এক উকিল এবং তার এক মক্কেল
এক উকিল এবং তার এক মক্কেল
শুরু করার আগে পুরনো দিনের কথা একটু বলে নেওয়া যাক। নইলে গল্পটা তেমন জমবে না। তখনও দেশভাগ হয়নি। এপার বাংলা আর ওপার বাংলা মিলিয়ে ছিল আস্ত বাংলাদেশ। সারা পৃথিবী জুড়ে সেই সময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে।
রন্টুর বয়স তখন দশ কি এগারো। তাদের বাড়ি ছিল অখণ্ড বাংলার ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের বিক্রমপুরের বিশাল একটা গ্রামে।
গ্রামের পাশেই ইছামতী নদী। বসিরহাটের গা ঘেঁষে সরু, শীর্ণ আরেক ইছামতী বয়ে গেছে। এই দুই নদী এক নয়। ঢাকা জেলার সেই ইছামতী পদ্মা থেকে বেরিয়ে এসেছে। পদ্মার মতো বিরাট না হলেও তার কাছাকাছি। বহুদূরে পেনসিলের আবছা আঁচড়ের মতো এপার থেকে ওপারটা মনে হত। এই ইছামতীর মাঝামাঝি ছিল বড় বড় চার—পাঁচটা চর। কোনও চরই ফাঁকা নয়। সব ক’টাতেই টিন বা খড়ের চালের বাড়িঘর বানিয়ে প্রচুর মানুষজন থাকত। চারপাশে জল, মধ্যিখানে বসতি।
রন্টুদের গ্রাম থেকে সাড়ে তিন মাইল দূরে ছিল মস্ত এক গঞ্জ। সেখানে বিস্তর দোকানপাট, ধান—চাল—পাটের আড়ত, ডাক্তারখানা, কবিরাজখানা, তা ছাড়া সরকারি নানা অফিস, আদালত আর ছিল স্টিমারঘাটা, লঞ্চঘাটা, কেরায়া নৌকো আর গয়নার নৌকোর ঘাট। সকাল থেকে সন্ধে অবধি এলাকাটা গমগম করত।
এখানে যে গয়নার নৌকোর কথা বলা হল সেটা আসলে কী? স্টিমার বা লঞ্চ যেমন অনেক প্যাসেঞ্জার নিয়ে নানা জায়গায় পাড়ি দেয়, গয়নার নৌকোও অনেকটা সেইরকম। বিপুল আকারের নৌকোগুলো তিরিশ— চল্লিশজন করে যাত্রী তুলে যে যেখানে যাবে সেখানে পৌঁছে দিত। কাছাকাছি কোথাও গেলে ভাড়া কম, দূরে গেলে ভাড়া বেশি।
ফি রবিবার গঞ্জের লাগোয়া প্রায় সিকি মাইল জায়গা জুড়ে হাট বসত। সেদিন চারপাশের পঁচিশ—তিরিশটা গ্রাম আর ইছামতীর চরগুলো থেকে হাজারে হাজারে মানুষ নৌকোয় চেপে হাটে চলে আসত। গঞ্জের সামনের দিকটা শ’য়ে শ’য়ে নৌকোয় ছেয়ে যেত। অন্য দিনের চেয়ে হাটের দিনে গঞ্জে দশ—বিশগুণ মানুষের ভিড়। তাই হইচইও বেশি। দু—আড়াই মাইল দূর থেকে লক্ষ কোটি মাছির ভনভনানির মতো সেই আওয়াজ শোনা যেত।
রবিবারের হাটের দিন রন্টুকে নিয়ে তার দাদু নৌকোয় চড়ে নানা জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য গঞ্জে যেতেন। রন্টুকে সঙ্গে না নিয়ে উপায় ছিল না। কেননা সে তো আর শান্তশিষ্ট সুবোধ বালকটি নয়। না নিয়ে গেলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়বে।
গঞ্জে দেদার মজা। সেখানে গাজি—বেকারির কেক পাওয়া যায়। শুধু কি কেক, কলকাতার ব্রিটানিয়া কোম্পানির বিস্কুট, লজেন্স ছাড়াও আসে ‘দেব সাহিত্য কুটির’—এর প্রহেলিকা আর কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের নতুন নতুন ডিটেকটিভ গল্পের বই। কেক বিস্কুট লজেন্স তো বটেই, তার চেয়ে বেশি করে চাই দমবন্ধ—করা গোয়েন্দা কাহিনি। সেই সঙ্গে দেশ—বিদেশের ভ্রমণের গল্পের বই পাওয়া গেলে রন্টু আহ্লাদে একেবারে ডগমগ। সেসব কিনে না দিলে দাদুর নিস্তার নেই।
এক রবিবার রন্টুরা গঞ্জে গেছে। আদালতে দাদুর জরুরি কিছু কাজ ছিল। তাই নৌকো থেকে নেমে রন্টুকে নিয়ে তিনি সোজা সেখানে চলে গেলেন। হাটের কেনাকাটা পরে হবে। হলুদ রংয়ের লম্বা একটা দালানে ছিল কোর্ট। বিল্ডিংটার ভেতরে তিনটে দেওয়াল তুলে তিনটে বড় বড় কামরায় ছিল তিনজন ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস। বাকি চার নম্বর কামরাটায় সাব—রেজিস্ট্রি অফিস।
কোর্টের সামনের দিকে একশো বছরের প্রাচীন এক বটগাছ। সেটার ডালপালা থেকে কত ঝুরি যে নেমেছে তার লেখাজোখা নেই। বটগাছের তলায় বারো—চোদ্দোটা বেঞ্চি পাতা। সেগুলো উকিলদের সেরেস্তা। কোর্টে মামলা না থাকলে মক্কেলদের নিয়ে সেখানে বসত তারা। সেরেস্তাগুলো থেকে একটু দূরে বটগাছের তলাতেই তিনটে মিষ্টির দোকান। রাজভোগ, মোহনভোগ, মাখা সন্দেশ, পান্তুয়া ছাড়াও বাখরখানি ওই দোকানগুলোতে পাওয়া যেত।
বটগাছটার পর খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তারপর ইছামতীর পাড় ঘেঁষে গয়নার নৌকোর ঘাট।
দাদু রন্টুকে নিয়ে বটগাছের তলায় চলে এলেন। সেখানে ভিড় কম। তিন—চারজন উকিল তাদের মক্কেলদের নিয়ে এধারে—ওধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে কথা বলছে। অন্য উকিলরা নিশ্চয়ই আদালতে মামলা করতে গেছে।
রন্টুর দাদু তাঁদের গ্রাম তো বটেই, চারপাশের তিরিশ—চল্লিশটা গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষদের একজন। সেই সময় মানুষের আয়ু বেশি হত না। বড়জোর ষাট—পঁয়ষট্টি। দাদু তখন ষাট, সত্তর পেরিয়ে তিয়াত্তরে পা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন খুবই জ্ঞানী মানুষ, সেই আমলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। চারদিকে গ্রামের মানুষজন তাঁকে চিনত, সমীহ করত।
বটগাছের তলায় যে উকিলরা বসে ছিল, সবাই দাদুকে দেখে হাতজোড় করে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বলতে লাগল, ‘প্রণাম প্রণাম বড়কর্তা, মেলা দিন পর এহানে আপনের পায়ের ধূলা পড়ল। লগে নাতিরেও দেখতে আছি। বহেন বহেন।’ গ্রামগঞ্জের মানুষ যাদের সঙ্গে মা সরস্বতীর একটু আধটুও সম্পর্ক আছে তারা তাঁকে বলত ‘বড়কর্তা’, আর যারা বর্ণপরিচয়ের একটি অক্ষরও চোখে দেখেনি তাদের কাছে তিনি ‘বড়কত্তা’।
ওদিকে উকিলদের মক্কেলরাও উঠে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে।
রন্টু আগেও বেশ কয়েকবার দাদুর সঙ্গে আদালতে এসেছে। এখানকার সব উকিলকেই সে চেনে, নামও জানে। যে তিন—চারজন এখন বটগাছের তলায় রয়েছে, চুপচাপ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
দাদু বলছিলেন, ‘না রে, আজ আর বসার সময় হবে না। একটা দরকারি কাজ সেরে আমাকে হাটে দৌড়োতে হবে। অনেক কিছু কেনার আছে। সেসব সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে। আরেক দিন তোদের সঙ্গে বসে গল্প করব।’ তাঁর চেয়ে বয়স যাদের কম, তিনি তাদের ‘তুই’ করে বলতেন। সেটা তাদের ছোট বা তুচ্ছ করার জন্য নয়, তাঁর বলাটার মধ্যে স্নেহ মাখানো থাকত।
নেংটি ইঁদুরের মতো শুঁটকো চেহারার একটা উকিল, নাকের তলায় খাড়া খাড়া কাঁচা—পাকা গোঁফ, চোখে নিকেলের গোল চশমা, পরনে ছাই ছাই রংয়ের কোট—প্যান্ট, পায়ে বাটা কোম্পানির আদ্যিকালের ফিতে—বাঁধা ফ্যাকাসে কেডস—নাম তার নিশিকান্ত সাহা রায়। দাদুর সঙ্গে রন্টু যখনই কোর্টে এসেছে, অবিরল এই পোশাকেই তাকে দেখা গেছে। কোট—প্যান্ট একসময় কুচকুচে কালো আর কেডস জোড়া ধবধবে সাদাই ছিল হয়তো। রং উঠে উঠে এখন সেগুলোর ওই দশা।
নিশিকান্ত বকের মতো লম্বা লম্বা পা ফেলে দাদুর কাছে চলে এল। তড়বড় করে বলল, ‘আপনে বহেন তো বড়কর্তা। কী কাম আমারে হুদা ক’ন। অহনই কইরা দিতে আছি।’ তার গলার স্বরটা ক্যানকেনে, ফাটা কাঁসর বাজালে যেমন আওয়াজ বেরোয় অনেকটা সেইরকম।
দাদু বললেন, ‘না না, তোকে দিয়ে হবে না। সাব—রেজিস্ট্রি অফিস থেকে আমাকেই গিয়ে সই করে দুটো রসিদ নিতে হবে। তুই একটা কাজ কর—’
‘ক’ন ক’ন কী করতে হইব?’
‘আমার এই নাতি রন্টুকে চিনিস তো?’
‘চিনুম না?’ কত ছোট থিকা দেখতে আছি। জবর ভালা পোলা।’
দাদু চোখ কুচকে বললেন, ‘ভালো ছেলে! একেবারে হাড় বিচ্ছু। আমি রেজিস্ট্রি অফিসের কাজটা সেরে আসি। ততক্ষণ রন্টুকে তোর কাছে রাখ। এক মুহূর্তও স্থির হয়ে বসে থাকার পাত্র নয়। কখন যে ওর মাথায় কী খেয়াল চাপবে, কেউ জানে না। হুট করে হয়তো কোনও দিকে টহল দিতে বেরিয়ে গেল—’
‘চিন্তা কইরেন না বড়কর্তা। রন্টু তেমুন কিচ্ছু করব না। আমার পাশে অরে বহাইয়া রাখুম। আপনে ঘুইরা আহেন।’
দাদু আর দাঁড়ালেন না, সোজা কোর্ট বিল্ডিংটার দিকে চলে গেলেন। অন্য যে উকিলরা ছিল তারা একে একে নিজেদের মক্কেলদের সঙ্গে করে দূরের বেঞ্চিগুলোতে গিয়ে বসল।
নিশিকান্ত রন্টুকে বলল, ‘বহো, বহো—’ তাকে বেঞ্চিতে বসিয়ে পাশে বসতে বসতে একটা খাবারের দোকানের দিকে গলা বাড়িয়ে তার মার্কামারা ক্যানকেনে গলায় হাঁকল, ‘মহেশ, বড়কর্তার নাতির লেইগা দুইখান বাখরখানি, দুইখান রাজভোগ আর একদলা মাখা সন্দেশ পাঠাইয়া দে—’
একটু পরেই একটা অল্পবয়সি ছোকরা পদ্মপাতায় বাখরখানি আর মিষ্টিগুলো সাজিয়ে এনে দিয়ে গেল।
নিশিকান্ত বলল,’খাও রন্টু, আমি এয়ার লগে একটু কথা কই—’
রন্টু আগেই লক্ষ করেছিল, একটা লোক, বয়স চল্লিশ—বেয়াল্লিশ হবে, নিশিকান্ত উকিলের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। ভিজে বেড়ালের মতো চেহারা। গোল গোল চোখ, মাথার চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। গায়ের চামড়া খসখসে। পরনে আধময়লা ধুতির ওপর ফতুয়া। খালি পা। দেখলে মনে হয় ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। লোকটা যে নিশিকান্ত উকিলের মক্কেল তা বোঝা যাচ্ছিল।
রন্টু পদ্মপাতায় সাজানো রাজভোগে মনোনিবেশ করেছিল ঠিকই, তবে তার চোখ দুটো ছিল নিশিকান্ত উকিল আর তার মক্কেলটির দিকে।
মক্কেল বলল, ‘উকিলবাবু, বড়কত্তায় তো রেজিস্টারি অফিসে চইলা গ্যাছেন, এইবার কী কইবেন ক’ন।’
নিশিকান্ত ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘কয়বার কইতে হইব—অ্যাঁ?’
রন্টুর মুখে রাজভোগ, কিন্তু চোখ আর কানদুটো শুঁটকো উকিল আর তার মক্কেলের দিকেই রয়েছে। বুঝতে পারছিল তারা গঞ্জে আসার আগে কোনও ব্যাপারে দু’জনের কথাবার্তা চলছিল। ফের সেটা শুরু হয়েছে।
এবার মক্কেলটি মাথা নীচু করে খুব মনোযোগ দিয়ে ঘাড় চুলকোতে লাগল।
একদৃষ্টে কয়েক লহমা তার দিকে তাকিয়ে রইল নিশিকান্ত। চশমার ওধারে চোখ দুটো যেন জ্বলছে। আচমকা তার গলার ভেতর থেকে বাজ পড়ার মতো আওয়াজ বেরিয়ে এল—’হারামজাদা চৈতন পাল—’ বলেই চিড়িক মেরে উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাতটা নাচাতে লাগল, ‘ট্যাকা, ট্যাকা, ট্যাকা বাইর কর।’
আস্তে আস্তে মাথা তুলল চৈতন। চোখ পিট পিট করতে করতে ঢোঁক গিলে মুখটা বেজায় করুণ করে বলল, ‘বড়কত্তারা আহনের আগে আপনেরে চাইর ট্যাকা দিছি না?’
মাটিতে পা ঠুকতে ঠুকতে মুহুর্মুহু গর্জন ছাড়তে লাগল, নিশিকান্ত।—’তিন তিন বার তর মামলা লইয়া জজসাহেবের এজলাসে চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া গলা ফাইড়া ফালাইছি। হাররা মামলা অহন জিতার মুখে। একেক দিন কোর্টে উঠলে আট ট্যাকা কইরা আমার ফি। তাইলে তিনদিনের পাওনা হইল তিন আষ্টে চব্বিশ ট্যাকা। সিধা হিসাব। আগে দিছস সাত ট্যাকা, আইজ পাইছি চাইর ট্যাকা। একুনে এগারো ট্যাকা। বাকি তেরো ট্যাকা বাইর কর।’ তার হাতটা আরও জোরে জোরে নড়তে লাগল।
ভীষণ মুষড়ে পড়ল চৈতন।—’উকিলকত্তা, আমার কাছে আর ট্যাকা নাই। জজসাহেবের এজলাস থিকা বাইর হওনের সোমায় কইছিলেন একমাস পর ফির মামলার তারিখ পড়ছে। হেই দিন আপনের পুরা ট্যাকা মিটাইয়া দিমু। বিশ্বাস করেন, মা রক্ষাকালীর কিরা।’
‘রক্ষাকালীরে টানাটানি করিস না। এইর আগেও তো তেনার নামে দশবার কিরা কাটছস কিন্তু দিছস কি? আইজ কোনও কথা শুনুম না, ট্যাকা বাইর কর—’
কাঁচুমাচু হয়ে হাতজোড় করে চৈতন পাল বলল, ‘যে চাইরডা ট্যাকা আছিল আপনেরে দিয়া দিছি। আমার কাছে আর কিচ্ছু নাই। মা রক্ষাকালী থাউক, মা দুগগা, মা লক্ষ্মী, মা বিষহরি, মা নাটাই চণ্ডী, বাবা ভোলানাথ, বম্মা, বিষ্ণু—হগগল দেব দেবীর নামে কিরা কাটতে আছি, পরের মাসের মামলার দিন সব মিটাইয়া দিমু—’
কী ভেবে এবার আর হুঙ্কার ছাড়ল না নিশিকান্ত উকিল। অনেকক্ষণ তার মক্কেলের পা থেকে মাথা অবধি নিরীক্ষণ করল। তারপর খুব নরম গলায় বলল, ‘চৈতন পাল, একবার আমার কাছে আয়—’
চৈতন অবাক।—’আমি তো কাছেই আছি—’
‘আরও কাছে—’
‘ক্যান কত্তা, আরও কাছে যামু ক্যান?’
‘তর লগে এট্টু কোলাকুলি করুম। আয়—
হতভম্বের মতো এগিয়ে এল চৈতন। নিশিকান্ত উকিল বলল, ‘ক্যান এত কাছে ডাকলাম, কিছু বুঝলি?’
আস্তে আস্তে মাথাটা ডাইনে—বাঁয়ে নাড়ল চৈতন পাল। তার মানে বোঝেনি।
‘এইবার বুঝবি। তর জামা কাপড়গুলান এট্টু ভালা কইরা দেখুম।’
চৈতন এতক্ষণ সিঁটিয়ে ছিল। এবার একগাল হেসে বলল, ‘দ্যাখেন দ্যাহেন। আমার আপত্তি নাই।’
নিশিকান্ত চৈতনের ফতুয়ার পকেটে হাত ঢুকিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজল কিন্তু চারটে পকেটে একটা সিকি—আধলাও পাওয়া গেল না। সব ফাঁকা। সে জানে তার মক্কেলটি সোজা সরল ব্যক্তি নন, অতি ধুরন্ধর। নিশিকান্ত তার বুকে চাপড় মেরে মেরে বুঝতে চেষ্টা করল, জামার ভেতর লুকোনো টাকার থলি টলি আছে কিনা। না, নেই। তার হাত এবার একই কায়দায় সারা পেটে তল্লাশি চালাল। না, সেখানেও কোনও কিছুর হদিস পাওয়া গেল না।
রন্টুর খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চোখদুটো গোলাকার করে সে উকিল আর মক্কেলের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। লক্ষ করল, নিশিকান্তর মুখচোখ রাগে গন গন করছে কিন্তু চৈতন্যের মুখে সেই হাসিটি লেগেই আছে।
নিশিকান্ত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। তার হাত এবার মক্কেলের তলপেটে নেমে এল।
চৈতন আঁতকে উঠল, ‘করেন কী উকিল কত্তা, করেন কী! আর নীচে নাইমেন না।’
হুঁশ ফিরে এল নিশিকান্তর। সত্যিই তো, আরও নীচে হাত নামালে সেটা ভীষণ বিশ্রী ব্যাপার হবে। অগত্যা ক্ষান্ত দিতে হল। তবে আশা ছাড়ল না উকিলবাবু, দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ‘পিছন ফিরা খাড়া—’
আদেশ পালিত হল। পেছন ফিরে দাঁড়াল চৈতন। নিশিকান্ত বুক—পিঠের মতো তার সারা পিঠেও হাত চালাল। না, গুপ্তধন সেখানেও নেই।
ওদিকে ইছামতীর গয়নার নৌকোর ঘাট থেকে মাঝিরা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকাডাকি শুরু করেছে, ‘যেনারা যেনারা চরবেগুলা, চরলখিন্দর, চরইসমাইল, চরবাসন্তীতে যাইবেন, চইলা আহেন, আহেন। নাও অহনই ছাইড়া দিব। আহেন আহেন—’
চৈতন ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। সে রীতিমতো চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘উকিলকত্তা, খুজাখুজি তো মেলা করলেন। চরের নাও ছাইড়া দিলে পরের নাও—এর লেইগা আমারে গঞ্জে তিন—চাইর ঘণ্টা বইয়া থাকতে হইব। হুকুম করেন, আমি চইলা যাই। চিন্তা নাই, আপনের ট্যাকা মাইর যাইব না। কড়ায় গণ্ডায় মিডাইয়া দিমু। অ্যালা যাই কত্তা?’
এত করেও কিছু মিলল না। নিশিকান্ত উকিল হতাশ হয়ে পড়েছে। চিরতা—গেলা মতো মুখ করে বিরস গলায় বলল, ‘যা তাইলে—’ সে একেবারে হাল ছেড়ে দিয়েছে।
রণ্টু বুঝতে পেরেছে চৈতন পাল ইছামতীর কোনও একটা চরে থাকে।
চৈতন বলল, ‘পন্নাম উকিলকত্তা—’ বলেই লম্বা লম্বা পায়ে গয়নার নৌকোর ঘাটের দিকে হাঁটা দিল। বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছে সে, আচমকা নিশিকান্ত উকিলের দুচোখে যেন ঝিলিক খেলে গেল। সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে জোরে জোরে নাড়তে নাড়তে ডাকতে লাগল, ‘এই চৈতন, চৈতন, যাইস না, যাইস না—’
চৈতন থমকে গেল। ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ডাকেন ক্যান কত্তা?’
‘একহান কথা শুইনা যা—’
‘নাও ছাইড়া দিব।’
‘ছাড়ব না। মাঝিরা আধাঘণ্টা চিল্লাচিল্লির পর নাও ছাড়ে। আমার কথাহান কইতে তিন মিনিটও লাগব না। আয়—আয়—’
পায়ে পায়ে এগিয়ে এল চৈতন। বলল, ‘ক’ন উকিলকত্তা—’
‘আরেকবার পিছন ফিরা খাড়া দেহি।’
‘ক্যান কত্তা, ক্যান?’
‘যা কই তাই কর—’
ধন্দ—ধরা মানুষের মতো একবার নিশিকান্তর দিকে তাকিয়ে পেছন ফিরল চৈতন।
নিশিকান্ত বলল, ‘তর সারা গায়ে তালাশ করছি, খালি কাছাডা দেখা হয় নাই।’
‘না, না—’ গলা ফাটিয়ে চিক্কর ছেড়ে তিন—চারটে পাক খেয়ে ভিরমি খেতে খেতে কোনওরকমে সামলে নিল চৈতন।—কাছায় হাত দিয়েন না উকিলকত্তা, হাত দিয়েন না—’
কে কার কথা শোনে। নিশিকান্ত ততক্ষণে চৈতনের কাছাটা টেনে খুলে হাতের মুঠোয় চেপে ধরেছে। মুহূর্তে সেটার ভেতর থেকে একটা ছোট কাপড়ের থলি বের করে বলল, ‘এইডা কী?’
চৈতন চেঁচাতে লাগল, ‘খুইলেন না উকিলকত্তা, খুইলেন না। ওইডার ভিতরে কিছু নাই—’
তার কথা কানেই তুলল না নিশিকান্ত সাহা রায়। মুহূর্তে থলির মুখটা খুলে তার ভেতর থেকে বের করে আনল ষষ্ঠ জর্জের ছবিওয়ালা আটটা রুপোর টাকা, কিছু সিকি, আধুলি, দু—আনি আর তামার পয়সা।
তখন ইংরেজ রাজত্ব চলছে। সেই আমলে পূর্ব বাংলার গ্রামেগঞ্জে কাগজের নোট ক’টাই বা দেখা যেত! কাজ কারবার চলত রুপোর টাকা, সিকি আধুলি—টাধুলি দিয়ে।
হাতের ভেতর টাকাগুলো নাচাতে নাচাতে নিশিকান্ত বলল, ‘কী রে চৈতন, তুই তো কইছিলি কিছু নাই, তাইলে এগুলি কী?’
চৈতন হাহাকার করে উঠল, ‘নিয়েন না, নিয়েন না, আমি এক্কেরে পথে বইয়া যামু।’
নিশিকান্ত উত্তর দিল না। দুই ঠোঁটের ফাঁকে হালকা একটু হাসি ফুটিয়ে টাকাগুলো কোটের পকেটে ঢুকিয়ে দিল।
চৈতনের হাহাকার চলছেই।—’মইরা যামু কত্তা, এক্কেরে মইরাই যামু—’
নিশিকান্তকে গলানো গেল না। বলল, ‘নিজের বড় টেটন ভাবছিলি। কাছায় ট্যাকাপয়সার থইলা গুইজা পার পাইয়া যাবি, কেমুন? ঘুঘু দেখছ, ফান্দ দেখো নাই, তুমি যাও ডাইলে ডাইলে, আমি যাই পাতায় পাতায়। যা ভাগ—’
চৈতনের নড়ার লক্ষণ নেই।
গয়নার নৌকোর মাঝিদের হাঁকাহাঁকি চলছেই। নিশিকান্ত বলল, ‘কী রে, অহনও খাড়াইয়া অছিস যে!’ নাও তো ছাইড়া দিব।’
বারকয়েক ঢোঁক গিলে চৈতন কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, ‘উকিলকত্তা, আপনে তো আমার সব্বস্ব কাইড়া নিলেন। চরে ফিরুম কেমনে? এউক্কা পয়সাও তো নাই। নাও ভাড়া দিমু কই থিকা?’
নিশিকান্ত উকিলের হয়তো একটু করুণাই হল। পকেট থেকে একটা সিকি (এখনকার পঁচিশ পয়সা) বের করে ছুড়ে দিল। সেটা কুড়িয়ে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে গয়নার নৌকোর ঘাটটার দিকে চলে গেল চৈতন।
আর নিশিকান্ত সাহা রায় এবার রন্টুর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাতে নাচাতে জিজ্ঞেস করল, ‘নাতিবাবু, কিছু বুঝলা?’
মিটিমিটি হাসতে হাসতে রন্টু বলল, ‘সবই বুঝেছি। খুব ভালো একটা ম্যাজিক দেখালেন।’
দাঁত বের করে হাসতে লাগল নিশিকান্ত উকিল।
__
