সোমনাথ সুন্দরী – ২৫
২৫
সূর্যোদয় হল সোমনাথ নগরীতে। উষ্ট্রপৃষ্ঠে বসে থাকা গজনীর সুলতান মামুদ নগরীতে প্রবেশ করার আগেই দূর থেকে দেখতে পেলেন সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণধ্বজ। সুলতান হিসাব করে দেখলেন গজনী মুলুক থেকে সোমনাথ নগরীতে পৌঁছতে তাঁর বিয়াল্লিশ দিন সময় লেগেছে। নগরীতে প্রবেশ করার আগে তার বাহিনীকে কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে তার পার্শ্বচরদের ডেকে নিলেন তিনি। জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের পাঁচটি ভাগ পাঁচ জন অভিজ্ঞ সেনাপতিদের অধীনে রাখার ব্যবস্থা করলেন। তাদের একটি দল নগরীকে বাইরে থেকে বেষ্টন করে থাকবে যাতে কেউ নগরী ত্যাগ করে বাইরে পলায়ন করতে না পারে। অথবা বাইরে থেকে কোনও সেনাদল যদি সোমনাথ নগরীকে রক্ষা করতে আসে তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য। বাকি চারটি দলকে নিয়ে মামুদ নগরীতে প্রবেশ করবেন। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবেন সোমনাথ মন্দির।
তিনি তাঁর সেনাপতিদের নির্দেশ দিলেন, ‘সোজা এগোতে হবে ওই অপবিত্র ধর্মস্থানের দিকে। ধ্বংস করতে হবে, লুণ্ঠন করতে হবে সব কিছু। আর একজন কাফেরও যদি ওই স্থানে জীবিত থাকে তবে এ জিহাদ সম্পন্ন হবে না এ কথাটা তোমরা মনে রেখো। শিশু হোক, বৃদ্ধ হোক বা যুবক তোমাদের প্রত্যেকের তরবারি যেন এক-একজন কাফেরকে নিক্ষেপ করে নরকের আগুনে।’
গজনীবিদের নির্দেশ দান শেষ হতেই পথপ্রদর্শক বিষধারীর উটটা এগিয়ে এল সুলতানের কাছে। সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধান বিষধারী সুলতানের উদ্দেশ্যে বলল, ‘ওটাই সোমনাথ মন্দির। ওই তার চূড়া দেখা যাচ্ছে। এবার আপনি আমাদের মুক্তির নির্দেশ দিন সুলতান।’
তার কথা শুনে সুলতান বললেন, ‘হ্যাঁ, মন্দির দেখা গেলে তো মুক্তি দিতেই হয়। কিন্তু কোথায় তোদের পুতুলের সেই মন্দির? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।’
সুলতানের কথা শুনে তাকে মন্দির শীর্ষ দর্শন করাবার জন্য আকাশের দিকে গলা তুলে তাকিয়ে বলল, ‘ওই যে, ওই। ওই দেখুন আকাশের বুকে সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণধ্বজ দেখা যাচ্ছে!’
সুলতান তার কথার জবাব না দিয়ে ইশারাতে তাঁর নির্দেশ জানালেন বিষধারীর পিছনে বসে থাকা উট চালককে। লোকটা মূহূর্তের মধ্যে মালিকের নির্দেশ পালন করে কোমর থেকে ধারালো ছুরিকা বার করে পিছন থেকে এক হাতে আলিঙ্গন করে অন্য হাতে সেই ছুরি চালিয়ে দিল বিষধারীর গলায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সোমনাথ মন্দিরের সেবায়েত প্রধানের ধড়-মুণ্ড আলাদা হয়ে গেল। তারপর সেই ধড় আর মুণ্ড উটের পিঠ থেকে খসে পড়ল সুলতানের যাত্রা পথের সামনে। বিষধারীর ধড়হীন মুণ্ড তখনও যেন তাকিয়ে আছে আকাশের বুকে জেগে থাকা সোমনাথ মন্দিরের স্বর্ণ শিখরের দিকে!
পথপ্রদর্শক বিষধারীকে এমন নির্মমভাবে হত্যার নির্দেশ দিয়ে সুলতান মামুদ যেন নগরীতে প্রবেশ করার মুখে তার অনুচরদের, জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের বুঝিয়ে দিলেন তিনি কাফেরদের প্রতি কতটা নির্মম। কোনও কারণে, কোনও অবস্থাতেই, কোনও কাফেরকে ক্ষমা করা চলে না!
সুলতানের এক সহচর তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘মালিক, সুন্দরী জেনেনাটাকেও এখনই নরকে পাঠাব?’
গজনীবিদ সুলতান বললেন, ‘না, এখন থাক। ওই পাপিষ্ঠাটাকে বরং উটের গলা থেকে খুলে পিঠে চাপাও। যাতে ও মন্দির দখল পর্যন্ত বেঁচে থাকে। স্বেচ্ছাসেবী জিহাদি বাহিনীর যে যুবক প্রথম কাফেরদের মন্দিরে প্রবেশ করবে তাকে আমি ওই সুন্দরী জেনেনা উপহার দেব।’
সুলতানের কথায় চাপা উল্লাসধ্বনি শোনা গেল জিহাদি যুবকদের মধ্যে। গজনীবিদ মামুদ এরপর খলিফার পতাকাবাহককে নির্দেশ দিলেন সামনে এগোবার জন্য।
সুলতান মামুদের নেতৃত্বে বন্যার স্রোতের মতো নগরীতে প্রবেশ করল যবন বাহিনী। নগরী প্রায় জনশূন্য। কেউ প্রতিরোধ করতে এগিয়ে এল না। সুলতান তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন তার এবারের হিন্দ মুলুক অভিযানের অন্তিম লক্ষ সোমনাথ মন্দিরের দিকে।
গর্ভগৃহ চত্বরে সে সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই পুরোহিত নন্দিবাহন ও মল্লিকার্জুন। তারা কিছু সময়ের মধ্যেই দেখতে পেলেন দিকচক্রবাল থেকে একটা প্রবল ধূলিঝড় যেন নগরীর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকে! তা দেখে নন্দিবাহন বললেন, ‘মল্লিকার্জুন আপনি আমার থেকে বয়জ্যেষ্ঠ, তাই ত্রিপুরারিদেবের যখন সন্ধান মিলছে না তখন তাঁর অনুপস্থিতিতে আপনি মন্দিরের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করুন।’
এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে প্রধান পুরোহিতের অনুপস্থিতিতে সহ প্রধান পুরোহিত মল্লিকার্জুনের ওপরই দায়িত্বভার বর্তায়। তাই তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি গর্ভগৃহ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করছি। আর আপনি নীচের চত্বর আর প্রবেশ তোরণ রক্ষার ভার নিন। আমাদের মাধ্যমে সোমেশ্বর মহাদেব নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন তাঁর আবাসস্থল সোমনাথ মন্দিরকে।’
দেবদাসীরা ব্যতীত সারা মন্দিরবাসী এখন সমবেত হয়েছে সোপানশ্রেণীর ঠিক নীচে উন্মুক্ত স্থানে। সেই জনতার ভিড়ে অঙ্গিরাও ছিল। একদিকে তার দেবদাসী সমর্পিতার জন্য প্রবল দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে এ পরিস্থিতিতে তার কী করা উচিত তা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। চারদিকে ভয়ার্ত, অসহায় নর-নারীদের ভিড়ে মিশে সে-ও অসহায় ভাবে দাঁড়িয়েছিল।
সহ-প্রধান পুরোহিত নন্দিবাহন গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করে নীচে নামার সময় সোপানশ্রেণীর মধ্যবর্তী একস্থানে এসে দাঁড়ালেন। নীচ থেকে মন্দিরবাসীরা তাকিয়ে আছে তার দিকে। দু-হাত মাথার ওপর তুলে তিনি প্রথমে শান্ত হতে বললেন জনতাকে। স্তব্ধ হল সবাই।
পুরোহিত নন্দিবাহন সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘যবনরা এসে উপস্থিত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাদের দণ্ড দেবার জন্য, নিশ্চিহ্ন করার জন্য তাদের নিয়তি তাদের এখানে টেনে এনেছে। আর সেই দণ্ড সোমেশ্বর মহাদেব তাঁর সন্তানদের অর্থাৎ আমাদের মাধ্যমেই নারকী মামুদকে দিতে চলেছেন। তাই শঙ্কার কোনও কারণ নেই। আমরাই প্রতিরোধ করব, ধ্বংস করব তাদেরকে। তা সে যত বিশাল বাহিনীই হোক না কেন। আর এ কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে যদি কারো মৃত্যু ঘটে, তবে যেন তার অক্ষয় স্বর্গ লাভ হবে। তার পুণ্যে তার সন্তান- সন্ততিরাও পুণ্যবান হবে। আমরা সবাই ভরসা রাখি আমাদের রক্ষাকর্তা সোমেশ্বর মহাদেবের ওপর। সবাই বলো, ‘ ”জয় সোমনাথ, জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়”!’ পুরোহিতের বক্তব্যে কিছুটা ভরসা পেয়ে উপস্থিত জনতা সম্মিলিত ভাবে বলে উঠল, ‘জয় সোমনাথ, জয় সোমেশ্বর মহাদেবের জয়! হর হর মহাদেব!’
ঠিক এই সময় পুরোহিত মল্লিকার্জুন গর্ভগৃহ চত্বরের প্রধান ঘণ্টাটা বাজাতে শুরু করলেন। তার সঙ্গে বাজতে শুরু করল উপমন্দিরের ঘণ্টা গুলোও। মন্দিরবাসীরা, সৈনিকরা সবাই প্রস্তত হল যে যার মতো মামুদ বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য।
সোমনাথ নগরীর মধ্যে দিয়ে এগোবার সময় কোনও রকম মৃদু প্রতিরোধের সম্মুখীন না হওয়াতে মৃদু বিস্মিত হলেন মামুদ। তাঁর মনে এ আশঙ্কাও তৈরি হল যে নগরবাসীদের মতো মন্দিরবাসীরাও তাদের রত্নখচিত পুতুল-বিগ্রহ আর সম্পদ নিয়ে মন্দির ত্যাগ করেনি তো? তবে দূর থেকে ঘণ্টাধ্বনি কানে যেতে কিছুটা আশ্বস্ত হলেন সুলতান। তিনি এগোতে লাগলেন মন্দিরের দিকে। ক্রমশ প্রাকার সমৃদ্ধ বিশাল সোমনাথ মন্দিরের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল তাঁর চোখের সামনে। ওই সেই কাফেরদের ধর্মস্থান! যা ধ্বংস করার জন্য উষর মরুপ্রদেশ অতিক্রম করে কাফেরদের রক্তে তলোয়ার ভিজিয়ে ছুটে এসেছেন গজনীবিদ।
সূর্য দিকচক্রবাল আর মধ্যাকাশের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছতেই বীভৎস চিৎকার আর ‘দীন দীন’ ধ্বনি তুলে মামুদ বাহিনী উপস্থিত হয়ে গেল সোমনাথ মন্দিরের কাছে। মন্দিরের ভিতরে উন্মাদের মতো বেজে চলেছে ঘণ্টাধ্বনি। যবন সেনাদের চিৎকারের প্রত্যুত্তরে মন্দিরের ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছে ‘জয় সোমনাথ, হর হর মহাদেব ধ্বনি’!
মন্দিরের নিকট উপস্থিত হয়েই চারদিকে বিভক্ত হয়ে মন্দিরকে বেষ্টন করে ফেলল অভিজ্ঞ সেনাপতিদের নেতৃত্বে জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকরা। তবে যুদ্ধবাজ সুলতান একটা ব্যাপার বুঝতে পারলেন। মাধেরা সূর্য মন্দিরের প্রাকারের তুলনায় এ মন্দিরের প্রাকার অনেক উঁচু, বহির্গাত্রও মসৃণ। উটের পিঠ থেকে লাফিয়ে প্রাকারে ওঠা যাবে না বা দেওয়াল বেয়ে ওঠা যাবে না। তোরণ ভেঙেই মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। যে তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বেতের বর্ম, লৌহ শিরস্ত্রাণ পরা সেনা আর মন্দির রক্ষীরা।
সুলতান তাঁর স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর তরুণদের নির্দেশ দিলেন উটের পিঠ থেকে মাটিতে নেমে মন্দির তোরণের দিকে এগোবার জন্য। যে প্রথম তোরণ অতিক্রম করতে পারবে সেই তো লাভ করবে সঙ্গে আনা সেই সুন্দরী নারীর শরীর।
যুবক জিহাদিরা তাই বীভৎস চিৎকার করতে করতে এগোল সোমনাথ মন্দিরের তোরণ ভেঙে ফেলার জন্য। রাজা ভীম যে সেনাদল মন্দির রক্ষার জন্য রেখে গেছিলেন, সেই সেনাদল মামুদ বাহিনীর তুলনায় ক্ষুদ্র হলেও তিরন্দাজিতে দক্ষ। তারাও প্রস্তুত হয়েই ছিল। জিহাদি যবনরা কাছে এগিয়ে আসতেই তির নিক্ষেপ করতে শুরু করল তারা। মন্দিরের ভিতর থেকে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠল, ‘জয় সোমনাথ! হর হর মহাদেব!’ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল!
যবন বাহিনী তলোয়ার চালনাতে দক্ষ হলেও তিরন্দাজি বা লক্ষ্যভেদে তেমন পারদর্শী নয়। রাজা ভীমের তিরন্দাজদের তিরের মুখে অনেকে ছিটকে পড়তে লাগলেও তাদের সাহসের অভাব নেই। সংখ্যাতেও তারা অনেক। সেই তির বৃষ্টির মধ্যেও তারা এগোতে লাগল তোরণের দিকে।
সুলতান নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন তার তরুণ জিহাদিদের সাহস। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হওয়া প্রয়োজন এই সব যুবকদের। কারণ, খলিফার পতাকা তো এই তরুণরাই ছড়িয়ে দেবে এই হিন্দ মুলুকে। ধ্বংস করবে, উৎপাটিত করবে কাফেরদের ধর্ম ভাবনা।
সূর্য মধ্য গগনে পৌঁছতেই তির বৃষ্টির মধ্যেই যবন তরুণরা পৌঁছে গেল তোরণের সামনে। রাজা ভীমের সেনাদের সঙ্গে শুরু হলো তলোয়ারের লড়াই। মামুদ বাহিনীর বাঁকানো তলোয়ারের আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হতে লাগল রাজা ভীমের সেনাদের দেহ, উপবিতধারী মন্দির রক্ষীদের বস্ত্র। যে রক্ষীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথ। তার রক্ষীদের ভল্লর আঘাতেও উড়তে লাগল সবুজ পাগড়ি সমেত হানাদারদের ছিন্ন মুণ্ড। তবে তলোয়ার যুদ্ধে সুলতানা বাহিনী অনেক বেশি পারদর্শী কাফের বাহিনীর থেকে। মামুদ বুঝতে পারলেন, কাফেররা যত বিক্রমে যুদ্ধ করুক না কেন তারা বেশি সময় যুদ্ধ চালাতে পারবে না। স্বেচ্ছাসেবক তরুণরা একজন কাফেরকে হত্যা করলেই সুলতান উল্লসিত ভাবে বলে উঠতে লাগলেন ‘শাবাশ! শাবাশ!’
অভিজ্ঞ সুলতানের অনুমানই সঠিক হল। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার কিছু সময় পরই শেষ হয়ে এল কাফের বাহিনী। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে অবশেষে যবনবাহিনীর সম্মিলিত আঘাতে মৃত্যু হল সোমনাথ মন্দিরের রক্ষী প্রধান জয়দ্রথের। তার ছিন্ন মুণ্ড নিয়ে ছুটে এসে সুলতানের পায়ের সামনে নামিয়ে রাখল এক তরুণ। সুলতান খুশি হয়ে তার আঙরখার ভিতর থেকে এক মুঠো স্বর্ণমুদ্রা বার করে ইনাম হিসাবে সেই স্বেচ্ছাসেবককে বলল, ‘তোরণ ভেঙে ফেলো।’
সুলতানের নির্দেশ পালনের জন্য সচেষ্ট হল তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা। সম্মিলিত ভাবে তারা ভারী প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করতে লাগল, অস্ত্রাঘাত করতে লাগল বিশাল তোরণের কপাটের ওপর। কেঁপে উঠতে লাগল তোরণ। তার গা থেকে খসে পড়তে লাগল ধাতুর অলঙ্করণগুলো।
সমুদ্রের বুকে সূর্য ঢলে পড়ার কিছু সময় আগে মামুদবাহিনী তোরণের একটা কাঠের পাটাতন খসিয়ে ফেলল। একজন জিহাদি তরুণ সে ফোঁকর গলে ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল। যে প্রথম কাফেরদের ধর্মস্থানে পা রাখবে, সেই তো সুন্দরী জেনেনাকে পাবে! কিন্তু সেই তরুণের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল না। শূলের আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গেল তার দেহ। আর তারপরই সেই ফাটল দিয়ে ভয়ঙ্কর চিৎকার করতে করতে বাইরে বেরোতে শুরু করল একদল মানুষ। আর তাদের দেখে বিস্মিত হয়ে গেল মামুদ বাহিনী, এমনকী স্বয়ং সুলতান মামুদও।
এ জীবনে বারংবার হিন্দ মুলুক অভিযানে বহু ধরনের যোদ্ধা দেখেছেন গজনীবিদ, কিন্তু এমন যোদ্ধা দেখেননি তিনি কোনওদিন। যারা মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ! জটাজুটধারী হিংস্র মুখমণ্ডল, ভস্ম মাখা শরীর। তাদের কারো হাতে ধরা ভীষণ শূল অথবা ত্রিশূল।
যে স্বচ্ছাসেবী জিহাদি যুবকরা তোরণ ভাঙছিল তারা একবার কাসেমের মুখ থেকে অথবা অন্য কারো থেকে শুনেছিল যে এই মন্দিরের কাফের দেবতার অনুচররা নাকি প্রেত-দৈত্যদানো। তেমনই বিশ্বাস কাফেরদের। এই লোকগুলো তেমন কেউ নয়তো? এরা মানুষতো? কেমন যেন আতঙ্ক সৃষ্টি হল জিহাদি যুবকদের মনে।
একলিঙ্গদেবের উপাসকরা ঝাঁপিয়ে পড়ল যবনদের উপর। বীভৎস তাদের ক্রোধ, দেহে আসুরিক শক্তি! সত্যি তারা যেন মহাদেবের সাক্ষাৎ অনুচর! তাদের শূলের, ত্রিশূলের প্রচণ্ড আঘাতে রক্তের বন্যা বইতে লাগল তোরণের সামনে।
ভয়ার্ত আর্তনাদ করতে করতে ছত্রভঙ্গ হতে লাগল সুলতানের স্বেচ্ছাসেবকরা। মন্দিরের ভিতর থেকে কাফেরদের উল্লাসধ্বনি ভেসে আসতে শুরু হল, ‘জয় সোমনাথ! জয় একলিঙ্গদেবের জয়! হর হর মহাদেব!’
সুলতানও হতবাক! এমন ভয়ঙ্কর প্রতিরোধের মধ্যে তাঁর বাহিনীকে কোনও দিন পড়তে হয়নি। পরিস্থিতি এক সময় এমন হল যে সুলতান দেখতে পেলেন স্বেচ্ছাসেবকদের ছিন্ন ভিন্ন করতে করতে সুলতান যেখানে অবস্থান করছেন সেদিকেই এগোচ্ছে কাফেরদের অদ্ভুত দর্শন দানব বাহিনী। বাধ্য হয়ে কিছুটা পিছু হটে গেলেন স্বয়ং সুলতানও। ভারত ভূখণ্ডের মাটিতে এই প্রথম তাঁর কয়েক কদম হলেও পশ্চাদাপসরণ! কিন্তু শেষ পর্যন্ত একলিঙ্গদেবের অনুচররা আর সুলতানের কাছে পৌঁছতে পারল না। সমুদ্রর বুকে সূর্য ডুবে গেল। নাগা সন্ন্যাসীদের দল প্রচণ্ড বিক্রম প্রদর্শন করে সেদিনের শেষ যুদ্ধ জয় করে মন্দিরে প্রস্থান করল।
মামুদ তাঁর শিবির স্থাপন করলেন সে স্থানেই। সৈন্যাধ্যক্ষ আর জিহাদি স্বেচ্ছাসেবকদের সমবেত করে তাঁদের উৎসাহ প্রদানের জন্য তিনি বললেন, ‘আমি নিশ্চিত আমার যোদ্ধারা, আমার স্বেচ্ছসেবক বাহিনীর তরুণরা অবশ্যই কাল মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে। আমি কাল নিজে তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে তোমাদের নেতৃত্ব দেব। যাদের দেখে তোমরা আতঙ্কিত হোচ্ছো, তারা দানো বা জিন নয়, তারা মানুষ। আর মানুষের শরীর হলে সে শরীর অস্ত্রের আঘাত প্রতিহত করতে পারে না। মনে সাহস এনে আঘাত হানো ওই নগ্ন কাফেরদের ওপর। সব সময় মনে রাখবে খলিফার দোয়া তোমাদের সঙ্গে আছে। ওই নগ্ন কাফেরদের দিকে প্রতি কাফেরকে লক্ষ করে দশ জন জিহাদি তরুণ এগিয়ে যাবে। তলোয়ারের সঙ্গে বর্শা নাও। যাতে তা দূর থেকে শত্রুর শরীরে নিক্ষেপ করা যায়। এক একজন উলঙ্গ কাফেরকে বধ করার বিনিময়ে তোমরা কুড়ি দিনার আরব মুদ্রা পাবে।’
ঠিক এই সময়তেই সোমনাথ মন্দির চত্বরেও মন্দিরবাসীদের সামনে বক্তব্য রাখছিলেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন। সোপানশ্রেণীর পাদদেশে সমবেত হয়েছে মন্দিরবাসীরা। তাদের মধ্যে অঙ্গিরাও আছে। সে বুঝতে পারছে বর্তমান যা অবস্থা তাতে সে যদি কোনও ভাবে মন্দির ত্যাগও করে তবে নিশ্চিত ভাবে যবন বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যাবে।
মল্লিকার্জুন বললেন ‘আজ একলিঙ্গদেবের উপসাকরা যুদ্ধের অন্তিম লগ্নে যে বীরত্ব প্রদর্শন করলেন তা শুভ সূচনার ইঙ্গিতবাহী। তোরণ ত্যাগ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে যবন বাহিনী। সোমেশ্বর মহাদেবের আশীর্বাদ আমাদের সঙ্গে আছে। কাল সবাই অস্ত্র ধরবেন আপনারা। অস্ত্র না থাকলে প্রস্তর খণ্ড, যষ্ঠি ইত্যাদি ব্যবহার করবেন অস্ত্র হিসাবে। জয় আমাদের নিশ্চিত। আগামী কালই হয়তো নগরীতে এসে উপস্থিত হবে ভোজরাজ পরমদেওর বিশাল সমুদ্র সমান বাহিনী। ধ্বংস হবে যবনরা।’
এরপর আরও কিছু কথা বলে বক্তব্য শেষ করলেন তিনি। সভা সাঙ্গ হল। মন্দিরবাসীরা প্রস্তুত হতে লাগল বিনিদ্র রজনী যাপনের জন্য। রাত্রি শেষে যবন বাহিনীর সঙ্গে সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার জন্য।
রাত গভীর হতে শুরু করল। অঙ্গিরা ভাবতে লাগল সে কী করবে? মন্দিরবাসীদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবে মামুদ সেনার বিরুদ্ধে? কিন্তু অঙ্গিরার মনে হল, যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে তারও তো মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। অঙ্গিরা মৃত্যু ভয়ে ভীত নয়, কিন্তু সে যে দেবদাসী সমর্পিতাকে কথা দিয়েছে তার কাছে যাবে, মিলিত হবে তার সঙ্গে। সে যে প্রতীক্ষা করছে অঙ্গিরার জন্য। যেভাবেই হোক কথা রাখতে হবে অঙ্গিরাকে। পৃথিবীর যে স্থানেই সে থাকুক তাকে খুঁজে বার করতে হবে—তার ভালোবাসা রাজকন্যা রাজশ্রীকে।
অঙ্গিরা সিদ্ধান্ত নিল, সে যুদ্ধ করবে না। আত্মগোপন করে থাকবে কোথাও। আর তার জন্য উপযুক্ত স্থান হল সেই চন্দ্রমন্দির। সুলতান বাহিনী যদি সোমনাথ মন্দিরে প্রবেশ করেও তবুও তারা নিশ্চয়ই সেই জীর্ণ, ভগ্ন, পরিত্যক্ত মন্দিরের প্রতি আকর্ষিত হবে না। কারণ, বাইরে থেকে সেই জীর্ণ মন্দির দেখেই তারা বুঝবে সেখানে কোনও সম্পদ নেই। এ কথা ভেবে নিয়ে সে এগোল চন্দ্রমন্দিরের দিকে। সেই মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করার আগে অঙ্গিরা একবার আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবল, ‘রাজকন্যা রাজশ্রী এখন কোথায়? সে যেখানে আছে সেখানেও কি আকাশে চাঁদ উঠেছে? রাজশ্রীও কি চাঁদের দিকে তাকিয়ে তার কথাই ভাবছে?’
হ্যাঁ, সে বনাঞ্চলের মাথাতেও একই রকম চাঁদ উঠেছিল। পরিত্যক্ত মন্দিরের সেই কক্ষের ভগ্ন গবাক্ষ দিয়ে রাত আরও গভীর হবার প্রত্যাশাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে এ ক’দিন, দিনরাত তো শুধু তার কথাই ভেবে চলেছে রাজশ্রী। মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব আর প্রতীক্ষা করতে রাজি নন। তবে রাজশ্রী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, অঙ্গিরাকে ফেলে রেখে সে চালুক্য নগরীতে ফিরবে না। রাজমুকুট, সাম্রাজ্ঞীর পদ তার ভালোবাসার থেকে দামি নয় রাজশ্রীর কাছে। অঙ্গিরাকে খুঁজে বার করতেই হবে তাকে। অঙ্গিরাও নিশ্চয়ই তার সন্ধান করছে।
নিজের সংকল্পে অটল রাজশ্রী প্রতীক্ষা করতে লাগল রাত্রি আরও গভীর হবার জন্য। এক সময় চাঁদ ঠিক মাঝ আকাশে পৌঁছল। রাজশ্রী কক্ষের উন্মুক্ত দ্বারের দিকে তাকিয়ে দেখল ক্লান্তিতে, চিন্তাতে অবসন্ন হয়ে দ্বারের একপাশে ঘুমিয়ে পড়েছেন চালুক্য মহামন্ত্রী। তিনি নিদ্রামগ্ন এ ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পর উঠে দাঁড়াল রাজশ্রী। সন্তর্পণে সে ঘুমন্ত চন্দ্রদেবের পাশ কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কিছুটা তফাতে চন্দ্রালোকে গাছের গায়ে বাধা আছে মহামন্ত্রীর ঘোড়াটা। রাজশ্রী নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে গাছের দড়িতে বাধা লাগামটা খুলে নিয়ে চড়ে বসল ঘোড়ার পিঠে। যাত্রাপথের দিকে ঘোড়ার মুখ ফেরাতেই অশ্বক্ষুরের শব্দে কেঁপে উঠে মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব দেখতে পেলেন ঘোড়ার পিঠে রাজশ্রীকে। ব্যাপারটা অনুমান করে আতঙ্কিত চন্দ্রদেব বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছ রাজকন্যা? ফিরে এসো, ফিরে এসো…।’
রাজকন্যা রাজশ্রী তাঁর কথায় কর্ণপাত করল না। সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল সোমনাথ নগরীর উদ্দেশ্যে।
