রাপুনজেল রহস্য – বনবীথি পাত্র
রাপুনজেল রহস্য – বনবীথি পাত্র
রাত তখন অনেকটাই, কিছুতেই ঘুম আসছে না অনীকের। কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছে মনের মধ্যে। কাল সন্ধেবেলাতেই আলাপ হয়েছিল ওদের পুরো দলটার সঙ্গে। সবাই-ই প্রায় অনীকেরই সমবয়সী। সি-বিচে ওদের সান্ধ্য আড্ডায় কিছুক্ষণের সঙ্গী হয়েছিল অনীক। ওদের নাকি নিজস্ব একটা ব্যান্ড আছে, ‘রাপুনজেল’। নামটা শুনে বেশ অদ্ভুত লেগেছিল অনীকের। ছেলেদের একটা ব্যান্ডের এমন মেয়েলি নাম? প্রথম আলাপেই এতটা কৌতূহল প্রদর্শন না দেখানোই ভালো ভেবে, এমন নামকরণের কারণটা জানতে গিয়েই থেমে গিয়েছিল। ইমন ছেলেটার গলাটা কিন্তু বেশ সুন্দর। ইমন-ই ওদের ব্যান্ডের সিঙ্গার। কলকাতায় ফিরে ওদের ব্যান্ডের প্রোগ্রাম থাকলে অনীককে জানাবে বলেছে।
একটা হাই প্রোফাইল কেস এসে পড়ায় বাবা শেষ অবধি ছুটি ম্যানেজ করতে পারল না। বেড়াতে যাওয়ার পুরো প্ল্যানটাই ক্যানসেল হয়ে যেতে বসেছিল। সবার শুকনো মুখটা দেখে বাবা-ই কথাটা বলেছিল। ‘কী রে অনি তুই তো বড় হয়েছিস, মা আর বোনকে দায়িত্ব করে নিয়ে যেতে পারবি না।’ — উফ্ এই সুযোগ কী আর অনি হাতছাড়া করে? এককথায় রাজি সে। গতবছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে, এখন যাদবপুরে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে পড়ছে। কিন্তু মা-বাবার চোখে যেন সেই ছোটটিই আছে। বাবার কথাতে যেন একলাফে অনেকটা বড় হয়ে গেছিল সেদিন। মা তখনও রাগে গজগজ করছে, ‘জীবনে আর যা-ই করিস পুলিশের চাকরি যেন কখনও করিস না। শুধু কাজ আর কাজ, সংসারের জন্য কোনও সময়ই নেই।’ চোখের ইশারাতে বাবা আশ্বস্ত করেছিল অনীক, মাকে ঠিক রাজি করিয়ে নেবে।
অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ধরে সরাসরি পুরী ধাম।
দুটো আলাদা রুমের ঝামেলাতে না গিয়ে মায়ের পছন্দমতো একটা থ্রি-বেডের রুম নিয়েছে। মা-বোন ডবল বেডে আর সিঙ্গল বেডটায় অনীক। নাইট ল্যাম্পের নীল আলোতে বোঝা যাচ্ছে ওরা দু’জনেই ঘুমিয়ে কাদা। মোবাইলটাতে টাইম দ্যাখে অনীক, বারোটা পঞ্চান্ন। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে বাইরের ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসে। হোটেলটা একদম সমুদ্রের ধারে হওয়াতে ব্যালকনি থেকে সোজাসুজি সমুদ্রটা দেখা যায়। অন্ধকারের সঙ্গে চোখের দৃষ্টির খাপ খেতে একটু সময় লাগে। তারপর অন্ধকারেই একটু একটু স্পষ্ট হয়ে ওঠে সবকিছু। তাছাড়া সামনে নিশ্চয় পূর্ণিমা, একটা নরম সোনালী আলোতে বাইরের অন্ধকার ততটা গাঢ় নয়। সারাদিনের ব্যস্ত স্বর্গদ্বার এখন শান্ত। সমুদ্র অবিরাম গতিতে ঢেউ ভাঙাগড়ার খেলায় মত্ত।
আজ সন্ধেবেলা মা আর বোনকে নিয়ে একটু কাছাকাছি মার্কেটগুলোতে ঘুরছিল। মা তো পাড়া-প্রতিবেশী সবার জন্য কিছু কিনতেই ব্যস্ত। টুকটাক কেনাকাটা করতে করতেই বেশ দেরি হয়েছিল। তারপর ডিনার সেরে হোটেলে ফিরতে বেশ রাত। হোটেলের গেটের সামনে দুটো পুলিশের জিপ দেখেই চমকে ওঠে, এখানে আবার কী হল? রিসেপশনে ঢুকতেই পুরো ব্যাপারটা জানা গেল। আজ সকাল থেকে নাকি ইমনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমে ওর বন্ধুরাই কাছাকাছি খুঁজেছে, তারপর কলকাতায় ওর বাবাকে ফোন। ওর বাবা কলকাতার নামকরা ব্যবসায়ী হেমন্ত সরকার। প্রভাবশালী মানুষ, ফোনেই পুলিশকে ইনফর্ম করেছেন। উনিও এসে পড়বেন সকাল হলেই। পুলিশ এসে তো ওর বাকি ছয়বন্ধুকে জেরায় জেরায় জেরবার। বেচারারা সবাই তো ভয়েই অস্থির। হোটেলের সব বোর্ডারের শহর ছেড়ে যাওয়া নিষেধ। সবাই বিরক্ত এই উটকো ঝামেলায়। কাল সকালে অনীকরা চিল্কা যাওয়ার প্ল্যান করেছিল সেটাও বাতিল। সেটা চিন্তার কারণ নয়, এখনও চারদিন রয়েছে যে কোনও একদিন গেলেই হবে। ইনেস্পেক্টর আঙ্কেল মাকে দেখেই চিনতে পেরেছেন। একসময় বাবার সঙ্গে নাকি একই থানায় ছিল। অনীকের চিন্তাটা অন্য জায়গায়, জলজ্যান্ত ছেলেটা কোথায় হাওয়া হয়ে গেল? এখান থেকে কোথাও গেলে তো বন্ধুদের বলে যেত। অত বড়লোকের ছেলে, কেউ আবার কিডন্যাপ করল না তো?
এলোমেলো ভাবনাতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল অনীক। হঠাৎ করে হোটেলের লনের দেবদারু গাছটার তলায় চোখটা আটকে গেল। কে ওটা? এত রাতে ওই গাছতলাতে দাঁড়িয়ে কী করছে? একটু ভালো করে খেয়াল করতেই বুঝতে পারে, ওটা তো নীলাদ্রী। ইমনদের ব্যান্ডের গিটারিস্ট। এত রাতে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা ভীষণই রহস্যজনক। তবে কি ইমনের অন্তর্ধান রহস্যের সঙ্গে নীলাদ্রি যুক্ত? দোতলার বারান্দাতে দাঁড়ানো অনীককে যেন দেখে না ফেলে, তার জন্য দেওয়ালের সঙ্গে নিজেকে যতটা সম্ভব মিশিয়ে ফেলে অনীক। অতটা শীত তো পড়েনি, এখনই গায়ে জড়ানো চাদরটাও বেশ সন্দেহের। পাঁচ-দশ-প্রায় পনেরো মিনিট কেটে যায়, কোনও ঘটনাই ঘটে না। নীলাদ্রি নিজের লন থেকে হোটেলের ভিতরে চলে আসে। অনীকও একমাথা রহস্যের জট নিয়ে রুমে চলে আসে। একটু না ঘুমালে মাথার মধ্যে সব যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
|| ২ ||
“কী রে ওঠ আর কত বেলা অবধি ঘুমাবি? এদিকে দ্যাখ কী অবস্থা, আধঘণ্টার মধ্যে সব বোর্ডারদের হোটেলের কনফারেন্স রুমে হাজির হতে বলে গেল। তোর বাবাকে ছাড়া আসাটাই ভুল হল আমাদের। কী যে হবে কে জানে।” — মায়ের ডাকে ধড়ফড় করে উঠে পড়ে অনীক। ইস অনেক বেলা হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে ওরা যখন কনফারেন্স হলে পৌঁছাল প্রায় সকলেই এসে গেছেন। ইন্সপেক্টর লাহিড়ী আঙ্কেল রয়েছেন, ওঁর সঙ্গের ওই ভদ্রলোকই মনে হয় ইমনের বাবা। বেশ উত্তেজিত ভাবে লাহিড়ী আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলছেন। ভিড়ের মাঝেও আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যায় অনীক।
“আপনি কী ভাবছেন, তেমন কোনও ফোন এলে আমি আপনাদের জানাতাম না? হেমন্ত সরকার ছেলের জন্য কোটি টাকাও মুক্তিপণ দিতে পারে। আমি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার ছেলেকে ফেরত চাই।”
কথাটা শুনে দিব্যি বোঝা যাচ্ছে, মুক্তিপণের জন্য কেউ অপহরণ করেনি।
লাহিড়ী আঙ্কেল মোটামুটি সব বোর্ডারদের সঙ্গেই কথা বললেন। অনীকদের সঙ্গেও কথা বললেন। অনীক কালকের রাতের ঘটনাটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। আগে না-হয় নীলাদ্রির সঙ্গে নিজেই একবার কথা বলবে। তেমন কোনও প্রয়োজনীয় তথ্য পেলেন বলে মনে হল না। ইমনের লাগেজ হোটেলেই ছিল, সেগুলো থানাতে নিয়ে গেলেন।
মিঃ সরকার তখনও গজগজ করছেন, “কতবার বলেছি এই সাব স্ট্যান্ডার্ড বন্ধুদের সঙ্গে না মিশতে। কিন্তু আমার কোনও কথা শুনলে তো? বেশি শাসনও করতে পারি না মা-মরা ছেলে।” গাড়িতে ওঠার আগে এই কথাটুকুই কানে আসে অনীকের।
শহরের বাইরে কোথাও যাওয়া না গেলেও হোটেলে বসে থেকে তো লাভ নেই, অগত্যা সমুদ্রস্নান। মায়ের জলে খুব ভয়, নিজে তো নামবেই না, ওদের দুই ভাইবোনকেও সমানে সাবধান করে যাচ্ছে। জলের বেশি দূরে যায়নি, বোনকে নিয়ে কাছাকাছিই ছিল। হঠাৎ খেয়াল করল ওরা ছ’জন সমুদ্রের দিকেই আসছে। কালকের সন্ধের থেকেও মলিন সবার মুখগুলো। নীলাদ্রির সঙ্গে কথা বলার এটাই সুবর্ণ সুযোগ, এটা কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায় না অনীক। বোনকে সঙ্গে করে জল থেকে উঠে আসে। নিজে আর একটু সমুদ্রে থাকবে বলে আবার জলে নেমে আসে। বোনের এমনিতেই ঠান্ডার ধাত, তাই মা আর বোন হোটেলে ফিরে যায়।
ওরা সবাই সমুদ্রে নামলেও সেভাবে মাতামাতি করছে না কেউ-ই। আর এটাই স্বাভাবিক, ইমনের ব্যাপারটা নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা আর ভয় তো সবার মনেই কাজ করছে। নীলাদ্রিকে একটু একা পাওয়ার চেষ্টা করছিল অনীক। একটু পরে সুযোগটাও এসে গেল, দলের বাকিরা নীলাদ্রির থেকে একটু দূরে যেতেই কাছাকাছি এল অনীক। সময় অল্প তাই কোনওরকম ভনিতা না করে সরাসরি কথায় চলে আসে।
“কাল অত রাতে লনে কী করছিলে?”
প্রশ্নটা শুনে চমকে ওঠে নীলাদ্রি। অস্বীকার করতে গিয়েও অনীকের দৃষ্টির কাঠিন্যের কাছে থমকে যায়। কিন্তু পুরো কথাটা শোনার মতো সময় তখন নেই। দুপুর দুটোর সময় হোটেলের লনে নীলাদ্রিকে আসতে বলে, মানুষের ভিড়ে মিশে যায় অনীক। একটু দূর থেকে খেয়াল রাখে ওদের সবাইকে। কেন জানি না অনীকের বার বার মনে হচ্ছে, ইমনের হারিয়ে যাওয়ার কারণ এরা না হলেও, আসল কারণটা এরা কেউ জানলেও জানতে পারে।
দুপুরের খাওয়া সেরে আর নিজেদের রুমে না গিয়ে লনেই অপেক্ষা করতে থাকে নীলাদ্রির জন্য। সময়ের একটু আগেই চলে আসে নীলাদ্রি। একটা বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ কথা হয় দু’জনের। নীলাদ্রি ছেলেটা সত্যি ভীষণ সরল, আর ইমনের সবথেকে পুরনো বন্ধু। তাই হয়তো ওকেই একটুখানি আভাস দিয়ে গেছে ইমন, যে কাজটা সেরেই ও ফিরে আসবে নীলাদ্রি যেন চিন্তা না করে। ‘রাপুনজেল’কে ভেঙে যেতে দেবে না কিছুতেই।
নীলাদ্রির কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে অনীকের। যত ভাবছে তত বেশি বেশি প্রশ্ন যেন উঠে আসছে একের পর এক। কাল রাতের ঘটনাটার কারণ যা বলল, আদৌ কি সেটা বিশ্বাসযোগ্য? ঘুম আসছিল না, হোটেলের রুমে সিগারেট খাওয়া বারণ বলে ও অত রাতে লনে গিয়েছিল। কিন্তু অনীক যতদূর খেয়াল করেছে ওকে তো সিগারেট খেতে দেখেনি। বলল কাল শীত শীত করছিল বলে চাদর গায়ে দিয়েছিল, অথচ আজ তো দিব্যি অনেকটা সময় ধরে সমুদ্রে স্নান করল। না না নীলাদ্রিকে যতটা সহজ সরল মনে হয়েছিল, ও তেমন তো নয়। কোনও কারণে সত্যি গোপন করছে ও। কিন্তু কেন?
ইমন কি এমন কাজে গেছে যে কাউকে কিছু না বলে ভ্যানিস হয়ে গেল? তার চিন্তা না করার কথাটা শুধু নীলাদ্রিকেই বলে গেল? নিজের বাবাকে অবধি কিছু জানাল না!
‘রাপুনজেল’কে ভেঙে যেতে দেবে না বলে গেছে ইমন। তবে কি রাপুনজেলের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত তার এই নিখোঁজ কাহিনি?
মা আর বোন বিকালবেলা সি-বিচে গেলেও অনীক গেল না। চিন্তাগুলো ক্রমশ যেন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে ওর কাছে। যত ভাবছে বিষয়টা ভাববে না, কিন্তু ভাবনাটা মাথা থেকে কিছুতেই বিদায় নিচ্ছে না। বাবার সঙ্গে একটু কথা বলা খুব দরকার। মায়ের সামনে বললে তো তখনি বকাবকি শুরু করবে, এইসব উটকো ভাবনাচিন্তার জন্য। মা নেই এই ফাঁকে বাবার সঙ্গে কথা সেরে নেয় অনীক। অনীক নিজে নিজে এত কিছু ভেবেছে শুনে বাবা তো দারুণ খুশি। ইন্সপেক্টর লাহিড়ী আঙ্কেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নেবে বাবা। যে কোনও রকম সাহায্য যেন পায় সেটা বলে দেবে আঙ্কেলকে।
বাবার উৎসাহে নতুন করে ভাবতে বসে অনীক। ইমনের হারিয়ে যাওয়ার কারণটা যেভাবেই হোক জানতেই হবে ওকে।
একটু পরেই একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন। ‘কী জুনিয়ার সোম, বাবার কাছে সব শুনলাম। ক্যারি অন ইয়ং বয়, আমি আছি তোমার সঙ্গে।’
লাহিড়ী আঙ্কেলের জুনিয়ার সোম সম্বোধনটায় একটু লজ্জা লজ্জা পায় অনীক। তবে ওর যে ক’টা কথা জানার ছিল জেনে নেয় আঙ্কেলের কাছে। কিছু উত্তর তখন দিলেও বাকিটুকু সামনাসামনি জানাবে বলে আশ্বাস দেন। আজ আটটা নাগাদ উনি হোটেলে আসবেন, তখনই কথা হবে।
আঙ্কেলের কাছে কালকে উদয়গিরি, খণ্ডগিরি, নন্দনকানন, কোণারকের সাইড ট্যুরের পারমিশন পেতেই হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়ে অনীক। মায়ের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে নেয় বাস ঠিক করার আগে।
|| ৩ ||
বাস ঠিক করে ফেলে, সকাল সাতটায় পুরী হোটেলের সামনে থেকে বাস ছাড়বে। তার আগে পৌঁছে যেতে বাসের কাছে। মানে বেশ সকাল সকাল উঠে রেডি হয়ে নিতে হবে। সব দেখে কাল ফিরতে ফিরতে সন্ধে।
আটটার সময় লাহিড়ী আঙ্কেল আসবেন, নিশ্চয়ই ইনভেস্টিগেশনের কিছু কাজেই। ইনভেস্টিগেশনের যতটুকু দেখা যায়, একটুও মিস করতে চায় না অনীক। তাছাড়া আঙ্কেলের সঙ্গে ওর ও নিজস্ব কিছু কথা আছে। মা সব শুনলে তো এমনিতেই টেনশন শুরু করবে, মায়ের সামনে কোনো আলোচনাই করা যাবে না। কায়দা করে মা আর বোনকে রুমে পৌঁছে দেয় অনীক। কালকের জন্য টুকটাক কিছু খাবার কেনার বাহানায় নিজে বেরিয়ে আসে অনীক। হোটেলের কাছের একটা দোকান থেকে কিছু বিস্কুটের প্যাকেট, কেক আর জলের বোতল কিনে বেড়চ্ছে, তখনই পুলিশের জিপটা হোটেলে ঢোকে।
দ্রুত পা চালিয়ে রিসেপশনেই ধরে ফেলে আঙ্কেলকে। আঙ্কেল ওর পিঠ চাপড়ে ওঁর সঙ্গেই থাকতে বলে অনীককে। প্রথমেই হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে কথা বললেন। বোর্ডারদের শহরে আটকে না রাখার অর্ডারটা তুলে নিলেন। তারপর ডেকে পাঠালেন রুম সার্ভিসের সবাইকে। নিতান্তই সাধারণ কিছু প্রশ্নোত্তর, কেউ-ই সেভাবে খেয়াল করেনি ইমনকে। তবে সিকিউরিটির একজনের সঙ্গে নীলাদ্রির চোখের ইশারা নজর এড়ায় না অনীকের।
ওদের ছয়বন্ধুকে আবারও নানা প্রশ্ন, কিন্তু তেমন সমাধান সূত্র কিছু মিলল না। নীলাদ্রি কিন্তু যেটুকু জানে সেটুকুও ভীষণ নির্বিকার ভাবে আঙ্কেলের কাছে চেপে গেল। অনীকের মনে সন্দেহ যেন দানা বাঁধতে থাকে নীলাদ্রিকে ঘিরেই।
সবার শেষে আঙ্কেল এককাপ কফি নিয়ে কথা শুরু করে অনীকের সঙ্গে। যে ক’টা তথ্য জানার ছিল সবক’টাই জানা হয়ে যায় আঙ্কেলের থেকে। নীলাদ্রির কথাটা বলতে গিয়েও চেপে যায় অনীক। পুরী ছেড়ে সেই সকালেই যদি না ইমন চলে গিয়ে থাকে, এখন আর বেড়তে পারবে না। পুলিশ ভীষণভাবে নজর রাখছে চারদিকে। আঙ্কেলের কাছেই জানতে পারে নীলাদ্রিরাও কাল সাইডট্যুরে যাচ্ছে।
রুমে ফিরতেই মায়ের বকুনি, সামান্য ক’টা জিনিস আনতে গিয়ে এত দেরি? মায়ের কথা সেভাবে মাথায় ঢোকে না অনীকের। ওর মাথায় তখন হাজার চিন্তার জট! হাতে আর মাত্র তিনদিন, তারপর তো কলকাতায় ফিরে যাওয়া। আঙ্কেলের কাছে হয়তো ঘটনাটার কি হল জানতে পারবে কিন্তু স্পটে থেকে রহস্যটার সমাধানটা দেখতে কেমন একটা লোভ হচ্ছে মনের মধ্যে।
বিছানায় শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে অনীক। ঘুম ভাঙে একেবারে ভোরবেলায় মায়ের ডাকে। চটপট রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়ে সবাই মিলে। হোটেল থেকে বেরনোর মুখেই নীলাদ্রিদের সঙ্গে দেখা। একসঙ্গেই সবাই মিলে বাসের কাছে আসে। আজ আর অতটা মনমরা লাগছে না ওদের। ঘটনার আকস্মিকতা হয়তো কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। রূপম ছেলেটা বেশ মিশুকে, একটু সময়েই মায়ের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলে। আরও চমক আর মজা অপেক্ষা করছিল ওদের জন্য। ওরা সবাই একই বাসের যাত্রী। হইচই আর ঘোরা বেড়ানোর মাঝে সবার সঙ্গে বেশ জানা চেনা হয়ে যায় অনীকের। তবু যেন সবকিছুর মাঝেই অনীক খুঁজে চলেছে সমাধান সূত্র। ইচ্ছা করেই একটু আলাদা আলাদা করে কথা বলার চেষ্টা করছে ওদের ছয়জনের সঙ্গে। ওর সামান্য বুদ্ধিতে সত্যি এদের সন্দেহ করার মতো কিছুই নেই। তবু নীলাদ্রিকে কিছুতেই যেন সন্দেহের উর্ধ্বে রাখতে পারছে না। সবকিছুর মাঝেও কেমন যেন চিন্তিত। মাঝেমধ্যেই সরে গিয়ে মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছে নিচুস্বরে। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে অনীকের। আর না বাবা, নীলাদ্রির সম্বন্ধে যেটুকু জেনেছে আজ ফিরেই লাহিড়ী আঙ্কেলকে বলে দেবে। কালকের দিনটা মনের আনন্দে ঘুরে নেবে, পরশু সকাল এগারোটাতেই তো ট্রেন। আবার সেই পড়াশুনো, কলেজ, রোজকার সেই যান্ত্রিক জীবন।
সারাদিন প্রচুর ঘোরাঘুরি হয়েছে, এখনও উদয়গিরি-খণ্ডগিরি বাকি। দুপুর গড়িয়ে বিকাল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সন্ধে নামবে হয়তো। সন্ধ্যে নামার আগে ঘুরেফিরে বাসের কাছে চলে আসতে বললেন ড্রাইভার। আগে উদয়গিরি, তারপর খণ্ডগিরি। সারাদিন এত ঘোরাঘুরি, তারপর বাসে বসে থেকে মায়ের হাঁটুর ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। মা আর উপরে উঠতে নারাজ। অবশেষে মাকে নীচে একজায়গায় বসিয়ে বোনকে নিয়ে অনীক উঠতে থাকল। ওরা ততক্ষণে উপরে উঠে গেছে। বোনের ফটো তোলার খুব শখ, যেখানে সেখানে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে আর অনুরোধ দাদাভাই একটা ফটো তুলে দে। এই করতে গিয়ে একটু দেরিই হল ওদের উদয়গিরিতে থেকে নামতে। বাসের আর সবাই ততক্ষণে খণ্ডগিরিতে। ঠিক সময়ে বাসের কাছে আসতে না পারলে আবার বাস ছেড়ে যাবে। খণ্ডগিরিটা আর দেখাই হল না বোধহয়। বোনকে বকুনি দিচ্ছে অনীক, তোর জন্যই দেরি হল লেটুরাম একটা। আমরা খণ্ডগিরিতে উঠতে উঠতে সবাই নেমে বাসে চেপে পড়বে তখন ভালো হবে। বকুনি খেয়ে মুখভার করার বদলে একমুখ হেসে বলে ওঠে, “ওই দ্যাখ নীলাদ্রিদা এখনও যায়নি। চল চল আমরা ওদের সঙ্গে যাই। বাস এতজনকে ফেলে নিশ্চয় পালাবে না।”
বোনের কথায় খেয়াল করি, খণ্ডগিরিতে ওঠার জায়গা থেকে একটু সরে নীলাদ্রি একটা লোকের সঙ্গে কথা বলছে আর ঘনঘন চারপাশে তাকাচ্ছে। ঠিক যেন খেয়াল করছে কেউ ওকে দেখছে কি না। ঘটনাটা নিয়ে আর ভাববে না ভেবেও অনীক যেন বার বার ঢুকে যাচ্ছে ঘটনার গভীরে। বোনকে মায়ের কাছে রেখেই অনীক চুপিচুপি দেখতে গেল ব্যাপারটা। অনীকরা যখন উদয়গিরি থেকে নামছে, তখন ও দেখেছে রূপম, পার্থ ওরা খণ্ডগিরিতে উঠছে। নীলাদ্রি তবে গেল না কেন ওদের সঙ্গে। কাছাকাছি যেতেই অনীকের চক্ষু চড়কগাছ। নীলাদ্রি ওর পিঠব্যাগ থেকে একটা ছোট ব্যাগ বের করে যার সঙ্গে কথা বলছিল তাকে দিয়ে দিল। খুব নিচুস্বরে কথা বললেও অনীক শুনতে পেল, “পরশো সুভাহ সাত বাজে…”
লোকটি চলে যেতেই নীলাদ্রি ফিরে গেল বাসের কাছে। একটা গাছের আড়ালে নিজেকে লুকালো অনীক, যাতে নীলাদ্রি ওকে খেয়াল না করতে পারে। যার সঙ্গে কথা হচ্ছিল সে যে কোথায় চলে গেল খেয়াল করতে পারল না। তবে পরশু সকালের আগে যে তেমন কিছু হচ্ছে না এটা নিশ্চিত অনীক। তবু এত ঘটনা আর বোধহয় চেপে রাখা ঠিক নয়, লাহিড়ী আঙ্কেলকে পুরোটা জানাতে হবে। তার আগে বাবার সঙ্গে একবার কথা বলে নেয় অনীক। বাবাও বলে লাহিড়ী আঙ্কলকে তখনি সবটুকু জানাতে। আর সবথেকে আনন্দের যেটা বাবা দু’দিনের ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছে। কাল ভোরবেলা পুরী পৌঁছে যাবে। মাকে কথাটা বলতে বারণ করে বাবা, ভোরবেলা সশরীরে সারপ্রাইজ দেবে একদম।
|| ৪ ||
বাবা আসছে, এই কথাটাই মনোবলকে যেন একনিমেষে দ্বিগুণ করে দিল অনীকের। লাহিড়ী আঙ্কেলের সঙ্গে ফোনে সব কথা হয়ে গেল। নীলাদ্রি আর সেই অজানা লোকটার একটা ছবি তুলেছিল অনীক। যদিও অস্পষ্ট তবুও ছবিটাও পাঠিয়ে দিল আঙ্কেলকে।
নীলাদ্রির গতিবিধি একটু খেয়াল রাখতে বললেন অনীককে। আর উনি তখনি ফোর্স নিয়ে এখানে আসছেন। কী হল না হল পরে জানাবেন ও বললেন। দারুণ আনন্দ হচ্ছে অনীকের। সে তাহলে লাহিড়ী আঙ্কেলকে সাহায্য করতে পারছে ইনভেস্টিগেশনের কাজে। ফেরার পথে তার তেমন কিছুই হল না। ফিরতে ফিরতেই প্রায় রাত আটটা।
সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর তখন অবসন্ন। তারমধ্যে অনীকের মাইগ্রেনের যন্ত্রণাটাও শুরু হয়েছে। একটু ফ্রেশ হয়ে সোজা বিছানায়। একটা ঘুম না হলে কিছুতেই থামবে না এই যন্ত্রণা।
বাবার গলা পেয়ে ঘুম ভাঙল একেবারে সকালে। ইস আটটা বাজে, কত বেলা হয়ে গেছে। মোবাইলটা হাতে নিতেই চমকে ওঠে, কাল রাত আর আজ সকাল মিলিয়ে লাহিড়ী আঙ্কেলের এগারোটা মিসড্ কল। কাল মোবাইলটা সাইলেন্স করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বাবাকে মোবাইলটা দেখাতেই হো হো করে হেসে ওঠে, “ডোন্ট অরি আমার সঙ্গে ওর কথা হয়ে গেছে। আগে ফ্রেশ হয়ে নাও, তারপর ব্রেকফাস্ট, তারপর সব কথা।” ব্রেকফাস্টের মাঝেই লাহিড়ী আঙ্কেলের ফোন, বাবাকে তখনই একবার থানায় যেতে বলে।
অনীক যেতে চাইলে বাবা ওকে চটপট রেডি হয়ে নিতে বলে। হোটেল থেকে বেরিয়েই একটা ফাঁকা অটো পেয়ে গেল ওরা। যেতে যেতে বাবার কাছে শুনল, ইমনকে ওই খণ্ডগিরির কাছে একটা গ্রামে ওই লোকটার বাড়িতে পাওয়া গেছে। সঙ্গে একটা মেয়েও আছে। ওদের কাল রাতেই থানায় আনা হয়েছে। ইমনের বাবাও ফ্লাইটে আসছেন, একটু পরেই পৌঁছে যাবে। রাপুনজেলের সবার উপর পুলিশ নজর রাখছে, যাতে ওরা কেউ পালাতে না পারে। ওদেরকেও দরকারে থানাতে আনা হবে।
থানাতে পৌঁছাতেই প্রথম দেখা লাহিড়ী আঙ্কেলের সঙ্গে। ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল কালকের সেই লোকটা, ইমন আর একটা অল্পবয়সী মেয়ে বসে রয়েছে। মেয়েটা ইমনের থেকে একটু ছোটই হবে, তবে বেশ স্টাইলিশ মেয়েটা। কে এই মেয়েটা, ইমনের সঙ্গে ওর কীসেরই বা সম্পর্ক যে সব ছেড়ে চলে গিয়েছিল ওর কাছে? আর এ তো ওই গ্রামের মেয়ে হতে পারে না, যথেষ্ট মডার্ন। ইমন তো নীলাদ্রিকে বলেছিল, কাজ সেরে ফিরে আসবে? কী কাজ ছিল ইমনের নাকি পুরোটাই মিথ্যা বলেছে নীলাদ্রি?
কত শত প্রশ্নের দাপাদাপি চলছে মাথাতে, অথচ কোনও সমাধানের পথ নেই।
হাতের কাজটা সেরে সবে ওদের সঙ্গে কথা বলছেন আঙ্কেল তখনি মিঃ সরকারের ফোন। ভুবনেশ্বরে থেকে আসার জ্যামে আটকে গেছেন, ইমনকে যেন থানাতেই বসিয়ে রাখা হয়।
কেন জানি না ইমনের বাবার আসতে একটু দেরি আছে শুনে অনীক মনে মনে একটু খুশিই হল। আঙ্কেলের কাছে আগে সবটুকু জানা যাবে।
মেয়েটার নাম লাবণ্য, ইমনদের বাড়ির আশ্রিতা। ইমনদের কলকাতার বাড়িতেই বড় হয়েছে সে। ইমনদের সঙ্গে ও তো পুরী আসেনি, তবে ও এখানে এল কী করে? আর ওকে নিয়ে ওই গ্রামে লুকিয়ে ছিল কেন? ইমন কোনও ব্যাপারেই মুখ খুলছে না। মুখ খুলছে না লাবণ্যও।
লাহিড়ী আঙ্কেল তো প্রায় সমাধান করে ফেলেছেন, ‘এসব কিশোর প্রেম বুঝলেন সোমদা। বাড়ি থেকে মেনে নেবে না বললে মেয়েটাকে নিয়ে পালাচ্ছিল। কোনও মন্দিরে হয়তো বিয়েটাও সেরে ফেলত।’
না না ব্যাপারটা তেমন কিছুতেই মনে হচ্ছে না অনীকের। প্রেম-ভালোবাসা বিয়ে এসব হলে কলকাতাতেই করতে পারত। তারজন্য এইভাবে এতটা রিস্ক নিত না। তখনই আরও একটা তথ্য ফাঁস করলেন লাহিড়ী আঙ্কেল। লাবণ্য ওদের ব্যান্ডের একজন সিঙ্গার।
এক ঝটকাতে যেন অনেকটা রহস্য খুলে গেল অনীকের কাছে। নিজের ওপর নিজেরই রাগ হচ্ছে, এই সামান্য ব্যাপারটা আরও আগে মাথায় আসা উচিত ছিল।
এখনই নীলাদ্রির সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার। আর সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। বাবাকে চুপিচুপি কিছু বলেই অনীক ফিরে আসে হোটেলে। ওরা সবাই হোটেলেই ছিল। আজ আর কোনও লুকোচুরি না করে, সোজাসুজি ওদের রুমে গিয়ে নীলাদ্রিকে ডেকে আনে।
দু’জনে হোটেলের বাইরে সি-বিচে একটু ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়ায়। এতদিন নীলাদ্রির সন্দেহজনক যা দেখেছে সব নীলাদ্রিকে বলতেই ওর মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আর মোবাইলের ছবিটা পুলিশকে দেখিয়ে দেবে বলতেই গড়গড় করে সব বলে ফেলে অনীককে।
অনেকটা এমনই যেন মনে হচ্ছিল অনীকের। আঙ্কেল যেভাবে ভাবছেন, ঘটনাটা তেমন নয়। নীলাদ্রি বেশ ভয় পেয়ে গেছে। ওর কিছু হবে না অভয় দিয়ে অনীক থানাতে ফিরে যায়।
আঙ্কেল তখন জেরা করছেন ওই লোকটাকে। ভয়ে কাঁচুমাচু মুখে, “হামি কুছু জানি না বাবু” ছাড়া আর কোনও কথাই বলছে না।
তখনি হন্তদন্ত হয়ে থানায় ঢোকেন মিঃ হেমন্ত সরকার।
অনীক বাবাকে অন্তত সব কথাগুলো বলবে তার সময়টাও পেল না। নিজের ওপর ভরসা করতে পারছে না অনীক। ঠিক সময়ে ঠিকঠাক কথাগুলো সব বলতে পারবে তো?
“মধুবন তুই এখানে?” — ওই লোকটাকে দেখে ভূত দেখার চমকে ওঠেন ইমনের বাবা।
“আপনি একে চেনেন মিঃ সরকার।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবাব দিলেন, “অনেক বছর আগে আমার বাড়িতে মালির কাজ করত।”
“ইমন কি ওনাকে চিনত যে ওনার বাড়ি গিয়েছিল?”
“না সে তো অনেকদিন আগের কথা, ও তখন অনেক ছোট। ওর তো মনে থাকার কথা নয়।”
“আই সি…” পুলিশি ভঙ্গিতে জেরা চালাচ্ছেন আঙ্কেল।
“আচ্ছা এই লাবণ্য যে আপনার বাড়িতে থাকে, ও আপনাদের আত্মীয় হয়?”
লাবণ্য আর ইমনের দিকে কটমট করে তাকান মিঃ সরকার। তারপর জবাব দেন, “ওর মা ইমনকে ছোটবেলায় দেখাশুনো করত। তখন থেকেই ও আমাদের বাড়িতে। ওর মা মারা যাওয়ার পর ও ওখানেই থেকে গেছে, ওর পড়াশুনো গান-বাজনা কিছুর অভাব রাখিনি। আর আজ সে আমার ছেলের দিকে হাত বাড়িয়েছে।” ক’টা অশ্রাব্য শব্দ বলে ফেলেই নিজেকে সংযত করে নিলেন।
বেইমান কখনও মানুষ হয় না।
লাহিড়ী আঙ্কেলের মুখে বিজয়ীর হাসি, “তাহলে যা ভেবেছিলেন তা-ই। পুরোটাই লাভ কেস…”
|| ৫ ||
তখনই মুখ খুলল অনীক, “আচ্ছা মিঃ সরকার লাবণ্যর মা মারা গেলে আপনি ওর বাবার খোঁজ না করে, ওকে নিজের কাছে রেখে দিলেন কেন? ওর বাবার নাম তো আপনি জানতেন। ওর স্কুল-কলেজ সব জায়গাতেই তো ওর বাবার নাম আছে মধুবন কুমার, তাই না?”
এবার অবাক হওয়ার পালা সবার। একে একে সব কথাই প্রকাশ পায়। কিছুটা নীলাদ্রির কাছে শোনা কাহিনি আর কিছুটা আন্দাজ এইভাবে যে কাজে লেগে যাবে বোঝেনি অনীক।
মিঃ সরকার ফ্লাইটে কলকাতা ফিরে গেছেন। আজ রাতে একটা বিজয়া-সম্মিলনী অনুষ্ঠান আছে পুরীতে, সেখানে ‘রাপুনজেল’-এর একটা গানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন লাহিড়ী আঙ্কেল। আজ রাতে সেই প্রোগ্রাম দেখে, কাল দুপুরের ট্রেনে সবাই মিলে গো টু কলকাতা।
দুপুরে খাওয়া সেরে ব্যালকনিতে বসে বাবা জিজ্ঞাসা করল, “এবার বল তো কীভাবে কী হল? কী করে বুঝলি?”
অনীক হেসে জবাব দেয়, “পুরোটাই নীলাদ্রির জন্য পেরেছি বাবা। প্রথম থেকে ওকে নজরে রেখেছিলাম বলেই শেষ মুহূর্তে ও সব স্বীকার করল।
প্রথমদিন মিঃ সরকার কে দেখে আর ওনার কথাবার্তা শুনে খুব একটা ভালোমানুষ বলে মনে হয়নি আমার। লাহিড়ী আঙ্কেলের কাছে জানতে পারি পয়সা থাকলেও চরিত্রের নানা দোষ রয়েছে মানুষটার। তবে তখনও কিছু বুঝতে পারিনি। আজ থানাতে গিয়ে লাবণ্য রাপুনজেলের একজন সিঙ্গার শুনেই যেন একটু আলো দেখতে পেলাম।
RAPUNGEL
R –> Rupam
A –> Anirban
P –> Partho
U –> Utpal
N –> Niladri
G –> Gourab
E –> Emon
L –> ?????
বাকি সাতজনের সঙ্গে আলাপ হলেও এই L টা কে? তারমানে এটা লাবণ্য? থানায় সবার সামনে ইমনকে জিজ্ঞাসা করা যাবে না। আর ও তো সত্যিটা স্বীকার নাও করতে পারে।
নীলাদ্রি বলেছিল ইমন নাকি ওকে বলে গিয়েছে ‘রাপুনজেল’কে ভাঙতে দেবে না। তারমানে ওর পালানোর সঙ্গে ‘রাপুনজেল’-এর সম্পর্ক আছে।
পুলিশকে সব বলে দেব বলাতেই নীলাদ্রি আজ সকালে সব বলে দেয়।
নীলাদ্রি সত্যিই ইমনের খুব ভালো বন্ধু। ইমন সব কথাই শেয়ার করত ওর সঙ্গে। লাবণ্য আসলে হেমন্ত সরকারের অবৈধ সন্তান। এই মধুবন আর স্ত্রী বাঁশরি কলকাতায় গিয়েছিল কাজের সন্ধানে। সরকার বাড়িতে মধুবন মালির কাজ করত আর বাঁশরি মা মরা ইমনের দেখাশোনা করত। তখনি হেমন্ত সরকারের নজর পড়ে বাঁশরির ওপর। টাকার মোহে বাঁশরিও ধরা দেয় সেই হাতছানিতে। মধুবন রাগে দুঃখে দেশে ফিরে আসে। বাঁশরির গর্ভে জন্ম হয় লাবণ্যের। কোনও কারণে বাঁশরি মারা যায় আর লাবণ্য আশ্রিতের পরিচয়ে থেকে যায় ওই বাড়িতেই। যতই হোক নিজেরই সন্তান তো, লাবণ্যর কোনও ব্যাপারে কাপর্ণ্য করেননি হেমন্তবাবু। কিন্তু কিছুদিন আগে কোনওভাবে আসল ঘটনা জেনে যায় লাবণ্য। আর সব জানায় ইমনকে। কিন্তু প্রভাবশালী বাবার কাছে প্রকাশ করতে পারে না কেউই। স্বভাবতই ভাই-বোনের মধ্যে ভাবটা একটু বেড়ে গিয়েছিল। মিঃ সরকার সেটাকেই প্রেম ভাবলেন আর তার পরিণতি ভেবে চমকে উঠলেন। নিজের সন্তান হলেও ইমনকে অনেক বেশি ভালোবাসেন লাবণ্যর থেকে। উনি লাবণ্যর বিয়ের ঠিক করলেন, এক বড়লোক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। কিন্তু বোন যে নীলাদ্রিকে ভালোবাসে সে’কথা জানত ইমন। আর সামনেই লাবণ্যর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। বাবা ওর পড়াশুনো, গান-বাজনা সব বন্ধ করে দিয়েছিল। কলকাতায় থেকে বোনকে আর বোনের ভালোবাসাকে বাঁচানো ওর পক্ষে সম্ভব নয়। সব খুলে বলে নীলাদ্রিকে। নীলাদ্রি কিছুদিন আগে উড়িষ্যা এসে খুঁজে বের করে মধুবনকে। যদি দয়া করে কিছুদিন লাবণ্যকে লুকিয়ে থাকতে দেয়। রাজি হয়েছিল মধুবন। লাবণ্যর ফটো দেখে ও যেন খুঁজে পেয়েছিল ওর হারানো বাঁশরিকে।
তারপর আর কী, ওরা পুরী আসার দু’দিন পর লাবণ্য সরাসরি পুরী চলে আসে। ওকে স্টেশন থেকে নিয়ে ইমন চলে যায় মধুবনের গ্রামে। লাবণ্যকে কলকাতাতে খুঁজলেও ওকে এতদূরে বাবা খুঁজতে আসবে না জানত। সেদিনই ফিরে যাবে ভেবেছিল ইমন, তাহলে এত জলঘোলা হত না। কিন্তু ওখানে পৌঁছেই খুব জ্বরে পড়ে লাবণ্য। বোনকে ফেলে সে রাতে ফিরতে পারে না ইমন। ততক্ষণে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গেছে।
এতটা নীলাদ্রি বলেছিল, তখনও জানতাম না কতটা সত্যি আর কতটা মিথ্যা। তবে ওই লাবণ্যর বাবার কথাটা তোলার পর তুমি আর আঙ্কেল যেভাবে প্যাঁচে ফেললে, তাই সবটুকু স্বীকার করলেন উনি। নাহলে হয়তো…”
আরে নাহলে কি বলছেন মিঃ অনীক সোম। আপনি তো পাকা গোয়েন্দার মতো সব তথ্য সাজিয়েই রেখেছিলেন।
বাবার কথায় আবার লজ্জা পেয়ে যায় অনীক।
“আচ্ছা বাবা সব বুঝলাম, কিন্তু নীলাদ্রি সেদিন অত রাতে লনে কী করছিল সেটা তো ক্লিয়ার হল না।”
“আরে সব যখন মিলে গেল, ধরেই নে না ও সিগারেট খেতেই বেরিয়েছিল।”
কথা বলতে বলতে বাবা লনের দিকে চোখের ইশারা করে।
অনীক তাকিয়ে দ্যাখে, সেই দেবদারু গাছের তলায় নীলাদ্রি আর লাবণ্য দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
.
বনবীথি পাত্র
জন্ম ৬ই নভেম্বর। স্কুল জীবনের শুরু কলকাতাতে হলেও, পরবর্তী শিক্ষা এবং বড় হওয়া পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়াতে। প্রথাগত শিক্ষানুযায়ী বিজ্ঞানের ছাত্রী হলেও, সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ ছোট থেকেই। লেখালিখির শুরু সেই শৈশবে। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় “শুকতারা” পত্রিকায়। তবে বহুবছর নানা কারণে লেখার জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার পর, নতুন করে লেখা শুরু করেন ২০১৫ তে। মানুষের মনের কথা, মানুষের জীবনের কথা লিখতেই ভালোবাসেন লেখিকা।
