সোমনাথ সুন্দরী – ১৯
১৯
অঙ্গিরাকে যেদিন খগেশ্বর সোমেশ্বর মুদ্রা ফিরিয়ে দিয়ে গেছিল, রক্ষী প্রধান জয়দ্রথ অঙ্গিরার কক্ষে রত্নরাজির সন্ধানে তল্লাসি নিতে এসেছিলেন। সে দিনের পর পাঁচ রাত কেটে গেল অঙ্গিরার। তার মধ্যে দু-রাত দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে নৈশ অভিসারে, বাকি তিনরাত ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ মতো নিজ কক্ষে আবদ্ধ থেকে দিবারাত্রি সমর্পিতার কথা ভাবতে ভাবতে। তিনি রাত্রি অতিথিশালার কক্ষে আবদ্ধ থাকার পর ভোরের আলো ফুটতেই আনন্দে চঞ্চল হয়ে উঠল অঙ্গিরার মন। আজ আবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে রাজশ্রীর—দেবদাসী সমর্পিতার।
তিনদিন পর নিজের কক্ষ, অতিথিশালা ত্যাগ করে মন্দির চত্বরে উপস্থিত হল অঙ্গিরা। চত্বর, বাগিচা সবই প্রায় ফাঁকা। বাইরের কোনও পুণ্যার্থী প্রবেশ করেনি মন্দিরে। শুধু সেবায়েতের দল এখানে ওখানে কেমন যেন আতঙ্কিত ভাবে চাপা স্বরে জটলা করছে!
মূল মন্দিরে ওঠার যে সোপানশ্রেণী আছে তা বেয়ে ওপরে ওঠার মুখে একটা ধাপে বসল অঙ্গিরা। স্বাভাবিক দিন হলে এসময় এই সোপানের ধারে বসলে মুহূর্তের মধ্যেই পদপিষ্ট হয়ে যেত সে। আজ সব কিছুই যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা। দু-চারজন সেবায়েত শুধু সোপান বেয়ে ওঠা-নামা করছে তাঁদের প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদনের জন্য।
মন্দিরের এই জনশূন্য গম্ভীর পরিবেশ অবশ্য তেমন ভাবে স্পর্শ করতে পারল না অঙ্গিরাকে। সে বিভোর ভাবে ভাবতে লাগল দেবদাসী সমর্পিতার কথা, ভাবতে লাগল কখন দিন কেটে গিয়ে সূর্যাস্ত হবে, অঙ্গিরা কখন পৌঁছবে দেবদাসী সমর্পিতাকে বক্ষলগ্ন করার জন্য; মধুর নিশি যাপনের জন্য! এ সব কথা ভাবতে ভাবতে সময় এগিয়ে চলল।
বেশ কিছু সময়ের পর অঙ্গিরার পাশে এসে দাঁড়াল একজন। অঙ্গিরা মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে। সোপানশ্রেণী বেয়ে নীচে নেমে অঙ্গিরাকে বসে থাকতে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন। অঙ্গিরাও উঠে দাঁড়াল তাকে দেখে। জয়দ্রথ হাসলেন না। তিনি বললেন, ‘যাক আপনাকে এখানে পেয়ে ভালোই হল। নইলে আপনার কক্ষে যেতে হতো আমাকে।’
অঙ্গিরা কথাটা শুনে হেসে বললেন, ‘কেন সেই অপহৃত রত্ন অনুসন্ধানের ব্যাপারে নাকি?’
জয়দ্রথ কিন্তু এবারও হাসলেন না। তিনি বললেন, ‘না সে ব্যাপারে নয়। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব আজ সন্ধ্যারতির পর এ মন্দিরের যারা বাসিন্দা তাদের সঙ্গে মিলিত হবেন। সবাইকে সেই সভাতে উপস্থিত থাকতে হবে তেমনই নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান পুরোহিত। এ সংবাদ আপনাকে জানাবার জন্যই যেতাম।’
অঙ্গিরা বলল, ‘আচ্ছা আমি উপস্থিত থাকব। কিন্তু কি কারণে এই সভা?’
রক্ষী প্রধান বললেন ‘মাধেরা সূর্য মন্দিরে নাকি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তার ফলাফল অবশ্য এখনও জানা যায়নি। তবে গতকাল রাতে রাজর্ষি ভীম তাঁর পরিবার বর্গ ও পারিষদবর্গদের নিয়ে কানিথকোট দূর্গ অভিমুখে রওনা হয়েছেন। নগরবাসীরাও আতঙ্কে নগর ত্যাগ করতে শুরু করেছে। এসব দেখেশুনে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়েছে মন্দিরবাসীদের মধ্যে। মন্দিরবাসীদের আশ্বস্ত করার জন্য, এ পরিস্থিতিতে তাঁর নির্দেশ দানের জন্যই গর্ভগৃহর সামনের চত্বরে সভার আহ্বান করেছেন প্রধান পুরোহিত। তা ছাড়া…!’—বাক্য সম্পূর্ণ করলেন না রক্ষী প্রধান।
‘তা ছাড়া কি?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।
একটু চুপ থেকে জয়দ্রথ বললেন, ‘আজ সকাল থেকে সেবায়েত প্রধান বিষধারীর খোঁজ মিলছে না। আর দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমাও মন্দিরে নেই!’
অঙ্গিরার এ কথা শুনে মনে পড়ে গেল পাঁচ রাত পূর্বে মধ্য রাতে দেবদাসী তিলোত্তমার কক্ষ থেকে সেবায়েত প্রধান বিষধারীর বাইরে আসার দৃশ্য। অঙ্গিরা প্রশ্ন করল, ‘সেবায়েত প্রধান বিষধারী আর দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা কি একই সঙ্গে মন্দির ত্যাগ করেছেন?’
অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে রক্ষী প্রধান বললেন, ‘তারা একইসঙ্গে মন্দির ত্যাগ করে কোথাও গেছেন কিনা সে ব্যাপারে কোনও সংবাদ জানা নেই। তবে দেবদাসী তিলোত্তমা কীভাবে মন্দির ত্যাগ করল সেটাই রহস্যের। দ্বার রক্ষীরা কোনও দেবদাসীকেই মন্দির ত্যাগ করতে দেয় না। তেমনই নির্দেশ দেওয়া আছে প্রধান পুরোহিতের। সেবায়েত প্রধানের মন্দির ত্যাগের ওপর তেমন কোনও নির্দেশ ছিল না। যতটুকু জানা গেছে, সেবায়েত প্রধান গতকাল সন্ধ্যারতির পর একলাই মন্দির ত্যাগ করেছিলেন।’ এ কথা বলার পর রক্ষী প্রধান আর দাঁড়ালেন না। অঙ্গিরার থেকে বিদায় নিয়ে তিনি নিজের কাজে অন্যত্র রওনা দিলেন। অঙ্গিরাও সে স্থান ত্যাগ করে রওনা হল অতিথিশালার দিকে।
সারাটা দুপুর-বিকাল নিজের কক্ষে বসে দেবদাসী সমর্পিতার কথাই ভাবতে লাগল অঙ্গিরা। সন্ধ্যা নামল এক সময়। সন্ধ্যারতির ঘণ্টা বাজা শুরু হলে অঙ্গিরা অতিথিশালা ত্যাগ করে সোপানশ্রেণী বেয়ে গর্ভগৃহের সামনে উপস্থিত হল। দেবদেসীদের নৃত্যগীত সাঙ্গ হবার পর সেদিনের মতো গর্ভগৃহর দ্বার বন্ধ করছেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। আর এক পুরোহিত নন্দিবাহনও সেখানে উপস্থিত। এক স্তম্ভের গায়ে ভূমিতে আসন গ্রহণ করল অঙ্গিরা। যে সব দেবদাসীরা কিছু আগে দেবতাকে নৃত্যগীত প্রদর্শন করেছে তারা ফিরে যায়নি এদিন। গর্ভগৃহর তোরণের এক পাশে উপবিষ্ট তারা।
ক্রমশ লোক সমাগম হতে লাগল গর্ভগৃহ চত্বরে। এক সময় অন্য দেবদাসীরাও তাদের আবাসস্থল থেকে উঠে এল সেখানে। অঙ্গিরা বিস্মিত ভাবে দেখল তাদের সঙ্গে দেবদাসী সমর্পিতাও এসেছে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ পালনের জন্য। চকিতের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হল তাদের দুজনের মধ্যে।
দেবদাসী সমর্পিতাও আসন গ্রহণ করল ভূমিতলে অন্য দেবদাসীদের সঙ্গে। কিছু সময়ের মধ্যেই জনসমাগমে পূর্ণ হয়ে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর। সেই চত্বর ছাপিয়ে মানুষের মাথা গিয়ে পৌঁছল সোপানশ্রেণীতেও।
একজন প্রদীপ বাহকের সঙ্গে গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণে এসে মন্দিরবাসীদের সামনে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুললেন, জনতা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে প্রণাম জানাবার পর। এরপর তাঁর ইশারাতেই আবার সবাই ভূমিতে আসন গ্রহণ করল।
সভা শুরুর আগে দুই সহ-প্রধান পুরোহিত গিয়ে দাঁড়ালেন প্রধান পুরোহিতের দু-পাশে। কিন্তু মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল বিশাল জনতার মধ্যে। বক্তব্য শুরুর আগে তার সামনে বসা মন্দিরবাসীদের দিকে তাকালেন প্রধান পুরোহিত। প্রদীপের আলো আর মশালের আলোতে জেগে থাকা মন্দিরবাসীদের মুখমণ্ডলে প্রবল উৎকণ্ঠার ছাপ তাঁর নজর এড়াল না। মন্দিরবাসীদের উদ্দেশ্যে কথা শুরু করলেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।
‘আমরা সবাই সোমনাথ মন্দিরের সোমেশ্বর মহাদেবের সেবক মাত্র। এ ব্যতীত আমাদের অর্থাৎ এই সোমেশ্বর মন্দিরের বাসিন্দা পুরোহিতকুল, সেবায়েত মণ্ডলী থেকে শুরু করে, দেবদাসী, মালিনী, রন্ধকারক, দ্বাররক্ষী থেকে শুরু করে শূদ্রমণ্ডলী, সোমেশ্বর মহাদেবের ক্ষুদ্রতম সেবক পর্যন্ত কারোই পৃথক কোনও অস্তিত্ব নেই। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর সোমেশ্বর মহাদেব। এই পৃথিবীর সকল কার্য তাঁরই ইচ্ছাধীন, নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনি মহাকাল, কাল নিয়ন্ত্রক। সামান্য বৃক্ষপল্লব পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছা ব্যতিরেকে স্থানচ্যুত হয় না। তিনি আমাদের আশ্রয়দাতা, আমাদের রক্ষক।
মূর্তি ধ্বংসকারী মহা নারকী যবন মামুদ আবার হানা দিয়েছে আমাদের পুণ্যভূমি এই মহাভারতের মাটিতে। সে নাকি সোমনাথ নগরীতে হানা দিতে আসতে পারে এ মন্দির লুণ্ঠন করার জন্য, ধ্বংস করার জন্য! এ সংবাদে নগরীতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নগরবাসীর অনেকে আতঙ্কিত হয়ে নগরী ত্যাগ করতে শুরু করেছে।
মাধেরা সূর্য মন্দিরের নিকট নৃপতি মাণ্ডলিক, চালুক্যরাজ অম্বুজ প্রমুখ হিন্দুশ্রেষ্ঠরা যবন মামুদকে পরাস্ত করার জন্য যুদ্ধ শুরু করেছেন যার ফলাফলের সংবাদ এখনও নগরীতে এসে পৌঁছয়নি। হয়তো বা রাজর্ষি মাণ্ডলিকই যবন বাহিনীর গতি রুদ্ধ করে দেবেন। তবে মাধেরার যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, আমাদের মন্দিরবাসীদের অযথা আতঙ্কের কোন কারণ নেই। কারণ, আমাদের রক্ষাকর্তা স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেব। মন্দির লুণ্ঠন তো দূরের কথা, তাঁর আবাসস্থলে প্রবেশ করার ক্ষমতা, তাঁর বিনা অনুমতিতে দেবতাদেরও নেই। তাঁর আশীর্বাদে সব আশঙ্কা অমূলক বলে শীঘ্রই প্রমাণিত হবে। ততদিন আপনারা আতঙ্কমুক্ত, ধৈর্যশীল ভাবে মন্দিরের প্রাত্যহিক কাজে নিয়োজিত থাকুন। আবারও আপনাদের বলি আমাদের রক্ষাকর্তা স্বয়ং সোমেশ্বর মহাদেব। এ মন্দির তাঁর আবাসস্থল। এ মন্দিরে তাঁর সেবকদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতা যবনদের নেই।’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন সোমেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।
তাঁর এই বক্তব্য শুনেও উপস্থিত মন্দিরবাসীদের অনেকের আতঙ্ক দূর হল না। একজন প্রবীণ সেবায়েত উঠে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘প্রশ্ন করার জন্য আমাকে মার্জন করবেন প্রভু। আশঙ্কা যদি অমূলক হয়ে থাকে তবে স্বয়ং রাজা ভীম সোমনাথ নগরী ত্যাগ করলেন কেন? এ ঘটনাই আমাদের মনে আরও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। সেই নারকী যবন যদি সত্যি-সত্যিই এখানে এসে উপস্থিত হয়?’
প্রশ্ন শুনে এবার মুখ খুললেন সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুন। তিনি বললেন, ‘নৃপতি ভীম রাজা হতে পারেন, কিন্তু তিনি আমাদের মতো সোমেশ্বর মহাদেবের সেবক নন। তাই তাঁর স্থান ত্যাগ করতে বাধা নেই। এটাও হতে পারে তিনি কোনও কৌশল অবলম্বন করতে নগরী ত্যাগ করেছেন। হয়তো বা এটাও সোমেশ্বর মহাদেবেরই কোনও ইচ্ছা। তা বোঝার সাধ্য বা ক্ষমতা হয়তো আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষের নেই। তবুও যদি এটাই হয়ে থাকে যে যবন মামুদ সোমনাথ নগরীতে উপস্থিত হবে বুঝতে পেরে তিনি নগরী ত্যাগ করেছেন তবে এটা নিশ্চিত যে সোমেশ্বর মহাদেবই মামুদকে ধ্বংস করার জন্য সোমনাথ নগরীর দিকে টেনে আনছেন। আরব বাহিনী-সহ মামুদকে ধ্বংস করবেন সোমেশ্বর মহাদেব। এই পবিত্র ভূমিতে এটাই হবে যবন বাহিনীর অন্তিম অভিযান।’
মল্লিকার্জুনের কথা শেষ হবার পর ত্রিপুরারিদেবের অন্য পাশে দাঁড়ানো আর এক সহ প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন মন্দিরবাসীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হ্যাঁ, যবন মামুদ যদি তার বাহিনী নিয়ে এ রাজ্যের মাটিতে সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠনের জন্য পা দিয়ে থাকে, তবে তার নিয়তিই তাকে এখানে টেনে আনছে। পাপের আধার পরিপূর্ণ হয়েছে হিন্দু হন্তারক, মন্দির লুণ্ঠনকারী মামুদের।
সোমেশ্বর মহাদেব নটরাজ মূর্তি ধারণ করে এবার প্রলয় নৃত্য শুরু করবেন। নিশ্চিহ্ন হবে নারকী মামুদ। মালবের মহানৃপতি ভোজরাজ নিশ্চয়ই তাঁর দশ হাজার হস্তি ও একলক্ষ সেনাদল নিয়ে ইতিমধ্যে যাত্রা শুরু করেছেন সোমনাথ নগরীর দিকে। তিনি এসে পড়বেন। সোমেশ্বর মহাদেবের ইচ্ছাতে তিনি ধ্বংস করবেন যবন মামুদকে। মানবপতি রাজর্ষি ভোজের অপরাজেয় বাহিনী বন্যার প্রবল জলস্রোতের মতো আছড়ে পড়বে যবনদের ওপর। খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, নিশ্চিহ্ন হবে আরবরা।’ তিন পুরোহিতের বক্তব্য শুনে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে নিশ্চুপ হল জনতা। কেউ আর কোন প্রশ্ন করল না তাঁদেরকে।
প্রধান পুরোহিত দৃষ্টিপাত করলেন গর্ভগৃহের বন্ধ কপাটের একপাশে উপবিষ্ট দেবদাসীদের প্রতি। আতঙ্ক, আশঙ্কার চিহ্ন সবথেকে বেশি পরিস্ফুট তাদের মুখমণ্ডলেই। ব্যাপারটা খেয়াল করে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা যারা এ মন্দিরের দেবদাসী, তারা নিজেদের নাথ বলে গ্রহণ করেছ সোমেশ্বর মহাদেবকে। তোমাদের আমৃত্যু বন্ধন সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে। তিনি তোমাদের স্বামী। দেবতারও সবথেকে প্রিয় পাত্রী তোমরা। তোমাদের নৃত্যগীত শ্রবণ না করলে বিগ্রহের নিদ্রা ভঙ্গ হয় না, তিনি ভোজ গ্রহণ করে দ্বিপ্রহরে পরিতৃপ্ত হন না, সান্ধ্যকালে নিদ্রা যান না সোমেশ্বর মহাদেব।
কোনও দেবদাসীর মৃত্যু ঘটলে পত্নী বিয়োগের মতোই শোকগ্রস্ত হন মহাদেব। কোনও দেবদাসীর স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তাঁর দেহ যে বস্ত্রখণ্ডে আবৃত করা হয় তা বিগ্রহেরই বস্ত্র খণ্ড। চিতার আগুন সংগ্রহ করা হয় গর্ভগৃহের প্রদীপের আগুন থেকেই। আর দুর্ঘটনাতে মৃত্যু ঘটা কোনও দেবদাসীকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবার পূর্বে যে ফুলমালা পরানো হয় তা বিগ্রহরই ফুলমালা। যতক্ষণ মৃতার দেহ অগ্নিকুণ্ডে পঞ্চভূতে বিলীন না হয় অথবা সমুদ্রতে ভেসে যায়, ততক্ষণ গর্ভগৃহতে প্রদীপ জ্বলে না, ভোগ গ্রহণ করেন না দেবতা।
এমনই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তাঁর সঙ্গে তোমাদের। তিনি তোমাদের নাথ, তোমাদের রক্ষাকর্তা। তোমাদের অঙ্গ, সৌন্দর্য সবই তাঁর চরণে নিবেদিত। এ অঙ্গ স্পর্শ করার ক্ষমতা অন্য দেবতাদেরও নেই। নির্ভয়ে থাক তোমরা। নৃত্যগীত পরিবেশন করে তৃপ্ত করো, মুগ্ধ করো তোমাদের নাথ সোমেশ্বর মহাদেবকে। এই মানবজন্ম সোমেশ্বর মহাদেব সেবার যে অমূল্য সুযোগ তোমাদের দিয়েছে তা দিয়ে তোমরা তোমাদের স্বর্গবাসের পথ প্রশস্ত করো।’
এ কথা বলার পর প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব মন্দিরবাসীদের তাঁর শেষ কথাগুলো বললেন, ‘বর্তমানে মন্দিরের পরিস্থিতির কথা ভেবে নতুন দুটি বিধি আমাকে প্রবর্তন করতে হচ্ছে। প্রথম—রাত্রিকালে কোনও ব্যক্তি তাঁর আবাসস্থল ত্যাগ করে মন্দিরের অন্যত্র গমন করতে পারবে না। একমাত্র যারা মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে রক্ষা বা প্রহরীর দায়িত্বে আছেন, কর্তব্য সম্পাদনের জন্য তাদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। আর দ্বিতীয় নিষেধ হল, দিন হোক বা রাত্রি, একমাত্র সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারীরা ব্যতীত অন্য কোনও ব্যক্তি আজ এই মুহূর্তের পর থেকে প্রধান পুরোহিত বা সহ প্রধান পুরোহিতের অনুমতি ভিন্ন কোনও ভাবেই মন্দির ত্যাগ করতে পারবেন না।’
প্রধান পুরোহিতের এই নির্দেশ শুনে অঙ্গিরার মনে হল সেবায়েত প্রধান বিষধারী ও দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার অন্তর্ধানের কারণেই সম্ভবত এ নিষেধ আরোপ করলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব।
তিনি এরপর সভা ভঙ্গ হবার ইঙ্গিত করে বলে উঠলেন, ‘জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়!’
উপস্থিত মন্দিরবাসীরা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাল, ‘জয় ভৈরবেশ্বরের জয়! শ্রাবণীকেশ্বরের জয়! গণেশ্বরের জয়!’ সোমেশ্বর মহাদেব, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যুগে যে সব নামে আবির্ভূত হয়েছেন সে সব নামে জয়ধ্বনি দিয়ে সভার কাজ শেষ হল। সবাই এরপর মন্দিরের গর্ভগৃহ চত্বর ছেড়ে পা বাড়াল মন্দিরে নিজ নিজ রাত্রিবাসের স্থানের দিকে। দেবদাসী সমর্পিতাও অন্য দেবদাসীদের সঙ্গে তাদের আবাসস্থলে এগোবার আগে চকিতের জন্য একবার পিছনে ফিরে তাকাল অঙ্গিরার দিকে। অঙ্গিরা তাকে চোখের ইশারাতে বুঝিয়ে দিল আজ রাত্রিতে সাক্ষাৎ হবে তার সঙ্গে।
দেবদাসীদের দলটা মন্দির চত্বর থেকে অন্তর্হিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই অঙ্গিরাও ফেরার পথ ধরল। অতিথিশালাতে মধ্য রাত পর্যন্ত কাটিয়ে তাকে রওনা হতে হবে প্রিয়তমার সঙ্গে মিলনের জন্য। যে মিলনের জন্য গত তিন দিন তিন রাত্রি প্রতীক্ষা করে আছে অঙ্গিরা। প্রতীক্ষা করে আছে রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতাও।
অন্ধকার গাঢ় হবার সঙ্গে-সঙ্গেই পুরু কুয়াশার আবরণে আবৃত হতে থাকল জনশূন্য মন্দির চত্বর। আকাশের চাঁদও কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে আছে অজানা কোন আতঙ্কে। মন্দির কাননে প্রাচীন বৃক্ষগুলোর কোটরে যে পেঁচককূল বাস করে, রাত্রি নামলে যারা মাঝে মাঝে কর্কশ ডাক ছাড়ে তারাও কদিন ধরে কেমন যেন নিশ্চুপ। রাত্রির অন্ধকারে কোথাও কোনও শব্দ নেই।
গর্ভগৃহ চত্বর থেকে ফিরে নিজ কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন ত্রিপুরারিদেব। বাইরে রাত্রি বেড়ে চলেছে কিন্তু ত্রিপুরারিদেবের চোখ নিদ্রাহীন। সোমেশ্বর মহাদেবের প্রতি তাঁর আস্থা অটুট থাকলেও, মন্দিরবাসীদের তিনি অভয়দান করলেও, বাস্তবিক কিছু ঘটনা তাঁকে গভীর ভাবে বিচলিত করে তুলেছে। প্রথমে অন্ধকারের রক্ষীর সেই গোপন কক্ষ ত্যাগ করা। অজ্ঞাত পরিচয় কোনও ব্যক্তির রত্ন হরণ, এদিন সকাল থেকে সেবায়েত প্রধান বিষধারী ও দেবদাসী তিলোত্তমার অন্তর্ধান, এসব ঘটনা নিদ্রা আনছে না ত্রিপুরারিদেবের চোখে। এসব দুর্ঘটনা কীসের ইঙ্গিতবাহী? কোনও অশুভ ঘটনা ঘটার ইঙ্গিত?
রাত বাড়তে বাড়তে মধ্যরাতে পৌঁছল। বিনিদ্র ত্রিপুরারিদেব তখন ভাবছিলেন—যদি সত্যিই যবন মামুদ মন্দিরে হানা দেয় তবে কি কর্তব্য তাঁর? বা এই গোলযোগের সুযোগ অন্য কেউও নিতে পারে। অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে দেবতার স্যমন্তক মণি, দেবতার রত্নাগার! হয়তো তিথি নক্ষত্রর জন্য অপেক্ষা করা আর উচিত হবে না। সে কক্ষের দায়িত্ব দ্রুত অর্পণ করা উচিত যুবক অঙ্গিরাকে।
প্রধান পুরোহিত মধ্যরাতে যখন অঙ্গিরার কথা স্মরণ করছিলেন ঠিক সেই সময় অতিথিশালা ত্যাগ করে অন্ধকার আর কুয়াশাময় পথ ধরে দেবদাসীদের আবাসস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হল অঙ্গিরা। প্রধান পুরোহিত অঙ্গিরাকে দেবদাসীদের আবাসস্থল ও সে সংলগ্ন অঞ্চলে প্রহরার কাজে নিযুক্ত করেছেন। তাই অতিথিশালা ত্যাগ করে সে স্থানে যেতে বাধা নেই অঙ্গিরার। আর যদি তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হতো তবুও সে দেবদাসী সমর্পিতার আহ্বান অগ্রাহ্য করতে পারত কিনা সন্দেহ। অঙ্গিরা এগিয়ে চলল।
সে যখন সেই খণ্ডহর প্রাচীন চন্দ্রদেবতার মন্দির অতিক্রম করছে ঠিক সেই সময় অন্ধকার মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এল একজন লোক। অঙ্গিরার একদম মুখোমুখি হয়ে গেল সে। নাপিত শিরমণি খগেশ্বর! তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল অঙ্গিরা। সে তাকে প্রশ্ন করল, ‘মধ্যরাতে চন্দ্রদেবতার ভগ্ন মন্দিরে আপনি কি করছিলেন?’
বৃদ্ধ খগেশ্বর কোনও জবাব দিল না।
অঙ্গিরার মুহূর্তের মধ্যে মনে পড়ে গেল সোমেশ্বর মুদ্রা দর্শন করিয়ে সেই রত্ন হরণের ব্যাপারটা। প্রবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সে খগেশ্বরকে বলল, ‘আপনি আমার থেকে কৌশলে সোমেশ্বর মুদ্রাটা নিয়েছিলেন মন্দিরের রত্ন হরণ করার জন্য, তাই না?’
এবারও নিশ্চুপ রইল খগেশ্বর।
অঙ্গিরা তাকে জবাব না দিতে দেখে ক্ষুব্ধ ভাবে বলল, ‘এ উদ্দেশ্য সফল করার জন্যই, আমার থেকে মুদ্রা নেবার জন্যই আপনি সমুদ্র সর্পর থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করেছিলেন। সে সম্পদ কি আপনি এ মন্দিরে লুকিয়ে রেখেছেন?’
নরসুন্দর প্রধান খগেশ্বর এবার বললেন, ‘না, ও মুদ্রা রক্ষীদের দেখিয়ে আমি রত্ন হরণ করিনি। সেবায়েত প্রধান বিষধারীও সোমেশ্বর মুদ্রার অধিকারী। তিনি রক্ষীদের সেই মুদ্রা প্রদর্শন করে ওই রত্নরাজি হরণ করে তা লুক্কায়িত রাখেন তাঁর প্রেয়সী দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার কাছে। ওই মুদ্রার সাহায্যে তিলোত্তমা গত রাত্রিতে রত্নগুলো নিয়ে মন্দির ত্যাগ করে মিলিত হয়েছে সেবায়েত প্রধানের সঙ্গে। তারপর সম্ভবত তারা দুজনে সোমনাথ নগরী ছেড়ে পলায়ন করেছে।’
এ কথা বলার পর একটু থেমে বিষণ্ণ হেসে বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, ‘আমার যদি রত্ন চুরি করতেই হত তবে এ মন্দিরের শ্রেষ্ঠ সম্পদ স্যমন্তক মণি হরণ করতাম। যার, সে মণির সন্ধান এখন জানা, সে অযথা ওই সামান্য ধনসম্পদ চুরি করতে যাবে কেন?’
খগেশ্বরের বলা অজানা, বিস্ময়কর কথাগুলো শুনে অঙ্গিরা বেশ বিস্ময়বোধ করল। সন্দেহ নিরসনের জন্য সে প্রশ্ন করল, ‘আপনি স্যমন্তক মণির খোঁজ পেলেন কীভাবে? আর এ মন্দিরেই বা এত রাতে কি করছেন তার জবাব দিলেন না তো?’
নরসুন্দর বলল ‘আমি তোমাকে এ স্থানেই নিয়ে আসব বলে ভেবেছিলাম। এই ভগ্ন মন্দিরের ভিতরে চলো। তোমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পাবে।’
মন্দিরের ভিতরে বাইরের চাঁদের আলো প্রবেশ করছে না। খগেশ্বরের পিছন পিছন সেই অতি জীর্ণ-ভগ্ন মন্দিরের ভিতর পা রেখে অঙ্গিরা স্বগোতক্তি করল, ‘কী ঘোর অন্ধকার!’
কথাটা শুনেই একটু শব্দ করে হাসল বৃদ্ধ খগেশ্বর।
অঙ্গিরা ব্যাপারটা খেয়াল করে বলল, ‘আপনি হাসলেন কেন?’
ক্ষৌরকার শিরমণি জবাব দিল, ‘তোমার কথা শুনে কৌতুক বোধ করলাম তাই। ওই যে বললে, ‘ঘোর অন্ধকার!’
‘এ কথায় কৌতুকবোধ করার কি আছে?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।
বৃদ্ধ কথার কোনও জবাব দিল না। অন্ধকার দেওয়ালের খাঁজ হাতড়ে চকমকি পাথর বার করে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি প্রদীপ জ্বালিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকল। প্রদীপের মৃদু আলোতে অঙ্গিরা যতটুকু বুঝতে পারল তাতে এ মন্দিরের সৌন্দর্যও এক সময় কম ছিল না। যদিও আরব জুয়ানেদের সেনাদের বর্বতার চিহ্ন আজও ধরে রেখেছে এ মন্দির।
দেওয়াল গাত্রের মূর্তিগুলোর কারও নাক ভাঙা, কারও হাত ভাঙা! কোনও দেবমূর্তির মুণ্ড হয়তো ছিন্ন হয়ে ধুলোতে পড়ে আছে! দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে প্রাচীনত্বর কারণে মূর্তিগুলো এমন ভাবে ধ্বংস হয়নি, ধ্বংস করা হয়েছে মূর্তিগুলোকে! কোনও এক ভয়ঙ্কর প্রাচীন অতীতের সাক্ষ্য আজও জেগে আছে সর্বাঙ্গে!
খগেশ্বরের পিছনে চলতে চলতে অঙ্গিরার এবার মনে হল সত্যিই যদি আরব মামুদ মন্দিরে হানা দেয় তবে কি সোমেশ্বর বিগ্রহ মন্দিরেরও এমনই অবস্থা হবে?
খগেশ্বর প্রদীপ হাতে এসে থামল এক অতি প্রাচীন কক্ষের সামনে। সে কক্ষের ভিতর জমাট বাঁধা অন্ধকার। কক্ষর কপাটহীন দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতর থেকে ভেসে আসা মনুষ্য কণ্ঠের অস্পষ্ট গোঙানি-আর্তনাদের শব্দ শুনতে পেল অঙ্গিরা! তাকে নিয়ে সেই কক্ষে পা রাখল বৃদ্ধ খগেশ্বর। ক্ষুদ্রাকৃতি সে কক্ষ আলোকিত হয়ে উঠল প্রদীপের আলোতে।
অঙ্গিরা দেখতে পেল সে কক্ষের এক কোণে একটা বস্ত্রখণ্ডর ওপর দু-পা ছড়িয়ে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছে বীভৎস দর্শন প্রায় নগ্ন একজন মানুষ। শুধু তার লজ্জাস্থান সামান্য বস্ত্রখণ্ডে আবৃত। লোকটার কেশদাম আর শ্মশ্রু এমনই প্রবল যে তার মুখমণ্ডল চেনা সম্ভব নয়। দীর্ঘ দিন ছেদন না করার ফলে তার হাত-পায়ের নখ শ্বাপদের নখের মতো তীক্ষ্ন-বাঁকানো। সর্বোপরি তার সারা শরীরে অসংখ্যা ঘা। সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর দর্শন এক মূর্তি বসে আছে অঙ্গিরার চোখের সামনে! প্রেত সদৃশ এই মূর্তিই কি হানা দিয়েছিল দেবদাসীদের আবাসস্থলে? এরই খোঁজে কি তাকে নিয়োগ করেছিলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব?
বিস্মিত অঙ্গিরা বলে উঠল ‘কে ও?’
বৃদ্ধ খগেশ্বর জবাব দিল, ‘ও হল, স্যমন্তক মণির রক্ষক। তোমার ভবিষ্যৎ? তবে ওর আর একটা পরিচয়ও আছে।
অঙ্গিরা বলল ‘আমার ভবিষ্যৎ মানে? ওর অন্য পরিচয়ই-বা কী?’
দ্বিতীয় প্রশ্নর জবাব প্রথমে দিল বৃদ্ধ খগেশ্বর। সে বলল, ‘ও হল আমার মৃত পুত্রের একমাত্র পুত্র। ওর নাম কার্তিকেয়। এক সময় দেবসেনাপতি কার্তিকেয়র মতোই অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল ও। কিন্তু দ্বাদশ বৎসর সেই অন্ধকার কক্ষে স্যমন্তক মণির প্রহরী হিসাবে দায়িত্ব পালন করার পর ওর কী চেহারা হয়েছে দেখো। সর্বাঙ্গে বিষাক্ত ঘা। দীর্ঘদিন সূর্যালোক না দেখাতে দিনের আলোতে চোখে দেখতে পায় না। আমরাই একদিন ওকে তুলে দিয়েছিলাম মন্দিরের অধ্যক্ষ আর ত্রিপুরারিদেবের হাতে।’
একথা বলার পর একটু চুপ করে থেকে অঙ্গিরাকে চমকে দিয়ে খগেশ্বর বলল, ‘হ্যাঁ, ওই তোমার ভবিষ্যৎ। ওই অন্ধকার কক্ষে অন্ধকারের প্রহরীর দায়িত্ব তোমাকে অর্পণ করতে চলেছেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। আমি দেখেছি কিছু দিবস পূর্বে তোমার চোখ বেঁধে তোমার লক্ষভেদ পরীক্ষা করছিলেন তিনি। কেন জানো? সে কক্ষে কোনও আলো প্রবেশ করে না। সেই রত্ন কক্ষের অবস্থান আমাকে বলেছে ও।
গর্ভগৃহতে মহাদেবের ঝুলন্ত বিগ্রহের পশ্চাতে দেওয়ালের গায়ে এক গোপন প্রবেশ পথ বেয়ে নীচে নেমে সেই অন্ধকার ভূগর্ভস্থ কক্ষে যেতে হয়। সে কক্ষের কথা সোমেশ্বর মন্দিরের অধ্যক্ষ আর প্রধান পুরোহিত ছাড়া কেউ কোনওদিন জানতে পারে না। অধ্যক্ষ বর্তমানে প্রয়াত হয়েছেন। সে কক্ষের কথা একমাত্র জানেন ত্রিপুরারিদেব। দৈবাৎ যদি কোনও ভাবে সেই কক্ষর সন্ধান পেয়ে স্যমন্তক মণি হরণের জন্য সেই অন্ধকারে প্রবেশ করে তবে তুমি অন্ধকারে তাকে তির নিক্ষেপ করতে পারবে কিনা, তোমার চোখ বেঁধে সে পরীক্ষাই নিয়েছেন প্রধান পুরোহিত।’
অঙ্গিরা হতবাক হয়ে গেল খগেশ্বরের বলা ভয়ঙ্কর কথা শুনে।
খগেশ্বর এরপর বলল, ‘আমি তোমার থেকে সোমেশ্বর মুদ্রা নিয়েছিলাম আমার এই হতভাগ্য পৌত্র কার্তিকেয়কে মুক্ত করার জন্যই। ভেবেছিলাম ওকে ছদ্মবেশ ধারণ করিয়ে, মুদ্রাটা ওর হাতে তুলে দেব। দ্বাররক্ষীদের ওই মুদ্রা দেখিয়ে রাতের অন্ধকারে যাতে ও মন্দিরের বাইরে যেতে পারে। কিন্তু তা আর সম্ভব হল না। স্বাভাবিক চলন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ও। মস্তিষ্ক বিকৃতিও ঘটেছে কদিনের মধ্যে। সোমেশ্বর মুদ্রা হাতে থাকলেও ও দ্বাররক্ষীদের ফাঁকি দিতে পারবে না।
যার স্যমন্তক মণির সন্ধান জানা আছে, জানা আছে হাজার বছর ধরে সঞ্চিত গোপন রত্নভাণ্ডারের কথা, তাকে কি কখনও মুক্তি দিতে পারেন প্রধান পুরোহিত? তোমাকে বিশ্বাস করে ওকে দেখাতে আনলাম। একটাই অনুরোধ, ওর কথা কাউকে জানাবে না। ও কোনও প্রেত বা অপদেবতা নয়, একজন হতভাগ্য মানুষ। দ্বাদশ বৎসর ধরে যে অন্ধকারের প্রহরী হিসাবে নিযুক্ত থেকে রক্ষা করেছে সোমেশ্বর মন্দিরের শ্রেষ্ঠ সম্পদ স্যমন্তক মণিকে। ওর শরীরের ঘা প্রবল ভাবে বিষিয়ে উঠেছে। আর হয়তো ক’টা দিন বাঁচবে ও। ওকে শান্তিতে মরতে দিও।’ শেষ কথাগুলো বলতে বলতে রুদ্ধ হয়ে এল বৃদ্ধ খগেশ্বরের কণ্ঠ। জল ঝরতে লাগল চোখ বেয়ে।
বাকরুদ্ধ অঙ্গিরা হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল অন্ধকারের প্রহরীর দিকে। সে ভাবতে লাগল তবে কি আর কদিন পর থেকে তার সঙ্গে আর কোনও দিন দেখা হবেনা চালুক্য কন্যা রাজশ্রীর? তার প্রেয়সী দেবদাসী সমর্পিতার? সে কি নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে তার চোখের সামনে!
এক সময় চোখের জল মুছে খগেশ্বর বলল, ‘চলো এবার বাইরে বেরোনো যাক।’
খগেশ্বরকে নিশ্চুপ ভাবে অনুসরণ করে কিছু সময়ের মধ্যে মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়াল অঙ্গিরা। সে একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘এমন ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে আপনারা ওকে ঠেলে দিয়েছিলেন কেন?’
বৃদ্ধ খগেশ্বর বললেন, ‘হয়তো এটাই ভবিতব্য ছিল। তবে আমরা কেউ-ই জানতাম না ওর এই পরিণতি হবে। এ ঘটনার মূলে এক ক্ষুদ্র কাহিনি আছে।’
‘কী কাহিনি?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।
বৃদ্ধ খগেশ্বর তাঁর শনের মতো চুলে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘দ্বাদশ বৎসর পূর্বের ঘটনা। আমরা ক্ষত্রিয় না হলেও ছেলেবেলা থেকেই অস্ত্রচালনাতে প্রবল আগ্রহ ছিল কার্তিকেয়র। নদী তীরের জঙ্গলে মাঝে মাঝে শিকারে যেত সে। চোখে বস্ত্রখণ্ড আবৃত করে শব্দভেদী বাণ চালনাও অনুশীলন করত সে। তেমনই একদিন জঙ্গলে চোখ বন্ধ করে শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপের অনুশীলন করছিল কার্তিকেয়। ঠিক সে সময় কোনও ওষধি গুল্মর সন্ধানে জঙ্গলে প্রবেশে করেছিলেন ত্রিপুরারিদেব। তার পদ শব্দ শুনে তাকে কোনও পশু ভেবে শর নিক্ষেপ করল চোখ বন্ধ কার্তিকেয়। সে তির গিয়ে বিদ্ধ হল ত্রিপুরারিদেবের পায়ে। তার বামপদের তিনটি আঙুল দেখবে নেই। তা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ওই তিরের আঘাতেই। একে ব্রাহ্মণের অঙ্গ ছিন্ন হওয়া, তাও আবার শূদ্রের তিরের আঘাতে। এর থেকে ভয়ঙ্কর ঘটনা আর কি হতে পারে!
পরবর্তীকালে পিতৃপুরুষদের মৃত্যুর পর তাদের অনন্ত নরককবাস তো বটেই, এ জন্মেও এ অপরাধের শাস্তি অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড ও তার পরিবারের জন্য কঠিন শাস্তি। এ অন্যায়ের প্রতিবিধানের জন্য সে সময়ের মন্দির অধ্যক্ষ ডেকে পাঠালেন পরিবারের কর্তা আমাকে। তিনি আমার সামনে এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখলেন। আমার পরিবার যদি গোপনে মন্দিরের হাতে দ্বাদশ বর্ষের জন্য কার্তিকেয়কে দান করে তবে সব অপরাধ ক্ষমা করবেন তারা। তবে এই দ্বাদশ বৎসর তার সঙ্গে কোনও ভাবেই সাক্ষাৎ করা যাবে না। এবং সে মন্দিরে কোথায় কোন স্থানে কোন কর্মে নিয়োজিত আছে, সে সম্পর্কে কোনও অনুসন্ধান করা যাবে না।
কার্তিকেয়কে মন্দিরের অধ্যক্ষর হাতে তুলে দিলে শুধু যে আমরা শাস্তিমুক্ত হব তাই নয়, কার্তিকেয়-সহ আমাদের কারোরই পর জন্মে শূদ্র জন্ম হবে না এই পুণ্য কাজের ফলে। নচেৎ এ জন্মে হয়তো বা মৃত্যুদণ্ড বা অনন্ত কারাবাসের মতো শাস্তি লাভ হতে চলেছে কার্তিকেয়র এবং মৃতুর পর আমাদের সবারই অনন্ত নরকবাস হবে!
কার্তিকেয় হয়তো সোমনাথ মন্দির ত্যাগ করে পালাতে পারত, কিন্তু তাকে ভাবিত করে তুলল তার পাপে তার পিতৃপুরুষদের নরকবাস থেকে মুক্ত হবার ব্যাপারটা। হয়তো বা তার সঙ্গে শূদ্র জন্ম থেকে মুক্ত হবার প্রলোভনও ছিল। এ শূদ্র জন্ম বড় ভয়ঙ্কর। উচ্চ বর্ণের লোকেরা ইচ্ছা হলেই শূদ্র নারীর লজ্জাবস্ত্র হরণ করতে পারে। শূদ্রদের সবসময় পদদলিত হতে হয়, অপমানিত হতে হয় অন্য বর্ণের লোকের দ্বারা। কাজেই কার্তিকেয় রাজি হয়ে গেল মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে নিজেকে সমর্পণ করতে। তখন সে বা আমি কেউই জানতাম না যে তার জন্য যে ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে, তা তার মৃত্যু বা অনন্ত নরকবাসের থেকেও অনেক ভয়ঙ্কর। তাই এক অন্ধকার রাতে সবার অগোচরে মন্দিরে প্রবেশ করে অধ্যক্ষ ও প্রধান পুরোহিতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিল আমার পৌত্র। তারপর সে হারিয়ে গেছিল পৃথিবীর আলো থেকে। তার সন্ধান আর কেউ পায়নি।’ কাহিনি শেষ করল হতভাগ্য কার্তিকেয়র পিতামহ হতভাগ্য শূদ্র বৃদ্ধ খগেশ্বর।
নরসুন্দর খগেশ্বরের মুখে অন্ধকারের প্রহরীর ও মন্দিরে সমর্পণের কাহিনি শুনে অঙ্গিরা অনেকটা স্বগতোক্তির স্বরেই বললে, ‘কিন্তু আমার পিতা-মাতা তাদের কোন মহাপাপ স্খলনের জন্য তাদের পুত্রকে সোমেশ্বর মন্দিরের পুরোহিতের কাছে আত্মনিবেদনের নির্দেশ দিয়ে গেলেন? তাঁরা কি জানতেন এ মন্দিরে কোন কাজে নিয়োজিত করা হবে আমাকে?’
অঙ্গিরার প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, ‘তোমাকে, প্রধান পুরোহিত যে কাজে নিয়োজিত করতে চলেছেন তা জানা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না বলেই আমার ধারণা। তবে তাঁরা কেন তোমাকে প্রধান পুরোহিতের কাছে আত্মনিবেদন করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন তা আমি সম্ভবত কিছুটা অনুমান করতে পারছি। তাদের সম্বন্ধে কিছু কথা আমি সংগ্রহ করেছি প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর থেকে।’
অঙ্গিরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘কী শুনেছেন আমাকে জানান? তারা তাদের কোন পাপ স্খলনের জন্য সোমনাথ মন্দিরে তাদের পুত্রকে সমর্পণের সিদ্ধান্ত নিলেন?’
গাঢ় কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। মাত্র হাতখানেক তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা খগেশ্বরের মুখমণ্ডল যেন অস্পষ্ট লাগছে অঙ্গিরার কাছে। বৃদ্ধ খগেশ্বর বলল, ‘সে সত্য কি তুমি সহ্য করতে পারবে?’
অঙ্গিরা বলল, ‘এ সত্য যত কঠিনই হোক না কেন তা আমার জানা উচিত। আপনি বলুন।’
বৃদ্ধ খগেশ্বর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বলল ‘তুমি একজন অজাচার সন্তান। তোমার পিতা-মাতারা ছিলেন সহোদর ভ্রাতা-ভগ্নি।’
কথাটা যেন বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো আঘাত করল অঙ্গিরাকে। সে অজাচার! সে প্রায় উন্মাদের মতো খগেশ্বরের গলা চেপে ধরে বলতে লাগল, ‘আমি অজাচার? মিথ্যা বলছ তুমি! কেন মিথ্যা কলঙ্ক লেপন করছ আমার মৃত পিতা-মাতার ওপর?’
খগেশ্বর অতিকষ্টে অঙ্গিরার বন্ধন মুক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি শান্ত হও। আমি কোনও কলঙ্ক লেপন করছি না তাঁদের ওপর। দোহাই, আমার পুরো বক্তব্য শুনুন। হয়তো বা তাহলে তাঁদের অসহায়তার কথা বুঝতে পারবে।’
নিজেকে অতি কষ্টে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করল অঙ্গিরা। যদিও তার পায়ের তলার মাটি টলতে শুরু করেছে। হতভম্বের মতো সে খগেশ্বরের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ খগেশ্বর শুরু করল তার কথা। অঙ্গিরার মনে হতে লাগল বহু যুগের ওপার থেকে যেন ভেসে আসছে খগেশ্বরের কণ্ঠস্বর।
‘সোমেশ্বর মন্দিরে পাঁচ বর্ণের দেবদাসী আছে। প্রথম, যারা স্বেচ্ছায় সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজের দেহমন নিবেদন করে, অর্থাৎ দত্তা। দ্বিতীয়, যারা তার পরিবারের মঙ্গললাভের জন্য, তাদের স্বর্গবাসকে নিশ্চিত করতে মন্দিরবাসী হয়, অর্থাৎ ভৃত্যা। তৃতীয় বর্ণ হল ভক্তা, অর্থাৎ যারা ভক্তির টানে মন্দিরের বাসিন্দা হয়েছে। চতুর্থ বর্ণের দেবদাসীরা হল হৃতা। অর্থাৎ যাদের হরণ করে মন্দিরে এনে দেবতাকে নিবেদন করা হয়েছে। আর পঞ্চমত হল বিক্রেতা। যে নিজেকে অর্থের বিনিময় মন্দিরের কাছে বিক্রয় করেছে। অথবা তাকে কেউ বিক্রয় করেছে।
আপনার মাতা ছিলেন বিক্রেতা শ্রেণির দেবদাসী। দাসের হাট থেকে একদল ছেলেমেয়েকে কিনে এনেছিলেন পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। আপনার পিতা-মাতা দুজনেই তখন শিশু। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত পুত্র সন্তানদের মন্দিরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোনও রাজ সৈন্য শিবিরে অস্ত্র শিক্ষা দিয়ে যুবক করে তোলার জন্য। তারা ভবিষ্যতে মন্দিরের দ্বাররক্ষী, প্রহরী এসব কাজে নিয়োজিত হয়। আর কন্যা সন্তানগুলিকে মন্দিরের ভিতর কোনও প্রাচীনা দেবদাসী বা মালিনীর তত্ত্বাবধানে বড় করা হয় দেবদাসী হবার জন্য। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বড় হয়ে উঠেছিলেন আপনাদের পিতা-মাতা।
আপনার পিতা যখন যুবা বয়সে মন্দিরে পদার্পণ করলেন তখন আপনার মাকে চিনবার তার কথা নয়। আর আপনার দেবদাসী মায়েরও নয়। শিশু বয়সে বিছিন্ন হবার ফলে তাঁরা কেউ অন্যের পরিচয় জানেন না। রাতে জেগে ওঠে এই মন্দির। হয়তো কোনও এক গোপন রাতে তাদের দুজনের দেখা হয়েছিল। নারী-পুরুষের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন তারা। ব্যাপারটা প্রধান পুরোহিত সহ মন্দিরের প্রধান ব্যক্তিদের দৃষ্টিগোচর হয় যখন তোমার মাতা সন্তান সম্ভাবনা হন।
যারা ব্যাপারটা জেনেছিলেন তাদের মধ্যে সে সময়ের সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠ অন্যতম। আর এরপরই নাকি মন্দির থেকে নিখোঁজ হয়ে যান তোমার পিতামাতা।’ এ পর্যন্ত একটানা কথাগুলো বলে থামল বৃদ্ধ। তারপর কিছুটা দম নিয়ে সে বলল, ‘এ পর্যন্ত যে ঘটনার কথা বললাম তা প্রাক্তন সেবায়েত প্রধান নীলকণ্ঠর থেকে শোনা। আর বাকি ঘটনা হল আমার অনুমান। সে অনুমান হল তোমার পিতা-মাতা যে সহোদর-সহোদরা এই ভয়ঙ্কর কথাটা ত্রিপুরারিদেব সেই হতভাগ্য নর-নারীকে জানিয়েছিলেন। এবং তাদের এ-ও বলেছিলেন যে তাদের সন্তানকে যদি তারা ভবিষ্যতে সোমনাথ মন্দিরে সমর্পণ করেন, তবেই তাঁরা এই ভয়ঙ্কর অনাচারের পাপ থেকে মুক্ত হবেন।
নরকবাসের আতঙ্ক কার না আছে? তার ওপর এই অত্যাচারের গ্লানি! যে জন্যই সম্ভবত তাঁরা সম্মত হয়েছিলেন প্রধান পুরোহিতের প্রস্তাবে। সোমনাথ নগরী ত্যাগ করে বল্লভীতে গিয়ে তোমার জন্ম দিয়েছিলেন। তোমাকে বড় করে তোলার পর আত্মহননের আগে তোমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছিলেন তাদের আত্মার মুক্তি ঘটাবার জন্য সোমনাথ মন্দিরে এসে ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ পালন করতে। তারা বল্লভী নগরীতে যাবার পূর্বে ত্রিপুরারিদেব তাদের হাতে সোমেশ্বর মুদ্রা তুলে দিয়েছিলেন এ কারণে যে, ভবিষ্যতে ওই মুদ্রা তোমার পরিচয় বহন করবে। তোমাকে সনাক্ত করতে সাহায্য করবে।’ কথা শেষ করল বৃদ্ধ খগেশ্বর।
অঙ্গিরার পা টলতে শুরু করেছে। মাথার ভিতরটা কেমন যেন করতে শুরু করেছে। তীব্র বমনের উদ্রেক হচ্ছে, শরীর কাঁপছে! সে একজন অজাচার! মানব সমাজের নিকৃষ্টতম প্রাণী! সে আর দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য এগোল না। কোনওক্রমে নিজের শরীরটাকে নিয়ে ফিরে চলল অতিথিশালার দিকে।
