সোমনাথ সুন্দরী – ১০
১০
মরু প্রদেশে কিছু সময় আগে সূর্যাস্ত হয়েছে। সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্তে আকাশের লাল রঙ আর কাফেরদের রক্ত স্রোতে লাল হয়ে যাওয়া মাটি যেন মিলে মিশে এক হয়ে গেছিল। না, তাঁর নির্দেশ পালনে কোনও গাফিলতি করেনি একজন জিহাদিও।
হ্যাঁ, তারা জিহাদি। ইসলামকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধ করছে তারা। জিহাদ হল যারা ইসলামকে কবুল করে না, অন্য কারো উপাসনা করে, পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ক্ষমাহীন যুদ্ধ। হ্যাঁ, গজনী থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা তিরিশ হাজার নিয়মিত সৈনিক আর মামুদ সুলতানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিন্দু মুলুকে এসে উপস্থিত তারা সবাই এ কথাই বিশ্বাস করে।
মামুদ বাহিনীর বিরুদ্ধে আজ একটা প্রতিরোধ হয়েছিল। নগরীতে প্রবেশের সময় কয়েকজন রাজপুত সামন্তরাজাদের সম্মিলিত বাহিনীর প্রতিরোধ। ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি তুলে সমুদ্র সমান আরব বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল মুর্খ কাফেরের দল। কিন্তু সূর্য মধ্য গগনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই সেই হিন্দ বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে শুধু জেহাদি স্বেচ্ছা সেবকরাই।
সুলতান মামুদের নিয়মিত সেনাদলকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সুলতান নিজেও তাঁর তাবু ছেড়ে বাইরে বেরোননি। শুধুমাত্র যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে খবর নিয়েছেন আর প্রয়োজন বোধে নির্দেশ পাঠিয়েছেন জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্দেশ্যে। তেমনই তাঁর এক নির্দেশ ছিল নগরীর কোনও পুরুষকে জীবিত রাখা যাবে না।
যুদ্ধে সক্ষম যে রাজপুত পুরুষরা অস্ত্র ধরেছিল তাদের সংখ্যা ছিল দশ সহস্রর মতো। তারা কেউ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অস্ত্রত্যাগ করেনি মামুদ বাহিনীর সামনে। তারপর ঘোড়ার খুড়ের আঘাতে তাদের ছিন্ন মুণ্ডগুলোকে অপসারিত করে ‘তকবীর’ ধ্বনি দিতে দিতে আজমের নগরীতে প্রবেশ করে।
মামুদ গজনভীর নির্দেশ মেনে নগরীর প্রতিষ্ঠা গৃহে, প্রাসাদে হানা দিয়েছে তারা। তলোয়ারের আঘাতে ছিন্ন করেছে অশক্ত বৃদ্ধদের কণ্ঠনালি। দৃষ্টিহীন বা খঞ্জ কোনও পুরুষই মুক্তি পায়নি আরব তলোয়ারের ফলা থেকে। পুরুষ শিশুদের বর্শার ফলায় বিদ্ধ করে সে দেহকে বিজয় পতাকার মতো উঁচিয়ে ধরে ঘোড়া ছুটিয়েছে স্বেচ্ছাসেবকের দল। কখনও বা বালকদের দু-পা রজ্জুবদ্ধ করা হয়েছে দুটো আরবি ঘোড়ার সঙ্গে। তারপর দুটো ঘোড়াকে দু-দিকে ছুটিয়ে হতভাগ্য বালকদের শরীর দ্বিখণ্ডিত করার খেলাতে মেতেছে আরব বাহিনী।
সুলতানের নির্দেশ কাফের পুরুষ মাত্রই তাকে বধ করতে হবে। ঠিক যেমন তিন শতাব্দী পূর্বে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের সময় রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিন কাশেমকে, আরব শাসক হাজ্জাজ নির্দেশ দিয়েছিলেন যে রাজা দাহিরের সিন্ধ নগরীতে একজন পুরুষও জীবিত না থাকে। এবারের হিন্দু অভিযানে তাঁর পূর্বসুরীর ভাবনাকেই অনুসরণ করছেন মামুদ গজনভী।
আজমের দুর্গ নগরীর পরিধি খুব বৃহৎ নয়। সেখানে খুব বেশি ধনসম্পদ পাবার কথা নয়। তা পাওয়া যায়নি। শুধু একটা মন্দিরে সোনার তৈরি একটা নারীমূর্তি পাওয়া গেছে। পৌত্তলিক কাফেরদের সেই মূর্তিকে গলিয়ে সোনার তালে পরিণত করা হচ্ছে। তবে বেশ কিছু নারীকে নগরী থেকে বন্দি করে আনা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা অধিকাংশই সদ্য যুবক। ওই নারীদের দিয়ে শরীরের তৃষ্ণা নিবারণ করবে জিহাদি তরুণরা।
সুলতানের শিবির নগর প্রাকারের মধ্যে স্থাপিত। বলতে গেলে কয়েক যোজন ব্যাপী তার পরিধি। সৈনিক, জিহাদি স্বেচ্ছাসেবক অন্যান্য খিদমদগার-সহ জনসংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজারের কাছে। সঙ্গে আছে পাঁচ হাজার আরবি ঘোড়া ও তিরিশ হাজার জল ও পণ্যবাহী উটের কাফেলা। বিশাল সমারোহ।
সুলতানের শিবির থেকে কিছুটা উচ্চস্থানে আজমের নগরীর অবস্থান। হত্যালীলা ও লুণ্ঠন কার্য সমাপ্ত করে নগরী ত্যাগ করার আগে নগরীতে অগ্নিসংযোগ করেছে আল্লার উপাসকরা। বিশেষত বড় প্রাসাদ আর নিশ্চিত ভাবেই পৌত্তলিকতার আধার কাফেরদের উপাসনা গৃহগুলোতে। নগরীতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সে আগুন।
পাথর আর কাঠের তৈরি স্থাপত্যগুলোর ধসে পড়ার শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে আসছে সেখান থেকে। জ্বলন্ত নগরীর লেলিহান অগ্নিশিখার আলোকে বহু দূর পর্যন্ত দৃশ্যমান সুলতানের শিবির। যতদূর চোখ যায় শুধু সার-সার তাঁবু আর উট, অশ্বের সমারোহ।
নানা ধরনের শব্দ ভেসে আসছে নানা জায়গা থেকে। ঘোড়ার পা ঠোকা, লেজ ঝাপটানোর শব্দ, উষ্ট্র বাহিনীর অদ্ভুত ডাক, লুণ্ঠিত নারীদের নিয়ে যুবক স্বেচ্ছাসেবকদের হুল্লোড়ের শব্দ, আবার কখনও বা সেই শব্দর মাঝে ক্ষণিকের কোনও ধর্ষিতা নারীর আর্তনাদ। মাঝে-মাঝে বৃত্তাকারে ঘেরা তাঁবুর মাঝখানে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে ঝলসানো হচ্ছে ভেড়ার মাংস, গো-মাংস। অথবা জালার মতো বিশাল বিশাল পাত্রে আহার প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট তাঁবুগুলোর মাঝখানে অবস্থান করছে আকারে বেশ বড় একটা তাঁবু। রক্ষী পরিবৃত সেই তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুগুলো যেন কিছুটা সম্ভ্রমের দূরত্ব প্রদর্শন করছে। তবে সেই তাঁবুর বাইরে কোনও উচ্ছ্বাস বা উল্লাসের শব্দ নেই। সে সব শব্দ যেন হঠাৎই এই তাঁবুর কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। মরুভূমিতে ঠান্ডা নামতে শুরু করেছে, কিন্তু তার চেয়েও এক নৈশব্দের, সম্ভ্রমের হয়তো বা আতঙ্কের শীতলতা এই বিশেষ তাঁবুকে ঘিরে বিদ্যমান। এ তাঁবুতে অবস্থান করছেন স্বয়ং সুলতান।
বিশাল তাঁবুর ভিতর পর্দার আচ্ছাদন দেওয়া বেশ কয়েকটা কক্ষ আছে সুলতানের নানা কাজে ব্যবহারের জন্য। তারই একটাতে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যস্ত সুলতান মামুদ গজনীও। মশাল দণ্ডে মশাল জ্বলছে। তার আলোকে আলোকিত তাঁবুর ভিতর কক্ষর মতো সেই স্থান।
মেঝেতে দুর্মূল্য গালিচা পাতা, ধূপদানিতে ধূপ জ্বলছে। তার একপ্রান্তে মাথা সমেত এক ব্যাঘ্র চর্মের ওপর তাকিয়াতে ঠেস দিয়ে বসে আছেন জিহাদের মূর্ত প্রতীক মামুদ শাহ। দীর্ঘকায় কঠিন পুরুষালি চেহারা, আজানুলম্বিত শ্মশ্রু মণ্ডিত মুখমণ্ডলের অধিকারী তিনি।
পরনে সোনার সুতো আর জরি বোনা, কোমরবন্ধ সমন্বিত দীর্ঘ ঝুলের পোশাক, মাথায় তাজ আর কণ্ঠহারের দুর্মুল্য পাথরগুলো ঝিলিক দিচ্ছে মশালের আলোতে। তাঁর পাশে শোয়ানো আছে তাঁর দীর্ঘ তরবারি। যে তরবারি শপথ নিয়েছে এই হিন্দু ভূমিতে পৌত্তলিকতার ভাবনাকে বিনাশ করে ইসলামের পতাকাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার।
আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করা, কেয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চালিয়ে যাওয়া তার পবিত্র কর্তব্য। এই তরবারিকে সঙ্গী করে সুলতান ইতিপূর্বে পনেরো বার হানা দিয়েছেন কাফেরদের ভূখণ্ডে। বিশাল এই ভূখণ্ডের পূর্ব সীমা বিস্তৃত গান্ধার থেকে কনৌজ, পশ্চিমে মাকরান, দক্ষিণে সমুদ্রোপকূল এবং দেবল আর উত্তরে কান্দাহার, সিস্তান, কুজদান পর্বতমালা পর্যন্ত।
ঝিলম-পঞ্চনদের তীরবর্তী ভূখণ্ড আর এই রাজপুত ভূমিও হিন্দের অন্তর্গত। সুলতান ইতিপূর্বে যে পনেরো বার হিন্দ আক্রমণ করেছেন প্রতিবারই তিনি ধ্বংস করেছেন অসংখ্য নগরী। লুণ্ঠন করেছেন অপরিমিত সম্পদ। যে সব নর-নারী-শিশুকে ক্রীতদাস হিসাবে আরব মুলুকে নিয়ে গেছেন, ধর্মান্তরিত করেছেন, তাদের সংখ্যাই আনুমানিক পাঁচ লক্ষ!
তবে পূর্ববর্তী সে সব অভিযানের থেকে এ অভিযান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মামুদ গজনীভের কাছে। কারণ, তার সে সব অভিযান ছিল মূলত সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য। আর এবারের অভিযান সুলতানের কাছে অনেক বেশি দায়িত্বের, অনেক বেশি সহজ।
এ অভিযান হচ্ছে জিহাদ। কাফেরদের পৌত্তলিকতাকে উৎপাটিত করে, শোণিত প্রবাহে মসৃণ করতে হবে খলিফার নির্দেশিত পথ। যে কারণে জিহাদের অভিযান শুরুর পূর্ব মুহূর্ত থেকে, স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করা, সেনাদল নির্বাচন, রসদ সংগ্রহ, যাত্রাপথ নির্ধারণ সব ব্যাপারেই অনেক বেশি সতর্ক এবং কৌশলী যুদ্ধবাজ আরব মামুদ। তীব্র আঘাত হানতে হবে হিন্দের মর্মস্থলে।
বিশাল একটা মহিষচর্ম রাখা আছে সুলতানের সামনের ভূমিতে। তাতে আঁকা আছে তাদের যাত্রা পথের মানচিত্র। বেশ কয়েকজন লোক সুলতানের প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করে হাঁটু মুড়ে বসে আছে সেই মানচিত্র ঘিরে। তাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি ব্যাতীত অন্য সবাই জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বী, গজনীর বাসিন্দা ও সুলতানের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর জিহাদি। একজন যে জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বী নয় তাকে সুলতান হিন্দ ভূখণ্ডে তার ত্রয়োদশ অভিযানের সময় কনৌজ থেকে গজনীতে ক্রীতদাস হিসাবে নিয়ে গেছিলেন।
এক সময় এ লোকটা হিন্দ ভূখণ্ডের বহু স্থানে ঘুরেছে একজন মণিকর হিসাবে। দুর্মূল্য পাথরের ব্যাপারে ও হিন্দু ভূখণ্ডের পথঘাটের ব্যাপারে তার জ্ঞান থাকায়, সর্বোপরি সে গজনী যাবার পর ইসলাম কবুল করাতে সুলতান তাকে পার্শ্বচর নিয়োগ করেছেন। ইসলাম কবুল করার পর তার বর্তমান নাম কাসিম। চান্দেল রাজার বিরুদ্ধে সুলতানের চতুর্দশ হিন্দ অভিযানে পথ চেনাবার ব্যাপারে যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে সুলতানের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছে কাসিম।
সুলতান তাকালেন কাসিমের দিকে। কাসিম ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে মানচিত্রের ওপর অঙ্গুলি স্থাপন করে তা সুলতানকে দেখাতে দেখাতে বলল, ‘এই হল আজমের। এই স্থানে বর্তমানে সুলতান অবস্থান করছেন। এরপর এই পথ ধরে সেই স্থানের দিকে অগ্রসর হব আমরা। আবারও বেশ কিছুটা পথ মরুভূমির মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করতে হবে আমাদের। মাঝে মাঝে কিছু ছোট অরণ্য আর জলপদও অবশ্য পড়বে। তারপর আমরা গিয়ে উপস্থিত হব কচ্ছদেশের প্রান্ত ভাগে মধেরা নগরীতে। এখানে হিন্দুদের সূর্যদেবতার বিরাট এক মন্দির আছে।’
সুলতান প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কখনও গেছ সে নগরীতে? সে নগরীর জনসংখ্যা কতো? সৈন্য সংখ্যা কত?’
কাসিম জবাব দিল ‘হ্যাঁ, মালিক। আমি একবার গেছি মাধেরাতে। সৌরাষ্ট্রর প্রধান নৃপতি মাণ্ডলিকের অধিকারভুক্ত সে অঞ্চল। সুউচ্চ প্রাকার বেষ্টিত মন্দির। তাকে ঘিরেই নগরীর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। মন্দিরের অধিবাসী নারী-পুরুষ মিলিয়ে পাঁচশত হবে। নগরীর জনসংখ্যা পাঁচ সহস্র। কিন্তু মন্দিরের স্বর্ণ মূর্তির রক্ষার্থে এক সহস্র সেনাদল আছে।’
মামুদ জানেন, তাঁর সমুদ্র সমান সেনার সামনে ওই ক্ষুদ্র সেনা দল খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। তাই প্রতিরোধের ব্যাপারে চিন্তিত না হয়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘কত সময় লাগবে সেখানে পৌঁছতে? পানীয় জল সংগ্রহ করা যাবে সে স্থানে?’
‘আনুমানিক তিন সপ্তাহ। হ্যাঁ, মিষ্ট জলের পুষ্করিণী আছে সেখানে।’ জবাব দিল কাসিম।
‘তারপর?’ আবার প্রশ্ন জিহাদি মামুদ গজনভীর।
কাসিম আবার মানচিত্রের ওপর হস্ত চালন করে দেখাতে দেখাতে বলল, ‘এরপর দিন সাতেকের মধ্যে এই যে এ পথ ধরে কচ্ছ উপকূলে প্রভাসপত্তনে প্রবেশ করব আমরা। দেখুন এই যে এই স্থানের নাম কানিথকোট। প্রভাসপত্তন বা সোমনাথ নগরীর বাইরে এই কানিথকোটে একটা দূর্গ আছে প্রভাসপত্তনের রাজা ভীমের। হয়তো বা শেষ বারের জন্য এই স্থানে আমাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে পারে রাজা ভীমের বাহিনী। আর তারপরই এই চিহ্নিত স্থান হল আমাদের গন্তব্য সোমনাথ মন্দির। আবার এও হতে পারে কোনও বাধারই সম্মুখিন হল না সুলতান বাহিনী।’
কথাটা শুনে সুলতান বললেন, ‘তুমি বলছ কোনও প্রতিরোধ নাও আসতে পারে? জিহাদি বাহিনী দেখে পালিয়ে যাবে তারা?’
কাসিম, সুলতানের প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘রাজপুত বাহিনী যত ক্ষুদ্র বা বৃহৎ হোক না কেন, যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে তারা পালায় না। তার প্রমাণ আমরা আজও পেয়েছি। তবে হিন্দুদের একটা বিশ্বাস আছে, বিশেষত সোমনাথ নগরীর বাসিন্দাদের সে বিশ্বাস খুব প্রবল—সোমনাথ মন্দির কেউ কোনও দিন ধ্বংস করতে পারবে না। যারা তা করতে যাবে তারা ধ্বংস হবে সোমেশ্বর মহাদেবের কোপে।’
কাসিমের কথা এ পর্যন্ত শোনার পরই তাঁর গাম্ভীর্য ক্ষণিকের জন্য মুছে ফেলে তাঁবু কাঁপিয়ে অট্টহাস্য করে উঠলেন মামুদ গজনভী। হ্যাঁ, কাফেরদের এই বিশ্বাস আগেও বহুবার শুনেছেন সুলতান। মন্দিরের সেই পুতুল নাকি সর্বশক্তিমান। আর এই বিশ্বাসকে, সেই পুতুলকে ইসলামের পদতলে খণ্ড খণ্ড করার জন্যই তো হিন্দুদের বিশ্বাসের মর্মস্থল ওই সোমনাথ মন্দিরকেই তার এই জিহাদি অভিযানের নির্দিষ্ট লক্ষ বস্তু হিসাবে বেছে নিয়েছেন তিনি। তার তুর্কী তরবারি নাকি হিন্দু মুলুকের বিশ্বাস কোনটা সত্য, তা এবার প্রমাণ করে দেবেন তিনি।
কিছুক্ষণ অট্টহাস্য করার পর আবার গম্ভীর হয়ে গেলেন সুলতান। তার বহুমূল্য অঙ্গুরীয় খচিত দক্ষিণ হস্তে একটা ক্ষুদ্র তীক্ষ্ন ছুরিকা ধরা ছিল। তার ফলাটা মানচিত্রে প্রদর্শিত যাত্রাপথের ওপর একবার বোলালেন তিনি। যেন সম্ভব হলে তিনি এই মুহূর্তেই ওই ছুরিকা দিয়ে বিদীর্ণ করে দিতেন কাফেরদের যাবতীয় ধর্ম বিশ্বাস।
এরপর তিনি ইশারাতে মানচিত্রটা সরিয়ে নিতে বলে বললেন, ‘বান্দা কাসিম, তুমি আমাদের পৌঁছে দেবে কাফেরদের সেই মন্দিরে। কাল ফজরের নমাজের পর জিহাদি বাহিনী যাত্রা করবে মাধেরার উদ্দেশ্যে। প্রথমে ধ্বংস করা হবে মাধেরা।’ উপস্থিত সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘আপনার হুকুম মালিক।’
সুলতানকে কুর্ণিশ করে তাঁর তাঁবু থেকে বেরিয়ে যে যার তাঁবুতে ফেরার পথ ধরল। কোথায় যেন এক হিন্দু নারী প্রবল ধর্ষণের শিকার হয়ে আর্তনাদ করে চলেছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, জীবন বাঁচাবার জন্য ধর্ম পরিবর্তন করলেই কি সনাতন ধর্ম মন থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায়? মুছে ফেলা যায় বুকের গভীরে আজন্ম লালিত বিশ্বাস? নিজের তাঁবুর দিকে হাঁটতে হাঁটতে কাসিম তাই মনে মনে বলল, ‘আমাকে তুমি ক্ষমা কোরো সোমেশ্বর মহাদেব। তোমার অজানা তো কিছুই নেই।’
