Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    সরস গল্প সমগ্র – তারাপদ রায়

    তারাপদ রায় এক পাতা গল্প1280 Mins Read0

    ভজহরি চাকলাদার

    ভজহরি চাকলাদার

    কী করিয়া কী হইল এখন গুছাইয়া লেখা সম্ভব নহে। তবে যাঁহারা আমাকে মহালয়ার দিন বিকালে গড়িয়াহাট মোড় হইতে ডবলডেকারে উঠাইয়া দিয়া নিশ্চিত ধরিয়া আছেন যে, আমি এখন রাঁচিতে মাতুলালয়ে মনোরম পরিবেশে শারদীয় অবকাশ অতিবাহিত করিতেছি তাহাদের অবগতির জন্যে জানাই রাঁচি পৌঁছাইতে পারি নাই, এমনকী কলকাতা ত্যাগ করিতেও পারি নাই। নারিকেলের দড়িতে বাঁধা বিছানা এবং পদ্মফুল-আঁকা উৎপলের বাড়ির চাকরের সুটকেস হারাইয়া এই শহরেরই একটি হাসপাতালে ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে শুইয়া শুইয়া যাহারা ক্রাচ ব্যবহার করে তাহাদের পদধূলি কেহ পায় না, না এইরূপ বিষয়াদি ভাবিয়া সান্ত্বনা খুঁজিতেছি।

    শ্যামল এবং ভাস্কর আমাকে যখন বাসে উঠাইয়া দিল তখন বিকাল পাঁচটা সতেরো, সাড়ে সাতটায় ট্রেন। সময় যথেষ্টই ছিল, কিন্তু রাস্তায় ভয়ংকর ভিড় এবং তদুপরি আমার ডবলডেকারটির ড্রাইভার বোধহয় পূর্বে ট্রামের ড্রাইভারি করিতেন, তাই তাহার ধারণা হইয়াছিল একই লাইনে ট্রামকে ওভারটেক করা সম্ভব নহে। তিনি একটি মন্দগতি ট্রামের পশ্চাদানুসরণ করিতেছিলেন। অবশ্য হলফ করিয়া বলিতে পারিব না যে, সেই ট্রামের জানলায় ঠিক আর কোনও আকর্ষণ ছিল না। শিয়ালদহের মোড়ে পৌনে সাতটা বাজিতে আমি সিট ছাড়িয়া উঠিয়া গিয়া ড্রাইভারের তারের জালের ভিতর দিয়া নাক গলাইয়া কহিলাম, দাদা, একটু দ্রুত করা কী সম্ভব? একটা গোরুকে পেট্রল খাওয়াইলে ইহা অপেক্ষা দ্রুত যাইত। দাদা একটু হাসিলেন, তাহার পর খাকি শার্টের আস্তিনে হাসিটুকু মুছিয়া নির্লিপ্তভাবে বলিলেন, কিন্তু আমি তো পেট্রল খাই নাই।

    শুনিয়া নিশ্চিন্ত হইলাম; কিন্তু তখন আর সময় ছিল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় মিনিট পনেরো-কুড়ি অতিবাহিত হইল, তখন বাস বড়বাজার পর্যন্ত আসে নাই। হাতে আর সময় নাই, টিয়া গেলে তবু ট্রেন ধরা যাইতে পারে কিন্তু এই বাসে অসম্ভব। অবশ্য বাস হইতে অবতরণ সে আরও অসম্ভব; কেন যে ট্রান্সপোর্ট-কর্তৃপক্ষ বাসগুলির প্রত্যেক জানলায় ফায়ার ব্রিগেডের দড়ির সিঁড়ির বন্দোবস্ত করেন না।

    আমি বিছানা এবং সুটকেস লইয়া বাহির হইবার চেষ্টা করিলাম। করুণ কণ্ঠে একটু পথ একটু পথ প্রার্থনা করিলাম। সর্বত্রই রসিক যাত্রী থাকেন, তাহাদেরই কেহ ভিড়ের মধ্য হইতে প্রশ্ন করিলেন, এই ভিড়ে পথ আবার কী? আপনাকে গার্ড অফ অনার দিতে হইবে নাকি? সম্মুখে পাটরাদি হাতে আমারই মতো আরেকজন নামিবার চেষ্টায় ছিলেন। আমি যথাসাধ্য তাহার পদাঙ্ক। অনুসরণ করিতে লাগিলাম।

    এই সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটিল। পিছন হইতে ভীষণ চাপ পড়ায় আমি ক্রমশ সম্মুখে হেলিয়া পড়িতেছিলাম। লেডিস সিটের প্রান্তবর্তী হইবামাত্র একটি জোর ধাক্কায় হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া গেলাম। লোকের শরীরে যাহাতে তা বা ধাক্কা না লাগে, সেই জন্য সুটকেস এবং বিছানা এতক্ষণ দুই হাতে মাথার উপর তুলিয়া আসিতেছিলাম, এইবার ওই দুইটি ছিটকাইয়া গেল। সম্মুখবর্তিনী দণ্ডায়মানা একটি যুবতীর পৃষ্ঠদেশ বিছানার সহিত আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা কর্কশ নারিকেল দড়ি লাঞ্ছিত হইয়া রক্ত ক্ষরিত হইতে লাগিল। তাঁহার পৃষ্ঠদেশ অতখানি উন্মুক্ত না থাকিলে যে পরিধেয় বস্ত্রের উপর দিয়াই ঘটনাটি ঘটিয়া যাইত, তাঁহার দেহে আঁচড়মাত্র পড়িত না, ইহা তাহাকে বুঝাইবার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু সেই স্বল্পবাসিনী যদি স্বল্পভাষিণীও হইতেন, তবে আমার চতুর্দশপুরুষ সেইদিন কিঞ্চিৎ অন্যায় অভিযোগ হইতে অব্যাহতি পাইতেন, এইটুকু বলিতে পারি। সুটকেসটি কী হইয়াছিল বলিতে পারি না। যদি ধ্বনি দ্বারা অনুমান সঠিক হয় তবে উহা কোনও হ্রস্ব ব্যক্তির শিরোপরি অধঃপতিত হইয়াছিল। সেই ব্যক্তিটি কিন্তু টু শব্দটি করেন নাই; হয় বাকরোধ হইয়া গিয়াছিল কিংবা জন্ম হইতেই বোবা। অবশ্য এমনও হইতে পারে উক্ত যুবতীর রোমহর্ষক বাক্যাদি শ্রবণ করিয়া তিনি আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিতে সাহসী হয়েন নাই।

    ইতিমধ্যে কী এক অজ্ঞাত কারণে (আমার উৎক্ষিপ্ত মালপত্রাদি অবশ্য ইহার কারণ হইতে পারে) সমস্ত বাসের মধ্যে দারুণ গৃহবিপ্লব দেখা দিল। যাঁহারা ফুটবোর্ডে দাঁড়াইয়া ছিলেন তাঁহারা বাসের ভিতর দিকে চাপ দিতে লাগলেন এবং ভিতরে যাঁহারা ছিলেন তাঁহারা প্রত্যুত্তরে অধিকতর চাপ দিতে লাগিলেন। যাঁহারা কলিকাতার বাসে যাতায়াতে অভ্যস্ত তাঁহাদের অবশ্য এই ধরনের আন্দোলন সম্পর্কে কিছু ধারণা রহিয়াছে। এইরূপ নিঃশব্দ বিপ্লব পৃথিবীতে সচরাচর দেখা যায়। পরস্পর পরস্পরকে কনুইয়ের ধাক্কা দিতেছে এবং সহ্য করিতেছে। কিন্তু কাহারও মুখে কোনও শব্দ নাই। অবশেষে একটি প্রচণ্ড তরঙ্গাঘাতে চলন্ত বাস হইতে আরও জন পনেরো লোকের সহিত আমারও পতন হইল। ভাগ্য ভাল, বাসটি দ্রুত সঞ্চরমান ছিল না, ফলে পরস্পর পরস্পরের উপর হুমড়ি খাইয়া পড়িলে যতটুকু আঘাত লাগে তাহার অপেক্ষা কেহই বেশি আহত হইল না। উপরন্তু এই আকস্মিক ভাগ্য-বিপর্যয়ের ফলে বাস হইতে নামিবার সুবিধা হওয়ায় সকলেই অল্প-বিস্তর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিলেন, অন্তত তাহাই মনে হইল।

    কিন্তু ততক্ষণে বিপরীত ফুটপাথে একটি প্রলয়ংকর কাণ্ড শুরু হইয়াছে। প্রথমে কিছু বোঝা গেল, একটি তাঁতের শাড়ির দোকানের সামনে হুলুস্থুল কাণ্ড। মনুষ্যমাত্রেই গোলমাল পাকাইতে এবং জমাইতে ভালবাসে। আমিও স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসায় অগ্রসর হইলাম। বহু পরিশ্রমে নিকটস্থ হইয়া দেখিলাম, দুইটি অসম আকৃতির ব্যক্তি প্রবলভাবে নড়িতেছে। একজন অতি শীর্ণ, বেঁটে, অপরজন গাট্টাগোট্টা, লম্বা-চওড়া ধরনের প্রথম ব্যক্তির তেজ এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির বিক্রম বেশি বলিয়া মনে হইল। দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম জনকে দুই পায়ের ফাঁকে ফেলিয়া পিষিয়া ধরিয়াছে এবং শীর্ণ ব্যক্তিটি এই অবস্থায় তড়িৎ গতিতে হস্ত, পদ এবং মুখ চালনা করিতেছে।

    বেশিক্ষণ এই দৃশ্য দেখিতে হইল না। শীর্ণ ব্যক্তি ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া আসিল; এই সময় একজন বলশালী দর্শক স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া আগাইয়া গিয়া প্রথমোক্ত গাট্টাগোট্টা ব্যক্তিটিকে ধরিয়া এক ঝাপটা দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ২নং ব্যক্তি পায়ের ফাঁক দিয়া গলিয়া রাস্তার উপর দুম করিয়া পড়িয়া গেল। কিন্তু পদচ্যুত হইবামাত্র ২নং ব্যক্তির তেজ যেন আবার বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল। সে এক লাফে উঠিয়া দাঁড়াইয়া ১নং ব্যক্তিকে পুনরায় দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিতে লাগিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ আস্ফালন করিতে লাগিল। আমি এই ২নং ব্যক্তিটির নিকটেই দাঁড়াইয়া ছিলাম এবং অন্যান্য দর্শকের মতোই বুঝিতে পারিয়াছিলাম যে, ২নং ব্যক্তিটি বেশি লাফালাফি করিলে আবার প্রচণ্ড মার খাইবে। আমি কর্তব্যবোধবশত তাহাকেই দুই বাহুপাশে আবদ্ধ করিলাম। আমি যদিও খুব সবল নহি কিন্তু ২নং ব্যক্তি এতই দুর্বল যে, যেকোনও বালকও তাহাকে আটকাইতে সক্ষম।

    ১নং ব্যক্তিটি বলশালী ব্যক্তির বাহুপাশে আবদ্ধ হইয়া এতক্ষণ ফুসিয়া চলিয়াছে। আমি যে ব্যক্তিটিকে ধরিয়াছি সে দুর্দান্ত চিৎকার শুরু করিল। আমাকে এই মুহূর্তে ছাড়িয়া দিন, আমি উহাকে, ওই কৃষ্ণ কুকুরশাবকটিকে শেষ না করিয়া ছাড়িব না, ছাড়িয়া দিন বলিতেছি…

    শীর্ণ ব্যক্তির গর্জনে আমার কর্ণপটাহ বিদীর্ণ হইবার উপক্রম হইল। এই সময় লক্ষ করিলাম যে নিশ্বাস লইবার অবসরে লোকটি চাপাস্বরে আমাকে কী যেন বলিতেছে, সে আরেকবার চিৎকার করিয়া তারপরে আমার পেটে কনুইয়ের খোঁচা দিয়া আবার ফিসফিস করিল। এইবার শুনিতে পাইলাম, অনুগ্রহ করিয়া ছাড়িয়া দিবেন না স্যার। ছাড়িয়া দিলে ওই ষণ্ড আমাকে মারিয়া ফেলিবে।

    এইটুকু অনুরোধ জ্ঞাপন করিয়াই, শীর্ণ ব্যক্তি আবার প্রচণ্ড গর্জন করিতে লাগিল।

    এই রকম মিনিট পাঁচেক চলিল, মধ্যে মধ্যে ভীষণ চিৎকার আস্ফালন এবং নিশ্বাস লইবার ছলে ক্ষীণ কণ্ঠে ছাড়িয়া না দিবার জন্য করুণ আকূতি। এই শীর্ণ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিটির এইরূপ তেজ ও আত্মসম্মানবোধ দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। রাজপথে অনুরূপ অবস্থায় সকলেই হয়তো এইরূপ করিয়া থাকে, কী জানি আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। চতুর্দিকে জনতা, বিশেষত পথিক-ললনাদের দৃষ্টির সম্মুখে কে আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করিতে চায়!

    ইতিমধ্যে ১নং ব্যক্তিটি যে কী কৌশলে বলশালী রক্ষকের বন্ধন ছিন্ন করিয়া মুহূর্তের মধ্যে এক ঝাপটায় আমার বাহুপাশ হইতে এই ২নং ব্যক্তিটিকে ছিনাইয়া লইয়া গেল সে রহস্য ঈশ্বর জানেন তবে আমি রাস্তায় গড়াইয়া পড়িলাম।

    কে একজন আমাকে টানিয়া তুলিলেন, দেখিলাম ১নং ব্যক্তিকে যিনি ধরিয়াছিলেন তিনিই আমাকে তুলিয়াছেন। তুলিয়াই প্রশ্ন করিলেন, মহাশয়ের বুঝি পথ-কলহ নিবারণের অভ্যাস নাই?

    নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করিলাম।

    তিনি বলিলেন, ইহারা মারামারি করিবে সে তো ভাল কথা, তাহাতে আমাদের কী, আমরা শুধু দেখিব যাহারা মারামারি দেখিতে ভিড় করিয়াছে তাহারা যেন নিরাশ না হয়। সুতরাং আমাদের কী করিতে হইবে?

    এমতাবস্থায় কী করিতে হয় জানা না থাকায় চুপ করিয়া রহিলাম।

    তিনি বলিতে লাগিলেন, লক্ষ রাখিতে হইবে মারামারি বন্ধ না হইয়া যায়। যখন মারামারি চলিতে থাকিবে ধরিতে যাইবেন না, তাহাতে নিজেরও আহত হইবার সম্ভাবনা থাকে। যেইমাত্র থামিয়া আসিবে তখন দুইজনকেই ধরিতে হইবে, কিছুক্ষণ এইভাবে ছাড়াইয়া তাহাদের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়া রাখুন, আবার আস্ফালন, গালিগালাজ হইতে হইতে যেই প্রবল উত্তেজিত হইল ছাড়িয়া দিন, আবার এক রাউন্ড, আবার আটকান, আবার সামনাসামনি দাঁড় করাইয়া রাখুন, আবার লাগ-লাগ-লাগ আরেক রাউন্ড। টাইমিং ঠিক করিতে পারিলে উপযুক্ত আম্পায়ার ঘণ্টার পর ঘণ্টা দর্শক-সাধারণকে নির্দোষ আনন্দ দান করিতে পারেন।

    তাহার কথা শুনিয়া হতবুদ্ধি হইয়া গেলাম। তিনি হঠাৎ গাড়ি, গাড়ি অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি করিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলেন এবং আমি কিছু বুঝিবার পূর্বেই তিনি এক ধাক্কায় আমাকে ফেলিয়া দিলেন, আমি অ্যাম্বুলেন্স চাপা পড়িলাম।

    যখন জ্ঞান হইল বুঝিলাম স্ট্রেচারে শুইয়া আছি, সম্ভবত অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই। চারদিক অন্ধকার, হাঁটুর নীচে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। ইহারই মধ্যে কে যেন নীচের স্ট্রেচার হইতে আমাকে অল্প অল্প খোঁচাইতে শুরু করিয়াছে। আমি উঃ, উঃকরিতে লাগিলাম। নীচ হইতে কে বলিল, স্যার, আমিও আছি।

    আমি, আমি কে? আমি প্রশ্ন করিলাম, যদিও অনুরূপ বাক্যালাপোচিত শরীরের অবস্থা তখন নয়।

    আমি ভজহরি চাকলাদার। এই নামে কোনও ব্যক্তির সঙ্গে পূর্ব পরিচয় আছে বলিয়া মনে করিতে পারিলাম না।

    স্যার, সেই রাস্তায়!

    এইবার কণ্ঠস্বর যেন কিঞ্চিৎ পরিচিত মনে হইল। পথিমধ্যে আর দুইজনে কোনও কথা হইল না। হাসপাতালে পৌঁছিয়া ভজহরি চাকলাদারকে দেখিলাম, সেই কলহপরায়ণ, শীর্ণ ২নং ব্যক্তি।

    হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে শুইয়া চাকলাদার মহাশয়ের সহিত আলাপ হইল। তিনি অমিতভাষী ব্যক্তি। তাঁহার সম্পূর্ণ বৃত্তান্ত যেমন বিচিত্র তেমনই জটিল।

    জানা গেল তাহারা পূর্বে চাকলাদার ছিলেন না। পুরাপুরি মনসাদার ছিলেন, শতাব্দী দেড়েক পূর্বে গ্রাম-প্রতিনিধিদের কী এক চক্রান্তে তাহারা তাহাদের উত্তরাধিকারগত উপাধি হইতে বিচ্যুত হন। কিন্তু তাহা হইলে কী হইবে, এখনও ধমনীতে প্রবলপরাক্রান্ত মনসাদার বংশের রক্ত প্রবাহিত হইতেছে। তাহাদের এক পূর্বপুরুষ, কী নাম, বোধহয় বজ্রগর্জন মনসাদার দুইটি হাতির লেজে এমন গিট বাঁধিয়া দেন যে গিট কাটিয়া অপারেশন করিয়া (ষাট বৎসর পরে) তাঁহাদের জেলার প্রথম ভেটার্নারি সার্জেন সাহেব হস্তি দুইটিকে আলাদা করিয়া দেন। সেই গিট-বাঁধা লেজ দুইটি এতকাল তাঁহাদের ঘরে গৌরবের সঙ্গে বিরাজ করিত, কিন্তু কিছুদিন পূর্বে যেদিন রাত্রিতে গ্রামের মনসাঠাকুরটি বারোয়ারিতলা হইতে চুরি যায় সেই রাত্র হইতে গিটবদ্ধ লেজ দুইটি পাওয়া যাইতেছে। বিলাতে নাকি এইসব জিনিস আজকাল বহুমূল্যে বিক্রয় হয়, অবশ্য এই প্রসঙ্গে তাহার জ্ঞাতিভ্রাতা হাবুল চাকলাদারকেই যে তাঁহার সন্দেহ তাহাও জানাইলেন।

    কলিকাতা হইতে বত্রিশ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে হুগলি জেলার কলাগ্রামে তাহাদের বাসস্থান। কলাগ্রাম যে আসলে চাকলাগ্রামেরই অপভ্রংশ তিনি তাহাও জ্ঞাতার্থে নিবেদন করিলেন।

    অতদূর হইতে আসিয়া কী করিয়া কলিকাতায় বড়বাজারে মারামারিতে প্রবৃত্ত হইলেন, তাহাও বলিলেন। বহু ধরাধরি করিয়া এতদিনে জমিদারির কিঞ্চিৎ ক্ষতিপূরণ আদায় করিয়াছেন। স্ত্রীর বহুদিনের শখ একটি তাঁতের ভাল শাড়ি। সেই শখ পূরণ করিতে আসিয়াই বিপত্তি। গ্রামস্থ এক বিষয়ী ব্যক্তি পরামর্শ দিয়াছিলেন, বড়বাজারে গিয়া দেবেন্দ্রমঙ্গল বসাক অ্যান্ড কোং-তে ক্রয় করিতে। বহু খুঁজিয়া, সারাদিন ভিড়ে ঘুরিয়া ক্লান্ত ঘর্মাক্ত অবস্থায় দেবেন্দ্রমঙ্গলের দোকান আবিষ্কার করিলেন। যখন ভিতরে ঢুকিতে যাইবেন দেখিলেন সামনে সাইনবোর্ডে দোকানের নামের নীচে লেখা এই বাড়ির দোতলায় আমাদের কোনও ব্রাঞ্চ বা শাখা নাই।

    ভজহরি চাকলাদার মহাশয়ের খটকা লাগিল। তিনি দোতলাতেই আগে যাইবেন স্থির করিলেন। তিনি উপরে তাকাইয়া দেখিলেন দোতলাতেও একই রকম সাইনবোর্ড, তবে তাহাতে লেখা, এই বাড়ির একতলায় আমাদের কোনও ব্রাঞ্চ বা শাখা নাই। কিছু স্থির করিবার পূর্বেই দুইদিক হইতে দুইটি লোক আসিয়া তাহার দুই হাতে দুইটি হ্যান্ডবিল খুঁজিয়া দিল। দুইটিরই ভাষা মারাত্মক, সারাংশ এইরকম:

    ভদ্রমহোদয়গণ, সাবধান! দালালদের দ্বারা প্রতারিত হইবেন না। এই বাড়ির একতলায় (ভিন্ন হ্যান্ডবিলে দোতলায়) যাহারা তাঁতের শাড়ি বিক্রয় করিতেছে তাহা বৈধ নহে। পূজায় আনন্দের জন্য শাড়ি কিনিয়া জেল খাঁটিবেন না।

    ততক্ষণে হ্যান্ডবিলদাতাদ্বয় হাতাহাতি শুরু করিয়া দিয়াছে। একতলা এবং দোতলা হইতে ক্রমাগত লোক নামিয়া আসিয়া যে যাহার পক্ষে সম্ভব যোগ দিয়াছে। ভজহরিবাবুকে লইয়া টানাটানি পড়িয়া গিল। এই পক্ষ টানিয়া তিন-সিঁড়ি উপরে লইয়া যায় আর সঙ্গে সঙ্গে অপর পক্ষের আর এক তাঁচকায় রাস্তায় ছিটকাইয়া পড়েন। জামার আস্তিন এবং কলার ছিঁড়িয়া গেল। জুতা হারাইয়া ফেলিলেন, টানাটানিতে হাত কিঞ্চিৎ লম্বা হইয়াছে বলিয়া তিনি মনে করেন।

    তার পর কী হইল? আমি প্রশ্ন করিলাম।

    প্রশ্নের উত্তরে ভজহরিবাবু ম্লান হাসিলেন, কী হইল, আমিও জানি না। একটু পরে দেখিলাম দেবেন্দ্রমঙ্গলের দোকানের সামনে আমি একটি অপরিচিত ব্যক্তির দুই পায়ের ফাঁকে আটকাইয়া আছি। তাহার পরের ঘটনা সবই আপনি জানেন।

    আমিও ম্লান হাসিলাম।

    আপাদমস্তক ব্যান্ডেজবাঁধা ভজহরিবাবু এবং আজানুমস্তক (পাঠক ভুল ধরিবেন না, এখন আমি পদচ্যুত) ব্যান্ডেজ-বাঁধা আমি দুইজনে এখন কড়িকাঠ শুনিতেছি।

    ইনস্টলমেন্টে কোথায় ক্রাচ পাওয়া যায় কেহ কি খবর দিতে পারেন?

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57 58 59 60 61 62 63 64 65 66 67 68 69 70 71 72 73 74 75 76 77 78 79 80 81 82 83 84 85 86 87 88 89 90 91 92 93 94 95 96 97 98 99 100 101 102 103 104 105 106 107 108 109 110 111 112 113 114 115 116 117 118 119 120 121 122 123 124 125 126
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleখাজুরাহ সুন্দরী
    Next Article কীর্তিহাটের কড়চা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাপদ রায়

    রম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়

    August 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.