মাইকেল – বুদ্ধদেব বসু
মাইকেল – বুদ্ধদেব বসু
১
মাইকেলের খ্যাতির সঙ্গে মাইকেলের কীর্তির সুমাত্রা-সূত্রের সম্বন্ধ নয়। যদিও পণ্ডিতেরা পক্ষপাতী ছিলেন না, এবং স্বয়ং বিদ্যাসাগর ঠোঁট বেঁকিয়েছিলেন, তবু সমসাময়িক পাঠকসমাজে মাইকেলের আধিপত্য সূচিত হয়েছিলো মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশিত হবার আগেই। আর তার পর থেকে আজ প্রায় একশো বছর ধরে আমরা অবিশ্রান্ত শুনে আসছি যে মাইকেল মহাকবি, বাংলা সাহিত্যের ত্রাতা এবং বাংলা কাব্যের মুক্তিদাতা। তাঁর ঘটনাবহুল নাটকীয় জীবন ও সেই জীবনের শোকাবহ সমাপ্তি তাঁর প্রতিষ্ঠার সহায়তা করেছে; এই সম্প্রতি আমাদের সাহিত্যে ও রঙ্গমঞ্চে পুনরুজ্জীবিত মাইকেলের যে-ছবি ফুটেছে তার দিকে ভালো করে তাকালে এ-কথা মনে না-করে পারা যায় না যে বাঙালি আসলে তাঁর কবিকর্ম সম্বন্ধে ততটা উৎসাহী নয়, যতটা তাঁর জীবনীর অসামান্য চিত্রলতা সম্বন্ধে উচ্ছ্বাসী।
সত্যি বলতে, মাইকেলের মহিমা বাংলা সাহিত্যের প্রসিদ্ধতম কিংবদন্তি, দুর্মরতম কুসংস্কার। কর্মফল তাঁকে পৌঁছিয়ে দিয়েছে সেই ভুল স্বর্গে, যেখানে মহত্ত্ব নিতান্তই ধরে নেয়া হয়, পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। এ-অবস্থা কবির পক্ষে সুখের নয়, পাঠকের পক্ষে মারাত্মক। আধুনিক বাঙালি পাঠক মাইকেলের রচনাবলি পড়ে এ-মীমাংসায় আসতে বাধ্য যে তাঁর নাটকাবলি অপাঠ্য এবং যে-কোনো শ্রেণীর রঙ্গালয়ে অভিনয়ের অযোগ্য, মেঘনাদবধ কাব্য নিষ্প্রাণ, তিনটি কি চারটি বাদ দিয়ে চতুর্দশ-পদাবলি বাগাড়ম্বর মাত্র, এমনকি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা বীরাঙ্গনা কাব্যেও জীবনের কিঞ্চিৎ লক্ষণ দেখা যায় একমাত্র তারার উক্তিতে। ভাবতে অবাক লাগে যে মাইকেলের ইংরেজি পত্রাবলিতে প্রাণশক্তির যে-প্রাচুর্য দেখি, তার সংক্রমণ প্রহসন দুটিতে ছাড়া আর-কোনো রচনাতে নেই— এবং প্রহসন দুটিও সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ নাটক নয়, নবিশের কাঁচা হাতের কৃশাঙ্গ নকশা মাত্র, অনেকটাই তার ছেলেমানুষি। কিন্তু এ-সব কথা মুখ ফুটে কেউ কি কখনো বলেছে? কখনোই বলেনি, এত বড়ো অপবাদ বাঙালির ধীশক্তিকে দেবো না, রবীন্দ্রনাথের একুশ বছর বয়সে লেখা মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা স্মরণীয়। ওই প্রবন্ধের চিন্তাবিন্যাসে অপরিণত মনের পরিচয় আছে, কিন্তু তৎসত্ত্বেও যে সত্য কথাই বলা হয়েছিলো তাতে সন্দেহ নেই। অথচ রবীন্দ্রনাথও পরবর্তী জীবনে সে-প্রবন্ধ প্রত্যাহরণ করে অন্য কোনো সুযোগে মাইকেলের স্তুতি করেছিলেন, বোধ করি পূর্বসূরির প্রতি সৌজন্য প্রকাশের প্রথা অনুসারেই। রবীন্দ্রনাথের যৌবনের সমালোচনার বক্তব্য ছিলো এই যে মেঘনাদবধ কাব্য কবিত্বের কেরানিগিরি মাত্র, মাইকেল স্রেফ নকলনবিশি ছাড়া আর-কিছুই করেননি, এপিকের বিভিন্ন লক্ষণ প্রাচীন সাহিত্য থেকে জেনে নিয়ে অন্ধ অধ্যবসায়ে তার প্রত্যেকটি প্রয়োগ করেছেন : ভাবখানা এইরকম যেন ‘এসো একটা এপিক লেখা যাক’ বলে সরস্বতীর সঙ্গে বন্দোবস্ত করে এপিক লিখতে বসে গেলেন।
বলা বাহুল্য, এ-সমালোচনা অক্ষরে-অক্ষরে সত্য। উত্তর-রবীন্দ্রের ভাষায় বলতে গেলে, মেঘনাদবধ কাব্য হয়ে ওঠা পদার্থ নয়, একটা বানিয়ে-তোলা জিনিশ। আয়োজনের, আড়ম্বরের অভাব নেই, সাজসজ্জার ঘটাও খুব, কিন্তু সমস্ত জিনিশটা আগাগোড়াই মৃত, কোথাও আমাদের প্রাণে নাড়া দেয় না, হৃদয়ে আন্দোলন তোলে না। পুরোপুরি নয় না হোক, অন্ত পাঁচটা-ছটা রস মেপে-মেপে পরিবেশন করেছেন কবি, কিন্তু তাঁর বীর রসে উদ্দীপনা নেই, আদি রসে নেই হৃৎস্পন্দন; তাঁর করুণ রসে দীর্ঘশ্বাস পড়ে না, এবং বীভৎস রস শুধুই বীভৎসতা। মহাকাব্যের কানুন সবই মেনেছেন তিনি, বড্ড বেশি মেনেছেন; কখনো মিল্টন, কখনো বা ভার্জিলকে স্মরণ করে নিয়মরক্ষার জন্য তাঁর অবিরাম ব্যস্ততা : ফলে সমগ্র কাব্যটি হয়েছে যেন ছাঁচে-ঢালা কলে-তৈরি নির্দোষ নিষ্প্রাণ সামগ্রী; দোকানের জানলার শোভা, ড্রয়িংরুমের অলংকরণ, কিন্তু অন্তঃপুরে অনধিকারী; কিঞ্চিদধিক ছয় সহস্র পঙক্তির মধ্যে দুটি-চারটির বেশি খুঁজে পাওয়া যায় না, যা পড়ে মনে হয় কবি শুধু নিয়মমাফিক চলতে চাননি, কিছু বলতে চেয়েছিলেন।
তারুণ্যের সত্যভাষণ ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হবার পঁচিশ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ অগ্রজ-নিন্দার প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টা করলেন “সাহিত্যসৃষ্টি” প্রবন্ধে। ভারতীয় চিত্ত-বৃত্তির সঙ্গে পাশ্চাত্ত্য চিন্তার শুভপ্রসূ মিলনের উদাহরণরূপে তিনি যে মেঘনাদবধ কাব্যকেই নির্বাচন করেছিলেন তার প্রকৃত কারণ কি এই নয় যে ‘মানসী’ বা ‘সোনার তরী’ বা ‘কাহিনী’র উল্লেখ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিলো?
মেঘনাদবধকাব্যে কেবল ছন্দোবন্ধে ও রচনাপ্রণালীতে নহে, তাহার ভিতরকার ভাব ও রসের মধ্যে একটা অপূর্ব পরিবর্তন দেখিতে পাই। এ পরিবর্তন আত্মবিস্মৃত নহে। ইহার মধ্যে একটা বিদ্রোহ আছে। কবি পয়ারের বেড়ি ভাঙিয়াছেন এবং রাম-রাবণের সম্বন্ধে অনেকদিন হইতে আমাদের মনে যে একটা বাঁধাবাঁধি ভাব চলিয়া আসিয়াছে স্পর্ধাপূর্বক তাহারও শাসন ভাঙিয়াছেন। এই কাব্যে রাম-লক্ষ্মণের চেয়ে রাবণ-ইন্দ্রজিৎ বড়ো হইয়া উঠিয়াছে। যে ধর্মভীরুতা সর্বদাই কোটা কতটুকু ভালো ও কতটুকু মন্দ তাহা কেবলই অতি সূক্ষ্মভাবে ওজন করিয়া চলে তাহার ত্যাগ দৈন্য আত্মনিগ্রহ আধুনিক কবির হৃদয়কে আকর্ষণ করিতে পারে নাই। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত শক্তির প্রচণ্ড লীলার মধ্যে আনন্দবোধ করিয়াছেন।… যে শক্তি অতি সাবধানে সমস্তই মানিয়া চলে তাহাকে যেন মনে মনে অবজ্ঞা করিয়া যে শক্তি স্পর্ধাভরে কিছুই মানিতে চায় না, বিদায়কালে কাব্যলক্ষ্মী নিজের অশ্রুসিক্ত মালাখানি তাহারই গলায় পরাইয়া দিল।…
(“সাহিত্যসৃষ্টি”-রবীন্দ্রনাথ)
রবীন্দ্রনাথ কি নিজেই জানতেন না যে তাঁর এই মন্তব্যে যাথার্থ্য নেই, আছে শুধু চলতি মতের পুনরুক্তি? মাইকেল সম্বন্ধে যে-কটি প্রবাদ বাঙালির মনে বদ্ধমূল, তার মধ্যে এটাই প্রধান যে বাংলা সাহিত্যের ঝিমিয়ে-পড়া ধমনীতে পাশ্চাত্ত্য রক্ত সঞ্চার করে তাকে উজ্জীবিত করেন তিনিই প্রথম। সত্যই যদি তা-ই হতো, তাহলে মাইকেলের অনতিপরে, এবং তাঁরই প্রভাবে, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উৎস খুলে যেতো, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ রবীন্দ্রনাথের অপেক্ষায় বসে থাকতো না। আমাদের আধুনিক সাহিত্যে মাইকেলের প্রভাব যে বলতে গেলে শূন্য, এমনকি মোহিতলালের প্রশংসনীয় উদ্যম সত্ত্বেও তাঁর প্রবর্তিত অমিত্রাক্ষর পর্যন্ত জাদুঘরের মূল্যবান নমুনা হয়েই রইলো, পূর্ব-পশ্চিমের মিলনসাধনায় তাঁর ব্যর্থতার এটাই প্রমাণ। বললে হয়তো কালাপাহাড়ি শোনায়, কিন্তু কথাটা একান্তই সত্য যে বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্য ভাব মাইকেল আনতে পারেননি, এনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; মাইকেলে আমরা পাই শুধু আকঁাড়া অনুকরণ (যার সবচেয়ে লোমহর্ষক দৃষ্টান্ত অষ্টম সর্গের নরকবর্ণনা), রবীন্দ্রনাথে পাই সসত্ত্ব অনুপ্রাণনা। শুধু জনরব দ্বারা চালিত না-হয়ে মনোযোগ দিয়ে মেঘনাদবধ কাব্য পড়লে আজকের দিনের যে-কোনো পাঠক বুঝবেন যে প্রকরণের অভিনবত্ব বাদ দিলে তাতে ‘অপূর্ব পরিবর্তন’ বা ‘বিদ্রোহ’ কিছুমাত্র নেই, বরং সে-গ্রন্থ দৃষ্টিহীন গতানুগতির একটি অনবদ্য উদাহরণ। শুধু প্রহসনদুটিতে ছাড়া অন্য সর্বত্রই এই অনম্য গতানুগতি মাইকেলের শক্তিকে পাংশু করে দিয়েছে : নামে, পানাহারে, নিত্যকর্মে ও নিত্যকার ভাষায় প্রতিশ্রুত বিজাতীয় হওয়া সত্ত্বেও, কিংবা সেইজন্যই, তাঁর রচনায় যে-মন প্রকাশ পেয়েছে তা তৎকালীন লোকধর্মের সংকীর্ণ সংস্কারে আবদ্ধ। যদি তিনি ব্যাস-বাল্মীকির নৈষ্ঠিক অনুসরণ করতেন, তাহলেও সংস্কার-পাষাণের শাপমুক্তি হতো; কিন্তু মূল পুরাণের কঠোর বাস্তবতা, কাশীরাম -কৃত্তিবাসের কৃপায় সেই যে লোকাচার-প্রচারে অধঃপতিত হলো, বাঙালির পক্ষে তার প্রভাব এড়ানো আজ পর্যন্ত দুঃসাধ্য, এবং তার নির্জীবক সংক্রাম থেকে মাইকেলের দুর্দান্ত বিলেতিপনাও তাঁকে বাঁচাতে পারেনি। হয়তো আদিকবির বিশ্বব্যাপী অনুকম্পা বর্তমান জগতে সম্ভবই নয়, আর তা-ই যদি হয়, তাহলে তো পুরাণের পুনর্জন্মই আধুনিক কবিকৃত্য, দেশে-দেশে, যুগে-যুগে তা-ই ঘটেছে, ইংরেজি সাহিত্যে চসার থেকে ইয়েটস পর্যন্ত, আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথ থেকে… কোন পর্যন্ত তা আরো দু-চারশো বছর পরে কোনো সমালোচক বলতে পারবেন। এখানে অনুধাবনযোগ্য এইটুকু যে আমাদের সাহিত্যে পুরাণের পুনর্জন্ম মাইকেল ঘটাননি, ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ : পুরাণ বা ইতিহাসের কাহিনীকে বর্তমান জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারলে তবেই তা নিয়ে কাব্যরচনা সার্থক হয়, এবং এ-কাজ প্রাক্-রবীন্দ্র বাঙালি কবিদের মধ্যে কেউ পারেননি, কোনো-একজন কোনো-একটি রচনাতেও না। বাংলা সাহিত্যে ‘চিত্রাঙ্গদা’ যে কত বড়ো যুগান্তরকারী গ্রন্থ, সুদ্ধু সেইটে উপলব্ধি করবার জন্য, মাইকেল তো বটেই, উপরন্তু হেম-নবীন গিরিশচন্দ্রাদির সঙ্গেও কিছু প্রত্যক্ষ পরিচয় বাঞ্ছনীয়। আর অর্জুন-চিত্রাঙ্গদাই শুধু নয়, কর্ণ, গান্ধারী, দেবযানী, দুর্যোধন প্রত্যেককেই রবীন্দ্রনাথ নতুন করে সৃষ্টি করেছেন, প্রত্যেকের মধ্যে আবিষ্কার করেছেন এমন মনোলোক, আদিকবির কল্পলোকের ত্রিসীমানায় যা ছিলো না। এরা প্রত্যেকেই বর্তমানের অন্তর্গত, আধুনিক বিশ্ববাসীর স্বজাতি, এদের মুখের কথায় আমাদেরই জীবনের স্পন্দন আমরা শুনতে পাই। অসম্ভব হতো দুর্যোধনের জয়োল্লাস, গান্ধারীর পতিভর্ৎসনা, দেবযানীর প্রণয়সৌরভ, যদি-না কবি উনিশ-শতকী পাশ্চাত্ত্য মনুষ্যধর্মে দীক্ষিত হতেন। রবীন্দ্রনাথের এ-সব কাব্য থেকে এই মহৎ শিক্ষাই আমাদের গ্রহণীয় যে চিরন্তনতা স্থাণুতার নামান্তর নয়, সাহিত্যে তাকেই চিরন্তন বলে যার মধ্যে অব্যক্ত ইঙ্গিতের পরিমণ্ডল সমস্ত ভবিষ্যৎকে আপন গর্ভে ধারণ করে, যুগে-যুগে অজাতের জন্মে, অব্যক্তের ব্যঞ্জনায় যার অপূর্ব রূপান্তর কখনোই শেষ হয় না। এই রূপান্তরের যাঁরা যন্ত্রী, বা যন্ত্র, তাঁরাই মহাকবি, এবং ভারতীয় সাহিত্যে কালিদাসের পরে এ-আখ্যা শুধু রবীন্দ্রনাথেরই প্রাপ্য। পুরাণের চিরন্তন চরিত্রগুলিকে রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে স্বকালের মুখপাত্র করে তুলেছেন যে তারা মহাভারতের অপভ্রংশ আর নেই, তাদেরও স্বাধীন সত্তা হয়েছে, তারা স্বতন্ত্ররূপে জীবন্ত এবং গ্রহণযোগ্য।
আর মাইকেল? রাম-রাবণ সম্বন্ধে আমাদের মনে যে-একটা ‘বাঁধাবাঁধি ভাব’ আছে, সত্যি কি তার শাসন তিনি ভেঙেছেন? সত্যি কি তাঁর রচনায় রাম-লক্ষ্মণের চেয়ে রাবণ-ইন্দ্রজিৎ বড়ো? সত্যি কি স্বতঃস্ফূর্ত শক্তির প্রচণ্ড লীলায় তাঁর আনন্দ? না, এর কোনোটাই না। কেননা মুখে যদিও তিনি সদম্ভে বলেছেন, ‘I despise Ram and his rabble’, কার্যত তিনি ভীরুতায় তাঁর অবজ্ঞাভাজন রামেরই সমকক্ষ, প্রভেদ শুধু · এই (এবং এ-প্রভেদ মাইকেলের পক্ষে সর্বনাশী) যে রাম ধর্মভীরু আর তিনি প্রথাভীরু। মিল্টন সম্বন্ধে একটা কথা আছে যে মনে-মনে তিনি শয়তানেরই সপক্ষে ছিলেন; বোধহয় সেইজন্যই মাইকেল স্থির করেছিলেন যে রাবণের প্রতি পক্ষপাত প্রকাশ করা তাঁর কর্তব্য। কিন্তু তা তিনি করেছেন শুধু বচনের দ্বারাই, রচনার দ্বারা নয়; মেঘনাদবধ কাব্যের পদে-পদে দেখা যায় যে রাম-সীতার লোকশ্রুত মহিমায় কবি অভিভূত, এবং রাবণের দুশ্চরিত্রতার ধারণাও তাঁর মনে বদ্ধমূল। তা-ই যদি না হতো, তাহলে ওই সুদীর্ঘ কাব্যে এই অদ্ভুত রহস্যময় প্রশ্ন উত্থাপিত না-হয়েই পারতো না যে রাবণ সীতাকে হরণ করেছিলেন কেন। সম্ভোগের জন্য? কিন্তু সম্ভোগ কোথায়? সীতাকে লঙ্কায় নিয়ে এসেই রাবণ যে তাঁকে একাকিনী অশোককাননে রেখে দিলেন, রাবণ-চরিত্রের এই মৌল দ্বন্দ্ব কারো চোখেই ধরা পড়েনি, যতদিন-না রবীন্দ্রনাথ সন্দীপের মুখ দিয়ে কথাটা বলিয়েছিলেন। এ-রকম অনুমান করতে বাধা নেই যে রাবণ সত্যিই সীতাকে ভালোবেসেছিলেন, আধুনিক অর্থে ভালোবেসেছিলেন; তাহলেই রাবণের ব্যবহার আমাদের চোখে সংযত লাগে, এবং তাঁর চরিত্রে মহত্ত্বের সম্ভাবনাও আমরা দেখতে পাই। কিন্তু মাইকেলি কল্পনায় এ-অনুমানের আভাসমাত্রও ছিলো না। বরং তিনি সেই চিরাচরিত জনরবকেই মেনে নিয়েছিলেন যে রাবণের সীতাহরণ তাঁর আত্মহত্যার উপলক্ষ এবং উপায় ছাড়া কিছু নয়, মনে-মনে তিনি রামেরই প্রেমিক, রামের হাতে মৃত্যুতেই তাঁর মোক্ষ। সেইজন্য মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রাবণের বীরত্ব একবারও উজ্জ্বল হয়ে ফুটলো না; পৌনঃপুনিক দীর্ঘশ্বাস এবং অশ্রুমোচনের ফাঁকে-ফাঁকে তিনি আস্ফালন করেন বটে, কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে প্রকৃত শক্তিমত্তার এ-রকম কোনো কথা কখনোই বেরোয় না, যেমন :
সুখ চাহি নাই মহারাজ।
জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।
ক্ষুদ্র সুখে ভরে নাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা
কুরুপতি—দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধা
জয়রস, ঈর্ষাসিন্ধুমন্থনসঞ্জাত,
সদ্য করিয়াছি পান; সুখী নহি, তাত,
অদ্য আমি জয়ী।
মাইকেলের রাবণ প্রথম থেকেই জানেন যে তাঁর সর্বনাশ অবধারিত, সেটা উদ্দীপনার অনুকূল নয়, তবু সেটাকে আশ্রয় করেই রাবণ সেই মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন, যে-মহিমা ট্র্যাজেডির পুণ্যফল। কিন্তু ট্র্যাজেডির তপস্যা মাইকেলের পক্ষে অসম্ভব ছিলো বলে তিনি আমাদের শুনিয়েছেন শুধু রক্ষোরাজের মনস্তাপ, পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যে যুদ্ধ করে যাচ্ছে তার মহিমা মূর্ত করতে পারেননি, যা রবীন্দ্রনাথ করেছেন কর্ণের মুখের একটি কথায় :
যে পক্ষের পরাজয়
সে পক্ষ ত্যাজিতে মোরে কোরো না আহ্বান।
সত্যি বলতে, রাবণের মহত্ত্বের সম্ভাবনা মাইকেল অন্ধভাবে উপেক্ষা করে গেছেন, আবার প্রতিপক্ষের দুর্বলতাও কিছুমাত্র প্রকাশ করতে পারেননি। শূর্পণখার প্রতি লক্ষ্মণের আচরণ যে অপৌরুষেয়, বালীবধ যে ধিক্কারযোগ্য, রামচন্দ্র যে কূটনীতিতে শ্রেষ্ঠ বলেই রাবণকে হারাতে পারলেন, ‘ভিখারী রাঘবের বিরুদ্ধে এতগুলি অস্ত্র পেয়েও মাইকেল ব্যবহার করেননি; এমনকি, মেঘনাদের হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুর অন্যায়টাকেও অনায়াসে আমাদের মন থেকে মুছে দিলেন স্বর্গের সমস্ত দেবতাদের রামানুরাগ প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথের এ-কথাও গ্রাহ্য নয় যে নাস্তিক শক্তির স্পর্ধাকেই কাব্যলক্ষ্মী বিদায়কালে মালা পরিয়ে দিলেন; কেননা শেষ পর্যন্ত আমরা তো এই দেখলুম যে মেঘনাদ-প্রমীলা পাশাপাশি বসে রথে চড়ে স্বর্গে গেলেন, আর মৃত্যুর পরে এতই যদি সুখ তাহলে আর মৃত ব্যক্তির জন্য শোক করবো কেন, আর রাবণের জন্যই বা দুঃখ কিসের। এদিকে লক্ষ্মণ যখন মরেও বাঁচলো, তখনই জানলুম যে রাবণের চিতা জ্বলতে আর দেরি নেই, কিন্তু সেই অনির্বাণ আগুনও আমাদের মনকে ছুঁতে পারলো না, কেননা, ততক্ষণে দেবদেবীদের কথাবার্তা শুনে আমরা বুঝে নিয়েছি যে রাম ভালোমানুষ আর রাবণটা বদমাস।
২
রবীন্দ্রনাথের পরে মাইকেল সম্বন্ধে বিচক্ষণ মন্তব্য করেছেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। বাঙালি সমালোচকদের মধ্যে তিনিই যেমন এই সুস্পষ্ট সত্যটা সাহস করে উচ্চারণ করেছেন যে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য ‘সাধারণত অপাঠ্য’, তেমনি এ-কথা বলতেও ভয় পাননি যে মাইকেল ‘বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতেন বটে, কিন্তু তার প্রকৃতি বুঝতেন না; তাই তিনি বঙ্গভারতীর সেবক মাত্র, তার ত্রাণকর্তা নন।’ আমিও একবার বলেছিলুম, মাইকেল বাংলা জানতেন না। বাংলা জানতেন না, এটা অত্যন্ত বাড়াবাড়ি শোনায়,* সত্য কথাটা এই যে বাংলা মাইকেলের মাতৃভাষা হলেও আবাল্য তিনি তাকে অবজ্ঞাই করেছেন, কখনো তার মর্মে প্রবেশ করেননি। সেই অবজ্ঞা হঠাৎ যখন জিগীষায় পরিণত হলো, তখন যে আশ্চর্যরকম অত্যল্প সময়ে সেই সংকল্প কার্যত সমাধা করে ফেললেন, এটা নিয়ে তাঁকে আমরা অপরিসীম বাহবা দিয়ে এসেছি। বাহবার যোগ্য কাজ সন্দেহ নেই, রীতিমতো তাক-লাগানো, হাঁ করে তাকিয়ে থাকবার মতো, কিন্তু মাইকেলের এই বঙ্গভাষাবিজয়ে জেদ যতটা ছিলো, সাধনা ততটা ছিলো না, শক্তির দৌরাত্ম্য যতটা ছিলো প্রেমের দৌত্য ততটা ছিলো না। এ যেন রাবণের সীতাহরণের মতোই ব্যাপার, একেবারে ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নেয়া হলো বটে, কিন্তু ‘একেই কি বলে পাওয়া’? আবাল্য নিরন্তর ব্যবহার এবং অনুশীলনের ফলে ভাষার সঙ্গে যে-অন্তরঙ্গতা জন্মায়, তার অবকাশ মাইকেলের জীবনে ঘটতে পারেনি; বাংলা ভাষার অবয়বের অধ্যয়নেই কাটলো তাঁর অতি হ্রস্ব সাহিত্যিক জীবন, তার প্রাণের সন্ধান পেলেন না, কিংবা প্রাণের প্রান্তে আসতে-আসতেই মৃত্যু দিলো ছেদ টেনে। এইজন্যই তাঁর প্রায় সমস্ত রচনাতে কলাকৌশল যেন কলকব্জার মতো কাজ করে; এইজন্যই তাঁর অনুপ্রাস শিশুতোষ, উপমা দ্যুতিহীন, পুনরুক্তি ক্লান্তিকর। তাঁর সমস্ত পদ্যরচনার অভিশাপ ভাষার সেই জীবনবিমুখ সুদূরতা, ইংরেজিতে যাকে বলে পোয়েটিক ডিকশন। মিল্টনের অনুসরণ ছিলো তাঁর প্রতিজ্ঞা, কিন্তু কার্যত তিনি পোপের খপ্পরেই পড়েছিলেন। পোপের রীতিতে প্যারাডাইস লস্ট লেখবার শ্রেষ্ঠ ফল যা হতে পারে, অমিত্রাক্ষর সত্ত্বেও মেঘনাদবধ কাব্য তা-ই। পোপের যে-সমালোচনা ওঅর্ডস্বার্থ করেছিলেন তার মধ্যে এই কথাটা একেবারেই অকাট্য যে পোপ ও তাঁর সমকালীন কবিরা চোখে দেখে লিখতেন না; —মাইকেল সম্বন্ধে নিছক সত্য সেই কথা। মাইকেল শুধু ভাষার আওয়াজ শুনতেন —আর আওয়াজটাও খুব কড়া রকমের হওয়া চাই –তার ছবিটা দেখতেন না, ইঙ্গিতের বিচ্ছুরণ অনুভব করতেন না। সংস্কৃতে একই বস্তুর অনেকগুলি নাম ব্যবহার করবার রীতি ছিলো, অ্যাংলো-স্যাক্সন ভাষাতেও তা-ই; কিন্তু সে-কথাগুলি পরস্পরের অবিকল প্রতিশব্দ নয়, প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র অর্থবহ, প্রত্যেকটিই একটি প্রচ্ছন্ন উপমা। অ্যাংলো-স্যাক্সন কবি সমুদ্রকে বলেছেন তিমি-পথ, বলা বাহুল্য সেটা সমুদ্র কথার প্রতিশব্দ মাত্র নয়, সমুদ্রের বিশেষ একটি রূপের বর্ণনা। কালিদাসের যক্ষ মেঘকে ডাকছেন কখনো জলদ, কখনো সৌম্য বা সাধু, কখনো বা আয়ুষ্মান; এগুলিও মেঘের ভিন্ন ভিন্ন রূপের, এবং সেই সঙ্গে মেঘ সম্বন্ধে যক্ষের অনুভূতির অভিজ্ঞান। সংস্কৃতে বিশেষ্যপদ মাত্রেরই কয়েকটি সেবক দেখতে পাই, যাদের বলা যায় বিশেষ্য-বিশেষণ; সেই শব্দসম্ভারের যে-অংশ লুপ্ত হয়ে যায়নি বাংলায় তা এসে পৌঁচেছে নিতান্তই প্রতিশব্দরূপে, আর প্রতিশব্দ মাত্রেই অতিশব্দ; অর্থাৎ হর্যক্ষ শোনামাত্র যদি সিংহের হলুদ চোখ দেখতে না পেলুম, তাহলে সিংহকে হর্যক্ষ বলা শুধু অনর্থক নয়, রুগ্ণতার লক্ষণ। বিশেষ অর্থটি যেখানে ফুটলো না, কিংবা যেখানে বিশেষ অর্থটির প্রয়োজনই নেই, সেখানে ওই শব্দ জড়পিণ্ডের মতো কাব্যের কণ্ঠরোধ করে। বারীন্দ্র বা সুধাংশু বললে সমুদ্র বা চাঁদের ছবি আমাদের মনে জেগে ওঠে না, বরং বাবু উপাধিধারী বঙ্গীয় ভদ্রলোককে মনে পড়ে। ‘যাদঃপতিরোধ যথা চলোর্মি আঘাতে’ আওয়াজ দিচ্ছে জমকালো, কিন্তু এ-ধ্বনির কোনো অনুষঙ্গ নেই, কোনো উদ্বোধনী শক্তি নেই, কোনো স্মৃতি, কোনো স্বপ্ন, কোনো মনোলীন নামহীন অভিজ্ঞতাকে এ ডেকে আনে না, একটু কষ্ট করে শাদা মানেটা বুঝে নিলেই ফুরিয়ে গেলো। মৃত শব্দরাজিতে আকীর্ণ বলেই মাইকেলি কলরোল আমাদের কানেই শুধু পৌঁছয়, কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে না, এবং দেবভাষা তাঁর ক্ষেত্রে ভাষাদানব হয়ে উঠেছিলো বলে তিনি তাকে সামলাতেই নিরন্তর ব্যস্ত ছিলেন, কখনোই চোখে দেখে লিখতে পারেননি। মাইকেলের সযত্নসজ্জিত সমস্ত বর্ণনা তাই তো কেবল সহস্রাক্ষ ছাপার অক্ষরে মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে, কোনো একটিও বাসা বাঁধতে পারে না মনের মধ্যে।
[* এই প্রবন্ধ প্রথম লেখা হবার কয়েক বছর পর আমি জানলাম যে রবীন্দ্রনাথ একবার মৌখিক আলাপে এতটা বলেছিলেন যে মাইকেলি বাংলা বাংলাই নয়।
“He was nothing of a Bengali Scholar,” said Rabindranath once, when we were discussing the Meghanadbadh: “he just got a dictionary and looked out all the sounding words. He had great power over words. But his style has not been repeated. It isn’t Bengali. “ – Rabindranath Tagore by Edward Thompson, 2nd Ed, 1948, page 16.]
শুধু যে বাংলাভাষার প্রকৃতি বোঝেননি তা নয়, সাহিত্যের আদর্শ নির্বাচনেও মাইকেল ভুল করেছিলেন। পাশ্চাত্ত্য ভাষায় পণ্ডিত হয়েও এ-কথাটা তাঁর উপলব্ধি হয়নি যে আধুনিক কালে এপিকের জায়গা নিয়েছে গদ্য উপন্যাস। তরুণ রবীন্দ্রনাথ মেঘনাদবধ কাব্যকে পদ্য-উপন্যাস বলে তার জাতিনির্ণয় ঠিকই করেছিলেন : তিনি বুঝেছিলেন যে প্রকৃত এপিক পৃথিবীতে দুটি কি তিনটি মাত্র আছে, পরবর্তী কাব্যকাহিনীগুলি নামত মহাকাব্য হলেও আসলে পদ্য-উপন্যাস-রঘুবংশ তা-ই, ঈনীড তা-ই, প্যারাডাইস লস্টও তা-ই। কিন্তু মাইকেলের ধারণায় মহাকবি মাত্রেই মহাকাব্যের লেখক ছিলেন বলে তিনি মহাকাব্য লিখতে তো পারলেনই না, উপরন্তু মহৎ পদ্য-উপন্যাস লিখে মহাকবির মর্যাদা লাভও সম্ভব হলো না তাঁর পক্ষে। যদি তিনি ভেবে দেখতেন, কেন প্যারাডাইস লস্টের পরেই ইংরেজি ভাষার উল্লেখযোগ্য ‘মহাকাব্য’ পিত্তপ্রবণ ‘ডানসিয়াড’, যদি ভেবে দেখতেন, তাঁর উপাস্য মিল্টন আর উপহাস্য পোপে সত্যিকার প্রভেদটা কোথায়, তাহলে হয়তো অনেক পণ্ডশ্রম তাঁর বেঁচে যেতো। যদিও অনেকগুলি ভাষা শিখেছিলেন এবং পড়েছিলেন বিস্তর, তবু এ-কথা মনে করতে পারি না যে তিনি ঠিকমতো পড়াশুনো করেছিলেন কিংবা পড়াশুনোকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। তাঁর পত্রাবলি মিল্টন-ভজনায় উচ্ছল, কিন্তু শেক্সপিয়র সম্বন্ধে (এমনকি নাটকের প্রসঙ্গেও) তিনি স্বল্পভাষী; বায়রনকে তিনি কিঞ্চিৎ আমল দেন, কিন্তু কীটস, যাঁর সঙ্গে মিল্টনের আত্মীয়তা সুস্পষ্ট, তাঁর নামও মুখে আনেন না। দান্তে, উগো, টেনিসন ইত্যাদিকে লক্ষ করে মাইকেল যে-সব সনেট লিখেছেন তাতে উদ্দিষ্ট কবিদের বিশিষ্টতা কিছুই প্রকাশ পায়নি, প্রশস্তির মুখস্থ-পাঠে সকলকেই এক মনে হয়। এ-থেকে এমন নিদারুণ সন্দেহও মনে উঁকি দেয় যে মাইকেল বিদ্যার অনুধাবন করলেও রুচি অর্জন করেননি : এবং সেই থেকে মনে এ-চিন্তার উদয় হয় যে বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রভূত শক্তির অপব্যয়ের হেতু কি সুধীন্দ্ৰনাথ দত্ত যা বলেছেন তা-ই, অর্থাৎ চারিত্রগুণের অনটন, না কি রুচির অনিশ্চয়তা।
তাছাড়া, চারিত্র বা রুচির ন্যূনতা সিদ্ধির অনতিক্রম্য অন্তরায় হয়তো হতো না, যদি মাইকেল কোনো বিশ্বাসের বিশ্বম্ভর আশ্রয় পেতেন। যে-বিশ্বাসের বলে দান্তের নরক প্রভাবে অলৌকিক হয়েও প্রকৃতিপন্থী উপন্যাসের মতো, এমনকি চলচ্চিত্রের মতো, প্রত্যক্ষ, যে-বিশ্বাসের বলে মিল্টন ইহুদি পুরাণ অবলম্বন করে অন্ততপক্ষে স্মরণীয় কাব্য বানাতে পেরেছিলেন, তার কিছু অংশও যদি মাইকেলের থাকতো তাহলে তাঁর কাব্যের রূপপ্রতিমায় প্রাণসঞ্চার না-হয়েই পারতো না। বাংলা সাহিত্যের এটাই বোধহয় শোচনীয়তম দুর্ঘটনা যে মধুসূদন দত্ত কোনো ঐতিহ্যকে আত্মসাৎ করতে পারলেন না, না স্বজাতীয়, না বিজাতীয়; যখন তিনি রাম-রাবণের যুদ্ধ নিয়ে কাব্যরচনায় লিপ্ত, তখনও এ-কথা ভেবে তাঁর আত্মপ্রসাদ যে তিনি একজন ‘জলি ক্রিস্টিয়ান ইউথ’, হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি সূচ্যগ্র অনুকম্পা তাঁর নেই, ভাবখানা এইরকম যেন লক্ষ্মণ মেঘনাদ সীতা প্রমীলাকে নিয়ে তিনি লেখা-লেখা খেলা করছেন বটে, কিন্তু সত্যি-সত্যি তাঁর জীবনে তারা কিছুই এসে যায় না। পক্ষান্তরে, জন্মদোষে খ্রিষ্টান ঐতিহ্যকে এতখানি শোষণ করে নেবার সম্ভাবনা তাঁর ছিলো না যাতে কাব্যের প্রেরণা সে-অঞ্চল থেকে আসতে পারে; মুহর্রমের কাহিনী নিয়ে কাব্যরচনার কথাও তাঁর মনে এসেছে, কিন্তু কোনো খ্রিষ্টান প্রসঙ্গের উল্লেখ তাঁর পত্রাবলিতে পাওয়া যায় না। ঐতিহ্যকে বাড়াতে কি বদলাতে হলে, যতটা আছে তাকে প্রথমে অধিকার করা চাই, আর ঐতিহ্য যখন বাড়েও না, বদলায়ও না, তখনই তার অধঃপাত ঘটে প্রথার অন্ধকূপে মাইকেল কোনো ঐতিহ্যকে পাননি বলেই তাঁকে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিলো প্রথার হাতে; তাই তাঁর রাম লক্ষ্মণ সীতা, কিংবা রাবণ মেঘনাদ প্রমীলা, এরা কেউ জীবন্ত নয়, তাই এতগুলি কাব্যে ও নাটকে একটিও চরিত্রসৃষ্টি তিনি করতে পারেননি; তাই তাঁর নরকে দুঃখের অগ্নিশুদ্ধি নেই, আছে শুধু ন্যক্কার, স্বর্গে নেই সৌন্দর্যের অমরতা, শুধু আছে হস্তলিপিপুস্তিকার নীতিকথা। (স্বর্গে সতীদের জন্য শুধু মনোরম প্রমোদ-কানন নয়, অপরিমিত চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়ের ব্যবস্থা করতেও তিনি ভোলেননি!) বীরাঙ্গনা কাব্য আকারে-প্রকারে অনেকটা অগ্রসর, কিন্তু তারার খেদোক্তির আরম্ভ পড়ে মনে যে-আশা জাগে, তা চূর্ণ হতে বেশি দেরি হয় না, এবং কাব্যটি আদ্যন্ত পড়ে ওঠার আগেই আমরা উপলব্ধি করি যে গ্রন্থটির নামকরণেই ভুল হয়েছে, বীরত্বের কোনো চিহ্ন এতে নেই, নারীত্ব বিষয়ে বিদ্রোহী কোনো ধারণা নেই, এই তথাকথিত বীরাঙ্গনারা সকলেই আসলে পতিদেবতার অশ্রুসৰ্বস্ব সেবাদাসী, শূর্পণখা বা তারাও এর ব্যতিক্রম নয়, কেননা তাদের প্রণয় পরকীয়া হলেও মনোভাব প্রেমিকার নয়, শাস্ত্রসম্মত পতিবিরহিণীর। অবশ্য পড়তে-পড়তে আমরা ভুলেই যাই কে তারা আর কে দ্রৌপদী, কে শূর্পণখা আর কে-ই বা শকুন্তলা; সকলেই এক কথা বলছে, এবং সকলের কথাই এক রকম চিরাচরিত প্রথার দ্বারা নির্দিষ্ট। ব্রজাঙ্গনার প্রেমলীলা এবং চতুর্দশপদীর দেশপ্রেম ও প্রকৃতিবর্ণনা—সেই একই কথা বলতে হয়—গতানুগতির পরাকাষ্ঠা, নাটক ক-খানাও তা-ই, উজ্জ্বল প্রহসনদুটির পরিসমাপ্তিও এর ব্যতিক্রম নয়।
৩
তবু এ-কথা মানতেই হবে যে মাইকেল শক্তিধর পুরুষ, বঙ্গসাহিত্যের অন্যতম প্রধান। কিন্তু তাঁর প্রাধান্যের স্বরূপ বুঝতে হবে, তবে তো তাঁকে আমরা নিজেদের কাজে লাগাতে পারবো। জীবদ্দশায় দেশব্যাপী জয়-জয়কার সত্ত্বেও তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে কেউ-কেউ বুঝেছিলেন যে বিদ্যাধরমাত্রেই সিদ্ধপুরুষ নন। রাজনারায়ণ বসুর বন্ধুতা বা বিদ্যাসাগরের মহত্ত্ব তাঁদের সমালোচক-দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করেনি; অভিনেতা কেশব গাঙ্গুলি পর্যন্ত দত্তজর নাট্যপ্রতিভা সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু এমন একটি কাণ্ড মাইকেল করেছিলেন যার সামনে কোনো সন্দেহ টিকলো না, কোনো আপত্তি দাঁড়াতে পারলো না। সকলেই জানেন যে সেটি তাঁর অমিত্রাক্ষর ছন্দের উদ্ভাবনা। এ-উদ্ভাবনা যে ঠিক কী কারণে মাইকেলকে অক্ষয় যশের অধিকারী করলো তা অবশ্য তাঁর সমসাময়িকেরা স্পষ্ট বোঝেননি, তাঁরা ভেবেছিলেন যে মিল-বর্জনটাই খুব বড়ো কথা। ওই মিল বস্তুটিকে একটু তলিয়ে দেখলেই এই ভুল ধারণা ভাঙতে পারে। যাকে আমরা মিল বলি আসলে তা তো অনুপ্রাসেরই রকমফের, এবং কোনো-না-কোনো শ্রেণীর অনুপ্রাস পদ্য-গদ্য লিখিত-কথিত সর্বপ্রকার ভাষার মর্মমূলে প্রোথিত। মিলের, অর্থাৎ পদান্ত অনুপ্রাসের, অভাব মেটাতে গিয়ে মাইকেল যে-ধরনের বাগাদনের সাহায্য নিয়েছিলেন তাতে সরস্বতীর হাড়ে বাতাস লাগেনি; ধ্বনিগাম্ভীর্যের তাগিদে অফুরন্ত অনুলাপের শরণ নিয়েছিলেন তিনি; একই শব্দের পুনরুক্তিদোষে তাঁর রচনা ভারাক্রান্ত;* তাছাড়া ‘কড়মড়মড়ে’ ‘ঝক ঝক ঝকে’ ইত্যাদি বালভাষিত পদাবলিরও তাতে অভাব নেই। মিলের কথাটা তাই বড়ো কথা নয়; মাইকেলের যতিস্থাপনের বৈচিত্র্যই বাংলা ছন্দের ভূত-ঝাড়ানো জাদুমন্ত্র। কী অসহ্য ছিলো ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল’-র একঘেয়েমি, আর তার পাশে কী আশ্চর্য মাইকেলের যথেচ্ছ-যতির উর্মিলতা। অবশ্য এ-বিষয়ে সমসাময়িক আলোচনা কম হয়নি, কিন্তু যতিপাতের এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে-সঙ্গেই যে ছন্দে প্রবহমাণতা এসে অন্তহীন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলো এ-কথাটা তৎকালীন অনুসন্ধানীর দৃষ্টিগোচর হয়নি, হেমচন্দ্রের না, মাইকেলের নিজেরও না। প্রকৃতপক্ষে, অন্য কোনো কারণে যদি না-ও হয়, শুধু বাংলা ছন্দে প্রবহমাণতার জনক বলেই মাইকেল উত্তরপুরুষের প্রাতঃস্মরণীয়, এবং যদি মিলহীনতার দিকে অত্যন্ত বেশি জোর না-দিয়ে তাঁর সহজীবীরা প্রবহমাণতার তত্ত্বটা আবিষ্কার করতেন, তাহলে শ্রীযুক্ত অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শ বহুপূর্বেই স্বতঃসিদ্ধ হতো যে এ-ছন্দের যথার্থ নামকরণ অমিত্রাক্ষর নয়, অমিতাক্ষর।
[যেমন
ভূষিতে মৃণালভুজ সুমৃণালভুজা;
কোমল কণ্ঠে স্বর্ণকণ্ঠমালা
ব্যথিল কোমল কণ্ঠ!
প্রবল পবন বলে বলীন্দ্র পাবনি
রঞ্জিত রঞ্জনরাগে, কুসুম-অঞ্জলি
আবৃত, পুড়িছে ধূপ ধূমি ধুপদামে;
ইত্যাদি। ‘রঞ্জিত রঞ্জনরাগে’, অর্থাৎ কিনা ‘রঙের রঙে রাঙানো’!]
কিন্তু মাইকেলি অমিত্রাক্ষর বাংলা ছন্দের নবজন্মের যবনিকা-উত্তোলক মাত্র, আসল পালা আরম্ভ হলো রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। মাইকেলের যে-কোনো কাব্যের যে-কোনো অংশের সঙ্গে মানসীর “নিষ্ফল কামনা”র অমিত্রাক্ষরের তুলনা করলে দুয়ের মধ্যে ব্যবধান অন্তত একশো বছরের মনে হয়। কী-উপায়ে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসকে চৌদূনে চালিয়েছিলেন সে-বিষয়ে নানা মুনির নানা মত হতে পারে, কিন্তু এ-কথা নিশ্চিত যে মাইকেলের তাতে কোনো হাত ছিলো না। এটা উল্লেখযোগ্য যে রবীন্দ্রনাথের কৈশোর রচনায় হেমচন্দ্রের প্রভাব পর্যন্ত লক্ষ করা যায়, কিন্তু মধুচক্রের মক্ষিকাবৃত্তির চিহ্নমাত্র নেই; তাঁর জন্মের অব্যবহিত পূর্বে মধুসূদন যদি যবনিকা উত্তোলন না-ও করতেন, তবু রবীন্দ্রনাথের পালা যখন এবং যে-ভাবে আরম্ভ হবার ঠিক তা-ই হতো। আসল কথা, বাংলা ভাষার প্রাণের ছন্দের সঙ্গে মাইকেল তাঁর অমিত্ৰছন্দকে মেলাতে পারেননি, তাই তাতে শুধু আন্দোলন আছে, স্বাচ্ছন্দ্য নেই; বেগ আছে প্রবল, কিন্তু গতির অনিবার্যতা নেই; এ যেন নদী নয়, আবর্ত, সেখানে নৌকো ভাসালে ডুবে যদি না মরি তাহলে নিরাপদেই ঘরে ফিরবো, কেননা অলক্ষ্যে অসীমের দিকে তা টেনে নিয়ে যায় না। আমি বলতে চাই, মাইকেল পড়বার পর পুরোনো জীবনের নিশ্চিন্ত পুনরাবৃত্তি সম্ভব, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সুর একবার যার প্রাণে লেগেছে, জীবনের মতো অন্য মানুষ হয়ে গেছে সে। মাইকেল পড়া না-পড়ায় শিক্ষার তারতম্য ঘটে; রবীন্দ্রনাথ পড়া না-পড়ায় জন্ম-জন্মান্তরের ব্যবধান।
আমি ভুলিনি যে মাইকেল পুরোমাত্রায় সচেতন শিল্পী। শুধু যে বাংলা ছন্দে যুক্তবর্ণের পরম রহস্যের তিনি আবিষ্কর্তা তা নয়; বাংলা স্বরব্যঞ্জনের ফলদ প্রয়োগ সম্বন্ধেও অবহিত ছিলেন বলেই
আইলা তারাকুন্তলা, শশী সহ হাসি
শর্বরী; বহিল চারি দিকে গন্ধবহ
তাঁকে তৃপ্ত করতে পারেনি,
আইলা সুচারু-তারা, শশী সহ হাসি,
শর্বরী; সুগন্ধবহ বহিল চৌদিকে,
লিখে সূক্ষ্মতর ধ্বনিসন্ধানের পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু যে-কোনো কাজ সর্বপ্রথম করতে গেলে তাতে আতিশয্য প্রায় অরোধ্য : প্রথম কথা-বলা সিনেমায় যেমন সমস্তটাই ছিলো নিছক চ্যাঁচামেচি, তেমনি মাইকেলও যুক্তবর্ণের আশ্চর্য যন্ত্রটি প্রথম হাতে পেয়ে হৈ-চৈ ও ধ্বনিসৌযম্যের প্রভেদ ভুলেছিলেন। তা না-হলে অমিত্রাক্ষরের এই পূজারি মার্লো শেক্সপিয়র ওয়েবস্টারকে অবহেলা করতেন না, অন্ততপক্ষে তাঁর উপাস্য মিল্টনের অনুকরণে একই যন্ত্র থেকে তূরীনির্ঘোষ ও সেভারের মীড় বের করার চেষ্টা করতেন। মাইকেলি ছন্দের প্রধান দোষ এই যে সেটা আগাগোড়াই অত্যন্ত বেশি কড়া, তাতে নিচু গলা কখনো শুনি না, নরম সুর কখনো বাজে না; সেটা কোনোখানেই গান নয়, সমস্তটাই বক্তৃতা। মেঘনাদবধ কাব্যের চতুর্থ সর্গে সীতা সরমার সম্মিলিত ক্রন্দন, আর পঞ্চম সর্গে –
ইন্দ্রাণীর কর-পদ্ম ধরিয়া কৌতুকে,
প্রবেশিলা মহা-ইন্দ্ৰ শয়ন-মন্দিরে-
সুখালয়! চিত্রলেখা, উর্বশী, মেনকা,
রম্ভা, নিজ গৃহে সবে পশিলা সত্বরে।
খুলিলা নূপুর, কাঞ্চী, কঙ্কণ, কিঙ্কিণী
আর যত অভরণ; খুলিলা কাঁচলি;
শুইলা ফুল-শয়নে সৌর-কর-রাশি-
রূপিণী সুর-সুন্দরী। সুস্বনে বহিল
পরিমলময় বায়ু, কভু বা অলকে,
কভু উচ্চ কুচে, কভু ইন্দু-নিভাননে
করি কেলি, মত্ত যথা মধুকর, যবে
প্রফুল্লিত ফুলে অলি পায় বন-স্থলে!
—ইন্দ্র-দম্পতির বাসরশয্যার এই বর্ণনা, এ-সব অংশ মনে হয় যত অলংকৃত ততই দরিদ্র—এতে আড়ম্বর আছে, আয়োজন প্রচুর, কিন্তু প্রাণ নেই, সাড়া তোলে না। এর কারণ শুধু প্রত্যক্ষদৃষ্টির অভাবই নয়, এর জন্য উপরন্তু দায়ী এই অমিত্রাক্ষরের প্রকৃতি। মাইকেলের ছন্দ ঢাকের বাদ্যির মতো, তাতে জোর আওয়াজ, কিন্তু রেশ নেই। মেঘনাদি ডঙ্কানাদে তাই আগামীর আগমনী বাজলো না, তা নির্বীজ ঐশ্বর্যের উদাহরণ হয়েই থাকলো, এবং রবীন্দ্রনাথ যখন আমাদের ভাষা-পাষাণীর ঘুম ভাঙালেন, তখন দেখা গেলো ছন্দের প্রবহমাণতার সঙ্গে মিলের কোনো মৌল বিরোধ নেই, বরং প্রবহমাণতাই সেই শক্তি যাতে পদে-পদে মিল দিয়েও মিল লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়, আর সেই সঙ্গে এ-কথাও আমরা বুঝলুম যে যতিপাতের স্বৈরিতা শ্বাসনালীর চমকপ্রদ ব্যায়াম নয়, তার আসল কাজ কাব্য-ভাষার সঙ্গে কথ্য ভাষার ঘটকালি।
অবশ্য মাইকেলও মনে-মনে অনুভব করেছিলেন যে যতির যদৃচ্ছতা দরজা দিয়ে ঢুকলেই মিলের ঝাঁক জানলা দিয়ে উড়ে পালায় না, শুধু তা-ই নয়, মিল-সংস্থাপনের পাশ্চাত্ত্য বৈচিত্র্য প্রবহমাণতার স্বাধীনতাই দাবি করে;–নয়তো সনেটগুচ্ছ তিনি লিখেছিলেন কেমন করে। উপরন্তু, তাঁর পত্রাবলি পড়ে বোঝা যায় যে গদ্যের ভূভারতের সঙ্গে কাব্যের স্বর্ণলঙ্কার সেতুবন্ধই ছিলো তাঁর অচেতন প্রয়াস, এবং সেই অসম্পূর্ণ, অব্যবহার্য, পরিত্যক্ত সেতুরই আমরা নাম দিয়েছি মাইকেলি অমিত্রাক্ষর। যদিও রবীন্দ্রনাথের কোনো কীর্তির পক্ষেই মাইকেলের অগ্রগামিতা অপরিহার্য নয়, তবু এ-কথাও সত্য যে অনুজ যা-কিছু করেছেন তার কোনো-কোনো অংশ অগ্রজকে দিয়েও সাধিত হতে পারতো, যদি তিনি সুস্থ মনে দীর্ঘজীবী হতেন। শুধু যে তথাকথিত অমিত্রাক্ষরকে সত্যকার সফলতায় পৌঁছিয়ে দিতে পারতেন তা নয়, যাকে আমরা আজকাল বলি তিনমাত্রার ছন্দ, বা মাত্রাবৃত্ত, তাও তাঁর মনে উঁকিঝুঁকি দিয়েছিলো,* এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, কাব্যে যে-গুণ তাঁর কখনো বর্তায়নি, সেই স্বাচ্ছন্দ্যকে অর্জন করেছিলেন গদ্য-মহাদেশের দুই বিপরীত সীমান্তপ্রদেশে। প্রহসনদুটির প্রাণপূর্ণ সংলাপ পড়ে যেমন মনে হয় যে পদ্মাবতী কৃষ্ণকুমারীকে নিয়ে পণ্ডশ্রম না-করে ব্যঙ্গবিদ্রূপের রঙ্গমঞ্চে নামলেই তাঁর প্রতিভার ধর্মরক্ষা হতো, তেমনি আবার হেক্টর-বধের উদার গম্ভীর গদ্য পড়ে বলতে লোভ হয় যে দৈবাৎ গদ্যকাহিনীতে হাত দিলে ইনিই হতেন বাংলা উপন্যাসের স্রষ্টা—অন্তত, আদ্যন্ত হোমার অনুবাদ করে উঠতে পারলে সে-গ্রন্থ যে কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের মতোই বাঙালির একটি রত্নখনি হতো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে মাইকেল আমাদের হতভাগ্যতম কবি; ব্যস্ত, উদ্ধত, অব্যবস্থিত উৎসাহে এই প্রায়-প্রৌঢ় যুবক তাঁর সাহিত্যিক তড়িৎ-যুদ্ধ চালিয়েছেন, এক-এক মাসে এক-একটা নতুন দেশ জয় করে চমক লাগিয়ে দিয়েছেন রাজপুত্র থেকে জুতোওলা পর্যন্ত সকলকে;–কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। তাঁর কর্মসূচিতে দেখতে পাই পরীক্ষার পর পরীক্ষা— পদ্যে ও গদ্যে, নাট্যে ও কাব্যে শুধু পরীক্ষা; অনেকটা তার নিছক চর্চা, নিতান্তই লিখতে শেখা, প্রাক্-‘মানসী’ রবীন্দ্ররচনার সগোত্র, অনেকটাই অবিমিশ্র অপব্যয়, যে-অপব্যয় যে-কোনো সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় অপরিহার্য। দেখতে পাই, যেদিকে তাঁর সহজাত ক্ষমতা সেদিকে তাঁর যথোচিত মনোযোগ নেই; যেটা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ, যেন বাজি রেখে সেইটে করার দিকেই ঝোঁক। ট্র্যাজেডি তাঁর ধারণার মধ্যে কোনো কালে আসেনি, অথচ ট্র্যাজেডি লিখতে গেলেন; পক্ষান্তরে, নাটকের ভাষা পদ্য হওয়া উচিত—এমন পদ্য যা কানে শোনাবে গদ্যের মতো অথচ মনের উপর কবিতার মতো কাজ করবে—এই অত্যন্ত উৎসাহজনক অভিমত ঘোষণা করেও কেন যে কখনো কাব্যনাট্য লিখলেন না, কিংবা লিরিক প্রেরণাকে আধুনিক কাব্যের বিশল্যকরণী বলে অনুভব করা সত্ত্বেও কেন কার্যত তাঁর সে-প্রেরণা আবদ্ধ রইলো শিশুপাঠ্য পদ্যসন্দর্ভে, তা মাইকেলের ভাগ্যবিধাতা ছাড়া সকলেরই অগোচর। তাঁর জয়যাত্রা অত্যন্ত অস্থির বলেই উত্তেজক; যে-ভাষার সওয়ার হয়ে বেরিয়েছেন সে সর্বদাই সচেষ্ট তাঁকে পিঠ থেকে ফেলে দিতে, যেহেতু তাঁর প্রতিজ্ঞা গায়ের জোরেই তাঁকে অনভ্যস্ত পথে চালাবেন। যতদিনে ভাষাকে তিনি প্রায় বাগে এনেছেন, চোখের সামনে পথ দেখা যাচ্ছে, যতদিনে নিজের ব্যর্থতার কাছে শিক্ষা নিয়ে-নিয়ে প্রায় প্রস্তুত হয়েছেন সত্যকার সফলতার জন্য, ততদিনে তাঁর জীবনে যে-দুর্ভাগ্য ঘিরে এলো তার অবসান হলো একেবারে মৃত্যুতে। যে-সত্যের আভাস তিনি পেয়েছিলেন তা আভাস হয়েই রইলো; সাহিত্য-রচনার যে-সব রীতি-নীতি উপলব্ধি করেছিলেন, তার প্রয়োগের অন্তরায় হলো ভাষাকে আত্মীকরণের অক্ষমতা; সাহিত্যশক্তির যে-বিভিন্ন উপাদানগুলিকে তিনি স্বতন্ত্রভাবে পরখ করে দেখেছিলেন, যথাযথমাত্রায় সেগুলির সমন্বয়ের সময় হলো না—তাঁর সমগ্র সাহিত্যিক জীবন বলতে গেলে মাত্রই তো পাঁচ-সাত বছরের। তাই সুধীন্দ্রনাথের সিদ্ধান্ত যদিও স্বীকার্য যে ‘বাঙালী কবিকে তরজাওয়ালার দল থেকে বাঁচিয়েছিলেন তিনিই’, এবং এইখানেই তাঁর ঐতিহাসিক প্রাধান্য, তবু আন্তরিক বিচারে তাঁকে অপরিণত অকালমৃত কবির মতোই আমাদের লাগে আজকাল; –তাঁকে মনে হয় এমন কোনো কবি, নিজের শক্তির ব্যবহার যিনি জানেন না, নিজের উদ্দেশ্যকে নিজেই পরাস্ত করেন, যাঁকে আমরা চড়া গলায় প্রশংসা করি, আর তাতেই আমাদের দায়িত্ব ফুরোয় বলে যাঁর জন্য আমাদের দুঃখ হয়।
১৯৪৬
[* যেমন :
কেনে এত ফুল তুলিলি, সজনি—
ভরিয়া ডালা?
মেঘাবৃত হলে, পরে কি রজনী
তারার মালা?
আর কি যতনে, কুসুম রতনে
ব্রজের বালা?
(ব্রজাঙ্গনা। কুসুম)
এ-কবিতাটির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কবি অশোকবিজয় রাহা। এ-ছাড়া আরো দুটি রচনা লক্ষণীয় :
কাব্যেকখানি রচিবারে চাহি,
কহো কি ছন্দঃ পছন্দ, দেবি!
কহো কি ছন্দঃ মনানন্দ দেবে
মনীষীবৃন্দে এ সুবঙ্গদেশে?
(দেবদানবীয়ম)
এখন কি আর্ নাগর্ তোমার্
আমার প্রতি, তেমন আছে।
নুতন পেয়ে পুরাতনে
তোমার্ সে যতন গিয়েছে।
(গান। ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’)
যুক্তবর্ণের প্রয়োগ আরো একটু স্পষ্ট হলেই মাত্রাবৃত্ত ছন্দ মাইকেলি আবিষ্কারের অন্তর্গত হতে পারতো, এমনকি ‘বেঠিক পথের পথিক’-এর ছন্দও যে তাঁর হাতে ধরা পড়তে-পড়তে ফস্কে গেলো তৃতীয় উদ্ধৃতিটিতে তার প্রমাণ আছে।]
