বাংলা শিশুসাহিত্য – বুদ্ধদেব বসু
বাংলা শিশুসাহিত্য – বুদ্ধদেব বসু
১
আমরা ছোটো ছিলুম বাংলা শিশুসাহিত্যের সোনালি যুগে। দুই অর্থেই সোনালি সেই যুগ। প্রথমত, সে-ই আরম্ভ, সূত্রপাত—বলতে গেলে শিশুসাহিত্যই শিশু তখনও; আমরা এখন যারা সসম্মানে কিংবা যে-কোনো প্রকারে মধ্যবয়সে অবস্থান করছি, বাংলা ভাষার লক্ষণযুক্ত শিশুসাহিত্য আমাদেরই ঠিক সমসাময়িক। দ্বিতীয়ত, গুণের বিচারেও সোনালি; শুদ্ধ, সরল, সুন্দর, স্বচ্ছন্দ—এই অর্থেও সোনালি। এই সমাবেশ সুলভ নয়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথমে যেটা করা হয়, সেটাই সবসময়ে ভালো হয় না। অনেক সময়ই দেখা যায় যে পথিকৃৎগণের ক্রিয়াকলাপ উত্তরকালের কাজে লাগে, আনন্দের আয়োজনে নয়, ইতিহাসের সূত্র সন্ধানে। বাংলা ভাষার শিশুসাহিত্য এ-বিষয়ে উল্লেখ্য ব্যতিক্রম। সেই প্রথম অধ্যায়ে প্রাচুর্য ছিলো না, মন-ভোলানো, অন্ততপক্ষে চোখ-ভোলানো রকমারি ছিলো না এত, কিন্তু যেটুকু ছিলো সেটুকু একেবারেই খাঁটি। বই ছিলো কম; কিন্তু যে-কটি ছিলো, তাদের অধিকাংশেরই আজ পর্যন্ত জুড়ি মেলেনি, অধিকাংশই আজকের দিনে ক্লাসিক বলে গণ্য হয়েছে। তখনকার শিশু-চিত্তের যাঁরা প্রতিপালক, তাঁরাই যে বাল্যবঙ্গের নিরন্তরভোগ্য মধুচক্র বানিয়েছেন, এই কথাটা আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করি। সংখ্যায় তাঁরা মাত্রই কয়েকজন। প্রাতঃকালীন, প্রাতঃস্মরণীয়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, নানা-রঙিন রূপকথার দক্ষিণারঞ্জন, আর সেই বিস্ময়কর রায়চৌধুরী পরিবার, বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে-একটিমাত্র পরিবারের আসন, মাত্রাভেদ যত বড়োই হোক না, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পরেই। কোনো-একটা সময়ে এ-রকমও আমাদের মনে হয়েছিলো যে বাংলা শিশুসাহিত্য এই রায়চৌধুরীদেরই পারিবারিক এবং মৌরশি কারবার ভিন্ন কিছুই নয়। উপেন্দ্রকিশোর এই উজ্জ্বল যুগের আদি পুরুষ। তিনিই আমাদের প্রথম শোনালেন রামায়ণ, মহাভারত; যাকে বলা যায় বাংলা দেশের অমর হড়ার গদ্যরূপ, সেই ‘টুনটুনির গল্প’ শোনালেন। কুলদারঞ্জনের পুরাণের গল্পে প্রাচীন ভারতের হৃদয়ের পথ খুঁজে পেলুম আমরা; তাঁর রবিন হুডের কাহিনীতে, যাতে ভোরবেলার শিশির-ছোঁয়া গন্ধটুকুও যেন লেগে ছিলো, মধ্যযুগীয় ‘সবুজ সুভগ’ ইংলন্ডের কত স্বপ্নেই মধুর হলো ছেলেবেলা। আর সুখলতা রাওয়ের ‘গল্পের বই’, ‘আরো গল্প’ সেই দুটি— হায়রে দুটিমাত্র! বইয়ের কথা কি বলবার! না কি তারা কখনোই ভোলবার! শৈশবের হৃদয়মন্থন এই বই ক-টি, সংখ্যায় বেশি নয় বলেই সম্ভোগে নিবিড়, অফুরন্ত বার পড়েও কখনো পুরোনো হতো না— আজকের দিনেও তারা পুরোনো হয়নি।
এটুকু হলেই যথেষ্ট মনে হতো, সাহিত্যের সেই প্রথম অবস্থায় খুব বেশি কেউ চাইতে শেখেনি, কিন্তু প্রাণের অব্যক্ত ইচ্ছা মূর্ত হয়ে উঠলো একটি পত্রিকায়। ছোটোদের আশার হরিণকে দিগন্তের দিকে ছুটিয়ে দিয়ে মাসে-মাসে আসতো ‘সন্দেশ’, আসতো তার আশ্চর্য মলাট আর ভিতরকার মনোহরণ রঙিন ছবি নিয়ে, আসতো দুটি মলাটের মধ্যে সাহিত্যের বিচিত্র ভোজে উজ্জ্বল পাইকা অক্ষরের পরিবেশন। কবিতা, গল্প, উপকথা, পুরাণ, প্রবন্ধ, ছবি, ধাঁধা—সন্দেশের ভোজ্য তালিকায় এমন কিছু ছিলো না, যা সুস্বাদু নয়, সুপাচ্য নয়, যাতে উপভোগ্যতা আর পুষ্টিকরতার সহজ সমন্বয় ঘটেনি। শুধু তা-ই নয়, সমস্ত বিভিন্ন রচনার মধ্যে এমন একটি সংগতি ছিলো সুরে, এমন একটি অখণ্ডতা ছিলো এই পত্রিকাটির চরিত্রে, যে অনেক সময় পুরো সংখ্যাটা একজনেরই রচনা বলে মনে হতো। এই ধারণার সমর্থন করতো অস্বাক্ষরিত রচনার প্রাচুর্য। স্পষ্টত একই হাতের কর্ম সে-সব। অনেক লেখাই অনামিতে বেরোতো ‘সন্দেশে’; সেইসব খেয়ালি কবিতা, ছন্দে-মিলে মন্ত্র-পড়ানো এবং অর্থহীনতায় অর্থময় সব কবিতা, পাতা খুলে প্রথমেই যার প্রিয় কণ্ঠের অভ্যর্থনা শুনতাম, আর কখনো-কখনো একই সংখ্যায় যার দুটি-তিনটি করে পাওয়া যেতো; আর সেইসব স্কুল-ছেলেদের হাস্যস্ফুরিত সমানুভাবী গল্প, বালকের প্রচ্ছন্ন জগতে নিত্যনতুন আবিষ্কারের কাহিনী, যেখানে অধ্যবসায়ী নন্দলাল নিয়তিনির্বন্ধে কিছুতেই প্রাইজ় পায় না, পাগলা দাশুর রহস্যময় বাক্স শুধু কৌতূহলের অসারতা প্রমাণ করে, এবং মাতুলবিলাসী কল্পনাপ্রবণ যজ্ঞিদাস কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের বিরোধ সইতে না-পেরে মর্মাহত হয়, –এইসব অস্বাক্ষরিত গল্প-কবিতা যে কার লেখা, সে-বিষয়ে ‘সন্দেশে’র তৎকালীন পাঠকরা ঠিক অবহিত না-থাকলেও সারা বাংলায় তার প্রচার হতে বিলম্ব হলো না—যখন ‘হ-য-ব-র-ল’ আর ‘আবোল তাবোল’ এই দুটি বই প্রকাশিত হলো। শুধু তো বই দুটি নয়, প্রকাশিত হলো প্রতিভা, অকালমৃত্যুর বেদনাজড়িত সেই বিস্ময় বাংলার চিত্তলোকে তরঙ্গ তুললো সেদিন। সোনার খাতায় নতুন একটি নাম উঠলো, নতুন একটি তারা ফুটলো আকাশে : সুকুমার রায়।
২
আজ আমার সেই ছেলেবেলার পড়া, বাঙালি ছেলের চিরকালের পড়া রচনাবলির কিছু অংশ নতুন আকারে দেখতে পেয়ে আনন্দিত হচ্ছি। ইতিমধ্যে অনেক বছর কেটেছে; আমরা যারা এ-সব লেখার প্রথম ছোটো ছোটো ভোক্তা ছিলুম, আজ আমাদেরই উপর ভার পড়েছে নবীন তরুণদের মনের খাদ্য জোগান দেবার। এই চেষ্টায় সম্প্রতি আমরা নানাভাবে হতকাম হয়েছি। যে-সব বই বিশেষভাবে অপত্যপাঠ্য মনে করি, তা সংগ্রহ করা অনেক সময়ই সহজ হয়নি। বাংলা দেশে এত বড়ো দুর্ঘটনাও ঘটেছিলো যে ‘আবোল তাবোল’ অনেক বছর ছাপা ছিলো না। মাঝে কুলদারঞ্জন অবলুপ্তির প্রান্তে এসে ঠেকেছিলেন, সুখলতা রাওয়ের বই যোগাড় করতে প্রায় গোয়েন্দা লাগাবার প্রয়োজন হতো। এ-সব বইয়ের পুনঃপ্রকাশ তাই সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে মনে করি। পাশাপাশি দেখছি সুকুমার রায় আর কুলদারঞ্জনকে, আর সুখলতা রাওয়ের বই দুটি যুক্ত হয়ে ‘গল্প আর গল্প’ নামে বেরিয়েছে। এই রচনাগুচ্ছে—রায়চৌধুরীদের সমগ্র রচনাগুচ্ছে—একটি পারিবারিক সাদৃশ্য দেখতে পাই। ব্যক্তিভেদে শক্তির তারতম্য আছেই, কিন্ত মৌল সাদৃশ্য যেখানে ধরা পড়ে, সেটি তাঁদের সহজ ভঙ্গিতে গল্প বলার অবসাদহীন প্রবাহে, কণ্ঠস্বরের সেই লাবণ্যে, যে-কোনো লাইন চোখে পড়লেই মনের মধ্যে যার প্রভাব ছড়ায়। এই লাবণ্য গুণটি বুঝিয়ে বলা শক্ত—কিংবা খুবই সহজ, অর্থাৎ এটি সাহিত্য-রান্নায় সেই লবণ, যার অভাবে অন্য কিছুরই স্বাদ ওঠে না। এ-ক্ষেত্রে বলা যায় যে এঁরা ঠিক ছোটোদের মতো করেই বলতে পারেন— মানে, ছোটোরা নিজেরা যে-রকম করে বলবে সে-রকম অবশ্য নয়, কিন্তু যেমন বললে তাদের মনে হবে যে তাদের মতোই বলা হচ্ছে, ঠিক তেমনি করেই বলতে পারেন এঁরা। তাই এঁদের লেখায় কৃত্রিমতা নেই; এক ফোঁটা পিঠ-চাপড়ানো নেই ছোটোদের উদ্দেশে, কোনোরকম ইস্কুল-মাস্টারি করুণা কিংবা কর্তব্যবোধ নেই; ছোটোদের সম্মান সম্পূর্ণ বজায় রাখেন এঁরা, কিন্তু তাই বলে স্বকীয় সত্তা ভোলেন না, নিজেরাই ছেলেমানুষির ভুল করেন না কখনো, বন্ধুতাস্থাপনের চেষ্টায় অশোভন মুখভঙ্গি করে শ্রদ্ধা হারান না। সুকুমার রায়ের প্রত্যেক গল্পেই উপদেশ আছে, কিন্তু সেটা বাইরে থেকে নিক্ষিপ্ত নয়, ভিতর থেকেই প্রকাশ-পাওয়া; সে-উপদেশ সেই জাতের, যা বালকেরা নিজেরাই মাঝে-মাঝে কৃতজ্ঞ চিত্তে নিয়ে থাকে জীবন থেকে। এইজন্যই তাদের উপভোগ কখনো ব্যাহত হয় না; তাদের বয়সোচিত নানারকম ছলচাতুরী বোকামি এবং দুষ্টুমির শেষে জব্দ হওয়ার দৃশ্যটিতে নিজেরাই তারা প্রাণ খুলে হাসে; ঐ জব্দ হওয়ার—যদিও তারাই এক-একজন এক-এক গল্পের নায়ক—সম্পূর্ণ সমর্থন করে তারা; সেটুকু না-থাকলেই ভালো লাগতো না, সত্যি বলতে। এতে প্রমাণ হয়, বয়স্ক লেখকের সঙ্গে তাঁর ছোটো ছোটো পাঠকের একান্তবোধ কত নিবিড়।
তবু যুগ-বদলের সঙ্গে-সঙ্গে সাহিত্যেও স্বাদ-বদল ঘটে থাকে, আর সুকুমার রায়ের সমস্ত লেখার মধ্যে শুধু ‘পাগলা দাশু’র গল্পগুলোই আজকের দিনে হয় কালপ্রভাবে ঈষৎ মলিন, যেন সাল-তারিখ পেরিয়ে আসা। যে-বিশেষ পরিবেশের সংলগ্নতায় এই গল্পগুলি জন্মেছিলো, সেই পরিবেশ আজ স্মৃতিকথায় পর্যবসিত; এইরকম ঐতিহাসিক ব্যবধান অনেক সময়ই রসগ্রহণে ব্যাঘাত ঘটায়। কিন্তু রূপকথা চিরন্তন, চিরকালের পুরোনো বলেই তারা নতুন থাকে;–আর এইখানেই সুখলতা রাওয়ের—কৃতিত্ব বেশি বলবো না, কিন্তু ভাগ্য ভালো। তাছাড়া যাকে লাবণ্য বলেছি, সহজ ভঙ্গি, সেই গুণটি সবচেয়ে বেশি প্রশংসা জাগায় তাঁরই লেখায়, কেননা ‘পাগলা দাশু’ বা কুলদারঞ্জনের কাহিনীর তুলনায় তাঁর গল্প আরো অনেকটা তরুণতরদের গ্রহণযোগ্য। ‘গল্পের বই’, ‘আরো গল্প’–ঠিক ‘টুনটুনির বই’য়ের মতো—একেবারেই বালভাষিত গদ্যে লেখা—অবশ্য রবীন্দ্রনাথের অর্থে নয়—সবে মাত্র যারা পড়তে শিখেছে একান্তভাবে তাদেরই উপযোগী; ছোটো ছোটো কথা, মৃদু-মৃদু বাক্য, শাদাশিধে ঘরোয়া ধরনে নিচু গলায় বলা—যেন লেখা গল্পই নয় আসলে, বলা গল্প—অথচ দক্ষিণারঞ্জনের জাঁকজমকের বেড়া ডিঙোতেও হয় না, আবার একটুও পানসে নয় তাই বলে, ছোট্ট মাপের মধ্যে ভরপুর এক-একটি গল্প। বর্ণপরিচয় পেরোনো মাত্র ধরিয়ে দেয়া যায় এমন সুখপাঠ্য গল্পের বই এ-তিনটি ছাড়া বাংলা ভাষায় এখনো বেশি হয়েছে বলে মনে করতে পারি না।
সুখলতার গল্প অবশ্য মৌলিক নয়, বিদেশী রূপকথার, প্রধানত গ্রিমভ্রাতাদের অনুসরণে লেখা। কিন্তু তাতে তাঁর গৌরবের কোনো হানি হয় না। সাহিত্যের কোনো-কোনো অবস্থায় অনুবাদ বা অনুসারী রচনা মৌলিকতারই মর্যাদা পেয়ে থাকে; তাছাড়া বৈশ্বিকতা রূপকথার চরিত্রগত, একই কাহিনীর বিভিন্ন প্রকরণ বিভিন্ন এবং বহুবিচ্ছিন্ন দেশে উদ্গত হয়ে মানবজাতির আদিম ঐক্যের সন্ধান দেয়। গ্রিমের গ্রন্থও সূক্ষ্ম অর্থে মৌলিক নয়, জর্মান দেশের আদ্যিকালের রূপকথার সংগ্রহ, আর সে-সব গল্প সুখলতার হাতে এমন অবাধভাবে দেশীয় হাওয়ায় প্রস্ফুটিত হয়েছে যে তারই জন্য বাঙালি শিশু বংশানুক্রমে কৃতজ্ঞ থাকবে তাঁর কাছে।
এই মৌলিকতার প্রসঙ্গটি আরো একটু অনুধাবনযোগ্য। সুখলতা, দৃষ্টিপাতমাত্র ধরা পড়ে, এ-বিষয়ে ব্যতিক্রম নন। তখনকার শিশু-লেখকরা প্রায় সকলেই মধুকরব্রতী; তাঁদের সাহিত্যের প্রধান অংশই অনুবাদ বা অনুরচনা—যাকে বলে অ্যাডাপ্টেশন–কিংবা প্রচলিত লোকসাহিত্যের সংগ্রহ বা সংকলন। এর উদাহরণ উপেন্দ্রকিশোর, কুলদারঞ্জন, ‘চারু ও হারু’ সত্ত্বেও দক্ষিণারঞ্জন, এবং অজস্র স্বাধীন রচনা সত্ত্বেও স্বয়ং যোগীন্দ্রনাথ। নিজে গল্প তৈরি করে কী হবে, তার প্রয়োজনই বা কী—এঁদের মনের ভাবখানা ছিলো এইরকম; দেশে ও বিদেশে যে-রত্নরাজি ছড়িয়ে পড়ে আছে, সেইগুলির যথাযোগ্য পরিবেশনেই এঁদের প্রযত্ন ছিলো। বাংলাদেশের সেটা ছিলো ফুটে ওঠার, হয়ে ওঠার সময়; এ-রকম সময়ে কোথাও-কোথাও অনুবাদের বড়ো-বড়ো যুগ এসেছে; যে-দৃশ্য আমরা দেখতে পাই চসারের কিংবা মার্লোর ইংলন্ডে, বাংলা শিশুসাহিত্যের আলোচ্য অংশ তারই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। এই ঐতিহাসিক অবস্থায় স্বাধীন এবং পরনির্ভর রচনায় ভেদচিহ্ন স্পষ্ট থাকে না; আর ভেবে দেখতে গেলে কোনো লেখাই তো সম্পূর্ণ ‘স্বাধীন’ নয়— বিশেষত, দেশে যখন কিছুই নেই, তখন অতীত থেকে, বিদেশ থেকে সংকলন কর্মই স্রষ্টা-মনের যোগ্য হয়ে ওঠে।* পূর্বসূরিরা জঙ্গল কেটে সাফ করলেন, তৈরি করলেন পথ, নানা দেশের নানান বীজ ছড়িয়ে দিলেন মাটিতে—আর এমনি করে ঘটিয়ে দিলেন, ফলিয়ে তুললেন সুকুমার রায়ের সুপরিণত ব্যক্তিস্বরূপ।
[* এই অনুবাদের ধারা উনিশ শতকেই আরম্ভ হয়েছিলো–আর তা শুধু নাবালক সাহিত্যেই নয়—বিদ্যাসাগরের ‘কথামালা’র পাশে কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতও আমরা দেখতে পাই। পরবর্তীকালে অবনীন্দ্রনাথও অনেকাংশে অনুলেখক। এ-প্রসঙ্গে আরো স্মর্তব্য যে বাংলার ‘স্বদেশী’ যুগে দেশজ রত্ন উদ্ধার করার যে-আবেগ এসেছিলো, তা তথাকথিত শিশুসাহিত্যেই আবদ্ধ থাকেনি; যে-প্রেরণায় যোগীন্দ্রনাথ ছড়া সংগ্রহ করলেন, উপেন্দ্রকিশোর লৌকিক গল্প আর দক্ষিণারঞ্জন রূপকথা, সেই একই প্রেরণার মহার্ঘ ফল ‘কথা ও কাহিনী’।]
৩
সুকুমার রায়কে আমি বরাবর শ্রদ্ধা করেছি শুধু হাস্যরসিক বলে নয়, শুধু শিশুসাহিত্যের প্রধান বলে নয়, বিশেষভাবে সাবালকপাঠ্য লেখক বলেও। তাঁর কথা ভাবলে অনিবার্যত মনে পড়ে ল্যুইস ক্যারল-এর যুক্তিচালিত বিস্ময়লোক, মনে পড়ে এডওঅর্ড লিয়র-এর লিমেরিকগুচ্ছে ব্যক্তিবাদের পরাকাষ্ঠা। এই শেষের কথাটা একটু বুঝিয়ে বলা দরকার। য়োরোপে যন্ত্রযুগ এসে যখন বললো, ‘সব মানুষকে এক ছাঁচে ঢালাই করে দাও’, সমাজের সেই স্পর্ধার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জেগে উঠলো সাহিত্যের নানা বিভাগে। লিয়রের আপাত-লঘু পঞ্চপদাবলি সেই প্রতিবাদেরই অন্যতম দলিল। তাঁর প্রহসনের পাত্র-পাত্রী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চরম নমুনা; একদম বেপরোয়া তারা, মরীয়ারকম স্বাবলম্বী, বা স্বেচ্ছাচারী—কেউ তারা গাছে উঠে বসে থাকে, কেউ দাড়িতে টুপিতে যত রাজ্যের পাখি জোটায়, কেউ বা ঝাঁপিয়ে পড়ে এটনার গনগনে উনুনটার মধ্যে–আর তাদের এ-সব কাণ্ড দেখে ‘they’ বা অন্যেরা যখন হাসে বা মারতে ওঠে, তখন তারা মরে গেলেও গোঁ ছাড়ে না। এই ‘অন্যেরা’ হলো সমাজ, যে-সমাজ মানুষকে কল বানাতে চায়। অ্যালিসের স্বপ্নলোকেও সবই অদ্ভুত, অবৈধ, অসামাজিক—নিয়মহারা নয়, কিন্তু উল্টো নিয়মের অধীন—যে-নিয়মে ওঅর্ডস্বার্থের সাত্ত্বিক বুড়ো ফাদার উইলিয়ম হঠাৎ খেপে গিয়ে অনবরত মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকে; যা-কিছু পোষ-মানা, আপোশে চলা, অতিশয় আরামদায়ক এবং গতানুগতিক, তাকে ‘মানি না’ বলার সম্ভাবনাটাই ক্যারলের অসম্ভাবনার তাৎপর্য। ভিক্টরীয় যুগের অনেক নিন্দে শোনা গেছে, কিন্তু এই আশ্চর্য ‘ননসেন্স’ সাহিত্য—যার মরাল-গীতি চেস্টার্টন গেয়েছিলেন—তারও উত্থান এই সময়েই ঘটেছিলো, মৃদু-মসৃণ ‘লন টেনিসন’-এর আমলে। এই ‘ননসেন্স’ আর-কিছুই নয়; আধুনিক সমীকরণের বিরুদ্ধে তির্যক বিদ্রোহ-ঘোষণা।
সুকুমার রায়ের জগৎটাতেও এই বিদ্রোহের আভাস দেখা যায়। সেখানেও রাজার পিসি কুমড়ো নিয়ে ক্রিকেট খেলে, আর রাজা বিশ্ববিমুখ মুণ্ডিতমস্তকের সমস্যা নিয়ে আকুল হয়ে থাকেন; সেখানেও কেউ ছায়া ধরার ব্যবসা করে, কেউ বা আপিশটাপি সব ভুলে শুধু গান গেয়ে দিন কাটায়। এই সাদৃশ্য শুধু প্রভাবজনিত নয়। উপরোক্ত দুই ইংরেজ লেখকের কাছে, বলা বাহুল্য, সুকুমার রায়ের ঋণ অনেক; সেই ঋণ সার্থক হয়েছিলো এইজন্যে যে এঁদের সঙ্গে তাঁর নানারকম মিল ছিলো। মিল ছিলো গুণের দিক থেকে, প্রাণের দিক থেকেও। ক্যারলের মতো, তিনিও ছিলেন একাধারে শিল্পী ও বিজ্ঞানী; লিয়রের মতো, একাধারে চিত্রী ও লেখক; ক্যারলের মতোই শব্দতত্ত্বে সন্ধানী ছিলেন, উভয়ের মতোই জন্মেছিলেন, লজিকনিষ্ঠ মনের সঙ্গে খামখেয়ালি মেজাজ নিয়ে। এ-দুয়ের মিলন ঘটলে তবেই সত্যিকার খেয়াল-খাতা লেখা যায়, নয়তো ও-বস্তু আক্ষরিক অর্থেই ‘ননসেন্স’ হয়ে পড়ে। এ-ক্ষেত্রে সুকুমার রায় তাঁর উত্তমর্ণদের—সমকক্ষ বললে ভুল হবে–কেননা তাঁর ব্যঙ্গের দিকেও ঝোঁক ছিলো—কিন্তু সমীপবর্তী। ব্যঙ্গরচনা খেয়ালি লেখার সধর্মী নয়, যেহেতু লক্ষ্যগোপনেই খেয়ালি লেখার লক্ষ্যভেদ, আর স্পষ্ট কোনো লক্ষ্য ছাড়া ব্যঙ্গ হয় না। যেখানে সুকুমার রায় ব্যঙ্গনিপুণ— –যেমন “সৎপাত্র” বা “ট্যাসগরু”তে—সেখানে তাঁর উদ্দেশ্য আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই বলে অদ্ভুত রসটা বিশুদ্ধভাবে পাই না। “হাত গণনা”, “নারদ, নারদ”, “গন্ধবিচার”—যে-সব কবিতায় চরিত্রসৃষ্টি আছে, মনস্তত্ত্ব আছে—সেখানেও স্পর্শসহ ‘অর্থ’ এসে রচনার জাত বদলে দেয়। এ-কথা বলে সুকুমার রায়ের মূল্য আমি কমাতে চাচ্ছি না—অমন অপচেষ্টা কোনো বাতুল যেন না করে—আমার উদ্দেশ্য শুধু এটুকু বলা যে তিনি ছিলেন অনেকটা চেস্টার্টনের মতো—একাধারে ঠাট্টায় আর আজগুবিত্বে স্বভাবসিদ্ধ; ক্যারলের মতো, লিয়রের মতো বিশুদ্ধভাবে অদ্ভুত রসের পূজারি ছিলেন না।
কিন্তু, এই ইংরেজ যুগলের তুলনায় একটি বিষয়ে তিনি মহত্তর; সেটি তাঁর কবিত্বগুণে। এই বিচার পরম নয়, আপেক্ষিক। অর্থাৎ এখানে ‘এ বুক অব ননসেন্স’-এর সঙ্গে বা ‘অ্যালিসে’র পদ্যাংশের সঙ্গে ‘আবোল তাবোলে’র তুলনা করছি না; ভেবে দেখছি আপন ভাষার কাব্যের ক্ষেত্রে কার কী রকম মূল্য। ইংরেজিতে লিয়র কিংবা ল্যুইস ক্যারল আসন পেয়েছেন হালকা কবিতার বিভাগে; তাঁদের পদ্য কৌতুকের উৎস, কৌতূহলের বিষয়, গবেষণাযোগ্য বিরল মণিমুক্তোর মতো; কিন্তু সুকুমার রায়কে ‘হাসির কবিতা’র গণ্ডির মধ্যে ধরে রাখা যায় না, কোনো বিশেষজ্ঞতার পরিধির মধ্যেও না—তিনি বেরিয়ে আসেন বাংলা কবিতার বড়ো মহলেই। ‘আবোল তাবোল’, আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছে, বাংলা ভাষার রীতিমতো একটি কাব্যগ্রন্থ, যাতে হাসির ছুতো করে, ছবি এবং কৌতুকের সাহায্যে ভুলিয়ে এনে, শিশুদের এবং বয়স্কদেরও কয়েক ফোঁটা বিশুদ্ধ কাব্যরস অন্তঃস্থ করে দেয়া হলো। ‘মেঘ-মুলুকে ঝাপসা রাতে রামধনুকের আবছায়াতে’ বসে ‘আলোয় ঢাকা অন্ধকারে’র গন্ধে ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাবেন কি কবি ছাড়া অন্য কেউ? না কি অন্য কেউ ‘পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা’কে ‘জোছনা হাওয়ার স্বপ্ন-ঘোড়ায় চড়িয়ে দেবেন? নাকি সংসারের হাজার হট্টগোলের মধ্যে অনবরত শুনতে পাবেন যে গানের মাঝে ‘তবলা বাজে ধিনতা’? যাঁর মালপোয়ালোভী মার্জার বেরিয়ে আসে, যখন–
বিদঘুটে রাত্তিরে ঘুটঘুটে ফাঁকা,
গাছপালা মিশমিশে মখমলে ঢাকা,
জট-বাঁধা ঝুল-কালো বটগাছ তলে,
ধকধক জোনাকির চকমকি জ্বলে,…
পুবদিকে মাঝরাতে ছোপ দিয়ে রাঙা,
রাতকানা চাঁদ ওঠে আধখানা ভাঙা।
যাঁর হাস্যভীরু রামগরুড়-শাবক
যায় না বনের কাছে, কিংবা গাছে-গাছে,
দখিন হাওয়ার সুড়সুড়িতে
হাসিয়ে ফেলে পাছে।
সোয়াস্তি নেই মনে— মেঘের কোণে-কোণে
হাসির বাষ্প উঠছে ফেঁপে
কান পেতে তাই শোনে।
ঝোপের ধারে ধারে রাতের অন্ধকারে
জোনাক জ্বলে আলোর তালে
হাসির ঠারে-ঠারে।
তাঁকে কবি বলে না-মানতে হলে ‘কবি’ কথাটায় অন্যায়ভাবে সীমানা টানতে হয়। সত্য, সুকুমার রায়ের পদ্যজাতীয় রচনা অধিকাংশই সর্বতোভাবে পদ্য, পদ্য যত ভালো হতে পারে তা-ই—তার বেশি আর-কিছু নয়, কিন্তু সেই সঙ্গে এ-কথাও সত্য যে মাঝে-মাঝে পদ্যের সীমা পেরিয়ে তিনি কবিতার স্তর স্পর্শ করে যান–তখন আমরা যে-আনন্দ পাই, সেটা পরিহাসলব্ধ হতে পারে না। উদ্ধৃত অংশের উজ্জ্বল চিত্ররূপ, ছন্দের বিন্যাস, প্রথম দৃষ্টান্তে হসন্ত শব্দে অন্তর্মিল-বহুল নৌকোর দাঁড় পড়ার মতো ছপছপ আওয়াজ—সবটা মিলিয়ে কৌতুকাবহ প্রসঙ্গ এরা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, কিংবা কৌতুকের সঙ্গে কল্পনা মিশে হয়ে উঠেছে অন্য কিছু। এখানে আমরা অন্য যে-আস্বাদটুকু পাই, তাকে কবিতারই অভিজ্ঞতা বলে তখনই আমরা চিনতে পারি। অর্থাৎ, ‘আবোল তাবোল’-এর আবেদন একাধিক স্তরে; ছোটোরা কুমড়োপটাশ আর বোম্বাগড়ের রাজাকে নিয়ে হাসে, দুলে-দুলে ছন্দ পড়ে, আবৃত্তি করে চেঁচিয়ে; আর বড়োরা–হয়তো কোনো-কোনো বালক-বালিকাও—উপভোগ করে ‘দখিন হাওয়ার সুড়সুড়ি’, মুগ্ধ হয় মিলের চমকে, দেখতে পায় ব্যঙ্গের দীপ্তি, লক্ষ করে বাতিকগ্রস্তদের অবিশ্বাস্য ব্যবহারে সমাজ-বিধানের সমালোচনা।
এ-ছাড়া অন্য দিক থেকেও তাঁর দাবি আছে। নিছক পদ্যরচনার কারিগরিতে ছন্দ-মিলের অপ্রতিহত পরিচালনায় সুকুমার রায়ের দক্ষতা এমন অসামান্য যে শুধু তারই জন্য তাঁকে কবি বলে স্বীকার করার বাধা হয় না। বাংলা দেশ, এখানে স্মরণ করা ভালো, একই কবির সম্মান দিয়েছে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে; সত্যেন্দ্রনাথও পদ্যকার, পদ্য ছাড়া বেশি কিছু লেখেননি, কিন্তু সেই পদ্যই ওস্তাদের মতো, আর প্রচুর পরিমাণে লিখেছেন বলে কবিসভায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে অমান্য করা যায় না। উপরন্তু সত্যেন্দ্রনাথের তুলনায় সুকুমার রায় অনেক বেশি পরিণত মনের মানুষ, তাঁর কলাকৌশলও অনেক বেশি সাবালক; তাই তাঁর পদ্য ছোটোদের জন্য লেখা হলেও বয়স্কদের ভোগ্যবস্তু হয়েছে, আর সত্যেন্দ্রনাথের লক্ষ্য যদিও বয়স্ক পাঠক, কার্যত তাঁর অধিকাংশ কবিতাই কিশোরপাঠ্য। গত দুই দশকে বাংলা কবিতা যতটা বদলে গেছে, তাতে আজকের দিনের তরুণ কবির পক্ষে সত্যেন্দ্রনাথ আর অপরিহার্য নেই, কিন্তু লেখা শেখার যে-কোনো ইস্কুলে ‘আবোল তাবোল’ এখনো আবশ্যিক।
‘আবোল তাবোলে’র সঙ্গী বই এবার প্রকাশিত হলো ‘খাই-খাই’ নামে। বইটি চোখে দেখে, এমনকি শুধু নাম শুনে, আমার মনে পড়ে গেলো “খাই-খাই” কবিতা যখন প্রথমে বেরিয়েছিলো অদূরবর্তী, সুদূরবর্তী অতীতে। সেই গ্রন্থবিরল যুগে বিধাতার আশীর্বাদের মতো এসেছিলো নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পার্বণী’, তারই পাতায় এই অপ্রতিরোধ্য কবিতা প্রথম এবং অবিস্মরণীয়রূপে পড়েছিলাম। মনে পড়ে একটি বালককে অসংখ্যবার এটি আবৃত্তি করতে হয়েছিলো, আর তা-ই শুনে বয়স্কজনেরা কতই না হেসেছিলেন। হ্যাঁ–হাসির কবিতা সন্দেহ নেই, কিন্তু শুধু তা-ই নয়, শুধু আজব ভোজের রঙিন তালিকাই তৈরি হয়নি এখানে, মাতৃভাষার স্বরূপটিও প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলা ভাষার এক-একটি ক্রিয়াপদ কত রকম বিচিত্র অর্থে ফরমাশ খাটে, যা আমরা সকলেই জানি, কিন্তু হঠাৎ কেউ জিগেস করলে বলতে পারি না—সে-বিষয়ে আমাদের মনোরম উপায়ে সচেতন করে দিলেন সুকুমার রায়। তাঁর এ-ধরনের রচনার মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ‘শব্দকল্পদ্রুম’, আর ‘খাই-খাই’ সবচেয়ে বিস্তারিত ও সম্পূর্ণ। ‘খাই-খাই’ পদ্যে লেখা হলেও আসলে একটি প্রবন্ধ বা অভিধানের. ছিন্নপত্র, অথচ রঙে-রসে উজ্জ্বল; পণ্ডিতের সঙ্গে রসিক এখানে মিলেছে, আর রসিকতায় শান দিয়ে যাচ্ছে ছন্দ-মিলের দাঁড়ি-কমা। ঐ মিল–স্বচ্ছন্দ, অভিনব, অনিবার্য এক-একটি মিল – ওর প্রয়োজন ছিলো ওখানে-নয়তো অতক্ষণ ধরে সহ্য করা যেতো না; কিন্তু পদের ঘনিষ্ঠতা যে-সব রচনায় নেই, সেখানে লেখক পুরোমাত্রায় পুষিয়ে দিয়েছেন গল্প এনে, প্লট সাজিয়ে; ‘অবাক জলপান’ এবং অংশত ‘চলচিত্তচঞ্চরী’কে বলা যায় ‘খাই-খাই’য়েরই গদ্য প্রকরণ, অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন প্রবন্ধ। সুকুমার রায়ের মাপজোক ঠিক নিতে হলে, তাঁর নানা গুণপনা বুঝতে হলে আমাদের আসতে হবে এখানেই–তাঁর রচনাবলির এই অংশে—যেখানে ভাষাতত্ত্ব শিল্পীর হাতে সজীব হয়ে উঠেছে, যেখানে তাঁর বৈজ্ঞানিক সার্কাসে কথার খেলা দেখানো হয়। এই কথা নিয়ে খেলা করার কাজটি লেখকদের পক্ষে লোভনীয়, কিন্তু রজ্জুপথে চলার মতোই বিপজ্জনক, একচুল ভুল হলেই সেখানে অপঘাত ঘটে। এর জন্য বিশেষ একরকম মনীষিতার প্রয়োজন হয়, সেটা সকলের থাকে না। এই ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার আধুনিক লেখকদের মধ্যে সুকুমার রায় অনন্যভাবে চোখে পড়েন; তাঁর কথা-খেলার ফলশ্রুতি বিনোদনেই ফুরোয় না, তাতে ভাষার লুকোনো কোণে আলো পড়ে, ভাষাপ্রয়োগের সম্ভাবনা যেন বেড়ে যায়। ‘হাঁসজারু’ বা ‘বকচ্ছপ’ শুনে ছোটোরা যত ইচ্ছে হাসুক, কিন্তু আমাদের মনে পড়ে যায় জেমস জয়েসকে আর পূর্বসূরি ল্যুইস ক্যারলকে যিনি ‘slithy’ আর ‘mimsy’ উদ্ভাবন করে জয়েসকে পথ দেখিয়ে দেন।* অবশ্য ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপে’ ক্যারলীয় গূঢ়তা নেই, কিন্তু ইঙ্গিত ঠিকরে পড়ে সুকুমার রায়ের শ্লেষপ্রয়োগে, যমকের ব্যবহারে। ঐ শ্লেষ বা ‘পান’ করার বিদ্যেটি বড়ো পিচ্ছিল—অনেকের হাতেই তা ছিবলেমি মাত্র হয়ে পড়ে। কিন্তু সুকুমার রায়, ‘হাস্যকৌতুকে’ রবীন্দ্রনাথের মতো, ওর সাহায্যে ভাষার গাঁট খুলে দেখান। ‘অবাক জলপানে’ আমরা শুধু কৌতুকে আবিষ্ট হই না, সেই সঙ্গে ‘জল’ কথাটির সঙ্গে নতুন করে আমাদের চেনা হয়।
[* ‘Slithy’ কথাটাই পিছল-পিছল শোনায়, আর ‘mimsy’ মানে যে তুচ্ছ কিছু, তা কি আর বলে দিতে হয়। প্রথম কথাটি—একটু ভাবলে বোঝা যাবে—তৈরি হয়েছে ‘lithe’ আর ‘slimy’ মিশিয়ে, আর দ্বিতীয়টিতে মিশেছে ‘flimsy’ আর ‘miserable’। ইংরেজিতে এই প্রথম দেখা দিলো ‘তোরঙ্গ-শব্দ’ বা ‘portmanteau word’ যাকে পরিণতির চরম সোপানে জেমস জয়েস নিয়ে গেলেন। বাংলা ভাষায় ‘womoon’ বা ‘hominous’ এখনো সম্ভব হয়নি, কিন্তু ‘গল্পসল্পে’ রবীন্দ্রনাথ খেলাচ্ছলে দু-একটি নমুনা বানিয়েছিলেন, যেমন ‘হিদিক্কার’ বা ‘বুদবুধি’। এর প্রথমটিতে ‘হৃদয়’, হিক্কা’, ‘ধিক্কার’ এই তিনটি শব্দেরই আভাস দেয়, আর দ্বিতীয়টিতে ‘বুধ’ আর ‘বুদবুদ’ মিশে পাণ্ডিত্যের প্রতি কটাক্ষ পড়েছে।]
৪
সুকুমার রায়ের মৃত্যুর পরে ‘সন্দেশ’ যতদিনে বন্ধ হলো, তার আগেই শিশুসাহিত্যে নতুন যুগ এনেছে ‘মৌচাক’ পত্রিকা। পরে অবশ্য ‘সন্দেশ’ বেরিয়ে আবার কিছুদিন চলেছিলো, কিন্তু ‘প্রত্যাগত’ শার্লক হোমস-এর মতোই সে আর তার পূর্বসত্তা ফিরে পায়নি। এর পর থেকে শিশুসাহিত্যে আসর জমালেন ‘মৌচাকে’র লেখকরাই; শিশুসাহিত্যের দ্বিতীয় যুগের এই পত্রিকাটিকেই প্রতিভূ বলা যায়।
এ-কথার অর্থ এই যে আধুনিক কালে, অর্থাৎ গত তিরিশ বছরের মধ্যে যারা ছোটোদের জন্য উল্লেখ্যরূপে লিখেছেন, তাঁরা সকলেই এই পত্রিকার লেখক এবং কেউ-কেউ হয়তো ওরই প্ররোচনায় প্রথম ওদিকে মন দেন। প্রথম যুগের সঙ্গে দ্বিতীয় যুগের কিছু লক্ষণগত পার্থক্য দৃষ্টিপাতমাত্র ধরা পড়ে। আগে রচনার ক্ষেত্রে নাবালক-সাবালকের সীমান্তরেখা খুব স্পষ্ট ছিলো; যাঁরা ছোটোদের জন্য লিখতেন, তাঁরা অন্য কিছু লিখতেন না, আর যাঁদের বলতে পারি অবিশেষ সাহিত্যিক, সর্বসাধারণের লেখক, তাঁরাও শিশুসাহিত্য এড়িয়ে যেতেন। (পাঠ্যপুস্তক বাদ দিয়ে বলছি, আর রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’ কাব্যটি যে ‘শিশুসাহিত্য’ নয়, সে-কথা অবশ্য না-বললেও চলে।) আধুনিক কালে এ-ব্যবস্থার বদল হয়েছে। ‘মৌচাকে’র প্রথম সংখ্যার প্রথম কবিতার লেখক ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, তার অনতিপরেই ‘বুড়ো আংলা’র আবির্ভাব হলো সেখানে : ‘ভারতী’-গোষ্ঠীর, তারপর ‘কল্লোল’-গোষ্ঠীর প্রায় সকলে দেখা দিলেন একে-একে; মোটের উপর এ-কথা বললে ভুল হয় না যে সম্প্রতি যাঁরা ছোটোদের জন্য লিখেছেন এবং লিখছেন, দু-একজনকে বাদ দিয়ে সকলেই তাঁরা সাবালক সাহিত্যে প্রতিষ্ঠাবান। হয়তো এরই জন্য, কিংবা হয়তো অনিবার্য যুগপ্রভাবে, আমাদের শিশুসাহিত্যও অপেক্ষাকৃত বয়স্ক হয়েছে এখন : হয়তো শৈশবেরও চরিত্র বদলেছে এতদিনে; আমরা আমাদের ছেলেবেলায় যে-রকমের ছোটো ছিলুম, এই রেডিওমুখর সিনেমাচ্ছন্ন যুগে সে-রকম আর সম্ভব বলেই মনে হয় না। এই পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়েছে শিশুসাহিত্যে; রচনার বিষয় বেড়েছে, বিষয় বদলেছে; ভিন্ন সুরে বলা হয় আজকাল, ছোটোদের আর ততটা ছোটো বলে গণ্য করা হয় না, এবং বর্তমান কালের ‘ছোটোদের’ বই অনেক ক্ষেত্রে বয়স্করাও উপভোগ করে থাকেন।
এই শেষের কথাটাকে একটু বিস্তার করা দরকার। শিশুসাহিত্যে বড়ো দুটো শ্ৰেণী পাওয়া যায়। তার একটা হলো একান্তভাবে, বিশুদ্ধরূপে নাবালকসেব্য, যেমন যোগীন্দ্রনাথের, উপেন্দ্রকিশোরের রচনাবলি; আর অন্যটা হলো সেই জাতের বই, যাতে বুদ্ধির পরিণতিক্রমে ইঙ্গিতের গভীরতা বাড়ে, যেমন ক্যারলের অ্যালিস-কাহিনী, আন্ডেরসেনের রূপকথা, বাংলা ভাষায় ‘বুড়ো আংলা’, ‘আবোল তাবোল’। যাদের মনের এখনো দাঁত ওঠেনি, একেবারে তাদেরই জন্য প্রথম শ্রেণীর রচনা, তাদের ঠিক উপযোগী হলেই তা সার্থক হলো : কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর রচনা, বিশেষ অর্থে, শিশুপাঠ্য থেকেও হয়ে ওঠে বড়ো অর্থে সাহিত্য, শিল্পকর্ম; অর্থাৎ লেখক ছোটোদের বই লিখতে গিয়ে নিজেরই অজান্তে সকলের বই লিখে ফেলেন। বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক শিশুসাহিত্য, যা বয়স্করাও উপভোগ করেন, তা এ-দুয়ের কোনো শ্রেণীতেই পড়ে না; খুব ছোটোদের খাদ্য এটা নয়—বরং বলা যায় কিশোর-সাহিত্য–আর বয়স্কদের যখন ভালো লাগে, তখন এই কারণেই লাগে যে লেখক তা-ই ইচ্ছে করেছিলেন, অনেক সময় বোঝা যায় যে লেখক যদিও মুখ্যত বা নামত ছোটোদের জন্য লিখেছেন, তবু সাবালক পাঠকও তাঁর লক্ষ্যের বহির্ভূত ছিলো না।
এর ফল—চারিদিক মিলিয়ে দেখলে—ভালোই হয়েছে। প্রাচুর্য বেড়েছে, বেড়েছে উপাদানের বৈচিত্র্য, সেই সঙ্গে রূপায়ণেও সমৃদ্ধি এসেছে। বিস্তর বই বেরোচ্ছে আজকাল, বিস্তর বাজে বই বেরোচ্ছে–কিন্তু সেইসব খড়-বিচিলির স্তূপের মধ্যে শস্যকণারও পরিমাণ বড়ো কম নেই। রচনার নতুন ধারা নানা দিকেই বেরিয়েছে; তার একটা হলো বহির্জীবনের ঘটনাবহুল কাহিনী, যাকে বলে অ্যাডভেঞ্চার, আর কৌতুক-রচনা—’পরশুরামে’র অনন্য উদাহরণ বাদ দিলে—সম্প্রতি যেন বিশেষভাবে শিশুসাহিত্যেই আশ্রয় নিয়েছে। এই উভয় বিভাগেই দেখা যায়, লেখকরা নাবালক-বুদ্ধির গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে নারাজ; তাঁদের লেখাটা হয় ছোটোদের মাপের, কিন্তু বিষয়টা সবসময় আন্দাজমতো হয় না, কখনো-কখনো পরিণত মনের প্রবীণতা তাতে ধরা পড়ে। আমি কী বলতে চাচ্ছি সেটা স্পষ্ট হবে হেমেন্দ্রকুমারের সঙ্গে প্রেমেন্দ্র মিত্রের রোমাঞ্চিকার তুলনা করলে। ‘যখের ধন’ খাঁটি কিশোর-সাহিত্য–আর লেখার জাত হিশেবেও বাংলা ভাষায় নতুন–কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের নতুন ‘বৈজ্ঞানিক’ অ্যাডভেঞ্চারে যেন আরো কিছুর সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাই। শুধু সম্ভাবনা, সেটুকুই যা দুঃখ। তাঁর চান্দ্র-ভ্রমণের রহস্যঘন কাহিনী বা দানবিক দ্বীপের লোমহর্ষক উপাখ্যান, এ-সব রচনাকে শিশুসাহিত্য বললে একটু কম বলা হয়, কিন্তু অন্য কোনো নামও এদের দেয়া যায় না। এতে এমন উপকরণ আছে, যাতে পরিণত মনেও কৌতূহলের উত্তেজনা আসে, কিন্তু সেই উত্তেজনার তৃপ্তির পক্ষে যথোচিত উপাদান বা ব্যবস্থাপনা নেই। আমরা বয়স্করা রুদ্ধশ্বাসে পড়ে উঠি, কিন্তু পড়ে উঠে মনে হয় যে আরো অনেক বিস্তার করলে, আরো অনেক বৈজ্ঞানিক আর মানবিক তথ্য যোগ করলে, তবে বিষয়টির প্রতি সুবিচার হতো, ‘শিশুসাহিত্য’ হবার জন্য গল্পটা যেন বাড়তে পেলো না। এর মানে এ-কথা নয় যে কিশোর পাঠকের ভাগে কোথাও কম পড়লো; আমার বক্তব্য শুধু এটুকু যে এদের যেন বয়স্কোচিত গল্প হবারই কথা ছিলো, অবস্থাগতিকে ছিটকে পড়েছে শিশুসাহিত্যে।* অনেকটা এইরকমের ধারণা দেয় হাস্যরচনাও; সেখানেও, যেমন শিবরামের কোনো-কোনো গল্পে অভিজ্ঞতাটা পাই বয়স্ক জীবনের, শুধু পরিবেশনটা কৈশোরোচিত।
[* ‘অবস্থাগতিকে’ কথাটা অনুধাবনযোগ্য। অ্যাডভেঞ্চারঘটিত গল্প জমাবার মতো উপকরণ বাঙালির জীবনে বেশি নেই; পুরো মাপে লিখতে গেলেই সম্ভাব্যতার সীমা ডিঙোবার আশঙ্কা ঘটে। হয়তো এই কারণেই প্রেমেন্দ্র মিত্র এইচ. জি. ওয়েলসের অনুগামী হতে পারেননি, আর হেমেন্দ্রকুমারও স্টীভেনসনকে সাত হাত তফাতে রেখেছেন। জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে অ্যাডভেঞ্চার নামক পদার্থটা পশ্চিমবাসীর জীবনের মধ্যে সত্য, তাই তার সাহিত্যেও সেটা জীবন্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের পক্ষে ও-বস্তুটি এখনো অনেকটাই বানানো, অমূল কল্পনা বা ইচ্ছাপূরণ। এই একই কারণে, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের প্রশংসনীয় হুকা-কাশি সত্ত্বেও, বাংলা ভাষায় সত্যিকার গোয়েন্দা-গল্প এখনো হতে পারলো না, শুধু তার বিকৃতি জমে উঠলো কিশোর-সাহিত্যের কুপথ্যশালায়।]
শিবরাম চক্রবর্তীর উপাদান ছিলো প্রমাণসই হাস্যরসিকের, কিন্তু তিনি তাঁর পুরো আকারে পৌঁছতে পারলেন না; ঘটনাচক্রে—কিংবা হয়তো তাঁর স্বভাবেই একটা অসংশোধনীয় ছেলেমানুষি আছে বলে—শিশুসাহিত্যেই আবদ্ধ থাকলেন। অবশ্য ‘বড়োদের জন্য’ও তিনি লিখেছেন, কিন্তু সে-লেখা তাঁর ‘ছোটোদের’ লেখারই আদিরসাত্মক প্রকরণমাত্র, এ-ছাড়া আর তফাৎ কিছু নেই। এ-কথাটা প্রশংসার হলো না, কিন্তু আরো কিছু অপ্রশংসাকে শিবরাম যেন নেমন্তন্ন করে ডেকে পাঠান; তিনি যে মাঝে-মাঝে একটু ভিন্ন অর্থে লোক হাসান, তাঁর রচনাবলির অনেকটা অংশ যে চর্বিতচর্বণ, শ্লেষ, যমক ইত্যাদি অলংকারগুলোকে তিনি যে প্রায় বিভীষিকার স্তরে নিয়ে গেছেন, এ-সব কথা বলার জন্য সমালোচকের প্রয়োজন হয় না, তাঁর নাবালক পাঠকরাও তা বলতে পারে। কিন্তু এই সমস্ত দোষ যোগ করে দেখলেও তাঁর গুণের অংশ মলিন করতে পারে না; সব সত্ত্বেও এ-কথাটা সত্য থেকে যায় যে কৌতুকের কলাক্ষেত্রে তাঁর স্বাক্ষর জাজ্বল্যমান, যেখানে তাঁর রচনা উৎকৃষ্ট—আর সে-রকম গল্প ও সংখ্যায় তিনি অনেক লিখেছেন—সেখানে তাঁর হাস্যরস এমন দুর্বার যে তার আঘাতে পাকা বুদ্ধির দেয়ালসুদ্ধু ভেঙে পড়ে। শিবরামের “কালান্তক লাল ফিতা”—যেখানে আদালতের ব্যূহ থেকে সম্পত্তি উদ্ধারের চেষ্টা পরলোকে পৌঁছিয়ে দিয়েও থামলো না, বা “পঞ্চাননের অশ্বমেধ”—যে-গল্পের শেষে ‘ঘোড়াটা হাসতে-হাসতে মরে গেলো’, বা যে-গল্পে তিনি কুশল প্রশ্নের নিক্তিমাপা জবাব দেবার জন্য গাণিতিক ভাষা উদ্ভাবন করেছেন—এ-সব গল্প শিশুসাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা ভাষার কৌতুকসাহিত্যে স্থান পায়। তুলনীয় গল্প তাঁর আরো আছে, সমসাময়িক অন্য লেখকদেরও আছে; উদাহরণত উল্লেখ করবো রবীন্দ্রলাল রায়ের “দিনের খোকা রাতে”, বা সেই জীবনের পক্ষে অতি সত্য গল্পটি, যেখানে নায়ক ছাতা ভুললেই ধারাবর্ষণ নামে আর বর্ষাতি নিলেই রোদ্দুর ওঠে দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলো যে বিশ্বজগতে ‘আমার জন্যই সব হচ্ছে’; —সব মিলিয়ে বোঝা যায় যে আধুনিক লেখক উপাদানের জন্য বালকজীবনে আবদ্ধ থাকেন না, যদিও হাসির ভোজে ছেলে-বুড়োর অংশ থাকে সমান—কেননা এ-সব লেখায় ঠাট্টা থাকলেও উগ্রতা নেই। যা বিশেষ অর্থে ব্যঙ্গ নয়, শুধুই কৌতুক—এই বস্তুটি আমাদের শিশুসাহিত্যেই প্রচুর হয়ে দেখা দিয়েছে, এ-কথাটি আনন্দের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করি।
উপরন্তু প্রমাণ মেলে যে ব্যঙ্গরচনাও ঝিমিয়ে পড়েনি। যোগ্য কারিগর আছেন অন্নদাশঙ্কর, যাঁর হাতে বাংলা দেশের সনাতন ছড়া নতুন করে জেগে উঠেছে। আধুনিক কবির হাতে ছড়া বেরোতে পারে শুধু এই শর্তে যে তাতে তিনি বক্তব্য কিছু দেবেন, অথচ সেটুকুর বেশি দেবেন না যেটুকু এই হালকা ছোটো চটুল শরীরে ধরে যায়। একেবারে সারাংশ কিছু না-থাকলে তা নেহাৎই শব্দের টুংটাং হয়ে পড়ে, আবার মাত্রা একটু বেশি হলেও ছড়া আর থাকে না। অন্নদাশঙ্কর দু-দিকই ঠিক সামলে চলেন, তাঁর ছড়ার একরত্তি রূপের মধ্যে একটি ফোঁটা বস্তুও তিনি বসিয়ে দেন, সঙ্গে দেন কৌতুকের সেই আমেজটুকু, যার স্বাদ জিভে লেগে থাকে। তাঁর ‘উড়কিধানের মুড়কি’ পড়ে সাবালক পাঠকের সবিস্ময় প্রশংসা জেগেছে; সেই একই ঝাল-মিষ্টি মেশানো মুড়মুড়ে ঠাট্টা আবার তিনি ছড়িয়েছেন ‘রাঙা ধানের খৈ’তে, এ-খই ‘ছোটোদের’ বলে আলাদা করে চেনা যায় না।* ছোটোদের ভিড় জমে উঠবে সন্দেহ নেই, কিন্তু ঠাট্টার সবটুকু রস শুধু বয়স্ক পাঠকই পাবেন, কেননা লেখকের বক্তব্য বিষয়ে, ‘কেশনগরে’র মশার কাঁদুনিটাই শেষ কথা নয়, বই জুড়ে ঝলক দিচ্ছে যুদ্ধকালীন পলিটিক্যাল ব্যঙ্গ, ভারতভঙ্গের বেদনা, আর উচুঁ হয়ে ফুটে আছে একটি আশ্চর্য সুলিখিত নাটিকা, সেখানে লেখক, হাস্যমুখর ছন্দ চালিয়ে, পিষ্টকগ্রাসী বিচারক বানরের পুরোনো নীতিকথায় ভারত-পাকিস্তান-ব্রিটিশ সম্বন্ধের বিবরণ দিয়েছেন। শিশুমহলে রাজনীতির প্রবেশ ‘সন্দেশে’র সময়ে অভাব্য ছিলো, এখানেও এই দুই যুগের প্রভেদ বোঝা যায়।
[* অন্নদাশঙ্করের ছড়া বা অজিত দত্তের “নইলে” নামক উৎকৃষ্ট কৌতুকাবহ কবিতাটি, এ-সবের জাত আসলে হালকা কবিতার, ইংরেজিতে যাকে বলে লাইট ভার্স, সেখানে বিষয়টাতে সাবালক মনের খোরাক থাকে।]
কিন্তু এই প্রভেদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ লীলা মজুমদার। তার কারণ, তিনি নতুন যুগের স্বাদ এনেছেন, বিষয়গত বৈচিত্র্য দিয়ে নয়, রূপায়ণের অভিনবত্বে। নতুন বিষয়ের নিজস্ব একটি আকর্ষণ আছে, তার প্রভাবে লেখাটা গৌণ হয়ে যায় অনেক সময়, কিংবা ভুল কারণে মূল্য পায়। এই আকর্ষণ লীলা মজুমদারে নেই, আর নেই বলেই তাঁর লেখার দুই যুগের পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে—বস্তুর দিক থেকে নয়, চরিত্রের দিক থেকে। প্রেমেন্দ্রের মতো, বা অন্নদাশঙ্করের মতো তিনি অপূর্ব কোনো উপাদান আমদানি করেননি; তিনি লিখেছেন সেই পুরোনো ছোটো ছেলেরই গল্প, যে-ছেলে চেয়ে দেখে, অবাক হয়, স্কুলে যায়—যেতে চায় না; এখানে কৃতিত্বটুকু সমস্ত তাঁর লেখায়, নতুনত্ব সমস্ত তাঁর দৃষ্টিতে। বিষয়বস্তুর মিল থাকলে পূর্বাপর তুলনা করা সহজ হয়, এ-ক্ষেত্রে তার আরো একটা বড়ো রকমের সুবিধে আছে। লীলা মজুমদার সুকুমার রায়ের পিতৃব্যপুত্রী, রায়চৌধুরীদের বংশগত দীপ্তি পেয়েছেন, কিন্তু এই ‘পারিবারিক সাদৃশ্য’ ছাড়াও তিনি বিশেষ অর্থেই সুকুমার রায়ের উত্তরসাধক। তাঁর ‘দিনে দুপুরে’র সঙ্গে ‘পাগলা দাশু’ মিলিয়ে পড়লে তৎক্ষণাৎ কিছু সামান্য লক্ষণ ধরা পড়ে : সেই একই রকম চাপা হাসি, মুখ টিপে হাসি, নকল-গম্ভীর বাচনভঙ্গি, এমনকি সেই বালিকার বদলে বালক-মনেরই নেপথ্যলোকে আলো ফেলা। ‘দিনে দুপুরে’র কুশীলব যে ছেলেরাই, কখনোই কোনো মেয়ে নয়, এতে একটু বিস্ময় জাগে, কোথায় একটু অভাব বলেই বোধ হয়—কিন্তু এই অভাব পূরণ করে দেয় লেখিকার বালকজীবনের সহজবোধ, আর স্কুল-ছেলেদের অসাধু এবং বলশালী স্ল্যাং বুলিতে তাঁর এমন দখল, যাতে ফিরে-ফিরে তাঁর অগ্রজকেই মনে পড়ে।
এই সাদৃশ্যের পটভূমিতে লীলা মজুমদারের বৈশিষ্ট্য আরো উজ্জ্বল হয়েছে। মোটের উপর, পূর্বপুরুষের তুলনায়, তাঁকে মনে হয় বেশি অভিজ্ঞ, বেশি সচেতন, কিংবা যাকে ইংরেজিতে বলে সফিস্টিকেটেড—আশা করি কথাটায় কেউ অপরাধ নেবেন না। এর সমস্তটাকেই কালধর্মের প্রভাব ভাবলেও ভুল হবে, তাতে লেখকের স্বকীয়তাকে খর্ব করা হয়। যেমন তাঁর গল্পের স্বাদ ‘পাগলা দাশু’র সীমাতিক্রান্ত, তেমনি সমসাময়িক কারো সঙ্গেও তাঁর সাদৃশ্য নেই। তিনিও কৌতুকের কারুকর্মী, কিন্তু শিবরামের মতো অতিরঞ্জনপন্থী নন, অন্নদাশঙ্করের ব্যঙ্গও তাঁর ধাতে নেই; তাঁর গল্পে কখনোই আমরা চেঁচিয়ে হাসি না, কিন্তু আগাগোড়াই মনে-মনে হাসি–আর কখনো-কখনো শেষ করে উঠে ভাবতে আরো বেশি ভালো লাগে। এই কৌতুকের সঙ্গে কল্পনা এমন সুমিত হয়ে মিশেছে, এমনভাবে আজগবির সঙ্গে বাস্তবের মাত্রা ঠিক রেখে, আর এমন নিচু গলার লয়দার গদ্যের বাহনে, যে লীলা মজুমদারকে—তাঁর পরিমাণের মন-খারাপ করা ক্ষীণতা সত্ত্বেও–বাংলা শিশুসাহিত্যে স্বতন্ত্র একটি আসন দিতে হয়।
৫
বাংলা শিশুসাহিত্যে দুই যুগ দেখিয়েছি; প্রথমে সরল, সংকলনপ্রধান, বিশুদ্ধরূপে শিশুসেব্য; তারপর উদ্ভাবনে নিপুণ, উপকরণে বিচিত্র, অংশত প্রবীণ-পাঠ্য। দুই যুগের চরিত্রভেদও দেখিয়েছি; বলতে চেয়েছি আধুনিক লেখক একান্তভাবে ছোটোদের জন্য লেখেন না, আর ছোটোরাও তেমন ছোটো আর নেই। এর সঙ্গে কিছু-কিছু ‘তবে’ ‘কিন্তু’ যোগ করা সম্ভব হলেও মোটের উপর এই বিভাগের যাথার্থ্য নিয়ে তর্ক ওঠে না। কিন্তু এই সীমাচিহ্ন, ইতিহাসের খুঁটি, এই সুবিধাজনক কাজ-চালানোর ব্যবস্থা—সমস্ত ভেঙে পড়ে, অর্থ হারায়, যখন আমরা অবনীন্দ্রনাথের সম্মুখীন হই। দুই যুগে ব্যাপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গার সেতুবন্ধী সওদাগর। তাঁকে দুই শতকের অন্তর্বর্তী করেছে তাঁর আয়ুষ্কাল; লেখক-জীবনের পরিধির মাপে তিন পুরুষের সমসাময়িক তিনি। তাঁকে উপেন্দ্রকিশোরের সতীর্থ বলে ভাবতে পারি, আবার আধুনিক রঙ্গমঞ্চেও তিনি প্রতীয়মান। উভয় যুগেরই চিহ্ন আছে তাঁর রচনায়; আরম্ভকালের লক্ষণ দেখি অনুরচনার উন্মুখতায়, আবার বর্তমানেও ঝোঁক পড়েছে শিশুগ্রন্থের সর্বজনীন আবেদনে।
না—ভুল হলো, ঠিক কথাটি বলা হলো না। অবনীন্দ্রনাথ, বাল্যবঙ্গের রত্নবণিক তিনি, এ-কথা যেমন সত্য, তেমনি এ-বিষয়েও সন্দেহ নেই যে শিশুসাহিত্যের ফ্রেমের মধ্যে তাঁকে ধরানো যায় না। ‘নালক’, ‘রাজকাহিনী’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘আলোর ফুলকি’ এ-সব বই আলাদা করে ছোটোদের নয়, আলাদা করে বড়োদেরও নয়; এখানেই তিনি খুঁজে পেলেন নিজেকে, বাস্তুভিটের দখল পেলেন। এটাই তাঁর ভাষা, তাঁর মনের ভাষা, প্রাণের ভাষা; এটাই তাঁর স্বর, তাঁর গলার স্বর, সত্তার স্বর; এটাই—তিনি। যে-সব লক্ষণের কথা বলেছি, যেখানে যেখানে দুই যুগেরই সঙ্গে তাঁর মিল দেখিয়েছি, আসলে সেগুলোই তাঁর মনের অভিজ্ঞান, তাঁর চরিত্রের প্রমাণপত্র। যে-কালে তিনি জন্মেছিলেন, যে-কুলে তিনি জন্মেছিলেন, সেখানে তাঁকে খুঁজতে গেলে দিশে মিলবে না, বড়োজোর টুকরো করে পাওয়া হবে। ‘নালক’ থেকে ‘আপন কথা’ পর্যন্ত বইগুলো যখন চিন্তা করি, তখন মনে হয় যে তাঁর মতো অখণ্ড চরিত্র নিয়ে আর-কোনো বাঙালি লেখক জন্মাননি, আর-কেউ নেই তাঁর মতো একই সঙ্গে এমন উদাসীন আর চকিতমনা, এমন দূরে থেকেও সংবেদনশীল। তাঁর জীবৎকালে কত হাওয়া উঠলো সাহিত্যে, কত হাওয়া ঘুরে গেলো, কিন্তু সে-সবের একটিও খড়কুটো দেখতে পাই না এখানে, কারোরই কোনো ‘প্রভাব’ ধরতে পারি না, পাশের বাড়ির রবিকাকার পর্যন্ত না—যদিও সেই রবি-কাকারই উৎসাহে তিনি তুলিতে অভ্যস্ত হাতে প্রথম কলম ধরেছিলেন। সমসাময়িক পরিবেশের মধ্যে তিনি যেন থেকেও নেই; তিনি লিখেছেন একলা বসে আপন মনে ঘরের কোণে, লিখেছেন যে-রকম করে না-লিখেই তিনি পারেননি ভাবেননি সে-লেখা কার জন্য, কে পড়বে;–কিংবা যদি-বা ছোটোদের কথা ভেবে থাকেন, সেই ছোটোরাও বিশ্বমানবেরই প্রতীক।
আরো বুঝিয়ে বলি কথাটা। যাঁরা সাবালকপাঠ্য লেখক, মাঝে-মাঝে ছোটোদের জন্য লেখেন, আর সেখানেও বয়স্ক জীবনের বক্তব্য বাদ দেন না, অবনীন্দ্রনাথ তাঁদের দলে পড়েন না। ইতিপূর্বে তাঁর নাম করেছি তাঁদের সঙ্গে, যাঁদের হাতে শিশুপাঠ্য রচনাও বড়ো অর্থে সাহিত্য হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে সাহিত্যশিল্পের চিরায়ত উদাহরণ। কিন্তু এখানেও একটু আলাদা করে দেখতে চাই। একদিকে রাখতে চাই সুকুমার রায়, ল্যুইস ক্যারলকে, শিশুসাহিত্যের অতি বিদগ্ধ লেখক যাঁরা, যাঁদের কৌতুকের অভিপ্রায় ভাষাব্যবহারে অসামান্য নৈপুণ্যদ্বারাই সার্থক। আর অন্য দিকে আছেন হান্স আন্ডেরসেন, অবনীন্দ্রনাথ, যাঁদের শিশু সাহিত্যে জীবনের মূল্যায়ন পাই, বাণী শুনতে পাই মানবাত্মার উদ্দেশে। অর্থাৎ, এঁরা সেই বিরল জাতের বড়ো লেখক, যাঁদের আত্মপ্রকাশের বাহনই হলো শিশুসাহিত্য। অবনীন্দ্রনাথ ‘পথে-বিপথেও লিখেছিলেন—’বড়োদের’ বই সেটি— কিন্তু সেখানে তাঁকে চিনতে পারি না—যেন তিনি অন্য মানুষ, রীতিমতো ‘শিক্ষিত’, ‘ভদ্রলোক’;- সেখানে মাঝে-মাঝে রবীন্দ্রনাথের বোল দেয়—এমনকি, বঙ্কিমেরও –ভ্রমণ-চিত্রের কোনো-কোনো অংশে ছাড়া, সেটি ‘ভারতী’-গোষ্ঠীর যে-কোনো ভালো লেখকের রচনা হতে পারতো। আর তাঁর মুখে–বলা বই—’ঘরোয়া’, ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’, এদেরও মূল্য প্রধানত তথ্যগত, শিল্পগত নয়। কিন্তু যেখানে তিনি শিল্পী, স্রষ্টা, যেখানে তিনি আসল অর্থে মৌলিক, সেখানে তাঁকে দেখতে হলে আসতে হবে এই অনুরচিত বইগুলির কাছে—এই ‘নালক’, ‘রাজকাহিনী’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘আলোর ফুলকি’*—যে-সব বই তিনি লিখেছিলেন তাদেরই জন্য, যারা ছেঁড়া মাদুরে নয়তো মাটিতে বসে গল্প শোনে, ইতিহাসের সত্যিকার ‘রাজা-রানী-বাদশা-বেগম যারা। তাঁর বিষয়ে এ-কথাও ঠিক বলতে চাই না যে তিনি ছোটোদের বই লিখতে গিয়ে সকলের বই লিখে ফেলেছেন, বলতে চাই তিনি প্রথম থেকেই সকলের বই লিখেছেন, শিশুর বইয়ের ছল করে মানুষের বই লিখেছেন তিনি। তাঁর মনের মধ্যে সেই মানুষ বসে ছিলো–’সেই সত্যিকার রাজা-রানী-বাদশা-বেগম’—যে-মানুষ না-ছেলে, না-বুড়ো, কিংবা একই সঙ্গে দুই—যার বয়সের হিশেব নেবার কথাই ওঠে না, উপায়ও নেই—আজকের ভোরবেলাটির মতো নতুন আবার সভ্যতার সমান বুড়ো সেই রূপকথার চিরকালের যে শ্রোতা এবং নায়ক। আর এ-সব বই যে-ভাষায় তিনি লিখেছেন—সেটা তাঁর মনের ভাষা, প্রাণের ভাষা; সে তো ভাষা নয়, ছবি, সে তো ছবি নয়, গান;–সুর তাতে রূপ হয়ে ওঠে আর রূপ যেন সুরের মধ্যে গলে যায়; -তাতে ছবির পর ছবি দেখি চোখ দিয়ে; আর কানে শুনি একটানা গান গুনগুন, গুনগুন;–তার সম্মোহন কেউ নেই যে ঠেকাতে পারে। আর এই জাদুকর গদ্যে যা তিনি লিখেছেন, যা-কিছু লিখেছেন, তাতে বুদ্ধিঘটিত বস্তু কিছু নেই, তার আবেদন ভাবনার কাছে নয়, কল্পনার কাছে, আমাদের কৌতূহলে নয়, ইন্দ্রিয়ে–চেতনায়। এই লেখার রসগ্রহণের জন্য ‘শিক্ষিত’ হতে হয় না, ‘অভিজ্ঞ’ হতে হয় না; মনের চোখ, মনের কান আর চলনসই গোছের হৃদয়টুকু থাকলেই যথেষ্ট। অর্থাৎ, নানা বয়সের নানা স্তরের মানুষের মধ্যে যে-অংশ সামান্য, সেই অংশই অবনীন্দ্রনাথের ছেঁড়া কাঁথার রাজপুত্তুর। তাই তাঁর শিশুগ্রন্থ সর্বজনীন।**
[* এখানে ‘ভূতপত্রী’র নাম করলুম না এইজন্য যে এ-বইটির গড়ন কিছু নড়বড়ে; গল্প, গুজব, পুরাণ, ইতিহাস, ভূগোল, আজগবি, এই সমস্ত মিলে-মিশে ‘বুড়ো আংলা’র মতো নতুন এবং অবিকল একটা পদার্থ হয়ে ওঠেনি, কোথাও-কোথাও অসংলগ্নতার দোষ ঘটেছে (যেমন হারুন-বাদশার উপাখ্যানের সঙ্গে সাগরতলের মাসিবাড়ির গল্পটিকে শুধু বাইরে থেকে জুড়ে দেখা হয়েছে, ভিতর থেকে ঘটকালি করা হয়নি)। অবশ্য এ-কথা বলার মানে এ নয় যে বইটির অন্যবিধ মূল্য বিষয়ে আমি সচেতন নই।
** ব্যতিক্রমস্বরূপ উল্লেখ করবো ‘শকুন্তলা’। ‘শকুন্তলা’য় কালিদাসকেই কেটে-ছেঁটে পালা করে বলা হয়েছে, লেখক নিজের কিছু যোগ করেননি, নতুন কোনো সৃষ্টি নেই এখানে, তাই এটি সীমিত অর্থেই শিশুপাঠ্য। পক্ষান্তরে, ‘আপন কথা’কে ‘ছোটোদের’ বই বলে ভাবতে রীতিমতো প্রয়াসের প্রয়োজন হয়; ‘ছেলেবেলা’র মতো, এরও মূল্য বিষয়ে নয়, বিষয়ীতে, আর গদ্য ভাষার বিশেষ একটি প্রকরণকলায়। অবনীন্দ্রনাথের সবচেয়ে পাৎলা-হাওয়ার বই এই ‘আপন কথা’; পড়তে-পড়তে মাঝে-মাঝে ঈষৎ হাঁপ ধরে।]
এই যিনি কথাশিল্পে রূপকার, সুরকার, বাংলা গদ্যের চিত্ররথ গন্ধব যিনি, এবার তাঁকে বিশেষভাবে শিশুসাহিত্যের সংলগ্ন করে দেখা যাক। প্রথমেই বলতে হয়–যা অন্যভাবে আগেই বলা হয়েছে—যে অবনীন্দ্রনাথ বই লিখেছেন, ছোটোদের জন্য নয়, ছোটোদের বিষয়ে। হান্স আন্ডেরসেনের মতো, তিনিও প্রতিভাবান শিশুপ্রেমিক ও পশুপ্রেমিক; তাঁর বই আলো হয়ে আছে এক আশ্চর্য ভালোবাসায়, যা এই দুই প্রাকৃত জীবের ভিতর দিয়ে বিশ্বজীবনে ছড়িয়ে পড়ে। “খাতাঞ্চির খাতা”য় পুতু যেখানে ‘হিজুলিপাতার জামা বাতাসে মেলে দিয়ে’, ‘জোনাকপোকার মতো একটুখানি আলো’ নিয়ে ঘরের মধ্যে উড়ে এসে ‘ঝুমঝুম করে ঘুঙুর বাজিয়ে’ খেলতে লাগলো; যেখানে, ‘রাজকাহিনী’র নিষ্ঠুরতম হত্যার আগে, পাহাড়ের উপর ভাঙা কেল্লায় দুই নিরীহ দুর্ভাগা আফিংচি বুড়ো তাঁদের কুড়োনো কন্যাটিকে নিয়ে ‘একটি পিদিমের একটুখানি আলোয় মস্ত একখানা অন্ধকারের মধ্যে’ বসে আছেন, আর বুড়ো চাচার ছেলেবেলার গল্প শুনতে-শুনতে মেয়েটির ‘চোখ ঘুমিয়ে পড়েছে’–সেখানে, আর এই রকমের আরো অনেক দৃশ্যে, আমরা যা অনুভব করি, যাতে দ্রব হই, নন্দিত হই, সেটা লেখকের এই মজ্জাগত গুণ—ঠিক গুণও নয়, তাঁর হৃদয়ের ক্ষরণ—তাঁর অপরিমাণ স্নেহ, উদ্বেল বাৎসল্য। এই স্নেহ পরতে-পরতে মিশে আছে তাঁর রচনায়, যেন ছাপার লাইনগুলির ফাঁকে-ফাঁকে বয়ে চলেছে, কিন্তু কোথাও-কোথাও ঢেউ উঠেছে বড়ো-বড়ো- সবচেয়ে বড়ো ঢেউ ‘ক্ষীরের পুতুলে’, ষষ্ঠীতলার সেই মহীয়ান স্বপ্নে, যেখানে লেখক বিশ্বশিশুর বর্ণনা দিতে-দিতে ছড়ার মন্ত্রে বাংলা দেশের প্রতিমায় প্রাণ দিয়েছেন। গল্পের উপসংহারের জন্য তুচ্ছ কোনো দৈব উপায় এটা নয়, গল্পের প্রাণের কথা এখানেই বলা আছে—এই স্বপ্নটিতেই অবনীন্দ্রনাথের আসল পরিচয়। এ তো স্বপ্ন নয়, দৃষ্টি, পরাদৃষ্টি—যাকে বলে vision—সেই একই, যে-দৃষ্টিতে ধরা পড়ে— ‘জগৎ-পারাবারের তীরে ছেলেরা করে খেলা।’
এই একটা জায়গায় বড়ো রকম মিল পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের। রবীন্দ্রনাথেও বাৎসল্যবৃত্তি অসামান্য; ব্যাপ্ত হয়ে বিচিত্র হয়ে তা প্রকাশ পেয়েছে, যেন প্রাণের পেয়ালা উপচে পড়ছে বার-বার, নানা রসে, নানা ভাবে, নানা ভঙ্গিতে। তাঁর উপন্যাসে শিশুচরিত্র যেমন প্রচুর, তেমনি জীবন্ত; যেখানেই তারা দেখা দেয়, সেই অংশেই পুলক লাগে। ‘গল্পগুচ্ছে’–শুধু “কাবুলিওয়ালা” নয়, “খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন”, “ছুটি”, “রাসমণির ছেলে”, এইরকম অনেক গল্পই স্নেহসূত্রে বিকশিত, “পোস্টমাস্টার”ও–শেষ পর্যন্ত—তা-ই, আর মৃন্ময়ী, গিরিবালা গিরিবালা প্রভৃতি বালিকা-নায়িকাদের বিষয়ে নায়কের প্রণয় ছাপিয়ে প্রবল হয়ে উঠেছে লেখকের বাৎসল্যবোধ।* “ছুটি”র ফটিককেই আবার আমরা দেখতে পাই “দেবতার গ্রাসে” রাখালে, “খাতা”র উমাকেই চিনতে পারি ‘পলাতকা’র “চিরদিনের দাগা”য়, আবার ‘পুনশ্চ’র “শেষ চিঠি”তে। নাটকে কাঁচা হাতে আরম্ভ হলো ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’, তারপর ‘বিসর্জন’; তারপর শিশুর মুখে ঋষির কথা শোনালেন ‘শারদোৎসবে’, ‘ডাকঘরে’। আর ‘শিশু’–সেই হাসিকান্নায় বিনুনি-করা কবিতা, অমন হালকা, চপল, গভীর, সুদূরস্পর্শী, একাধারে অমন পার্থিব আর স্বর্গীয়, যার অনুরূপ অন্য কোনো লেখার অস্তিত্বের কথা আমি জানি না, যার তুলনায় উইলিয়ম ব্লেকের শৈশব-গীতিকা গভীরতর হলেও একটু বিশেষ অর্থে ‘ধর্মসংগীত’ বলে মনে হয়—সেখানে স্নেহ, তার বাস্তবের রস ভরপুর বজায় রেখে, হয়ে উঠেছে পূজা, আর শিশু, রক্তেমাংসে প্রামাণ্য থেকেও হয়ে উঠেছে ভগবানের সঙ্গে মানুষের মিলনের উপায়। রবীন্দ্রনাথ, যেমন তিনি গাছের পাতায় সোনার বরন আলোটিতেই চিরপ্রেমের অঙ্গীকার দেখেছিলেন, তেমনি রাঙা হাতে রঙিন খেলনা দিয়ে তবেই বুঝেছিলেন বিশ্বসৃষ্টির আনন্দময় রহস্য।
[* অনেক সময় প্রেমের গল্পে লেখক নিজেই তাঁর নায়িকার প্রেমে পড়েন, কিন্তু–”নষ্টনীড়” বাদ দিলে –’গল্পগুচ্ছে’ রবীন্দ্রনাথের মনের ভাবটি প্রেমিকের নয়, পিতার; তাঁর নায়িকাদের মধ্যে প্রিয়াকে ততটা দেখতে পাই না, যতটা কন্যাকে। বালক-বালিকার চরিত-কথা, ‘সবুজপত্র’ যুগের আগে পর্যন্ত, এখানে কিছু অত্যধিক মাত্রাতেই দেখা যায় : “দিদি”, “খাতা”, “আপদ”, “অতিথি”, “স্বর্ণমৃগে” বৈদ্যনাথের স্বহস্তে প্রস্তুত খেলার নৌকো, “রাসমণির ছেলে”তে ব্যঞ্জনকারিণী মহার্ঘ মেমপুতুলের সুন্দর ঘটনাটি—সমস্ত মিলিয়ে এই গ্রন্থ যেন স্নেহরসে পরিপ্লুত হয়ে আছে। আর এই শিশুচিত্রাবলি—শুধু ‘গল্পগুচ্ছে’ নয়—সমগ্রভাবে বাংলা সাহিত্যেই লক্ষণীয়; ‘রামের সুমতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’, শ্রীকান্ত-দেবদাসের বাল্যপ্রণয়, তারপর ‘পথের পাঁচালি’, ‘রাণুর প্রথম ভাগ’– চারদিকে তাকিয়ে দেখলে ধরা পড়ে যে বাংলা কথাশিল্পের একটি বড়ো অংশ শৈশবঘটিত। হয়তো বাঙালির মনে স্বভাবতই বাৎসল্য বেশি; অন্তত কোনো-কোনো লেখক সার্থক হয়েছেন— দ্বন্দ্বজটিল বয়স্ক জীবনের ক্ষেত্রে নয়, শৈশবের সরল পরিবেশেরই মধ্যে।]
কিন্তু এই তুলনার এখানেই শেষ। এই সহজাত স্নেহশীলতা, আর জীবনের মধ্যে চিরশিশুর উপলব্ধি—শুধু এই ভাবের দিকটিতেই সাদৃশ্য পাই অবনীন্দ্র আর রবীন্দ্রনাথে; রূপায়ণের ক্ষেত্রে কিছুই মিল নেই। দু-জনের তফাৎ—মস্ত তফাৎ—এইখানে যে অবনীন্দ্রনাথের বই সর্বজনীন হয়েও আলাদা অর্থে ছোটোদেরও উপযোগী, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ—পাঠ্যপুস্তক বাদ দিয়ে—সত্যিকার ছোটোদের বই একখানাও লেখেননি। সেটা সম্ভব ছিলো না তাঁর পক্ষে, তিনি যে বড্ড বেশি বড়ো লেখক। আমি অবশ্য ভুলিনি যে ‘শিশু’, ‘শিশু ভোলানাথে’র কোনো-কোনো কবিতা ছোটোদের পক্ষে অফুরন্তভাবে উপভোগ্য, ‘মুকুটে’র কথাও মনে আছে আমার—কিন্তু সে-কথা উঠলে সেখানেই বা থামবো কেন আমরা, কেন উল্লেখ করবো না ‘ব্যঙ্গকৌতুক’, ‘হাস্যকৌতুক,’ তারপর ‘অচলায়তন’, ‘শারদোৎসব’, ‘কথা ও কাহিনী’, এমনকি ‘ডাকঘর’, ‘লিপিকা’ আর শেষ পর্যন্ত ‘গল্পগুচ্ছেরই বা নাম করতে দোষ কী। প্রায় সব বয়সেই পড়া যায় কিন্তু এক-এক বয়সে এক-এক স্তরে পড়া হয়, এমন রচনার অভাব নেই রবীন্দ্রনাথে, কিন্তু শিশুসাহিত্যের প্রসঙ্গে তাঁকে আনতে হলে বেছে নিতে হবে সে-সব বই যেগুলো ভেবে-চিন্তে পালা করে লেখা, যাতে কৈশোরোচিত চেহারা অন্তত আছে। আর এই ক্ষেত্রেই স্পষ্ট দেখতে পাই যে রবীন্দ্রনাথ, যতই চেপে-চেপে লিখে থাকুন, নিজেকে কখনো ছাড়াতে পারেননি—কোনোমানুষই তা পারে না। ‘সে’, ‘খাপছাড়া’, ‘গল্পসল্প’, এদের আমি রাখবো—শিশুসাহিত্যের বিভাগে নয়, স্বতন্ত্র একটি শ্রেণীতে, এদের বলবো প্রতিভাবানের খেয়াল, অবসরকালের আত্মবিনোদন, চিরচেনা রবীন্দ্রনাথেরই নতুনতর ভঙ্গি একটি। ‘ভূতপত্রী’র সঙ্গে ‘সে’ আর ‘আবোল তাবোলে’র সঙ্গে ‘খাপছাড়া’ তুলনা করলে তৎক্ষণাৎ জাতের তফাৎ ধরা পড়ে; আগের বইদুটির স্বাচ্ছন্দ্য এখানে নেই, এরা বড়ো বেশি সাহিত্যিক, বড়ো বেশি সচেতন– এমনকি আত্মসচেতন; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামক মহাকবিটি মাঝে-মাঝেই উঁকি দিয়ে যান, আর তাঁরই হাতের নতুন কৌশল আমরা অভিজ্ঞ পাঠকরা চিনতে পেরে খুশি হই। সুকুমার রায়ের ও অবনীন্দ্রনাথের—’সে’-র মুখের কথা দিয়েই বলছি— ‘কেরামতিটা কম বলেই সুবিধা’ ছিলো।
অবনীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের প্রতিতুলনায় আরো একটু যোগ করবো। রবীন্দ্রনাথের নানা দিকের মধ্যে শুধু একটি ছিলো শৈশব-সাধনা, আর অবনীন্দ্রনাথে এটি প্রায় সর্বস্ব, অন্তত—তাঁর সাহিত্যে—সর্বপ্রধান। তাঁর ভিতরকার বালকটিকে রবীন্দ্রনাথ কখনো ভুললেন না, আর অবনীন্দ্র তাকে হারিয়ে ফেলতে অস্বীকার করলেন। রবীন্দ্রনাথের শিশুকাব্য হাওয়ার মতো হালকা, তিনি তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন রেখেছেন পূর্ণপরিণত জীবনের ওজন; আর অবনীন্দ্রনাথ, শৈশবের পরশমণি ছুঁইয়ে, জীবন নামক ব্যাপারটাকেই নির্ভার করে তুলেছেন। বয়স্ক জীবনের বড়ো বড়ো অভিজ্ঞতাকে স্থান দিয়েছেন তিনি—ঘৃণা, হিংসা, প্রেম—কিন্তু সেগুলোকে এমন করে বদলে নিয়েছেন, এমন কোমল স্বপ্নের রঙে গালিয়ে নিয়েছেন, যে তাদের আর চেনাই যায় না অথচ ঠিক চেনাও যায়। ‘আলোর ফুলকি’তে কত কথাই বলা আছে! সুরের বিরুদ্ধে অসুরের চক্রান্ত, আলোর বিরুদ্ধে পিশাচশক্তির, শিল্পীর নিষ্ঠা, পুরুষের বীর্য, নারীর ছলনা, নারীর ত্যাগ। স্ত্রী-পুরষের মিলনের কথা—শুধু ‘আলোর ফুলকি’তে নয়— বারে বারেই দেখা দেয় তাঁর লেখায়, দেখা দেয় অনিবার্যভাবেই, সৃষ্টির এই মূলসূত্রটিকে দূরে রাখলে কিছুতেই তাঁর কাজ চলতো না। শিশুসাহিত্যে নিষিদ্ধ এই বিষয়টিকে তিনি ‘গৃহীত’ বলে ধরে নিয়ে নিঃশব্দ থাকেননি, কিংবা শুধু ভাবের দিক থেকেই দেখাননি তাকে, রীতিমতো তার ছবিও দিয়েছেন—সে-ছবি যেমন বাস্তব, তেমনি বস্তুভারহীন। মনে করা যাক ‘বুড়ো আংলা’র সেই অর্থময় দৃশ্যটি, যেখানে খোঁড়া হাঁসের সঙ্গে সুন্দরী বালিহাঁসটির দেখা হবার পর, ওরা দু-জনে ‘জলে গিয়ে সাঁতার আরম্ভ করলে’,* আর একলা রিদয় পাড়ে বসে বেনার শিষ চিবোতে লাগলো। কিংবা—যেখানে ‘কোটি কোটি আগুনের সমান’ সূর্যদেবের আলো ক্রমশ ক্ষীণ হতে-হতে শুধু একটুখানি রাঙা আভা হয়ে ‘সধবার সিঁদুরের মতো’ সুভাগার বিধবা সিঁথি ‘আলো করে রইলো’—আর তারপরেই মানবীর কোলে জন্ম নিলো দেবতার সন্তান। এই প্রতীকচিত্র অবনীন্দ্রনাথ এঁকেছেন—আইন-মাফিক শিশুসাহিত্যের সীমার মধ্যে থাকার জন্য নয়—তাঁর মনের ভাষাই ঐ-রকম ছিলো বলে। ও-রকম করেই ভাবতেন তিনি, ও-রকম করেই দেখতেন, তাঁর স্বভাবই ছিলো রূপকথা করে সব কথা বলা। যাকে তিনি গল্প বলেছেন, তিনি নিজেই সেই ছোটো ছেলে, তারই ঘুমে-ঢোলা, স্বপ্ন-জড়ানো অথচ স্বচ্ছ চোখ দিয়ে জগৎটাকে দেখেছেন তিনি; তাঁর জগৎটাই শিশুর জগৎ, কিংবা শিশুজগৎ—বিরাট বিশ্বকে গুটিয়ে এনে এইটুকু কৌটোর মধ্যে তিনি ধরিয়ে দিয়েছেন। সেখানে সবই খুব ছোটো মাপের, বয়স্ক কিছু নেই, মায়েরা ছোটো মেয়ের মতো, দাড়িওলা রাজপুত রাজারা ঠিক যেন ছোটো ছেলেটি; যেন বিচিত্র মানুষের মধ্য থেকে সামান্য লঘিষ্ট সংখ্যাটিকে বের করে নিতে হলো, বড়ো এবং বুড়ো লোকদের মানিয়ে নেবার জন্য। নয়তো, এই একান্তরূপে প্রাকৃত জগতে, বয়স্কদের স্থান হতো না।
[* ‘আলোর ফুলকি’, ‘বুড়ো আংলা’, এই দুটি গ্রন্থই বিদেশী গল্পের অবলম্বনে লেখা। মূল গ্রন্থদুটি আমার পড়া নেই, ঘটনাবিন্যাসে অবনীন্দ্রনাথের নিজের অংশ কতখানি তা আমি বলতে পারবো না। কিন্তু ঘটনাগুলির ভিতর দিয়ে তাঁর যে-মন প্রকাশ পেয়েছে, এই আলোচনার পক্ষে তা-ই যথেষ্ট।]
রবীন্দ্রনাথ দূর থেকে শিশুকে দেখেছেন, তার সঙ্গে বিচ্ছেদবোধে ব্যথিত হয়েছেন, বার-বার তৃষিত হয়েছেন তাকে ফিরে পাবার জন্য। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথে এই বিচ্ছেদটাই কখনো ঘটেনি। আর তাই, যেহেতু তিনি ছোটো ছেলের সঙ্গে এক হয়ে ছিলেন, তাঁর স্নেহের চেয়েও বড়ো হয়ে উঠেছে আর-একটি বৃত্তি : একটি আশ্চর্য শ্রদ্ধা, জীবনের প্রতি বিস্ময়ে ভরা শান্ত ধীর গভীর একটি সম্ভ্রম। এই হচ্ছে সেই চোখ, যে-চোখ সত্যিকার শিশুর, রূপকথার শিশু-মানুষের, যে পায়ের তলার পিঁপড়েটিরও কথা শুনতে থেমে দাঁড়ায়, বিশ্বজগৎকে বন্ধু বলে ধরেই নেয়ধরে নিয়ে ভুল করে না। এ-চোখ দেখতে ভয় পায় না, দেখতে পেয়েও আকুল হয় না, এতে কাছে ডাকা নেই, দূরে রাখাও না—একই সঙ্গে নির্লিপ্ত ও ঘনিষ্ঠ, একে বলতে পারি প্রাণপদার্থের পবিত্রতাবোধ। আকাশের উঁচু পাড় থেকে যে-বাজ অমোঘ হয়ে নেমে আসে তাকেও এ নমস্কার জানায়, আবার পায়রার রক্তমাখা ছেঁড়া পালকটিকেও করুণা দিয়ে ধুয়ে দেয়। অবনীন্দ্রনাথের পশুচিত্রণ, তাঁর প্রকৃতির বর্ণনা, সবই এই উৎস থেকেই নিঃসৃত হয়েছে; তাঁর পশুপাখিরা ব্যঙ্গকৌতুক উপদেশের উপায় নয়, তারা আছে বলেই মূল্যবান, আর ফুল, পাতা, জল, আকাশ—এরাও শুধু গয়না নয় তাঁর কাছে, শুধু মানুষের মনের আয়নারও কাজ করে না, এরা নিজেরাই প্রাণবন্ত, ব্যক্ত, ব্যক্তিত্বধারী; তাঁর লেখায় ‘বীর বাতাস’ বয়ে যায়, আলো কথা ‘বলেন’, * ‘বৃক্ষটি’ ভঙ্গি ধরে ‘দাঁড়ান’, আর কুঁকড়ো হয়ে ওঠে—হয়ে ওঠেন—শুধু কি কুক্কুটকুলচূড়ামণি, শুধু কি একজন মহাশয় ব্যক্তি? শিল্পী, প্রেমিক, বীর, পুরুষ, রাজা—এত বড়ো চরিত্ররূপ যে তুচ্ছ একটা মোরগের মধ্যে ফুটে উঠতে পারলো, এতে মূল লেখকের যতটা অংশই থাক না, অবনীন্দ্রনাথের হৃদয়ের দানও দীপ্ত হয়ে আছে। সে-দান আর-কিছু নয়, এই শ্রদ্ধা, যাতে নিখিলজীবন একসূত্রে বাঁধা পড়ে। অবনীন্দ্রনাথের নির্যাস এটি, তাঁর সমস্ত লেখার মজ্জাস্বরূপ; এরই জন্য—হান্স আন্ডেরসেনের মতোই—তিনি শিশু-পশুর গল্পের মধ্য দিয়ে শোনাতে পেরেছেন অমৃতবাণী : সর্বজীবে দয়া, সর্বভূতে প্রেম, বিশ্বের সঙ্গে একাত্মবোধ।**
[* এই ‘তিনি’র আশ্চর্য ব্যবহার অবনীন্দ্রনাথে সর্বত্র পাওয়া যায়, ‘নালকে’র একটি অংশ উল্লেখ করি। ‘রাত ভোর হয়ে এসেছে, শিশিরে নুয়ে পদ্ম বলছে-নমো, চাঁদ পশ্চিমে হেলে বলছেন—নমো, সমস্ত সকালের আলো পৃথিবীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বলছেন নমো’–এখানে—এই ‘বলছেন’টা হঠাৎ যেন পুজোর ঘন্টা বাজিয়ে দিয়ে চলে যায়।
** আন্ডেরসেনের সঙ্গে অবনীন্দ্রনাথের তুলনা বার-বার এসে পড়ছে। কিন্তু একটি পার্থক্য উল্লেখ করবো। খ্রিষ্টান ঐতিহ্যে পাপবোধ প্রবল; যে-মেয়ে ঘাঘরা বাঁচাতে রুটি মাড়িয়েছিলো, আর লাল জুতো পরে দেমাক হয়েছিলো যার, তাদের অতি কঠিন শাস্তি দিয়ে তবে আন্ডেরসেন পুণ্যলোকে পৌঁছিয়ে দিলেন। আর হৃদয়হীন রিদয় ছেলেটার উপর গণেশের শাপ লাগলো বটে, কিন্তু যে-উপায়ে তার ত্রাণ হলো সেটা বিপদসংকুল হলেও মনোরম। হিন্দুর মনে নরকের ধারণা স্পষ্ট নয়; সেটা তার শক্তির কারণ, দুর্বলতারও।]
৬
এমন মত পোষণ করা সম্ভব যে শিশুসাহিত্য স্বতন্ত্র কোনো পদার্থ নয়, কেননা তা সত্যিকার সাহিত্য হলে বড়োরাও তাতে আনন্দ পান, আর সাবালক—এমনকি আবহমান সাহিত্যের একটি অনতিক্ষুদ্র বিচিত্র অংশের ছোটোরাও উত্তরাধিকারী। যে-সব গ্ৰন্থ চিরকালের আনন্দভাণ্ডার, ছোটোদের প্রথম দাবি সেখানেই–সেই মহাভারত, রামায়ণ, বাইবেল, আরব্যোপন্যাস, বিশ্বের পুরাণ, বিশ্বের রূপকথা আর সেইসঙ্গে আধুনিক কালের ভাস্কর চিত্রাবলি—ডন কুইকসট, রবিনসন ক্রুসো, গালিভার। শিশুসাহিত্যের বড়ো একটি অংশ জুড়ে এরাই আছে; এই অমর সাহিত্যের প্রবেশিকাপাঠ শিশুদের আদ্যকৃত্য! পক্ষান্তরে, মৌলিক শিশুগ্রন্থ তখনই উৎকৃষ্ট হয়, যখন তাতে সর্বজনীনতার স্বাদ থাকে। অতএব, অন্তত তর্কস্থলে, সাহিত্যে এই ‘ছোটো-বড়ো’র ভেদজ্ঞানকে অস্বীকার করা সম্ভব।
কিন্তু এই মত একটা জায়গায় টেকে না। যারা আক্ষরিক অর্থে শিশু, নেহাৎ বাচ্চা, এইমাত্র পড়তে শিখলো কিংবা এবারে পড়তে শিখবে, তাদের জন্যও বই চাই; আর সে-সব বইয়ে সাহিত্যকলার সাধারণ লক্ষণ আমরা খুঁজবো না, আলাদা করেই তাদের দেখতে হবে। কত ভালো করে কাজ চলবে, কত সহজে ক-খ শিখবে ছেলেরা, তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাস্য শুধু এইটুকু; তার বেশি চাহিদাই নেই। কিন্তু এখানেও, আশ্চর্যের বিষয়, বাঙালির মন সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছে; বাংলার মাটিতে এমন মানুষ একজন অন্তত জন্মেছেন, যিনি একান্তভাবে ছোটোদেরই লেখক—সেই সব ছোটোদের, যারা কেঁদে-কেঁদে পড়তে শিখে হেসে হেসে বই পড়ে। অবশ্য অশ্রুহীন বর্ণপরিচয় সম্ভব নয়; ঠিক অক্ষর চিনতে হলে—আজ পর্যন্ত বিদ্যাসাগরই আমাদের অবলম্বন; কিন্তু তার পরে—এবং তার আগেও—মাতৃভাষার আনন্দরূপের পরিচয় নিয়ে প্রস্তুত আছেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার। মুখে বোল ফোটার সঙ্গে-সঙ্গে বাঙালি ছেলে তাঁরই ছড়া আওড়ায়—সেই ধাবমান অজগর আর লোভনীয় আম্রফলের চিরনূতন নান্দীপাঠ—মায়ের পরেই তাঁর মুখে মুখে কথা শেখে শিশুরা। যোগীন্দ্রনাথ, তাঁর হাসিখুশির দানসত্র নিয়ে, তাঁর উৎসর্গিত শুভ্র জীবনের রাশি-রাশি উপচার নিয়ে, আজকের দিনে একজন লেখকমাত্র নেই আর, হয়ে উঠেছেন বাংলা দেশের একটি প্রতিষ্ঠান, শিশুদের বিদ্যালয়। ঠিক তাঁর পাশে নাম করতে পারি এমন কোনো বিদেশী লেখকের সন্ধান আমি আজও পাইনি; ‘হাসিখুশি’র সঙ্গে তুলনীয় কোনো ইংরেজি পুস্তক এখনো আমাকে আবিষ্কার করতে হবে। অনুরূপ গ্রন্থে ইংরেজি ভাষা কত সমৃদ্ধ সে-কথা আমি ভুলে যাচ্ছি না; সেই সাহিত্যের বৈচিত্র্য, উদ্ভাবনকৌশল আর দক্ষতাকে শ্রদ্ধাও করি;–কিন্তু শেষ পর্যন্ত দক্ষতাটাই অত্যধিক বলে মনে হয়, মনে হয় সে-সব বই মাপজোক নিয়ে নিখুঁতভাবে কলে-তৈরি জিনিশ কিংবা লেখক-চিত্রক-মুদ্রকের সমবায়শ্রমের যোগফল। এইখানে যোগীন্দ্রনাথের জিৎ। তিনি প্ল্যান করে বই লেখেননি, প্রাণ থেকে লিখেছেন; তাঁর লেখা ঘনিষ্ঠভাবে তাঁরই, তাঁর হৃদয়ের স্পন্দনটি সেখানে শুনতে পাই—শিশুর জন্য অনবরত খিল-খুলে-রাখা দরাজ তাঁর হৃদয়। পুস্তক পড়ে শিশু-মনস্তত্ত্ব জানতে হয়নি তাঁকে, শিক্ষাশাস্ত্রে অভিজ্ঞ হতে হয়নি; বিভিন্ন বয়সের শিশুর মনের তারতম্য ঠিক কতটা, কিংবা সে-মনের উপর কোন রঙের কত মাত্রার প্রভাব কী-রকম, এ-সব বিষয়ের বৈজ্ঞানিক তথ্যে কিছুই তাঁর প্রয়োজন ছিলো না। শিশুর মন সহজেই তিনি বুঝেছেন—তাঁর নাড়ির টান ছিলো ওদিকে, আর সেই সঙ্গে রুচি ছিলো নির্ভুল, রচনাশক্তি যথাযথ—যেটুকু হলে সংগত হয় সেইটুকুই, তার কমও না, বেশিও না। তাই তাঁর প্রতিটি বই ঠিক তা-ই, অতিতরুণ পাঠমালার যা হওয়া উচিত—আগাগোড়া শৈশবের রসে সবুজ, একেবারে কিশলয়ের মতো কাঁচা—লেখায় যেটুকু কাঁচা ভাব আছে, অপটুতাও আছে, তাও তার স্বাদের একটি উপকরণ, ওর চেয়ে ‘পাকা হাত’ হলে সে-হাতে অমন তার উঠতো না। অপটুতা মানে অক্ষমতা নয়–এমন নয় যে কিছু-একটা ইচ্ছে করে তিনি পেরে ওঠেননি–তাকে বলতে পারি ঘরোয়া ভাব, সভাযোগ্য সৌষ্ঠবের বদলে গৃহকোণের অন্তরঙ্গতা যেন, আটপৌরে হবার সুখ, দুপুরবেলা মাদুর পেতে শুয়ে মা যখন ছেলেকে ডাকেন, সেই অবসরের সতর্কতাহীন আরাম। যোগীন্দ্রনাথের রচনা একান্তভাবে অন্তঃপুরের;–স্কুলের নয়, পাঁচজনকে ডেকে শোনাবার মতোও না, যেন মা-ছেলের বিশ্রম্ভালাপের ভাষা—ঠিক তেমনি স্নিগ্ধ-কোমল সহাস্য তাঁর গলার আওয়াজ। ঐ আওয়াজটি ফরমাশ দিয়ে পাওয়া যায় না বলেই যোগীন্দ্রনাথের জুড়ি হলো না; তাই এই বিভাগে, পথিকৃৎ হয়েও এখনো তিনি সর্বোত্তম। ‘হাসিখুশি’র প্রতিদ্বন্দ্বিতার উচ্চাশা নিয়ে অনেক বই উঠলো পড়লো; তার সর্বাধুনিক প্রকরণটি বর্ণবিলাসে জাজ্বল্যমান। এই নব্য প্রকরণ বিলেতি কিংবা মার্কিনি; প্রসাধনসিদ্ধ, নয়নরঞ্জন, কিন্তু এ-সব বই ছবিরই বই, অন্তত ছবিটাই এখানে মুখ্য, আর লেখা নামক গৌণ অংশটি নির্দোষ হলেও, দক্ষ হলেও, তাতে প্রাণের সাড়া পাওয়া যায় না, লেখকের সঙ্গে শিশুর মনের অব্যবহিত সম্বন্ধটি নেই তাতে। আর বইয়ের পাতায় ইন্দ্রধনুকে উজোড় করে দিলেও এই অভাবের পূরণ হয় না।
অন্য দিক থেকেও তফাৎ আছে। পড়া-শেখা পুঁথির সবচেয়ে জরুরি গুণ এই যে তা বস্তু-ঘেঁষা হবে, যাকে বলে কংক্রীট। এইটেই সব বইয়ে পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে ছবিটা শুধু ছবিতেই থাকে, আর সেইজন্য পাঠযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। যেটা পাঠ্য বই, তাতে ছবিটা থাকা চাই লেখাতেই, রংটা লাগানো চাই ক্ষুদ্র এবং খুব সম্ভব অনিচ্ছুক পাঠকের মনটিতেই। সেই সঙ্গে দ্রষ্টব্য ছবি—থাকা ভালো নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটা অতিরঞ্জিত হলে তাতে উদ্দেশ্যের পরাভব ঘটে। যদি বলি ‘লাল ফুল, কালো মেঘ’, সেটা তো নিজেই একটা ছবি হলো, মেঘলা দিনে মাঠের মধ্যে কোথাও একটি লাল ফুল ফুটে আছে এ-রকম একটা দৃশ্যেরও তাতে আভাস থাকে, কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে টকটকে লাল হুবহু একটি গোলাপফুল বসিয়ে দিলে তাতে চোখের সুখ কল্পনাকে বাধা দেয়। এখানে উদ্দেশ্য হলো—চোখ ভোলানো নয়, চোখ ফোটানো, আর দেহের চোখ অত্যধিক আদর পেলে মনের চোখ কুঁড়ে হয়ে পড়ে, কল্পনা সবল হতে পারে না। মনে করা যাক ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’- রবীন্দ্রনাথের সেই আদিশ্লোক, তাঁর জীবনের কবিতা পড়ার প্রথম রোমাঞ্চ যাতে পেয়েছিলেন তিনি–সেটি বটতলার ছাপাতে ছিলো বলে আনন্দে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি, বরং সেইজন্যই নিবিড় হয়েছে, অন্য কোনো উপকরণ ছিলো না বলেই বাণীচিত্র মূল্য পেয়েছে পুরোমাত্রায়। আমি অবশ্য নিশ্ছবিতার অনুমোদন করছি না; আমার বক্তব্য শুধু এই যে লেখার মধ্যেই ছবির যেন ইঙ্গিত থাকে, আর আঁকা ছবি সেই ইঙ্গিতকে ছাপিয়ে উঠে নষ্ট করে যেন না দেয়, কল্পনাকে উস্কে দিয়েই থেমে থাকে।* এখন যোগীন্দ্রনাথের লক্ষণ এই যে তাঁর লেখার মধ্যেই দৃশ্যতাগুণ ছড়িয়ে আছে : তাঁর বর্ণমালার উদাহরণে বিশেষ্য ছাড়া কিছু নেই, আর সেই বস্তুগুলিও অধিকাংশই সজীব, যথাসম্ভব পশুশালা থেকে গৃহীত—যেখানে শিশুর মন তৎক্ষণাৎ সাড়া দেয়—আর নয়তো শিশুজীবনের অন্তরঙ্গ পরিবেশ থেকে বাছাই-করা।
[* বর্ণপরিচয় পুস্তকে ছবির স্থান কোথায় এবং কতটুকু, তার আদর্শ আছে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠে’। যোগীন্দ্রনাথের বইগুলিও লক্ষ করতে হবে—রঙিন কালিতে হলেও এক রঙে ছাপা; নানা রঙের সমাবেশে চিত্তবিক্ষেপ ঘটে, পাঠক্রিয়া ক্ষুণ্ণ হয়। লেখার সঙ্গে ছবির সৌষম্যসাধনের আর-একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘আবোল তাবোলে’র আদি সংস্করণ।
এই প্রবন্ধ লেখা হবার পর আমি মর্মঘাতীরূপে আবিষ্কার করলাম যে ‘হাসিখুশি’র নতুনতম সংস্করণে এই তিন পুরুষের চেনা, প্রিয়, পুরোনো, অম্লান, অম্লেয় ছবিগুলির বদলে ‘আধুনিক’ ধরনের পটুত্ব-অভিমানী অপটু চিত্রাবলি আমদানি করা হয়েছে। আমি নিশ্চয়ই বলবো যে এটা পাপাচরণের পর্যায়ভুক্ত, পুরোনো পাথরের মন্দির ভেঙে নব্য ফ্যাশনের বিদেশী মার্বেলের তথাকথিত মন্দির-রচনার তুল্য। জানি না কোন দুর্বুদ্ধির প্ররোচনায় যোগীন্দ্রনাথের প্রকাশক এবং উত্তরাধিকারী এই কর্মটি করেছেন, কিন্তু সমস্ত সাহিত্যজগতের দোহাই দিয়ে তাঁদের কাছে আমার নিবেদন এই যে তাঁরা যেন পরবর্তী সংস্করণে পুরোনো ছবির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে বাংলা সংস্কৃতির মুখরক্ষা করেন।
শুনেছি, পরবর্তী এবং অধুনা-প্রচলিত সংস্করণে তা-ই করা হয়েছে। —দ্বিতীয় সংস্করণের পাদটীকা।]
কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি,
খেঁকশিয়ালি পালায় ছুটি।
গরু-বাছুর দাঁড়িয়ে আছে,
ঘুঘুপাখি ডাকছে গাছে।
জীবজন্তুর মেলা বসে গেছে একেবারে, আবার মাঝে-মাঝে সুন্দর এক-একটি পারম্পর্য ধরা পড়ছে, যেমন ধোপার পরেই নাপিত, কণ্ঠকণ্ডূয়নী ওলের পরই ঔষধ, বা টিয়াপাখির লাল ঠোটের সঙ্গে ঠাকুরদাদার শীর্ণ গণ্ডের প্রতিতুলনা। বস্তুত, বর্ণমালার উদাহরণ-সংগ্রহে ‘হাসিখুশি’ এমনই অব্যর্থ যে ঐ একটি বিষয়ে বাংলা ভাষার উপাদান সেখানে নিঃশেষিত বলে মনে হয়; পরবর্তীরা—আজকের দিন পর্যন্ত—লিখেছেন ওরই ছাঁচে, নতুনত্ব যা-কিছু শুধু চেহারায়। কিন্তু ঐ ছাঁচটা এমন যে ওর মধ্যে একাধিকের সম্ভাবনা নেই—নেই বলেই প্রমাণ হয়েছে; যোগীন্দ্রনাথের একটি লাইনও ‘আরো ভালো’ করা যায় না; আর দীর্ঘ ঈ-তে ঈগলের বদলে ঈশান, বা ঋ-তে ঋষির বদলে ঋষভ লিখলে রকমারি হয় বটে, কিন্তু ব্যঞ্জনা হয় না, ছবিটা মারা যায়। তাই পরবর্তী কারো লেখাতেই স্বাদ পাওয়া গেলো না; ‘হাসিখুশি’ তার প্রসাদগুণে, প্রত্যক্ষতার গুণে, এমন জরাহীন জীবন্ত হয়ে থাকলো যে তার পরে অন্য ছাঁচের দ্বিতীয় একটি মৌলিক গ্রন্থ রচনার জন্য প্রয়োজন হলো আস্ত একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভা।
শুভক্ষণে ‘সহজ পাঠ’ লেখায় হাত দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রচনাকালের দিক থেকে এটি ‘সে’, ‘খাপছাড়া’রই সমসাময়িক, কিন্তু ও-দুটি গ্রন্থের আত্মসচেতন বৈদগ্ধ্যের কোনো চিহ্ন নেই এখানে; পাঠ্যপুস্তক বলে এখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিভাকে সীমার মধ্যে রেখেছিলেন, অথচ তার প্রয়োগে কোনো কার্পণ্য করেননি। এর ফলে সর্বাঙ্গে সার্থক হয়েছে ‘সহজ পাঠ’—বাংলা ভাষার রত্নস্বরূপ এই গ্রন্থ, যেন প্রতিভার বেলাভূমিতে উৎক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র নিটোল স্বচ্ছ একটি মুক্তো। এর ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে চারিত্র, আর সেই সঙ্গে ব্যবহারযোগ্যতা, পরিশীলিত বিরল হাওয়ার মধ্যে নিকটতম তথ্যচেতনা, মহত্তম বাণীসিদ্ধির সরলতম উচ্চারণ। কী ছন্দোবদ্ধ ভাষা, কী কান্তি তার, কী-রকম চিত্ররূপের মালা গেঁথে-গেঁথে চলেছে, অথচ কঠিনভাবে প্রয়োজনের মধ্যে আবদ্ধ থেকে, শিশুর মনের গণ্ডি কখনো না-ভুলে, বর্ণশিক্ষার উদ্দেশ্যটিকে অক্ষরে-অক্ষরে মিটিয়ে দিয়ে। পদ্যছন্দের বৈচিত্র্য, মিলের অপূর্বতা, অনুপ্রাসের অনুরণন*—সমস্তই এখানে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু সমস্তই আঁটো মাপের শাসনের মধ্যে রেখেছেন, কোনোখানেই পাত্র ছাপিয়ে উপচে পড়েনি। ভেবে দেখা যাক একেবারে প্রথম শ্লোকটি—
[* বর্ণপরিচয় পুস্তকে অনুপ্রাস-প্রয়োগ অপরিহার্য, তার প্রকটতাও এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু ‘সহজ পাঠে’ অনুপ্রাস অনেকটা বিনীত হয়ে আছে, যেন অলক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে; কোথাও-কোথাও স্বর-ব্যঞ্জনের নমুনাগুলি, নিজেরা অনেকটা অগোচরে থেকে, দিয়ে যায় সাহিত্যেরই স্বাদ, ছন্দেরই আনন্দ।]
ছোটো খোকা বলে অ-আ,
শেখে নি সে কথা কওয়া।
কেমন সহজ অথচ অবাক-করা মিল, আর এ-রকম শুধু একটিই নয়, এর পরেই মনে পড়ে ‘শাল মুড়ি দিয়ে হ ক্ষ। কোণে বসে কাশে খক্ খ’, আর–সবচেয়ে আশ্চর্য—সেই নরম, অনতিস্ফুট ‘ঘন মেঘ ডাকে ঋ। দিন বড়ো বিশ্রী—’ এই যেটা এমন মনে হয় ‘ঋ’র সঙ্গে অনিবার্য এবং একমাত্র মিল, তার প্রতীক্ষায় কত কাল কাটাতে হলো বাংলা ভাষাকে। পদ্য-ব্যবহারেও কারিগরি কিছু কম নেই—কোনো-কোনোটি ‘ছন্দ’ বইয়ে নমুনাস্বরূপ উদ্ধৃত হতে পারতো—’আলো হয়, গেল ভয়’-এর ত্বরান্বিত বেগ, ‘কাল ছিল ডাল খালি’র দু-রকমের দোলা, ‘আমাদের ছোটো নদী’তে দীর্ঘায়িত ‘বৈশাখ’ শব্দটির সুখস্পর্শ,
গঞ্জের জমিদার সঞ্জয় সেন
দু-মুঠো অন্ন তারে দুই বেলা দেন।
এই মাত্রিক পয়ারে পিংপং বলের মতো লাফিয়ে-ওঠা এক-একটি যুক্তবর্ণ। অথচ এর কিছুই অত্যন্ত বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি, সমস্তটাই মূল উদ্দেশ্যের অধীন হয়ে আছে, নষ হয়ে শিশুশিক্ষার কর্তব্যটুকু সম্পন্ন করে যাচ্ছে। এই সমন্বয়গুণ—এটি আরো বেশি বিস্ময় জাগায় গদ্যের অংশে—বিস্ময়ের চমক সেখানে নেই বলে, আপাতদৃষ্টিতে কারিগরিটা সেখানে অদৃশ্য বলে। কিছু নয়, ছোটো-ছোটো কয়েকটি কথা পাশাপাশি বসানো, পদ্যের ঢেউ নেই, একেবারে সমতল-হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে ‘যে-কেউ’ লিখতে পারতো, কিন্তু মনঃসংযোগ করামাত্র ধারণা বদলে যায়। ‘বনে থাকে বাঘ। গাছে থাকে পাখি। জলে থাকে মাছ। ডালে থাকে ফল।’ আর তারপরে মাত্রা-বদলে-যাওয়া ‘বাঘ আছে আম-বনে। গায়ে চাকা-চাকা দাগ। পাখি বনে গান গায়। মাছ জলে খেলা করে।’—এই গদ্য লেখার জন্য রবীন্দ্রনাথের সত্তর বছরের অভ্যস্ত হাতেরই প্রয়োজন ছিলো; এর আগে ‘লিপিকা’ যিনি লিখেছেন, এবং এর পরে ‘পুনশ্চ’ যিনি লিখবেন, তাঁরই হাত থেকে বেরোতে পারে—’রাম বনে ফুল পাড়ে। গায়ে তার লাল শাল। হাতে তার সাজি। জবা ফুল তোলে। বেল ফুল তোলে। বেল ফুল সাদা। জবা ফুল লাল।’ শুধু ছাপার অক্ষরে চোখ বুলিয়ে আশ মেটে না এখানে; এ-লেখা থেমে-থেমে, মনে-মনে পড়তে হয়, বলতে হয় গুনগুন করে, এর সুন্দর সুনিয়ন্ত্রিত ছন্দটিকে মনের মধ্যে মুদ্রিত করে নিতে হয়। আর এই ছন্দের ভিতরেই ছবির পর ছবি বেরিয়ে আসছে; বাঘ, মাছ, পাখি, ফুলের বাগানে লাল শালের উজ্জ্বলতা, জবার পাশে বেলফুল, যে-বয়সে ক-খ চিনলেই যথেষ্ট, সেই বয়সেই সাহিত্যরসের দীক্ষা দেয় ‘সহজ পাঠ’; এই একটি বইয়ের জন্য বাঙালি শিশুর ভাগ্যকে জগতের ঈর্ষাযোগ্য বলে মনে করি।
৭
ছোটোরা কী চায়, কী পড়তে ভালোবাসে, আজ বাংলাদেশে তার সংখ্যাগণন যদি করা হয়, তাহলে বিচিত্র রকমের ফল পাওয়া সম্ভব। হয়তো তাদের মোহন-তালিকা সীমিত হয়ে আছে ডট-ড্যাশ-বিস্ময়চিহ্ন-বহুল দুই অর্থে বীভৎস হত্যাকাহিনীতে; কিংবা, দৈনিকপত্রের শিশু-বিভাগ এবং সাধারণভাবে শিশু-পত্রিকার সাক্ষ্য থেকে, হয়তো প্রমাণ হবে যে ছোটোরা বেজায় কাজের লোক হয়ে উঠেছে আজকাল, বড্ড হিশেবি, নেহাৎই শুধু গল্প-কবিতা পড়ে ঠকে যাবার পাত্রটি আর নেই; ‘দেশের উন্নতি’, ‘সমাজ-সংস্কার’, এই রকম সব গুরুতর বিষয়ে ইস্কুলমাস্টারি এখন চায় তারা, আর সেই ভাতের বদলে পাথরকুচি গলাধঃকরণ করার জন্য তার সঙ্গে চায় মাছি-আটকানো চিটেগুড়ের মতো বিশুদ্ধ ন্যাকামির পলেস্তারা। কিন্তু এ-রকম দুর্লক্ষণ–শুধু তো শিশুসাহিত্যে বা সাহিত্যে নয়—দেশের মধ্যে চারদিকেই উগ্র হয়ে উঠেছে : কী সংগীতে, কী সিনেমায়, কী-বা দোল-দুর্গোৎসবে অথবা পঁচিশে বৈশাখের পুতুল-পুজোয়, রুচিহীনতার বিষরণ আজ সর্বত্রই প্রকট। এই দৃশ্যে ভাবুক ব্যক্তির মন-খারাপ হতে পারে, উদ্বেগের কারণ নেই তাও নয়; পাছে, এই গণস্ফীতির কৃষ্ণপক্ষে, মন্দই প্রবল হয়ে উঠে ভালোকে ডুবিয়ে দেয় এই আশঙ্কায় বিশ্বের সুধীচিত্ত আজ দোদুল্যমান। তবে আশার কথা এই যে সাহিত্য-ব্যাপারে সংখ্যা-গণনায় ঠিক ছবিটা পাওয়া যায় না; কেননা, ঐকাহিকের আবেদন যেমন বিপুল, তেমনি মানুষের মনে অমৃতের তৃষ্ণাও দুর্বার, আর সেই তৃষ্ণার তৃপ্তি হয়ে, প্রতিভূ হয়ে, যুগে-যুগে শিল্পীরা আসেন জীবনধর্মেরই আপন নিয়মে, তার প্রেরণা কোনোকালেই রুদ্ধ হয় না। বিশেষত, বাংলা শিশুসাহিত্যের কৃতিত্ব এমন অসামান্য যে তার সাম্প্রতিক বিকৃতি সে-তুলনায় অকিঞ্চিৎকর। এমনও বলা যায় যে আমাদের সমগ্র সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ অংশই শিশুসাহিত্য; অন্ততপক্ষে এটুকু সত্য যে ছোটোদের ছোটো খিদের মাপে বাংলা ভাষায় সুপথ্য যত জমেছে, সে-তুলনায় সুপরিণত সবল মনের ভারী খোরাক এখনো তেমন জোটেনি। এর কারণ—কেউ হয়তো বাঁকা ঠোঁটে বলবেন—আমাদের জাতিগত ছেলেমানুষি এখনো ঘোচেনি; কিন্তু আমি বলবো এই শৈশবসিদ্ধি শান্তশীল গৃহস্থ বাঙালির চিত্তবৃত্তিরই অন্যতম প্রকাশ। বাংলা শিশুসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য এই যে এই ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়েছে সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কোনো-কোনো বুদ্ধি, মহত্তম কোনো-কোনো মন : যার আদিপুরুষ বিদ্যাসাগর, যাকে রবীন্দ্রনাথ নানা স্থলে স্পর্শ করে গেছেন, যাতে আছেন অবনীন্দ্রনাথের মতো হৃদয়বান ও সুকুমার রায়ের মতো গুণী পুরুষ, তার দুটো-একটা রোগলক্ষণে ভীত হবার কারণ দেখি না, কেননা তার আপন ঐতিহ্যেই আরোগ্যশক্তি সঞ্চিত আছে।
