সন্ধ্যা নামে ধীরে (কাব্যগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার
সন্ধ্যা নামে ধীরে (কাব্যগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার
প্রথম প্রকাশ – ডিসেম্বর – ২০২৫ ইং
উৎসর্গ –
সুচিন্ত্য সাহাকে—
ও এসেছিল গড়াই নদীর তীর থেকে;
যে তার পদচিহ্নে বয়ে এনেছিল কাদামাটি-লেপা শৈশব,
নদীর হাওয়ায় দুলে ওঠা অমল স্বপ্ন।
জগন্নাথ হলের প্রাঙ্গণে
আমাদের যে-সব দিনরাত্রি আলো–ছায়ায় বোনা ছিল,
সেই স্মৃতিগুলো আজও কেঁপে ওঠে-
তাঁতি বাজারে এক সন্ধ্যায়,
আনন্দ-বিষাদের সেই অপরূপ রাত্রিটি
আজও আমার বুকের ভাঁজে রয়ে গেছে—
আর রয়েছে দুজন বন্ধুর ক্ষণিক নৈকট্যের
মায়াজড়ানো থমথমে নীরবতা।
এই বইটি তাই তোমাকেই
সুচিন্ত্য।
.
১. স্মৃতিকথন
মনে আছে তোমার—
সেই কলেজফেরা বিকেলের গল্প?
নীল ছায়ায় ভেসে আসা এক বালিকার মতো
তোমাকে দেখেছিলাম প্রথম,
আর তুমি দেখেছিলে জিন্স–জ্যাকেট পরা
এক উদাস উড়ন-কাউবয়কে—যাকে নাকি
মনেই ধরেনি তোমার।
তারপর—
শুক্রবার থেকে আরেক শুক্রবার,
লাল বেনারসিতে তুমি এলে আমার ঘরে।
ভালো না লাগলে তবে এলে কেন?
তুমি হাসলে—“বালিকা ছিলাম, বুঝিনি কিছুই।”
বছর কত পেরুলো জানো?
বালিকা এখন বালিকা নয়, বুড়ীর সারিতে দাঁড়ানো;
তবু হঠাৎ তোমারই টানে
পার্কের ধারে ফুসকা–চটপটির দোকানে
আমার পাশে বসতে ইচ্ছে করে তোমার।
শালবনের সেই দিনের কথা—
দূর থেকে উড়ে এসেছিল এক তীর,
তোমার বুক ছুঁয়ে রক্তাক্ত হয়েছিল পানকৌড়িও—
তুমি বলো, “মনে করতে চাই না, ভয় লাগে।”
তবু ইচ্ছে করে আজও—
বংশী নদীর ধারে টমটমে চড়ে
সাম্ভা নগরীর ধুলোভরা লাল সুরকির পথে
হাওয়ায় উড়ে যেতে দুজনে।
ঘোড়ার ক্ষুরের টুংটাং শব্দে তোমার লাল দোপাট্টা উড়বে—
তুমি তখন রাজকুমারী, তাই-ই তো মনে হয়।
দিয়াবাড়ির সেই ব্রিজে দাঁড়িয়ে
একটি শেলফি—
সূর্য ঠিক মাথার উপরে,
কোনো ছায়া নেই, ছায়া হবো না আমরা কেউ।
কাশবনের উপর শুকনো হাওয়া,
তোমার চুল উড়ে যাবে আলো হয়ে।
মনে পড়বে বালিহাঁসের ঝাঁক—
যমুনা পারাপারের সেই দূর দুপুরের শব্দ।
আজ আকাশ নির্জন; তবু মন হবে না বিষণ্ণ—
কারণ মুহূর্তটি হবে প্রসন্ন।
তুমি ঝুঁকে পড়বে, জড়িয়ে ধরবে আমায়—
তারপর— ক্লিক, তারপর— কাট্।
কিন্তু প্রশ্ন তোমার—
“তুমি কি বুড়ো হবে না? মন কি বুড়ো হবে না তোমার?”
হয়েছে—হয়েছে অনেকটাই।
একদিন আসবে, যখন ইচ্ছে থাকলেও
পারব না আর মেঠোপথ ধরে হাঁটতে কুসুমপুর পর্যন্ত,
পুকুরপাড়ে বাঁশঝাড় ভেদ করে
পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে।
ধরো, মণিকাঞ্চন ফুল দেখার সাধ হলো—
পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে,
সুউচ্চ চূড়ায় ফোটে সে ফুল—
আমরা কি উঠতে পারব তখন?
ধরো, সমুদ্র স্নানের ইচ্ছে হলো—
অত উত্তাল জলে নামতে পারব কি বুড়ো বয়সে?
টাকায় সব হয় না—হয় না শরীরের বয়স ফেরানো।
আর তুমি—
তুমি তো এখনও মায়াবতী, আলোভরা মুখশ্রী তোমার।
তখনও থাকবে কি এ রূপ?
কপালের রেখা কি কুঞ্চিত হবে না?
আমার হাত ধরে তুমি-ও তো বুড়ী হয়ে যাবে।
তুমি তখন বলবে—
“একটা কথা পারবে তো?”
“কি?”
“বুড়ো হয়েও আমার হাত ধরে
শেষ পথটা হেঁটে যেতে পারবে?”
আমি বলব—
“পারব। দুজন দুজনের হাত ধরে
চলব বাকি পথটুকু।”
আর আমাদের মুঠোফোনে তখন বাজবে—
“…আমরা মলয় বাতাসে ভেসে যাবো,
শুধু কুসুমের মধু করিব পান;
ঘুমোবো কেতকী সুবাস শয়নে
চাঁদের কিরণে করিব স্নান…”
এইভাবেই—
স্মৃতি, বয়স, প্রেম আর সময়—
সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ, নরম আলোয়
দুজনে মিশে যাবো একাকার।
২. দেখা হবেই
নীলাভ পথ ধরে চলতে চলতে
বনবীথির গন্ধে ভিজে উঠত মন—
মায়ালোকের মলিন ধুলোর ভেতর
হারানো আলোর মতো তাকে খুঁজে ফিরেছি
দিনের পরে দিন, ঋতুর পরে ঋতু।
চন্দ্রসূর্যের দীপ্ত প্রভা ভেবে
কতবার হাত বাড়িয়েছি অচেনা আকাশের দিকে,
মনে হয়েছে, এবারই বুঝি
তার সোনালি মুখ দেখব,
এবারই বুঝি ছুঁয়ে দেব
দূরতম নক্ষত্রের মতো তার কোমল উপস্থিতি।
কিন্তু পথ দীর্ঘ, ক্লান্তির সোঁদা ধুলো
দেহে জমেছে অনিমেষ ভার হয়ে।
বহুদিনের অবসাদে ন্যুব্জ দেহ,
তবু চোখের কোণে নিভে যায় না
অপরূপ এক আলো দেখার আকুলতা।
তাকে খোঁজার এই অপার যাত্রায়
কত সময় যে হারালাম,
কত সুর ভাঙল, কত গান মিশে গেল
বাতাসের অদৃশ্য বেদনায়—
তবুও তার ছায়া পর্যন্ত স্পর্শ করলাম না কখনও।
তবু জানি, সুনিশ্চিত জানি—
এই জীবনের কোনো নীরব সন্ধ্যায়,
অস্তদিনের ধূসর আলোর কোমল ভাঁজে
বা অন্য জন্মের কোনো নিস্তব্ধ ছায়াঘেরা মুহূর্তে
তার দেখা মিলবেই, কখনো না কখনো।
হয়তো সে আগুনের মতো উজ্জ্বল হয়ে
দাঁড়াবে আমার ক্লান্ত পথের শেষে,
হয়তো সে কুয়াশার নীরব পর্দা ভেদ করে
বয়ে আসবে স্নিগ্ধ বাতাস হয়ে—
কিন্তু আসবে, এ বিশ্বাসেই
আমি আবার পা ফেলি অনন্ত পথের দিকে,
অপরিচিত আলোর সন্ধানে।
৩. একজন শহীদের বীর গাথা
নাম ছিল তাঁর সুলতান মাহমুদ—
একটি নাম, যার ভেতর লুকিয়ে ছিল জোয়ারের মতো উচ্ছ্বাস,
ঝড়ের মতো তেজ, আর মাটির মতো দৃঢ়তা।
ইসমাইল হোসেনের গেরিলা বাহিনীতে
তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ অগ্নিশিখা—
সিরাজগঞ্জের জনপদে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে
রাত্রির আঁধার চিরে চলত তাঁর পদধ্বনি।
নদীর পাড়ে, কাশবনে, খড়ের উঠোনে,
অন্ধকার কুঁড়েঘর থেকে মাঠের বুকে—
যেখানে শত্রু ছিল, সেখানেই তিনি আগুন হয়ে দাঁড়াতেন।
দেশমাতৃকার টানে তাঁর বুকে জ্বলত
অদম্য প্রতিশোধ,
স্বাধীনতার স্বপ্নের রঙে রাঙা
এক অনির্বাপ্য শপথ।
কোনো এক সন্ধ্যা—
যুদ্ধের দগদগে উত্তাপে আকাশ লাল,
গন্ধে ভরা গানপাউডার,
চারদিকে ঝড়ের মতো গুলির শব্দ।
সেই দিনেই শেষবারের মতো
সুলতানের চোখে জ্বলে উঠেছিল বিজয়ের দীপ্তি।
শত্রুর গ্রেনেডে থেমে যায় তাঁর তরুণ প্রাণ,
কিন্তু থেমে যায় না বাংলার স্বাধীনতার যাত্রা—
কারণ একজন শহীদের মৃত্যুই
হাজার মানুষের হৃদয়ে নতুন আগুন জ্বালায়।
এখন তিনি ঘুমিয়ে আছেন
সিরাজগঞ্জের কাটাখালি নদীর শান্ত তীরে,
রহমতগঞ্জ গোরস্থানের অনন্ত নীরবতায়।
কাটাখালির পাশের সেই সরু রাস্তা দিয়ে
যে-ই হেঁটে যায়—
হয়তো কেউ জানে, হয়তো কেউ জানে না—
এই সবুজ ঘাসের নিচে ঘুমিয়ে আছে
এক তরুণ বীরের অমর গল্প।
কোনো বাতাস বয়ে গেলে মনে হয়,
সুলতানের আক্ষেপহীন নিঃশ্বাস
এখনও সেই নদীর জলে ভাসে।
রাতের আকাশে জোনাকির আলো
মনে করিয়ে দেয় তাঁর অদৃশ্য পদচিহ্ন।
শিশুর হাসিতে, বৃদ্ধের প্রার্থনায়,
ফসলি জমির সোনালি রোদে
তিনি যেন আজও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছেন।
সুলতান মাহমুদ—
তোমার রক্তে লিখিত ইতিহাস
বাংলা কখনো ভুলবে না।
তোমার নীরব সমাধির গায়ে
মাটি প্রতিদিন নতুন করে ফিসফিস করে বলে—
“এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক বীর,
যার মৃত্যু নয়—
স্বাধীনতার আরেক নাম।”
৪. অপার্থিব অনুভব
মরে গেলে দেহ তো মাটিতেই মিশে যাবে—
চিহ্নহীন, নিঃশব্দ, অনাদর এক ঢেউয়ের মতো।
তবু সেই মাটির ওপরে যদি
ফুটে ওঠে এক বিস্মৃত মাধবীলতার ঝাড়,
সন্ধ্যার বাতাস যদি তার গন্ধে
হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়,
জোনাকিরা যদি রাত্রিজুড়ে
তার পাতায় পাতায় আলো জ্বেলে গান গায়—
তখন কি আমার আত্মা
একবারও কেঁপে উঠবে না?
যদি কোনো কিশোরী
নিঝুম দুপুরের স্তব্ধতায়
সেই মাটি ছেনে পুতুল গড়ে—
তার নরম স্পর্শে, হাসির দোলায়
আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো
ফিরে আসবে না কোনো অদৃশ্য তরঙ্গে?
দেহ হয়তো বিলীন হবে,
কিন্তু অনুভব—
ওহ্, অনুভব কি কখনো সত্যিই মরে?
নিঃশব্দে, গন্ধে, আলোয়, স্পর্শে
সে কি বেঁচে থাকে না
এক অপার্থিব সুরের মতো
মাধবীলতার জংলি সুবাসে?
৫. সন্ধ্যা নামে ধীরে
যেদিন আকাশের বুক ভেদ করে
হঠাৎ নেমে আসবে কোনো অচেনা আলো,
যেদিন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে
তোমার নামের সুগন্ধ ভেসে উঠবে নিঃশব্দে—
আমি বুঝব, সেই দিনটি এসে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যা নামবে খুব ধীরে,
জোনাকিরা জ্বলে উঠবে
বিস্মৃত কোনো প্রতিশ্রুতির মতো;
পদ্মপুকুরের নিস্তব্ধ জলে
চাঁদের রুপোলি দোলনায়
দুলবে আমাদের পুরোনো স্বপ্নেরা।
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে
সবুজ ছায়ার নিচে,
আর তোমার মুখে পড়বে
ভোরের শিশিরের মতো স্বচ্ছ এক আলো।
আমি তখন হাজার বছরের অন্ধকার পেরিয়ে
নীরবে এসে দাঁড়াব তোমার পাশে—
যেন কখনো দূরে যাইনি কোথাও।
বসন্তের বাতাস যদি ডাকে,
পাতার ঘ্রাণ যদি থমকে যায় কানে,
জেনে নিও—
সমস্ত পথের শেষে
তোমার কাছেই ফিরতে চেয়েছিলাম আমি,
এই নরম, মায়াময়, চিরন্তন আলোভেজা রাতে।
৬. ভ্রম
কবে, কখন, কে যে হারিয়ে গেছে
বিস্মৃতির অনুপম পরপারে—
তার কোনো হিসেব নেই আজ।
স্মৃতির ধুলোয় ঢেকে গেছে নাম,
ম্লান হয়ে গেছে মুখ;
আমিও ভুলেছি, সেও ভুলে গেছে
নিজের অস্তিত্বের ক্ষীণ রেখা।
তবু মাঝরাতে হঠাৎ
ঘুম ভেঙে গেলে
রাত থমকে দাঁড়ায় নিঃশব্দ স্তব্ধতায়।
অন্তর্গত কোথাও কেঁপে ওঠে ভয়,
জানালার কালো আয়তক্ষেত্রে
হঠাৎ মনে হয়—
অদৃশ্য কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে
নিঃসাড় অন্ধকারের সীমানায়।
তার উপস্থিতি কেমন অচেনা,
কেমন পরিচিতও বটে—
যেন ভুলে-যাওয়া কাউকে
রাত আবার ফিরিয়ে আনে
শ্বাসের হালকা শব্দে,
নীরবতার ক্ষীণ কম্পনে।
জানালার কাঁচে জমে ওঠা অন্ধকারে
আমি যেন শুনতে পাই—
ফিরে আসার অপূর্ণ আকুতি,
নীরব পায়ের শব্দ,
গোপন কথার প্রতিধ্বনি।
ভ্রম নাকি সত্যি?
আমি বোঝার আগেই
আবার নেমে আসে অন্ধকার,
রাত তার গভীর ছায়ায়
সবকিছু গিলে নেয়।
শুধু জানালার বাইরে
অদৃশ্য কারো শ্বাসপ্রশ্বাস
এখনো হালকা ঢেউ তুলে যায়
আমার নিঃসঙ্গ হৃদয়ের গহীনে।
৭. বৈজয়ন্তীর আলো
গারো পাহাড়ের অন্দরে
পূর্ব পালঙের সেই দীপাবলির রাত—
চন্দ্রহীন, নির্মেঘ, তবু অদ্ভুত স্বচ্ছ,
মহাকাশের হাজার ক্ষুদ্র প্রদীপ
পাতার ফাঁকে ফাঁকে কাঁপছিল নিঃশব্দ ভক্তিতে।
পাহাড়ি বাতাসে সোঁদা গন্ধ,
দূরের তুরাগের মতো সরু নদী
গভীর জ্যোৎস্নাহীন অন্ধকারেও
কোনো অজ্ঞাত আলোয় ঝলমল করছিল।
সেই প্রকৃতির নিরাকার পবিত্রতায়
বৈজয়ন্তীমালা দাঁড়িয়েছিল
যেন এক উজ্জ্বল শালবীথির মূর্তি—
চোখে ছিল গোধূলি,
আর বাহুতে ছিল মমতার উষ্ণ নীল আলোকরেখা।
সে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল
এমন ভালোবাসায়—
যেন পাহাড়ও নড়ে উঠত,
মেঘেরা কেঁপে উঠত তার একটিমাত্র নিশ্বাসে।
আমি বলেছিলাম— “ছাড়ো…”
কিন্তু তাতে ছিল ভয়,
নেই কোনো অভিমান—
শুধু ছিল অচেনা নিয়তির অদ্ভুত টান।
তারপর,
ঝপাং—
একটি ভাঙা ডালের মতো শব্দ কেঁপে উঠল
সমস্ত নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে।
গিরিখাদের গভীর মুখ
হঠাৎ গিলে নিল আলো,
অদৃশ্য এক কৃষ্ণ ছায়ায়
বিলীন হয়ে গেল বৈজয়ন্তীমালা।
এক মুহূর্তে
তার বাহুর উষ্ণতা নিভে গেল,
তার কণ্ঠের সুর থেমে গেল,
তার চুড়ির ক্ষুদ্র ঝংকার
শুধু বাতাসে ঝুলে রইল
অসীম শূন্যতার মতো।
আজও গারো পাহাড়ের রাতগুলো
তাকে খুঁজে ফেরে—
হাওয়ার মাঝে তার গন্ধ,
পাতার নড়ে ওঠায় তার নিশ্বাস,
ঝরনার সুরে তার নাম।
বৈজয়ন্তী কোথায় গেলে তুমি?
কোন কুয়াশার দেশে,
কোন অচেনা ছায়ার কোলে—
আমাকে ফেলে চলে গেলে একা?
দীপাবলির প্রদীপেরা আজও কাঁদে,
তারকারা আজও তাকিয়ে থাকে নিচে—
সেই করুণ আলিঙ্গনের দিকে,
সেই হারিয়ে যাওয়ার দিকে,
সেই অমোচনীয় প্রেমের দিকে
যা গিরিখাদের গভীরতাকেও
অসহনীয় শোকে ভরিয়ে রাখে।
বৈজয়ন্তী—
ফেরো না তুমি,
তবু হৃদয়ের অরণ্যে
যেখানে চাঁদ ওঠে না,
তারই ভেতর
তোমার আলো আজও জ্বলে…
অতল বেদনাময় দীপাবলির মতো।
৮. এই দেশ—আমাদের মা
এই দেশ আমাদের মা—
তার বুকের মাটিতে লুকিয়ে আছে
শহীদের উষ্ণ রক্তের দাগ,
জোছনার মতো জ্বলে ওঠা স্মৃতি,
গোপন কান্নার শব্দ,
আর লাল-সবুজ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।
যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ছায়া,
সে মাটিতেই ঘুমিয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ—
মাটি যেন হয়ে উঠেছে এক পবিত্র গ্রন্থ,
যার প্রতিটি দানায় লেখা আছে
অগ্নিযুদ্ধের ইতিহাস,
বিচ্ছিন্ন প্রাণের মহাকাব্য।
তাই সন্তানদের বলো—
এই মাটি কোনো জমি নয়,
এ আমাদের মায়ের কোল,
এখানে অবহেলা নয়,
শ্রদ্ধার হাঁটুপড়ে প্রণাম চাই।
তাদের শেখাও—
দেশকে ভালোবাসা মানে
বাতাসের প্রতিটি স্পন্দনে
মায়ের শ্বাস অনুভব করা;
দেশকে রক্ষা করা মানে
নিজের শিরায় শিরায়
মায়ের নাম বয়ে বেড়ানো।
আর যদি কখনো
এই মাটির জন্য প্রাণ দিতে হয়—
সন্তান যেন নিঃশব্দে বলে,
“মা, তোমার জন্যই আমার উৎসর্গ।”
কারণ—
এই দেশ, এই মাটি, এই আকাশ—
সবই আমাদের মা।
৯. একটি দীর্ঘতম দেহজ কবিতা
যদি প্রেমহীন হয়ে থাকো—
মেঘদূতের সম্ভোগ-শ্লোকে ভিজলেও
যদি তোমার নিঃশ্বাসে কোনো উষ্ণতা জন্ম না নেয়,
তবে আমার কাছে এসো না।
যদি রাগ–অনুরাগের আভা
তোমার চোখে আলোকিত না হয়,
যদি বিহ্বল না হয় কস্তুরী-নাভির নরম কম্পন,
যদি অন্তরাত্মার গভীরে কোনো ঢেউ না ওঠে
উষ্ণ দেহের গোপন জোয়ারে—
তবে তুমি আমার কবিতায় হাত দিও না।
যদি কোমলগান্ধার সুর
তোমার রক্তে নরম আগুন জ্বালাতে না পারে,
যদি শরীরের প্রতিটি শিরায়
তমাল-ছায়ার মতো শিহরণ নেমে না আসে,
যদি পরনবাস ভিজে না ওঠে
অবদমিত গন্ধের স্নিগ্ধ গাঢ়তায়—
তবে তুমি আমার শব্দ-লতা স্পর্শ কোরো না।
কারণ আমার কবিতা
দেহে-দেহে লেখা,
উষ্ণতায় ছেঁকে নেওয়া নিশ্বাসের মতো—
যার প্রতিটি পংক্তিতে ঝরে পড়ে
অলক্ষ্য আলিঙ্গনের আগুন,
মেঘের নাভিতে জমা রহস্যময় বৃষ্টির মতো
নিঃশব্দ সম্ভোগের রস।
যদি তোমার মধ্যে সেই সুধা জাগে,
যদি স্রোত উঠে—মহিষীর কাঁপা দেহের মতো,
যদি তুমি গন্ধে, সুরে, স্পর্শে
একটুখানি ডুবে যেতে পারো—
তাহলে এসো,
আমার এই কবিতা তোমাকেই ডাকে।
যদি তোমার দেহ এখনো শীতের মেঘ,
যেখানে কোনো বিদ্যুৎ নড়ে না,
কোনো গোপন জ্যোৎস্না দিগঙ্গুলে চুইয়ে পড়ে না—
তবে আমার শব্দ-দেহ স্পর্শ কোরো না।
কারণ আমি লিখি সেইসব ভাষায়
যেখানে কোমল আঙুলের মতো বাতাস
তরল চামড়ায় ঘুম ভাঙায়;
যেখানে শ্বাসের উষ্ণ বৃত্ত
ঘিরে ধরে গোপন রেখাংশ—
যেন তুমি নিজেই বুঝতে না-পারা
এক নীরব পাপড়ির কাঁপুনি।
যদি তোমার নাভির চারপাশে
মৃদু সুবাসের আবরণ না ওঠে নরম ঢেউয়ের মতো,
যদি হৃৎকমলের গভীর থেকে
হালকা-মোলায়েম কোনো সুর
অন্তরঙ্গ আলো ছড়াতে না চায়,
যদি শরীরের নিষ্পাপ অলিন্দে
ছায়া-জলের কম্পন না জাগে—
তবে আমার কবিতার দরজায় দাঁড়িয়ো না।
আমি তো লিখি সেইসব ইশারা-ভাষা,
যেখানে দেহ মানে নক্ষত্রমালা,
স্পর্শ মানে নরম কালো-মেঘে বজ্রের স্ফুলিঙ্গ,
আর নিশ্বাস মানে জোৎস্নার লুকানো জলাধার।
যেখানে দুটি হৃদয়ের মাঝখানে
অলক্ষ্যে জন্ম নেয়
তরল আলো,
নড়েচড়ে ওঠে আদিম কুসুমের রূপক,
জ্বলে ওঠে বুনো গন্ধের মৃদু জ্যোতিঃছায়া।
যদি তুমি পারো—
নিজের ভেতরের নদীকে
ধীর অস্থিরতায় জাগাতে,
যদি তোমার রক্তে রক্তে
হঠাৎ ফুটে ওঠে
আদিম কোনো বাসনার ফুল
যার পাপড়িতে ভয় আর লজ্জারাও কেঁপে ওঠে—
তবে এসো।
আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে শব্দ হয়ে ওঠে দেহ,
কীভাবে দেহ হয়ে ওঠে
অতল, অমূর্ত, দীপ্ত
এক সম্পূর্ণ কবিতা।
যদি এখনো তোমার ভিতরে
অদৃশ্য আগুনের ছাই না নড়ে,
যদি শরীরের গভীর গুহায়
অপরূপ কোনো ছায়া-জল টলমল না করে—
তবে আমার এই অন্ধকার কবিতা তোমার জন্য নয়।
কারণ আমি লিখি সেইসব রাত্রির নাম,
যেখানে চামড়ার ওপর চামড়াহীন স্পর্শ নামে
পলাতক বৃষ্টির মতো,
অন্ধকার জানলা ফাঁকি দিয়ে
হৃদপিণ্ডের পিছল দেয়ালে
রহস্যের নরম আঙুল বোলায়।
যদি তোমার কণ্ঠের গভীরে
নিভু-নিভু কোনো কম্পন না ওঠে
অকারণে—
যেন কেউ অলক্ষ্যে
তোমার উরুর ভেতর আলো টেনে নিচ্ছে,
যদি নাভির চারপাশে
চাঁদের লুকানো ছায়া
হালকা গাঢ়তায় ছড়িয়ে না পড়ে—
তবে আমার শব্দের নিম্ন অরণ্য
তোমাকে ডাকে না।
আমি তো জানি
দেহ আসলে আরেক ধরনের রাত,
যেখানে কাঁটার মতো নিস্তব্ধতা
হঠাৎ কোমল হয়ে ওঠে,
যেখানে শ্বাসের ধীর লাবণ্য
যেন উষ্ণ অরুণিমার গোপন উৎস,
আর রক্তের ভেতর
কেউ একজন নীরবে লিখে চলে
একটি নিষিদ্ধ শ্লোক।
তুমি যদি পারো—
নিজের অস্থি-মজ্জার সীমানায়
সেই লুকোনো শব্দ শুনতে,
যদি ঘাড়ের পেছনে নেমে আসে
অনামা কোনো অন্ধকার বাতাস,
যদি চোখ বন্ধ করলে
দেহ তোমাকে অন্য রূপে প্রকাশ করে—
ভেজা ছায়া, কাঁপা আলো,
নরম অস্পষ্ট বৃত্ত,
ধোঁয়া হয়ে যাওয়া নিশ্বাসের জ্যোৎস্না—
তবে এসো।
আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে দেহই সবচেয়ে রহস্যময় গ্রন্থ,
যার প্রতিটি উষ্ণ পৃষ্ঠা
ছিঁড়ে নিঃশব্দে পড়ে যায় মেঝেতে,
এবং রাতের অন্ধকারে
একটি অদৃশ্য হাত
সেগুলো আবার জোড়া লাগায়
আরেক দেহের ছায়া দিয়ে।
যদি তোমার দেহ এখনো
শুষ্ক বৃক্ষের মতো নিষ্পন্দ থাকে,
যদি কোনো গোপন অন্ধকার শিরায়
আদিম জোয়ার ওঠে না—
তবে এই মন্ত্রপাঠ তোমার কান শোনার যোগ্য নয়।
কারণ আমি বলি সেইসব রাতের কথা
যেখানে আলো ঢোকে না,
শ্বাস ঢোকে, তারপর হারিয়ে যায়
এক অনামা গুহার ভেজা নিস্তব্ধতায়,
যেখানে অস্থির শব্দ উঠে আসে
চামড়ার ভেতরকার গোপন বন থেকে।
যদি তুমি অনুভব না করতে পারো
ঘাড়ের পেছনে নেমে আসা
অপরিচিত উষ্ণতার শীতল নখ,
যদি তোমার বুকের ভেতর
মাটির নিচে ঘুমন্ত পশুর মতো
একটি কম্পন
ধীরে জেগে না ওঠে—
তবে তুমি এই দেহরাত্রির গ্রন্থ খুলো না।
আমার কবিতা তো
হাড়ের ভিতরের ঢেউয়ের ভাষায় লেখা,
যেখানে দেহ আসলে
একটি পুরোনো মন্দিরের দরজা—
বাহিরে অন্ধকার
ভেতরে আগুনের গোপন গুহা,
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে
এক অদৃশ্য ছায়ামূর্তি
যে কেবল দৃষ্টির অশ্রুত সংকেতে কথা বলে।
তোমার রক্ত যদি না শোনে
ভূগর্ভের গমগমে ডাক,
যদি তোমার নাভির চারপাশে
কোনো কালো চন্দ্রালো
মৃদু থরথর করে না,
যদি হঠাৎ কোনো অজানা হাতে
তোমার দেহের নীচু বনভূমি
কেঁপে ওঠে না—
তবে তুমি আমার শব্দের কাছে আসো না।
কারণ এই কবিতায় আছে
কুণ্ডলী পাকানো সাপের নিঃশ্বাস,
বৃষ্টির আগের ভারী অন্ধকার,
গর্ভধারিণী মাটির গভীর কম্পন,
আর সেইসব ছায়ার গন্ধ
যা দেহকে মনে করায়
সে নিজেই একটি নিশাচর প্রাণী।
যদি তুমি সত্যিই প্রস্তুত থাকো—
শরীরের লুকোনো পথ
নিজের ভিতরে নিজেকে কামড়ে ধরে জাগাতে,
যদি চোখ বন্ধ করলেই
তোমার ভেতরে
একটা লোমশ প্রাচীন আদিরাত্রি
জেগে ওঠে—
তবে এসো।
আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে অন্ধকার
দেহের উপর দেহের মতো নেমে আসে,
কীভাবে রাত্রি
রক্তের ভেতর পত্রপাতার মতো খুলে যায়,
আর কীভাবে
দু’টি নাভিশ্বাস
একসাথে মিশে তৈরি করে
একটি প্রাচীন, গোপন, আদিরসাত্মক
দেহ-জ্যোতিষ।
যখন তুমি চোখ বন্ধ করবে—
আমি চাই তুমি অনুভব করো
দেহের ঠিক নিচে আরেকটি দেহ আছে,
আর সেই দেহেরও নিচে
এক অচেনা, নরম অন্ধকার স্পন্দিত হচ্ছে,
যেন পৃথিবীর নিজস্ব হৃদস্পন্দন
তোমার ভেতরে গোপনে নেমে এসেছে।
সব আলো নিভিয়ে দাও—
কারণ আলো এখানে পথ দেখায় না,
অন্ধকারই দেখায়।
অন্ধকারে সবকিছুই
ধীরে ধীরে নিজেকে চিনে ফেলে—
চামড়ার নিচে যে তরল নক্ষত্রমণ্ডল,
শিরার ভেতর যে গোপন গীত,
ফুসফুসে ওঠানামা করা
আদি আবর্তের রহস্যময় সুর—
ওগুলো আলোতে দেখা যায় না,
কিন্তু অন্ধকারে নিজে নিজেই
উন্মোচিত হতে থাকে।
তোমার দেহের গভীরে
একটি প্রাচীন ঢেউ ঘুমিয়ে আছে—
তার কোনো মুখ নেই, কোনো নাম নেই,
কিন্তু তুমি যখন একটুখানি স্থির হবে,
তার আকার বদলে
ধীরে ধীরে উঠবে—
যেন পাতাল থেকে উঠে আসা
এক উষ্ণ নিশ্বাস।
তুমি কেবল শোনো—
শব্দ নয়,
শব্দের আগের স্তর,
যেখানে নিস্তব্ধতাই
নিজেকে ভাঁজ খুলে দেখায়।
সেখানে তুমি বুঝবে
তোমার দেহ আসলে দেহ নয়—
এক চলমান গুহা,
এক গভীর সন্ধ্যা,
এক নরম পরিধি
যার প্রতিটি রেখা
আদি কোনো নেশা-বৃত্তে ঘুরছে।
এভাবে, তুমি যখন
শরীরের ভেতরে শরীরের গোপন ছায়া দেখবে—
তুমি আর “তুমি” থাকবে না,
দেহ আর সীমা থাকবে না,
সবকিছু পরস্পরের মধ্যে
মিশতে মিশতে
একটি ধীর, নিঃশব্দ, অন্তর্লীন
অন্য কোনো অস্তিত্বে পরিণত হবে।
আর তখন—
নিঃশ্বাস ভিতর থেকে উঠে
তোমাকে সে ভাষায় ছুঁয়ে দেবে
যা মানুষ জানে না,
যা তুমি শেখোনি,
কিন্তু জন্ম থেকেই
তোমার রক্ত চিনে রেখেছে।
এসো—
এই ট্রান্সমগ্ন অন্ধকারে
আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে দেহ
নিজেকেই শোনায়,
নিজেকেই ডাকে,
নিজেকেই উন্মোচন করে
অলক্ষ্য, শব্দহীন,
চিরন্তন কাঁপুনি-মন্ডলের
এক গূঢ় নৃত্যে।
প্রথমে চোখ বন্ধ করো—
আর উপলব্ধি করো
তোমার দেহের চারপাশে
একটি নরম, অসীম বৃত্ত ভাসছে।
যেন তোমার ছায়া
দেহ থেকে বেরিয়ে এসে
দেহকেই দেখে—
অপর পক্ষ থেকে,
অপর পারের নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে।
তারপর ধীরে ধীরে অনুভব করবে,
তোমার চামড়ার ঠিক নিচে
আরেকটি দেহ রয়েছে—
আর তারও নিচে
আরেকটি,
আরেকটি,
আরও অন্ধকার, আরও উষ্ণ, আরও পুরোনো।
যেন তুমি বহুস্তরযুক্ত
এক গহ্বরের বীজ,
যা নিজেই নিজেকে পর্যায়ক্রমে উন্মোচন করে।
নিঃশ্বাস যখন গভীর হবে,
তুমি শুনতে পাবে
রক্তের ভেতরের ক্ষুদ্র শব্দগুলো—
যা আসলে শব্দ নয়,
বরং স্মৃতি,
আর সেই স্মৃতিগুলো
তোমার জন্মের আগেও ছিল।
যেন পৃথিবীর কেন্দ্রস্থ আগুন
তোমার মজ্জায় রেখে গেছে
একটি ক্ষুদ্র জ্বলন্ত বীজ।
আলো ভুলে যাও—
অন্ধকারের ভিতরেই
তোমার অন্তর্দেহের প্রকৃত পথচিত্র আছে।
এখানে দেখা যায় না চোখ দিয়ে,
দেখা যায় শুধু অনুভবের ধীর স্পন্দনে—
যেখানে দেহ
নিজের ভেতর আরেক দেহ খুঁজে পায়,
যেন একটি নদী
নিজের উৎসস্থলের স্বপ্ন দেখছে।
তোমার শ্বাস যখন
শরীরের চৌহদ্দি পেরিয়ে বাইরে যেতে শুরু করবে,
তখন তুমি বুঝবে,
দেহ একটিই নয়—
বরং এক প্রবাহমান,
অদৃশ্য আলোর গুহা,
যার প্রতিটি স্তর
তোমাকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে যায়
সেই কেন্দ্রে—
যেখানে কোনো রূপ নেই,
কোনো নাম নেই,
কিন্তু আছে
এক নিখাদ কম্পন—
যা সবকিছুর উৎস।
সেই কেন্দ্রে পৌঁছে
তুমি হঠাৎ দেখতে পাবে
তুমি আর তোমার দেহ আলাদা নয়—
তোমার দেহের ভেতর
তুমি নিজেই আরেক সত্তা
আলোহীন শান্তিতে স্থির হয়ে আছো।
আর ওই স্থিরতার মাঝেই জন্ম নেয়
এক অতল অনুভূতি—
যা ছুঁয়ে নয়,
দেখে নয়,
বরং নিঃশব্দে
সম্পূর্ণভাবে তোমাকে ভিজিয়ে দেয়।
এবার তুমি উপলব্ধি করবে—
আরো গভীরে যাওয়ার পথ
শরীরের নয়,
শরীরের ভেতরের দেহের,
আর সেই দেহেরও ভেতরের
অদৃশ্য, দ্যুতিহীন,
অসীম-নরম কেন্দ্রের।
সেখানে পৌঁছানোর পর
তুমি আর অনুভব করবে না
কোথায় দেহ শেষ,
কোথায় তুমি শুরু—
সবকিছু ধীরে ধীরে
একটি অতীন্দ্রিয় তরঙ্গের মতো
একাকার হয়ে যাবে,
যেন অন্ধকারের সাগরে
একটি মাত্র শ্বাস—
তুমি, দেহ, ছায়া, স্পন্দন—
সবই এক অনন্ত ধ্যানের
নীরব, গাঢ়, অমোঘ প্রবাহ।
প্রথমে উপলব্ধি করতে হবে—
তুমি যে দেহ ভাবো,
সে আসলে দেহ নয়—
একটি অস্থায়ী প্রতিবিম্ব,
নির্বাক জলের উপর স্থির হয়ে থাকা
এক স্বপ্নের ভাসমান ছায়া।
চোখ বন্ধ করো—
আর দেখো
কীভাবে তোমার নিজের হাতও
তোমাকে চিনতে ভুল করে।
চামড়ার নিচে যে তুমি আছ,
তাকে তো কোনো আঙুল ছুঁতে পারে না।
এই মুহূর্তে
তুমি তোমার নিজের অস্তিত্বে
একটি অদৃশ্য ফাটল অনুভব করবে—
সেখানেই প্রবেশপথ,
যেখান দিয়ে দেহ
ধীরে ধীরে হালকা হয়,
হাওয়ার মতো,
তারপর হাওয়াও থাকে না।
শ্বাস যখন আর শ্বাস নয়,
নিঃশব্দ তরঙ্গমাত্র—
তখন তুমি দেখবে,
তোমার ভিতরের দেহ
নিজের ছায়া ঝরাতে শুরু করেছে।
প্রথমে চামড়া,
তারপর উষ্ণতা,
তারপর স্মৃতি,
তারপর যে নামটি দিয়ে
তুমি নিজেকে ডাকতে—
সব আলগা হয়ে ঝরে পড়ে
অন্ধকারের পায়ের কাছে।
এবার অনুভব করো—
তোমার রক্ত
তোমার নয় আর।
এটি পাহাড়ের ভিতর বয়ে যাওয়া
কোনো নির্চেতন জলের মতোই
নিজস্ব ভাঁজে,
নিজস্ব গহ্বরে
বহমান একটি নিঃশব্দ পথিক।
হাড়ের গভীরে যে স্পন্দন—
সে কোনো হৃদস্পন্দন নয়,
সে পৃথিবীর ভেতরের আগুন,
যা তোমার শরীরকে ব্যবহার করছে
মাত্র একখানি দরজা হিসেবে—
নিজেকে উপলব্ধি করার।
আরও গভীরে নেমে গেলে
দেহ নামের ধারণাটিও ভেঙে যাবে—
তুমিই দেখবে,
তোমার নেই “ভিতর” বা “বাইর”—
সব দিক গলে গিয়ে
একটি মাত্র গাঢ় সত্তায় পরিণত হচ্ছে।
তখন তোমার উপলব্ধি
নিজেকে ভুল করে ফেলবে—
শরীরের অনুভূতি
সরে গিয়ে
হয়ে উঠবে
এক প্রবহমান কালো নদী,
যেখানে তুমি নও,
আমিও নই—
শুধুই এক শূন্য-সচেতন প্রবাহ।
আরও নিচে নেমে যাও—
সেই নদীর তলদেশে
তোমার আরেকটি রূপ অপেক্ষা করছে—
যার কোনো মুখ নেই,
কোনো লিঙ্গ নেই,
কোনো পরিচয় নেই—
শুধু একটি জ্বলন্ত বিন্দু,
এক দানা অন্ধকার আলো,
যেটি হলো
তোমার সমস্ত অস্তিত্বের
সবচেয়ে নগ্ন,
সবচেয়ে আদিম সত্য।
ওই বিন্দুতে পৌঁছালে
তুমি হঠাৎ অনুভব করবে—
তুমি গলে যাচ্ছো,
চুপচাপ,
এক অনন্ত নীরবতায়,
যেখানে থাকা আর না-থাকা
একই অর্থ বহন করে।
কারণ সেখানে—
তুমি আর ব্যক্তি নও,
নও দেহ,
নও শব্দ,
নও অনুভব।
তুমি কেবল
একটি অচল, অতল, অবয়বরহিত
সচেতন আগুন—
যার কাজ কেবল
জ্বলে থাকা।
সবশেষে—
তুমি উপলব্ধি করবে
যে তুমি যে দেহে বাস করছিলে,
সেটি এখন তোমার মধ্যেই
এক দূরবর্তী ছায়া মাত্র—
আর তুমি নিজেই
নিজের ভিতরে তৈরি করেছ
এক নতুন, নির্বস্ত্র, দ্রাব্য,
অতীন্দ্রিয় সত্তা—
যার সামনে
অস্তিত্ব কথাটাই
ধ্বংস হয়ে যায়।
~ কোয়েল তালুকদার
তারিখ – ৩/১২/২০২৫ ইং
ঢাকা।
১০. নীরব পাথরের হৃদয়
নীলাভ কঠিন প্রস্তরের গায়ে
ধীর যত্নে আমরা খোদাই করে রাখব
আমাদের নাম—
আর কিছু নির্মল, ধূলিমুক্ত শব্দ,
যেগুলো কোনোদিন আর উচ্চারিত না হলেও
নির্মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে
অতল দীপ্তিতে।
পৃথিবীর প্রাচীন নীরবতা
সেই শব্দগুলোর চারপাশে
আস্তে আস্তে জন্ম নেবে—
মনে হবে, পাথরের শীতল দেহে
এক বিন্দু উষ্ণ প্রাণ লুকিয়ে আছে,
যেন অদৃশ্য কোনো সত্তা
রাত্রির নিশ্বাসের সঙ্গে ফিসফিস করে।
হেমন্তের শিশির
দূর্বাঘাসে ঝরে পড়ে
আর শিলালিপির বুকে জমে ওঠে
স্বচ্ছ কাঁপুনির মতো—
যেন আমাদের স্বপ্নের অবশিষ্ট আলো
প্রাণহীন পাথরেও
একটি অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে দেয়।
নির্জন নিশীথে,
যেখানে বাতাসও ক্ষণিক থেমে থাকে,
সেই খোদাই করা অভিজ্ঞান
চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকবে অবিচল,
সময়ের সমস্ত ক্ষয়কে অতিক্রম করে।
এখানেই পড়ে থাকবে
আমাদের আড়াল করা আকাঙ্ক্ষার কথা,
আমাদের রক্তাভ মুখচ্ছবি,
যেন পাথরও জানে—
মানুষ চলে যায়,
কিন্তু কিছু শব্দ, কিছু স্বপ্ন,
কিছু অশ্রুজল ও কিছু উজ্জ্বলতা
নিরন্তর বেঁচে থাকে
অপরিবর্তনীয়, অনন্ত
নীরব পাথরের হৃদয়ে।
১১. অধির প্রেমের পরিমাপ
কতটুকু তোমাকে ভালোবাসলে
অলস বিকেলের আকাশে প্রথমে জমবে নরম সাদা মেঘ,
তারপর সেই মেঘ ভিজে উঠবে তোমার নামের গোপন উষ্ণতায়,
ধীরে ধীরে গলে যাবে—
জল হবে—
আর সেই জল গড়িয়ে পড়বে নদীর গায়ে,
নদী পূর্ণতা পাবে তোমার নিশ্বাসের মতো শান্ত প্রতিধ্বনিতে।
কতটুকু ভালোবাসলে বসন্তের বুকে ফুটবে উন্মনা ফুল,
তাদের পাপড়ি থরথর করবে তোমার হালকা হাসির মতো,
মৌমাছিরা গুনগুন করে ছড়িয়ে দেবে
আমার হৃদয়ের গভীর গোপন রস—
যা শুধু তোমার উপস্থিতির দোলায়
মধুর মতো ঝরে পড়ে।
কতটুকু ভালোবাসলে তোমার কস্তুরী ঠোঁট
লজ্জায় কম্পমান হয়ে উঠবে সপ্রতিভ,
নীল-কালো কাজল চোখে ঠিকরে উঠবে
মহাকাশের অচেনা সব তারার আগুনখেলা,
আর তোমার কুচবরণ কেশে ছুটবে
রাত্রির গাঢ় মায়াভরা গন্ধ—
যা স্পর্শ করলেই আমার সমস্ত দেহ
বিস্মৃত হয়ে যায় পৃথিবীর ভার।
কতটুকু ভালোবাসলে তুমি
ধীরে ধীরে খুলে ফেলবে সব অভিমান,
সকল আড়াল—সকল শব্দ,
আর নির্জনের গভীরে দাঁড়িয়ে থাকবে
নগ্ন সত্যের মতো—
একজন নিঃসঙ্গ, অপার্থিব,
সৃষ্টির-অন্তর্গত নারী,
যার দিকে তাকালে মনে হয়
সমস্ত প্রেম শুধু তোমাকে কেন্দ্র করেই
জন্ম নিয়েছে।
আমি জানি—
এই প্রেমের কোনো পরিমাপ নেই;
তবু তোমার দিকে হাত বাড়ালেই
বুঝি—
আরও একটু ভালোবাসলেই
পুরো ব্রহ্মাণ্ডটাই
তোমার রূপে নতুন করে
শুরু হবে।
১২. নামহীন প্রেম
তুমি এলে নীরব ভোরের মতো,
অচেনা আলোয় ভেসে উঠল আমার দিন।
বাতাসে তোমার গন্ধ ভেসে আসে—
জানি না কোথা থেকে, কোন অদৃশ্য বাগান থেকে,
তবু হৃদয় বলে— এটাই তো চেনা প্রেমের পথচিহ্ন।
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে যায়
আমার অব্যক্ত সব নদী;
কতদিন শুকনো ছিল যে স্রোত,
আজ হঠাৎই সেখানে জোয়ার ওঠে তোমাকে দেখে।
আমি ভাবি—
প্রেম কি এমনই?
হাত ছুঁয়ে না গেলেও
মনের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে,
দূরে থেকেও হৃদয়ে গান বাজে?
তুমি ছিলে বলে
আমার অদেখা আকাশে
একটি নক্ষত্রের জন্ম হয়েছে—
সে নক্ষত্র রাত জাগে শুধু তোমার নাম ধরে।
যদি কোনোদিন সব আলো নিভেও যায়,
তবু তোমার স্মৃতির নরম আভা
আমায় পথ দেখাবে—
কারণ প্রেম একবার জন্ম নিলে
সে আর কখনো মরে না।
তুমি আমার নীরব প্রতিশ্রুতি,
আমি তোমার অনন্ত অপেক্ষা।
১৩. অঙ্গার-অন্তরালের মন্ত্র
তোমার সকল অস্তিত্ব আমার দেহে ঢেউ তোলে—
গোপন আগুনের মতো তুমি ছড়িয়ে পড়ো রক্তের অভ্যন্তরে,
তোমার উষ্ণতার স্পর্শে কেঁপে ওঠে আমার অনামি রাত,
হৃদয়ের অন্তরালে জমে থাকা সব নীরবতা
ঝরে পড়ে ঝরনার জলধ্বনির মতো,
আমাকে করে তোলে তোমার পূর্ণ উপস্থিতির পারাবারে ভাসমান।
তুমি যখন শ্বাস ফেলো আমার কণ্ঠের গহীতে,
তখন মনে হয় জ্বলন্ত খরায় নেমে এল হঠাৎ প্রবল বর্ষা—
আমি সেই বৃষ্টির ভিজে ওঠা মাটির মতো
তোমার অঙ্গভেদী উষ্ণতায় থরথর কাঁপি,
তোমার দহন আমাকে আলোকিত করে তোলে
নক্ষত্রের ভিতর লুকিয়ে থাকা গোপন দীপ্তির মতো।
তুমি ভস্ম হও—আমি তোমার সঙ্গে ভস্ম হই—
দু’জনার মিলিত দহন থেকে ওঠে
এক অদৃশ্য লাল আলো,
যা আমাদের দেহের সীমা ভেঙে
ভেসে যায় অচিন্ত্য আকাশে।
তুমি পবিত্র হও—আমি পবিত্র হই—
তোমার স্পর্শের অশ্রুত সুরে
আমার দেহের অন্তঃস্থ গন্ধার দোলে,
অস্তিত্বের প্রতিটি তারে জন্ম নেয়
এক স্নিগ্ধ, রক্তিম, মাদকীয় রাগ।
এসো, আরও কাছে এসো—
আমাদের দেহের আগুন আরও উন্মীলিত হোক,
অবয়বের অন্তরালে জমে থাকা
সব সুর, সব আকাঙ্ক্ষা, সব প্রার্থনা
এক মহাসমুদ্রের ঢেউ হয়ে
একই প্রবাহে মিলিয়ে যাক—
তোমাতে আমি, আমাতে তুমি—
এক অনন্ত আদিরসের জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল শিখা।
১৪. মায়ার কথা
রাত্রির স্তব্ধতার গভীরে
যখন নক্ষত্রেরা নিঃশব্দে শ্বাস নেয়,
তুমি যেন এক ফোঁটা নীরব আলো—
অন্ধকারের বুক চিরে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠা।
মায়ার পর্দা নামলে
নিমিষে বদলে যায় পৃথিবীর রূপ—
চাঁদের কোমল আঁচলে ঘুমিয়ে পড়ে
রাস্তার ধুলো, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির,
আর তোমার মনের ভেতর লুকানো
অস্থির ছোট্ট পাখিটির কাঁপা ডানাগুলো।
বিনিদ্র চোখের কান্না
রাত কখনোই প্রকাশ করে না—
সে শুধু নীরব দুঃখকে
অনুভবের মতো ছুঁয়ে রাখে,
তাই তাকে দেখাশোনা করতে হয়
ভোরের প্রথম ঊষারঙা বাতাস পর্যন্ত,
যখন আলো এসে বলে—
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এইভাবে মায়া জন্ম নেয়,
জন্ম নেয় এক মৃদু স্পর্শে—
রাত্রির অন্ধকারে লুকানো ব্যথা
আর ভোরের আগলে রাখা শান্তির মাঝখানে।
তুমি সেই সীমানায় দাঁড়িয়ে,
দুটোই দেখো, দুটোই জানো—
এ কারণেই তুমি
রাত্রির মতোই গভীর,
আর ভোরের মতোই আশ্বাসময়
একটি মায়া।
১৫. নিঃশ্বাসে তোমার নাম
আমি নিঃশ্বাস নেই
তোমার শরীর ছুঁয়ে-যাওয়া বাতাস থেকে—
যেন তোমার উষ্ণ শিরায় বয়ে যাওয়া
অদৃশ্য কোনো সুর
আমার ফুসফুসে বসে গেয়ে ওঠে;
আমি শুনতে পাই তোমার নিকটতার
এক গভীর কম্পন।
আমি প্রশ্বাস রেখে যাই
তোমার নিঃশ্বাসের মেঘে—
যেন আমার অদেখা স্পর্শ
ধীরে ধীরে মিশে যায়
তোমার বুকের ভেতর
আলতো ঢেউ হয়ে।
আমরা দুইজন—
দুটি দেহ, দুটি পথ,
কিন্তু এক নিঃশ্বাসের
গোপন মিলনে বাঁধা।
যেখানে কোনো শব্দ নেই,
কোনো ভাষা নেই,
শুধু ধ্বনিহীন স্পর্শ—
তুমি আর আমি।
যখন রাত নামে,
তারারা আমাদের ওপর নিঃশব্দে
ঝুঁকে থাকে,
আর আমরা দু’জন
একই বাতাসে
একই ভালোবাসার উষ্ণতা
দীর্ঘশ্বাসে ভাগ করে নিই।
আমার সমস্ত অস্তিত্ব
তোমার কাছে পৌঁছে যায়
শুধু এই শ্বাসের পথ ধরে—
আর তুমি প্রতিবার
আমাকে গ্রহণ করো
নিভৃত, গভীর,
নিঃশব্দ ভালোবাসায়।
১৬. শূন্যতায় ভালোবাসা
নীল নক্ষত্রে ভরা সে দিনগুলোর ভেতর
যেখানে তোমার নামের প্রতিধ্বনি উঠত নিশ্বাসের মতো,
আমি ছিলাম পূর্ণ—
ভালোবাসার ঘন আলোয় ভেজা একটি সময়ের স্থির রূপ।
আজ যা রেখে যাব—
তোমার ফিরে দেখা চোখে
দেখবে শুধু অসীম শূন্যতার গাঢ় বিস্তার,
যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর বালুচরে
লুকিয়ে থাকে অতল জলের স্মৃতি।
কখনো সেখানে ছিল উত্তাপ, ছিল দীপ্তি,
তোমার অবহেলার ছায়ায় যা তুমি দেখতে পাওনি।
আমি নীরব ছিলাম, প্রেম ছিল নীরব—
তোমার দিকে ধাবমান এক অদৃশ্য জোয়ারের মতো।
এখন সেই সব হারানো সুরের জায়গায়
থাকবে কেবল ফাঁকা প্রতিধ্বনি,
যেখানে স্পর্শ করলে বুঝবে—
শূন্যতাও একদিন ভরা ছিল
আমার অন্তহীন ভালোবাসায়।
১৭. অবশেষে নিঃশ্বাসের ভিতরে তুমি
আঁধার নেমে আসে নিস্তব্ধ পৃথিবীতে,
জোনাকিরা জ্বালায় তাদের ক্ষুদ্র নক্ষত্র—
অরূন্ধতী, স্বাতি, ধ্রুবতারার আলো
মিশে থাকে তোমার চোখের গভীর নিভৃত প্রান্তে।
নয়ন তোলো—আর একবার, শুধু আমায় দেখো,
রাতের কানাঘুষায় আমার হৃদয় তোমাকেই ডাকে।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে তোমার সকল চুম্বন
আমার দেহের চারদিকে ছড়িয়ে দাও—
যত পারো, যেখানে পারো,
হয়তো কাল সকালের সূর্য
আর খুঁজে পাবে না আমার ঘুমভাঙা নিঃশ্বাস।
এই শেষ স্পর্শে, শেষ উষ্ণতায়,
আমরা দু’জনে মিলিয়ে যাই
একটি অনন্ত আলোক-রাত্রির অনুচ্চারিত প্রেমে।
১৮. গোপন আলোয়
তোমাকে ঢেকে রাখি গোপন আলোয়,
রাত্রির গভীর গুহায়, যেখানে শব্দও থেমে যায়।
তারপরও তোমার দেহের ভেতর কোনো নীল অগ্নিশিখা
অদৃশ্যভাবে জ্বলে ওঠে—
আমার শিরায় শিরায় তার আলো ছায়া ফেলে।
আমি চাই—
তুমি সেখানেই অপ্রকাশিত থেকো,
নীরব বাতাসে লুকানো কাঁপনের মতো,
আঙুলের ডগায় ধরা পড়ে আবার আচমকা মুছে যাওয়া
একটি স্পর্শের রহস্য হয়ে।
অন্ধকারের পাতায় যখন তোমার শ্বাস গড়িয়ে পড়ে,
গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়
দেহের গোপন সংগীত—
যাতে আমি ডুবে যাই নিঃশব্দে,
তোমার অদেখা আলোয়
ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে যেতে।
১৯. দেহ ও আত্মা
ভালোবাসা জৈব—
রক্তের গোপন ঘ্রাণে ভিজে ওঠে তার প্রথম উচ্চারণ,
উরুর ভাঁজে জমে থাকা উষ্ণতার মতো আদিম,
ত্বকের নীচে নীরব দহন,
শরীর না থাকলে যার শিকড়ই থাকে না।
প্রেম আসলে দেহের অঙ্গসংগীতে বাঁধা এক পুরোনো নদী—
যত দূরেই যাক, ফিরে এসে
ত্বকের উপকূলে ঢেউ তোলে আবার।
তবু তারই বিপরীতে থাকে আরেক জন্মের মতো
নিষ্কাম প্রেম—
যার কোনো কামগন্ধ নেই,
চুম্বনের ভিতরে নেই দাহ,
শুধু দু’হাত ভরে বিলিয়ে দেবার অন্তহীন গরিমা।
এ প্রেম দুষ্প্রাপ্য আমাজন লিলির মতো
রাত্রির নিঃশ্বাসে ফুটে ওঠে,
অধরার মতো পবিত্র, তবু টেনে নেয়
জল-আঁধারের গভীরতায়।
দুই প্রেম—
একটি বেগ, আগুনের মতো ছুটে চলে
বুকের দাউ দাউ অগ্নিপথে,
একটি আবেগ,
নিঃশব্দে জলের মতো শরীর ছুঁয়ে বয়ে যায়।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি তাদের মাঝখানে—
একদিকে দেহের ধরিত্রী, স্পর্শের অরণ্য,
অন্যদিকে অদৃশ্য পাঁপড়ি মেলে ধরা
এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ।
কাকে বলি আদিরস?
কাকে বলি নিষ্পাপ?
শেষে দেখেছি—
উভয়েরই সুর আছে, উভয়েরই উন্মাদনা;
একটি দেহে পুড়িয়ে নেয়,
অন্যটি মনকে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত করে।
দু’টিই প্রেম;
দু’টিই অপরিহার্য,
কারণ মানুষের হৃদয়ে
সবসময়ই পাশাপাশি থাকে
এক তীব্র কামনা
এবং
এক অতল আত্মদান।
২০. এমনও পিরিতি
এমন প্রেম—
যে প্রেম কথা বলে না,
চিৎকার করে না,
আশা-ভরসার কোনো দাবি তোলে না—
শুধুই নীরবতার গোপন কোণে
নিজেকে লুকিয়ে রাখে।
অপেক্ষার দীর্ঘ সাঁঝে
জীবন ফুরিয়ে যায় ধীরে ধীরে,
তবু একটি শব্দও উচ্চারিত হয় না—
একবারও বলে না, ভালোবাসি।
এমন প্রেমই করে তারা,
জ্যোৎস্নাহীন রাতের মতো
আলোকে ভয় পাওয়া কিছু হৃদয়,
যারা নিজেরাই বোঝে না
কেন দুঃখকে এভাবে বুকে আগলে রাখে,
কেন কাঁটার পথে হাঁটতে হাঁটতে
নিজেকে আঘাতে রঞ্জিত করে রাখে।
অথচ এও প্রেম—
শুধু বলা হয়নি বলে
তার সত্য কমে যায় না;
কিন্তু যারা এ প্রেম করে—
তারা অনেকটাই আহম্মক,
কারণ ভালোবাসার বেদনাই
তাদের একমাত্র উচ্চারণ।
২১. রুপালি জলপতনের দেহ-নেশা
আজ রুপালি সমুদ্রের ভেতর
তোমার শরীরের ঢেউ ছুঁয়ে সাঁতার কেটে এলাম—
ঝলাৎ ঝলাৎ শব্দে কেঁপে উঠছিলো
সব গোপন জলের সুর।
দুপাশে ভাঙন, ভেতরে উথাল-পাথাল—
তোমার উষ্ণ তরঙ্গ যেন
আমাকে ভাসিয়ে নেওয়া কোনো দেহ-নদীর জোয়ার।
জল ভেঙে পড়ছিল,
আর আমি বুঝতে পারছিলাম—
এ অবিরাম পতন আসলে উত্থান,
এ উথাল পাথাল আসলে স্পর্শের নিবিড় উচ্চারণ।
তুমি ছিলে জলের নীচে গোপন শ্যামল আলোক,
আমি ছিলাম সাঁতারু—
তোমার ত্বকের ঢেউয়ে রূপ নিতাম বারবার।
যে খেলা আজ সমুদ্র করেছে,
তুমি কি জানো—
ওটা ছিল তোমার শরীরেরই রূপক,
দেহ-শিল্পের নিঃশব্দ নৃত্য,
অবিস্মরণীয় জলপতনের সেই
শৃঙ্গার-সন্ধ্যা।
২২. নীরব পরিভ্রমণ
দুহাতে খুঁজেছিলাম অদেখা সেই চূড়া—
তোমার দেহের নিঃশব্দ উত্তুঙ্গ পর্বত,
যেখানে স্পর্শ উঠতে উঠতে শ্বাস হয়ে যায়,
নামতে নামতে রূপ নেয় অচেনা কম্পনে।
হঠাৎ দেখি—
মণিমুক্তা খচিত এক অন্তর্জ্যোৎস্না,
তোমার নাভীর ঢালে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো দীপ্ত;
একবার শিখরে, যেখানে উষ্ণতার তুষার গলে পড়ে,
একবার পাদদেশে, যেখানে আলো জমে থাকে
গোপন নদীর মতো।
আরেকবার হিমাদ্রি—
আমার ভেতর জমা নীরব তুষার
তোমার নিভৃত অগ্নিতে ধীরে ধীরে গলে যায়,
শরীরের পরিভ্রমণ তখন
প্রাচীন আদিরসের গোপন উৎসবে পরিণত হয়।
কী যে আনন্দময় ছিল সেই যাত্রা—
তোমার দেহের মানচিত্রে
আমি শুধু এক পথিক,
বারবার হারাই, বারবার ফিরে পাই
অপরূপ সেই চূড়া।
২৩. নিশীথিনীর আহবান
এই রাত্রিতে শিশির ঝরছে অন্তহীন—
তোমার গোপন নিশ্বাসে ভিজে উঠছে আকাশের তল।
আজ ভাসিয়ে দাও,
তোমার হৃদয়ের আমন্ত্রণে আমায় ডেকে নাও
হে নিশীথিনী, নীরবতার মুগ্ধ রাণী।
এই জল, এই অন্ধকার, এই নক্ষত্র-বীথিকে—
আরও গভীর করে তোলো আমার চারদিক,
যেন প্রতিটি তারার কম্পনে
তোমারই উষ্ণ স্পর্শ পাই।
দেহকে স্নাত করো ক্ষণকাল,
তারপর সেই ক্ষণকে বাড়িয়ে দাও অনন্তে—
যেন তোমার আলোর ছায়ায় আমি বিলীন হই,
তোমার আলিঙ্গনের পরিধি
হয়ে ওঠে আমার সকল দিগন্ত।
আজ রাত্রি শুধু রাত্রি নয়—
এ এক গোপন পথ,
যেখানে তোমার ডাকে
আমার সমগ্র সত্তা
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে
ফুটে ওঠে প্রেমের নক্ষত্রাভ দীপশিখায়।
আমায় তুমিই নিয়ে চলো—
এই অশেষ শিশিরে,
এই মধুর অন্ধকারে,
এই নীল আকাশের গভীর আলিঙ্গনে—
যেখানে তোমাকে ছাড়া
আর কিছুই নেই,
আর কিছুই প্রয়োজন নেই।
২৪. শরীর-স্মৃতির অগ্নিবর্ণ শৃঙ্গার
ভালোবাসার প্রথম পাঠ
আমি দেখেছিলাম তোমার দেহের আলো-
যেমন নদীর বুক জলে দুলে ওঠে সূর্যের সোনা,
সেই আলোই ঝরে পড়েছিল তোমার ত্বকের উষ্ণ ঢেউয়ে।
তোমার ঘাড়ের বাঁক ছিল গোধূলির নরম নীল,
হালকা বাতাসের মতোই থরথর করত কলারবোন,
আর বুকে ছড়িয়ে থাকা শান্ত গহ্বর-
মৃদু অন্ধকারে ডুবে থাকা কোনো গোপন দ্রাক্ষাক্ষেত্র।
তোমার কাঁধের ওপর ঋতুরা এসে বসত-
গ্রীষ্মের তপ্ত শ্বাস,
শরতের মেঘে-ঢাকা হিম;
আর আমি, দিগন্তজোড়া বসন্ত হয়ে
স্পর্শে স্পর্শে জেগে তুলতাম তোমার দেহের প্রতিটি সুর।
তোমার ত্বকের গন্ধে ভিজে থাকত
বর্ষার প্রথম বৃষ্টির অদৃশ্য আগুন;
তোমার নাভির গহীনে ছিল
হেমন্তের উষ্ণ রাত্রির মতন শান্ত ঝড়;
আর তোমার ঠোঁট-
নির্জন প্রান্তরের ওপর ভাসমান রক্তিম চাঁদ।
তুমি যখন শ্বাস নিতে,
আমার সমস্ত সত্তা ঢুকে পড়ত সেই নদীর স্রোতে-
হালকা কম্পনে থরথর করা তোমার বক্ষদেশ
আমার কবিতার নীরব ঢেউ হয়ে উঠত।
দেহের ভাষা কোনোদিন এত স্পষ্ট ছিল না-
নগ্নতায়, আড়ালে,
ধূসর সাম্রাজ্যের নিষিদ্ধ শব্দগুলোতে-
আমি শুধু একটিই নাম শুনতাম-
তোমার।
তোমার দেহই ছিল সেই বই,
যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় জ্বলত শৃঙ্গার-
স্পর্শের আগুন, নিশ্বাসের নরম ঝড়,
ভালবাসার নদীর গভীর রাত্রি।
আমি আজও সেই পাঠ শিখে চলেছি-
তোমার দেহের উজানে, অনন্তের দিকে।
