Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    লে মিজারেবল – ভিক্টর হুগো

    ভিক্টর হুগো এক পাতা গল্প1486 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ২.৭ পেতিত পিকপাসের কনভেন্টে

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    ১.

    পেতিত পিকপাসের এই কনভেন্টেই ঘটনাক্রমে এসে পড়ে জাঁ ভলজাঁ। ফশেলেভেন্ত তাকে বলে, সে যেন আকাশ থেকে পড়েছে সহসা।

    কসেত্তেকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ভলজাঁ ফশেলেভেন্তের সঙ্গে জ্বলন্ত আগুনের ধারে বসে তার খাওয়া সেরে নেয়। ঘরের মধ্যে দ্বিতীয় কোনও বিছানা না থাকায় মেঝের উপর খড় বিছিয়ে তার উপর শুয়ে পড়ে ভলজাঁ। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে বলে, আমাকে এখানেই থাকতে হবে। কথাগুলো ফশেলেভেন্তের মনটাকে দারুণ ভাবিয়ে তোলে সে-রাতে।

    সে-রাতে তাদের দুজনের কেউই ঘুমোতে পারেনি। ভলজাঁ বুঝতে পারে জেতার্ত তাকে খুঁজছে তখনও, ফলে শহরের কোথাও কোনওখানে সে কসেত্তেকে নিয়ে নিরাপদে লুকিয়ে থাকতে পারবে না। সে বুঝতে পারে এই বাগানবাড়িটা একই সঙ্গে খুবই বিপজ্জনক এবং খুবই নিরাপদ। বিপজ্জনক এইজন্য যে এখানে কেউ আসে না, এবং এখানে কেউ যদি এসে দেখে ফেলে তাকে তা হলে সে ধরা পড়ে যাবে এবং তাতে জেলে যেতেই হবে। আর নিরাপদ এইজন্য যে এখানে কে তাকে খুঁজতে আসবে?

    দারুণ চিন্তায় ফশেলেভেন্তের মাথাটা পীড়িত হচ্ছিল। তার তখন শুধু এই কথাই মনে হচ্ছিল যে সমস্ত ব্যাপারটাই তার বুদ্ধির অতীত। সে কোনওমতেই বুঝে উঠতে পারছিল না মঁসিয়ে ম্যাদলেন কী করে এত বড় বিরাট উঁচু পাঁচিল ডিঙিয়ে একটা বাচ্চা মেয়েকে সঙ্গে করে এখানে এল? এই মেয়েটাই-বা কে? কোথা থেকে এল তারা? এই কনভেন্টে কাজ নিয়ে আসার পর থেকে ফশেলেভেন্ত মন্ত্রিউল-সুর-মের-এর কোনও খবরই পায়নি। এবং এর মধ্যে কী ঘটেছে না ঘটেছে তারা কিছুই জানে না। বর্তমানে পিয়ের ম্যালেনের যা অবস্থা তাতে তাকে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করা যায় না। সেন্টকে কেউ কখনও কোনও প্রশ্ন করে না। কিন্তু তার মনে ম্যাদলেনের মহত্ত্ব ম্লান হল না বিন্দুমাত্র। ম্যালেনের এই শোচনীয় অবস্থা দেখে তার শুধু এই কথাই মনে হল যে ম্যাদলেন হয়তো হঠাৎ ব্যবসায় বিশেষভাবে ক্ষগ্রিস্ত হয়ে পড়ে পাওনাদারদের জ্বালায় লুকিয়ে বেড়াচ্ছে অথবা হয়তো কোনও রাজনৈতিক কারণে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কারণটা যদি রাজনৈতিক হয় তা হলে তাতে অবশ্যই খুশি ফশেলেভেন্ত, কারণ উত্তরাঞ্চলের চাষিদের মতো সে-ও মনেপ্রাণে বোনাপার্টপন্থী। এই কনভেন্টটাকে এক নিরাপদ আশ্রয় ভেবে ম্যাদলেন যদি এখানে লুকিয়ে থাকতে চায় তা হলে সে সেটা বুঝতে পারে। কিন্তু এই শিশুটি কোথা হতে এল এবং কেনই-বা সে এখানে থাকবে তা সে কোনওক্রমেই বুঝতে পারল না। শিশুটার। ব্যাপার রহস্যময় রয়ে গেল তার কাছে, মনে মনে এই দুর্বোধ্য রহস্যের সন্ধান করতে করতে তার মধ্যে ডুবে গেল সে। বিভিন্ন অনুমান আর কল্পনার কাঁটাজালে জড়িয়ে পড়ল। তবে অনেক ভাবনা-চিন্তা করে একা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হল সে। আজ না-ই হোক, মেয়র মঁসিয়ে ম্যাদলেন একদিন তার জীবন রক্ষা করেছে, মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচিয়েছে। সেদিন তিনি বৃথা সময় নষ্ট না করে সেই গাড়িটার তলায় ঢুকে পড়ে আমাকে উদ্ধার করেন। আজ তিনি যে কারণেই হোক আমার সাহায্যপ্রার্থী। আজ তিনি যদি চোর বা খুনিও হন তা হলেও তাকে আমি বাঁচাব। কারণ তিনি সাধু প্রকৃতির লোক।

    আরও দেখুন
    বইয়ের
    বাংলা ই-বই
    অনলাইন বই
    Library
    সেবা প্রকাশনীর বই
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বাংলা ই-বুক রিডার
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বাংলা লাইব্রেরী

    কিন্তু কী করে তিনি কনভেন্টে থাকবেন? এখানে তো কোনও পুরুষ আসতে বা থাকতে পারে না। কিন্তু সমস্যা যত অলঙ্ঘনীয়ই হোক না কেন, একেবারে দমে গেল না ফশেলেভেন্ত। পিকার্দি অঞ্চলের সে একজন সামান্য চাষি। ভক্তি, সরলতা, শুভেচ্ছা আর কৃষকসুলভ এক চাতুর্য ছাড়া আর কোনও সম্বল নেই তার। সেই চাতুর্য প্রয়োগ করে। কনভেন্টের কড়া নিয়ম-কানুনের সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তার জীবনদাতাকে সাহায্য করার উদার প্রবৃত্তিটিকে রক্ষা করে চলার এক দৃঢ় সংকল্প করে বসল সে মনে মনে। ফশেলেভেস্ত তার সারা জীবন ধরে আপন স্বার্থের সেবা করে এসেছে। সে ছিল পুরোপুরি আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু আজ সে বার্ধক্যে উপনীত, সে দুর্বল, পঙ্গু। জীবনে আজ আর আগের মতো আগ্রহ নেই। আজ তার কৃতজ্ঞতাবোধকে পরিতৃপ্ত করতে পারার এক। বিরল আনন্দ অনুভব করছে সে। জীবনে আজ প্রথম একটা ভালো কাজ করতে পারার সে সুযোগ পেয়েছে, সে সুযোগকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় সে। কোনও মুমূর্ষ ব্যক্তি অনাস্বাদিতপূর্ব একপাত্র ভালো মদ পেয়ে যেমন পুলকের এক রোমাঞ্চ অনুভব করে, ফশেলেভেন্তেরও আজ সেই অবস্থা হল। তাছাড়া কয়েক বছর কনভেন্টের এই ধর্মীয় আবহাওয়ায় কাটানোর ফলে তার চরিত্রটা বদলে যায়। কোনও না কোনও একটা পুণ্যের কাজ করার আগ্রহ ক্রমশ প্রবল এবং অদম্য হয়ে ওঠে তার মনে।

    আরও দেখুন
    অনলাইন বুক
    বাংলা উপন্যাস
    অনলাইন বই
    বাংলা টাইপিং সফটওয়্যার
    বাংলা ই-বুক রিডার
    বাংলা কমিকস
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বাংলা সাহিত্য কোর্স
    উপন্যাস সংগ্রহ
    বাংলা বইয়ের সাবস্ক্রিপশন

    ফশেলেভেন্ত তাই ম্যাদলেনকে রক্ষা করার জন্য দৃঢ়সংকল্প হয়ে উঠল। তাকে আমরা পিকার্দি অঞ্চলের এক সামান্য চাষি বলে অভিহিত করেছি। কিন্তু এটা তার আংশিক পরিচয়, সম্পূর্ণ নয়। আমরা যদি পিয়ের ফশেলেভেন্তের জীবনটাকে আরও ভালো করে পর্যালোচনা করে দেখি তা হলে দেখতে পাব সে চাষি হলেও মুহুরিগিরি এবং দলিল নকলের কাজ করত। এই কাজ করতে গিয়ে তার চাতুর্য এবং আইনের জ্ঞান বেড়ে যায়। তার স্বভাবসিদ্ধ সরলতার মাঝে এক দৃঢ়তা আসে। বিভিন্ন কারণে তার মুহুরিগিরি কাজ ভালো না চলায় সে গাড়িচালকের কাজে নামে। গাড়িভাড়া খাটার কাজ ছাড়াও মাঝে মাঝে দিনমজুরের কাজ করত। গাড়িচালনা এবং ঘোড়াচালনার কাজ সে করলেও তার মনে সেই মুহুরিগিরির দক্ষতা এবং চাতুর্যের কিছুটা রয়ে গিয়েছিল। তার বুদ্ধিবৃত্তি বেশ উন্নত ছিল এবং তার কথাবার্তা অন্য চাষিদের মতো অমার্জিত ছিল না। সে অনেক সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করত যা সাধারণত গ্রামবাসীরা করে না। গাঁয়ের লোকেরা তাই তার সম্বন্ধে বলত, ও ভদ্রলোকের মতো কথা বলে। মোট কথা, ফশেলেভেন্ত ছিল একাধারে গ্রাম্য ও শহুরে। সমাজের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার না পেলেও গ্রাম্য এবং নাগরিকতার মিশ্র উপাদানে গড়া ফশেলেভেন্তের চরিত্রের মধ্যে এমন কতকগুলি গুণ ছিল যা তাকে খারাপ হতে বা নিচে নেমে যেতে দেয়নি কোনও দিন। তার মধ্যে দোষ-ত্রুটি কিছু থাকলেও সেগুলো ছিল তার চরিত্রের বহিরঙ্গের ব্যাপার, তার গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। তার কপালে কুঞ্চিত রেখার মধ্যে কোনও হিংসা বা নির্বুদ্ধিতার ছাপ ছিল না।

    আরও দেখুন
    বাংলা কমিকস
    বিনামূল্যে বই
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    অনলাইন বই
    বাংলা টাইপিং সফটওয়্যার
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    গ্রন্থাগার সেবা
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বই
    বাংলা শিশু সাহিত্য

    অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সকাল হতেই চোখ খুলে দেখল পিয়ের ফশেলেভেন্ত, মঁসিয়ে ম্যাদলেন তার খড়ের বিছানার উপর বসে ঘুমন্ত কসেত্তে’র পানে তাকিয়ে আছে।

    ফশেলেভেন্ত তার বিছানার উপর উঠে বসে বলল, এই যে আপনি উঠেছেন। এখন এখানে কিভাবে আপনার থাকার ব্যবস্থা করি বলুন তো।

    এ প্রশ্নে চমক ভাঙল জাঁ ভলজাঁ’র। সে সজাগ ও সচেতন হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করতে লাগল ফশেলেভেন্তের সঙ্গে।

    ফশেলেভেন্ত বলল, কথাটা হল এই যে, আপনারা কেউ যেন এই কুঁড়েটার বাইরে এক পা-ও কোথাও যাবেন না। আপনাদের দু জনের কাউকে একবার দেখে ফেললে আর রক্ষা থাকবে না। আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে।

    ভলজাঁ বলল, তা বটে। কথাটা সত্যি।

    আরও দেখুন
    উপন্যাস সংগ্রহ
    অনলাইন গ্রন্থাগার
    গ্রন্থাগার সেবা
    বাংলা ক্যালিগ্রাফি কোর্স
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বাংলা অনুবাদ সাহিত্য
    বাংলা অডিওবুক
    অনলাইন বই
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বাংলা লাইব্রেরী

    ফশেলেভেন্ত বলল, বুঝলেন মঁসিয়ে ম্যাদলেন, আপনি যে সময়ে এখানে এসে পড়েছেন সেটা হয় খুব সুসময় অথবা খুব দুঃসময়। কনভেন্টের এক মহিলা এখন মৃত্যুশয্যায়, এখন অন্তিমকালীন যতসব আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম হচ্ছে। চল্লিশ ঘণ্টা ধরে প্রার্থনা চলছে। তাই এখানকার সবাই এখন এত ব্যস্ত আছে যে এদিকে কেউ তাকাবে না। একজন সেন্ট বিদায় নিচ্ছে পৃথিবী থেকে। একদিক দিয়ে আমরা সবাই সেন্ট। পার্থক্য এই যে আমরা থাকি সামান্য কুঁড়েঘরে। মৃত্যুর আগে ও পরে অনেক প্রার্থনা করতে হয়। এইভাবে আজকের দিনটা কেটে যাবে। কিন্তু কাল কী হবে বলতে পারি না।

    জাঁ ভলজাঁ বলল, যাই হোক, এই ঘরটা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে রয়েছে। তাছাড়া ঘরটা গাছে ঘেরা আছে। কনভেন্ট থেকে এ ঘরটা দেখতে পাওয়া যায় না নিশ্চয়।

    সন্ন্যাসিনী বা সিস্টাররা এদিকে আসে না ঠিক, কিন্তু স্কুলের মেয়েরা আসে।

    এমন সময় চার্চে একটা ঘণ্টাধ্বনি হতে তার কথাটা বাধা পেল। সে নিজের চুপ করে গিয়ে ভলজাঁকে ইশারায় চুপ করতে বলল। আবার একবার ঘণ্টা বাজল।

    আরও দেখুন
    বইয়ের
    ই-বই ডাউনলোড
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    অনলাইন বুক
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    গ্রন্থাগার
    Books
    PDF
    বাংলা বইয়ের সাবস্ক্রিপশন
    অনলাইন বই

    ফশেলেভেন্ত বলল, মহিলাটি মারা গেছে। এটা হচ্ছে মৃত্যুকালীন ঘণ্টাধ্বনি। গির্জা থেকে মৃতদেহ বার করে নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে এক মিনিট পর

    পর এইভাবে ঘণ্টা বেজে চলবে। স্কুলের মেয়েরা বাগানে খেলা করে। একটা বল। কোনও রকমে এদিকে আসার অপেক্ষা। তা হলে ওরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসবে এদিকে। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখবে। এদিকে ওদের আসা নিষিদ্ধ হলেও ওরা তা মানে না। ওরা তো শিশু।

    ভলজাঁ প্রশ্ন করল, কোন শিশুরা?

    ফশেলেভেন্ত বলে যেতে লাগল, ওরা অল্প সময়ের মধ্যে আপনাকে দেখে ফেলবে। তার পর সব মেয়েগুলো একবাক্যে চিৎকার করে উঠবে, একটা লোক রয়েছে, লোক রয়েছে। তবে আজ আর সে বিপদ নেই। কারণ আজ সব খেলাধুলা নিষিদ্ধ। আজ শুধু সারাদিন প্রার্থনা। ওই দেখুন। আবার ঘণ্টা বাজছে। আমি যা বলেছিলাম অর্থাৎ মিনিটে মিনিটে ঘণ্টা বেজে চলেছে।

    আরও দেখুন
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    সাহিত্য পত্রিকা
    বইয়ের
    PDF
    বাংলা সাহিত্য
    পিডিএফ
    বাংলা গল্প
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বাংলা লাইব্রেরী
    বাংলা ই-বই

    ভলজাঁ বলল, এবার বুঝেছি। এখানে একটা বোর্ডিং স্কুল আছে।

    হঠাৎ একটা কথা মনে এসে গেল তার। এখানকার স্কুলে কসেত্তে লেখাপড়া শিখতে পারে তো।

    ফশেলেভেন্ত বলল, প্রায় একডজন বাচ্চা মেয়ে আছে। তারা শুধু চেঁচামেচি করতে করতে ছুটে বেড়ায়। এখানে কোনও পুরুষমানুষ যেন প্লেগ রোগের জীবাণু। এই কারণেই আমার পায়ে একটা ঘন্টা বাধা আছে। যেন আমি একটা বন্য জন্তু।

    জাঁ ভলজাঁ আবার চিন্তার গভীরে ডুবে গেল। সে ভাবল হয়তো কনভেন্টই তাদের মুক্তির উপায় হয়ে উঠবে।

    সে বলল, এখন এখানে থাকাটাই হল সমস্যা।

    ফশেলেভেন্ত বলল, না, সমস্যাটা হল বেরিয়ে যাওয়াটা।

    চমকে উঠল ভলজাঁ, বেরিয়ে যাওয়া?

    আরও দেখুন
    অনলাইন গ্রন্থাগার
    বাংলা বই
    Library
    বইয়ের
    গ্রন্থাগার সেবা
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    বাংলা লাইব্রেরী
    উপন্যাস সংগ্রহ
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    বাংলা কমিকস

    হা মঁসিয়ে, বাইরে থেকে এখানে যারা আসে তারা দরজা দিয়ে আসে। কিন্তু আপনি সেভাবে আসেননি। আমি আপনাকে চিনি তাই। কিন্তু আমারই তো মনে হচ্ছিল আপনি আকাশ থেকে পড়েছেন।

    আবার একটা জোর ঘণ্টাধ্বনি হল।

    ফশেলেভেন্তু বলল, এই ঘণ্টাধ্বনির দ্বারা মাদারদের প্রার্থনায় যোগদান করার জন্য ডাকা হচ্ছে। কেউ মারা গেলে তারা দিনরাত প্রার্থনা করে। কিন্তু আপনি চলে যাচ্ছেন না কেন এখান থেকে? আমি অবশ্য প্রশ্ন করছি না। শুধু জানতে চাইছি আপনি কী করে ভেতরে ঢুকলেন?

    জাঁ ভলজাঁ’র মুখখানা মলিন হয়ে গেল। পুলিশপরিবৃত সেই ভয়ঙ্কর রাস্তায় ফিরে যাওয়ার কল্পনাটা সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে তুলঁল তার। এ যেন ব্যাঘ্ৰাকীর্ণ কোনও জঙ্গল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার সেই জঙ্গলে ফিরে যাওয়া। মনে মনে কল্পনা করতে লাগল সে, গোটা রাস্তাটা ভরে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ আর প্রহরী। সবাই তার কলার ধরার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে আর জেভার্ত তাদের নেতা।

    আরও দেখুন
    PDF
    বই পড়ুন
    বাংলা ফন্ট প্যাকেজ
    ই-বুক রিডার
    বাংলা ভাষা
    সাহিত্য পর্যালোচনা
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বাংলা উপন্যাস
    বাংলা টাইপিং সফটওয়্যার
    বাংলা ভাষা শিক্ষার অ্যাপ

    ভলজাঁ বলল, অসম্ভব। পিয়ের ফশেলেভেন্ত এই কথাই মনে করে যাক যে আমি আকাশ থেকে পড়েছি।

    ফশেলেভেন্ত বলল, হ্যাঁ, আমি তাই বিশ্বাস করতে রাজি আছি। আমাকে আর কিছু বলার দরকার নেই। ঈশ্বর হয়তো আমি যাতে একবার আপনাকে দেখতে পাই তার জন্য এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার একটা ঘন্টাধ্বনি হল। এ ঘণ্টার অর্থ হল মিউনিসিপ্যালিটিতে মৃত্যুর খবর দিয়ে পাঠানোর। খবর পেয়ে সেখান থেকে একজন ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে দেখবে মৃত্যুর খবর ঠিক কি না। বাইরে থেকে ডাক্তার আসার ব্যাপারটা এখানকার কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু এবার খুব তাড়াতাড়ি লোক পাঠাচ্ছে কেন? কিছু একটা নিশ্চয় ঘটেছে। আপনার এই বাচ্চা মেয়েটা এখনও ঘুমোচ্ছে। ওর নাম কী?

    কসেত্তে।

    এ কি আপনার মেয়ে? অবশ্য এ আপনার নাতনিও হতে পারে।

    হ্যাঁ তাই।

    আরও দেখুন
    বাংলা কমিকস
    উপন্যাস সংগ্রহ
    বাংলা ই-বুক রিডার
    বাংলা ই-বই
    সাহিত্য পর্যালোচনা
    Library
    বাংলা বই
    বাংলা কুইজ গেম
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    অনলাইন বুক

    মেয়েটাকে এখান থেকে বার করে নিয়ে যেতে কোনও কষ্ট হবে না। উঠোনের দিকে বাইরে যাবার একটা দরজা আছে। আমি তাতে করাঘাত করলেই দারোয়ান সেটা খুলে দেয়। আমি বাগানের মালী, কুঁড়ি কাঁধে বেরিয়ে যাব আর ও ঝুড়ির মধ্যে চুপ করে বসে। থাকবে। আমি ওকে আমার এক পুরনো বান্ধবীর কাছে রেখে আসব। র‍্যু দু শেমিন ভার্তে সেই বুড়িটার একটা ফলের দোকান আছে। বুড়িটা অবশ্য কানে কালা এবং আমাকে চিৎকার করে বলতে হবে মেয়েটি আমার ভাইঝি। কাল পর্যন্ত ওকে এখানে রাখতে হবে তোমার কাছে। তার পর ও না হয় তো আপনার সঙ্গে আবার কাল এখানে আসবে। আপনার এখানে আসার কোনও একটা উপায় আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে। কিন্তু এখান থেকে বার হবেন কী করে?

    জাঁ ভলজাঁ মাথা নেড়ে বলল, শোন পিয়ের ফশেলেভেন্ত, আমাকে কেউ যেন দেখতে না পায়। সেইটাই সবচেয়ে বড় কথা। তোমাকে একটা ঝুড়ি আর কিছু দড়ির ব্যবস্থা করতেই হবে।

    ফশেলেভেন্ত তার বাঁ হাতের মাঝের আঙুল দিয়ে তার কানের গর্তটা নাড়া দিতে লাগল। এর মানে সে একটা বড় রকমের সমস্যায় পড়েছে। সে চিন্তা করতে লাগল। এমন সময় আবার একটা ঘণ্টাধ্বনি হল।

    সে বলল, এর মানে ডাক্তার এসে গেছে। ডাক্তার দেখেই বলবে, রোগী আগেই মারা গেছে। ডাক্তার স্বর্গে যাবার ছাড়পত্রে সই করে দিলেই কফিনের জন্য তোক পাঠানো হবে। মৃত যদি মাদার হয় তা হলে মাদারেরাই মৃতকে কফিনে শোয়াবে। আর যদি সিস্টার মারা যায় তা হলে সিস্টারেরাই তাকে শোয়াবে কফিনে। তার পর আমাকে কফিনের মুখ বন্ধ করে পেরেক সঁটতে হবে। মালী হিসেবে এটা আমার কর্তব্যের একটা অঙ্গ। মালীর কাজ অনেকটা কবর খোঁড়ার লোকের মতো। গির্জার একটা ছোট ঘরে কফিনটা রাখা হবে। ঘরের রাস্তার দিকের দরজাটা খুলে দেওয়া হবে। একমাত্র ডাক্তার ছাড়া বাইরের কোনও পুরুষ আসতে পারবে না। আমাকে তো পুরুষ বলে গণ্য করা হয় না। এরপর মৃতদেহভরা কফিনটাকে নিয়ে যাওয়া হবে সমাধিভূমিতে। শবাধার বহনের জন্য পুরুষরা আসবে। তাতে কোনও ক্ষতি নেই।

    সূর্যের একটা রশ্মি কসেত্তে’র মুখের উপর পড়তে ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল তার। মনে হল সে যেন সূর্যালোক পান করছে। ভলজাঁ একদৃষ্টিতে সেইদিকে তাকিয়ে রইল। সে কোনও কথা না শুনলেও ফশেলেভেস্ত নিজের মনে বলে যেতে লাগল।

    কবরখানাটা হল সিমেতেয়ার ভগিয়ার্দে। কিন্তু জায়গাটা নাকি এদের পছন্দ হচ্ছে না। কবরখননকারী পিয়ের মেস্তিয়েল আমার বন্ধু। এই কনভেন্টের কোনও মৃতদেহ ওখানে রাত্রিবেলাতেও নিয়ে গিয়ে সমাহিত করা চলে। পুলিশের কর্তারা হুকুম দিয়েছে। কিন্তু গতকাল থেকে আজকের মধ্যে কত কী ঘটে গেল। মাদার ক্রুসিফিকিসান মারা গেল আর পিয়ের ম্যাদলেন—

    জাঁ ভলজাঁ মুখের উপর একফালি সকরুণ হাসি ফুটিয়ে বলে উঠল, পিয়ের ম্যাদলেন হল জীবন্ত সমাহিত।

    হ্যাঁ, জীবন্ত সমাহিত আপনি হবেন যদি আপনি চিরদিন এখানে থাকেন।

    আবার ঘণ্টা বেজে উঠল। ফশেলেভেন্ত তার নিজের ঘণ্টাটা বার করে পায়ে বেঁধে নিল। সে বলল, এটা আমার জন্য। প্রধানা কত্রী আমাকে ডাকছে। আমি না আসা পর্যন্ত আপনি এখানেই থাকবেন। কোথাও যাবেন না। রুটি, মাখন আর মদ আছে। ক্ষিদে পেলে খাবেন।

    যেতে যেতে সে বলতে লাগল, আমি আসছি, এখনি আসছি।

    সে যখন তার খোঁড়া পা নিয়ে বাগান পার হয়ে সবজিক্ষেতের উপর দিয়ে যেতে লাগল, ভলজাঁ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মিনিটের মধ্যে সে গেটের কাছে গিয়ে দরজায় ঘা দিল। দারোয়ান দরজা খুলে বলল, চিরদিন, চিরদিন। তার মানে ভেতরে এস।

    দরজা দিয়ে একটা ছোট ঘরে ঢুকল ফশেলেভেন্ত। ঘরের মধ্যে প্রধানা কত্রী তার। কাজ বুঝিয়ে দেবার জন্য অপেক্ষা করছিল তার জন্য।

    .

    ২.

    সংকটের সময় একই সঙ্গে বিব্রত এবং সংযত হওয়া কতকগুলি চরিত্রের বিশেষ গুণ। বিশেষ করে যাজক ও ধর্মসম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে এই গুণটি বেশি পরিমাণে দেখা যায়। ফশেলেভেন্ত যখন কনভেন্টের বাইরের দিকের সেই ছোট ঘরটাতে গেট পার হয়ে ঢুকল তখন কনভেন্টের প্রধানা কী সুন্দরী, বিজ্ঞ ও হর্ষোৎফুল্ল ম্যাদলেন দ্য ব্লেমুর মেরে আর ইনোসেন্তের মধ্যে এই গুণ দুটি একই সঙ্গে প্রকট হয়ে উঠেছিল তার চোখেমুখে।

    মালী ফশেলেভেন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে অভিবাদন জানিয়ে দাঁড়িয়ে রইল নীরবে। প্রধানা কত্রী মেরে ইনোসেন্ত তখন মালা জপ করছিলেন। মালা জপতে জপতে একসময় তিনি মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ও তুমি ফভেন্ত!

    ফশেলেভেন্তকে কনভেন্টের সকলে সংক্ষেপ ফভেন্ত বলত।

    ফশেলেভেন্ত তার কপালটা একবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে বলল, আপনি আমায় ডেকেছেন শ্রদ্ধেয়া মাদার?

    তোমাকে একটা কথা বলার আছে আমার।

    আমারও আপনাকে একটা কথা বলার আছে।

    নিজের সাহস দেখে নিজেই বিস্মিত হল ফশেলেভেন্ত।

    তোমার কিছু বলার আছে?

    একটা অনুরোধ।

    ঠিক আছে, বলে ফেল। শুনি কী অনুরোধ।

    চাষি হয়েও যে একদিন মুহুরিগিরি করত সেই ফশেলেভেন্তের বাস্তব হিসেবি বুদ্ধি বেশই ছিল। তার মুখে-চোখে সব সময় যে একটা অজ্ঞতার ভাব ফুটে থাকত তা যেমন একদিকে সকলের মন থেকে তার প্রতি সব অবিশ্বাস ও সংশয়কে দূরীভূত করে দিত তেমনি তার প্রতি সকলের এক সহজ বিশ্বাসকেও আকর্ষণ করত। তার এই অজ্ঞতার ভাবটা সরলতার প্রতীক হিসেবে গণ্য হত সকলের কাছে। সে প্রায় দু বছরের বেশিদিন এই কনভেন্টে কাজ করছে। এর মধ্যে এই ধর্মসম্প্রদায়েরই একজন হয়ে উঠেছে সে যেন। সে ছিল সম্পূর্ণ একা, বাগানের কাজ নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকত। দেহটা তার কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার সমগ্র মনজুড়ে বিরাজ করত এক বিরাট কৌতূহল। আজ দু বছরের মধ্যেও কনভেন্টের অভ্যন্তরীণ জীবনের অনেক কথাই তার জানা হয়নি। সেখানকার সবকিছুই রহস্যময় তার কাছে। অবগুণ্ঠিত সন্ন্যাসিনীদের আসা-যাওয়া ও পদচারণ সে দূর থেকে দেখে। প্রথম প্রথম তাদের এক একটি ছায়ামুর্তি বলে মনে হত তার। এখন ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে তাদের সে রক্তমাংসের মানুষ বলেই ভাবে। বধির মানুষের দৃষ্টিশক্তি যেমন বেড়ে যায়, অন্ধ মানুষের যেমন শ্রবণশক্তি বেড়ে যায় তেমনি তারও বোধশক্তি থাকতে থাকতে বেড়ে যায় ক্রমে ক্রমে। সে প্রতিটি ঘণ্টাধ্বনি শুনে তাদের অর্থ বলে দিতে পারত। ক্রমে কনভেন্টের সব গোপন তথ্য ও জীবনযাত্রা প্রণালীর সব রহস্যই একে একে উদঘাটিত হয়ে ওঠে তার বোধশক্তির কাছে। স্কিঙ্কস যেন তার সব রহস্যের কথা বলে দিয়েছে তার কানে কানে।

    কিন্তু অনেককিছু জানলেও কোনও কথা কখনও কারও কাছে বলেনি, কোনও কিছু প্রকাশ করেনি ফশেলেভেন্ত। এখানেই ছিল তার বিশেষ দক্ষতা। কনভেন্টের সকলেই তাকে বোকা-বোকা ভাবত আর এই বোকা বোকা ভাবটা ধর্মসম্প্রদায়ের পক্ষে একটা বড় গুণ। কনভেন্টের মাদাররা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত। তাকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করত। তাছাড়া সে নিয়মিত কাজ করে যেত। একদিনের জন্যও কাজে সে অবহেলা করেনি, কোনওদিন অনুপস্থিত হয়নি। একমাত্র বাগানের কাজ ছাড়া সে বাইরে কোথাও যায়নি কখনও। মাত্র দুটি লোকের সঙ্গে তার একটু বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারা হল কনভেন্টের দারোয়ান আর কবর-খনকারী। তাদের কাছ থেকেও অনেক কথা জানতে পারত সে। সে যেন সব সময় সন্ন্যাসিনীদের একই সঙ্গে জীবন এবং মৃত্যুর আলোকে বিচার করে দেখত। কিন্তু তাদের সম্বন্ধে যা-ই ভাবুক না কেন, তাদের কোনওদিন তুচ্ছ বা হীন ভাবত না। ফলে সে-ও শ্রদ্ধা পেত সকলের কাছ থেকে। সে ছিল পঙ্গু, সরলস্বভাব, কানে কম শুনত, চোখে কম দেখত–পেতিত পিকপাসের কনভেন্টের পক্ষে সে ছিল সবচেয়ে যোগ্য পুরুষ। তার জায়গায় অন্য কাউকে বসানো সত্যিই এক কঠিন ব্যাপার।

    প্রধানা কত্রীর কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে সে গ্রাম্য ভাষায় এবং ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করল। সে প্রথমে তার বার্ধক্য আর বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার কথা বলল। বলল, বয়সের ভারে ক্রমশই নত হয়ে উঠছে সে। বাগানটা বড়, একা তাকে অনেক কাজ করতে হয়। যেমন গতরাতে তাকে বাইরে গিয়ে বাইরে থেকে খড় এনে রাত্রিকালে চাঁদের আলোতে বরফ পড়ার ভয়ে তরমুজগুলো খড় দিয়ে বাঁধতে হয়েছে।

    এই সব বলার পর এবার আসল কথায় এল ফশেলেভেন্ত। তার এক ভাই। আছে, এ কথায় প্রধানা কত্রী চমকে উঠে তার মুখপানে তাকালেন। ফশেলেভেন্ত বলল, তবে সে যুবক নয়, তার বেশ বয়স হয়েছে। এ কথা শুনে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।

    ফশেলেভেন্ত আবার বলতে লাগল। সে বলল, তাকে যদি অনুমতি দেওয়া হয় তা হলে তার ভাই তার কাছে থেকে তাকে বাগানের কাজে সাহায্য করতে পারে। তার ভাই-এর এক নাতনি আছে। একটা বাচ্চা মেয়ে। তাকে যদি কনভেন্টের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয় তা হলে কে বলতে পারে ভবিষ্যতে সে একদিন একই কনভেন্টেরই এক সন্ন্যাসিনী বা সিস্টার হয়ে উঠতে পারে। সবশেষে সে বলল, যদি তাকে এ অনুমতি দেওয়া না হয় তা হলে তার বয়স এবং কর্মগত যোগ্যতার অভাবের কথা ভেবে সে এ কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।

    তার কথা শেষ হলে প্রধানা কত্রী মালা জপ করার কাজ থামিয়ে বললেন, আজকের সন্ধ্যার মধ্যে একটা লোহার শাবল এনে দেওয়া সম্ভব তোমার পক্ষে?

    ফশেলেভেন্ত বলল, হ্যাঁ, হবে শ্রদ্ধেয়া মাদার।

    কথাটা বলে সে একা দাঁড়িয়ে রইল।

    .

    ৩.

    এরপর প্রায় পনেরো মিনিট কেটে গেল। প্রধানা কর্তী আবার ফিরে এলেন। দু জনেই কী যেন ভাবছিল। এরপর দু জনের মধ্যে যেসব কথা হয় তা তুলে দেওয়া হল।

    প্রধানা কত্রী বললেন, পিয়ের ফশেলেভেন্ত?

    শ্রদ্ধেয়া মাদার?

    তুমি গির্জার কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত?

    এ কাজের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ আমার কম। আমি সমবেত প্রার্থনায় যোগ দিতে সময় পাই না। দূর থেকে তা শুনতে হয়।

    কখনও যোগ দিয়েছ?

    মাত্র দু-তিনবার।

    আমি তোমাকে দিয়ে একটা পাথর সরাতে চাই।

    পাথরটা কি খুব ভারী?

    বেদির পাশে মেঝের একটা পাথর।

    যে পাথর দিয়ে বেদির পাশের গহ্বরটা ঢাকা আছে?

    হ্যাঁ।

    কিন্তু এটা তো দুটো লোকের কাজ।

    মেরি অ্যাসেনশানের গাঁয়ে পুরুষের মতো জোর আছে। সে তোমাকে সাহায্য করবে এ কাজে।

    কিন্তু কোনও নারীর শক্তি পুরুষের সমান নয়।

    এছাড়া আমাদের আর তো কোনও উপায় নেই। ডন মেবিলন আমাদের কাছে সেন্ট বার্নাদের চারশো সাতটি চিঠি পাঠিয়েছেন আর মার্লোনাস হবসন্তাস পাঠিয়েছেন তিনশো সাতষট্টিটি চিঠি। তাই বলে তো মার্লোনাসকে তুচ্ছ ভাবতে পারি না।

    এখন আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। এটা তো আর কারখানা নয়।

    নারী আর পুরুষও কখনই এক হতে পারে না। আমার ভাই-এর গাঁয়ে দারুণ শক্তি আছে।

    তাছাড়া তোমার হাতে একটা লোহার শাবল থাকবে।

    এইভাবেই পাথরটাকে তুলঁতে হবে।

    পাথরটার মধ্যে একটা কড়া আছে।

    আমি তার ভেতর দিয়ে শাবলটাকে ঢুকিয়ে দেব।

    পাথরটা ঢাকনা চাপা আছে।

    আমি সেটা তুলে গহ্বরের মুখটা খুলে দেব মাদার।

    চারজন মাদার উপস্থিত থাকবেন।

    গহ্বরের মুখটা খোলার পর কী হবে?

    আবার সে মুখটা বন্ধ করতে হবে।

    শুধু এই কাজ? আর কিছু নয় তো?

    না।

    বলুন আর কী করতে হবে আমায়?

    ফভেন্তু, আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি।

    আমি আপনার হুকুম তামিল করার জন্য প্রস্তুত।

    এবং কাউকে কোনও কথা বলবে না।

    না, বলব না।

    গহ্বরের মুখটা খোলার পর–

    আমাকে আবার তা বন্ধ করতে হবে।

    কিন্তু তার আগে আর একটা কথা আছে।

    বলুন, শ্রদ্ধেয়া মাদার।

    সেই গহ্বরের মধ্যে কিছু একটা নামাতে হবে।

    হঠাৎ চুপ করে গেল ফশেলেভেন্ত। দু জনেই চুপচাপ। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর প্রধানা কর্তী নিচের ঠোঁটটা একটু কামড়ে কুণ্ঠার সঙ্গে বললেন, তুমি জান ফভেন্ত, আজ একজন মাদার মারা গেছেন?

    না।

    তুমি ঘণ্টাধ্বনি শোননি?

    বাগানের শেষ প্রান্ত থেকে সব ঘণ্টা শোনা যায় না।

    তাই নাকি?

    আমি শুধু আমার জন্য বাজানো ঘণ্টাটাই শুনতে পাই।

    আজ সকালেই তিনি মারা গেছেন।

    তা হলে তখন বাতাসটা আমার দিকে বইছিল না।

    যিনি মারা গেছেন তিনি হলেন মাদার কুসিফিকসিয়ন। স্মরণীয় মহিলা।

    প্রধানা কত্রী আবার নীরব হয়ে গেলেন। তার পর আবার বলতে লাগলেন, তিন বছর আগে জেসসেনীয়পন্থী মাদাম দ্য বেথুন মেরে কুসিফিকসিয়নের ভক্তি আর উপাসনার নিবিড়তা দেখে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন।

    এবার আমি বুঝতে পেরেছি মাদার। আমি ঘণ্টাধ্বনিও শুনতে পাচ্ছি।

    তাঁর মৃতদেহ চ্যাপেলসন্নিহিত মৃতদেহ রাখার ঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে।

    আমি তা জানি।

    তুমি ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সে-ঘরে প্রবেশাধিকার নেই। কাউকে সে অধিকার দেওয়াও হবে না। সে ঘরে অন্য কোনও পুরুষ ঢুকলে কী হবে জান?

    যদি প্রায়ই ঢোকে।

    তার মানে?

    তার মানে যদি প্রায়ই তাকে এ অনুমতি দেওয়া হয়।

    কিন্তু আমি তো বলিনি।

    আমি আপনাদের কথা সমর্থন করতেই চাই। শুধু বোঝাতে পারছি না।

    আমিও বুঝতে পারছি না।

    এমন সময় নটার ঘণ্টা বাজল।

    প্রধানা কর্জী তা শুনে বললেন, এই বেলা নটায় এবং প্রতিটি প্রহরে আমাদের ভক্তি এবং উপাসনা চলবে অব্যাহত গতিতে।

    ফশেলেভেন্ত বলল, ‘আমেন’ অর্থাৎ তথাস্তু।

    ঘণ্টাধ্বনিটা এক অপ্রীতিকর জটিল অবস্থার জাল থেকে তাদের দু জনকেই উদ্ধার করল। তাদের চিন্তা অন্যদিকে চলে গেল। ফশেলেভেন্তু তার কপালে হাত দিল।

    প্রধানা কত্রী বললেন, মেরে কুসিফিকসান তার জীবদ্দশায় অনেককে ধর্মান্তরিত করেছেন। এখন মৃত্যুর পর তিনি অনেক ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া দেখাবেন।

    এ কথার পুনরাবৃত্তি করে ফশেলেভেন্ত বলল, তিনি অনেক ঐন্দ্রজালিক কাজ দেখাবেন।

    প্রধান কী বলতে লাগলেন, মেরে কুসিফিকসানকে পেয়ে আমাদের সম্প্রদায় অনেক ধন্য হয়েছে। কার্ডিনাল দ্য বেরুল যেমন প্রার্থনা করতে করতে মারা যান, তেমন ভাগ্য অবশ্য সবার হয় না। ক্রুসিফিকসানেরও এই সৌভাগ্য হয়নি। তবু কিন্তু তাঁর মৃত্যুটাও খুব সুন্দরভাবে হয়। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার জ্ঞান ছিল। তিনি আমাদের সঙ্গে ও দেবদূতদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি তাঁর শেষ উপদেশের কথাগুলো বলে যান আমাদের। পিয়ের ফভেন্ত, তোমার যদি একটু বিশ্বাস থাকে এবং তুমি যদি মৃত্যুকালে তাঁর পাশে থাকতে তা হলে তিনি তোমার খোঁড়া পা-টাকে স্পর্শ করে সারিয়ে দিতে পারতেন। তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল। আমরা বেশ বুঝতে পারলাম, তিনি ঈশ্বরের মধ্যে নবজীবন লাভ করেছেন। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গলাভ করেছেন তিনি।

    ফশেলেভেন্ত বলল, আমেন।

    এরপর সে নীরবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রধানা মালা জপ করতে লাগলেন। তার পর একসময় বললেন, শোন পিয়ের ফভেন্ত, মৃত ব্যক্তির মৃত্যুকালীন ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। এ বিষয়ে আমি অনেক ধর্মযাজকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি এমন সব ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছি যারা ধর্মের কাজে জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং তাতে পরম আধ্যাত্মিক সম্পদ লাভ করেছেন।

    ফশেলেভেন্ত বোকার মতো বলল, আপনি জানেন মাদার এখান থেকে চার্চের ঘণ্টা যেমন শোনা যায়, বাগান থেকে তেমন যায় না।

    প্রধানা তার আগেকার কথাটার জের টেনে বললেন, তাছাড়া তিনি সাধারণ মহিলা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সেন্ট। ঠিক আপনার মতো শ্রদ্ধেয়া মাদার।

    আমাদের পরম ধর্মীয় পিতা পোপ সপ্তম পায়াসের অনুমতি নিয়ে তিনি কুড়ি বছর কফিনের মধ্যে নিদ্রাভিভূত অবস্থায় ছিলেন।

    যে পোপ বোনাপার্টের রাজ্যাভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

    ফশেলেভেন্তের মতো একজন বোকা লোকের পক্ষে একথাটা বলা সত্যিই আশ্চর্যজনক। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে প্রধানা কী তখন অন্য চিন্তায় মগ্ন ছিলেন বলে তার কথাটাই শুনতে পাননি।

    প্রধানা কর্তী আবার বলতে লাগলেন, কাঁপাদোসিয়ার আর্কবিশপ সেন্ট দিওদোর তার সমাধিস্তম্ভের উপর শুধু একটা কথাই খোদাই করে রাখতে বলেছিলেন। সে কথা হল ‘আকারাস’ অর্থাৎ মাটির পোকা এবং তাই করা হয়েছিল। এটা কি ঠিক নয়?

    হ্যাঁ, শ্রদ্ধেয়া মাদার।

    অ্যাকুইনা গির্জার অধ্যক্ষ মোজাকে ফাঁসিকাঠের তলায় সমাহিত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন এবং তার তা-ই করা হয়েছিল।

    হ্যাঁ, সত্যি কথা।

    টাইবার নদীর মুখের কাছে যিনি বাস করতেন সেই অস্তিয়ার বিশপ সেন্ট তেরেন্স। মৃত্যুর আগে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভের উপর পিতৃহত্যার একটা প্রতীক খোদাই করা থাকবে, যাতে পথিকরা তাঁর স্মৃতিস্তম্ভের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় থুতু ফেলে তাঁর আত্মার উদ্দেশে। তাই করা হয়েছিল। মৃতের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত।

    তা বটে।

    ফ্রান্সে রোশে আবেলের কাছে বানৰ্দি গিদোলিস জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন স্পেনের অন্তর্গত তু-এর বিশপ। তাঁর নির্দেশমতো এবং কাস্তিলের রাজার বিরোধিতা সত্ত্বেও মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ সমাহিত করার জন্য ডোমিনিকান চার্চে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একথা কেউ অস্বীকার করতে পারে? প্লানতেভিচ দ্য লা ফসি এ ঘটনার সত্যতা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন।

    তা হলে একথা সত্য হবেই মাদার।

    আবার মালা জপ করতে লাগলেন প্রধানা।

    একসময় তিনি বললেন, পিয়ের ফভেন্তু, মেরে কুসিফিকসিয়ন যে কফিনে কুড়ি বছর ধরে নিদ্রাভিভূত ছিলেন সেই কফিনেই তাকে সমাহিত করা হবে।

    ঠিক বলেছেন মাদার।

    এই সমাধিই হবে তাঁর নিদ্রার প্রসারিত রূপ।

    তা হলে সে কফিনেই আমাকে পেরেক আঁটতে হবে।

    হ্যাঁ।

    আর কে কে থাকবে?

    চারজন মাদার তোমাকে সাহায্য করবেন।

    কিন্তু কফিনে পেরেক আঁটতে তাদের দরকার হবে না আমার।

    কিন্তু কফিনটাকে নামাতে দরকার হবে।

    নামাতে হবে? কোথায়?

    সেই গহ্বরটার ভেতরে।

    ফশেলেভেন্ত চমকে উঠল। তার পর বলল, বেদির তলায় সেই গহ্বরটায়? কিন্তু—

    তোমাকে একটা শাবল দেওয়া হবে।

    তা অবশ্য বটে! কিন্তু—

    মৃতের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে অবশ্যই পালন করতে হবে। এটাই ছিল মেরে কুসিফিকসিয়নের অন্তিম কামনা। তিনি বলেছিলেন যে সমাধিভূমি অধর্মাচারীদের দ্বারা কলুষিত সেখানে যেন তাঁকে সমাহিত করা না হয়। তাঁকে যেন সমাহিত করা হয় সেই বেদির তলদেশে যেখানে কুড়ি বছর ধরে প্রার্থনা আর উপাসনা করে এসেছেন তিনি। তিনি আমাদের কাছে এই কামনাই প্রকাশ করেছিলেন এবং এ কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

    কিন্তু এ কাজ তো নিষিদ্ধ মাদার।

    মানুষের দ্বারা নিষিদ্ধ, কিন্তু ঈশ্বরের অনুমতিসিদ্ধ।

    কিন্তু কথাটা যদি জানাজানি হয়ে যায়?

    আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি।

    আমাকে? আমি দেয়ালের একটা পাথরের মতো। কিন্ত–

    আমি প্রার্থনাসভায় সমবেত মাদারদের সঙ্গে আলোচনা করেছি এ নিয়ে। আমরা সকলে মিলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে মেরে কুসিফিকসিয়নকে তাঁর শেষ ইচ্ছানুসারেই সমাহিত করা হবে। একবার ভেবে দেখ ফভেন্ত, এর থেকে কত রহস্যময় সুফল লাভ করা যেতে পারে। এর দ্বারা আমাদের ধর্মসম্প্রদায় কত গৌরব অর্জন করতে পারে। যতসব ঐন্দ্রজালিক অতিপ্রাকৃত ঘটনা সমাধিস্তম্ভতেই ঘটে।

    কিন্তু মাদার, স্বাস্থ্যদপ্তরের কমিশনার যদি

    এই সমাধির ব্যাপারে সেন্ট দ্বিতীয় বেনেডিক্ট কনস্তান্তিন পোগোলাতের আদেশ অমান্য করেছিলেন।

    যদি পুলিশ কমিশনার–

    কলোদেমেয়ার নামে একজন জার্মান রাজা যিনি কনস্তান্তিনের রাজত্বকালে গলদের পক্ষে যোগদান করেন তিনি একথা স্বীকার করেছিলেন যে ধর্মসম্প্রদায়ের লোকদের ধর্মস্থানেই সমাহিত হবার অধিকার আছে। তার মানেই বেদির তলায়।

    পুলিশ বিভাগের যদি কোনও ইন্সপেক্টর—

    ধর্মের কাছে পৃথিবীর কোনও দাম নেই। কার্থেজদের একাদশতম সেনাপতি মার্টিন একবার লাতিন ভাষায় বলেছিলেন, পৃথিবী চিরকাল ঘুরতে থাকবে, কিন্তু ক্রস এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে।

    ফশেলেভেন্ত বলল, আমেন, লাতিন ভাষায় বলা কথা যখন, তখন তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই। আমার মনের সব সংশয় দূর হয়ে গেল।

    কোনও মানুষ দীর্ঘকাল কথা না বলার পর যদি কোনও শ্রোতা পায় তা হলে কথা বলতে বলতে আর থামতে চায় না। জিমনাসততারাস নামে একজন বাগ্মী কারাগার থেকে দীর্ঘদিন পর মুক্তি পেয়ে যেসব যুক্তি ও চিন্তা সঞ্চিত ছিল তা প্রকাশ করার কোনও লোক না পেয়ে একটা গাছকেই উদ্দেশ্য করে বোঝাতে থাকেন। কনভেন্টের প্রধানা কত্রী তেমনি দীর্ঘদিন ধরে মনের মধ্যে স্থূপীকৃত কথার রাশি প্রকাশ করতে না পেরে এখন সুযোগ পেয়ে সে সব কথা ঢেলে দিতে লাগলেন। বাঁধভাঙা অবরুদ্ধ জলরাশি যেন হঠাৎ ছাড়া পেয়ে ঝরে পড়তে লাগল অবাধে।

    আমার ডান হাতে আছে বেনেডিক্ট আর বাঁ হাতে আছে বার্নার্দ। কে এই বার্নার্দ?

    এই বার্নার্দ? তিনি ছিলেন ক্লেয়ারভয়ের চার্চের প্রথম অধ্যক্ষ। বার্গান্ডির ফতেনে ছিল তাঁর জন্মভূমি। তাঁর জন্মস্থান হিসেবে সে জায়গা ধন্য হয়ে আছে আজও। তাঁর পিতার নাম তেয়সলিন এবং মার নাম অ্যাশিথিয়া। তিনি তাঁর ধর্মজীবন শুরু করেন সিটোতে আর সে জীবন শেষ করেন ক্লেয়ারভয়ে। তিনি সাতশো শিক্ষানবিশকে শিক্ষাদান করেন। এবং একশো ষাটটি গির্জা ও ধর্মপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। শ্যালনের বিশপ গিলমদ্য শ্যাম্পো তাঁকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯৪০ সালে রেইম-এর ধর্মসভায় তিনি সব ছদ্মবেশী কপট শয়তানদের পরাজিত করেন। তিনি রাজাদের মধ্যে সব মতভেদ দূর করেন। যুবক রাজা লুইকে সৎপথে চালিত করেন। পোপ তৃতীয় ইউসেনকে পরামর্শ দান করে। এইভাবে তিনি একই সঙ্গে ধর্ম ও রাজনৈতিক জগতের মধ্যে তার প্রভাব বিস্তার করেন। ক্রুসেডের সময় তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে ধর্মপ্রচার করেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আড়াইশো অলৌকিক ক্রিয়া প্রদর্শন করেন। একবার একদিনের মধ্যে এই ক্রিয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় ঊনচল্লিশটি।

    বেনেডিক্ট কে ছিলেন? তিনি ছিলেন মন্তি ক্যাসিনোর ফাদার। তিনি যে ধর্মসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর সেই প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং নির্দেশাবলি মান্য করে চল্লিশটি পোপের সৃষ্টি হয়েছে। তার থেকে বেরিয়ে এসেছে দুলোজন কার্ডিনাল, পঞ্চাশজন ফাদার, মোলোশশা আর্কবিশপ, সাড়ে চার হাজার বিশপ, চারজন সম্রাট, বারোজন সম্রাজ্ঞী, ছেচল্লিশজন রাজা, একচল্লিশজন রানি, তিন হাজার ছোেজন সেন্ট এবং তাঁর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মতবাদ ও নিয়মাবলি চৌদ্দশো বছর ধরে চলে আসছে। একদিকে আছেন। বেনেডিক্ট আর একদিকে বার্নার্দ। আমাদের অন্য কোনও শাসকের প্রয়োজন নেই। আমাদের কথা রাজ্যের মানুষরা একবার ভেবে দেখে না। আমাদের দেহের মাটি ঈশ্বরকে দান করার অধিকারও আমাদের নেই। স্বাস্থ্যের কথাটা তুলেছে বিপ্লবীরা। এটা তাদের আবিষ্কার। ঈশ্বরকে এখন পুলিশ কমিশনারের অধীন করে তোলা হয়েছে। এই হল আমাদের দেশ। কোনও কথা কাউকে বলবে না ফশেলেভেন্ত।

    অস্বস্তিবোধ করতে লাগল ফশেলেভেন্ত।

    প্রধানা আবার বলে যেতে লাগলেন, ধর্মপ্রতিষ্ঠানের লোকদের ইচ্ছামতো সমাহিত হবার অধিকার একমাত্র কুপথে চালিত নিরীশ্বর ও নাস্তিক লোকরাই মানতে চায় না। আমরা এখন দারুণ গোলমালের মধ্যে জীবনযাপন করছি। এখানকার লোকেরা যেটা তাদের জানা উচিত তা জানে না আর যেটা জানা উচিত নয় সেইটা জানে। এখনকার সমাজের মানুষগুলো বড় স্কুল প্রকৃতির। তারা সবাই অসাধু। তারা এতদূর অধার্মিক যে তারা মোড়শ লুই-এর বধ্যভূমিটাকে যিশু খ্রিস্টের ক্রসের সঙ্গে তুলঁনা করে। কিন্তু লুই ছিলেন শুধু একজন রাজা। আমাদের এখন ঈশ্বরের কথা ভাবতে হবে। ভলতেয়ারের কথা এখন সবাই জানে, কিন্তু সিজার দ্য বুসের কথা কেউ জানে না। অথচ সিজার দ্য বুস হলেন একজন ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য পুরুষ, আর ভলতেয়ার একজন অভিশপ্ত মানুষ। ভূতপূর্ব আর্কবিশপ কার্ডিনাল দ্য পেরিগর্দ জানতেন না যে শার্লস দ্য কলজেন বেরুলের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তিনি আবার ফ্রাসোয়া বুর্গয়েন কনট্রেনের স্থলাভিষিক্ত হন। আবার সেন্ট মার্থের ফাদার বুর্গায়েনের স্থলাভিষিক্ত হন। এরা সবাই ভালো বাগী। হুগোনত রাজা চতুর্থ হেনরি পিয়ের কটনের ওপর এক নোংরা মন্তব্য করেন বলে তাঁর কথা সবাই জানে, কিন্তু তিনি যে এক ধর্মপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তা কেউ জানে না। দু-একজন যাজক কখনও কোনও ভুল করে বসলেই সব যাজককে খারাপ ভাবতে হবে। মার্তিন দ্য তুর্গ ছিলেন এমনই এক সেন্ট যিনি তার পোশাকের আধখানা অনেক সময় গরিবদের দান করতেন। সেন্টরা কত সহ্য করেন তা কেউ দেখতে পায় না। সত্যের প্রতি মানুষ চিরকালই অন্ধ। কেউ একবার স্বর্গ ও নরকের কথা ভাবে না। মানুষ কত দুষ্ট প্রকৃতির হয়ে গেছে! রাজার নামে কোনও কথা বলা মানেই বিপ্লবের নামে কোনও কিছু বলা। রাজার কোথায় কী কর্তব্য, মৃতদের প্রতিই-বা রাজার কর্তব্য কী, তা কেউ জানে না। ধর্মপূতঃ পরিবেশে মরাটাও যেন নিষিদ্ধ, মৃতকে সমাহিত করার ব্যাপারটাও যেন একটা নাগরিক এবং রাজনৈতিক ব্যাপার। এটা ঈশ্বরের প্রতি, ধর্মের প্রতি একটা বিদ্রোহ। দ্বিতীয় সেন লি পিয়ের নোতেয়ার আর ভিসিগথের রাজার কাছে দুটি চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি মৃতকে সমাহিত করার ব্যাপারে সম্রাটের কর্তৃত্ব এবং অধিকারকে অস্বীকার করেন। তাঁর আদেশ অমান্য করেন। এবং এই একই ব্যাপারে শ্যালনের বিশপ গতিরের বার্গান্ডি ডিউক ওটোর আদেশ অমান্য করেন। অতীতে রাজনীতির ওপর ধর্ম ও ধর্মপ্রতিষ্ঠানের একটা প্রভাব ছিল। আব্বে দ্য সিতো বার্গান্ডির পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। আমরা বরাবর আমাদের বিবেচনা এবং ইচ্ছামতো মৃতদেহ সমাহিত করে এসেছি। সেন্ট বেনেডিক্ট নিজে ৫৪৩ সালে ইতালির মন্টি ক্যাসিনোতে মরদেহ ত্যাগ করলেও তাকে ফ্লাক্সের আব্বায়ে দ্য ফুরি-তে সমাহিত করা হয়। যারা নাস্তিক, যারা অধার্মিক তাদের অবশ্যই আমি ঘৃণা করি ঠিক, কিন্তু যারা সমাধির ব্যাপারে চার্চের ওপর হস্তক্ষেপ করতে চায়, চার্চের অধিকারকে অস্বীকার বা খর্ব করতে চায় তাদের আমি আরও বেশি ঘৃণা করি।

    কথা বলা শেষ করে প্রধানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফশেলেভেন্তের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তা হলে রাজি আছে তো পিয়ের ফভেন্ত?

    হ্যাঁ, রাজি আছি শ্রদ্ধেয়া মাতা।

    আমরা তা হলে নির্ভর করতে পারি তোমার ওপর?

    আমি আপনাদের আদেশ পালন করে চলব, কারণ আমি কনভেন্টের সেবক।

    ঠিক আছে। তুমি কফিনটাকে বন্ধ করে এঁটে দেবে আর সিস্টাররা সেটাকে গির্জায় বয়ে নিয়ে যাবে। তার পর মৃতের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন হবে। প্রার্থনা শেষ হলে রাত্রি এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে তুমি লোহার শাবল নিয়ে এখানে এসে উপস্থিত হবে। সবকিছুই বিশেষ গোপনে সম্পন্ন করতে হবে। শুধু চারজন মাদার আর তুমি থাকবে গির্জায়।

    ফশেলেভেন্ত বলল, গির্জায় আর একজন থাকবেন। তিনি হলেন একজন সিস্টার যিনি প্রায়শ্চিত্তের জন্য প্রার্থনা করতে থাকবেন।

    সে তার ঘাড় ঘোরাবে না।

    কিন্তু তিনি সেকথা শুনতে পাবেন।

    সে শুনবে না। তাছাড়া সে তো কনভেন্টের লোক। কনভেন্টের কথা যেন বাইরে না যায়।

    একটু চুপ করে থাকার পর প্রধানা আবার বললেন, আজ তোমাকে আর ঘণ্টা পরতে হবে না। প্রায়শ্চিত্তকারিণী সিস্টারকে তোমার উপস্থিতির কথা আর জানাতে হবে না।

    আপনি যা বলছেন তাই হবে মাদার।

    হ্যাঁ।

    ডাক্তার এসেছিলেন?

    তাঁকে ডাকার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল। তিনি চারটের মধ্যেই এসে পড়বেন। কিন্তু তুমি আমার ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাওনি?

    আমি শুধু আমাকে ডাকার ঘণ্টা শুনতে পাই।

    তা ভালো।

    একটা ছ ফুট লম্বা শাবল আমার দরকার মাদার।

    কোথায় সেটা পাবে তুমি?

    বাগানে অনেক লোহার রড় পড়ে থাকে। তার থেকে একটা শাবল বেছে নেওয়া কষ্টকর হবে না।

    রাত্রি বারোটা বাজার পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে তোমাকে আসতে হবে। ভুলো না যেন।

    আর একটা কথা শ্রদ্ধেয়া মাদার।

    বলে ফেল।

    যদি এই ধরনের কাজ আপনার থাকে তা হলে বলতে পারেন। আমার ভাই খুবই বলিষ্ঠ।

    কাজটা তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।

    কিন্তু আমি তো তাড়াতাড়ি কোনও কাজ করতে পারি না। আমার বয়স হয়েছে। তার ওপর আমি খোঁড়া।

    খোঁড়া হওয়াটা পাপ নয়। সম্রাট দ্বিতীয় হেনরি খোঁড়া ছিলেন। কেউ প্রতিবাদ করেনি। অষ্টম বেনেডিক্টকেও লোকে একই সঙ্গে সেন্ট আর খোঁড়া বলত।

    একই সঙ্গে খোঁড়া আর সেন্ট হওয়া ভালো। আমি আবার কানেও কম শুনি।

    তোমাকে পুরো এক ঘণ্টা সময় দেওয়া উচিত। এগারোটা বাজলেই তুমি শাবল নিয়ে চলে আসবে। দুপুররাতে প্রার্থনা শুরু হবে। তার আগেই কাজ সারতে হবে। পুরো এক ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে।

    আপনাদের ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতি আমার ভক্তি কতখানি তা প্রমাণ করার জন্য আমি যথাশক্তি চেষ্টা করব। আমি সবকিছু বুঝে নিয়েছি এবং এগারোটা বাজলেই গির্জায় চলে আসব। মেরে অ্যাসেনশান এবং মাদাররা থাকবেন। দু জন পুরুষই যথেষ্ট এ ব্যাপারে। তবে আমি অবশ্যই একটা শাবল আনব। কফিনে পেরেক এটে আমি সমাধির মুখটা খুলব। তার পর কফিনটা সমাধিগহ্বরে নামিয়ে মুখটা আবার বন্ধ করে দেব। এমনভাবে মুখটা বন্ধ করে দেব যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে। সরকার কোনও সন্দেহ করতে পারবে না। তা হলে সব কিছু ঠিক হয়ে গেল মাদার।

    না, সবকিছু ঠিক হয়নি।

    আবার কী বাকি আছে?

    আর একটা খালি কফিন বাইরে থেকে আনা হবে। সেটা নিয়ে আমরা কী করব পিয়ের ফভেন্ত?

    এবার দু জনেই চুপচাপ ভাবতে লাগল।

    তার পর ফশেলেভেন্ত বলল, সে কফিনটা বাইরের সমাধিভূমিতে নিয়ে গিয়ে কবর দেওয়া হবে।

    কিন্তু খালি অবস্থায়?

    আমি কফিনটাতে পেরেক এঁটে দিয়ে তার উপর চাদর ঢাকা দিয়ে দেব।

    কিন্তু শববাহকরা সেটা বয়ে নিয়ে যাবার সময় এবং সমাধির ভেতর সেটা নামাবার সময় কফিনটা হালকা দেখে বুঝতে পারবে তার মধ্যে কিছু নেই।

    ফশেলেভেন্ত কী বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু কথাটা বলা ঠিক হবে না ভেবে তা বলল না। কী বলা ঠিক হবে তা খুঁজতে লাগল মনে মনে।

    অবশেষে বলল, আমি কফিনটার মধ্যে মাটি ভরে দেব। এমনভাবে মাটি ভরে দেব যাতে মনে হবে একটা মৃতদেহ আছে তার মধ্যে।

    হ্যাঁ, এটা করলে ঠিক হবে। মাটি আর মানুষের দেহের মাংস একই জিনিস। কাজটা ঠিকমতো করবে কিন্তু ফভেন্ত।

    নিশ্চয়, অবশ্যই তা করব।

    প্রধানা এবার গম্ভীর মুখে ফশেলেভেন্তের দিকে তাকিয়ে ইশারায় চলে যেতে বলল, ফশেলেভেন্তু যাবার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল। ঘর থেকে সে বার হতেই প্রধানা বললেন, আমি তোমার কাজে সন্তুষ্ট পিয়ের ফভেন্ত। সমাধির কাজ শেষ হয়ে গেলে আগামীকাল তোমার ভাইকে নিয়ে আসবে এবং তার নাতনিকে নিয়ে আসতে বলবে।

    .

    ৪.

    খোঁড়া লোক কানা লোকের মতো সাবধানে পা ফেলে ধীরগতিতে যায়। কনভেন্টের অফিসঘর থেকে তার বাসায় ফিরে আসতে পনেরো মিনিট সময় লেগে গেল। বাসায় ফিরে সে দেখল কসেত্তে তখন ঘুম থেকে জেগে উঠেছে এবং জাঁ ভলজাঁ আগুনের ধারে বসে আছে। আরও দেখল, দেয়ালের উপর টাঙানো মালীর ঝুড়িটা দেখিয়ে ভুল কসেত্তেকে বলছিল, আমার কথা শোন বাছা। এখন আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। তবে আবার আমরা এখানেই ফিরে আসব এবং সুখেই থাকব। মালী ওই ঝুড়িতে তোমাকে চাপিয়ে পিঠে করে বাইরে বয়ে নিয়ে যাবে। একজন মহিলার কাছে সে নিয়ে যাবে তোমাকে। সে তোমার দেখাশোনা করবে। তার পর আমি গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসব। তুমি খুব শান্তভাবে থাকবে। কিন্তু কথা বলবে না। তা হলে মাদাম থেনার্দিয়ের তোমাকে ধরে ফেলবে।

    কসেত্তে গম্ভীরভাবে ঘাড় নাড়ল।

    এবার ভলজাঁ ফশেলেভেন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, কী খবর ভালো তো?

    সবকিছুর ব্যবস্থা হয়ে গেল, আবার কিছুই হয়নি। আমাদের প্রধানা কত্রীর কাছে তোমাদের নিয়ে যাবার জন্য অনুমতি পেয়েছি। কিন্তু সেখানে তোমাদের নিয়ে যাবার আগে তোমাদের বেরিয়ে যেতে হবে যাতে বাইরে থেকে তোমাদের ডেকে আনতে পারি। বাচ্চা মেয়েটা অবশ্য যদি চুপ করে থাকে তা হলে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়াটা কঠিন হবে না।

    ভলজাঁ বলল, সেটা আমি দেখব।

    ফশেলেভেন্ত বলল, কিন্তু পিয়ের ম্যাদলেন, আপনি যে পথে যেমন করে এখানে এসেছেন সেই পথে তেমনি করে বাইরে যেতে পারবেন না?

    সে ভাবল এবার ম্যালেনের কাছ থেকে একটা সদুত্তর পাবে।

    কিন্তু এবারেও ভলজাঁ আগের মতোই শুধু একটা কথা বলল ‘অসম্ভব’।

    ফশেলেভেন্ত তখন বলল, কিন্তু তা হলে তোমাকে বার করব কী করে এখান থেকে?

    এরপর সে বিড়বিড় করে আপন মনে কী বলতে লাগল। এর ওপর আবার একটা সমস্যা এসে দেখা দিল। কফিনটার গোটাটাতে যদি মাটি ভরে দিই তা হলে সেটা খুবই ভারী হবে। আবার যদি তাতে কম করে মাটি ভরা হয় তা হলে সেটাতে মাটিগুলো নড়বে। তা হলে তারা বুঝবে ভেতরে মানুষ নেই। তারা সন্দেহ করবে।

    ভলজাঁ তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ফশেলেভেন্ত আপন মনে বিড়বিড় করে যা বলে যাচ্ছিল তার কিছুই সে বুঝতে পারছিল না। ফশেলেভেন্তু তখন ব্যাপারটা সব বুঝিয়ে বলল ভলজাঁকে। মৃত মাদারকে কোথায় কবর দিতে চায় তারা, খালি কফিনটা মিউনিসিপ্যালিটি থেকে সেটা পাঠানো হবে তাতে কি ভরা হবে, কিভাবে সে ভলজাঁকে তার ভাই বলে প্রধানার কাছে নিয়ে যাবার অনুমতি লাভ করেছে–এই সব কথা ভলকে খুলে বলল প্রথম থেকে। এখন খালি কফিনটা ভর্তি করাই হল প্রধান সমস্যা।

    ভলজাঁ বলল, কোন কফিনের কথা বলছ তুমি?

    মিউনিসিপ্যালিটির কফিন। ডাক্তার একজন সন্ন্যাসিনী মারা গেছে বলে রিপোর্ট দিয়েছে। তাই শুনে মিউনিসিপ্যালিটি একটা কফিন পাঠিয়েছে এবং আগামীকাল শববাহকরা এসে কফিনটা সমাধিভূমিতে নিয়ে যাবে। কিন্তু খালি কফিনটা তুলঁলেই তারা বুঝবে তাতে কোনও মৃতদেহ নেই।

    তা হলে তাতে তোমাকে কিছু ভরতে হবে।

    অন্য কোনও মৃতদেহ? পাব কোথায়?

    একটা জীবন্ত দেহ।

    কী বলতে চাইছ তুমি?

    ভলজাঁ বলল, কেন, আমাকে।

    ফশেলেভেন্ত তার চেয়ার থেকে এমনভাবে লাফ দিয়ে উঠল যেন তার তলায় একটা বোমা ফেটেছে। আশ্চর্য হয়ে বলল, তুমি!

    শীতের মেঘলা আকাশ থেকে মেঘ ভেঙে বেরিয়ে আসা একফালি বিরল সূর্যালোকের মতো একটুখানি হাসি ফুটে উঠল ভলজাঁ’র মুখে। সে বলল, তুমি যখন বলেছিলে মেরে কুসিফিকসিয়ন মারা গেছে তখন আমি তোমাকে বলেছিলাম পিয়ের ম্যাদলেন জীবন্ত সমাহিত হবে। তাই হবে।

    আপনি আসলে ঠাট্টা করছেন। এটা আপনার মনের কথা নয়।

    হ্যাঁ, আমার মনের কথাই বলছি। এ বিষয়ে আমরা দু জনেই একমত হয়েছিলাম যে আমাকে এখান থেকে অদৃশ্য অবস্থায় বেরিয়ে যেতে হবে। তার জন্য তোমাকে একটা ঝুড়ি আর দড়ির খোঁজ করতে বলেছিলাম। এখন তা পেয়ে গেলাম। ঝুড়ির বদলে কফিন পেলাম আর দড়ির বদলে কালো শবাচ্ছাদন।

    কালো নয়, সেটা সাদা।

    ঠিক আছে, সাদা।

    আপনি একজন সাধারণ লোক নন পিয়ের ম্যাদলেন।

    ফশেলেভেন্ত জানত জেলের কয়েদিরা মরিয়া হয়ে এইভাবে কৌশলে পালায়; কিন্তু জেলখানার শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশের মধ্যে থেকে কিভাবে এ কাজ সম্ভব হবে তা সে বুঝে উঠতে পারল না। তার মনে হল যে র‍্যু সেন্ট ভেনিসের রাস্তার ধারে খালে একটা বককে মাছ ধরতে দেখেছে।

    জাঁ ভলজাঁ বলল, আমাকে যেমন করে তোক অদৃশ্যভাবে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে এবং এটাই হল একমাত্র উপায়। কিন্তু খালি কফিনটাকে কোথায় পাওয়া যাবে? কোথায় সেটা থাকবে?

    গির্জায় মৃতদেহ রাখার ঘরে যেটাকে মচুয়ারি চেম্বার বলা হয় তার উপর একটা শবাচ্ছাদন থাকবে।

    সেটা কতটা লম্বা?

    ছয় ফুট।

    ঘরটা কোথায় তা বল।

    বাগানের ধারে একটা বাড়ির একতলায় হল ঘরটা। লোহার রড দিয়ে ঘেরা একটা জানালা আছে বাগানের দিকে আর দু দিকে দুটো দরজা আছে–একটা রাস্তার দিকে, আর একটা গির্জার দিকে।

    এই দুটো দরজার চাবি তোমার কাছে আছে?

    না, শুধু গির্জার দিকের দরজার চাবি আমার কাছে আছে। অন্য দরজার চাবি আছে দারোয়ানের কাছে।

    সে চাবি কখন খোলে সে?

    শুধু শববাহকরা বাইরে থেকে কফিন নিয়ে যাবার জন্য এলে দরজার তালা খোলে। তারা কফিন নিয়ে চলে যেতে আবার বন্ধ করে দেয় দরজাটা।

    কে পেরেক আঁটে কফিনে?

    আমি।

    আর তুমিই শবাচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে দাও কফিনটাকে?

    হ্যাঁ।

    তুমি একা থাকবে?

    হ্যাঁ, পুলিশের লোক, ডাক্তার আর শববাহকরা ছাড়া বাইরের কোনও লোক ঢুকতে পারে না। দরজার উপর তা লেখা আছে।

    রাত্রিতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তুমি ঘরটার মধ্যে একজনকে লুকিয়ে রাখতে পারবে?

    ঘরটায় নয়, তার পাশে ছোট্ট একটা ঘর আছে যেখানে আমি আমার যন্ত্রপাতি রাখি। সে ঘরের চাবি আমার কাছে আছে।

    আগামীকাল শববাহকরা বাতিদান নিয়ে কখন আসবে?

    কাল বিকাল তিনটেয়। ভগিয়ার্দের কবরখানায় কফিনটা সমাহিত হবে সন্ধ্যার আগে। এখান থেকে কিছুদূরে জায়গাটা।

    আমাকে তা হলে সারারাত এবং অর্ধেক দিন সেই ছোট্ট ঘরটার মাঝে থাকতে হবে। তা হলে আমার খাবার চাই।

    আমি তোমাকে কিছু খাবার দেব।

    তুমি কাল বেলা দুটোর সময় আমার কফিনে পেরেক এঁটে দেবে।

    ফশেলেভেন্ত আবার চেয়ারে বসে পড়ে বলল, অসম্ভব। বাজে।

    একটা কফিনে কতকগুলি পেরেক আঁটা কী এমন কঠিন কাজ? ফশেলেভেন্তের কাছে যেটা অসম্ভব ও অকল্পনীয় ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল, ভলজাঁ’র কাছে সেটা একসঙ্গে সরল এবং সহজ ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল। এর থেকে আরও অনেক খারাপ ঘটনার কথা জানে সে। যারা দীর্ঘদিন জেলে থাকে তারা পালাতে গিয়ে যে কোনও বস্তুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শেখে। কয়েদিদের কাছে পালানোর ব্যাপারটা এক গুরুতর অসুখের মতো, যা হয় সেরে যায় অথবা মানুষের মৃত্যু ঘটায়। এই রোগ সারাবার জন্যই কয়েক ঘণ্টা পেরেক আঁটা কফিনের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হবে। সে ক্ষমতা আছে ভলজাঁর। যাজক অস্টিন কাস্তিলেদো বলতেন সিংহাসনচ্যুতির পর পঞ্চম চার্লস লা প্পন্বেকে শেষবারের মতো দেখতে যান কফিনের মধ্যে শুয়ে। তাঁকে সেন্ট জন চার্চে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন।

    ফশেলেভেন্তের এতক্ষণে হুঁশ হল। বলল, কিন্তু কী করে তুমি নিশ্বাস নেবে? ভাবতেও ভয় লাগছে আমার।

    আমার মুখের কাছে ঢাকনার উপর কয়েকটা ছিদ্র করে দেবে। আর ঢাকনাটা খুব বেশি আঁট করে বন্ধ করবে না।

    ঠিক আছে। কিন্তু তুমি যদি হাঁচ বা কাশ?

    পলাতক কয়েদি কখনও হাঁচে-কাশে না। এসব ক্ষেত্রে আমাদের শক্ত হয়ে থাকতে হয়। হয় আমাকে এখানে ধরা পড়তে হবে অথবা ওখানে কফিনের ভেতর ঢুকে যেতে হবে।

    কোনও বিড়াল যেমন খোলা দরজার ভেতর দিয়ে ঘরে ঢোকার আগে ইতস্তত করতে থাকে তেমনি অনেক সদাসতর্ক ব্যক্তি আছে যারা কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মুহূর্তে ভাবতে থাকে। এই সব ব্যক্তি সাহসী লোকদের থেকে বেশি বিপদের ঝুঁকি নেয়। ফশেলেভেন্ত ছিল এই ধরনের এক ব্যক্তি। কিন্তু ভলজাঁ’র অবিচলিতচিত্ততা তাকে বেশি ভাবিয়ে তুলঁল। সে বলল, আমিও তাই মনে করি। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

    ভলজাঁ বলল, আমি শুধু ভাবছি কবরখানায় কী হবে?

    ফশেলেভেন্ত বলল, সেটা কোনও সমস্যা নয়। তুমি যদি কফিনের মধ্যে টিকে থাকতে পার তা হলে আমি তোমাকে কবর থেকে ঠিক বার করব। কবরখননকারী পিয়ের মেস্তিয়েন একজন বৃদ্ধ মাতাল লোক, সে আমার পরিচিত। তাকে সহজেই বশে আনা যাবে। সেখানে কী হবে আমি তোমাকে আগেই বলে দিতে পারি। আমরা সেখানে সন্ধ্যার আগেই পৌঁছব অর্থাৎ কবরখানা বন্ধ হবার পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে। শববাহকেরা তোমার কফিনটা বয়ে নিয়ে যাবে যখন, তখন আমি তাদের পিছু পিছু যাব। আমার পকেটে কিছু যন্ত্রপাতি থাকবে। কফিনে দড়ি বেঁধে ওরা কফিনটাকে কবরের মধ্যে নামাবে। তার পর প্রার্থনা হবে, যাজক পবিত্র শান্তিজল ছিটোবে, ক্রস আঁকবে। তার পর ওরা সবাই চলে যাবে, থাকবে শুধু পিয়ের মেস্তিয়েন আর আমি। সে আমার বন্ধু, সে কথা আগেই বলেছি। সে হয় আগে থেকেই মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকবে আর যদি তা না হয় তা হলে তাকে বলব, একগ্লাস মদ পান করে নাও দোকান খোলা থাকতে। তাকে আমি ঠিক মাতাল করে তুলঁব, কারণ সে সব সময়ই অর্ধমাতাল হয়ে থাকে। তাকে আমি কবরখানার প্রতীক্ষাগারে টেবিলের তলায় শুইয়ে একা কবরে চলে যাব। সে মাতাল হয়ে উঠলে আমি তখন তাকে বলব, তুমি বাড়ি যাও। আমি তোমার সব কাজ করে দেব। তা হলে আমি কবরখানায় একা থাকব এবং তোমাকে কবর থেকে সহজেই বার করব।

    জাঁ ভলজাঁ তার একটা হাত বাড়িয়ে দিল এবং ফশেলেভেন্তু তার কৃষকসুলভ নিষ্ঠার সঙ্গে সে হাতটা জড়িয়ে ধরল।

    ভলজাঁ বলল, তা হলে সব ঠিক হয়ে গেল ফশেলেভেন্ত। আমাদের কোনও বেগ পেতে হবে না।

    ফশেলেভেন্ত চিন্তান্বিতভাবে বলল, যদি কোনও প্রতিকূল ঘটনা না ঘটে। হে ভগবান, ঠিকভাবে যেন সবকিছু ঘটে।

    .

    ৫.

    পরদিন বিকালবেলায় বুলভার্দ দু মইন অঞ্চলের পথচারীরা এক পুরনো ধরনের শবযাত্রা রাস্তা দিয়ে চলে যেতে দেখে তাদের টুপি খুলে শ্রদ্ধা জানায় মৃতের প্রতি। এক সাদা শবাচ্ছাদন দিয়ে কফিনটা ঢাকা ছিল। সেই চাদরটার উপর একটা কালো ক্রস আঁকা ছিল। শববাহকদের পেছনে একটা গাড়ি ছিল। সেই গাড়িতে একজন যাজক আর লাল টুপি মাথায় একজন প্রার্থনার গান গাওয়ার জন্য একটা ছেলে ছিল। কালো পোশাকপরা দু জন শববাহক শবের দু পাশে যাচ্ছিল। সকলের পেছনে একজন খোঁড়া বুড়ো লোক হাঁটছিল। তার কাছে ছিল একটা হাতুড়ি, একটা বাটালি আর একটা সাঁড়াশি।

    শবযাত্রাটি ভগিয়ার্দের কবরখানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেকালে প্যারিসের অন্যান্য কবরখানা থেকে ভগিয়ার্দের কবরখানার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, কারণ তার কতকগুলি নিজস্ব রীতিনীতি ছিল। প্যারিসের সব কবরখানা সন্ধ্যার সময় বন্ধ হয়ে গেলেও ভগিয়ার্দের কবরখানাটা পেতিত পিকপাসের বার্নার্দ ও বেনেডিক্ট সম্প্রদায়ের অধিকারে ছিল বলে তাদের সম্প্রদায়ের লোকরা মৃত ব্যক্তিদের সন্ধ্যার পরেও সমাহিত করার এক বিশেষ অনুমতি পায়। ভগিয়ার্দের কবরখানায় দু দিকে দুটো লোহার গেট ছিল। সূর্য অস্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গে গেট দুটোয় তালা পড়ে যেত। তখনও যদি পেতিত পিকপাসের কনভেন্টের কোনও মৃত সন্ন্যাসিনীকে সমাহিত করার কাজ শেষ না হত, যদি কোনও কবরখননকারী রয়ে যেত ভেতরে তা হলে তার কাজ শেষ হলে সে দারোয়ানের কাছে গিয়ে তার বিশেষ ছাড়পত্র দেখিয়ে তবে বার হতে পারত। অথবা ছাড়পত্র না থাকলে তার নাম বলত দারোয়ানকে। তখন দারোয়ান গেটের চাবি খুলে দিত।

    আমরা যে সময়ের কথা লিখছি তখন ভগিয়ার্দের কবরখানার অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। এখানে-সেখানে শ্যাওলা পড়ে। তার মাঝে কোথাও কোনও ফুল ফুটত না। সমাধিস্তম্ভগুলোর উপর ইউগাছ আর লম্বা লম্বা ঘাস গজিয়ে উঠেছিল।

    ভগিয়ার্দের কবরখানার গেটের কাছে এসে সেদিন যখন শবযাত্রাটা থামল তখন সূর্য অস্ত যায়নি। তাদের পেছনে ছিল ফশেলেভেন্ত। তাকে বেশ উফুল্ল দেখাচ্ছিল। এতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পূর্বপরিকল্পনা মতোই সবকিছু ঘটেছে। মেরে কুসিফিকসিয়নকে বেদির তলায় সেই গোপন সমাধিগহ্বরে যথাসময়ে সমাহিত করা হয়েছে। কসেত্তেকে সেইখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ম্যাদলেনকে খালি কফিনে শুইয়ে পেরেক এঁটে দিয়ে সেই কফিনটাকে এখানে আনা হয়েছে। একদিকে কনভেন্টের প্রধান অন্যদিকে মঁসিয়ে ম্যাদলেন–দু দিকে দুটি চক্রান্তের সঙ্গেই লিপ্ত হয়ে পড়েছে সে। যে চক্রান্ত এতক্ষণ পর্যন্ত বিনা বাধায় সম্পন্ন হয়েছে। ভলজাঁ শান্তভাবে কফিনের মধ্যে আছে দেখে তাদের চূড়ান্ত সাফল্য সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহ রইল না ফশেলেভেন্তের মনে। আর যা কিছু তার করার আছে তা অতি তুচ্ছ ব্যাপার। এর আগে প্রায় একডজনবার কবরখননকারী পিয়ের মেস্তিয়েনকে মদ খাইয়ে মাতাল করে তুলেছে। সে তার পকেটে। সে তাকে দিয়ে যা খুশি করাতে পারবে। এ বিষয়ে তার কোনও চিন্তা-ভাবনা নেই।

    গেটে এসে সমাধি দেবার ছাড়পত্র দেখাতে হল দারোয়ানকে। আসার পথে একজন অপরিচিত লোক অংশগ্রহণ করে শবযাত্রায়। সে ফশেলেভেন্তের পাশে পাশে পথ হাঁটছিল।

    ফশেলেভেন্ত একসময় লোকটাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে?

    লোকটা উত্তর করল, কবরখননকারী।

    ফশেলেভেন্ত আশ্চর্য হয়ে বলল, পিয়ের মেস্তিয়েন তো কবরখননকারী।

    লোকটা বলল, আগে তাই ছিল।

    তার মানে কী বলতে চাইছ তুমি?

    সে মারা গেছে।

    এই দুঃসংবাদের জন্য প্রস্তুত ছিল না ফশেলেভেন্ত।

    সে এটা কোনওক্রমেই আশা করতে পারেনি। সে ভাবতেই পারেনি যে লোক সব মৃতদেহের জন্য কবর খোড়ে, সে মারা যাবে। তবু তার মৃত্যু ঘটেছে।

    ফশেলেভেন্তু হাঁ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার যেন কথা বলার শক্তি নেই। তার মুখ থেকে শুধু বেরিয়ে এল, অসম্ভব।

    কিন্তু এটা সত্যি।

    ফশেলেভেন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, কিন্তু পিয়ের মেস্তিয়েন চিরকাল কবর খুঁড়ে আসছে। লোকটা বলল, আর খুঁড়বে না। নেপোলিয়নের পর যেমন অষ্টাদশ লুই, মেস্তিয়েনের পর তেমনি গ্রিবার। আমার নাম গ্রিবার।

    ফশেলেভেন্ত গ্রিবারের দিকে তাকিয়ে রইল। গ্রিবারের চেহারাটা লম্বা আর রোগা। তার মুখটা গম্ভীর ধরনের। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন ডাক্তার হতে না পেরে কবরখননকারী হয়েছে। ফশেলেভেন্ত হাসতে লাগল। সে বলল, তা হলে বেচারা মেস্তিয়েন মারা গেল। কিন্তু পিয়ের লেনয়ের বেঁচে আছে। তাকে চেন? এক জগ ভালো লাল মদ নিয়ে সব সময় বসে আছে। পিয়ের মেস্তিয়েনের জন্য দুঃখ হয়। সে জীবনটাকে ভোগ করেছে। তুমিও বন্ধু জীবনকে ভোগ কর। চল, দু জনে কিছুক্ষণ মদ খাওয়া যাক।

    লোকটা বলল, আমি লেখাপড়া শিখেছি, আমি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। আমি মদ খাই না।

    শবযাত্রা আবার এগিয়ে চলতে লাগল। কবরখানার বড় রাস্তাটা ধরল। ফশেলেভেন্ত পিছিয়ে পড়ল। দুর্বলতার সঙ্গে মানসিক উত্তেজনার জন্য হাঁটতে পারছিল না ঠিকমতো। সে আবার গ্রিবারের দিকে তাকাল। গ্রিবার লোকটা বয়সে যুবক হলেও তাকে বুড়োর মতো দেখাচ্ছে। তার চেহারাটা রোগা হলেও বেশ শক্ত।

    ফশেলেভেন্ত বলল, বন্ধু, আমি হচ্ছি কনভেন্টের কবরখননকারী।

    গ্রিবার বলল, তা হলে আমরা সহকর্মী।

    লেখাপড়া না শিখলেও ফশেলেভেন্ত কূট বুদ্ধিসম্পন্ন। সে বুঝতে পারল, তাকে ভয়ঙ্কর ধরনের এমন এক লোককে নিয়ে চলতে হবে যে ভালো কথা বলতে পারে, যার যুক্তিবোধ আছে। সে আপন মনে বলে উঠল, তা হলে মেস্তিয়েন মারা গেল।

    গ্রিবার বলল, হ্যাঁ, ঈশ্বর তার খাতা খুলে দেখল তার দিন ফুরিয়ে গেছে। তার মৃত্যুর। পালা এসে গেছে। তাই মারা গেল।

    ফশেলেভেন্ত বলল, হা ভগবান!

    গ্রিবার বলল, হা ভগবান! দার্শনিকরা বলে, চিরন্তন পরম পিতা। জ্যাকবিয়ানরা বলে, পরম সত্তা।

    ফশেলেভেন্ত বলল, আমরা পরস্পরের পরিচিত।

    গ্রিবার বলল, আমরা পরস্পরকে চিনি। তুমি একজন গ্রাম্য লোক আর আমি প্যারিস শহরের লোক।

    ফশেলৈভেন্তু বলল, একসঙ্গে দু জনে মদপান না করলে পরস্পরকে চেনা যায় না। মদের গ্লাস পান করার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ মনের কথা সব বলে। দু জনে বসে আগে মদ খেতে হবে। এটা তুমি অস্বীকার করতে পার না।

    আগে আমাদের কাজ সারতে হবে।

    ফশৈলেভেন্ত ভাবল, আমার দফা শেষ হয়ে গেল।

    তারা সেই জায়গাটায় পৌঁছল যেখানে সন্ন্যাসিনীরা দাঁড়ায়। গ্রিবার ফশেলেভেন্তুকে বলল, বন্ধু, সাতটা ছেলেকে আমার খাওয়াতে হয়। মদ খাব কী করে? তাদের ক্ষুধাই আমার মদের পিপাসার শত্রু।

    শবযাত্রাটা এবার একটা সরু পথ ধরল। বৃষ্টির জলে পথটায় কাদা হয়ে গিয়েছিল। ফশেলেভেন্ত গ্রিবারের কাছে সরে এল। সে বলল, আর্জেন্টিনার একটু ভালো মদ আছে।

    গ্রিবার বলল, তুমি ব্যাপারটা বোঝ, কবরখননকারী হবার আমার কোনও অধিকারই নেই। আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনো করি। কিন্তু তিনি দুর্ভাগ্যের কবলে পড়েন। কারবারে তার সব টাকা খোয়া যায়। আমি পড়াশোনা ত্যাগ করতে বাধ্য হই। এখনও বাজারের বই লিখি।

    ফশেলেভেন্তু তার জামার আস্তিনটা ধরে বলল, তার মানে তুমি একজন কবরখননকারী নও।

    অবশ্য আমার কাছে সব কাজই সমান। আমি একজন বহুত্ববাদী।

    গ্রিবারের শেষের কথাটা ফশেলেভেন্তের বোধগম্য হল না কিছুতে। সে বলল, তোমাকে এখন কিছু মদ খেতে হবে।

    এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। সে মদ খাবার কথা বলেছে। এ বিষয়ে তার প্রচুর আগ্রহ ও উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সে মদের দামটা কে দেবে সে বিষয়ে সে কিছুই বলেনি। এ ব্যাপারে মেস্তিয়েনের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল। সে তাকে মদ খাবার কথাটা বললেও মদের দামটা মেস্তিয়েই দিত। কিন্তু পরিবর্তিত অবস্থায় মদের দাম দেবার প্রস্তাবটা তারই করা উচিত ছিল। এ বিষয়ে তার ভয় থাকা সত্ত্বেও সে দাম দিতে চায়নি।

    গ্রিবার হাসতে লাগল। সে বলল, পেটে খেতে হবে সবাইকে। আমি পিয়ের মেস্তিয়েনের কাজের ভারটা নিতে নিজেই রাজি হয়েছিলাম। পড়াশোনা শেষ হয়ে গেলেই যে কোনও লোক একদিক দিয়ে দার্শনিক হয়ে ওঠে। কলম দিয়ে লেখার কাজ শেষ করে। আমি হাতের কাজ শুরু করেছি। বাজারে র‍্যু দ্য বেভারেতে এখনও আমার একটা বই-এর দোকান আছে। তুমি জান কি না তা জানি না। ক্রয় রোগ অঞ্চলের যেসব মেয়ে রান্নাঘরে ঝি-এর কাজ করে, তারা আমার কাছে চিঠি লেখাতে আসে। আমি সারাদিন ধরে প্রেমের চিঠি লিখি আর বিকালবেলায় কবর খোঁড়ার কাজ করি। এই হচ্ছে আমার জীবন।

    শবযাত্রা কবরখানার ভেতরে আসল জায়গার দিকে এগিয়ে চলল। দুশ্চিন্তায় ফশেলেভেন্তের কপালে ঘাম দেখা দিল।

    গ্রিবার বলল, কিন্তু দুটো কাজ একসঙ্গে চলতে পারে না। হয় কলম–না হয় কোদাল, দুটোর মধ্যে একটা বেছে নিতেই হবে আমাকে। কোদাল ধরে ধরে আমার হাতে ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে।

    একটা মুখখোলা কবরের সামনে এসে শবযাত্রাটা থেমে গেল।

    .

    ৬.

    ভলজাঁ তার কফিনের মধ্যে এমন একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছিল যাতে সে প্রয়োজনমতো নিশ্বাস নিতে পারে। দেহমনের স্বস্তি থেকে একটা আশ্চর্য নিরাপত্তাবোধ জেগেছিল তার মধ্যে। তার পরিকল্পনা প্রথম থেকেই কার্যকরী হয়ে আসছিল। ফশেলেভেন্তের মতো সে-ও মেস্তিয়েনের ওপর নির্ভর করেছিল অনেকখানি এবং পূর্বকল্পিত পরিণাম সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ ছিল না তার মনে। এতখানি সংকটজনক মূহূর্তে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এতখানি মানসিক প্রশান্তি কেউ কখনও দেখাতে পারেনি তার মতো।

    কফিনের চার-দেয়ালের মধ্যে সেই প্রশান্তি বিরাজ করছিল। সে তার ভেতর থেকে সেই নাটকের গতিবিধি বুঝতে পারছিল যে নাটকে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মৃত্যু। কফিনটাতে ফশেলেভেন্তে পেরেক এঁটে দেবার পরই সে অনুভব করে কফিনটাকে তোলা হয় একটা চাকাওয়ালা গাড়ির উপর। কফিনের গাড়িটা প্রথমে পাথরভরা এবড়ো খেবড়ো পথের উপর দিয়ে যেতে থাকে এবং তার ফলে খুব ঝাঁকুনি হতে থাকে। তার পর বুলভার্দের মসৃণ পথের উপর দিয়ে চলতে থাকে। গাড়িটা যখন প্রথম থামে তখন ভলজাঁ বুঝতে পারে এরা কবরখানায় এসে গেছে। তার পর চলতে শুরু করে আবার যখন থেমে যায় তখন সে বুঝতে পারে এবার সমাধির জায়গায় এসে গেছে। এরপর কফিনটা একবার ঝাঁকুনি খেল। তাতে দড়ি বেঁধে সেটাকে কবরের মধ্যে নামানো হল।

    হঠাৎ ভলজাঁ’র মনে হল সে মাথার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পর কফিনটাকে শুইয়ে দেওয়া হল। সে বুঝতে পারল সে কবরের তলায় শুয়ে আছে। একটা শিরশিরে অনুভূতির ঢেউ খেলে গেল তার মধ্যে। সে শুনতে পেল উপরে শান্ত ও গুরুগম্ভীর কণ্ঠে লাতিন ভাষায় কে মন্ত্রপাঠ করছে। একটা বালককণ্ঠ বলে উঠল, “দে পোফান্দিস। যে যাজক মন্ত্র পড়ছিলেন তিনি বললেন, হে প্রভু, চিরশান্তি দান কর তার আত্মাকে। এরপর কফিনের উপর পবিত্র জল ছিটানো হতে লাগল।

    ভলজাঁ ভাবল, এরপর ওরা চলে যাবে আর ফশেলেভেন্ত মেস্তিয়েনকে মদ খেতে পাঠিয়ে দিয়ে তাকে মুক্ত করবে। সে বেরিয়ে আসবে। সে সমাধির উপর কতকগুলি পদশব্দ শুনতে পেল। কিন্তু পরক্ষণেই তার কফিনের উপর মাটি পড়তে লাগল। একটা একটা করে মাটির চাপ পড়তে লাগল। ভলজাঁ আশ্চর্য হয়ে গেল। সমাধির গর্তটা বুজে যাচ্ছে ক্রমশ।

    আর সহ্য করতে পারল না ভলজাঁ। তার শ্বাস-প্রশ্বাস নেবার পথ বন্ধ হয়ে গেল। সে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল।

    .

    ৭.

    এরপর সমাধিভূমিতে যা ঘটেছিল তা হল এই।

    শববাহকরা পুরোহিতকে নিয়ে চলে গেলে গ্রিবার কোদাল নিয়ে সমাধির গর্তটা বোজাতে গেল। ফশেলৈভেন্তে তখন কবর আর গ্রিবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চরম ত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে হাতজোড় করে বলল, আমি দাম দেব।

    তার পানে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে গ্রিবার বলল, কিসের দাম দেবে?

    আমি বলছি, আমি দাম দেব।

    কিসের দাম?

    মদের দাম। আর্জেন্টিনার ভালো মদ।

    কোথায় পাওয়া যায় সেই মদ?

    বন ফোয়িং-এ।

    জাহান্নামে যাও।

    এই বলে এককোদাল মাটি সমাধির ভেতর কফিনের উপর ফেলে দিল গ্রিবার।

    ফশেলেভেন্তের পা দুটো জোর কাঁপতে লাগল। মনে হল সে যেন নিজেই কবরের ভেতরে পড়ে যাবে। সে আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু বন্ধু, দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।

    সে কথা গ্রাহ্য না করে আবার মাটি কাটায় মন দিল গ্রিবার।

    ফশেলেভেন্ত তার একটা হাত ধরে বলল, আমি দাম দেব। শোন বন্ধু, আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি। এ কাজ সন্ধের পর করলেও চলবে। মদপান করার পর আমরা এ কাজ শেষ করব।

    গ্রিবারকে সে ধরে রইল মরিয়া হয়ে। তার তখন শুধু এই ভাবনা হতে লাগল তাকে মদ খাওয়ালেও সে মাতাল হবে কি?

    গ্রিবার বলল, ঠিক আছে, আমি তোমার সঙ্গে মদ খেতে পারি। কিন্তু কাজটা শেষ করার পর।

    আবার কোদালের উপর ঝুঁকে পড়ল। ফশেলেভেন্ত তাকে বাধা দেবার চেষ্টা করল। বলল, ছয় স্যুতে ভালো মদ।

    গ্রিবার বলল, তুমি শুধু ঘণ্টার মতো একটানা বেজে চলেছ। এখন যাও।

    এই বলে আবার এককোদাল মাটি ফেলে দিল গ্রিবার। ফশেলেভেন্তের মনের অবস্থাটা তখন এমনই হয়ে উঠল যে সে কী বলছে তা সে নিজেই জানে না। সে বলল, একটুখানি মদ খাব, আমি দাম দেব।

    গ্রিবার আপন মনে বলে চলতে লাগল, আজ রাতে বড় ঠাণ্ডা পড়বে। বুড়িটা মরে পড়ে আছে, আগে মাটি ঢাকা দিতে হবে। তা না হলে আমাদের তাড়া করবে।

    গ্রিবার যখন চতুর্থবার এককোদাল মাটি দিতে যাচ্ছিল তখন তার পকেটে একটা জিনিস লক্ষ করল ফশেলেভেন্ত। গ্রিবারকে একমনে কাজ করতে দেখে সে তার একটা হাত দিয়ে পকেট থেকে সেই জিনিসটা তুলে নিল।

    গ্রিবার এককোদাল মাটি ফেলে দিতেই ফশেলেভেন্ত বলল, আচ্ছা তোমার বেরিয়ে যাবার জন্য কার্ড আছে তো?

    গ্রিবার তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, কী কার্ডঃ

    এখন সন্ধে হয়ে আসছে। গেট বন্ধ হয়ে যাবে।

    তা হলে?

    তোমার কার্ড আছে তো?

    গ্রিবার তার পকেটে হাত দিয়ে দেখল। না পেয়ে তার পোশাকগুলোতে তন্ন তন্ন করে। খুঁজল। কিন্তু পেল না কার্ডটা। তখন বলল, তা হলে আমি ভুলে গেছি।

    ফশেলেভেন্ত বলল, তা হলে পনেরো ফ্ৰাঁ জরিমানা লাগবে।

    গ্রিবারের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পনেরো ফ্ৰাঁ জরিমানা!

    তার মানে তিনশো স্যু গুনে দিতে হবে।

    গ্রিবার কোদালটা নামিয়ে রাখল।

    এবার সুযোগ বুঝে ফশেলেভেন্ত বলল, হতাশ হবার কারণ নেই। আত্মহত্যা করে কবর ভরিয়ে কাজ নেই। পনেরো ফ্ৰাঁ তুমি দিতে পারবে না। আমার বয়স হয়েছে। কিসে কী হয় আমার সব জানা আছে। কী করতে হবে না হবে পরে বলে দেব। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গেট বন্ধ হয়ে যাবে।

    তা ঠিক। এ কবরের খালটা বেশি। গেট বন্ধ হবার আগে কবর বোজাতে পারব না।

    তা ঠিক। তবে এখনও সময় আছে, তুমি কোথায় থাক?

    আমি থাকি ব্যারিয়ারের কাছে, ৮৭ নম্বর র‍্যু দ্য ভগিয়ার্দে। পনেরো মিনিটের পথ।

    তুমি এখনি ছুটে চলে যাও। বাড়িতে কার্ডটা খুঁজে দেখগে। পেলে ফিরে আসবে। জরিমানা দিতে হবে না তোমাকে। আমি ততক্ষণ এখানে বসে পাহারা দেব।

    খুব ভালো কথা।

    তা হলে চলে যাও।

    গ্রিবার ছুটতে শুরু করে দিল। সাইপ্রেস গাছের আড়ালে কিছুক্ষণের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল সে।

    ফশেলেভেন্ত কবরের উপর ঝুঁকে ডাকল, পিয়ের ম্যাদলেন! কোনও উত্তর নেই।

    ভয়ে কাঁপতে লাগল ফশেলেভেন্ত। সে কবরের তলায় নেমে গিয়ে কফিনের কাছে। মুখটা নিয়ে গিয়ে বলল, আপনি আছেন?

    কোনও কথা নেই।

    কাঁপতে কাঁপতে ফশেলেভেন্ত কফিনের উপর হতে মাটিগুলো সরিয়ে কফিনের ঢাকনাটা তুলঁল। তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল। দেখল ম্যালেনের চোখ দুটো বন্ধ, মুখখানা অন্ধকারেও সাদা দেখাচ্ছে।

    ফশেলেভেন্তের মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল। সে কফিনের উপর পড়ে যাচ্ছিল কাঁপতে কাঁপতে। ভলজাঁ’র নীরব নিস্তব্ধ শায়িত মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল, সে হয়তো মারা গেছে। সে তার বুক চাপড়ে বলল, এইভাবে তাকে আমি উদ্ধার করলাম বিপদ থেকে!’ সে কাঁদতে লাগল।

    কাঁদতে কাঁদতে সে বলতে লাগল, এই সবকিছু হল শুধু পিয়ের মেস্তিয়েনের জন্য। যখন তার দরকার তখনি সে মারা গেল। পিয়ের ম্যাদলেন কবরেই মারা গেল। সে মারা গেল। এখন মেয়েটার কী হবে, তাকে নিয়ে কী করব সেই কথাই ভাবছি। ফলের দোকানের মেয়েটাই-বা কী বলবে। এরপর ঈশ্বরে আর বিশ্বাস রাখা যায় না। পিয়ের ম্যাদলেন আমাকে গাড়ির ভেতর থেকে কত কষ্টে উদ্ধার করেছিলেন। বোধহয় শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ চলে গেল। এ হল ভাগ্যের চক্রান্ত। এরপর আর আমি কনভেন্টে ফিরে যাব না। আমরা দু জন বুড়ো লোক কত ভালো থাকতাম একসঙ্গে। পিয়ের ম্যাদলেন। মঁসিয়ে লা মেয়র। আর তিনি শুনতে পাবেন না।

    এবার সে তার মাথার চুল ছিঁড়তে লাগল। তার পর আবার ভলজাঁ’র উপর ঝুঁকে দেখতে লাগল। হঠাৎ চমকে উঠল সে। দেখল ভলজাঁ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।

    স্তম্ভিত হয়ে গেল ফশেলেভেন্ত। ভলজাঁ বলল, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

    ফশেলেভেন্ত আনন্দে চিৎকার করে উঠল, হে স্বর্গের মাতা, তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।

    ভলজাঁর মতোই নিজেকে আবেগের কবল থেকে সামলে নিতে দেরি হল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলতে লাগল, তা হলে তুমি মরনি! তোমার মনের জোর আছে তা হলে! আমি অনেক ডেকেছি তোমায়। তবে তোমার জ্ঞান ফিরেছে। যখন দেখলাম তোমার চোখদুটো বন্ধ, তখন ভাবলাম তোমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে গেছে। আমি পাগল হয়ে যেতে বসেছিলাম। তুমি মারা গেলে কী হত? কী করতাম আমি। বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়েই-বা আমরা কী করতাম? তুমি তা হলে এতক্ষণ বেঁচে ছিলে?

    ভলজাঁ বলল, আমার খুব শীত লাগছে।

    কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব অবস্থার প্রতি সচেতন হয়ে উঠল ফশেলেভেন্ত। দু জনের মন তখন ঠিক হয়ে উঠলেও কবরখানার সান্ধ্য নির্জন পরিবেশ তাদের ভালো লাগছিল না।

    ফশেলেভেন্ত বলল, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে যেতে হবে। তার আগে একফোঁটা করে মদ গলায় ঢালতে হবে।

    এই বলে তার পকেট থেকে মদের একটা ফ্লাস্ক বার করল। কিছুটা মদ পান করায় দেহে শক্তি ফিরে পেল ভলজাঁ। সে কফিন থেকে বেরিয়ে এল। ফশেলেভেন্তু পেরেক এঁটে দিল কফিনের ঢাকনাটাতে।

    এতক্ষণে মনে মনে শান্ত এবং নিশ্চিন্ত হয়ে উঠল ফশেলেভেন্ত। এখন কবরখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রিবারও তার কার্ড খুঁজতে বাড়ি চলে গেছে। কার্ড সে পাবে না, সুতরাং আর এখন ফিরে আসবে না। তার কার্ড এখন ফশেলেভেন্তের পকেটে। তাকে ভয়ের আর কিছু নেই এখন। ফশেলেভেন্ত কোদাল হাতে নিল এবং ভলজাঁ নিল গাইতিটা। মাটি দিয়ে কবরের খালটা বুজিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল। সে পথে শবযাত্রা কবরখানায় ঢুকেছিল সেই পথ দিয়েই বেরিয়ে পড়ল ওরা। ভলজাঁর পাগুলো শক্ত কাঠ হয়ে ছিল। সে ঠিকমতো হাঁটতে পারছিল না। সে বলল, অল্প সময়ের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

    গেট দিয়ে বার হবার সময় ফশেলেভেন্ত কার্ডটা চিঠির বাক্সে ফেলে দিতেই দারোয়ান দরজা খুলে দিল এবং ওরা তখন বেরিয়ে গেল।

    ফশেলেভেন্ত বলল, সবকিছু কত ভালোভাবে হয়ে গেল। তোমার পরিকল্পনাটা চমঙ্কার পিয়ের ম্যাদলেন।

    ভগিয়ার্দে ব্যারিয়ার অঞ্চলের মধ্য দিয়ে নিরাপদে ওরা চলে গেল। সমাধিভূমি অঞ্চলে কারও হাতে কোদাল গাঁইতি থাকলে সেটা তার ছাড়পত্রের কাজ করে। র‍্যু দ্য ভগিয়ার্দ অঞ্চলটা সন্ধ্যার সময় খুব নির্জন থাকে।

    সামনের দিকের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ফশেলেভেন্ত বলল, আমার থেকে তোমার চোখের দৃষ্টি ভালো আছে। দেখ তো ৮৭ নম্বর বাড়ি কোনটা।

    ভলজাঁ বলল, আমরা তো এসে গেছি।

    ফশেলেভেন্তু বলল, আমার হাতের গাঁইতি-কোদালটা নিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর।

    এরপর সে ৮৭ নম্বর বাড়িটার উপরতলায় চলে গিয়ে একটা রুদ্ধ দরজায় করাঘাত করল।

    গ্রিবার ভেতর থেকে তাকে যেতে বলল।

    গ্রিবারের বাসাটা একটা ঘরের মধ্যে। ছোট ঘরখানা কফিনের মতোই অন্ধকার আর বুকচাপা। মেঝের উপর পাতা একটা মাদুর বিছানার কাজ করে। ঘরটার এককোণে একটা ছেঁড়া কার্পেটের উপর একটি রোগা মহিলা বসে আছে, তার চারপাশে একদল ছেলেমেয়ে। গোটা ঘরটা কে যেন ওলট-পালট করেছে। ঘরময় জিনিসপত্র সব ছড়ানো। মহিলাটি বসে বসে কাঁদছে। ছেলেগুলোও বোধ হয় মার খেয়েছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কবরখননকারী গ্রিবার তার কার্ড না পেয়ে তার বাড়ির সবাইকে কার্ডটা হারানোর জন্য দায়ী করেছে। তার চোখ-মুখ দেখে বোঝা যায় সে হতাশ হয়ে উঠেছে।

    কিন্তু ফশেলেভেন্তু প্রথমে গ্রিবারকে কার্ড না দিয়ে কার্য সম্পাদনের খবর আগে দিতে চাইল। সে তার কোদাল-গাঁইতিটা তাকে দিয়ে বলল, তোমার কাজ আমি করে দিয়েছি।

    গ্রিবার আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি সব করে দিয়েছ?

    ফশেলেভেন্ত বলল, গেটের দারোয়ানের কাছে তোমার কার্ড পাবে।

    গ্রিবার বলল, ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না আমি।

    ব্যাপারটা খুবই সোজা। কার্ডটা হয়তো তোমার পকেট থেকে পড়ে যায়। তুমি চলে আসার পর আমি সেটা কুড়িয়ে পাই। তার পর আমি কবরের গর্তটা বুজিয়ে দিই। তোমার কাজ সব করে দিই। দারোয়ান তোমার কার্ড দিয়ে দেবে। তোমাকে আর পনেরো ফ্র দিতে হবে না।

    গ্রিবার ফশেলেভেন্তের একটা হাত ধরে আনন্দের সঙ্গে বলল, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ বন্ধু। এরপরের বার আমি মদের দাম দেব।

    .

    ৮.

    এক ঘণ্টার পর সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে উঠলে দু জন লোক কসেত্তেকে নিয়ে পেতিত র‍্যু পিকপাসের ৬২ নম্বর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

    র‍্যু দু শেমিন ভার্তের যে ফলের দোকানটায় গতকাল সন্ধ্যার সময় ফশেলেভেন্ত কসেত্তেকে নিয়ে গিয়ে রেখে এসেছিল সেখান থেকে তারা নিয়ে এল তাকে। নিদারুণ এক ভীতিবিহ্বল অবস্থার মধ্য দিয়ে সেখানে চব্বিশ ঘণ্টা কাটায় কসেত্তে। সে ভয়ে একবারও কাঁদেনি। কিছু খায়নি বা ঘুমোয়নি। ফলের দোকানের মালিক সেই মহিলাটি তাকে অনেক প্রশ্ন করে, তার কাছ থেকে অনেক কথা বার করবার চেষ্টা করে। কিন্তু কসেতে তার একটা কথারও জবাব দেয়নি। সে শুধু নীরবে তাকিয়ে থেকেছে তার পানে নিদারুণ দৃষ্টিতে। গত দু দিনের মধ্যে সে যা দেখেছে বা শুনেছে সে তার কিছুই বলেনি। সে বুঝতে পেরেছে গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে। তাই শান্ত হয়ে থাকার একটা প্রয়োজনীয়তার প্রতি গভীরভাবে সচেতন হয়ে উঠল সে। তাছাড়া তার কানে কানে একটা কথা বলে দেওয়া হয়েছিল, একটা কথাও বলবে না। চব্বিশ ঘণ্টা কাটাবার পর জাঁ ভলজাঁকে দেখতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আকুল হয়ে এমনভাবে চিৎকার করে ওঠে কসেত্তে, যাতে কেউ তাকে দেখলেই বুঝতে পারত তার মনের অবস্থা তখন কী ছিল।

    এইভাবে দুটো সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ভলজাঁকে কনভেন্ট থেকে বার করে আবার তার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। ফশেলেভেন্তের কথায় দারোয়ান দরজা খুলে দিল। ফশেলেভেন্ত আর ভলজাঁ কসেত্তেকে নিয়ে বাগানে ঢুকে বাগান পার হয়ে সেই বৈঠকখানা ঘরটায় ঢুকল যেখানে গতকাল ফশেলেভেন্ত কনভেন্টের প্রধানার সঙ্গে কথা বলেছিল।

    প্রধানা তখন জপের মালা হাতে বসে ছিলেন সেই ঘরে। তার পাশে একজন মাদার দাঁড়িয়ে ছিল। একটা বাতি জ্বলছিল ঘরের মধ্যে।

    প্রধানা তাঁর নত চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ভলজাঁকে পরীক্ষা করলেন। তার পর প্রশ্ন করলেন, তুমি ওর ভাই?

    ফশেলেভেন্ত উত্তর দিল, হ্যাঁ শ্রদ্ধেয়া মাতা।

    তোমার নাম কী?

    এবারও ফশেলেভেন্তই উত্তর দিল, আলতিমে ফশেলেভেন্ত। এই নামে তার এক ভাই ছিল। সে মারা গেছে।

    তোমার বাড়ি কোথায়?

    ফশেলেভেন্ত উত্তর করল, অ্যামিয়েন্সের কাছে পিকিগনেতে।

    তোমার বয়স কত?

    পঞ্চাশ।

    তোমার পেশা কী?

    আমি মালীর কাজ করি।

    তুমি কি একজন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান?

    আমাদের বাড়ির সবাই নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান।

    এই বাচ্চাটা তোমার?

    হ্যাঁ শ্রদ্ধেয় মাতা।

    তুমি তার বাবা?

    তার পিতামহ।

    পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাদার প্রধানকে চুপি চুপি বলল, ও ভালোই কথা বলে।

    আসলে ভলজাঁ একটা কথাও বলেনি। তার হয়ে ফশেলেভেন্তই সব উত্তর দিয়েছে।

    প্রধানা মনোযোগের সঙ্গে কসেত্তে’র দিকে তাকিয়ে বলল, মেয়েটাকে দেখে বেশ সাদামাটা মনে হচ্ছে।

    প্রধানা আর মাদার দু জনে কিছুক্ষণ ধরে আলোচনা করল। তার পর প্রধান ফশেলেভেন্তকে বলল, পিয়ের ফভেন্তু, এবার থেকে তোমাকে আর একটা ঘণ্টা বাঁধতে হবে।

    পরদিন সকাল থেকে বাগানে দু জন মালীর পায়ে দুটো ঘন্টার ধ্বনি শোনা যেতে লাগল। সে ঘণ্টার ধ্বনি শুনে সন্ন্যাসিনী ও সিস্টারেরা তাদের অবগুণ্ঠনের কিছুটা না তুলে পারত না। তারা ভলজাঁকে বাগানে গাছের তলায় ফশেলেভেন্তের পাশে কাজ করতে দেখে চুপি চুপি বলাবলি করত নিজেদের মধ্যে, একজন সহকারী মালী এসেছে। এ হচ্ছে পিয়ের ফভেন্তের ভাই।

    জাঁ ভলজাঁ’র পায়েতে ঘণ্টা বাধা হল। আলতিমে ফশেলেভেন্তও একজন কনভেন্টের লোক হয়ে গেল।

    প্রধানা কসেত্তেকে দেখে সরল এবং সাদামাটা বলায় ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। মেয়েটাকে তার ভালো লেগে যায়। তিনি এক অনাথা ছাত্রী হিসেবে স্কুলে তার একটা স্থান করে দেন। সাদামাটা’ কথাটার মধ্যে একটা তাৎপর্য ছিল। যেসব মেয়ে সুন্দরী তারা কখনও ধার্মিক হতে চায় না। সৌন্দর্যের অহঙ্কার আর সন্ন্যাসিনীর কাজ পরস্পরবিরুদ্ধ ব্যাপার। তাই যারা দেখতে খুব সাদামাটা এই ধরনের ধর্মপ্রতিষ্ঠানে তাদের দাম বেশি।

    এই ঘটনায় তিন দিক থেকে সাফল্য লাভ করল ফশেলেভেন্ত। সে জাঁ ভলজাঁকে উদ্ধার করে আশ্রয় দান করেছে: গ্রিবারকে জরিমানার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে আর তারই সহায়তায় কনভেন্ট ধর্মের সেবায় সরকারি আইন ও শাসনকে অমান্য করতে পেরেছে। এখন পেতিত পিকপাসের বেদির তলায় মৃতদেহভরা একটা কফিন আছে। আর ভগিয়ার্দের কবরখানায় একটা খালি কফিন পোঁতা আছে। তাতে হয়তো সরকার ক্ষুণ্ণ। হবে। কিন্তু ফশেলেভেন্তের প্রতি কনভেন্টের কৃতজ্ঞতা বেড়ে যায়। সে কনভেন্টের সবচেয়ে সেরা ভূত্যরূপে পরিগণিত হয় এবং তার খাতির বেড়ে যায়। পরে আর্কবিশপ কনভেন্ট পরিদর্শন করতে এলে তার কাছে তার কথা তোলা হয়। ফশেলেভেন্তের খ্যাতি রোমে পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। একদিন তৎকালীন পোপ তার এক আত্মীয়ের কাছে বলেন, প্যারিসের এক কনভেন্টে ফভা নামে চমৎকার এক মালী আছে। সে সাধু প্রকৃতির লোক।

    .

    ৯.

    কনভেন্টে আসার পরেও মুখ খুলল না কসেত্তে। সে ভাবত সে জাঁ ভলজাঁ’র সন্তান। এর থেকে সে বেশি কিছু জানত না। তাই বলারও কিছু ছিল না তার। ক্রমাগত দুঃখভোগ তাকে ভীরু স্বভাবের করে তোলে। সে সব কিছুকেই ভয় করতে থাকে। এমনকি কথা বলতে এবং নিশ্বাস ফেলতেও ভয় করত তার। ভলজাঁ’র সঙ্গে থাকাকালে সে যে নিরাপত্তাবোধ লাভ করেছিল সে নিরাপত্তাবোধ স্থায়ী। কনভেন্টে আসার পর সে কনভেন্টের জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় নিজেকে। তার শুধু একটা দুঃখ, সে তার পুতুলটাকে আনতে পারেনি। কিন্তু সে কথা কাউকে বলেনি। শুধু ভলজাঁকে একবার বলেছিল, আমি যদি জানতাম এখানে আসব তা হলে ক্যাথারিনকে নিয়ে আসতাম আমার সঙ্গে।

    ছাত্রী হিসেবে কসেত্তেকে স্কুলের পোশাক পরতে হত। যে সব পোশাক সে ছেড়ে দেয়, সেই সব কালো পোশাক, থেনার্দিয়েরদের দেওয়া পোশাক, ভলজাঁ একটা ছোট বাক্স জোগাড় করে রেখে দেয় তার মধ্যে। বাক্সটা সে তার বিছানার পাশে একটা চেয়ারের উপর রেখে দেয়। বাক্সের চাবিটা সে সব সময় তার নিজের কাছে রেখে দেয়।

    ফশেলেভেন্ত এই ঘটনায় তিন দিক থেকে লাভবান হয়। সে যে ভালো ভালো কাজ করেছে তার পুরস্কার সে পায় তিন দিক থেকে। প্রথমত সে এ কাজ সুসম্পন্ন করতে পেরে মনের দিক থেকে তৃপ্তি পায়। দ্বিতীয়ত এখন থেকে বাগানের কাজ তাকে কম করতে হয়। তৃতীয়ত সে তিনবার করে ধূমপান করতে পায় এবং ভলজাঁ-ই তার দাম দেয়। ভলজাঁকে ডাকার সময় সন্ন্যাসিনীরা আলতিমে কথাটা ব্যবহার করত না, বলত আর এক ফভেন্ত।

    জেভার্তের মতো তীক্ষ্ণ ও সন্ধানী দৃষ্টি যদি সন্ন্যাসিনীদের থাকত তা হলে তারা একটা জিনিস লক্ষ করত, কনভেন্টের কোনও ফাইফরমাস খাটার সময় কোনও কাজে বাইরে যেতে হলে বা কোনও জিনিস বাইরে থেকে আনতে হলেও ফশেলেভেন্তই যেত, ভুলজা কোনও সময় কোনও কারণেই বাইরে যেত না। যাদের মনপ্রাণ ঈশুরে সমর্পিত থাকে তারা বোধ হয় জাগতিক ছোট-বড় কোনও ব্যাপারে লক্ষ রাখে না। কোনও কিছু খেয়াল করে না।

    এদিকে জাঁ ভলজাঁকে খোঁজার জন্য সারা জেলাটায় কড়া নজর রেখেছিল জেভার্ত। তাকে তন্ন তন্ন খুঁজে চলছিল। ভলজাঁ সেটা জানত বলেই সে ইচ্ছা করে নিজেকে আবদ্ধ রাখে কনভেন্টের মধ্যে। ভলজাঁ’র কাছে কনভেন্টটা ছিল যেন বিক্ষুব্ধ সমুদ্র দ্বারা পরিবৃত একটা ছোট দ্বীপ। এই দ্বীপে থেকে প্রাণভরে মাথার উপরে আকাশ দেখে আর কসেত্তেকে দেখে মনে যথেষ্ট শান্তি পায়। শান্তিপূর্ণ এক নতুন জীবন তার শুরু হল এখানে।

    ভলজাঁ ফশেলেভেন্তের সঙ্গে বাগানের এক প্রান্তে তিনটে ঘরওয়ালা রঙচটা চুনখসা একটা ছোট একতলা বাড়িতে থাকত। সে না চাইলেও তিনটে ঘরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘরখানা তাকে দেয়া হয়েছিল। ফশেলেভেন্তই জোর করে ঘরটা করায়। ঘরখানার মধ্যে আসবাবপত্র বলতে কিছুই ছিল না। শুধু দেয়ালে গাঁথা দুটো পেরেকের উপর একটা ঝুড়ি আর একটা হাঁটু বাধার ফিতে ঝোলানো ছিল। এ ছাড়া ১৭৯৩ সালে রাজার নামে দশ লিভারের যে ব্যাংকনোট বার হয় সেই নোট একটা দেয়ালে গাঁথা ছিল। ফশেলেভেন্তের আগে কনভেন্টের বাগানে যে মালী কাজ করত সে-ই এই নোটটা রেখে দেয় এইভাবে।

    মালীর কাজে বেশই পারদর্শিতা দেখাতে লাগল ভলজাঁ। প্রথম জীবনে সে গাছ কাটার কাজ করত, তাই মালীর কাজ করতে কোনও অসুবিধাই হল না তার। এ দেশের সব গাছপালাই তার চেনা। এ বাগানে বিভিন্ন রকমের গাছ ছিল। সেই সব গাছ সময়মতো হেঁটে ও তাদের যত্ন করে তাদের উন্নতি সাধন করল।

    প্রতিদিন কসেত্তে এক ঘণ্টা করে ভলজাঁর কাছে থাকার অনুমতি পেয়েছিল। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে সে ছুটে আসত ভলজাঁ’র কাছে। ভলজাঁ’র সাহচর্য সবচেয়ে ভালো লাগত তার। আবার তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভলজাঁ’র মুখখানাও আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। যে কোনও সুখের বৈশিষ্ট্য হল এই যে, যে সুখ আমরা কোনওভাবে কাউকে দান করি সেই সুখ প্রতিফলনের মতো না কমে গিয়ে আমাদের কাছেই ফিরে আসে বর্ধিত আকারে। কসেত্তে যখন অন্য মেয়েদের সঙ্গে খেলা করত তখন তাকে একটু দূর থেকে দেখত ভলজাঁ। তার হাসির শব্দ শুনে অন্য মেয়েদের থেকে তাকে চিনে নিতে পারত সে।

    কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে মুখে হাসি ফুটে ওঠে কসেত্তের। কসেত্তে যখন হাসত তখন তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠত। হাসির আলো মানুষের মুখ থেকে সব অন্ধকার দূর করে দেয়। কসেত্তেকে খুব একটা সুন্দরী না দেখালেও তার মুখটাকে হাসিখুশিতে উজ্জ্বল দেখাত। শিশুসুলভ মিষ্টি নরম গলায় অনেক কথা বলত সে। খেলার পর যখন তার নিজের ঘরে চলে যেত তখন ভলজাঁ তার ঘরের জানালাগুলোর পানে তাকিয়ে থাকত। রাত্রিতে মাঝে মাঝে উঠে সে কসেত্তে’র ঘরের জানালার পানে তাকাত।

    কসেত্তেকে নিয়ে কনভেন্টে বাস করতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে এক বিরাট পরিবর্তন আসে ভলজাঁ’র জীবনে। তবে একথাও ঠিক যে ধর্মের পথ অনেক সময় মানুষকে অহঙ্কাররূপ পাপের পথেও নিয়ে যায়। শয়তানই সেতুবন্ধ করে এই দুটো পথের মাঝখানে। ভলজাঁ যখন আপন মনে এই অহঙ্কাররূপ পাপের পথে এসেছিল তখন পেতিত পিকপাসে এসে পড়ে সে। প্রথম প্রথম সে বিশপের সঙ্গে নিজের তুলঁনা করে অযোগ্য আর ছোট ভাবত নিজেকে। কিন্তু কালক্রমে আর পাঁচজনের সঙ্গে তুলঁনা করতে লাগল এবং গর্ববোধ করতে লাগল। সে যদি এই কনভেন্টে না আসত তা হলে গর্বের সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণা জাগত তার মনে।

    কনভেন্টে আসার ফলে সে ঘৃণা আর জাগেনি। এটাও এক ধরনের কারাগার। কিন্তু জেল বা আসল কারাগারের মতো এ কারাগারের বিকৃত রূপ নেই, কয়েদিদের ওপর আইনের তরফ থেকে অনুষ্ঠিত কোনও অপরাধের নামগন্ধ নেই এখানে। কারখানা থেকে কনভেন্ট। দুটো জীবনের সঙ্গে তুলঁনা করে দেখত সে।

    জমিতে কাজ করার সময় মাঝে মাঝে চিন্তার অবরুদ্ধ স্রোতগুলোকে মুক্ত করে দিত সে। তার অতীতে কাটানো কারাজীবন আর সেখানকার সঙ্গীসাথিদের কথা ভাবত সে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কী পরিমাণ পরিশ্রম তাকে করতে হত, কী পোশাক তাকে পরতে হত, কী নামে তাদের ডাকা হত সেই সব কথা মনে পড়ল একে একে। তাদের শুধু এক-একটা নম্বর ধরে ডাকা হত। তারা মদ খেতে পেত না। খুব বেশি পরিশ্রম করার সময়েই তাদের মাংস খেতে দেওয়া হত। তাদের চুলগুলো ছোট করে ছাঁটা থাকত।

    এখানে আসার পর থেকে ভলজাঁ কনভেন্টের সন্ন্যাসিনীদের দেখে তাদের কথা প্রায়ই ভাবত। তার মনে হত এটাও যেন একটা কারাগার। এখানে যেসব মেয়ে থাকে তাদেরও চুলগুলো ছোট করে ছাটা। কয়েদিরা অপমানের বোঝাভারে মুখচোখ নামিয়ে থাকত, এরাও ধর্মজগতের নিষ্ঠুর অনুশাসনে নিপীড়িত। এদের কাঁধে ও গাঁয়ে কোনও বেত্রাঘাতের চিহ্ন না থাকলেও কঠোর আত্মনিগ্রহের ছাপ তাদের চোখে-মুখে। তারাও ধর্মের খাতিরে তাদের নিজেদের নাম ত্যাগ করে অন্য নাম ধারণ করেছে। তারাও মদ-মাংস খায় না এবং প্রায়ই সারাদিন উপবাস করে সন্ধের সময় খায়। তারা পরে কালো পশমের পোশাক যা শীতের পক্ষে মোটেই যথেষ্ট নয় এবং গ্রীষ্মকালে পীড়াদায়ক। তারা গ্রীষ্মকালে লিনেনের কোনও জামা বা শীতকালে পশমের পোশাক পরে না। আর ছমাস ধরে যে চুলের জামা পরতে হয় তাদের, সে জামা পরে তাদের জ্বর আসে। তারা যে সব ঘরে বাস করে সেখানে কোনও আগুন জ্বলে না। তাদের শীতে কষ্ট পেতে হয়। তাদের শোবার কোনও তোষক নেই, খড়ের চাটাই বা মাদুরের উপর শুতে হয়। সারাদিনের খাটুনির পর তারা রাত্রিতে শান্তিতে ঘুমোতে পায় না। এক ঘুমের পরেই সব সন্ন্যাসিনীকে বিছানা থেকে উঠে শীতে কাঁপতে কাঁপতে প্রার্থনা করতে হয়। তার উপর এক সপ্তাহ অন্তর পালাক্রমে প্রত্যেক সন্ন্যাসিনীকে একবার করে প্রায়শ্চিত্ত ব্রত সাধন করতে হয়। এই সময় বারো ঘণ্টা ধরে একটানা বেদির সামনে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করে যেতে হয়। আবার কখনও-বা বুকের উপর হাত দুটো আড়াআড়ি করে রেখে উপুড় হয়ে সটান শুয়ে থাকতে হয়।

    জেলখানার কয়েদিরা ছিল পুরুষমানুষ, এরা হল মহিলা। জেলখানার কয়েদিরা অপরাধী, চোর, ডাকাত, খুনি, প্রতারক, দুবৃত্ত। কিন্তু এই সব ধর্মপ্রতিষ্ঠানের মেয়েরা কি অপরাধ করেছে? তারা তো কোনও অপরাধ করেনি!

    একদিকে যত রকমের পাপ মানুষ তার জীবনে করতে পারে আর একদিকে যত রকমের পুণ্য, পবিত্রতা আর ধর্মের কাজ থাকতে পারে যে কাজ মর্তলোককে পবিত্র করে তুলে স্বর্গলোকের দিকে মানুষের মনকে নিয়ে যায়। একদিকে কৃত অপরাধের অস্বীকৃতি আর তা গোপন করার চেষ্টা আর একদিকে সব দোষ, সব অপরাধের অকুণ্ঠ স্বীকারোক্তি। একদিকে যত দুর্গন্ধ আর একদিকে পবিত্র সুগন্ধ। একদিকে নৈতিক অধঃপতনের মধ্য দিয়ে সেই আইনের বলি হয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়ে কারাজীবনযাপন করা, আর একদিকে নির্জনবাসের মধ্যে থেকে আত্মার পরিশুদ্ধি সাধনের চেষ্টা করে যাওয়া। একদিকে নিবিড় অন্ধকার, আর একদিকে ছায়া। কিন্তু ছায়া হলেও সে ছায়ার মধ্যে আলো আছে, সে আলোর মধ্যে আছে আবার সূর্যকিরণের উজ্জ্বলতা।

    দুটোই দাসত্বের জায়গা। একটাতে অবশ্য দাসত্বের শেষ আছে, মেয়াদ ফুরোলেই মুক্তি। কিন্তু অন্য স্থানটিতে আছে শুধু যাবজ্জীবন দাসত্বের অক্ষয় বন্ধন। ধর্মপ্রতিষ্ঠানের সন্ন্যাসিনীদের মুক্তির একমাত্র আশা হল মৃত্যু। জেলখানার কয়েদিরা ধাতব শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে আর কনভেন্টের কয়েদিরা আবদ্ধ থাকে ধর্মবিশ্বাসের শৃঙ্খলে।

    এই দুটি জায়গায় থেকে পরিণামে কী পায় তারা একদিকে অর্থাৎ জেলখানায় কয়েদিরা লাভ করে শুধু অন্তহীন নিবিড় হতাশা আর সমগ্র মানবজাতির প্রতি অদম্য এক ঘৃণা আর ক্রোধ আর ঈশ্বরের প্রতি অবজ্ঞা আর বিদ্রূপ। অন্যদিকে এই ধর্মপ্রতিষ্ঠানের সন্ন্যাসিনীরা লাভ করে ঈশ্বরের আশীর্বাদ আর প্রেম। দুটো দু রকমের জায়গাতে বিভিন্ন ধরনের মানুষ একই উদ্দেশ্যে কাজ করে চলেছে। সে উদ্দেশ্য হল প্রায়শ্চিত্ত এবং আত্মার মুক্তি।

    জেলখানার কয়েদিদের প্রায়শ্চিত্তের ব্যাপারটা ভলজাঁ বোঝে। ব্যক্তিগত পাপের প্রায়শ্চিত্ত। কিন্তু এখানে সন্ন্যাসিনীরা কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে কোনও দোষ বা পাপ তো করেনি তারা। তবে কিসের প্রায়শ্চিত্ত? এ প্রশ্নের উত্তরে তার বিবেক উত্তর করল, ধর্মপ্রাণ মানুষেরা যত সব পাপী-তাপীদের পাপস্খলনের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করে যায় সারা জীবন।

    এতক্ষণে ধরে ভলজাঁ’র মনে যে সব চিন্তা-ভাবনার ঢেউ খেলে যাচ্ছিল সেই সব চিন্তাগুলোকেই প্রকাশ করলাম আমরা। ভলজাঁ এখানে এসে দেখেছে মানুষ কিভাবে চরম দুঃখভোগ ও আত্মনিগৃহের মধ্য দিয়ে পুণ্যের সর্বাধিক শিখরে উঠে যেতে পারে, কিভাবে মানুষ মানুষের সব অপরাধ ক্ষমা করে সে অপরাধ স্খলনের জন্য, সে পাপ থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য নিজে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে প্রায়শ্চিত্ত করে যেতে পারে। নিজে কোনও পাপ না করেও মানুষ কী করে পাপীদের সব শাস্তির বোঝা নিজে বহন করে চলে তা সে নিজে দেখেছে।

    এই সবকিছু এখন ভাবে ভলজাঁ। প্রায় দিনই রাত্রিতে ঘুম ভেঙে যায় তার। কত বাধা অতিক্রম করে, কত শাস্তি কত কষ্ট ভোগ করে অবশেষে সে এখানে এল সে কথাও ভাবে সে। তার মনে হল এক কারাগার থেকে আর এক কারাগারে এসে পড়েছে সে। কিন্তু সে কারাগারের দেয়ালগুলো কতকগুলি হিংস্র সিংহকে ঘিরে রেখেছে আর এখানে সে দেয়ালগুলোর মাঝে ভরা আছে কতকগুলি শান্ত মেষশাবক। এটা হল প্রায়শ্চিত্তের এক পবিত্র স্থান, শাস্তি বা দণ্ডভোগের স্থান নয়। তবু তার মনে হল এ স্থান, এ কারাগার আগের কারাগারের থেকে আরও নির্মম, আরও ভয়ঙ্কর। শীতের যে হিমশীতল বাতাস তার যৌবনের রক্তকে জমিয়ে দিয়েছে, যে বাতাস শকুনিদের বাসাগুলোর মধ্য দিয়ে বয়ে যায়, সেই বাতাস এখানে এসে যেন আরও তীক্ষ্ণ, আরও কনকনে আর দুঃসহ হয়ে ওঠে।

    কিন্তু কেন?

    সে যখন এই সব কথা ভাবে তখন তার সমগ্র সত্তা ঈশ্বরের রহস্যময় বিধানের কাছে এক নিবিড় আত্মসমর্পণে ঢলে পড়ে। তার সব অহঙ্কার নিঃশেষে উধাও হয়ে যায়। তার নিজের দুর্বলতার কথা সে বুঝতে পারে। সে শিশুর মতো কাঁদতে থাকে। দু মাস ধরে সে যত কষ্টই ভোগ করুক আজ সে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে কসেত্তেকে কাছে পেয়েছে, আর তার বিনয় ও নম্রতার দ্বারা কনভেন্টের মধ্যে প্রবেশাধিকার পেয়েছে।

    কোনও কোনও দিন সন্ধ্যার অন্ধকারে গির্জার বাইরে পথের উপর একটা জানালার তলায় নতজানু হয়ে সে প্রার্থনা করতে থাকে। গির্জার ভেতর ওই জানালার বেদির সামনে নতজানু হয়ে বসে এক সিস্টার প্রায়শ্চিত্ত ব্ৰত সাধন করতে থাকে আর ও যেন সিস্টারের কাছেই নতজানু হয়ে তার নির্দেশে প্রার্থনা করতে থাকে। সরাসরি ঈশ্বরের কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করার সাহস যেন তার নেই।

    এখন তার চারদিকে আছে শুধু বাগানের স্তব্ধ প্রশান্তি, ফুলের সুগন্ধ, শিশুদের আনন্দোচ্ছল হাসি, সন্ন্যাসিনীদের নিষ্পাপ গাম্ভীর্য আর সরলতা। এই সব জিনিসগুলো ধীরে ধীরে তার আত্মার গভীরে প্রবেশ করে তার জীবনের মধ্যেও এনে দিয়েছে যেন এক অনির্বচনীয় সুখ, সরলতা, আর স্তব্ধ নীরব এক গাম্ভীর্যমণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। ভলজাঁ’র মনে হল দুটো কারাগারই যেন ঈশ্বরের দুটো বাড়ি। তার জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে এই দুটো বাড়ি স্থান দেয় তাকে।

    একবার সমস্ত সমাজ যখন তাকে প্রত্যাখ্যান করে, ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করে দূরে ঠেলে দেয় তখন ঈশ্বরের বাড়িস্বরূপ একটি কারাগারই স্থান দেয় তাকে। আবার উন্মুক্ত হয়েছে তার জন্য। প্রথম কারাগারে যদি সে তখন প্রবেশ না করত তা হলে সে একের পর এক করে অপরাধমূলক কাজ করে যেত। আবার এখন যদি এ কারাগারে সে প্রবেশ না করত তা হলে আরও অনেক দুঃককষ্ট ভোগ করে যেতে হত তাকে।

    এই সব ভাবতে গিয়ে তার সমস্ত অন্তর এক অপরিসীম কৃতজ্ঞতা আর এক মধুর ঈশ্বরপ্রেমে বিগলিত হয়ে উঠত।

    এইভাবে বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগল এবং শৈশব পার হয়ে বাল্যজীবনে প্রবেশ করল কসেত্তে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleটয়লার্স অভ দ্য সী – ভিক্টর হুগো
    Next Article কেন আমি নাস্তিক – ভগৎ সিং

    Related Articles

    ভিক্টর হুগো

    টয়লার্স অভ দ্য সী – ভিক্টর হুগো

    November 6, 2025
    ভিক্টর হুগো

    দ্য ম্যান হু লাফস – ভিক্টর হুগো

    November 6, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }