সাইলাস মারনার – ১০
দশ
স্কয়্যারের বাসায় দারুণ জমল সেদিন। পেটপুরে খেল প্রত্যেকে। ডিনারের পর শুরু হল নাচ। ন্যান্সির সঙ্গে কয়েক দফা নাচল গডফ্রে। ভাবভঙ্গিতে বুঝল মেয়েটি ওকে এখনও ভালবাসে। আনন্দে ভরে উঠল ওর বুক। ভুলে গেল স্ত্রীর কথা।
মলি ফ্যারেন কিন্তু ভোলেনি গডফ্রেকে। স্কয়্যারদের পার্টির কথা সে-ও শুনেছে। তিক্ততায় ছেয়ে রয়েছে তার মন। ‘গডফ্রে ওখানে মেয়েদের সঙ্গে নাচছে…আর আমি? একা পড়ে রয়েছি,’ ভাবল সে। মনে পড়ল, গডফ্রে বলেছে মরে গেলেও স্কয়্যার কাসকে কিছু জানাবে না। ওকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। কথাটা মনে হতেই রেগে উঠল মলি। ‘ঠিক আছে। আমিও দেখে নেব। নাচের পার্টিতে যাব আমি। গডফ্রের বান্ধবীরা দেখুক আমাকে কী অবস্থায় রেখেছে সে। স্কয়্যার দেখুক তার ছেলের বউ আর নাতনীকে। আমার নোংরা কাপড় দেখে সবার সামনে লজ্জা পাক ওরা। আমাকে শেষ করে দিয়েছে বদমাশটা!’
নববর্ষের আগের রাত। বেথারলি থেকে রওনা দিল মলি। কোলে তার সন্তান। তুষার পড়ছে। তারই মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছে সে। দু’বছর বয়েস ওর মেয়ের। ঘুমন্ত মেয়েটিকে বয়ে নিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে অসুস্থ মলির। খানিক বাদেই কাহিল হয়ে পড়ল সে। থেমে দাঁড়াল। বেশ খানিকটা আফিম গিলে রওনা দিল আবার। কিন্তু বেশিদূর আর যাওয়া হল না। নেশা ধরে গেছে তার, বড্ড ঘুম পাচ্ছে। ঘুমোবে সে এখন।
বাচ্চার কথা ভুলে, সবকিছু ভুলে পুরু তুষারের ওপরই শুয়ে পড়ল মলি। আহ্, কী নরম! একটা ঝোপে মাথা রাখল সে। নিথর শুয়ে রইল। কোলের বাচ্চা কোলেই রইল। তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বাচ্চাটি।
গাঢ় ঘুম পাচ্ছে মলির। শিথিল হল তার হাতজোড়া। মায়ের কাছ ছাড়া হল বাচ্চা। তুষার পড়তেই ঘুম ভাঙল তার। ‘মা,’ চেঁচিয়ে উঠল সে, ‘মা।’ কিন্তু জবাব মিলল না।
টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। মাথার ওপর তারারা উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। চারপাশে ঘন, সাদা তুষার। ‘মা,’ আবার চেঁচাল সে। সাড়া দিল না মলি ফ্যারেন।
হঠাৎ বাচ্চাটির চোখে পড়ল উজ্জ্বল আলো-তুষারের ওপর দিয়ে আসছে। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। ভারি ভাল লাগল তার। আলতো পায়ে সেদিকেই এগোল সে। যত এগোচ্ছে তত উজ্জ্বল হচ্ছে আলো। এভাবে সাইলাস মারনারের কুটিরে পৌঁছে গেল সে।
ঘরে ঢুকল বাচ্চাটি। আগুন জ্বলছে চুলায়। ওটার কাছে গেল সে। উত্তাপ লাগছে গায়ে। দারুণ আরাম! ছোট হাত দুটো বাড়িয়ে বসে পড়ল ও। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল নিজেও জানল না।
এগারো
‘সাইলাস মারনার তখন কুটিরে ছিল না। সে গিয়েছিল বাইরে, নববর্ষের ঘণ্টাধ্বনি শোনার জন্যে। তার প্রতিবেশীরা বলেছে: মাঝরাতে ঘণ্টাধ্বনি শুনতে ভুল করবেন না কিন্তু। ওটা শুভ সঙ্কেত, ভাগ্য ফিরিয়ে দেয়। বলা যায় না, আপনার টাকা ফিরেও পেতে পারেন।
ফলে আর দ্বিধা করেনি সাইলাস, মাঝরাতে ঘণ্টাধ্বনি শুনতে ঠিক বেরিয়ে এসেছে। শোনা হয়ে গেলে সে ফিরে চলল কুটিরে। এসময় আবার ঘোরের মধ্যে পড়ল ও। স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইল কুটিরের বাইরে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল জানে না সে। তারপর হুঁশ ফিরতে দেখে ঠাণ্ডা লাগছে। ভেতরে চলে এল তখন।
ঢুকেই অবাক হয়ে গেল সাইলাস। ঘর অন্ধকার। চুলায় কয়েকটা চেলা কাঠ দিয়ে আগুনটা উসকে দিল সে। এবার আলোকিত হয়ে উঠল ঘর। আরে! ফায়ারপ্লেসের সামনে… ওটা কী? সোনা! আবার ফিরে এসেছে তার কাছে; প্রতিবেশীরা তো তাহলে ঠিকই বলেছিল!
ঝুঁকে পড়ল সাইলাস, আরও ভালভাবে দেখার জন্যে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না তার। খাঁটি সোনা! ছোঁয়ার জন্যে দু’হাত বাড়িয়ে দিল সে।
সোনা যদিও তবে এগুলো সোনার মুদ্রা নয়, সোনালি চুল। সাইলাস তার ফিরে পাওয়া সম্পত্তিতে হাত বোলাল।
সাইলাসের একটা ছোট বোন ছিল। বড় আদরের। সে কিশোর বেলার কথা। বেচারী বোনটি শিশুকালেই মারা যায়। এই কি সেই ছোট্ট বোন? নাকি তাকে স্বপ্নে দেখছে সাইলাস? চোখ বুজল সে। কল্পনায় ভেসে উঠল মা-বোনের মুখ, ছেলেবেলার সুখের স্মৃতিগুলো।
হঠাৎ কেঁদে উঠল বাচ্চাটি। ঘুম ভেঙে গেল তার। ডাকতে লাগল, ‘মা, মা,’ করে। হাঁটুর ওপর বসাল ওকে সাইলাস, আদর করল। তারপর খানিকটা দুধ গরম করে খেতে দিল।
সাইলাসের দিকে বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল মেয়েটি, কী নিশ্চাপ সেই দৃষ্টি। খানিক বাদে হাঁটু থেকে নেমে নিজেই ঘরময় হেঁটে বেড়াতে লাগল। ওর পেছন পেছন এল সাইলাস, পড়ে যেতে গেলেই ধরবে। কিন্তু তার দরকার হল না। মেয়েটি বসে পড়ে জুতো খুলতে চেষ্টা করল। পায়ে ব্যথা পাচ্ছে সে। কাজটা করে দিল সাইলাস। ওর দিকে চেয়ে দেবশিশুর মত হাসল মেয়েটি।
ওর ভেজা জুতো জোড়ার দিকে চাইল সাইলাস। কোন সন্দেহ নেই তুষার মাড়িয়ে এসেছে। কে ছিল ওর সাথে? বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে।
নিচু হয়ে মেয়েটির পায়ের ছাপ পরখ করল ও। তারপর ছাপ অনুসরণ করে এগোল। কিছুক্ষণ পরে পৌঁছে গেল কয়েকটা ঝোপ- ঝাড়ের কাছে। ‘মা,’ কেঁদে উঠল মেয়েটি। ঝোপের মধ্যে পড়ে রয়েছে মলি ফ্যারেনের নিষ্প্রাণ দেহ। ইতোমধ্যেই তুষার অনেকখানি ঢেকে দিয়েছে তার শরীর।
বারো
ওদিকে ‘রেড হাউস’-এ তখন সুখের অন্ত নেই। নাচছে সবাই। তাজা বাতাসের জন্যে খুলে রাখা হয়েছে সবগুলো দরজা। দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে চাকর-বাকররা, নাচ দেখছে। গ্রামের অনেকে রয়েছে ওখানে।
এ মুহূর্তে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে গডফ্রে। চোখ তার ন্যান্সির দিকে। নাচছে সে। হঠাৎ হৈ-চৈ শুনে দরজার দিকে তাকাল ও। ওর বাচ্চা না? বুকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাইলাস। নিশ্চিত হওয়ার জন্যে এগিয়ে গেল গডফ্রে। হ্যাঁ, কোন ভুল নেই। ওরই সন্তান!
মারনারকে দেখে বিরক্ত হলেন স্কয়্যার। ‘আপনি এখানে কী চান?’
‘একজন ডাক্তার দরকার, স্যার। এক মহিলা পড়ে রয়েছে তুষারে…মারা গেছে খুব সম্ভব…কূয়ার কাছে।
এগিয়ে এলেন যাজক। ‘শ্শ্, মারনার। আস্তে কথা বলুন। মহিলারা শুনলে ভয় পাবেন। আমি ডাক্তারকে ডেকে আনছি।’
মহিলারা অবশ্য শুনে ফেলেছেন ইতোমধ্যে। তাঁরা বাচ্চাটিকে কাছ থেকে দেখার জন্যে এগিয়ে এলেন। হাসছে শিশুটি। গডফ্রের দিকে ফিরল ন্যান্সি। ‘কার বাচ্চা এটা?’ প্রশ্ন করল সে।
‘কে জানে?’ বলল গডফ্রে। ‘কোন্ মহিলা নাকি পড়ে রয়েছে তুষারে। তারই হবে মনে হয়। ‘
‘বাচ্চাটাকে এখানে রেখে যেতে পারেন,’ সাইলাসকে বললেন এক মহিলা। ‘চাকর-বাকররা দেখে রাখবে।
‘অসম্ভব!’ দ্রুত বলে উঠল সাইলাস। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শিশুটিকে। ‘ও আমার কাছে এসেছে। ওকে আমিই রাখব।’
ডাক্তারকে তাসের আসর থেকে ডেকে আনা হল। স্কয়্যারের সঙ্গে কথা সেরে গডফ্রেকে প্রশ্ন করলেন তিনি, ‘আমাকে একজোড়া উঁচু বুট দিতে পারবে?’ তারপর বললেন, ‘কাউকে বল ডলি উইনথ্রপকে ডেকে আনবে। এখন তাঁকেই প্রয়োজন।’
‘আমি নিজেই যাচ্ছি,’ বলল গড়ফ্রে।
সাইলাস মারনারকে নিয়ে ডাক্তার তক্ষুণি বেরিয়ে গেলেন। গডফ্রেও আর দেরি করল না। সোজা ডলি উইনথ্রপের বাড়িতে চলে গেল সে। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে মারনারের কুটিরের দিকে রওনা দিল। বারবার ওকে ফিরে যেতে বললেন ডলি। বললেন এই ঠাণ্ডার মধ্যে বাইরে থাকলে অসুখ করবে। কিন্তু তাঁর কথা গায়ে মাখল না গডফ্রে।
কুটিরের ভেতর ঢুকলেন ডলি। বাইরে দাঁড়িয়ে রইল গডফ্রে। উদ্বিগ্ন মনে ভাবতে লাগল, ‘মলি কি সত্যিই মারা গেছে? যদি তাই হয় তবে আমি এখন মুক্ত। ন্যান্সিকে বিয়ে করতে আর কোন বাধা রইল না!…বাচ্চাটা রয়েছে যদিও, কিন্তু কেউ জানে না আমি ওর বাবা। আমি ওকে সব ভাবে সাহায্য করব। কিন্তু কখনই ওকে নিজের সন্তান বলে স্বীকার করব না…কিন্তু মলি যদি মরে না গিয়ে থাকে! তখন? আমি শেষ! ও সবাইকে বলে দেবে আসল ঘটনা। বাবা তো খেদাবেই, ন্যান্সিও আর ফিরে চাইবে না।’
কুটির থেকে বেরিয়ে গডফ্রেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন ডাক্তার। অবাক হয়ে গেলেন তিনি। ‘এখানে কী করছ তুমি? বাড়ি চল!’
‘মহিলা…মহিলা কেমন আছে?’ ঢোক গিলে প্রশ্ন করল গডফ্রে।
‘মারা গেছে। আমি আসার আগেই। কিছুই করতে পারলাম না।’
‘মহিলা বয়স্কা?’
‘না, না। একদম অল্পবয়সী, দেখে মনে হল গরীব ঘরের। তবে আঙুলে বিয়ের আঙটি রয়েছে।
‘মহিলাকে দেখতে চাই একবার,’ ডাক্তারকে বলল গডফ্রে। তারপর বলল, ‘আপনি এগোন। আমি আসছি।’
কুটিরে ঢুকল গডফ্রে। হ্যাঁ, মলি ফ্যারেনই শুয়ে রয়েছে। একে দু চোখে দেখতে পারত না সে। ভাল করে মৃতা স্ত্রীকে দেখে নিল গডফ্রে। তারপর সাইলাসের দিকে ফিরল। ওর বাচ্চা কোলে চুলার পাশে বসে রয়েছে সে। ঘুম ঘুম চোখে গডফ্রের দিকে চাইল মেয়েটি, তবে বাপকে চিনতে পারল না। সাইলাসের দিকে চেয়ে হাসল। ছোট্ট একটা হাত বাড়িয়ে কান ধরে টানল।
‘ওকে এতিমখানায় দেবেন নিশ্চয়ই?’ প্রশ্ন করল গডফ্রে। উদাসীনতার অভিনয় করল সে।
‘না, না। ও আমার কাছে থাকবে।’
‘কিন্তু আপনি কি ওকে মানুষ করতে পারবেন? অসুবিধে হবে তো।’
‘হোক,’ পাল্টা বলল সাইলাস। ‘তবু রাখব। ওর মা নেই। বাবা কোথায় আছে কে জানে? দুনিয়ায় আমিও একা। টাকা ছিল তাও গেছে। আমাদের দু’জনের মধ্যে অদ্ভুত মিল…’
‘বেচারী!’ বলল গডফ্রে। ‘ওর নতুন কাপড় দরকার। এটা রাখুন, সাইলাসের হাতে একটা স্বর্ণমুদ্রা ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল সে।
ডাক্তার দাঁড়িয়ে ছিলেন বাইরে। তাঁর কাছে পৌঁছে বলল গডফ্রে, ‘ভেবেছিলাম মহিলাকে হয়ত চিনতে পারব। কিন্তু আগে কখনও দেখিনি একে। বাচ্চাটা খুব সুন্দর, না? মারনার নাকি পালবে ওকে।
‘তাই নাকি?’ উদাসভাবে প্রশ্ন করলেন ডাক্তার। তাঁর মন পড়ে রয়েছে ‘রেড হাউস’-এ।
আর কোন কথা হল না দু’জনার মধ্যে। দ্রুত ফিরে চলল তারা ‘রেড হাউস’-এ। নানা চিন্তা আসছে গডফ্রের মাথায়। ‘বেচারী মলি।’ ভাবল সে। দুঃখ হচ্ছে ওর জন্যে, তবে আনন্দও কম নয়। ন্যান্সিকে বিয়ে করতে বাধা রইল না আর। ‘মলির কথা কেউ জানবে না। ডানস্ট্যান ফিরলে রকবক করতে চাইবে। কিন্তু পয়সা দিলেই সব ঠাণ্ডা। ন্যান্সিকে মলির কথা জানাব না আমি। কেনই বা জানাব? বেচারী দুঃখ পাবে…সাইলাস আমার বাচ্চাটার দেখাশোনা করবে, ওকে সব রকমের সাহায্য দেব। আমার বাচ্চা ভালই থাকবে…’
‘রেড হাউস’-এ ফেরার পথে এসব চিন্তাই এল তার মাথায়।
তেরো
এ ঘটনা নিয়ে লোকে গাল-গল্প জুড়ল। অনেকে বলল সাইলাস বোকামি করেছে। বাচ্চাটাকে তার রাখা উচিত হয়নি। ‘পাগল লোক, বলল তারা। ‘তাছাড়া বয়স্ক মানুষ। বাচ্চা দেখবে কিভাবে?’ তবে বেশিরভাগ লোকই সাইলাসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার মানবতায় মুগ্ধ। অনেকেই, বিশেষ করে মহিলারা বাড়ি এসে ওকে নানা উপদেশ দিয়ে গেল।
তবে বলাই বাহুল্য সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়ালেন মিসেস ডলি উইনথ্রপ। সাইলাস তাঁকে গডফ্রের দেয়া মুদ্রাটা দিতে চাইল। বলল বাচ্চার জন্যে নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিতে।
‘কোন দরকার নেই,’ বললেন ডলি। ‘অ্যারনের গায়ে অনেক কাপড় ছোট হয়ে গেছে। সেগুলো পরতে পারে ও, প্ৰায় নতুনই রয়েছে।
বাচ্চাটিকে গোসল করাতে শুরু করলেন ডলি। কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সাইলাস। ‘কী সুন্দর!’ কোঁকড়া কোঁকড়া সোনালী চুলগুলো ধুয়ে দেয়ার সময় বললেন তিনি। খানিকক্ষণ কী যেন চিন্তা করলেন ভদ্রমহিলা। তারপর বললেন, ‘মিস্টার মারনার, ও প্রথম প্রথম জ্বালাতন করতে পারে। আমি অবশ্য নিয়মিত আসব। আপনাকে সাহায্য করতে।’
‘ধন্যবাদ,’ বলল সাইলাস। ‘আমি ওর সব কাজ নিজেই করতে চাই। আমি চাই ও আমাকে ভালবাসুক। আপনি বরং আমাকে শিখিয়ে দিন কিভাবে কী করতে হয়।‘
‘অবশ্যই,’ ছোট একটা শার্ট তুললেন ডলি। ‘প্রথমে এটা পরাবেন।’
বাচ্চার ওপর ঝুঁকে পড়ল সাইলাস। ভাল করে দেখে নেয়ার জন্যে। ওর দিকে ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দিল মেয়েটি। চুমু খেল গালে।
‘দেখেছেন!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন ডলি। চিনে ফেলেছে আপনাকে। ভালবেসে ফেলেছে। আপনি ওকে কোলে নিয়ে নিজেই কাপড় পরিয়ে দিন।
হাঁটুতে বসাল ওকে সাইলাস। ডলির সাহায্য নিয়ে বাচ্চাকে কাপড় পরাল। শিশুটির জন্যে ভালবাসায় বুক ভরে উঠেছে তাঁর। হ্যাঁ, এই ভালবাসার কাছে টাকা-পয়সা কিছুই না, নস্যি। হঠাৎ নিজেকে অসম্ভব সুখী মনে হল তার। এত সুখ জীবনে পায়নি সে। এই অনুভূতির কোন তুলনা নেই।
‘খুব সহজ না?’ সাইলাস বাচ্চার পোশাক পরানর পর জিজ্ঞেস করলেন ডলি। ও কিন্তু মাঝেমধ্যে দুষ্টুমি করবে, এদিক-সেদিক পালারে, আমি তো চিনি বাচ্চাদের। আস্ত বানর একেকটা।’
এক মুহূর্ত ভাবল সাইলাস। ‘ওকে তাঁত যন্ত্রের সঙ্গে বেঁধে রাখব, যাতে পালাতে না পারে। লম্বা, নরম একটা কাপড় জোগাড় করতে হবে। সর্বক্ষণ নজর বন্দী থাকবে তখন।
‘তা করতে পারেন, বললেন ডলি। ‘অ্যারনের ছোট চেয়ারটা এনে দেব। তাতে বসে থাকবে ও। ইস্, ও যদি আমার মেয়ে হত!’
‘ও আমার,’ দ্রুত বলে উঠল সাইলাস।
‘তা তো অবশ্যই। তবে ওর কিন্তু অনেক কিছু শিখতে হবে। ওকে গির্জায় নিয়ে যাবেন, প্রার্থনা করতে শেখাবেন। আমার অ্যারন যা সুন্দর করে প্রার্থনা করে! আমার তো মনে হয় যেন পাদ্রীই প্রার্থনা করছেন।’
ভদ্রমহিলার কথাগুলো বিশেষ সন্তুষ্ট করতে পারল না সাইলাসকে। চুপ করে রইল সে।
‘আগে দরকার একটা নাম,’ বললেন ডলি। ‘ওকে কি নামে ডাকবেন, ঠিক করেছেন?’
‘আমার মায়ের নাম ছিল হেপজিবাহ,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল সাইলাস। ‘মায়ের নামেই রাখা হয়েছিল ছোট বোনের নাম।
‘নামটা অনেক বড়, কঠিনও,’ মৃদু হেসে বললেন ডলি।
‘আমি বোনকে সব সময় এপি বলে ডাকতাম। একেও তাই ডাকব।’
নামটা ডলিরও পছন্দ হল। বাচ্চাকে নিয়ে গির্জায় গেল সাইলাস। যাজক ওর নাম রাখলেন ‘এপি।’
চোদ্দ
নতুন জীবন শুরু করল সাইলাস। সুখী জীবন। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে লাগল এপি। সর্বক্ষণ হাসি লেগেই রয়েছে তার মুখে। জিভের ডগায় হাজারো প্রশ্ন। সেগুলোর জবাব দিতে দিতে সাইলাস হয়রান।
এপিকে নিয়ে বেড়াতে বেরয় সাইলাস। ওর জন্যে ফুল কুড়িয়ে আনে এপি। ওকে ‘বাবা’ বলে ডাকে। বাপ-বেটিতে মিলে পাখিদের গান শোনে। এত সুখ কখনও পায়নি সাইলাস।
এপির বয়স এখন তিন। অন্য বাচ্চাদের মত মাঝেমধ্যে দুষ্টুমি করে সে-ও। সাইলাসের কথা শোনে না।
‘ওকে শাসন করবেন,’ উপদেশ দেন ডলি উইনথ্রপ। ‘দুষ্টু বাচ্চাদের শাস্তি দিতে হয়। চড়-চাপড় মারতে বাধলে কয়লার চালায় ঢুকিয়ে দেবেন। অ্যারনকে তাই করি আমি। মাত্র এক মিনিটের জন্যে। কালো ভূত হয়ে বেরিয়ে আসে। আর কখনও যেতে চায় না ওখানে। এপিকেও ঢোকাবেন। বাচ্চারা বেয়াদব হয়ে গেলে মুশকিল।’
‘তা ঠিক,’ ভাবল সাইলাস, ‘কিন্তু এপিকে কিছুতেই কষ্ট দিতে পারব না আমি। কিছুতেই না।’
এভাবেই কাটতে লাগল। এপিকে কোনরকম শাসন করে না সাইলাস। কিন্তু করতে হল একদিন।
সেদিন কাজে ব্যস্ত ছিল সাইলাস। এপি কখন যে কাঁচিটা হাতিয়ে নিয়েছে জানে না সে। ওর দিকে পিছন ফিরে বসল এপি। যেন ও কি করছে, সাইলাস দেখতে না পায়। তারপর তাঁতের সঙ্গে বাঁধা কাপড়টা কেটে ফেলল। গুটগুটিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে।
সাইলাস এসবের কিছুই জানল না। সে ভাবল, ‘বাহ্, এপি আজ বড় শান্ত রয়েছে।’ তারপর যেই কাঁচি নেয়ার জন্যে ফিরেছে দেখে এপি হাওয়া! –
ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল সাইলাস। নাম ধরে বহু ডাকল। সাড়া পেল না। ভয়ে তার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড়। কুয়ায় পড়ে যায়নি তো? দৌড়ে গেল সাইলাস। নাহ্। মাঠে গেছে? গেল সাইলাস। সেখানেও নেই। পরের মাঠটাতে পুকুর রয়েছে একটা। ডুবে গেল নাকি? আবার ছুটল সাইলাস।
হ্যাঁ, ঐ তো পুকুরের পাশে বসে রয়েছে এপি, আপন মনেই হাসছে, কথা বলছে। কাদায় দেবে রয়েছে ওর দু’পা। এক হাতে ধরা একপাটি জুতো, পানি ভর্তি। সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে একটা গরু, এই অবুঝ শিশুর কাণ্ড-কারখানা দেখছে।
সাইলাস তড়িঘড়ি ছুটল। ওর কাছে পৌঁছে তুলে নিল কোলে। চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিল ছোট্ট মুখটা। তারপর মেয়েকে কোলে করেই বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। ভাবল সে, ঠিকই বলেছিলেন ডলি উইনথ্রপ। ওকে শাস্তি দিতে হবে। নইলে আবার পালাবে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাই করতে হল সাইলাসকে। এপিকে কয়লার চালায় ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল সে। মুহূর্ত পরেই চিকন গলা শোনা গেল, ‘খোল, খোল।’ সাইলাস বার করে আনল ওকে।
কালো ভূত হয়ে রয়েছে এপি। ওকে গোসল করাল সাইলাস। নতুন কাপড় পরাল। এসব করতে করতেই কারার হয়ে গেল সময়। কাজ মাটি হল। সাইলাস ভাবল, ‘এবার নিশ্চয়ই বুঝবে ও, পালালে শাস্তি পেতে হয়।
এপিকে বেঁধে রাখার ছেঁড়া কাপড়টা তুলে নিল সে। কিভাবে ওটা মেরামত করা যায় ভাবছে ও। তার এই ক্ষণিকের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিল এপি। ছুটে গিয়ে আবার ঢুকে পড়ল কয়লার চালায়। ‘বাবা, দেখ,’ ওখান থেকে চেঁচাল সে। সাইলাস চেয়ে দেখে সারা শরীরে আবার কালি মেখেছে তার মেয়ে।
‘ওতে কাজ হয়নি,’ সাইলাস পরে এক সময় বলল ডলি উইনথ্রপকে। ‘ও ভেবেছে এটা একটা মজার খেলা। ভাবুক, অসুবিধে নেই; এটা তো দুষ্টুমিরই বয়স। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।’
‘হুঁ, বোধহয় তাই,’, বললেন ডলি।
এপিকে বিনা শাস্তিতে মানুষ করতে লাগল সাইলাস। ওর আদর- ভালবাসায় স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে শিখল এপি। সাইলাস যেখানেই যায় মেয়েকেও সঙ্গে নেয়। ফলে খুব শিগগিরই গ্রামের সকলের কাছে পরিচিত এবং প্রিয় হয়ে উঠতে লাগল ওরা দু’জন। এপি আর তার বুড়ো বাপকে সবাই পছন্দ করে এখন।
