রেইনবো হোমস্টে – শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য্য
“উফ! শেষ পর্যন্ত আমাদের প্ল্যান সাকসেসফুল। বসের কচকচানি, অফিস পলিটিক্সের নোংরা জগৎ ছেড়ে অবশেষে পা রাখলাম মেঘের রাজ্যে। আমাদের ড্রিম উইকেন্ড ডেসটিনেশন, লেপচাজগত।”— বুক ভরে দীর্ঘ শ্বাস টেনে পাহাড়ের শীতল মুক্ত বায়ু সেবন করতে করতে মুগ্ধ নেত্রদ্বয় যতটা সম্ভব প্রসারিত করে বলল অর্ঘ।
অর্ঘকে দাঁত কেলিয়ে সমর্থন জানাল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিন মূর্তি— সায়ন, তিয়াস আর সৌম্য। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অফিস থেকে চারজনে একসঙ্গে ছুটি ম্যানেজ করেছে।
“এই মুহূর্তেই আরও একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম বুঝলি, আমি বিয়ের পর অদ্রিজাকে নিয়ে হানিমুনে এইখানেই আসব। নিভৃতে বউকে নিয়ে রোমান্স করবার একেবারে আদর্শ জায়গা।”— গাড়ি থেকে নিজের লাগেজ বার করতে করতে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল অর্ঘ।
অর্ঘর কথাটা লুফে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ভেংচি কাটল তিয়াস, “একেই বলে গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল। টানা দু-বছর অদ্রিজার পেছনে অনাথ কুকুর ছানার মতো অবিরাম লেজ নেড়ে এতটুকুও পাত্তা পেল না, সে আবার বিয়ে করে হানিমুনের স্বপ্ন দেখছে!”
“পাত্তা দেয়নি তো কী হয়েছে? আজ দেয়নি, কাল দেবে। আলবাত দেবে। আর এক বছরের মধ্যেই অদ্রিজাকে যদি তোদের বউদি না বানাই, তবে আমার নামও অর্ঘ বাগচী নয়।”
“দ্যাটস দ্য স্পিরিট। আমি জানি তোর চেষ্টার কোনও খামতি নেই। তবে তা কতটা সফল হবে, সেটা নিয়ে একটু সংশয় আছে। বলা যায় না, আমাদের বউদি বানাতে গিয়ে, শেষমেশ অদ্রিজা তোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অন্য কাউকে জুটিয়ে আবার তোর বউদিই না হয়ে বসে।”— মুচকি হেসে ফোড়ন কাটল সায়ন।
“অভিশাপ দিচ্ছিস? দে। কোথায় বন্ধুর দুঃসময়ে সহানুভূতি দিবি, পাশে থাকবি, তা নয়—। তোদের মতো বন্ধু সত্যি বলছি শত্রুর চেয়েও ভয়ঙ্কর।”— রাগে গজগজ করতে করতে হোমস্টের প্রবেশ দ্বার সজোরে ঠেলে ভেতরে ঢুকল অর্ঘ।
রিসেপশনের ফর্মালিটি পূরণ করতেই, রুমের চাবি নিয়ে হাসি মুখে এগিয়ে এল একুশ-বাইশ বছরের একটি ছেলে। “আইয়ে সাব। আপলোগোকা কামরা দিখা দু।”— বলে আগ বাড়িয়ে সবার লাগেজ নিজেই নিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ছেলেটি।
কলকাতা থেকে লেপচাজগতের রেইনবো হোমস্টের একটা বড় ফোর বেডের ডরমেটরি বুক করেছে অর্ঘ। এই হোমস্টের মালিক একজন বাঙালি। অভিনব ঘোষাল। তিনি নিজে অবশ্য এখানে থাকেন না। নিজের কিছু বিশ্বস্ত কর্মচারীর হাতে এই হোমস্টের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে, নিজের অন্য ব্যবসার কাজে ঘুরে বেড়ান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
ছেলেটি ডরমেটরির বন্ধ দরজা খুলে সুটকেসগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে, কারও উদ্দেশে জানলা দিয়ে হাঁক পাড়ল, “একশো চার নাম্বার রুমমে পানি লাও শিলা।”
শিলা হন্তদন্ত হয়ে দু-জগ জল দিয়ে যেতেই ছেলেটি নিজের কাজ গুছিয়ে রুম থেকে বেরোতে যাবে, পেছন থেকে ডাকল অর্ঘ, “আরে, তোমার নামটাই তো জানা হল না। নাম কী তোমার? বাংলা বোঝো?”
ছেলেটি লাজুক হেসে বলল, “হা সাব বুঝি। বলতেও পারি। আমার নাম মঞ্জিল। মঞ্জিল তামাং।”
“বাহ! বেশ নাম তো? তা ক-বছর কাজ করছ এখানে?”
“সাব তিন বছর। আপনারা এখানে কতদিন—”
হঠাৎ কথার মাঝেই বাইরে কারও ডাক শুনে, তৎক্ষণাৎ চুপ করে গিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল মঞ্জিল।
সায়ন মঞ্জিলের চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে বলল, “মঞ্জিল তাহলে নেপালি? এখানে কিন্তু নেপালি রয়েছে অনেক।”
অর্ঘ স্মিত হেসে বলল, “হ্যাঁ, থাকবেই তো। এখান থেকে সাত-আট কিলোমিটার দূরেই তো নেপাল বর্ডার। মিরিক সাইট সিইং গেলে বর্ডারটাও ঘুরে আসব। পাসপোর্ট আর ভিসা ছাড়া ভিনদেশে বসে গরম চা আর সঙ্গে ‘ওয়াই ওয়াই’-এর স্বাদটাও নিয়ে আসা যাবে।”
সায়ন ভুরু কুঁচকে বলল, “ওয়াই ওয়াই! সেটা আবার কী?”
“কী আবার? ওটা হল ম্যাগির পার্বত্য সংস্করণ। খেতে মন্দ নয়।”— বলতে বলতে সুটকেস থেকে জামাকাপড় বার করে ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকে গেল অর্ঘ।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে, সায়ন আর তিয়াস ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে গরম লেপের ভেতর। সৌম্য দাঁড়িয়ে রয়েছে জানলার বাইরে একদৃষ্টে আনমনে চেয়ে। অর্ঘ ধীরে ধীরে সৌম্যর পাশে এসে বলল, “কীরে এত চুপচাপ কেন তুই? কেমন লাগছে জায়গাটা বলছিস না তো?”
সৌম্য সামনে অপরূপ সৌন্দর্যে সমুজ্জ্বল তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে মুগ্ধ নিষ্পলক নেত্রদ্বয় নিবদ্ধ রেখেই বলল, “কী বলব আমি? প্রকৃতির এই মোহময়ী দৃশ্য দেখে কথা যে হারিয়ে গেছে। তোর উৎসাহ, তোর উদ্যোগেই আজ আমার ঘুরতে বেরোনোর প্রথম হাতেখড়ি। প্রকৃতির যে অকল্পনীয় সৌন্দর্য দেখবার, উপভোগ করবার উপহার তুই দিলি আমায়, তার পরিবর্তে তোকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমার জানা নেই অর্ঘ। শুধু বলতে পারি আমি ভীষণ এক্সাইটেড। ওই শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘাকে স্বচক্ষে প্রথম দেখে, আজ বুঝতে পারছি, অনুভব করতে পারছি, ‘দ্য ফাইভ ট্রেসার অফ দ্য স্নো’-এর প্রকৃত অর্থ। মন চাইছে এই কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলেই হারিয়ে যাই চিরতরে।”
অর্ঘ মুচকি হেসে বলল, “তুই এখানে এক্সাইটেড। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চাস। আর এই দু’জনকে দেখ এই পাহাড় ছেড়ে বিছানাকেই উপভোগ করতে ব্যস্ত এখন।”
সায়নের খাটের পাশে গিয়ে ঠেলা মেরে বলল, “কীরে দুদিনের জন্য ঘুরতে এসে, ঘুমিয়ে কাটাবি তোরা?”
সায়ন কোনওমতে লেপ থেকে মাথার কিয়দংশ বার করে বিরক্তি মিশিয়ে বলল, “জ্বালাস না অর্ঘ। বাগডোগরা থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পাহাড়ি রাস্তায় প্রায় সত্তর কিলোমিটার জার্নি করে হাড়পাঁজরা ঝনঝন করছে। একটু বিশ্রাম না নিলে শরীর, মন, মস্তিষ্ক কোনওটাই সতেজ হবে না। আমাদের বিশ্রামের প্রয়োজন। তোদের অত উত্তেজনা থাকলে তোরাই এনজয় কর এখন।”
বিকেলে ফরেস্ট ট্রেল ধরে, বেশ কিছুক্ষণ হাঁটবার পর, রুমে এসে কফি আর সঙ্গে গরম গরম চিকেন বল পাঁচ প্লেট সাবার করে, চার বন্ধু রাতের অন্ধকারে জনবিরল লেপচাজগতের গা ছমছমে পরিবেশ উপভোগ করবার উদ্দেশ্যে আবার বাইরে বেরোবার উদ্যোগ করতেই, বাধা দিল মঞ্জিল। এগিয়ে এসে বলল, “রাতের অন্ধকারে বাইরে বেরোবেন না সাব। লেপার্ডের ভয় আছে। আমি অনেকবার লেপার্ডের পায়ের চিহ্ন দেখেছি। এখানে স্থানীয় বাসিন্দারা কেউই সন্ধের পর বাইরে বেরোয় না ভয়ে।”
মঞ্জিলের আপত্তিতে রাতের অ্যাডভেঞ্চারে বাধা পড়লেও, সকাল সকাল চার বন্ধু ক্যাব বুক করে বেরিয়ে পড়ল সাইট সিইংয়ে। আজ ওদের গন্তব্য ঘুম মনেস্ট্রি আর মিরিক লেক। আর ফেরবার পথে নেপাল বর্ডারে ঢুকে ভিনদেশে আয়েশ করে গরম চা খাওয়ার অভিলাষও পূরণ করে আসবে।
গাড়িতে সবথেকে আনন্দে, উত্তেজনায় অস্থির হয়ে রয়েছে সৌম্য। কারণ এটা ওর প্রথম ট্যুর, প্রথম পাহাড় দর্শন। ওক, পাইন, রডোডেনড্রনে সুসজ্জিত, মেঘের চাদরে ঢাকা পাহাড়ের এই বর্ণনাতীত নানান রূপ ওকে পাগল করে দিচ্ছে। গাড়ির ঊর্ধ্বগতিকে পাল্লা দিয়ে ততোধিক গতিতে ঊর্ধ্বে ধাবিত হচ্ছে সৌম্যর উত্তেজনার পারদ।
সাইট সিইং সেরে ফিরতে ফিরতে সন্ধে গড়িয়ে এল প্রায়। চারজনেই বেশ ক্লান্ত। রাতে ডিনার একটু তাড়াতাড়ি সেরে যে যার নরম বিছানায় ঢুকে পড়ল। ক্লান্ত চার জোড়া চোখ ঘুমে তলিয়ে গেল নিমেষেই। গভীর রাতের নিস্তব্ধতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ঘরের মধ্যে শুধু ঘড়ির কাঁটার নিরবচ্ছিন্ন টিকটিক শব্দ। হঠাৎই ছন্দপতন ঘটিয়ে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা চিড়ে অপ্রত্যাশিতভাবে আছড়ে পড়ল ভয়ঙ্কর এক জান্তব গর্জন। ঘুম ভেঙে গেল অর্ঘর। মনে হল ডাকটা হোমস্টের অনতিদূরে ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকেই আসছে। পাশে তাকাতেই দেখে, ঘুম ভেঙে ভয়ার্ত মুখ নিয়ে উঠে বসেছে সৌম্যও। দুজনেরই বিহ্বল দৃষ্টি জানলার বাইরে। বেশ কিছুক্ষণ কারও মুখে কোনও কথা নেই। সংবিৎ ফিরল তিয়াসের কথায়। লেপের ভেতর থেকে ঘুম জড়ানো গলায় বলল, “অত ভয় পাচ্ছিস কেন? ওটা চিতাবাঘের গর্জন। মঞ্জিল বলল শুনলি না, এখানে লেপার্ড আছে?”
পরের দিন সকালে অর্ঘর ঘুম ভাঙতে একটু দেরিই হয়ে গেল। ধড়মড়িয়ে খাটে উঠে বসে দেখে, সায়ন আর তিয়াস তখনও ঘুমোচ্ছে। কিন্তু সৌম্যর বিছানা খালি। অর্ঘ মুচকি হাসল। সৌম্য ঠিক উঠে সানরাইস দেখতে বেরিয়ে গেছে। ওকে ঘুরতে আনাটাই সার্থক হয়েছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই দুই কুম্ভকর্ণকে নিয়ে আর কখনও ঘুরতে বেরোবে না। ঘুরতে এসে কাউকে পড়ে পড়ে এভাবে ঘুমোতে দেখাটা সত্যিই অসহ্য। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হতে অর্ঘ ঢুকে পড়ল বাথরুমে।
রিসেপশনের দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো বড় দেওয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম ঢং ঢং শব্দে দুলে উঠল দশবার। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই আঁধার ঘনাচ্ছে সবার চোখেমুখে। উদ্বিগ্ন মুখে ব্যস্ত হয়ে চারদিকে ছোটাছুটি করছে হোমস্টের কর্মচারীরা। আশেপাশের বসতিগুলোতেও লোক পাঠিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত কেউই সঠিক কোনও খবর আনতে পারেনি। লনে থম মেরে বসে রয়েছে সায়ন আর তিয়াস। অর্ঘ উন্মাদের মতো হোমস্টের চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। সেই সকালে বেরিয়ে সৌম্য এখনও ফিরে আসেনি। প্রথম পাহাড়ে এসে প্রচণ্ড এক্সাইটেড ছিল ছেলেটা। পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও, পাহাড়ের অজানা বিপদের সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ সৌম্য। অর্ঘর মন কু ডাকছে। কোনও বিপদে পড়েনি তো? ভয়ে হাত-পা অবশ হয়ে আসছে ক্রমশ। ঠিক কখন থেকে সৌম্য রুমে নেই, তাও তো ওরা জানে না। সৌম্য যে সকালেই বেরিয়েছে, সেটাও তো নিশ্চিত নয়। বারবার মনে একটা দুশ্চিন্তাই দানা বাঁধছে, গতকাল রাতে চিতার ভয়ানক গর্জন শুনে সবাই ঘুমিয়ে পড়বার পর কৌতূহলবশত কোনওভাবে বাইরে বেরিয়ে যায়নি তো ছেলেটা? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, হোমস্টের কোনও কর্মচারীই সৌম্যকে বাইরে বেরোতে দেখেনি। ওয়াচম্যানদের মুখেও এক কথা। সকাল সাতটার আগে কেউ বাইরে বেরোয়নি। তবে জলজ্যান্ত ছেলেটা গেল কোথায়? অর্ঘর বিরক্ত লাগছে। হোমস্টের ভেতর সিসিটিভির কোনও ব্যবস্থা নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন দার্জিলিং সদর থানার পুলিশ ইন্সপেক্টর নীরজ ছেত্রী। রেইনবো হোমস্টে থেকেই সৌম্যর নিখোঁজের খবর দেওয়া হয়েছিল থানায়। ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁইছুঁই। রিসেপশনে কিছু কথা সেরে ইন্সপেক্টর এলেন অর্ঘদের রুমে। একটা চেয়ার টেনে বসলেন অর্ঘ, সায়ন আর তিয়াসের সামনে।
নীরজবাবু নেপালি হলেও, তিনজনের উদ্দেশে পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন, “সৌম্যবাবু যে রুমে নেই, আপনাদের মধ্যে কে প্রথম দেখেছিলেন?”
অর্ঘ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “স্যার আমি দেখেছিলাম। এমনিতে ঘুম থেকে রোজ আমিই তাড়াতাড়ি উঠি। কিন্তু আজ উঠতে একটু দেরিই হয়েছিল। প্রায় সাতটা বেজে গিয়েছিল। পাশে তাকিয়ে দেখি সৌম্য খাটে নেই। সায়ন আর তিয়াস তখনও ঘুমোচ্ছিল।”
“বন্ধুকে না দেখতে পেয়ে আপনি তাঁকে খোঁজবার চেষ্টা করেননি অর্ঘবাবু?”
অর্ঘ একটু ইতস্তত করে বলল, “আসলে সৌম্য যে নিখোঁজ হবে, এই কথাটা তো স্বপ্নেও ভাবিনি। তাই ভাবলাম হয়তো সানরাইস দেখতে গেছে। একটু পরেই ফিরে আসবে। তাই আর সেভাবে গুরুত্ব দিইনি। ঘুরতে এসে আমাদের মধ্যে সৌম্যই সবথেকে বেশি এক্সাইটেড ছিল।”— বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল অর্ঘ।
তিয়াস অর্ঘর ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “শান্ত হ অর্ঘ। এখন ভেঙে পড়বার সময় নয়।”
নিজেকে কিছুটা সামলিয়ে কোনওমতে কণ্ঠরোধ হয়ে আসা ভারী গলায় অর্ঘ অনুনয়ের সুরে বলল, “সৌম্যকে ফিরিয়ে আনুন স্যার। সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে ওকে ঘুরতে নিয়ে এসেছিলাম আমি। পাহাড় সম্বন্ধে ও একেবারেই অনভিজ্ঞ। কোনও রাস্তা চেনে না। ওর কিছু হয়ে গেলে আমি ফিরে গিয়ে কী জবাব দেব সৌম্যর বাবা-মাকে?”
“আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করব অর্ঘবাবু। আপনি শান্ত হন। একটু খেয়াল করে বলুন তো, এই কয়েক ঘণ্টায় ঘরে অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়েছে কি?”
সায়ন এবার নীরজবাবুর উদ্দেশ্যে গম্ভীর হয়ে বলল, “স্যার অস্বাভাবিক সেরকম কিছু নয়, তবে সৌম্য কিন্তু মোবাইল নিয়ে যায়নি। ওর মোবাইল খাটে বালিশের তলাতেই রাখা ছিল। আমরা যতদূর জানি, সৌম্য মোবাইল ছাড়া সাধারণত কোথাও বেরোয় না। আর ওর জুতোজোড়াও রয়েছে রুমের শ্যু র্যাকেই। খাটের নীচে স্লিপারটা শুধু নেই। কিন্তু এই ঠান্ডায় সৌম্য জুতো ছাড়া শুধু স্লিপার পরে বাইরে বেরোবে কেন?”
নীরজবাবু ভুরুযুগল কুঞ্চিত করে বললেন, “ভালো কথা বললেন। মাথায় রাখতে হবে ব্যাপারটা।”
এরপর তিনি ইশারায় তাঁর অধস্তন কর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন রুমটা আর সঙ্গে হোমস্টের প্রতিটা ঘর ভালোভাবে সার্চ করতে।
সেই ফাঁকে তিনি মঞ্জিলকে ঘরে ডেকে নেপালি ভাষায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। সায়ন, অর্ঘ আর তিয়াস চেয়ে রয়েছে বোকার মতো। দুজনের কথোপকথন মাথামুণ্ডু কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। তবে নীরজবাবুর হাবেভাবে এটা স্পষ্ট, মঞ্জিলের দেওয়া উত্তরে উনি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না মোটেই।
এইসময় হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকল একজন কনস্টেবল। নীরজবাবুর দিকে একটা হাতঘড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল, “স্যার, এটা একতলা যাওয়ার সিঁড়িতে পেয়েছি।”
অর্ঘ দৌড়ে গিয়ে ঘড়িটা হাতে নিয়ে বলল, “এটা তো সৌম্যর ঘড়ি। আগের বছরই কিনেছিল।”
নীরজবাবু এবার মঞ্জিলের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রাশভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের হোমস্টেতে ট্যুরিস্টদের জন্য বরাদ্দ ঘর তো দোতলায়। তাহলে একতলাটা কী হিসেবে ব্যবহার হয় মঞ্জিল?”
মঞ্জিল আমতা আমতা করে বলল, “স্যার, ওটা তো বেসমেন্ট। ওখানে তিন-চারটে ঘর আছে স্টাফদের রাতে শোওয়ার জন্য। আর একটা বড় স্টোররুম রয়েছে, যেখানে অনেকদিনের সবজি বাজার, গ্রোসারি আইটেম জমা করে রাখা হয়।”
মঞ্জিলকে নিয়ে নীরজবাবু নিজেদের ভাষায় কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন নীচে। অর্ঘ, তিয়াস, সায়ন বসে রইল রুমের ভেতর। বেলা দেড়টা বাজে। তিন বন্ধু নাওয়া-খাওয়া ভুলে বিধ্বস্ত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে চিন্তিত মুখে ফিরে এলেন ইন্সপেক্টর নীরজ ছেত্রী। কক্ষের চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন, “ব্যাপারটা আমার খুব একটা সুবিধের ঠেকছে না অর্ঘবাবু। আমার মন বলছে কিছু একটা রহস্য রয়েছে। এখানকার স্টাফরাও ঠিক ইনফরমেশন দিচ্ছে না। অনেক কিছুই গোপন করছে। আপনারা একটু সাবধানে থাকবেন। এই মুহূর্তে বিপদ কিন্তু আপনাদেরও। আমি কটা দিন পুলিশ ফোর্স নিয়ে আপনাদের পাশের হোমস্টেতেই থাকব। যদি প্রয়োজন মনে করেন, সময় অসময় ভাবেন না, একটা ফোন করবেন। হাজির হয়ে যাব।”— বলেই নীরজবাবু দ্রুত বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।
সময় বয়ে চলেছে তার নিজের ছন্দেই। সারাদিনের শারীরিক, মানসিক ধকলে ক্লান্ত সায়ন আর তিয়াস একসময় তলিয়ে গেল ঘুমে। কিন্তু ঘুম নেই অর্ঘর চোখে। দুশ্চিন্তায় মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত আরক্ত চোখ দুটো ভাষাহীন, হতবিহ্বল। এর আগেও কত ঘুরেছে। কিন্তু এইরকম বিপদের সম্মুখীন হতে হয়নি কোনওদিন। অসহায়ভাবে হাতড়ে চলেছে কিনারা। কিন্তু কোনও সমাধানই মাথায় আসছে না সেভাবে। নানান চিন্তায় ছটফট করতে করতে অস্থির হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল অর্ঘ। আস্তে করে দরজাটা খুলে সিঁড়ি বেয়ে সোজা নেমে এল নীচে। বেসমেন্টে নামবার এই সিঁড়িতেই পাওয়া গিয়েছে সৌম্যর ঘড়ি। একতলার আধো অন্ধকার সরু গলি ধরে চারদিক নজর করতে করতে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল অর্ঘ। একতলার প্রতিটা রুমের দরজাই বন্ধ। স্টোররুমেও তালা ঝোলানো। চারদিক নিস্তব্ধ, শুনসান। উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক ওদিক বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে, সন্দেহজনক কিছুই নজরে এল না সেভাবে। হতাশ হয়ে ফিরে আসতে যাবে, ডানপাশের সম্পূর্ণ অন্ধকার গলি দিয়ে দ্রুত হেঁটে আসা একজনের সঙ্গে হঠাৎই অনভিপ্রেতভাবে মুখোমুখি বিশ্রী সংঘর্ষ হল অর্ঘর। কোনওমতে নিজেকে সামলিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখে, বেশ বিরক্তিমাখা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন ভদ্রলোক। তাঁর আপাদমস্তক গরম পোশাকে আবৃত। মাথায় মাঙ্কিক্যাপ সঙ্গে মাফলার জড়ানো। মাফলারের পুরু আবরণের ফাঁক গলে শুধু বেরিয়ে রয়েছে টানা টানা দিঘল দুটি চোখ। অর্ঘ বিনম্রভাবে সরি বলতেই, ভদ্রলোক মাথা নেড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন সেখান থেকে।
সারাদিন পাহাড় তন্নতন্ন করে খুঁজেও, পাওয়া যায়নি সৌম্যকে। দুর্ভাবনায়, আতঙ্কে, ভয়ে দিশেহারা তিন বন্ধু। এর মধ্যে মাথাতে আছে নীরজবাবুর বলা সাবধান বাণী। বিপদ আসতে পারে ওদেরও। আর কোনও রিস্ক নিতে চায় না ওরা। ঠিক হয়েছে, প্রত্যেকে পালা করে রাত জাগবে। বিপদ বুঝলে বাকিদের জাগিয়ে তুলবে।
আজ ভোরের দিকে জাগবার পালা অর্ঘর। রাত জাগার ক্লান্তিতে সায়ন আর তিয়াস বেহুঁশ হয়ে ঘুমোচ্ছে। অর্ঘ উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে জানলার দিকে। আজ বাইরের প্রকৃতিও যেন মেঘাচ্ছন্ন, মনমরা। হয়তো সমব্যথী। তবে এখন ভেঙে পড়লে চলবে না কোনওমতেই। ধৈর্য্য রাখতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে সৌম্যকে। চিন্তার মাঝে বাইরে মৃদু গুনগুন শব্দ কানে আসতেই সচকিত হয়ে উঠল অর্ঘ। খুব আস্তে আস্তে কারা যেন কথা বলছে। অর্ঘ সন্তর্পণে পদশব্দ না করে দরজা খুলে দেখে, রিসেপশনের সামনে সোফায় বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত মঞ্জিল আর শিলা। অর্ঘ কান পেতে শুনল। তবে ভাষা বোঝা ওর আয়ত্বের বাইরে। গোর্খা ভাষায় কথা হচ্ছে দুজনের। অর্ঘ আস্তে আস্তে এগিয়ে সামনে দাঁড়াতেই চমকে উঠল মঞ্জিল। তটস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সাব, আপনি? এখন? এখানে? ঘুম আসেনি?”
“না আসেনি। তোমরাও বা এত রাতে কী করছ এখানে?”— গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করল অর্ঘ।
মঞ্জিল একবার শিলার দিকে তাকিয়ে থেমে থেমে বলল, “সাব, আমাদের মালিক আসবেন এখন। তাই তাঁর অপেক্ষা করছি আমরা।”
“মালিক মানে অভিনববাবু আসবেন?”
“জী সাব। উনি তো এখানে থাকেন না। আজকের দুর্ঘটনার খবর শুনে আসছেন এখানে।”
মঞ্জিলের কথা শুনে অর্ঘ চলে যেতে যাবে, কী ভেবে মঞ্জিল আবার ডাকল পেছন থেকে। ইতস্তত করে বলল, “একটা কথা বলবার ছিল সাব।”
অর্ঘ ভুরু কুঁচকে বলল, “হ্যাঁ বলো?”
মঞ্জিল নিজের দু-হাত খানিক কচলে বলল, “এই হোমস্টে থেকে এর আগেও অনেকজন গায়েব হয়েছে সাব। তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
অর্ঘ আঁতকে উঠে বলল, “সে কী! কই আমরা তো এই হোমস্টের সম্পর্কে এমন কিছু শুনিনি? এর রেপুটেশেন বেশ ভালো জেনেই তো আমরা বুক করেছি এখানে।”
“জানবেন কী করে সাব? মালিক তো টাকা খাইয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দেন।”
“তাহলে এত বড় কথাটা ইন্সপেক্টর নীরজ ছেত্রীকে বললে না কেন তুমি?”
“কী করে বলব সাব? তাহলেই তো চাকরি যাবে। আর নাহলে খুন হয়ে বেঘোরে প্রাণটা যাবে। ঘরে আমার মুখ চেয়ে তিনটে ছোট বোন আর মা রয়েছে সাব। সবার পেট চলে আমার এই রোজগারেই। আমি চাইলেও—”
মঞ্জিলের কথা শেষ হল না, তার আগেই বাইরের দরজা ঠেলে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকলেন, সুঠাম দেহী মধ্যবয়স্ক একজন পুরুষ। মঞ্জিল আর শিলার ব্যস্ততা দেখে বুঝতে বাকি রইল না ইনিই অভিনব ঘোষাল। হোমস্টের মালিক। ভদ্রলোক ঢুকেই অর্ঘর দিকে বিন্দুমাত্র দৃকপাত না করে হনহন করে চলে গেলেন নিজের রুমে। কিন্তু এই কয়েক মুহূর্তেই অর্ঘর চোখ আটকে গেল মানুষটার ওই দু’-চোখে। এই চোখ সে দেখেছে। গতকাল বিকেলেই এই দিঘল চোখের অধিকারীর সঙ্গে তার ধাক্কা লেগেছিল মুখোমুখি। আর ভাবতে পারছে না অর্ঘ। বুঝতেই পারছে, না চাইতেও অনেক অজানা রহস্যের আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে ওরা। ভারাক্রান্ত মনে দ্রুত এসে রুমের দরজাটা খুলতে যাবে, তার আগেই দরজা খুলে উন্মাদের মতো বেরিয়ে এল তিয়াস। অর্ঘকে দেখেই চিৎকার করে উঠল, “কোথায় গিয়েছিলি তুই? আমরা তো ভাবলাম সৌম্যর মতো তোকেও হারালাম বুঝি।”
নিজের খাটে দু’-হাতে মাথা চেপে বসে রয়েছে অর্ঘ। ওর দিকে প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে নীরবে চেয়ে রয়েছে সায়ন আর তিয়াস।
বেশ কিছুক্ষণের মৌনতা ভেঙে অর্ঘ বলল, “আমি নিশ্চিত, এই হোমস্টের বাইরে কোথাও যায়নি সৌম্য। আমার বিশ্বাস এইখানেই ওকে কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম সৌম্য বাইরে বেরিয়ে হয় বিপদে পড়েছে না হয় পাহাড়ে পথ হারিয়েছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। সৌম্য বাইরে বেরোলে অবশ্যই এই ঠান্ডায় নিজের জুতোটা অন্তত পরত। ঘরে মোবাইল ফেলে বেরিয়ে যাওয়াটাও মেনে নিতে পারছি না। তাছাড়া কেউ ওকে বাইরে বেরোতেও দেখেনি। বাইরের গেটে সবসময় তালা থাকে। বেরোলে অন্তত কাউকে তালাটা খোলবার জন্য বলত। বাইরের গেট যেমনকার তেমনই বন্ধ ছিল। তাহলে সৌম্য বেরোল কীভাবে? আর সবথেকে বড় বিষয়, এই মুহূর্তে মঞ্জিলের কাছে জানলাম, ঘুরতে এসে এর আগেও নাকি এই হোমস্টে থেকে সৌম্যর মতো আরও অনেকেই নিরুদ্দেশ হয়েছে।”
তিয়াস আঁতকে উঠল, “কী বলছিস তুই?”
অর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এটা সত্যি। মঞ্জিলের ভয়ার্ত চোখ দেখেই বুঝেছি, ও মিথ্যে বলছে না। এখানকার স্টাফরা সব জেনেও পুলিশের কাছে সব কিছু গোপন করেছে ভয়ে। শুধুমাত্র আত্মরক্ষার্থে। বেসমেন্টের ওই তালাবন্ধ ঘরগুলো কিন্তু আমার কাছে বেশ সন্দেহজনক। মঞ্জিলকে ঘরগুলোর তালা খুলতে বলেছিলাম। সে অস্বীকার করেছে খুলতে। বাইরের কারও সামনে খোলবার নাকি অনুমতি নেই। তাছাড়া এখানে আরও একটা জিনিস আমায় ভাবিয়ে তুলছে, একতলার অন্ধকার গলিতে ওই দিঘল পটলচেরা চোখের অধিকারী মানুষটাই বা কে? আমি যা সন্দেহ করছি, সেটা কি ঠিক?
ওদের কথার মাঝেই পুব আকাশ রাঙিয়ে টুপ করে পাহাড়ের কোল থেকে লাফিয়ে উঠল রক্তিম দিবাকর। সূচনা হল আরও এক নতুন দিনের। চারপাশ খানিক ফরসা হতেই ইন্সপেক্টর নীরজ ছেত্রীও চলে এলেন পুলিশ ফোর্স সহ। মানুষটি ভীষণই কর্তব্যপরায়ণ, কর্মঠ। বেশ কয়েকটা দলে নিজের লোকেদের ভাগ করে, শুরু করলেন আর এক দফা তল্লাশি। অর্ঘর অনুরোধে বেসমেন্টের প্রতিটা দরজাই তালা খুলে খোঁজা শুরু হল। কিন্তু সব চেষ্টাই বিফল হল। এর মধ্যেই এক ফাঁকে অর্ঘর নজর পড়ল সিঁড়ির উপর। দাঁড়িয়ে রয়েছেন অভিনব ঘোষাল। ভাবলেশহীন গম্ভীর মুখে নেই কোনও অভিব্যক্তি। পুলিশের কাজে বাধাও দিচ্ছেন না। আবার কোনও আগ্রহও দেখাচ্ছেন না সেভাবে। ওঁর দু-চোখের ওই শীতল চাহনি বড়ই অস্বস্তিকর। বিরক্তিতে মুখটা ঘুরিয়ে নিল অর্ঘ।
আরও একটা গোটা দিন চলে গেল চরম ব্যর্থতায়। রাতে নিজের বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে নির্ঘুম অপলক চেয়ে রয়েছে অর্ঘ। মাথাটা যেন শূন্য লাগছে। এক রাতের মধ্যে কীভাবে একটা জলজ্যান্ত ছেলে উধাও হয়ে যেতে পারে? এই মুহূর্তে মস্তিষ্ক সেই তথ্য দিতে অপারগ। সৌম্য কি আদৌ বেঁচে রয়েছে? যদি থাকে, তাহলে কী অবস্থায় রয়েছে ছেলেটা? নানান অলীক চিন্তার মাঝে একটু হয়তো তন্দ্রার মতো এসেছিল, আবার সেই বিকট জান্তব গর্জনে খাটে ধড়মড় করে উঠে বসল অর্ঘ। পাশে তাকিয়ে দেখে, প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুম ভাঙেনি সায়ন আর তিয়াসের। আজ আর খাটে বসে রইল না অর্ঘ। লাফ দিয়ে খাট থেকে নেমে, এসে দাঁড়াল জানলার সামনে। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড় জুড়ে। যতটুকু চোখ যায়, ভালো করে নজর করেও অস্বাভাবিক কিছুই চোখে ঠেকছে না অর্ঘর। তবে রাতের গভীর নিস্তব্ধতায় ভালো করে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে জঙ্গলের ভেতর শুকনো পাতা মাড়ানোর খসখস শব্দ। যেন বেশ কয়েকজন জঙ্গলের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে খুব সন্তর্পণে। পদশব্দ আরও কিছুটা জোড়ালো হতে, চোখে পড়ল ছোট ছোট টর্চের মৃদু আলো। এগিয়ে আসছে হোমস্টের দিকেই। বেসমেন্টের কাছাকাছি এসেই একসঙ্গে নিভে গেল প্রতিটা আলো। এবার বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা। নিজেকে আড়াল করে অর্ঘ ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে জানলার সামনেই। খানিকবাদেই আবার শুরু হল মৃদু গুঞ্জন। পাতা মাড়ানোর ক্ষীণ খসখস শব্দ। জ্বলে উঠল টর্চের আলো। আলো জ্বলে উঠতেই কেঁপে উঠল অর্ঘ। লাফিয়ে উঠল হৃৎপিণ্ড। বিস্ফারিত চোখ দুটো রইল অপলক স্থির। নিজের মনেই গঙিয়ে উঠল অর্ঘ, লোকগুলোর কাঁধে সাদা প্যাকেটে জড়ানো ওসব কী? শবদেহ!
আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে জুতো পরতে পরতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল করল ইন্সপেক্টর নীরজ ছেত্রীকে। নীরজবাবু কল রিসিভ করতেই অর্ঘ এক নিঃশ্বাসে বলল, ‘স্যার আপনি এই মুহূর্তেই চলে আসুন হোমস্টের পেছন দিকে বেসমেন্টের লোহার গেটের কাছে। আমি ওইখানেই অপেক্ষা করব আপনার জন্য।’— বলেই কল কেটে দ্রুত বেরিয়ে গেল অর্ঘ রুম থেকে।
এই ঠান্ডাতেও সারা শরীর ঘেমে উঠেছে অর্ঘর। হাত-পা কাঁপছে। পরিষ্কার দেখেছে বেসমেন্টের পেছনের গেট দিয়ে বার করা হচ্ছে মৃতদেহ। সৌম্য ঠিক আছে তো? ছেলেটা আদৌ বেঁচে আছে তো? চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে অর্ঘর। কোনওমতে সিক্ত চোখ দুটো দু-হাতে কচলে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়াল একতলায়। নীচের আধো অন্ধকার গোলকধাঁধাঁর মতো গলি কোনওমতে হাতড়িয়ে চলে এল সেই রহস্যময় গলির কাছে। যে গলির কাছেই ধাক্কা খেয়েছিল সেই অজানা আগন্তুকের সঙ্গে। যার চোখ দুটোর সঙ্গে অসম্ভব মিল রয়েছে অভিনববাবুর দিঘল চোখজোড়ার। একটু কাছে যেতেই শব্দ পেল মৃদু গুঞ্জনের। কানে আসছে বেশ কয়েকজনের খুব চাপা স্বরে কথাবার্তা। শব্দের উৎস অনুসরণ করে আরও একটু এগোতেই, অর্ঘকে অপ্রস্তুত করে আচম্বিতে খুলে গেল সামনের একটি দরজা। হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল অর্ঘ। এখানে যে একটা দরজা রয়েছে একবারের জন্যও কখনও মনে হয়নি অর্ঘর। এর আগেও এসেছে এখানে। নীরজবাবুকে নিয়েও তল্লাশি করেছে দু-বার। কিন্তু কখনওই দেখে মনে হয়নি এটা একটা দরজা। এর পেছনে কোনও ঘর থাকতে পারে। যতবার দেখেছে, সাধারণ দেওয়াল বলেই ভুল করেছে। তিনদিকের দেওয়ালের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে এমন নিখুঁতভাবে বানানো হয়েছে, কেউ না জানলে বিশ্বাসই করবে না এটা কোনও দেওয়াল নয়, একটা কক্ষের প্রবেশ মুখ। মুহূর্তেই অর্ঘ নিজেকে আড়াল করল গলির অন্য পাশে। চোখ রাখল সামনের খোলা দরজার দিকে। কয়েকজন লোক চার-পাঁচটা মৃতদেহ টানতে টানতে বেরিয়ে আসছে ঘর থেকে। তারা বেরিয়ে আসতেই খুলে গেল বেসমেন্টের লোহার দরজা। প্রত্যেকে বেরিয়ে যেতেই আবার বন্ধ হল সেটা। কিন্তু আশ্চর্য! খোলা রইল ভেতরের রুমের দরজা। মৃদু আলো জ্বলছে সেখানে। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। শব্দহীন, জনমানবহীন কেমন ভূতুড়ে পরিবেশ। বেশ অনেকক্ষণ কারও কোনও শব্দ না পেয়ে, অর্ঘ মনে সাহস সঞ্চয় করে অদম্য কৌতূহলে সন্তর্পণে এগিয়ে যেতে শুরু করল খোলা দরজার দিকে। চারপাশ ভালোভাবে নজর করে প্রবেশ করল রুমের ভেতর। এখানেও নেই কেউ। অর্ঘ আরও একটু সাহস পেয়ে সবার ফিরে আসবার আগে রুমের ভেতর দ্রুত খুঁজতে শুরু করল এমন কিছু, যার ভিত্তিতে সৌম্যকে খুঁজে পাওয়া যেত পারে। এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। হুঁশজ্ঞান হারিয়ে চারদিক হাতড়িয়ে চলেছে পাগলের মতো। হঠাৎই কিছু একটায় অসতর্কভাবে হাত পড়ায় শব্দ হল বিকট। আর সঙ্গে সঙ্গেই মেঝের টাইলস সরে গিয়ে বেরিয়ে এল ভূগর্ভস্থ আরও একখানা ঘর। প্রচণ্ড বিস্ময়ে অর্ঘ ঝুঁকে পড়ে নীচের দিকে তাকাতেই, আঁতকে উঠল। অস্ফুটে বিস্ময়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটাই শব্দ, সৌম্য!
শুধু সৌম্যই নয়। সেখানে বন্দি রয়েছে সৌম্যর মতো আরও অনেকেই। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছে অচেতন। প্রচণ্ড উন্মাদনায় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অর্ঘ দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে যাবে, খোলা দরজার কাছ থেকে ভেসে এল শ্লেষ মেশানো এক গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর, “বন্ধুকে দেখে কেমন লাগল অর্ঘবাবু?”
অর্ঘ চমকে পেছনে ফিরে দেখে, অভিব্যক্তিশূন্য মুখে শীতল দৃষ্টি হেনে ওরই দিকে স্থির তাকিয়ে রয়েছেন অভিনব ঘোষাল। ঠোঁটের কোণে তাঁর হিংস্র ক্রূর হাসি।
এই মুহূর্তে অভিনববাবুর নিষ্ঠুর বিদ্রূপাত্মক কথাটা শুনে, চোখের সামনে সৌম্যর করুণ অবস্থা তথা এমন বীভৎস নারকীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে, নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না অর্ঘ। রাগে উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ইউ ব্লাডি বিচ। আপনার সাহস কী করে হয় আমাদের বন্ধুকে এভাবে তুলে আনার? আপনাকে আমি পুলিশে দেব।” — বলে এগোনো মাত্রই, পেছন থেকে মাথায় আচম্বিতে এসে পড়ল প্রচণ্ড রডের আঘাত। পা দুটো থমকে গেল। চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে তৎক্ষণাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল অর্ঘ।
জ্ঞান ফিরে অর্ঘ চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে, সকাল হয়ে গিয়েছে। হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে সে। হাতে স্যালাইন চলছে। ডান পাশের দেওয়াল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে রয়েছে চারজন সশস্ত্র পুলিশ। পায়ের কাছে চেয়ার নিয়ে থমথমে মুখে বসে রয়েছে সায়ন আর তিয়াস। আর ঠিক মাথার কাছে বসে রয়েছেন ইন্সপেক্টর নীরজ ছেত্রী।
অর্ঘ সবার মুখ চোখের অবস্থা দেখে বেশ ঘাবড়ে গেল। চারদিকে কৌতূহলী, চিন্তিত দৃষ্টি বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সব ঠিক আছে তো? আমি এখানে এলাম কীভাবে? আর সৌম্য কোথায়? আমি ওকে কাল রাতে বেসমেন্টের ঘরে দেখেছিলাম অচেতন অবস্থায়!”
সায়ন আর তিয়াস কোনও কথা না বলে একে অপরের দিকে তাকাল বিস্মিত হয়ে। কথা বললেন নীরজ ছেত্রী। গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি ঠিক আছেন অর্ঘবাবু?”
অর্ঘ উদ্গ্রীব হয়ে বলল, “আমি ঠিক আছি। আপনি শুধু সৌম্যর খবর কী বলুন।”
এবার একটু রহস্য করে হাসলেন নীরজবাবু। ঠোঁটে হাসির রেশ টেনে বললেন, “সৌম্যবাবুর কথা জানলে আপনি কি খুব একটা খুশি হবেন অর্ঘবাবু?”
অর্ঘ একটু থতমত খেয়ে বলল, “মানে? আপনার কথার অর্থ আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না? আমার সত্যিই অধৈর্য্য লাগছে। দয়া করে আপনি আর হেঁয়ালি করবেন না।”
“তাহলে এবার আপনাকে বরং সবটা বুঝিয়েই বলি অর্ঘবাবু। আর হেঁয়ালি আমারও ভালো লাগছে না। সত্যিই আপনার সময় হয়ে গেছে বোঝবার।”— অর্ঘর চোখে চোখ রেখে কঠিন হয়ে বললেন নীরজবাবু।
“কী বলতে চাইছেন আপনি?”— অর্ঘর গলার স্বরে কিঞ্চিত ভয় মেশানো।
নীরজবাবু এবার সায়ন আর তিয়াসের দিকে একঝলক তাকিয়ে, অর্ঘর দিকে ফিরে কিছুটা রুক্ষভাবে বললেন, “আর কত অভিনয় করবেন? অনেক হয়েছে। আপনার এই নোংরা নাটক এবার বন্ধ করুন অর্ঘবাবু। নিজেকে খুব চালাক মনে করেন? কী ভেবেছিলেন, এই নোংরা নাটক করে পুলিশের হাতে ধরা পড়বেন না? সহানুভূতি কুড়োবেন?”
“এসব কী বলছেন আপনি? কীসের নাটক? অযথা আমার উপর কী দোষারোপ করতে চাইছেন আপনি?” —উগ্র হয়ে উঠল অর্ঘ।
সায়ন এবার ভগ্নকণ্ঠে বলল, “নীরজবাবু আমরাও কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না। সবই কেমন ধোঁয়াশার মতো। একটু পরিষ্কার করে বলবেন আপনি?”
নীরজবাবু এবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন জানলার কাছে। দেওয়ালে হালকা হেলান দিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বললেন, “তাহলে শুনুন। কাল মাঝরাতে যখন আবার চিতাবাঘের গর্জন শুনি, তখন আর এক মুহূর্তও দেরি না করে, পুলিশ ফোর্স নিয়ে আমি চলে আসি রেনবো হোমস্টের সামনে। জঙ্গলের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে সন্তর্পণে আমরা দ্রুত ঘিরে ধরি রেনবো হোমস্টের বেসমেন্ট। কারণ আমার সন্দেহ প্রথম থেকেই এই হোমস্টের প্রতিটা স্টাফ ও তার মালিক অভিনব ঘোষালের উপরই ছিল। আমার স্থির বিশ্বাস ছিল সৌম্যবাবুর অন্তর্ধানের সব রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এই হোমস্টে ও তার বেসমেন্টেই। তাই আমি পুলিশ ফোর্স নিয়ে রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যেই ওঁত পেতে ছিলাম সঠিক সময়ের। কিন্তু হোমস্টের দোতলার জানলা দিয়ে আমাদের দেখে ফেলেন অর্ঘবাবু। তিনিও জানলার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি অভিনববাবুকে সাবধান করবার জন্য রুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত দৌড়ে যান বেসমেন্টে।”
তিয়াস এবার বাধা দিয়ে বলল, “এক মিনিট নীরজবাবু। আপনি কী বললেন? আমাদের অর্ঘ অভিনববাবুকে সাবধান করবার জন্য দৌড়ে গেছে? এসব কী বলছেন!”
সঙ্গে সঙ্গে অর্ঘও চেঁচিয়ে উঠল, “আমার নামে এসব অবান্তর কথা কেন বলছেন আপনি? আমি কেন অভিনববাবুকে সাবধান করতে যাব? কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?”
নীরজবাবু হেসে তিয়াসের দিকে ফিরে বললেন, “আপনাদের বন্ধুর তাহলে আসলে পরিচয়টা এবার দিয়েই দিই বলুন? এই অর্ঘ বাগচী হলেন অভিনব ঘোষালেরই দলের লোক। ওঁর খুব ঘনিষ্ঠ একজন। অভিনববাবুর হয়ে খানিকটা ওই দালালের কাজ করেন উনি। অর্ঘবাবুর কাজ হল টোপ দিয়ে বা ভুলিয়ে ভালিয়ে, ছলেবলে ট্যুরিস্টদের ধরে এনে রেনবো হোমস্টেতে হাজির করা। পরিবর্তে অভিনববাবুর কাছে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন উনি।”
নীরজবাবুর কথা শুনে সায়ন আর তিয়াসের প্রচণ্ড বিস্ময়ে বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছে না। অর্ঘ উত্তেজিত হয়ে আবারও প্রতিবাদ করতে যাবে, এবার রাগে প্রচণ্ড জোরে ধমক দিয়ে উঠলেন নীরজবাবু— “চুপ। আর একটাও কথা নয় অর্ঘবাবু। আপনি ধরা পড়ে গেছেন। শুধু আপনি নন অভিনব ঘোষাল সহ আপনার দলের প্রত্যেকেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। অভিনববাবুই আপনার আসল পরিচয় পুলিশের কাছে ফাঁস করে দিয়েছেন। এখন আর আপনার পালাবার কোনও পথ নেই।”
সায়ন এবার আস্তে আস্তে বলল, “তাহলে অর্ঘ নিজে যে মাথায় আঘাত পেল? ও যদি অভিনববাবুর দলের লোক হয়, তাহলে ওরা কেন অর্ঘকে আঘাত করবে?”
নীরজবাবু বাঁকা হেসে বললেন, “আসল গল্পটা তো সেইখানেই। অর্ঘবাবু সবাইকে সাবধান করবার জন্য ঘর থেকে বেরোবার আগে আমাকে একটা ফোন করেন। তিনি তো জানেনই, আমি এদের সব কুকীর্তি দেখে ফেলেছি। তাই অর্ঘবাবু ভালোমানুষ সেজে আমায় আবার সব বিস্তারিত জানিয়ে ফোন করেন। যাতে ওঁর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ না হয়। বেসমেন্টের ঘরে গিয়ে সৌম্য সহ বন্দি আরও অনেককে অন্যত্র সরাবার ব্যবস্থা করে, দলেরই কাউকে দিয়ে নিজেকেই আঘাত করেন। যাতে ঘটনাটা এমন বোঝায় যেন তিনি বন্ধুকে উদ্ধার করতে গিয়েই মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন। সবার সহানুভূতি যেন ওঁর ওপরই এসে পড়ে। কিন্তু অর্ঘবাবু হয়তো কল্পনাও করেননি, পুলিশ তার আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়ে ওঁর সব পরিকল্পনাই ভেস্তে দেবে।”
নীরজবাবুর কথা শুনে তিয়াস প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বলে উঠল, “এত বড় ষড়যন্ত্র?”
অর্ঘ এবার রাগে নিজের সংযম হারিয়ে বেড থেকে উঠে নীরজবাবুর দিকে তেড়ে আসতে যাবে, তার আগেই পেছন থেকে ওকে জাপটে ধরল সশস্ত্র পুলিশ কর্মচারীরা। অর্ঘ চিৎকার করছে, “আপনি মিথ্যে কথা বলছেন। আমার নামে মিথ্যে দোষারোপ করা হচ্ছে। সব, সব মিথ্যে।”
নীরজবাবু এগিয়ে এসে অর্ঘর হাতে হ্যান্ডকাফ পরাতে পরাতে হিমশীতল গলায় বললেন, “এত লাফালাফি করছেন কেন অর্ঘবাবু? শান্ত হন। আমি যদি মিথ্যে বলি, তাহলে সত্যি কথা বলবার জন্য আসল মানুষটাকে ডেকে আনি এখানে?”
নীরজবাবুর ইশারামাত্র দুজন কনস্টেবল বিধ্বস্ত সৌম্যকে নিয়ে প্রবেশ করল কেবিনে। সৌম্যকে দেখেই সায়ন আর তিয়াস বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবেগতাড়িত হয়ে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল সবেগে। কিন্তু অর্ঘর মুখ শুকিয়ে তখন পাংশুবর্ণ।
সৌম্য ধীরে ধীরে বেডের কাছে এগিয়ে এসে অর্ঘর দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “কেন করলি অর্ঘ? এতই টাকার লোভ তোর? আমরা সবাই তো তোকে বন্ধু হিসেবেই মানতাম। বন্ধু হয়ে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করলি আমার সঙ্গে?”
অর্ঘ নিশ্চুপ। ওর উত্তর দেওয়ার ভাষা নেই।
সায়ন এগিয়ে এসে সৌম্যর কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোর সঙ্গে কী হয়েছিল সৌম্য? তোকে কে কিডন্যাপ করেছিল?”
সৌম্য ম্লান হেসে বলল, আমাকে কিডন্যাপ করেছিল আমাদেরই বন্ধু অর্ঘ। পরশু রাতে চিতাবাঘের গর্জন শোনবার পর তোরা যখন ঘুমিয়ে পড়লি, অর্ঘ তখন আমায় ঘুম থেকে ডেকে তোলে। বলল, “রাতের অন্ধকারে বেসমেন্টের নীচের লোহার দরজা দিয়ে বাইরে চাঁদের আলোয় হোমস্টের সামনেটা একটু ঘুরে আসবে। চাঁদের আলোয় পাহাড়ের রাতের শোভা যদি না দেখি, তাহলে এখানে ঘুরতে আসাটাই বৃথা। দরজার চাবি মঞ্জিলকে বলে নাকি ম্যানেজ করেছে। তোরা তো জানিস, আমি এইবার প্রথম ঘুরতে এসেছি পাহাড়ে, তাই উৎসাহটা একটু বেশিই ছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতাটা নেহাতই কম ছিল। তাই বন্ধুর প্রতি সরল বিশ্বাসে অর্ঘর ফাঁদে পা দিলাম। প্রচণ্ড উন্মাদনায় সঙ্গে সঙ্গেই যেতে রাজি হয়ে গেলাম। তোদের ঘোরবার উৎসাহ নেই বলে, তোদের ডাকতে বারণ করল অর্ঘ। ওর কথামতো গেলাম বেসমেন্টের দরজার কাছে। তারপরেই হঠাৎ পেছন থেকে আমার নাকে রুমাল চেপে ধরল অর্ঘ। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।”
সায়ন জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে অর্ঘর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চিপে বলল, “স্কাউন্ড্রেল।” তারপর নীরজবাবুর দিকে চেয়ে বলল, “আচ্ছা এদের আসল ব্যবসাটা তাহলে কী ছিল? আর সৌম্যকে কিডন্যাপ করেছিলই বা কেন?”
নীরজবাবু বললেন, এদের আসল ব্যবসা হল মানুষের গুরুত্বপূর্ণ দেহাংশ পাচার। সৌম্যবাবুর কিডন্যাপের ব্যাপারটা জানাজানি হওয়াতে কাল পুলিশের হাতে এই পাচারকারীদের এক বিশাল চক্র ধরা পড়েছে হাতেনাতে। যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রেইনবো হোমস্টের মালিক অভিনব ঘোষাল। আর তাঁর দালাল ছিলেন এই অর্ঘবাবু। অবশ্য অভিনববাবুর এরকম দালাল আরও অনেকেই গোপনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। হোমস্টের ব্যবসা ছিল অভিনববাবুর শুধুমাত্র লোক দেখানো। এই হোমস্টেকে কেন্দ্র করেই অর্ঘবাবুর সাহায্যে তিনি তাঁর ব্যবসার রসদ মানে মানুষ জোগাড় করতেন। তারপর তাকে হত্যা করে, দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করতেন চড়া মূল্যে। খবর পেয়েছি, চোরাই পথে মানুষের মাংসও নাকি পাচার হতো বিশেষ বিশেষ হোটেলে। যতটুকু জানি, মানুষের মাংস নাকি খেতে খুব একটা খারাপ নয়। এর স্বাদ খানিকটা ওই শুকর ও ভেড়ার মাংসের স্বাদের মাঝামাঝি। সৌম্যবাবুর মতো আরও অনেকেই এই হোমস্টে থেকে একইভাবে নিরুদ্দেশ হয়েছিল এর আগেও। বরাত জোরে বেঁচে গেলেন উনি। বারবার পুলিশের তল্লাশি হচ্ছিল বলে, হোমস্টের বেসমেন্ট থেকে রাতের অন্ধকারে বডিগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলবার চেষ্টা করছিলেন অভিনববাবু। সৌম্যবাবুকে মনে হয় এই কটা দিন আফিম জাতীয় কিছু খাইয়ে ঘোরের মধ্যেই রাখা হয়েছিল। যাতে উনি কিছু বুঝে উঠতে না পারেন। তবে এই চক্রের জাল ছড়িয়ে রয়েছে অনেক দূর। এই জাল গোটাতে সময় লাগবে বিস্তর। তবে অভিনববাবু আর অর্ঘবাবুর মতন দলের এত বড় চাঁই যখন ধরা পড়েছেন, তখন বাকিদের হদিশ পেতে বেগ পেতে হবে না বিশেষ।
তিয়াস এবার একটু ইতস্তত করে কৌতূহল নিয়ে বলল, “একটা কথা আমার একটু জানবার ছিল। এখানে সত্যিই কি চিতাবাঘ আছে নীরজবাবু? আমরা কিন্তু দু’-বার মাঝরাতে চিতাবাঘের গর্জন শুনেছি।”
এবার হেসে ফেললেন নীরজ ছেত্রী। ঠোঁটে হাসির রেশটুকু রেখেই বললেন, “চিতাবাঘ আছে। তবে লোকালয়ে বাঘ গর্জন করে কখনও নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে আসে না তিয়াসবাবু। আপনারা যে বাঘের গর্জন শুনেছেন, সেটা দুষ্কৃতিদেরই কারসাজি। নির্বিঘ্নে কাজ সারবার জন্য গর্জন করে বাঘের ভয় দেখিয়ে এরা দূরে সরিয়ে রাখে গ্রামবাসীদের। তবে যাইহোক এইরকম একটা জঘন্য চক্র যে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল পুলিশের হাতে, এটাই সুখবর।”
রাতে ফেরবার ট্রেনে বসে, সবারই মুখ থমথমে। কারও মনে আনন্দের ছিঁটেফোঁটাও নেই। সায়ন অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছে। এতদিন ধরে অনেক টেনশন গেছে। আর ভালো লাগছে না এই গুমোট পরিবেশ। পরিস্থিতি হালকা করতে ম্লান হেসে বলল, এবার কি একটু স্বাভাবিক হওয়া যায় না? জানি যে জঘন্য ঘটনা ঘটল, তারপর সবার পক্ষে এত তাড়াতাড়ি সেটা ভুলে যাওয়া সত্যিই কঠিন। অর্ঘ প্রথম থেকে সৌম্যর জন্য এমন কান্নাকাটি করছিল, বন্ধুত্বের আড়ালে ওর আসল চেহারাটা ঘুণাক্ষরেও ধরতে পারিনি আমরা। বন্ধুত্বের উপর বিশ্বাসটাই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও আমি বলব, ঘুরতে এসে এইবার কিন্তু ডবল পাওনা হল আমাদের। ঘোরবার আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চ। আমার কিন্তু বেশ লাগল এই নতুন অভিজ্ঞতা। আর সবচেয়ে বড় কথা, শেষমেশ সৌম্যকে তো আমরা ফিরে পেলাম? আর অপরাধীরা ধরাও পড়েছে। সেই আনন্দে এবার তো একটু হাসা যেতেই পারে।
সায়নের মনের ভাব বুঝে সৌম্য সঙ্গে সঙ্গেই সমর্থন করে বলল, “কেন হাসা যাবে না? অতি অবশ্যই হাসা যায়। এত কিছুর পরেও আমি যদি স্বাভাবিক হতে পারি, তোরা কেন নয়? তবে এটা ঠিক, তোদের অ্যাডভেঞ্চারের জন্য, আমি ভাই আর কিডন্যাপড হতে রাজি নই।”
সৌম্যর এই শেষ কথায় এবার সশব্দে হেসে উঠল সবাই।
.
শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য্য
জন্ম বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ছোট্ট পাহাড় ঘেরা শহর চক্রধরপুরে। শৈশব থেকে কৈশোর সেখানেই অতিবাহিত। তবে এখন পাকাপাকিভাবে বাসা বেঁধেছেন পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর শহরে। খড়্গপুর কলেজ থেকে ইতিহাস অনার্সে স্নাতক। লেখা তাঁর শখ, তাঁর ভালোবাসা। আর ভালোবাসেন নিজের মনের আবেগকে সম্পূর্ণ নিংড়ে, গান গাইতে। ডিপ্লোমা করেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতে। তাঁর লেখা তাঁর কাছে সন্তানতুল্য, যাকে আঁকড়ে ধরেই আজ তাঁর এই নতুন পথ চলা।
