২০. সুখানপুকুর নামের মানে কি
নীতু বলল, সুখানপুকুর নামের মানে কি আপা?
শাহানা বলল, যে পুকুর শুকিয়ে গেছে সেই পুকুরই সুখানপুকুর।
তাহলে তো বানান হওয়া উচিত তালিব্য শ দিয়ে…
শাহানা বিরক্ত গলায় বলল, তোকে নিয়ে বের হবার প্রধান সমস্যা হল–তুই খুব তুচ্ছ জিনিশ নিয়ে জটিল তর্কে যেতে চাস।
নীতু বলল, তোমাকে নিয়ে বেড়াতে বের হবার প্রধান সমস্যা কি তুমি জান?
না।
প্রধান সমস্যা হল–সব সময় তোমার মুডের উপর লক্ষ্য রাখতে হয়। তোমার দিকে লক্ষ্য রেখে কথা বলতে হয়। মোহসিন ভাই তোমাকে বিয়ে করে কি ভয়ংকর বিপদে যে পড়বে তা সে জানে না।
জানিয়ে দিস।
আসলেই জানানো উচিত। উনি এলেই প্রথম এই কথা বলব।
শাহানা বিস্মিত হয়ে বলল, উনি এলেই মানে? সে আসছে না-কি?
হুঁ।
হুঁ মানে কি? পরিষ্কার করে বল।
উনি আসছেন, মিতু আপা আসছে।
কেন?
দাদাজান তাদের আনার জন্যে নে কখন আসবে?
আজ ভোরবেলা এসে পৌঁছানোর কথা। এই জন্যেই আমি তোমার সঙ্গে বের হতে চাইনি। তুমি জোর করে নিয়ে এলে।
দাদাজান হঠাৎ ওদের নিয়ে আসছেন কি জন্যে?
সেটা দাদাজানই জানেন। সম্ভবত তোমাকে অবাক করে দিতে চান।
আমাকে অবাক করবার তার দরকারটা কি?
তোমাকে উনি খুবই পছন্দ করেন। আমরা যাদের পছন্দ করি তাদের অবাক করে দিতে আমাদের ভাল লাগে।
শাহানা বিরক্ত বোধ করছে। মিতু আসছে আসুক। মিতুর সঙ্গে মোহসিন আসছে কেন? বিয়ের আগের সময়টা সে নিজের মত করে থাকতে চায়? নীতু বলল, তুমি মুখটা এমন কাল করে ফেললে কেন? মোহসিন ভাই আসছে এতে তো তোমার আনন্দিত হবার কথা। এখন আর আমাকে সঙ্গে নিয়ে তোমাকে ঘুরতে হবে না। তুমি। সঙ্গী পেয়ে গেলে।
এত কথা বলিস না তো নীতু, মাথা ধরে যাচ্ছে।
আচ্ছা আর কথা বলব না। এখন থেকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সাইন ল্যাংগুয়েজে জবাব দেব। আপা, তুমি কি সাইন ল্যাংগুয়েজ জান? আমি তোমাকে ভালবাসি এটা সাইন ল্যাংগুয়েজে কি ভাবে বলা হয়?
তুই চলে যা নীতু। আমি একা একা ঘুরব।
চলে যাব?
হ্যাঁ চলে যা। ওরা আসবে, ওদের জন্যে অপেক্ষা কর।
তুমি বাড়ি ফিরবে কখন?
দুপুরের আগেই ফিরব।
ওরা যদি চলে আসে তোমাকে খবর পাঠাব?
না।
নীতু খুশি মনে চলে যাচ্ছে। শাহানা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। জায়গাটা খুব সুন্দর। ছোট্ট সুন্দর একটা দীঘি। গ্রামের দীঘির চারদিকে সাধারণত নারকেল গাছ কিংবা তালগাছ থাকে। এই দীঘিটার চারদিকে কদমগাছ। কদমফুল ফুটে আলো হয়ে আছে। অপরিকল্পিতভাবে এমন কিছু করা যায় না। খুব রুচিবান কোন মানুষ ভেবেচিন্তে গাছগুলি লাগিয়েছেন। কে সেই রুচিবান মানুষ?
শাহানা মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে কদমগাছ দেখছে। এই মুহূর্তে কেউ যদি তাকে বলে? পৃথিবীর সবচে সুন্দর ফুলের নাম কি? সে অবশ্যই বলবে–কদম।
আম্মাজি!
শাহানা চমকে তাকাল। বৃদ্ধ একজন মানুষ কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিনয়ে প্রায় নুয়ে পড়েছে। মুখে আনন্দের হাসি।
কি দেখেন আম্মাজি?
কদমগাছ দেখি। দীঘির চারদিকে এমন সুন্দর করে কে কদমগাছ লাগিয়েছে বলতে পারেন?
কেউ লাগায় নাই আম্মজি, আপনাআপনি হইছে?
সত্যি?
জ্বি।
এই গ্রামে কি আরো দীঘি আছে?
জি-না। একটাই দীঘি?
দীঘিটার নাম কি?
কোন নাম নাই আজি–আফনে একটা নাম দেন, আমরা হেই নামে ডাকব।
আমি একটা নাম দিলেই সবাই এই নামে ডাকবে?
অবশ্যই ডাকব। এই গেরামের মানুষ যে আফনেরে কত ভাল পায় এইটা আফনে জানেন না।
শাহানা লজ্জিত গলায় বলল, আমি তো আপনাদের জন্য তেমন কিছু করিনি। দশ বার জন রোগি দেখেছি। সেটা তো আমি দেখবই। আমি তো আপনাদের গ্রামেরই মেয়ে। ডাক্তার হয়েছি। রোগি দেখা তো আমার পেশা।
আফনের রোগ দেখা আর অন্যের রোগি দেখার মইধ্যে আসমান-জমিন ফারাক আছে।
শাহানা হাসছে। সে এখনো তাকিয়ে আছে কদমগাছগুলির দিকে–ইস, কি সুন্দর ফুল!
আম্মাজি, ফুল পাইরা দিব?
না। গাছের ফুল গাছেই থাক। আচ্ছা ঠিক আছে, দিন তো কয়েকটা ফুল। আপনি তো গাছে উঠতে পারবেন না–ফুল পাড়বেন কি ভাবে?
আম্মাজি, আমি পাইরা পাঠাইয়া দিমু।
আচ্ছা?
শাহানা হাঁটছে। গ্রামের বৌ-ঝিদের কৌতূহলী দৃষ্টি তাকে অনুসরণ করছেন কিন্তু কেউ তাকে বিরক্ত করছে না। হাঁটতে হাঁটতে শাহানার মনে হল—এই গ্রামের মানুষগুলি এত হত দরিদ্র কেন? ঘরবাড়ির কি অবস্থা! আহা রে, একুটু কিছু যদি এই মানুষগুলির জন্যে করা যেত!
একটা বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছে। ব্যাকুল হয়ে ফুঁখিয়ে ফুঁপিয়ে কে কাঁদছে। শাহানা থমকে দাঁড়াল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির ভেতর থেকে ঘোমটা দেয়া একজন বৃদ্ধ মহিলা বের হয়ে এলেন।
বৃদ্ধ গাঢ় আন্তরিকতার স্বরে বললেন, আমার বাড়ির সামনে আইস্যা দাঁড়াইছেন কি যে খুশি হইছি আম্মা।
শাহানা বলল, কাঁদছে কে?
আমার ছেলের বৌ কানতাছে আম্মা।
কেন?
আপনেরে দেইখ্যা কানতাছে।
আমাকে দেখে কাঁদছে কেন?
বউটার বড় ছেলেটা গত মাসে চাইর দিনের জ্বরে মারা গেছে। আম্মা, আপনেরে দেইখ্যা এই জন্যে কানতাছে। যদি এক মাস আগে আইতেন, ছেলেটা বাঁচত।
শাহানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বউটার হাহাকার সহ্য করা যায় না। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে বিনিয়ে বিনিয়ে বলছে–আল্লাহ, রাজবাড়ির কন্যারে তুমি আইজ কেন পাঠাইলা? তুমি কেন এক মাস আগে পাঠাইলা না!…
শাহানার চোখে পানি এসে গেল। আর জন্যে সে লজ্জিতও হল না। শাড়ির আঁচিলে চোখ মুছে বলল, আপনি আপনার বৌমাকে বুঝিয়ে বলবেন–জীবন এবং মৃত্যু আল্লাহ ঠিক করে রাখেন। মানুঝের কিছুই করণীয় নেই।
শাহানা জানে সে ভুল কখা বলেছে। মানুষের অনেক কিছুই করণীয় আছে–মানুষের আছে রোগব্যাধির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তিশালী সব হারিয়ার। মৃত্যুর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে মানুষ আজ উঁচু গলায় বলতে পারে–বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী।
বৃদ্ধা তুললে, মা, আপনি একটু ঘরে পা দিবেন না?
জ্বি-না। আপনার বউমার কান্না শুনে আমার খুব খারাপ লাগছে। দেখছেন না আমার নিজের চোখে পানি এসে গেছে।
আম্মাগো, বড় খুশি হইছি, আপনি যে আমার বাড়ির সামনে দাঁড়াইছে–বড় খুশি হইছি। এখন কই যাইবেন আম্মা?
কোথাও যাব না, পথে পথে হাঁটব।
শাহানা কিছুক্ষণ পথে পথে হাঁটল–তারপর উপস্থিত হল মতির বাড়িতে। মতির আবার জ্বর এসেছে। সে কুণ্ডলি পাকিয়ে নোংরা বিছানায় শুয়ে আছে। শাহানাকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসল।
শাহানা বলল, আজ আমার মনটা খুব খারাপ। আপনি আমাকে একটা আনন্দের গান গেয়ে আমার মন ভাল করে দিল। আমি আমার গান শুনতে এসেছি।
মতি লাল, আনন্দের গান শুইনা মনের দুঃখ দূর হয় না। মনের দূর করতে দুঃখের গান লাগে।
বে, একটা দুঃখের গান গান।
মতি সঙ্গে সঙ্গে গান ধরল–
কে পরাইল আমার চউক্ষে কলংক কাজল?
কুসুম সকালে এসে মতির জ্বর দেখে গিয়েছিল।
সে এক বাটি সাগু নিয়ে ঘরে ঢুকে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দেখল–রাজবাড়ির মেয়ে চৌকিতে পা তুলে ধ্যানী মুর্তির মত বসে আছে। মতি মিয়া চোখ বন্ধ করে গলা ছেড়ে গাইছে–কে পরাইল আমার চউক্ষে কলংক কাজল।
কুসুম কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে নিঃশব্দে বের হয়ে গেল।
