সোমনাথ সুন্দরী – ১৪
১৪
আকাশে প্রায় পূর্ণিমার চাঁদ, নিজের কক্ষ ছেড়ে নিঃশব্দে বাইরের চত্বরে বেরিয়ে এল রাজশ্রী—সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী সমর্পিতা। ভালো করে একবার চারপাশে তাকালো সে। আপাত দৃষ্টিতে তার কোথাও কাউকে চোখে পড়লনা।
চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভ সমৃদ্ধ বিশাল চত্বরটা। থামগুলোর আড়ালে যেখানে চন্দ্রালোক প্রবেশ করছে না, সে সব জায়গাতে খেলা করছে অন্ধকার। মাথার ওপর চাঁদের অবস্থান দেখে সে অনুমান করল, এখন ঠিক মধ্যরাত। ধীর পায়ে চত্বর অতিক্রম করে সে গিয়ে দাঁড়াল প্রাকারের গায়ে সেই বেদিটার কাছে। বাইরে থেকে সমুদ্রের শব্দ ভেসে আসছে। অঙ্গিরা নামের সেই যুবকের আসার কথা।
সারা দিন নিজের কক্ষেই ছিল সমর্পিতা। সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্যগীত পরিবেশনের জন্য ডাক পড়েনি তার। পড়ার কথাও নয়। দ্বিপ্রহরে একবার কিছু সময়ের জন্য তার সংবাদ নিতে এসেছিল উত্তরা। সে তাকে জানিয়েছে তার সম্বন্ধে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত জানাননি পুরোহিতশ্রেষ্ঠ ত্রিপুরারিদেব।
উত্তরা চেষ্টা করছে অতি দ্রুত অমন একটা ঘুঙুরদানা তার প্রেমিকের মাধ্যমে গোপনে বানিয়ে আনার। সমর্পিতা তার কথা নিশ্চুপ ভাবে শুনেছে, কিন্তু গতরাতে তার সঙ্গে যে অঙ্গিরার সাক্ষাৎ হয়েছে বা সে তাকে ঘুঙুরদানা ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে ব্যাপারে উত্তরাকে কিছু জানায়নি অঙ্গিরা। হয়তো বা তাতে উত্তরার মনে কোনও ভুল ধারণার জন্ম হতে পারে।
তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার, গত রাতে অঙ্গিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার পর থেকে সারা দিন রাজশ্রীর খালি বারবার মনে পড়েছে তার কথাই। চোখ বন্ধ করলেই সে বার বার দেখতে পেয়েছে চাঁদের আলোতে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ধনুর্বাণ কাঁধে এক সুঠাম সুন্দর যুবক।
অঙ্গিরার কথা কি তার বারবার মনে এসেছে শুধুমাত্র ঘুঙুরদানা ফেরত পাবার প্রত্যাশাতে? রাজশ্রী ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সারাদিন খালি তার মনে হয়েছে কখন চাঁদ উঠবে মাঝ আকাশে, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে সেই যুবকের। তার জন্য প্রতীক্ষা শুরু হল সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতার।
কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল তত আশঙ্কা তৈরি হতে লাগল সমর্পিতার মনে। যদি সে না আসে? সময় এগিয়ে চলল, তার সঙ্গে বেড়ে চলল উত্তেজনাও। যখন তার মনে হতে লাগল সে আর আসবে না, ঠিক তখনই থামের আড়াল থেকে তার সামনে আবির্ভূত হল অঙ্গিরা। তাকে দেখেই মুহূর্তের মধ্যে সোমনাথ সুন্দরীর সব মলিনতা যেন মুছে গেল! চাঁদের আলোতে তার মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল উচ্ছল এক আনন্দের ভাব। আর অঙ্গিরার চোখেও যেন ফুটে উঠল অদ্ভুত এক ভালোলাগা, ঠোঁটের কোণে আবছা স্নিগ্ধ হাসির টুকরো। পরস্পরের এ ব্যাপারটা তাদের কারোরই চোখ এড়াল না।
অঙ্গিরা তার সামনে এসে দাঁড়াতেই দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘আমি অনেকক্ষণ প্রতীক্ষা করে আছি তোমার জন্য।’
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘আমি ঠিক মধ্যরাতেই কক্ষ ত্যাগ করেছিলাম। বাইরে বেরিয়ে দেখি প্রধান পুরোহিত দণ্ডায়মান। তিনি আমার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে করতে অনেকটা দূর পর্যন্ত এলেন। তাঁর ফিরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। তাই আসতে বিলম্ব হল।’
তার কথা শুনে সমর্পিতা বলল, ‘আমি জানি তুমি আসবে। কিন্তু, তবু বিলম্ব দেখে মনের ভিতর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। আসলে ভাগ্য আমার সঙ্গে এতটাই প্রতারণা করেছে যে আমি আর কোনও কিছুতেই আস্থা রাখতে পারি না। আমার পিতা-মাতার হত্যা বা মৃত্যু, নিজের সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য অথবা পুণ্য লাভের লক্ষে চালুক্যরাজের আমাকে এই মন্দিরে দেবদাসী হবার জন্য তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে গর্ভগৃহর সামনে সেদিন প্রায় মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া। দুর্যোগ যেন কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ছে না! রাজকন্যা থেকে আমি এখন সোমনাথ মন্দিরের নগণ্য দেবদাসী।’
সোমনাথ সুন্দরীর কথা শুনে অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে বলে উঠল, ‘তুমি রাজকন্যা! শুনেছিলাম বটে তুমি নাকি চালুক্য রাজবংশীয়া।’
সে মৃদু হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ছিলাম। পিতা অম্বরীষ ছিলেন চালুক্য যুবরাজ। সিংহাসনে বসার ঠিক পূর্বদিনেই সস্ত্রীক নিহত হলেন তিনি। সিংহাসনে বসলেন খুল্লতাত অম্বুজ। আমাকে তিনি তুলে দিলেন সোমনাথ মন্দিরের হাতে। চালুক্য বংশীয়া নারীদের সিংহাসনে বসার নজির আছে। নিষ্কণ্টক হলেন তিনি। রাজকন্যা রাজশ্রী থেকে আমি হলাম সোমনাথ সুন্দরী সমর্পিতা।’
অঙ্গিরা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, ‘সেখানে তোমার নিকটজন কেউ ছিলো না। যিনি তোমাকে এই মন্দিরে পাঠানো থেকে নিরস্ত করতে পারতেন চালুক্যরাজ অম্বুজকে?’
দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘পিতা-মাতার মৃত্যুর পর আমি এক বৃদ্ধা পরিচারিকার কাছে মানুষ হয়েছি। হ্যাঁ, আর এক জন হয়তো ছিলেন, তবে তিনি রক্তের সম্পর্কর কেউ নন। অমাত্য চন্দ্রদেব। তিনি স্নেহ করতেন আমাকে। আমার পিতা যদি সিংহাসনে বসতেন তবে তিনিই হয়তো প্রধানমন্ত্রী বা মহা অমাত্য হতেন। কিন্তু রাজার বিরুদ্ধাচরণ করার মতো ক্ষমতা তার ছিল না। তা ছাড়া গোপনে অন্ধকার রাতে শিবিকাবন্দি অবস্থাতে সৈন্যরা আমাকে এখানে পৌঁছে দেয়। রাজা অম্বুজ অত্যন্ত চতুরতা দেখিয়েছেন এ ব্যাপারে। আমাকে হত্যা করার পাপ নিলেন না, উপরন্তু সোমনাথ মন্দিরের ধন্যবাদগ্রাহ্য হলেন।’
চাঁদের আলোতে সোমনাথ সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরার মনে হল সমর্পিতার চোখের কোণে যেন অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে। তার বিষণ্ণতা এবার যেন অঙ্গিরাকেও স্পর্শ করল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সমর্পিতার বিষণ্ণতা কাটিয়ে দেবার জন্য অঙ্গিরা হেসে বলল, ‘ও এই জন্যই তোমাকে গতকাল পরিচয় জিগ্যেস করাতে তুমি প্রথমে তোমার রাজশ্রী নাম বলেছিলে। তা আমি কী নামে ডাকব তোমাকে? রাজশ্রী নাকি সমর্পিতা?’
সোমনাথ সুন্দরী বলল, ‘দেবদাসী হবার পর পূর্ব পরিচয় মুছে ফেলতে হয়। যদিও মনের ভিতর তা কোনওদিন মুছে ফেলতে পারব কিনা জানি না। সমর্পিতা নাম শুনতে সুন্দর হলেও জন্ম থেকে শুনে আসা রাজশ্রী নামই আমার প্রিয়। ভালোবাসা জড়িয়ে আছে ও নামের সঙ্গে। ও নামই শুনতে আমার ভালো লাগত। কিন্তু সর্ব সময়ে ও-নামে তো তুমি আমাকে ডাকতে পারবে না।’
নিজের অজান্তেই যেন অঙ্গিরা বলে ফেলল, ‘সব সময়ে কেন, যখন নিভৃতে সাক্ষাৎ হবে তখন তোমায় রাজশ্রী নামে ডাকব।’
কথাটা বলে ফেলেই একটু লজ্জাবোধ করল অঙ্গিরা। তার সঙ্গে কেনই বা নিভৃতে দেখা হবে রাজশ্রীর? সেই বা কেন একান্তে সাক্ষাৎ করবে অঙ্গিরার সঙ্গে!
অঙ্গিরার কথা শুনে রাজশ্রীর মনের গভীরে হঠাৎই যেন একটা কাঁপন লাগল। এক অজানা অনুভূতির কাঁপন।
কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে থেকে সে বলল, ‘তবে তুমি আমাকে রাজশ্রী নামেই ডেকো।’
এ কথা বলার পর রাজশ্রী হেসে বলল, ‘আমার কথা তো অনেক শুনলে, এবার তোমার কথা বলো? তোমার পিতা, মাতা, পরিজন আছে নিশ্চই?’
অঙ্গিরা বলল, ‘আমারও অবস্থা তোমারই মতো। পিতা-মাতা কেউ জীবিত নেই। তারা প্রাণ বিসর্জন দেবার পর তাদের অন্তিম নির্দেশ পালনের জন্য এখানে এসেছি। আমারও কেউ নেই।’
‘প্রাণ বিসর্জন’ শব্দটা কানে বাজল রাজশ্রীর। সে বলল ‘প্রাণ বিসর্জন— অর্থাৎ?’
অঙ্গিরা একটু ইতস্তত করে সত্যি কথাই বলল ‘আমি একবিংশ বৎসরে পদার্পণ করলে তাঁরা দুজন সরস্বতী নদীতে নিজেদের বিসর্জন দেন। তাঁরা মৃত্যুর আগে আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে আমি যেন এই সোমনাথ মন্দিরে এসে প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাকে যা নির্দেশ দেবেন তা পালন করতে হবে আমাকে। তবে তাদের আত্মার মুক্তি ঘটবে। মৃত্যুর পর সব আত্মারাই তো এই সোমনাথ মন্দিরে মুক্তিলাভের জন্য উপস্থিত হন। হয়তো বা তাঁরাও এখানেই আছেন। যতটুকু জানি তারা এক সময় এ মন্দিরেই থাকতেন।
রাজশ্রী, অঙ্গিরার জবাব শুনে মৃদু বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করল, ‘তাঁরা আত্মহনন করলেন কেন? এ মন্দিরে তাঁরা কি কাজে নিয়োজিত ছিলেন?’
অঙ্গিরা উত্তর দিল, ‘তার কারণ, আমার জানা নেই, তাঁরা এ মন্দিরে কী কাজে নিয়োজিত ছিলেন সে সম্পর্কে কোনওদিন অবগত করেননি আমাকে। তবে আমার মা ছিলেন অতীব সুন্দরী। বাবা, রক্ষী বা এ ধরনের কোনও পেশাতে নিয়োজিত থাকতে পারেন। তিনি অস্ত্রবিদ্যাতে পারদর্শী ছিলেন। আমাকে তিনিই ও বিদ্যা শিখিয়েছেন।’
কথাটা শুনে রাজশ্রী বলল, ‘যদি তোমার মা দেবদাসী হয়ে থাকেন, তবে তিনি মুক্তি পেলেন কী ভাবে? ঘর বাঁধলেন কী ভাবে?’
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘এ প্রশ্নের উত্তরও আমার কাছে নেই। এমনও হতে পারে তিনি দেবদাসী নয়, মালিনী বা চয়নিকা ছিলেন। আসলে আমার পিতা-মাতা, কখনোই প্রয়োজনের অধিক বাক্যালাপ আমার সঙ্গে করতেন না।’
রাজশ্রী আবারও প্রশ্ন করল, ‘তাদের সম্বন্ধে তোমার আরও কথা জানতে ইচ্ছা করে না? বিশেষত তুমি যখন এ মন্দিরে এসেছ, তারা যখন এ মন্দিরে তোমাকে পাঠিয়েছেন, নিজেরাও এ মন্দিরে ছিলেন। নিশ্চই তো কোনও সম্পর্ক আছে পুরো ঘটনাটার মধ্যে?’
অঙ্গিরা প্রশ্ন শুনে একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, কোনও সম্পর্ক হয়তো আছে। আসলে ব্যাপারটা নিয়ে আমি এ ভাবে কোনওদিন ভাবিনি। সোমনাথ মন্দিরের কথা আমি পিতা-মাতার কাছ থেকে শুনলেও এখানে না উপস্থিত হলে বুঝতেই পারতাম না, প্রত্যহ কত বিচিত্র রকমের ঘটনা প্রবাহ অহর্নিশ পরিচালিত হয় এখানে। তাই এ মন্দিরের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আমার খুব একটা কৌতুহলও ছিল না। যাই হোক তা হয়তো আজ আর আমার জানার উপায় নেই।’ কথা গুলো বলার পর অঙ্গিরার হঠাৎই কেন জানি মনে পড়ে গেল নরসুন্দর খগেশ্বরের কথা। সে যদি তাঁর পিতা-মাতা সম্পর্কে কোনও তথ্য উদ্ধার করে দিতে পারে অঙ্গিরাকে। তবে একজন নিশ্চিত জানেন ব্যাপারটা। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। কিন্তু তাঁকে তো আর প্রশ্ন করা যাবে না?
অঙ্গিরা এরপর হেসে বলল, ‘যাই হোক না কেন অন্তত এক যুগ, অর্থাৎ বারোটা বছর আমাকে কর্মে নিয়োজিত থাকতে হবে। তেমনই জানিয়েছেন ত্রিপুরারিদেব।’
রাজশ্রী বলল, ‘এখানে থাকতে ভালো লাগবে তোমার? দম বন্ধ লাগবে না? আমার তো প্রতিটা দিন মনে হয় দমবন্ধ হয়ে আসছে। প্রাসাদে আমার প্রতি উপেক্ষা হয়তো ছিল, গোপন নজরদারী যে নিশ্চিত ভাবে ছিল তা এখন বুঝি। কিন্তু এমন কঠিন অনুশাসন সেখানে ছিল না। অন্তত নগরী পরিভ্রমণে যাওয়া যেত, বাগিচায় ভ্রমণ করা যেত, হরিণ শাবক, ময়ূর-ময়ূরিদের নিয়ে খেলা করা যেত।’
অঙ্গিরা বলল, ‘আমার কিন্তু এ মন্দির, প্রভাসপত্তন মন্দ লাগছে না। কত ধরনের, কত দেশের মানুষের নিত্য আনাগোনা। অবশ্য আমার তো আর তোমার মতো বিধিনিষেধ নেই। মন্দির বা নগরীর যে-কোনও স্থানে আমি যেতে পারি।’
রাজশ্রী বিষণ্ণভাবে বলল ‘আমারতো সে সুযোগ নেই। আমি পিঞ্জরবদ্ধ।’
অঙ্গিরা তাকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, ধরো যদি তোমাকে মুক্তি দেওয়া হল, তবে কোথায় যাবে তুমি? চালুক্য প্রাসাদে কি আবার তোমার স্থান হবে?’
প্রশ্নর জবাবে রাজশ্রী একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘না, তা হবে না। আর সেখানে আমার স্থান হলেও মৃত্যু ওৎ পেতে থাকবে। যদি দূরে অচেনা, অজানা কোনও স্থানে চলে যাওয়া যায়। স্বাধীন ভাবে নর্তকীর জীবনও তো কাটাতে পারি?’
অঙ্গিরা হেসে বলল ‘তা হয়তো কাটাতে পারো। হয়তো বা কোনও রাজ সভাতে রাজনর্তকীও হতে পারো। এ ব্যাপারে তোমার দক্ষতা সম্পর্কে কোনও সংশয় নেই।
রাজশ্রী বলল, ‘চালুক্য রাজ পরিবারের রমণীদের মধ্যে নৃত্যগীতের চল আছে। সে শিক্ষা আমি এ স্থানের আসার পূর্বেই পেয়েছি। এখানে যারা দেবদাসী, তারা অনেকেই এখানে আসার পর নৃত্যের তালিম পায়। আমার ব্যাপারটা তা নয়।’
অঙ্গিরার এবার খেয়াল হল, যে ব্যাপারের জন্য তার এখানে আসা সেই আসল কাজটাই তো বাকি থেকে গেছে! অঙ্গিরা পোশাকের ভিতর থেকে ঘুঙুরদানাটা বার করে তালুর ওপর রেখে বাড়িয়ে দিল দেবদাসী সমর্পিতার দিকে।
রাজশ্রীও যেন ভুলেই গেছিল ঘুঙুরদানার কথা। যুবক অঙ্গিরার উপস্থিতিই যেন তার কাছে শুধুমাত্র আকাঙ্ক্ষিত মনে হচ্ছিল। হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। চাঁদের আলোতে ঝলমল করছে অঙ্গিরার হাতে রাখা ঘুঙুরদানাটা।
রাজশ্রী হাত বাড়াল সেটা নেবার জন্য। কিন্তু অঙ্গিরার হাত স্পর্শ করতেই কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হল রাজশ্রীর মনে। অঙ্গিরার করতলের ওপর প্রথমে হাতটা রাখল সে। তারপর ধীরে ধীরে চেপে ধরল হাতটা। এ যেন সেই হাত, যে হাতের ওপর ভরসা করা যায়! এ হাত সেই হাত যে হাত তার নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে অগ্নিবলয় থেকে রক্ষা করেছে তুচ্ছ দেবদাসীকে!
যুবক অঙ্গিরার হাতও এ ভাবে কোনও দিন স্পর্শ করেনি কোনও নারী। এক অনাস্বাদিত ভালোবাসার শিহরন যেন তার ধমনীতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল! এক অদ্ভুত ভালোলাগার পরশ। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে অঙ্গিরা। সে দৃষ্টিতে কেমন যেন এক আর্তি ফুটে উঠেছে অঙ্গিরার প্রতি।
সমুদ্রর বাতাসে চুল উড়ছে রাজশ্রীর। মুখমণ্ডলে জ্যোৎস্নার আলো। যেন এক অপ্সরা! অঙ্গিরার পাথর কুঁদে তৈরি করার মতো দেখতে শরীর বেয়েও চুঁইয়ে নামছে জ্যোৎস্নার আলো।
দীর্ঘক্ষণ সে ভাবেই হাতে হাত রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল তারা। যেন তারা সোমনাথ মন্দিরের প্রস্তর মূর্তি। যুগ যুগ ধরে ওভাবেই যেন দাঁড়িয়ে আছে! নিশ্চুপ দুজনেই, কিন্তু যেন কত কথা হয়ে চলেছে তাদের দুজনের মধ্যে!
চাঁদের আলো যখন ম্লান হয়ে এল তখন সম্বিত ফিরল অঙ্গিরার। রাজশ্রীর হাতটা তুলে নিয়ে সে নিঃশব্দে চুম্বন করে, ঘুঙুরদানাটা রাজশ্রীর মুঠিতে ধরিয়ে দিয়ে বলল ‘এবার ফিরতে হবে আমাকে।’
রাজশ্রী অস্ফুটভাবে বলল, ‘আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকব।’
দেবদাসীদের আবাসস্থল ত্যাগ করে অঙ্গিরা যখন বাইরে উদ্যানে বেরিয়ে এল তখনও তার ঘোর কাটেনি। সে যেন তখনও তার করতলে অনুভব করছে রাজশ্রী-দেবদাসী সমর্পিতার উষ্ণ স্পর্শ, কানে বাজছে তার কণ্ঠস্বর।
কক্ষে ফিরে আজ আর নিদ্রার অবকাশ নেই অঙ্গিরার। প্রধান পুরোহিতের নির্দেশমতো সূর্য ওঠার পর তাকে সমুদ্র তীরে যেতে হবে, মস্তক মুণ্ডণ-সহ তাঁর পিতা-মাতার পারলৌকিক কার্য সম্পাদনের জন্য।
রাজশ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে ক্ষয়াটে চাঁদের আলোতে মূল মন্দির চত্বর সংলগ্ন অতিথিশালাতে ফেরার পথ ধরল অঙ্গিরা। মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল অঙ্গিরা। প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একজন। অঙ্গিরাকে সে খেয়াল করেনি। যে পথ ধরে অঙ্গিরা ফিরবে সে পথ ধরেই হাঁটতে লাগল সে।
চাঁদের আলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। রাত শেষ আর ভোরের আলো ফোটার মধ্যবর্তী এ সময়টাতে আবার অন্ধকার গাঢ় হয়, তা ছাড়া কুয়াশাও আছে। অঙ্গিরাও নিশ্চুপ ভাবে অনুসরণ করল লোকটাকে। কিছু সময়ের মধ্যেই লোকটাকে অঙ্গিরা যেন চিনতে পারল। এ লোক নিশ্চিত নাপিত শিরোমণি খগেশ্বর। অবয়ব তো তারই মতন, হাঁটার ভঙ্গিও এক। তা ছাড়া অঙ্গিরা যতটুকু বুঝতে পারছে তাতে লোকটার মাথার চুল ধবধবে সাদা! অমন সাদা চুল তো সোমনাথ মন্দিরে বা নগরীতে দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির দেখেনি সে। কিন্তু রাতে কোথায় গেছিল নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ? তাছাড়া সে তো মন্দিরের বাইরে বাস করে! তোরণ এখনও উন্মুক্ত হয়নি, তবে নিশ্চই গতরাতে মন্দির চত্বরেই ছিল!
ব্যাপারটা ভেবে একটু অবাক হয়ে, খগেশ্বরের কাছে পৌঁছবার জন্য দ্রুত পা চালাল সে। কিন্তু তার কাছে পৌঁছবার আগেই হঠাৎই যেন কোথায় মিলিয়ে গেল সে! সম্ভবত কোনও ধংসস্তূপের আড়ালে চলে গেল লোকটা। অঙ্গিরা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে জায়গাতে। কিন্তু খগেশ্বরকে আর দেখতে পেল না। অগত্যা ফেরার পথ ধরল সে। অঙ্গিরা কক্ষে ফেরার কিছু সময়ের মধ্যেই ধ্রুবতারা ফুঠে উঠল। ঝমঝম শব্দে বাজল সোনার শিকল।
