Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    রাণুর তৃতীয় ভাগ – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প222 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    বর ও নফর

    গণশা বলিল, “আমার ক-ক-কপালে পরের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে সুখ লেখা নেই। সেবাবে কালসিটেয় তিলুর বরযাত্রী হয়ে গিয়ে ওই হল; পরশু মাসির বাড়ি গেছলাম। মা-মাসি ডেকে ডেকে তেইশজনকে পেরনাম করালে, তিনজন ফাউ, সেখানে অত গুরুজন আছে জানলে ওদিক মাড়াতাম না। কো-ক্কোমরের ফিক-ব্যথাটা এয়সা আউড়ে উঠেছে—”

    ত্রিলোচন প্রশ্ন করিল, “ফাউ মানে?”

    “তি-ত্তিনটে তাদের মধ্যে দাসী ছিল, মানে, ঘাড় তুলে দেখবার তো আর ফুরসুত ছিল না।”

    কে. গুপ্ত বলিল, “ভিড় জিনিসটা ফুটবলের মাঠেই ভালো মশাই। গাড়িতে বলুন, শ্বশুরবাড়ি কুটুমবাড়িতে বলুন—”

    গোরাচাঁদ বলিল, “নেমন্তন্নয় বল, বড্ড অসুবিধেয় পড়তে হয়।”

    রাজেন জিজ্ঞাসা করিল, “তোর নিজের বিয়ের কি হল র‍্যা গণশা? মামা বলে কি?”

    গণশার মুখটা অদ্ভুত ভাবে বিকৃত হইয়া পড়িল। একটু পরে সংক্ষেপে বলিল, “কুষ্টির মিল হয় তো গু-গু-গুষ্টির মিল হয় না, ওরা বলে এক, মামারা বলে আর। বিয়ের কথা হচ্ছে, কিন্তু ব-উয়ের কথা চাপা পড়ে গেছে।”

    ঘোঁৎনা বলিল, “আসলে ওর মামারা ঠাউরেছে, এর মধ্যে একটা চাকরি-বাকরি হয়ে গেলে দাঁও মারবে। গ্যাঞ্জেস মিলে তো সেদিন গিছলি, কি বললে?”

    গোরাচাঁদ বলিল, “ভিড়ের কথা যদি বললি তো আমার শ্বশুরবাড়ি ভালো। বউ, শাশুড়ি, খুড়শাশুড়ি, একটি শালী, শালা আর শালাজ; পিসেমশাই বলে ডাকবে, তার জন্যে শালাজের একটি ছেলেও দিয়েছেন ভগবান, মানে যে কটি দরকার, ঠিক সাজানো, ফালতু ভিড় পাবে না। বাজে মার্কার মধ্যে এক শ্বশুর, তা সে বেচারী সন্ধ্যের পর আফিম খেয়ে পড়ে থাকে, নিশ্চিন্দি।”

    কিছুক্ষণ চুপচাপ গেল, বোধ হয় সবাই মনে মনে গোরাচাঁদের কথাগুলি রোমন্থন করিতে লাগিল। একটু পরে গোরাচাঁদ আবার বলিল, “শিগগির একবার যেতে লিখেছে শাশুড়ি, অনেকদিন দেখে নি কিনা!”

    রাজেন প্রশ্ন করিল, “কবে যাচ্ছিস?”

     

     

    “বাবা বলছে, এটা মলমাস; কটা দিন যাক, তারপর।”

    গণশা বলিল, “বে-বেটাছেলের আবার মলমাস! তুই তো আর স্বামীর ঘর করতে যাচ্ছিস না।”

    রাজেন শিস দেওয়া আরম্ভ করিয়াছিল, থামাইয়া বলিল, “আমি তো বুঝি শ্বশুরবাড়ি যাব, ঠিক যখন কেউ ভাববে না যে জামাই আসছে। তা হলেই তো যার জন্যে যাওয়া, তাকে ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় দেখতে পাব। বলা নেই, কওয়া নেই, হুট করে গিয়ে পড়লাম, বউ বোধ হয় তখন গা ধুয়ে উঠে কালো চুলে রাঙা গামছা জড়িয়ে জল নিংড়োচ্ছে—”

    গণশা বলিল, “ঘুম থেকে উঠে কক্কড়াইমুড়ি চিবোতেও তো পারে, নয়ত মুখ ভেংচে ঝগড়া করছে কারও সঙ্গে—”

    গোরাচাঁদ রাজেনের মতো কবি না হইলেও রাজেনের কথাটা তাহার মনে লাগিল। নূতন বিবাহ তো! একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, “কিন্তু তাতে খাওয়াদাওয়ার একটু অসুবিধে হয়, যোগাড়যন্তর কিছু থাকে না কিনা, আর আমার শ্বশুরবাড়ি একটু আবার পাড়াগাঁ-গোছেরও।”

     

     

    ত্রিলোচনের নববিবাহের রসচেতনায় একটু আঘাত লাগিল। বিরক্তভাবে বলিল, “তোর শুধু খ্যাটের চিন্তা গোরা। বিয়ে না দিয়ে কাকা যদি তোর একটা হোটেলে ওয়েটারের চাকুরি করে দিত তো—”

    গোরাচাঁদ বলিল,–”গণশা, কি বলিস, যাব একবার কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে?”

    গণশা অন্যমনস্ক হইয়া কি যেন ভাবিতেছিল, বলিল, “চ-চ্চল্ না।”

    সকলেই একজোটে বলিয়া উঠিল, “চল্ না মানে?”

    গণশা উত্তর করিল, “আম্মো তা হলে একবার দেখে আসি গোরার শ্বশুরবাড়ি।”

    গোরাচাঁদ একেবারে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল, গণশার হাতটা চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “চল মাইরি; আমার বন্ধু জানলে তারা—”

    গণশা বলিল, “হ্যাঁ, তোর বন্ধু হয়ে গিয়ে বাইরের চালের বাতা গুনি আর তোর আফিমখোর শ্বশুরের বক্তার শুনি!”

     

     

    রাজেন প্রশ্ন করিল, “তবে?”

    “ভাবছি, চা-চ্চাকর সেজে গেলে কেমন হয়!

    ত্রিলোচন একটু অন্যমনস্ক ছিল; বোধ হয় বিনা খবরে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথাটা লইয়া মনে মনে আলোচনা করিতেছিল। আর সবাই উল্লসিত ভাবে বলিয়া উঠিল, “গ্র্যান্ড হয়, উঃ!”

    ঘোঁৎনা বলিল, “যাবি যে, গোরার বাড়িতে কি বলবে? দুদিন থাকবে তো? তুই বা কি বলবি?”

    রাজেন বলিল, “গোরা বলবে, আমাদের কারুর জন্যে মেয়ে দেখতে গেছল কোথাও। তোর শালীর বয়েস কত র‍্যা গোরা?”

    কে. গুপ্ত বলিল, “আরে গণেশবাবুর বললেই হবে, চাকরি খুঁজছিলেন।”

    গণশা বিরক্ত হইয়া বলিল, “চা-চ্চাকরি কি হারানো গাই-গরু মশাই যে, তিন দিন ধরে, দিন নেই রাত নেই, খুঁজতে থাকব? বলে দিলেই হবে একটা কিছু, মা-ম্মাদের তো ঘুম হচ্ছে না গণশার ভাবনায়!”

     

     

    .

    সঙ্গে চাকর যাইতেছে, গোরাচাঁদের মনে একটা মস্ত লোভের উদ্রেক হইয়াছিল, সন্ধ্যা-বাজারের নিকট পৌঁছিয়া সেটাকে আর চাপিয়া রাখিতে পারিল না; বলিল, “যখন দুজনেই যাচ্ছি গণশা, কিছু গলদাচিংড়ি, দার্জিলিঙের কপি, কড়াইশুঁটি আর নৈনিতাল আলু নিয়ে গেলে হত না? আর কিছু মিষ্টি? মানে তোর খাবার কষ্ট না হয়, একটু পাড়াগাঁ- গোছের জায়গা কিনা! আমরা পৌঁছবও সেই যার নাম আটটা, রাত হয়ে যাবে।”

    গণশা বলিল, “কিন্তু গাড়ির আর মোটে আধ ঘণ্টাটাক দেরি।”

    যাহা হউক, বাজারটা একেবারে হাতের কাছে, কেনাই ঠিক হইল। আন্দাজের একটু বেশি সময়ই লাগিল। গোরাচাঁদ তরকারির ঝুড়িটা লইল, গণশা খাবারের হাঁড়িটা। তারপর ক্ষিপ্রতার জন্য গণশা যে বাসটায় উঠিয়া বসিল, কতকটা ক্ষিপ্রতার অভাবে ও কতকটা ঝুড়িটার জন্যও গোরাচাঁদ সেটা ধরিতে পারিল না। দুইটি স্টপ পার হইয়া যাওয়ার পর গণশা সেটা টের পাইল। ফিরিয়া আসিতে, গোরাচাদকে খুঁজিয়া বাহির করিতে এবং গায়ের ঝাল মিটাইতে আরও খানিকটা সময় গেল। স্টেশনে আসিয়া প্রায় হাঁপাইতে হাঁপাইতে প্ল্যাটফর্মে ঢুকিয়া গণশা জিজ্ঞাসা করিল, “ডা-ড্ডানদিগেরটা, না, বাঁদিগেরটা র‍্যা গোরে?”

     

     

    পাশাপাশি দুইটা গাড়ি দাঁড়াইয়া। ঢুকিবার সময় প্ল্যাটফর্মের নম্বর দেখিতে ভুলিয়া গিয়াছে; সন্দেহ আছে বুঝিলে গণশা আবার পাছে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে, সেই ভয়ে গোরাচাঁদ পরিণাম চিন্তা না করিয়াই বলিল, “বাঁদিগেরটা।”

    গাড়িতে ভিড় ছিল একটু। একেবারে ভিতরের দিকে এক কোণে গিয়া দুইজনে একটু জায়গা পাইল। গোরাচাঁদ চুপড়িটা উঠাইয়া বাঙ্কের এক কোণে রাখিল; গণশার হাত হইতে হাঁড়িটা লইয়া চুপড়ির মধ্যে বসাইয়া দিল।

    কয়দিন বৃষ্টি হয় নাই, বেশ গরম পড়িয়াছে; দৌড়াদৌড়ি, তাহার উপর ভিড়। গণশা ঠেলিয়া-ঠুলিয়া আসিয়া প্ল্যাটফর্মের উপর পায়চারি করিতে লাগিল। একটি বৃদ্ধযাত্রী বলিল, “ফাষ্টো বেল হয়ে গিয়েছে হে বাপু!”

    গণশা দোরটার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। বৃদ্ধ প্রশ্ন করিল, “যাওয়া হবে কনে?”

    “সিঙ্গুর।”

    “সিঙ্গুর! সে তো বাবা তারকেশ্বরের লাইনে। এ গাড়ি তো নয়, ওই সামনেরটা। এ গাড়িতো পশ্চিম যাবে।”

     

     

    গণশা কতকটা অবিশ্বাসে, কতকটা উদ্বেগে বলিল, “কে বললে?”

    দ্বিতীয় ঘণ্টা পড়িল।

    বৃদ্ধ বোধ হয় একটু রগ-চটা। বলিল, “কেউ বলে নি; তুমি উঠে এস। ওতে যাবে না, শেষে এটাও হাতছাড়া করবে! গাঁটের পয়সা দিয়ে যখন টিকিট কিনেছ, উঠে পড়।”

    হুইসল্ দিয়া গাড়ি স্টার্ট দিল। গণশা চিৎকার করিয়া বলিল, “গোরা শি-শি-শিগগির নেমে পড়, বলছে—”

    গোরাচাঁদের খটকা লাগিয়াছিল একটু “কে বলছে? কে বলছে র‍্যা?—বলিতে বলিতে হন্তদন্ত হইয়া লোকদের পা মাড়াইয়া মোট ডিঙাইয়া আসিয়া কোনোমতে নামিয়া পড়িল। গণশা চোখ রাঙাইয়া বলিল, “ত-ত্তবে যে তুই বললি বাঁদিগেরটা?”

    গোরাচাঁদ চলন্ত গাড়িটার দিকে চাহিয়া বলিল, – “যাঃ, চুপড়িটা গেল ছেড়ে— হাঁড়িসুদ্ধু! হায় হায়!”

     

     

    একটু অগ্রসর হইতে হইতে বলিল, “মশাই, চুপড়িটা ফেলে দিন না এদিকে, ওই বাঙ্কে রয়েছে—উত্তর দিকে, মানে পূর্ব দিকের উত্তুর, মানে উত্তুর কোণটায় আর কি—–”

    গণশা দাঁতমুখ খিঁচাইয়া বলিল, “ছো-ছোট্, দৌড়ো দিল্লি পর্যন্ত ওই বলতে বলতে!”

    পাশের গাড়ির প্রথম বেলটা পড়িল। একজন রেল-কর্মচারি একটু দূরে দাঁড়াইয়া ছিল; গণশা জিজ্ঞাসা করিল, “এটা তারকেশ্বর লাইনের গাড়ি তো স্যার?”

    “হ্যাঁ, শিগগির উঠে পড় গিয়ে।”

    ভুলের সমস্ত সম্ভাবনা এড়াইবার জন্য গোরাচাঁদ প্রশ্ন করিল—”যে তারকেশ্বরের লাইনে সিঙ্গুর আছে?”

    গণশাও উত্তরটা শুনিবার জন্য ঘাড় বাঁকাইয়া দাঁড়াইয়া ছিল, একটা ধমক খাইয়া দুইজনে তাড়াতাড়ি গিয়া গাড়িতে উঠিল। গণশা প্ল্যাটফর্মের দিকের বেঞ্চটায় বসিয়াছিল; গোরাচাঁদ পকেট হইতে মানিব্যাগ বাহির করিতে করিতে বলিল, “গলা বাড়িয়ে দেখ তো গণশা, খাবারের ভেন্ডারটা আছে কাছে-পিঠে? বেশ খানিকটা ছুটোছুটি হয়রানি হল কিনা!”

     

     

    দ্বিতায় ঘণ্টা পড়িল, হুইসল্ দিয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

    গোরাচাঁদ ব্যাগটা যথাস্থানে রাখিয়া দিল। একটি দীর্ঘশ্বাস মোচন করিয়া বলিল, “সে চুপড়িটা এতক্ষণ বোধ হয় লিলুয়া পেরিয়ে গেল হাঁড়িসুদ্ধু! কেনা পর্যন্ত খালি দৌড়োদৌড়ি, একটাও যে মুখে ফেলে দোব, এমন ফুরসৎ হল না।”

    যাহা হউক, গাড়িটার গতিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুইজনেরই মনমরা ভাবটা কাটিয়া গেল। গণশা চাকরের মুখে মানায় এইরকম ভাব ও ভাষার একটা গান ধরিল, “পরাণ যদি লিলেই রে প্রাণ–” সেটা জমিয়া উঠিতে দুই-একজন উঠিয়া যাওয়ায় কোলের কাছে যখন একটু জায়গা খালি হইল, গোরাচাঁদ গিয়া সেইখানটিতে বসিল। প্রথমে গুনগুন করিয়া গানে একটু যোগ দিল, কিন্তু গণশার তোলামির জন্য কোরাসে অসুবিধা হওয়ায় গাড়ির বাহিরে হাত বাড়াইয়া শুধু তবলা বাজাইতে লাগিল।

    গাড়ি রিষড়ায় আসিয়া দাঁড়াইলে একদল বরযাত্রী নামিল। খানিকটা উল্লসিত চেঁচামেচি; এসেন্সের, জুইয়ের গোড়ের গন্ধ; চেলি-পরা, কপালে চন্দনের ফুটকি দেওয়া বর। গণশার গানটা মৃদু হইতে হইতে থামিয়া গেল। গাড়ি ছাড়িয়া খানিকটা গেলে বলিল, “হ্যাঁ, হঠাৎ মনে পড়ে গেল, তোর শা-শা-শালীর বয়েস কত র‍্যা গোরা? মানে যদি বিয়ের যুগ্যি হয় তো শিবপুরে পাত্তোর-টাত্তোর দেখি; একটা ভদ্দলোকের উদ্‌গার করতে পারা মস্ত ভাগ্যি কিনা!”

     

     

    গোরাচাঁদ বলিল, “বউয়ের ষোল যাচ্ছে, এ কার্তিকে সতেরোতে পড়বে; শালী হল দু বছর তিন মাসের ছোট, তা হলে—”

    গণশা হিসাবের গোলমালের দিকে না গিয়া বলিল, “বিটুইন তেরো অ্যান্ড চোদ্দো! হেল্থ কেমন?”

    “বউয়ের চেয়ে ভালোই বলতে হবে। বউটা ম্যালেরিয়ার বড় ভুগলো কিনা, একেবারেই হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছিল; ধন্যি বলতে হবে পান্নালাল ডাক্তারকে, যাকে বলে মরা মানুষ চাঙ্গা করে—”

    গণশা প্রশ্ন করিল, “দে-দ্দেখতে কেমন?”

    গোরাচাঁদ একটু লজ্জিতভাবে ধমক দিয়া বলিল, “যাঃ! আহা, উনি যেন দেখেন নি! তবে যে বললি সেদিন, গোরা, তিলুর বউয়ের চেয়ে তোর বউয়ের রঙটা—”

    গণশা আর বিরক্তি চাপিতে পারিল না, “তোর শালীর কথা জিজ্ঞেস করছি, না স্রেফ বউ বউ করে সেই থেকে—”

     

     

    গোরাচাঁদ অপ্রতিভ হইয়া বলিল, “তাই বল্! আমি এদিকে ভেবে সারা হচ্ছি, গণেশ জেনে-শুনেও ও-কথা জিজ্ঞেস করছে কেন! শালী হচ্ছে যাকে বলে—হ্যাঁ, সুন্দরী!”

    “লেখাপড়া কেমন? ক-কথা হচ্ছে, কেউ জিজ্ঞেস করলে আবার খুঁটিয়ে বলতে হবে কিনা। নইলে বলবে, খুব খোঁজ রাখেন তো মশাই! আবার সম্বন্ধ করতে এসেছেন!”

    “ছাই লেখাপড়া, ওর চেয়ে বউ অনেক পড়েছে; কিন্তু মুখের কাছে দাঁড়াও দিকিন শালীর!”

    গণশা হাসিয়া বলিল, “সত্যি নাকি?” মৃদু হাস্যের সঙ্গে মাথা দুলাইয়া কি চিন্তা করিল খানিকটা, তাহার পরে ধীরে ধীরে ত্রিলোচনের বিয়ের সেই হিন্দি গানটা ধরিল, “মুহা পঙ্কজ সোঙরি সোঙরি—”

    শেওড়াফুলিতে পৌঁছিতে গোরাচাঁদ বলিল, “তোর ক্ষিদে পায় নি গণশা? সে চুপড়িটা বোধ হয় এতক্ষণ চন্দননগরে—তোর কি আন্দাজ হয়?”

     

     

    গণশা বলিল, “ক্ষিদের চেয়ে তেষ্টা পেয়েছে বেশি; একটা লেমনেড হলে হত।”

    গোরাচাঁদ বলিল, “তুই তবে তাই খা, ওই ভেন্ডারটা আসছে, আমি দেখি নেমে, যদি খাবার-টাবার পাওয়া যায় কিছু।”

    গণশা ধমক দিয়া উঠিল, “গ-গ-গর্দভ কোত্থাকার! আর একটুখানি সহ্যি করে থাকবে, তা নয়, পথে যা-তা খেয়ে পেট ভরাচ্ছে!”

    কথাটা গোরাচাঁদের খুব সমীচীন বলিয়া বোধ হইল। প্রকাশ করিয়া বলিলও, “ঠিক বলেছিস গণশা, পাড়াগাঁয়ের রাত হলেও জামাই মানুষ পৌঁছেছে, যতদূর সাধ্য করবেই তারা, একটা মস্ত আহ্লাদের কথা তো! কিছু নাহলেও পুকুরের মাছ আর গরুর দুধটা তো আছেই। আমিও তাহলে একটা লেমনেড খাই এখন; ক্ষিদেটা জলে চাপা রইল। তাতে কোনো ক্ষতি হবে না, কি বলিস?”

    লেমনেড ছিল না, দুইজনে দুইটা সোডাই পান করিল। গণশা একটা ঢেকুর তুলিয়া বলিল, “চা-চ্চাপা কি! ক্ষিদেয় একেবারে শান দেওয়া রইল। মাছ যদি তেমন ওঠে তো একবার কালিয়া রেঁধে দেখাই গোরে। পাড়াগাঁয়ে কিন্তু আবার চাকরের রান্না খাবে না যে!”

    গোরাচাঁদ উল্লসিত হইয়া বলিল, “রান্নাঘরের দোরগোড়ায় বসে তুই বাতলে দে না কেন শালাজকে, সে-ই রাঁধে কিনা। এক ঢিলে দু-পাখি মারা হবে, গল্পও করতে থাকবি, আবার শালী, বউ সবাই থাকবে। তারা ভাববে, জামাইবাবুর চাকর, ওটার কাছে আবার লজ্জা! চাকরবাবু যে এদিকে শিবপুরের ডাকসাইটে গণেশরাম—”

    দুইজনেই সজোরে হাসিয়া উঠিল।

    সিঙ্গুরের আর দেরি নাই। গাড়ির এদিকটায় তাহারা মাত্র দুইজনে বসিয়া। গণশা উঠিয়া জামাকাপড় ছাড়িয়া একটা ময়লা ধুতি ও একটা ঘুণ্টিদেওয়া ফরসা পিরান পরিল; মাথার তেরিটা মুছিয়া ফেলিয়া কানে একটা বিড়ি গুঁজিয়া দিল। জামাকাপড় এবং ক্যাম্বিসের জুতা-জোড়াটা গোরাচাঁদের ছোট সুটকেসটায় গুছাইয়া ফেলিল; তাহার পর হঠাৎ চোখ দুইটা ট্যারা করিয়া লইয়া গোরাচাঁদের দিকে চাহিয়া ডাকিয়া উঠিল, “দাঠাউর!”

    দুইজনে আবার একচোট হাসিয়া উঠিল।

    .

    রাত প্রায় সাড়ে আটটার সময় গাড়ি সিঙ্গুরে পৌঁছিল।

    গল্প করিতে করিতে স্টেশনের বাহির হইয়া দুইজনে চলিতে আরম্ভ করিল। বউয়ের কথা, শালী-শালাজের কথা, খাওয়ার কথা যখন বেশ জমিয়া উঠিয়াছে, গোরাচাঁদ বলিল, “হ্যাঁ, আসল কথাটাই ভুলে যাচ্ছি যে! এদিকে এসেও পড়েছি অনেকটা; তোকে কি বলে ডাকব র‍্যা শ্বশুরবাড়িতে? মানে, বউটা আবার তোর নাম জানে কিনা।”

    হঠাৎ থমকিয়া সভয়ে চারিদিক চাহিয়া বলিল, “এ কোথায় এলাম র‍্যা গণশা, এ যে অনেক ভদ্দরলোকের বাড়ি!”

    গণশা বিস্মিতভাবে দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর ব্যঙ্গের স্বরে প্রশ্ন করিল, “তুই কি বা- ব্বাগ্দী-পাড়া কেওরাপাড়ায় শ্বশুর-বাড়ি খুঁজছিলি?”

    বেশ অন্ধকার। গোরাচাঁদ দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া চারিদিকে দেখিতে দেখিতে বলিল, “সে কথা নয়, মানে শ্বশুর-বাড়িটা এক টেরেয় কিনা, নিজ সিঙ্গুর ছাড়িয়ে খানিকটা ভেতরের দিকে। বাড়িঘর, কি দোকানপাট তো নেই সেদিকে, চল্ আবার ইস্টিশানে, গল্প করতে করতে এক্কেবারে উল্টো রাস্তায় এসে পড়েছি; এদিকটা তো আমার জ্ঞাতি পিসশ্বশুরের বাড়ি।”

    “না হয় পিসশ্বশুরের বাড়িই রাতটা কাটাবি চল না, সকালে তখন—”

    গোরাচাঁদ শিহরিয়া উঠিল; বলিল, “ওরে বাব্বা! তারা তো চায়ই তাই। টের পেলে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে রাতারাতি কাজ সাফাই করে লাস গুম করে ফেলবে। জমি নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে ভয়ঙ্কর খুনে মকদ্দমা চলছে কিনা! ওরা তো চায়ই, কেউ একবার আসুক এদিক বাগে, জামাই পেলে তো লুফে নেবে!”

    গণশা তাড়াতাড়ি তাহাকে টানিয়া লইয়া ফিরিল। খুবই চটিয়া গিয়াছিল, কিন্তু স্টেশনে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছু বলিল না। স্টেশনের কাছে আসিয়া খুব একচোট গালিগালাজ করিল গোরাচাঁদকে। আবার ঠিক রাস্তা ধরিয়া দুইজনে যাইতে আরম্ভ করিল। চলিতে চলিতে দুই-তিন জায়গায় খবর লইয়া যখন বুঝিল যে, ঠিক রাস্তাতেই যাইতেছে, তখন মনের রাগটা এবং পিসশ্বশুরের আতঙ্কটা অল্পে অল্পে কাটিয়া গেল। বুঝিল, কাছে আসিয়া পড়িয়াছে, গণশার মনটা প্রফুল্ল হইয়া উঠিল, কথাবার্তাও সরস হইয়া আসিল। সাহস পাইয়া গোরাচাঁদ বলিল, “তুই তো ওই সব বলে ঠাট্টা করছিস শুধু, আমার এদিকে নাড়ী জ্বলে গেল ক্ষিদেয়, ভুল রাস্তার পাল্লায় পড়ে রাতও হয়ে গেল বড্ড।”

    “না-ন্নাড়ী কি আমারই জ্বলছে না? দেখছি, কালিয়াটা আর হবে না রাত্তিরে। যদি বড় মিরগেল ওঠে তো ভেজেই দিক আপাতত; লুচি তো করবেই—স্রেফ মিরগেল মাছের পেটি ভাজা আর লুচি।”

    গোরাচাঁদ মুখে রস জমিয়া উঠায় একটা ঝোলটানা-গোছের শব্দ করিয়া বলিল, “দুটোই বড় শুকনো হয়ে গেল; তা রাতটা কাটুক ওই ভাবেই, সকালে তখন দেখা যাবে। বউকে বরং বলব, দুধটাকে নটক্ষিরে করে—; হাতে একটা আধলা ইট তুলে নে তো গণশা, এসে গেছি, আমি এই বাঁশের আগালেটা বাগিয়ে ধরছি।”

    গণশা দাঁড়াইয়া পড়িয়া বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিল, “কেন র‍্যা, আবার কি?”

    “কুকুরটা বড় রোখা। রাত্তিরে কেউ এলে ধরে নেয়, চোর কিংবা পিসশ্বশুরের বাড়ির কেউ; দাঙ্গার পর থেকে ওদের ওপর বড় চটা কিনা! ওই, ডাকতে আরম্ভ করেছে! তুই যে থান-ইট তুলে নিয়েছিস, একেবারে থেঁতো হয়ে যাবে যে! আয়, বাঘা বাঘা, চ্যু চ্যু—আমি রে তোদের জামাইবাবু। আচ্ছা, বাড়ি একেবারে নিষুতি কেন বল তো গণশা?”

    “ঘুমিয়েছে নিশ্চয়, রাত দশটা হয়ে গেল।”

    গোরাচাঁদ বলিল, “ঘুমুলে কুকুরটার এরকম ডাকেও ঘুম ভাঙবে না?”

    দুইজনে কুকুরটাকে আটকাইতে বাহিরের উঠানে গিয়া উপস্থিত হইল। তখন একজন ভিতর-বারান্দা হইতে জড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন করিল, “কে? কে র‍্যা বাঘা?”

    গোরাচাঁদ বলিল, “আমি শিবপুর থেকে আসছি।”

    সেই রকম নিদ্রালু স্বরে প্রশ্ন হইল, “কি দরকার রাতদুপুরে?”

    এরূপ অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের উত্তর গোরাচাঁদের মুখে টপ করিয়া যোগাইল না। গণশা বলিল, “না দ-দরকার তেমন কিছু নেই, তবে ইনি—তোমায় গিয়ে দা-দ্দাদাঠাউর এ-বাড়ির জামাই।”

    গোরাচাঁদ ফিসফিস করিয়া বলিল, “বাড়িটা ঠিক তো? ‘জামাই’ আবার গালাগাল কিনা?”

    ওদিকে আর কোনো সাড়া নাই। লোকটা ঘুমাইয়া পড়িয়াছে নিশ্চয়, ঘুমের মধ্য হইতেই প্রশ্ন করিয়াছিল। দুইজনে কুকুরটাকে কখনও তাড়না, কখনও খোশামোদ করিতে করিতে বারান্দার খেলা রকে উঠিয়া গেল। গোরাচাঁদ লোকটাকে লক্ষ্য করিয়া একটু চড়া গলায় বলিল, “জামাই মানে, শিবপুরের জামাই গোরাচাঁদ আমি; সঙ্গে এ গণ—, আমার চাকর।”

    গণশা কানের কাছে মুখ লইয়া বলিল, “দু-দ্দুখীরাম।”

    “আমার চাকর দুখীরাম। তুমি কে কথা কইলে?”

    সেই নিদ্রালু স্বর একটু ধমকের সুরে প্রশ্ন করিল, “বলি, তুমি কে?”

    গোরাচাঁদ হতাশ হইয়া গণশার দিকে চাহিয়া বলিল, “বললাম তো একচোট সব খুলে! কি গেরো বল তো!”

    একটু থামিয়া গলা আর একটু চড়াইয়া বলিল, “বাঘা, এখনও চিনতে পারছিস না জামাইবাবুকে—সেই লুচি খেতিস হাত থেকে?”

    গণশা বলিল, “পিসশ্বশুরের বাড়ির লোক নয় রে বাঘু।”

    এবার ঘরের ভিতর হইতে ভারি গলায় প্রশ্ন হইল, “বাইরে কে ব্যাড়র ব্যাড়র করছে? কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলে!”

    গোরাচাঁদ গণশাকে বলিল, “শ্বশুরের আওয়াজ। আফিমের ঘুম কিনা, ঠিক ধরতে পারছে না।”

    চেঁচাইয়া বলিল, “বাবা আমি আপনাদের গোরাচাঁদ, শিবপুর থেকে আসছি।”

    “কে বাবাজী? এস বাবা, এস এস। নিধে! এই ব্যাটা হারামজাদা, পড়লে আর হুঁশ থাকে না! রকে জামাই দাঁড়িয়ে যে!”

    তাড়া খাইয়া নিধিরাম ধীরে ধীরে উঠিয়া পড়িল। বাঁ হাতে কালি-পড়া লণ্ঠনটা লইয়া দুয়ার খুলিল, তাহার পর আলোটা তুলিয়া ধরিয়া চোখ পিটপিট করিতে করিতে টানা জড়িত স্বরে কহিল, “তাই তো, জামাইবাবু যে! এস এস, আস্তেজ্ঞে হোক, পেন্নাম হই। তা বলা নেই, কওয়া নেই—যেন গিয়ে বিনি মেঘে বজ্রাঘাত, বাঃ, কি সৌভাগ্য! ওটি কে?”

    গণশা বলিল, “আমি দাঠাউরের নফর নিধুদা; গড় করি।”

    .

    তিনজনে ঘরে আসিল। গোরাচাঁদ শ্বশুরকে প্রণাম করিয়া সামনের একটা পায়া মচকানো চেয়ারে, প্রতি মুহূর্তেই পড়িয়া যাইবার আশঙ্কায় সতর্ক হইয়া বসিয়া রহিল। গণশাও খুব ভক্তিভরে পায়ের ধূলা লইয়া নীচে উবু হইয়া বসিল। নিধু ঘরের এক কোণে গিয়া তামাক সাজিতে লাগিল।

    শ্বশুর খানিকটা নিঝুম হইয়া বসিয়া রহিলেন। অস্বস্তি বোধ হওয়ায় গোরাচাঁদ প্রশ্ন করিল, “আপনি-আপনারা কেমন আছেন?”

    কোনো উত্তর হইল না।

    গণশা ইশারায় তাগাদা করিল, হাতের কাছে অন্য কোনো প্রশ্ন না পাওয়ায় গোরাচাঁদ জিজ্ঞাসা করিল, “এবার এদিকে—এবারে এদিকে বৃষ্টি কেমন হল?”

    নড়নচড়ন পর্যন্ত নাই। গণশা আবার প্রশ্ন করিতে তাগাদা করিল গোরাচাঁদ ভীতভাবে হাত নাড়িয়া ফিসফিস করিয়া বলিল, “চটে যায়।”

    আবার খানিকক্ষণ নিঝুম। একটা ঝোঁক কাটিয়া গেলে শ্বশুর হঠাৎ মাথা তুলিয়া বলিলেন, “হুঁ, গোরাচাঁদ এসেছ, না?”

    গোরাচাঁদ ব্যাকুলভাবে একবার গণশার দিকে চাহিয়া উত্তর করিল, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”

    “তাই তো!”

    আবার খানিকটা চুপচাপ, শুধু গোরাচাঁদের চেয়ার সামলানোর ক্যাচ কোঁচ শব্দ হইল দুই-তিনবার।

    নিধিরাম তামাক সাজিয়া দিয়া এক পাশে বসিল।

    হুঁকায় কয়েকটা টান দিয়া গোরাচাঁদের শ্বশুর একটু চাঙ্গা হইলেন। বলিলেন, “তখন থেকে চুপ করে তাই ভাবছি। হ্যাঁরে, নিধে, বাড়ির সবাই বিয়েবাড়ি নেমন্তন্ন গিয়ে বসে রইল, জামাই খাবেন কি?”

    নিধিরাম কলিকাটির দিকে অর্ধমুদ্রিত সতৃষ্ণ নয়নে চাহিয়া ছিল, নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বলিল, “সেই কথাই তো ভাবছি।”

    গোরাচাঁদের মুখ ফ্যাকাশে হইয়া গেল। গণশা একটু চাপা, তবু তাহার দিকে চাহিয়া দেখিল, সেও হতভম্ব হইয়া গিয়াছে। দুইজনে পরস্পরের মুখের দিকে চাহিয়া শ্বশুর কি স্থির করেন, সেই প্রত্যাশায় একটু চুপ করিয়া রহিল। আরও খানিকক্ষণ তামাক টানিয়া নিধিরামের দিকে হুঁকাটা বাড়াইয়া শ্বশুর বলিলেন, “ভাবিয়ে তুললে যে! উপোস করে থাকবেন?”

    নিধিরাম কলিকাটা পাক দিয়া হুঁকা হইতে খুলিতে খুলিতে বলিল, “রামঃ, সে কি হয়?”

    “উপায়?”

    “উপায়!”—পরম ভক্তিভরে কলিকাটা মাথায় ঠেকাইয়া বলিল, “বাবা আছেন।”

    বাবা—এ প্রান্তে তারকেশ্বরের সাধারণ নাম।

    গণশা গোরাচাঁদের পানে ঠোঁটটা কুঞ্চিত করিয়া মাথা নাড়িল, অর্থাৎ আর কোনো আশা নাই।

    “আমি বলি।”—বলিয়া গোরাচাঁদ কি বলিতে যাইতেছিল, নিধিরাম হাসিয়া বলিল, “তুমি যা বলবে বুঝতেই পারছি দাদাঠাকুর, খবর দিয়ে আসতে পার নি বলে, আর খুব রাত হয়ে গেছে বলে পথে শেওড়াফুলিতে খেয়ে এসেছ, এই তো? শুনছেন জামাইবাবুর কথা কৰ্তা?”

    নেশাটা চটিয়া যাইতেছে, জামাইয়ের হাঙ্গামা না মিটাইলে অব্যাহতি নাই; বৃদ্ধ মিটিমিটি করিয়া হাসিয়া বলিল, “দ্যুৎ! সেই তুই আমি করতাম বলে কি ও ছেলেমানুষরাও করবে? না, সেটা উচিত হত?”

    অর্থাৎ সেইটাই উচিত হইত, এবং যদি না হইয়া থাকে তো কাণ্ডজ্ঞানহীন ছেলেমানুষ বলিয়াই হয় নাই।

    গণশা গোরাচাঁদ বিমূঢ়ভাবে পরস্পরের মুখ-চাওয়াচাওয়ি করিল। গোরাচাঁদ কি উত্তর দিতে যাইতেছিল; পেটুক মানুষ পাছে বেমানান কিছু বলিয়া বসে–সেই ভয়ে গণশা তাড়াতাড়ি বলিয়া দিল, “আজ্ঞে, বললে বিশ্বাস যাবেন না, দাঠাউর সত্যি খেয়ে এয়েছেন।” গোরাচাঁদ গণশার দিকে কটমট করিয়া চাহিয়া মরীয়া হইয়া আবার কি একটা বলিতে যাইতেছিল, কপালদোষে হঠাৎ একটা ঢেকুর বাহির হইল। তবু যথাসম্ভব সামলাইয়া লইয়া বলিল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, একটা সোডা–”

    গণশা তাহার দিকে একটা ভ্রুকুটি করিয়া মুখ ঘুরাইয়া লইয়া বলিল, “খাবেন না সোডা? তি-ত্তিন গণ্ডা রসগোল্লা, পোয়াটাক কচুরি-সিঙাড়া মিলিয়ে পো-খানেক মিহিদানা খেলেন, শেষে আমি বললাম—”

    গোরাচাঁদ হতাশভাবে চাহিয়া ছিল, তাহার মুখের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখিয়া গণশা বলিল, “শেষে আমি বললাম, দাঠাউর, একটা সোডা খেয়ে নাও; তাঁরা তো সেখানে খাবার জন্যে জেদাজেদি করবেনই—”

    নিধিরাম বলিল, “করব না জেদাজেদি? ঘরের জামাই এলেন, বাঃ!”

    গণশা ক্রমাগত চোখ টেপানি দিতেছে। আর কোন আশা নাই দেখিয়া গোরাচাঁদ নিরুৎসাহ কণ্ঠে যতটা সম্ভব জোর দিয়া বলিল, “দুখীরামের কথা শুনে আমি বললাম, হাজার জিদ করলেও আমি আর খেতে পারব না। শেষকালে কি মারা যাব?”—বলিয়া চেষ্টা করিয়া আর একটু ঢেকুর তুলিল।

    শ্বশুর নিধিরামের নিকট হইতে কলিকাটা লইয়া বলিলেন, “আমার কিন্তু বাপু বিশ্বাস হচ্ছে না যে, জামাই পথেই খেয়ে এসেছেন। নিধে কি বলিস?”

    হাঙ্গামা-পোহানোর ভয়ে নিধিরাম অনেকটা সামলাইয়া আনিয়াছে, আবার কাঁচিয়া যায় দেখিয়া তাড়াতাড়ি বলিল, “অবিশ্বাসের তো হেতু দেখছি না, কর্তামশাই; নোতুন জামাই মিছে কথা বলবেন কি? তায় আপনার মতো দেবতুল্যি শ্বশুর।

    “তাই তো!”—বলিয়া বৃদ্ধ আরও খানিকটা চিন্তা করিলেন, তাহার পর উৎসাহভরে বলিয়া উঠিলেন, “আমি বলি কি নিধে, জামাইকে না হয় নেমন্তন্নবাড়ি নিয়ে যা না কেন, ততক্ষণ আমাতে আরএটির নাম কি?”

    গোরাচাঁদ উৎসাহভরে বলিল, “ক্ষুদিরাম।”

    “আমাতে আর ক্ষুদিরামে বসে বসে গল্প করি না হয়। বেয়াই বেহান-ঠাকরুন আছেন কেমন ক্ষুদিরাম?”

    “বেশ আছেন।”—বলিয়া গণশা তাড়াতাড়ি বলিল, “আজ্ঞে আমি তো জা-জ্জান থাকতে দাঠাউরকে একলা ছেড়ে দিতে পারব না। এই সাপ-খোপের দেশ! কর্তাবাবু বললেন, দুখীরাম, ম-ম্মলমাস, ছেলেটা একলা যাচ্ছে, সর্বদা সঙ্গে সঙ্গে থাকবি, খ-খ- খবরদার!”

    গোরাচাঁদ হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল, “নিধু, খুব বিচক্ষণ লোক গণ—দুখীরাম, ও আবার ঝাড়ফুঁকও জানে। তোর কোনো ভাবনা নেই; নিশ্চিন্দি হয়ে বাবার সঙ্গে গল্প কর, আমি একটু হয়ে আসি। কথা হচ্ছে, ক্ষিদে তো এক্কেবারেই নেই, কিন্তু শাশুড়ি-ঠাকরুনকে দেখবার জন্যে প্রাণটা কেমন আইঢাই করছে; অনেকদিন পায়ের ধুলো নিই নি কিনা!”

    গণশা ভিতরে ভিতরে জ্বলিয়া খাক হইতেছিল, গোরাচাঁদের দিকে একটা উগ্র কটাক্ষ হানিয়া সংযতভাবে কহিল, “বি-ব্বিনি পায়ের ধুলোয় যখন চারটে মাস কাটালে চোখকান বুজে, ত্যাখন আর একটা কি দুটো ঘণ্টা কোনোরকমে কাটাও না দাঠাউর, মা-ঠাকরুনও এক্ষুনি নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরবেন ছিচরণ সঙ্গে নিয়ে।”

    শ্বশুর মাথা নাড়িয়া বলিলেন, “সে আজ সমস্ত রাত আসবে না, তারা কেউ না; সম্পর্কে আমার নাতনীর বিয়ে কিনা, গিন্নি বাসর জাগবে, ও কি! ধর ধর।”

    শেষ আশা একটু ছিল, শাশুড়ির,–সেটুকুও যাওয়ায়, গভীর নিরাশায় শরীরটা হঠাৎ শিথিল হইয়া পড়ায় গোরাচাঁদের ভাঙা চেয়ার হইতে আছাড় খাওয়ার দাখিল হইয়াছিল; গণশা আর নিধিরাম ধরিয়া ফেলিল।

    শ্বশুর বলিলেন, “আহা ঘুম ধরেছে।’

    নিধিরাম বলিল, “চাপ খাওয়া হয়েছে কিনা!”

    শ্বশুর উঠিয়া বলিলেন, “তবে বাবাজী, চল দুর্গা শ্রীহরি বলে শুয়েই পড়বে চল। ক্ষিদে যখন নেই-ই বলছ, শুধু প্রণাম করবার জন্যে কোশটাক পথ ভাঙার মাঝরাত্রে কি দরকার? ওঠ তা হলে। দুখীরামকে না হয় গোটাকয়েক খইচুর এনে দোব!”

    গণশা উত্তর দেওয়ার আগে গোরাচাঁদ প্রতিহিংসাবশে বলিল, “না না, খাওয়ার ওপর খেয়ে একটা কাণ্ড করে বসবে শেষে; ওর ভরসায়ই বাবা আমায় পাঠিয়েছেন মলমাস অগ্রাহ্যি করে।”

    গণশার পানে না চাহিয়া শ্বশুরের পিছনে পিছনে ভিতরে চলিয়া গেল।

    প্রায় ঘণ্টা দেড়েক আরও কাটিল। গোরাচাঁদ ভিতর-বাড়িতে ক্ষুধার জ্বালায় এবং খাদ্য সম্বন্ধে হতাশায়, বিছানাতে পড়িয়া এপাশ-ওপাশ করিতেছিল, এমন সময় ঘরের দুয়ারের কাছে গণশা ডাকিল, “দাঠাউর!”

    গোরাচাঁদ উত্তর দিতে যাইতেছিল, নিধিরামের গলার আওয়াজ শুনিল, “ঘুমে এলিয়ে পড়েছেন আর তুলে কাজ নেই। তুমি তাহলে এই দোরগোড়াটায় শুয়ে থাক দুখীরাম ভাই, আমি যাই কর্তার কাছে; এই শতরঞ্জি রইল।”

    নিধিরাম চলিয়া গেলে গণশা ভিতর বাড়ির কপাট বন্ধ করিয়া যখন ফিরিয়া আসিল, গোরাচাঁদ ধীরে ধীরে ডাকিল, “গণশা!”

    “জেগে আছিস?”—বলিয়া গণশা দুয়ার ঠেলিয়া ভিতরে ঢুকিল।

    গোরাচাঁদ চিঁ চিঁ করিয়া বলিল, “ঘুমুতে পারছি না ভাই, আর সাহসও হচ্ছে না— এইসা ক্ষিদে গণশা! মনে হচ্ছে, ঘুমুলে আর ওঠা হবে না, জামাইকে ওদের সকালে টেনে বের করতে হবে।”

    গণশা মশার কামড়ে চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল, “চাকর সেজে এলে আবার মশারি দেবে না, মনে ছিল না রে—উঃ! তার ওপর দু ব্যাটা আপিমখোরের বক্তার! নেশা চটে গেছে কিনা।”

    গোরাচাঁদ বলিল, “তাও যেমন ভগবান দয়া করে ভুল গাড়ি চড়িয়ে দিয়েছিলেন, যদি রেখে দিতেন—। পেটটা খালি থাকলে পুড়ে যাওয়ার মতো জ্বালা করে রে! জানতাম না। নিধেটা কি ধড়িবাজ দেখেছিস?”

    “দুটোই। খিদেয় মরছি, অথচ কেমন বলিয়ে নিলে, খেয়ে এসেছি! এইসা কোণঠাসা করে এনেছিল যে, না-না বললে, আর মান থাকত না।”

    খানিকটা চুপচাপ গেল। তাহার পর গণশা মাথাটা মশারির মধ্যে গলাইয়া দিয়া পূর্বের চেয়েও চাপা গলায় বলিল, “গোরে, এক মতলব বের করেছি। ভাবছি, রাজী হবি কি না, তোর আবার শ্বশুরবাড়ি কিনা।”

    গণশার মতলব বাহির করায় কত বড় বড় সমস্যার সমাধান হয়। গোরাচাঁদ পরম আগ্রহে বলিয়া উঠিল, “কি মতলব রে গণশা?”

    “বুড়ো সেই খইচুরের কথা বলছিল—”

    “দিয়েছে নাকি? বলিয়া গোরাচাঁদ মশারি জড়াইয়া এক রকম পড়-পড় হইয়া নামিয়া গণশার সামনে দাঁড়াইল।

    গণশা বলিল, “দেয় নি, ত-ত্তবে বাড়িতেই তো আছে।”

    গোরাচাঁদ গণশার দিকে একটু বিমূঢ়ভাবে চাহিয়া থাকিয়া একেবারে গলা নামাইয়া বলিল, “চুরি?”

    গণশা উপরে নীচে মাথা নাড়িল।

    গোরাচাঁদ ঝোল-টানার শব্দ করিয়া বলিল—”জামাই হয়ে—তাই বলছিলাম; কিন্তু কেই বা দেখছে! আর এসা চমৎকার খইচুর এখানকার গণশা, সন্দেশ, রসগোল্লা ফেলে—”

    “ভাঁড়ার ঘর কোনটে জানিস?”

    গোরাচাঁদ আবার ভাঁড়ার-ঘর চিনিবে না—তাও শ্বশুরবাড়ির! বলিল, “উঠোনের ওদিকে রান্নাঘরের পাশে—হ্যাঁ রে গণশা, আমার একটা-আধটায় হবে না; কমে গেলে ওরা সব টের পেয়ে যাবে না তো, যে জামাই রাত্তিরে উঠে এই কাণ্ডটি—”

    “গা-গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল? আগে চল নিয়ে, যদি তালা দেওয়া থাকে তো আবার—”

    গোরাচাঁদের বুকটা যেন ধসিয়া গেল; ভীত নিরাশ দৃষ্টিতে বলিল—”তা হলে?”

    “চল না, ইডিয়ট!”—বলিয়া গণশা তাহাকে একটা ঠেলা দিল। বালিশের তলা হইতে দেশলাইটা লইল।

    প্রদীপ লইয়া সন্তর্পণে অগ্রসর হইতে হইতে গোরাচাঁদ বলিয়া উঠিল, “তোরই মতলবের ওপর আমার এক মতলব এসে গেল গণশা, রান্নাঘরটাও অমনই আগে একবার দেখে নিলে হয় না? কপাল যেমন, তাতে যে কিছু পাব—তবু ধর, যদি ও-বেলায় ভাজা মাছটা-আসটা—”

    গণশা বলিল—”হ্যাঁ, চল। কখনও কখনও জল দিয়ে পান্তা করেও রাখে মেয়েরা, খুব তোয়াজ বোঝে কিনা, নেমন্তন্ন খেয়ে শরীরটা গরম হবে।”

    উঠান পার হইয়া রকে উঠিয়া গোরাচাঁদ উৎফুল্লভাবে বলিল, “তালা দেওয়া নেই রে গণশা, ভগবান বোধ হয় এবার মুখ তুলে চাইলেন।”

    ভগবান সত্যিই মুখ তুলিয়া চাহিয়াছেন। রান্নাঘরে প্রবেশ করিতেই দুইজনে দেখিল, সামনে একটা শিকায় টাঙানো একটা বড় সাইজের হাঁড়ি, তার উপর একটা জামবাটি, তাহার উপর একটা কড়া; পাশে আর একটা শিকায় একটা পিতলের কড়া।

    একটা বিড়াল উনানের পাশে বসিয়া ছিল, ইহাদের দেখিয়া লাফাইয়া জানালায় উঠিয়া বসিল।

    গোরাচাঁদ তাড়াতাড়ি গিয়া পিতলের কড়াটায় আঙুল ডুবাইয়া উল্লাসে চোখ দুইটা বড় করিয়া বলিল, “দুধ রে গণশা—মিল্ক!”

    গণশা বলিল, “নামা।”

    চঞ্চল হাতে নামাইতে গিয়া একটু সরসুদ্ধ দুধ চলকাইয়া গোরাচাঁদের কপালের উপরটায় পড়িয়া গেল। বাঁ হাতে সরটি মুছিয়া মুখে দিয়া গোরাচাঁদ বলিল, “বেশ মোটা সর রে! দুটা বাটি যদি পাওয়া যেত!”

    গণশা বলিল, “আগে হাঁড়ির শিকেটা দেখে নে। এই রে, তোর কপালে কড়ার কালি লেগে গেল যে!”

    সৌন্দর্যের দিকে গোরাচাঁদের খেয়াল ছিল না। “ঠিক বলেছিস, দুধটা শেষ পাতের জিনিস কিনা!”—বলিয়া কপালটা ডানহাতে মুছিয়া অন্য শিকাটার দিক অগ্রসর হইল।

    গণশা বলিল, “আমি ধরছি শিকেটা, তুই একটা একটা করে পাড়। আবার জামায় হাতটা মুছলি বুঝি? এঃ ভূত হয়ে গেলি যে!”

    গণশা শিকার একটা দড়ি ধরিল; গোরাচাঁদ উপরের কড়াটায় আঙুল ডুবাইয়া বলিল, “ঝোল, গণশা!” আঙুলগুলা চালাইয়া উত্তেজিত ভাবে বলিল, “মাছের ঝোল।”

    আর তর সহিতেছিল না, গোটাকতক মাছ বাহির করিয়া মুখে ফেলিয়া আনন্দের চোটে গণশার হাতটা ধরিয়া ফেলিল, “পুঁটিমাছের টক মাইরি!”

    গণশার উঁচু-করা মুখে জল আসিয়াছিল, একটা ঢোক গিলিয়া বলিল, “তা হলে হাঁড়িতে নির্ঘাত পান্তা আছে; জামবাটিটা দেখ তো! আমার হাত ধরতে গেলি কেন? দেখ তো, আমায়ও বাঁদর বানিয়ে ছাড়লি!”

    জানালার উপর বিড়ালটা ডাকিল, মিউ।

    গোরাচাঁদ বলিল, “তাড়া তো বেটীকে। ভাগীদার জুটেছেন!”

    গণশা বলিল, “না না, আমি মতলব ঠাউরেছি, যাবার সময় সব ফেলে-ছড়িয়ে বেড়ালটাকে ঘরে বন্ধ করে যাব!”

    “তোর এত মাথায় খেলে মাইরি!”—বলিয়া গোরাচাঁদ সপ্রশংস দৃষ্টিতে বন্ধুর পানে চাহিল, তাহার পর বলিল, “ঠিক করে ধরিস, আমার হাতটা কাঁপছে।”

    কড়াটা বাঁ হাতে একটু তুলিয়া জামবাটির মধ্যে হাত দিতে যাইবে, এমন সময় বাহিরের রকের এ কোণটায় বাঘা উৎকট স্বরে ঝাউঝাঁউ করিয়া ডাকিয়া উঠিল। একে আচমকা, তায় চোরের মন, দুইজনেই একসঙ্গে চমকিয়া উঠিল এবং তাহাদের হস্তধৃত দড়ি ও কড়াটা কাঁপিয়া গিয়া কড়াটা বাঁকিয়া প্রায় অর্ধেকটা অম্বলের মাছ আর ঝোল হড়হড় করিয়া গোরাচাঁদের মাথার উপর পড়িল। গণশা একটা লাফ দিয়া পেছনে সরিয়া গেল, কিন্তু তবু যে নিতান্ত বাদ গেল, এমন নয়!

    সঙ্গে সঙ্গে বাহিরের দরজার নিকট হইতে আওয়াজ আসিল, “বাঘা আমরা সব; থাম।”

    ঝোলে-বোজা চোখে কোনোরকমে পিটপিট করিয়া চাহিয়া গোরাচাঁদ দেখিল, গণশা চোখ দুইটা বড় করিয়া তাহার দিকে চাহিয়া আছে; অতিমাত্র ভীত চাপা স্বরে বলিল, “আমার সম্বন্ধী—শিবুদা।”

    গণশা জিজ্ঞাসা করিল, “উপায়?”

    আওয়াজ অগ্রসর হইতে লাগিল—বিয়েবাড়ির চর্চা। সবাই রকে উঠিল। শিবু বাহিরের দুয়ারের কড়া নাড়িয়া ডাকিল, “বাবা, ও বাবা! নিধে! দুজনেই নিঃসাড়! এই নিধে!”

    কর্তার গলারই উত্তর হইল, “এলি তোরা? জামাই এসেছেন।”

    দুয়ার খোলার শব্দ হইল। প্রবেশ করিতে করিতে শিবু প্রশ্ন করিল, “আমাদের গোরাচাদ! কখন এল?”

    গণশা ফিসফিস করিয়া ডাকিল, “গোরে!”

    গোরাচাঁদ কাঠ হইয়া গিয়াছে; একবার নিজের অম্লসিক্ত শরীরটা দেখিয়া বিহুলভাবে গণশার পানে চাহিয়া রহিল।

    ভিতর-বাড়ির দুয়ারে করাঘাত হইল। গোরাচাঁদ জিজ্ঞাসা করিল, “কি করবি বল তো গণশা? কাপড়-জামাটা ছেড়ে—”

    গণশা বলিল, “পাগল! সময়ই বা কোথায়? আর সুটকেসটাও বাইরে।”

    ঘন ঘন করাঘাতের সঙ্গে তাগাদা হইল, “গোরাচাঁদ, দোর খোল হে। জামাইবাবু!” গণশা অতিমাত্র চঞ্চল হইয়া বলিল, “পালাতে হবে গোরে, খিড়কিটা কোন্ দিকে বল তো!”

    এত বিপদেও গোরাচাঁদের এ সম্ভাবনাটা মনে হয় নাই; চরম বিস্ময়ের সহিত বলিল, “পা-লা-তে হবে? শ্বশুরবাড়ি যে! আর সত্যিই তো, তা না হলে—”

    বাইরে শোনা গেল, “নিধে, তুই ওদিক থেকে একটু হাঁক দে তো! শালা যেন কুম্ভকর্ণ! আর চাকরটাই বা কি রকম! দোর খোল হে।”

    জোর কড়া-নাড়ার শব্দ হইল, কপাটে দুই-একটা লাথির ঘা পড়িল।

    এমনসময় যেখানটা কুকুর ডাকিয়া উঠিয়াছিল, সেখানটায় নিধিরামের শঙ্কিত কণ্ঠ শোনা গেল, “দাদাবাবু, রান্নাঘরে আলো দেখছি যে! মা-ঠাকরুণ জ্বেলে রেখে গিয়েছিলেন নাকি?”

    “কই না! হে বাবা তারকেশ্বর!”–মেয়ে গলায় কাঁপা আওয়াজ হইল।

    খানিকক্ষণ একেবারে চুপচাপ। শিবু নিধিরামের কাছে আসিয়া বলিল, “সত্যিই তো! আর দু—”

    গোরাচাঁদ এক ফুৎকারে আলোটা নিবাইয়া দিল। গণশা খুব চাপা গলায় বলিল, “কি করলি গাধা?”

    “নিবিয়ে দিলে! চোর! চোর! বাবা, জেনেশুনে চোর ঢোকালে বাড়িতে! নিধে!”

    “দেখলাম, জামাই—সেই রকম মুখ-চোখ কথাবার্তা, দিব্যি প্রণাম করলে—”

    “তবে আর কি! প্রণাম করলে: শিগগির খিড়কি আগলাগে নিধে; নিশে বাগদীকে হাঁক দে। ও রতনের মা! ও সামন্ত, সামন্ত!”

    একটু দূরে বনের মধ্যে হইতে আওয়াজ আসিল, “এজ্ঞে!”

    “শিগগির এস সড়কিটা হাতে করে, দু শালা ঢুকেছে।”

    “এলাম। সটকায় না যেন, একসঙ্গে গাঁথব। রতনের মা, তোর সেই কাটারিটা নিয়ে বেরো!”

    গণশা আর গোরাচাঁদ ঘর ছাড়িয়া উঠানের মাঝামাঝি জড়সড় হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল, গোরাচাঁদ একসঙ্গে গাঁথার কথায় একটু সরিয়া দাঁড়াইল।

    আওয়াজ হইল, “নিধে!”

    “আমি এই খিড়কিতে, বাঘাকে নিয়ে!”

    গণশা চারিদিকে চাহিয়া নিরাশভাবে বলিল, “কি করা যায়?”

    তাহার পর হঠাৎ গোরাচাঁদের পায়ের নিকট হইতে একটা আধলা ইট কুড়াইয়া লইয়া বলিল, “হয়েছে, চল খিড়কির দিকে; তুইও পিঁড়েটা তুলে নে।”

    গোরাচাঁদ শঙ্কিত ভাবে বলিল, “খুন করে পালাবি নাকি নিধেকে?”

    গণশা বলিল, “আর বাঘাকে। নয়তো কি খু-খু-খুন হব সামন্তর সড়কিতে? কোনটে খিড়কি? এগো।”

    কি হইত বলা যায় না, কিন্তু এই সময় কুকুরটা হঠাৎ নিধিরামের নিকট হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে কি একটা তাড়া করিয়া রান্নাঘরের পিছনে গেল এবং সেখান থাবা গাড়িয়া বসিয়া উঁচু মুখে প্রবল শোরগোল লাগাইয়া দিল।

    শিবু একটু লক্ষ্য করিয়া বলিল, “আবার রান্নাঘরে ঢুকেছে; সবাই এই দিকটা চলে এস, এখনও আছে শালারা। নিধে, আয় দিকিন, সামন্ততে আর তোতে পাঁচিল ডিঙিয়ে ওদিকে পড়। বাঘা, ঠিক চোখে চোখে রাখবি ওই ভাবে।”

    বাঘা রাখিতেও ছিল, কালো বিড়ালের মতো শত্রু আর তাহার নাই। বাঘাহীন খিড়কিতে নিধিরামের পা থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল, সে তাড়াতাড়ি সরিয়া আসিয়া সবিক্রমে বলিল, “হ্যাঁ, ওঠ তো সামন্ত খুড়ো; দাও, সড়কিটা ধরে থাকি ততক্ষণ। ‘

    গণশা ও গোরাচাঁদ গিয়া খিড়কি ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। যেই বুঝিল নিধিরাম সরিয়া গিয়াছে, দোর খুলিয়া আস্তে আস্তে বাহির হইল। গণশা খুব সন্তর্পণে শিকটা তুলিয়া দিল। খুব অন্ধকার, ঝোপঝাপ। গোরাচাঁদ অগ্রসর হইল। হাতটা পিছনে করিয়া গণশার জামা ধরিয়া খুব চাপা গলায় বলিল, “আয়, একটু ঘুরে গিয়ে সদর রাস্তা। বাঘা সরে নি, ওরা বাড়ি নিয়েই থাকবে একটু।”

    এত বিপদেও বাড়িটার দিকে চাহিয়া তাহার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়িল। বলিল, “একটা রাতও কাটল না; বউ ওদিকে নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছে—”

    গণশা কালসিটের ব্যাপারটা স্মরণ করিয়ে শুধু একবার প্রশ্ন করিল, “সামনে পানাপুকুরটুকুর নেই তো?”

    .

    শিবপুরে স্টীমার-জেটির রেলিঙে হেলান দিয়া মুখোমুখি হইয়া দাঁড়াইয়া রাজেন, ত্রিলোচন, কে. গুপ্ত, গণশা আর গোরাচাঁদ। রাজেন প্রশ্ন করিল, “তারপর গোরের শ্বশুরবাড়ি কেমন লাগল গণশা?”

    ত্রিলোচন প্রশ্ন করিল, “এক রাত্তির থেকেই চলে এলি যে বড়?’

    গোরাচাঁদের মনটা অবসন্নই ছিল, একটু ব্যঙ্গের সুরে উত্তর করিল, “শ্বশুরবাড়ি এক রাত্তিরের বেশি থাকলে মান থাকে নাকি?”

    ত্রিলোচন বলিল, “সে কথা নয়, মানে—দিলে যে বড় আসতে?”

    গণশা কুটা না কি একটা দাঁতে কাটিতেছিল; গঙ্গার দিকে চাহিয়া বলিল, “আসতে কি দি-দ্দিতে চায়? অনেক ক-কষ্টে–”

    আর শেষ করিতে পারিল না। কথাটা বাড়ি ঘেরাও করিয়া আটকানো, খিড়কি দিয়া পলায়নের সঙ্গে এমন মিলিয়া গেল যে, আপনিই যেন তাহার গলার স্বর মাঝপথে বাধিয়া গেল।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরাণুর কথামালা – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    Next Article রাণুর দ্বিতীয় ভাগ – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    Related Articles

    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    শ্রেষ্ঠ গল্প – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    October 29, 2025
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    রাণুর প্রথম ভাগ – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    October 29, 2025
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    রাণুর দ্বিতীয় ভাগ – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    October 29, 2025
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    রাণুর কথামালা – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    October 29, 2025
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় রচনাবলী ২ (দ্বিতীয় খণ্ড)

    October 29, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }