সোমনাথ সুন্দরী – ১৩
১৩
কোঙ্কন উপকূলের অধিপতি আহরিয়া রাজপুত নৃপতি মাণ্ডলিক। তাঁর করদ রাজ্যের শাসক রাজা ভীম। আর রাজা ভীম, নৃপতি মাণ্ডলিক, সবার মাথার ওপর অবস্থান করছেন ভোজরাজ পরমদেও। মধ্য ও পশ্চিম হিন্দ ভূখণ্ডের নরপতিরা তাকেই তাদের সর্বময়কর্তা বা রক্ষাকর্তা মনে করেন। এমনকী কাশীরাজের মতো সমৃদ্ধ নৃপতিও, পরমদেওকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।
বিশ সহস্র হস্তিবাহিনী ও একলক্ষ পদাতিক বাহিনীর অধিপতি রাজপুত্র কুলদ্ভব প্রসার পরমদেও। ভোজরাজ, শৈব্য পরমদেওর রাজধানী ধারা নগরী। ভোজরাজের তুলনায় রাজা ভীম তো বটেই স্বয়ং মাণ্ডলিকও সামান্য নরপতি মাত্র। মালোয়ার ভোজরাজের অনুগ্রহী।
প্রভাসপত্তন সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল। স্বয়ং মহাদেবই এই প্রাচীন নগরীর রক্ষাকর্তা বলে মানুষের বিশ্বাস। পাঁচ শত বৎসর পূর্বে আরব জুয়ানেদের সেনাদের আক্রমণ ব্যতীত পরবর্তী পাঁচ শত বছর ধরে নিরুপদ্রবেই জীবন কাটাচ্ছে প্রভাসপত্তনের বাসিন্দারা।
ভারতবর্ষর ছোট-বড় সব নৃপতির কাছেই পবিত্র নগরী প্রভাসপত্তন। তাদের অনেকেই এ নগরীতে আসেন পিতৃপুরুষের জন্য পিণ্ডদান করতে, সোমেশ্বর মহাদেবের পূজা দিতে। সে সময় রাজা ভীমের আথিত্য গ্রহণ করেন তাঁরা। ভোজরাজ এ নগরীতে কোনও দিন পদার্পণ না করলেও দশ বৎসর পূর্বে তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময়কালে পর্যাপ্ত পরিমাণ উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন সোমনাথ মন্দিরে। রাজা ভীম কিছুটা আত্মীয়তার সম্পর্কযুক্ত ভোজরাজের সঙ্গে। ভোজরাজ পরমদেওর এক মহিষী সোলাঙ্কি রাজবংশের কন্যা।
তিন পুরুষ ধরে প্রভাসপত্তনের শাসনকর্তা রাজা ভীম। পিতামহ মুলরাজের আমলে রাজধানী। রাজার বাসস্থান ছিলো বল্লভী নগরী। রাজা ভীমরাজের পিতা নাগরাজের আমলে বল্লভী নগরী থেকে রাজগৃহ স্থানান্তরিত হয় এই প্রভাসপত্তনেই। সামরিক বল বলতে কচ্ছর কানিথকোটে এক ক্ষুদ্র দূর্গ আছে রাজা ভীমের। সেনাদল মাত্র পাঁচ সহস্র। সীমান্তে নয়, সেই সেনাদলের অধিকাংশই মোতায়েন থাকে কানিথকোট দূর্গে ও সোমনাথ নগরীতে রাজপ্রাসাদে। প্রভাসপত্তনের শান্তিরক্ষার কাজে কখনও, কদাচিৎ তাদের অবতীর্ণ হতে হলেও ইতিপূর্বে তাদের কখনও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়নি।
নগরীর মধ্যভাগে প্রস্তর ও কাষ্ঠ নির্মিত প্রাসাদ। সমুখ ভাগে বিশাল প্রবেশ তোরণের গায়ে গালার প্রলেপের ওপর সোনালি রঙের আবরণ দেখে স্বর্ণ মণ্ডিত বলে ভ্রম হয়। খড়গধারী, তিরন্দাজ সেনারা প্রহরা দেয় তোরণ। উন্মুক্ত এক শিবিকাতে মন্দির ত্যাগ করে প্রাসাদ অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। সঙ্গে রয়েছে ছত্রধর।
শিবিকার পাশাপাশি পদব্রজে চলতে চলতে বিরাট কাষ্ঠ দণ্ড সমন্বিত ছত্র দিয়ে মল্লিকার্জুনের মস্তক আড়াল করে রেখেছে সূর্যতাপ থেকে। এ ব্যতীত আরও একজন আছেন। সেই সেবায়েত নিয়ে চলেছে রেশমখণ্ড আচ্ছাদিত এক স্বর্ণপাত্র। তাতে আছে রাজা ভীমের জন্য প্রসাদী ফুলমালা ও চন্দনকাঠের পরমান্নর আধার।
মন্দির থেকে প্রাসাদের পথে নগরীর বহু মানুষ মল্লিকার্জুনকে দেখে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়েছে তাঁর উদ্দেশ্যে। সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব তো বটেই, তাঁর সহকারীদ্বয় মল্লিকার্জুন ও নন্দিবাহনও নগরবাসীর কাছে পরম সম্মানের পাত্র। প্রায় দেবতার মতোই অনেকে তাঁদের দেখেন। এই পুরোহিতশ্রেষ্ঠরাই তো সোমেশ্বর মহাদেবের সাধারণ মানুষের যোগসূত্র রক্ষা করেন।
মল্লিকার্জুনের শিবিকা প্রাসাদ তোরণে উপস্থিত হতেই প্রহরীরা তোরণ উন্মুক্ত করে দিল। তোরণ থেকে প্রাসাদ পর্যন্ত পথ দু-পাশে সেনাদলের শৃঙ্খলে আবৃত। তারাও মাথা ঝোঁকাতে লাগল মল্লিকার্জুনকে দেখে। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করলেন পুরোহিত। দণ্ডায়মান সেনাদলের মধ্যে, মুখমণ্ডলে কাঠিণ্যের পরিমাণ যেন অধিক বলে বোধ হচ্ছে।
ইতিপূর্বে কার্যোপলক্ষে এ প্রাসাদে বহুবার এসেছেন মল্লিকার্জুন। সেনারা প্রতিবারের মতো এবারও তাঁর প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেও পুরোহিত দর্শনে তাদের মুখমণ্ডলে সৌভাগ্যজনিত যে উৎফুল্ল ভাব প্রকাশ পেত, তা যেন নেই। যেন চিন্তান্বিত হিমশীতল কাঠিণ্য যুক্ত তাদের মুখমণ্ডল।
শিবিকাবাহকরা শিবিকা নামাল প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার স্বর্ণ কপাটের ঠিক সামনে। মল্লিকার্জুনের অভ্যর্থনার জন্য সেখানে দণ্ডায়মান ছিলেন রাজপ্রতিনিধি মীরধ্বজ। পুরোহিত শিবিকা থেকে নামতেই তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘মহারাজ আপনার আগমনের জন্যই প্রতীক্ষারত।’
সেবায়েতের থেকে সেই রেশমবস্ত্র আবৃত পাত্র নিয়ে মল্লিকার্জুন, মীরধ্বজের সঙ্গে প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। না, রাজসভা বা রাজঅন্তঃপুরে ভীমের বিলাসবহুল কক্ষ নয়। মীরধ্বজ, পুরোহিতকে নিয়ে চললেন মন্ত্রণাকক্ষের দিকে। গবাক্ষহীন, পুরু পাথরের দেওয়াল মোড়া আধো অন্ধকার এক কক্ষ। একটি মাত্র মশাল জ্বলছে সে কক্ষে। তাতে কক্ষের অন্ধকার দূর হচ্ছে না।
অতি বিশ্বস্ত কিছু আমাত্ত ও সৈন্যাধ্যক্ষ মহাভিষাকে নিয়ে সেখানে অবস্থান করছিলেন রাজা ভীম। মীরধ্বজ, মল্লিকার্জুনকে নিয়ে সে কক্ষে প্রবেশ করতেই তাদের পিছনে লৌহকপাট বন্ধ হয়ে গেল, কোনও আলোচনা যাতে অন্য কারো কর্ণগোচর না হয় সেজন্য।
পাথরের আসনে উপবিষ্ট ছিলেন মধ্যবয়সি রাজা ভীম। মল্লিকার্জুন যেই হোন না কেন, রাজার আসন সবার ওপরে। তাই মল্লিকার্জুনই মাথা ঝুঁকিয়ে প্রথম প্রণাম জানালেন তাকে। তারপর তাঁর কাছে এগিয়ে হাতের পাত্র থেকে রেশমবস্ত্রের আবরণ উন্মোচন করে বললেন, ‘মহারাজ ভীমের মঙ্গল কামনায় প্রধান পুরোহিত সোমেশ্বর মহাদেবকে বিশেষ পূজা নিবেদন করেছেন। আপনি সেই প্রসাদী ফুল আর পরমান্ন গ্রহণ করুন।’
মল্লিকার্জুনের কথা শুনে রাজা ভীম উঠে দাঁড়িয়ে সেই পাত্র গ্রহণ করে মাথায় ছুঁইয়ে তা সমর্পণ করলেন এক পার্শ্বচরের হাতে। রাজার ইশারাতে তাঁর পাশেই আসন গ্রহণ করলেন সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিত।
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। রাজা ভীম মৌনতা ভঙ্গ করে বললেন, ‘আপনাকে আমি আমন্ত্রণ জানিয়েছি মন্দিরের নিরাপত্তার বিষয় জরুরি আলোচনার জন্য। আপনাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূর্বের ন্যায় আছে নিশ্চয়?’
রাজার কথা শুনে সোমনাথ পুরোহিত মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘মন্দিরের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা? মন্দিরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই অটুট আছে। রক্ষীরা নিয়মিত প্রহরা দেয়, সেবায়েতরাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে মন্দির চত্বর। গর্ভগৃহ ও মন্দিরকোষও নিরাপত্তার আচ্ছাদনে আবৃত। সর্বোপরি সোমেশ্বর মহাদেব প্রহরা দিচ্ছেন তাঁর আবাসস্থলকে। নিরাপত্তার তো কোনও অভাব দেখি না। কেন, তেমন কোনও সংবাদ আছে নাকি মহারাজের কাছে?’
ভীম জবাব দিলেন, ‘না, মন্দিরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ব্যাপারটা বর্তমানে কেমন তা জানার জন্য প্রশ্নটা করেছিলাম। তবে হয়তো বা কোনও দুর্যোগের সম্মুখীন হতে পারে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির, আর এই প্রভাসপত্তন।’
‘অর্থাৎ?’ জানতে চাইলেন পুরোহিত।
প্রশ্নের জবাবটা এল মহারাজের অন্য পাশে বসা প্রধান মহাভিষার কাছ থেকে। তিনি বললেন, ‘বিধর্মী মামুদ বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আবার হানা দিয়েছে ভারত-ভূখণ্ডে। মরুপথে এ ভারতভূমিতে প্রবেশ করেছে তারা। আজমের নগরী ধ্বংস করেছে গজনী বাহিনী। শিশু থেকে বৃদ্ধ, কোনও পুরুষকেই জীবিত রাখেনি তারা। আজমের নগরী ধ্বংস করার পর মামুদ বাহিনী ঝড়ের মতো এগোচ্ছে আমাদের দিকে। মাধেরা নগরীকে লক্ষ করে। হয়তো বা মাধেরা সূর্য মন্দিরই মামুদ বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু। কারণ, যতদূর সংবাদ মিলেছে, তাতে সুলতানের এ অভিযান শুধু মাত্র লুণ্ঠনের জন্য বলে মনে হচ্ছে না। কারণ তাদের যাত্রাপথে মন্দির আর দেব-দেবীর বিগ্রহকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে বেছে নিচ্ছে তারা। সে মন্দির ছোট হোক বা বড় হোক, তাতে সম্পদ থাকুক বা না থাকুক। যেন বিগ্রহ উৎপাটনই তার লক্ষ।’
কথাটা জেনে অবাক হয়ে গেলেন মল্লিকার্জুন। রাজনীতি না করলেও মামুদ নামটা শুনেছেন মল্লিকার্জুন। এক হিংস্র লোক, পরধর্ম বিদ্বেষী একটা লোক। প্রতি বৎসর একবার করে হানা দেয় ভারত ভূখণ্ডে, সম্পদ লুণ্ঠন করে, মন্দির ভাঙে। দাস হিসাবে নিজের মুলুকে নিয়ে যায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। কাশীতেও একবার সে হানা দিয়েছিল নাকি মন্দির অপবিত্র করার জন্য। এই ভারত ভূখণ্ডর নানা প্রান্ত থেকে সোমনাথ মন্দিরে আসে পুণ্যার্থীরা। তাদের কাছেই গজনীপতি মামুদের নানা কাহিনি শুনেছেন মল্লিকার্জুন। সেই মামুদ এবার কোঙ্কনে হানা দিতে চলেছে!
সেনাপতি মহাভিষা তাঁকে প্রাথমিক সংবাদ জানাবার পর রাজা ভীম বললেন, ‘নৃপতি মাণ্ডলিকের নির্দেশে মাধেরাতে করদ রাজ্যগুলো সৈন্য সমাবেশ করতে চলেছে মাসুদ বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য। আমার পক্ষ থেকে সেনাপতি মহাভিষা আজই রওনা হচ্ছেন মাধেরাতে দুই সহস্র সৈন্য নিয়ে। চালুক্যরাজ অম্বুজও আসছেন মাণ্ডলিকের আহরিয়া রাজপুতবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে। মালবের মহানৃপতি ভোজরাজকেও ইতিমধ্যে সংবাদ পাঠানো হয়েছে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে।’
এ কথা বলে রাজা ভীম একটু থামলেন। তারপর বললেন, ‘কিন্তু মাধেরার যুদ্ধে সবকিছুই ঘটতে পারে। এমন যদি হয় যে রাজপুত বাহিনী পরাজিত হল এবং ভোজরাজের হস্তিবাহিনী এসে উপস্থিত হল না, তখন?
মালব এখান থেকে বেশ দূরের পথ। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নগরীর অভিজাত ব্যক্তি, সম্ভ্রান্ত নারীদের নিয়ে কানিথকোট দূর্গে চলে যাব। মাধেরার যুদ্ধে আমাদের সেনারা যদি পরাজিত হয় তবে মামুদের পরবর্তী লক্ষ্য নিশ্চই হবে প্রভাসপত্তন আর সোমনাথ মন্দিরের অতুলনীয় ধনসম্পদ ও নারীরা।
মন্দিরে যে দেবদাসীরা আছে তাদের আপনারা আমার সঙ্গে কানিথকোট দূর্গে পাঠাতে পারেন তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে। আর প্রধান পুরোহিত সহ আপনি ও পুরোহিত নন্দিবাহনও আমার সঙ্গী হতে পারেন।
হাতে সময় বিশেষ নেই। আর কয়েকদিনের মধ্যেই কানিথকোট রওনা হব আমি। দুই সহস্র সেনাদল অবশ্য রেখে যাব মন্দির ও নগরী রক্ষার্থে। এ ব্যাপারে আলোচনার জন্যই আমি আপনাদের আজ আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’
রাজা ভোজের প্রস্তাব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মল্লিকার্জুন বললেন ‘দেবদাসীরা দেবতা সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছে। তাদের নাথ সোমেশ্বর মহাদেব। তাদের জীবন-মৃত্যু সবই সোমেশ্বর মহাদবের সঙ্গে জড়িয়ে। নাথকে ত্যাগ করে তারা অন্যত্র যাবে কীভাবে? কোনও অবস্থাতেই তাদের মন্দিরের বাইরে যাবার নিয়ম নেই। তা ছাড়া…।’ এই বলে মৃদু থামলেন পুরোহিত।
‘তা ছাড়া কী?’ প্রশ্ন করলেন ভীম।
লক্ষ লক্ষ মানুষের মতো মল্লিকার্জুনেরও প্রবল বিশ্বাস স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেবই তাঁর আবাসস্থল ও তার ভক্তদের রক্ষাকর্তা। পৃথিবীর কোনও শক্তিই নেই যে তাকে পরাস্ত করতে পারে। কেউ সে চেষ্টা করলে তার ধ্বংস অনিবার্য। তাই তিনি বললেন ‘তা ছাড়া, মামুদ যদি সত্যিই এ নগরীতে উপস্থিত হন তবে তার মৃত্যুই তাকে এ নগরীতে টেনে আনছে বলে মনে হয়। মন্দির, বিগ্রহ ধ্বংসকারী, লক্ষ লক্ষ হিন্দুর হত্যাকারী নারকী মামুদের জীবনে কোনও পাপ আর অবশিষ্ট নেই। তাকে চূড়ান্ত শাস্তি দেবার জন্য, স্বমূলে বিনাশ করার জন্য প্রভু সোমেশ্বরই হয়তো তাকে এখানে টেনে আনছেন। জাগ্রত মহাদেবের সংহারমূর্তি এবার প্রত্যক্ষ করবে বিশ্ববাসী। একজন পাপীও আর গজনীতে ফিরে যেতে পারবে না।’—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন সোমনাথ মন্দিরের পুরোহিত।’
মল্লিকার্জুনের কথা শুনে রাজা ভীম বললেন, ‘আমিও মনে করি সোমনাথই আমাদের সবার রক্ষাকর্তা। ভোজরাজ পরমদেওর হস্তিবাহিনী যদি নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হয় তবে এটাই সত্য হবে। বিগ্রহ উৎপাটকদের একজনও প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না। কিন্তু আমার মনে পড়ে যাচ্ছে আরব জুয়ানেদের সেনাদলের বীভৎস সেই কাহিনি! কীভাবে তারা নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল! মৃতদেহ পর্যন্ত ধর্ষিত হয়েছিল!’
মল্লিকার্জুন বললেন, ‘সে কাহিনি আমি জানি। আরব সেনাবাহিনী চালুক্যরাজ পুলকেশীকে পরাজিত করে মন্দির ধ্বংস করে উজ্জয়নীতে প্রবেশ করতে গেছিল। গুর্জর রাজ নাগভট্ট তাদের শেষ পর্যন্ত পরাস্ত করেন। তবে সে ঘটনার আসল কারণ ছিল সোমেশ্বর মহাদেবের কোপ।
সোমনাথ মন্দিরের অনুকরণে বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র মন্দির নির্মিত হচ্ছিল যা ধর্মসিদ্ধ নয়। সেই সব মন্দির নির্মাণ করে কিছু রাজা ও ব্রাহ্মণ সোমেশ্বর মহাদেবের নামে সম্পদ আহরণের চেষ্টা শুরু করেছিলেন মানুষকে প্রতারিত করে।
সোমেশ্বর মহাদেবের আবাসস্থল একটাই। তা হল এই প্রভাসপত্তন, অন্য কোথাও নয়। তা ছাড়া নাকি সোমেশ্বর মন্দিরের অধ্যক্ষ ও প্রধান পুরোহিতের মন্দির পরিচালনাতে ত্রুটি ছিল। দেবদাসীরা তাদের কামজ্বালা মেটাবার জন্য কিছু পুরোহিত ও সেবায়েতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। তাই তাদের শাস্তি দিয়েছিলেন সোমেশ্বর মহাদেব। তবে আরব সেনারা কিন্তু মন্দির ধ্বংস করলেও গর্ভগৃহতে প্রবেশ করতে পারেনি। অগ্নিবলয় সৃষ্টি হয়েছিল গর্ভগৃহর চারপাশে। অন্য সবাইয়ের মৃত্যু হলেও নিজেকে নিজেই রক্ষা করেছিলেন দেবতা।’
মল্লিকার্জুন যে কথা বললেন, আরবদের মন্দির ধ্বংসের পিছনে সে ব্যাখ্যা আগেও নানা জনের কাছে শুনেছেন রাজা ভীম। নিজেদের পাপের ফল নাকি সে সময় পেয়েছিল দেবদাসীরা। কুপিত হয়েছিলেন সোমেশ্বর। নইলে আরবদের সাধ্য কি ছিল সোমেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে প্রবেশ করে?
রাজা ভীম, মল্লিকার্জুনের সঙ্গে বিতর্কে গেলেন না। তিনি শুধু বললেন ‘আমার বক্তব্য আপনি প্রধান পুরোহিতের গোচরে আনবেন। মন্দির বিষয়ক যে-কোনও সিদ্ধান্তের অধিকারী আপনারাই। আমি শুধু বিষয়টা সম্পর্কে আমার কথা ব্যক্ত করলাম। তবে মামুদের নগরী বা মন্দির আক্রমণের আশঙ্কাটা আপাতত গোপন রাখবেন। নইলে আতঙ্কে আগাম বিশৃঙ্খলার জন্ম হতে পারে।’
পুরোহিত বললেন, ‘আপনি নিশ্চিত থাকুন, এ সংবাদ আমি একমাত্র প্রধান পুরোহিতের কাছেই ব্যক্ত করব।’
মন্ত্রণাকক্ষের আলোচনা শেষ হল। দ্বার উন্মুক্ত হল। মল্লিকার্জুনের জন্য একজন ফলাহার নিয়ে প্রবেশ করল সেখানে। তিনি শুধু তার থেকে একটা হর্তুকী মুখে তুলে মন্দিরে ফেরার জন্য কক্ষ-প্রাসাদ ত্যাগ করলেন। সোমেশ্বর মহাদেবের ওপর তাঁর বিশ্বাস ভক্তি অটুট থাকলেও, কপালেও মৃদু চিন্তার ভাব দেখা দিল।
সোমেশ্বর মহাদেব নিশ্চিত ধ্বংস করবেন সেই পাপিষ্ঠদের। কিন্তু একটা অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি তো হবেই।
মল্লিকার্জুন যখন মন্দিরে ফিরলেন তখন বিকাল হয়েছে। মন্দির ত্যাগ করে ফিরতে শুরু করেছে পুণ্যার্থীর দল। তিনি সোজা উপস্থিত হলেন প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সামনে। ত্রিপুরারিদেব দ্বার প্রান্তে তার সহকারীর জন্যই অপেক্ষারত ছিলেন। কক্ষে প্রবেশ করে মুখোমুখি উপবেশন করলেন দুই পুরোহিত। মল্লিকার্জুন, রাজা ভীমের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন বিস্তৃত ভাবে অবগত করলেন প্রধান পুরোহিতকে।
সে কথা শুনে ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘রাজা ভীমকে আপনি যথার্থই বলেছেন। কোনও অবস্থাতেই তাদের নাথকে ত্যাগ করতে পারে না দেবদাসীরা। আমৃত্যু দেবদাসীরা সোমেশ্বরের সঙ্গে আবদ্ধ ওই নীলকণ্ঠ ফুলের মালা আর ওই ঘুঙুরদানার মাধ্যমে। আর প্রধান পুরোহিতের তো মন্দির ত্যাগের কোনও প্রশ্নই নেই।
ব্যাপারটা আপনি নন্দিবাহনকেও জানিয়ে রাখুন। আশা করি পিতা সোমেশ্বর আমাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। আগামী কাল পূর্ণিমা। তার পরের পূর্ণিমাতে চন্দ্রগ্রহণ। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাবেশ ঘটবে মন্দিরে। আমাদের সবাইকেই প্রস্তুত হতে হবে সেদিনের জন্য। এর মধ্যবর্তী সময় যদি কোনও দুর্যোগের সংবাদ আসে তবে পরিস্থিতি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আপনি রাজকর্মচারীদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলুন। তবে কোনও পরিস্থিতিতেই দেবদাসীরা মন্দির ত্যাগ করবে না। একদিনের জন্যও সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্যগীত বন্ধ হবে না।’
মল্লিকার্জুন, প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে ফিরে গেলেন। সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।
মল্লিকার্জুন কক্ষত্যাগ করার পরই ত্রিপুরারিদেবের মনে পড়ে গেল ভূগর্ভস্থ সেই কক্ষের কথা। প্রহরী বিহীন অবস্থায় পড়ে আছে সেই কক্ষ! মনে মনে তিনি ভাবলেন, এদিন রাত্রিতে একবার তিনি অতিথিশালাতে যাবেন অঙ্গিরার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। অঙ্গিরার ব্যাপারে প্রাথমিক কাজ আগামী কালই সম্পন্ন করতে হবে।
