শিল্পীর স্বাধীনতা – বুদ্ধদেব বসু
আমি শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এই কথাটা বলতে আজকের দিনে কিঞ্চিৎ সাহসের প্রয়োজন হয়, কেননা এই বিশ্বাস যাঁরা বিসর্জন দিয়েছেন, দেশে-দেশে তাঁদের সংখ্যা বিবর্ধমান। আমি জানি ‘স্বাধীনতা” কথাটা উচ্চারিত হওয়ামাত্র আপত্তি উঠবে; যে-সব যুক্তি, তর্ক তথ্য সারে সারে দাঁড়িয়ে যাবে তাদের সঙ্গেও পরিচয় আছে আমার। সেই যুক্তিগুলোকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথমত, কেউ-কেউ বলবেন যে স্বাধীনতা বস্তুটা পরম নয়, আপেক্ষিক, কোনো-এক অর্থে তার অস্তিত্ব নেই বলেই ধরা যায়, কেননা আমরা সকলেই আমাদের শরীরের সীমায় বন্দী, আমাদের সামাজিক অবস্থার মধ্যে আবদ্ধ। দ্বিতীয়ত এই যান্ত্রিক সমীকরণের যুগে, যখন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকেও সেপাই-কোর্তার অবিশেষ ছাঁচে ঢালাই করে দেবার চেষ্টা চলছে, যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ব্যক্তিবাদ আখ্যা দিয়ে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেবার প্রস্তাব উঠছে প্রবল হয়ে, তখন এমন কথা বলবার লোকেরও অভাব হবে না যে স্বাধীনতা-–বাঞ্ছনীয় হওয়া দূরে থাক—রীতিমতো ক্ষতিকর, বাধাস্বরূপ; সেটা দমিত হলেই সমগ্রভাবে সমাজের পক্ষে মঙ্গল। আর তৃতীয়ত—যাঁরা এত দূর কবুল করতে রাজি হবেন না, যাঁদের মতে স্বাধীনতা কাম্য, এমনকি সম্ভবপর, তাঁরাও অনেকে বলবেন যে সেটাকে সম্ভব করার জন্যই সাময়িকভাবে বর্জন করতে হবে; অর্থাৎ, তাকে ধ্বংস করার জন্য দিকে-দিকে যে-সব শক্তি আজ উদ্ধত হয়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে শিল্পীকেও—তাতে তখনকার মতো তাঁর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলেও উপায় নেই।
এ-সব মত খণ্ডন করা আমার উদ্দেশ্য নয়; আমার পক্ষে সেটা অপচেষ্টা হবে। আমি সাহিত্যিক, শিল্পকলা শুধু তত্ত্ব নয় আমার কাছে, জীবনের অংশ। সাহিত্যিক হিশেবে আমি যা অনুভব করেছি, বুঝেছি, দিনে-দিনে হাতে-কলমে যেটুকু শিখেছি, সেই অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেই দু-চার কথা বলতে চাই। শিল্পীর স্বাধীনতা বলতে আমি কী বুঝি, সেই কথাটাকে প্রথমে স্পষ্ট করা যাক।
বলা বাহুল্য, শিল্পীও মানুষ, এবং অন্যান্য মানুষের মতোই দেহের সীমায়, দেশ-কালের পরিবেশে আবদ্ধ। এ-কথাও সত্য যে তাঁর সমাজের জীবন থেকে, সমসাময়িক ইতিহাস থেকেই তাঁর অভিজ্ঞতার অধিকাংশ তিনি আহরণ করে থাকেন। অর্থাৎ, যেখানে তিনি সকলের সঙ্গে অভিন্ন, সেখানেই তাঁর উপাদানের ভাণ্ডার। কিন্তু তাঁর হাতে পড়ে সেই উপাদান যা হয়ে ওঠে, শিল্পরচনায় যে- অভিজ্ঞতাটি প্রকাশিত হয়, সংক্রমিত হয়, সেটা বিশেষ, সেটা অনন্য, সেটা তাঁরই ব্যক্তিত্ব থেকে সঞ্জাত। তার মানে সেটা ‘ব্যক্তিগত’ নয়, ‘প্রাইভেট’ নয়;–তাহলে কোনো প্রকাশ হতো না, কোনো সংক্রাম সম্ভব হতো না অন্যদের মনে।
এই যেগুলো সর্বসাধারণের অভিজ্ঞতা, এগুলো যে হঠাৎ এক জায়গায় এসে বিশেষ হয়ে ওঠে, যেন তুলনাহীন, এইটেই শিল্পপ্রক্রিয়ার মূল রহস্য। জীবনের অতি সাধারণ তথ্যের রূপান্তর ঘটে সেখানে; তারা অর্থ পায়, দ্যোতনা পায়, দূরস্পর্শী ইঙ্গিতে আলোকিত হয়ে ওঠে। আমরা যখন সাহিত্য পড়ি তখন আমাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বের তথ্যগুলিকেই চিনতে পারি সেখানে, কিন্তু ঠিক সেগুলোকেও নয়। সেইসব তথ্য, যা বাস্তব জীবনে অস্পষ্ট, এলোমেলো, যোগসূত্রহীন, কিংবা অভ্যাসে পরিজীর্ণ, সেগুলোকে যেখানে সুসংবদ্ধরূপে দেখতে পাই, স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণ করে উপলব্ধি করি, তাকেই আমরা বলি আর্ট, বলি শিল্পকর্ম। এমন প্রবল তার সংঘাত, এমন নিবিড় তার প্রভাব আমাদের মনের উপর, যে হাজারবার জানা কথাটাও নতুন লাগে সেখানে, মনে হয় যেন এ-রকম আর-কিছুই হয়নি, যেন এই প্রথম এটাকে দেখতে পেলাম, চিনতে পারলাম। অর্থাৎ, শিল্পীর যেটা নিজস্ব এবং বিশেষ দৃষ্টি, তার অংশীদার হয়ে তবেই আমরা সাধারণকে চিনতে পারি। এই অর্থেই শিল্পী তাঁর স্বজাতির কিংবা বিশ্বমানবের মুখপাত্র
কিন্তু তথ্যের অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি যুগপৎ সম্ভব নয়, ঘটনাকে সার্থকভাবে প্রকাশ করতে হলে ঘটনা থেকে সরে যেতে হয়। এই মানসিক অপসরণের জন্য শিল্পীর চাই অনাসক্ত দৃষ্টি; মানুষ হিশেবে সাধারণ সুখদুঃখ সকলের সঙ্গে সমানভাবেই তিনি ভোগ করবেন, কিন্তু তিনি যখন শিল্পী, তখন ঐ মানবভাগ্যের অন্তর্গত হয়েও তাঁকে দেখতে হবে যেন বাইরে থেকে, বলতে হবে এমনভাবে যেন তিনি অংশভাগী নন, দর্শক, এবং দর্শয়িতা বা সূত্রধর। ঘটনার উতরোল বিশৃঙ্খলায় বিহ্বল হলে তাঁর চলবে না; অর্থ বোঝার জন্য, অন্বয়সাধনের জন্য তাঁকে তখনকার মতো হতে হবে মনের দিক থেকে আত্মস্থ, আত্ম-সম্পূর্ণ। আর এই সরে যাবার, সরে দাঁড়াবার প্রয়োজন থেকেই তাঁর স্বাধীনতার উদ্ভব—শিল্পীর পক্ষে স্বতঃসিদ্ধ সেই স্বরাজ; যতক্ষণ যতটুকু তিনি শিল্পী, ততক্ষণ এবং ততটুকুই স্বতঃসিদ্ধ। তাঁর জীবনের অনেকটা অংশই আকস্মিক; যে-দেশে, যে-সময়ে তিনি জন্মান, যে-সব ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়, তার কিছুই বেছে নিতে পারেন না তিনি; অনেক সময় তাঁর জীবিকার উপায় বা জীবনযাপনের রীতির উপরেও তাঁর হাত থাকে না! কিন্তু এই পুঞ্জ-পুঞ্জ অভিজ্ঞতাকে কেমন করে তিনি ব্যবহার করবেন, কতটুকু তার রাখবেন, কতটা ফেলে দেবেন, সেই অসংলগ্ন ভগ্নাংশরাশিকে কোন চিন্তা-সূত্রে গ্রথিত করবেন, কী-রকম আকৃতি, অবয়ব দেবেন তাকে, কী অর্থ তাঁর পাত্রটুকুতে ধরাবেন—এ-সব বিষয়ে তিনিই তাঁর নিয়ন্তা, তাঁর উপরে কথা বলার কেউ নেই, তাঁর শিল্পের যে-সব শাসনে স্বেচ্ছায় তিনি নিজেকে বাঁধেন, তা ছাড়া আর কোনো শর্তেরই তিনি অধীন নন। মানুষ হিশেবে তাঁর অবস্থা তাঁর আজ্ঞাবহ নয়, ঘটনাচক্র তাঁর ইচ্ছা মেনে চলে না, কিন্তু শিল্পী হিশেবে তাঁর অধিকার অনাহত; তাঁর রচনার রূপ, বিষয়, বক্তব্য, এ-সব বিষয়ে মুক্ত ইচ্ছার প্রয়োগে কোনো বাধা নেই তাঁর, থাকতেই পারে না—যদি তার জন্য সমসাময়িক সমাজের হাতে তাঁকে উপেক্ষিত বা নিপীড়িত হতেও হয়, . তবু এখানে তাঁর আপন প্রবৃত্তির পরামর্শই চরম। যখন ঐতিহাসিক ঘটনাবলি দুর্গম বেগে বয়ে চলে, তখন তাকে যে-কোনো ভাবে শাসন করা শিল্পীর পক্ষে অসাধ্য হতে পারে; অসংখ্য সাধারণ মানুষের মতো, তিনিও অসহায়ভাবে বন্যার মুখে ভেসে যেতে পারেন। এমনও হতে পারে যে অবস্থার চাপ সইতে না-পেরে হেরে গেলেন তিনি, শিল্পকর্মে ইস্তফা দিলেন। কিন্তু তাতে এ-কথা প্রমাণ হলো না যে শিল্প যথেষ্ট শক্তিমান নয়; তাতে বোঝা গেলো যে শিল্পীরও মানবিক দুর্বলতা আছে। কথাটা এই যে শিল্পী যতক্ষণ তাঁর নিজের বৃত্তি পালন করেন, ততক্ষণ, যে-কোনো অবস্থায়, তিনিই কর্তা; তাঁর কর্মের উপাদান এবং রূপায়ণ আদ্যন্ত তাঁর বশবর্তী। অর্থাৎ, শিল্পী হিশেবে তিনি যা-কিছু করেন সেখানে তিনি স্বভাবতই স্বাধীন; বাইরের দিক থেকে যত কঠোর আবদ্ধতাই থাক, এর কখনো ব্যতিক্রম হতে পারে না, কেননা এই স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়া মানেই তাঁর শিল্পী-সত্তার অবসান।
জর্মান কবি রাইনের মারিয়া রিলকের একটি উক্তি এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। শিল্পী যে স্বয়ংপ্রতিষ্ঠ, এই কথাটাই রিলকে তাঁর ‘তরুণ কবিকে লেখা পত্রাবলি’তে বলেছেন, বলেছেন ঠিক সেটুকু অতিরঞ্জন করে, মনের মধ্যে গেঁথে দেবার জন্য অনেক সময়ই যার প্রয়োজন হয়। ‘মনে করো তুমি কারাগারে আছো, যার দেয়াল পেরিয়ে পৃথিবীর কোনো শব্দই তোমার চেতনায় পৌঁছয় না—তবু, তবুও কি নিয়ত তোমার শৈশব তোমার সম্পদ হয়ে নেই, সেই মূল্যবান, রাজকীয় ঐশ্বর্য, স্মৃতির সেই রত্নভাণ্ডার?…আর সেই অন্তর্গামিতা, অন্তর্মুখিতা থেকে যদি কোনো কবিতা আসে, তাহলে এ-কথা কাউকে জিজ্ঞাসা করার চিন্তা কোরো না সেগুলো ভালো হয়েছে কিনা।…সেই শিল্পকর্মই ভালো, যার জন্ম হয়েছে প্রয়োজন থেকে।’
এ-রকম উক্তির আক্ষরিক অর্থ করে একে অসার বলে উড়িয়ে দেয়া সহজ। কিন্তু এই ধীর, গম্ভীর কথাগুলির মধ্যে সত্যের যে-কঠিন শাঁসটুকু আছে, তা উপলব্ধি করবেন তাঁরাই, যাঁরা জীবনের যে-কোনো সময়ে নিজের ভিতর থেকে বাইরে কিছু টেনে আনতে চেয়েছেন, চেয়েছেন অঙ্কুরিত হতে, সৃষ্টি করতে। যাকে রিলকে বলেছেন ‘প্রয়োজন’–যা থেকে শিল্পকলার জন্ম—তার কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করতে হয় শিল্পীকে, কিছুই হাতে রাখলে চলে না। এই আত্মসমর্পণ সহজ নয়, তার জন্য নিজের মধ্যে স্তব্ধ হতে হয়, অতিশয় শান্ত হয়ে, ক্ষুদ্র হয়ে, প্রতীক্ষা করতে হয় তার। বলতেই হবে, তাই কথা বলেন শিল্পী; সেটা তাঁর বাধ্যতা; নিজের কাছে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন এমন সাধ্য তাঁর নেই। কিন্তু কী বলতে চান, কী সেই বাণী, যার বীজ জন্মের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে তাঁর মধ্যে–সেইটি বুঝতেও ভুল হয় অনেক সময়, নিজেকে জানতে ভুল হয়। যা আকস্মিক, যা সময়োচিত, তা অনেক সময় উদ্ভ্রান্ত করে, কিংবা ঘটনার উত্থানপতনের কলরোলে অন্তরের মৃদু গুঞ্জন ডুবে যায়। শিল্পীর প্রথম কর্তব্য তাই নিজেকে আবিষ্কার করা, আর তার জন্য নিজের মনের অনেক গভীরে নামতে হয় তাঁকে, পৌঁছতে হয় মাটি খুঁড়ে-খুঁড়ে সেই গহনে, যেখানে পাথর কাদা আবর্জনার স্তূপের ফাঁকে-ফাঁকে স্তরে-স্তরে সঞ্চিত আছে তাঁর সার্থক অভিজ্ঞতা, যেন মূল্যবান ধাতুর আদিম রূপ, অন্ধকারে প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে হাতের স্পর্শে হাতুড়ির আঘাতে রূপান্তরিত হবার প্রতীক্ষা নিয়ে। আর এই আত্ম-আবিষ্কার, আত্মপ্রকাশের সুদীর্ঘ প্রক্রিয়াটি যতক্ষণ চলতে থাকে—জীবন ভরেই চলা উচিত—ততক্ষণ বাইরের কোনো শাসন শিল্পীর উপর প্রয়োজ্য নয়, এই কাজেরই যা অন্তর্গত নয় এমন কোনো দাবি তাঁর উপর করা চলবে না; এই দায়িত্ব একাই যথেষ্ট গুরুভার। এইভাবে, তাঁর কর্মের বাধ্যতাই তাঁকে মুক্তি এনে দেয়, সৃষ্টিকর্মের সুকঠিন শর্ত থেকেই এর উদ্ভব। এই স্বাধীনতা বাইরে থেকে কেউ দান করছে না তাঁকে, বাইরে থেকে কেউ কেড়ে নিতেও পারে না—যদি না তিনি স্বেচ্ছায় সেটি ত্যাগ করতে রাজি হন।
এতক্ষণ যা বলা হলো, তা-থেকে আশা করি এমন কথা কেউ ভাবলেন না যে শিল্পীকে তাঁর সাংসারিক কর্তব্য থেকেও ছুটি দিতে চাচ্ছি; চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর স্বরাজ্য বোঝানোই আমার উদ্দেশ্য। আমি বলতে চাই যে শিল্পী স্বভাবতই ব্রাত্য; কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ে ভর্তি হওয়া, কোনো সংঘবদ্ধ মতবাদ গ্রহণ করে সেই মতেরই নৈষ্ঠিকতা বাঁচিয়ে চলা—এটা তাঁর প্রকৃতির পক্ষে অনুকূল নয়। অন্য সমস্ত চিন্তার ধারা বর্জন করে তিনি যদি একান্তভাবে একটিমাত্র মতবাদেই দীক্ষা নেন—সে-মতবাদের নিজস্ব মূল্য যা-ই হোক না—তাহলে তাঁর দৃষ্টি ব্যাহত হবার, ব্যক্তিত্ব সংকুচিত হবার আশঙ্কা থাকে। তাহলে, খুব সম্ভব, তাঁর অভিজ্ঞতাগুলোকে আপন প্রেরণায় সুস্থির এবং সুপক্ব হতে না-দিয়ে, তিনি তাদের কেটে-ছেঁটে শাস্ত্রের মাপে মিলিয়ে নিতে চাইবেন। ফলত, তাঁর বাণীর লক্ষ্য হবে—সমগ্র মানবাত্মা নয়, নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়। শিল্পীর পক্ষে এর মানে বৈকল্য, বা বিকৃতি।
আজকের দিনে পশ্চিমী জগতে দীক্ষাগ্রহণের ধুম পড়ে গেছে। সেখানকার অনেক লেখক, মনীষী—তাঁদের মধ্যে কেউ-কেউ অগ্রগণ্য—তাঁরা শিল্পীর জন্মগত অধিকারে আস্থা হারিয়ে কোনো-কোনো অনম্য মতবাদের পতাকা নিয়েছেন কাঁধে তুলে। তাঁরা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন, প্রচার করেন, যে ঐ একটিমাত্র মতবাদ যদি জগৎসুদ্ধু সবাই মেনে নেয়, তাহলেই মানুষের ত্রাণ হতে পারে। এই যেটা এতকাল ছিলো ধর্মযাজকের মনোভাব, আজ সেটা সাহিত্যেও উগ্র হয়ে উঠেছে; সমসাময়িক পাশ্চাত্য সাহিত্যের একটা লক্ষণ এই যে তার অনেকটা অংশই ধর্মযুদ্ধের ভেরীনির্ঘোষ; অর্থাৎ তার পরিচয় যেন নিজের মধ্যে বিবৃত হয়ে নেই, কোনো-কিছুর পক্ষ নিয়ে, বা অন্য কিছুর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে, তবেই তা সম্ভব হতে পেরেছে। দেখা যাচ্ছে আটলান্টিকের দুই তটে ভিন্ন-ভিন্ন শিবির পড়েছে লেখকদের; কেউ-কেউ মার্ক্সবাদে প্রতিশ্রুত-কিংবা তার কোনো-না- কোনো প্রকরণে, সনাতন ক্যাথলিক ধর্মের শরণ নিয়েছেন কেউ-কেউ, আর কেউ হয়তো নতুনতর মার্কিন মন্ত্র জপাতে চাচ্ছেন জগৎটাকে। এঁরা পরস্পরের বিরোধী, কিন্তু এই বিরোধিতার মধ্যেই একটা জায়গায় সাদৃশ্য আছে এঁদের; যারা সহযাত্রী নয় তারা যে সকলেই পতিত, আর সেই পতিতদের দীক্ষা দিয়ে উদ্ধার করাই চাই, এই প্রত্যয় এঁদের সকলের মনেই দুর্মর। এতে কখনো-কখনো তীব্রতা আসে রচনায়, যেন সৈনিকের সঙিনের ধার, কিন্তু সেই সঙ্গে সীমাবদ্ধতাও দেখা দেয়, একটি বই রং ধরে না; পড়ে মনে হয়—অন্তত অদীক্ষিত পাঠকের মনে হয়—যে লেখকের মন একটিমাত্র সংকীর্ণ পথেই চলতে জানে, এই বিশাল বিচিত্র মানবজীবনের যে-কোনো প্রসঙ্গ, যে-কোনো সূত্রকে তাঁর মতবাদের চৌহদ্দির মধ্যে যে-করে হোক টেনে আনাই যেন তাঁর প্রতিজ্ঞা।
এই ভাবটা ভারতবর্ষীয় চিন্তাধারায় কখনো স্থান পায়নি। ভারতীয় কবির যেটা আবহমান বৃত্তি, যেখানে তিনি মুক্ত মনেরই প্রতিভূ; কোনো সাম্প্রদায়িক উপবীত তিনি ধারণ করেন না, কিছুই প্রত্যাখ্যান করেন না, আবার কোনোকিছুই চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করেন না, মনের সবগুলো দরজা-জানলা খোলা রাখেন যে-কোনো দিক থেকে আলো আসার জন্য। এর ব্যতিক্রম নেই তা বলি না, কিন্তু ভারতীয় কবি বলতে যে-ছবিটা আমাদের মনে জাগে সেটা শুদ্ধাচারী মঠবাসীর নয়, খোলা হাওয়ায় ধুলোর পথে চলা পথিকের। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, এবং আরো যে-সব লৌকিক ধারা এই দেশেরই মাটিতে জন্মেছিলো, তাদের পাশাপাশি মেলামেশির পরিচয় আমাদের পুরোনো সাহিত্যে গ্রথিত হয়ে আছে; আছেন, তাঁর সময়কার লক্ষণসম্পন্ন কবির, যিনি না-হিন্দু না-মুসলিম, কিংবা একাধারে দু-ই। আর আধুনিককালে রবীন্দ্রনাথ, এই সমন্বয়ধর্মী ভারতীয় মনেরই ভাস্বর ব্যঞ্জনা তিনি। রাষ্ট্রে, ধর্মে, সমাজে, তাঁর জীবৎকালে যত আন্দোলন এ-দেশে জেগে উঠেছিলো, তার প্রায় প্রত্যেকটিতে সাড়া দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তাকে ফলিয়ে তুলেছিলেন সাহিত্যে, কখনো-কখনো প্রত্যক্ষভাবেও অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু কদাচ কোনো সংঘভুক্ত হননি, কোনো পুরোহিতের আনুগত্য স্বীকার করেননি, তাঁকে বাঁধতে পারে এমন বাঁধন কারো হাতেই তৈরি হলো না। তাই তিনি হিন্দুয়ানির নিন্দাভাজন হয়েছেন, আবার গোঁড়া ব্রাহ্মেরও মনঃপূত হতে পারেননি, এবং কোনো রাষ্ট্রনেতার থলির মধ্যেও তাঁকে ধরানো গেলো না কোনোদিন। যে-কথাটি আজ পশ্চিমী দেশে প্রবল হয়ে উঠেছে, যে মানুষের সামনে একটি ভিন্ন দ্বিতীয় পথ নেই, এটা আমাদের কানে অদ্ভুত শোনায়, এটা আমাদের ইতিহাস-চেতনার বহির্ভূত। এই অনন্যবাদ বিশেষভাবে পাশ্চাত্ত্য, এবং পাশ্চাত্ত্য জগতে নতুন কিছুও নয়, কেননা বহু যুগ ধরে এই ধারণা সেখানে বদ্ধমূল যে যীশু মানুষের একমাত্র ত্রাতা। কিন্তু ঐ ‘একমাত্র’ কথাটা ভারতীয় মন কখনো মানতে পারেনি; ‘মামেকং শরণং ব্রজ’ সত্ত্বেও হিন্দুর পক্ষে কোনো বিশ্বাসই আবশ্যিক নয়, ভগবানে বিশ্বাস পর্যন্ত না—নানা নামে তিনি এক, এই হলো ভারতবর্ষীয় কথা;-’মুক্তি নানা মূর্তি ধরি দেখা দিতে আসে জনে জনে, এক পন্থা নহে।’*
[* আমরা অবাক হই, যখন আজকের দিনেও টি. এস. এলিয়টের মতো মনীষী অখ্রিষ্টানদের ‘হীদেন’ আখ্যা দিয়ে তাদের জন্য করুণা প্রকাশ করেন, কিংবা কোটি-কোটি ‘পতিত’ মানুষ অধিবাসিত বিশাল এশিয়ার দিকে তাকিয়ে পল ক্লোদেলের নৈষ্ঠিক হৃদয়ে পবিত্র রোষাগ্নি জ্বলে ওঠে। আমরা অবাক হই, বিব্রত বোধ করি। পক্ষান্তরে গীতার উপদেশ অনন্যবাদের ঘোষণারূপে গ্রাহ্য নয়; ‘সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’, এ-কথা বলাও যা আর স্বধর্ম রক্ষা করে মামেকং শরণং ব্রজ এ-কথা বলাও তা-ই, প্রমথ চৌধুরীর এই ব্যাখ্যায় ভারতীয় ঐতিহ্যের সমর্থন আছে। “পাঠান-বৈষ্ণব রাজকুমার বিজুলি খাঁ” প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী দেখিয়েছেন যে ভারতীয় মধ্যযুগে ভগবদ্ভক্ত ও বৈষ্ণব এ-দুটি পর্যায়-শব্দ ছিল, সুতরাং ব্রাহ্মণের মতো পাঠানও স্বধর্ম রক্ষা করেও পরম-বৈষ্ণব অর্থাৎ পরম-ভাগবত হতে পারত। ঐ স্বধর্ম রক্ষার কথাটা শিল্পীর পক্ষে পরম উপদেশ।]
এই ঐতিহ্য, যাকে রবীন্দ্রনাথ আরো অনেক সমৃদ্ধ করে রেখে গেছেন, তার শক্তি ইতিমধ্যে ক্ষয়ে গেছে এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি একে অস্বীকার করার উদ্যম চলেছে দেশের মধ্যে; আমাদের দেশেও সংঘে যোগ দিচ্ছেন লেখকরা, সম্প্রদায়ের সংলগ্ন হচ্ছেন, আপ্তবাক্যের চশমা পরে জগৎটার দিকে তাকিয়ে দেখছেন। এই শঙ্কিল, বিশৃঙ্খল সময়ে, যখন ক্রান্তিকালের ঝোড়ো হাওয়ায় জীবনের দড়িদড়া প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে তখন এইরকম কোনো মতবাদের দেয়াল-ঘেরা কেল্লার মধ্যে আশ্রয় পাওয়া যায় সে-কথা সত্য, হয়তো কোনো-এক রকমের নিশ্চিতি জোটে। কিন্তু সে-নিশ্চিতি কতটুকু পুষ্টি দিতে পারবে মানুষকে, যার জন্য মূল্য দিতে হয় তার চিন্তার স্বাধীনতা, তার চিত্তের স্বতঃস্ফূর্তি? বিশেষত, জীবনের মূল্যবোধ যখন বিপর্যস্ত, তখন তাকে বাঁচিয়ে রাখা, জাগিয়ে তোলাই তো শিল্পীর কর্তব্য—সেইসব বড়ো-বড়ো পুরোনো মূল্য, যা মানবসভ্যতার সমবয়সী বলেই কোনোদিন পুরোনো হয় না, মানুষের সকল শুভকর্মের যা উৎপত্তিস্থল। শিল্পী যদি একান্তভাবে গোষ্ঠীগত হয়ে পড়েন, যদি তাঁর নিজেরই দৃষ্টি খণ্ডিত হয়, তাহলে জীবনের অবিকল চেতনা কেমন করে আশা করবো তাঁর কাছে? যাঁকে শিল্পী বলি, তাঁর বুদ্ধি পূর্ণজাগ্রত, সংবেদনশীলতা চরম; জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে অবিরলভাবে বেড়ে ওঠেন তিনি, কোনো- একটা জায়গায় এসে আটকে যান না। তাঁর জিজ্ঞাসা সর্বত্র, তাঁর এষণা স্বাধীনভাবে ধাবিত হয় সকল ক্ষেত্রে, আপন প্রকৃতির দাবি অনুসারে চারদিক থেকে তিনি শোষণ করে নেন যেটুকু তাঁর বিকাশের পক্ষে প্রয়োজন। শিল্পীর মন বহুরূপী, তার গতিবিধি অনির্ণেয়, তার ক্রিয়াকর্ম বিষয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। এই মনের উদাহরণ আছেন রবীন্দ্রনাথ, কিংবা গ্যেটে—যাঁকে বলা হয়েছে একাধারে ক্যাথলিক আর প্রটেস্টান্ট, জর্মান এবং লাটিন চরিত্রের প্রতিনিধি, একাধারে রেনেসাঁসের সন্তান এবং মার্টিন লুথারের উত্তরসাধক। এইরকম মন সব বিরোধ ভঞ্জন করে, সব বিপরীতকে মিলিয়ে নেয় নিজের মধ্যে; সেটাই তার পূর্ণতালাভের প্রক্রিয়া। বলা বাহুল্য, এই আদর্শে পৌঁছনো দুরূহ, কিন্তু দুরূহ বলেই এটা অনুসরণযোগ্য, সাধনযোগ্য। আদর্শের সঙ্গে সাধ্যের ব্যবধান থেকেই কঠিনতর প্রচেষ্টার প্রেরণা আসে, কিন্তু আদর্শটাকেই নামিয়ে দিলে সিদ্ধির কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
১৯৫২
