রবীন্দ্র-জীবনী ও রবীন্দ্র-সমালোচনা – বুদ্ধদেব বসু
রবীন্দ্র-জীবনী এবং রবীন্দ্র-সমালোচনা লেখবার একটি বাধা আছে আমাদের। সে-বাধা অদ্ভুত, অসাধারণ এবং পর্বতপ্রমাণ, কেননা সে-বাধা রবীন্দ্রনাথ। একে তো আত্মজৈবনিক গ্রন্থে ও পত্রাবলিতে তিনি সাক্ষাৎ কল্পতরু, তার উপর–স্বেচ্ছায় কিংবা দায়ে পড়ে—নিজেই নিজের মল্লিনাথের কাজ অসংখ্যবার করেছেন বলে বর্তমান বাংলা দেশে তাঁর জীবনীকার বা সমালোচকদের অনেক সময়ই সংগ্রাহকমাত্র মনে হয়–কি বড়োজোর সম্পাদক; অর্থাৎ তাঁরই রচনা আর চিঠিপত্র থেকে বিস্তারিত উদ্ধৃতি, এবং সেই উদ্ধৃতিরই রোমন্থন পেরিয়ে আমাদের রবিচর্চা আর বেশিদূর এগোয় না। বাংলা ভাষার পাঠকমাত্রেই জানেন যে রবীন্দ্র-বিষয়ক গ্রন্থের সাধারণ সুখপাঠ্যতার প্রধান কারণ আদি উৎস থেকে উদ্ধৃতির বহুলতা; আর যদিও তার কোনো- কোনোটি—যেমন সদর স্ট্রিটের স্বপ্নভঙ্গের বর্ণনা—পুনরুক্তির শরশয্যায় শতচ্ছিন্ন, তবু কখনো-কখনো এমন কোনো পঙক্তি বা পত্রাংশের সাক্ষাৎ মেলে যা পাঠক হয়তো তৎপূর্বে লক্ষ করেননি— আর তারই জন্য গ্রন্থকারকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সংকলনের নৈপুণ্যে সমালোচকের কাজ ফুরোয় না; যে-লেখা রবীন্দ্রনাথকে চিনিয়ে দেবে, তাঁর বই পড়ে যা পাওয়া যায়, তার উপরেও আরো কিছু যোগ করবে, সে-রকম সমালোচনায় সিদ্ধি বড়ো দুরূহ, কেননা প্রণয়নের পদে-পদে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষ্যকারের প্রতিযোগী। এ-রকম আশঙ্কা সর্বদাই বিদ্যমান যে ‘জীবনস্মৃতি’ বা ‘ছিন্নপত্রে’র কোনো অংশের পাশে আমাদের পদাতিক গদ্যের খঞ্জতা যেমন প্রকট হবে, তেমনি ধরা পড়বে যে তাতে বক্তব্য কিছু নেই, আসলে তা উদ্ধৃত পদেরই সম্প্রসারণ মাত্র। ফলত, পাঠকের হয়তো ধারণা হবে যে সমালোচকের দ্বারস্থ হওয়া বৃথা; রবীন্দ্রনাথকে আরো বেশি জানতে হলে আরো একবার রবীন্দ্রনাথ পড়াই সদুপায়। আর এ-ধারণার বশবর্তী হলে কেউ ভুল করবে সে-কথাও এখনো বলা যায় না, কেননা রবীন্দ্রনাথ তাঁর পরিমাণ ও বৈচিত্র্যগুণে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে আছেন; অর্থাৎ, তাঁর রচনাবলি অন্তঃস্থ হলেই তাঁর জীবনের সঙ্গে পরিচয় হয়; শুধু তা-ই নয়, তাঁর চিন্তার সঙ্গে আমাদের উপলব্ধির সেতুনির্মাণ করে তাঁর নিজেরই পত্রাবলি, প্রবন্ধাবলি। রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের ব্যাখ্যাতা হয়ে পরবর্তীদের যে-সুবিধে করে দিয়েছেন সেই সুবিধেটাই বিপজ্জনক; তাঁর আপন ভাষ্যের সীমানার বাইরে তাঁকে দেখতে পাওয়া আজ পর্যন্ত সহজ হয়নি। এর একটা উদাহরণ এই যে তাঁর জীবন সম্বন্ধে যে-সব তথ্য সত্যই জ্ঞাতব্য, অথচ তিনি প্রকাশ করেননি, অন্য কেউ তার ধার দিয়েও এখনো ঘেঁষেনি; কিংবা তিনি পরোক্ষে যেটুকু জানিয়েছেন, অন্য কেউ প্রত্যক্ষভাষণেও পৌঁছতে পারেননি সেখানে–সুবৃহৎ ‘রবীন্দ্র-জীবনী’র প্রণেতা শ্রীযুক্ত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ও না।
এতৎসত্ত্বেও এ-কথা সত্য যে ভালোবাসা ভাষার প্রত্যাশী; অতএব স্বর্গত অজিতকুমার চক্রবর্তী থেকে শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ বিশী পর্যন্ত রবীন্দ্র-বিষয়ক গ্রন্থকর্তারা এইজন্যেই আমাদের শ্রদ্ধেয় যে তাঁদের পরিশ্রম তাঁদের রবিপ্রেমেরই প্রতিমূর্তি। এ-কথা অজিতকুমার সম্বন্ধে বিশেষভাবে প্রয়োজ্য, কেননা এই স্বল্পায়ু রসজ্ঞ তাঁর বই দু-খানা যখন লিখেছিলেন, তখন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রবাবু বলা হতো, এবং রবিভক্তি—অন্তত তার মৌখিক প্রকরণ—ভব্যতার অপরিহার্য অনুষঙ্গ বলে গণ্য হয়নি। যদিও রবীন্দ্রনাথ তখন বয়ঃক্রমে পঞ্চাশোত্তর, আর গ্রন্থসংখ্যায় শতাধিক, তবু সরবে তাঁর পক্ষপাতী হওয়া তখন পর্যন্ত দুঃসাহসিক ছিলো; উপরন্তু, ক্ষয়িষ্ণু ব্রাহ্মসমাজের বন্ধ্যত্ব, আর যুযুৎসু হিন্দুসমাজের অন্ধতা, এই উভয়সংকট অতিক্রম করে রবিপ্রতিভার স্বরূপ চেনা সহজ ছিলো না। এই ডবল ফাঁড়া কাটিয়ে গিয়েছিলেন অজিতকুমার; তাঁর সম্বন্ধে উল্লেখ্য শুধু এ-ই নয় যে তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রতিশ্রুত রবিপূজকদের অন্যতম, তাঁর প্রধান কৃতিত্ব এইখানে যে রবীন্দ্রনাথকে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন স্থানীয়, অস্থায়ী এবং সাময়িকের পরপারে, কোনো-এক ধ্রুব আদর্শের পটভূমিকায়। অবশ্য সে-আদর্শ তিনি সংগ্রহ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথেরই কাছে—আর সেখানেই তাঁর সমালোচনার ন্যূনতা—কিন্তু তার জন্য অজিতকুমারকে দোষ না-দিয়ে দোষ দিতে হয় আমাদের ভাগ্যকে—যে-ভাগ্যে আমরা রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি তার মস্ত মাশুল এই দিতে হচ্ছে যে তাঁর বিষয়ে তাঁরই ভাষায় কথা বলতে হয়। আদর্শের যে-পূর্বপ্রস্তুত স্বকীয়তায় সমালোচনা মেরুদণ্ড পায়, যার জোরে নিজের পায়ে সে দাঁড়াতে পারে, তারই অভাব আমাদের রবিচর্চার প্রায় সামান্য লক্ষণ। বাঙালির সাধারণ সাহিত্যচিন্তার সংকীর্ণতা থেকে রবিপ্রতিভার সার্বভৌমতা এতই সুদূরে যে তাঁর বিষয়ে কিছু বলতে হলে—শুধু অজিতকুমার কেন—অনেকেই আমরা আজ পর্যন্ত গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা সারি এটা পরিতাপের বিষয়, কিন্তু বিস্ময়ের নয়, কেননা গুল্মবহুল বাংলা সাহিত্যের এঁদো জমিতে রবীন্দ্রনাথের অভ্যুত্থান এত বড়োই আশ্চর্য ঘটনা যে তার টাল সামলাতেই আমাদের প্রায় দম ফুরোয়। কার্যত, এই অনন্য বনস্পতির ছায়ায় বসেই দিন কাটে আমাদের, মাপজোক নেবার কলকব্জা খুঁজে পাই না। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে আধুনিক মনের থই মেলে না, স্বদেশী ঐতিহ্যে তুল্য কোনো কবি নেই, আবার পশ্চিমী আদর্শ প্রয়োগ করতে গেলেও ভুল হবে- -যদিও এই বিশ্বমানবের আলোচনায় বিশ্ববোধ অপরিহার্য প্রয়োজন। এই বিশ্ববোধের আভাস দেখা যায় অজিতকুমারে, কেননা “উর্বশী”-বিষয়ক চলতি বুলির তিনিই যদিও জন্মদাতা*, তবু অন্তত এ-সত্য তিনি অনুভব করেছিলেন যে রবীন্দ্র-কাব্য ‘বিশ্বের জন্য বিরহ-বেদনা’য় চঞ্চল।
[* ভেবে অবাক লাগে যে অজিতকুমার, পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যে অভিজ্ঞ হয়েও, কেমন করে এমন কথা লিখতে পেরেছিলেন যে, “উর্বশী”র ন্যায় সৌন্দর্যবোধের এমন পরিপূর্ণ প্রকাশ সমগ্র য়োরোপীয় সাহিত্যে কোথাও আছে কি না সন্দেহ!]
উপরন্তু অজিতকুমার বুঝেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের কাব্য ও জীবন ‘একই রচনা’র অন্তর্গত; তাঁর লক্ষ্য ছিলো ইংরেজি লাইফ অ্যাণ্ড লেটার্স গ্রন্থমালার পদ্ধতিতে জীবনের সঙ্গে কাব্যের অন্বয়। তবু যে জীবনীর দিকে তাঁর আগ্রহ জাগেনি, সেটা তাঁর ভাগ্য; কেননা রবীন্দ্র-বিষয়ক গ্রন্থরচনার পূর্বোল্লিখিত সাধারণ বাধা ছাড়াও জীবনীবিন্যাসে বিশেষ বিপত্তির কারণ আছে। রবীন্দ্রনাথ যে একবার একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে তাঁর জীবন সম্বন্ধে বিশেষ-কিছু বলবার নেই সে-কথা বিনয়প্রসূত অতিশয়োক্তি নয়, একদিক থেকে খাঁটি সত্য। একদিক থেকে, তাঁর জীবন নিতান্ত গতানুগতিক; না মধুসূদনের মতো নাটকীয়, না শেলির মতো বাণবিদ্ধ বা কীটসের মতো তীক্ষ্ণকরুণ। আবার, গ্যেটের হেঁয়ালিবহুল অনৈতিকতা কিংবা টলস্টয়ের দ্বন্দ্বপীড়িত উত্তালতারও তাতে চিহ্ন নেই। শিল্পীজীবনের প্রথাগত বৈশিষ্ট্য কিছুই বর্তায়নি তাঁর জীবনে; দারিদ্র্যে প্রহৃত হননি কখনো, ব্যর্থতার শৈত্যসঞ্চার অনুভব করেননি, উদ্ভ্রান্ত হননি কোনো পারিবারিক অনিয়ন্ত্রণে কি সাংসারিক দুর্বিবেচনায়; কোনো বয়সে, কোনো অবস্থাতেই উন্মত্ততার কোনো লক্ষণ দেখাননি, উচ্ছৃঙ্খলতারও না। শান্ত, সংযত, সমতল তাঁর জীবন একটি স্থির লক্ষ্যের দিকে তীরের মতো তন্ময়; লক্ষ্যের যত কাছে আসছেন ততই গভীর হয়ে তার রেখা পড়ছে পার্থিবের মানচিত্রে; নিরবচ্ছিন্ন আত্ম-উপলব্ধি আর সমানুপাতিক জাগতিক স্বীকৃতি তাঁকে উপহার দিয়েছে রাজকীয় উত্তরজীবন, মহিমান্বিত মৃত্যু। এদিক থেকে, তাঁর সুন্দর, সম্পূর্ণ বৃত্ত জীবনীকারের পক্ষে ততটা উৎসাহজনক নয়, যতটা—ধরা যাক—শেলির অসমাপ্ত উন্মাদনা, বা গ্যেটের বক্রবন্ধুর মানসভূগোল। পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রজীবনের কর্মসূচি বাইরের দিক থেকে এতই বিচিত্রবহুল, ব্যক্তিগত জীবনে মৃত্যুশোকে আর কবিজীবনে নবজন্ম এমন পৌনঃপুনিক, তাঁর বিশ্বজয়ী ভ্রমণকাহিনীর তালিকা এত সুদীর্ঘ, এমনই নিঃসংশয়ে তিনি বিশ শতকের প্রথমার্ধের অন্যতম বিশ্বপ্রধান— আর তা শুধু কবি বলে নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই–এক কথায়, তাঁর মধ্যে সর্বতোমুখী প্রতিভার ছবি এমনভাবেই ভাস্বর যে তাঁর প্রতি জীবনীকারের পক্ষপাত অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু এই শ্রীক্ষেত্রে আহূত হলেও বৃত হবার সম্ভাবনা কম; কেননা এখানেও রবীন্দ্রনাথ অন্তরায়, অন্তরায় তাঁর কর্মের আযোজন বিস্তৃতি। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সমস্ত কথা লিখতে গেলে পৃষ্ঠাসংখ্যা পাঠক ভাগাবে, তার উপর সেই বহুবিভক্ত বহুবিক্ষিপ্ত উপাখ্যানের বিশৃঙ্খলতার, অতএব অপাঠ্যতার, আশঙ্কাও অনেকখানি।
সাহসী প্রভাতকুমার সেই চেষ্টাই করেছেন; তাঁর গ্রন্থের পরিবর্ধিত সংস্করণটির আকার দেখলেই সম্ভ্রম জাগে। প্রথম খণ্ডের সুবৃহৎ ঘনমুদ্রিত ৪০০ পৃষ্ঠায় তিনি পৌঁচেছেন মাত্র ১৩০৮ সালে, অর্থাৎ কবির চল্লিশ বছর পর্যন্ত। অথচ, তথ্যের এই আধিক্য সত্ত্বেও, কিংবা সেইজন্যেই, রবীন্দ্রনাথ কোনো-একটি পৃষ্ঠাতেও জীবন্ত হয়ে ওঠেননি, কোথাও নিশ্বাস পড়েনি তাঁর, একবারও শুনতে পেলাম না তাঁর হৃৎস্পন্দন। ভিক্টরীয় ইংলন্ডের ‘সরকারি’ জীবনীর অনুসরণে প্রভাতকুমার অধিগম্য সকল তথ্যই একত্র করেছেন, তার উপর নায়ককে অবতীর্ণ করেছেন প্রথম থেকেই মহত্ত্বের ইস্পাতি জামা পরিয়ে। অবশ্য এ-বিষয়ে তিনি সচেতন যে জীবনীকারের অতিভক্তি জীবনীর অভিব্যক্তির প্রতিকূল; তিনি প্রশংসনীয় চেষ্টা করেছেন অভিভূত না-হতে, সুযোগ পেলেই রবীন্দ্রনাথের মতের বিরুদ্ধে তর্ক তুলেছেন, রচনার দুর্বল অংশগুলিকে দুর্বল বলেই ঘোষণা করতে দ্বিধা করেননি—তবু-যে বিগ্রহে প্রাণসঞ্চার করতে পারেননি তার কারণই এই যে গ্রন্থটি ক্রমবিকশিত নয়, নির্মিত, অর্থাৎ লেখক প্রকৃতির অনুকরণে তাঁর পাত্রকে উন্মোচিত করেননি, প্রথম থেকেই ধরে নিয়েছেন, এবং পাঠককে বুঝতে দিয়েছেন যে, তিনি মহাপুরুষ, তার উপর একটি মহৎ বংশের রত্নোত্তম।
ঐ শেষোক্ত বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের নিজের কিঞ্চিৎ আপত্তি ছিলো। ‘রবীন্দ্র-জীবনী’ প্রথম বেরোবার পর—প্রভাতকুমার তাঁর দ্বিতীয় সংস্করণের ‘সূচনা’য় জানিয়েছেন- রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে বইখানা রবীন্দ্রনাথের জীবনী হয়নি; হয়েছে দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্রের কাহিনী। এই আর্য বাক্য মেনে না-নিয়ে উপায় থাকে না, যখন অতিবিস্তৃত বংশপরিচয়ের পরেও প্রভাতকুমার ঘন-ঘন দ্বারকা-দ্বারস্থ হন, এমনকি রবীন্দ্রনাথের বিবাহপ্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে ‘সামাজিক আর্থিক আধ্যাত্মিক কোনো দিক “হইতেই” অভিজাত ঠাকুর পরিবারের সহিত ইঁহাদের (অর্থাৎ কবিপত্নীর পিত্রালয়ের তুলনা হইতে পারে না।’ সত্যি বলতে, বাংলা দেশে রবীন্দ্রনাথকে এখনো অনেকটা আচ্ছন্ন করে আছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি; তিনি যেন ঠাকুরবাড়িরই কৃতিত্ব, কিংবা ঠাকুরবাড়ির বলেই তিনি রবীন্দ্রনাথ, এই রকম মোহপ্রসূত বাক্য মাঝে-মাঝেই শোনা যায়। ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথে’র লেখিকা এক জায়গায় কবির আভিজাত্য ইত্যাদি নিয়ে উচ্ছ্বসিত; এমনকি শ-ভক্ত প্রমথনাথ বিশীও এ-কথা ভেবে রোমাঞ্চিত যে, ‘দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র’ এমন অনেকের সঙ্গে বনভোজনে বেরিয়েছেন, যারা ‘দ্বারকানাথের পৌত্রের চেয়ে ধন ও বংশমর্যাদায় অনেক নীচে।’ একেই ইংরেজিতে বলে স্নবিশ।
সমালোচনার ক্ষেত্রে বিশীমহাশয় অজিতকুমারের সধর্মী; তাঁরও প্রয়াস জীবনের সঙ্গে সাহিত্যকর্ম মিলিয়ে দেখানো। এই পদ্ধতির উপযোগ আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এখানে খুব সতর্ক না-হলে এমন বিষয় প্রশ্রয় পায়, যা সমালোচনায় অবৈধ, বা অবান্তর। বংশপরিচয় জায়গা জোড়ে, খামকা ফেঁপে ওঠে আত্মীয়-বন্ধুর তালিকা, আর তার ফলে যে কাব্যজিজ্ঞাসার ক্ষতি হয়, তার দৃষ্টান্ত মেলে বিশীমহাশয়ের জীবনীঘটিত সমালোচনায়। এই রবিসাধক যদি ভুলতে পারতেন যে রবীন্দ্রনাথ দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র, যদি কবির উপর প্রত্যেক পারিবারিক ও সাহিত্যিক অগ্রজের, এবং বিদেশী কবিদের ‘প্রভাব’-সন্ধানে শ্রান্ত না-হতেন, তাহলে ‘রবীন্দ্র-কাব্য-নির্ঝরে’ বালার্কবর্ণনার কাহিনীর অংশ তাঁর হাতে আরো রমণীয় হতো, আরো গ্রহণীয় হতো সমালোচনা। বলা বাহুল্য, সাহিত্যশাস্ত্রে পারদর্শিতা মানেই সারদর্শিতা নয়, রবিজ্ঞতাও বৃহত্তর অভিজ্ঞতার মুখাপেক্ষী; সেই অভিজ্ঞতার অভাববশতই বাংলা দেশে রবীন্দ্র-বিষয়ক কিছু প্রবচনের উদ্ভব হয়েছে, যার বাস্তবে ভিত্তি নেই, অথচ মুখে-মুখে যার পুনরুক্তিও কিছুতেই থামছে না। –আজকের দিনেও বিশীমহাশয় আমাদের শুনিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথ শেলির সগোত্র, আর শেলি ও কীটস নাকি ‘আদি-পর্বে’ কাহিনী-কাব্য লিখে থাকলেও শেষে বুঝেছিলেন যে দীর্ঘ কাব্য তাঁদের ‘যথার্থ বাহন’ নয়, উপরন্তু কাহিনী-কাব্যে তাঁরা ‘সাফল্যলাভ’ করতে পারেননি ‘বাস্তব সংসারের সঙ্গে পরিচয়ের অভাবে।’ বস্তুটাকে বাদ দিয়ে শাস্ত্র মেনে চললে তার ফলাফলটা কেমন দাঁড়ায় তা জানবার সুযোগ আমরা আরো পেয়েছি; বাঙালি অধ্যাপকের মুখে এমন কথাও আমাদের শুনতে হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথে হাস্যরস নেই— কেননা রবীন্দ্রনাথ গীতিকবি, এবং গীতিকাব্যের কেতাবি লক্ষণে হাস্যরস গণ্য হয় না। উপরি-উদ্ধৃত মন্তব্যটিও ফর্মুলামাফিক নিঃসৃত হয়েছে; শেলি-কীটস রোমান্টিক জাতের কবি, এবং রোমান্টিকদের লিরিক লেখাই নিয়ম—অতএব চোখ বুজে বলে দেয়া যায় যে কাহিনীকাব্যে তাঁরা ব্যর্থকাম। অবশ্য যাঁরা কানুন ভুলে কবিতাটারই সাক্ষ্য নেন তাঁরাই জানেন যে কীটসের কবিপ্রকৃতির প্রবল উন্মুখতা ছিলো দীর্ঘ কাব্যেই, শুধু কাহিনী-কবিতায় নয়, নাটকে এপিকেও সুস্পষ্ট; ‘দি চেঞ্চি’ অভিনয়ের অযোগ্য হলেও নাটকীয় দ্বন্দ্বে দরিদ্র নয়, এবং শেলির সর্বশেষ অসমাপ্ত ‘ট্রায়াম্ফ অব লাইফ’, যার তুল্য গভীর কবিতা তিনি আর লেখেননি, সেটি অস্ত্যর্থেই দীর্ঘ, শেষ হলে সুদীর্ঘ হতো। যে-বিষয়ে এই দুই কবির প্রবণতা স্বাভাবিক, এবং কৃতিত্ব কিছু নেই তাও নয়, সে-বিষয়ে তাঁদের ‘সাফল্যে’র অভাব কেউ কারণসুদ্ধু দেখিয়ে দিলে সমালোচনার ভিৎ ভেঙে পড়ে। *
[* এখানে উল্লেখ্য যে শেলির ঘোরতর অভক্ত টি. এস. এলিয়ট সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে দান্তের প্রভাব শেলির মধ্যে যে-রকম সার্থক হয়েছিলো, ইংরেজি ভাষার আর-কোনো কবিতেই সে-রকম হয়নি। বাঙালি পাঠকসমাজে শেলি সম্বন্ধে যে-ধারণা প্রচলিত, এই উক্তির সামনে তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।]
এখানে বলা দরকার যে ইংরেজ রোমান্টিক কবিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অতিপ্রচলিত সাদৃশ্য-চিন্তায় আমরা বহুকাল ধরে অত্যন্ত বেশি মুগ্ধ হয়ে আছি। সত্য, তাঁর রচনা থেকেই প্রমাণ করা যায় যে তাঁর প্রিয় কবিদের মধ্যে ছিলেন ইংরেজ রোমান্টিকত্রয়—শেলি, কীটস ও ওঅর্ডস্বার্থ; অন্য বহু বিদেশী কবিতা তাঁকে চঞ্চল করেছিলো, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এবং সম্পূর্ণ সুখের বিষয়ও নয়, তাঁর রচনায় প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রত্যেকটি ভারতীয়**; উপনিষদ, কালিদাস, বৈষ্ণব কবিতা, বাউল গান আর বাংলার লৌকিক ছড়া—এই ক-টি ছাড়া আর-কোনো প্রভাব আবিষ্কার করতে হলে পাতা ওল্টাতে হয় তাঁর বাল্যরচনার, যেখানে প্রভাবের প্রসঙ্গই অবান্তর, কেননা সেখান থেকে পঙক্তি তুলে-তুলে প্রমাণ করা শক্ত হয় না যে তিনি কখনো বিহারীলালের প্রভাবে চিহ্নিত, কখনো শেলির—এমনকি কখনো হেমচন্দ্রের। কিন্তু স্বভাব যতদিন প্রতিষ্ঠা না পায়, প্রভাব ততদিন অনুকরণেরই সমার্থক, এবং যে-বয়সে পূর্বসূরির অনুকরণ অবশ্যম্ভাবী, কিংবা অনুকরণই শুধু সম্ভব, সেই বয়সের রচনাকে ‘প্রভাব’ কিংবা ‘সাদৃশ্যে’র সাক্ষীরূপে দাঁড় করালে উদ্ভ্রান্তির সীমানা শুধু বেড়ে যায়। উদাহরণত, ‘কবি-কাহিনী’ আর ‘অ্যালাস্টরে’র সাদৃশ্যের অর্থ শুধু এ-ই হতে পারে যে প্রথমোক্ত শেষোক্তের অনুকরণ; এ-থেকে যদি এমন ধারণা প্রশ্রয় পায় যে ও-দুই কবিকে বিধাতা ‘একই ছাঁচে’ গড়েছিলেন, তাহলে এই সত্যটাই চাপা পড়ে যে রবীন্দ্রনাথের তুলনায় শেলি নাবালকমাত্র হলেও শেলির আত্মহারা তীব্রতা রবিপ্রকৃতির দূরবর্তী। প্রতিভার ক্রিয়াকলাপ রহস্যময়, স্বতোবিরোধ তার কুললক্ষণ; তাই দেখতে পাই যে রবীন্দ্রনাথ—যদিও আমাদের দেশজ সাহিত্যের ক্ষীণ ধমনীতে পাশ্চাত্ত্য শোণিতসঞ্চার তিনিই করেন, তবু তাঁর রচনাবলিতে প্রতীচীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি নেই, আর—তার চেয়েও যা আশ্চর্য—তাঁর প্রবন্ধাদি প্রমাণ করে যে পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যের সঙ্গে প্রাণসূত্রে তিনি বাধা পড়েননি,* ওতে তাঁর বুদ্ধির আগ্রহ ছিলো, কিন্তু স্বভাবের সমর্থন ছিলো না। উপরন্তু লক্ষণীয় যে তাঁর বয়স এবং প্রতীচীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা যত বেড়েছে, ততই তাঁর রচনায় কমে এসেছে পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যের প্রসঙ্গ; ও-বিষয়ে উল্লেখ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় তাঁর বাল্যরচনায়। বলা বাহুল্য, সে-সব কৈশোরক পঠনপাঠন এবং তৎ-প্রসূত অনুবাদ ও নিবন্ধাদি বয়সোচিত সাহিত্যিক ব্যায়ামের পর্যায়ভুক্ত, রবীন্দ্রনাথের মনোলোকের সন্ধানে তাদের প্রয়োজন অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু প্রভাতকুমার আর প্রমথনাথ দু-জনেই তাদের উন্মাত্রিক মূল্য দিয়েছেন।
[** প্রত্যক্ষ প্রভাব কাকে বলছি তা একটু বুঝিয়ে বললে ভালো হয়। কবিতার আকারে-প্রকারে বিদেশী কবিদের পরামর্শ তিনি পেয়েছিলেন; হয়তো বলা যায় যে “নারীর উক্তি”“পুরুষের উক্তি” প্রভৃতি কবিতায় ব্রাউনিঙের ধরনটা তাঁর মনে ছিলো; হয়তো ‘ক্ষণিকা’র হালকা চালটিকে হাইনে কিঞ্চিৎ এগিয়ে দিয়েছিলেন; তাছাড়া ‘আমি নাবব মহাকাব্য সংরচনে’র সঙ্গে অস্টিন ডবসনের ‘I intended an ode. Rose turned it to a sonnet’-এর সম্বন্ধ এতই স্পষ্ট যে সেটা উল্লেখ্যই নয়। কিন্তু আঙ্গিক—এমনকি আক্ষরিক সাদৃশ্যেও—প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রমাণ হয় না, প্রত্যক্ষ প্রভাব ভাবগত, মনের গভীরতম স্তরে তার ক্রিয়াকলাপ। সেই কবিরই প্রত্যক্ষ প্রভাবে পড়ি আমরা, যাঁকে আমরা অনুভব করি একান্ত বলে, চিনতে পারি পরিচালক এবং প্রতিযোগী বলে, যাঁকে আমরা দেখামাত্র বলে উঠি –’ঐ তো আমি!’ কিংবা, ‘আহা। আমি যদি উনি হতুম!’ ঠিক এই ভাবটি কোনো পশ্চিমী কবির বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের জাগেনি যদিও “বর্ষশেষে”র সঙ্গে “ওড টু দি ওয়েস্ট উইন্ড”-এর তুলনা অপ্রতিরোধ্য।
* ‘জীবনস্মৃতি’তে শেক্সপিয়র-প্রসঙ্গ স্মরণীয়। তখনকার বাঙালিরা ইংরেজি সাহিত্য থেকে মাদকতা যতটা পেয়েছিল খাদ্য ততটা পায়নি [‘আমরা যে-পরিমাণে মাদক পাইয়াছি সে-পরিমাণে খাদ্য পাই নাই’–স.] সে-কথা সত্য, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যে শেক্সপিয়র সম্বন্ধেই অনুকম্পার, অতএব সৃষ্টির, অভাব ধরা পড়ে, যদিও তাঁর পূর্বজীবনের নাটকের গড়ন অনেকাংশেই শেক্সপিয়রীয়। শেক্সপিয়র শতবার্ষিকীর কবিতাটিতেও অন্য অনেক-কিছু আছে, শুধু শেক্সপিয়র নেই।]
রবীন্দ্রনাথের বাল্যজীবন সম্বন্ধে এই লেখক দু-জন পরস্পরের সমর্থক; বিশীমহাশয়ের ধারণা যে কবির বালভাষণ ‘গুরুত্বপূর্ণ’, আর প্রভাতকুমারের মতেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘precocious child’। অথচ রবীন্দ্র-চরিত্রে মনঃসংযোগ করলে তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে যে তিনি ছিলেন অকালপক্কতার পরপারে; তাঁর জীবনে আকস্মিকতা নেই, চমক নেই, আছে ক্রমবিকাশের অত্বর নিশ্চয়তা। যদি কীটসের বয়সে তাঁর মৃত্যু হতো তাহলে তিনি বাঙালি গৌণ কবিদের মধ্যে কোনোরকমে গণ্য হতে পারতেন; শেলির বয়সে হলে, তিনি হতেন আমাদের রম্য কবিদের অন্যতম, বিবিধ কাব্য-চয়নগ্রন্থের বিশেষ উপযোগী, পরবর্তী কবিরা কুড়ি বছর পর-পর তাঁকে নতুন করে ‘আবিষ্কার’ করতেন। অবশ্য তিনি নিজেই একবার নিজেকে ‘quick-witted’ অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন—আর সেই সঙ্গে এ-কথা জুড়তেও ভোলেননি যে সেটা সদগুণ নয়—কিন্তু আসলে তাঁর উপর ঈশ্বরের দয়া এতটাই ছিলো যে তিনি দ্রুতধী ছিলেন না, চতুর ছিলেন না, মাইকেলের মতো রাতারাতি কোনো হুলুস্থুল ঘটাননি, তাঁর কৈশোর-যৌবনে দেখতে পাই–বিদ্রোহ না, বিস্ময় না—প্রথাপালন, রীতিরক্ষা, অগ্রজের শান্ত, মৃদু অনুসরণ। বিদেশে—এমনকি স্বদেশেও—কৈশোরেই স্মরণীয় কবিতা লিখেছেন এমন কোনো-কোনো কবি, যাঁরা হয়তো সমগ্রভাবে রবীন্দ্রনাথের শতাংশতুল্য; কিন্তু রবিপ্রতিভা সেই জাতের, যার বৈশিষ্ট্য অবিরল বেড়ে ওঠায়, অবিরল ‘হয়ে ওঠা’য়, যার তার বাঁধতে কিছু দেরি হয়, কিন্তু বাঁধা হয়ে গেলে গান আর থামে না; তাই তাঁর বাষ্পজড়িত কিশোরকাব্যে আশাতীতের আস্বাদ নেই, তাঁর স্বাক্ষর প্রথম স্পষ্ট হলো ‘মানসী’তে—আর ‘মানসী’ তাঁর যে-বয়সের লেখা, কীটস ততদিন বেঁচে থাকেননি। কীটস প্রায় বালক বয়সেই পূর্ণপরিণত, শেলি তিরিশে অসমাপ্ত হয়েও কৃতকর্ম, আবার ওঅর্ডস্বার্থের দীর্ঘজীবন ব্যর্থতারই দৃষ্টান্তস্থল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘায়ু শুধু যে সার্থক করেছিলেন তা নয়, তাতে তাঁর প্রয়োজন ছিলো, কেননা মুখমণ্ডলের প্রতিটি কালকুঞ্চনের সঙ্গে আরো প্রসারিত হয়েছেন তিনি, তাঁর উদ্যমের যেন অন্ত ছিলো না।
মনোবিজ্ঞানীর মতে মানুষের শৈশবই তার চরিত্রনিয়ন্তা; তবু প্রতিভা অদ্যাবধি কোনো বিজ্ঞানের বশবর্তী হয়নি; তার হেতু অজ্ঞাত, উৎপত্তি যত্রতত্র, তার বিবর্তন তারই ক্রিয়াকলাপ থেকে অনুমেয়। ঈশ্বরের এই একটি সৃষ্টি এখনো এতটাই রহস্যময় আছে যে তার সম্বন্ধে যে-কোনো গণনাই ফেল পড়ে; সংখ্যাতত্ত্ব বা সৃজনবিদ্যা, ইতিহাস বা মনোবিজ্ঞান, কোনো শাস্ত্র প্রয়োগ করেই প্রতিভার প্রকৃতিকে নিয়মাবলির অধীন করা যায় না, তার উৎপাদন তো অসম্ভব। তাই আমি বিশ্বাস করি যে প্রতিভাবানের বাল্যজীবন অনেক সময় রমণীয় উপাখ্যান হলেও অধিকাংশ স্থলেই তাৎপর্যহীন; অর্থাৎ প্রতিভা যখন প্রকাশ পায় তখন থেকেই প্রতিভার আরম্ভ; আমি বিশ্বাস করি যে প্রতিভাবানের পূর্বপুরুষ, পিতামাতা, আত্মীয় বা বাল্যসঙ্গীতে তাঁর আভাস বা অঙ্কুর বা উপাদান অন্বেষণ করা বিড়ম্বনা; বিশ্বাস করি যে রবীন্দ্রনাথ বস্তিতে জন্মালেও রবীন্দ্রনাথই হতেন— আকারে-প্রকারে অন্য রকম, কিন্তু ফলত একই। শীতের শেষ রাত্রে লেপের তলা ছেড়ে ঠাকুরবাড়ির আর-কোনো ছেলে উঠে যায়নি নারকেল গাছের মাথায় প্রথম রোদের ঝিকিমিকি দেখতে, আবার এমন অনেকে হয়তো গিয়েছে যারা বড়ো হয়ে কিছুমাত্র কবি হয়নি। বাল্যে আর বয়ঃসন্ধিতে অনেকেই কবিতা লেখে, তাদের মধ্যে কোনোরকমে কবি-নামের যোগ্য হয়ে উঠবে একশোতে কোন-একজন, তা যখন নিশ্চিত বলা দুরূহ, তখন মহাকবির কোষ্ঠী গুণতে কে বসবে? কার্যত কেউ তা বসেও না; সমালোচকরা ঘটনার ঘোটকে মন্তব্যের শকট জুড়ে দেন, অর্থাৎ যাঁর মহত্ত্ব ইতিমধ্যেই সংশয়াতীত, তাঁরই বাল্যজীবন ও বাল্যরচনা থেকে মহত্ত্বের লক্ষণাবলি উদ্ধার করেন। এ-কাজটি ইচ্ছে করলেই পারা যায়, তাই বোধহয় গবেষকের পক্ষে বালক-রবির আকর্ষণ প্রবল।
অজিতকুমারের সময় থেকে আজ পর্যন্ত যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যাতা, তাঁরা সকলেই তাঁর মর্ত রূপের পরিচয় পেয়েছিলেন, কেউ-কেউ ঘনিষ্ঠভাবে। এটা সুবিধে, কিন্তু অসুবিধেও, বোধহয় অসুবিধেই বেশি। তিনি-যে কত বড়ো—শুধু কবিত্বে নয়, ব্যক্তিত্বেও—সে-কথা চেষ্টা করেও ভুলে থাকা বর্তমান কালের লেখকের পক্ষে দুঃসাধ্য, আর এই আনুক্ষণিক মহত্ত্বচেতনা জীবনীরচনার বিঘ্ন, সমালোচনায় অন্তরায়।* অন্তত জীবনীতে, যেখানে প্রকৃতিপন্থী উপন্যাসের মতোই নায়কের চরিত্র সৃষ্টি করতে হয়; আগে কিছু বলে না-দিয়ে, কিছু ধরে না-নিয়ে, একটু-একটু করে প্রত্যয় জন্মাতে হয় পাঠকের মনে, সেখানে আশু ভবিষ্যতে লক্ষ্যভেদের আশা দেখি না। জীবনীরচনাও এক রকমের শিল্পরচনা; জীবনীকারকে নির্মম হতে হয়, নির্লোভ হতে হয়, ভূরিপরিমাণে উপকরণ সংগ্রহ করে ফেলে দিতে হয় অনেকটাই, বাছাই করে-করে সাজাতে হয় একাধারে সত্য আর সৌষম্যের দিকে লক্ষ্য রেখে; মনে রাখতে হয় ভালো করে বলাই সবচেয়ে বেশি বলা, আর সার কথা মানেই সব কথা। অবশ্য নায়কের জীবদ্দশায়, কিংবা মৃত্যুর অনতিপরে, এ-আদর্শে জীবনীরচনার সম্ভাবনা বেশি থাকে না; কেননা, একজন অমৃতপুত্রকে আমরা তখনই আবার সহজভাবে তাঁর মর্ত রূপে ভাবতে পারি, যখন সময়ের ব্যবধানে অনেক অবান্তর সঞ্চয় ঝরে পড়ে, আবার সমস্ত তথ্য প্রকাশিত হবারও বাধা থাকে না। রবীন্দ্রনাথকে তাই অপেক্ষা করতে হবে, হয়তো দীর্ঘকাল—অন্তত যতদিন-না ‘রবীন্দ্র-জীবনী’ পরিবর্ধিত হবার পরেও নতুনতর তথ্য নিয়ে অনুরূপ গ্রন্থ আরো বেরোয়। এই অপেক্ষা ব্যর্থ হবে ভাবতে পারি না, কেননা রবীন্দ্রনাথ যদিও জানাতে ভোলেননি, ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’, তবু উল্টো আশাও তিনিও দিয়ে গেছেন—একদিন চিনে নেবে তারে’।
[* এটা লক্ষণীয় যে আমাদের রবিচর্চায় সবচেয়ে সুফল ফলেছে এখন পর্যন্ত ‘বেললেতর’-এর সীমানার মধ্যে; যা জীবনীও নয়, সমালোচনাও নয়, অথচ যাতে দুয়েরই কিছু আভাস কিংবা উপাদান আছে, এ-রকম লেখায় কৃতিত্বের পরিচয় আছে বাংলা ভাষায়। তার কারণ এ-সব ক্ষেত্রে মহত্ত্ববোধ বিঘ্ন হয় না, তাছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ লিখতে বিশেষ-কোনো প্রস্তুতিরও প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথের জীবন্ত কোনো মুহূর্ত যেখানে ধরা পড়েছে, কিংবা যে-গ্রন্থ তাঁরই সুবচনের মঞ্জুষা, সেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রতিযোগী হয়ে দাঁড়ান না, সহকর্মী হন, অনেকাংশে গ্রন্থকর্তা। ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বা ‘আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ’কে বলা যায় রবীন্দ্রনাথেরই আত্মকথা- পত্রাবলির ক্রোড়পত্র।]
১৯৪৭
