সোমনাথ সুন্দরী – ১৭
১৭
পরদিন বেশ বেলাতেই করাঘাতের মৃদু শব্দে ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। মন্দিরের দৈনন্দিন কাজ তখন অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। দরজা খুলে অঙ্গিরা দেখতে পেল নাপিত শিরোমণি দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্গিরা যেন ভুলেই গেছিল তার কথা। ভিতরে প্রবেশ করল খগেশ্বর। মলিনতা যেন গ্রাস করে আছে তার মুখকে। পোশাকের ভিতর থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে খগেশ্বর বলল, ‘এই নিন। তিনদিন পর মুদ্রাটা আমার ফিরিয়ে দেবার কথা ছিল, ফিরিয়ে দিলাম।’
অঙ্গিরা মুদ্রাটা হাতে নিয়ে বৃদ্ধ খগেশ্বরের মুখের মলিনতা লক্ষ করে জানতে চাইল ‘আপনার স্ত্রী কেমন আছেন?’
প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধ মাটির দিকে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল, ‘আমার স্ত্রী নেই। বহুকাল আগে সে প্রয়াত হয়েছে।’
জবাব শুনে বিস্মিত অঙ্গিরা বলে উঠল, ‘তবে যে আপনি বলেছিলেন যে স্ত্রীকে দেখাবেন বলে মুদ্রাটা নিচ্ছেন?’
খগেশ্বর বলল, ‘আমাকে মার্জনা করবে, পাছে তুমি মুদ্রাটা না দিতে চাও তাই মিথ্যা বলেছিলাম। মিথ্যা বলার জন্য আমার গ্লানিও হয়েছে। তুমি বিশ্বাস করে মুদ্রাটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিলে। তোমাকে মিথ্যা বলা আমার উচিত হয়নি। তাই সত্যটা বললাম।’
অঙ্গিরা বলল, ‘তবে এ মুদ্রা আপনি কেন নিয়েছিলেন?’
খগেশ্বর মৃদু নিশ্চুপ থেকে বলল, ‘সে কারণ এই মুহূর্তে আমি তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারব না। তবে কেন জানি, তোমাকে দেখে তোমার প্রতি আমার একটা ভালো লাগা জন্মেছে। হয়তো-বা আমার পুত্র অনেকটা তোমার মতোই দেখতে ছিল তাই। দ্বাদশ বৎসর পূর্বে তার মৃত্যু ঘটেছে। পুত্রবধূও তার চিতার সামনেই সহমৃতা হয়। তোমার দ্বারা আমার কোনও অনিষ্ট হবে না জানি, হয়তো বা অনিষ্ট হতে বাকিও কিছু নেই। শেষ অনিষ্টটা যাতে রোধ করা যায় তাই মুদ্রাটা তোমার থেকে নিয়েছিলাম। কিন্তু সোমেশ্বর মহাদেবের হয়তো বা সে ইচ্ছা নেই।’
এ কথা বলার পর আবারও মৃদু চুপ করে থেকে খগেশ্বর বলল, ‘তোমাকে একটা ব্যাপার জানাতে চাই। মধ্যরাত্রে একবার বেরোতে পারবে আমার সঙ্গে? এ মন্দিরের ভিতর এক স্থানে তোমাকে নিয়ে যাব।’
অঙ্গিরা বলল, ‘আপনি এখন মন্দিরেই রাত্রিবাস করেন নাকি?’
খগেশ্বর বলল, ‘আমার পরিচিত একজনের কক্ষ আছে মন্দিরের ভিতর। যার কক্ষ সে বর্তমানে নগরীতে নিজের বাটিকাতে থাকে। তার অনুমতিক্রমে আমি কিছুদিন হল রাত্রিবাস করছি সে কক্ষে। আমি ক্ষৌরকার প্রধান, প্রধান পুরোহিতসহ অন্য পুরোহিতদেরও মস্তক মুণ্ডন করাই। তাই কেউ আপত্তি করেনি ব্যাপারটাতে।’
অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘গভীর রাতে মন্দিরের ভিতর কোন স্থানে আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?’
ক্ষৌরকার প্রধান বলল, ‘এখন বলব না, সেখানে গেলেই তুমি ব্যাপারটা জানতে পারবে। আজ রাত্রিকে আমি নিতে আসব তোমাকে?’
বৃদ্ধ খগেশ্বর তাকে কি দেখাতে চায় তা জানার জন্য কৌতূহল সৃষ্টি হল অঙ্গিরার মনে। সে বলতে যাচ্ছিল, ‘আমি রাতে আপনার সঙ্গে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকব।’ কিন্তু তার তখনই মনে পড়ে গেল, রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা তো তার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকবে। সেখানে তো যেতেই হবে অঙ্গিরাকে। আজ কাল, দু-রাতের পর আবার ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ পালন করতে তিনদিন বদ্ধ ঘরে কাটাতে হবে তাকে। তিন দিনের জন্য বিচ্ছেদ ঘটবে রাজশ্রীর সঙ্গে। কাজেই এ দু-রাত কিছুতেই রাজশ্রীর সঙ্গ ত্যাগ থেকে সে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। সব কিছু হিসাব করে নিয়ে অঙ্গিরা বলল, ‘আগামী পাঁচ রাত আপনার সঙ্গে যাবার উপায় নেই আমার। তারপর আমি আপনার সঙ্গে রাত্রি ভ্রমণের চেষ্টা করতে পারি।’
অঙ্গিরার জবাব শুনে বৃদ্ধর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, ‘ঠিক আছে পাঁচ রাত পরে আমাদের উভয় পক্ষের যদি সে সুযোগ থাকে তবে তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।’
অঙ্গিরা এরপর জানতে চাইল, ‘সুলতানের আক্রমণের ব্যাপারে কোনও খবর জানেন?’
খগেশ্বর বলল ‘সে দ্রুত এগিয়ে আসছে মাধেরার দিকে। হিন্দু সেনারাও উপস্থিত হয়েছে মাধেরা সূর্য মন্দিরের সামনে। আগামী পাঁচ-ছ’-দিনের মধ্যেই হয়তো যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে হানাদারদের সঙ্গে।’
অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘নগরীর অবস্থা কেমন?’
নরসুন্দর শ্রেষ্ঠ বলল, ‘গতকাল প্রত্যুষে আমি প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য নগরীতে প্রবেশ করেছিলাম। শুনলাম রাজা ভীম নাকি কচ্ছর কানিথকোট দুর্গে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মাধেরার যুদ্ধে যদি আহরিয়া, চালুক্য, রাজপুতবাহিনী পরাস্ত হয়, নারকী যদি তার সেনাদের নিয়ে প্রভাসপত্তনের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে তবে রাজা ভীম সেনাদলের হাতে নগরী আর মন্দিরের দায়িত্ব দিয়ে পরিবার আর অমাত্যদের নিয়ে কানিথকোট দুর্গে চলে যাবেন।
সে দুর্গ ছোট হলেও উপকূলবর্তী। গজনী সেনারা যদি সেদিকেও ধাওয়া করে তবে রাজা ময়ূরপঙ্খী নিয়ে ভেসে পড়বেন সমুদ্রর জলে। মামুদ আর তাকে অনুসরণ করতে পারবে না। স্বয়ং মহারাজ ভীম যেখানে আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন সেখানে নগরবাসীদের অবস্থা তো সহজেই অনুমেয়। ধনাঢ্যরাও অন্যত্র যাবার প্রস্তুতি শুরু করেছে। আর যাদের কোথাও যাবার জায়গা নেই তারা সোমেশ্বর মহাদেবের ওপর ভরসা করে নগরীতেই রয়ে যাবে।
মন্দিরে দর্শনার্থীদের আসাও কমে গেছে। আতঙ্ক হয়তো বা বাইরের থেকে কিছুটা বেশি ছড়িয়েছে মন্দিরের ভিতর। কারণ, নগরবাসীরা অনেকেই প্রয়োজনবোধে অন্যত্র পলায়ন করতে সক্ষম হলেও এ মন্দিরের অনেকেই কোনও অবস্থাতেই মন্দির ত্যাগ করতে পারবে না। বিশেষত পুরোহিত কুল, কিছু সেবায়েত যাঁরা প্রত্যক্ষ ভাবে সোমেশ্বর মহাদেবের সেবায় নিয়োজিত থাকেন এবং দেবদাসীরা। বিপদ থেকে বাঁচবার জন্য তাদেরও একমাত্র ভরসা সোমেশ্বর মহাদেব।’—একটানা কথা বলে থামলেন বৃদ্ধ।
খগেশ্বর, প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছিল শুনে অঙ্গিরা তাকে জিগ্যেস করল ‘আমার পিতা-মাতার এ মন্দিরের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে সেই অতিবৃদ্ধ কোনও কিছু বললেন আপনাকে?’
কথাটা শুনে হঠাৎই যেন গম্ভীর হয়ে গেল বৃদ্ধর মুখ। সে বলে উঠল, ‘ও প্রসঙ্গে পরে কথা হবে। আমাকে এখনই বিশেষ প্রয়োজনে অন্যত্র যেতে হবে।’ এ কথা বলে আর কালক্ষেপ না করে, অঙ্গিরাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করল খগেশ্বর। তার এ ভাবে হঠাৎ চলে যাওয়াটা বেশ একটু অদ্ভুত মনে হল অঙ্গিরার।
পরামাণিক শ্রেষ্ঠ চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে অতিথিশালা ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এল অঙ্গিরা। মন্দিরে কিছু ভক্তকুল উপস্থিত হলেও তাদের সংখ্যা বেশ নগণ্য। কয়েক সহস্রর পরিবর্তে কয়েকশত মাত্র। ঘণ্টাধ্বনি বা সোমেশ্বর মহাদেবের নামে জয়ধ্বনি হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তা অন্য দিনের মতো আকাশ-বাতাসকে বিদীর্ণ করছে না। সেবায়েতদের তেমন কাজের চাপ নেই। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে জটলা করছে তারা।
মন্দির চত্বরে এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎই সেবায়েতদের একটা জটলার পাশ দিয়ে যাবার সময় তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার একটা কথা কানে এল অঙ্গিরার। এক সেবায়েত তার সঙ্গীদের বলছে, ‘সোমেশ্বর মুদ্রা যাঁদের কাছে আছে তাঁরা সবাই সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁরা কেউ কি এ কাজ করবেন? রক্ষীরা নিশ্চয়ই মিথ্যা কথা বলছে।’
তাদের মধ্যে কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা জানা নেই অঙ্গিরার। কিছুক্ষণ মন্দিরে ঘুরে বেড়াবার পর অতিথিশালাতে ফিরে স্নান-আহার ইত্যাদি কার্য সম্পন্ন করে রাজশ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
সূর্যাস্তের কিছু আগে করাঘাতের শব্দে ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। দরজা খুলে সে দেখল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ একজন রক্ষী নিয়ে হাজির হয়েছেন। তিনি অঙ্গিরাকে বললেন, ‘আপনাকে বিরক্ত করার কারণে দুঃখিত। কিন্তু প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ পালনের জন্য এখানে এসেছি।’
‘কী নির্দেশ?’ জানতে চাইলে অঙ্গিরা।
জয়দ্রথ প্রথমে অঙ্গিরার প্রশ্নর জবাব না দিয়ে বললেন, ‘আপনার কাছে সোমেশ্বর স্বর্ণমুদ্রাটা আছে তো? আমাকে একটু দেখাবেন?’
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আছে। দাঁড়ান দেখাচ্ছি।’
অঙ্গিরা কক্ষের ভিতর থেকে মুদ্রাটা এনে জয়দ্রথের হাতে দিল। তিনি মুদ্রাটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সেটা আবার অঙ্গিরার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘আপনার কক্ষটা আমরা একটু পরীক্ষা করে দেখতে চাই। অনুগ্রহ করে আমার রক্ষীদের ভিতরে প্রবেশ করতে দিন।’
‘কীসের পরীক্ষা?’ বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইল অঙ্গিরা।
জয়দ্রথ বললেন, ‘আগে পরীক্ষা হোক, তারপর জানাচ্ছি।’
রক্ষীদল প্রবেশ করল কক্ষে। অঙ্গিরার সঙ্গে আনা সামগ্রী বলতে সামান্য কিছু বস্ত্র। সেই বস্ত্রর পুঁটুলি খুলে দেখল তারা। তারপর তার শয্যার তলদেশে, ঘরের আনাচেকানাচে কীসের সন্ধানে যেন অনুসন্ধান চালাতে লাগল। এমনকী জল রাখার জন্য যে মাটির জালাটা রাখা ছিল তার মুখের আচ্ছাদন তুলে ভিতর উঁকি দিয়ে দেখল তারা। এক সময় অনুসন্ধান পর্ব তাদের শেষ হল। রক্ষীপ্রধানকে তারা জানাল, ‘না তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।’
রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ এরপর অঙ্গিরার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আসলে মন্দিরের এক কক্ষ থেকে বহুমূল্য কিছু রত্নরাজি স্বর্ণালঙ্কার খোয়া গেছে। তারই অনুসন্ধান করতে এসেছিলাম আমি।’
কথাটা শুনে বেশ অপমানিত বোধ করে অঙ্গিরা উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘আমাকে আপনারা তস্কর ভেবে সন্দেহ করলেন?’
জয়দ্রথ বললেন, ‘উত্তেজিত হবেন না। শুধু আপনি নন, এ মন্দিরে যাদের কাছে সোমেশ্বর স্বর্ণমুদ্রা আছে এবং মন্দিরের বাইরেও যাদের কাছে এই মুদ্রা আছে, তাদের সবার গৃহতেই ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে ওই সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। এই তো আপনার কক্ষে আসার পূর্বেই আমি সেবায়েত প্রধান বিষধারীর কক্ষে তল্লাসি চালাতে গেছিলাম। তিনিও বাদ পড়েননি।’
অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারীদেরই সন্দেহের তালিকাতে রাখা হয়েছে কেন?’
জয়দ্রথ বললেন, ‘তবে ঘটনাটা খুলে বলি আপনাকে। নগরীর এক ধনাঢ্য নারী কিছু দিবস আগে প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার স্বর্ণালঙ্কার ও বহুমূল্য বেশ কিছু রত্নরাজি দান করে গেছেন সোমেশ্বর মহাদেবকে। একটা থলেতে সেই দানসামগ্রী নিয়ে তার পুত্ররা সন্ধ্যারতির পর মন্দিরে হাজির হয়। মন্দিরের কোষাগারের দরজা ততক্ষণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল দৈনন্দির মূল্যবান দানসামগ্রী তার ভিতরে ঢুকিয়ে রেখে। যে খাঁজশলাকা দিয়ে কোষাগারের লৌহকপাট উন্মোচন করা হয় তাও আমি জমা রেখে এসেছিলাম পুরোহিত মল্লিকার্জুনের কাছে।
যারা রত্ন থলিটা দিতে এসেছিল, তাদের আমি প্রথমে পরদিন অর্থাৎ আজ সকালে আসতে বলি। কিন্তু তারা জানায় তা সম্ভব নয়। গতরাত্রিতেই প্রভাসপত্তন ত্যাগ করবে তারা। সম্ভবত মামুদের হানার আতঙ্কতেই নগরী ত্যাগ করছে তারা। কাজেই বাধ্য হয়ে সেই মূল্যবান দানসামগ্রী গ্রহণ করি আমি।
অন্ধকার নেমে গেছে তখন। পুরোহিত মল্লিকার্জুনও তখন কক্ষের দ্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে অন্য যে কক্ষে সম্পদ রাখা হয় আমি সে কক্ষে সম্পদ রাখি এবং সেখানে দুজন প্রহরী মোতায়েন করি। আজ সকালে আমি মল্লিকার্জুনের থেকে খাঁজশলাকা নেবার পর সেই কক্ষ থেকে রত্ন থলিটা নিয়ে মন্দিরের সম্পদ কোষে স্থানান্তর করতে যাই। কিন্তু কক্ষে সেই রত্নথলি ছিল না। প্রহরীরা জানায়, মধ্যরাতে অবগুণ্ঠনে ঢাকা এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয় এবং সোমেশ্বর মুদ্রা দেখিয়ে সে কক্ষে প্রবেশ করেছিল।
রক্ষীরা অবশ্য প্রথম অবস্থাতে তাকে কিছু জিজ্ঞেসাবাদ করেছিল। কিন্তু ভাঙা কণ্ঠস্বরে মুখমণ্ডল আবৃত সেই ব্যক্তি জানায় সে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশে কক্ষে প্রবেশ করতে এসেছে। তা ছাড়া সোমেশ্বর মুদ্রা যার কাছে আছে সে গর্ভগৃহ আর সম্পদকোষ ব্যতীত যে কোনও স্থানে প্রবেশ করতে পারে। তাকে বাধাদান করা অপরাধ। রক্ষীরা যদি তাকে কক্ষে প্রবেশ করতে না দেয় অথবা তার কাজের কোনও বিলম্ব ঘটায় তবে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হবে তাদের। অল্পবয়সি অতি সাধারণ রক্ষী দুজন ভয় পেয়ে যায় তার কথা শুনে। লোকটাকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেয় তারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কক্ষ থেকে রত্নখনি নিয়ে উধাও হয় সেই প্রতারক তস্কর।’
অঙ্গিরা আশ্চর্য হয়ে গেল তার কথা শুনে।
জয়দ্রথ এরপর বললেন, ‘রক্ষী দুজনকে তাদের বুদ্ধিহীনতার কারণে বরখাস্ত ও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। যদিও তাদের তেমন কিছু করার ছিল না। গত রাতে প্রধান পুরোহিতের কক্ষে গিয়ে তাদের পক্ষে সত্যানুসন্ধান সম্ভব ছিল না, অন্য কারো পক্ষেও ছিল না। কারণ সন্ধ্যারতি সমাপ্ত হবার পর কারো মন্দিরের সর্বোচ্চ ধাপ, গর্ভগৃহ ও তার সংলগ্ন চত্বরে ওঠার অনুমতি নেই। এবার নিশ্চই পুরো ঘটনা পরিষ্কার হল। ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশে কেন আমরা সোমেশ্বর মুদ্রা প্রাপকদের কক্ষে অনুসন্ধান চালাচ্ছি।’
আপনিই শেষ ব্যক্তি যার কক্ষে সেই সম্পদের সন্ধান চালানো হল। কোথাও কিছু পাওয়া গেল না। যে কাজটা করেছে সে হয়তো সেই রত্ন-অলঙ্কার অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছে। আপনার কাছে মুদ্রাটা দেখতে চাইলাম কারণ, এমনও হতে পারে যে মুদ্রার প্রকৃত মালিক মুদ্রাটা অন্য কারোকে হস্তান্তর করে তার মাধ্যমেই তস্কর কার্য সম্পাদন করেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, মুদ্রাটা তার প্রাপকরা সবাই দেখিয়েছে আমাকে। তবে কি চুরিটা তারা কেউ করেনি? রত্ন থলিও কারো কাছে পাওয়া গেল না আবার সবার কাছেই নিজ নিজ মুদ্রা আছে! যদি না এমন কিছু হয় যে ওই চৌর্য কার্যের জন্য মুদ্রাটা যাকে দেওয়া হয়েছিল সে কার্য সম্পন্ন করার পর রত্নথলি অন্যত্র লুকিয়ে মুদ্রাটা আবার তার আসল মালিকের কাছে ফেরত দিয়ে গেছে।’
অঙ্গিরা, রক্ষীপ্রধানের এই শেষ কথাটা শুনে ভিতরে ভিতরে চমকে উঠল।
কার্য সম্পাদন করে ফিরে গেলেন রক্ষী প্রধান। কিন্তু তার বলে যাওয়া শেষ কথাগুলো অন্য এক ভাবনা, আশঙ্কার জন্ম দিল অঙ্গিরার মনে। এমন হয়নি তো খগেশ্বর লোভের বশবর্তী হয়ে ওই রত্নালঙ্কার হরণ করেছে? হয়তো পুরো ব্যাপারটা আগাম জানা ছিল, অনুমান করা ছিল খগেশ্বরের। সে জানত যে অন্ধকার নামার পর সে সম্পদ দিতে আসা হবে, এবং তা রাখা হবে তোষাগৃহর পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম নিরাপত্তাবলয়ে আবৃত কোনও কক্ষে? ভাবতে লাগল অঙ্গিরা।
কিছু সময়ের মধ্যেই অন্ধকার নামল। সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনিও শুরু হল। আর তার সঙ্গে-সঙ্গেই অঙ্গিরার মনে পড়তে লাগল রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতার কথা। তার ভাবনা আচ্ছন্ন করে ফেলল অঙ্গিরার মনকে। সে ভাবতে লাগল কখন মধ্যরাত্রি আসবে, সে সাক্ষাৎ করতে যাবে তার সঙ্গে, দেবদাসী সমর্পিতার ওষ্ঠে স্থাপন করবে তার ওষ্ঠ।
