Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    সপ্তপদী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প122 Mins Read0

    ০৪. অথচ রিনা তাঁকে লিখেছিল

    অথচ রিনা তাঁকে লিখেছিল। একদিন উঅ আনটু ইউ। শেষ চিঠি তার। কৃষ্ণেন্দু, তুমি আমার কাছে মৃত। ডেড টু মি।

    পরদিন সকালে শরণ লায়েকের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন কৃষ্ণস্বামী। প্রায় সারা রাত্রি পরিশ্রম করে শরণের নাতনীকে প্রসব করিয়ে বাড়ি ফিরছেন। ভোরের শালবনে এখনও রাত্রিচরদের আনাগোনা স্তব্ধ হয় নি। পাখিরাও বাসা ছাড়ে নি, কলরব শুরু করেছে শুধু। ফুলেরাও সবে ফুটছে। মাথার উপরে আকাশে বকের ঝক উড়ে উড়ে চলেছে, বিষ্ণুপুরের বধগুলোতে চলেছে, আর পাক খাচ্ছে একসঙ্গে সরালি হাস। ভোরের বাতাস ক্লান্ত শরীরে বড় ভাল লাগছে। সাইকেলটা থাকলে বড় ভাল হত। ফিরতে ফিরতে ওই কথাটা মনে পড়ল। মনে পড়েছে কাল রাত্রেই। কিন্তু এতক্ষণ চাপা পড়ে ছিল। অন্য কোনো চিন্তার অবকাশ ছিল না। আবার অতীত কথা, রিনার কথা মনে পড়েছে। হে ঈশ্বর! মার্জনা করো তুমি। যাকে ভালবাসে মানুষ—তাকে ভুলতে পারে না। পারে না। পারে না।

    শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণেন্দু রিনাকে ভালবেসেছিল। রিনাও ভালবেসেছিল। দুজনের বিরোধের মধ্যে আশ্চর্যভাবে সেতু গড়ে উঠেছিল। ভাবলে আজও মনে হয় পরমাশ্চর্য! রিনা ওকে দেখলেই। বারান্দা থেকে চিৎকার করে বলত, ইউ হিদেন!

    কৃষ্ণেন্দু তখন ধর্ম ঈশ্বর কিছুই মানে না, তা হিদেনইজম্। ম্যাটার আর মাইন্ডের সংজ্ঞাকে মেনে সে নূতন যাত্রা শুরু করেছে। তবু তাকে হিদেন বললে তার গায়ে লাগত। কিন্তু সে সত্য অর্থে নয় বলে নয়, গায়ে লাগত এদেশের মানুষ বলে। মেয়েটার উপর একটা শোধ নেবার আকাঙ্ক্ষা তার মনের মধ্যে বিক্ষুব্ধ আবেগে ঘুরে বেড়াত। সামান্য সুযোগে বিচিত্র রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসত। এমনি একটা ঘটনা মনে পড়ছে।

    এই ঘটনার মাসখানেক পরে। সেপ্টেম্বরের শেষে, মেডিক্যাল কলেজের ওদের টিম জিতে নিয়ে এল কলেজ কম্পিটিশনের সব থেকে বড় শিল্ডটা। সেবারকার খেলায় কৃষ্ণেই ছিল সবচেয়ে ভাল প্লেয়ার। মেট্রন পলি ব্রাউনের ভারি শখ ছিল খেলা দেখার। কলেজের টিমের খেলা। থাকলে সেই অজুহাত নিয়ে সে ঠিক গিয়ে তার শখের হাতপাখা নিয়ে সামনেই চেয়ারে বসত। পাশে থাকত রিনা। কৃষ্ণেন্দু যেন রিনার উপরে শোধ তুলবার জন্যই এমন উন্মাদের মত দুর্দান্ত বিক্রমে খেলত। রিনা সত্য সত্যই রাগত। কৃষ্ণেন্দুকে হিদেন বলার ঝোঁক তার বাড়তে লাগল। শিল্ড জিতে কলেজে এসে সেদিন ছেলেরা কৃষ্ণেকে কাঁধে নিয়ে নাচছিল। রিনা বেরিয়ে এল বারান্দায়। হঠাৎ কৃষ্ণের কী মনে হল, রিনা হিদেন বলে সম্বোধন করবার আগেই সে চিৎকার করে উঠল, জয় কালী! বলেই জিভ কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। রিনা ছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকল। ছেলেদের দল হো-হো করে হেসে উঠল।

    এরপর রিনাকে দেখলেই কৃষ্ণেন্দু চিৎকার করে উঠত, জয় কালী!

    রিনাও বলত, হিদেন! প্রথম দিন হতভম্ব হয়ে ঘরে ঢুকলেও, পরে আর হতভম্ব হত না। রিনা।

    আবার ঘটল আর একটি ঘটনা।

    মাস কয়েক পর বড়দিনের সময় মিলিটারি স্টুডেন্টদের সোশ্যাল ফাংশন হল। তার মধ্যে। ছিল কয়েকটা সিলেক্টেড সিন। একটি সিন ছিল ওথেলো থেকে। ওথেলো আর ডেসডিমোনা। ইট ইজ দি কজ, ইট ইজ দি কজ মাই সোল দিয়ে আরম্ভ ডেসডিমোনাকে হত্যার দৃশ্য। জন ক্লেটন করেছিল ওথেলো, এবং কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিয়ে ডেসডিমোনার অংশে অভিনয় করেছিল রিনা। ক্লেটনের ওথেলো ভাল হয় নি, কিন্তু চেহারা ও মিষ্ট কণ্ঠস্বরের জন্য এবং বিশেষ করে সহজ অভিনয়ের জন্য রিনার অভিনয়ের প্রশংসা হয়েছিল। কৃষ্ণেন্দু দেখেছিল এই অভিনয়। এর পর কী তার খেয়াল হল, সে ওথেলো নাটকের ওই দৃশ্যটা মুখস্থ করে ফেললে এবং যখন তখন ইট ইজ দি কজ, ইট দি কজ বলে সলিলকিটুকু আবৃত্তি শুরু করে দিত। রিনা তিক্ত হয়ে এরপর কৃষ্ণের সামনে বের হওয়া ছেড়ে দিলে। তবুও কৃষ্ণেন্দু শূন্য বারান্দার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করত, ইট ইজ দি কজ, ইট ইজ দি কজ।

    এরপর হঠাৎ একটি ঘটনায় সবকিছু উটে গেল। নাটকীয়ভাবে নয়—অত্যন্ত সাধারণভাবে স্বচ্ছন্দ গতিতে। আগে সেই পরিবর্তনের সময় কৃষ্ণের কাছে বিস্ময়কর বলে অবশ্যই মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ?

    বনপথে চলতে চলতে প্ৰসন্ন ম্লান হাসি ফুটে উঠল কৃষ্ণস্বামীর মুখে। কিসের বিস্ময়, কোথায় বিস্ময়ের কারণ? মানুষের মধ্যে প্রাণ-ধর্মের এই স্বভাব। এই তো ঈশ্বরের তপস্যা মানুষের দেহের বেদিতে। গুণের আসরে মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রতিযোগিতা যেমন তার স্বভাব, প্রতিযোগিতার পর গুণগ্রাহিতাও তার তেমনি প্রকৃতি-ধর্ম।

    মাস আষ্টেক পর পরের বছর ফুটবলের সময়। ইন্টারভারসিটি শিল্ড কম্পিটিশনে মেডিক্যাল টিম যাবার কথা ঠিক হল। আই. এম. ডি. এবং এম. বি. কোর্সের ছেলেদের মিলিত টিম। ক্লেটন এবং কৃষ্ণেন্দু দুজনেই নির্বাচিত হল। সিলেকশন হওয়ার পরই দুজনের দেখা হল। সিঁড়িতে। দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, হ্যালো! দুজনেই একসঙ্গে হাত বাড়ালে, পরস্পরের হাত চেপে ধরলে। দুজনেই বললে, তুমি থাকলে আমি ভাবি না।

    টুর্নামেন্টে ওরা ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল, ফাইনালে হারল। খেলাটা হয়েছিল বম্বেতে। ফিরে যখন এল, তখন ওরা দুজনে দুজনের অন্তরঙ্গ হয়ে গিয়েছে।

    ফিরে এসে ক্লেটনই ওকে নিয়ে গেল পলি ব্রাউনের বাড়ি। চল এবার রিনার সঙ্গে মিটমাট কর। সে বেচারার অত্যন্ত দুঃখ সে তোমার কাছে হেরেছে। পলি ব্রাউন ভারি খুশি হয়েছিল। এই দুর্দান্ত ছেলেটির কলেজে সর্বজনপ্রিয়তা দেখে আশ্চর্য হত। এবং কলেজের সর্বজন থেকে সেও আলাদা নয়। সে তাকে সংবর্ধনা করে বলেছিল, ওথেলো, দি টারবুলেন্ট মুর। তারপরেই হেসে বলেছিল, ইট ইজ দি কজ, ইট ইজ দি কজ। তুমি ওটা বেশ বল। আমার ভাল লাগে। কিন্তু রিনাকে চটাবার জন্য কেন বল? ইউ নটি বয়?

    রিনা তখন ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদু মৃদু হাসছিল। ক্লেটন বলেছিল, লেট বাইন্স বি বাইগন্স। শেক হ্যান্ডস ইউ টু অ্যান্ড বি ফ্রেন্ডস।

    কৃষ্ণেন্দু এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বলেছিল, আমি ক্ষমা চাইছি।

    রিনা হাত বাড়িয়ে কৃষ্ণের হাত চেপে বলেছিল, উই আর ফ্রেন্ডস।

    আলাপের মধ্যে হঠাৎ পলি ব্রাউন এসে বলেছিল, ওটা তুমি একবার আবৃত্তি কর। ইট ইজ দি কজ, ইট ইজ দি কজ। ওইটে। সত্যিই ওটা তুমি ভাল কর। তোমার হোর্স ভয়েসে অ্যান্ড-অ্যান্ড-ইউ ক্যান পুট লাইভলি ইমোশন ইন ইট।

    রিনা বলেছিল, অ্যান্ড–বলেই চুপ করেছিল।

    ক্লেটন জিজ্ঞাসা করেছিল, কী?

    রিনা হেসে বলেছিল, তোমার থেকে অনেকটা বেশি ওথেলোর মত। টল, মোর মূলাইক, ইজ নট ইট?

    কৃষ্ণেন্দু বলেছিল, কিন্তু তোমার চেয়ে ভাল ডেসডিমোনা আমি কল্পনা করতে পারি না। আমার মনে হয় পারফেক্ট।

    ক্লেটন বলেছিল, তা হলে তোমরা দুজনে গোটা সিনটা কর। লেট আস এনজয় অ্যান্ড মেক দি মেমরি অব দি ফাষ্ট মিটিং আনফরগেটেবল। থাক চিরস্মরণীয় হয়ে আজকের এই পরিচয়ের স্মৃতি।

    জেমস ব্রাউন একবার এসেই চলে গিয়েছিল। লোকটা অদ্ভুত। অদ্ভুত ঠিক নয়, ও সেই সব ইংরেজের একজন, যারা এদেশের এক-একজন ছোটখাটো লাটসাহেব। কালা মানুষদের সঙ্গে কথা কইতেও ঘেন্না। এবং গোঁড়া ক্রিস্টান হিসেবে হিদেনদের ছুঁলে হাত ধোয়। নিঃস্ব, তাই নিঃশব্দে থাকে।

    রিনা ব্রাউন সাহেবের ঘরের দিকে তাকিয়েই আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু ক্লেটন ব্রাউনের কাছে গিয়ে অনুমতি আদায় করে এনেছিল। ব্ৰাউন সাহেব প্রশ্ন করেছিল, শুধু ভাল ছেলে, কলেজে পড়ে না ভাল ঘরের ছেলে!

    ক্লেটন বলেছিল, বোথ।

    তা হলে অবশ্য অনুমতি দিতে পারি। উঁচু জাত? ওদের মধ্যে?

    হ্যাঁ। হি ইজ এ গুপ্টা। উই হ্যাভ সো মেনি গুপ্টাজ অ্যাঙ্গস্ট আওয়ার প্রফেসরস।

    ইয়েস, ইয়েস, আই নো। গুপ্টাজ আই নো। ইয়েস।

    অনুমতি দিয়েছিল ব্রাউন সাহেব।

    ওরা গোটা সিনটাই আবৃত্তি করেছিল। একটা কাও ঘটেছিল শেষের দিকে। ডেসডিমোনাকে হত্যা করবার সময় সে যখন ইট ইজ টু লেট বলে তার গলা টিপে ধরার অভিনয় করছে, রিনা। যখন ওহ্ লর্ড লর্ড লর্ড বলে কাতর চিৎকার করছে, তখন সেই মুহূর্তে সেই আয়াটি রিনা রিনা বলে আর্তনাদ করে ঘরে এসে ঢুকে কৃষ্ণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে টেনে ধরেছিল ছেড়া দাও! ছেড়া দাও! ইযেন একটা বিশ্বস্ত কুকুর হিংস্র হয়ে উঠেছে।

    চমকে উঠে সরে দাঁড়িয়েছিল কৃষ্ণেন্দু।

    রিনা তাড়াতাড়ি উঠে বসে ওকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল কৃষ্ণেন্দু; রিনা সান্ত্বনা দিয়েছিল পরিষ্কার মেদিনীপুর-মানভূম-বাঁকুড়া অঞ্চলের খাস বাঙলা ভাষায়!

    মিছা-মিছা; ই সব মিছামিছি; ই সব থিয়েটারের বক্তৃতা!

    ও ঘর থেকে জেমস ব্রাউন এসে দাঁড়িয়েছিল দরজায়। ভয়ার্ত পশুর মত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে মেয়েটা স্তব্ধ মূক হয়ে গিয়েছিল। এক মুহূর্ত মূক থেকে চিৎকার করে উঠেছিল–আমার-আমার—মেয়েটাকে–।

    নিকালো, ই ঘরসে নিকালো ইউ বিচ, গেট আউট! ব্রাউন ফেটে পড়েছিল রাগে। কৃষ্ণেন্দু একটু অস্বস্তি বোধ করেছিল। মেয়েটির হাত ধরে রিনাই এ ঘর থেকে ওর ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। পলি ব্রাউন সামলেছিল জেমস ব্রাউনকে।

    ক্লেটন হেসে বলেছিল কৃষ্ণেন্দুকে, দ্যাট নেটিভ ওম্যান রিনাকে এক মাস বয়স থেকে মানুষ করেছে। অত্যন্ত ভালবাসে রিনাকে। ওকে অপছন্দ করে না-বাট, ইউ সি, হি ডাজ নট লাইক ইট। মিস্টার ব্রাউন অকৃতজ্ঞ নন, তিনি ওকে তাড়িয়ে দিতে চান না; দেনও নি; কিন্তু ওই যে মায়ের মত ভালবাসতে চায়, নিজের মেয়ের মত দেখতে চায়, সে উনি বরদাস্ত করতে পারেন না। ইউ নো, মিস্টার ব্রাউন ইজ এ পাক্কা সাহিব। শুধু তাই নয়, ব্রাউন একজন গোড়া ক্রিস্টানও বটে। সেই মুহূর্তেই রিনা ফিরে এসেছিল।

    রিনার সে-ছবি এখনও মনে আছে। একবার তাকাচ্ছিল, যে ঘরে ওই মমতায় আবদ্ধ, মূক পশুর মত তার ওই ধাত্রী আছে সেই ঘরের দিকে, আবার তাকাচ্ছিল বাপের দিকে। হঠাৎ সে এক সময় ঘর থেকে বের হয়ে চলে গিয়েছিল নিজের ঘরের দিকে।

    পলি ব্রাউন ফিরে এসে কৃষ্ণেন্দুকে বলেছিল, আমি অত্যন্ত দুঃখিত গুপ্টা। তুমি এটা মনে রেখো না। তুমি জান না, মেয়েটা বড় আনক্লিন ইন মাইন্ড। এবং কিছুটা আউট অব মাইন্ড। পাগল খানিকটা। রিনা ঘুমোয় আর ও তুক-তাক করে। একটু চুপ করে থেকে প্রসঙ্গটা ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, খুব খুশি হয়েছি। আর কী সুন্দর আবৃত্তি করলে তুমি! আবার এসো। প্লিজ। প্লিজ, ড়ু কাম।

    ***

    ক্লেটনের সঙ্গে ওর প্রীতির সম্পর্কটাই ছিল গায়ের জোরের ব্যাপার নিয়ে। ওদের হোস্টেলে গিয়েই পাঞ্জা কষা থেকে শুরু হত। ঘরে ঢুকেই হাতখানা বাড়িয়ে বলত, কাম অনু!

    তারপর নানান রকমের প্রতিযোগিতা চলত। এবং যেটি বিস্ময়কর মনে হত ক্লেটনের কাছে, সেইটি সে পলি ব্রাউনের বাড়িতে কৃষ্ণেন্দুকে টেনে নিয়ে গিয়ে আবার করিয়ে তবে ছাড়ত।

    শুকনো নারকেল শুধু হাতের জোরে ছাড়িয়ে মাথায় ঠুকে ভেঙে খাওয়া দেখে প্রশ্ন করেছিল, পাথর?

    না। কাটলে রক্ত পড়ে। হেসে বলেছিল কৃষ্ণেন্দু।

    একদিন পঞ্চাশটা সিদ্ধ ডিম খাওয়ার পরিচয় দিয়ে আসতে হল ব্রাউনদের বাড়িতে।

    এরই মধ্যে কখন যে রিনা এবং সে, বান্ধবী এবং বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল, তার সঠিক দিনটি নির্ণয় করা কঠিন। তবে তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল এই বন্ধুত্ব, হঠাৎ কোনো একদিনের আকস্মিক ঘটনার ফলে বা একদিনের আকস্মিক কোনো আবেগের উচ্ছ্বাসে নয়। অত্যন্ত সহজভাবে ও স্বচ্ছন্দ গতিতে। এই ফুল ফোটার মত।

    হ্যাঁ, ফুল ফোটার মত। ফুল যেদিন ফোটে, সেদিন সূর্যোদয়ের আগেও তার বর্ণ গন্ধের ঘোষণা কাউকে ডাক দেয় না। যখন ফোটে, তখন তার বর্ণশোভা গন্ধের নিমন্ত্রণ ছড়িয়ে পড়ে। তেমনি করেই পরস্পরকে ওরা জানলে একদিন।

    ক্লেটন দু-বছর ফেল করে যখন পাস করে বের হল, তখন কৃষ্ণের সিক্সথ ইয়ার। কৃষ্ণেন্দু তখন শুধু খেলার আসরেই খ্যাতিমান নয়, শুধু দুর্দান্তপনাতেই সর্বজনপরিচিত নয়, বিদ্যার ক্ষেত্রেও তার জীবন-দীপ্তি প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। চিকিৎসার কয়েকটা পদ্ধতিতে তখনই সে পাকা চিকিৎসকের মত নিপুণ হয়েছে। কলেরায় স্যালাইন ইনজেকশন এবং ইনট্রাভেনাস ইনজেকশনে সে পটুত্ব অর্জন করেছে। সে পটুত্ব এমন যে, কলেরা কেসের কলে নামকরা ডাক্তারেরা তাকে সাহায্যের জন্য ডাকেন। ইনজেকশন সে-ই দেয়। ডাক্তার উপস্থিত থাকেন। তাতে তার উপার্জন হয়। সালভারসন ইনজেকশন দেবার জন্য তো তখন সে সদ্যপাস করা বন্ধু ডাক্তারের নামে একটি চেম্বার খুলেই বসেছে। এতে ক্লেটন তাকে সাহায্য করেছিল অনেক। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের মহলে ওকে পরিচিত করে দিয়েছিল। ক্লেটন ওকে তখন স্যুট পরা ধরিয়েছে। ধুতি-কামিজ-পরা ডাক্তারের কাছে এরা আসতে চায় না। অর্থের অভাব হত না। নিজেই রোজগার করত।

    ক্লেটন পাস করল। ওদের পাস করলেই চাকরি। নূতন চাকরি নিয়ে চলে যাবে। মিলিটারি স্টুডেন্টরা বিদায়ী দলকে অভিনন্দন জানালে। ক্লেটনের উদ্যোগেই ওথেলোর সেই দৃশ্যটি অভিনীত হল। তারই প্রস্তাবে কৃষ্ণেন্দু ওথেলো ডেসডিমোনা রিনা।

    ওই অভিনয়ের মধ্যেই কৃষ্ণেন্দু আবেগপ্রখর চাপা গলায় যখন ঘুমন্ত ডেসডিমোনার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বললে, আই উইল স্মেল দি অন দি ট্রি তখনই সে যেন আত্মহারা হয়ে গেল। সে হিন্দু, সে কালা আদমি, অভিনয়ে ক্লেটনের আগ্রহে ওথেলোর পার্ট পেয়ে থাকলেও ডেসডিমোনা রিনা ব্রাউনকে চুম্বনের অধিকার ওর ছিল না। আত্মহারা আবেগ সত্ত্বেও ওখানটায় সংবরণ করলে নিজেকে, কিন্তু–

    So sweet was neer so fatal. I must weep.
    But they are cruel tears. The sorrow’s heavenly.

    বলতে বলতে তার বড় চোখ দুটি থেকে জলের ধারা নেমে এল। কণ্ঠস্বরও রুদ্ধ হয়ে আসছিল, কোনো রকমে সে শেষ করলে,

    Its strikes where it doth love. She wakes.

    রিনা ব্রাউন চোখ বুজেও অনুভব করছিল সেই আবেগের স্পর্শ। চোখ মেলে দেখলে কৃষ্ণের চোখে জলের ধারা। সে অভিভূত হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য। পরমুহূর্তে সে অনুভব করলে আরও কিছু। প্রখর স্পষ্ট হয়ত নয়, তবু অন্ধকারাবৃতের মত অব্যক্ত নয়। কুয়াশার মধ্যে বর্ণের আভাসের মত অস্পষ্ট। অস্পষ্ট থাকলেও অজ্ঞাত থাকে নি পরস্পরের কাছে। এরপর দুজনের দেখা হলেই একটা কম্পন বুকের মধ্যে অনুভব করত।

    রিনা কৃষ্ণেন্দুকে পরে বলেছিল কথাটা। রিনা প্রকাশ করবার ভাষা পাচ্ছিল না, কৃষ্ণেই যুগিয়ে দিয়েছিল। তুমি বলছ অন্ধকার কেটে গিয়ে কুয়াশার মধ্যে রামধনুর রঙের আভাসের মত? জান তো কালো কোনো রঙ নয়, কালোহল রঙের অভাব, বৰ্ণশূন্যতা।

    রিনা বলেছিল, দ্যাটস ইটা বলেছিল, তারপর তুমি যখন বললে, থিঙ্ক অব দাই সিনস, আমি বললাম—দে আর লাভস আই বেয়ার টু ইউ, সেই মুহূর্তে আমারও চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল।

    অভিনয়ের শেষে কেউ কারুর সঙ্গে কোনো কথা না বলেই চলে গিয়েছিল। পরস্পরের সঙ্গে দেখা করে নি। সাত দিন। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণেন্দু কেমন হয়ে গিয়েছিল।

    কিছুদিন আগে লেখা বাবার চিঠিখানা বার বার পড়ত আর ভাবত। বাবা কলকাতায়। এসেছিলেন হঠাৎ। এক মাসের উপর সে চিঠি দেয় নি। চিন্তিত হয়ে তিনি চলে এসেছিলেন। আরও একটা কারণ ছিল। ওদের গ্রামের হরিবিলাস বসু কলকাতায় থাকেন, তিনি দেশে গিয়ে বলেছিলেন, ছেলে যে সায়েব হয়ে গেল শ্যামসুন্দরকাকা। কোটপ্যান্ট পরে সায়েব-মেমের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রেস্টুরেন্টে টেবিলে বসে খাচ্ছে। আমি নিজের চোখে দেখে এলাম।

    বাবা পরদিনই কলকাতায় এসে ধর্মতলার চেম্বারে উঠেছিলেন। ওই ঠিকানাই সে ইদানীং ব্যবহার করত মেসের ঠিকানার পরিবর্তে। বোধহয় ওর মধ্যে প্রতিষ্ঠার একটা প্রচ্ছন্ন মোহ বা অহংকার ছিল। সুবিধে ছিল—চিঠিপত্র পেতে গোলমাল হত না।

    কৃষ্ণেন্দু তখন চেম্বারে একটি ফিরিঙ্গী মেয়েকে ইনট্রাভেনাস ইনজেকশন দিচ্ছে, তার সঙ্গের আর একটি মেয়ে বাইরে বসে আছে। আর দুটি রোগী অপেক্ষা করছে। সবই সালভারসনের কেস। এদিক দিয়ে এদের মানসিকতা বৈজ্ঞানিক। এরা লজ্জা করে না। এসে সোজাসুজি বলে, ওয়েল ডক, আমার সন্দেহ হচ্ছে, এবং সন্দেহের কারণও আছে যে, আমার খারাপ অসুখ হয়েছে। দেখ তো অনুগ্রহ করে। এবং যথেষ্ট পারিশ্রমিক দিয়ে চিকিৎসা সুশেষ করে ধন্যবাদ জানিয়ে ওরা চলে যায়। এদেশের লোক শুধু গরিবই নয় কৃপণও বটে। ডাক্তারের ফি নিয়েও দর করে। ফাঁকিও দেয়।

    মেয়েটির ইনজেকশন শেষ করে চেম্বার থেকে বেরিয়েই সে বাবাকে দেখেছিল। মেয়েটি তখনও টেবিলে শুয়ে। বিশ্রাম নিচ্ছে।

    বাবা! বাবাকে দেখে বিস্মিত হয়েছিল সে।

    হ্যাঁ। এক মাসের উপর আটত্রিশ দিন চিঠি দাও নি। চিন্তিত হয়ে এসেছি। বাবা তার মুখের উপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে যেন পড়তে চেষ্টা করেছিলেন।

    আমি তো চিঠি দিয়েছি।

    আমরা তো পাই নি।

    হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল, একখানা পত্র লিখেছিল ডাকে দেবার জন্য। চেম্বারে ঢুকে ব্লটিং প্যাডটা তুলে চিঠিখানা বের করেছিল। অপরাধীর মতই চিঠিখানা হাতে নিয়ে বাবার কাছে ফিরে এসে বলেছিল, কাজের মধ্যে ভুলে গিয়েছিলাম, ফেলা হয় নি।

    বাবা বিচিত্ৰ হাসি হেসেছিলেন। তারপর ও সম্পর্কে আর কোনো প্রশ্ন না করে প্রশ্ন করেছিলেন, এরা সব?

    রোগী।

    রোগী? তুমি–?

    একজন ডাক্তার বন্ধু চিকিৎসা করেন এখানে। তাকে সাহায্য করি। আপনার আশীর্বাদে আমি পাস-করা ডাক্তারদের চেয়ে ভাল ইনজেকশন দিই।

    এই সময়ে এসেছিল ক্লেটন এবং রিনা। হ্যালো ম্যান–

    কৃষ্ণেন্দু তাড়াতাড়ি তার বাবার পরিচয় দিয়ে বলেছিল, ক্লেটন, ইনি আমার বাবা। বাবা, ইনি আমার বন্ধু। আমাদের কলেজেই পড়েন, জন ক্লেটন, আর ইনি রিনা ব্রাউন। বন্ধু আমার।

    গ্রান্ড ওল্ড ম্যান! ক্লেটন সত্যিই খুশি হয়ে বেশ সম্মান দেখিয়ে কথা বলেছিল।

    রিনা একদৃষ্টে তাঁকে দেখেছিল।

    বাবা আর থাকেন নি—চলে গিয়েছিলেন; দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে উঠেছিলেন। কালীঘাটে তিনি চলে গেলে রিনা বলেছিল, হি ইজ ও ট্র্য, হিন্দু, এ টিপিক্যাল ব্ৰাহমিন। আমার ভারি ভাল লাগল। কী মিষ্টি কথা! অ্যান্ড ইউ, টারবুলেন্ট মূর, এ রায়টার, হিজ সন! তারপরই বলেছিল, কী নাম বল তো সেই ব্ৰাহ্মণের ছেলের—যে বিদ্রোহ করে দেবতা ভেঙেছিল? ইয়েস। কালাপাহাড়—ব্ল্যাক মাউন্টেন!

    হেসেছিল কৃষ্ণেন্দু। কৃষ্ণেই ওদের কাছে কালাপাহাড়ের গল্প বলেছে।

    পরদিন হাওড়া স্টেশনে সে বাবাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসেছিল। বাবা কথা কমই বলেন, ট্রেনে চড়ে একটি কথাও বলেন নি। ট্রেন ছাড়বার সময় শুধু বলেছিলেন, সাবধানে চলে।

    হাসি পেয়েছিল কৃষ্ণের। সাবধানে চলতে হবে? কেন? বাড়ি গিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। বাবা। লিখেছিলেন, ইচ্ছা ছিল আসিবার সময় তোমার সম্মুখেই সকল কথা বুঝাইয়া বলিয়া আসি কিন্তু সাবধানে চলিবে এই কথা ছাড়া কোনো কথা বলিতে পারি নাই। পত্রেও সকল কথা খুলিয়া লিখিতে বসিয়াও লিখিতে কেমন যেন বাধা অনুভব করিতেছি। তোমার মাকেও এসব কথা বলতে পারিতেছি না। তাহা হইতে আমার মনের অবস্থা বুঝিতে পারিবে। মনে। হইতেছে উচিত হইবে না। তুমি উপযুক্ত পুত্র। বিদ্যাবুদ্ধিতে তুমি যখন সুখ্যাতি পাইছে, তখন কী করিয়া মন্দ বলিব? কিন্তু তবু বলিতেছি, আমার ভাল লাগিল না। মনে হইতেছে, ভাল হইবে না। যেন বড় বেশি আগাইয়া যাইতেছ। আমাদের শাস্ত্রে বলে, উপনয়নের সময় তিন পায়ের বেশি অগ্রসর হইতে নাই। তাহাতে আর ফিরিবার উপায় থাকে না। আমার মনে হইতেছে, তিন পায়ের বেশিই অগ্রসর হইয়াছ তুমি। অপর দিকে বলে, সাত পা একসঙ্গে পথ হাঁটিলে অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব হয়। দেখিলাম, কলিকাতায় তুমি অনেক পা অনেকের সঙ্গে ঘঁটিয়াছ। সাত পা কি না জানি না। সপ্তপদ পূর্ণ না হইয়া থাকিলে আর আগাইও না। গোবিন্দ তোমাকে রক্ষা করুন। সপ্তপদ পূৰ্ণ হইয়া থাকিলে তিনি যেন আর দুইপদ তোমাকে আগাইয়া দেন।

    চিঠি পেয়েও কৃষ্ণেন্দু হেসেছিল। বাবার অমূলক আশঙ্কায় না হেসে করবে কী? আর আশঙ্কা অমূলক না হলে পাথরের গোবিন্দের রক্ষা করবার শক্তিই বা কোথায়? কিন্তু এই ঘটনায়, অর্থাৎ ক্লেটনদের বিদায়-উৎসব উপলক্ষে ওথেলোর অভিনয়ের মধ্যে আকস্মিকভাবে নিজের যে প্রকাশ তার নিজের কাছে ঘটল, তারপর আবার চিঠিখানা খুলে বার বার না পড়ে সে পারে নি। কয়েকদিন পরে পেয়েছিল মায়ের চিঠি। তার অভয়দায়িনী উদারদৃষ্টি মা। মা লিখেছেন, তোর বাবা ভয় পেয়েছেন। তিনি রাগ করলে আমি বুঝতাম হয়ত সহ্য করতে পারছেন না তোর সত্যকে বুঝতে পারছেন না তোর ন্যায়কে তাই রাগ করছেন। কিন্তু ভয় যখন পেয়েছেন তখন যে চিন্তা আমারও হচ্ছে কালো। ওরে তুই নিজে হিসেব করে দেখিস। তা সে করেছিল নিজেই হিসেব করেছিল, কপা সে ছেড়ে এসেছে, কপা এগিয়েছে রিনার সঙ্গে। হিসাব করতে বসে আবার মনের জোর ফিরে পেয়েছিল।

    ইস্কুল এক পা, সেন্ট জেভিয়ার্স এক পা, মেডিক্যাল কলেজ এক পা। তিন পা হয়ে গেছে। সে জানে উপনয়নের সময় দু-পায়ের পর শেষ পা ফেলার সময় পিতা বা উপনয়নদাতাই পাখানি ধরে পিছিয়ে দেন। ঘরে সংসারী হয়ে আবদ্ধ হয়, বদ্ধ অবস্থাতেই জীবন কেটে যায়। মানুষের প্রাণ বদ্ধ জলার মত বাষ্প হয়ে পুনর্জন্মের জলধারা হয়ে ঝরে প্রবাহের কামনা করে। সে যদি নদীর স্রোতের গতি পেয়ে থাকে, তবে তাতে খেদের কী আছে? হুঁ, সে গতি সত্যিই সে পেয়েছে, অনেকদূরে চলে এসেছে। তাকে রক্ষা করবার জন্য গোবিন্দের প্রয়োজন নেই। পাথরের বিগ্রহ গোবিন্দের নাগালের বাইরে সে। গোবিন্দ সজীব সত্য হলে সে তাকে মানবে। তার সামনে গিয়ে তবে দাঁড়াবে।

    কল্পনার গোবিন্দকে সে তো মানে না। বিজ্ঞানের তথ্যগুলি যে তার সম্মুখে নতুন পথ খুলে দিয়েছে। তার কোনো পথই তো পুরাণের বৈকুণ্ঠের দিকে যায় নি।

    আর রিনার সঙ্গে? কত পদ? কত পদ হল?

    যত পদই হোক_সপ্তপদ হয় নি। ওপথে আর পদক্ষেপ করবে না স্থির করেছিল, কারণ রিনা ক্লেটনের মনোনীত বধূ। ক্লেটন তার বন্ধু। এখানে সে বাবা-মার চিঠি নামেনেও সাবধান হল। পরদিন থেকে রিনাদের বাড়ি যাওয়া ছেড়েই দিলে। রিনাই চিঠি লিখলে। ও তার জবাব দিলে, জনি ছিল, জনির সঙ্গে যেতাম। জনি চলে গেছে। আমার সামনে পরীক্ষাও বটে। জনি। ফিরে এলে যাব। আমার দোষ নিয়ো না। জন ক্লেটন চলে গেছে মিলিটারি ট্রেনিঙে।

    ***

    বাবাসাহেব! অতীতকালের স্মৃতিকথাকে ড়ুবিয়ে দিয়ে বর্তমান যেন কথা কয়ে উঠল। কে তাকে ডাকলে।

    কে! থমকে দাঁড়ালেন কৃষ্ণস্বামী। কারুর অসুখ নাকি?

    ই সকালে পয়দলে কুথাকে যাবেন গোঃ সাইকেল কী হল?

    কোনো গ্রাম থেকে মাথায় কলসি এবং পাটের শাকের বোঝা নিয়ে কয়েকজন লায়েক। চলেছে বিষ্ণুপুরের দিকে। পথে বাবাসাহেবকে দেখে স্মিতহাস্যের সঙ্গে আত্মীয়ের মত প্রশ্ন করছে।

    পথ ভুল হয়ে গেছে কৃষ্ণস্বামীর। বনের মধ্যে পথ-ভুল একটা সাধারণ ব্যাপার।

    নিজের আস্তানার পথ ফেলে অনেকটা চলে এসেছেন। বন প্রায় শেষ হয়ে আসছে। বন শেষ হলেই একেবারে বিষ্ণুপুরের প্রান্তভাগে উঠবেন। একেবারে যমুনা বাঁধের কাছাকাছি।

    থমকে দাঁড়ালেন কৃষ্ণস্বামী।

    ফিরবেন এখান থেকে? না।

    একবার যাবেন লাল বাঁধের ধারে। লাল বাঁধের পাড়ের উপর সেই পাথরখানাকে স্পর্শ করে যাবেন, যেখানার উপর রামকৃষ্ণ পরমহংস বসে বিশ্রাম করেছিলেন।

    মনের মধ্যে অবাধ্য স্মৃতির পীড়ন আর তিনি সহ্য করতে পারছেন না।

    মুছে যাক, অতীত কালের সব স্মৃতি মুছে যাক। পরশপাথরের ছোঁয়াতে লোহা সোনা হয়; ওই বৈরাগীশ্রেষ্ঠের আসনখানার স্পর্শে তার মন বৈরাগ্যে ভরে উঠুক। বৈরাগ্যের গেরুয়ার ছাপে সুখ-দুঃখ হাসি-কান্নার রামধনুর সাত রঙ নিঃশেষে ঢেকে থাক।

    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleচাঁপাডাঙার বউ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article বিচারক – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গল্পসমগ্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    হাঁসুলী বাঁকের উপকথা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    রাইকমল – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    চৈতালী-ঘূর্ণি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    ধাত্রী দেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গণদেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.