সাংবাদিকতা, ইতিহাস, সাহিত্য – বুদ্ধদেব বসু
মানবস্বভাব সীমাহীনরূপে শোধনীয় বলে মানবসমাজে প্রগতিমাত্রই আপতিক, কোনো মঙ্গলই অমিশ্র নয়, ভালোর বিশুদ্ধতা, অন্তত ব্যতিক্রমরূপে, সম্ভব শুধু ব্যক্তির জীবনে, কিন্তু যৌথ-জীবনে তার মিশ্রতাই নিয়ম; আর যেহেতু সকল মানুষের, এমনকি অনেক মানুষের, বিশুদ্ধ ভালোত্ব এখন পর্যন্ত অচিন্তনীয় প্রস্তাব, তাই মানবসমাজে এমন-কোনো ভালোর উদ্ভব হতেই পারে না, কালক্রমে মন্দের মাশুল দিয়ে যার দেনা ডবল শুধতে না হয়। উদাহরণত, সংস্কৃতির উপর মুদ্রাযন্ত্রের ও গণতন্ত্রের প্রভাবের কথা যদি ভাবি? মাতৃভাষায় বর্ণপরিচয় সকলের পক্ষে আবশ্যিক হবে, এ-ব্যবস্থা কি ভালো নয়? পাঠ্যবস্তুর দ্রুত, সুলভ ও বহুল প্রচার কি অকাম্য? নিশ্চয়ই ভালো, নিশ্চয়ই কাম্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ফলিত বিজ্ঞান মানুষকে এমন একটা অসহায় অবস্থায় নিয়ে এসেছে যে নিজের ক্ষমতার সীমা সে টানতে পারে না; কোনো-একটা শক্তি একবার ছাড়া পেলে কোথায় গিয়ে থামবে, এবং পথে-পথে কী কাণ্ড ঘটাবে তা স্বয়ং উদ্ভাবকেরও অজ্ঞাত। আমাদের পুরাণে দেখতে পাই, দারুণ অস্ত্র প্রভুর আজ্ঞায় দুঃসাধ্যসাধনে বেরোলো, এবং ঠিক-ঠিক প্রয়োজনটুকু সম্পন্ন করেই ভালোমানুষের মতো ফিরে এলো তূণে। এই প্রত্যাহরণ বিদ্যাটা আধুনিক মানুষ হারিয়েছে : পুরাকালে, বীরেরা অন্তত উপায়ের কর্তা ছিলেন, এ-যুগে দিগ্বিজয়ীরাও উপায়ের দাস। মুদ্রাযন্ত্র জন্ম দিলো সংবাদপত্রকে, সর্বজনীন প্রথম পাঠ তাকে লালন করলো, তারপর দেখতে-দেখতে তা হয়ে উঠলো প্রজাবৃন্দের প্রধান পাঠ, জনগণের একমাত্র মানসিক খাদ্য। বর্তমান পৃথিবীর সাক্ষর জনসংখ্যার প্রায় সকলের পক্ষে প্রতিদিনের প্রথম প্রাতঃকৃত্য হলো পত্রিকাপাঠ, অনেকের পক্ষে ত্রিসন্ধ্যার আহ্নিক অনুষ্ঠান; আর বয়স্কদের মধ্যে এমন ব্যক্তির সংখ্যাও আজ নগণ্য নয়, যাঁরা জীবন কাটিয়ে দেন পত্রিকাদি ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রিত বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাতমাত্র না-করে।
বর্তমান জগতে সংবাদপত্রের অপরিহার্যতা স্বতঃসিদ্ধ। পৃথিবী আজ ভৌগোলিক অর্থে এমন সংকুচিত, ঐতিহাসিক অর্থে এমন একীকৃত যে কোনো-এক দেশে এমন-কিছু প্রায় ঘটতেই পারে না, যার প্রভাব ছড়িয়ে না পড়ে অন্য সব দেশের আশু কিংবা ভবিষ্যৎ সুখদুঃখে। অতএব বিশ্ব-ব্যাপারে দৈনন্দিন অনুসন্ধিৎসা আধুনিক মানুষের পক্ষে অদম্য। পূর্বযুগে দেশে-দেশে, এমনকি জনপদে-জনপদে, ভৌগোলিক ব্যবধান দুরতিক্রম্য ছিলো বলে মানুষের কৌতূহলেরও গতি ছিলো ছোটো, এবং ক্ষেত্রভেদে বিভিন্ন; তখন সংবাদপত্র রচিত হতো মানুষের মুখে-মুখে, হাটের কোলাহলে, ঘাটের কলরবে, চণ্ডীমণ্ডপের চর্চায় কিংবা শুঁড়িখানার হল্লায়—এই শেষোক্তেরও বৃত্তান্ত আর এগোতো না নাবিকের উপবাদের পরে। এর বিলুপ্তি, বলা বাহুল্য, নাগরিক সমাজেও এখনো ঘটেনি; আর এই মৌখিক সংবাদপত্র সম্বন্ধে এমার্সনের উক্তি মেনে নিতে কারোরই আপত্তি হবে না যে সংবাদমাত্রেই পরচর্চা, ‘all news is gossip’। এমনকি, এর সামাজিক স্বীকৃতি দেখতে পাই এই ভিক্টরীয় প্রবচনে যে ভদ্রলোকেরা কথা বলেন নানাবিষয়ে, আর ভৃত্যেরা কথা বলে ব্যক্তিদের নিয়ে। কিন্তু যে-খবর ছাপার অক্ষরে ওঠে, তার প্রতি এমার্সনীয় সংজ্ঞার্থটি আরোপ করতে অনিচ্ছুক হবেন প্রায় সকলেই, যদিও তাতে মিথ্যার পরিবেশন স্নানের ঘাটের বা চায়ের পার্টির পরচর্চার তুলনায় গুরুত্বেও বড়ো, ব্যাপ্তিতেও বহুগুণ বেশি। ইংলন্ডে অ্যাডিসন যখন প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর প্রতিশ্রুত ও প্রযুক্ত উদ্দেশ্য ছিলো সরসতার দ্বারা নীতির উজ্জীবন, আর নীতির দ্বারা সরসতার সংশোধন; কিন্তু এ-সূত্র গ্রহণ করলে আজকের দিনের বাণিজ্য-সেবক পার্টিপোষিত সংবাদপত্রের অস্তিত্বই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।
আধুনিক সংবাদপত্রের তিনটি অংশ : সংবাদ, মন্তব্য ও বিজ্ঞাপন। তিনটিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সত্যের অপলাপী। প্রত্যক্ষ অপলাপ ঘটে সংবাদের নির্বাচনে; অর্থাৎ অন্যগুলি বাদ দিয়ে শুধু সে-সব খবর সাজানো হয়, যা বিশেষ একটি সামাজিক শ্রেণীর কিংবা রাজনৈতিক দল বা উপদলের স্বার্থসাধক। অর্থাৎ, যে-সব তথ্য নির্বাচিত হয়, আর নির্বাচিত হয়ে যে-ভাবে তারা পরিবেশিত হয়, তাতেই প্রচ্ছন্ন থাকে অপলাপী মন্তব্য। খবর সাজাবার কৌশলে পাঠকের মন প্রথমে তৈরি করা হলো, তারপর এলো সম্পাদকীয় মন্তব্য দ্বারা পরোক্ষ অপলাপ; ফলত, লোকচিত্তে সেই তথ্যের অধিকতর বিকৃতি ঘটে, যার উপর নির্ভর করে মানুষ ‘সত্য কথাটা’ জানতে চায়। এই অপলাপের ব্যতিক্রম সংবাদে ও মন্তব্যে যতটা দেখা যায়, বিজ্ঞাপনে তার চেয়ে অনেক কম; বিজ্ঞাপনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় অপলাপই অনেক বেশি সক্রিয়, আবেদনেও অনেক বেশি প্রবল। আধুনিক বিজ্ঞাপন চতুর্বিধ : প্রথমত, যেখানে তথ্য আর মীমাংসা দুটোই যথার্থ; দ্বিতীয়, যেখানে তথ্য ভ্রান্ত কিন্তু মীমাংসা গ্রহণীয়; তৃতীয়, যেখানে তথ্যে ভুল নেই, কিন্তু মীমাংসা কাল্পনিক; চতুর্থ, যেখানে তথ্য আর মীমাংসা দুটোই ভ্ৰান্ত। প্ৰথম শ্রেণীর বিজ্ঞাপন অত্যল্প, কেননা সেটা সম্ভব শুধু সেই ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত বা নগণ্য, কিংবা যেখানে পণ্যবস্তুর নামটা জানানোই যথেষ্ট; যেমন সৎগ্রন্থের বা -পূর্বযুগে—কুইনিনের বিজ্ঞাপন। চতুর্থ শ্রেণীর বিজ্ঞাপনও পরিমাণে অপেক্ষাকৃত অল্প এবং –অন্তত শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে—প্রতিপত্তিতে দুর্বল; এখন পর্যন্ত এই শ্রেণীটা নিতান্তই যুবকীকরণী ভেষজে আর সন্তাননিবারিকা বটিকায় আবদ্ধ। আধুনিক সংবাদপত্রের প্রচারিত অধিকাংশ বিজ্ঞাপন দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণীর : যেমন, ‘রাত্রিকালীন অপুষ্টি’ তথ্য-হিশেবে ভ্রান্ত, কিন্তু এই অলীক ব্যাধির প্রতিকাররূপে যে-পানীয়টি প্রচারিত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাতে উপকার হতেও পারে; কিংবা নিয়মিত স্নান যে স্বাস্থ্যকর এ-তথ্য অকাট্য হলেও, সাবান না মাখলে, তার উপর বিশেষ কোনো-একটি সাবান না-মাখলেই, স্নান ব্যর্থ হলো, এ-মীমাংসা সাধারণ বুদ্ধিতেই অগ্রাহ্য। অতএব অধিকাংশ বিজ্ঞাপনই প্রত্যক্ষভাবে সত্যের অপলাপী; অথচ প্রত্যেক সংবাদপত্রের একটি প্রধান অংশ বলে, এবং কোনো-কোনো পত্রিকার সুপাঠ্যতম অংশ বলে, প্রতিপত্তিতে বিজ্ঞাপন আজ সংবাদ ও সম্পাদকীয় স্তম্ভের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। এ-যুগের সাক্ষর জনসাধারণ তার কাজ চালাবার মতো জীবনদর্শন সংবাদপত্র থেকেই সংগ্রহ করে (যেহেতু মোটের উপর সে আর-কিছুই পড়ে না), কিছুটা তার ‘পাঠ্য বস্তু’ থেকে, কিছুটা বিজ্ঞাপন থেকে—বোধহয় বিজ্ঞাপন থেকেই বেশি, কেননা অনেক পত্রিকার ‘পাঠ্য বস্তু’ও তাদের প্রতিপালক বিজ্ঞাপনদাতারই প্রচারক, অর্থাৎ ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপন। এ-অবস্থায়, যতই মন-খারাপ হোক, এ-সিদ্ধান্তে না-এসে তো উপায় দেখি না যে এই অতি-বৈজ্ঞানিক যুগে, জনগণের সমস্ত ধারণা ও অনুমান, অতএব সমস্ত ব্যবহার, অসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।
পুরাকালীন মৌখিক সংবাদপত্র এত মারাত্মক নিশ্চয়ই ছিলো না। লোকে পরচর্চা করতো, কিন্তু তাকে পরচর্চা বলেই জানতো, পরাবিদ্যা বলে ভ্রম করতো না। তাতে বিশ্বাস ছিলো না, শুধু বিনোদন ছিলো। বিশ্বাস সংগ্রহের অন্য ক্ষেত্র ছিলো তখন, ছিলো ভিন্ন-ভিন্ন দেশে নিত্যক্রিয়াশীল ভিন্ন-ভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও আদিকাব্য। আধুনিকের দৃষ্টিতে বাইবেল কিংবা রামায়ণ-মহাভারত তথ্যের দিক থেকে যতই অসম্পূর্ণ ও ভ্রান্ত হোক, বিজ্ঞাপনের তৎকালীন অপরিণতির পরিমাণে মানুষের সর্বাঙ্গীণ শিক্ষারই ব্যবস্থা ছিলো তাতে; তাছাড়া, যে-সংশ্লেষণ-শক্তির বা জ্ঞানের সহায় ব্যতীত কোনো বিশেষ জ্ঞান, বিশ্লেষণী জ্ঞান, অর্থাৎ বিজ্ঞান হতে পারে না, এ-সব গ্রন্থ সেই জ্ঞানেরই ভাণ্ডার বলে তাতে জীবনের মৌল শুভপ্রসূ মূল্যবোধ সম্বন্ধে স্বীকৃতির পরাকাষ্ঠা আজ পর্যন্ত আমাদের বিস্ময় জাগায়। সেকালে মানুষ তার প্রতিদিনের কাজ-চালানো জীবনদর্শন যে-উৎস থেকে সংগ্রহ করতো, সেই উৎসটা অন্তত সত্যাভিমুখী ছিলো, একালে উৎসটাই মিথ্যাশ্রয়ী। প্রভেদটা নিঃসন্দেহে নিদারুণ।
সংবাদ যে মিথ্যা, বিজ্ঞাপন যে ততোধিক, এ-কথা মনে-মনে অনেকেই জানেন, মুখেও মানেন, কিন্তু কার্যত এ-কথা মনে করতে অনেকেই সীমাহীনরূপে অক্ষম যে রটারিযন্ত্রের রটনাও হাটের চ্যাঁচামেচি বা ঘাটের কিচিমিচিরের মতোই ‘গসিপ’। একে তো মুদ্রাক্ষর সম্বন্ধে ছেলেবেলার অন্ধ আস্থা অনেকেই আজীবন কাটিয়ে উঠতে পারেন না, তার উপর আপাতদর্শনে আধুনিক সংবাদপত্রের তথ্যাবলি এতই প্রামাণিক, তার সংগ্রহে মানুষের উপায়নৈপুণ্য এতই চমকপ্রদ যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনাস্থার অস্থায়ী অপনোদন—যদিও কোলরিজীয় অর্থে নয়—অনিবার্য। বস্তুত, এই তথ্যাবলি অনেক ক্ষেত্রেই অতথ্য নয়, তবু সত্যের অপলাপী; কেননা সংবাদপত্র শুধু জীবনের বিভিন্ন বিভাগের ক্রিয়াকাণ্ডের বিবৃতি দেয়, কোনো সংশ্লেষণী নীতির দ্বারা ঘটনাবলিকে সুসংবদ্ধ ও অর্থমণ্ডিত করার কোনো চেষ্টাই করে না। রাজনীতি, ঘোড়দৌড়, রঙ্গালয়, বিচারালয়, মৃদু-মধুর পরচর্চা ও বিবিধ বিচিত্র পণ্যপ্রচার—এই সব পরস্পরবিচ্ছিন্ন বিষয়ের দিনপঞ্জিতে তথ্যের যাথার্থ্য যদি থাকেও, এই বিচ্ছিন্নতাকে একসূত্রে গাঁথবার মতো কোনো মূলনীতির প্রয়োগ নেই বলে তথ্য আর অতথ্য মানুষকে সমপরিমাণেই উদ্ভ্রান্ত করে। অর্থাৎ, কোথায় কী ঘটছে তা আমরা কাগজ পড়ে জানতে পারি, কিন্তু ঘটনাবলির তাৎপর্য বুঝতে পারি না, আর সেটা না-বুঝলে আমরা-যে যত জানবো ততই মূঢ় হবো, মানবজাতির সাম্প্রতিক ইতিহাসই তার তর্কাতীত প্রমাণ। বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থও বিবিধ বিষয়ে তথ্যের আধার; কিন্তু সে-সব তথ্য একটি একাভিমুখী উদ্দেশ্য, একটি সত্যান্বেষী মূলনীতির দ্বারা সংবদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট বলে সেখানে তথ্যাবলির তাৎপর্য এতদূর সুপরিস্ফুট যে অতথ্যও সর্বত্র সত্যনির্ণয়ের অন্তরায় হয় না। যেমন, বস্তুবিশ্ব সম্বন্ধে প্রাচীন দার্শনিকদের অনেক ধারণাই ভ্রান্ত ছিলো, আজ আমরা এ-কথা জেনেছি বলে তাঁদের মুখ্য মীমাংসা, তাঁদের সামগ্রিক উপলব্ধি আমাদের কাছে অনর্থক হয়ে যায়নি। উদ্দেশ্য সংবাদপত্রেও আছে, কিন্তু সে-উদ্দেশ্য সত্যান্বেষী নয়, একাভিমুখীও নয়, কেননা তার আশ্রয় দিনানুদৈনিক রাজনীতি, অর্থাৎ আজ-নীতি। আজ-নীতি বলি তাকেই, যার কাছে আজকের মুহূর্তটাই সবচেয়ে প্রধান, কোনো কিছু হয়েছে কিংবা হচ্ছে বলেই সেটা ভালো, এই রকম যার ভিতরকার ভাবটা, যাতে বিচার নেই—অর্থাৎ, ‘ঘটনা’ আর ‘সত্য’ যার কাছে সমার্থক। সংবাদপত্র-সেবিত মানুষের কাছে নীতি মানেই যেহেতু আজ-নীতি, বর্তমান জগতে এ-ধারণা প্রায় সর্বব্যাপী যে সত্য তথ্যেরই নামান্তর মাত্র, অতএব শিক্ষা মানেই তথ্যসংগ্রহ। সামাজিক মূল্য সবচেয়ে বেশি আজ ‘well-informed’ মানুষের, অর্থাৎ সবজান্তার। উদারতম শিক্ষাব্যবস্থাতেও কোনো সত্যান্বেষী সংশ্লেষণী নীতির প্রভাব নেই; শুধু খবর, শুধু কতগুলি খবর কুড়োতে পারলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম উপাধিলাভ সম্ভব। আমরা যারা সে-সব উপাধি পেয়েছি, কখনো কোনো উপলক্ষে কোনো শিক্ষকের মুখে এমন পরামর্শের আভাসও আমরা শুনিনি যে খবর সংবাদ হয়ে ওঠে শুধু তখনই যখন তাকে কোনো-এক সমগ্রের অংশ বলে উপলব্ধি করি, আর সেই সমগ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলে যে-কোনো খবরই ‘গসিপ’ ছাড়া কিছুই নয়। কেউ আমাদের বলেননি যে আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য ধাতুগত অর্থে সংবাদ, অর্থাৎ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি সংবিদ হতে, সংবিৎ জাগাতে, জ্ঞানের অন্বেষণে। দৈনিকপত্রের মতো বিভিন্ন, পরস্পরবিচ্ছিন্ন, তাৎপর্যহীন খবর কুড়োনোকেই আমরা জেনেছি শিক্ষা বলে। যে-সমগ্রের অংশরূপে না-দেখলে সব খবরই ‘গসিপ’, সেই সমগ্রের অস্তিত্বের কথাও শুনিনি আমরা। তবু আমাদের সময়ে তথ্য-তৃষ্ণা অপেক্ষাকৃত অনুগ্র ছিলো; সাধারণত, সাহিত্যের ছাত্র সাহিত্যের খবরই শুধু রাখতো, আর বিজ্ঞানের ছাত্র বিজ্ঞানের। এই বিষয়-বিভক্ত শিক্ষা জ্ঞানের অন্তরায়, কিন্তু এর চেয়েও বড়ো অন্তরায় অধুনা- প্রবর্তিত তথ্যোন্মাদনা—শুধু ছাত্ররা নয়, অগ্রগামী বয়স্করাও এ-ধারণার বশবর্তী যে যত বেশি তথ্য তাঁরা জানবেন আর তার বিষয় যত বহুল বিচিত্র হবে, ততই তাঁরা শিক্ষিত হবেন, ততই পাল্লা দিতে পারবেন আধুনিক জীবনের জটিলতার সঙ্গে। এই তথ্যোন্মাদনার পরিচয় পাই রীডার্স ডাইজেস্ট ধরনের বটিকাপত্রিকার পৃথিবীব্যাপী পরার্ধ-প্রচারে, আর রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, দর্শন ও বিবিধ বিজ্ঞান বিষয়ে গণপাঠ্য গ্রন্থ ও পুস্তিকাসংখ্যার অফুরন্ত গুণনে। বলা বাহুল্য, এই পত্রিকা ও পুস্তিকারাশি দৈনিক পত্রেরই করিৎকর্মা সহযোগীমাত্র, কেননা স্বল্পপরিসরে, জলবৎ ভাষায়, এ-সব বিষয়ে কতগুলি তথ্যই শুধু জানানো যায়, সে-সব তথ্যের সংশ্লেষণ, মূল্যবিচার, তাৎপর্যনির্ণয়, অর্থাৎ তথ্যে নির্ভর করে সত্যের অন্বেষণ, লেখকের অভিপ্রেত এবং শক্তির অধিগম্য হলেও (বস্তুত, প্রায়ই তা হয় না) কার্যত সম্ভব হয় না। সাধারণ মানুষের চিন্তার জগতে, তাই নৈরাজ্য আজ ঘোরতর; কুড়ি বছর আগেকার তুলনায় আজকের দিনের উৎসাহী ছাত্র কিংবা অগ্রগামী মধ্যবয়সী খবর রাখেন ভূরিপরিমাণে বেশি, কিন্তু কোনো-এক সমগ্রের অংশরূপে না-দেখলে সব খবরই যে ‘গসিপ’ এ-বিষয়ে অচেতনতা আরো ব্যাপ্ত, আর সেই সমগ্রের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অজ্ঞতা আরো নীরন্ধ্র। ফলত, তথ্যের পরিমাপে আরো ঘনীভূত হচ্ছে প্রমাদ; তথ্য যত পাচ্ছে, সত্য থেকে তত দূরে সরে যাচ্ছে মানুষ; বুদ্ধিমানেরাও তাজ্জব সবজান্তার বেশি কিছু হতে পারছেন না। আর এই অবস্থাটাই অনেকের মতে প্রগতি, আর-কোনো কারণে নয়, আমাদের জৈব জীবনের বর্তমান ব্যবস্থা এরই অনুকূল বলে, আজকের দিনে আর্থিক মূল্য ও সামাজিক মর্যাদা সবজান্তারই সর্বাধিক বলে।
মুদ্রাযন্ত্র ও গণতন্ত্রের ফলে সংবাদপত্রের উত্থান ও প্রতিপত্তি; সংবাদপত্রের উত্থান ও প্রতিপত্তির ফলে সাধারণের তথ্যোন্মাদনা; সাধারণের তথ্যোন্মাদনার ফলে সংস্কৃতির অধঃপাত—আমাদের আপতিক প্রগতি বলতে গেলে মাত্র এক শতকের মধ্যে এতদূর নিয়ে এসেছে আমাদের। শেষোক্ত প্রস্তাবের প্রমাণস্বরূপ এখানে একটুমাত্র বলবো যে তথ্যোন্মাদনার সংক্রমণ আজ সাহিত্যের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। এটা উল্লেখযোগ্য এইজন্য যে সাহিত্য, কল্পনাপ্রবণ সাহিত্য, বিজ্ঞান নয়, অর্থাৎ বিশেষ-কোনো জ্ঞান নয়; সাহিত্য-রচনার জন্য কোনো তথ্যের উপর নির্ভর করতে হয় না–কিংবা, এমন-কোনো তথ্যের উপর নির্ভর করতে হয় না, যা সাধারণ মানুষের অনায়ত্ত। বলা বাহুল্য, নতুন কোনো খবর পাবো বলে আমরা কবিতা গল্প উপন্যাসাদি পড়ি না, কেননা আমরা সকলেই জানি ওতে যে-সব খবর পাওয়া সম্ভব, তা সাধারণত আমাদের সকলেরই জানা। অবশ্য নতুন খবর আমরা পেতে না পারি তা নয়; যেমন, ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ পড়ে আমি জেনেছি যে সেকালের কলকাতার বাবুরা পাড় ছিঁড়ে ঢাকাই ধুতি পরতেন, কিংবা চেখভ পড়ে জেনেছি যে সেকালের রুশদেশে বৃদ্ধ কৃষক-দম্পতি পরস্পরকে সম্বোধন করতো ‘মা’ এবং ‘বাবা’ বলে। এ-রকম ক্ষেত্রে আমি সাহিত্যপাঠের উপফলস্বরূপ খানিকটা ইতিহাসও জেনে গেলুম; এই ইতিহাসটা, বলা বাহুল্য, সাহিত্যের মধ্যে মুখ্য নয়, গৌণ; প্রাথমিক নয়, প্রাসঙ্গিক; সারবস্তু নয়, শুধু বিস্তারের ক্ষেত্র। সাহিত্যের শরীরে—বিশেষত গল্প উপন্যাস নাটকে—ইতিহাসের অংশ কিছু-না-কিছু থাকেই, কিন্তু সেটা একেবারে বর্জন করেও যে সাহিত্য হয়, শুধু তা-ই নয়, সাহিত্যহিশেবে তার কাজ অতুলনীয়রূপে সম্পন্ন করতে পারে, গীতিকবিতাই তার প্রমাণ। কখনো এমন হয় যে দেশে কিংবা কালে দূরবর্তী কোনো লেখকের রচনা আমরা পড়ি—কষ্ট করেও পড়ি—সুদ্ধু সেই দেশের বা কালের জীবন্ত ইতিহাস জানবার জন্য (পৃথিবীর রাশি-রাশি অনুত্তম পদ্য বা গদ্য কাহিনীর সার্থকতা একবার স্বকাল পেরোলে এতেই পর্যবসিত হয়); কিন্তু এ-ক্ষেত্রে আমরা সাহিত্যকে খাটিয়ে নিচ্ছি ইতিহাসের কাজে, সাহিত্য আর সাহিত্য নেই আমাদের কাছে, হয়ে উঠেছে ছদ্মবেশী ইতিহাস। সাহিত্যের কাছে সাহিত্যের প্রার্থনা নিয়ে যখন আমরা যাই, সাহিত্যের কাছে সাহিত্যেরই ফল যখন আকাঙ্ক্ষা করি, তখন এই ইতিহাসের অংশটা অবান্তর, বড়োজোর প্রাসঙ্গিক মাত্র।
অথচ আজকের দিনের অধিকাংশ মানুষের শিক্ষা আর মানসিক অভ্যাস এই রকমের হয়ে পড়েছে যাতে সাহিত্যের কাছে সাহিত্যের ফল চাইতে তারা ভুলে যাচ্ছে। দৈনিকপত্র আর বটিকা-পত্রিকার সম্পাদকরা তাঁদের কোটি-কোটি ক্রেতার মনে এই ধারণা-সঞ্চারে কৃতকার্য হয়েছেন যে গুছিয়ে-লেখা খবরকেই বলে ‘স্টোরি’। কাহিনীরঞ্জিত তথ্য পড়ে-পড়ে এমন অভ্যাস তাদের হয়েছে যে তারা যখন খবর-কাগজের শানানো গল্প ছেড়ে বইয়ের পাতার বানানো গল্পে মন দেয়, তখনও প্রত্যাশা করে তথ্যাকীর্ণ কাহিনী। অর্থাৎ, সাহিত্যের কাছে ইতিহাসের ফল চায় তারা। শুধু চায় না, দাবি করে। শুধু যে বহুল তথ্যাংশ না-থাকলে সে-বই তারা প্রত্যাখ্যান করে, তা নয়; উপরন্তু এ-ইচ্ছাও তারা ঘোষণা করে যে নতুন যত সাহিত্য জন্মাবে সবই হবে আজ-নীতির অনুগত, সমসাময়িক ঘটনাবলির অনুরঞ্জিত বিবরণ। স্বভাবত এবং ন্যায়ত সাহিত্যের যা কাজ নয়, সাহিত্যের কাছে সেই কাজের দাবি দিনে-দিনে প্রবল হয়ে উঠেছে, আর সে-দাবি নিয়মিত মিটিয়েও চলেছে পৃথিবীর সমস্ত ভাষায় রাশি-রাশি সাংবাদিক গল্প, সাংবাদিক নাটক, এমনকি সাংবাদিক কবিতা। শুধু সাধারণ পাঠকের মধ্যেই নয়, শিক্ষিত সমাজেও অনেকের মনে আজ এ-বিভ্রম জন্মেছে যে সাহিত্য সাংবাদিকতারই নামান্তর কিংবা উচ্চ স্তর, যে সেই লেখাই ভালো যা হালখবরের হালখাতা, আর সেই লেখাই দূয্য যাতে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কোনো উল্লেখ নেই।
সাহিত্যবেশী, কিংবা সাহিত্যের মধ্যে গ্রথিত, সাংবাদিকতা পৃথিবীতে অবশ্য নূতন নয়, বরং অত্যন্তই প্রাচীন। খবরের কাগজ যখন ছিলো না, তখনও যেহেতু খবর ছিলো, সেই খবর কোনো-না-কোনো উপায়ে লিপিবদ্ধ না-করেও মানুষ পারেনি। আর পুরাকালে উপায়ের বৈচিত্র্য বেশি ছিলো না; ছন্দোবদ্ধ কাব্যই ছিলো প্রধান বাহন; এইজন্য ছন্দোবদ্ধ, যাতে পুঁথির অভাব স্মৃতি দিয়ে পূরণ করা যায়। মহাভারতের কাহিনীর মধ্যে যেমন দর্শন, সমাজনীতি, বিবিধ বিজ্ঞান যথেচ্ছভাবে বিক্ষিপ্ত ও প্রক্ষিপ্ত, তথ্যও তেমনি পর্বতপ্রমাণ; বস্তুত, প্রাচীন ভারতের সর্ববিদ্যার সংগ্রহের নামই মহাভারত। একই গ্রন্থের মধ্যে কাব্য, কাহিনী ও ইতিহাসের, আর সেই সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব থেকে অশ্ববিদ্যা পর্যন্ত সর্ববিষয়ে উপদেশের অঙ্গীকার আজ আমাদের কাছে অচিন্ত্য; মুদ্রাযন্ত্রের উদ্ভাবনার পর থেকে শুধু যে ছন্দোবন্ধনের আবশ্যকতা ঘুচে গিয়ে গদ্যের প্রসার বেড়েছে তা নয়, সাহিত্যরূপের বিভেদীকরণ এবং বিশেষীকরণও সম্ভব হয়েছে; দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদি তত্ত্ব, তথ্যে যার নির্ভর, সেগুলি সাহিত্যশরীর থেকে চ্যুত হয়ে স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছে, যার ফলে সাহিত্য বলতে আমরা আধুনিক যুগে বুঝি শুধু কল্পনাপ্রবণ রচনা, সংস্কৃত পরিভাষায় রস-সাহিত্য। বিশেষীকরণ এখানেই থামেনি; রস-সাহিত্যের মধ্যেও ভেদ বেড়েছে, কাহিনী (মোটের উপর ) বিচ্ছিন্ন হয়েছে কাব্য থেকে, আর গীতিকাব্য (বহুলত) সংগীত থেকে, আবার কাব্য আর কাহিনী উভয়েই শাখান্বিত হয়েছে ভিন্ন-ভিন্ন আকার ও আকৃতি নিয়ে। কবিতা, ছোটো- গল্প, নাটক, উপন্যাস, আধুনিক রস-সাহিত্যের এই সব স্থূল বিভাগের পরেও আরো বৈচিত্র্যের সম্ভাবনা এনে দিয়েছে প্রবন্ধাদি উপসাহিত্য, ফরাশিরা যাকে বলে রূপ-সাহিত্য। রূপের এই বৈচিত্র্য আধুনিক জগতের একটি প্রধান ঘটনা।
সাহিত্য আর সাংবাদিকতার ভেদ ভুলে যাওয়া মানেই এই বৈচিত্র্যকে বাতিল করে দেয়া, মুদ্রাযন্ত্রের যথার্থ উপকারিতাকে প্রত্যাখ্যান করা। এই বৈচিত্র্য যে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে তার অন্যতম কারণ নিশ্চয়ই মুদ্রাযন্ত্রের প্রয়োগ, আবার সেই মুদ্রাযন্ত্রের ব্যবহারের ফলেই কি বৈচিত্র্যবিলোপের আন্দোলন? সাহিত্যে তথ্য চাই, তারিখমাফিক খবর-সরবরাহ চাই, এই সূত্রের একমাত্র ন্যায়সম্মত পরিণতি হতে পারে সাহিত্য আর ইতিহাসের পুনরঙ্গীকরণে। সেই সঙ্গে যদি মহাভারতের মতো কোনো-একটি সংশ্লেষণী জ্ঞানের প্রভাব থাকতো, থাকতো কোনো সার্বভৌম বিশ্বাসের ভিত্তি, তাহলে এর ফলে সাহিত্য অবান্তরতায় ভারাক্রান্ত আর ইতিহাস সংশয়াচ্ছন্ন হলেও কোনো নৈতিক বিকৃতির আশঙ্কা থাকতো না। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় সে-রকম কোনো সম্ভাবনা দেখি না; মানুষের বিশ্বাস আজ সার্বভৌমতা হারিয়ে নানা শিবিরে বিভক্ত, কিংবা তার জীবন্ত কোনো বিশ্বাসই নেই; তাই সাহিত্য-শরীরে ইতিহাসকে গ্রথিত করতে গেলে তার ফল হবে ভিন্ন-ভিন্ন দল বা উপদলের আপন স্বার্থান্বেষী অপলাপ, কিংবা নিতান্তই খবুরে-কাগজে তথ্যপ্রলাপ। হবে কেন, তা-ই হচ্ছে।
সাহিত্যে এই ঐতিহাসিকতার আন্দোলন শুধু যে নীতিবিকারী তা নয়, তদুপরি অনর্থক। অনর্থক এইজন্য যে আন্দোলনের প্রবক্তারা লেখককে দিয়ে যা করিয়ে নিতে চাচ্ছেন, কোনো-এক অর্থে লেখক তা না-করে মোটে পারেনই না। যে-দেশে, যে-সময়ে তিনি বাঁচেন, সেটা তাঁর নিশ্বাসের হাওয়া; তাঁর দেহ যেমন সেই দেশের মাটিতে গড়া, তাঁর মনও তেমনি সেই সময়ের হাওয়ার মধ্যেই ফুটে ওঠে। তাঁর বিষয়বস্তু, তাঁর চিন্তার উপকরণ, তাঁর জীবৎকালের পরিধি থেকেই এ-সব তিনি সংগ্রহ করেন, উপরন্তু রচনার রূপ ও রীতি, অর্থাৎ তার কলাকৌশলও কালাদিষ্ট। বর্নার্ড শ শেক্সপিয়রের সমসাময়িক হলে অমিত্রাক্ষরে ছাড়া নাটক লিখতে জানতেন না, ব্রাউনিং তাঁর সময়কারই ফ্রান্সে জন্মালে খুব সম্ভব হতেন মনস্তত্ত্বঘটিত উপন্যাসে অগ্রণী। কিন্তু তাই বলে এমন কথা বলা যায় না যে লেখকরা ইতিহাসের এক-একটি উপসর্গ বা কালতরঙ্গের এক-একটি বিক্ষেপ মাত্র, কেননা উপায় আর উপকরণ জুটলেই সাহিত্য হয় না, ঐ দুই বস্তু অন্বিষ্ট, সুসংবদ্ধ, অর্থময় হয়ে উঠে তৃতীয় যে-সত্তাটিকে জন্ম দেয়, তা কোনো দেশ-কালের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পীনামযোগ্য লেখকমাত্রেরই মন কিছু পরিমাণে দেশকালাতীত হতেই হবে। যাঁর মন যত মুক্ত, তিনিই, শেষ পর্যন্ত, তত বড়ো লেখক। কিপলিঙের ছিলো উপকরণে অগাধ অধিকার, কলাকৌশলে চমকপ্রদ দক্ষতা, তবু তাঁর মন নিতান্তই দেশে-কালে আবদ্ধ ছিলো বলে লেখক হিশেবে তাঁর ক্ষুদ্রত্ব কিছুতেই ঘুচলো না। পক্ষান্তরে, তাঁরই সমসাময়িক ইয়েটস, যদিও কিপলিঙের তুলনায় উপকরণের পরিধি তাঁর অনেক সংকীর্ণ, কলাকৌশলেও আপাতবৈচিত্র্য ও আপাতরমণীয়তার অভাব, তবু তাঁর দেশকালাতীত মুক্ত মনের অমৃতক্ষরণে তিনি সাহিত্যের ধ্রুবলোকে বৃত হলেন।
কলাকৌশলকেই কলাকৈবল্য বলে গ্রহণ করে ইংলন্ডের ‘নব্বুই’-যুগের সমালোচনা যেমন ভুল করেছিলো, তেমনি, বা হয়তো তার চেয়েও মারাত্মক ভুল করছে এ-যুগের এক শ্রেণীর সমালোচনা উপাদানকেই সর্বস্ব বলে ভেবে। উপাদানকেই যদি করে তুলি সাহিত্যবিচারের মানদণ্ড, তাহলে উদ্ভ্রান্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে : তাহলে, অন্তত পরোক্ষে, এ-কথাই বলতে হয় যে মঙ্গলকাব্য যেহেতু ইতিহাসের উপাদানে সমৃদ্ধ, তাই অশরীরী বৈষ্ণব কাব্যের চেয়ে তার সাহিত্যিক মূল্যও বেশি, আর একই কারণে ‘সংবাদপ্রভাকর’ ‘সন্ধ্যাসংগীত’ অপেক্ষা গরীয়ান। আবার বলি, সাহিত্যে সমসাময়িকতা চাই, এ-নিয়ে আলাদা করে একটা দাবি উত্থাপন করাই বাহুল্য; আর-কোনো কারণে নয়, লেখক মানুষ বলেই সেটা না-হয়েই পারে না; স্মরণীয় ও বরণীয়দের অনেকের মধ্যেই এই সমসাময়িকতার স্বাদ খুব নিবিড় যদিও কোনো- কোনো ক্ষেত্রে তার আভাসমাত্র পাওয়া যায় না। পোপ বা টেনিসনের স্বকালের স্বাক্ষর তাঁদের রচনার প্রতি পৃষ্ঠায় অঙ্কিত, কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যে ব্লেক যে আঠারো শতকের, আর হপকিন্স যে ভিক্টরীয় যুগের, তাঁদের রচনায় তার প্রমাণ কিছু নেই— কিংবা নামমাত্র আছে। অবশ্য যাঁরা ঘনিষ্ঠরূপে সমসাময়িক তাঁদের মধ্যে আছেন দান্তে, শেক্সপিয়র—এবং রবীন্দ্রনাথ—আর এঁদের উদাহরণ দেখে আমাদের মনে কখনো- কখনো এ-রকম মোহসঞ্চারও সম্ভব যে বড়ো লেখক তাঁকেই বলে, যাঁর লেখায় আপন কালের বিবরণ সুপ্রচুর। কিন্তু আসলে, অমর কবিদের অধ্যয়নের ফলে এই শিক্ষাই আমরা পাই যে সমসাময়িকতা ততক্ষণই গুণ, যতক্ষণ লেখক সেটাকে অতিক্রম করতে পারেন; আর তারই মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়লে প্রণম্যদেরও পতন ঘটে। শুদ্ধশীলা শকুন্তলার প্রেমিক-স্বামীরূপে হারেমবিলাসী দুষ্মন্ত আমাদের আধুনিক ধারণায় অসহ্য, কিন্তু কালিদাসের যে কখনোই অসহ্য লাগেনি, সেটুকুই কালিদাসত্বে তাঁর ন্যূনতা। ইহুদি শাইলককে চরম দণ্ড দেবার পরেও শেক্সপিয়রের মনে তার জন্য কোনো বেদনাবোধ নেই, বিধবা বিনোদিনী যখন অপরাধের ভার নিয়ে হ্রস্বকেশে নতশিরে কাশীধামে নির্বাসিত হলো, তখন রবীন্দ্রনাথ এতটুকু করুণা করলেন না তাকে। এ-সব ক্ষেত্রে কালিদাস, শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ খর্ব হয়েছেন তাঁদের আপন-আপন সময়ের গণ্ডি, সমাজের নির্দেশ, অতিক্রম করতে পারেননি বলেই। সমসাময়িকতাই লক্ষ্য নয়, সেটা পথ, যে-পথ চলে গেছে চিরন্তনের দিগন্তরেখার দিকে, আর সেই পথে যিনি যত অগ্রসর, ততই তিনি মহৎ বলে মান্য।
আধুনিক কালের কোনো-কোনো কবিকে দেখতে পাই, যাঁরা সমসাময়িকের রঙ্গালয় থেকে ইচ্ছে করে, এমনকি চেষ্টা করে, কিছুটা দূরে সরে গিয়েছেন, বেছে নিয়েছেন প্রতীকী পন্থা, আত্মরোপণ করেছেন কোনো পুরাণ বা রূপকথার অখণ্ড উপলব্ধির ভূমিতে। দৃষ্টান্ত আছেন ইয়েটস, রিলকে, ভালেরি, এ-যুগের শ্রেষ্ঠ তিনজন পশ্চিমি কবি। সমকালীন ঘটনার বর্ণনা ছাড়া আধুনিকতার আর-কোনো সংজ্ঞার্থ যাঁরা মানেন না, এঁদের লেখা পড়ে তাঁদের হতাশ হতে হবে। আর তার উপর সমগ্রভাবে সাহিত্যের দিকে তাকালে, সাহিত্যের নির্লিপ্ততাই বড়ো হয়ে চোখে পড়ে, অর্থাৎ ইতিহাসের বড়ো-বড়ো ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন অনেক সময়ই দেখা যায় না সেখানে—কিংবা যেখানে দেখা যায় সেখানে শিল্পের মর্যাদারক্ষা হয় না। ইংরেজি সাহিত্য থেকে দুটি দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করি। ইংলন্ডে প্লেগের মহামারী আর তৎপরবর্তী কৃষক-বিপ্লব দুটোই ঘটেছিলো চসারের জীবদ্দশায়, কিন্তু এই বহুপ্রসবী প্রতিভাবানের সমগ্র রচনাবলির মধ্যে প্লেগের নামগন্ধ নেই, আর কৃষক বিপ্লবের একটি সকৌতুক উল্লেখ আছে। এদিকে তাঁর সমসাময়িক ল্যাংল্যান্ডের কাব্য তৎকালীন দুঃখ-দুর্দশার বর্ণনায় পরিপূর্ণ, অর্থাৎ সাম্প্রতিক পরিভাষায় তিনি চসারের চাইতে অনেক বেশি সমাজসচেতন, কিন্তু ল্যাংল্যান্ডের কাব্য কি তাতে বাঁচলো? কার্যত দেখা গেলো, চসারের মধুচক্রেই ইঙ্গজন নিরবধি আনন্দে সুধাপান করলো, আর ল্যাংল্যান্ডের স্থান হলো পণ্ডিতমহলে, ড পাধিপ্রার্থীর ক্লেশকর অধ্যয়নে, ইতিহাসের তথ্যান্বেষীর পরিশ্রমে। তারপর স্প্যানিশ আর্মাডার পরাজয়ের মতো এত বড়ো একটি ঘটনাও একটা কবিতারও উপলক্ষ হলো না, যদিও স্পেনসর আর মার্লো দুজনেই তখন বেঁচে, এলিজ়াবিথান গীতবিতান কলমুখর, আর ঠিক সেই সময়েই সাহিত্যক্ষেত্রে শেক্সপিয়রের আবির্ভাব। যে-সব লেখক স্বকালের আত্মাকে ধারণ করেন, তাঁরা অনেকেই ঘটনালোকের নেপথ্যবিহারী।
এই শেষের কথাটা অবশ্য রবীন্দ্রনাথের পক্ষে প্রয়োজ্য নয়। ভালেরি বা রিলকের মতো কবি নন তিনি, সমসাময়িকের ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরে যাননি কখনোই; বরং তিনি সর্বত্র এবং সবসময় একটু যেন অধিক পরিমাণেই উপস্থিত। তাঁর জীবৎকালের ইতিহাসের এমন-কোনো তথ্যই বোধহয় নেই তাঁর রচনাবলির কোনো-না-কোনো অংশে যার উল্লেখ না আছে। অপঘাতের আশঙ্কা যেমন ছিলো, তেমনি তিনি জন্মেওছিলেন রক্ষাকবচ নিয়ে। সে-কবচ আর-কিছুই নয়; মহাকবিদের সহজাত সংশ্লেষণশক্তি, এই সহজবোধ যে কোনো-এক সমগ্রের অংশ করে না-দেখলে সব তথ্যই অর্থহীন, খবরমাত্রেই গুজব এবং ইতিহাস মাত্রেই অসার। তাই—দান্তের মতো, বা শেক্সপিয়রের মতো,* তিনিও তাই ইতিহাসকে বানিয়ে ছেড়েছেন সেই করুণ রঙিন পথ, যে-পথে বেরোলে চোখের তারায় অরণ্য-পর্বতের গান শোনা যায়; স্বকালকে অবলম্বন করে ব্যক্ত করেছেন চিরকালকে, স্বদেশের জীবনের মধ্যে প্রকাশ করেছেন বিশ্বজননী। মহাকবিদের সমসাময়িকতার বৈশিষ্ট্য এইখানে যে সমসাময়িক প্রসঙ্গকে উপলক্ষ করে তাঁরা যা বলেন, ভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়েও তার সার্থকতা নষ্ট হয় না, যে-কোনো দেশের, যে-কোনো কালের বিশেষ প্রসঙ্গের মধ্যে তা যেন মানিয়ে যায়, ভিন্ন-ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন-ভিন্ন ব্যঞ্জনা তার বিচ্ছুরিত হয়। এইজন্যই তাঁরা স্থায়ী, এইজন্যই যুগে-যুগে বিচিত্র তাঁদের আবেদন।
[* অবশ্য অন্য কোনো বিষয়েই দান্তে বা শেক্সপিয়রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করছি না আমি; ও-দুই কবির সঙ্গে তাঁর প্রভেদ কোথায় এবং কতখানি সে-বিষয়ে আমি সচেতন। এখানে আমার উদ্দেশ্য শুধু এইটুকু বলা যে এই তিনজনেই ঘনিষ্ঠভাবে দেশগত, যুগধর্মী—অথচ তাই বলে একটুও প্রাদেশিক নন—আপন-আপন ইতিহাস-ভূগোল অবলম্বন করেই তার সীমানা ছাড়িয়ে গেছেন এঁরা, বিশ্বমনের প্রতিভূ হয়ে উঠেছেন।]
সমসাময়িক থেকে চিরন্তনে পৌঁছবার দিগন্ত-দীর্ঘ পথে রবীন্দ্রনাথের জয়যাত্রা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। এ-বিষয়ে তাঁর এমনই স্বাচ্ছন্দ্য ছিলো যে শুধু সমসাময়িককে নয়, সাময়িককেও নিশ্চিন্তে স্থান দিয়েছেন, আর তাতেও বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটিয়েছেন। ‘সম্রাটের জয়গান রচনার জন্যে’ অনুরুদ্ধ হয়ে তাঁর মনে ‘বিস্ময়ের সঙ্গে উত্তাপেরও সঞ্চার’ হলো, আর তারই ‘প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায়’ লিখে ফেললেন ‘জনগনমন-অধিনায়ক’ গানটি—‘যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালকে’র দেশকালাতীত বন্দনাগান। ** আর ‘সংকোচের বিহ্বলতা’ তিনি রচনা করেছিলেন শান্তিনিকেতনের সংকুচিতা ছাত্রীদের জিউ-জুৎসু শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্য। কিন্তু কিসে থেকে কী হলো। শুধু বাংলায় ‘স্বদেশী’ উদ্দীপনার যুগেই নয়, আজীবন কত রাষ্ট্রিক আর সামাজিক প্রসঙ্গে, কত বিবাহে, উৎসবের অনুষ্ঠানে, আর কত দিক থেকে কত বিচিত্র অনুরোধ রক্ষার্থে কত কবিতা, কত গান তিনি গেঁথেছেন নিছক সাময়িকতার প্ররোচনায়, শুধুমাত্র কোনো উপলক্ষের ক্ষণিক চাহিদা মেটাতে—কিন্তু তার অধিকাংশই উপলক্ষ পেরিয়ে লক্ষ্যে পৌঁচেছে, স্থায়ী হয়েছে সাহিত্যে। প্রণাম করি এই লোকোত্তর প্রতিভাকে, কিন্তু সেই সঙ্গে এও বলি যে তুলনীয় প্রতিভা যেহেতু অন্যদের মধ্যে আশাতীত, সেইজন্য এ-বিষয়ে তাঁকে অনুকরণ করতে যাওয়া মারাত্মক; ক্ষুদ্রতর কবিদের হাতে উপলক্ষ-ঘটিত কবিতা কী-রকম দাঁড়াতে পারে, তার মন-খারাপ-করা প্রচুর নমুনা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রেখে গেছেন।
[** রবীন্দ্রনাথের যে-পত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি, সেটি শ্রীযুক্ত প্রবোধচন্দ্র সেনের ‘ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত’ পুস্তিকায় মুদ্রিত আছে।]
সাময়িক প্রসঙ্গকে, ঘটনাকে, কবিতাদ্বারা চিহ্নিত করার প্রথাটা আসলে প্রাচীনকালের। যে-কালে রাজাই ছিলেন কবির ভরণকর্তা, সে-কালে রাজবাড়ির ক্রিয়াকর্মে শোকে উৎসবে পুরোহিতের মতো কবিরও কিছু করণীয় ছিলো, কিন্তু আজকের দিনের সমাজব্যবস্থায় সে-রকম কোনো কথাই আর ওঠে না। যে-কোনো উপলক্ষে কবিরও ডাক পড়ুক, এমনকি নতুন রঙ্গালয় বা মোদকভাণ্ডারের উদ্বোধনেও এই সামাজিক স্বীকৃতির ইচ্ছাটুকুতে দোষ নেই, কিন্তু আধুনিক জগতে সেই স্বীকৃতিটা অন্য রকম হওয়াই সর্বতোভাবে বাঞ্ছনীয় মনে করি। ইংলন্ড আজও অবশ্য একজন রাজকবিকে রেখেছে, বিগ্রহে বিবাহে অভিষেকে তাঁর কাছে কিছু প্রত্যাশাও থাকে, তবে এটুকু সুবুদ্ধিও ইংরেজের হয়েছে যে আলফ্রেড টেনিসনের পরে আর কোনো মুখ্য কবিকে ঐ আসনে তারা বসায়নি। বাংলা দেশের সার্বজনীন রাজকবির যে-পদটি রবীন্দ্রনাথ উত্তরজীবনে পেয়েছিলেন, সেটাও ঠিক কবি বলে পাননি, পেয়েছিলেন বিশ্ববিশ্রুত একজন ব্যক্তি বলে, এমন ব্যক্তি, যাঁর নামের সঙ্গে যে-কোনো রকম সংস্রবই একটা বিরাট বিজ্ঞাপন। আশ্চর্য এই যে রবীন্দ্রনাথের কর্ণকুণ্ডল এ-দুর্বিপাকেও তাঁকে রক্ষা করেছে, কেননা যদিও দক্ষিণ কলকাতার দধিকারের প্রশংসাপত্রে তাঁর প্রতিভাও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে, তবু সিনেমাবিষয়ক গদ্যকবিতাটিতে চিহ্নিত হয়েছে তাঁর তুলনাহীনতার অন্যতম উদাহরণ।*
[* “চিররূপের বাণী”, ‘পুনশ্চ’র পরবর্তী সংস্করণের অন্তর্গত। ‘রূপবাণী’ প্রেক্ষাগৃহের উদ্বোধন উপলক্ষে রচিত এই উৎকৃষ্ট কবিতাটি এখনো পাঠকসমাজের তেমন লক্ষ্যগোচর হয়নি।]
‘তুলনাহীন’ কথাটির বিশেষ একটি তাৎপর্য আছে এখানে। রবীন্দ্র-অভ্যুদয়ের পরে বহুদিন পর্যন্ত রাশি-রাশি প্রাসঙ্গিক কবিতা লিখেছেন প্রত্যেক বাঙালি কবি; তার কোনোটাই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনীয় হলো না, কোনো-কোনোটি আজকের দিনে কোনোরকমে পাঠযোগ্য হলেও অধিকাংশ ধুলো হয়ে গেলো গত চৈত্রের ঝরাপাতার মতোই। পুরীতে গিয়ে সমুদ্র, দার্জিলিং গিয়ে হিমালয়, আর আগ্রাতে গিয়ে তাজমহলকে উপলক্ষ করে উচ্ছ্বাস, উপরন্তু যে-কোনো ব্যক্তিগত আত্মীয়ের বা প্রখ্যাত পুরুষের মৃত্যুতে শোকগাথা—আমাদের ছেলেবেলায় এ-সব ছিলো কবিত্বের নিত্যকর্ম। বড়ো হয়ে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলুম আমরা, অন্তত এ-ধরনের কৃত্রিমতাকে তাড়িয়েছিলুম সাহিত্য থেকে। কিন্তু গত যুদ্ধের বছরগুলি ভরে তারই একটি হালফ্যাশনের নতুন নমুনাকে উগ্র হয়ে উঠতে দেখা গেলো— এখনো তার অবসান ঘটেছে বলতে পারি না।
বাংলা সাহিত্যের কি তবে প্রাসঙ্গিকতার দিকে, সাংবাদিকতার দিকে স্বাভাবিক একটু প্রবণতাই আছে? না কি এটা রবীন্দ্র-প্রভাবের একটা শোকাবহ বিকৃতি? দুটোই সম্ভব; কিন্তু আরো একটা কারণ এর আছে বলে মনে হয়; সেটা এই যে আমরা পরাধীন—মানে, এতদিন ছিলুম। পরাধীন দেশেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূত্রপাত, পরাধীন দেশেই এ-পর্যন্ত তার পরিণতি। দুর্বল ও দুর্গত দেশে স্বদেশপ্রেমের আবেগপ্রাবল্য অনিবার্য, এবং দুর্বল ও দুর্গত দেশেই স্বদেশপ্রেম সহনীয়। কিপলিঙের সমালোচনা-প্রসঙ্গে এলিয়ট লিখেছেন যে দেশপ্রেম কখনো কবিতার বিষয় হতে পারে না। সত্য কথা। ইংলন্ডের মতো প্রবল সমৃদ্ধ দেশে দেশপ্রেমের কবিতা মানেই ‘রুল ব্রিটানিয়া’র দাম্ভিক চীৎকার কিংবা বড়োজোর তার কিপলিঙীয় সংস্করণ।* দেশপ্রেমের কবিতা সম্ভব হতে পারে শুধু দুঃস্থ পরাধীন দেশে, কিংবা স্বাধীন দেশের সংকটের সময়ে; সম্ভব হয়েছে আয়ার্ল্যান্ডে আর ‘প্রতিরোধ’-আন্দোলনকালীন ফ্রান্সে। স্বদেশ-বন্দনার পরিমাণ বাংলা সাহিত্যে যত বেশি, আয়তনে অত বৃহত্তর ইংরেজি সাহিত্যে তার অংশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। জাঁক করবার মতো কিছু নয় এটা, এটা আমাদের দুর্দশারই পরিমাপ। দেশপ্রেমের একমুঠো উৎকৃষ্ট কবিতা রবীন্দ্রনাথ যদি দিয়ে থাকেন, সেই সঙ্গেই দেশ ছেয়ে গেছে সেন্টিমেন্টাল বিলাপে-প্রলাপে। পরাধীনতা মানুষকে হীনতাবোধে বিদ্ধ করে, আপ্লুত করে ভাবালুতায়; সে লুব্ধ হয় অতিরঞ্জনে, অতিকথনে, আত্মপ্রদর্শনে; নিজের গৌরব রটনার এতটুকু সুযোগ পেলে সেটাকে তুলোধুনো না-করা পর্যন্ত ছাড়ে না; তখন এমন অদ্ভুত অর্থহীন কথাও তার মুখ দিয়ে বেরোয় যে সর্বজীবের মাতা যে-পৃথিবী, সেই পৃথিবী ধন্য হলো তার মাতৃভূমির পদস্পর্শ করে। অবিশ্রাম আমরা খুঁজে বেড়িয়েছি আমাদের বন্ধন-দশার দুঃখপ্রকাশের সুযোগ; ছোটো-বড়ো কোনো উপলক্ষই ব্যবহার করতে ভুলিনি; সম্ভবত সেইজন্যই আমাদের দেশে প্রাসঙ্গিক, সাময়িক, বা সাংবাদিক রচনার পরিমাণ সমগ্র সাহিত্যের পরিমাপে এখনো অত্যধিক। রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল প্রাইজ় পেলেন, তৎকালীন সম্ভ্রান্ত জীবিত কবিরা প্রত্যেকে কবিতা লিখেছেন সে-উপলক্ষে—সে তো কবিপ্রশস্তি নয়, ইঙ্গ-শাসিত হলেও বঙ্গভূমি যে আসলে কত বড়ো, তারই গৌরব-ঘোষণার কলরব। মনের এই দুবর্লতা অবশ্য মার্জনীয়, কিন্তু রচনার দুর্বলতার তো মার্জনা নেই। আমাদের দুঃখ আমাদের তাড়না করে বেড়িয়েছে চলতি মুহূর্তের ক্ষণিক আবেগ লিপিবদ্ধ করতে; সহজ উত্তেজনায় সহজে কিছু-একটা লিখে ফেলে আমাদের নিজেদের মন হালকা হয়েছে তখনকার মতো— কিন্তু সাহিত্য কি দুঃখপ্রকাশের বাহন, দুঃখলাঘবের উপায়? এইভাবে, পরাধীনতার পরোক্ষ অভিশাপে, এতদিন ধরে প্রচুর অপব্যয় হয়েছে আমাদের সাহিত্য-শক্তির; দুই বিঘা জমি সংক্রান্ত উচ্ছ্বাসে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সুর নেমে গেছে।
[* এখানে স্মর্তব্য যে কিপলিং যেমন খাশ ইংরেজ, ইয়েটস তেমনি খাঁটি আইরিশ, কিন্তু এঁদের স্বাদেশিকতার প্রকারভেদেই প্রতিভার ব্যবধান বোঝা যায়। কিপলিঙের আবেদন তাঁর স্বজাতির মধ্যে, এবং স্বজাতিরও বিশেষ-একটি শ্রেণীর মধ্যে আবদ্ধ; তাঁকে ভালোবাসতে হলে সাম্রাজ্যবাদে বিশ্বাসী হওয়া চাই, সে-বিশ্বাসে অংশী হতে যাঁরা পারেন না এমন ইংরেজ সমালোচকও তাঁর কোনো-কোনো কবিতাকে ‘ডিটেসটেবল’ আখ্যা দিয়েছেন। পক্ষান্তরে ইয়েটস তাঁর স্বদেশপ্রেমের সূত্র ধরেই বিশ্বমানসে পৌঁচেছেন, আয়ার্ল্যান্ডকে করে তুলেছেন সৌন্দর্যের, মহিমার প্রতীক; তাঁর ‘কাউন্টেস ক্যাথলীন’বা “ঈস্টার, ১৯১৬” যদিও আইরিশ ইতিহাসের তৎকালীন সংলগ্নতার মধ্যে রচিত, তবু সর্বমানবের নিগূঢ় একটি বেদনাই তাতে ব্যক্ত হয়েছে। সমগ্রভাবে ইয়েটসকে দেখলে বোঝা যায় যে এই দেশপ্রেমকে তিনি উপায়হিশেবে ব্যবহার করেছেন, আত্মপ্রকাশের উপায়; তাঁর কাব্যসাধনার ওটি একটি স্তর মাত্র, যে-স্তর ছাড়িয়ে যথাসময়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। তেমনি, রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেমও অনতিপরেই তাঁর ভগবৎবোধে, বিশ্ববোধে মিলিত হলো, অসহযোগ আন্দোলন বিশ্ববিমুখ বলে তাকে প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। এদিক থেকে ইয়েটস-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের, এবং আয়ার্ল্যান্ডের ‘সেলটিক পুনরুজ্জীবনে’র সঙ্গে বাংলার ‘স্বদেশী’ আন্দোলনের সুন্দর একটি তুলনা ধরা পড়ে।]
কিন্তু আর কেন? আজ তো দেশে রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা স্থাপিত হলো, আমরা আত্মমর্যাদা ফিরে পেলাম; আমরা যে খুব বড়ো, খুব ভালো, কিংবা খুব দুঃখী, এ-কথা সকলকে ডেকে চেঁচিয়ে বলবার আবেগের তাড়নাটা অন্তত রইলো না। আর কেন ঘটনার বিবৃতি, রটনার অনুলিখন, উচ্ছ্বাস, সদিচ্ছা, আত্মকরুণা? চলতি মুহূর্তের ক্ষণিক আবেগকে লিপিবদ্ধ করার কর্তব্যপরায়ণতা থেকে মুক্তির সময় কি এখনো আসেনি? এই ক্ষণিক আবেগের উপলক্ষ যখন ছিলো পুরীর সমুদ্র কি আত্মীয়ের মৃত্যু, অর্থাৎ ব্যক্তিগত, তখন বিলাপে-প্রলাপে নিরীহতা অন্তত ছিলো, কিন্তু আত্মজীবনের বদলে যাঁরা আজ সমাজ-জীবনের তথ্যানুগামী, ঘটনাপ্রসূত উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে তাঁরা যা লিখছেন, তা অনেকসময় হয়ে উঠেছে–শুধু সাহিত্য নিয়ে পরিহাস নয়, মানুষের দুঃখকেও অপমান। বিষয়হিশেবে গণজীবনকে অবলম্বন করেও তাঁরা প্রকাশ করছেন সেই ক্ষণিক, ব্যক্তিগত আবেগের বুদবুদ, চলতি মুহূর্তের উত্তেজনা, ব্যক্তিগত ক্রোধ, কি ব্যক্তিগত দুঃখ; দুঃখটা কখনো-কখনো এত চড়া গলায় এত বেশি করে বলা যে আমাদের মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক অ-সাহিত্যের উদাহরণ-স্বরূপ উদ্ধৃত ‘দুঃখ করো অবধান, দুঃখ করো অবধান, আমানি খাবার গর্ত দেখো বিদ্যমান’, কিংবা এমনও মনে হয় এ যেন বাংলা সাহিত্যের একদা-খ্যাত ‘উদ্ভ্রান্ত প্রেমের শোকোচ্ছ্বাসের আধুনিক প্রকরণ। প্রভেদটা শুধু এই যে উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ সমুদ্রের বদলে জনতা, মৃতা পত্নীর বদলে লক্ষ-লক্ষ দুর্গত মানুষ। ‘শুধু’ বললাম, কিন্তু প্রভেদটা এদিক থেকে গুরুতর যে নিতান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে ভাবালুতা শুধু কু-সাহিত্য প্রসব করেই ক্ষান্ত হয়, তার বেশি ক্ষতি করে না; কিন্তু বিষয় যেখানে দেশব্যাপী ক্ষুধা, বিশ্বব্যাপী হত্যা, সেখানে ভাবালুতায় মানুষের প্রতি যে-অশ্রদ্ধা প্রকাশ পায়, সেটা মনুষ্যত্বেরই পরিপন্থী।
প্রতিদিনের সংবাদ-জ্ঞাপন, বিবিধ তথ্যপ্রচার, বিক্ষোভ, অভিযোগ ও সদিচ্ছার বিচ্ছুরণ—এর প্রয়োজন আছে আমাদের সামাজিক-সাংসারিক জীবনে, সে-প্রয়োজন ক্রমবর্ধমান নৈপুণ্যে পূরণ করুন সংবাদপত্র আর সাংবাদিক পত্রিকা ও পুস্তিকাবলি। সাহিত্য আর সাংবাদিকতা যে ভিন্ন-ভিন্ন জগতের, জীবনের বিভিন্ন মহলের অধিবাসী, এ-কথার সক্রিয় স্বীকৃতির সময় এসেছে এখন, সময় এসেছে নিজের ভিতরে ফিরে তাকাবার। বলা বাহুল্য, ঘরের দরজা নি-খিল করে দিলেই নিখিলমিলন ঘটে না, কেননা বিশ্বকে উপলব্ধি করতে হয় নিজের ঘরেই, অর্থাৎ নিজের মনেরই মধ্যে। ঠিক ততটুকুই আমরা উচ্চারণের অধিকারী, যতটুকু আমাদের উপলব্ধি, আর অধিকার অতিক্রম করবার প্রলোভন ত্যাগ করতে-করতেই উপলব্ধির পরিধি বাড়ে। সমসাময়িককে অবলম্বন করে তাকে অতিক্রম করাই শিল্পকলার লক্ষ্য, কিন্তু চলতি ঘটনার উত্তেজনাকে তখন-তখন প্রকাশ করে ফেলে হাতে-হাতে নগদ বিদায় নিতে গেলে সেটি সম্ভব হয় না। উপলব্ধির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তথ্যকে, ঘটনাকে কোনো-এক সমগ্রের অংশরূপে দেখতে হয়—তবে যদি জেগে ওঠে সেই সুর, যাতে আজকের কথাই চিরকালের কথা হয়ে ওঠে। যা-কিছু ঘটে যাচ্ছে শিল্পের ক্ষেত্রে তার কোনো মূল্যই নেই যতক্ষণ-না শিল্পীর মন সেটাকে উপার্জন করেছে, সেই মানস-রসায়নের প্রক্রিয়াতেই সত্য করে পাওয়া হয় তাকে, সত্য করে প্রকাশ করা হয়। অপেক্ষার ধৈর্য যাঁর নেই, উপলব্ধির পরিশ্রমে যিনি বিমুখ, যাঁর ক্রিয়াকর্ম পর্যবসিত শুধু ইতিহাসের উপকরণ সঞ্চয়ে, তিনি মূল্যবান সমাজসেবক হতে পারেন, কিন্তু তিনি যে সাহিত্য-শিল্পী নন, বাংলা দেশে এই সত্যকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো যে-আত্মকরুণার আসক্তি, তার অবসান হোক, চিন্তা মুক্ত হোক, আমাদের সাহিত্য আজ সাবালক হোক।
১৯৪৭
