সোমনাথ সুন্দরী – ৯
৯
অতিথিশালাতে ফিরে এসে আহার সাঙ্গ করে শয্যা গ্রহণ করেছিল অঙ্গিরা। তবে সে ঘুমায়নি। তার ঘুমাবার কথাও নয়। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব তাকে নিতে আসবেন। শুয়ে শুয়ে আজ সন্ধ্যার ঘটনা বা দুর্ঘটনাই বার বার তার মনে পড়ছিল। তার সামনে ভূমির ওপর বসে আছে অতীব সুন্দর এক নারী। মৃত্যু প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল তাকে। আতঙ্কিত বিহ্বল দৃষ্টি চোখে লেগে আছে তার। দ্রুত শ্বাসের সঙ্গে আন্দোলিত হচ্ছে তার বক্ষ। কূচ যুগলও যেন স্পষ্ট দৃশ্যমান। তার মসৃণ কটিদেশের দু-পাশ বেয়ে নামছে হীরক কণার মতো ঘর্মবিন্দু, গভীর নাভিমূল যেন শুষে নিচ্ছে চারপাশের সব আলো। অতীব সুন্দরী এক নারী পড়ে আছে অঙ্গিরার পদপ্রান্তে কিছুটা তফাতে। না, ঠিক যৌনতা নয়, এক অদ্ভুত ভালোলাগার আবেশ নিয়ে অঙ্গিরা ভাবতে লাগল সেই দৃশ্য। সময় এগিয়ে চলল মধ্যযামের দিকে। নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগে অঙ্গিরা শয্যা ত্যাগ করে অস্ত্রসাজে নিজেকে সজ্জিত করল। কাঁধে তূণীর, কোমরবন্ধে তরবারি।
ঠিক মধ্যযামেই মৃদু আঘাতের শব্দ শোনা গেল কপাটে। অঙ্গিরা দ্বার উন্মোচন করতেই দেখতে পেল বাইরে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছেন ত্রিপুরারিদেব। একাই এসেছেন তিনি। তার সহ প্রধান পুরোহিতদ্বয়, রক্ষী, সেবায়েত বা ছত্রবাহক পরিবৃত হয়ে থাকলেও প্রধান পুরোহিত যে ওসব অনুষঙ্গ বিশেষ পছন্দ করেন না, এ ব্যাপারটা এতদিনে খেয়াল করেছে অঙ্গিরা। এই মধ্যযামেও তাই তিনি মন্দিরের ওপরের চত্বর থেকে একাই নীচে নেমে এসেছেন। অঙ্গিরা তাকে প্রণাম জানাবার পর তিনি বললেন, ‘তুমি প্রস্তুত? তবে চলো।’
অঙ্গিরা তার ধনুকটা উঠিয়ে নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করে অনুসরণ করল প্রধান পুরোহিতকে। ত্রিপুরারিদেবের হাতে ধরা আছে একটা রেশমের থলে। ত্রিপুরারিদেব সে হাতটা নাড়াতেই যেন থলের ভিতর ঘুঙুরের মৃদু শব্দ হল। অতিথিশালা ত্যাগ করে ত্রিপুরারিদেব যেদিকে রওনা হলেন, মন্দিরের সে অংশে অঙ্গিরা এর আগে কোনওদিন যায়নি। সেদিকে নানা ধরনের প্রাচীন কাঠামো, মন্দির ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় বর্তমানে সোমেশ্বর মহাদেবের যে মূল মন্দির তার তুলনায় এসব মন্দির, কাঠামো অনেক বেশি প্রাচীন। কিছু কাঠামো তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের ছাদ ধ্বসে গেছে, স্তম্ভগুলো ভূপতিত। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার খেলা করছে ছাদহীন দেওয়াল গুলোর আড়ালে।
অঙ্গিরার মনে হল দিনেরবেলাও তার ভিতর সূর্যালোক তেমন প্রবেশ করে না। মন্দিরের মূল প্রাকারের মধ্যে অবস্থিত হলেও এ অঞ্চলটাকে পরিত্যক্তই বলা যায়। কোথাও কোনও শব্দ নেই। অঙ্গিরাদের মাথার ওপর অর্ধেক চাঁদ। যে চাঁদ প্রতিদিন ক্রমশ বড় হতে হতে এগোচ্ছে পূর্ণিমার দিকে।
পথপার্শ্বে এক জায়গাতে বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে। তার ঠিক মাঝখানে মাথায় চূড়োঅলা একটা মন্দিরের অংশ আজও দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের জন্য সেদিকে তাকিয়ে একবার থামলেন ত্রিপুরারিদেব।
সেই ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে তিনি বললেন ‘এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির হলো সোমেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গনের আদি মন্দির। আরব জুয়ানেদের আক্রমণে ও মন্দির ধ্বংস হয়। স্বয়ং চন্দ্রদেব ওই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।’ এ কথা বলে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, ‘এই সোমেশ্বর মন্দির যে চন্দ্রদেব তাঁর অভিশাপ মোচনের পর নির্মাণ করেছিলেন তা নিশ্চয়ই তুমি জানো?’ চলমান ত্রিপুরারিদেবের থলে থেকে মাঝে-মাঝেই যেন ঘুঙুর বাজছে!
অঙ্গিরা জবাব দিলো ‘হ্যাঁ জানি।’
‘কী অভিশাপ, কার অভিশাপ, তুমি জানো?’ প্রশ্ন করলেন পুরোহিত শ্রেষ্ঠ।
অঙ্গিরা বলল, ‘তা জানা নেই।’
মাথার ওপর চাঁদের দিকে তাকিয়ে ত্রিপুরারিদেব চলতে চলতে বললেন, ‘চন্দ্রদেবতার ছাব্বিশ জন পত্নী ছিলেন দক্ষ প্রজাপতির কন্যা। কিন্তু চন্দ্রদেব তার অপর পত্নী রোহিণীর প্রতি অধিক আসক্ত হয়ে পড়েন ও তাঁর অন্য পত্নীদের উপেক্ষা করতে থাকেন। দক্ষ কন্যারা বঞ্চিত হতে থাকেন চন্দ্রদেবের সঙ্গ লাভ থেকে। তাঁরা অভিযোগ জানালেন পিতার কাছে। দক্ষ প্রজাপতি যখন চন্দ্রদেবকে তাঁর কন্যাদের দুর্দশা জানানো সত্ত্বেও চন্দ্রদেব এই কাজ থেকে বিরত হলেন না, তখন দক্ষ কুপিত হয়ে তাঁর জামাতাকে শাপ দিলেন যে তার শরীর ক্ষয়ে যেতে থাকবে।
প্রজাপতির অভিশাপে প্রতিদিন ক্ষয়ে যেতে লাগল চন্দ্রদেবতার শরীর। শাপ মোচনের জন্য চন্দ্রদেব এই প্রভাসতীর্থে নেমে এসে শিবের উপাসনা শুরু করেন। শিব, প্রজাপতির শাপ খণ্ডন না করলেও চন্দ্রদেবতাকে এই বর দেন যে, ক্ষয় হতে হতে চন্দ্রদেব সম্পূর্ণ অদৃশ্য হবার দিন, অর্থাৎ অমাবস্যার পরদিন থেকে আবার তার শরীর ফিরে পেতে শুরু করবেন ও পূর্ণতা লাভ করে পূর্ণ কিরণে বিকশিত হবেন, অর্থাৎ পূর্ণিমা তিথি লাভ করবেন।
ক্ষয়িষ্ণু চন্দ্রদেব যেদিন আবার প্রথম তার পূর্ণ অবয়ব ফিরে পেয়েছিলেন সেদিন ছিল শ্রাবণ পূর্ণিমা। যে কারণে প্রতি পূর্ণিমাতে বিশেষত শ্রাবণ পূর্ণিমাতে প্রচুর মানুষের সমাগম হয় এখানে।
শাপমোচন হবার পর চন্দ্রদেবতা, এখানে ‘সোমনাথ’ অর্থাৎ চন্দ্রদেবতা বা সোমদেবের রক্ষাকর্তার মূর্তি নির্মাণ করান এবং সোমনাথের মনোরঞ্জনের জন্য নৃত্যগীতে পারদর্শী কিছু কুমারী কন্যাকে উৎসর্গ করেন সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে। ওরাই হল আদি দেবদাসী। তারপর থেকেই সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে কন্যা উৎসর্গ করার প্রথা, দেবদাসী প্রথা চলে আসছে।’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন।
দেবদাসী শব্দটা শুনে অঙ্গিরার চোখে আবারও ভেসে উঠল সন্ধ্যারতির সময়ের ঘটনার কথা। প্রধান পুরোহিতের উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘আজ সন্ধ্যাতে এক দেবদাসী প্রদীপ শিখাতে দগ্ধ হতে যাচ্ছিল। আমি তাকে রক্ষা করেছি।’ অঙ্গিরা অনুমান করেছিল, প্রধান পুরোহিত এ সংবাদ শুনে তাকে ধন্যবাদ দেবেন বা আশীর্বাদ করবেন। কিন্তু কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য তিনি অঙ্গিরার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, ‘পুরোহিত নন্দিবাহন এ বিষয়ে আমাকে অবগত করেছেন। কিন্তু ও কাজ করতে যাওয়া তোমার উচিত হয়নি।
সমর্পিতা নামের ওই নর্তকী যদি অগ্নিগ্রস্ত অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে তোমাকে আলিঙ্গন করত তবে তুমিও অগ্নিদগ্ধ হতে পারতে, এমনকী তোমার মৃত্যুও ঘটতে পারত। তোমাকে আমি যে দায়িত্ব অর্পণ করতে চলেছি, সে দায়িত্ব পালনের জন্য তোমার জীবন অনেক মূল্যবান। একজন দেবদাসীর মৃত্যু হলে তার শূন্যস্থান অন্য কেউ সহজেই পূরণ করতে পারবে। কিন্তু তুমি যে দায়িত্ব পালন করতে চলেছ তা অন্য কারো পক্ষে পালন করা দুরূহ। এ কথাটা মনে রেখো। তুমি এমন কোনও কার্যে অবর্তীণ হবে না, যে ক্ষেত্রে তোমার জীবনহানির সম্ভাবনা থাকে।’
ত্রিপুরারিদেবের কথা শুনে মৃদু বিস্মিত হয়ে অঙ্গিরা বলল ‘যথা আজ্ঞা প্রভু।’
সেই ধ্বংস্তূপ অতিক্রম করে এক উন্মুক্ত কাননে এসে উপস্থিত হলেন প্রধান পুরোহিত। এ স্থান মূল মন্দিরের কাছেই, কিন্তু এক নির্জন প্রান্তে অবস্থিত। কাননের একপাশে প্রাচীন বৃক্ষরাজি সারবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে। ঠিক তার বিপরীতে প্রাকার বেষ্টিত একটা স্থান আছে। প্রাকারের গায়ে একটা তোরণ থাকলেও তা বন্ধ। প্রাকারের ভিতর কি আছে তা বাইরে থেকে না দেখা গেলেও এক ঘুর্ণায়মান সোপানশ্রেণী সেই প্রাচীরের ভিতর এক কোণ থেকে ওপরে উঠে গিয়ে মিলিত হয়েছে গর্ভগৃহ চত্বরে।
নীচ থেকে নিঝুম, অন্ধকার ঘেরা গর্ভগৃহ চত্বর নজরে পড়ছে অঙ্গিরার। প্রাকার বেষ্টিত সেই স্থান বা বাইরে চাঁদের আলোতে অঙ্গিরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার চারপাশ নিস্তব্ধ। প্রাচীন বৃক্ষগুলোকে কেমন যেন জীবন্ত বলে মনে হল অঙ্গিরার। তারা যেন অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে চাপাস্বরে কথা বলছে! সমুদ্রর দিক থেকে ভেসে আসা বাতাসে মৃদু খসখস শব্দ হচ্ছে গাছের পাতায়। ঠিক যেন মানুষের চাপাস্বরে কথোপকথনের মতো।
ত্রিপুরারিদেব, অঙ্গিরাকে এনে দাঁড় করালেন সেই প্রাচীন গাছগুলোর হাত তিরিশ তফাতে। সেখানে তাকে তিনি দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে গাছগুলোর কাছে এগিয়ে গিয়ে তাদের গুঁড়িগুলোর গায়ে তার থলে থেকে ক্ষুদ্রাকৃতির শঙ্খ বার করে স্থাপন করতে লাগলেন। পরপর পাঁচটি বৃক্ষের গায়ে পাঁচটি শুভ্র শঙ্খ। সে কাজ সমাপ্ত করে অঙ্গিরার কাছে ফিরে এসে তিনি বললেন, ‘শঙ্খগুলোকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করো। চোখ বাঁধা অবস্থায় তোমাকে ওগুলো চূর্ণ করতে হবে।’
অঙ্গিরা তার ধনুকে শর যোজন করে ভালো করে সেই শঙ্খগুলোর অবস্থান দেখে নিল। ত্রিপুরারিদেব একখণ্ড রোশম বস্ত্র দিয়ে অঙ্গিরার চোখ বেঁধে দিলেন ভালো করে। তারপর বললেন, ‘এবার শর নিক্ষেপ করো।’
সোমেশ্বর মহাদেবকে স্মরণ করে তির নিক্ষেপ করল অঙ্গিরা। তির গিয়ে বিদীর্ণ করল প্রথম শঙ্খকে। ত্রিপুরারিদেব বলে উঠলেন, ‘উত্তম, অতি উত্তম!’
পর পর পাঁচটি শরে পাঁচটি শঙ্খ চূর্ণ করল অঙ্গিরা। আর তা দেখে প্রতিবারই প্রশংসাসূচক বাক্য বললেন প্রধান পুরোহিত।
এরপর আসল পরীক্ষা। অঙ্গিরা, ত্রিপুরারিদেবের থলের ভিতর থেকে নির্গত যে শব্দকে ঘুঙুরদানার শব্দ ভেবেছিল তা আসলে ক্ষুদ্রাকৃতির ঘণ্টার শব্দ। যা ছাগ, মেষ ইত্যাদি প্রাণীর গলাতে বাঁধা থাকে। শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপে অঙ্গিরা কতটা পারদর্শী তারই পরীক্ষা নেবেন ত্রিপুরারিদেব। তিনি চোখবাঁধা অঙ্গিরাকে বললেন, ‘আমি এই ক্ষুদ্রাকৃতির ঘণ্টাগুলি নিক্ষেপ করব। সেই শব্দ শুনে তুমি তির নিক্ষেপ করবে।’
তূনির থেকে একটা তির তুলে নিয়ে প্রয়াত পিতার কথা স্মরণ করে ও তাঁর আশীর্বাদ কামনা করে ধনুকে বাণ রচনা করে প্রস্তুত হল অঙ্গিরা। শব্দ শোনার জন্য উৎকর্ণ সে। প্রথম ঘণ্টাটা কিছুটা দূরে নিক্ষেপ করলেন ত্রিপুরারিদেব মাটিতে পড়ে বেজে উঠল সেটা। শব্দস্থান অনুমান করে ভূমির উদ্দেশ্যে তির ছুড়ল অঙ্গিরা। তিরের আঘাতে ঘণ্টাটা আবার বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গিরা বুঝতে পারল, পিতার শিক্ষা তার বিফলে যায়নি। শব্দভেদী বাণ চালনাতে সফল হয়েছে সে।
প্রধান পুরোহিত এর পরের ঘণ্টাটা প্রথম ঘণ্টা থেকে কিছুটা তফাতে ফেললেন। শব্দ শুনে অঙ্গিরা আবারও তির চালাল। আবারও বেজে উঠল ঘণ্টা। প্রধান পুরোহিত প্রতিবারই ঘণ্টার দুরত্ব বৃদ্ধি করতে লাগলেন। অঙ্গিরার কানে ঘণ্টা পতনের শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগল। তবে সে আঘাত হানতে লাগল ঘণ্টাতে।
ত্রিপুরারিদেব তাঁর শেষ ঘণ্টাটা নিক্ষেপ করলেন বেশ অনেকটা দূরে। ঘণ্টা পতনের ক্ষীণ অস্পষ্ট যে শব্দ অঙ্গিরার কানে ধরা দিল তা যেন, না শোনারই মতো। অঙ্গিরা ধনুকে শর যোজন করে মনকে সংহত করে তির নিক্ষেপের আগে মনে মনে বলল, ‘হে সোমেশ্বর মহাদেব। আমার এ শর নিক্ষেপ যেন ব্যর্থ না হয়। আমার পিতা-মাতার আত্মার মুক্তির পথ প্রশস্ত করো তুমি।’
মহাদেবের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তির চালাল অঙ্গিরা। মুহূর্তের মধ্যে ঘণ্টার ঝংকার উঠল দূরবর্তী ভূমি থেকে। অঙ্গিরার প্রার্থনা শুনেছেন সোমদেব।
অঙ্গিরার চোখের আবরণ উন্মুক্ত করলেন প্রধান পুরোহিত। অঙ্গিরা তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখল ত্রিপুরারিদেবের মুখমণ্ডলে চাঁদের আলোতে যুগপত বিস্ময় আর আনন্দ ফুটে উঠেছে। অঙ্গিরা ভূমিষ্ঠ হয়ে তাঁর চরণ স্পর্শ করে উঠে দাঁড়াতেই প্রধান পুরোহিত বললেন, ‘সত্যিই, এই কঠিন পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হলে তুমি। তোমার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। যা ভবিষ্যতে তোমার কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তোমাকে এ শিক্ষা দিয়ে তোমার পিতা তাঁর স্বর্গবাসের পথ প্রশস্ত করেছেন।’
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘তুমি প্রয়োজনবোধে এ স্থানে তোমার অস্ত্র অনুশীলন করতে পারো। এ স্থানে কেউ আসে না। আর ওই যে ওই প্রাকার বেষ্টিত অঞ্চল দেখছ, ওটি হল দেবদাসীদের আবাসস্থল।’ এ কথা বলার পর তিনি হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রচণ্ড আর্তচিৎকার ভেসে এল প্রাকারের ভিতর থেকে। নারী কণ্ঠের চিৎকার!
বেশ কয়েকবার শব্দটা শোনা গেল। যেন প্রচণ্ড আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল কেউ! এরপর কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর একাধিক বামাকণ্ঠের উত্তেজিত স্বর যেন ভেসে আসতে লাগল প্রাকারের ভিতর থেকে!
প্রধান পুরোহিত সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর প্রাকারের গায়ে যে প্রবেশ তোরণ আছে সেদিকে এগোলেন ওই আর্তনাদের কারণ অনুসন্ধান করতে। অঙ্গিরা একটু ইতস্তত করে অনুসরণ করল তাঁকে। তিনি আপত্তি করলেন না।
তোরণের কপাট ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল তারা। অনেক নারী কণ্ঠের কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনুচ্চ এক সোপানশ্রেণী অতিক্রম করে পাথর বাঁধানো এক প্রশস্ত অঙ্গনে উঠে এলেন প্রধান পুরোহিত, আর তার সঙ্গে অঙ্গিরাও।
সুদৃশ্য স্তম্ভ সমন্বিত বিশালাকার এই প্রাঙ্গণের চারপাশ কক্ষ সমৃদ্ধ। দেবদাসীদের আবাসস্থল। ইতিপূর্বে এ স্থানে আসার সুযোগ ঘটেনি অঙ্গিরার।
চত্বরের একপাশে একটা স্তম্ভের নীচে সমবেত হয়েছে বেশ কিছু দেবদাসী। উত্তেজিত ভাবে তারা বাক্যালাপ করছে। কয়েকজনের হাতে জ্বলন্ত প্রদীপ আছে। ত্রিপুরারিদেবের পিছন পিছন অঙ্গিরা এগোল সেদিকে।
তাদের কাছাকাছি পৌঁছে অঙ্গিরা শুনতে পেল, একজন দেবদাসী বলছে, ‘জানোই তো, মৃত্যুর পর সব আত্মারা মুক্তির জন্য এ মন্দিরে এসে উপস্থিত হয়। হয়তো এ কোনও পাপিষ্ঠ আত্মা। ব্রাহ্মণ হত্যা বা গোহত্যার মতো কোনও পাপ করেছিল। যেজন্য ওর মুক্তি ঘটছে না।’
অঙ্গিরা তার কাছে উপস্থিত হতেই প্রথমে তাদের পদশব্দে চমকে উঠল নারীর দল। অস্পষ্ট আতঙ্কিত স্বরও বেরিয়ে এল কারো কণ্ঠ থেকে। কিন্তু প্রধান পুরোহিতকে দেখতে পেয়েই সবাই বাক্যালাপ থামিয়ে সংযত হয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।
অঙ্গিরা দেখতে পেল সামনের থামটার নীচে পা ছড়িয়ে থামের গায়ে ভর দিয়ে বসে একজন দেবদাসী। সিক্ত বসন। তার পাশে একটা শূন্য কলস দেখে বোঝা যাচ্ছে জল সিঞ্চন করা হয়েছে তার শরীরে। প্রচণ্ড আতঙ্কর ভাব ফুটে উঠেছে সেই দেবদাসীর মুখমণ্ডলে। আর তার সমুখে দাঁড়িয়ে আছে দেবদাসী-শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা।
প্রধান পুরোহিতকে দেখে তাঁকে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তিলোত্তমা। অন্য দেবদাসীরাও জানাল। তিলোত্তমা এরপর মাটি থেকে তুলে কোনও ক্রমে দাঁড় করাল সেই দেবদাসীকে। থরথর করে কাঁপছে সে।
ত্রিপুরারিদেব তিলোত্তমাকে প্রশ্ন করল, ‘ওর কী হয়েছে? কী নাম ওর?’ তিলোত্তমা জবাব দিল ‘ওর নাম ”উলুপী”। কিছু সময় পূর্বে এ স্থানে ওর প্রেত দর্শন হয়েছে।’
এরপর তিলোত্তমার কথায় জানা গেল, কিছুটা তফাতে তার কক্ষের বাইরে কিছু একটা শব্দ শুনে কপাট উন্মোচন করে বাইরে আসে উলুপী। এই স্তম্ভর কাছে একটা ছায়া দেখে সে এখানে এগিয়ে আসে। তারপর প্রেত দর্শন হয় তার। আতঙ্কিত ভাবে চিৎকার করে মুর্ছিত হয়ে পড়ে সে। তার চিৎকার শুনে অন্য দেবদাসীরা বাইরে বেরিয়ে জল সিঞ্চন করে তার জ্ঞান ফেরায়। উলুপী তার প্রেত দর্শনের কথা ব্যক্ত করেছে।
তিলোত্তমার কথা শুনে প্রধান পুরোহিত প্রথমে বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘প্রেত দর্শন হয়েছে!’
তারপর উলুপী নামের সেই দেবদাসীর দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘সে কোনও মানুষ নয়তো? কী করে বুঝলে সে প্রেত? মিথ্যা আতঙ্ক ছড়ালে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেব।’
উলুপী হাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আমি মিথ্যা বলছি না প্রভু। উলঙ্গ শরীর তার। সর্বাঙ্গে ঘা। মাথায় জটা, শুশ্রু মণ্ডিত ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডল। হাত-পায়ের নখগুলো শ্বাপদের মতো দীর্ঘ। অমন চেহারা কোনও মানুষের হতে পারে না! পুতি গন্ধ নির্গত হচ্ছিল তার শরীর থেকে। সে আমার উদ্দেশ্যে বাক্যও বলল!’
‘কী বাক্য?’ গম্ভীর মুখে জানতে চাইলেন প্রধান পুরোহিত।
দেবদাসী উলুপী জবাব দিল, ‘সে আমাকে বলল, ‘তুমি আমাকে এ মন্দির থেকে মুক্ত করো। আমি তোমাকে ”সামন্তক মণি”-র সন্ধান দেব। আর এরপরই আতঙ্কে আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে যাই আমি।’
অঙ্গিরা খেয়াল করল দেবদাসী উলুপীর কথা শুনে স্পষ্টতই যেন চমকে উঠলেন প্রধান পুরোহিত। পরমুহূর্তেই তিনি নিজেকে সংযত করে নিয়ে প্রথমে উলুপীর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমার অনুমান নিদ্রা জড়িত অবস্থায় তুমি প্রাঙ্গণে এসে আলো আঁধারিতে অলীক-অবাস্তব দর্শন করেছ ও শুনেছ। তন্দ্রামগ্ন অবস্থাতে অনেক সময় এমন ভ্রম ঘটে। আতঙ্কিত হবার ব্যাপার নেই। মনে রাখবে, তোমার নাথ—ভূতনাথ। প্রেতরা সব তাঁর আজ্ঞাবাহী। কোনও প্রেত দেবদাসীদের ক্ষতি করতে পারে না।’
এ কথা বলার পর তিনি তিলোত্তমাকে নির্দেশ দিলেন, ‘ওকে কক্ষে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। আর তোমরাও যে যার নিজের কক্ষে ফিরে যাও। প্রতিদিনের মতো কালও গর্ভগৃহর দ্বার উন্মোচনের সময় তোমাদের নৃত্য পরিবেশন করতে হবে।’
আজ্ঞা পালিত হল প্রধান পুরোহিতের। চত্বর শূন্য হয়ে গেল।
চোয়াল কঠিন হয়ে গেছে প্রধান পুরোহিতের। তার কপালে চিন্তার ভাব স্পষ্ট। কিছু সময় চুপ করে থাকার পর তিনি বললেন, ‘চলো একবার প্রাঙ্গণটা ভালো করে পরিভ্রমণ করা যাক।’
স্তম্ভ সমন্বিত আলো-আঁধারি ঘেরা বিশাল সেই প্রাঙ্গণের আনাচেকানাচে প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে পরিক্রমণ শুরু করল অঙ্গিরা। এক সময় সে স্থানের একপাশের প্রাকারের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। একটা বেদি আছে সেখানে। মাথার ওপর ছত্রের আচ্ছাদনও আছে। প্রাকারের ওপাশ থেকে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের শব্দ আসছে। তার অভিঘাতে মৃদু কম্পন অনুভূত হচ্ছে প্রাকারে।
চাঁদের আলোতে চিন্তাক্লিষ্ট প্রধান পুরোহিতের মুখমণ্ডল। হ্যাঁ, ভাবছেন তিনি। অন্ধকারের প্রহরী এই মন্দিরেই আছে। পালাতে পারেনি সে। দিনের বেলা যখন মন্দিরের প্রধান তোরণ উন্মুক্ত থাকে তখনও সে তার এই চেহারা নিয়ে দ্বাররক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্ধকারের প্রহরীর বাইরে যাওয়া অসম্ভব।
সে যদি মন্দিরের বাইরে চলে যায় অথবা পালাতে গিয়ে দ্বাররক্ষীদের হাতে ধরা পড়ে তবে দুটো ঘটনাই সমান বিপদজনক হতে পারে। গোপন সত্য উন্মোচিত হতে পারে তার মুখ দিয়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে সত্য গোপন করে রেখেছেন, আড়াল করে রেখেছেন মন্দিরের অধ্যক্ষ আর প্রধান পুরোহিতরা। যে সত্য গোপন রাখার জন্য ত্রিপুরারিদেবকেও মূল্য চোকাতে হয়েছে।
অন্ধকারের প্রহরীর মুখ থেকে এই সত্য উদঘাটনের ভয়েই তো তিনি তার কথা ব্যক্ত করতে পারছেন না কারো কাছে। তাকে অনুসন্ধান করার জন্য রক্ষী নিয়োগ করতে পারছেন না। এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার সম্মুখীন ত্রিপুরারিদেব। দেবদাসী উলুপীকে বলা, অন্ধকারের প্রহরীর কথাটা মনে পড়ল ত্রিপুরারিদেবের, ‘তুমি আমাকে এ মন্দির থেকে মুক্ত করো। তোমাকে আমি ”সামন্তক মণি”-র সন্ধান দেব।’
কথাটা মনে হতেই ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব। অন্ধকারের প্রহরীকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করতে হবে তাঁকে। কিন্তু কীভাবে? সমুদ্রর গর্জন শুনতে শুনতে তার উপায় ভাবার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি। তাঁর পাশে নিশ্চুপ ভাবে দণ্ডায়মান অঙ্গিরা।
মাথার ওপর চাঁদ যাত্রা শুরু করেছে বৈতরণীর দিকে। রাত শেষ হয়ে আসছে। হঠাৎ একটা পরিকল্পনা মাথায় এল তাঁর। তিনি অঙ্গিরাকে বললেন, ‘যতদিন না আমি তোমাকে আসল কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব প্রদান করি ততদিন তুমি অপর কোনও কর্ম সম্পাদনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিলে মনে আছে?’
অঙ্গিরা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, প্রভু।’
ত্রিপুরারিদেব বললেন, ‘তবে আমি তোমাকে রাত্রিকালে দেবদাসীদের এই আবাসস্থল ও এ স্থানের বহিঃদেশে প্রহরার কাজে নিযুক্ত করছি। এমনকী প্রয়োজনে দিনের বেলাতেও এ স্থানে তুমি প্রবেশ করতে পারবে।’
এ কথার পর তিনি একটু থেমে তিনি বললেন, ‘দেবদাসী উলুপী যে চেহারার বর্ণনা দিল তেমন কোনও মানুষকে যদি তুমি দেখতে পাও তবে সতর্কতার সঙ্গে তাকে অনুসরণ করে তার আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করে তৎক্ষণাৎ সে সংবাদ জানাবে আমাকে। তবে তাকে দেখতে পেলে অন্য কাউকে সে সংবাদ জানাবে না।’
অঙ্গিরা বলল, ‘যথা আজ্ঞা প্রভু।’
দেবদাসীদের আবাসস্থল ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে অঙ্গিরাকে নিয়ে ফেরার পথ ধরলেন ত্রিপুরারিদেব। অঙ্গিরার মনে শুধু একটা প্রশ্নের উদয় হল, দেবদাসী উলুপীর প্রেতদর্শন যদি তার দৃষ্টিবিভ্রম হয়ে থাকে তবে তার অনুসন্ধান করতে বলছেন কেন প্রধান পুরোহিত? তবে কি তার উপস্থিতি সত্যিই আছে? অঙ্গিরা অতিথিশালায় ফিরে এল। আর ত্রিপুরারিদেব মন্দিরে উঠে গেলেন। শুকতারা ফুটতেই সোনার শিকল বেজে উঠল।
