সোমনাথ সুন্দরী – ২২
২২
ভোর হল অন্য এক স্থানেও। যে পথ বেয়ে সোমনাথ মন্দিরের সন্ধানে দ্রুত এগোচ্ছে সুলতান মামুদের কাফেলা। সঙ্গে তাদের পথ প্রদর্শক কাসেম নেই। তাই কিছুটা অনুমানের ভিত্তিতেই পথ চলছে সেই বিশাল বাহিনী। মাধেরা মন্দিরের কুণ্ড থেকে তারা পর্যাপ্ত জল খাইয়ে নিয়েছে উষ্ট্র বাহিনীকে। তাই প্রাণীগুলো দিন রাত ক্লান্তিহীন ভাবে ছুটে চলেছে। শুধু সওয়ারীদের বিশ্রামের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে থামানো হচ্ছে সেই জিহাদি বাহিনীকে। তবে কোথাও শিবির স্থাপন করা হচ্ছে না। কোনওক্রমে রন্ধন আহারকার্য সমাপ্ত করেই এগোচ্ছে তারা।
সুলতানের অনুমান হয়তো বা মাঝরাতে কাফেরদের পরাজয়ের সংবাদ তাদের আগেই পৌঁছে যাবে ওই সোমনাথ মন্দিরে। সে সংবাদ পেয়ে কাফেরগুলো যাতে মন্দিরের ধনসম্পদ নিয়ে পালাতে না পারে তাই যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পৌঁছোনো দরকার। তাই ছোটার বিরাম নেই। এদিন সূর্যোদয়ের পর মামুদ হিসাব করে দেখলেন গজনী থেকে যাত্রা শুরু করার পর এটা আটত্রিশতম দিন!
আলো ফোটার বেশ কিছু সময় পর চলয়মান বাহিনী তাদের যাত্রা পথের পাশে একটা বনভূমি দেখতে পেল। সারারাত ধরে উটের পিঠে চলেছে জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকরা। মামুদ নির্দেশ দিলেন সেই বনভূমির পাশে কিছু সময় যাত্রা স্থগিত করার জন্য। সেই মতো থামল বাহিনী। নিজের উটের পিঠ থেকে অবতরণ করলেন সুলতান। তাঁর বিশ্রামের জন্য একটা শামিয়ানা টাঙিয়ে গালিচা বিছিয়ে দিল তার অনুচররা। সুলতান সেখানে উপবেশন করলেন। বাহিনীর লোকজন খাদ্য প্রস্তুত ইত্যাদি নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
হঠাৎ কাফেলার অগ্রবর্তী বাহিনীর লোকরা দেখতে পেল কিছুটা দূরে অরণ্যের একপাশ থেকে আত্মপ্রকাশ করে অন্যদিকে পালাবার চেষ্টা করছে এক অশ্বারোহী! এমন দৃশ্য মাঝে মাঝেই তাদের চোখে পড়ে। তাদের দেখে আতঙ্কে ছুটে পালাচ্ছে কেউ। এ দৃশ্য তাদের মধ্যে বেশ কৌতুক প্রদান করে। কিন্তু হঠাৎ তারা খেয়াল করল অশ্বারোহীর সঙ্গে ঘোটকপৃষ্ঠে একজন নারীও আছে। আর এ ব্যাপারটাই বিশেষ ভাবে প্রলুব্ধ করল স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর যুবকদের। তাদের কয়েকজন ঘোড়া ছুটিয়ে দিল পলায়মান ঘোড়সওয়ারকে লক্ষ করে। দ্রুতগামী তুর্কী ঘোড়াগুলো ধরে ফেলল তাদেরকে।
চাঁদোয়ার নীচে বসে গজনীর সুলতান তখন শুকনো খেজুর আর দ্রাক্ষা ফল দিয়ে আহার সাঙ্গ করছিলেন। এমন সময় এক প্রবীণ যোদ্ধা ও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক তার সামনে হাজির করল দুজনকে। তাদের দুজনের একজন মুণ্ডিত মস্তক পুরুষ, অন্যজন এক অপরূপ সুন্দরী নারী। দুজনেই আতঙ্কে কাঁপছে।’
মামুদ তাদের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জানতে চাইল, ‘এরা কারা?’
যোদ্ধা জবাব দিল, ‘এরা জঙ্গলে আত্মগোপন করেছিল। এগুলো এই কাফেরদের কাছে পাওয়া গেছে।’—এই বলে লোকটা একটা থলে উপুড় করে দিল সুলতানের পায়ের কাছে। সূর্যের আলোতে ঝলমল করে উঠল বেশ কয়েকটা হীরকখণ্ড। তা দেখে মৃদু বিস্মিত হলেন সুলতান। তবে সেই হীরখণ্ডের সঙ্গে তার পদতলে পড়ে থাকা অন্য একটা জিনিস দৃষ্টি আকর্ষণ করল সুলতানের। জিনিসটা ঘুরিয়ে দেখলেন তিনি। বেশ বড় একটা স্বর্ণমুদ্রা। তার একপাশে খোদিত একটা মন্দিরের ছবি, আর অন্য পাশে খোদিত আছে স্বাক্ষর।
সুলতান শুভ্রবসন মুণ্ডিত মস্তক কাফেরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘এ কার মুদ্রা?’
নিশ্চুপ রইল লোকটা।
সুলতান জবাব না পেয়ে ক্ষুব্ধ ভাবে বললেন, ‘জবাব দে কাফের?’ এই বলে তিনি হাত রাখলেন তার পাশে শোয়ানো তলোয়ারের ওপর। আর তা দেখেই সেই কাফেরের সঙ্গিনী আতঙ্কে বলে উঠল, ‘সোমনাথ মন্দিরের।’
‘সোমনাথ মন্দির!’ কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে বসলেন সুলতান। মুদ্রায় খোদিত মন্দিরের ছবিটা আর একবার দেখে নিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘এ মুদ্রা তোরা কোথায় পেলি? কোথা থেকে আসছিস তোরা?’
কাফেরটা এবার নতজানু হয়ে বসে হাতজোড় করে বলল, ‘এই হীরকখণ্ড, মুদ্রা সবই আপনি নিয়ে নিন সেনাপতি। আমরা সোমনাথ মন্দিরের বাসিন্দা। মন্দির থেকে পালাচ্ছিলাম। আমাদের যেতে দিন।’
এই যবন নারী-পুরুষ সোমনাথ মন্দিরের বাসিন্দা! মৃদু বিস্মিত ভাবে সুলতান জানতে চাইলেন, ‘চুরি করে পালাচ্ছিলি? পালাচ্ছিলি কেন?’
কাফের জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, সুলতান মামুদের আতঙ্কে।’
গজনীবিদ এবার অট্টহাস্য করে বলে উঠল, ‘আমি কে জানিস? আমি গজনীর মালিক সুলতান মামুদ।’
কথাটা শুনেই যেন প্রবল বিস্ময় আর আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধান বিষধারী। দেবদাসী-প্রধান তিলোত্তমাও কাঁপতে কাঁপতে নতজানু হয়ে বসে পড়ল তার পাশে।
আবার গম্ভীর হয়ে গেলেন গজনীবিদ। তারপর হীরকখণ্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এমন হিরে, সোনা সেখানে প্রচুর আছে তাই না?’
বিষধারী বলল, ‘হ্যাঁ, প্রচুর। এ শুধু কণামাত্র। আমাদের আপনি মুক্তি দিন।’
মামুদ জানতে চাইলেন ‘সেখানে কত সৈন্য আছে?’
বিষধারী জবাব দিল, ‘সৈন্য নেই। মন্দির রক্ষী আর দ্বার রক্ষীর মিলিত সংখ্যা একশত মতো। আর এক সহস্র মতো নারী-পুরুষ মন্দিরবাসী আছে। দোহাই আমাদের মুক্তি দিন।’
সুলতান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘তোকে আমি এক শর্তে মুক্তি দেব। তুই আমাকে পথ দেখিয়ে সোমনাথ মন্দিরে নিয়ে যাবি?’
সুলতানের কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেল বিষধারী। মন্দিরের রত্ন আর দেবদাসীকে হরণ করে সে পালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই ভয়ঙ্কর যবন সুলতানকে পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গেলে কি পরিণাম হবে তা তাঁর অনুমান করতে বাকি নেই। হাজার হোক মন্দিরের প্রধান সেবায়েত রূপে এতদিন সে কাজ করেছে। সোমনাথের সেবা করেছে।
তাকে স্তব্ধ থাকতে দেখে সুলতান ত্রু্ুদ্ধ ভাবে বলে উঠলেন, ‘জবাব দে। সময় নষ্ট করিস না। নইলে এখনই তোকে বধ করব। আর তোর সুন্দরী জেনেনাটাকে তুলে দেব যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের হাতে। এমন সুন্দরী জেনেনা ওরা অনেকদিন পায়নি।’
দেবদাসী তিলোত্তমা দেখতে পেল আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যবন যুবকরা তাদের হলদেটে দাঁত বার করে নিঃশব্দে হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। শ্বাপদের হাসি! সুলতান নির্দেশ দিলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর! এ দৃশ্য আর সহ্য করতে না পেরে মূর্ছিত হয়ে ঢলে পড়ল দেবদাসী তিলোত্তমা। আর প্রেয়সীর সেই দৃশ্য দেখে তার ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা ভেবে প্রবল আতঙ্কিত সেবায়েত প্রধান সুলতানের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, ‘আমি আপনাকে সোমনাথ মন্দিরে নিয়ে যাব। দয়া করে এই নারীকে হত্যা করবেন না।’
বিষধারীর কথা শুনে হাসি ফুটে উঠল সুলতানের ঠোঁটের কোণে। তিনি বললেন, ‘এই জেনেনাকে হাত-পা বেঁধে উটের গলা থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। খাদ্য-পানীয় পাবে না। ওর জীবন-মৃত্যু নির্ভর করছে কত দ্রুত তুই আমাকে সে মন্দিরে পৌঁছে দিতে পারিস তার ওপর।’
কথাটা শুনে তাঁর এ সিদ্ধান্ত রদ করার জন্য তাঁর পা জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল বিষধারী। কিন্তু একজন তার শিখাগুচ্ছ ধরে টান দিয়ে সুলতানের পাদস্পর্শ করতে দিল না।
হুকুম দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন সুলতান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর নির্দেশ পালিত হল। মূর্ছিত হতভাগ্য দেবদাসী তিলোত্তমাকে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হল একটা উটের গলাতে। বিষধারীকেও তুলে দেওয়া হল সওয়ারী সমেত আর এক উটের পিঠে। যাত্রা করার মুহূর্তে সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধান মনে মনে বলল, ‘হে সোমেশ্বর মহাদেব। আমার এ মহাপাপ ক্ষমা করো তুমি। আমি নিরুপায়।’
বিষধারীর দেখানো পথ বেয়ে সোমনাথ নগরীর দিকে ছুটে চলল সুলতান মামুদের যবন বাহিনী।
ছুটছিল আরও একজন তার ঘোড়ার পিঠে। সে কাসেম। তিরটা কোনওক্রমে পিঠ থেকে খসিয়ে ফেলেছে সে। পথে একটা জনশূন্য গ্রাম পড়েছিল দুদিন আগে। সুলতান হানার ভয়ে সে গ্রামের বাসিন্দারা পালিয়েছে অন্যত্র। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে তাদের ফেলে রাখা ঘোড়া পেয়েছিল কাসেম। ঘোড়া বদল করে আবারও ছুটেছে সে। কিন্তু ক্রমে ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে আসছে তার শরীর। ঘোড়াটাও যেন অবসন্ন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া আরও এক সন্দেহ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে তার মনে। অন্ধকারের মধ্যে তিনদিন ঘোড়া ছোটাবার সময় রাত্রির অন্ধকারে দিক ভুল করেছে সে। নইলে গত কালই ভোরে তো তার সোমনাথ নগরীতে পৌঁছে যাবার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল সারাটা দিন, তারপর রাত পেরিয়ে আজ এত বেলা হয়ে গেল তবু সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণচূড়া চোখে পড়ল না।
বহু যোজন দূর থেকে আকাশের গায়ে দিনের আলোতেও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো তাকে চোখে পড়ে। আর এ ব্যাপারটাই আরও অবসন্ন করে তুলেছে কাসেমকে। সে মনে মনে বলছে, ‘হে দেবতা পথের দিশা দেখাও, কিন্তু সে দিশা মিলছে না। কোনওক্রমে এগোতে থাকল কাসেম। দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হল। তারপর ঘোড়াটাও ধুঁকতে শুরু করল।
বিকাল নাগাদ হঠাৎই পথের পাশে অন্য একটি মন্দিরের ধ্বজা দেখতে পেয়ে সেদিকে ঘোড়া নিয়ে এগোল সে। সেই মন্দিরের সামনে পৌঁছেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ঘোড়া। কাসেমও ছিটকে পড়ল মাটিতে। কোনওক্রমে উঠে বসে মন্দিরটার দিকে তাকাল সে। জনশূন্য মন্দির। সুলতানের ভয়ে মন্দিরবাসীরাও পালিয়েছে সম্ভবত। কিন্তু মন্দিরটা দেখে চিনতে পারল কাসেম। এ মন্দিরে ইতিপূর্বে সে একবার এসেছিল মুক্তমালা বিক্রির জন্য। বিষ্ণুদেবতার মন্দির। আর তার সঙ্গে সঙ্গে কাসেম এটাও বুঝতে পারল সে পথ ভুল করেছে। প্রথম দু-দিন ঠিক পথেই এগিয়ে ছিল সে। তারপর পথ ভুল করে পশ্চিমের বদলে পূর্ব দিকে চলে এসেছে। ঘোড়ার পিঠে আবার সোমনাথ নগরীতে পৌঁছতে অন্তত তিনদিন লাগবে আর পদব্রজে সাত দিন। কিন্তু কাসেমের ঘোড়াটা মৃত। তবে কি শেষ রক্ষা হল না?
কাসেম বলে উঠল, ‘হে দেবতা, তুমি কি আমার পাপ ক্ষমা করবে না!’ তার পরই হঠাৎ একদল সশস্ত্র অশ্বারোহী মন্দিরের ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল ভূপতিত কাসেমকে। কাসেমের পরনে যবনদের পোশাক দেখে তারা সুলতান বাহিনীর গুপ্তচর ভেবে তার দিকে বর্শা উদ্যত করল সৈনিকরা। তারা ভোজরাজের সৈনিক। মহারাজ ভোজ কিছু অশ্বারোহী সৈনিককে আগে পাঠিয়েছেন তার বিশাল হস্তিবাহিনীর পথ নির্ণয়ের জন্য। তিনদিনের দূরত্বে তিনি তার বিশাল হস্তিবাহিনী সমৃদ্ধ সেনাদল নিয়ে আসছেন সুলতান বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। হস্তিবাহিনীকে কর্দমাক্ত জমি, ফসলের খেত এসব এড়িয়ে চলতে হয়। সে জন্য উপযুক্ত পথের খোঁজে অগ্রবর্তী অশ্বারোহী দলের প্রয়োজন হয়। সৈনিকরা তার দিকে বর্শা নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয়েছে দেখে কাসেম কাতর কণ্ঠে বলল, ‘তোমারা আমাকে বধ করার আগে আমার কথা শোনো। তোমরা কারা?’
একজন সৈনিক বলল, ‘তুই কে? আমরা ভোজরাজ পরমদেওর সৈনিক।’
কাসেম বলল, ‘আমি কাসেম। পূর্বনাম ছিল কৃষ্ণ। সুলতান মামুদ আমাকে ক্রীতদাস করে গজনীতে নিয়ে গেছিলেন। তার সঙ্গেই আমি আবার এদেশে এসেছি। কিন্তু আমি তার শিবির থেকে পালিয়েছি। মাধেরা সূর্য মন্দির ধ্বংস করেছেন সুলতান। এবার তিনি সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করতে আসছেন। সে খবর আমি তাদের দিতে যাচ্ছিলাম।’
একজন কথাগুলো শুনে প্রশ্ন করল, ‘তুমি যে সত্যি বলছ তার প্রমাণ কি?’
কাসেম বলল, ‘দেখো আমার পিঠে তিরের ক্ষতচিহ্ন। সোমেশ্বর মহাদেব জানেন আমি মিথ্যা বলছি না।’ এরপর আর কোনও কথা বলতে পারল না সে। প্রবল ক্লান্তিতে মূর্ছিত হয়ে পড়ল কাসেম। সৈনিকরা নেমে পরীক্ষা করল তার ক্ষতচিহ্নটা। লোকটা মিথ্যা বলছে না। তারা শুশ্রুষা শুরু করল কাসেমের। কিছুক্ষণের মধ্যে চোখ মেলল কাসেম। কিছুটা সুস্থ হবার পর সে বলল, ‘আমাকে তোমরা সোমনাথ মন্দিরে নিয়ে চলো।’
অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান বলল, ‘মহারাজ এখানে না উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত আমরা সেদিকে এগোবনা। আমি তোমাকে মহারাজের কাছে পাঠাচ্ছি।’
কাসেম বলল, ‘তবে তাই করো।’ সময় নষ্ট কোরো না। তাকে অনেক সংবাদ জানাবার আছে সুলতান বাহিনীর সম্বন্ধে।
অশ্বারোহী প্রধানের নির্দেশে কয়েকজন ঘোড়সওয়ার কাসেমকে একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে রওনা হয়ে গেল হিন্দু সম্রাট রাজাভোজ পরমদেও যে পথে আসছেন সেদিকে। সূর্য ডুবে গেল।
সূর্য ডুবল সোমনাথ নগরীর বুকেও। অন্ধকার নামল সোমনাথ মন্দিরে। সারাদিন নিজের কক্ষেই কাটিয়েছে অঙ্গিরা। সোমেশ্বর মুদ্রাটা তার কাছে না থাকায় মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে সমুদ্রতটে গিয়ে খগেশ্বরের সঙ্গে তার সাক্ষাতের উপায় ছিল না। কিন্তু অঙ্গিরা যে সেই মুদ্রা দেবদাসী সমর্পিতাকে দিয়ে এসেছে এবং সমগ্র পরিকল্পনা তাকে জানিয়েছে, সে ব্যাপারটা সম্বন্ধে ক্ষৌরকার শিরোমণিকে অবগত করা প্রয়োজন।
অঙ্গিরা ভেবে রেখেছিল অন্ধকার নামার পরই এদিন সে বেরিয়ে পড়বে। প্রথমে সে যাবে সেই চন্দ্রমন্দিরে। সেখানে খগেশ্বরের সঙ্গে কথা বলে, সেই মৃত্যুপথযাত্রীর বর্তমান অবস্থা জানার পর রাত একটু গভীর হলে রওনা হবে দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। অঙ্গিরা তার সেই পরিকল্পনা মতো মন্দিরের শেষ আরতি ঘণ্টার শব্দ বেজে ওঠার কিছু সময়ের মধ্যেই অতিথিশালা ত্যাগ করল।
সন্ধ্যারতি শেষ করে দেবদাসীরা ফিরে যাবার পরই অঙ্গিরা দেখতে পেল মন্দিরের প্রবেশচত্বর শূন্য হয়ে গেছে। অন্ধকারের সঙ্গে-সঙ্গে গাঢ় কুয়াশাও নামতে শুরু করেছে। তার মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে অঙ্গিরা এগিয়ে চলল।
সেই প্রাচীন চন্দ্রমন্দিরের সামনে পৌঁছেই অঙ্গিরা দেখতে পেল মন্দিরের প্রবেশ পথে বৃদ্ধ খগেশ্বর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ধরা আছে একটা থলে। তার মুখমণ্ডলের বিষণ্ণতা যেন একটু গাঢ়।
অঙ্গিরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, ‘তিনি কেমন আছেন?’
বৃদ্ধ তার কথার জবাবে ইশারাতে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে বলল তাকে। এদিন আর খগেশ্বর প্রদীপ জ্বালাল না। অন্ধকারে তার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে দেবদাসী সমর্পিতার সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা বলল অঙ্গিরা। ক্ষৌরকার শিরোমণি চুপচাপ শুনে গেল তার কথা। নির্দিষ্ট সেই কক্ষের সামনে উপস্থিত হতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে এসে লাগল অঙ্গিরার।
বৃদ্ধ তাকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল। প্রদীপ জ্বলছে কক্ষে। সেই আলোতে অঙ্গিরা দেখতে পেল মাটিতে শুয়ে আছে অন্ধকারের প্রহরীর নিথর দেহ। তার মুখের মধ্যে পোড়া আছে একটা জ্বলন্ত কাঠকয়লা। মাংস পোড়ার গন্ধ ছড়াচ্ছে তার থেকে! এক বীভৎস করুণ দৃশ্য! বৃদ্ধ খগেশ্বর অঙ্গিরার উদ্দেশ্যে প্রথমে বলল ‘কিছু সময় আগেই সব শেষ হয়ে গেছে! একজন শূদ্র যে তার অন্তেষ্টির জন্য জ্বলন্ত কাঠ কয়লার টুকরোটা পেল এটাই তার পক্ষে যথেষ্ট।’
এ কথা বলার পর বৃদ্ধ প্রচণ্ড ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘এসব কিছুর জন্য দায়ী ত্রিপুরারিদেব। আমি তাঁকে এমন আঘাত দেব যা সুলতান মামুদও দিতে পারবে না। তার পাপেই নিঃস্ব হতে চলেছে এ মন্দির।’
অঙ্গিরা নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে রইল তার কথা শুনে। অঙ্গিরারও মনে হল এসব কিছুর মূলেই রয়েছেন ত্রিপুরারিদেব। তাঁর নির্দেশেই তো পরিচালিত হয় সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির।
বৃদ্ধ হয়তো এরপর বুঝতে পারল জ্বলন্ত কাঠ কয়লা মুখে পোরা মৃতদেহটা অঙ্গিরার কাছে অসহ্য মনে হচ্ছে। তাই সে তাকে বলল, ‘সত্যিই আমি মুক্ত করব সেই দেবদাসীকে। তুমি চিন্তা কোরো না। আমার এই পুঁটুলিতে পুরুষের পোশাক আছে। তোমার সামনে যে দেহটা পুড়ছে তাকে বাইরে বের করে নিয়ে যাবার জন্যই ক’দিন আগে এ পোশাক এনেছিলাম। সে কাজ তো আর হল না। আমার আর কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে এখানে। যতক্ষণ না ওই অঙ্গারের আগুন নিভে যায়। তারপর পাথর খণ্ড সাজিয়ে কক্ষের প্রবেশ মুখটাও বন্ধ করতে হবে যাতে কোনও প্রাণী মৃতদেহর সন্ধান না পায় সেজন্য। ততক্ষণ তুমি বাইরে প্রতীক্ষা করো।’
অঙ্গিরা বাইরে এসে প্রতীক্ষা করতে লাগল। বেশ অনেকটা সময় পর কক্ষত্যাগ করল খগেশ্বর। বৃদ্ধের ক্লেশ লাঘবের জন্য অঙ্গিরা নিজেই আশেপাশে পড়ে থাকা পাথরখণ্ড তুলে এনে কক্ষের প্রবেশ মুখ বন্ধ করতে লাগল। একসময় সাঙ্গ হল তার কাজ। কক্ষর দিকে শেষ একবার দৃষ্টিপাত করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতভাগ্য বৃদ্ধ বলল ‘এ মন্দির আর ওকে মুক্তি দিল না। সোমেশ্বর মহাদেব যেন তোমাদের অন্তত মুক্তি দেন।’
মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এল তারা দুজন। নিশ্চুপ ভাবে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় দুজনে পৌঁছে গেল দেবদাসীদের আবাসস্থলের কাছে। খগেশ্বর অঙ্গিরাকে বলল, ‘এক সঙ্গে দুজনের ভিতরে প্রবেশ করা উচিত হবে না। তুমি বরং বাইরে দাঁড়িয়ে চারদিকে দৃষ্টি রাখো। কেউ উপস্থিত হলেই চত্বরের ভিতর একটা প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করে আমাকে সংকেত করবে।
অঙ্গিরা বলল, ‘বেশ তাই হোক।’
বৃদ্ধ খগেশ্বর প্রবেশ করল দেবদাসীদের আবাসস্থলে। বাইরে অন্ধকারের মধ্যে প্রতীক্ষা করতে লাগল অঙ্গিরা। প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ হতে লাগল তার। শেষ পর্যন্ত দ্বার রক্ষীদের কাছে দেবদাসী সমর্পিতা ধরা পড়ে যাবে না তো। রাত বেড়ে চলল। আর তার সঙ্গে উত্তেজনাও বেড়ে চলল অঙ্গিরার মনে।
মধ্যরাত্রিরও পরে দেবদাসী সমর্পিতাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল খগেশ্বর। চর্ম পাদুকা আর পুরুষের সাজে সজ্জিতা সমর্পিতার মুখমণ্ডলও কৃষ্ণবর্ণের বস্ত্রখণ্ডে আচ্ছাদিত। সেখানে দাঁড়িয়ে কোনও কথোপকথন সমীচিন হবে না বলে খগেশ্বর ইশারাতে অনুসরণ করতে বলল তাকে।
দেবদাসী সমর্পিতাকে নিয়ে এগিয়ে খগেশ্বর থামল সেই প্রাচীন চন্দ্রদেবতার মন্দিরের সামনে। অঙ্গিরা তাদের সঙ্গে মিলিত হল। অবগুণ্ঠন সরাল দেবদাসী সমর্পিতা। অঙ্গিরা দেখল শুধু পুরুষের পোশাকই নয়, পাটের সুতো আর প্রদীপের কাজল দিয়ে দেবদাসীর শশ্রু-গুম্ফও রচনা করে দিয়েছে খগেশ্বর!
নরসুন্দর শিরোমণি খগেশ্বর বলল, ‘এ মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে প্রথমে কোথায় আত্মগোপন করতে হবে তা আমি রাজকুমারীকে বলে দিয়েছি। সোনার শিকল বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরে যারা বাইরে থেকে কার্য সম্পাদনের জন্য প্রতিদিন প্রবেশ করে, তাদের জন্য তোরণ উন্মুক্ত করা হয়। তখন আমি বাইরে বেরোব। তাতে রক্ষীদের সন্দেহ কম হবে। বাইরে বেরিয়ে আমি রাজকুমারীর সঙ্গে মিলিত হয়ে মন্ত্রী চন্দ্রদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সোমনাথ নগরী ত্যাগ করে দূরবর্তী স্থানে তাদের ছেড়ে আসব। আমি মন্দিরে ফিরব একদিন বাদে। সোমেশ্বর মুদ্রা নিয়ে তারপর তুমি মন্দির ত্যাগ করবে।’
একথা বলার পর ক্ষৌরকার প্রধান বলল, ‘আমার সামান্য একটা কাজ বাকি আছে। আপনাদের দুজনের কোনও কথা যদি থাকে তবে তা সেরে নিন। আমি আমার কাজ সেরে এখনই আসছি।’ এ কথা বলে সে অন্তর্হিত হল ভগ্ন মন্দিরের অন্ধকারে।
কিছুক্ষণ তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকার পর অঙ্গিরা বলল, ‘আর কিছু সময়ের মধ্যেই হয়তো তোমার দেবদাসী সমর্পিতার পরিচয় মুছে যেতে চলেছে। তুমি তখন চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী। ভবিষ্যতের চালুক্য সাম্রাজ্ঞী রাজশ্রী।’
অঙ্গিরার কথা শুনে সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘আমি দেবদাসী হই বা সাম্রাজ্ঞী, আমি তোমার ভালোবাসা। সত্যি কথা বলতে কি, এই বিদায় বেলাতে আমার যেন মনে হচ্ছে যে, মন্দির থেকে আমি মুক্তি লাভ করতে চেয়েছি প্রতি মুহূর্তে, তাকেও যেন আমি নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছি। এ মন্দিরের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে ঘুঙুর ছড়াগুলোকে আমি পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে নিয়েছি। আমি অপেক্ষা করে থাকব তোমার জন্য। খগেশ্বর ফিরে এসে তোমার হাতে সোমনাথ মুদ্রাটা দিলেই তুমি মন্দির ত্যাগ করে আমার সঙ্গে মিলিত হবে।’
অঙ্গিরা বলল, ‘ধরো আমি মন্দির ত্যাগ করতে পারলাম না। তোমার সঙ্গে এটাই যদি আমার শেষ দেখা হয়?’
কথাটা শুনেই দেবদাসী সমর্পিতা অঙ্গিরার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, ‘এমন অশুভ কথা বোলো না তুমি। তুমি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তোমার প্রতীক্ষায় থাকব আমি। তোমাকে না নিয়ে আমি চালুক্য নগরীতে ফিরব না।’
কথাগুলো বলে সজল চোখে সে তাকিয়ে রইল অঙ্গিরার দিকে। সে মুখের দিকে তাকিয়ে অঙ্গিরার মনে হল এ মুখ কোনও দেবদাসীর নয়, এ মুখ কোনও রাজকন্যার নয়, এ মুখ সেই আদি অকৃত্রিম নারীর মুখ! যে মুখ সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকে পরিচয়হীন ভাবে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবেসে এসেছে তার পুরুষকে। সে মুখের দিকে চেয়ে রইল অঙ্গিরা।
সামান্য কিছু সময়ের মধ্যেই মন্দির থেকে বেরিয়ে এল খগেশ্বর। সে বলল, ‘এবার রাজকুমারীকে তোরণের দিকে যেতে হবে।’ অঙ্গিরা আর দেবদাসী সমর্পিতা শেষবারের মতো ওষ্ঠ চুম্বন করল গভীর ভালোবাসার আবেশে। যার সাক্ষী হয়ে রইল প্রাচীন বৃদ্ধ খগেশ্বর আর সোমনাথ মন্দির।
বস্তুার ভিতর থেকে সোমেশ্বর মুদ্রাটা বার করে প্রবেশ তোরণের দিকে রওনা হল দেবদাসী সমর্পিতা। অন্ধকারে কিছুটা তফাতে তাকে অনুসরণ করল অঙ্গিরা আর বৃদ্ধ খগেশ্বর।
দেবদাসী সমর্পিতা তোরণের কাছে পৌঁছে যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা দুজন। কয়েকটা মশাল জ্বলছে তোরণে। অঙ্গিরারা দূর থেকে দেখতে পেল পুরুষবেশি দেবদাসী সমর্পিতাকে রক্ষীরা ঘিরে দাঁড়িয়েছে তার পরিচয় অনুসন্ধানের জন্য। তা দেখে অঙ্গিরা মনে মনে বলল, ‘হে সোমেশ্বর মহাদেব তুমি রক্ষা করো আমার ভালোবাসাকে।’
সোমেশ্বর মহাদেব হয়তো শুনলেন অঙ্গিরার প্রার্থনা। তোরণ উন্মোচনের অস্পষ্ট শব্দ শোনা গেল। অঙ্গিরা দেখতে পেল তোরণের ফাঁক গলে ত্রিপুরারিদেবকে ফাঁকি দিয়ে সোমনাথ মন্দির ত্যাগ করে অদৃশ্য হয়ে গেল দেবদাসী সমর্পিতা।
বৃদ্ধ খগেশ্বর এরপর অঙ্গিরাকে বলল, ‘তোমার দুশ্চিন্তার আর কোনও কারণ নেই। নগরীর বাইরে নিরাপদ স্থানে রাজকন্যা রাজশ্রী আর চালুক্য মহামন্ত্রীকে রেখে একদিন বাদেই মন্দিরে ফিরে আসব। তুমি এবার অতিথিশালাতে ফিরে যাও।’
অঙ্গিরা বৃদ্ধর হাত দুটো ধরে বলল, ‘আপনার কথা, আজকের এই রাত্রির কথা আমি কোনওদিন ভুলব না।’
অঙ্গিরা রওনা হল অতিথিশালার দিকে। আর বৃদ্ধ খগেশ্বর রয়ে গেলেন কাছেই এক স্থানে। স্বর্ণশৃঙ্খল বেজে উঠলেই তাকে বেরিয়ে পড়তে হবে এ মন্দির ত্যাগ করে।
নিজের কক্ষে ফিরে গেলেও ঘুম এল না অঙ্গিরার। বাইরে রাত শেষ হয়ে শুকতারা ফুটল এক সময়। অঙ্গিরা শুনতে পেল মন্দিরবাসীর নিদ্রাভঙ্গ করার জন্য ঝমঝম শব্দে স্বর্ণ শৃঙ্খল বাজাচ্ছেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। খগেশ্বর নিশ্চয়ই মন্দির ত্যাগ করে রওনা হবে এখন।
