সাইলাস মারনার – ১৫
পনেরো
পেরিয়ে গেল ষোলোটি বছর। শরতের এক উজ্জ্বল সকাল। রবিবার। গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। গ্রামের লোক বেরিয়ে আসছে প্রার্থনা শেষে।
বিয়াল্লিশ বছর বয়সের এক লোকও রয়েছে তাদের সঙ্গে। লম্বা। মাথায় সুন্দর চুল। এই লোক হচ্ছে গডফ্রে কাস। তার পাশে রয়েছে এক মহিলা। ন্যান্সি। তার স্ত্রী।
স্কয়্যার কাস মারা গেছেন। তবে ন্যান্সির বাবা-মা বেঁচে রয়েছেন। ডানস্ট্যান আজও নিখোঁজ। এপিকে পাওয়ার পর থেকে নিয়মিত গির্জায় আসে সে।
সাইলাস মারনারও রয়েছে সকলের সঙ্গে। সাদা চুল আর বাঁকা কাঁধে বয়স্ক দেখাচ্ছে তাকে। তবে তার সারা মুখে ছড়িয়ে রয়েছে স্বর্গীয় সুখ। সবার সঙ্গে হেসে কথা বলছে সে। দেখে বোঝা যায় সুখী একজন মানুষ। এপি এখন আঠারো বছরের সুন্দরী তরুণী। সাইলাস আর তার পিছে হাঁটছে সুদর্শন এক যুবক। পরনে সুট। অ্যারন উইনথ্রপ। এপির কথা ভাবছে সে। সবসময়ই ভাবে, ওকে ভালবাসে অ্যারন, বিয়ে করতে চায়।
‘বাবা,’ ডাকল এপি, ‘মিসেস উইনথ্রপের মত একটা বাগান আমার চাই।’
বেশ, করে দেব।’
উঁহু, তোমাকে কিছু করতে দেব না। তোমার কষ্ট হবে।’
‘তুই ভাবিস না। প্রত্যেকদিন বিকেলে অল্প-স্বল্প খাটলেই হয়ে যাবে।’
‘আমি সাহায্য করব,’ বলল অ্যারন। পরম আগ্রহ তার। পিছন থেকে এগিয়ে এল। এপির পাশে পাশে হাঁটতে লাগল সে।
‘তবে তো শিগগিরই বাগানটা হয়ে যাচ্ছে,’ অ্যারনের দিকে চেয়ে মৃদু হাসল সাইলাস।
‘কূয়ার কাছে আজ বিকেলে যাব আমি। জমি পরখ করে তবে খুঁড়ব।
‘অ্যারনই জমি খুঁড়বে, বাবা,’ বলল এপি। ‘আমরা শুধু চারা বুনে দেব।’
‘আমি অনেক চারা এনে দিতে পারব,’ উৎসাহে টগবগ করে ফুটছে অ্যারন।
‘তবে তো কথাই নেই,’ হাসল সাইলাস। অ্যারন ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে চলল। এপি আর সাইলাস যাবে তাদের কুটিরে।
‘বাবা, আমার বহু দিনের শখ, ছোট্ট একটা বাগানের,’ বাপকে বলল এপি। ‘জানতাম অ্যারন আমাদের সাহায্য করবে।’
‘ওর খুব খাটনি যাবে।’
‘গায়ে মাখবে না ও,’ খুশি মনে বলল এপি। কুটিরে পৌঁছল ওরা। ওদের স্বাগত জানাল স্ন্যাপ। ওদের কুকুর। একটা বিড়াল ছানা খেলা করছে টেবিলের নিচে। ওটার মা জানালার পাশে গুটিসুটি মেরে বসে রোদ পোহাচ্ছে। সুখী ঘরোয়া দৃশ্য।
কুটিরের সর্বত্র এক মহিলার যত্নের ছোঁয়া। সবকিছু ঝকঝকে তকতকে, পরিষ্কার।
গডফ্রে কাস বৃদ্ধ তাঁতী আর এপির প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। চমৎকার কয়েকটি আসবাবপত্র উপহার দিয়েছে ওদের। বাপ-বেটির প্রতি ওর দুর্বলতার জন্যে গ্রামের প্রত্যেকে প্রশংসা করে তার।
চেয়ারে বসে এপিকে দেখছে সাইলাস। কী সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে সংসারটাকে। টেবিলে পরিষ্কার, সাদা চাদর বিছাল তার মেয়ে। খাবারের পাত্রগুলো রাখল তার ওপর।
খেতে বসল সাইলাস। খেয়ে চলল একাগ্রচিত্তে। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ কম কথা বলল সে। মাঝেমধ্যে খাওয়া থামিয়ে এপিকে দেখল।
ষোলো
খাওয়া সেরে বাইরে এসে বসল সাইলাস। পাইপ টানতে লাগল। নানা চিন্তা এখন তার মাথায়। মনে অনাবিল শান্তি। ‘হ্যাঁ,’ ভাবল সে, ‘দুনিয়ায় শান্তিও কম নয়। বাচ্চাটা আমার জীবন বদলে দিয়েছে। ঈশ্বরই পাঠিয়েছেন ওকে। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এবং তাঁর অস্তিত্বকে সন্দেহ করার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী।
সাইলাস অনেক আগেই এপিকে তার মায়ের দুঃখজনক মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। মায়ের আঙুলের বিয়ের আঙটিটা দিয়েছে ওকে। যে ঝোপে মাথা রেখে মারা গিয়েছিল ওর মা সেটা এখনও রয়েছে, সেখানটাতে। বাড়ছে।
টেবিল পরিষ্কার করে বাইরে এল এপি। বাবার পাশে বসল। সেই ঝোপটার দিকে চেয়ে বলল, ‘বাবা, ঝোপটা আমাদের বাগানে লাগাব। অ্যারন বলেছে সাদা লিলির চারা এনে দেবে আমাকে। ওটাকে ঘিরে চারাগুলো লাগাব।’
‘ঠিকই বলেছিস, মা। ঝোপটা বাগানে লাগিয়ে ওটার চারপাশে দেয়াল তুলে দেব।’
‘অ্যারনই করে দেবে কাজটা। কূয়ার কাছে অনেক পাথর পড়ে রয়েছে। ছোটগুলো আমরা আনব। আর বড়গুলো আনবে ও।’
এই বলে পাথর কুড়িয়ে আনতে ছুটল এপি। হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘বাবা, দেখে যাও! পানি একদম নেমে গেছে। গতকালই তো ভরা দেখলাম।’
ওর কাছে এগিয়ে এল সাইলাস। ওকে বুঝিয়ে বলল, ‘জমিটা স্যাঁতসেঁতে। মিস্টার কাসের লোকেরা গর্ত খুঁড়ছে। পানি বার করে দেয়ার জন্যে। দেখবি খুব শিগগির শুকনো হয়ে যাবে এ জায়গাটা। কূয়াটাও শুকিয়ে যাবে।
বাপ-বেটি পাশাপাশি বসল। ক’মিনিট কেউ কোন কথা বলল না। তারপর মুখ খুলল এপি, ‘বাবা, বিয়ের সময় আমি কি মায়ের আঙটিটা পরব?’
ওর দিকে তাকাল সাইলাস। ‘কেন, বিয়ের কথা ভাবছিস নাকি?’
‘উম্…অ্যারন বলছিল-’
‘ওকে পছন্দ তোর?’
‘হ্যাঁ, বাবা। তুমি ভেব না। আমি বিয়ের পরও তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। অ্যারন বলেছে ও আমাদের সঙ্গে এসে থাকবে। তোমার ছেলের মত।’
‘ছেলেটা ভাল। ওকে ছোট থেকে দেখছি। আমার আপত্তি নেই। বুড়ো হয়ে গেছি, আজ আছি কাল নেই। তোকে দেখা-শোনার জন্যে তো একজন কাউকে দরকার! ঠিক আছে, মিসেস উইনথ্রপের সঙ্গে কথা, বলব আমি। দেখি উনি কি বলেন।’
কিছুক্ষণ বাদে সাইলাসের কুটিরের দিকে আসতে দেখা গেল অ্যারন আর মিসেস উইনথ্রপকে।
সতেরো
সেই রবিবারেরই বিকেল। বাগানে বসে রয়েছে ন্যান্সি কাস। একা। তার স্বামী গেছে জমি দেখাশোনা করতে। পাথুরে কূয়ার কাছে। ‘লোকগুলো ঠিকমত কাজ করে থাকলে জমি শুকিয়ে গেছে এতক্ষণে। তুমি অপেক্ষা কর। আমি চা খাওয়ার জন্যে ফিরব, বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেছে সে।
ন্যান্সি বসে বসে রাজ্যের চিন্তা করতে লাগল। গডফ্রে ওকে ভালবাসে। কিন্তু মাঝেমধ্যে কেমন যেন হয়ে যায় সে। গম্ভীর মুখে বসে থাকে। তখন স্বামীকে বুঝতে পারে না ন্যান্সি। নিজের মনেই বহুবার প্রশ্ন করেছে সে, ‘ওর কিসের দুঃখ?’ ওদের ছেলে মেয়ে হয়নি। সেটাই কি কারণ? একাধিকবার বলেছে গডফ্রে, ‘কাউকে পালক নিই।’ একবার এপির কথাও তুলেছিল। রাজি হয়নি ন্যান্সি। রাজি হওয়া কি উচিত ছিল তার?
ন্যান্সির ভাবনায় ছেদ পড়ল এসময়। কাজের মেয়েটা এসে জানাল, ‘চা তৈরি।’
‘সাহেব ফিরেছেন?’
‘জ্বি, না।’ তারপর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটি, ‘আরে, সবাই দেখছি কৃয়ার দিকে দৌড়াচ্ছে। দুর্ঘটনা নিশ্চয়ই….
‘কী বললে!’ ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল ন্যান্সির। ‘কী হয়েছে? স্বামীর জন্যে উদ্বেগ হচ্ছে তার।
‘বলতে পারছি না…তবে খারাপ কিছু ঘটেছে।
পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করল ন্যান্সি। মিস্টার স্নেলের ষাঁড়টা হয়ত ছুটে গেছে আবার। তাই এত ছোটাছুটি।
‘কাউকে গুঁতিয়ে দিয়েছে হয়ত…’
ভয় পেয়ে গেল ন্যান্সি। গডফ্রে কোথায়? এত দেরি করছে কেন? এতক্ষণে তো তার ফিরে আসার কথা!
সামনের জানালায় ছুটে গেল সে। রাস্তা ফাঁকা। কেউ নেই। ‘খামোকা ভাবছি আমি,’ নিজের মনকে প্রবোধ দিল ও। কিন্তু শান্তি পেল না। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। গডফ্রে ফেরেনি এখনও।
আঠারো
উদ্বিগ্ন ন্যান্সি দাঁড়িয়ে রয়েছে জানালায়। এসময় ঘরে ঢুকল গডফ্রে।
‘এসেছ? আমি তো ভয়েই মরি…’ থেমে গেল ন্যান্সি। ফ্যাকাসে হয়ে রয়েছে গডফ্রের মুখ। কাঁপা হাতে হ্যাটটা খুলে রাখল সে। ধপ করে বসে পড়ল চেয়ারে। মাথা নুয়ে পড়েছে বুকের কাছে।
‘কি হয়েছে তোমার?’
‘বস। এখানে বস, শান্তস্বরে বলল গডফ্রে। আঙুল দিয়ে উল্টো দিকের চেয়ারটা দেখাল। ‘ভয়ানক ব্যাপার ঘটে গেছে।’
‘কী হয়েছে খুলে বল।
‘ডানস্ট্যান। ওর কঙ্কাল পাওয়া গেছে। পাথুরে কূয়ার নিচে। দুটো পাথরের মাঝখানে পড়ে ছিল। শুকিয়ে গেছে কূয়াটা। ওর ঘড়ি আর আমার চাবুকসুদ্ধ উদ্ধার করা হয়েছে কঙ্কাল…’ এক মুহূর্তের জন্যে থামল গডফ্রে।
‘ওকি…ওকি আত্মহত্যা করেছে?’
মনে হয় না। খুব সম্ভব মাতাল অবস্থায় পড়ে গেছে। ওহ্, ন্যান্সি, ও-ই সেই চোর। সাইলাসের টাকা ওই চুরি করেছিল। সে-টাকাও পাওয়া গেছে কূয়ার ভেতর।’
হতবাক হয়ে গেছে ন্যান্সি। প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে স্বামীকে সান্ত্বনা দিল সে, ‘তুমি মন খারাপ কোরো না, গডফ্রে। আমি তোমার পাশে আছি।’
‘আরও কথা আছে, ন্যান্সি,’ বলে চলল গডফ্রে। ‘শুনলে কষ্ট পাবে তুমি। কিন্তু বলতে আমাকে হবেই। আজ দেখলাম পাপ কোনদিন চাপা থাকে না। অপরাধীকে ধরা পড়তেই হয়…’ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইল গডফ্রে। তারপর ন্যান্সির দিকে চেয়ে বলতে শুরু করল:
‘ন্যান্সি, তোমার কাছ থেকে একটা সত্যি লুকিয়ে রেখেছিলাম এতদিন। আজ বলছি…এপির মায়ের কথা মনে আছে? যার মৃতদেহ তুষারে পড়ে ছিল…সেই মহিলা আমার স্ত্রী। এপি আমারই মেয়ে।’
অন্যদিকে মুখ ফেরাল ন্যান্সি।
‘ন্যান্সি, আমাকে মাফ করবে না?’
‘আমাকে আগে বলনি কেন?’
‘বললে তুমি যদি আমাকে বিয়ে না কর, সেই ভয়ে বলিনি।’
‘উফ, গডফ্রে! আগে যদি জানতাম এপি তোমার মেয়ে তবে
নিজের কাছে এনে রাখতাম ওকে। আপন মেয়ের মত।’
‘সেটা এখনও সম্ভব। আমরা ওকে পোষ্য নিতে পারি।
‘এত সহজ নয়। ভুলে যেয়ো না ওর বয়স এখন আঠারো। অন্য *জায়গায়, অন্যভাবে মানুষ হয়েছে সে। ওকে নিতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু ও কি রাজি হবে?’
‘আজ রাতে ওদের বাসায় চল না যাই,’ বলল গডফ্রে।
উনিশ
সাইলাস আর এপি বসে রয়েছে ঘরে। সাইলাসের সামনে টেবিলে রাখা রয়েছে তার হারানো মুদ্রাগুলো। বিকেলটা প্রচণ্ড উত্তেজনায় কেটেছে। ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে।
‘জানিস, মা,’ এপিকে বলল সে। ‘তুই আসার আগে এই মুদ্রাগুলো ছিল আমার নয়নের মণি। পরম মমতায় এদের জমিয়েছিলাম আমি। তারপর তুই এলি, আমার জীবনের ধারা পাল্টে দিলি। আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখালি। তোকে যে আমি কী ভালবাসি- ‘
‘সে আমি জানি, বাবা। তুমি আমার জন্যে অনেক কষ্ট করেছ।’
‘ওকথা বলিস নারে,’ বলল সাইলাস। তারপর চুপ করে গেল সে। চিন্তিত মুখে বলল, টাকাগুলো এখন তোর দরকার। সেজন্যেই সময়মত ফিরে পেয়েছি এগুলো। ঈশ্বরই ফিরিয়ে দিয়েছেন। সত্যি কোন তুলনা নেই তাঁর।
এ সময় দরজায় টোকা পড়ল। এপি উঠে গিয়ে খুলে দিল দরজাটা। মিস্টার এবং মিসেস কাস এসেছেন। তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানাল এপি। দুটো চেয়ার এগিয়ে দিল বসার জন্যে। তারপর সাইলাসের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
‘আমার ভাইয়ের অপকর্মের জন্যে, লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেছে। আমি যে কোন্ মুখে আপনার সঙ্গে কথা বলব…আমি ভাইয়ের হয়ে ক্ষমা চাইছি।’
‘ওসব কথা থাক না,’ বলল সাইলাস। ‘আপনার তো কোন দোষ নেই। আপনি আমাদের জন্যে অনেক করেছেন।’
‘সাইলাস, আপনার কাছে একটা অনুরোধ করব। রাখবেন?’
অবাক হল সাইলাস। তারপর শান্তস্বরে বলল, ‘বলুন, সম্ভব হলে অবশ্যই রাখব।’
‘আমরা এপিকে পালক নিতে চাই। কথা দিচ্ছি, ওর কোন অযত্ন হবে না। আর ও তো এ গ্রামেই থাকবে। যখন ইচ্ছে এসে আপনার সঙ্গে দেখা করে যাবে। ওকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব আমি।’
কালো হয়ে গেল সাইলাসের মুখ। অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারল না সে। এপিকে হারানোর কথা ভাবতেই পারে না ও। গডফ্রে কাস এমন অনুরোধ করবে তা স্বপ্নেও ভাবেনি সাইলাস। বাপের কাঁধে হাত রাখল এপি। মেয়ের স্পর্শে নিজেকে অনেকখানি ফিরে পেল সাইলাস। দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘এপি, তুই কি আমাকে ছেড়ে যাবি?’
বাপের অন্তরের ব্যথা বুঝতে পারল এপি। গডফ্রের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হানল সে। ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, স্যার। কিন্তু আমি আমার বাবাকে ছেড়ে দুনিয়ার কোথাও যাব না। আমি আপনাদের ‘সত্যিকারের মানুষ’ হতে চাই না, আমি এখানেই থাকব। এটাই আমার বাড়ি।’ শেষের দিকে কেঁপে গেল এপির গলা। ওর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল সাইলাস।
ন্যান্সির চোখ ছলছল করছে। চুপ করে শুনতে লাগল সে।
গডফ্রে ফিরল সাইলাসের দিকে। ‘শুনুন, মিস্টার মারনার, এপিকে নিয়ে যাওয়ার অধিকার আমার আছে। ও আমার মেয়ে। মলি ফ্যারেন আমার স্ত্রী ছিল।
একথা শুনে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল এপি। কড়া গলায় বলল সাইলাস, ‘একথা ষোলো বছর আগে বলেননি কেন? তিল তিল করে ওকে গড়ে তুলেছি আমি। আর আজ আপনি এসেছেন ওকে ছিনিয়ে নিতে? এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনি আমাকে খুন করতে এসেছেন? ও আমার মেয়ে। ওর ওপর কোন অধিকার নেই আপনার।
গডফ্রে এবার এপির দিকে ফিরল। ‘মারনার তোমাকে বাপের স্নেহে মানুষ করেছেন একথা সত্যি। তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমি তোমার প্রতি অবিচার করেছি তাতেও ভুল নেই। কিন্তু আমি বদলে গেছি এখন। আমাকে একবার সুযোগ দাও।’
‘আমাকেও.’ বলল ন্যান্সি। ‘আমার ছেলেমেয়ে নেই। তোমাকে আমি আপন মেয়ের মত আদর করব।’
সাইলাসের হাতখানা শক্ত করে চেপে ধরল এপি। তারপর কঠিন গলায় বলতে শুরু করল, ‘আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ। জেনে রাখুন, এই ভদ্রলোক আমার বাবা। এঁকেই চিনি আমি। আর কাউকে চিনি না, চিনতে চাইও না। আমি বাবাকে ছেড়ে গেলে…’ কেঁদে ফেলল এপি। ‘বাবাকে ফেলে কখনও যাব না আমি। কখনও না,’ কাঁদতে কাঁদতে বলল সে।
‘আমি বুঝি, মা,’ নরম স্বরে বলল ন্যান্সি। কিন্তু, মা, আপন বাবার প্রতিও তো তোমার দায়িত্ব কম নয়। সে তোমাকে নিজের কাছে রাখতে চায়। তাকে ফিরিয়ে দেয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?’
‘সাইলাস মারনার আমার আপন বাবা,’ পাল্টা বলল এপি। ‘আমি সব সময় চেয়েছি ছোট্ট একটা বাসা, যেখানে বাবা থাকবেন; আমি থাকব। বিয়ে করব যাকে সেও আমাদের সঙ্গে এসে থাকবে। বাবাকে ভালবাসবে, তাঁর দেখাশোনা করবে।’ বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলল এপি।
হতাশ চোখে স্ত্রীর দিকে চাইল গডফ্রে। তার আশা নিভে গেছে। ‘চল, ফিরে যাই,’ বলল সে।
নিঃশব্দে বেরিয়ে এল ওরা, ঘর ছেড়ে। হাঁটা ধরল ‘রেড হাউস’- এর দিকে। মুখে কথা নেই।
