সোমনাথ সুন্দরী – ১২
১২
আর ক’দিন পরই পূর্ণিমা। প্রায় চন্দ্রালোকিত রাত্রি। তবে রাত্রি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চাঁদের ঔজ্জ্বল্য ফিকে হতে শুরু করবে এরপর। শেষ রাতে ক’দিন ধরে কুয়াশার স্তর গাঢ় হচ্ছে। ঠিক এই সময়তেই গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে সবাই।
অঙ্গিরার যতদূর চোখ যায়, তার চারপাশে ঘুমন্ত নিস্তব্ধ প্রাকার বেষ্টিত সোমনাথ মন্দির। দেবদাসীদের প্রাকারবেষ্টিত আবাসস্থলের বহিঃকাননে এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে সারা রাত প্রহরা দিয়েছে অঙ্গিরা। যে স্থানে ভগ্নপ্রায় প্রাচীন মন্দিরগুলো মহাকালের সাক্ষী হয়ে আজও দণ্ডায়মান সেই চন্দ্রদেবতার মন্দিরের আশেপাশে পরিভ্রমণ করে এসেছে সে।
কাননের এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান বিশাল যে বৃক্ষদেবতারা আছেন তাদেরই একজনের গুড়ির গায়ে হেলান দিয়ে অঙ্গিরা বসেছিল বাকি রাতটুকু অতিক্রম করার অপেক্ষাতে। শুকতারা ফুটে উঠলেই সে উঠে পড়বে অতিথিশালাতে নিজের কক্ষে ফিরে যাবার জন্য।
মৃদু তন্দ্রা যেন অঙ্গিরার চোখে নেমে আসতে শুরু করেছে। হঠাৎ তার মনে হল, যে প্রাকার দিয়ে দেবদাসীদের প্রাঙ্গণ সংলগ্ন বাসস্থান আবৃত সেই প্রাকারের এক স্থানে যেন একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে! চাঁদের আলো প্রাকারের সে স্থানে ভালো করে না পৌঁছলেও, একটা মানুষ যেন সে স্থানে প্রকারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে।
অঙ্গিরা চোখ কচলে সেদিকে তাকাতেই বুঝতে পারল তার অনুমান মিথ্যা নয়। হ্যাঁ, কেউ একজন সেখানে আছে। মৃদু মৃদু নড়ছে সে। প্রাকারের গায়ে মানুষের আকারের কোনও বৃক্ষ নেই যে, সেই বৃক্ষ আন্দোলিত হয়ে অঙ্গিরার দৃষ্টিবিভ্রম ঘটাবে। তবে প্রাকারের গায়ে চন্দ্রালোক ভালো করে প্রবেশ না করাতে এবং চারদিক মৃদু কুয়াশাবৃত থাকাতে, সে মূর্তি নারী না পুরুষের তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না অঙ্গিরা।
কোনও মানুষ নিশ্চিতভাবে সেখানে অবস্থান করছে বুঝতে পেরে গাছের নীচ ছেড়ে উঠে কাঁধে ধনুর্বাণ নিয়ে এগোল সেদিকে। কিন্তু কয়েক পা সেদিকে এগোতেই অঙ্গিরার মনে হল সেই মূর্তি যেন প্রাকারের গায়ে ঝুঁকে পড়ল। অঙ্গিরা যখন সেখানে উপস্থিত হল তখন সেখানে কেউ নেই।
অঙ্গিরা এত ভুল দেখল! অঙ্গিরার চোখ তো তিরন্দাজের চোখ। আর এর পরই তার চোখে পড়ল জল নিষ্কাষণের সেই বৃত্তাকার ছিদ্রটা। হ্যাঁ, অনায়াসে একজন মানুষ সামান্য কসরত করলেই ও পথে ভিতর-বাহির করতে পারে। পিঠে তূণীর না থাকলে অঙ্গিরাও ওই পথে অবশ্যই প্রবেশ করতে পারবে ভিতরের প্রাঙ্গণে।
অঙ্গিরা অনুমান করল তবে ওই পথেই অন্তর্হিত হয়েছে, যে এখানে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সে কে? সেই প্রেত, নাকি অন্য কেউ? ব্যাপারটা অনুসন্ধানের প্রয়োজন, তাই অঙ্গিরা এগোল কিছুটা তফাতে প্রাকারের গায়ে প্রবেশতোরণের দিকে।
নিঃশব্দে কপাট উন্মোচিত করে অঙ্গিরা প্রাঙ্গণে উঠে এল। স্তম্ভ সমৃদ্ধ প্রাঙ্গনে কোথাও খেলা করছে চাঁদের আলো, আবার কোথাও কুয়াশা মাখা অন্ধকার। প্রাঙ্গণ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দেবদাসীদের ঘুমন্ত কক্ষগুলো। কোথাও কোনও শব্দ নেই। বাইরে থেকে ভেসে আসা জলোচ্ছ্বাসের শব্দ ছাড়া। সে যদি ভিতরে প্রবেশ করে থাকে তবে সে কোথায় আত্মগোপন করল?
মার্জার পায়ে অঙ্গিরা পরিভ্রমণ করতে শুরু করল চত্বরটা। এক সময় সে উপস্থিত হল সেই স্থানে যেখানে প্রকারের বাইরে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের জলরাশি। সেই স্থানে প্রাকার সংলগ্ন ছাতার নীচে বেদিতে একজনকে বসে থাকতে দেখল অঙ্গিরা। তবে তার পোশাক দেখে অঙ্গিরা বুঝতে পারল যে বসে আছে সে পুরুষ নয়, নারী। হাঁটু মুড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। নিশ্চিত কোনও দেবদাসী হবে। কিন্তু এত রাতে সে কক্ষের বাইরে কেন? অঙ্গিরা তার কাছে এগিয়ে গেল। তারপর একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করল, ‘কে তুমি?’
অঙ্গিরার কণ্ঠ শুনে মৃদু চমকে উঠে মুখ তুলে সে বলল, ‘আমি রাজশ্রী।’
শেষ রাতের চাঁদের আলো এসে পড়েছে মেয়েটির মুখে। কিন্তু অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে দেখল, এ নারী নিজেকে রাজশ্রী নামে পরিচয় দিলেও তাঁর সামনে চাঁদের আলোতে যে বসে আছে সে তো দেবদাসী সমর্পিতা!
রাজশ্রী অবশ্য এর পরই নিজের ত্রুটি বুঝতে পারল। উঠে দাঁড়িয়ে সে জবাব দিল, ‘আমি দেবদাসী সমর্পিতা।’ জবাব দেবার পরমুহূর্তেই অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল দেবদাসী সমর্পিতার চোখেও। সে চিনতে পারল অঙ্গিরাকে। হ্যাঁ, এ যুবকই তো তার প্রাণরক্ষা করেছিল!
অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, ‘এত রাতে কক্ষের বাইরে কেন?’
সমর্পিতা জবাব দিল, ‘দেবদাসীদের বিনা অনুমতিতে প্রাকারের বাইরে যাওয়ার নিয়ম নেই জানি। কিন্তু প্রাকারের ভিতরে কক্ষত্যাগ করে এই প্রাঙ্গণে আসার ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা আছে জানি না তো? আমার নিদ্রা আসছে না তাই কক্ষ ত্যাগ করে প্রাঙ্গণে এসে বসেছি।’ কৈফিয়তের সঙ্গে যেন মৃদু ঝাঁঝের রেশ নির্গত হল দেবদাসীর কণ্ঠ থেকে।
অঙ্গিরা তার জবাব শুনে মৃদু হেসে বলল, ‘না, আমি কৈফিয়ত তলব করিনি। কৌতূহলবশত প্রশ্ন করেছি। এত রাতে এই নির্জন প্রাঙ্গণে বসে থাকতে তোমার ভয় করছে না?’
‘ভয় করবে কেন?’ জানতে চাইল দেবদাসী।
অঙ্গিরা উত্তর দিল, ‘এ প্রাঙ্গণে যে একজন দেবদাসীর প্রেত দর্শন হয়েছে তা নিশ্চয়ই শুনেছ? প্রেতে তোমার ভয় নেই?’
সমর্পিতা কথাটা শুনে মৃদু হাসল। তার বিশ্বাস, জল নির্গমনের গহ্বর দিয়ে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করা কোনও দেবদাসীর প্রেমিককে দেখেই প্রেত বলে ভ্রম হয়েছে উলুপী নামের সেই দেবদাসীর। রাত গভীর হলে দেবদাসীরাই যে শুধু ওই গহ্বর পথে বাইরে যায় তাই নয়, কখনও-কখনও কোনও সাহসী যুবকও তার প্রেয়সীর প্রেমের আকাঙ্ক্ষাতে, ধরা পড়লে কঠিন শাস্তি এমনকী মৃত্যুদণ্ডর মুখে পড়তে হবে জেনেও, প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। উত্তরা তাকে একথা জানিয়েছে। উত্তরারও বিশ্বাস, উলুপী যাকে প্রেত ভেবেছে সে আসলে তেমনই কেউ। এই তো, এই যুবকের আগমনের কিছু আগেই একজন ওই ছিদ্রপথে প্রাঙ্গণে উঠে প্রবেশ করল একটা কক্ষে। যদিও সে পুরুষ নয়, অভিসার সাঙ্গ করে ফিরে আসা কোনও দেবদাসী হবে। সমর্পিতা বলল, ‘আমি আগেও শুনেছি এ স্থানে নাকি রাতের বেলা প্রেত ঘুরে বেড়ায়। প্রেতে আমার ভয় নেই। তবে প্রেতেরাও দেখছি দেবদাসীদের মতো মুক্তি চায়, তাই না?’
‘অর্থাৎ?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।
সমর্পিতা জবাব দিল, ‘শুনলাম ওই প্রেত নাকি দেবদাসী উলুপীকে বলেছে যে, তার মুক্তির ব্যবস্থা করলে সে তাকে স্যমন্তক মণির সন্ধান দেবে!’
সমর্পিতার বক্তব্য এবার বোধগম্য হল অঙ্গিরার। বাইরের প্রাকারে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। শেষ চাঁদের আলো এসে পড়েছে সমর্পিতার মুখে। অঙ্গিরা বুঝতে পারল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে যাচ্ছে তার মুখমণ্ডলে।
সোমনাথ সুন্দরী এরপর জানতে চাইল, ‘তোমার পরিচয় কী? রক্ষী বাহিনীর কেউ?’
অঙ্গিরা এ প্রশ্নর কি জবাব দেবে বুঝতে না পেরে বলল, ‘আমার নাম অঙ্গিরা। না, আমি রক্ষীবাহিনীর কেউ নই। বল্লভী নগরী থেকে এখানে এসেছি প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের কাছে। তিনি আমাকে এখানে প্রবেশানুমতি দিয়েছেন।’
‘কী কার্য সম্পাদনের জন্য তুমি এখানে এসেছ?’ জানতে চাইল দেবদাসী সমর্পিতা।
ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবার জন্য অঙ্গিরা বলল, ‘এখনও তিনি আমার ওপর তেমন কোনও বিশেষ কর্মভার দেননি। তবে ভবিষ্যতে দেবেন। এখানেই থাকতে হবে আমাকে।’
এ কথা বলার পর আলোচনার প্রসঙ্গ অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য অঙ্গিরা বলল, ‘তোমার নৃত্য প্রদর্শন আমি দেখেছি। অতীব মনোমুগ্ধকর। তবে একটু সাবধানতা অবলম্বনের প্রয়োজন। ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটতে পারত সেদিন।’ কথাটা শুনে দেবদাসী সমর্পিতা হাসল ঠিকই, কিন্তু অঙ্গিরা স্পষ্ট বুঝতে পারল, সে হাসির মধ্যে যেন একটা বিষণ্ণতার আভাস এখনও বর্তমান। অস্পষ্টভাবে সে বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ প্রাণরক্ষাকারী।’
অঙ্গিরা হেসে বলল ‘না, তেমন ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই। দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে দেখে আমি ছুটে গিয়ে তোমাকে বলয় থেকে মুক্ত করলাম। আমি না করলে অন্য কেউ কাজটা করত।’
সমর্পিতা বেশ দৃঢ়ভাবে বলল, ‘আমি জানি অন্য কেউ এ বিপদের ঝুঁকি নিত না। কাছাকাছি তো আরও অনেক পুরুষই ছিলেন। গর্ভগৃহ চত্বর দেবদাসীদের নৃত্যগীতে আলোকময় হয়ে থাকে ঠিকই, তবে তাদের জীবন প্রকৃত অর্থে মূল্যহীন। একজন নগণ্য দেবদাসীর মৃত্যু হলে তার স্থান নেবে আর একজন। সেই মৃতার শোকে একবারের জন্যও, একদিনের জন্যও বন্ধ হবে না গর্ভগৃহর সমুখে দেবদাসীদের নৃত্যগীত। দুর্ঘটনায় যদি আমার মৃত্যু হতো তবে এক দিবসের জন্যও কেউ মনে রাখত না আমাকে।’
সমর্পিতার বলা কথাগুলো যে সত্যি, তা একদিনে দেবদাসীদের সম্পর্কে অঙ্গিরা যা জেনেছে তাতে সে বুঝতে পারল। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের মুখ থেকেও দেবদাসীদের সম্পর্কে একই ভাবনার কথা শুনেছে অঙ্গিরা। সমর্পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হয়নি, কারণ মন্দিরে দেবদাসীর অভাব হবে না, কিন্তু অঙ্গিরার জীবন অমূল্য—এমনই কথা তাকে মৃদু ভর্ৎসনার স্বরে জানিয়েছিলেন ত্রিপুরারিদেব।
অঙ্গিরা, সোমনাথ সুন্দরীর বিষণ্ণতা দূর করার জন্য বলল, ‘আবারও বলছি, তোমার নৃত্যশৈলী কিন্তু অতীব মনোমুগ্ধকর। অন্য দেবদাসী যারা নৃত্য প্রদর্শন করে তাদের তুলনায় অনেক উৎকৃষ্ট। শুধু আমি নই, অনেকেই তা মনে করেন। আমি এ কথাও লোককে বলতে শুনেছি যে ভবিষ্যতে দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার স্থলাভিষিক্তা হবার সম্ভাবনা আছে তোমার। আমি তো তোমার নৃত্যশিল্প দেখার জন্যই প্রত্যহ গর্ভগৃহর সমুখে উপস্থিত হই। কী অপূর্ব তোমার নৃত্যশৈলী!’
অঙ্গিরার কথা শুনে এবার মুহূর্তের জন্য যেন সত্যিই একটা লজ্জামিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল দেবদাসী সমর্পিতার ঠোঁটে। মাথা ঝুঁকিয়ে মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে।
অঙ্গিরা এবার ভালো করে তাকাল তার শরীরের দিকে। সমর্পিতার শরীরে এখন দেবদাসীর প্রচলিত উজ্জ্বল নৃত্য পোশাক বা অলঙ্কার নেই। রাত্রির শয়নের জন্য যে শুভ্র মসৃণ দীর্ঘ বস্ত্রখণ্ডে সে নিজেকে আবৃত করেছিল সেই বস্ত্রখণ্ডই তার পরনে। অন্তর্বাসহীন বস্ত্রখণ্ডর ভিতর থেকে সোমনাথ সুন্দরীর স্তন যুগল যেন চেয়ে আছে বৈতরণীর পথে উপস্থিত হওয়া চাঁদের দিকে, শরীরে প্রতিটা বাঁক বিমূর্ত হয়ে আছে, তার দেহের প্রতিটা রেখা যেন ধরা দিচ্ছে অঙ্গিরার চোখে। বাতাসে উড়ছে, তিরতির করে কাঁপছে সোমনাথ সুন্দরীর কেশগুচ্ছ।
অঙ্গিরা অবশ্য কয়েক মুহূর্ত তার শরীরের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি সন্ধ্যারতিতে নৃত্য প্রদর্শন করছ না কেন?’
অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে সমর্পিতা মুখ তুলে বলল, ‘সেদিন আমার নৃত্য প্রদর্শনের সময় আমার বস্ত্রে অগ্নিসংযোগ হবার ব্যাপারটা নাকি অমঙ্গলজনক। দেবদাসী প্রধানা তিলোত্তমা আমাকে জানিয়েছে, যতদিন না প্রধান পুরোহিত আমার ব্যাপারে কোনও নির্দেশ দেন, পাপ স্খলনের জন্য কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, ততদিন পর্যন্ত সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে আমি নৃত্য প্রদর্শন করতে পারব না।’
অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘পাপ স্খলন মানে? কীসের পাপ?’
সমর্পিতা জবাব দিল ‘হয়তো বা সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্য প্রদর্শনের সময় আমার বা অন্য কোনও দেবদাসীর চেতনে বা অবচেতনে কোনও ত্রুটি বা পাপ কার্য সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে। পুরোহিত নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন সেই পাপের অনুসন্ধান করে তা প্রধান পুরোহিতকে জানাবেন। তারপর প্রধান পুরোহিত সেই ত্রুটি সংশোধন বা পাপ স্খলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।’
কথাগুলো বলার পর দেবদাসী সমর্পিতার মনে হল, সে পাপ কি তার ঘুঙুরদানা হারানোর ফল? ব্যাপারটা উপস্থিত কেউ বুঝতে না পারলেও জীবন্ত বিগ্রহ কি বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা? ওই বিশেষ ঘুঙুরদানা পায়ে না থাকার কারণেই কি কূপিত হলেন মহাদেব?
এ ব্যাপারটা নিয়ে দেবদাসী উত্তরাও বেশ আশঙ্কিত। একমাত্র সেই জানে সোমেশ্বর মহাদেব প্রদত্ত ঘুঙুরদানা হারাবার ব্যাপারটা। ঘটনা যদি প্রকাশ পায় তবে নাকি এ ব্যাপারটাকেই নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হবে সোমেশ্বর মহাদেবের কূপিত হবার কারণ হিসাবে। এবং এই অন্যায় কার্য অর্থাৎ ওই ঘুঙুর ছাড়া নৃত্য প্রদর্শনের জন্য নাকি কোনও ভয়ঙ্কর শাস্তির মুখেও পড়তে হতে পারে সমর্পিতাকে। দেবদাসীদের জীবনের অনুশাসন বড় কঠিন।
সমর্পিতার বলা কথা শুনে অঙ্গিরা বেশ আশাহত হল। সমর্পিতা যখন আবার তাঁর নৃত্য প্রদর্শন করবে তখন তা দেখার সুযোগ হবে কিনা তা অঙ্গিরার জানা নেই।
তবু সে বলল, ‘আমি প্রতীক্ষায় থাকব তোমার নৃত্যকলা দেখার জন্য।’
অঙ্গিরার কথাতে বিষণ্ণ হাসল সমর্পিতা।
চাঁদ এবার মুছে যেতে শুরু করেছে। কিছু সময়ের মধ্যেই শুকতারা ফুটে উঠবে। ফিরতে হবে অঙ্গিরাকে। কিন্তু তার আগে হঠাৎই একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। সে বলল, ‘আমার কাছে একটা সোনার ঘুঙুরদানা আছে। হয়তো বা তোমাদের কারো হবে সেটা। দুর্ঘটনার আগের দিন তোমরা যখন নৃত্য প্রদর্শন করছিলে তখন কারও ঘুঙুরছড়া থেকে ছিটকে এসে আমার সামনে পড়েছিল। আমি নিজের কাছে রেখে দিয়েছি।’
অঙ্গিরার কথা কানে যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই সমর্পিতার মুখমণ্ডল থেকে একটা শঙ্কার ছায়া সরে গেল। সে বলে উঠল, ‘ও ঘুঙুরদানা তোমার কাছে! ও তো আমার ঘুঙুরদানা!’
অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আমার কাছেই আছে।’
দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘দয়া করে ওটা ফেরত দাও আমাকে। নইলে মহাবিপদের সম্মুখীন হব আমি।’
অঙ্গিরা বলল, ‘নিশ্চই দেব। তবে সে দানা তো আমার সঙ্গে নেই। কক্ষে রাখা আছে।’
‘তবে আমি কীভাবে পাব সেই ঘুঙুরদানা?’ কাতর কণ্ঠে বলে উঠল সমর্পিতা।
অঙ্গিরা তার মনের অনিশ্চয়তার ভাবনা পাঠ করে বলল, ‘তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। আগামী কাল রাতে আমি এ স্থানে এসে ওই ঘুঙুরদানা ফিরিয়ে দেব তোমাকে।’
সমর্পিতার মুখমণ্ডলের শঙ্কার ভাবটা অন্তর্হিত হল। সে বলল, ‘আমি তবে এ স্থানে প্রতীক্ষা করব তোমার জন্য।’
আকাশের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরা বলল, ‘এবার আমাকে ফিরতে হবে। কাল আবার এই স্থানে মিলিত হব আমরা।’
স্মিত হেসে মাথা ঝোঁকালো দেবদাসী সমর্পিতা। সেই প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে ফেরার পথ ধরল অঙ্গিরা। সে যখন অতিথিশালার কাছে উপস্থিত হল তখনই আকাশে শুকতারা ফুটে উঠল। আর তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঝমঝম শব্দে বাজতে শুরু করল সেই সোনার শিকল।
শিকলটা প্রথমে বাজান প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবই। তারপর সে কাজে যুক্ত হল তাঁর দুই প্রধান সহকারী মল্লিকার্জুন ও নন্দিবাহন। এদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দুই সহ প্রধান পুরোহিত ওপরের চত্বরে উঠে এসে ত্রিপুরারিদেবের হাত থেকে সোনার শিকলটা নিয়ে পর্যায়ক্রমে বাজাতে লাগলেন।
ঘুম ভাঙতে শুরু করল মন্দিরের। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই এবার সমুদ্র-স্নানে যেতে হবে ত্রিপুরারিদেবকে। সেজন্য তিনি পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা অন্য শব্দ কানে আসাতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। শব্দটা কানে যেতেই মৃদু বিস্মিত হয়ে শিকলের শব্দ থামিয়ে দিলেন তার সঙ্গীরা।
অশ্বখুরের শব্দ! শিকলধ্বনির সঙ্গে-সঙ্গেই মন্দিরের প্রধান তোরণ সংলগ্ন যে ক্ষুদ্রাকৃতি তোরণ আছে তা দ্বাররক্ষীরা খুলে দেয় মন্দির চত্বর ধৌতকরণ ইত্যাদি কাজের জন্য। সে পথেই প্রবেশ করেছে কোনও অশ্বারোহী। মন্দির প্রাকারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার অশ্বখুরধ্বনি।
সে শব্দ এসে থামল মূল মন্দিরের সোপানশ্রেণীর ঠিক নীচে। অশ্বর পিঠ থেকে অবতরণ করে ওপরে দণ্ডায়মান তিন পুরোহিতের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল সেই অশ্বারোহী। তাকে দেখে পুরোহিতরা অনুমান করল সে কোনও রাজকর্মচারী হবে। ত্রিপুরারিদেব তাকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন ওপরে উঠে আসার জন্য।
উঠে এল সে। তিনজন পুরোহিতই তাকে ওপরে উঠে আসার পর চিনতে পারল। আগন্তুকের নাম মীরধ্বজ। রাজা ভীমের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর এই মীরধ্বজ। তাঁর মাধ্যমেই রাজা ভীম সোমেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করেন।
তিন পুরোহিতের উদ্দেশ্যে আবারও মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে মীরধ্বজ বললেন, ‘অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে মহারাজ ভীম তাঁর প্রাসাদে প্রধান পুরোহিত অথবা তাঁর সহকারীদের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে চান। তিনি তাঁর প্রাসাদে আপনাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।’
আমন্ত্রণের বিষয়টা যে অত্যন্ত জরুরি তা বুঝতে অসুবিধা হল না ত্রিপুরারিদেবের। নইলে ভোরের আলো ভালো করে ফোটার পূর্বেই মহারাজের আমন্ত্রণ নিয়ে উপস্থিত হতেন না বার্তাবাহক মীরধ্বজ। তার মুখমণ্ডলেও কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনার ভাব জেগে আছে!
ত্রিপুরারিদেব তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কিছু জানা আছে? অগ্রিম সে বিষয় অবগত থাকলে আলোচনায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যোগ দেওয়া যায়। তথ্য সংগ্রহ সংক্রান্ত যদি কোনও ব্যাপার থাকে তবে তার জন্যও প্রস্তুত হওয়া যাবে।’
প্রশ্ন শুনে মীরধ্বজ মৃদু চুপ করে থেকে বললেন, ‘মন্দিরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় জরুরি আলোচনা করতে চান প্রভাসপত্তন পতি। মার্জনা করবেন, মহারাজই আপনাদের কাছে সবকিছু অবগত করবেন।’
মন্দিরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়! কথাটা শুনে বেশ বিস্মিত হলেন তিন পুরোহিত। মুহূর্তের জন্য ত্রিপুরারিদেবের একবার মনে এল তবে কি অন্ধকারের প্রহরীর অন্তর্ধানের ব্যাপার কোনও ভাবে কানে গেছে রাজা ধীরাজের? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? সে স্থানের অস্তিত্ব বা তার প্রহরীর ব্যাপারই তো রাজা ভীমের জানার কথা নয়।
প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব মন্দির ত্যাগ করে নগরীতে প্রবেশ করেন না। একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি মহারাজকে জানাবেন আমার ও এ মন্দিরের প্রতিনিধি রূপে সে সভায় উপস্থিত থাকবেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন।’
প্রধান পুরোহিতের বার্তা গ্রহণ করে মন্দির থেকে নেমে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করলেন মীরধ্বজ।
অশ্বখুরের শব্দ মন্দির প্রাকারের বাইরে মিলিয়ে গেল। আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে, জেগে উঠছে মন্দির। সমুদ্রে অবগাহনের জন্য মন্দির ত্যাগের আগে ত্রিপুরারিদেব সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুনকে বললেন, ‘মহারাজের সঙ্গে সাক্ষতের সময় সোমেশ্বর মহাদেবের প্রসাদী ফুল ও পরমান্ন নিয়ে যাবেন তাঁর মঙ্গল কামনাতে।’
