Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    সরস গল্প সমগ্র – তারাপদ রায়

    তারাপদ রায় এক পাতা গল্প1280 Mins Read0

    ছোটসাহেব

    শরৎকালের কোনও কোনও বিকেলে বেগমবাহার ঘুড়ির কাটাকুটির মতো সাদা মেঘ আর কালো মেঘ ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে।

    সহসা হু হু করে বাতাস আসে। কোন দিক থেকে আসবে বোঝা কঠিন, সাদাকালো মেঘগুলো ক্রমাগত দিক বদল করে। এদিকেরটা ওদিকে যায়, ওদিকেরটা এদিকে আসে।

    গোপালগ্রামের ছোটসাহেব তাঁদের দোতলা বাড়ির ভাঙা ছাদে উঠে একটা অদৃশ্য লাটাই হাতে মেঘগুলোকে কন্ট্রোল করেন। কখনও সুতো ছাড়ছেন তো ছাড়ছেনই। একটা বেয়াদপ সাদা মেঘকে কখনও মণ্ডলপাড়া ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা তারপর ধানক্ষেত, বালির চর, খেয়াঘাটের ওপর দিয়ে ইছামতী নদী পার করিয়ে দেন।

    আবার একটু পরেই একটা নাদুসনুদুস কালো মেঘকে মাথার ওপর টেনে আনেন। মেঘটা বড়সড়, মোটা-সোটা হলে কী হবে ভারি ভিতু, ছোটসাহেবের হাতে পড়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।

    ছোটসাহেবের মনটা খুব নরম। ভিতু মেঘটার কান্নাকাটি দেখে সেটাকে অব্যাহতি দেন, বলেন, যা, ছেড়ে দিলাম। এখন কিছুক্ষণ আমগাছের মাথায় যা, তারপর হাজিপাড়া হয়ে চলে যাবি।

    আবার একেকসময় খুব কড়া ভাবে শাসন করেন গোলমেলে মেঘগুলোকে। গতকাল বিকেলে কোনও কারণ নেই, পরিষ্কার আকাশে হঠাৎ কোথা থেকে দুটো কালো মেঘ এসে মোষের মতো শিং উঁচিয়ে একেবারে মাথার ওপরে রামরাবণের যুদ্ধ শুরু করে দিল।

    এদিকে পরশুদিনই সকালবেলা কাজের মাসি দুর্গারানীকে ছোটসাহেব বলেছিলেন কালকের দিনের জন্যে মেঘগুলোকে তাড়িয়েছি। দুর্গাদি, তুমি কাল ময়লা বাসি কাপড়জামা সব কেচে দাও। আমার মশারিটাও কেচে দিও। আর ছাদের ওপরে আচার, কাসুন্দি, ডালের বড়ি সব রোদে শুকোতে দাও।

    দুর্গারানী ছোটসাহেবকে ছোটসাহেবের জন্ম ইস্তক দেখে আসছে। ছোটসাহেবের কথায় রোদ উঠবে, বৃষ্টি হবে না–এমন সব কথা বিশ্বাস করার পাত্রী সে নয়। কিন্তু ছোটসাহেবের কথামতো কাজ না হলে ঝামেলা হবে, এ কথা দুর্গারানী হাড়ে হাড়ে জানে।

    সাত-সকালে উঠে জামাকাপড় ছেড়ে স্নান করে দুর্গারানী ছাদে উঠে আচারকাসুন্দি সব রোদে দিয়েছিল। এসব কাজ শুদ্ধভাবে করতে হয়, না হলে আচার-টাচার সব পচে যায়।

    ভোরবেলা ছাদে উঠে কিন্তু দুর্গারানীর মন প্রসন্ন হয়ে গিয়েছিল।

    ফুরফুরে নীল আকাশ। সাদা বা কালো বা ঘেঁড়া ছেঁড়া কোনও রকম মেঘই আকাশে নেই। পুব দিক থেকে থেমে থেমে হালকা বাতাস বইছে। নীলকণ্ঠ ফুলের একটা বুড়ো লতাগাছ উঠোন থেকে ছাদে উঠেছে, তার সবুজ পাতা ঢেকে গেছে নীল ফুলে, সেগুলো হালকা হাওয়ায় তির তির করে কাঁপছে। পুজো এসে গেছে। দূরে কোথায় ডাক বাজছে।

    এদিকে ছাদের নীচে ঠাকুরদালানের বাগানে শ্বেতকাঞ্চন আর টগরের সাদা ফুল থই থই করছে। ঘোর বর্ষার শেষে শ্বেত গন্ধরাজ ফুলের ঝাড়ে হঠাৎ রীতিমতো হইচই, কয়েকশো গন্ধরাজ ফুটেছে, তার সৌরভ এই খোলা ছাদে ছড়িয়ে পড়েছে।

    দূরে হাটখোলার অশ্বত্থ গাছের দুটো বড় ডালের ফাঁক দিয়ে সূর্য উঠে এসেছে। আবছা গোলাপি বর্ণের রোদ আস্তে আস্তে সাদা হচ্ছে।

    দুর্গারানী এত শত বোঝে না, বোঝার দরকারও নেই। কিন্তু সে বুঝতে পারে বর্ষাকালের শেষে এটা একটা আশ্চর্য সকাল।

    আরেকটা ব্যাপার হয়েছে।

    দুর্গারানী আজ তার বদ্ধমূল ধারণা বদল করতে চলেছে। মেঘ বাতাস-রোদ ওসবের ওপর ছোটসাহেবের ক্ষমতা জারির ব্যাপারটা সে পাগলামি বলেই এতকাল মনে করেছে। আজ বর্ষা শেষের এই সুনীল সুপ্রসন্ন ভোরবেলা তার মনে হল ছোটসাহেব ভুল বলেনি। যা বলেছিল, আজ সকালে অন্তত অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।

    অবশ্য ছোটসাহেবের পাগলামির কম দাপট এতকাল তাকে সামলাতে হয়নি।

    কী খটমট সব মন্ত্র ছোটসাহেবের, সেগুলো দুর্গারানী মনে রাখতেও পারে না, বলতেও পারে না, কিন্তু না বললে চলবে না।

    গত সপ্তাহে একদিন ভরদুপুরবেলা ঝমঝম করে বৃষ্টি এল। ছোটসাহেব দালানের বড় ঘরের খাটে গা এলিয়ে শুয়ে আছেন। সারা সকাল প্রচুর ধকল গেছে তার, গোটা দশেক অবাধ্য দেবদারু চারাকে উঠ-বোস করিয়েছেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে দেখলেন ঝমঝম বৃষ্টি নেমেছে। এই সময়ে বৃষ্টি নামাটা ছোটসাহেবের মোটেই পছন্দ হয়নি। দেবদারুর বাচ্চাগুলোকে শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন আছে, কঠোর রোদে ওগুলোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। অসময়ে বৃষ্টি এসে তাও সব ভেস্তে দিল।

    সঙ্গে সঙ্গে দুর্গারানীকে তলব। সবে সে ভাতঘুমে মাদুরের ওপরে কাত হয়ে পড়েছিল। তাকে বলা হল, মন্ত্র বল। আর সে যে কী মন্ত্র!

    রসগোল্লা চমচম।
    যায় রে বৃষ্টি ঝমঝম ॥
    রসগোল্লা চমচম।
    যায় রে বৃষ্টি কমকম ॥
    রসগোল্লা চমচম।
    আয় রে রোদ গমগম ॥
    রসগোল্লা চমচম।
    ছোটসাহেব মেঘের যম ॥
    রসগোল্লা চমচম।
    মেঘের বংশ হল খতম ॥

    দুর্গারানীর গেঁয়ো উচ্চারণে এই দারুণ পদ্য সাপুড়ের সাপ খেলানোর কিংবা ওঝার ভূত নামানোর মন্ত্রের মতো শোনাচ্ছিল।

    কিন্তু সেদিন কিছুতেই কিছু হয়নি। মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে দুর্গারানীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। একশো আটবার মন্ত্র পড়তে হয়েছিল তাকে। কিন্তু তাতেও বৃষ্টি থামেনি। বরং আরও জোরে এসেছে।

    ছোটসাহেব কিন্তু তাতে মোটেই দমেননি। দুর্গারানীকে বললেন, তুমি এত জোরে জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মন্ত্রগুলো বললে যে মেঘগুলো সব ভয় পেয়ে গেল। একসঙ্গে সব দৌড়ে পালাচ্ছে। তাই বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে।

    দুর্গারানী জানে এসব বাজে কথা। যত সব পাগলামি ছোটসাহেবের। দূর আকাশের ওপারে মেঘেদের নিজের দেবতা আছে, তারা গোপালগ্রামের ছোটসাহেবের মন্ত্র মানতে যাবে কেন?

    ছোটসাহেবকে গ্রামসুদ্ধ নোক ওই ছোটসাহেব নামেই ডাকে কিন্তু দুর্গারানী বলে ফুচু। জমিদারি নেই, সেই কবে চলে গেছে। তবু জমিদার বাড়ি আছে। সেই পোড় ইট বের হওয়া, পলেস্তারা খসা দালানের, প্রাচীন জমিদার বংশের শিবরাত্রির সলতে, এই ফুচু তথা গজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী।

    এ বাড়িতে এই রকমই সব নাম। কাগজপত্রে, সরকারি দলিলে যিনি কীর্তিনারায়ণ, ফুচুর বা ছোটসাহেবের যিনি প্রণম্য পিতামহ তাঁকে তাঁর মা-পিসিরা ডাকতেন কচু বলে। তাঁর ছেলে রায়সাহেব গর্জন নারায়ণ, বাড়ির মধ্যে তাঁর নাম ছিল ঘেঁচু। তিনিই ভুচু-ফুচুর বাবা।

    এসব দুর্গারানীর শিশুকাল থেকে দেখা।

    ছোটসাহেবের ঘটনাটাও দুর্গারানী ভালই জানে। ছোটসাহেবের দাদার ডাকনাম ছিল ভুচু। কিন্তু এই ভুচু নামটা চলেনি। ছোটবেলায় ভুচুর গায়ের রং এতটাই ফরসা ছিল যে লোকের মুখে মুখে তার নাম হয়ে গিয়েছিল সাহেব।

    সাহেবের থেকে ছোটসাহেব তিন বছরের ছোট। ছোটসাহেবের গায়ের রং মোটেই ফরসা নয়, আর দশজন গাঁয়ের লোকের মতো গায়ের রং তার। কিন্তু দাদার সুবাদে তার ক্ষেত্রেও ফুচু নামটা চলেনি। কী করে যে হল ব্যাপারটা বলা কঠিন। আস্তে আস্তে ফুচু ছোটসাহেব হয়ে গেলেন।

    এদিকে আসল সাহেব বড় হয়ে লেখাপড়া করে সেই যে বিলাত গেলেন, আর ফিরলেন না। আগে মাঝে মধ্যে দু-একটা রঙিন ছবিওলা চিঠি আসত। আজ আট-দশ বছর তাও আসে না।

    ছোটসাহেবের দাদা সেই প্রথম সাহেব এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, বেঁচে আছেন কিনা সেটাও কেউ জানে না। গ্রামের মানুষও তাকে আর খেয়াল রাখেনি।

    এ বাড়িতে একসময় তোকজন গমগম করত। দুর্গারানীর সব মনে আছে। এগারো বছর বয়েসে সে বিধবা হয়েছিল। তার পরের বছরেই তার বাবা এসে তাকে এ বাড়িতে রেখে যায়।

    সাহেব, ছোটসাহেবের বাবা রায়সাহেব ঘেচু তাকে খুব ভালবাসতেন। তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে সেই যেদিন আশ্রয়ের খোঁজে সে এ বাড়িতে ঢুকেছিল, তারপর একদিনের জন্যেও এ বাড়ির বাইরে থাকেনি।

    দুর্গারানীর চোখের সামনে ভুচু-ফুচুর মা মারা গেলেন, বিধবা পিসি, খুড়ি কেউ বেঁচে রইল না।

    বাড়িতে নায়েব-গোমস্তা-মুনিষ ছিল। গোয়াল ভর্তি গোরু ছিল। একদিন জমিদারি উঠে গেল। তার পরে সবই ধীরে ধীরে চলে গেল।

    এখন এই পুরনো ভাঙা বাড়িটা আছে। তাও ভয় হয়, কবে না মাথার ওপরে ভেঙে পড়ে। অল্প কিছু ধানজমি আছে, কয়েকটা ফলগাছ, একটা পুকুর। এতেই দুর্গারানীর আর ছোটসাহেবের কষ্টেসৃষ্টে কেটে যায়।

    ০২.

    ছোটসাহেবের খাটের নীচে অনেকগুলো প্ল্যাকার্ড। চারফুট কাঠের খুঁটিতে নানা রকম ঘোষণা:

    (১) সস্তায় কালো মেঘেদের আড়ং ধোলাই করে সাদা করা হয়। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

    (২) উচিত মূল্যে সাদা, কালো, ডোরাকাটা, ছাড়া ছাড়া বাচ্চা মেঘ বিক্রয়। গ্যারান্টি এক বছর।

    (৩) বৃষ্টিভেজা রোদ প্রতি এক হাজার বর্গফুট একশো টাকা। আশ্বিন মাসে শতকরা পঁচিশ টাকা কমিশন।

    এই রকম সব পোস্টার বা প্ল্যাকার্ড, এগুলো আসলে সবই বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপনের পিছনে একটা কারণ আছে।

    মাসখানেক আগে ভাঁড়ার ঘরে মাটির জালা থেকে রান্নার চাল বার করতে গিয়ে দুর্গারানী দেখে মা লক্ষ্মী প্রায় বাড়ন্ত, যার অর্থ হল খাওয়ার চাল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।

    এদিকে তখনও ভাদ্র মাস পড়েনি। তারপরে আশ্বিন আছে, কার্তিক আছে, তারপর মাঠের ধান উঠবে গোলায়। অবশ্য দুর্গারানীর সংসারী বুদ্ধি ভালই আছে। বাড়ির চারপাশে পুরনো কালের অনেকগুলো নারকেল গাছ আছে। সেগুলো থেকে নারকেল পাড়িয়ে পুজোর বাজারে বেচলে ভাল দাম পাওয়া যায়। তা দিয়ে চাল কেনা যাবে। কিন্তু সেখানে ছোটসাহেবের বাধা রয়েছে।

    গাছ থেকে নারকেল কাটায় ছোটসাহেবের খুব আপত্তি। কারণ এই নারকেলের লোভ দেখিয়েই আকাশের এ মাথা ও মাথা থেকে লোভী মেঘদের তিনি ডেকে আনেন। নারকেল না থাকলে তারা আসবে না।

    গত বছর নারকেল বেচা নিয়ে খুব চেঁচামেচি হয়েছিল। ফুচু মানে ছোটসাহেবকে কোলেপিঠে করে বড় করেছে দুর্গারানী। এই এতখানি বয়েসেও কিন্তু সে পুরোপুরি সাব্যস্ত মানুষ হয়নি। তার ইচ্ছে করে না ফুচুর সঙ্গে ঝগড়া করতে। না হলে ঝগড়া করতে দুর্গারানী কখনও পিছ-পা নয়, এ গাঁয়ের সাতপাড়ার লোক সেটা জানে।

    আর ঝগড়া করেই সে এই চৌধুরী বাড়ির চৌহদ্দি, নারকেল গাছ, ফলের বাগান, ভদ্রাসন এমন। কী অবশিষ্ট জোতজমি এতদিন রক্ষা করেছে। গোপালগ্রামের পাঁচজনে জানে দুর্গারানী না থাকলে চৌধুরীদের ছোটসাহেব কবে ইছামতীর গাঙের জলে ভেসে যেত।

    সুতরাং দুর্গারানী ঠিক করেছে এবার নারকেল বেচা বাদ যাক। মজা পুকুর পাড়ে একটা আদ্যিকালের বুড়ো কাঁঠাল গাছ আছে। এখন ভাল করে কাঁঠালও আসে না। কঁঠালের মুচি কালো হয়ে শুকিয়ে পড়ে যায়। সেই গাছটা দরকার হলে বেচবে। আজকাল কাঁঠাল কাঠের খুব দাম।

    এ বাড়িতে অবশ্য পুরনো আমলের খাট-পালঙ্ক, চেয়ার-টেবিল অনেক রয়েছে। সবই মেহগনি বা শাল কঁঠালের মতো দামি এবং একালে দুষ্প্রাপ্য কাঠের।

    এ ছাড়াও আছে তামার পুজোর বাসান, খোদ বেনারসের। আর ইসলামপুর, খাগড়া আর কাগমারির কাঁসা পিতলের থালা-বাটি, গেলাস কলসি, পানের ডাবর, হুঁকোর ঘটি? অনেক রয়েছে। কাঠের সিন্দুকে সব থরে থরে সাজানো আছে।

    টুকটুক করে, একটা দুটো করে এসব জিনিস চুরিও যাচ্ছে। কিন্তু প্রাণ থাকতে, নিজের হাতে। দুর্গারানী এসব বেচবে না, কারণ সে নিজের চোখে এ বাড়িতে এসবের ব্যবহার দেখেছে। তার কেমন একটা ভুল ধারণা, আবার হয়তো কোনও সময় খুব হইচই হবে, লোকজন, ভুচুর বউ, ফুচুর বউ, তাদের ছেলেমেয়ে, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনে ভর্তি হয়ে আবার বাড়ি গমগম করবে।

    কিন্তু এসব কবে হবে দুর্গারানী তা ভাবতে পারে না। এ ব্যাপারে ছোটসাহেবের দায়িত্ব তো কিছু কম নয়। এই যে চাল ফুরিয়ে গেছে, ছোটসাহেবের তো কিছু করা উচিত। সে-ই বাড়ির কর্তা, তাকেই তো করতে হবে। বাড়িতে কম করেও পাঁচটা মুখ। ছোটসাহেব, দুর্গারানী, দুটো কুকুর, আর বাজারের এক ভিখিরি রাতে বারান্দায় শোয়। তাকেও দুবেলা খেতে দিতে হয়।

    ছোটসাহেবকে দুর্গারানী ধরল, ভাঁড়ারে চাল ফুরিয়েছে।

    অবস্থাটা বিপজ্জনক বুঝে ওড়ানোর চেষ্টা করলেন ছোটসাহেব, তার আমি কী করব?

    দুর্গারানী বলল, তুমি করবে না তো কে করবে? তোমারই বাড়ি। তুমিই বাড়ির কর্তা।

    ঘাড় চুলকিয়ে ছোটসাহেব স্বীকার করলেন, সেটা ঠিক, কিন্তু এ সম্বন্ধে আমি কী করতে পারি?

    দুর্গারানী বলল, উপার্জন।

    ছোটসাহেব আকাশ থেকে পড়লেন, উপার্জন? আমি কী করে উপার্জন করব? আমি তো কোনও কাজ পারি না। কিছুই জানি না।

    তুমি শুধু মেঘ চরাতে জানো। এই কথা বলে গজগজ করতে করতে দুর্গারানী ছুতোর পাড়ার দিকে চলে গেল কাঁঠালগাছটা বিক্রির ব্যবস্থা করতে।

    মেঘ চরাবার কথাটা কিন্তু ছোটসাহেবের মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। সত্যিই তো, আর কিছু না হোক আমি তো মেঘের ব্যবসা করতে পারি।

    তারপর গত একমাস ধরে ছোটসাহেব বসে বসে কাঠের খুঁটিতে হেঁচা বাঁশের বেড়ার টুকরো কেটে কেটে লাগিয়ে এই প্ল্যাকার্ডগুলো বানিয়েছেন। বাজার থেকে ফুলস্ক্যাপ কাগজ কিনে এনে আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছেন, তারপর লালনীল কালি দিয়ে একের পর এক মেঘের বিজ্ঞাপন লিখেছেন। তার হাতের লেখা চমৎকার। বড় বড় হরফে প্ল্যাকার্ডে ফুটে উঠেছে:

    যদি চাই ছোট মেঘ,
    নাই কোনও উদ্বেগ।
    সস্তায় ঝুড়ি ঝুড়ি,
    আশি টাকা এক কুড়ি।

    ছোট মেঘের বিজ্ঞাপন এরকম হালকা ভাষায় লেখা। হালকা জিনিস, সস্তা দাম।

    বড় মেঘ একেকটার দাম হাজার টাকা। এর বিজ্ঞাপনটা গুরুগম্ভীর ভাষায় অনেক মাথা খাটিয়ে ছোটসাহেবকে রচনা করতে হয়েছে:

    প্রকৃত বড় মেঘ পূজা মণ্ডপের সামিয়ানার চেয়েও
    বৃহৎ আকারের। প্রতিটির মূল্য দুই হাজার টাকা।

    তিন সপ্তাহের আগাম নোটিশ লাগিবে।
    বর্ষাকালে তিনদিনের নোটিশেও হইবে।

    ঠিক এরই নীচে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা, গ্রাহকদের প্রতি নিবেদন:

    বড় মেঘ প্রতিপালন করা অতি
    কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
    বড় মেঘ পুষিতে যাইবেন না।
    ঘর সংসার তছনছ করিয়া দিবে।
    ইহা অপেক্ষা বুনো মোষ কিংবা
    গণ্ডার পোষা ভাল ॥

    সবসুদ্ধ প্রায় তেরো-চোদ্দটি পোস্টার হয়েছে। একটা পুরনো পঞ্জিকা খুলে বিজ্ঞাপন দেখে দেখে ছোটসাহেব প্ল্যাকার্ডগুলো লিখেছেন। তাই যেমন রয়েছে:

    সকল প্রকার মেঘের সব রকম দুরারোগ্য
    এবং প্রাচীন ব্যাধির চিকিৎসা করা হয়।

    ঠিক তেমনিই একটা বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা আছে, এটা অবশ্য পঞ্জিকা থেকে টুকে নয় বাজারের রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া একটা হ্যান্ডবিল থেকে ছোটসাহেব বানিয়েছেন:

    মেঘশিশুদের নার্সারি বিদ্যালয়।
    আর মাত্র অল্প কয়েকটা সিট
    খালি আছে।

    ০৩.

    আজ ছোটসাহেবের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলেছে। মেঘেরা তাদের মালিককে এতদিনে চিনতে শিখেছে।

    এ কদিন এত মেঘবৃষ্টির পর আজ সারাদিন পরিষ্কার আকাশ। রোদ ঝলমলে দিন।

    দুর্গারানী খুব খুশি। কাসুন্দি-আচারের বয়ামগুলো সারাদিন ছাদে খুব ভাল রোদ পেয়েছে। ডালের ধামায় মুগ, ছোলা এসব তোলা ছিল, সেগুলিতে ছোট ছোট কালো বর্ষার পোকা হয়েছে। রোদ্দুরে দিয়ে সেগুলো তাড়ানো হয়েছে। এদিকে ভাড়ার ঘরে ডাল খুঁজতে গিয়ে এক বড় পেতলের কলসি ভর্তি চাল বেরিয়েছে। চাল ভাঙানোর পর কিছুটা দুর্গারানী অদিনের জন্য আলাদা করে সরিয়ে রাখে, তা মনে ছিল না। আজ চালটা পাওয়ায় সে খুব খুশি।

    সকালবেলাই সব জামাকাপড়, ধুতি-চাদর, মায় ছোটসাহেবের মশারি গরম জলে সেদ্ধ করে সাবান দিয়ে কেচে দিয়েছে দুর্গারানী। সেগুলো ছাদে পতপত করে উড়ছে। মশারিটা তো নৌকার পালের মতো ফুলে ফুলে বাতাস কাটছে। শরৎকালের নীল আকাশের নীচে সাবেককালের বাড়িটা এক বড় পানসি নৌকোর মতো দেখাচ্ছে।

    ছোটসাহেব তাঁর খাটের নীচ থেকে পোস্টারগুলো বার করেছেন।

    আজ শনিবার। পুজোর আগে ভাদ্রমাসের শেষ হাটবার। এ সময় হাটে ভিড় বাড়ে।

    ইছামতী নদীর ধারে গোপালগ্রামের পুরনো হাট। নদীর এপার ওপার থেকে দুগাঁয়ের মানুষ কেনাবেচা করতে আসে।

    সেই হাটের একপাশে একটু উঁচু মতন ফঁকা জায়গা দেখে ছোটসাহেব নরম মাটিতে প্ল্যাকার্ডগুলো পুঁতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

    গ্রামের লোকেরা জমিদারবাড়ির ছোটসাহেবকে ভাল করেই জানে। কিন্তু মেঘের ব্যাপারটা জানত না। ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে লাগল। সবাই এসে অন্তত একবার পোস্টারগুলো পড়ে যাচ্ছে। যারা কিছু বুঝতে পারছে না, নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, কালে কালে আর কত দেখব? মেঘ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আবার কেউ বলছে, মেঘেরা কি মানুষ হয়ে গেল নাকি? এদের খাবার জোগাবে কে?

    দুর্গারানী সংসারের সাপ্তাহিক তেলমশলা, আনাজপাতি কিনতে হাটে এসেছিল। ফেরার পথে দেখে এক জায়গায় বিরাট ভিড়। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখে ছোটসাহেব প্ল্যাকার্ডগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    দুর্গারানী যখন জামাকাপড়, আচারকাসুন্দি নামাতে ছাদে উঠেছিল তখন বিজ্ঞাপনগুলো ঘাড়ে করে ছোটসাহেব বেরিয়ে এসেছে।

    প্ল্যাকার্ডগুলোয় কী লেখা আছে সেটা সবটা না বুঝলেও দুর্গারানী কিছুটা বোঝে। ছোটবেলায় বিয়ের আগে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করেছিল সে।

    ছোটসাহেবের প্ল্যাকার্ডের ব্যাপারটা যে এতদূর গড়াবে সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি।

    দুর্গারানীকে দেখে ছোটসাহেব খুশিই হবেন, কী দুর্গাদি, কেমন বুঝছ?

    দুর্গারানী জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কী করছ?

    ছোটসাহেব বললেন, উপার্জন। তুমি বলেছিলে না উপার্জন করতে।

    মাটির ওপর থেকে খুঁটিপোঁতা প্ল্যাকার্ডগুলো তুলতে তুলতে দুর্গারানী বলল, উপার্জনের নিকুচি করেছে। তুমি করবে উপার্জন?

    ছোটসাহেব চারদিকে তাকিয়ে বললেন, এই তো কত ভিড় হয়েছে। এরা কি কেউ একটা মেঘ কিনবে না? একটা মেঘের চিকিৎসা করাবে না? একটা মেঘের বাচ্চার লেখাপড়া করাবে না?

    দুর্গারানী ততক্ষণে সব প্ল্যাকার্ডগুলো গুটিয়ে ফেলেছে। এবার ছোটসাহেবকে কড়া গলায় ধমক দিল, চলো। বাড়ি চলো। মেঘের কদর বোঝে এমন একটাও লোক এখানে নেই।

    ছোটসাহেব কী বুঝলেন কে জানে। গুটি গুটি দুর্গাদির পিছুপিছু বাড়ি রওনা হলেন। সবগুলি প্ল্যাকার্ডই দুর্গারানী কাঁধে তুলে নিয়েছে। শুধু একটা রয়েছে ছোটসাহেবের হাতে। তাতে লেখা:

    যত হবে উদ্বেগ।
    কালো হবে সাদা মেঘ ॥
    যত যাবে উদ্বেগ।
    সাদা হবে কালো মেঘ ॥

    হন্তদন্ত

    সমস্যার পর সমস্যা।

    অস্থির হয়ে পড়েছেন হরেন মিত্র। এতই অস্থির হয়েছেন তিনি যে একেক সময় আশঙ্কাষিত বোধ করছেন, পাগল না হয়ে যাই।

    না, এখনও পাগল হয়ে যাননি তিনি। কিন্তু এত সমস্যার ধাক্কা সামলানো সহজ নয়।

    বিপদ আর সমস্যা কখনও একা আসে না। এক সমস্যার ঘাড়ে এসে আরেক সমস্যা চেপে বসে। ঘরের দেয়ালের দিকে তাকালেন হরেনবাবু, সেখানে ইস্কুলের একটা বাতিল ব্ল্যাকবোর্ড টাঙানো আছে। সেখানে এখনও ঝকঝকে অক্ষরে লেখা আছে ন্যালাখ্যাপা, সেই ন্যালাখ্যাপার সমস্যা না মিটতেই এখন ঘাড়ে এসে পড়েছে হন্তদন্ত

    হরেনবাবুর বর্তমান বৃত্তান্ত আরম্ভ করার আগে হরেন মিত্র লোকটির ইতিহাস একটু বলে নিই।

    হরেন মিত্র সম্পর্কে লোকটি বলা অবশ্য সঠিক হল না। হরেনবাবু কিছুদিন আগেও কলাখোঁপা রামসুন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বাড়ির অবস্থা খারাপ নয়। বাগুইহাটিতে পৈতৃক বাড়িতে থাকেন। পঞ্চাশের এদিকে বয়েস, বিয়ে করেননি। সংসার চালাবার দায় বা ঝামেলা নেই। এই বাড়িতেই তাঁর দুই ভাইপো থাকে। তাদের আলাদা আলাদা হেঁসেল, বিয়ের পর বউদের মধ্যে সদা সর্বদা খিটিমিটি লাগায় হরেনবাবুই মধ্যস্থতা করে তাদের ভিন্ন করে দিয়েছেন। এতে অবশ্য পরবর্তীকালে হরেনবাবুরই সুবিধে হয়েছে। দুই ভাইপোর হেঁসেলে এক মাস এক মাস করে অন্নগ্রহণ করেন, বিনিময়ে তাদের কিছু অর্থ সাহায্য করেন।

    শিক্ষক জীবনে হরেনবাবু অত্যন্ত মারকুটে ছিলেন। ছাত্রদের বেধড়ক পেটাতেন। শুধু তাই নয়। এক তরুণ শিক্ষক কাজে নতুন যোগদান করেছিলেন। টি শার্ট এবং জিনস পরা সেই শিক্ষকটি ক্লাসে ঢোকার মুখে, জীবনে প্রথম ক্লাস নেওয়া তাই একটি সিগারেট টেনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনোবল সংগ্রহ করছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই নতুন শিক্ষককে হরেনবাবু আগে দেখেননি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধূমপানরত অবস্থায় তাকে দেখে ছাত্ৰভ্রমে হরেনবাবু তার কান ধরে বারান্দার ওপরে নিল ডাউন করিয়ে দেন।

    এই ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে হরেনবাবুকে শিক্ষকতার চাকরিটি মানে মানে ছাড়তে হয়। কিছু প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ছিল, সামান্য পেনশনও পাবেন। তাতে মোটামুটি চলে যাচ্ছে।

    তা ছাড়া হরেনবাবু নতুন একটা কাজ জোগাড় করেছেন। তার পাড়ায় কলেজ স্ট্রিটের একজন প্রকাশক আছেন। সেই প্রকাশকের বইগুলোর তিনি প্রুফ দেখে দেন।

    প্রুফ দেখা খুব কঠিন কাজ। তবে হরেনবাবু একনিষ্ঠ, পরিশ্রমী এবং বানান সচেতন। তিনি খুব ভাল প্রুফ দেখেন। প্রকাশক মশায়েরও তার ওপর খুবই আস্থা।

    কিন্তু এই প্রুফ দেখতে গিয়েই যত বিপদ আর সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

    বিপদ প্রকাশক মশায়ের, যিনি পাড়ায় ভুতোবাবু নামে পরিচিত। ভুতোবাবু ছাপোষা মানুষ, বইয়ের ব্যবসা করেন। তবে তিনি তো পণ্ডিত লোক নন। তা ছাড়া খুব পণ্ডিত লোকও হরেনবাবুর কাছে সহজে পার পাবে না।

    হরেনবাবুর যেটা সমস্যা, ভুতোবাবুর সেটাই বিপদ। প্রুফ দেখতে দেখতে কথায় কথায়, সময়ে অসময়ে হরেনবাবু ভুতোবাবুর কাছে ছুটে আসেন।

    মাসখানেক আগের একটা ঘটনা বলি।

    রাত এগারোটা, ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ ঘনঘন কলিংবেলের আওয়াজে জানলার খড়খড়ি তুলে ভুতোবাবু দেখেন সদর দরজায় ছাতা মাথায় হরেনবাবু দাঁড়িয়ে।

    তাড়াতাড়ি দরজা খুলে হরেনবাবুকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে ভুতবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার। হরেনবাবু? এই বৃষ্টির মধ্যে, এত রাতে?

    হরেনবাবু ভেজা ছাতাটা দরজার একপাশে রাখতে রাখতে বললেন, আপনার বনবিহারীবাবুর উপন্যাসের প্রুফটা দেখতে গিয়ে দারুণ সমস্যায় পড়ে গেছি।

    এই অসময়ে কী এমন সমস্যা হল? কপিতে কোনও গোলমাল?–ভুতোবাবু ঘুমচোখে প্রশ্ন করেন।

    হরেনবাবু বলেন, না, কপিতে কোনও গোলমাল নেই। কপি চমৎকার, কিন্তু ওই যে বনবিহারী লিখেছেন, …ভুবন চক্রবর্তী মানুষটি একটু ন্যালাখ্যাপা গোছের। …তা এই ন্যালাখ্যাপা কথাটার মানে কী?

    ভুতোবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, ডিকশনারি দেখেছেন? সেখানে নেই?

    হরেনবাবু বললেন, তা একটু আছে। কিন্তু শব্দটা এল কোথা থেকে?

    বিরক্ত হয়ে ভুতোবাবু বললেন, তা যেখান থেকেই আসুক। বনবিহারীবাবু বড় লেখক, তিনি যখন শব্দটা ব্যবহার করেছেন। আপনি প্রুফ দেখে ছেড়ে দিন।

    হরেনবাবুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, এ কী বলছেন আপনি? আপনি একটা বই ছাপছেন, সেই বইয়ে এমন একটা শব্দ আছে, যেটা কোথা থেকে এসেছে। আপনি কিছু জানেন না। এ হয় নাকি?

    মধ্যরাতে আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে! আপাতত হরেনবাবুকে এড়ানোর জন্যে ভুতোবাবু বললেন, ঠিক আছে, আমি দু-একদিনের মধ্যে বনবিহারীবাবুর কাছ থেকে জেনে এসে আপনাকে বলব।

    প্রশ্নটা শুনে বনবিহারীবাবু হো হো করে হেসে উঠেছিলেন। প্রবীণ প্রতিষ্ঠিত লেখক, ভুতোবাবু তাকে আর ঘাঁটাতে সাহস পাননি। পাড়ায় এসে হরেনবাবুকে বলেছিলেন, বনবিহারীবাবুর আন্ত্রিক হয়েছে, নার্সিংহোমে আছেন। তাই জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

    হরেনবাবু বললেন, খবরের কাগজে যে দেখলাম বনবিহারীবাবু ভবানীপুর হিতসাধিনী সভার শতবর্ষ উৎসবে কালকেই সভাপতি হয়েছেন।

    কোনওরকমে আমতা আমতা করে ভুতোবাবু বললেন, তারপরেই তো ঘটনাটা ঘটল। হিতসাধিনী সভার শেষে ওখানেই চা-সিঙাড়া-জিলিপি দিয়ে জলযোগ করেছিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বমি, পেট ব্যথা। তারপরে ওই ভবানীপুরেই নার্সিংহোমে তাকে ভর্তি করা হয়।

    হরেনবাবু কী বুঝলেন কে জানে! ওই ন্যালাখ্যাপা শব্দ নিয়ে তিনি আর ভুতোবাবুকে জ্বালাতন করেননি। সমস্যাসংকুল ন্যালাখ্যাপা শব্দটি তিনি তার ব্ল্যাকবোর্ডে তুলে দিয়েছেন।

    এই ব্ল্যাকবোর্ডটির একটি ব্যাপার আছে। শিক্ষকতা থেকে স্বেচ্ছা-অবসরের পর ফেয়ারওয়েলের সময় তিনি ছাত্র বা শিক্ষকদের তরফ থেকে কোনও উপহার না নিয়ে বিদ্যালয়ের একটি পুরনো ব্ল্যাকবোর্ড চেয়ে নেন।

    তারপর সেই ব্ল্যাকবোর্ডটির নামকরণ করেন সমস্যা। যেসব শব্দ নিয়ে সমস্যা হবে, সেগুলোর কোনও সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এখানেই লেখা থাকবে, যাতে সমস্যাটি সব সময়ে চোখের সামনে থাকে।

    আজ সপ্তাহ চারেক ন্যালাখ্যাপা শব্দটি ব্ল্যাকবোর্ড আলো করে রয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল আবার হন্তদন্ত যোগ হয়েছে।

    তরুণ কবি মোজাম্মেল হকের নতুন কাব্যগ্রন্থটির নাম হন্তদন্ত। নাম কবিতাটিও হন্তদন্ত। বইটি ভুতোবাবুই প্রকাশ করছেন।

    নাম কবিতাটি এইভাবে আরম্ভ হয়েছে,

    হসন্তগুলি কোথায় পালালো
    হন্তদন্ত তদন্ত করা ভালো।

    বইয়ের নাম, কবিতার নাম, তার ওপরে প্রথম কবিতার দ্বিতীয় পংক্তিতে আবার হন্তদন্ত, সব মিলে হরেনবাবুকে বিপর্যস্ত করে দিল।

    ন্যালাখ্যাপার সমস্যা না মেটার আগেই তিনি অন্য কোনও সমস্যায় জড়িত হতে চাইছিলেন না। কিন্তু উপায় নেই হন্তদন্ত তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। সঙ্গে অনেক প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে।

    লোকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। এসে বলে, আজ ব্যাপারটার একটা হন্তদন্ত করতে চাই। কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে হরেনবাবু ভাবেন, এই দুই হন্তদন্তের মানে তো এক হতে পারে না।

    আর শেষ পর্যন্ত মানে যাই হোক, হন্তদন্ত কথাটা তৈরি হল কী করে? মনের গভীরে প্রশ্নের বুদ্বুদ উঠছে তো উঠছেই, শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে হরেনবাবু ন্যাল্যাখ্যাপার নীচে লিখলেন হন্তদন্ত।

    ইচ্ছে করলে এখনই তিনি ভুতোবাবুকে গিয়ে ধরতে পারেন, কবি মোজাম্মেলের কাছ থেকে জেনে আসার জন্যে হন্তদন্তের ব্যাপারটা। কিন্তু তার ওপরে হরেনবাবুর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু ন্যালাখ্যাপা নয়, তারপরেও অর্ধচন্দ্র, হড়িকাঠ এবং গোঁফ-খেজুরে নিয়ে ভুতোবাবু রীতিমতো বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

    তবে এগুলো সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারেনি। কলাখোঁপা ইস্কুলে গিয়ে পেনশনের তাগাদা দেয়ার সময়ে স্কুল লাইব্রেরি থেকে পুরনো আমলের অতিকায় বাংলা অভিধান থেকে এগুলোর অর্থ ও ব্যুৎপত্তি পেয়ে গেছেন এবং সন্তুষ্ট হয়েছেন।

    কয়েকদিন আগে জগাখিচুড়ির পাল্লায় পড়েন হরেনবাবু। অথচ জগাখিচুড়ির ব্যাপারটা খুব সহজে সমাধান হয়েছিল।

    জগাখিচুড়ি হাসির গল্পের পাঁচ নম্বর লেখক গয়ারাম দাসের আশু প্রকাশিতব্য গল্প সংকলন। হাসির গল্পের লেখকদের নম্বর ফুটবলের নম্বরের মতো। যত বড় লেখা তত বেশি নম্বর, পাঁচ হল সবচেয়ে বড় নম্বর।

    জগাখিচুড়ি বইটার প্রুফ হাতে পেয়ে গয়ারামবাবুকে পাড়ার বুথ থেকে ফোন করেছিলেন হরেনবাবু। গয়ারাম তার পুরনো বন্ধু, এক সময়ে কলাখোঁপা ইস্কুলে তিনি ড্রিল মাস্টার ছিলেন। সেই সঙ্গে সংস্কৃতের সেকেন্ড পণ্ডিত। সংস্কৃত উঠে গেল, ড্রিল উঠে গেল! গয়ারাম মনের দুঃখে মাস্টারি ছেড়ে হাসির গল্প লিখতে লাগলেন।

    গয়ারামের সঙ্গে হরেনবাবুর বন্ধুত্ব আজও ছিন্ন হয়নি। গত বছরই গয়ারামের মেয়ের বিয়েতে তিনি নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছেন। গয়ারামকে ফোন করা মাত্র তিনি হরেনবাবুকে জগাখিচুড়ির বৃত্তান্ত সংক্ষিপ্ত করে ফোনেই শোনালেন।

    জগা নামে এক পাগল থাকত কালীঘাট মন্দিরের চত্বরে। তার হাবভাব পাগলদের মধ্যেও ছিল অতি অস্বাভাবিক। কোমরে খুপরির তলোয়ার, হাতে বাঁশের তির ধনুক, কপালে কাঁঠালপাতার মুকুট–সে সবসময় বীর রাজার বেশে থাকত। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলা কালীঘাট বাজারের সবজি আর মুদি দোকানিদের কাছ থেকে অল্প করে সবজি-চাল-ডাল-নুন-মশলা চেয়ে নিত। ভাল খারাপ নানারকম চাল, মুগ-মসুর-ছোলা সব রকম ডাল, কচু থেকে কাঁচকলা, ফাটা আলু, শুকনো বেগুন যে যা দিত–তাই জগা নিয়ে ঝুলিতে ভরত। তারপর রাতে ইটের উনুনে বিরাট মাটির হাঁড়িতে সব মিলিয়ে খিচুড়ি রান্না হত। সেই খিচুড়ি মন্দিরের সব ভিখিরির সঙ্গে ভাল করে জগা খেত।

    সেই থেকে জগাখিচুড়ি। জগাখিচুড়ি নাকি ছিল অতি উপাদেয়। গয়ারাম আরও বলেছিলেন যে ওই জগা ছিল সাধুপুরুষ, নিজের মৃত্যুর কথা সে বুঝতে পারে। সেদিন রাতে জগাখিচুড়ি বেঁধে সবাইকে খাইয়ে সে মন্দিরের সামনে কাঠের তলোয়ার নিয়ে একা একা লড়াই শুরু করে আর গলা খুলে গান গাইতে থাকে–

    যম জিনিতে যায় রে জগা
    যম জিনিতে যায়।

    সেই রাতেই জগা মৃত্যুবরণ করে।

    জগাখিচুড়ির কাহিনি শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন হরেনবাবু। সামান্য একটা চালু কথার পিছনে কত বড় গল্প। সেই থেকে তার আরও ঝোঁক বেড়ে গেছে সব গোলমেলে শব্দের মর্মার্থ জানার।

    অবশ্য ন্যালাখ্যাপা শব্দটা এরপর প্রায় ঘাড়ের থেকে নামিয়ে দিয়েছেন হরেনবাবু। ধরে নিয়েছেন ওটাও ওই জগাখিচুড়ির মতো ন্যালা নামে কোনও খ্যাপার ব্যাপার।

    কিন্তু এখন হন্তদন্ত ঘাড়ে ভূতের মতন চেপেছে। হরেনবাবু কলাখোঁপা ইস্কুলে গিয়ে সুবল চন্দ্র মিত্রের বাঙ্গালা অভিধান খুঁজে এসেছেন। সেখানে হন্তদন্ত নেই। ভুতোবাবুর কাছে জিজ্ঞাসা করেও কোনও লাভ নেই। তা ছাড়া আগেই বলেছি, তার ওপরে এখন আর হরেনবাবুর বিশ্বাসই নেই। অবশ্য কবি মোজাম্মেল হককে গিয়ে ধরা যেতে পারে। কিন্তু হয়তো দেখা যাবে, সে ছোকরাও কিছু জানে না। তার কবিতাগুলোর প্রুফ দেখার সময়েই হরেনবাবুর মনে হয়েছিল এই ব্যক্তি অনেক কিছু না বুঝে অনুমানে লিখেছে।

    দিশেহারা হয়ে গেছেন হরেনবাবু। এই অবস্থায় একদিন অন্যমনস্কভাবে পথ চলতে গিয়ে একটা ইটে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন হরেনবাবু। পথের লোকজন তাকে টেনে তুলে পাশের ডাক্তারখানায় নিয়ে গেল।

    পাড়ার মধ্যেই, ডাক্তারবাবু চেনা। তিনি ভাল করে দেখলেন। সামনের একটা দাঁত ভেঙে গেছে, আর ঠোঁটটা একটু কেটে গেছে। ওষুধপত্র দেওয়া হল।

    ডাক্তারবাবু বললেন, আমি আপনাকে মাঝেমধ্যেই দেখি, রাস্তা দিয়ে এমন অন্যমনস্ক চলাফেরা করেন। সর্বক্ষণ এত কী ভাবেন মশায়?

    ভাঙা দাঁতের গোড়ায় জিব বুলিয়ে হরেনবাবু বললেন, একটা শব্দের মানে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।

    ডাক্তারবাবু বললেন, শব্দের মানে নিয়ে চিন্তা? কী সে শব্দ?

    হরেনবাবু বললেন, হন্তদন্ত।

    ডাক্তারবাবু বললেন, এই শব্দ নিয়ে এত মাথাব্যথা? আপনি নিজেই এখন হন্ত দন্ত। হন্ত মানে হত, দন্ত মানে দাঁত, পুরো মানে আপনার দাঁত হত হয়েছে।

    হরেনবাবু অবাক। ডাক্তারবাবু কত সহজে শব্দটার মানে ধরতে পেরেছেন। ফাটা ঠোঁট আর ভাঙা দাঁতের দুঃখ ভুলে নিশ্চিন্ত মনে তিনি বাড়ি রওনা হলেন।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57 58 59 60 61 62 63 64 65 66 67 68 69 70 71 72 73 74 75 76 77 78 79 80 81 82 83 84 85 86 87 88 89 90 91 92 93 94 95 96 97 98 99 100 101 102 103 104 105 106 107 108 109 110 111 112 113 114 115 116 117 118 119 120 121 122 123 124 125 126
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleখাজুরাহ সুন্দরী
    Next Article কীর্তিহাটের কড়চা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাপদ রায়

    রম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়

    August 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.