Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    লীলাবতী – হুমায়ূন আহমেদ

    হুমায়ূন আহমেদ এক পাতা গল্প283 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ০৩. কার্তিক মাসের সকাল

    কার্তিক মাসের সকাল।

    সিদ্দিকুর রহমানের গায়ে ঘিয়া রঙের চাদর। ঘন হয়ে কুয়াশা পড়েছে। তিনি কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। তার দৃষ্টিতে একধরনের মুগ্ধতা আছে। মুগ্ধতার কারণ এই বছর শিউলি গাছে ফুল ফুটেছে। হাজার হাজার ফুল। গত বছর এবং আগের বছর গাছে কোনো ফুল ফুটে নি। শিউলি গাছ মাঝেমধ্যে ফুল দেয়া বন্ধ করে এটা তার জানা ছিল না। ফল গাছের ক্ষেত্রে এরকম দেখা যায়। সব আমগাছে প্রতিবছর মুকুল আসে না। ফুল গাছের ক্ষেত্রে এই ব্যাপার কখনো ঘটে না। ফুল ফুটানো তাদের জন্যে বাধ্যতামূলক।

    সিদ্দিকুর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন শহরবাড়ির সামনে। এই বাংলো ধরনের বাড়ি তার দাদা খান বাহাদুর হামিদুর রহমান বানিয়েছিলেন। বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ফুলার কটেজ। পূর্ববঙ্গ ও আসামের প্রথম লে. গভর্নর ফুলার সাহেবের নামে বাড়ি। বাড়ির ডিজাইন করা হয়েছিল গভর্নর সাহেবের ইংল্যান্ডের বাড়ির ছবি দেখে। বাড়ির সামনে তিনি চেরিগাছও লাগিয়েছিলেন। গাছগুলি বাঁচে নাই।

    হামিদুর রহমানের ধারণা ছিল বাড়ি দেখে ফুলার সাহেব মুগ্ধ হবেন। শুধু তার এক রাত থাকার জন্যে কেউ এত আয়োজন করবে। এটা নিশ্চয়ই তিনি ধারণা করে বসে ছিলেন না। ফুলার সাহেবের ময়মনসিংহের নেত্রকোনার অতি প্রত্যন্ত অঞ্চলে আসতে চাওয়ার পেছনের কারণ পাখি শিকার। সাহেব নিরামিষাশী হলেও পাখি শিকারের প্রচণ্ড নেশা ছিল। রাজকার্যের বাইরে তিনি পাখি শিকারের জন্যে অনেক সময় বের করতে পারতেন।

    খান বাহাদুর হামিদুর রহমান গভর্নর সাহেবের পাখি শিকারের জন্যে বিপুল আয়োজন করিয়েছিলেন। এই উপলক্ষে তিনি সুসং দূর্গাপুরের মহারাজার কাছ থেকে নান্দিনা নামের একটা মাদি হাতি কিনে নেন। গভর্নর সাহেব হাতির পিঠে চড়ে শিকারে যাবেন। তার জৌলুসাই আলাদা। জামালপুর থেকে কারিগর। এনে দুটা পালকি বানানো হয়। যে-সব জায়গায় হাতি যাবে না সে-সব জায়গায় পালকি যাবে। মুন্সিগঞ্জ থেকে একটা বজরা কিনে আনেন। নদীতে বজরা বাধা থাকবে। বজরায় পান ভোজনের ব্যবস্থা। বরফকলের বরফ, স্কচ হুইস্কি। সাহেবরা মদ্যপান ছাড়া কোনোরকম খেলাধুলাই করতে পারেন না। বাঙালির যেমন পান-সুপারি সাহেবদের সেরকম বরফ-মদ।

    গভর্নর সাহেবের পছন্দের খানা তৈরির জন্যে কোলকাতার আলীপুর থেকে একজন ফিরিঙ্গি বাবুর্চি আনা হয়। বাবুর্চির নাম হর্নথন।

    লেফটেনেন্ট গভর্নর ফুলার শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চলে পাখি শিকারে আসেন নি। তিনি স্বদেশী আন্দোলনকে কঠিন হাতে দমন করতে গিয়ে কংগ্রেসী নেতাদের সঙ্গে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন। তাকে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করতে হয়। লর্ড মিন্টো ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।

    গভর্নর সাহেবের পদত্যাগে ভারতবর্ষে যে মানুষটি সবচে বেশি দুঃখ পেয়েছিলেন তিনি সম্ভবত খান বাহাদুর হামিদুর রহমান। অনেকের ধারণা লাট সাহেব তাঁর বাড়িতে আসেন নি এই শোকে সেই বছরই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর একমাত্ৰ সন্তান হাসানুর রহমানের বয়স তখন মাত্র দশ। অতি দ্রুত পরিবারটি ধ্বংসের মুখোমুখি এসে পড়ে। নানান পাওনাদার এসে জুটে। একজন এসে জোর করে হাতি নিয়ে চলে যায়। একজন নিয়ে যায় বজরা। জমিজমা নিয়েও দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনরা মামলা শুরু করে দেন।

    বিস্ময়কর ঘটনা হলো বালক হাসানুর রহমানের পাশে সে সময় যে মানুষটি এসে দাঁড়ায় সে ফিরিঙ্গি বাবুর্চি হর্নথন। তার মুখে একটাই বুলি— I will kill all the bastards বন্দুকসে গোলি মারদুঙ্গা। হর্নথন এই বাড়িতেই মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যান। গ্রামের মানুষরা তাকে ডাকত হন্টন সাহেব। হন্টনের আগে একটি বিশেষণও ব্যবহার করত— পাগলা। পাগলা হন্টন। বাড়ির নামও লোকজন পাল্টে দিল। বাংলো বাড়ির নাম হয়ে গেল— শহরবাড়ি। এই বাড়ির সামনে এসে দাড়ালে অঞ্চলটাকে শহর মনে হয়। গ্রাম মনে হয় না। কাজেই বাড়ির নাম শহরবাড়ি।

    কুয়াশার ভেতর দিয়ে রোদ এসেছে। কুয়াশা ভেজা রোদ। সিদ্দিকুর রহমান চোখ বন্ধ করে রোদের দিকে মুখ ফিরালেন। পাগলা হন্টন শেষ বয়সে এই কাজটা করতি–ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বন্ধ করে রোদের দিকে তাকিয়ে থাকত। সিদ্দিকুর রহমানের শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে এই মানুষটার আশেপাশে। সে হড়বড় করে সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলে যেত। বালক সিদ্দিকুর রহমান ইংরেজি কিছুই বুঝত না কিন্তু মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনন্ত। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে পাগলা হন্টন মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গান করত। কিছু কিছু গান সিদ্দিকুর রহমানের এখনো মনে আছে—

    I adore thee
    l Serve thee
    Fall before thee

    সিদ্দিকুর রহমান ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন। পাগলা হন্টন সাহেবের কথা মনে হলেই তার মন খারাপ লাগে। এও এক রহস্য। তার কত প্ৰিয়জনই তো মারা গেছেন। তাদের কথা এরকম হুটহাট করে মনে আসে না। আর মনে এলেও মন খারাপ হয় না। তিনি ডাকলেন, সুলেমান!

    সুলেমান সঙ্গে সঙ্গে বলল, জি।

    আজি কী বার?

    বিষুদৃদবার।

    আজ তো রমিলার স্নানের দিন।

    জি।

    নতুন সাবান আছে না?

    জি।

    রমিলাকে সপ্তাহে একদিন স্নান করানো হয়। এই স্নান তিনি নতুন সাবান ছাড়া করেন না। খুবই আগ্রহ করে তিনি সাবানের মোড়ক খুলেন। কিছুক্ষণ গন্ধ নেন।

    রমিলার ঘরের জানালা খোলা। জানালা দিয়ে রোদ এসে খাটে পড়েছে। তিনি সাবধানে রোদে হাত রাখলেন। তার ভাবটা এরকম যেন এটা রোদ নাআগুন। আগুনে হাত রাখলে পুড়ে যাবে। তিনি আঙুল বন্ধ করছেন এবং ফাক করছেন। আঙুলের ফাঁক দিয়ে রোদ খাটের চাঁদরে পড়ছে এবং বন্ধ হচ্ছে। সুন্দর লাগছে দেখতে।

    তিনি কিছুক্ষণ এই খেলা খেললেন। দূর থেকে কইতরী তাকে লক্ষ করছে। কইতরীর চোখে কৌতূহল এবং ভয়। তার সামান্য মনখারাপ হলো। কইতরী তারই মেয়ে। অথচ মায়ের ভয়ে সে অস্থির। তিনি হাত ইশারায় মেয়েকে ডাকলেন। কইতরী ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আসছে। মেয়েটা তো অনেক বড় হয়েছে। সুন্দরও হয়েছে। যতই দিন যাবে। এই মেয়ে ততই সুন্দর হবে।

    মাগো, তোমার ব্যাপজান কই জানো?

    না।

    খোঁজ নিয়া বাইর করতে পারবো?

    হুঁ।

    তোমার বাপজানরে বলো তালা খুঁইল্যা আমারে যেন বাইর করে। আইজ আমার মাথা ঠিক আছে।

    আইচ্ছা।

    তোমার বয়স কত হইছে মা?

    এগার।

    মাশাল্লাহ।

    তার খুব ইচ্ছা করছে মেয়েকে একটা প্রশ্ন করতে। লজ্জায় করতে পারছেন না। একটা বিশেষ সময় থেকে মেয়েরা যে শারীরিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়— তার দুই মেয়ে কি তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে? কোনো মা মেয়েদের এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে লজ্জা পান না। তিনি পাচ্ছেন কারণ তিনি সাধারণ মা না। তিনি পাগল মা।

    কইতরী এখনো দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় মার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে। ভালো লাগলেও তার চোখ থেকে ভয় যায় নি।

    তোমার ভাইন জাইতরী কই?

    শহরবাড়িত।

    তারেও ডাক দিয়া আনো। তোমরার দুই ভইনের মাথাত আমি তেল দিয়া দিব।

    আচ্ছা।

    তোমার ভাই মাসুদ কই?

    জানি না।

    তারেও খবর দেও। অনেক দিন তারে দেখি না।

    আচ্ছা খবর দিব।

    কইতরী চলে যাচ্ছে, রমিলা মুগ্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। এত মুগ্ধ হয়ে ছেলেমেয়ের দিকে তাকানো ঠিক না। নজর লেগে যায়। বাপ-মায়ের নজর–কঠিন নজর রমিলা মনে মনে বললেন, আল্লাগো মাফ করো। মাকুন্দগো আমার নজর যেন না লাগে।

    তিনি নজর না লাগানোর জন্যে অন্যদিকে তাকাতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু মেয়ের উপর থেকে নজর সরাতে পারছেন না।

    মেয়ে যে ফ্রকটা পরে আছে তার রঙ সুন্দর– হলুদ। হলুদ মেয়েদের রঙ। এই রঙ পুরুষের জন্যে নিষেধ। কেন নিষেধ কে জানে! ভালো মুনশি মাওলানা পেলে জিজ্ঞেস করে দেখতেন। যখন তার মাথা ঠিক থাকে তখন অনেক কিছু জানতে ইচ্ছা করে। কথা বলার মতো একজন কেউ যদি থাকত!

    তিনি খাট থেকে নামলেন। তার হাঁটতে ইচ্ছা করছে। ঘরের তালা না। খোলা পর্যন্ত তিনি ঘরের ভেতরই কিছুক্ষণ হাঁটবেন বলে ঠিক করলেন। ঘরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাওয়া এবং ফিরে আসা। তার ঘরটা বেশ বড়। ঘরের একমাথা থেকে আরেক মাথায় যেতে হলে একশ তিনি কদম পা ফেলতে হয়। বেশির ভাগ সময়ই তিনি হাঁটেন চোখ বন্ধ করে। খাটটা ছাড়া এই ঘরে অন্যকোনো আসবাব নেই। কাজেই চোখ বন্ধ করে হাঁটতে অসুবিধা হয় না। বরং একটা সুবিধা হয়–চোখ বন্ধ করে হাটলে তিনি অনেক রকম গন্ধ পান। পশ্চিমের দেয়ালের কাছে গেলে কাঠ পচা গন্ধ এবং ন্যাপথিলিনের গন্ধ পান। যখন উত্তর দেয়াল ঘেঁসে হাঁটেন তখন পান আতরের গন্ধ। পূর্বদিকের জানালার কাছে এলেই নাকে আসে কাঁচা ঘাসের গন্ধ।

    সিদ্দিকুর রহমান ঘরের তালা খুলতে খুলতে বললেন, ভালো আছ?

    রমিলা মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে বললেন, হু।

    সিনান করবে? গরম পানি দিতে বলব? আজ বিষ্যুদবার।

    সিনান সইন্ধ্যাকালে করব। আজ সিনান কইরা নয়া একটা শাড়ি পরব।

    সিদ্দিকুর রহমান বিস্মিত হয়ে তাকালেন। একবার ভাবলেন জিজ্ঞেস করেন— নিয়া শাড়ি কেন? জিজ্ঞেস করলেন না।

    রমিলা স্বামীকে দেখেই মাথা নিচু করে ফেলেছিলেন। এখন মাথা আরো নিচু করে গুটিসুটি পাকিয়ে ফেললেন।

    সিদ্দিকুর রহমান বললেন, রান্না করতে মন চায়? রান্নার জোগাড়যন্ত্র করে দিতে বলব?

    না। মেয়ে দুটিার মাথায় তেল দিয়ে দিব।

    বসবে কোথায়?

    এক জায়গায় বসলেই হবে।

    আমি কি থাকব। আশেপাশে?

    দরকার নাই। আমার শরীর আজ ভালো।

    বিশেষ কিছু কি খেতে ইচ্ছা করে? ইচ্ছা করলে বলো ব্যবস্থা করি। তোমার যখন মাথা ঠিক থাকে না তখন তো খেতে পারো না। আজ আরাম করে খাও।

    সইন্ধ্যাকালে খাব।

    রমিলা হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় চলে এসেছেন। সিদ্দিকুর রহমান তাঁর পেছনে পেছনে আসছেন। রমিলাকে তালা খুলে বের করা ঠিক হয়েছে কি না।

    বুঝতে পারছেন না। রমিলা সুস্থ মানুষের মতো আচরণ করছে বলে তার কাছে মনে হচ্ছে না। বারান্দার শেষ মাথা পর্যন্ত সে এসেছে চোখ বন্ধ করে।

    রমিলা!

    জি।

    তোমার শরীর কি আসলেই ঠিক আছে?

    হুঁ।

    রমিলা মাথার ঘোমটা ফেলে দিয়ে স্বামীর দিকে সরাসরি তাকালেন। ফিসফিস করে বললেন, আপনাকে একটা কথা বলব।

    আইজ রাইতে একটা ঘটনা ঘটব।

    কী ঘটনা?

    সেইটা আপনেরে বলব না। ঘটনা ঘটনের পরে আপনের দিল খোশ হইব। এই জন্যেই আমি নয়া শাড়ি চাইছি।

    নতুন শাড়ির ব্যবস্থা করতেছি। শোনো রমিলা, আমি তোমার আশেপাশেই আছি। মাথার মধ্যে উনিশ-বিশ কিছু যদি টের পাও আমারে ডাকবা।

    আচ্ছা।

    রমিলা খুব যত্ন করে দুই মেয়ের মাথায় তেল দিয়ে দিলেন। চুল টেনে ফিতা দিয়ে বেঁধে দিলেন। মেয়েদের বুদ্ধি পরীক্ষার জন্যে কয়েকটা সিমাসা দিলেন। কঠিন সিমাসা। বুদ্ধি থাকলে ভাঙানো যাবে। বুদ্ধি না থাকলে না।

    বলো তো মা, জিনিসটা কী?

    কহেন কবি কালিদাস পথে যেতে যেতে
    নাই তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে?

    জইতরী-কইতরী দুজন একসঙ্গে বলল, পারব না।

    আচ্ছা আরেকটা ধরি।

    জইতরী বলল, প্রথমটা আগে ভাঙাও।

    রমিলা বললেন, সবগুলা পরে একসঙ্গে ভাঙায়ে দিব। এখন আরেকটা শোনো—

    আকাশে উড়ে না পক্ষী উড়ে না জঙ্গলে
    এই পক্ষী উড়ে শুধু শনি মঙ্গলে।

    পারব না।

    তাহলে এটা ভাঙাও

    মহাকবি কালিদাসের অতি আজব কথা
    নয় লক্ষ তেঁতুল গাছের কয় লক্ষ পাতা?

    পারব না।

    দেখ এইটা পার কি-না—

    তিন অক্ষরে নাম তার বৃহৎ বলে গণ্য
    পেটটা তাহার কেটে দিলে হয়ে যায় অন্ন।

    কইতরী আনন্দিত গলায় বলল, এইটা পারব। এটা ভারত। ভারতের পেট কাটলে হয়। ভাত।

    হইছে। মা, তোমার খুব বুদ্ধি।

    কইতরী বিড়বিড় করে বলল, মা, তুমি কি ভালো হয়ে গেছ?

    রমিলা ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বললেন, এখন ভালো। মন্দ হইতে কতক্ষণ!

    কইতরী বলল, শহরবাড়ি যাইবা?

    না।

    কইতরী বলল, তেঁতুল খাইবা? গাছ পাকনা তেঁতুল।

    রমিলার তেঁতুল খেতে ইচ্ছা করছিল না, তারপরেও বললেন, আনো দেখি।

    দুই মেয়েই দৌড়ে চলে গেল। লোকমানকে দেখা যাচ্ছে। সে অনেকক্ষণ থেকেই আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করছে। পরপুরুষের সামনে পর্দা করা উচিত। কিন্তু লোকমান তাকে মা ডাকে। পুত্রের সামনেও কি পর্দার বিধান আছে? রমিলা মাথায় শাড়ির আঁচল তুলতে তুলতে লোকমানকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। লোকমান প্রায় ছুটে এসে পাশে দাঁড়াল।

    কেমন আছ লোকমান?

    আম্মা, ভালো আছি।

    ঘরদোয়ার বড়ই অপরিষ্কার। ঝাড় পোছ দেও। কুটুম আসব।

    কে আসব আম্মা?

    রমিলা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, যখন আসব তখন জানিবা। এখন সামনে থাইকা যাও।

    রমিলা চোখ বন্ধ করলেন। তার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ভোঁতা ধরনের চাপ ব্যথা। লক্ষণ মোটেই ভালো না। এই ব্যথা বাড়তে থাকবে। তারপর হঠাৎ করেই ব্যথা বোধ থাকবে না। শুরু হবে ভয়ঙ্কর সময়। যে সময়ের কোনো হিসেব তার কাছে থাকবে না। রমিলার উচিত অতি দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার ব্যবস্থা করা। তার মন খারাপ লাগছে, মেয়ে দুটি আগ্রহ করে তেঁতুল আনতে গিয়েছে। এই তেঁতুল তারা দিতে পারবে না। তিনি বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে মেয়েদের সন্ধানে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন।

    এই তো তাদেরকে দেখা যাচ্ছে। মেয়ে দুটাই তো সুন্দর হয়েছে। কই তরী একটু বেশি সুন্দর। শুধু যদি চুল কালো হতো! এই মেয়ের চুল। লাল। মেয়েদের লাল চুল ভালো না।

    লাল চুলের মেয়েদের দিকে জিন-পরীর নজর থাকে।

    বলে আমারো যেন তালাবন্ধ করে। আমার মাথা নষ্ট হইতে শুরু করছে।

    জইতরী-কইতরী মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। রুমিলা ক্লান্তগলায় বললেন, তোমরা সাজগোজ কইরা থাকবা। বাড়িতে কুটুম আসতেছে।

    কইতরী বলল, কুটুম কে মা?

    রমিলা বললেন, তোমাদের বড় ভইন। তার নাম লীলা। লীলাবতী।

    তোমারে কে খবর দিছে মা?

    কেউ খবর দেয় নাই। আমি আগে আগে কিছু কিছু জিনিস জানি। ক্যামনে জানি বলতে পারব না।

    রমিলা তেঁতুল হাতে নিয়ে তাঁর ঘরের দিকে রওনা হলেন। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। আর দেরি করা ঠিক না।

    লীলা ট্রেনের জানালায় মাথা রেখে বসে আছে। তার চোখে চশমা। চশমা নড়বড় করছে। মনে হচ্ছে যে-কোনো সময় আলগা হয়ে নিচে পড়ে যাবে। খাপ করে হাত বাড়িয়ে ধরার সময় পাওয়া যাবে না। কারণ তার দু’টা হাতই বন্ধ। সে মাথা রেখেছে হাতের উপর। ট্রেন ঝড়ের গতিতে চলছে। প্ৰচণ্ড বাতাস। বাতাসে লীলার চুল উড়ছে। অল্প স্বল্প বাতাসে চুল উড়ে যখন মুখের উপর পড়ে তখন তার খুব বিরক্তি লাগে। এখন বিরক্তি লাগছে না। বরং উল্টোটা হচ্ছে, খুবই ভালো লাগছে। ভালো লাগার সঙ্গে খানিকটা ভয় যুক্ত হয়েছে— মাথার উপরের জানোলা খটখট করছে। ট্রেনের ঝাকুনিতে ধুম করে যে-কোনো সময় হয়তো মাথার উপর পড়বে।

    লীলার বয়স একুশ। তার মুখ লম্বাটে। গায়ের রঙ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে তাকে খুব ফরসা লাগে। আবার কখনো মনে হয় শ্যামলা। সব মানুষের চেহারায় কিছু বিশেষত্ব থাকে। লীলার বিশেষত্ব হচ্ছে, তাকে দেখেই মনে হয় সে খুব কথা বলে। আসলে ব্যাপারটা উল্টা। লীলা খুবই কম কথা বলে। তবে অন্যরা যখন কথা বলে সে সারাক্ষণই মুখ টিপে হাসতে থাকে এবং এমন আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে যে মনে হয় এ-ধরনের কথা সে আগে কখনো শোনে নি, ভবিষ্যতে শোনার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। যা শোনারএখনি শুনে নিতে হবে।

    ট্রেনের বাকুনিতে লীলার ঘুম-ঘুম লাগছে। সে বেশ কষ্ট করে জেগে আছে। সামনের স্টপেজটাই নান্দাইল রোড। তাকে নামতে হবে নান্দাইল রোডে। ট্রেন সেখানে মাত্র দুমিনিটের জন্যে থামবে। এই নিয়েও কিছু সমস্যা আছে, তাকে ট্রেনের যাত্রীরা বলেছে, মেইল ট্রেন নান্দাইল রোডে থামে না। যদি সত্যি সত্যি না থামে। তাহলে বিস্ময়কর ব্যাপার হবে। সে টিকিট কেটেছে নান্দাইল রোডের। ট্রেন না থামলে টিকিট কেন দেয়া হবে?

    লীলার সঙ্গে এমন কিছু মালপত্র নেই। একটা বড় সুটকেস, একটা হ্যান্ডব্যাগ। হ্যান্ডব্যাগ সে হাতে করে নামাবে। সুটকেস নামাঝে মঞ্জুমামা। মঞ্জুমামা এখন উপরের বার্থে শুয়ে হাঁ করে ঘুমুচ্ছেন। ট্রেনের গতি কমে এলে তার ঘুম ভাঙাতে হবে। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। টেনশনে তার গলার স্বর চিকন হয়ে যাবে। এমনিতে তার গলার স্বর ভারী, শুধু টেনশনের সময় গলা চিকন হয়ে যায়। লীলা ভেবেই পায় না একটা মানুষ সারাক্ষণ এত টেনশনে কী করে থাকে! তার চেয়েও আশ্চর্য কথা— এত টেনশন নিয়ে একটা মানুষ যখন-তখন কী করে ঘুমিয়ে পড়ে?

    মঞ্জুমামা লীলার আপন মামা না। লীলার মায়ের খালাতো ভাই। নয়াপুরে তার একটা ফার্মেসি, একটা টি স্টল এবং রেডিও সারাই-এর দোকান আছে। কোনো দোকান থেকেই তেমন কিছু আসে না। এই নিয়ে তার মাথাব্যথাও নেই। ব্যবসা পাতির খোঁজখবর নিতে গেলে তার টেনশন হয় বলেই তিনি কোনো খোঁজখবর করেন না। দিনের বেশিরভাগ সময় তার স্কুলজীবনের বন্ধু পরেশের চায়ের দোকানে বসে থাকেন। দোকানের পেছনে চৌকির উপর শীতল পাটি পাতা থাকে। ঘুম পেলে সেখানে ঘুমিয়ে পড়েন। মগুমামার বয়স পয়তাল্লিশ। এখনো বিয়ে করেন নি, তবে বিয়ের কথা চলছে। পত্রিী নয়াপাড়া প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। মাঘ মাসের ছয় তারিখে বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছে। তার পরও স্থানীয় মানুষজনের ধারণা, এই বিয়ে শেষ পর্যন্ত হবে না। আগেও কয়েকবার বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয় নি। মঞ্জুমামাকে লীলা নিয়ে এসেছে তার চড়নদার হিসেবে। সম্পূর্ণ নতুন একটা জায়গায় যাচ্ছে, বয়স্ক একজন পুরুষমানুষ সঙ্গে থাকা দরকার। এই মানুষটাকে লীলার খুবই পছন্দ।

    জানালার বাইরে বিপুল অন্ধকার। হঠাৎ-হঠাৎ দু’একটা বাতি জ্বলতে দেখা যায়। বাতিগুলিকে লীলার কাছে মনে হয়। জিনের চোখ। বাতিগুলির দিকে তাকিয়ে থাকতে তার ভালো লাগছে। বাতিগুলি স্থির না। চলন্ত ট্রেনের কারণে হঠাৎ গাছের আড়ালে পড়ে বাতি উধাও হয়ে যাচ্ছে, আবার হুট করে অন্ধকার থেকে বের হচ্ছে। আলোর রঙও একরকম না; কোনোটা গাঢ় লাল, কোনোটা হালকা হলুদ। কোনোটা আবার নীলাভ। সবগুলি বাতির রঙ এক হওয়া উচিত। সবই তো কেরোসিনের আলো। রঙের বেশ-কমটা কি দূরত্বের জন্যে হচ্ছে? পরীক্ষা করতে পারলে হতো। লীলা পরীক্ষাটা করতে পারছে না, কারণ সে চোখই মেলে রাখতে পারছে না।

    লীলা নিশ্চিত, কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়বে। মজার কোনো স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। মঞ্জুমামাও উপরের বার্থে ঘুমিয়ে থাকবেন। তারা নান্দাইল রোড স্টেশন ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে যাবে। একসময় মঞ্জুমামার ঘুম ভাঙবে। তিনি চিকন গলায় বলবেন–ধুনছে আমারে! তুলা ধুনা ধুনছে। ও লীলা, এখন করি। কী? লীলা বলবে, চলুন মামা আমরা চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ি। মঞ্জুমামা অত্যন্ত বিরক্ত গলায় বলবেন, তোর মাথায় কি কিরা ঢুকছে? ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে পড়লে তুই বাঁচবি? তোকে সঙ্গে নিয়ে বের হওয়াই ভুল হয়েছে। এইজন্যে শাস্ত্ৰে আছে পথে নারী বিবর্জিতা।

    কোন শাস্ত্ৰে আছে?

    কোন শাস্ত্ৰে আছে জানি না। কথা বলিস না, চুপ করে থাক। ধুনছেরে আমারে, ধুনছে। হায় খোদা এ কী বিপদ!

    ট্রেনের গতি কি কমে এসেছে? ঘটাং ঘটাং শব্দ এখন হচ্ছে না। তার বদলে শো শো শব্দ হচ্ছে। লীলা বুঝতে পারছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে, তবে কিছুটা চেতনা এখনো আছে। এক্ষুনি সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। সে স্বপ্ন দেখছে, শুরুতে এই বোধটা থাকবে।

    লীলা এখন দেখছে সে হাতির পিঠে বসে আছে। হাতিটা দুলতে দুলতে এগোচ্ছে। স্বপ্ন দেখা তাহলে শুরু হয়েছে। লীলা ইচ্ছা করলেই স্বপ্ন নষ্ট করে জেগে উঠতে পারে। স্বপ্ন নষ্ট করতে ইচ্ছা করছে না। হাতির পিঠে চড়তে ভালো লাগছে। আরো কী কাণ্ড, বাদ্য-বাজনা হচ্ছে! কারা যেন আবার পিচকিরি দিয়ে রঙ ছিটাচ্ছে। লাল-নীল রঙ চোখে-মুখে লাগছে। রঙ উঠবে তো? হাতির মাহুত লীলার দিকে তাকিয়ে বলল— তাড়াতাড়ি নামো, তুফান হচ্ছে। মাহুত শুদ্ধভাষায় কথা বলছে। গলার স্বর মঞ্জুমামার মতো। লীলা বলল, নািমব কীভাবে? একটা সিঁড়ি লাগিয়ে দিন-না! মাহুত রাগী গলায় বলল— আরে বেটি তুফান হচ্ছে। এই বলেই ধাক্কা দিয়ে সে লীলাকে ফেলে দেবার চেষ্টা করতে লাগল। লীলার ঘুম ভেঙে গেল। সে অবাক হয়ে দেখে আসলেই তুফান হচ্ছে। ট্রেন থেমে আছে। কামরায় কোনো বাতি নেই। যাত্রীরা জানালা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। ছোট একটা বাচ্চা কাঁদছে। একজন একটা টাৰ্চলাইট জুলিয়েছে। টাৰ্চলাইটের আলো ক্ষীণ। সেই ক্ষীণ আলোও আবার কিছুক্ষণ পরপর নিভে যাচ্ছে।

    লীলা বলল, মামা, আমরা কোথায়?

    মঞ্জু বিরক্ত গলায় বলল, আরো গাধা— ড্রাইভার জঙ্গলের মাঝখানে ট্রেন থামিয়ে দিয়েছে। আরো ব্যাটা, তুই কোনো স্টেশনে নিয়ে গাড়ি থামা। জংলার মধ্যে ট্রেন থামালি, এখন যদি ডাকাতি হয়?

    ডাকাতি হবে কেন?

    দেশ ভরতি হয়ে গেছে ডাকাতে। ডাকাতি হবে না? আজকাল ট্রেন অ্যাকসিডেন্ট হলে কী হয়? আশেপাশের চার-পাঁচ গ্রামের লোক চলে আসে। সাহায্য করার বদলে তারা করে লুটপাট। সুন্দরী মেয়ে থাকলে ধরে নিয়ে যায় পাটক্ষেতে।

    লীলা বলল, মামা, শুধু—শুধু টেনশন করো না তো! কিচ্ছু হবে না।

    মঞ্জু বিরক্ত গলায় বলল, কিছু হবে না তুই জানিস কীভাবে?

    মিটমিটি করে এতক্ষণ যে টর্চলাইট জ্বলছিল সেটিও নিভে গেল। কামরার ভেতর গাঢ় অন্ধকার। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই আলোয় যাত্রীদের ভীত মুখ দেখা যাচ্ছে। লীলার জানালার পাশে হুড়মুড় শব্দ হলো। লীলা চমকে উঠে বলল, মামা, কী হয়েছে?

    মঞ্জু বলল, গাছ ভেঙে পড়েছে, আর কী হবে! ঝড়ের মধ্যে গাধা-ড্রাইভার জঙ্গলে ট্রেন দাঁড় করিয়েছে। দেখিস পুরো জঙ্গলই ট্রেনের উপর ভেঙে পড়বে। পুরো ট্রেন পাটিসাপটা হয়ে যাবে। ভাই, আপনাদের কারো সঙ্গে দেয়াশলাই আছে? দেয়াশলাই থাকলে জ্বালান তো!

    দেয়াশলাই-এর কাঠি জ্বলেই নিভে গেল। ট্রেনের জানালা বন্ধ, তার পরও হু-হু করে বাতাস ঢুকছে। যাত্রীদের মধ্যে একজন (টর্চের মালিক) মঞ্জুমামাকে লক্ষ করে বলল, আপনেরা যাইবেন কই?

    মঞ্জু বলল, তা দিয়ে আপনার কী? আমাদের যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাবো।

    লীলা বলল, আমরা নয়াপাড়া যাব।

    কোন নয়াপাড়া? নান্দাইল নয়াপাড়া?

    হুঁ।

    এইখান থাইক্যা খুব কাছে। উত্তরে হাঁটা দিলে দশ মিনিটের রাস্তা। শিয়ালজানি খাল পার হইলেই…

    মঞ্জু বলল, এই যে বৃদ্ধ! চুপ করে থাকেন। বুদ্ধি দিবেন না। আপনার কথা শুনে ঝড়ের মধ্যে হাটা দেই। আর ডাকাতের হাতে পড়ি!

    একটা ভালো পরামর্শ দিলাম।

    আপনাকে পরামর্শ দিতে হবে না। মরা ব্যাটারিওয়ালা টর্চ নিয়ে যে রওনা হয়। আমি তার পরামর্শ নেই না।

    নান্দাইল রোড ইষ্টিশনে নামলে চার মাইল রাস্তা।

    চার মাইল কেন, চল্লিশ মাইল হলেও নান্দাইল রোডেই নামব। আপনি চুপ করে বসে থাকেন।

    জি আচ্ছা।

    আপনার যদি খুব বেশি ইচ্ছা করে আপনি নিজে নেমে হাঁটা দেন।

    ঝড় কমে এসেছে। এখন শুধু মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু ট্রেন নড়ছে না। মঞ্জু বলল, ব্যাপারটা কী?

    লীলা বলল, মামা টেনশন কোরো না তো! সময় হলেই ট্রেন ছাড়বে।

    মঞ্জু গলা নামিয়ে বলল, ড্রাইভার কাজটা ইচ্ছাকৃত করছে কি না কে জানে!

    ইচ্ছাকৃত করবে কেন?

    এদের যোগসাজস্য থাকে। বেকায়দা জায়গায় ট্রেন থামায়। আগে থেকে বোঝাপড়া থাকে। ডাকাত এসে সব সাফা করে দেয়।

    মামা, তুমি জানালাটা খুলে দাও। এসো বৃষ্টি দেখি।

    মঞ্জু বলল, বৃষ্টি দেখতে হবে না। যেভাবে বসে আছিস সেইভাবে বসে থাক। তুই রবি ঠাকুর না যে বৃষ্টি দেখতে হবে।

    বাতাস আবারো বাড়তে শুরু করেছে। কিছুক্ষণ পরপর দমকা হাওয়া। মঞ্জু হতাশ গলায় বলল— ধুনছে আমারে। ভালো বিপদে পড়লাম দেখি! ভাই, আপনাদের মধ্যে যাদের কাছে ছাতা আছে তাদের কেউ–একজন ড্রাইভারের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে আসেন না, ঘটনা। কী।

    আফনে নিজে যান।

    আমি যাব। কীভাবে? আমার সাথে মেয়েছেলে আছে দেখেন না? এইটা আপনাদের কীরকম বিবেচনা!

    এমন ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ড্রাইভারের কাছে কেউ খোঁজ নিতে যাবে বলে লীলা ভাবে নি। একজন সত্যি সত্যি রওনা হলো। সে খবর যা আনল তা ভয়াবহ–লাইনের উপর বিরাট একটা গাছ পড়ে আছে। লাইনের ফিস প্লেট উঠে গেছে। ময়মনসিংহ থেকে রেসকিউ ট্রেন না। আসা পর্যন্ত এই ট্রেন নড়বে না।

    কামরার ভেতর গাঢ় অন্ধকার। এক-একবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে— আলো ঝলমল করে উঠছে, সঙ্গে সঙ্গে লীলা দু’হাতে কান চেপে ধরছে। বজ্রপাতের শব্দ তার সহ্য হয় না। প্রচণ্ড ভয় লাগে। লীলার মনে হলো, আল্লাহ ভালো ব্যবস্থা করেছেন— প্রথমে আলোর সংকেত পাঠাচ্ছেন, তারপর পাঠাচ্ছেন বজের শব্দ। উল্টোটা হলে লীলার জন্যে খুব সমস্যা হতো। ঝড়বৃষ্টির সময় সারাক্ষণ দুহাতে কান চেপে ধরে রাখতে হতো।

    ভইন, আপনে নয়াপাড়া কার বাড়িতে যাইবেন?

    প্রশ্নটা কে করেছে। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। লীলার ধারণা হলো টর্চওয়ালা বুড়ো। লীলা বলল, সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের বাড়িতে যাব।

    উনি আপনের কে হয়?

    আমার বাবা। উনাকে চেনেন?

    উনারে চিনব না। আপনে কী কন? উনি অঞ্চলের বিশিষ্ট ভদ্ৰলোক। অতি বিশিষ্ট ভদ্রলোক। আপনেরে যেটা বললাম সেটা করেন— ঝড়বৃষ্টি থামলে উত্তরমুখী হাঁটা দেন। পাঁচ মিনিটের রাস্তা।

    আচ্ছা আমরা তা-ই করব।

    মঞ্জু বিরক্ত হয়ে বলল, হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিবি না লীলা। হুটহাট সিদ্ধান্ত আমার ভালো লাগে না। এই বুড়ো প্ৰথমবার বলেছে দশ মিনিটের রাস্তা, এখন বলছে পাঁচ মিনিট। এই বুড়ো খবরদার, তুমি আর মুখ নাড়বে না।

    লীলা উত্তর দিল না। বেঞ্চে পা উঠিয়ে আরাম করে বসল। হুটহাট সিদ্ধান্ত অন্যের ভালো না লাগলেও তার ভালো লাগে। বাবাকে দেখতে আসার এই সিদ্ধান্তও হুট করে নেয়া। সিদ্দিকুর রহমান নামের মানুষটা ভয়ঙ্কর খারাপ— এই কথা জ্ঞান হবার পর থেকেই সে শুনে আসছে। এই মানুষটা তার প্রথম স্ত্রীকে ত্যাগ করেছে। অসহায় সেই মেয়ে মনের দুঃখে মরেই গেল। লোকটা কোনোদিন খোঁজ নিল না। সেই মেয়েটার ফুটফুটে একটা কন্যাসন্তান একা এক বড় হচ্ছে মামার বাড়িতে। তার খোজেও কোনোদিন এলো না। লোকটা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। দুঃখকষ্টে সেই স্ত্রীরও মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাকে চিকিৎসাও করাচ্ছে না। ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখছে। এমন একজন মানুষকে হঠাৎ দেখতে আসার পেছনে কোনো কারণ নেই। লীলা তাকে দেখে কী বলবো? বাবা বলে বুকে ঝাপিয়ে পড়বে? এমন হাস্যকর কাজ সে কোনোদিনও করবে না। তবে কী করবে তাও জানে না। আবার বিদ্যুৎ চমকাল। লীলা দু’হাতে কান চেপে বসে আছে। বজ্রপাতের প্রতীক্ষা।

    সিদ্দিকুর রহমান খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তাঁর হাতে পাঁচ-ব্যাটারির একটা টর্চ। টর্চ জ্বালালে আলো বহুদূর পর্যন্ত যায়। মাঝে মাঝে তিনি জানালার ওপাশের জামগাছে আলো ফেলছেন। ঝড় যেভাবে বাড়ছে জামগাছের ডাল ভেঙে টিনের চালে পড়বে। তবে আতঙ্কিত হবার মতো কিছু না। গাছের ডাল জানান দিয়ে ভাঙবে–বেশ কিছু সময় ধরে মড়মড় শব্দ হবে। ঘর ছেড়ে বের হবার সময় পাওয়া যাবে। সিদ্দিকুর রহমান ভয় পাচ্ছেন না। একধরনের উত্তেজনা অনুভব করছেন। তিনি এতক্ষণ পা মেলে বসে ছিলেন, এইবার পা গুটিয়ে বসলেন। চাপা গলায় ডাকলেন, লোকমান!

    ডেকেছেন একজনকে, কিন্তু দুই ভাই একসঙ্গে সাড়া দিল। দুজনই চেঁচিয়ে বলল, জি। মনে হয় তারা ডাকের জন্যে অপেক্ষা করছিল। সিদ্দিকুর রহমান শান্ত গলায় বললেন, ঝড়ের গতি কেমন?

    এইবার লোকমান জবাব দিল। ভীত গলায় বলল, গতিক ভালো না। টিনের বাড়িতে থাকা নিরাপদ না। চলেন পাকা দালানে যাই। শহরবাড়িতে গিয়া উঠি।

    ভয় লাগতেছে?

    লোকমান জবাব দিল না। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, ভয়ের কিছু নাই। কপালে মৃত্যু থাকলে মৃত্যু হবে। পাকা দালানে থাকলেও হবে, আবার মাটির ভিতরে পঞ্চাশ হাত গর্ত খুঁড়ে বসে থাকলেও হবে। ঠিক না লোকমান?

    জি ঠিক।

    গোয়ালঘরের গরুগুলির দড়ি খুলে দাও।

    জি আচ্ছা।

    সুলেমানকে বলে হুক্কা ঠিক করে দিতে। ঝড়-তুফানের রাতে হুঙ্কা টানতে আরাম।

    সিদ্দিকুর রহমান হুক্কার জন্যে অপেক্ষা করছেন। হুক্কা আসতে সময় লাগবে। হুঙ্কায় পানি ভরতে হবে। টিক্কায় আগুন দিতে হবে। অপেক্ষা করতে কোনো অসুবিধা নেই। চুপচাপ অপেক্ষা করার চেয়ে কারো সঙ্গে গল্প করতে করতে অপেক্ষা করা সহজ। তার গল্প করার লোক নেই। তিনি যাদের সঙ্গে সব সময় ঘোরাফেরা করেন। তারা হ্যাঁ-নার বাইরে কোনো কথা বলে না। নিজের ছেলেমেয়েরাই বলে না। রমিলা সুস্থ থাকলে সে হয়তো কিছু গল্পটল্প করত। সিদ্দিকুর রহমান ভুরু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করলেন, রমিলা যখন সুস্থ ছিল তার সঙ্গে গল্প করেছে কিনা। তেমন কিছু মনে পড়ছে না। হয়তো রমিলাও গল্প করত না।

    লোকমান গোয়ালঘরের গরুগুলি ছেড়ে দিয়ে ফিরে এসেছে, চাপা গলায় কেশে সে তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে।

    লোকমান!

    জি।

    ভিতরে আসো।

    লোকমান ঘরে ঢুকল। সে ভিজে চুপসে গেছে। তার গা বেয়ে পানি পড়ছে। সে অল্প অল্প কঁপিছে। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, বৃষ্টির পানি কি বেশি ঠাণ্ডা?

    জি, অত্যধিক ঠাণ্ডা।

    এটা খারাপ লক্ষণ, ঝড় আরো বাড়বে। বড় ঝড়ের আগে বৃষ্টির পানি অত্যধিক ঠাণ্ডা হয়।

    গোয়ালঘরের গরুগুলি ছেড়ে দিয়েছ?

    জি।

    গরুগুলি কী করল? ঘরেই আছে, না ছুটে বের হয়ে গেছে?

    বাইর হইয়া গেছে।

    এটাও খারাপ লক্ষণ। পশুপাখিরা গতিক সবচে ভালো বোঝে। বাড়ের সময় গরুর গলার দড়ি খোলার পরেও সে যদি নড়াচড়া না করে তাহলে বুঝতে হবে ঝড় তেমন জোরালো হবে না। আবার যদি দড়ি খোলামাত্র ছুটে বের হয়ে যায় তাহলে মহাবিপদ।

    সুলেমান হুক্কা নিয়ে এসেছে। সিদ্দিকুর রহমান নল হাতে নিয়ে আস্তে টান দিলেন। তামাকটা ভালো। অতি সুঘ্ৰাণ।

    লোকমান এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সিদ্দিকুর রহমান তাকে চলে যেতে না বলা পর্যন্ত সে যাবে না। তিনি কিছু বললেন না। একমনে তামাক টেনে যেতে লাগলেন। ঘরের টিনের চালে প্ৰচণ্ড শব্দ হচ্ছে। পেরেক উঠে গেছে বলে মনে হচ্ছে। বাতাস বড় একটা ধাক্কা দেবে। আর চাল উড়ে যাবে। খাটে বসে থেকে তিনি মাথার উপর ঝড়ের আকাশ দেখতে পাবেন।

    লোকমান!

    জি।

    বোবাপ্ৰাণী ছাড়াও আরো এক কিসিমের মানুষ আছে যারা ঝড়-তুফানের গতিক বুঝতে পারে। তারা কারা বলো দেখি?

    জানি না।

    পাগল মানুষ বুঝতে পারে। ঝড়-তুফান ভূমিকম্প এইসবের খবর পাগলের কাছেও আছে। তোমার চাচিআম্মারে যদি জিজ্ঞেস করো সে বলতে পারবে। পাগল হওয়ার কিছু উপকারিতাও আছে, ঠিক না লোকমান?

    লোকমান কিছু বলল না। মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। তার বুক এখন ধড়ফড় করা শুরু করেছে। চাচাজি অনেকক্ষণ তাকে সামনে দাড় করিয়ে রেখেছেন। এই কাজটা তিনি যখনই করেন তখন বুঝতে হয়। চাচাজি নাখোশ হয়েছেন। সিদ্দিকুর রহমান হুক্কায় লম্বা টান দিয়ে নল একপাশে রেখে খাটে পা বুলিয়ে বসলেন। তাঁর গলার স্বর হঠাৎ বদলে গেল। ভারী হয়ে গেল। তিনি বললেন–আজকে ঝড়-তুফানের রাত। আমার বড় ছেলে মাসুদ বাড়িতে নাই। সে কোথায় গেছে তুমি জানো?

    জানি।

    কোথায় গেছে?

    কুদ্দুস মিয়ার বাড়িতে।

    সেখানে সে কী করে?

    মাসুদ ভাইজানের গানবাজনার শখ। ঐখানে গানবাজনা করেন।

    তাহলে এই ঘটনা আজ প্রথম না। আগেও সে গিয়েছে। ঐ বাড়িতে রাত কাটিয়েছে।

    জি।

    তোমরা দুই ভাই এই ঘটনা জানতা, আমারে কিছু বলো নাই।

    লোকমান জবাব দিল না। চুপ করে রইল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কুদ্দুস মিয়ার কি কোনো সেয়ানা মেয়ে আছে?

    জি আছে।

    মেয়ের নাম কী?

    পরী। পরীবানু।

    সিদ্দিকুর রহমান হুক্কার নিলে কয়েকটা টান দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, এখন ঘটনা বোঝা গেল। আমার ছেলে গানবাজনার অজুহাতে সেয়ানা মেয়ের গায়ের গন্ধ শুঁকতে যায়। একটা বয়সের পরে সেয়ানা মেয়ের গায়ের গন্ধের জন্যে যুবক ছেলেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা জগতের নিয়ম। তবে সব নিয়ম সব জায়গায় চলে না। লোকমান শোনো, তোমারে একটা কাজ দিতেছি— ঝড় কমলে কুদ্দুস মিয়ার বাড়িতে যাবে। তাকে আর তার মেয়ে পরীবানুকে নিয়ে আসবে।

    জি আচ্ছা।

    আর আমার পুত্ৰকেও ধরে নিয়ে আসবে। গানবাজনা কী শিখছে তার একটা পরীক্ষা হবে।

    জি আচ্ছা।

    এখন সামনে থেকে যাও।

    লোকমান হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দ্রুত ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেল।

    সিদ্দিকুর রহমান খাট থেকে নামলেন। আলমিরা খুলে রমিলার ঘরের চাবি বের করলেন। তিনি খানিকটা লজ্জা পাচ্ছেন। গোয়ালঘরের গরগুলির কথা তার মনে হয়েছে। কিন্তু পাগলাস্ত্রীর কথা মনে হয় নাই। যখন গরুর গলার দড়ি খোলা হয়েছে তখন রমিলার ঘরের চাবিও খোলা উচিত ছিল।

    রমিলা ঘরের এক কোনায় জড়সড় হয়ে বসেছিল। তালা খুলে সিদ্দিকুর রহমান ঢুকতেই সে উঠে দাঁড়াল। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথায় ঘোমটা দিল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কেমন আছ গো বউ?

    রমিলা নিচু গলায় বলল, ভালো আছি।

    বিরাট ঝড়-তুফান শুরু হয়েছে। ভয় পাইছিলা?

    হুঁ।

    ডাক দিলা না কেন?

    রমিলা জবাব দিল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, চলো পাকা ঘরে যাই। টিনের এই ঘরের অবস্থা ভালো না। যে-কোনো সময় চাল উড়ে যাবে।

    আমি এইখানেই থাকব।

    এইখানে থাকবা?

    জি।

    কেন?

    এই ঘর ছাইড়া কোনোখানে যাইতে আমার ভালো লাগে না।

    ভালো লাগালাগির কিছু তো নাই বউ। ঝড়-তুফানের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়।

    ঝড়-তুফান শেষ হয়েছে। আর হবে না।

    আর হবে না?

    না।

    সিদ্দিকুর রহমান কান পাতালেন। আসলেই তো তাই, শো শো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। শুধুই বৃষ্টির শব্দ। রমিলা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছে। পাগল মানুষের হাসি-কান্না কোনো ব্যাপার নয়। পাগলমানুষ কারণ ছাড়াই হাসে। কারণ ছাড়াই কাদে। তবু সিদ্দুিকুর রহমান অভ্যাসবশে জিজ্ঞেস করলেন, হাসো কেন বউ?

    রমিলা হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, বাড়িতে কুটুম আসতেছে। আমার মনে আনন্দ, এইজন্যে হাসতাছি।

    কুটুমটা কে?

    সেটা আপনেরে বলব না।

    রমিলা এখনো হাসছে। সিদ্দিকুর রহমান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন।

    খাড়াইয়া আছেন ক্যান?

    সিদ্দিকুর রহমান রমিলাকে তালাবন্ধ করে চলে এলেন। রমিলা ঠিক আগের জায়গায় গুটিসুটি মেরে বসে গেল। এখন সে আর হাসছে না।

    রাত চারটা বাজে। ফজরের আজানের বেশি দেরি নেই। এখন ঘুমোতে যাবার অর্থ হয় না। সিদ্দিকুর রহমান ঠিক করলেন, অজু করে বারান্দায় বসে ভোরের প্রতীক্ষা করবেন। ফজরের নামাজের পর তুফানে গ্রামের কী ক্ষয়ক্ষতি হলো তা দেখতে বের হবেন। ইতিমধ্যে মাসুদ চলে আসবে। তার বিষয়ে ব্যবস্থা কী নেয়া যায় সেটাও ভাবা দরকার।

    সিদ্দিকুর রহমান বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন। তার পাশেই সুলেমান অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তুফান কি কমেছে?

    সুলেমান বলল, জি।

    মাঝে মাঝে বড় রকমের ঝড়-তুফান হওয়া ভালো। বন্যার সময় কী হয় দ্যাখো— জমিতে পলি পড়ে, ফসল ভালো হয়। ঝড়-তুফানেরও সেরকম উপকার আছে।

    সুলেমান কিছু বলল না। যেভাবে বসে ছিল সেইভাবেই বসে রইল। সিদ্দিকুর রহমান ভেবেছিলেন সুলেমান বলবে, ঝড়-তুফানের কী উপকার আছে? তখন তিনি উপকার ব্যাখ্যা করবেন। সুলেমান কিছু জানতে চাইল না বলে তাঁরও বলা হলো না। অবিশ্যি ঝড়-তুফানের কী উপকার তিনি জানেন না। ভেবে বের করতে হতো। জটিল জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে তার ভালো লাগে। নানান কাজ-কর্মে তিনি ব্যস্ত থাকেন। চিন্তার সময় পাওয়া যায় না। দিনের কিছুটা সময় যদি আলাদা করে রাখা যেত তাহলে ভালো হতো। এই সময় তিনি চিন্তা করবেন। আর কিছু করবেন না।

    সুলেমান!

    জি?

    চা চানাও, চা খাব।

    জি আচ্ছা।

    একটা পাতলা চাদর এনে আমার গায়ে দিয়ে দাও, শীত–শীত লাগছে।

    জি আচ্ছা।

    চা বানিয়ে আনার পর যদি দেখ আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তাহলে আমাকে ডাকবে না।

    জি আচ্ছা।

    লোকমােন কি মাসুদকে আনতে গেছে?

    জি।

    পাখি কিচিরমিচির করতেছে, শুনতেছ?

    জি।

    তুফান শেষ হয়েছে এইজন্যে এরা আনন্দ করতেছে। এ তার গায়ে ঠোকর মারতেছে। পশুপাখিরা মারামারি কামড়াকামড়ি করে আনন্দ প্রকাশ করে। পশুপাখির জগতের নিয়মকানুন বড়ই অদ্ভুত। সুলেমান শোনো, আমার গায়ে চাদর দেয়ার দরকার নাই। শীত-শীত ভাবটা ভালো লাগতেছে।

    জি আচ্ছা।

    সুলেমান চা বানিয়ে এনে দেখে, সিদ্দিকুর রহমান ঘুমোচ্ছেন। ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে। সে চায়ের কাপ পাশে রেখে আগের ভঙ্গিতেই বসেই পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান পড়ল। সুলেমান ভেবে পেল না। সে এখন কী করবে। চাচাজিকে ডেকে তুলবে? তিনি বলেছিলেন তার ঘুম যেন ভাঙানো না হয়। সুলেমান খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

    সিদ্দিকুর রহমানের ঘুম ভাঙল ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পর। তিনি চোখ মেলে দেখলেন অসম্ভব রূপবতী অপরিচিত একটি তরুণী তার দিকে তাকিয়ে আছে। তরুণীর মুখ হাসিহাসি। চোখে বিস্ময়। তাকে চোখ মেলতে দেখেই তরুণী তার দিকে ঝুঁকে এসে বলল— বাবা, আমি লীলা। লীলাবতী। আপনার কি শরীর খারাপ?

    সিদ্দিকুর রহমান জবাব দিলেন না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। লীলাবতী অসঙ্কোচে তার বুকের উপর হাত রাখল। সিদ্দিকুর রহমানের দুই চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল। কতদিন পর নিজের মেয়েকে দেখছেন। কী সুন্দর মেয়ে! তাকে অবিকল দেখাচ্ছে কিশোরী আয়নার মতো। আবার সে আয়নাও না, অন্য কেউ। মেয়েকে কিছু বলা দরকার। কোনো কথা মনে আসছে না। আহারে! মেয়েটা খবর দিয়ে কেন এলো না! খবর দিয়ে এলে তিনি সুসং দুর্গাপুর থেকে ভাড়া করে হাতি আনতেন। স্টেশন থেকে মেয়ে আসত হাতিতে চড়ে। সঙ্গে থাকত বাদ্যবাজনা। আহারে! মেয়েটা কেন আগে খবর দিল না?

    আচ্ছা এটা কি সম্ভব যে পুরো ব্যাপারটাই স্বপ্নে ঘটছে? কেউ তাঁর কাছে আসে নি। তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুমের মধ্যেই ইচ্ছাপূরণ জাতীয় একটি স্বপ্ন দেখছেন। আগেও এরকম হয়েছে। দুপুরবেলা ঘুমুচ্ছিলেন— স্বপ্নে দেখলেন, আয়না এসেছে। সে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল, জ্বর কি বেশি? তিনি বললেন, হু, কপালে হাত দিয়ে দেখো। আয়না বলল, কপালে হাত দিতে পারব না। আমি হলুদ বেটেছি, হাতে হলুদ। তারপরেও আয়না। কপালে হাত দিল। তিনি নাকে কাঁচা হলুদের গন্ধ পেলেন। তার ঘুম ভেঙে গেল। কপালে হলুদের গন্ধ কিন্তু চলে গেল না। সেই গন্ধ সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকল।

    লীলা কি সত্যি এসেছে? সত্যি কি মেয়েটা তার বুকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে? সে তার মায়ের মতো কপালে হাত রাখল না কেন?

    সিদ্দিকুর রহমান বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন, তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তাদের ঘিরে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে কোনো রকম মানসিক দুর্বলতা প্রকাশ করা ঠিক না। তিনি অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ, গলায় বললেন, পরিশ্রম করে এসেছি। ভিতরের বাড়িতে যাও, হাত-মুখ ধোও।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅনিল বাগচির একদিন – হুমায়ূন আহমেদ
    Next Article শঙ্খনীল কারাগার – হুমায়ূন আহমেদ

    Related Articles

    হুমায়ূন আহমেদ

    বোতল ভূত – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    রং পেন্সিল – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    বিবিধ / অগ্রন্থিত লেখা – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    আজ হিমুর বিয়ে – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    কৃষ্ণপক্ষ – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }