সাইলাস মারনার – ৫
পাঁচ
ডানস্ট্যান যখন কুটির ছেড়ে বেরল সাইলাস তখন মাত্র শ’ খানেক গজ দূরে। গ্রাম থেকে ফিরছিল সে। কাঁধে একটা বস্তা নিয়ে হাঁটছিল সাইলাস। তার হাতে ছিল প্রদীপ। গ্রাম থেকে সুতো কিনে আনার জন্যে গিয়েছিল ও। কাল দরকার পড়বে। বাড়ির উষ্ণতায় ফেরার জন্যে মনটা আকুল হয়ে রয়েছে তার।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকল সাইলাস। তার দুর্বল দৃষ্টি নজর করতে পারল না কোন অসঙ্গতি। বস্তাটা নামিয়ে রাখল সে। প্রদীপটা রাখল এক কোণে। একাজগুলো করার ফলে তার পায়ের ছাপ ঢেকে দিল ডানস্ট্যানের পদচিহ্ন। চুলার পাশে উত্তাপের জন্যে বসল সে। বেশ আরাম বোধ করছে এখন। মাংসের টুকরোটাও সেঁকা হয়ে এসেছে প্রায়। কিন্তু সাইলাসের মন ছটফট করতে লাগল। স্বর্ণমুদ্রাগুলো না দেখা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছে না সে। খাবার টেবিলে ওগুলো ছড়িয়ে বসে খেতে কী ভালই না লাগবে!
প্রদীপটা নিয়ে যন্ত্রের কাছে গেল সাইলাস। বালি সরিয়ে ইঁটগুলো তুলে ফেলল। গর্ত খালি! না, এ কিছুতেই হতে পারে না। নিশ্চয়ই ভুল দেখছে সে। কাঁপা হাতে গর্তের ভেতর হাত বোলাল সাইলাস। গতটা সত্যিই ফাঁকা। গাছের পাতার মত কাঁপতে লাগল সে। মনে করার চেষ্টা করল, অন্য কোথাও মুদ্রাগুলো রেখেছে কিনা। কোথায় রেখেছে? টেবিলে? উঁহু, খাটের নিচে? নাহ্। সবখানেই খুঁজল বেচারা, ঘরের কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না ব্যাগ দুটো। অবশেষে মাথা পরিষ্কার হল সাইলাসের। কি ঘটেছে বুঝতে পেরে চিৎকার করে উঠল সে। তারপর পাগলের মত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল।
তীরের ফলার মত সারা গায়ে বিধছে বৃষ্টির ফোঁটা। বার কয়েক মাটিতে আছাড় খেল সে, কিন্তু কোনদিকে হুঁশ নেই তার। সোজা চলে এল রেইনবো সরাইখানায়। সে জানে এখানে পাওয়া যাবে গ্রামের মাথাদের। তাঁদেরকে সব খুলে বলবে সে। সাহায্য চাইবে। তাঁরা নিশ্চয়ই টাকা ফিরে পেতে সাহায্য করবেন তাকে।
ছয়
গ্রামের মান্যগণ্য সকলেই উপস্থিত ছিলেন সরাইখানায়। বৃষ্টির দিন পেয়ে ভূত-প্রেত নিয়ে জমিয়ে গল্প গুজব করছিলেন তাঁরা। এসময় আচমকা খুলে গেল দরজা। বলতে না বলতেই ভূত এসে দরজায় দাঁড়াল নাকি? সাইলাসের একহারা শরীরটা দেখে ভূত ঠাওরেছিলেন তাঁরা। মলিন দেখাচ্ছে তার চেহারা। ভাবলেশহীন চোখে তাঁদের দিকে চেয়ে রইল সে।
নীরবতা নেমে এল ঘরে। ভয় পেয়েছেন সকলে। অবশেষে মুখ খুললেন মিস্টার স্নেল। এ সরাইখানার মালিক।
‘কি ব্যাপার, মিস্টার মারনার? কি হয়েছে?
‘চোর!’ অতিকষ্টে বলল সাইলাস, ‘চোর! আমার সব সোনা নিয়ে গেছে। পুলিশ স্কয়্যার…
আর বলতে পারল না সে। পড়ে যাওয়ার দশা হল তার।
‘ওকে ধর, জেম রডনি,’ চিৎকার করে বললেন মিস্টার স্নেল।
‘তুমি ধর,’ ভয় পেয়ে বলে উঠল জেম। জেমের দিকে ফিরল সাইলাস। লোকটা চুরি করে খরগোশ মারে।
‘জেম, আমার টাকা নিয়েছ তুমি? কিচ্ছু বলব না আমি। দিয়ে দাও। তোমাকে…তোমাকে একটা মোহর বকশিস দেব।’
‘কি?’ খেপে উঠল জেম। ভয়-ডর পালিয়েছে তার। ‘তুমি বলতে চাও আমি চোর? আমি তোমার টাকা চুরি করেছি?’ রাগের চোটে হাতের গ্লাসটা সে সাইলাসের গায়ে ছুঁড়ে মারে আরকি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করলেন স্নেল। সাইলাসের গা থেকে ভেজা কোটটা খুললেন তিনি। তাকে বসিয়ে দিলেন একটা চেয়ারে, ফায়ারপ্লেসের পাশে। ‘না জেনে কাউকে দোষ দেয়া ঠিক নয়। খুলে বলুন তো কী হয়েছে,’ নরম গলায় বললেন তিনি।
সব ঘটনা বলল সাইলাস। সকলেই বিশ্বাস করলেন তার কথা, দুঃখ প্রকাশ করলেন। এই প্রথম তাঁরা উপলব্ধি করলেন, সাইলাস মারনার তাঁদের মতই সাধারণ একজন মানুষ।
স্নেল হাত রাখলেন সাইলাসের কাঁধে। ‘আমরা আপনার পাশে আছি, মিস্টার মারনার। জেম রডনি কিন্তু নির্দোষ। সারা সন্ধ্যাটা সে এখানেই কাটিয়েছে।
‘জেম,’ বলল সাইলাস, ‘ভুল হয়ে গেছে, ভাই, মাফ করে দিয়ো। কারও প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার।’ হাত জোড়া মাথায় রাখল সে। ‘আমি জানতে চাই…শুধু জানতে চাই আমার টাকা গেল কোথায়….
‘কত টাকা ছিল, মিস্টার মারনার?’ গ্রামের দরজি জিজ্ঞেস করল।
‘দু’শো বাহাত্তর পাউণ্ড, বারো শিলিং, • ছয় পেন্স। কাল রাতে গুনেছি।’
‘খুব বেশি ভারী নয় তাহলে। কেউ ঘরে ঢুকে নিয়ে গেছে। নিশ্চয়ই চোরের পায়ের ছাপ রয়েছে, আপনি দেখতে পাননি। চলুন, পুলিশ নিয়ে আপনার বাড়ি যাব। তন্ন তন্ন করে খুঁজলে নিশ্চয়ই কোন সূত্র পাওয়া যাবে।
স্নেল দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিলেন বাইরে। ‘বৃষ্টি পড়ছে।’
‘পড়ক। আমরা যাব’ বলল দরজি।
‘আমিও যাব,’ দাঁড়িয়ে পড়ল জেম রডনি।
সাইলাসকে ধরে দাঁড় করালেন স্নেল। নিজের একটা কোট পরতে দিলেন। হতাশ ভঙ্গিতে সবার দিকে একবার চাইল সাইলাস। তারপর দুই সঙ্গীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল বৃষ্টির মধ্যে।
সাত
পরদিন সকালে গ্রামের সবার মুখে মুখে ফিরল চুরির কথা। কেউ কেউ বলল সাইলাস পাগল; তার কথা বিশ্বাস করা যায় না। তবে বেশিরভাগ লোকই ওর দুর্দশায় দুঃখ পেল।
স্নেলের ধারণা; চোর হচ্ছে এক ফেরিঅলা। ‘কাল এসেছিল এখানে। বদমাশের মত দেখতে। সাইলাসের বাড়িতেও গিয়েছিল বলে,’ সরাইখানায় উপস্থিত সকলকে বললেন তিনি।
‘ব্যাটা বোধহয় লুকিয়ে বসে ছিল সাইলাসের বাড়ির কাছে। অপেক্ষা করছিল। বেচারা দেখতে পায়নি। যেই বেরিয়েছে ঘর থেকে অমনি ব্যাটা সব গায়েব করে দিয়েছে,’ বলল একজন। অন্যেরা সায় দিল তার কথায়।
পুলিশ বহু খুঁজেও সেই ফেরিঅলার পাত্তা পেল না। সে কোথায় ফেরি করতে চলে গেছে কে জানে।
.
ওদিকে গডফ্রেও নিজের জ্বালায় অস্থির। ডানস্ট্যান বাড়ি ফেরেনি। গেল কোথায়? ওয়াইল্ডফায়ার কেইবা কোথায় নিয়ে গেল? ‘ডানস্ট্যান হয়ত ঘোড়াসুদ্ধ বিপদে পড়েছে,’ ভাবল সে। নাকি বেচে দিয়েছে? যদি তাই হয় তাহলে এত সহজে আর এ মুখো হচ্ছে না সে। সব টাকা খুইয়ে তবে ফিরবে। ইস্! কী বোকামি যে করেছি! ওকে ঘোড়াটা দেয়াই উচিত হয়নি।’
ঘোড়া নিয়ে বেথারলির দিকে রওনা দিল গডফ্রে। সম্পূর্ণ মনের বিরুদ্ধে, কারণ মলি ফ্যারেন ওখানেই থাকে। ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যাক সেটা কিছুতেই চায় না গডফ্রে। কিন্তু ঘোড়ার খবর পাওয়া যেতে পারে ব্রাইসের কাছে। বেথারলিতেই ওর বাড়ি। সুতরাং বাধ্য হয়েই যেতে হচ্ছে তাকে। ব্রাইসের সঙ্গে পথেই দেখা হল তার।
‘তোমার ভাইয়ের কপাল খারাপ,’ ওকে দেখে বলল ব্রাইস।
‘তার মানে?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করল গডফ্রে।
‘ও কিছু বলেনি তোমাকে?’ অবাক হয়ে গেছে ব্রাইস।
‘ও তো এখনও বাড়িতেই ফেরেনি।’
‘ওয়াইল্ডফায়ারের দাম বলেছিলাম একশো-বিশ পাউণ্ড। কিন্তু রেস খেলতে গিয়ে…’
‘ওয়াইল্ডফায়ারের হাঁটু ভেঙেছে! জানতাম এমন একটা কিছু হবে! প্রায় চেঁচিয়ে উঠল গডফ্রে!
‘তারচেয়েও খারাপ,’ বলল ব্রাইস। ‘মারা গেছে ঘোড়াটা। তোমার ভাই ফেরেনি এখনও?’
‘না, ঘটে বুদ্ধি থাকলে ফিরবেও না। আমার ঘোড়া মেরে ফেলেছে…
‘তোমার ঘোড়া?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল ব্রাইস। ‘তারমানে মিথ্যে বলেছে ও। তোমার অনুমতি ছাড়াই বেচে দিচ্ছিল আমার কাছে।’
‘না, আমার অনুমতি ছিল।’
‘তাই বল,’ বলল ব্রাইস। ‘তাহলে বাড়ি ফিরল না কেন?’
‘সেটাই তো ভাবছি,’ বলল গডফ্রে। এমুহূর্তে ছোট ভাইয়ের জন্যে চিন্তা হচ্ছে তার। ‘আমি বাড়ি ফিরব। যাবে নাকি ওদিকে?
মাথা নাড়ল ব্রাইস। গডফ্রের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ার মুখ ঘোরাল বাড়ির দিকে।
ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোল গডফ্রে। চিন্তামগ্ন। ফাউলারের ভাড়ার ব্যাপারটা বলে দিতে হবে বাবাকে। সে মনস্থির করে ফেলল আগামীকাল সকালে জানাবে সব কিছু। মলির কথাও গোপন করবে না। বেশি দেরি করলে মলি নিজেই এসে ফাঁস করে দেবে সব। জেনে যাবে সবাই। বাবা দেবেন তাড়িয়ে। চিরদিনের মত হারাতে হবে ন্যান্সিকে। এটা কিছুতেই হতে দিতে পারে না সে।
আট
পরদিন সকাল সকাল নাস্তা সারল গডফ্রে। তারপর বাবার ঘুম থেকে ওঠার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। স্কয়্যার কাস ঘুম ভেঙে দেখেন ছেলে বসে রয়েছে। কারণ জিজ্ঞেস করতে গডফ্রে বলল, ‘কিছু কথা ছিল।’
‘ও, টাকা চাই?’
‘আসলে ওয়াইল্ডফায়ারের কথা…কপালটাই খারাপ…’
‘ঘোড়াটার হাঁটু ভেঙেছে, এই তো?’ প্রশ্ন করলেন স্কয়্যার, ‘চিকিৎসার টাকা লাগবে। উঁহুঁ, টাকা-পয়সা হবে না। লোকে ভাড়া দেয়নি এখনও। ফাউলার গতমাসে বলেছিল একশো পাউণ্ড দেবে। কিসের কী, এক পেনিও দেয়নি। ওকে বার করে দেব আমি। আজই।
‘ফাউলারের ব্যাপারেও কথা আছে,’ দুর্বল কণ্ঠে বলল গডফ্রে। ওয়াইল্ডফায়ারকে বেচতে পারলে ফাউলারের ভাড়াটা মিটিয়ে দিতে পারতাম।’
‘তুমি! ফাউলারের ভাড়া মেটাবে! কি বলছ এসব! পাগল হয়ে গেলে নাকি?
‘ফাউলার ঠিকমতই ভাড়া দিয়েছিল। ওর কোন দোষ নেই। টাকাটা আমি…মানে…ডানস্ট্যানকে দিয়েছিলাম।’
স্কয়্যারের লাল মুখ আরও লাল হল একথা শুনে। টাকা পেয়েও দাওনি আমাকে! বলেছ ফাউলার ভাড়া দেয়নি। এসব মিথ্যে কথার কারণ কী? তুমিও চুরি বিদ্যা শিখে গেছ?’ শ্বাস নেয়ার জন্যে থামলেন স্কয়্যার। ‘ডানস্ট্যান কোথায়? ওকে এক্ষুণি এখানে ডেকে নিয়ে এস।’
‘ও এখনও ফেরেনি, স্যার।’
‘কেন? ঘোড়া থেকে পড়ে ব্যথা পেয়েছে?’
‘না, স্যার। কিন্তু দুর্ঘটনার পর থেকে ওকে আর দেখা যায়নি।’
‘তবে তোমাকেই জবাবদিহি করতে হবে,’ ক্রুদ্ধস্বরে বললেন স্কয়্যার। ‘ওকে টাকা দিতে গেলে কেন? বল।’ ডান হাতের মুঠি সজোরে টেবিলে বসালেন তিনি।
‘আমি…আমি জানি না কেন দিয়েছি।’
‘জান না? ফাজলামির আর জায়গা পাও না? টাকা খাইয়ে ওর মুখ বন্ধ রাখছ, তাই না?’
গডফ্রে কিছু না বললেও তার চেহারায় ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। বাবা কি জেনে ফেলেছেন? হালকাভাবে বলতে চেষ্টা করল সে, ‘আসলে তেমন কিছুই না…কেবল এক যুবকের বোকামি…’
‘আর কত বোকামি করবে! ছেলেমানুষ তো নও। অপদার্থের মত ঘুরে না বেড়িয়ে এবার কিছু একটা করার চেষ্টা কর।’
‘ফার্মের কাজে সব সময়ই সাহায্য করতে চেয়েছি আপনাকে। আপনি নেননি।’
‘নেব কেন? তোমার ওপর আস্থা নেই আমার,’ বললেন স্কয়্যার। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, ‘বিয়ে করছ না কেন? ল্যামেটারের মেয়েকে পছন্দ করতে না তুমি? কি হয়েছে? ও ফিরিয়ে দিয়েছে তোমাকে?’
‘তা নয়, তবে ফিরিয়ে দেবে,’ মাথা নিচু করে বলল গডফ্রে।
‘কেন? ওকে প্রস্তাব দিয়ে দেখেছ?’
‘না, স্যার।’
‘ওর বাবাকে বলব আমি। আমাকে ফেরাতে পারবে না সে।’
‘প্লীজ, স্যার, ওটা করতে যাবেন না, অনুনয় করল গডফ্রে। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখ। ‘আমি নিজেই মেয়েটিকে প্রস্তাব দেব।’
‘তবে জলদি কর। আর নিজেকে ওর জন্যে তৈরি করে নাও।’ এক মুহূর্তের জন্যে থামলেন স্কয়্যার। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘ডানস্ট্যানের ঘোড়া বেচে টাকাটা আমাকে দেবে। আর দেখা হলে বলবে এ বাড়িতে ওর আর ফেরার দরকার নেই। নিজে রোজগার করে খেতে শিখুক।’ রাগে অগ্নিশর্মা স্কয়্যার উঠে পড়লেন টেবিল ছেড়ে। তারপর গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
লজ্জায় নুয়ে পড়ল গডফ্রে। নিজের চোখেই ছোট হয়ে গেছে সে। কাপুরুষ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না নিজেকে। বাবাকে মলি ফ্যারেনের কথা বলার সৎ সাহসটুকুও নেই তার। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মত নতুন উদ্বেগ এসে আবার ভর করেছে মনে। বাবা যদি ন্যান্সির বাবার সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে সত্যিই কথা বলেন, তবে? কী করবে তখন সে? কিছুই করতে পারবে না, এক অপেক্ষা করা ছাড়া। নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটবে। হয়ত মারাও যেতে পারে মলি। ইদানীং অসুস্থতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে তার। আফিম নিতে শুরু করেছে সে। খুব বেশিদিন আর নেই ও। এমনিতরো হাজারো কুচিন্তা ভিড় জমাল গডফ্রের মনে।
নয়
পেরিয়ে গেল কয়েক সপ্তাহ। চোর ধরা পড়ল না। ডানস্ট্যানেরও কোন খবর নেই। অবশ্য সকলের ধারণা ডানস্ট্যান নিজেই বাড়ি ছেড়েছে। এর আগেও পালিয়েছে বহুবার। টাকার দরকার পড়তে সুড়সুড় করে ফিরে এসেছে আবার।
ডানস্ট্যান চোর এটা কারও মাথাতেই এল না। কাস পরিবার এ গ্রামের গর্ব। সবাই শ্রদ্ধা করে তাদের, সমীহ করে। সে-বাড়ির ছেলে চোর হবে কিভাবে!
বড়দিনের আর বেশি বাকি নেই। বছরের সেরা উৎসবের জন্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে লোকজন। ফলে ডানস্ট্যানের প্রসঙ্গ ধামাচাপা পড়ে গেল।
বড়দিন নিয়ে সাইলাসের কোন মাথাব্যথা নেই। তার একমাত্র আনন্দ ছিল তার মুদ্রাগুলো। সেগুলোই নেই যখন, তখন আর রইল কী, দুঃখ আর বেদনা ছাড়া? কিন্তু এখনও কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে সে। যদিও মন তার পড়ে রয়েছে চুরি যাওয়া টাকার ওপর। ‘যত কষ্টই করি না কেন ঐ পরিমাণ সোনা আর কোনদিন জমাতে পারব না!’ মাঝে মাঝেই রাতে কাজ শেষে বসে থাকে সে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।
সাইলাসের প্রতি গ্রামের সকলেই এখন সহানুভূতিশীল। আগে তাদের ধারণা ছিল সাইলাস চতুর লোক, অসৎ। আর এখন তারা মনে করছে লোকটা বোকা, নইলে কারও জমানো টাকা চুরি যায়? বড়দিনের আগে অনেকেই উপহার সামগ্রী আর খাবার পাঠাল সাইলাসকে। দেখা হলে কুশল জিজ্ঞেস করল। বাড়ি এসে সান্ত্বনা দিয়ে গেল। কিন্তু সাইলাসের কোন উপকার তাতে হল না। স্বর্ণমুদ্রাগুলোর কথা কিছুতেই ভুলতে পারল না সে।
সাইলাসের কুটিরে সবার আগে এলেন মিসেস ডলি উইনথ্রপ, দয়ালু মহিলা, সহমর্মী। প্রতিবেশীর বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রবিবারের এক সকালে এলেন তিনি। সাইলাস তখন তার তাঁত নিয়ে ব্যস্ত। ভদ্রমহিলা সঙ্গে করে তাঁর ছোট ছেলে অ্যারনকে নিয়ে এসেছেন। অ্যারন এই অদ্ভুত লোকটিকে অসম্ভব ভয় পায়। সে আড়াল নিল মায়ের পেছনে।
‘মিস্টার মারনার,’ বললেন ডলি, ‘আপনার জন্যে ক’টা কেক এনেছি।’
তাঁকে ধন্যবাদ জানাল সাইলাস।
‘বড়দিন তো এসে গেল,’ মৃদু হেসে বললেন ডলি।
‘আজ সকালে গির্জার ঘণ্টা শোনেননি?’
‘হ্যাঁ, শুনেছি,’ জবাব দিল সাইলাস। ‘গির্জায় যাই না আমি।
‘জানি, কিন্তু গেলে শান্তি পেতেন,’ বললেন ডলি। ‘আমি পাই। ঈশ্বরের কাছে কিছু চাইলে তিনি বান্দাকে ফেরান না।’
সাইলাস কোন কথা বলল না। মনে মনে ভদ্রমহিলার কথার বিরুদ্ধাচরণ করল সে।
এ মুহূর্তে অ্যারনের ভয় অনেকখানি কেটেছে। মায়ের চেয়ারের আড়াল থেকে গুটিগুটি বেরিয়ে এল সে। ওর দিকে এক টুকরো কেক এগিয়ে দিল সাইলাস। দৌড়ে আবার মায়ের কাছে ফিরে গেল অ্যারন। তবে হাতটা বাড়িয়ে রাখল, কেক চাই তার।
‘ছি অ্যারন! উনি তোমাকে ছোঁচা ভাববেন না?’ ধমক দিলেন ভদ্রমহিলা। তারপর সাইলাসের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ও খেতে বড় ভালবাসে। ছোট মানুষ তো!’ অ্যারনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ওর গলাটা ভারি মিষ্টি। চট জলদি সব কিছু শিখে ফেলে। ওর বাপের কাছ থেকে বড়দিনের একটা গান শিখেছে, শুনবেন?’
মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সাইলাস। মুখে হাসি ফোটাতে চেষ্টা করল।
‘অ্যারন, দাঁড়িয়ে শুরু করে দাও,’ ওর মা বললেন।
মায়ের কাঁধে মুখ লুকাল অ্যারন।
‘অ্যারন, গাও সোনামণি। মিস্টার মারনার তোমার গান শুনতে চাইছেন।’
এবার টেবিলের পেছনে চলে গেল ছেলেটি। দাঁড়াল, কেবল মাথাটা দেখা যাচ্ছে তার। তারপর সুরেলা গলায় গানটা গাইল।
‘দারুণ না?’ জিজ্ঞেস করলেন ডলি।
‘হ্যাঁ,’ সাইলাস জবাব দিল। ভদ্রমহিলাকে খুশি করার জন্যেই কথাটা বলল সে।
‘বড়দিনে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে গির্জায় গাইবে ও। আপনি আসবেন। আপনার ভাল লাগবে।’
সাইলাস আর এক টুকরো কেক বাড়িয়ে দিল অ্যারনের দিকে।
‘প্লীজ, দেবেন না, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন ডলি। ‘আমরা এখন চলি। আপনার যে-কোন প্রয়োজনে ডাকবেন, আসব। কিন্তু দয়া করে রবিবার কাজ করবেন না, শরীর-মন খারাপ হবে।’
ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ জানাল সাইলাস। কিন্তু তিনি চলে গেলে খুশি হল সে। একা থাকতে চায় ও, কাজ করতে চায়।
সাইলাস ছাড়া আর সকলেই বড়দিনে গির্জায় গেল। সেখান থেকে ফিরে যে যার মত মেতে উঠল উৎসবে। সাইলাস বাড়িতে বসে রইল। ডিনারের জন্যে বেশ খানিকটা মাংস পেয়েছে সে। উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে ল্যামেটার পরিবার। বিষণ্ন মনে তাই খেল সাইলাস।
ওদিকে ‘রেড হাউস’-এ সেদিন পার্টি হল। সবাই উপভোগ করল। ডানস্ট্যান কেবল অনুপস্থিত। কিন্তু তার কথা মনে করল না কেউই।
বড়দিনের পর নববর্ষের জন্যে সাজসাজ রব পড়ে গেল। নববর্ষের আগের দিন সন্ধ্যায় স্কয়্যার কাসের বাড়িতে নাচের পার্টি হবে। কাস পরিবারের বন্ধুরা তাতে আমন্ত্রিত। ন্যান্সি ল্যামেটারও আসবে। সে দিনটির জন্যে আকুল হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল গডফ্রে। ন্যান্সির সঙ্গে নাচবে সে! ন্যান্সির সঙ্গ উপভোগ করবে!
