সোমনাথ সুন্দরী – ১৬
১৬
তিনটে দিন বদ্ধ কক্ষেই কাটাল অঙ্গিরা। কিন্তু এ তিনদিন নিদ্রায়-জাগরণে সে শুধু দেবদাসী সমর্পিতার কথাই ভেবেছে। অঙ্গিরা নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না কেন এমন হচ্ছে। সামান্য কয়েকদিনের পরিচয় বই তো তাঁর সঙ্গে অন্য কোনও সম্পর্ক নেই রাজশ্রী-দেবদাসী সমর্পিতার। একেই কি তবে প্রেম বলে? সে কখন, কীভাবে এসে মানুষের মনে হানা দেয় তা কেউ বুঝতে পারে না। নইলে কেন তার প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ছে সেই দেবদাসীর কথা?
তৃতীয় দিন সূর্যাস্তের পর কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। যদি ত্রিপুরারিদেব এ তিনদিনের মধ্যে দেবদাসী সমর্পিতাকে নৃত্য প্রদর্শনের অনুমতি দিয়ে থাকেন, সে কথা ভেবে তাকে দর্শনের আশাতে অঙ্গিরা মন্দিরে উঠে হাজির হল গর্ভগৃহর সামনে। অন্য সন্ধ্যার মতো যারা যারা সেখানে উপস্থিত থাকেন, সেই নন্দিবাহন, জয়দ্রথ-সহ সবাই সেখানে উপস্থিত।
প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের কাজও শুরু হয়েছে। জয়দ্রথের সঙ্গে অন্যদিন প্রথম দৃষ্টি বিনিময় হলে তিনি হাসেন অঙ্গিরাকে দেখে। এদিন কিন্তু তার মুখে হাসি ফুটল না। অঙ্গিরাকে দেখে ঘাড়টা মৃদু ঝোঁকালেন তিনি। পুরোহিত নন্দিবাহন-সহ সবারই মুখমণ্ডল কেমন যেন গম্ভীর বলে মনে হল। তিলোত্তমার নেতৃত্বে এরপর চত্বরে উঠে এল দেবদাসীরা।
নন্দিবাহন প্রদীপদণ্ড দিয়ে সন্ধ্যা আরতি শুরু করলেন। অঙ্গিরার চোখ দেবদাসীদের ভিড়ের মধ্যে খুঁজল দেবদাসী সমর্পিতাকে। না, সে আজও আসেনি। আরতির পর প্রতি সন্ধ্যার মতো মহাদেবের উদ্দেশ্যে নৃত্যগীত শুরু হল এবং শেষও হল। পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন যান্ত্রিক বলে মনে হলো অঙ্গিরার। শুধু কি তা সমর্পিতার অনুপস্থিতির কারণে, নাকি অন্য কিছু কারণ আছে তার পিছনে। হ্যাঁ, কারণ যে একটা আছে তা কিছু সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারল অঙ্গিরা।
নৃত্যগীত সমাপ্ত হবার পর সেদিনের মতো গর্ভগৃহর দ্বার বন্ধ করলেন পুরোহিত নন্দিবাহন। দেবদাসীরা ফিরে গেল। অঙ্গিরাও ফেরার জন্য এগোল সোপানশ্রেণীর দিকে। অঙ্গিরার সঙ্গেই নীচে নামার পথ ধরেছেন রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ। তিনি বললেন, ‘খেয়াল করেছেন, আজ থেকে মন্দিরে দর্শনার্থীদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। দ্বিপ্রহরেই মন্দির প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল!’
কথাটা শুনে অঙ্গিরা বলল, ‘তিনদিন আমি কক্ষত্যাগ করিনি। তাই কিছু দেখিনি। কিন্তু কেন বলুন তো?’
জয়দ্রথ মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘গজনীর সুলতান মামুদ যে এ দেশের দিকে আসছে তা আপনি শোনেননি?’
অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, তা আমি শুনেছি বটে।’
জয়দ্রথ বলল, ‘হ্যাঁ, সে কারণেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই মাধেরাতে যুদ্ধ শুরু হবে। রাজপুত বাহিনী যদি পরাজিত হয় তবে পাতকী মামুদ নিশ্চয়ই সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনের জন্য এখানেও আসবে। নগরীতে কোনও পুরুষকে পেলে হত্যা করবে, নারীদের ধর্ষণ করবে, ক্রীতদাসী হিসাবে ধরে নিয়ে যাবে। যে কারণেই আতঙ্কে পুণ্যার্থীদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। আশেপাশের কয়েকটি রাজ্য নাকি ঢেঁড়া পিটিয়ে তাদের নগরবাসীদের সুরক্ষার কথা ভেবে একথাও জানিয়েছে যে পুণ্যার্থীরা যেন মাধেরা সূর্যমন্দির আর এই প্রভাসপত্তনের সোমনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা আপাতত স্থগিত রাখে।’
অঙ্গিরা বলল, ‘না, এতটা খবর আমার জানা ছিল না।’
জয়দ্রথ বললেন, ‘দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়? এমনকী মন্দিরেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ, নগরবাসীরা প্রয়োজনে প্রভাসপত্তন ত্যাগ করলেও কিছু মানুষ বিশেষত পুরোহিতকুল, দেবদাসীরা আর আমরা কয়েকজন তো কোনও অবস্থাতেই মন্দির ত্যাগ করতে পারব না। শুনলাম, আতঙ্ক নিরসনের জন্য প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব নাকি মন্দিরের বাসিন্দাদের নিয়ে সভা ডাকতে চলেছেন।’ এ কথা বলার পর রক্ষীপ্রধান নীচে নেমে অন্যত্র চলে গেলেন। আর অঙ্গিরাও অতিথিশালায় ফিরে এসে প্রতীক্ষা শুরু করল মধ্যরাতের জন্য।
চাঁদ যখন ঠিক মাথার ওপর উঠল তখন প্রস্তুত হয়ে কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। চাঁদের আলোতে নিস্তব্ধ সোমনাথ মন্দির। রাজশ্রীর সঙ্গে কি তার দেখা হবে? এ কথা ভাবতে ভাবতে আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলতে-দুলতে অঙ্গিরা রওনা হল নির্দিষ্ট স্থানের দিকে। মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংস্তুপ অতিক্রম করে অঙ্গিরা প্রথমে উপস্থিত হল সেই নির্জন কাননে। তারপর সন্তর্পণে দেবদাসীদের আবাসস্থলের তোরণ উন্মুক্ত করে উঠে এল সেই স্তম্ভ সমন্বিত প্রাঙ্গণে। না, চারপাশে কেউ নেই। কক্ষগুলো সব ঘুমন্ত বলেই মনে হলো তার। স্তম্ভের গোলক ধাঁধা পেরিয়ে অঙ্গিরা এগোল সেই বেদির দিকে। কিছুটা এগিয়েই সে দেখতে পেল, হ্যাঁ, সেখানে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা।
স্তম্ভের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করে অঙ্গিরা তার সামনে আবির্ভূত হতেই প্রথমে মুণ্ডিত মস্তক অঙ্গিরাকে হঠাৎ চিনতে না পেরে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল রাজশ্রী। কিন্তু অঙ্গিরা তাড়াতাড়ি তার মুখ চাপা দিয়ে বলে উঠল, ‘আমি অঙ্গিরা।’
কথাটা শুনেই মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক মুছে গিয়ে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সোমনাথ সুন্দরীর চোখ। অঙ্গিরা তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেবার পর দেবদাসী সমর্পিতা কয়েক মুহূর্ত বিস্ময় মিশ্রিত আনন্দ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর প্রশ্ন করল, ‘তোমার গুম্ফ, শ্মশ্রু, অমন সুন্দর কুঞ্চিত কেশ কোথায় গেল?’
অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল ‘পূর্ণিমার দিন পিতা-মাতার পিণ্ডদান উপলক্ষে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশে মস্তক মুণ্ডন করতে হয়েছে।’
রাজশ্রী এরপর একটু অভিমানের স্বরে বলল, ‘তুমি এ তিনদিন আসনি কেন? আমি প্রতিরাতে তোমার জন্য এখানে প্রতীক্ষা করেছি। তারপর শুকতারা ফুটে উঠলে আশাহত হয়ে কক্ষে ফিরে গেছি। সারা দিন শুধু তোমার কথাই মনে পড়েছে আমার।’
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘এ তিনদিন আমারও প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে তোমার কথা। প্রতি রাতেই মনে হয়েছে এখানে চলে আসি। কিন্তু পারিনি। কারণ ত্রিপুরারিদেব তিনদিন কক্ষ ত্যাগ করতে নিষেধ করেছিল আমাকে। আগামী পূর্ণিমাতে তিনি আমার ওপর তার কাজের দায়িত্ব সমর্পণ না করা পর্যন্ত তিনদিন পরপর তিনদিন রুদ্ধ কক্ষে বসে আমাকে আমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। প্রধান পুরোহিত আমাকে সে নির্দেশই দিয়েছেন।’
এ কথা বলার পর একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরা বলল, ‘হয়তো তোমার সঙ্গে আমার আর দেখাই হতো না।’
দেখা হতো না কেন?’ জানতে চাইল দেবদাসী সমর্পিতা।
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘তিনদিন আগে মস্তক মুণ্ডনের পর যখন আমি সমুদ্র স্নানে নেমেছিলাম তখন এক সামুদ্রিক অজগর সর্প আক্রমণ করেছিল আমাকে। কি বীভৎস ভয়ঙ্কর তার চেহারা!
কথাটা শুনেই দেবদাসী আতঙ্কিত হয়ে অঙ্গিরার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তারপর?’
অঙ্গিরা বলল, ‘সে মহাসর্প, তো আমাকে গিলেই খাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় বৃদ্ধ ক্ষৌরকার খগেশ্বর জলে নেমে তার খুর তুলে দিল আমার হাতে। সেই খুরের আঘাতে মহাসর্পর কণ্ঠদেশ ছিন্ন করে নাগপাশ থেকে মুক্ত হলাম আমি।’
এ কথা বলার পর অঙ্গিরা হেসে বলল, ‘তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমি যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করছি সেই মহাসর্পর সঙ্গে, ঠিক সেই মুহূর্তে অদ্ভুত ভাবে তোমার মুখটাই আমার মনে ভেসে উঠেছিল!’
কথাটা শুনে রাজশ্রী অঙ্গিরার চোখের দিকে তাকিয়ে তার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, ‘আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি।’
কিছুক্ষণ পরস্পরের মুখের দিকে নিস্তব্ধ ভাবে চেয়ে রইল তারা দুজন। রাজশ্রী এরপর বলল, ‘গত কয়েকদিন ধরেই আমার একটা কথা মনে হচ্ছে। হয়তো বা তোমার সঙ্গে দেখা হবে বলেই বিধাতা পুরুষ আমাকে রাজকন্যা রাজশ্রী থেকে দেবদাসী সমর্পিতা বানালেন।’
অঙ্গিরা হেসে জবাব দিল, ‘আমারও এখন মনে হচ্ছে, শুধু পিতা-মাতার আত্মার মুক্তির জন্য নয়, তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে বলেই ভাগ্য আমাকে এখানে এনেছে। আমরা দুজনেই তো এক সঙ্গে থাকব এ মন্দিরে। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে তো মিলিত হতে পারব। সে পাওয়াও তো অনেক। আমার কার্যকলাপের মেয়াদ দ্বাদশ বৎসর। সে সময় অতিক্রান্ত হলেও আমি অন্য কোনও কাজে তোমার জন্য রয়ে যাব এ মন্দিরে।’
‘আমার জন্য তারপরও রয়ে যাবে তুমি!’ বলে উঠল দেবদাসী সমর্পিতা।
অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, আমার তো অন্য কোথাও কেউ নেই। প্রকাশ্যে না হলেও এখানে কেউ তো থাকবে আমার জন্য।’
এ কথা শোনার পর রাজশ্রী প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল, ‘শুনছি কোন এক সুলতান মামুদ নাকি এ মন্দিরে হানা দিতে পারে এখানে। সে নাকি খুব নিষ্ঠুর। তার সেনাবাহিনীও নারীলোলুপ। দেবদাসীরা একথা বলাবলি করছে। উত্তরাও কোথাও থেকে শুনেছে এ কথা। তুমি কিছু শুনেছ?’
অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, শুনেছি। তবে সে নিশ্চিত ভাবে এখানে উপস্থিত হবে কিনা ঠিক নেই। হিন্দু রাজারা মাধেরার কাছে সম্মিলিত সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছেন সুলতানবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য।’
রাজশ্রী বলল, কিন্তু সত্যিই যদি সে এখানে এসে পড়ে তবে কি হবে? তারা তো আমাদের ছেড়ে দেবে না? শুনেছি তারই মতো জুয়ানেদের সেনারা যখন এ মন্দিরে হানা দিয়েছিল তখন তাদের সম্মিলিত বীভৎস লালসার শিকার হয়েছিল দেবদাসীরা। সেই অত্যাচারে অধিকাংশ দেবদাসীরই মৃত্যু হয়েছিল। দেবদাসীদের রক্তে ভেসে গেছিল এ প্রাঙ্গণ। যে সব দেবদাসী প্রাণে বেঁচে ছিল, তাদের ক্রীতদাসী হিসাবে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আরও কোন ভয়ঙ্কর পরিণতির জন্য। তেমন যদি কিছু হয়?’ স্পষ্ট আতঙ্কের সুর ফুটে উঠল তার কণ্ঠে।
তাকে আশ্বস্ত করার জন্য অঙ্গিরা বলল, ‘তেমন কোনও দুর্যোগ উপস্থিত হলে আমি যে ভাবেই হোক রক্ষা করব তোমাকে। ভয় পেও না। জানো, আমি অন্ধকারে শব্দভেদী বাণও চালাতে পারি।’ এই প্রথম ত্রিপুরারিদেব ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রকাশ করল অঙ্গিরা।
দেবদাসী সমর্পিতা এ কথা শুনে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু, হঠাৎই একটা দৃশ্য তার চোখে পড়াতে সে বেদির কাছ থেকে অঙ্গিরাকে হাত ধরে টেনে এনে একটা থামের আড়ালে অন্ধকারে আত্মগোপন করল। থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে আঙুল তুলে চত্বরের নির্দিষ্ট দিকে তাকাবার জন্য ইশারা করল অঙ্গিরাকে।
রাজশ্রীর দৃষ্টি অনুসরণ করে অঙ্গিরা দেখল চত্বরের এক অংশে কক্ষের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে একজন নারী। চাঁদের আলোতে অঙ্গিরা চিনতে পারল তাকে—দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা! চারপাশে তাকিয়ে চত্বরটা দেখার চেষ্টা করছে। সে কি দেবদাসী সমর্পিতাকে খুঁজছে? সে কি দেখতে পেয়েছে তাকে?
কয়েক পলের মধ্যে অবশ্য আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল তারা দুজন। চত্বরে কাউকে দেখতে না পেয়ে তিলোত্তমা তার কক্ষের ভিতর তাকিয়ে হাত নেড়ে কাকে যেন বাইরে বেরোবার জন্য ইশারা করল! সেই ইশারাতে অন্ধকার কক্ষের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল একজন পুরুষ! অঙ্গিরারা বুঝতে পারল শুধু সাধারণ দেবদাসীদের নয়, তাদের পরিচালিকারও গোপন প্রেম আছে!
বাইরে বেরিয়েই লোকটা এগোল প্রাচীরের গায়ে যেদিকে ফোকর আছে সেদিকে। লোকটার মুখে একটা বস্ত্রখণ্ড থাকলেও সে কিছুটা এগোবার পর হঠাৎই সেটা কাকতালীয় ভাবে খসে গেল। অঙ্গিরা তাকে চিনতে পেরে চাপা স্বরে বলে উঠল ‘আরে এ যে স্বয়ং সেবায়েত প্রধান বিষধারী!’
চত্বর থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেল লোকটা। তিলোত্তমাও কক্ষে প্রবেশ করে দ্বার বন্ধ করল। অঙ্গিরারাও হয়তো থামের বাইরে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল, কিন্তু অঙ্গিরা তার শরীরে এক অদ্ভুত স্পর্শ অনুভব করল। রাজশ্রী পাশ থেকে এমন ভাবে আলিঙ্গন করে আছে যে তার বস্ত্রখণ্ডর ভিতর থেকে তার সুডৌল স্তন যুগল স্পর্শ করে আছে অঙ্গিরার পাঁজর। নিবিড় স্পর্শ।
রাজশ্রী মুখ তুলে চেয়ে আছে অঙ্গিরার দিকে। স্তম্ভের ফাঁক গলে ছুরির ফলার মতো এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখমণ্ডলে। গোলাপের পাপড়ির মতো ওষ্ঠাধর যেন উন্মুখ ভাবে চেয়ে আছে অঙ্গিরার দিকে। মুহূর্তর মধ্যে শরীরে এক অদ্ভুত শিহরন অনুভব করল অঙ্গিরা। যে অনুভূতি আগে কোনওদিন লাভ করেনি সে। নারীর আলিঙ্গনে দ্রুত সে শিহরন ছড়িয়ে পড়তে লাগল অঙ্গিরার ধমনীতে। পুরুষের স্পর্শে একই অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতার রক্তেও।
যে অনুভূতি সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণের জন্ম দিয়েছে নারী-পুরুষকে। এগিয়ে নিয়ে চলেছে জীবনের প্রবাহমানতা। সমর্পিতা তার ওষ্ঠাধর যেন আরও একটু তুলে ধরল। নিজের অজান্তেই যেন অঙ্গিরার ঠোঁট নেমে এল সোমনাথ সুন্দরীর ঠোঁটের ওপর।
এ যেন এক অদ্ভুত বিদ্যুৎস্পর্শের অনুভূতি। যে অনুভূতি মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে নিল তাদের দুজনের শরীরকেই। নিবিড় আলিঙ্গনে, নিষ্পেষণে মিশে যেতে লাগল দুটো শরীর। খসে পড়ল অঙ্গিরার ধনুর্বাণ, রাজশ্রী অথবা দেবদাসী সমর্পিতার বসন, যেন তারা বনাচারী নিরাবরণ আদিম মানবমানবী।
এ রাত যেন নিমেষে কেটে গেল। তাদের যখন হুঁশ ফিরল তখন চাঁদ ম্রিয়মান। শুকতারা ফুটে ওঠার সময় হয়ে গেছে। বসনে আবৃত হয়ে উঠে দাঁড়াল তারা। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল তারা। আবেশঘন কণ্ঠে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘আমাকে কথা দাও, তুমি কোন দিন বিচ্ছিন্ন হবে না আমার কাছ থেকে। কোনও দিন ভুলবে না আমাকে?’
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, কথা দিলাম।’
দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘রাত্রির প্রত্যাশায় থাকব আমি।’
অঙ্গিরা হেসে বলল, ‘আমি আসব।’ এ কথা বলে অঙ্গিরা পরম মমতায় সোমনাথ সুন্দরীর কপাল চুম্বন করে রওনা হল ফেরার জন্য। অঙ্গিরা যখন অতিথিশালাতে কক্ষে ফিরে দোর বন্ধ করল ঠিক সেই সময় বাইরে শিকলের শব্দ শুরু হল। ছন্দময় সেই শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল অঙ্গিরা।
