সোমনাথ সুন্দরী – ১৮
১৮
মাধেরা সূর্যমন্দির। সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরের মতো এ মন্দির অতি প্রাচীন নয়। সোলাঙ্কি রাজা ভীমের পিতামহ মাত্র একশত বৎসর পূর্বে অপূর্ব শিল্প সুষমা মণ্ডিত এ মন্দির নির্মাণ করান। তবে এ স্থানেরও বিশেষ স্থান মাহাত্ম্য বর্তমান। ব্রহ্ম পুরাণে এ স্থানের কথা আছে।
মাধেরার অতি প্রাচীন নাম ধর্মারণ্য। পুষ্পবতী নদীতীরে ধর্মারণ্য বা অরণ্য ভূমি ছিল উপাসনা স্থল। শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা জয় করেন ও লঙ্কেশ্বর রাবণকে হত্যা করেন। রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাঁকে হত্যা করার পর শ্রীরামচন্দ্র ব্রহ্ম হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ঋষি বশিষ্ঠের পরামর্শে ধর্মারণ্যে এসে সূর্যদেবের তপস্যা করে পাপ মুক্ত হন এবং সীতাপুর নামে এক গ্রাম স্থাপন করেন।
শ্রীরামচন্দ্রের পদধূলিতে ধন্য এ পুণ্য ভূমিতেই সোলাঙ্কি রাজারা সূর্যমন্দির স্থাপন করেছেন। জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর নির্ভর করেই গড়ে তোলা হয়েছে অদ্ভুত স্থাপত্য ও অলঙ্কৃত এই মন্দির।
সোমনাথ মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীর থেকে অনেক উৎকৃষ্ট স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত মাধেরা সূর্য মন্দির। যদিও তার ব্যাপ্তি আকারে ক্ষুদ্রকায় সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির থেকে। প্রশস্ত চত্বরে প্রধান সূর্য মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে গণেশ, বিষ্ণু, নটরাজ, কালি প্রভৃতি দেবদেবীর একশত সাতটি উপমন্দির বা মন্দির। অর্থাৎ মন্দিরের সর্বমোট সংখ্যা মোট একশত আটটি। হিন্দুদের জপমালাতে মোট একশত আটটি রুদ্রাক্ষই থাকে। তাই শ্রীরামচন্দ্রের জপস্থানে নির্মিত হয়েছে একশত আটটি মন্দির।
সূর্যদেব যখন বিষুবীয় সময় পৌঁছন তখন ভোরের প্রথম আলো উন্মুক্ত তোরণ পথে গিয়ে পড়ে সুর্যদেবতার মূর্তির ওপর। সূর্যদেবতার মন্দিরটি তাকে ঘিরে থাকা অন্য মন্দিরগুলির তুলনায় বৃহৎ এবং দেখতে ওল্টানো পদ্মফুলের ন্যায়। পদ্মফুল সূর্যালোকের স্পর্শ পেলে পাপড়ি মেলে, আবার সূর্যাস্ত হলে পাপড়ি মুদে ফেলে। এ কারণে পদ্মকে বলে সৌরপুষ্প।
সৌরদেবতা বা সূর্যদেবের মন্দির তাই রচনা করা হয়েছে প্রস্ফুটিত ওল্টানো পদ্মফুলের আঙ্গিকে। চতুষ্কোণ পিটিকা বিশেষের ওপর। গর্ভগৃহতে সূর্যদেবের বিগ্রহ সোনার রথে আসীন। সাতটি ঘোড়া টানছে সে রথ। শুধু বিগ্রহই নয়, রথের সোনার ঘোড়াগুলিও বহুমূল্য রত্ন সমৃদ্ধ। আর এই রথ সমেত বিগ্রহকে ঘিরে আছে দশ হাত গভীর ও পাঁচ হাত চওড়া এক পরিখা। যা রাজা ও ভক্তবৃন্দের দান করা স্বর্ণমুদ্রাতে পরিপূর্ণ। ওই কূপই এই মন্দিরের সূর্যদেবের প্রধান মন্দির।
অন্য দেবদেবীর মন্দির ছাড়াও মন্দির চত্বরে রয়েছে সুবিশাল এক উপাসনাস্থল। তার বাহান্নটি খিলান এক সৌরবৎসর অর্থাৎ বাহান্ন সপ্তাহকে এবং কারুকার্যমণ্ডিত বারোটি স্তম্ভ বারোটি মাসের পরিচয় বহন করে। এ ছাড়াও আছে একশত আটটি ধাপ সমন্বিত বিশাল জলকুণ্ড, অতিথিশালা, পুরোহিত, সেবায়েতদের বাসস্থান ইত্যদি যা যা থাকার কথা, সবই আছে এখানে। বারো জন দেবদাসীও আছে। তারা নৃত্যগীত পরিবেশন করে সূর্যদেবের বিগ্রহের সামনে। মন্দিরের জনসংখ্যা দুই শত। আরও তিন শত লোক বসবাস করে মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে।
সোমনাথ মন্দিরের মতো সূর্যদেবের মন্দিরে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম না হলেও প্রতিদিন কয়েকশত মানুষের, পুণ্যার্থীদের সমাগম হতো এখানে, কেউ বা আসত সোলাঙ্কি রাজাদের অপূর্ব শিল্পকীর্তি প্রত্যক্ষ করার জন্য। কিন্তু তাদের সবারই আসা বন্ধ হয়েছে।
পুণ্যার্থীদের বদলে মন্দির চত্বরে সমবেত হয়েছে চালুক্য, সোলাঙ্কি, আহরিয়া রাজপুত সেনারা। অতিথিশালার কক্ষগুলি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন করদ নৃপতি ও সেনাপতিদের বাসস্থান রূপে। মহারাজ মাণ্ডলিক নিজেও উপস্থিত হয়েছেন। তার রাত্রিবাসের জন্য প্রধান পুরোহিত বিভাবসু নিজ কক্ষ ত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছেন গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণে।
রক্ষা করতে হবে মাধেরা সূর্য মন্দির। তবে রাজা হোক বা সৈনিক কারো চোখেই ঘুম নেই। মন্দির চত্বর আর মন্দির প্রাকারকে বেষ্টন করে অহর্নিশ পাহারা দিচ্ছে হিন্দু সেনারা।
অন্যদিনের মতোই কুয়াশার জাল ছিন্ন করে সেদিনও সূর্যোদয় হল মাধেরার বুকে। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ল স্বর্ণরথে আসীন সূর্যদেবের স্বর্ণ কিরিটে। জলকুণ্ডে অবগাহন করে সূর্যদেবের বিগ্রহর সামনে পুজোতে বসলেন প্রধান পুরোহিত বিভাবসু।
মন্দির রাজপুত সেনাদলের ঘেরার মধ্যে থাকলেও নিত্য দিনের পূজাপাঠ ব্যাহত হয় না। গর্ভগৃহ থেকে বিভাবসুর উদাত্ত কণ্ঠের স্তোত্র পাঠ ও ফুল-ধূপ-ঘৃতর সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগল মন্দির চত্বরে। এ মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ সেনাবাহিনীর মধ্যেও ভোরের আলোর সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত মনোবলের সঞ্চয় করে।
প্রাত্যহিক পুজাপাঠ চলল বেশ কিছু সময় ধরে। তারপর ঠিক সোমনাথ মন্দিরের মতোই বিগ্রহর সামনে নৃত্য প্রদর্শন শুরু করল দেবদাসীর দল। যদিও সংখ্যাতে তারা নগণ্য। তাদের নৃত্যগীত সমাপ্ত হলে গর্ভগৃহ চত্বরের বিশাল ঘণ্টাটা বাজালেন মাধেরা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু। প্রধান মন্দিরকে কেন্দ্র করে উপমন্দিরের ঘণ্টাগুলোও বেজে উঠল।
এই ঘণ্টাধ্বনি শুনে মন্দির থেকে প্রসাদকণা সংগ্রহ করতে থাকে সৈনিকরা। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। ঘণ্টাধ্বনি থামতেই প্রধান মন্দির চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করল সৈনিকরা। কয়েকজন সেবায়েত কাঠের প্রকাণ্ড বারকোষ থেকে তণ্ডুলকণা তুলে দিতে লাগল সৈনিকদের হাতে। সে কাজের তত্ত্বাবধান করছিলেন সূর্যমন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু।
ঠিক সেই সময় মন্দির চত্বরে হঠাৎ চিৎকারের শব্দ শোনা গেল। আর সেই শব্দ কানে যাওয়া মাত্রই প্রসাদকণা গ্রহণকারী সেনারা কোনওক্রমে সেই তণ্ডুলপ্রসাদ কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে উষ্ণীষে বেঁধে ছুটল চত্বরের দিকে। আর এর পরই উপমন্দিরের ঘণ্টাগুলো এক সাথে বাজতে লাগল। একজন সেবক ছুটে এসে বিভাবসুকে জানাল, ‘এসে গেছে! এসে গেছে! মন্দির শীর্ষে প্রহরারত সৈনিকরা তাদের দেখতে পেয়েছে! এখনই যুদ্ধ শুরু হল বলে!’
তার কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই বিভাবসুও মন্দিরের সবাইকে সতর্ক করে দেবার জন্য মূল মন্দিরের বিশাল ঘণ্টাটাও আবার বাজাতে শুরু করলেন। সেই শব্দ কানে যেতেই নিজেদের কক্ষ ত্যাগ করলেন চালুক্য, সোলাঙ্কি আর আহরিয়া নৃপতি সেনাপতিরা।
পরিকল্পনা আগেই রচনা করা ছিল। ত্রিস্তরীয় বলয় রচনা করা হবে যবন বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য। প্রাকারের বহিঃবলয়ে থাকবে চালুক্যরাজ অম্বুজের নেতৃত্বে চালুক্য বাহিনী। যারা প্রথম আক্রমণ করবে যবন বাহিনীকে। অসি চালনাতে দক্ষ তারা। সোলাঙ্কিদের তিরন্দাজ বাহিনী থাকবে মন্দির প্রাকার ও প্রধান মন্দির-সহ উপমন্দিরগুলোর শীর্ষ দেশে। তাতে তির নিক্ষেপে সুবিধা হবে তাদের। আর প্রধান মন্দিরকে ঘিরে আর মন্দির চত্বরে থাকবে মহারাজ মাণ্ডলিকের নেতৃত্বে আহরিয়া রাজপুত বাহিনী। অন্য দুই বাহিনীকে অস্ত্র, রসদ যুগিয়ে সাহায্য করবে। আর যদি শেষ পর্যন্ত যবনরা মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে তবে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যবন বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ লড়াই চালাবে তারা। তিন নৃপতির নেতৃত্বে তাদের সেনাদল পরিকল্পনা মতো নিজেদের স্থানে উপনীত হল।
প্রথমে সূক্ষ্ম চুলের মতো কালো দাগ দৃশ্যমান হল দিকচক্রবালে। ক্রমশ সে দাগ পুরু হতে শুরু করল। অস্পষ্ট শব্দ পরিণত হল বিরাট চিৎকারে। রাজপুত সৈন্যরাও ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে লাগল। দু-পক্ষের প্রচণ্ড চিৎকারে আতঙ্কিত পাখির ঝাঁক আকাশে উড়তে শুরু করল। এসে পড়ল যবন বাহিনী।
আরব মামুদ। তিনি অবশ্য সেনাদলের পুরোভাগে নেই। দিকচক্রবালে যেখানে কৃষ্ণবর্ণের দাগের মতো তাঁর বাহিনী দৃশ্যমান হয়েছিল, সেখানেই তিনি তাঁর তাঁবুতে অবস্থান করছেন। যাঁরা মন্দিরের দিকে উটের বা ঘোড়ার পিঠে এগোচ্ছে, তারা সবাই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর আরব যুবক। এরাইতো ভবিষ্যতে আরব ধর্ম ভাবনার পতাকাকে ছড়িয়ে দেবে হিন্দ মুলুকে। তাই তাদের সাহস ও দক্ষতা দেখার জন্য, তারা যাতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে সেজন্য একজন প্রধান সেনাপতির নেতৃত্বে তাদেরকে অগ্রগামী বাহিনীতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সুলতান।
লম্বা লম্বা পা ফেলে মন্দির প্রাকারকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য প্রথমে এগিয়ে এল উষ্ট্র বাহিনী। তাদের একজনের হাতে পতাকাদণ্ডে খলিফার সবুজ নিশান। সে তিরের পাল্লার মধ্যে আসতেই মন্দির শীর্ষে বসা এক সোলাঙ্কি তিরন্দাজ তির নিক্ষেপ করল সেই নিশান বাহককে লক্ষ্য করে। অব্যর্থ লক্ষ্য। তির গিয়ে বিদ্ধ হল লোকটার কণ্ঠদেশে। উটের পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ল নিশান বাহক। তা প্রত্যক্ষ করে আকাশবাতাস কাঁপিয়ে ‘হর হর মহাদেব’ বলে উল্লাসধ্বনি করে উঠল রাজপুত বাহিনী।
লোকটা মাটিতে পড়লেও, পতাকাটা মাটি স্পর্শ করার আগেই তা আবার উঠিয়ে নিল এক আরব। যে পতাকা হিন্দ ভূমিতে প্রোথিত করার সংকল্প নিয়ে তারা মরুভূমির প্রচণ্ড ভয়াবহতা সহ্য করে এত দূর এসেছে, তাকে ভুলুণ্ঠিত হতে দেওয়া চলে না। পতাকাবাহী উটের পিঠ থেকে ভূপতিত হলেও উষ্ট্রবাহিনী কিন্তু থামল না প্রথমে। ধুলোর ঝড় তুলে মন্দিরের দিকে এগোবার চেষ্টা করল তারা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চারপাশ থেকে মন্দির প্রাকারকে ঘিরে ফেলে উটের পিঠ থেকে প্রাকার ডিঙিয়ে মন্দির চত্বরে লাফিয়ে পড়ার। কিন্তু অনেক্ষণ ধরে চেষ্টা চালালেও তা ফলপ্রসূ হল না। প্রাকার আর মন্দিরগুলির শীর্ষদেশ থেকে রাজপুত বাহিনীর মুহুর্মুহু তির বর্ষণ যবনদের উষ্ট্র বাহিনীর গতি রুদ্ধ করল।
এরপর পরিকল্পনা বদল করল যবন সেনাপতি। উষ্ট্র বাহিনীকে পিছু হটিয়ে আগুয়ান হল আরব ঘোড় সওয়াররা। পরনে তাদের ঢোলা পাজামা, পাগড়ির কাপড় দিয়ে মাথা-মুখমণ্ডল আবৃত। হাতে বাঁকানো তলোয়ার। ‘তকবির’ ধ্বনি তুলে তারা এগিয়ে আসতে লাগল মাধেরা সূর্য মন্দিরের প্রধান তোরণের দিকে।
চালুক্যরাজ অম্বুজের নেতৃত্বে হিন্দু সেনারাও ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর। সম্মুখ সমর শুরু হয়ে গেল। ‘তকবির’ আর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি, অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ আর আর্তনাদের বীভৎস শব্দে কাঁপতে থাকল চারদিক। প্রবল বিক্রমে যবনদের প্রতিহত করছে চালুক্যবাহিনী।
এমন প্রতিরোধের যে সম্মুখীন হতে হবে তা ভাবতে পারেনি আরব বাহিনী। বিশেষত লম্বা শূলধারী চালুক্য সেনা দলের যে অংশ ছিল, তারা আরব ঘোড়সওয়ারদের ভয়ঙ্কর শূলের আঘাতে ভূপতিত করতে লাগল।
দুপুর গড়িয়ে যখন বিকাল হল তখন আরব বাহিনী পিছু হটল। এদিনের মতো মাধেরা সূর্যমন্দির দখল করতে ব্যর্থ হল তারা। উল্লাস ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল রাজপুত শিবিরে। প্রায় দুই শতর মতো যবন হানাদারকে নিহত করেছে চালুক্যরাজ অম্বুজের সেনাদল।
তবে চালুক্য সেনাবাহিনীর হতাহতের সংখ্যাও প্রচুর। মাধেরা মন্দিরের প্রবেশ তোরণের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে আরব সেনাদের সঙ্গে চালুক্য সেনাদের দেহও। সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে সেই চালুক্য দেহগুলোর। মন্দির চত্বরের ভিতর যেখানে সোপনশ্রেণী বিশিষ্ট জলকুণ্ড আছে, তার পাড়েই চিতা সাজানো হবে। তাই চালুক্যরাজ অম্বুজের নেতৃত্বে চালুক্য সেনাদের দেহগুলি, তাদের ছিন্ন অঙ্গগুলি সনাক্ত করে তা মন্দিরের ভিতর সেই নির্দিষ্ট স্থানে পাঠাবার কার্য শুরু হল।
সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। আর কিছু সময়ের মধ্যেই অন্ধকারে আবৃত হবে চারপাশ। চালুক্য সেনাদের দেহগুলো মন্দিরের ভিতরে নিয়ে যাবার কাজ তখন প্রায় শেষ। ঠিক সেই সময়ে এক অপ্রত্যাশিত ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল। এক যবন আর এক চালুক্য সেনার মৃতদেহ আলিঙ্গনবদ্ধ অবস্থায় ভূপতিত ছিল। যেন মৃত্যু মুহূর্ত পর্যন্ত পরস্পরকে প্রচণ্ড আক্রোশে নিষ্পেষণের চেষ্টা করছিল তারা। একজন চালুক্য সৈনিক মৃতদেহ দুটিকে আলিঙ্গন মুক্ত করতে যেতেই হঠাৎই মৃতের ভান করে পড়ে থাকা সেই আরব লাফিয়ে উঠে একটা তীক্ষ্ন ছুরিকা নিয়ে ছুটল, কিছুটা তফাতে তার দিকে পিছন ফিরে দণ্ডায়মান চালুক্যরাজ অম্বুজের দিকে। ব্যাপারটা চোখে পড়তেই চালুক্য মন্ত্রী তার হাতের ভল্ল নিক্ষেপ করলেন সেই যবনের দিকে। সেই ভল্ল যবনের মুণ্ড ছিন্ন করল ঠিকই, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। সেই কবন্ধ শরীর গিয়ে আছড়ে পড়ল চালুক্যরাজের দেহের ওপর। আর তার হাতের তীক্ষ্ন ছুরি চালুক্য রাজের পৃষ্ঠদেশে প্রবেশ করে বুক ফুড়ে বেরিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় সূর্য ডুবে গেল।
চালুক্য সেনারা দ্রুত তাদের মহারাজের দেহটা তুলে নিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে কাছেই একটা উপমন্দিরের চাতালে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল। কিন্তু তাঁকে নিয়ে কারোরই আর তখন বিশেষ কিছু করার নেই। যবনের ছুরি ফুঁড়ে দিয়েছে চালুক্যরাজের হৃৎপিণ্ড। মৃত্যু সমাগত। চালুক্যরাজ নিজেও বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। শ্বাস টানতে টানতে সে অবস্থাতে তাঁর শরীরের ওপর ঝুঁকে থাকা চালুক্যমন্ত্রী চন্দ্রদেবকে বললেন, ‘কোন পাপে আমার এ অবস্থা হল মন্ত্রী?’
প্রশ্ন শুনে নিশ্চুপ রইলেন মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব।
চালুক্যরাজ অম্বুজ অবশ্য নিজেই এরপর উত্তরটা দিলেন। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির অনেক সময় আত্ম-উপলব্ধি হয়। হয়তো তাই চালুক্যরাজ অম্বুজ বললেন, ‘হ্যাঁ, ভ্রাতৃ হত্যার পাপ। তাঁর সন্তানকে বঞ্চিত করার পাপ। যে সিংহাসন আমার ছিল না তা গ্রহণ করার পাপ!’
মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব বললেন ‘আমার প্রতি আপনার কোনও নির্দেশ আছে মহারাজ? চালুক্য সিংহাসনে কে বসবেন?’
অন্তিম শ্বাস উঠতে শুরু করেছে চালুক্যরাজ অম্বুজের। মৃত্যু যন্ত্রণাতে বিকৃত হয়ে উঠেছে তার মুখ। সেই অবস্থাতেই অনেক কষ্টে তিনি মন্ত্রী চন্দ্রদেবকে বললেন ‘পাপ স্খলন না হলে আমার মুক্তি ঘটবে না। ভ্রাতুষ্পুত্রী রাজশ্রীকে আমি তুলে দিয়েছিলাম সোমেশ্বর মন্দিরে। সে সেখানেই আছে। আপনি সোমেশ্বর মন্দির থেকে তাকে মুক্ত করে নিয়ে গিয়ে চালুক্য সিংহাসনে অভিষিক্ত করুন। সোমেশ্বর সমুদ্রতটেই আমার পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করবেন আপনি।’ এ কথা বলার পরই প্রচণ্ড কেঁপে উঠল চালুক্যরাজ অম্বুজের দেহ। মাথা থেকে খসে পড়ল তাঁর রাজমুকুট। মাধেরা সূর্য মন্দিরে সেই বিষণ্ণ সন্ধ্যার অন্ধকারে স্থির হয়ে গেল চালুক্যরাজের শরীর।
মহারাজের বিস্ফারিত চোখের পাতা দুটো হাত দিয়ে বুজিয়ে দিলেন প্রবীণ চালুক্য মন্ত্রী চন্দ্রদেব। রাজ-মুকুটটা কুড়িয়ে নিলেন তিনি। সময় নষ্ট করা আর উচিত হবে না। চালুক্যরাজের দেহ উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হল জলকুণ্ডের তীরে। মাধেরা সূর্যমন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু আর নৃপতি মাণ্ডলিকের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠল চালুক্যরাজের চিতার আগুন। সে আগুন নির্বাপিত হবার পর চালুক্যরাজের শেষ ইচ্ছা পালন করার জন্য কোমরবন্ধে তাঁর রাজমুকুট আবৃত করে মাধেরা সূর্য মন্দির ত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে সোমনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব।
ঠিক সেই সময় নিজের তাঁবুতে তাঁর অনুচরদের নিয়ে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন গজনীর মালিক। তাঁর শ্মশ্রু সম্মিলিত মুখমণ্ডলে ক্ষমাহীন হিমশীতল কাঠিন্য। না, কাফেরদের জন্য বিন্দুমাত্র দয়া-মমতা নেই তাঁর শরীরে। বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করার পর তিনি বললেন, ‘না, এখানে বেশি ওয়াক্ত বরবাদ করা যাবে না। আমাদের আসল লক্ষ্য সোমনাথ। এখানে বেশি দিন গুজরান করলে কাফেরগুলো হয়তো সোমনাথ থেকে সব ধনরত্ন নিয়ে পালাবে। তিন দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে এই মাধেরার যুদ্ধ। বেরহম ভাবে মারতে হবে কাফেরদের। আমি কাল নিজে তলোয়ার ধরব।’
মামুদ গজনীর একথা বলার সঙ্গে-সঙ্গেই হয়তো বা মাধেরার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। পরদিন সূর্যের আলো ফুটতেই গজনীবিদের নেতৃত্বে সর্বশক্তি দিয়ে মাধেরা সূর্য মন্দিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আরব বাহিনী। চালুক্য, সোলাঙ্কি, আহরিয়া রাজপুত বাহিনী প্রবল বিক্রমে লড়লেও, লড়াইতে পিছু হঠতে লাগল তারা। এর প্রধান কারণ মামুদ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা।
হিন্দু ধর্ম রক্ষক সেনার একজন যবনের মাথা কাটলেই তার জায়গাতে আবির্ভূত হল পাঁচ জন জিহাদি! দ্বিতীয় দিন সুলতান বাহিনী মন্দিরে প্রবেশ করতে না পারলেও আরব বাহিনী কার্যত চারদিক থেকে দুর্গ প্রাকার ঘিরে ফেলল। অসীম সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করলেও দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল চালুক্য বাহিনী। তাদের মৃত রাজার পদাঙ্ক অনুসরণ করল তারা। সোলাঙ্কি আর আহরিয়া রাজপুতরা মন্দির প্রাকারের ভিতর রুদ্ধ হয়ে প্রস্তুত হলো শেষ লড়াইয়ের জন্য।
মামুদ দক্ষ যুদ্ধবাজ। দিনের শেষে রাজপুতরা দেখল যে আরব বাহিনীর উটগুলো ফিরে যাচ্ছে তাদের দূরবর্তী শিবিরের দিকে। কিন্তু রাতের গভীরে মামুদ তাঁর উষ্ট্রবাহিনীর কিছু অংশকে আবার ফিরিয়ে এনে স্থাপন করলেন মন্দির প্রাকারের পিছনের অংশে। ওই দিকের অংশে মন্দিরের দেবদাসীদের আবাসস্থল।
পরদিন সূর্যোদয়ের মুহূর্তে গর্ভগৃহর সামনে পুজোতে বসলেন সূর্যদেবের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু। যাই ঘটুক না কেন, দেবতার পুজো তো বন্ধ করা যায় না। ঠিক সেই সময় তিনি দেখতে পেলেন দেবতার মন্দিরের দিকে ছুটতে ছুটতে আসছে দেবদাসীরা। আর তাদের পিছু ধাওয়া করে আসছে একদল তলোয়ারধারী। প্রাকার অতিক্রম করে মন্দিরে প্রবেশ করেছে যবনরা!
কিছু রাজপুত যোদ্ধা পথ অবরোধ করল যবনদের। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই অস্ত্রের সংঘর্ষে কেঁপে উঠল মন্দির চত্বর। আতঙ্কিত দেবদাসীরা পুরোহিত বিভাবসুর সামনে উপস্থিত হয়ে বলল ‘হে প্রভু আমাদের রক্ষা করুন।’
বিভাবসু বললেন, ‘তোমাদের রক্ষাকর্তা তোমাদের নাথ সূর্যদেব। তোমরা তাঁর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করো। আতঙ্কিত নারীরা প্রবেশ করল মন্দিরের গর্ভগৃহে, তাদের শেষ আশ্রয়স্থলে সূর্যদেবের চরণে। গর্ভগৃহের কপাট বন্ধ করে পিছনের বড় প্রদীপ দণ্ডটা অস্ত্রের মতো উঁচিয়ে ধরে বিগ্রহ আর নারীদের রক্ষার জন্য দাঁড়ালেন মাধেরা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিভাবসু।
প্রাকার অতিক্রম করে ‘দীন দীন’ ধ্বনি তুলে মন্দির চত্বরে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল যবন সেনারা। শুরু হল শেষ যুদ্ধ। যেন এক বিরামহীন ভয়ঙ্কর যুদ্ধ! সারাদিন অতিক্রান্ত হয়ে অন্ধকার হয়ে গেল। তবু যুদ্ধ থামে না। মশালের আলোতে উপমন্দিরের আনাচে কানাচে চলতে লাগল খণ্ডযুদ্ধ।
পুরো প্রাকার তখন ঘিরে ফেলেছে যবন বাহিনী। মামুদ গজনী নিজেও তার তাঁবুতে ফেরেননি। প্রাকারের বাইরে দাঁড়িয়ে জিহাদি তরুণদের তিনি উৎসাহ দিচ্ছেন প্রাকারের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। একজন কাফেরকে হত্যা করার ইনাম দশ স্বর্ণমুদ্রা! তার কথা শুনে আরব ধর্ম যোদ্ধারা উটের পিঠ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রাকারের ভিতর মন্দির চত্বরে। গজনীবিদ বুঝতে পারছেন মাধেরা জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা।
তাঁর অনুমান মিথ্যা হল না। শেষ রাতে গণপতি উপমন্দিরের সামনে প্রবল বিক্রমে লড়াই করে সবশেষে নিহত হলেন সূর্য মন্দিরের শেষ প্রহরী রাজা মাণ্ডলিক। শেষ হয়ে গেল মাধেরার যুদ্ধ। ভোরের আলো ফোটার মুহূর্তে গর্ভগৃহর দ্বার উন্মোচন করে দেবতার আরাধনাতে বসলেন প্রধান পুরোহিত বিভাবসু। যবনরাও তখন যুদ্ধ শেষে মন্দিরের তোরণ উন্মোচন করে ফেলেছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্যার স্রোতের মতো মাধেরা মন্দিরে প্রবেশ করছে যবন বাহিনী। বিভাবসু কিন্তু তার দেবতা বন্দনায় অচঞ্চল। একদল যবন উল্লাস করতে করতে উঠে এল মন্দির প্রাঙ্গণে। এক জিহাদি তলোয়ারের এক কোপে আলাদা করে দিলো প্রধান পুরোহিতের ধড়-মুণ্ড। বিভাবসুর ছিন্ন মুণ্ড মাটিতে পড়ে বিড় বিড় করে ঠোঁট নাড়িয়ে তখনও যেন বলে চলেছে, ‘ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং…।’
যে পবিত্র গর্ভগৃহতে প্রধান পুরোহিত ছাড়া অন্য কেউ তাঁর অনুমতি ভিন্ন পা রাখতে পারত না, সেই গর্ভগৃহে চর্ম পাদুকা সহযোগে প্রবেশ করল যবনদের প্রথম দলটা। রত্নখচিত দেবতার অশ্ব, রথচক্র, স্বর্ণপূর্ণ পরিখা, সর্বোপরি হীরক-মরকত-নীলাকান্ত মণি খচিত সূর্যদেবতার স্বর্ণমূর্তি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আরব যুবকদের। পাগলের মতো সেই রথ ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল তারা।
হতভাগ্য সেই বারোজন দেবদাসী লুকিয়ে ছিল সেই রথ ও সূবর্ণ বিগ্রহের আড়ালে। গাছের কোটরে পাখির বাসাতে সর্প প্রবেশ করলে যে অবস্থা হয় তাদেরও অবস্থা হল তেমনই। প্রবল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল তারা। কয়েকজন দেবদাসী যুবক জিহাদিদের নিষ্ঠুর হাতের ফাঁক গলে গর্ভগৃহ থেকে বাইরে বেরিয়ে দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু কোথায় পালাবে তারা! একদল আরব ধরে ফেলল তাদের।
সাপেদের মুখে ধরা পাখির পালক যেমন আকাশে ওড়ে তেমনই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দেবদাসীদের ছিন্ন বসনগুলো বাতাসে উড়তে লাগল। উল্লসিত আরবদের মাঝে ঢাকা পড়ে গেল মাধেরা সূর্য মন্দিরের হতভাগ্য দেবদাসীদের আর্তচিৎকার। সুলতানের নির্দেশ, কাফেরদের কোনও মূর্তি, তা রত্নখচিত হোক বা না হোক, তা আস্ত রাখা যাবে না। সে কাজ শুরু হল এরপর। বিগ্রহের অঙ্গ থেকে খুবলে ফেলা হতে লাগল সোনার পাত, দুর্মূল্য মণি-মুক্তা। সেগুলো থলেতে ভরে তোলা হতে থাকল উটের পিঠে। সূর্যদেবের রথটাকে খণ্ডবিখণ্ড করে মূল্যবান ধাতু সমৃদ্ধ ঘোড়াগুলোকেও উটের পিঠে চাপানো হল আরব মুলুকে নিয়ে যাবার জন্য। সারাদিন ধরে চলতে লাগল এই কাজ। দিন শেষ হতে চলল একসময়।
সূর্যাস্তের ঠিক পূর্বমুহূর্তে সূর্যমন্দিরের চত্বরের আসরে একলা দাঁড়িয়ে ছিল কাসেম। চত্বর প্রায় তখন ফাঁকা হয়ে গেছে। মাধেরা মন্দিরের সব সম্পদ উটের পিঠে বোঝাই করে নিজেদের শিবিরের দিকে রওনা দিয়েছে আরবরা। সামান্য কিছু আরব তখনও বিধ্বস্ত মন্দির চত্বরের আনাচে কানাচে সন্ধান চালাচ্ছে যদি কোথাও কোনও ধনরত্নের সন্ধান মেলে তার জন্য। যদিও তা মেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যা ছিল তা সবই মন্দির গাত্র থেকে খুবলে নিয়েছে আরব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। এমনকী দারুকাঠের টুকরোগুলো পর্যন্ত।
কাসেম অবশ্য এসব কাজে যোগ দেয়নি। সে ইসলাম কবুল করতে বাধ্য হলেও তার ধমনীতে যে আদি সনাতন রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। সে রক্ত এ কাজে বাধ সেধেছে শুধু তাই নয়, সারাদিন ধরে তার চারপাশে চলতে থাকা এই ধ্বংসলীলার বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা, বিভীষিকা জাগ্রত করেছে তার হৃদয়ে। পাথরের মূর্তির মতো অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে সে প্রত্যক্ষ করেছে সব কিছু।
এমন বিষণ্ণ, রক্তাক্ত সন্ধ্যা কোনও দিন নামেনি মাধেরা মন্দিরে। চারপাশে শুধু ছড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ, পাথর, কাষ্ঠখণ্ড আর মৃতদেহ। যে মাধেরা মন্দিরে এ সময় সন্ধ্যারতির ধূপের সৌরভে পরিপূর্ণ থাকত সেখানের বাতাসে এখন শুধুই রক্ত আর উটের বিষ্ঠার দুর্গন্ধ!
নিঃসঙ্গ কাসেম একলা দাঁড়িয়ে ভাবছিল, ‘এ আমি কী পাপ কাজে লিপ্ত হলাম! নিয়তি কি নিষ্ঠুর খেলা খেলছে আমাকে নিয়ে! এই অনাচার, পাপকার্যের পথ প্রদর্শক হতে হচ্ছে আমাকেই।
সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার কিছুটা তফাতে একজন আরব একটা বেশ বড় গোলাকৃতি ধরনের প্রস্তর খণ্ড নিয়ে বারবার মাটিতে আছাড় মারছিল সেটা চূর্ণ করার উদ্দেশ্যে। কাসেমকে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেই প্রস্তর খণ্ডটা নিয়ে এসে দাঁড়াল কাসেমের সামনে। সেটা সে কাসেমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখো তো এটা ভাঙতে পারো কিনা। এর ভিতরেও হিরা-জহরত লোকানো থাকতে পারে। শুনেছি এই পাথরের পুতুলগুলোর ভিতরেও ধনরত্ন পুরে রাখে কাফেররা!
কাসেম কথাটা শুনে আরবের হাতে ধরা প্রস্তর খণ্ডর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল! যদিও তার গা থেকে খুবলে ফেলা হয়েছে সোনার পাত। অক্ষিকোটর থেকে বার করে ফেলা হয়েছে হীরক খণ্ডের তৈরি অক্ষিগোলকগুলো তবু জিনিসটা চিনতে অসুবিধা হল না কাসেমের। লোলুপ আরবের হাতে ধরা আছে মাধেরা সূর্য মন্দিরের সূর্য দেবতার ছিন্ন মস্তক। সুলতানের নির্দেশে অন্য আরবরা যা তাঁর দেহ থেকে ছিন্ন করে সোনা, হীরকখণ্ড খুলে নিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে গেছিল, সেটাই আবার রত্ন লাভের আশাতে তুলে এনেছে এই আরব! বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভাতে কাসেমের দিকেই যেন চেয়ে আছে সেই ছিন্ন মস্তক! যেন রক্ত ঝরছে মস্তকের ছিন্ন কণ্ঠদেশ ধেকে!
এ দৃশ্য আর সহ্য করা সম্ভব হল না জন্মসূত্রে সনাতন ধর্মাবলম্বী কাসেমের পক্ষে। যবনের হাত থেকে সেই ভারী সূর্যদেবের মস্তক তুলে নিয়ে কাসেম সেটা মাটিতে আছাড় না মেরে আছাড় মারল যবনের কপালে। মুহূর্তর মধ্যে চূর্ণ হয়ে গেল যবনের মস্তক। মাটিতে ছিটকে পড়ল তার দেহ!
কাসেমের মনের ভিতর এরপর কে যেন বলে উঠল, ‘পালাতে হবে! পাপ স্খলন করতে হবে আমাকে! সোমনাথবাসী হয়তো জানে না যে গজনীবিদ মামুদের এ অভিযানের আসল লক্ষ সোমনাথ মন্দির। মামুদ সেখানে উপস্থিত হবার আগেই তাদের সে সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে যাতে তারা বিগ্রহ রক্ষার চেষ্টা করেন।’
কাসেমের হৃদয় থেকে কথাটা উঠে আসার সঙ্গে-সঙ্গেই সে মন্দির চত্বর থেকে বাইরে বেরোবার জন্য ছুটতে শুরু করল। মন্দির তোরণের ঠিক মুখেই একজন আরব কয়েকটা ঘোড়ার লাগাম ধরে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করছিল ঘোড়াগুলোকে কুণ্ডের জল খাওয়াবার জন্য। কাসেম তার হাত থেকে একটা ঘোড়ার লাগাম কেড়ে নিয়ে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে লাফিয়ে তার পিঠে উঠে বসল। বিস্মিত আরব আরও প্রশ্ন করল, ‘আমার ঘোড়া নিয়ে তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
কাসেম তার কথার কোনও জবাব না দিয়ে হাতের লাগামে ঝাঁকুনি দিয়ে ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে দিল। কাসেম তার ঘোড়া নিয়ে পালাচ্ছে অনুমান করে আরব তার পিঠ থেকে তির-ধনুক খুলে নিয়ে তির চালাল কাসেমকে লক্ষ্য করে। ধাবমান কাসেমের পিঠে বিদ্ধ হল সেই তির। ঠিক সেই সময় ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল মাধেরার বুকে।
তির বিদ্ধ অবস্থায় গজনীবিদ মামুদের শিবির ত্যাগ করে তাদের পথ প্রদর্শক কাশেম হারিয়ে গেল রাত্রির অন্ধকারে। সুলতান শিবিরে খবরটা পৌঁছতে দেরি হল না। তিনি বললেন, ‘হয়তো সোমনাথ মন্দিরে পৌঁছতে দুদিন দেরি হবে আমাদের, কিন্তু আমরা সেখানে পৌঁছবই। আর মাত্র অল্প পথ বাকি। কাসেমকে যদি ধরা যায় তবে তাকে জীবন্ত দগ্ধ করব আমি।’
পরদিনও মাধেরাতেই অবস্থান করলেন গজনীবিদ মামুদ তার উষ্ট্র বাহিনীকে মন্দির কুণ্ডের জল পর্যাপ্ত ভাবে পান করিয়ে নেবার জন্য। তার পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই শিবির উঠিয়ে মাধেরা ত্যাগ করে যাত্রা শুরু করল মামুদের বিশাল বাহিনী। গজনীবিদ মূর্তি ধ্বংসকারী আরব মামুদের শেষ লক্ষ সোমনাথ মন্দির।
