সোমনাথ সুন্দরী – ১৫
১৫
নাপিত শিরোমণি বৃদ্ধ খগেশ্বরের সঙ্গে অঙ্গিরার কিন্তু সাক্ষাৎ হয়ে গেল সকালবেলাতেই। ভোরের আলো ফোটার পর ত্রিপুরারিদেব তাকে সমুদ্রতীরে সেই স্তম্ভর কাছে উপস্থিত হবার নির্দেশ দিয়েছিলেন গত রাতে। অঙ্গিরা সেই নির্দেশ পালনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতেই দেখল খগেশ্বর তার ক্ষৌরকারের ক্ষুদ্র পেটিকা নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। অঙ্গিরাকে দেখে সে বলল, ‘প্রধান পুরোহিত আমাকে এখানে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, আপনার মস্তক মুণ্ডণের জন্য। কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি এসে পড়বেন।’
অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে গর্ভগৃহর দ্বার উন্মোচন করে সোমেশ্বর মহাদেবের স্নান ও দিনের প্রথম পূজা সাঙ্গ করেই তিনি উপস্থিত হবেন এখানে। সময় হয়ে এসেছে। ওই শুনুন, গর্ভগৃহ চত্বরের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে।’
এ কথা বলার পর অঙ্গিরার মনে হল, মন্দিরের ভিতর সেই প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের সামনে শেষ রাতে উপস্থিতির কারণটা একবার জিগ্যেস করে খগেশ্বরকে। কিন্তু সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না, নাপিত শিরোমণিকে প্রশ্নটা করা সমীচীন হবে কিনা। এমনও তো হতে পারে যে অঙ্গিরা কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারের মধ্যে যাকে তফাত থেকে দেখেছে সে খগেশ্বর নয়, অন্য কেউ! অঙ্গিরা, তাকে প্রশ্ন করবে কি করবে না ভাবছিল, কিন্তু তাদের আলোচনার বিষয় এরপর অন্যদিকে ধাবিত হল। খগেশ্বর প্রশ্ন করল ‘আপনি কিছু শুনেছেন?’
‘কী ব্যাপারে?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।’
বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, ‘গজনীর মামুদের নাম শুনেছেন? সুলতান মামুদ আবার হানা দিয়েছে এ দেশে। সঙ্গে বিশাল বিধর্মী বাহিনী। রাজপুতদের আজমের নগরী ধ্বংস করার পর সে এদিকেই আসছে!’
খগেশ্বরের কথা শুনে অঙ্গিরা বলল, ‘তাই নাকি? না আমি কিছু শুনিনি এ ব্যাপারে।’
খগেশ্বর বলল ‘হ্যাঁ, সেই পাষণ্ডটা আসছে মাধেরার পথে। মহারাজ মাণ্ডলিক মাধেরাতে ওই বিধর্মী আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ করার জন্য নাকি সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছেন। নগরীতে যাতে আতঙ্ক না ছড়ায় সে জন্য রাজপ্রাসাদের তরফে ঘটনাটা আপাতত গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু কী ভাবে খবরটা যেন নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল গভীর রাতে সেনাবাহিনীকে মাধেরার পথে যাত্রা করতে দেখেছে কেউ কেউ। হয়তো-বা সেখান থেকেই খবরটা ছড়িয়েছে। ভোর হতেই শহরের নানা স্থানে আলোচনা শুরু হয়েছে।’
অঙ্গিরা খবরটা শুনে বিস্মিত ভাবে বলল, ‘নগরবাসী বা মন্দিরের এ ব্যাপারে আশঙ্কার কারণ আছে?’
বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘যদি, মাধরাতে হিন্দু সেনারা বিধর্মীদের প্রতিরোধ করতে সমর্থ হয়, অথবা রাজাধীরাজ পরমদেওর বাহিনী যদি নির্দিষ্ট সময় এখানে এসে উপস্থিত হয় তবে আশঙ্কার কারণ নেই, নচেৎ অবশ্যই আছে। মাধেরার যুদ্ধে গজনী বাহিনী যদি আমাদের সেনাদলকে পরাস্ত করে তবে নিশ্চয়ই তারা প্রভাসপত্তনের পথে ধেয়ে আসবে সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনের জন্য। এ মন্দিরের মতো ধনসম্পদ যে এ দেশের কোনও মন্দিরে বা রাজকোষে নেই সে খবর নিশ্চয়ই মামুদের জানা। মন্দির লুণ্ঠনের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে না সে। গজনীর সুলতান হিন্দুদের মাটিতে প্রতি বৎসর হানা দেয়ই সম্পদ লুঠতরাজ, নারী আর ক্রীতদাস সংগ্রহর জন্য।’
অঙ্গিরা বলল, ‘সংবাদটা তবে গুরুতর!’
খগেশ্বর বলল, ‘তা তো বটেই। আরব জুয়ানেদের বাহিনী কী ভাবে সোমেশ্বর মন্দির ধ্বংস করেছিল, কী ভাবে প্রভাসপত্তন নগরীতে নারকীয় হত্যালীলা, ধর্ষণ চালিয়েছিল সে সব কাহিনী বংশ পরম্পরায় শুনে আসছে নগরবাসী। পুরোনো মন্দিরগুলো আজও মানুষের চোখের সামনে সেই ভয়ঙ্কর দিনের সাক্ষ বহন করছে।
এই বালুতটেই মন্দিরের পুরোহিতদের সারবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে মস্তক ছেদন করেছিল জুয়ানেদ বাহিনী। বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্রের জল লাল হয়ে গেছিল নিরীহ পূজারিদের রক্তে। আজও এ বালুতট খুঁড়লে পাওয়া যায় তাদের শিলাভূত প্রাচীন অস্থি, ধাতব কর্ণকুণ্ডল ইত্যাদি। মাসুদের অভিযানের সংবাদে নগরবাসীদের আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। সে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল বলে। গতকাল পুরোহিত মল্লিকার্জুন রাজপ্রাসাদে গেছিলেন। আমার ধারণা, মন্দির কর্তৃপক্ষকে মামুদের ঘটনাটা জানিয়ে রাখার জন্যই রাজা ভীম তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।’
অঙ্গিরা বলল ‘কিন্তু এ নগরী, মন্দিরের রক্ষাকর্তা তো স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেব। তিনি কি রক্ষা করবেন না তাঁর উপাসকদের? রক্ষা করবেন না নিজের আবাসস্থল? এ মন্দিরে তো তিনি জীবন্ত বিগ্রহ রূপে আবির্ভূত।’
বহুদর্শী বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে তার ডান হাত সোমেশ্বর মহাদেবের উদ্দেশ্যে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, প্রভু সোমেশ্বরই রক্ষাকর্তা। পৃথিবীর সব কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন।’
অঙ্গিরা এরপর আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে এবং অঙ্গিরা দুজনেই দেখতে পেল, মন্দির ত্যাগ করে তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। তার সঙ্গে দুজন সেবায়েতও আছে। বেশ কিছু সামগ্রী বহন করে আনছে তারা।
অঙ্গিরা আর খগেশ্বর দুজনেই নত মস্তকে প্রণাম জানাল তাঁকে। প্রধান পুরোহিত তাদের উদ্দেশ্যে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে তাঁর দক্ষিণ হস্ত কিছুটা তুললেন। তারপর খগেশ্বরকে বললেন, ‘তুমি ওর মস্তক মুণ্ডণ করো। তারপর ওর পিতা-মাতার পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করা হবে।’
বালুতটে একটা স্থান নির্বাচন করে সেখানে সেবায়েতদের নিয়ে সেই কার্য সম্পাদনের উপাচার সাজাতে বসলেন প্রধান পুরোহিত। তাদের কিছুটা তফাতে খগেশ্বরের সঙ্গে অঙ্গিরা বসল মস্তক মুণ্ডণ আর শ্মশ্রু-গুম্ফ মোচনের জন্য। পেটিকা থেকে বেশ বড় একটা ক্ষুর বার করে অঙ্গিরার মস্তক মুণ্ডণ শুরু করল।
খগেশ্বরের কাজ কিছু সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হল। মুণ্ডিত মস্তক অঙ্গিরা গিয়ে দাঁড়াল ত্রিপুরারিদেবের সামনে। তিনি ও তার সঙ্গীরা তখন প্রয়োজনীয় নানা উপাচার সাজিয়ে ফেলেছেন বালুতটে। পুরোহিত, অঙ্গিরাকে বললেন, ‘ওই স্তম্ভের কাছে গিয়ে অবগাহন করে এসো। তারপর এই যে বস্ত্রখণ্ড রাখা আছে তা পরিধান করে মেটে হাড়িতে তণ্ডুল প্রস্তুত করতে হবে কাষ্ঠ আগুনে। ওই রন্ধন করা তণ্ডুল দিয়ে পিণ্ড তৈয়ার হবে। তবে ওই স্তম্ভ অতিক্রম কোরো না। ওর পর আর তল নেই।’ ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে অঙ্গিরা এগোল সমুদ্রস্নানের জন্য।
জল ভেঙে অঙ্গিরা পৌঁছে গেল স্তম্ভর কাছে। কোমর সমান জল সেখানে। স্তম্ভর লম্বাটে একটা ছায়া পড়েছে জলে। ডুব দিল অঙ্গিরা। প্রথমে একটা ডুব। দ্বিতীয় ডুব দেবার সময় অঙ্গিরার মনে হল জলের ভিতর স্তম্ভর ছায়াটা যেন কেঁপে উঠল। তৃতীয় ডুব দিল অঙ্গিরা। এরপর সে ফেরার জন্য পিছু ফিরতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় স্তম্ভর ছায়াটা জলতল থেকে লাফিয়ে উঠে আলিঙ্গন করতে শুরু করল অঙ্গিরাকে!
ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল অঙ্গিরার। তারপর সে বুঝতে পারল এক সামুদ্রিক অজগর সর্প লেজ দিয়ে তার শরীরকে পেঁচিয়ে ধরতে শুরু করেছে! জলতলের ওপর অঙ্গিরার মুখের সামনে জেগে উঠেছে তার প্রকাণ্ড মাথাটা! কী হিংস্র ত্রু্ুর দৃষ্টি তার চোখে! হাঁ করল সেই মহাসর্প। কী বিশাল সেই মুখগহ্বর! হিংস্র দাঁত আর চেরা জিভ প্রস্তুত হয়ে আছে অঙ্গিরাকে গিলে খাবার জন্য। সেই ভয়ঙ্কর মুখগহ্বর এগিয়ে আসছিল অঙ্গিরার মাথাটা তার ভিতর পুরে নেবার জন্য। মাথার দিকে থেকেই শিকারকে গলাধঃকরণ করে অজগর সর্প। তবে সে ঘটনা ঘটার আগেই অঙ্গিরা তার বলিষ্ঠ দক্ষিণ হস্ত দিয়ে চেপে ধরল তার গলা। দুজনের মধ্যে প্রবল সংঘর্ষ শুরু হল। ছিটকে উঠতে লাগল সমুদ্রর জল। অঙ্গিরা সেই মহাসর্পর গলা চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল, ‘সাহায্য করো, সাহায্য করো আমাকে! রক্ষা করো সর্পর কবল থেকে!’
তার আর্ত চিৎকার কানে যেতেই ত্রিপুরারিদেব-সহ সমুদ্রতটে যে সব মানুষ ছিল তাদের সকলের চোখে পড়ল সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য। ভয়ঙ্কর অজগর সর্প আলিঙ্গন করেছে অঙ্গিরাকে। তার থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা চালাচ্ছে অঙ্গিরা, আর চিৎকার করে সাহায্য প্রার্থনা করছে!
কিন্তু কে তাকে সাহায্য করবে? ওই যুবককে বাঁচাতে গেলে ওই সর্পরাজ যদি যুবককে ছেড়ে রক্ষাকারীকে আলিঙ্গন করে তবে তার মৃত্যু নিশ্চিত। কাজেই কেউ জলে না নেমে সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত ভাবে চিৎকার শুরু করল। কিন্তু সমুদ্রসর্প ব্যাঘ্র বা ভল্লুকের মতো ডাঙার প্রাণী নয় যে চিৎকার শুনে শিকারকে ছেড়ে দেবে। শিকার তার মুখের সামনে। কতক্ষণ সে লড়বে তার শরীরের নিষ্পেষণের সঙ্গে? পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
অঙ্গিরার কোমর পর্যন্ত পেঁচিয়ে আছে লেজ। তার প্রচণ্ড পেষণে অঙ্গিরার শরীরে অস্থি যেন চুরমার হয়ে যাচ্ছে! অবসন্ন হয়ে আসতে লাগল অঙ্গিরার দেহ, শিথিল হয়ে আসতে লাগল তার মুষ্টি।
তার শিকার যে দুর্বল হয়ে পড়ছে তা যেন বুঝতে পারল সেই মহাসর্প। সে এবার চেষ্টা শুরু করল শিকারকে স্তম্ভর ওপাশে টেনে নিয়ে যাবার। যাতে তাকে তার গলাধঃকরণে সুবিধা হয়।
সেই অবস্থাতেই হঠাৎই কেন জানি অঙ্গিরার মনে যেন ভেসে উঠল সমর্পিতার মুখ! অঙ্গিরার জীবনের আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত বাকি। ঠিক সেই সময় অঙ্গিরা খেয়াল করল তার আর এক পাশে কি যেন একটা আবির্ভূত হয়েছে! এই মহাসর্পর কোনও সঙ্গী বা সঙ্গিনী নাকি? কিন্তু অঙ্গিরা শুনতে পেল খগেশ্বরের কণ্ঠস্বর, ‘গলা চিরে ফেলো, কণ্ঠ ছিন্ন করে দাও ওর।’ জলের ভিতর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে ক্ষুর বাড়িয়ে দিচ্ছে খগেশ্বর।
বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা করতেই হবে। অঙ্গিরা কোনওক্রমে বাম হাত দিয়ে ক্ষুরটা নিল, তারপর তা দিয়ে আঘাত হানতে শুরু করল সর্পরাজের গলাতে, আর তার বীভৎস চোখ দুটোতে। ফোয়ারার মতো রক্ত বেরোতে লাগল সর্পরাজের ছিন্ন কণ্ঠদেশ থেকে, লাল হয়ে উঠল সমুদ্রের জল।
ব্যাপারটা এবার উল্টো ঘটল, অবসন্ন হয়ে আসতে লাগল সেই মহাসর্পর দেহ। শিথিল হয়ে আসতে লাগল নাগপাশ। অঙ্গিরাও ব্যাপারটা বুঝতে পারল। আতঙ্ক মুছে গিয়ে শক্তি ফিরে এল তার মনে শরীরে। দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে সে আঘাত হানতে লাগল সেই মহাসর্পর শরীরে।
এক সময় সত্যিই নাগপাশ খসে গেল অঙ্গিরার দেহ থেকে। আর এরপরই কোথা থেকে যেন একটা প্রবল ঢেউ এসে অঙ্গিরা আর খগেশ্বরকে জল থেকে তুলে নিয়ে সমুদ্র তটের বালু রাশিতে ছুড়ে ফেলল।
আসন্ন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা অঙ্গিরার ধাতস্থ হতে মৃদু সময় লাগল। সে যখন উঠে দাঁড়াল তখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রধান পুরোহিত। আর অন্য কিছু মানুষও সেখানে উপস্থিত হয়েছে যারা এতক্ষণ জলে নেমে অঙ্গিরাকে বাঁচাবার চেষ্টা না করে সর্পদানবের সঙ্গে অঙ্গিরার মরণপণ সংগ্রাম দেখছিল।
অঙ্গিরা উঠে দাঁড়িয়ে দেখল তারই পাশে সিক্ত বসনে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছে বৃদ্ধ নরসুন্দরপতি।
সে কৃতজ্ঞতা পরবশ হয়ে খগেশ্বরকে বলল, ‘আপনি আমার জীবন রক্ষা করলেন। ক্ষুরটা আমার হাতে তুলে না দিলে কিছুতেই আমি নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারতাম না। নিশ্চিত মৃত্যু ঘটত আমার।’
কথাটা শুনে হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধর মুখে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই সে হাসি অন্তর্হিত হল প্রধান পুরোহিতের কথাতে। খগেশ্বরের উদ্দেশ্যে অঙ্গিরার কথা শুনে ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘একজন সামান্য শূদ্রের ক্ষমতা কি যে সে নিয়তিকে খণ্ডন করে? আমি ব্রাহ্মণ, সোমেশ্বর দেবতার প্রধান পুরোহিত। আমার সে ক্ষমতা নেই। তোমার নিয়তিকে কেউ যদি খণ্ডন করে থাকে, তোমার প্রাণ রক্ষা করে থাকেন তবে তিনি একমাত্র সোমেশ্বর মহাদেব। তাঁর কাছে তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, প্রণাম জানাও সেই দেবতার উদ্দেশ্যে।’
ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে সমবেত জনতা জয়ধ্বনি করে উঠল, ‘হর হর মহাদেব! জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়!’
উপস্থিত জনতাকে এরপর সে স্থান ত্যাগ করতে বললেন ত্রিপুরারিদেব। তারা অন্তর্হিত হবার পর অঙ্গিরাকে দিয়ে কার্যারম্ভ হল। নতুন বস্ত্র পরিধান করে মেটে হাড়িতে কাঠের আগুনে তণ্ডুল রন্ধন করে পুরোহিতের মুখোমুখি কুশাসনে বসল মুণ্ডিত মস্তক অঙ্গিরা। কদলী, তিল, ঘৃত, মধু, রন্ধন করা তণ্ডুলের সঙ্গে মিশ্রিত করে রচনা করা হলে পিণ্ডগোলক। অন্যান্য নানা উপচারও সেখানেই ছিল। সে সব সহযোগে শুরু হল মন্ত্রোচ্চারণ সহ নানাবিধ কাজ।
বেশ অনেকক্ষণ ধরে সে সব চলার পর অন্তিম লগ্নে পিণ্ড উৎসর্গ করা হল অঙ্গিরার পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে। পিণ্ড দান হবার পর পিণ্ড গোলকগুলি বায়সপক্ষীদের নিবেদন করাই প্রথা। বায়সপক্ষী বা কাকের রূপ ধরে আত্মারা নাকি পিণ্ডভক্ষণ করতে আসেন। অঙ্গিরা সমুদ্রতটে বেশ কয়েকদিন ঘুরে বেড়াবার ফলে এ ব্যাপারে কিছু নিয়ম সম্বন্ধে অবগত হয়েছে।
বেশ বড় আকারের দুটো কাকও খাবারের প্রত্যাশাতে অঙ্গিরাদের কিছুটা তফাতে এসে বসেছে। পিণ্ডদান সম্পন্ন হবার পর অঙ্গিরা পুরোহিতকে প্রশ্ন করল, ‘আমি কি এই পিণ্ডগোলক সমূহ ওই বায়সপক্ষীদের নিবেদন করে আসব?’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন ‘না, এ পিণ্ডদান প্রক্রিয়া সাধারণ প্রক্রিয়া নয়। তুমি এই ধাতব কলসের মধ্যে পিণ্ডগুলি রাখো। এ কলস আমি আমার কাছে রাখব। তুমি যে কার্যে নিয়োজিত হতে চলেছ, যেদিন তুমি সেই কার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তার পরদিন প্রত্যুষে এই পিণ্ড আমি বায়স পক্ষীদের নিবেদন করব। মনে রেখো, সেই নিবেদন কার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তোমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তি ঘটবে না।’
পুরোহিতের নির্দেশ পালন করে অঙ্গিরা কলসবন্দি করল পিণ্ড গোলকগুলি। সাঙ্গ হল কাজ। প্রধান পুরোহিত উঠে দাঁড়াবার পর অঙ্গিরা ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম জানাল তাকে। সেবায়েত সঙ্গী দুজনও পিণ্ড কলস নিয়ে মন্দিরে প্রস্থান করার আগে ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘তিন দিবস কক্ষ ত্যাগ করবে না তুমি। রুদ্ধ কক্ষে বসে পিতা-মাতাকে স্মরণ করবে। তাদের আত্মার মুক্তি প্রার্থনা করবে। আজ পূর্ণিমা, আগামী পূর্ণিমাতে কার্যভার গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনদিন পরে পরে তিনদিনের জন্য রুদ্ধদ্বার অন্ধকার কক্ষে এ প্রার্থনা চালিয়ে যাবে তুমি। তাতে তাঁদের মুক্তির পথ প্রশস্ত হবে। অন্ধকার কক্ষে প্রথমবার তিন দিবস থাকতে হয়তো অস্থির লাগবে। কিন্তু পরবর্তীতে তা অভ্যাস হয়ে যাবে।’
প্রধান পুরোহিতের কক্ষের সন্নিকটে সমুদ্র স্নানে আসার যে সোপানশ্রেণী আছে, সঙ্গীদের নিয়ে সে পথেই মন্দিরে ফিরে গেলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরাকেও ফিরতে হবে এবার। সে দেখতে পেল কিছুটা তফাতে খগেশ্বর দাঁড়িয়ে আছে।
অঙ্গিরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কেমন যেন অদ্ভুত বিষণ্ণতা তার মুখমণ্ডলে। হয়তো বা প্রধান পুরোহিতের বলা কথার জন্যই। ব্যাপারটা ভেবে নিয়ে অঙ্গিরা তাকে বলল, ‘সোমেশ্বর মহাদেবের ইচ্ছাতেই এই পৃথিবীর সব কিছু পরিচালিত হয় জানি, কিন্তু তবুও আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।’
নাপিত শিরোমণি খগেশ্বর বিষণ্ণ হেসে জবাব দিল, ‘সোমেশ্বর মহাদেবকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার নেই। তাঁর কাছে আমিও কৃতজ্ঞ, আমার মতো শুদ্রকে দিয়ে তিনি তোমাকে সাহায্য করালেন বলে।’
অঙ্গিরার মনে হল এই বৃদ্ধকে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কোনও উপহার প্রদান করা প্রয়োজন। ত্রিপুরারিদেবের দেওয়া স্বর্ণমুদ্রাগুলি তো তার কাছে রয়েইছে। সে কথা ভেবে অঙ্গিরা বলল, ‘আমি যদি আপনাকে কৃতজ্ঞতা পরবশত কিছু উপহার দিই তবে তা আপনি গ্রহণ করবেন?’
বৃদ্ধ হেসে বললেন, ‘না, কোনও উপহারের প্রয়োজন নেই আমার। তা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে আমার নিজেরও মনে হতে পারে যে নিজের অবচেতনে কোনও পারিতোষক লাভের আকাঙ্ক্ষাতে তোমাকে সাহায্য করতে গেছিলাম।’ এরপর একটু থেমে সে বলল, ‘তুমি যদি সত্যিই আমার জন্য কিছু দিতে চাও তবে অন্য একটা জিনিস সাময়িক ভাবে চাইব তোমার কাছে। দিলে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’
‘কী জিনিস?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।
খগেশ্বর বলল, ‘চলো, তোমার সঙ্গে কক্ষের দ্বার পর্যন্ত যাই। তারপর বলছি।’
মন্দিরে ফেরার জন্য হাঁটতে শুরু করলে তারা দুজন। কিছু সময়ের মধ্যেই সমুদ্রতট ত্যাগ করে তারা পৌঁছে গেল মন্দিরের প্রধান তোরণের কাছে। আজ পূর্ণিমা বলে দর্শনার্থীদের ভিড় অন্য দিনের তুলনাতে অনেক বেশি। ‘হর হর মহাদেব’, ‘জয় সোমেশ্বর মহাদেব’ ধ্বনিতে মুখরিত চারদিক। শোনা যাচ্ছে অবিরাম ঘণ্টাধ্বনি। তবু তারই মধ্যে মন্দিরে প্রবেশ করার পর সেবায়েত ও পুণ্যার্থীদের ছোট ছোট জটলা যেন মাঝে মাঝে চোখে পড়তে লাগল। নীচু স্বরে কথা বলছে তারা। সেবায়েতদের তেমনই একটা ছোট জটলার দিকে অঙ্গিরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে খগেশ্বর বলল, ‘তোমাকে বললাম না, মামুদের আক্রমণের খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে! তাই নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। এ সংবাদ বড় সংক্রামক।’
অঙ্গিরা খগেশ্বরকে নিয়ে অতিথিশালাতে তার কক্ষে পৌঁছে গেল। নাপিত শিরোমণিকে আমন্ত্রণ কক্ষে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাতে সে-ও কক্ষে প্রবেশ করল। অঙ্গিরা এরপর তাকে প্রশ্ন করল, ‘এবার বলুন আপনি কি চান আমার কাছে?’
বৃদ্ধ একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরাকে চমকে দিয়ে বলল, ‘তোমার কাছে যে সোমেশ্বর মুদ্রাটা আছে সেটা দেবে আমাকে?’
অঙ্গিরা বলল, ‘ওটা কী ভাবে দেব আপনাকে? ও মুদ্রা তো আমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে প্রধান পুরোহিতকে।’
খগেশ্বর বলল ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেবে ফিরিয়ে। আমি শুধু তিনদিনের জন্য ও মুদ্রা ধার চাচ্ছি তোমার কাছে। বিশ্বাস রাখো, তিনদিন পর আমি তোমাকে ওই মুদ্রা ফিরিয়ে দেব।’
খগেশ্বরের কথা শুনে তাকে কি জবাব দেবে তা বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল অঙ্গিরা। তা দেখে খগেশ্বর বলল, ‘তুমি যদি তার বিনিময় আমার সারা জীবনের সম্পদও দাবি করো তাও দিতে আমি রাজি।’
অঙ্গিরা বলল ‘না, না, সে সব গ্রহণ করার প্রশ্ন নেই।’
নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ এরপর বললেন, ‘আমার বৃদ্ধা স্ত্রী মৃত্যুশয্যায়। তার বহু দিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল যে তাঁর স্বামী সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী হোক। কিন্তু সেই অবলা নারীর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় যে, যেখানে ওই মুদ্রার দাবি নিয়ে ব্রাহ্মণদের মধ্যেই তীব্র প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে একজন শূদ্রের পক্ষে এ সৌভাগ্য লাভ অসম্ভব। হয়তো-বা আর দু-দিন মাত্র তার আয়ু। তার মৃত্যুর আগে তার হাতে এ মুদ্রাটা তুলে দিয়ে আমি তাকে দেখাতে চাই যে আমি সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী হয়েছি। হয়তো ব্যাপারটা মিথ্যা হবে, কিন্তু মৃত্যু পথযাত্রী শেষ আনন্দ-শান্তি পাবে তাতে। আবারও বলছি, আমি শূদ্র হতে পারি, কিন্তু প্রতারক নই। তোমার মুদ্রা তুমি নির্দিষ্ট সময় ফেরত পাবে।’
খগেশ্বরের কথা শুনে অঙ্গিরা বলল, ‘কিন্তু এ খবর যদি প্রধান পুরোহিতের কর্ণগোচর হয় তবে আমি ভর্ৎসৃত হব। শাস্তিও হতে পারে।’
খগেশ্বর জবাব দিল, ‘তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, এ বিষয়ে কাকপক্ষীও জানবে না।’
এরপর আর কিছু বলার থাকে না। অঙ্গিরা তার সামগ্রীর মধ্যে মুদ্রাটা যেখানে রাখা ছিল সেখান থেকে তা বার করে বৃদ্ধর হাতে তুলে দিল। সোমেশ্বর মুদ্রাটা হাতে নিয়ে চকচক করে উঠল খগেশ্বরের মুখ। সে বলে উঠল, তোমার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ রইলাম। আর হ্যাঁ, তোমার পিতা-মাতার পরিচয়, দ্রুত সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি আমি।’ কথাগুলো বলে কক্ষ ত্যাগ করল বৃদ্ধ নাপিত শিরোমণি।
সে চলে যাবার পর প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ মতো দ্বার বন্ধ করে অন্ধকার কক্ষে পিতা-মাতাকে স্মরণ করতে বসল অঙ্গিরা। পল-দণ্ড-প্রহর-সময় এগিয়ে চলল। বাইরে দিন কেটে গিয়ে সূর্যাস্ত হল একসময়। নিঃস্তব্ধতা, অন্ধকার নেমে এল সোমনাথ মন্দিরে। আর রাত্রি নামার সঙ্গে-সঙ্গেই মনসংযোগ ছিন্ন হতে শুরু করল অঙ্গিরার। তার বন্ধ চোখে ভেসে উঠতে লাগল রাজশ্রী-দেবদাসী সমর্পিতার মুখ! সে যেন ডাকছে তাকে! জ্যোৎস্না আলোকিত সেই প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসছে তার আহ্বান! অঙ্গিরার জন্য অপেক্ষা করছে সে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে আহ্বান যেন তীব্র হতে লাগল। এক একসময় অঙ্গিরার মনে হতে লাগল, কক্ষ ত্যাগ করে সে রওনা হয় তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রাখল অঙ্গিরা। তবে যে তার মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারল না সেই দেবদাসীকে। অন্ধকার কক্ষে নিজেকে আবদ্ধ রাখলেও, তার চোখে শুধু ভেসে উঠতে লাগল দেবদাসী সমর্পিতার করুণ মুখ।
