Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    সেই রাত্রি এই দিন

    আশাপূর্ণা দেবী এক পাতা গল্প102 Mins Read0
    ⤶

    ৩১-৪০. ধ্রুব সত্যের সামনে

    ৩১.

    মাথা নিচু করবেই। ধ্রুব সত্যের সামনে মাথা নিচু করা ছাড়া উপায় কী? কোনও কিছুই স্থায়ী নয়, এর চাইতে ধ্রুববাক্য আর কি আছে? কিন্তু সত্য বস্তুটা বড় ভয়ংকর।

    সে খোলা তলোয়ারের মতো, দুপুরের সূর্যের মতো, জ্বলন্ত আগুনের মতো।

    তাই হঠাৎ সে খোলা চোখের সামনে এসে দাঁড়ালে সহ্য করা কঠিন।

    মৃণাল যেন মালবিকার ওই সাধারণ কথাটার মধ্যেই সেই অগ্নিস্পর্শ অনুভব করল।

    স্থায়ী নয়, কিছুই স্থায়ী নয়।

    বস্তু নয়, দৃশ্য নয়, কাল নয়, জীবন নয়, শোক নয়, প্রেম নয়। তা নইলে আমি আবার হাসছি, খাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি, পাটভাঙা স্যুট পরে অফিস যাচ্ছি। আমার দৈনন্দিন জীবনের কোনওখানে কোনও ছন্দপতন নেই!

    শুধু আমি আমার কর্মস্থলে খুব শান্ত আর স্তব্ধ হয়ে থাকি, হাসি না, কথা বলি না। সেটা পারি না বলে নয়, ভয় পাই বলে।

    আমি আমার মুখের উপরকার ওই বিষণ্ণ গাম্ভীর্যের আবরণটা একটু সরিয়ে ফেললেই তো ওরা আমাকে পেড়ে ফেলবে, আর অন্তরঙ্গের গলায় প্রশ্ন করতে বসবে।

    কী হয়েছিল বলুন তো? হঠাৎ এমন হল! আগে থেকে শরীর খারাপ ছিল? আশ্চর্য! মাত্র কটা দিনের ছুটিতে বেড়াতে গিয়ে–বেশি জ্বর হল বুঝি? ডাক্তার পেলেন না সময়মতো? কদিন ভুগেছিলেন? কী মনে হল? ম্যালেরিয়া?

    সুযোগ পেলেই এই প্রশ্নের ঝাঁক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওরা মৃণালের উপর। ওদের মুখের রেখায় রেখায় মুখর হয়ে আছে ওই প্রশ্নগুলো। বুঝতে পারছে মৃণাল। তখন হয়তো মৃণালকে আবার ওই পুকুরের গল্প বানাতে হবে। যেটা সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য।

    তাই মৃণাল নিজের মুখের আবরণটা একবারও অসতর্কে খসে পড়তে দিচ্ছে না।

    জানে, শুধু ওইটুকুইনয়, ওই ঝাঁকের প্রশ্নগুলোর উত্তরেই তো আশ মিটবেনা ওদের যে, গোঁজামিল চলবে। ওরা শুধোতে বসবে, ঠিক কোন অবস্থায়, কটা বেজে কমিনিটের সময় কীভাবে হল! তুলে আনার পর কী কী লক্ষণ প্রকাশ পেল, কী কী উপসর্গ দেখা দিল, ডাক্তার কী প্রেসক্রিপশন করল, ঠিকমতো ব্যবস্থা হল কিনা, এগুলো নিখুঁত ভাবে শুনে অবহিত হতে চাইবে তারা।

    যেন তাদের এক সহকর্মীর স্ত্রীর মৃত্যুকালের সমস্ত ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ না শুনলে ভাত হজম হবে না তাদের।…তারপর সান্ত্বনা দিতে বসবে।

    এই ভয়েই স্বাভাবিক হতে পারছি না আমি, ভাবে মৃণাল। না হলে মাঝে মাঝেই তো কথা কয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়।

    ভয় বাড়িতেও কিছু আছে বইকী!

    মার সামনে সহজ হতে হতে হঠাৎ কঠিন করে ফেলি আমি নিজেকে, ভাবল মৃণাল। পাছে মা ভাবেন আমি জ্যোতিকে ভুলে যাচ্ছি। পাছে মা মনে করেন আমার মধ্যে গভীরত্ব নেই।…আরআর পাছে অন্য কিছু সন্দেহ করে বসেন।

    তাই আমি যখন হঠাৎ কোনও রান্নার প্রশংসা করে বসি, যদি মার ওই পাতানোনা মেয়ের প্রতি ভালবাসার আতিশয্য দেখে কৌতুক করে হেসে উঠি, সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে শক্ত করে নিই, নিজেকে গম্ভীর আর মলিন করে নিই।

    তার মানে আমি শোকের অভিনয় করে প্রমাণিত করতে চেষ্টা করি, জ্যোতিকে আমি ভুলে যাচ্ছি না।

    হঠাৎ ওই মেয়েটার উপর ভারী রাগ আসে মৃণালের।

    ওই মেয়েটাই আমার জীবনের শনি!

    ও যেন কোন অদৃশ্য আকাশ থেকে ওর অশুভ ডানার ঝাঁপটায় জ্যোতিকে সরিয়ে দিয়ে নিজে এসে সেই শূন্য স্থানটার মধ্যে জেঁকে বসেছে।

    যেন ওর আসা আর জ্যোতির হারিয়ে যাওয়া একটাই ঘটনা।

    তারপর ও আস্তে আস্তে সব গ্রাস করছে।

    আমার শোক, আমার শুভ্রতা, আমার প্রেম।

    ও আমার সংসারটাকেও গ্রাস করে নিয়েছে।

    আমার মাকে, আমার বাবাকে।

    জ্যোতির জন্যে আর ওঁদের মনে এতটুকু শূন্যতা অবশিষ্ট নেই।

    জ্যোতির কাজগুলো হাতে তুলে নিতে নিতে অলক্ষ্যে জ্যোতির আসনটাও দখল করে নিচ্ছে।

    অথচ ওর বিরুদ্ধে বলবার কিছু পাচ্ছি না আমি। সেই আসনটা মালবিকা চুরি-ডাকাতি করে নিচ্ছে না, নিচ্ছে না জাল-জোচ্চুরি কি কৌশল করে। প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে সে আসন আপনি এসে যাচ্ছে ওর অধিকারে।

    অথচ আমি সেই অনিবার্যের দর্শক হয়ে বসে আছি, সেই অন্যায় দখলের প্রতিবাদ করছি না।

    আমি পরমানন্দে দেখছি, লীলাবতীর শুধু উঠতে বসতে মালবি মালবি–

    মালবি, আমার সেই কালোরঙের গরম চাদরটা কোথায় রে? মালবি, এবারে কি ধোবার বাড়ি থেকে আমার চওড়া সবুজ পাড়ের শাড়িটা এসেছে?..মালবি, মাছটা কী হবে বল তো, ঝাল না ঝোল?…মালবি, দুধ কি কিছু বেশি নেওয়া হবে, অনেকদিন পায়েস হয়নি।…মালবি, তোর আজকে ফিরতে একটু দেরি হবে বললি না? বিকেলে কী কুটনো হবে বলে দিয়ে যাস বাপু!

    মালবিও সঙ্গে সঙ্গেই বলে, বিকেলের কুটনো আমি কুটে রেখেছি মা, খাবার ঘরের তাকে ঢাকা দেওয়া আছে। তুমি ব্যস্ত হোয়য়া না, আমি এলেই রান্না হবে। বলে, আজ আর পায়েস কেন মা? মাংস হচ্ছে। কাল হবে না হয়।বলে, ঝাল তো বাবার সহ্য হয় না, মাছের ঝোলই হোক মা!

    হ্যাঁ, মা আর বাবা!

    মা, মা, মা!

    সবুজ পাড়ের শাড়িটা তো গতবারেই এসেছে মা, আপনার আলমারিতে রেখেছি। কালো চাদরটা কাঁচতে পাঠিয়েছি, বলেছে দেরি হবে, দু-একটা রিপু করতে হবে।

    নিজে থেকেও বলে, মা, আজ আমার স্কুল নেই, প্রতিষ্ঠাতার জন্মদিবস। দোকানে যাবে বলছিলে না? আজ যাবে তো চলো।…মা, ছোটমাসির অসুখ বললে, দেখতে যাবে তো যাও না, আমি সব ঠিক করে নেব।

    মাঝে মাঝেই লীলাবতীকে এখানে ওখানে বেড়াতে যাবার সুযোগ দেয়, আমি সব ঠিক করে নেব বলে।

    ঠিক অতএব হচ্ছে।

    ভক্তিভূষণেরও সমর্পিত-প্রাণ অবস্থা। যেন বিরূপতা কেটে যাচ্ছে। এত বেশি হুঁশিয়ার মেয়েটা যে, ওর হাতে সমর্পিত-প্রাণ হওয়া ছাড়া উপায় থাকেনি।

    ভক্তিভূষণ কখন কখন ওষুধ খান, সেকথা ভক্তিভূষণ জানেন না, জানে মালবিকা। ভক্তিভূষণ কখন কোন কাপড়-জামাটা পরবেন সে নির্দেশ মালবিকার। ভক্তিভূষণ বর্ষার দিনে চান করবেন কিনা, এবং গরমের দিনে কতটা জোরে পাখা চালাবেন, সে খবরদারির দায়িত্ব মালবিকারই।

    জ্যোতি এতটা পারত না।

    জ্যোতির সমস্ত চিন্তা-চেতনা হিল্লোলিত হত আর একটি লক্ষ্যে। জ্যোতি কর্তব্যর থেকে আনন্দকে প্রাধান্য দিত। তাই জ্যোতির কর্মনিষ্ঠা মাঝে মাঝেই স্থিরবিন্দু থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ত। বার্ধক্যের অসহিষ্ণুতা যেটা সহজে ক্ষমা করতে নারাজ।

    তাই জ্যোতির সঙ্গে তুলনা বন্ধ হয় না।

    আর মালবিকাই যেন সে তুলনায় অতুলনীয় হয়ে ওঠে।

    কর্মনিষ্ঠা বড় ভয়ানক হাতিয়ার! মন জয় করে নেবার পক্ষে এর মতো অস্ত্র অল্পই আছে।

    কর্মনিষ্ঠা, অনন্যচিত্ততা, সংযম, ধৈর্য!

    বয়স্ক মন এর কাছে আত্মসমর্পণ না করে পারে না।

    তাই ভক্তিভূষণের বিরূপ মন আস্তে আস্তে বশ্যতা স্বীকার করছে।

    ভক্তিভূষণ যখন মালবিকাকে তাঁর পারিবারিক সম্ভ্রম রক্ষার উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তখন বিরূপ ছিলেন না। তখন বরং যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন।

    কিন্তু ভক্তিভূষণ ধারণা করেননি কলকাতায় এসে লীলাবতী এতখানি করে তুলবেন। যে মেয়ের জাতকুল কিছুই জানা নেই, নিজের পরিচয়পত্রে স্বাক্ষর করবার জন্যে যে নিজেই কলম হাতে নিয়েছে, ত্রিসীমানায় একটা আত্মীয় বন্ধু দেখাবার ক্ষমতা যার নেই, তাকে একেবারে প্রাণের পুতুল করে তোলাটা বড় বেশি আতিশয্য ঠেকেছিল ভক্তিভূষণের।

    আর নিতান্ত বিসদৃশ লেগেছিল মৃণালের কাছে ওই মেয়েটাকে এগিয়ে দেওয়া। লীলাবতী হয়তো তাঁর বিরহব্যথিত পুত্রের তাপিত চিত্তে একছিটে শীতল বারি নিক্ষেপ করতে একটা অসামাজিক কাজই করে বসছিলেন, কিন্তু ভক্তিভূষণ তাতে ক্রুদ্ধ হচ্ছিলেন।

    পিতৃস্নেহ অনাবিল, পিতৃস্নেহ অতি-মাতৃস্নেহের মতো অনিষ্টকারী নয়।

    আবার, যদি ভক্তিভূষণ ও ঘরে মৃণালের হঠাৎ হেসে ওঠার শব্দ পেতেন, রাগে জ্বলে যেতেন।

    ভক্তিভূষণের মনে হত, ছেলেটা এত অপদার্থ? এত অসার? এত ভালবাসা ছিল, এত গলাগলি ছিল, দুদিনে উড়ে গেল সব! ছি ছি! ওই মেয়েটাও ঘুঘু, কেমন তুকতাক করে মা ও ছেলেকে মুঠোয় পুরে ফেলছে। আমার সেই লক্ষ্মীপ্রতিমার জন্যে এতটুকু হাহাকার নেই কারুর মধ্যে!

    ছি ছি!

    অনবরত ওই ছি ছি।

    গোড়ায় গোড়ায় মালবিকাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখলে জ্বলে যেতেন। বলতেন, নিজে বলেছে মিত্তির, তো মিত্তির? ভগবান জানেন! ওকে দিয়ে ভাত না রাঁধালে হবে না?…তোমার গতরে কী হল?

    লীলাবতী অবশ্য এ অপমান সহ্য করে নিতেন না। লীলাবতী চাপা ক্রোধের সঙ্গে বলতেন, আমার গতরে আগুন লেগেছে। প্রাণ বলে বস্তুটা থাকলে বুঝতে পারতে, কী হচ্ছে আমার ভিতর। আমার হাত পা উঠবে না আর।..ইচ্ছে হয় রাঁধুনি রাখো, ইচ্ছে হয় স্বপাক খাওগে। আমি ওর হাতেই খাব।

    লোকে দেখলে বলবে, বিনি মাইনের একটা রাঁধুনি পেয়ে গেছ

    লোকে বললে আমার গায়ে ফোঁসকা পড়বে না।

    ও নিজেও ভাবতে পারে।

    তোমার মতন কুটিল মন সবাইয়ের নয়।

    কিন্তু আস্তে আস্তে সেই কুটিল মন সরল হয়ে গেছে।

    বিরূপ চিত্ত বিগলিত চিত্তে পরিণত হয়েছে।

    আর এও লক্ষ করেছেন ভক্তিভূষণ, মেয়েটাকে যা ভেবেছিলেন, তা নয়।

    একটা তরুণী মেয়ে আপন হৃদয়ের বালাই না রেখে শুধু একান্তচিত্তে সেবা করে যাচ্ছে, এহেন দুর্লভ ঘটনাকে কতদিন অবহেলায় ঠেলে রাখা যায়?

    ভক্তিভূষণের এখন উঠতে-বসতে মা মা!

    মালবি নয়, শুধু মা।

    লীলাবতী এখন ওই উপলক্ষে সরস কথার স্রোত বহান।

    অ মালবি, দেখ তোর বুড়ো খোকা মা মা করে হাঁক পাড়ছে কেন?…অ মালবি, তোর ধাড়ি ছেলে কী বলছে শোন।…ওরে মালবি, শুনছিস তোর ছেলের নেমকহারামি কথা–আমার রান্না নাকি আর ওঁর মুখে রোচে না।

    কথার লীলা!

    কথার মাধুরী!

    জ্যোতিকে নিয়ে এতটা হত না।

    জ্যোতির হাতের রান্না দুদৈর্বে পড়ে ছাড়া গলা দিয়ে নামানো চলত না।

    জ্যোতি সেবা যত্ন যা কিছুই করুক, তার মধ্যে পালাই পালাই ভাবটা স্পষ্ট হয়ে উঠত।

    শুধু দুদণ্ড কাছে বসে থাকা জ্যোতির কোষ্ঠীতে লিখত না। কাজ সারা হলেই জ্যোতি ঘরে গিয়ে বই পড়ত, সেলাই করত, শুয়ে বসে থাকত।

    মালবিকার নিজস্ব কোনও ঘর নেই।

    মালবিকা তাই সর্বদাই কাছে কাছে।

    মালবিকা স্কুলের চাকরিটা নিয়েছে বটে, তথাপি মনে হয় না সরে গেছে। যাবার সময় পর্যন্ত দেখে যায় কোথাও কোনও ত্রুটি রইল কি না। আবার এসেই কোমরে আঁচল জড়ায়।

    লীলাবতী রেগে রেগে বলেন, আমি কি তোকে ঝি রেখেছি?

    মালবিকা হেসে বলে, তাই তো! ঝি মানে কী, নিজেই বলো।

    লীলাবতী বলেন, রোস একটা পাত্তর জুটিয়ে তোকে শ্বশুর-ঘরে পাঠিয়ে বাঁচি।

    মালবিকা বলে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে মা! তবে দোহাই তোমার, ও শাস্তিটা মনে ভেঁজো না।

    কেন ভাঁজব না? ভাঁজছি তো।

    তা হলে পিটটান দেব। ওই ভয়ে কাকার বাড়ি ছেড়েছিলাম। কাকার শালার সঙ্গে বিয়ে দেবে বলে কাকি হেসে ফেলে মালবিকা, বুঝতেই পারছ পাত্রটি কেমন?

    তা আমি কি তোকে ভাল বিয়ে দেব না? তেমনি পাত্রে ধরে দেব?

    আমার ভালয় কাজ নেই মা! তোমার কাছে না রাখতে চাও তো ফুটপাথে ছেড়ে দাও।

    তুমিই বলে।

    নইলে লীলাবতী রাগারাগি করেন।

    লীলাবতী যেন এই মেয়েটাকে উপলক্ষ করে বাৎসল্যের লীলায় বিকশিত হতে চান, মেয়ে যে ছিল না, তার শোধ তোলেন।

    আর মালবিকা সে লীলায় আড়ষ্ট হয় না, বিরক্ত হয় না।

    তা হলে?

    কিন্তু এ তো গেল বয়স্ক দুই প্রাণীর চিত্তজয়ের ইতিহাস। তারা না হয় পরাভূত? কিন্তু এ সংসারের অল্পবয়স্ক সদস্যটির চিত্তের সংবাদ কী?

    সেও কি ওই একই অস্ত্রে নিহত?

    এমনিতে তো সে বলে, এ বাড়ির গৃহিণী শ্রীমতী লীলাবতী দেবী কত করে মাইনে দেন আপনাকে?

    বলে, আত্ম-নির্যাতনেরও একটা সীমা থাকা উচিত। এটা হচ্ছে কী?…জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবকিছুর দায়িত্ব যে আপনারই, এটাই বা কোন চণ্ডীতে লেখা আছে বলুন তো?

    আবার কখনও কখনও গাম্ভীর্যও দেখায়। বলে, আমার টেবিল কারুর সাফ করবার দরকার নেই, আমি নিজেই করে নেব। আমার ঘরের পরদা, বালিশ ঢাকা কে সাবান দিল? না না, আমি এ সব পছন্দ করি না।

    আপনি বিরক্ত হন? মালবিকা বলে।

    হ্যাঁ, হই। দস্তুরমতো হই–মৃণাল দৃঢ় হয়, এ ঘরের কোনও কাজ করবার দরকার নেই। আশ্চর্য! এ বাড়িতে তো আগে একটা ঝি ছিল দেখেছি, সেটা কোথায় গেল বলতে পারেন? ছেড়ে গেছে?

    মালবিকা ওর ভঙ্গিতে হেসে ফেলে বলে, ছেড়ে যাবে কেন?

    যায়নি তো তার বাড় এত বেড়ে গেছে কেন যে, বাড়ির লোকে ঘর সাফ করবে, সাবান কাঁচবে?

    বাড়ির লোক?

    মালবিকা চোখ তুলে একবার তাকায়।

    তারপর সে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে, ওর কাজ বড় নোংরা।

    হোক গে। তা বলে নিজের হাত নোংরা করতে হবে না।

    হাতের কাজে হাত নোংরা হয় না–মালবিকা হেসে বলে, কোনও নোংরা কাজেই নয়।

    মৃণাল ওই হাসির দিকে তাকিয়ে চোখ নামায়।

    তা তিলে তিলে হয়তো এই অস্ত্রেই নিহত হচ্ছে এ বাড়ির তরুণবয়স্ক সদস্যটি। একটি বুদ্ধিমার্জিত মনের সঙ্গে কথা বলার সুখ, একটি শান্ত সভ্য ধৈর্যশীল প্রকৃতির সাহচর্যের সুখ, অহরহ একটি সুকুমার সুষমার দর্শক হওয়ার সুখ, অর্থহীন জীবনের ভারগ্রস্ত দিনগুলোকে কিছুটা হালকা করতে পাওয়ার সুখ, এগুলো কি সোজা মূল্যবান? এই মূল্যেই বিকিয়ে যাওয়া যায়।

    তা ছাড়া হাল ভেসে যাওয়া সংসার-তরণীর সুশৃঙ্খল গতি, আর উদ্বেলিতচিত্ত প্রৌঢ় মা বাপের চিত্তের শান্তি, এ দুটোও তাকে জয় করার কাজে লেগেছি বইকী!

    হয়তো বা ওইটাই প্রধান। পুরুষ হচ্ছে সুশৃঙ্খল সংসারযাত্রার কাঙাল। সেই পরম বস্তুটি যে তাকে দিতে পারে, পুরুষ মনে মনে তার কেনা না হয়ে পারে না।

    .

    কিন্তু মালবিকা?

    এ বাড়ির ওই কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটা?

    সে তো এ সংসারকে অনেক দিচ্ছে।

    তবে নিজে কেন সে কেনা হয়ে আছে?

    কেন শত দাসত্বেও ক্লান্তি নেই তার? আর শুধু এই পাতানো মেয়ের চাকরিটুকুতেই বা এত কী সার্থকতা তার? সুখই বা কী? অথচ আছে সুখ, আছে সার্থকতা।

    আছে যে, সেটা তার চোখে মুখে আঁকা হয়ে গেছে।

    আশাহীন ভবিষ্যৎহীন এই জীবনের মধ্যেই যেন তার পরম পূর্ণতা।

    .

    আশাহীন বইকী!

    ভবিষ্যৎহীনও।

    যেখানে সে মনের নোঙর ফেলেছে, সেখানের মাটি আলগা, খুঁটি পোঁতবার ভরসা নেই।

    অথচ সেই প্রথম দিন যখন অচৈতন্যের অন্ধকার থেকে উঠে এসে প্রথম চৈতন্যের দরজায় চোখ ফেলেছিল, তখনই জীবনকে বিকিয়ে বসেছিল। তারপর ধীরে ধীরে,কাজে অকাজে, আলাপে স্তব্ধতায়, ঔৎসুক্যে আর অবহেলায় ভরে উঠছে সেই মন।

    মৃণাল যখন আগ্রহের চোখে তাকায়, তখন সুখে আনন্দে কৃতজ্ঞতায় মন ভরে। মৃণাল যখন অন্যমনস্কের মতো ওকে ভুলে গিয়ে আপন হৃদয়ভাবের মধ্যে নিমগ্ন থাকে, তখন শ্রদ্ধায় বিশ্বাসে মন ভরে ওঠে।

    লোকটা বাজে নয়, অসার নয়, তরলচিত্ত নয়, সুযোগ-সন্ধানী নয়।

    ভালবাসার পক্ষে এই তো অনেক।

    তা ছাড়ালীলাবতীর ভালবাসা?

    তাকেও কম মনে করে না মালবিকা। যদিও তার অনেকটাই আতিশয্যের ফেনা, অনেকটাই ধরে রাখবার আকুতি, অনেকটাই আত্মবিকাশের লীলা, তবু ভিতরের বস্তুটা খাঁটি বইকী!

    মালবিকাও অনেক পেয়েছে।

    পেয়েছে আশ্রয়, পেয়েছে স্নেহ, পেয়েছে সম্মান।

    এবং আরও একটা দুর্লভ বস্তু!

    সেটাও যে তিলে তিলে সঞ্চিত হচ্ছে মালবিকারই জন্যে, সেটাও টের পাচ্ছে মালবিকা।

    মালবিকা লোভের হাত বাড়াবে না সেখানে, তবু তার জন্যেই যে জমা হচ্ছে ঐশ্বর্য সেটা জানাই কি কম সুখ?

    .

    বহু বিচিত্র অনুভূতির মধ্যে মালবিকার মন তৈরি হচ্ছে। একদিকে কুণ্ঠা, লজ্জা, অনধিকার প্রবেশের অপরাধী ভাব, আর ভালমন্দের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে গভীর চাঞ্চল্য, অপরদিকে অনাস্বাদিত এক স্বাদের তীব্র আকর্ষণ। জীবনে কবে ভাললাগার স্বাদ পেয়েছে মালবিকা? জীবনে কবে মালবিকা কারও কাছে মূল্যবান হয়েছে?

    না, শৈশবে অনাথ মালবিকা ছিল মূল্যহীন।

    তাই সে প্রতিদিন মনে করেছে, এবার মায়া কাটিয়ে চলে যাই, আর প্রতিদিনই আরও একপাক বন্ধনের গ্রন্থিতে আটকে গেছে।

    কলকাতায় এসে পড়ে যখন তখুনি যেতে পেল না মালবিকা, তখন ভাবল, তা বেশ, চশমাটাই হোক। ওটা না হলে তো কিছুই হবে না। দয়ার দানই নিতে হবে।

    মৃণাল হেসে বলেছিল, চক্ষুদান।

    মালবিকা মনে মনে বলল, দৃষ্টিদান। পৃথিবীকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম তোমার মহত্ত্বে, তোমার সুষমায়।

    চশমাটা যেদিন হল, সেদিন মৃণাল অফিসে জয়েন করেছে।

    দুপুরবেলা খালি ঘরটা ঝাড়তে ঢুকল মালবিকা। আজই তো প্রথম স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে, সেলফে কী কী বই, দেয়ালে কার কার ছবি, টেবিলে দাঁড় করানো স্ট্যান্ডটায় যে ছবি, তার মুখটা কেমন।

    দেখল, দেয়ালে দেয়ালে শুধু একটি রমণীয় রমণীমূর্তির বহু ভঙ্গি। বিয়ের পর কিছুদিন ধরে চলেছিল ওই ফটোর মাতামাতি।

    জ্যোতি বলত, এত ছবি দেয়ালে টাঙাবার দরকার কী? অ্যালবামে থাক না?

    আহা, অ্যালবামে তো রয়েইছে–মৃণাল বলত, কত রয়েছে, এনলার্জডগুলো অ্যালবামের জন্যে নয়।

    তোমার সারা দেয়ালে কেবল আমি, লজ্জা করে না বুঝি?

    আমার সারা পৃথিবীতেই তো তুমি, লজ্জাটা তবে তুলে রাখবে কোথায়?

    মা ঘরে ঢোকেন, ভারী ইয়ে হয়–

    মা বাবার সামনে তুমি বেরোচ্ছ না? ঘুরছনা, ফিরছ না? হাসছনা, কাজ করছ না? তবে? ছবিগুলো দেখলেই দোষ?

    ওটা একটা যুক্তি হল? আমি হলাম শুধু আমি, আর ছবিগুলো হল তোমার আমি।

    মার যদি বাস্তব বুদ্ধি থাকে, তো বুঝবেন দুটোই এক। সব তুমিটাই আমার।

    তা বলে কেউ বউয়ের এত ছবি তুলে দেয়ালে ঝুলোয় না। জানো, মা তোমায় বলেন, কী বেহায়া!

    সব মায়েরাই বলে থাকেন। ছেলে বউকে ভালবাসলেই বেহায়া।

    সে ভালবাসার ছবি তুলে রাখলে তবে কী হয় বলো?

    বলে নিজেই নতুন করে ভালবাসার ছবি হয়ে যেত জ্যোতি।

    নতুন চশমা পরে সেই বহু আলোচিত আর বহু ভঙ্গির ছবিগুলি দেখতে পেল মালবিকা। অবর্ণনীয় একটা যন্ত্রণাবোধ হতে লাগল। আস্তে টেবিলে রাখা শুধু একখানি মুখকে দেখতে লাগল অপলকে।

    আস্তে আস্তে সেই মুখও যেন জীবন্ত হয়ে উঠে তাকিয়ে থাকে মালবিকার দিকে। কিন্তু সেই মুখটায় কোনও অভিযোগ নেই, বিদ্রূপ নেই, করুণার ভঙ্গি নেই। শুধু হাস্যোজ্জ্বল। শুধু সুখের সাগরে ভাসা রানি রানি ভাব।

    অনেকক্ষণ দেখতে দেখতে হঠাৎ ওই রানি-রানি মুখটার প্রতিই করুণা এল মালবিকার।

    মনে মনে বলল, কী দুঃখী তুমি, কী দুঃখী!

    নিজের সেই যন্ত্রণা-যন্ত্রণা ভাবটা মুছে গেল, শুধু যেন একটা অপরাধিনী ভাব রয়ে গেল।

    সেটাই রয়ে গেছে বুঝি আজও, অথবা বাড়ছে।

    .

    অথচ তারপর কত দিন চলে গেল, কত সান্নিধ্য আর সাহচর্যে সহজ হয়ে উঠল ব্যবহার। এখন এ বাড়ির কুড়নো মেয়েটাও এ বাড়ির মালিকের ছেলেকে বকতে পারে, শাসন করতে পারে।…

    অনুক্ত বাণীতে কোথায় যেন একটা অধিকারের দাবি ঘোষিত হয়ে গেছে।

    এখন আর মনে পড়ে না, ওই মালবিকা নামের মেয়েটা এ বাড়িতে কোনওদিন ছিল না।

    এখন আর চোখে পড়ে না, এ বাড়ির একটা ঘরের দেয়াল জুড়ে জ্যোতি নামের একটা মেয়ের দেদার ছবি ঝোলানো রয়েছে।

    এখন আর বোধহয় কোনওদিন সেই ছবি-ঝোলানো ঘরের মালিক ঘুম না হওয়া রাত্রে জানলায় দাঁড়িয়ে ব্যাকুল প্রশ্নে উত্তাল হয়ে ওঠে না, জ্যোতি, তুমি কি তা হলে সত্যিই হারিয়ে গেলে?…জ্যোতি, তুমি যেখানেই গিয়ে পড়ে থাকো, একটা চিঠিও তো দিতে পারতে?..জ্যোতি, তুমি তবে মারা গেছ? জ্যোতি, ওই আকাশের তারাদের সঙ্গে মিশে গেছ তুমি?

    হয়তো এখন সে বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।

    হয়তো আর কোনও মুখ তার স্বপ্নে ছায়া ফেলে, যে মুখ জ্যোতির নয়। সময়ের ধুলোয় জ্যোতির মুখ ক্রমশই ঝাপসা হয়ে আসছে।

    .

    ৩২.

    দিন যাচ্ছে, যাচ্ছে রাত্রি!

    সূর্য আপন কক্ষে আবর্তিত হচ্ছে। নিত্যনিয়মে পৃথিবী তাকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে, ঋতুচক্রের আবর্তন অব্যাহত।

    এই গতি রচনা করে চলেছে ধুলোর বৃত্ত। আর সেই ধুলোর স্তর পড়ে চলেছে জীবন, চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, জগৎ-সংসারের সবকিছুর উপর। ঢাকা পড়ে যাচ্ছে নীচের ভূমি, ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে আগের রং।

    জ্যোতি ক্রমশ শুধু একটি ফ্রেমে বাঁধা ছবি হয়ে যাচ্ছে।

    মালবিকার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সেই ঝাপসার উপর। এখন শুধু একটি সমারোহময় অভিষেকের অপেক্ষা।

    সে অভিষেকের প্রস্তুতি যবনিকার অন্তরালে কম্পমান।

    কিন্তু মৃণাল কি এতই অপদার্থ? এত শীঘ্র জ্যোতিকে ভুলে গেল? খুঁজল না তাকে ভাল করে? হারিয়ে ফেলে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে রইল?

    জ্যোতির জন্যে কোনও কিছু ত্যাগ করল না? জ্যোতির ধ্যানে সমাহিত হয়ে রইল না? সাধারণ মানুষের মতোই খেল, ঘুমোল, কাজ করল, দোকান গেল, বই পড়ল, কথা বলল? তা হলে তো ধিক তাকে!

    না, এতটা অবিচার করা চলে না মৃণালের উপর। করেছিল বইকী অনেক কিছু! হারিয়ে-যাওয়া মানুষকে খোঁজবার যা যা উপায়-পদ্ধতি আছে সংসারে, তার সবই করেছিল। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, পুলিশ-ঘর করেছিল, উড়ো-ভাসা কোনও খবর পেলেই ছুটেছিল সেখানে, চেষ্টার ত্রুটি করেনি।

    তিন-তিনটে বছর তো কম নয়! কতই করল? এরপর আর কী করবে?

    ক্রমশ মেনে নিয়েছে অমোঘ অনিবার্যকে।

    যেমন মেনে নেয় মানুষ মৃত্যুকে। মৃত্যুর শূন্যতাকে।

    অপূরণীয় ক্ষতিও যখন ঘটে, তখন করবার কিছু থাকে কী? পরম প্রিয়জন চলে যায়, হয়তো একে একে সবাই যায়, তবু তারপরও মানুষকে চলতে হয় সংসারপথে। আত্মহত্যা করে জীবনের শেষ করে না ফেললে, চলতেই হবে যথাযথ নিয়মে। দেহটাই যে প্রধান শত্রু, আর পরম প্রভু। দেহ থাকলে সবাইকে রাখতে হবে।

    প্রথমটায় তো এ চাকরি ছেড়ে দিতে চেয়েছিল মৃণাল, ছেড়ে দিতে চেয়েছিল এই ফ্ল্যাট, এই পাড়া, এই শহর।

    আত্মীয় বন্ধু পরিচিত সমাজ, ছাড়তে চেয়েছিল সবাইকে।

    কিন্তু ভক্তিভূষণ একটি পরম প্রয়োজনীয় কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। স্থিরবুদ্ধি গৃহকর্তা ভক্তিভূষণ বললেন, এ বাসা ছেড়ে দিলে কোনওদিন আর তাকে পাবার আশা থাকবে না।

    স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মৃণাল। উপলব্ধি করেছিল এ কথার সত্যতা।

    সত্যিই আশা থাকবে না। খবর যা-কিছু আসবে, এই ঠিকানাতেই আসবে।

    চিঠি যদি কারও আসে, এই ঠিকানাতেই আসবে। আর–?

    আর নিজে যদি কোনওদিন এসে হাজির হতে পারে সে, এই বাসার দরজাতেই আসবে। তবে? তবে আর কি, ছাড়া হল না বাসা। আর বাসাই যদি ছাড়া হল না তো কাজ ছাড়া চলে কী করে? অতএব দৃশ্যত ওই মৃত্যু-সংবাদটাই চালু করতে হল। খোঁজাখুঁজি চলতে লাগল তলে তলে।

    আর বলতে গেলে তো মৃত্যুই।

    যাকে আর পাবার আশা নেই, সে মৃত ছাড়া আর কী? খোঁজটা আত্মমর্যাদা। নিশ্চেষ্ট থাকাটা নিজের কাছে নিজেকে ছোট করা। নিজের কাছে, সংসারের কাছে, আর বাড়িতে এসে পড়া ওই অতিথিটির কাছেও সম্ভ্রম বজায় রাখতে বহুদিনই চলল ব্যর্থ চেষ্টার পুনরাবৃত্তি।

    সেই চেষ্টায় অংশগ্রহণ করেছে মালবিকাও।

    মালবিকা কাগজের অফিসে গিয়েছে, মালবিকা মৃণালের সঙ্গে পুলিশ-অফিসে গিয়েছে।

    লীলাবতী বলেছেন, ওই মন-ভাঙা ছেলে একা যায়, আর আরও মন ভেঙে বাড়ি ফেরে। এমন একটা কেউ নেই যে সঙ্গে সঙ্গে যায়। আমার ইচ্ছে করেই ওর সঙ্গে।

    তখন মালবিকা বলেছে, আমি তত বেকার বসে আছি, যেতে পারি।

    এতে কেউ আশ্চর্য হয়নি। কারণ, এ যুগে মেয়েতে ছেলেতে কাজের পার্থক্য নেই। লীলাবতীর যুগ নয় যে, ইচ্ছে নিয়ে ঘরের খাঁচায় পাখা ঝাঁপটাবে বসে বসে। এ যুগে মেয়ে যে মেয়ে, সেটা প্রমাণ হয় শুধু লুঠের সময়। রাবণের আমল থেকে এ ঐতিহ্যটা অব্যাহত আছে কিনা!

    মালবিকা বলেছিল, যেতে পারি।

    যেত। প্রায়ই যেত।

    সেই একত্র যাওয়া-আসার সূত্রেই হয়তো অলক্ষ্যে একটি বন্ধন-সূত্র রচিত হতে থাকল। চাঁদের মা বুড়ি অবিরাম চরকা চালিয়ে যে সুতো বাতাসে উড়িয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়, সেই সুতোই তো ওই। বন্ধনের কাজে লাগে।

    বাঁধা যে পড়েছে, এ আর কারও অবিদিত থাকছে না। আর অবিদিত থাকছে না বলেই যেন সাহসটা যাচ্ছে বেড়ে, অধিকারবোধটা আসছে সহজে।

    এখন মৃণাল অনায়াসেই বলতে পারছে, লাইট-হাউসে একটা ভাল ছবি এসেছে, চলো না দেখে আসা যাক।

    তুমিই চলছে। লীলাবতীই বলে বলে ভয় ভাঙিয়েছেন। বলেছেন, হ্যাঁ রে, আমি মেয়ে বলি, আর তুই ওকে আপনি-আজ্ঞে করিস?

    তখন মৃণাল উত্তর এড়িয়েছে। বলেছে, ভালই তো! মান্য-ভক্তি করি তোমার মেয়েকে।

    থাম বাপু! না না, তুমি বলবি। বাড়ির মধ্যে ঘরের মেয়েকে আপনি-আপনি করিস, শুনতে ভাল লাগে না।

    মৃণাল হাসত। মালবিকাকে উদ্দেশ করে বলত, এই শুনুন। মাতৃদেবীর আদেশ পালনার্থে আপনাকে তুমি বলতে হবে।

    মালবিকা হাসত, ভালই তো।

    এখন তো বলছেন ভাল। এরপর হয়তো মান্য-ভক্তি কমে যাচ্ছে ভেবে রাগ হবে।

    রাগতে দেখলে আবার না হয় আপনি ধরবেন।

    এইভাবেই সহজ হওয়া। তুমিতে নেমে আসা।

    তারপর নিত্যদিনের সাহচর্যে, কখনও চকিত একটু হাসির মধ্যে, কখনও গভীর একটু চাওয়ার মধ্যে, কখনও বেদনার মধ্যে সেই সহজ এসে দিয়েছে ধরা।

    ক্রমশ বলা যাচ্ছে, লাইট-হাউসে একটা ভাল ছবি এসেছে, চলোনা, দেখে আসা যাক।বলা যাচ্ছে, এই, তুমি যে কী বইয়ের কথা বলছিলে সেদিন, চলো না কিনে আনা যাক।

    মালবিকা যদি বলে, বই লাইব্রেরি থেকে এনে পড়ে নিলেই চলবে, মৃণাল তাকে ভাল বই কাছে রাখা সম্পর্কে যুক্তি দেখায়।

    মালবিকা যদি বলে, থাক না, ছবি দেখে আর কী হবে, মৃণাল ছবিটার পাবলিসিটিতে পঞ্চমুখ হয়।

    প্রথম প্রথম যখন সংসারের গুমোটটা হালকা হয়ে এসেছে, যখন চক্ষুলজ্জাটা কেটে আসছে, তখন মৃণাল বলত, মা, সন্ধ্যাটা তো তোমরা বাড়ি বসে কাটাও দেখি, একটা ছবি-টবি দেখে এলে পারো। যাবে তো বলো।

    লীলাবতীরও এ ইচ্ছে হয়েছে কখনও।

    নিজের জন্যে না হোক, মালবিকার জন্যে। কিন্তু চক্ষুলজ্জায় তুলতে পারেন না এ কথা। জ্যোতি যে সিনেমা-পাগল ছিল!

    কিন্তু আরও অনেক জিনিসের মতো এতেও চক্ষুলজ্জা কাটানোয় মৃণালই সাহায্য করেছে। জ্যোতির বইয়ের আলমারির চাবি মালবিকার হাতে পড়েছে মৃণালের হাত থেকেই।

    .

    ৩৩.

    তা, প্রথম প্রথম লীলাবতীর সঙ্গে।

    কিন্তু ওদের যে ইংরেজি ছবিতে মন।

    লীলাবতী বলেন, ও বাপু তোরাই যা। আমি বুঝি-সুঝি না।

    ভক্তিভূষণ মাঝে মাঝে এ ব্যবস্থায় প্রশ্ন তুলেছেন, লীলাবতী বলেছেন, তাতে আর কী হয়েছে? আজকাল কি আর ওসব শুচিবাইপনা আছে?

    লীলাবতী তো বলবেনই। তিনি যে একটি গোপন ইচ্ছে লালন করছেন মনে মনে।

    ভাবতে কষ্ট হচ্ছে, বুকের মধ্যেটা মোচড় দিয়ে উঠছে, তবু ভাবছেন। ভাবছেন, সে তো আর আসবে না, ছেলেটা তবে সারাটা জীবন কাটাবে কী নিয়ে?

    ভাবছেন, দ্বিতীয় পক্ষের বিয়ের নজির কি নেই?

    এমনিতেই তো আত্মীয়-স্বজন সকলেই বলছে, এই বয়েস, একটা বাচ্চাকাচ্চা পর্যন্ত নেই, ছেলের আবার বিয়ে দিচ্ছ না কেন?

    লীলাবতী তখন পৃষ্ঠবল পাচ্ছেন।

    .

    ৩৪.

    কিন্তু মালবিকা? তার কি চক্ষুলজ্জার বালাই নেই?

    সে একদিন ঝড়ের মুখে ছেঁড়া পাতার মতো উড়ে এসে জুড়ে তো বসেছে অনেকখানি। আবার রাজসিংহাসনেও বসতে চায়?

    সে কি এ বাড়িতে জ্যোতির সাম্রাজ্যের চিহ্ন দেখেনি? কোনও কোনও নির্জন মুহূর্তে বিষাদস্তব্ধ মৃণালের অনন্ত আকাশে হারিয়ে যাওয়া মুখ দেখেনি? দেখেনি জ্যোতির ভালবাসা-ভরা আর সুখে ভরা জীবনের অজস্র খুঁটিনাটির সঞ্চয়?

    লীলাবতী কেঁদে কেঁদে বলেছেন, একটু ঝেড়ে-ঝুড়ে রাখো মা, যদি কখনও আসে। এইসব তুচ্ছ জিনিসে কী আগ্রহ ছিল তার!

    বলেছেন অবশ্য সেই অনেকদিন আগে। এখন আর বলেন না।

    এখন অবিরতই বলেন, জানতেই পারছি সে আর নেই। থাকলে কোনওমতে একছত্র চিঠিও কি দিত না? আমরা না হয় তার ঠিকানা জানি না, সে তো আমাদের ঠিকানা জানে!

    এখন আর বলেন না, কিন্তু যখন বলতেন, রাখত মালবিকা তার জিনিস ঝেড়ে-ঝুড়ে। এখনও রাখে নিজে থেকে। আলমারি-ভর্তি জামাকাপড়, বাক্স-ভর্তি পুঁতির মালা, কৌটো-ভর্তি কাচের চুড়ি।…

    আর–অবিরতই তো ঝাড়ছে জ্যোতির ছবি, জ্যোতির খেলনা পুতুল, জ্যোতির বইয়ের সংগ্রহ। এইসবের অধিকারিণী হয়ে বসতে লজ্জা হবে না তার? আর লজ্জা হবে না জ্যোতির বরকে নিয়ে নিতে?

    .

    ৩৫.

    তা, লজ্জা নেই বলা যায় কী করে?

    সেদিন মৃণাল ওর মুখোমুখি বসে ছিল। আর ওর একটা হাত চেপে ধরে বলে উঠেছিল, এত ভার নিতে পেরেছ, আমার ভারটাও নাও এবার। আর বইতে পারা যাচ্ছে না।

    পার্কের বেঞ্চে বসে ছিল দুজনে, সন্ধ্যা নেমে আসছিল পৃথিবীতে। সেই সন্ধ্যার চোখে তাকিয়ে ছিল মালবিকা।

    বলেছিল, লজ্জা বলে একটা শব্দ কি নেই জগতে?

    আমার জগতে অন্তত আর নেই মালবিকা,বলেছিল মৃণাল, আমি এবার হার মেনেছি।

    কিন্তু আমি যে হার মানতে রাজি নই, আমার লজ্জা আছে।

    তবু আমার অবস্থা ভাবো মালবিকা, আমি একটা রক্ত-মাংসের মানুষ, শুধু ছায়া নিয়ে আর কতদিন টিকে থাকব? আমাকে তো বাঁচতে হবে!

    .

    ৩৬.

    বাঁচতে হবে!

    জগতের পরমতম এবং চরমতম কথা। বাঁচতে হবে। বাঁচতে হবে।

    নিখিল বিশ্বের অণুপরমাণুটি পর্যন্ত এই কথাই বলে চলেছে। বাঁচতে হবে।

    মৃণালকেই বা তবে লজ্জাহীন বলা চলে কী করে?

    মৃণাল শুধু সেই চিরকালীন কথাটাই বলেছে। আর বাঁচতে হবে বলেই বলেছে, মালবিকা, তুমি আমার ভার নাও। আমি আর পারছি না।

    মালবিকা আস্তে ওর হাতে হাত রেখে বলেছে, আমি যদি না আসতাম, আমি যদি নির্লজ্জের মতো, লোভীর মতো এখানে পড়ে না থাকতাম, হয়তো ওই ছায়া নিয়েই বেঁচে থাকতে পারতে তুমি!

    সেটা আত্ম-প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু হত না।

    এখন তাই ভাবছ, তখন হয়তো তা ভাবতে না। ওই ছায়াই তোমার জীবনে চিরসত্য হয়ে থাকত।

    কী হলে কী হত, সে কথা আর ভাবা যাচ্ছে না মালবিকা, এখন আমি জেনেছি মৃত্যুর চেয়ে জীবন অনেক বড়।

    মৃত্যু মহান, মৃত্যু পবিত্র!

    জীবন সুন্দর, জীবন ঐশ্বর্যময়!

    কিন্তু বেশ তো চলে যাচ্ছে।

    একে বেশ চলা বলে না মালবিকা! এই বেশ ভাবাটাও আত্মপ্রবঞ্চনা।

    আমার ভয় করে। মনে হয় অন্যায় করছি।

    ভয়ের কিছু নেই মালবিকা! সত্যকে স্বীকার করাই সততা।

    আমি যদি চলে যাই, হয়তো আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

    সব ঠিক হয়ে যাবে? মৃণাল ওর হাতটা চেপে ধরে বলেছে, সেই ঠিকটা কী তুমি তা বলতে পারো? তুমি চলে গেলে জ্যোতি ফিরে আসবে?

    মালবিকা মাথা নিচু করেছে।

    তারপর আবার বলেছে, তা নয়। তবু তুমি হয়তো তোমার আসল মনকে ফিরে পাবে। এখন একটা ঝোঁকে পড়ে–

    তিলে তিলে নিজেকে যাচাই করেছি মালবিকা! অহরহ অনন্ত শূন্যতায় মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে দেখেছি। আমার বাইরের চেহারাটাই দেখতে পেয়েছ, আমার ভিতরের যুদ্ধের চেহারাটা দেখতে পাওনি। কিন্তু আমি যুদ্ধে জয়ী হতে পারিনি।

    পরাজয় তো লজ্জার।

    পরাজয় স্বীকার করাটা গৌরবের।

    লোকে কী বলবে?

    লোক? লোকে কী বলবে? সেটাও ভেবেছি বইকী! লোকভয়েই তো আজকের পরিস্থিতির উদ্ভব।..কিন্তু এখন যদি শুধু এইভাবে বেশ আছি বলে কাটিয়ে দিতে যাই, লোকে সহ্য করবে না। লোকে আরও অনেক কিছু বলবে। তার চাইতে যা স্বাভাবিক, যা বাস্তব, তাই ধরে দেওয়া ভাল তাদের সামনে।

    মালবিকা অনেকক্ষণ কথা বলেনি। তারপর ক্ষুব্ধ হাসি হেসে বলেছে, লোকে হয়তো বলবে–বিয়ে না করে উপায় ছিল না বলেই নিশ্চয়

    মৃণাল ওর ধরে-থাকা হাতটায় চাপ দিয়ে বলেছে, তা যদি বলে, সেটা ভুল বলবেনা। সত্যিই আমার আর উপায় থাকছে না। অবিরতই এই অদ্ভুত অবস্থাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রবল হয়ে উঠছে আমার মধ্যে।

    মাকে তুমি বলবে কোন মুখে?

    মুখে বলতে হবে না। আমার মুখেই সে কথা লেখা হয়ে চলেছে। সে লেখা পড়বার বিদ্যে মার আছে।

    বাবা তা হলে আমার মুখ দেখবেন না।

    সময়ে সবই হয়ে যাবে। মানুষ অবস্থার দাস।

    আর যদি কোনওদিন তিনি

    সে কল্পনা আর করি না মালবিকা! সব কিছুই বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করতে হয়।

    আমার মনে হয় এত সুখ আমার কপালে সইবে না।

    চুপ করো। ওই সব কথা বোলো না। মেয়ে জাতটারই দেখছি অকারণ অমঙ্গল চিন্তা করা স্বভাব। ওতে অমঙ্গলকে ডেকেই আনা হয়।

    তা হলে তুমিও মেয়েদের মতো ওইসবে বিশ্বাসী।

    বিশ্বাসী কিনা জানি না। তবু ও আমার ভাল লাগে না। আমরা পরস্পরকে চাই এ কথা আর অস্বীকার করবার জো নেই, তা তুমিও জানো আমিও জানি। তবে মিথ্যে কেন মরুভূমি সৃষ্টি করে বসে থাকব বলতে পারো?

    তোমার কাছে কথায় কে পারবে?

    বলে মৃদু হাসির মুখ নিয়ে তাকিয়ে থেকেছে মালবিকা।

    মৃণাল বলেছে, আমি যে রক্তমাংসের মানুষ এ কথা স্বীকার করতে পেরে আমি বেঁচেছি। বিবেকের হাত থেকে রেহাই পেয়েছি। আর ভীরুতা আমার স্বর্গীয় প্রেমের ছদ্মবেশ নিয়ে বসে থাকবে, এ অসহ্য!

    কোনটা যে কী তা এখনই ঠিক বুঝতে পারছ?

    পারছি বইকী! প্রতিনিয়ত পারছি।

    দিনের পর দিন এমনি কথা গেঁথে গেঁথে চলেছে মাল্য রচনা।

    তারপর একদিন মালবিকাকে বলতেই হয়েছে, নাঃ, লজ্জা শরম আর রাখতে দিলে না তুমি আমার।

    .

    ৩৭.

    লীলাবতীর চোখে জলের কণা ভাসছে, কিন্তু লীলাবতী আহ্লাদে ভাসছেন। আশা করেননি এ দিন আসবে তাঁর। আশা করেননি আবার তিনি সংসার পাবেন, আবার তাঁর মৃণাল জোড়া-গাঁথা হবে।

    তা ছাড়া–দেখছেন তো! বুঝছেন তো, মেয়েটা মৃণালের জন্যে মরছে।

    মৃণাল হেঁটে যায় তো ওর বুকে বাজে। মৃণাল কথা কয়, ও চেয়ে থাকে। আর ক্রমশই তো দুজনে দুজনের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

    তবে আর দ্বিধা কীসের?

    দিন একটা দেখাও এবার। স্বামীর কাছে এসে বললেন লীলাবতী।

    ভক্তিভূষণ শুকনো গলায় বললেন, দিন দেখাদেখির কী আছে? আজকাল যা বিয়ে হচ্ছে, সেই বিয়েই হোক।

    কেন, আমাদের দিশি বিয়ে হবে না?লীলাবতী ক্ষুণ্ণ হন।

    ভক্তিভূষণ বলেন, তোমার দিশি বিয়েতে সম্প্রদানকর্তা নামের একটা লোক লাগে। তাকে পাচ্ছি কোথায়?

    ওর তো কাকা আছে?

    দোহাই তোমার! সেই কাকাকে পায়ে ধরে নিয়ে আসতে হুকুম কোরো না আমায়।

    লীলাবতী তীক্ষ্ণ গলায় বলেছেন, তোমার কি এ বিয়েতে মত নেই?

    তা তো বলিনি–ভক্তিভূষণ বলেছেন, আমি শুধু বলেছি যেটা শোভন, সেটাই ভাল।

    .

    ৩৮.

    মালবিকাও তাই বলে, দোহাই মা, বেনারসি কিনতে বোসোনা আমার জন্যে, যেটা শোভন সেটাই ভাল।

    আর দুজনে মিলে ননাটিস দিতে যাবার দিন সেই শোভন সাজই সাজতে বসেছে মালবিকা।

    শুধু চোখে-মুখে একটু প্রসাধনের ছোঁয়া, শুধু একখানি নতুন তাঁতের শাড়ি। আর কিছু না।

    মৃণাল এসে দরজায় দাঁড়ায়। বলে, হল?

    বাঃ, এক্ষুনি হবে? সাজব না?

    তবু ভাল, তোমার মুখে শুনলাম একটা নতুন কথা। সেজো, সেই দিন খুব করে সেজো। আজ দেরি হয়ে যাচ্ছে।

    মালবিকা আলোকোজ্জ্বল মুখে বেরিয়ে এল। লীলাবতীকে প্রণাম করল।

    ভক্তিভূষণের সামনে যেতে লজ্জা করছে। আজ আর যাবে না, একেবারে সেই দিন যাবে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। ভাবল, আকাশে কত সোনা! তবু দরজা থেকে বেরিয়ে থমকে দাঁড়াল মালবিকা। বলল, লেটার বক্সে চিঠি এসে পড়ে রয়েছে, খামের চিঠি।

    বটুয়া থেকে ছোট্ট তালার চাবিটা বার করল।

    মৃণাল অসহিষ্ণু হচ্ছিল। বলল, ফিরে এসে বার করলেই হবে, দেরি হয়ে গেছে।

    আহা, এতে আর কত সময় যাচ্ছে–

    চাবিটা খুলল। বলল, খুব দরকারি চিঠিও তো হতে পারে।

    তারপর বার করল। একটা ইলেকট্রিক বিল, মৃণালের ক্লাবের কী একটা ফাংশনের কার্ড, আর একখানা ইনল্যান্ড লেটার।

    সেটা হাতে করে স্তব্ধ হয়ে গেল মালবিকা। শূন্য সাদা চোখে তাকিয়ে চিঠিসুদ্ধ হাতটা বাড়িয়ে দিল মৃণালের দিকে। এ অক্ষর তার অপরিচিত নয়। এ বাড়ির সর্বত্র ছড়ানো দেখেছে এই অক্ষর। গানের খাতায়, ডায়েরির খাতায়, ধোবার খাতায়, গয়লার খাতায়।

    .

    ৩৯.

    অনন্তকাল পার হয়ে গেল।

    তেমনি শূন্য সাদা চোখে তাকিয়ে রইল দুজনে পরস্পরের মুখের দিকে।

    অনেকক্ষণ পরে শতাব্দীর ঘুম ভেঙে মালবিকা বলল, খুলে দেখো। হয়তো খুব দরকারি। দরকারি। সত্যিই দরকারি। কিন্তু সেটা কার?

    .

    ৪০.

    কার? কার চিঠি? অনেকদিন পরে আবার গলা ভাঙল লীলাবতীর। বললেন, কী লিখেছে?

    মৃণাল খোলা চিঠিটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিল।

    লীলাবতী বললেন, আমি পড়তে চাই না। তোমরাই পড়ো।লীলাবতীর গলাটা কর্কশ শোনাল। ভক্তিভূষণ আস্তে তুলে নিলেন চিঠিটা, নিরুচ্চারে পড়লেন :

    শ্রীচরণকমলেষু,
    প্রেতলোক থেকে উঠে এসে এই চিঠি লিখছি। কত বছর হল? তিন বছর না? তিন বছরে তিনশো বছরের ইতিহাস উঠেছে জমে।

    কিন্তু সে যাক, কোনওমতে আবার কলকাতায় এসেছি। বড্ড ইচ্ছে করছে একবার দেখি। সেটা সম্ভব করা কি একেবারেই অসম্ভব? যদি অসম্ভব হয় তো থাক। যদি সম্ভব হয়, সোমবার বিকেল পাঁচটার সময় একবার কলেজ স্ট্রিটে আমাদের সেই পুরনো বইয়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে।

    ভয় নেই, তিনশো বছরের ইতিহাস শোনাতে বসব না, শুধু দূর থেকে একবার দেখব। প্রণাম নিয়ো। ইতি–
    জ্যোতি।

    আমাদের সেই বইয়ের দোকানের সামনে লিখে আবার আমাদেরটা কেটেছে। শুধু সেই বইয়ের দোকানের উল্লেখটা রেখেছে।

    ভক্তিভূষণ চিঠিখানা আবার ছেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে অস্ফুটে বলেন, সোমবার মানে আজ।

    তারপর দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলেন, এখন চারটে দশ।

    মৃণাল কারও দিকে না তাকিয়ে যেন বাতাসকে বলল, যাচ্ছি।

    যাচ্ছিস? হঠাৎ যেন ছিটকে উঠলেন লীলাবতী। তেমনি ভাঙা কর্কশ গলায় বলে উঠলেন, কোথায় যাচ্ছিস? কোথাও যাবি না। মনে কর এ চিঠি পাসনি তুই।

    মৃণাল তবু যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে বলল, ওকে নিয়ে আসছি।

    লীলাবতী বসে পড়লেন। বললেন, ওকে নিয়ে আসছিস?

    মৃণালের প্রেতাত্মার গলা বলল, আসছি বইকী!

    তাকে তুই গ্রহণ করবি? কত তুচ্ছয় বউকে ত্যাগ করে লোকে—

    মৃণাল দাঁড়াল। মার চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল, যাকে রক্ষা করতে পারিনি, তাকে ত্যাগ করব কোন মুখে?

    তা বলে সেই অশুচি অপবিত্রকে লীলাবতী কেঁদে ফেললেন, শত্রু, মহাশত্রু আমার! বারেবারে কেবল আমার ঘর ভাঙছে। ওকে এনে কী করবি? ওর হাতে আমি জল খাব?

    খাবার জন্যে তোমায় জোর করবনা মা! মৃণাল মুখ ফেরায়। আবার পা বাড়ায়। এখানে আর কেউ আছে, দেখতে পায় না যেন।

    চলে যাচ্ছে। আনতে যাচ্ছে এ সংসারের অধিকারিণীকে।

    লীলাবতী ফেটে পড়েন, আর এর কী হবে? এই পোড়াকপালীর? ধর্মজ্ঞানী মহাপুরুষ, বলে যা সে কথা?

    এতক্ষণ পরে নাটকের নীরব দর্শক মালবিকা এখন হঠাৎ একটু হেসে ফেলে কথা বলে ওঠে, কী মুশকিল, সেটা আবার একটা ভাবনা নাকি? বিশেষণটা তো মা দিয়েই দিলেন।

    মৃণালের দিকে এগিয়ে যায় একটু, বলে, এই, তুমি নিশ্চয় ট্যাক্সি নেবে? দেরি হয়ে গেছে। ওদিকেই তো শেয়ালদা? আমাকে আমার সেই বান্ধবীর হোস্টেলে একটু নামিয়ে দিয়ে যেতে পারবে না?

    প্রায় সহজ শোনাল ওর গলা। যেন মাত্র একটু বেড়াতে এসেছিল। যেন ট্যাক্সিতে ওই নামিয়ে দেওয়াটা খুবই সাধারণ ঘটনা।

    মৃণাল ওই প্রায়-হাসির আভাস লাগানো মুখটার দিকে কয়েক সেকেন্ড নির্নিমেষে তাকিয়ে থেকে বলল, চলো।

    ⤶
    1 2 3 4
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদশটি উপন্যাস – আশাপূর্ণা দেবী
    Next Article লোহার গরাদের ছায়া

    Related Articles

    আশাপূর্ণা দেবী

    বিবাগী পাখি – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    কুমিরের হাঁ – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    ঠিকানা – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    ততোধিক – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    ১. খবরটা এনেছিল মাধব

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    নতুন প্রহসন – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Our Picks

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }