Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    স্রষ্টার জন্য লড়াই : মৌলবাদের ইতিহাস – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    ক্যারেন আর্মস্ট্রং এক পাতা গল্প828 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ০৮. সংগঠন (১৯৬০-৭৪)

    ৮. সংগঠন (১৯৬০-৭৪)

    ১৯৬০-র দশক নাগাদ গোটা পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্যে বিপ্লবের হাওয়া ভেসে বেড়াচ্ছিল। ইউরোপ ও আমেরিকায় তরুণরা রাস্তায় নেমে বাবা-মার আধুনিক রেওয়াজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অধিকতর ন্যায় ভিত্তিক ও সাম্যবাদী ব্যবস্থার দাবি করে তারা, তাদের সরকারের বস্তুবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও শোভেনিজমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, জাতীয় যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকার করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে অস্বীকৃতি জানায়। অনেক দশক ধরে মৌলবাদীরা যা করে আসছিল ঠিক সেটাই করতে শুরু করেছিল ষাটের তরুণ সমাজঃ মূলধারার মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসাবে একটা ‘প্রতি-সংস্কৃতি’, ‘বিকল্প সমাজ’ গড়ে তুলতে শুরু করেছিল তারা। নানাভাবেই আরও বেশি করে ধর্মীয় জীবনধারার দাবি করছিল। বেশিরভাগেরই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাস রাখার বা একেশ্বরবাদের কর্তৃত্বপরায়ণ কাঠামোয় বিশ্বাস করার ফুরসত ছিল না। তার বদলে কাঠমান্ডু গেছে তারা ঝা প্রাচ্যের ধ্যানমূলক বা অতীন্দ্রিয়বাদী কৌশলের কাছে সান্ত্বনা খোঁজার প্রয়াস পেয়েছে। অন্যরা মাদক প্রভাবিত অভিযাত্রা, দুয়েমূলক ধ্যান বা এরহার্দ সেমিনারস ট্রেনিং (ইএসটি)-র মতো ব্যক্তিগত পরিবর্তনের কৌশলের ভেতর দুয়ের সন্ধান পেয়েছে। মিথোসের পক্ষে এক ধরনের ক্ষুধা বিরাজ করছিল, এবং সেটা ছিল নতুন পাশ্চাত্যের অর্থডক্সিতে পরিণত হওয়া বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের প্রত্যাখ্যান। তবে এটা আসলে সত্যিকারের যুক্তিবাদের নয়, বরং এর চরম ধরনের প্রত্যাখ্যান ছিল। বিংশ শতাব্দীর খোদ বিজ্ঞানই নিজের সীমাবদ্ধতা ও যোগ্যতার আওতা সম্পর্কে দারুণভাবে শৃঙ্খলিত ও নীতিগতভাবে সতর্ক, সুবোধ ছিল। কিন্তু আধুনিকতার চলমান মেজাজ বিজ্ঞানকে আদর্শিক করে তুলেছিল, সত্যে পৌঁছানোর অন্য যেকোনও উপায়কে স্থান দিতে অস্বীকার গেছে। ষাটের দশকে তারুণ্যের বিপ্লব ছিল অংশত যৌক্তিক ভাষার অবৈধ আধিপত্য ও মিথোস ও লোগোসের অবদমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

    কিন্তু অধিকতর স্বজ্ঞাপ্রসূত জ্ঞান অর্জনের এমনি শৃঙ্খলিত উপায় সম্পর্কে উপলব্ধি যেহেতু সেই আধুনিকতার আবির্ভাবের পর থেকেই পাশ্চাত্যে অবহেলিত হয়ে এসেছে, ফলে আধ্যাত্মিকতার লক্ষ্যে ষাটের এই সন্ধান প্রায়শঃই আত্ম- প্রমোদপূর্ণ ও বেসামাল ছিল। ধর্মীয় রেডিক্যালদের দর্শন ও নীতিমালায়ও ভ্রান্তি ছিল; আধুনিক সমাজের সেক্যুলারাইজেশন ও যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে নিজস্ব আক্রমণ সংগঠিত করে তুলতে যাচ্ছিল তারা। মৌলবাদীরা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। আধুনিকতাকে প্রায়শঃই আগ্রাসী হামলা মনে করে এসেছে তারা। আধুনিক চেতনা অতীতের সেকেলে চিন্তাধারা হতে মুক্তি দাবি করেছে; প্রগতির আধুনিক আদর্শ অযৌক্তিক এবং সে কারণে বিঘ্নসৃষ্টিকারী মনে হওয়া সকল বিশ্বাস, আচরণ ও প্রতিষ্ঠানের অবসান দাবি করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মতবাদ প্রায়শঃই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। অনেক সময়, স্কোপস ট্রায়ালের সময় উদারপন্থীদের কেসের মতো অস্ত্রকে পরিহাস করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে, আধুনিকতা যেখানে অনেক বেশি সমস্যাপূর্ণ ছিল, পদ্ধতি ছিল আরও বেশি নিষ্ঠুর, হত্যালীলা, দেশান্তরীকরণ ও নির্যাতন শিবির জড়িত ছিল এর সাথে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে নাগাদ অনেক ধার্মিক ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে, উদারপন্থী ও সেক্যুলারিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিল তারা। তাদের বিশ্বাস মোতাবেক এই দলটি তাদের নির্যাতন করেছে ও প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু এই ধার্মিক রেডিক্যালরা ছিল তাদের সময়েরই মানুষ। আধুনিক অস্ত্র হাতেই লড়াই করেছে, আধুনিক আদর্শ গড়ে তুলেছে।

    ,

    আমেরিকান ও ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের পর থেকে পাশ্চাত্য রাজনীতি আদর্শিক হয়ে উঠেছিল। লোকে যুক্তির কালের আলোকন আদর্শের পক্ষে বিরাট সব যুদ্ধে অংশ নিয়েছে: মুক্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবীয় সুখ ও সামাজিক ন্যায়বিচার। পাশ্চাত্য উদারনৈতিক ঐক্যমতের বিশ্বাস ছিল, শিক্ষার ভেতর দিয়ে সমাজ ও রাজনীতি আরও বেশি যৌক্তিক ও ঐক্যবদ্ধ হবে। মানুষকে যুদ্ধের জন্যে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উপায় সেক্যুলার আদর্শ ছিল একটি আধুনিক বিশ্বাস পদ্ধতি যা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করে একে একটা যুক্তি প্রদান করে। যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টির করার লক্ষ্যে আদর্শকে সহজ ইমেজে প্রকাশ করা হয়, যাকে প্রায়শঃই ‘জনগণই ক্ষমতার উৎস!’ বা ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ!’ জাতীয় শ্লোগানে সংক্ষিপ্ত করা সম্ভব। এমনি অতি সরল সত্যি সবকিছু ব্যাখ্যা করে বলে বিশ্বাস করা হয়। আদর্শবাদীরা বিশ্বাস করে, বিশ্ব সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে, তারা সাম্প্রতিক সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে এবং এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার একটা উপায় বের করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা বিশ্বের ধ্বংসের জন্যে দায়ী করা যেতে পারে এমন কোনও বিশেষ দলের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; অন্য একটি দল সব ঠিক করে দেবে। আধুনিক বিশ্বে রাজনীতির আর অভিজাত গোষ্ঠীর পেশা থাকা সম্ভব না হওয়ায় সমগ্র জনগণের সমর্থন লাভের জন্যে আদর্শকে অবশ্যই যথেষ্ট সরল হওয়ার প্রয়োজন ছিল যাতে সামান্য মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিও তার মানে আত্মস্থ করতে পারে।

    কোনও কোনও দল ‘মিথ্যাবিশ্বাসে’ আক্রান্ত থাকায় কোনওদিনই আদর্শ উপলব্ধি করতে পারবে না, এমনি বিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শ প্রায়শঃই রুদ্ধ ব্যবস্থা হয়ে থাকে, বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্বের সাথে নিতে পারে না। পুঁজিবাদীদের গোটা বিশ্বের সমস্ত দুরবস্থার জন্যে দায়ী বিবেচনাকারী মার্ক্সবাদীরা পুঁজিবাদের মূল্যবোধ বুঝতে পারে না। এবং বিপরীতক্রমে। উপনিবেশবাদীরা উদীয়মান জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিল। যায়নবাদী ও আরবরা একে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করতে পারে না। সকল আদর্শ একটি অবাস্তব, অনেকে বলবেন, অবাস্তবায়নযোগ্য ইউটোপিয়ার কল্পনা করে। স্বভাবগতভাবেই তারা দারুণভাবে নৈর্বাচনিক হয়, কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট সময়ে জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসন বা সাম্যের মতো পরিবেশে বিরাজ করা ধারণা, আবেগ ও উৎসাহ একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শ কর্তৃক নির্বাচিত হতে পারে, তো তাতে ইতিহাসের একই মৌল চেতনা থেকে উদ্ভুত একই ধরনের আদর্শের কাছে আবেদন সৃষ্টি করতে পারে।

    ইতিহাসবিদ এডমান্ড বার্ক (১৭২৯-৯৭) ছিলেন অন্যতম যারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোনও একদল মানুষ প্রতিষ্ঠানের মতাদর্শকে (তা নিজেই এক সময় বিপ্লবী থেকে থাকতে পারে) চ্যালেঞ্জ করতে চাইলে তাদের নিজস্ব প্রতিবিপ্লবী আদর্শ গড়ে তুলতে হবে। এটাই ছিল ১৯৬০ ১৯৭০-র দশকের বেশির ভাগ অসন্তুষ্ট ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমের অবস্থান। তাদের চোখে আধুনিক প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক ফ্যান্টাসির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এক সময়ের বিপ্লবী ও রেডিক্যাল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, যা এখন এতটাই কর্তৃত্বপরায়ণ ও আধিপত্যবাদী হয়ে উঠেছিল যে সেগুলোকে মনে হচ্ছিল স্বতঃসিদ্ধ। সকলেই দুর্বল অবস্থায় ছিল তারা, সকলেই অনেক সময় যৌক্তিকভাবেই বিশ্বাস করেছে, সেক্যুলারিস্ট ও উদারপন্থীরা তাদের নিশ্চিহ্ন করতে চায়। একটি ধর্মীয় আদর্শ গড়ে তুলতে এমনভাবে তাদের ঐতিহ্যের মিথোস ও প্রতীকসমূহকে নতুন রূপ দিতে হবে যাতে সেগুলো কর্মতৎপরতার জোরাল নীলনকশায় পরিণত হয়ে মানুষকে রুখে দাঁড়িয়ে ধর্মকে নিশ্চিহ্নতার হাত থেকে বাঁচাতে বাধ্য করবে। এইসব ধর্মীয় আদর্শকের কেউ কেউ রক্ষণশীল কালের আধ্যাত্মিকায় গভীরভাবে আপ্লুত ছিল। তারা অতীন্দ্রিয়বাদী ছিল এবং তাদের অদৃশ্যের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা মিথ ও আচারের উপলব্ধি গড়ে তুলেছিল। তবে একটা সমস্যা ছিল। প্রাক আধুনিক যুগে মিথোসকে কখনওই বাস্তব প্রয়োগের জন্যে ভাবা হয়নি। নিরেট কর্মপরিকল্পনার যোগানদার কল্পনা করা হয়নি একে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যে স্প্রিংবোর্ডে মিথোস ব্যবহার করার ফল ছিল বিপর্যয়কর। এখন সেক্যুলার বিশ্বের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার পরিকল্পনার সময় এইসব ধর্মীয় রেডিক্যালদের মিথসমূহকে মতাদর্শে পরিণত করতে হবে।

    মিশরে ১৯৬০-র দশকে ইসলাম অব্যাহত আদর্শিক আক্রমণের শিকার হয়েছিল। জনপ্রিয়তার শিখরে অবস্থান করছিলেন নাসের, ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের’ ডাক দিয়েছিলেন তিনি; এর বাস্তবায়নের নাম দিয়েছিলেন ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’। মে, ১৯৬২ সালে ঘোষিত ন্যাশনাল চার্টারে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেন তিনি। এটা ছিল এমন এক আদর্শ যা পুঁজিবাদ ও রাজতন্ত্রের ব্যর্থতা ‘প্রমাণ’ করেছে, কেবল সমাজতন্ত্রই নিজস্ব সরকার, উৎপাদনশীলতা ও শিল্পায়ন হিসাবে সংজ্ঞায়িত ‘প্রগতি’র দিকে নিয়ে যেতে পারে। শাসক গোষ্ঠী ধর্মকে অপরিবর্তনীয়ভাবে অতীতের বিষয় বলে ধরে নিয়েছিল। মুসলিম ব্রাদারহুডের ধ্বংসের পর নাসের আর ইসলামি বুলি ব্যবহারের দিকে যাননি। ১৯৬১ সালে সরকার প্রাচীন মধ্যযুগীয় শিক্ষা আঁকড়ে থাকার জন্যে উলেমাদের ও ‘নিজেকে বর্তমান সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা’ ‘আত্মরক্ষামূলক, রক্ষণশীল ও আড়ষ্ট’ দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে আযহারের তীব্র নিন্দা করে। নাসেরের কথায় যুক্তি ছিল। মিশরিয় উলেমাগণ প্রকৃতপক্ষেই আধুনিক বিশ্বের বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন, সংস্কার প্রতিহত করে যাচ্ছিলেন তাঁরা। নিজেদের পশ্চাদপদ করে তুলে মিশরিয় সমাজের আধুনিকায়িত ক্ষেত্রগুলোর উপর সমস্ত প্রভাব খোয়াচ্ছিলেন। একইভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রান্তিক গ্রুপগুলোর নৈতিক, অন্যায় সন্ত্রাসবাদ সমাজের ধ্বংসের জন্যে ব্যাপকভাবে দায়ী ছিল। মুসলিম প্রতিষ্ঠান যেন নিজেকে কর্মহীন ও আধুনিক বিশ্বের কাছে নিজের অযোগ্যতাই স্বপষ্ট করে তুলছিল।

    মিশর ও সিরিয়ায় ১৯৬০-র দশকে ‘নাসেরবাদী’ ইতিহাসবিদগণ নতুন সেক্যুলারিস্ট আদর্শকে শক্তিশালী করে তোলেন। ইসলাম পরিণত হয়েছিল জাতির সকল দুর্বলতার কারণ; একে পরিণত করা হয়েছিল ‘ আউট গ্রুপের’ ভুমিকাবরণকারীতে, আরব দেশগুলো প্রগতি অর্জন করতে চাইলে যাকে অবশ্যই নিশ্চিহ্ন করতে হবে। সিরিয় পণ্ডিত যাকি আল-আরযুসি বিশ্বাস করতেন, আরবরা বিশ্বকে ইসলাম উপহার দিয়েছিল, এই কথা ভেবে সময় নষ্ট করার বদলে ইতিহাসবিদদের উচিত বস্তুবাদী সংস্কৃতিতে তাদের অবদানের (উদাহরণ স্বরূপ, হিয়েরোগ্লাফিক থেকে বর্ণমালায় পরিবর্তন) উপর জোর দেওয়া। ধর্মের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপের ফলেই আরবরা ইউরোপের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে, আধ্যাত্মিক বিশ্বের বদলে ভৌত জগতের প্রতি মনোযোগ দিয়েছে তারা, আধুনিক বিজ্ঞান, শিল্প ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছে। শিবলি আল-আয়াসমি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মুসলিম ইতিহাসবিদদের প্রাক-মুসলিম আরবীয় সভ্যতাকে জাহিলিয়াহ (‘অজ্ঞতার কাল’) হিসাবে নাকচ করে দেওয়াটা নিন্দনীয়, কারণ প্রাচীন ইয়েমেনে এর সাংস্কৃতিক সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ইয়াসিন আল-হাফিজ কেবল শাসক শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটানো ইসলামি ঐতিহাসিক সূত্রের উপর বিশ্বাস রাখার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছেন। মৃত সুদূর অতীতের অসঠিক স্মৃতির উপর ভিত্তি করে আধুনিক আদর্শ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ইতিহাসবিদদের অবশ্যই আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও দ্বান্দ্বিক ইতিহাসবিজ্ঞান নির্মাণ করতে হবে, ‘প্রাচীন সমাজের সকল কুসংস্কার ধ্বংস করার জন্যে যে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যোগ দিতে হবে। ধর্মই আরবদের টেনে ধরে রাখা ‘মিথ্যা সচেতনতা’। সুতরাং, যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক প্রগতির পথে আর সব বাধার মতো একে অবশ্যই অপসারণ করতে হবে। যেকোনও আদর্শের মতোই এইসব যুক্তি ছিল নৈর্বাচনিক। ধর্মের বর্ণনা ছিল সরল ও ভ্রান্ত। এটা অবাস্তবও ছিল। আধুনিক বিশ্বে ধর্মের স্থান যাই হোক না কেন (এখনও তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাকি রয়েছে), এমনকি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান ও সেগুলোর কর্মীদের সরিয়ে ফেলা হলেও মানুষের মনে টিকে থাকা জাতিকে গড়ে তোলা অতীত মুছে ফেলা সব সময়ই অসম্ভব।

    এরই সাড়া হিসাবে ধর্মীয় আদর্শবাদীরাও একই রকম সরলবাদী ও আগ্রাসী ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, জীবনের তাগিদে তারা লড়াই করছে। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানি সাংবাদিক ও রাজনীতিক আবুল আলা মাওদুদি (১৯০৩-৭৯) মিশরে তাঁর রচনা প্রকাশ শুরু করেন। মাওদুদির ভয় ছিল যে ইসলাম ধ্বংস হওয়ার পথে। ইসলামকে শেষ করে মুছে ফেলার জন্যে পশ্চিমের বিপুল শক্তিকে একত্রিত হতে দেখেছেন তিনি। মহাসংকটের এক মুহূর্ত ছিল সেটা। মাওদুদি বিশ্বাস করতেন, ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা জগৎ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে অন্যদের হাতে রাজনীতি তুলে দিতে পারে না। তাদের অবশ্যই একসাথে মিলে অগ্রসরমান ও লা- দিনি (‘ধর্মহীন’) সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে শক্তভাবে দলবদ্ধ হতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করতে মাওদুদি ইসলামকে যাতে সময়ের অন্য অগ্রসর আদর্শের মতো গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয় সেজন্যে একে একটি যুক্তিপূর্ণ, পদ্ধতিগত উপায়ে উপস্থানের প্রয়াস পান।৫ সুতরাং, ইসলামের গোটা জটিল মিথোস ও আধ্যাত্মিকতাকে বাস্তবভিত্তিক কর্মকাণ্ডের দিকে চালিত করার লক্ষ্যে প্রণীত একটি যৌক্তিক ডিসকোর্স লোগোসে পরিণত করার প্রয়াস পাচিছলেন তিনি। রক্ষণশীল বিশ্বে এধরনের যেকোনও প্রয়াসকে মারাত্মকভাবে ভ্রান্তিপূর্ণ হিসাবে নিন্দা জানানো হত, কিন্তু মুসলিমরা আর তখন প্রাক আধুনিক কালে বাস করছিল না। ভয়ানক, সহিংস বিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকতে হলে তাদের পুরোনো ধ্যানধারণাকে পর্যালোচনা করে ধর্মকে আধুনিক করার প্রয়োজন ছিল হয়তো?

    আমরা আরও যেসব আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদের কাজ আলোচনা করব তাদের মতোই মাওদুদির আদর্শের ভিত্তি ছিল আল্লাহ’র সার্বভৌমত্বের মতবাদ। এই ব্যাপারটা সাথে সাথে আধুনিক বিশ্বের প্রতি অস্ত্র তাক করে, কারণ তা আধুনিকতার প্রতিটি পবিত্র সত্যির বিরোধিতা করে। যেহেতু কেবল আল্লাহই মানবীয় বিষয়াদির শাসন করেন, তিনিই যেহেতু সর্বোচ্চ আইনদাতা, সুতরাং মানুষের নিজের আইন তৈরি করার বা নিয়তিকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনও অধিকার নেই। মানবজাতির স্বাধীনতা ও মানুষের সার্বভৌমত্বের সম্পূর্ণ ধারণাটিকে আক্রমণ করার মাধ্যমে মাওদুদি গোটা সেক্যুলারিস্ট রীতিকেই অগ্রাহ্য করেছেন।

    আমাদের অস্তিত্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করা বা আমাদের জাগতিক কর্তৃত্বের সীমানা নির্ধারিত করে দেওয়ার দায়িত্বটি আমাদের নয়, এইসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আর কারও নেই…কোনও কিছুরই সার্বভৌমত্ব দাবি করার অধিকার নেই, তা সে মানুষ, পরিবার, শ্রেণী, বা একদল মানুষ বা এমনকি সামগ্রিকভাবে গোটা মানবজাতি হোক। কেবল আল্লাহই সার্বভৌম, এবং তাঁর নির্দেশ ইসলামের বিধিবিধান।৬

    লক, কান্ট এবং আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদারগণের তাঁদের কবরে নড়েচড়ে ওঠার কথা। কিন্তু আসলে যেকোনও আধুনিক মানুষের মতো স্বাধীনতার অনুরক্ত ছিলেন মাওদুদি, একটি ইসলামি মুক্তির তত্ত্ব তুলে ধরছিলেন তিনি। যেহেতু আল্লাহই সার্বভৌম, কোনও মানুষের কাছ থেকে নির্দেশ নিতে কেউই বাধ্য নয়। আল্লাহ’র বিধান (কোরান ও সুন্নাহর মাধ্যমে প্রত্যাদিষ্ট) অনুযায়ী শাসন করতে অস্বীকারকারী কোনও শাসকই তাঁর প্রজাদের আনুগত্য দাবি করতে পারেন না। এমন অবস্থায় বিপ্লব কেবল অধিকার নয়, বরং দায়িত্ব।

    সুতরাং ইসলামি ব্যবস্থা এটা নিশ্চিত করেছে যে রাষ্ট্র কোনও শাসকের খামখেয়ালির ও উচ্চাভিলাষের বস্তু নয়। মুসলিমদের তা খেয়ালখুশি আর মানবীয় নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য অশুভ থেকে রক্ষা করেছে। ইসলামি আইনে শুরাহর (‘পরামর্শ’) নীতি অনুযায়ী খলিফা প্রজাদের সাথে আলোচনা করতে বাধ্য, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সরকার গণতান্ত্রিক আদর্শের মতো জনগণের কাছ থেকে বৈধতা লাভ করে থাকে। খলিফা বা জনগণের কেউই নিজেদের মতো করে আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। তারা কেবল শরীয়াহ প্রয়োগ করতে পারেন। সুতরাং, মুসলিমদের অবশ্যই উপনিবেশিক শক্তির আরোপিত পাশ্চাত্যকৃত সরকারের ধরনকে প্রতিহত করতে হবে, যেহেতু এই ধরনের সরকারগুলো আল্লাহ’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বোঝায় ও তাঁর কর্তৃত্বকে ছিনতাই করে। মানুষ একবার অহমিকাভরে নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিলে অশুভ, নির্যাতন, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিপদ সৃষ্টি হয়। গোঁড়া সেক্যুলারিস্টের কাছে অদ্ভুত ঠেকা এক মুক্তির ধর্মতত্ত্ব, কিন্তু যেকোনও আদর্শের প্রকৃতিই এমন যে এর অন্তর্দৃষ্টি বিরোধীদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। মাওদুদি চলমান যুগচেতনার মূল্যবোধসমূহের ধারক ও ভাগিদার ছিলেন; তিনি মুক্তি ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করতেন, এসবকে স্বৈরাচার ও দুর্নীতি ঠেকানোর একটা উপায় হিসাবেও দেখেছেন। কেবল এইসব আদর্শকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করে ইসলামি চেহারা দিয়েছেন তিনি, কিন্তু সেক্যুলারিজমের ‘মেকি মানসিকতা’ নিয়ে কারও পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব হবে না।

    একটি আদর্শের মূল্যবোধেও বিশ্বাস করতেন মাওদুদি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ইসলাম ফ্যাসিবাদ বা মার্ক্সবাদেরই অনুরূপ একটি বিপ্লবী আদর্শ, কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নাৎসি ও মার্ক্সিস্টরা অন্য মানুষকে দাসত্বে শৃঙ্খলিত করেছে, অথচ ইসলাম তাদের আল্লাহ ছাড়া অন্য যেকোনও কিছুর দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে চেয়েছে। প্রকৃত আদর্শবাদী মাওদুদি অন্য সকল ব্যবস্থাকে নিরাময়ের অতীত ভ্রান্তিপূর্ণ মনে করেছেন।” গণতন্ত্র বিশৃঙ্খলা, লোভ ও মব শাসনের দিকে চালিত করে; পুঁজিবাদ শ্রেণীর সুবিধাকে লালন করে ও গোটা বিশ্বকে ব্যাংকারদের একটা গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়; কমিউনিজম মানবীয় উদ্যোগের গলা টিপে মারে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের বিনাশ ঘটায়। এগুলো সাধারণ আদর্শগত অতিসরলীকরণ। মাওদুদি বিস্তারিত বিষয় ও সমস্যা পাশ কাটিয়ে গেছেন। ইসলামি শুরা কেমন করে প্রায়োগিক অর্থে পাশ্চাত্য দলনমূলক গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন? কৃষি ভিত্তিক আইনি বিধান শরীয়াহ কীভাবে আধুনিক শিল্পায়িত বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সাথে খাপ খাইয়ে নেবে? মাওদুদি যুক্তি দেখিয়েছেন, একটি ইসলামি রাষ্ট্র সমগ্রতাবাদী হবে, কারণ তা সমস্ত কিছুকে আল্লাহ’র অধীনে নিয়ে আসবে; কিন্তু সেটা বাস্তবক্ষেত্রে কেমন করে স্বৈরাচার থেকে ভিন্ন হবে-মাওদুদি সঠিকভাবেই কোরানে যার নিন্দা করা হয়েছে বলে জোর দিয়েছেন?

    যেকোনও আদর্শবাদীর মতো কোনও বিমূর্ত পণ্ডিতি তত্ত্ব গড়ে তুলছিলেন না মাওদুদি, বরং যুদ্ধের আহবান জানাচ্ছিলেন। তিনি সর্বজনীন জিহাদের দাবি করেছেন, একেই ইসলামের মূল ভিত্তি ঘোষণা করেছিলেন। এর আগে অন্য কোনও মহান মুসলিম চিন্তাবিদ এধরনের দাবি করেননি। মাওদুদির চোখে বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে এটা ছিল প্রয়োজনীয় উদ্ভাবন। পশ্চিমারা যেমন বিশ্বাস করে, জিহাদ (‘সংগ্রাম’) বিধর্মীদের ধর্মান্তরিত করার যুদ্ধ নয়, আবার আব্দুহ যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন, কেবল আত্মরক্ষার উপায়ও নয়। মাওদুদি জিহাদকে গোটা মানবজাতির কল্যাণে ক্ষমতা দখলের বিপ্লবী সংগ্রাম হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এখানেও আবার ১৯৩৯ সালে এই ধারণা গড়ে তোলা মাওদুদি মার্ক্সবাদের মতো উগ্র মতাদর্শের মতো একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছেন। পয়গম্বর যেভাবে প্রাক ইসলামি যুগের অজ্ঞতা ও বর্বরতা জাহিলিয়াহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, ঠিক সেভাবে সকল মুসলিমকে অবশ্যই সকল উপায়ে পশ্চিমের আধুনিক জাহিলিয়াহকে ঠেকাতে হবে। জিহাদ নানা রূপ নিতে পারে। কেউ কেউ নিবন্ধ লিখবে, অন্যরা বক্তৃতা দেবে, কিন্তু শেষ উপায় হিসাবে তাদের অবশ্যই সশস্ত্র সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।১০

    এর আগে কখনও ইসলামি আনুষ্ঠানিক ডিসকোর্সে জিহাদ এমন কেন্দ্ৰিয় ভূমিকায় আসেনি। মাওদুদির দর্শনের উগ্রতা প্রায় নজীরবিহীন, কিন্তু আব্দুহ ও বান্না ইসলামকে সংস্কারের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আধুনিক পাশ্চাত্য রীতিনীতিকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করার পর পরিস্থিতি অনেক কঠিন হয়ে উঠেছিল। মুসলিমদের কেউ কেউ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত ছিল। মাওদুদির রচনায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিতদের একজন হলেন সায়ীদ কুতব (১৯০৬–৬৬), তিনি ১৯৫৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগ দিয়েছিলেন, ১৯৫৪ সালে নাসেরের হাতে কারাভোগ করেছেন এবং পনের বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের শাস্তি ভোগ করেছেন, ইসলামপন্থীদের প্রতি শাসকদের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করেছেন।১১ নাসেরের নির্যাতন শিবিরের অভিজ্ঞতা তাঁকে বিক্ষত করেছে, ফলে মাওদুদির চেয়ে আরও বেশি রেডিক্যাল হয়ে উঠেছিল তাঁর ধারণা। কুতবকে সুন্নি মৌলবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলা যেতে পারে। কারাগারে তাঁর প্রণীত আদর্শের উপরই প্রায় সকল রেডিক্যাল ইসলামপন্থী নির্ভর করেছে,১২ কিন্তু সব সময় পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি বৈরী বা চরমপন্থী ছিলেন না তিনি। কায়রোর দার আল-উলুম কলেজে পড়াশোনা করেছেন কুতব, এখানে ইংরেজি সাহিত্যের প্রেমে পড়েন তিনি, পরিণত হন বইপ্রেমীতে। জাতীয়তাবাদীও ছিলেন তিনি, এবং ওয়াফদ পার্টির সদস্য। দেখে মোটেই উগ্র মনে হত না, ছোটখাট, মৃদুভাষী; শারীরিকভাবেও শক্তিশালী ছিলেন না। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন কুতব। দশ বছর বয়সে গোটা কোরান মুখস্থ করেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা, কিন্তু তরুণ বয়সে তাঁর বিশ্বাস অনায়াসে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সেক্যুলার নীতিমালার সাথে খাপ খেয়ে গিয়েছিল। ১৯৪০-র দশক নাগাদ অবশ্য পশ্চিমের প্রতি তাঁর সমীহ ক্ষয়ে আসতে শুরু করেছিল। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কর্মকাণ্ড যায়নবাদের প্রতি পশ্চিমা সমর্থনের মতোই তাঁকে অসুস্থ করে তোলে।১৩ বছর খানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়শোনা করার পর্বটিও ছিল মোহমুক্তিকর।১৪ আমেরিকান সংস্কৃতির যৌক্তিক বাস্তববাদীতা তাঁর অস্বস্তিকর ঠেকেছে: ‘কাজের উপযোগী উদ্দেশ্য ছাড়া আর সব ধারণাকেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, অহম ছাড়া আর কোনও মানবীয় আবেগকে স্বীকার করা হয় না,’ এক চিঠিতে লিখেছেন তিনি। ‘গোটা জীবন যেখানে এমনি বস্তুবাদে নিয়ন্ত্রিত, সেখানে শ্রম ও উৎপাদনের আইন ছাড়া আর কোনও আইনের কোনও সুযোগ নেই।’১৫ কিন্তু তাসত্ত্বেও মধ্যপন্থী ও সংস্কারক হিসাবে গণতন্ত্র ও সংসদীয় পদ্ধতির মতো পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানসমূহকে সম্পূর্ণ সেক্যুলারিস্ট আদর্শের বাড়াবাড়ি এড়ানোর আশায় একটা ইসলামি মাত্ৰা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

    কিন্তু কারাগারে কুতবের অভিজ্ঞতা তাঁর মনে বিশ্বাস যোগায় যে ধার্মিক ও সেক্যুলারিস্টরা একই সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারবে না। কারাগারের চারপাশে নজর বোলানোর সময় ব্রাদারদের উপর নির্যাতন ও তাদের হত্যার কথা ভেবেছেন তিনি, ধর্মকে একপাশে ঠেলে দেওয়ার নাসেরের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার কথা মনে পড়ে গেছে, মাওদুদির মতো ধর্মবিশ্বাসের চিরকালের, সব সময়ের শত্রু অজ্ঞ বর্বরতা হিসাবে সংজ্ঞায়িত জাহিলিয়াহর সব রকম লক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। মক্কার জাহিলি (অজ্ঞ) সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন পয়গম্বর মুহাম্মদ (স), তাঁর নজীর অনুসরণ করে মুসলিমরা আমরণ লড়াই করতে বাধ্য। তবু কেবল অমুসলিম বিশ্বকেই জাহিলি বিবেচনাকারী মাওদুদির তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসর হয়েছিলেন কুতব। ১৯৬০-র দশক নাগাদ কুতব নিশ্চিত হয়ে যান যে, তথাকথিত মুসলিম বিশ্বও জাহিলিয়াহর অশুভ মূল্যবোধ ও নিষ্ঠুরতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। নাসেরের মতো একজন শাসক বাইরে বাইরে ইসলামের কথা বললেও তাঁর কথা ও কাজ প্রমাণ করেছে যে আসলে তিনি ধর্ম ত্যাগ করেছেন। এমন সরকারকে উৎখাত করা মুসলিমদের দায়িত্ব। এবার সেক্যুলারিজমের স্রোতকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে জিহাদে নিবেদিতপ্রাণ ভ্যানগার্ড সংগঠন এবং সমাজকে আবার ইসলামি মূল্যবোধে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে একটি আদর্শ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পয়গম্বরের জীবন ও ব্রতের শরণাপন্ন হলেন তিনি।

    আধুনিক বিশ্বের মানুষ ছিলেন কুতব এবং একটি আকর্ষণীয় লোগোস সৃষ্টি করবেন, কিন্তু মিথের জগৎ সম্পর্কেও গভীরভাবে সজাগ ছিলেন তিনি। যুক্তি ও বিজ্ঞানকে শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু একে সত্যের পথে একমাত্র পথপ্রদর্শক মনে করেননি। কারাগারে কাটানো দীর্ঘ সময়ে নতুন মৌলবাদী তত্ত্বের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি কোরানের উপর একটি বিশাল ধারাভাষ্য রচনা করেন তিনি, তাতে অদৃশ্য ও দুয়ের প্রতি তাঁর আধ্যাত্মিক সচেতনতা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি যত যৌক্তিকই হয়ে উঠুক না কেন, লিখেছেন তিনি, ‘অজানার সাগরে’ অবিরাম ভেসে চলেছে তা। সকল দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিকাশ নিঃসন্দেহে এক ধরনের প্রগতির কথা বোঝায়, কিন্তু সেগুলো স্রেফ চিরস্থায়ী মহাজাগতিক বিধানের ঝলকমাত্র, ‘কোনও মহাসাগরের’ তরঙ্গের মতো উপরিতলের; ঢেউকে তা বদলে দেয় না, ধ্রুব প্রাকৃতিক উপাদানে তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।’১৬ আধুনিক যুক্তিবাদ যেখানে জাগতের প্রতি মনোযোগ দিয়েছে, কুতব সেখানে সময় ও পরিবর্তনের অতীত বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরাতে জাগতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে দেখার প্রচলিত অনুশীলনের চর্চা করছিলেন। জাগতিক ঘটনাপ্রবাহকে মোটামুটি চিরন্তন আদি আদর্শ বাস্তবতার প্রতিফলন হিসাবে দেখা এই অত্যাবশ্যকমূলক অতীন্দ্রিয় মানসিকতা তাঁর ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর আপাত অনুপস্থিতি তাতে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল। যখনই আধুনিক সেক্যুলার সংস্কৃতির কথা ভেবেছেন, অন্য মৌলবাদীদের মতো কুতবও তাঁকে আতঙ্কে ভরে তোলা পবিত্রতা ও নৈতিক তাৎপর্যরহিত স্থান নরকের দেখা পেয়েছেন।

    মানুষ আজকের দিনে এক বিশাল পতিতালয়ে বাস করছে! একবার কেবল পত্রিকা, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন শো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা, বল রুম, মদের বার ও সম্প্রচারকেন্দ্রগুলোর দিকে তাকানোই যথেষ্ট! কিংবা নগ্নদেহ, উস্কানিমূলক অঙ্গভঙ্গি ও সাহিত্যে অসুস্থ ও ইঙ্গিতময় বর্ণনা, শিল্পকর্ম ও গণমাধ্যমে লালসা! আর এর সাথে যোগ করুন মানুষের টাকার জন্যে প্রলোভনকে ইন্ধন যোগানো ও এর সংগ্রহ ও বিনিয়োগের লক্ষ্যে আইনের পোশাকে প্রতারণা, কূটকৌশল ও ব্ল্যাকমেইলের পাশাপাশি দুষ্ট কৌশল বের করতে প্ররোচিতকারী সুদের পদ্ধতি।১৭

    এই সেক্যুলার শহরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে এবং আধুনিক সমাজের উপর আধ্যাত্মিকতার একটা বোধ পুনঃস্থাপন করতে চেয়েছিলেন কুতব।

    ইতিহাসকে অতীন্দ্রিয়ভাবে দেখেছেন কুতব। তিনি এইসব ঘটনাকে অনন্য এবং সুদূর অতীতের মনে করে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদের মতো পয়গম্বরের জীবনের শরণাপন্ন হননি। ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সমালোচক হওয়ায় তিনি জানতেন যা ঘটে গেছে তার পেছনের সত্যিতে উপনীত হওয়ার অন্য উপায় আছে। কুতবের চোখে মুহাম্মদের ব্রত তখনও আদি আদর্শ ছিল, এমন এক মুহূর্ত যখন পবিত্র ও মানুষ এক হয়ে ঐকতানে কাজ করেছে। গভীরতর অর্থে এটা ছিল জাগতিক কর্মকাণ্ডকে ঐশী জগতের সাথে সম্পর্কিত করা একটা ‘প্রতীক’। এভাবে মুহাম্মদের জীবন ইতিহাস, সময় ও স্থানের অতীত এক আদর্শ তুলে ধরেছে; এবং ক্রিশ্চান অপুদীক্ষার মতো পরম বাস্তবতার সাথে মানবজাতির এক ‘অবিরাম সাক্ষাতের’ ব্যবস্থা করেছে।১৮ সুতরাং এটা একটা এপিফ্যানি ছিল; আর পয়গম্বরের ব্রতের বিভিন্ন পর্যায় নারী-পুরুষকে তাদের ঈশ্বরের দিকে চালিতকারী ‘মাইলফলক’ বোঝায়। একইভাবে জাহিলিয়াহ কথাটি প্রচলিত মুসলিম ইতিহাসবিজ্ঞানের মতো কেবল আরবের প্রাক ইসলামি কালকে বোঝাতে পারে না। ‘জাহিলিয়াহ সময়ের কোনও পর্ব নয়,’ তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত গ্রন্থ মাইলস্টোনস-এ লিখেছেন কুতব। ‘এটা সমাজ যখনই ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়, তখনই দেখা দেওয়া এক অবস্থা, সেটা অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতে হতে পারে।’১৯ আল্লাহ’র বাস্তবতা ও সার্বভৌমত্ব অস্বীকারের যেকোনও রকম প্রয়াসই জাহিলি। জাতীয়তাবাদ (রাষ্ট্রকে পরম মূল্য দেয়), কমিউনিজম (নাস্তিক্যবাদী), ও গণতন্ত্র (যেখানে জনগণ আল্লাহ’র ক্ষমতা কেড়ে নেয়) সবই আল্লাহ’র পরিবর্তে মানুষের উপাসনাকারী জাহিলিয়াহর প্রকাশ। এটা খোদাহীনতা ও ধর্মদ্রোহিতার একটা অবস্থা। কুতবের চোখে মিশর ও পাশ্চাত্যের আধুনিক জাহিলিয়াহ পয়গম্বরের আমলের জাহিলিয়াহর চেয়ে ঢের খারাপ ছিল, কারণ এটা ‘অজ্ঞতা’ ভিত্তিক ছিল না, বরং আল্লাহ’র বিরুদ্ধে নীতিগত বিদ্রোহ ছিল।

    কিন্তু প্রাক আধুনিক আধ্যাত্মিকতায় ইসলামের আচার ও নীতিগত আনুশীলনের মাধ্যমে প্রতিটি মুসলিম সত্তার অন্তস্তলে মুহাম্মদীয় আদিআদর্শ রূপ গড়ে তোলা হয়েছিল। এভাবে নিশ্চিতভাবে তা কুতবের পক্ষে একটা মিথোস ছিল, কিন্তু তিনি এবার একে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করেছেন যাতে মিথ কর্মকাণ্ডের নীলনকশা আদর্শে পরিণত হয়। মদীনায় পয়গম্বর প্রতিষ্ঠিত প্রথম উম্মাহ ছিল আল্লাহ পরিকল্পিত এক ‘উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা’, ‘যাতে এই অনন্য ইমেজ বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বাস্তবায়িত করা যায় এবং মানবীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ভেতর একে পুনাবৃত্তি করার জন্যে এর কাছেই সাহায্য চাওয়া যায়। সত্যিই ‘এক ব্যতিক্রমী প্রজন্মের মানুষদের হাতে’ মদীনার আদি আদর্শমূলক সমাজ অর্জিত হয়েছিল, তবে সেটা ‘অননুকরণীয় অলৌকিক’ ঘটনা ছিল না; এটা ছিল ‘মানবীয় প্রয়াসের ফল,’ এবং যথার্থ প্রয়াস নিলেই অর্জন করা সম্ভব।২১ মুহাম্মদের জীবনে, যুক্তি দেখিয়েছেন কুতব, স্বর্গীয় পরিকল্পনা (মানহাজ) তুলে ধরেছেন আল্লাহ, সুতরাং এটা মানব রচিত সকল আদর্শের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল। পয়গম্বরের জীবনের ‘মাইলফলক’ পর্যবেক্ষণ করে আল্লাহ মানব সন্তানকে সঠিকভাবে নির্দেশিত সমাজ গঠনের একমাত্র উপায় দেখিয়ে দিয়েছেন। ২২

    ক্রিশ্চানদের বিপরীতে মুসলিমরা সবসময় স্বর্গীয় সত্তাকে মতবাদের চেয়ে বরং এক ধরনের ঔচিত্যবোধ হিসাবেই অনুভব করেছে; মুসলিম মৌলবাদ সব সময়ই সক্রিয় থাকবে ও উম্মাহ কেন্দ্রিক হবে। কিন্তু কুতব পয়গম্বরের জীবনের মিথোসকে একটি আদর্শে রূপান্তরিত করার পর অনিবার্যভাবে সরলীকরণ করে এর আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে সীমিত করে দেন, এবং একে খাট করেন। তিনি আধুনিক আদর্শের জন্যে প্রয়োজনীয় এক শৃঙ্খলিত কর্মসূচি প্রণয়নের জন্যে পয়গম্বরের ব্যক্তিগত বহুমুখী সংগ্রামের জটিলতা, দ্ব্যর্থবোধকতা ও বৈপরীত্যকে সরিয়ে দেন; কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় এর সাথে অন্তর্ভুক্ত নিষ্ঠুর নির্বাচন ইসলামি দর্শনকে বিকৃত করেছে।

    পয়গম্বরের জীবনকে চারটি পর্যায়ে অগ্রসর হতে দেখেছেন কুতব; বিংশ শতাব্দীতে সঠিকপথে পরিচালিত একটি সমাজ গড়ে তোলার জন্যে মুসলিমদের অবশ্যই এই চারধারা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।২৩ প্রথমে আল্লাহ একজন ব্যক্তি মুহাম্মদের কাছে তাঁর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন, এরপর তিনি আল্লাহ’র ইচ্ছা বাস্তবায়ন ও মক্কার জাহিলিয়াহ অপসারণ করে একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক, সাম্যবাদী সমাজ গঠনের শপথ গ্রহণকারী অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তিদের দল, যা কেবল আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে, উম্মাহ গঠনের পথে অগ্রসর হয়েছেন। প্রথম পর্যায়ে মুহাম্মদ এই ভ্যানগার্ডদের সম্পূর্ণ ভিন্ন মূল্যবোধে পরিচালিত পৌত্তলিক জাহিলি প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। অন্য মৌলবাদীদের মতো কুতব বিচ্ছিন্নতার নীতিকে (মাফাসালাহ) গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছেন। পয়গম্বরের কর্মসূচি দেখিয়েছে যে সমাজ দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত শিবিরে বিভক্ত। আজকের মুসলিমদেরও, যুক্তি দেখিয়েছেন কুতব, অবশ্যই তাদের নিজস্ব কালের জাহিলিয়াহকে প্রত্যাখ্যান করে এর থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে একটি খাঁটি মুসলিম ছিটমহল নির্মাণ করতে হবে। তারা তাদের সমাজের অবিশ্বাসী ও ধর্মদ্রোহীদের প্রতি সৌজন্য দেখাতে পারে, দেখানো উচিতও, কিন্তু সেই সম্পর্ক একেবারে নিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে এবং সাধারণভাবে শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অসহযোগিতার নীতি অনুসরণ করতে হবে।২৪

    জাহিলি মূলধারা থেকে এই বিচ্ছিন্নতা মক্কার পৌত্তলিক প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন শুরু এবং শেষ পর্যন্ত ৬২২ সালে তাদের মক্কা থেকে আনুমানিক ২৫০ মাইল উত্তরের মদীনার বসতিতে অভিবাসনে (হিজরাহ) বাধ্য করলে প্রকট হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের বিশ্বাসী ও তাদের খোদাহীন সমাজের ভেতর সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ছিল অনিবার্য। কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ে পয়গম্বর মদীনায় একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটা ছিল সংহতি, ভ্রাতৃত্বমূলক নিশ্চয়তা ও সমন্বিতকরণের একটা পর্যায়; এই সময় আসন্ন সংগ্রামের লক্ষ্যে জামাহ নিজেকে প্রস্তুত করেছে। কর্মসূচির চতুর্থ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে মুহাম্মদ (স) মক্কার বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র সংগ্রামের কাল সূচনা করেন, প্রথমে মক্কার বাণিজ্য ক্যারাভানের উপর ছোট মাত্রার আক্রমণ, এবং পরে মক্কান সেনাবাহিনীর উপর অব্যাহত হামলা। সমাজের মেরুকরণ বিবেচনায় রেখে ঠিক আজকের মুসলিমদের মতোই সহিংসতা ছিল অনিবার্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৬৩০ সালে মক্কা স্বেচ্ছায় মুহাম্মদকে (স) তার দুয়ার খুলে দেয়, স্বীকার করে নেয় ইসলামের শাসন ও আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব।

    কুতব সব সময় জোর দিয়ে বলেছেন, আল্লাহ’র পক্ষে সশস্ত্র সংগ্রাম শক্তি দিয়ে ইসলাম কায়েমের লক্ষ্যে নির্যাতনমূলক, নিপীড়ক অভিযান হবে না। মাওদুদির মতো তিনি তাঁর আল্লাহ’র সার্বভৌমত্বের ঘোষণাকে স্বাধীনতার ঘোষণা মনে করেছেন। এটা ছিল

    অন্য মানুষ বা মানবীয় ইচ্ছার বন্ধন থেকে সর্বজনীন মানবীয় মুক্তির ঘোষণা… আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব ঘোষণার অর্থ: সকল ধারণা, ধরন, পদ্ধতি ও শর্তের দিক থেকে মানবীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সামগ্রিক বিপ্লব, এবং মানব জাতি যেসব ক্ষেত্রে সর্বভৌম তার প্রতিটি শর্তের প্রতি উপেক্ষা ২৫

    কুতবের আদর্শ আবিশ্যিকভাবে আধুনিক ছিল; তাঁর ভাবনায় আল্লাহ’র ‘কেন্দ্রিকতা ছাড়া অনেক দিক থেকেই তিনি আধুনিক পদ্ধতির প্রত্যাখানে ষাটের দশকের মানুষ ছিলেন। পয়গম্বরের কর্মসূচির বর্ণনায় কোনও আদর্শের প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুই রয়েছে। এটা ছিল সহজ; শত্রুকে শনাক্ত করেছে, সমাজকে পুনর্গঠনকারী জামাহকে চিহ্নিত করেছে। কুতবের আদর্শ সমাজের বিচ্ছিন্নতা ও নতুন করে দিক নির্ধারণে অস্বস্তিতে ভোগা অনেক মুসলিমের কাছে ইসলামি পরিভাষায় আধুনিক রীতিনীতির জটিল বৈশিষ্ট্যসমূহকে অনুবাদ করেছে যাতে তারা নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারে। নিশ্চিতভাবেই ব্রিটিশদের দান ‘স্বাধীনতাকে’ মুক্তিদায়ী বা ক্ষমতায়নকারী হিসাবে অনুভব করেনি তারা। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ছয় দিনের যুদ্ধে নাসেরের শোচনীয় পরাজয় অনেক মানুষের কাছে নাসেরবাদের সেক্যুলার, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ধরনের ধর্মীয় পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছিল, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম কুতবের আদর্শে অনুপ্রেরণার সন্ধান লাভ করবে।

    মুসলিম দর্শনে জিহাদকে কেন্দ্রিয় অবস্থানে এনে কুতব আসলে পয়গম্বরের জীবনকে বিকৃত করেছেন। প্রচলিত জীবনীকারগণ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, প্রথম উম্মাহকে টিকে থাকার জন্যেই লড়াই করতে হয়েছিল, মুহাম্মদ (স) তলোয়ারের সাহায্যে বিজয় লাভ করেননি, বরং অহিংসার সৃজনশীল ও মেধাবী কৌশলে সেটা অর্জিত হয়েছে। কোরান সকল সহিংসতাকে ঘৃণিত হিসাবে প্রবলভাবে নিন্দা করে। কেবল আত্মরক্ষায় যুদ্ধের অনুমোদন দিয়েছে। কোরান ধর্মীয় বিষয়ে শক্তিপ্রয়োগের ঘোর বিরোধী। এর দর্শন অন্তর্ভুক্তিমূলক, অতীতের সকল মহান পয়গম্বরের প্রশংসা করেছে।২৬ পরলোকগমনের আগে তাঁর সম্প্রদায়ের উদ্দেশে মুহাম্মদ (স) শেষ যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে তিনি সকল মানুষ যেহেতু ভাই, তাই ধর্মকে ব্যবহার করে তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্যে মুসলিমদের তাগিদ দিয়েছেন: ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার।২৭ বর্জন ও বিচ্ছিন্নতার কুতবের এই দর্শন এই গ্রহণের সহিষ্ণুতা বিরোধী। কোরান স্পষ্টভাবে এবং গুরুত্বের সাথে জোর দিয়ে বলেছে ‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।২৮ কুতব একে সীমিত করেছেন: ইসলামের রাজনৈতিক বিজয় প্রকৃত মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই কেবল সহিষ্ণুতা থাকতে পারে।২৯

    নতুন আপসোহীনতা মৌলবাদী ধর্মের মূল ভিত্তি গভীর ভীতি থেকে উৎসারিত। কুতব ব্যক্তিগতভাবে আধুনিক জাহিলিয়াহর খুনে ও বিধ্বংসী ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। নাসের যেন ইসলামকে মুছে ফেলতে বদ্ধ পরিকর বলে মনে হয়েছে। তিনি একা ছিলেন না। ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরানোর সময় কুতবের মনে হয়েছে ইসলামকে ধ্বংস করার জন্যে একের পর জাহিলি লেগে ছিল: পৌত্তলিক, ইহুদি, ক্রিশ্চান, ক্রুসেডার, মঙ্গোল, কমিউনিস্ট, পুঁজিবাদী, উপনিবশেবাদী এবং যায়নবাদী। আজ এরাই আবার এক বিশাল ষড়যন্ত্রে একজোট হয়েছে। অনেক দূর ঠেলে দেওয়া প্রকৃত মৌলবাদীর ভ্রান্তি নিয়ে কুতব সর্বত্র সম্পর্ক লক্ষ করেছেন। আরবদের প্যালেস্তাইন থেকে বিতাড়িত করতে ইহুদি ও ক্রিশ্চান সাম্রাজ্যবাদীরা একসাথে ষড়যন্ত্রে মেতেছে; পুঁজিবাদ ও কমিউনিজম, দুটোরই জন্ম দিয়েছে ইহুদিরা; ইসলামকে বিতাড়িত করতেই ইহুদি ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা আতাতুর্ককে ক্ষমতায় বসিয়েছে; মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তুরস্কের নজীর অনুসরণ না করায় নাসেরকে সমর্থন দিয়েছে তারা ৩১ অধিকাংশ বৈকল্যবাদীর মতো এই ষড়যন্ত্র ভীতি বাস্তবতার কাছে উড়ে যায়, কিন্তু যখন মানুষের মনে এই অনুভূতি জাগে যে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্যেই তারা বিরাট বিপদের মোকাবিলা করছে, তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর যুক্তিসঙ্গত থাকতে পারে না।

    কুতব বাঁচতে পারেননি। ১৯৬৪ সালে সম্ভবত ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কারাবাসের সময় বোন তাঁর লেখা চালান করে গোপনে বিলি করেছিলেন, কিন্তু মুক্তির পর কুতব মাইলস্টোনস প্রকাশ করেন। পরের বছর সরকার নাসেরকে হত্যার ষড়যন্ত্র লিপ্ত বলে অভিযুক্ত সন্ত্রাসী দলের এক নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব উন্মোচন করে। কুতবসহ শত শত ব্রাদারকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬৬ সালে নাসেরের জবরদস্তির ফলে কুতবকে ফাঁসি দেওয়া হয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভকারীর বদলে কুতব বরং একজন আদর্শবাদীই হয়ে ছিলেন। তিনি সব সময় যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ১৯৫৪ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্যেই ব্রাদারদের অস্ত্র সংগ্রহ কেবল আত্মরক্ষামূলক কাজ। তিনি সম্ভবত ভেবেছিলেন, জিহাদ শুরুর সময় হয়নি। জাহিলিয়াহর উপর আক্রমণ শানানোর আগে আধ্যাত্মিক ও কৌশলগতভাবে তৈরি হওয়ার জন্যে ভ্যানগার্ডকে মুহাম্মদীয় কর্মসূচির প্রথম তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে। সব ব্রাদারই তাঁকে অনুসরণ করবে না। অধিকাংশই অধিকতর মধ্যপন্থী সংস্কারপন্থী হুদাইবির দর্শনের প্রতি অনুগত ছিল, কিন্তু কারাগার ও নির্যাতন শিবিরে মুসলিমদের একটা বিরাট সংখ্যা কুতবের রচনা পাঠ করেছে, সেসব নিয়ে আলোচনা করেছে, এবং ছয় দিনের যুদ্ধের পর অধিকতর ধর্মীয় পরিবেশে ক্যাডার তৈরি শুরু করেছে।

    ইরানের শিয়া মুসলিমরাও ১৯৬২ সালে শাহ মুহাম্মদ রেযা পাহলবী শ্বেত বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়ার পর সেক্যুলারিস্ট আগ্রাসনের নতুন ঢেউয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের জন্যে বর্ধিত মুনাফা ভাগাভাগির প্রতিষ্ঠান ও জমির মালিকানার আধা সামন্তবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটানো ও স্বাক্ষরতা বাহিনী সৃষ্টি।৩২ শাহর কিছু প্রকল্প সফল হয়েছিল। শিল্প, কৃষি ও সামাজিক প্রকল্পগুলোকে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ১৯৬০-র দশকে মোট জাতীয় উৎপাদনে ব্যাপক বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করা গেছে। শাহ ব্যক্তিগতভাবে নারীদের নিম্নপর্যায়ের মনে করলেও তাদের মর্যাদা ও শিক্ষার মান উন্নত করা সংস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন; যদিও তাতে কেবল সমাজের উঁচু পর্যায়ের মহিলারাই উপকৃত হয়েছিল। পশ্চিমে উৎসাহের সাথে শাহর সাফল্যের তারিফ করা হয়েছে: ইরানকে যেন মধ্যপ্রাচ্যে প্রগতি ও সুস্থতার আলোকবর্তিকা মনে হয়েছে। মুসাদ্দিক সংকটের পর আমেরিকাকে তোয়াজ করে চলছিলেন শাহ, ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়েছেন ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা বিদেশী বিনিয়োগে পুরস্কৃত হয়েছেন। কিন্তু এমনি একটা সময়েও দক্ষ পর্যবেক্ষক লক্ষ করেছিলেন যে, এইসব সংস্কার যথেষ্ট প্রসারিত হয়নি। ধনীদের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে সেগুলো, শহুরে নাগরিকদের প্রতি কেন্দ্রিভূত ছিল এবং সাধারণ মানুষকে অবহেলা করেছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে অর্জিত মুনাফা দক্ষতার সাথে ব্যবহৃত হয়নি, বরং লোকদেখানো ও সামরিক প্রযুক্তির সর্বশেষ সরঞ্জামের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। এর ফলে সমাজের মূল কাঠামো স্পর্শের বাইরে রয়ে গেছে ও পাশ্চাত্যকৃত ধনীক গোষ্ঠী ও প্রাচীন কৃষিভিত্তিক রীতিনীতির অধীনে ফেলে আসা সাধারণ দরিদ্রদের ভেতরকার ফারাক আরও প্রসারিত হয়েছে।

    কৃষিক্ষেত্রে অবনতির কারণে গ্রাম এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের শহরে অভিযাত্রা ঘটেছে: ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৮ সালের ভেতর শহরের জনসংখ্যা শতকরা ৩৮ ভাগ থেকে ৪৭ ভাগে বৃদ্ধি পায়। এই বছরগুলোতে তেহরানের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুন হয়ে ওঠে, ২.৭১৯ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪.৪৯৬ মিলিয়নে দাঁড়ায়। গ্রামের অভিবাসীরা ঠিকভাবে মিশে যেতে পারেনি, শহরের উপকণ্ঠে বস্তি এলাকায় বাস করত তারা; কুলি, ট্যাক্সি ড্রাইভার ও রাস্তার হকার হিসাবে কোনওমতে জীবন যাপন করত। অধুনিক ও প্রচলিত ধারায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল তেহরান: পুরোনো শহর থেকে পাশ্চাত্যকৃত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী নতুন আবাসিক এলাকা এবং শহরের উত্তরের বার আর ক্যাসিনোর অবস্থান রয়েছে, মহিলারা যেখানে পশ্চিমা কায়দায় পোশাক পরে, এবং প্রকাশ্যে পুরুষের সাথে খোলামেলাভাবে মেশে সেই বাণিজ্যিক এলাকায় চলে আসে। পুরোনো শহর ও সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলে রয়ে যাওয়া বাজারি ও হতদরিদ্রদের কাছে একে বিদেশী কোনও শহর মনে হয়েছে।

    ইরানের বিপুল সংখ্যাগিরিষ্ঠ জনগণ এভাবে যারপরনাই মানসিক আবেগে অস্বস্তিকর অবস্থার মোকাবিলা করছিল। পরিচিত বিশ্ব অচেনা হয়ে উঠেছে; শহর থেকেও যেন নেই; অসুস্থতার কারণে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়া কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো। ১৯৬০-র দশকে ইরান যেভাবে দ্রুত বদলে গেছে বিশ্ব যখন সেভাবে বদলে যায়, নারী-পুরুষ নিজেদের আগন্তুক ভাবতে শুরু করে। ক্রমবর্ধমানহারে উদ্বেগজনক সংখ্যক ইরানি কোথাওই স্বস্তি বোধ করছে না বলে আবিষ্কার করেছিল। ১৯৫৩ সালের বিপর্যয় অনেককেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে পরাজয় ও অপমানের ক্ষয়িষ্ণু বোধে তাড়িত করেছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষাধারী অল্প কজন যারা বাবা-মা ও পরিবারের কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেছে, দুটো জগতের মাঝখানে পড়ে কোনওটাতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না। জীবন অর্থহীন মনে হয়েছে। ১৯৬০-র দশকের দ্রুতপ্রজ সাহিত্যে সবচেয়ে পুনরাবৃত্ত প্রতীক বেড়ে ওঠা বিচ্ছিন্নতা তুলে ধরেছে: দেয়াল, একাকীত্ব, অর্থহীনতা, নৈঃসঙ্গ ও কপটতা। সমসাময়িক ইরানি সমালোচক ফাযানেহ মিলানি ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে ‘সংরক্ষণ ও গোপনীয়তার মেধাবী’ নাছোড় ইমেজারির কথা উল্লেখ করেছেন।

    দেয়াল ঘিরে রাখে বাড়িকে। বোরখা মেয়েদের। ধর্মীয় তাকিয়াহ বিশ্বাসকে রক্ষা করে। তারোফ [ডিসকোর্সের আচরিক ধরণ] প্রকৃত ভাবনা ও আবেগকে আড়াল করে। বাড়িঘর দারনি [অন্দরমহল], বিরুনি [বহির্মহল] আর বাতিনি [গোপন] বলয়ে বিভক্ত হয়ে গেছে।৩৫

    ইরানিরা নিজেদের কাছ থেকে এবং অন্যদের কাছ থেকে নিজেদের আড়াল করছিল। দারুণ ভীতিকর জায়গায় পরিণত হয়ে ওঠা পাহলভী রাষ্ট্রে তারা আর নিরাপদ বোধ করছিল না।

    কেবল স্বৈরাচারী শাসন ও সকল বিরোধিতাকে স্তব্ধ করে সংস্কারকে এগিয়ে নিতে পারবেন ভেবে মজলিসকে নিষিদ্ধ করে শ্বেত বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন শাহ। ১৯৫৭ সালে আমেরিকার সিআইএ ও ইসরায়েলি মোসাদের সহযোগিতায় তৈরি গোপন পুলিস সাভাক সহায়তা দেয় তাঁকে। সাভাকের নিষ্ঠুর কায়দা, অত্যাচার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজত্ব জনগণের মনে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগসাজশে নিজ দেশে কারাবন্দি থাকার ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছিল।৩৬ ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে এই সময়ে উন্নয়নশীল দেশে আবির্ভূত হতে চলা গেরিলা গ্রুপের আদলে দুটি প্যারামিলিটারি দল গঠন করা হয়েছিল: বর্তমানে নিষিদ্ধ তুদেহ ও ন্যাশনাল ফ্রন্ট পার্টির সদস্যদের নিয়ে গঠিত মার্ক্সবাদী গ্রুপ ফেদাইন-ই খালক ও ইসলামি বাহিনী মুজাহিদিন-ই খালক। শক্তিকেই সকল স্বাভাবিক বিরোধিতার পথ রুদ্ধকারী সম্মতি নয় বরং নির্যাতনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একমাত্র উপায় মনে করা হয়েছে।

    বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন ধারণার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রয়াস পেয়েছেন। দেশের অস্থিরতার কারণে অস্বস্তিতে ছিলেন তাঁরা, বুঝতে পারছিলেন যে আধুনিকায়ন মাত্রাতিরিক্ত দ্রুত গতিতে চলায় ব্যাপকবিস্তৃত বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে। ১৯৬০-র দশকের শেষের দিকে ইউনিভার্সিটি অভ তেহরানের প্রফেসর পদে উন্নীত অসাধারণ মেধাবী দার্শনিক আহমাদ ফরিদ (১৯১২-৯৪) ইরানি টানপোড়েনকে বোঝাতে গার্বজাদেগি (‘পাশ্চাত্য আসক্তি’) শব্দটি তৈরি করেন: মানুষ পশ্চিমের কারণে বিষে আক্রান্ত ও দূষিত হয়েছে; তাদের অবশ্যই একটা ভিন্ন পরিচয় গড়ে তুলতে হবে।৭ সেক্যুলারিস্ট ও এককালের সমাতন্ত্রী জালাল আল-ই আহমাদ (১৯২৩-৬৯) এই ধারণাটি আরও বিস্তৃত করেন, তাঁর গার্বজাদেগি (১৯৬২) ১৯৬০-র দশকে ইরানিদের কাছে একটি কাল্ট গ্রন্থে পরিণত হয়েছিল। এই ‘শেকড়হীনতা’ ও ‘অক্সিডেন্টোসিস’ এক রকম ‘উপযুক্ত পরিবেশে বিস্তার ঘটা বাইরের রোগ। ‘কোনও রকম সমর্থক ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক পটভূমিহীন, পরিবর্তনের কোনও রকম উপাদান বিহীন’ এক জাতির দুঃখ।৩৮ এই মহামারী ইরানের অখণ্ডতাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারে, এর রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বিনাশ ঘটাতে পারে, ধ্বংস করে দিতে পারে অর্থনীতিকে। কিন্তু আল-ই আহমাদ নিজেই টানাপোড়েনে ভুগছিলেন: সার্ত্র এবং হেইদেগারের মতো পাশ্চাত্য লেখকদের রচনায় আকৃষ্ট ছিলেন তিনি, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মতো পাশ্চাত্য আদর্শের আকর্ষণ বোধ করেছেন; কিন্তু ইরানের অচেনা ভূমিতে কেমন করে তাকে রোপন করা যাবে সেটা বুঝতে পারেননি। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত দুই দিকে আকর্ষণবোধকারী ইরানিদের যাকে বলে ‘অ্যাগোনাইজড সিযোফ্রেনিয়া’ তুলে ধরেছেন৩৯ এবং সমস্যাটাকে স্মরণীয়ভাবে প্রকাশ করতে পারলেও কোনও সমাধান প্রস্তাব করতে পারেননি-যদিও মনে হয় যে, জীবনের শেষদিকে তিনি শিয়াবাদকে প্রকৃত জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি ও পাশ্চাত্যকরণের রোগের উপশমসুলভ বিকল্পে পরিণত হতে পারার মতো প্রকৃত ইরানি প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে শুরু করেছিলেন। ৪০

    ইরানি উলেমাগণ মিশরিয় যাজকদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলেন। অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে সাধারণ জনগণকে সমর্থন দিতে হলে নিজেদের ও তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহকেও আধুনিকায়তি করতে হবে। মৌলিক শিয়া নীতিমালাকে আহত করে চলা শাহর স্বৈরাচরী শাসন এবং ধর্মের প্রতি স্পষ্ট নিরাসক্ততায় ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিলেন তাঁরা। ১৯৬০ সালে যাজকদের যেকোনও রকম রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণাকারী প্রধান মারজা আয়াতোল্লাহ বোরুজারদি শাহর ভূমি সংস্কার আইনের নিন্দা জানাতে এগিয়ে আসেন। তাঁর এই ইস্যু হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপারটা ছিল দুঃখজনক, কারণ উলেমাদের তা স্বার্থপর ও প্রতিক্রিয়াশীল হিসাবে তুলে ধরেছিল, যাদের অনেকেই ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। আসলে বোরুজারদির হস্তক্ষেপ সম্ভবত এটাই কীলকের সংকীর্ণ ডগা হয়ে থাকার এই সহজাত ভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল। ভূমি সংস্কার মালিকানার শরীয়াহ বিধানের পরিপন্থী ছিল, বোরুজারদি হয়তো কোনও একটি ক্ষেত্রে জনগণকে ইসলামি আইনে প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ব্যাপারটি অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে এবং তা আরও খারাপ হয়ে উঠতে পারে ভেবে ভয় পেয়েছিলেন। পরের বছর মার্চে বোরুজারদি মারা যাবার পর মারজা’র পদ আর পূরণ করা হয়নি। উলেমাদের একটি গ্রুপ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন যে, শিয়া মতবাদকে আরও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে হবে, জটিল নতুন বিশ্বে একজন মাত্র ব্যক্তির পরম নির্দেশকে পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা বাস্তব সম্মত নয়। প্রত্যেকের নিজস্ব বিশেষত্ব সম্পন্ন কয়েকজন মারাজিকে নিয়ে নতুন নেতৃত্ব হতে পারে। স্পষ্টই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া ছিল এটা, ইসলামি বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখা বেশ কয়েক জন যাজক সংস্কারবাদী উলেমাদের এই দলে ছিলেন: আয়াতোল্লাহ সায়ীদ মুহাম্মদ বিহিশতি; বিজ্ঞ ধর্মবেত্তা মোতা মোতাহারি; আল্লামাহ মুহাম্মদ-হুসেইন তাবাতাবাতি; এবং সবচেয়ে রেডিক্যাল ইরানি যাজক আয়াতোল্লাহ মাহমুদ তালেকানি। ১৯৬০ সালে বসন্তে বেশ কিছু বক্তৃতা অনুষ্ঠান করেন তাঁরা, এবং পরের বছর শিয়া মতবাদকে হালনাগাদ করার বিষয়ে বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা করা একটি প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ করেন।

    একটা বিষয়ে সংস্কারকগণ নিশ্চিত ছিলেন যে, ইসলামে যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, তাই উলেমাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার বেলায় এতটা সতর্ক থাকা উচিত নয়। যাজকীয় শাসন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেননি তাঁরা, তবে রাষ্ট্র স্বৈরাচরী বা জনগণের চাহিদার প্রতি নির্বিকার হয়ে উঠছে অনুভব করার পর বিশ্বাস করেছেন যে, ঠিক তামাক সংকট ও সাংবিধানিক বিপ্লবের সময় যেমন করেছিলেন, শাহদের বিরুদ্ধে ঠিক সেভাবে উলেমাদের রুখে দাঁড়ানো উচিত। ফিকহ’র উপর অতিরিক্ত মনোযোগ হ্রাস করার জন্যে মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমকে পর্যালোচনা করে নতুন করে সাজানোর যুক্তি দেখিয়েছেন তাঁরা। যাজকদের তাদের আর্থিক ব্যবস্থাকেও যৌক্তিক করতে হবে: বর্তমানে স্বেচ্ছা দানের উপর বেশি নির্ভরশীল তাঁরা, লোকজন যেহেতু রক্ষণশীল মানসিকতার, তাই এটা তাদের মৌলিক পরিবর্তন থেকে দূরে রেখেছে। ইজতিহাদের গুরুত্বের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সত্যিই জনগণের সেবা করতে চাইলে শিয়াদের অবশ্যই ব্যবসা, কূটনীতি ও যুদ্ধের মতো আধুনিক বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। সবার উপরে ছাত্রদের কথা শুনতে হবে। ১৯৬০-র দশকের তরুণ সমাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত, এরা পুরোনো প্রপাগান্ডা হজম করবে না। ধর্ম থেকে এদের দূরে সরে যাওয়ার কারণ তাদের সামনে তুলে ধরা শিয়াবাদের রূপ প্রাণহীন, প্রাচীন ধরনের। পশ্চিমে তরুণ সংস্কৃতি পুরোপুরিভাবে বিকশিত হওয়ার আগেই ইরানি যাজক সমাজ তরুণদের সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের সংস্কার আন্দোলনে মুষ্টিমেয় কয়েকজন উলেমা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; সাধারণ জনগণের কাছে তা পৌছেনি, শাসকেদের সমালোচনা করার কোনও প্রয়াস পাননি তাঁরা। কেবলই শিয়াদের অভ্যন্তরীণ বিষয়-আশয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু ধর্মীয় বলয়ে প্রচুর আলোচনার জন্ম দিয়েছে ও যাজকগোষ্ঠীর সিংহভাগকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে গেছে।৪২ কিন্তু সহসা এপর্যন্ত অলক্ষ্যে থাকা একজন যাজক পত্রিকার শিরোনাম কেড়ে নিলে উলেমাগণ বিস্মিত হয়ে পড়েন, আরও রেডিক্যাল অবস্থানে চলে যান তাঁরা।

    ১৯৬০-র দশক নাগাদ ক্রমেই অধিক সংখ্যায় ছাত্ররা কুমের ফায়যিয়াহ মাদ্রাসায় আয়াতোল্লাহ খোমিনির ইসলামি নৈতিকতার উপর শিক্ষাক্রমের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল। কথিত আছে, ক্লাস চলার সময় তিনি পুলপিট ছেড়ে নেমে এসে, ‘অফ দ্য রেকর্ড’ ছাত্রদের সাথে মেঝেয় বসে প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করতেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে অকস্মাৎ এই আড়াল ছেড়ে বের হয়ে পুলপিট থেকেই স্বীয় ক্ষমতাবলে শাহর বিরুদ্ধে অবিরাম প্রত্যক্ষ আক্রমণ শুরু করেন, তাঁকে ইসলামের শত্রু হিসাবে চিত্রায়িত করেন। যখন শাসকের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার মতো সাহস ছিল না কারও, শাহর শাসনের নিষ্ঠুরতা ও অবিচার, তাঁর অসাংবিধানিকভাবে মজলিস ভেঙে দেওয়া, নির্যাতন, সকল বিরোধী দলের অপ নিষিদ্ধকরণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শাহর ভীরু আত্মসমর্পণ এবং প্যালেস্তাইনিদের আবাস থেকে বঞ্চিতকারী ইসরায়েলের প্রতি তাঁর সমর্থনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন খোমেনি। বিশেষ করে গরীবের অসহায় অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি: শাহর উচিত তাঁর চোখ ধাঁধানো প্রাসাদ থেকে বের হয়ে দক্ষিণ তেহরানের বস্তি এলাকায় একবার ঘুরে আসা। একবার নাকি এক হাতে কোরানের একটি কপি ও অন্য হাতে ১৯০৬ সালের সংবিধানের কপি নিয়ে এগুলো রক্ষার জন্যে নেওয়া তার নেওয়া শপথ ভঙ্গ করার অভিযোগ তোলেন তিনি। ২২শে মার্চ, ১৯৬৩ ষষ্ঠ ইমামের (যাঁকে ৭৬৫ সালে খলিফা আল-মনসুর বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিলেন) শাহাদৎ বার্ষিকীতে সাভাক বাহিনী মাদ্রাসা ঘেরাও করে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রকে হত্যা করে। খোমেনিকে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয় পদক্ষেপ নেওয়ার বেলায় শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে আনাড়ী ও আত্মধ্বংসী দিন ছিল এটা। খোমেনির সাথে দীর্ঘ সংগ্রামে অবিরাম শাহ যেন স্বাভাবের বাইরে গিয়ে নিজেকে স্বৈারচারী শাসক ও ইমামদের শত্রু হিসাবে তুলে ধরেছেন।

    কেন মুখ খোলার জন্যে এই মুহূর্তটিকে বেছে নিয়েছিলেন খোমেনি? সারা জীবন মোল্লা সদ্রার তালিম দেওয়া ইরফানের অতীন্দ্রিয়বাদী অনুশীলন চর্চা করেছেন তিনি। সদ্রার মতো খোমেনির কাছেও অতীন্দ্রিয়বাদ ও রাজনীতি অবিচ্ছেদ্য ছিল। আধ্যাত্মিক সংস্কারের সাথে পরিচালিত না হলে সমাজের কোনও রকম সামাজিক সংস্কার হতে পারে না। পরলোকগমনের আগে ইরানের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর শেষ ভাষণে খোমেনি ইরফানের পাঠ ও তার চর্চা চালিয়ে যাবার আবেদন রেখেছেন, উলেমাগণ এই অনুশীলনটিকে অবহেলা করে এসেছেন। খোমেনির চোখ মিথোসের সাথে সম্পর্কিত অতীন্দ্রিয়বাদী অনুসন্ধানকে অবশ্যই লোগোসের বাস্তব কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। খোমেনির সাথে যারা সাক্ষাৎ করেছেন তারা সব সময়ই আধ্যাত্মিকতায় তাঁর স্পষ্ট মগ্নতায় বিস্মিত হয়েছেন। তাঁর উদাস মনোভোব, অন্তর্মুখী দৃষ্টি ও ভাষণের ইচ্ছাকৃত একঘেয়েমি (পশ্চিমারা যাকে বিতৃষ্ণ মনে করেছে) শিয়াদের কাছে অনায়াসে ‘সোবার’ অতীন্দ্রিয়বাদীর লক্ষণ মনে হয়েছে। অন্তস্থঃ যাত্রা কালে প্রায়শঃই উন্মুক্ত হওয়া আবেগীয় চরম অবস্থার কাছে নতি স্বীকার করে ‘মাতাল’ সুফি ও অতীন্দ্রিয়বাদীদের বিপরীতে ‘সোবার’ অতীন্দ্রিয়বাদীগণ বাড়াবাড়িকে দূরে ঠেলে রাখার জন্যে ইস্পাত কঠিন আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা করেন। মোল্লা সদ্রা উম্মাহর নেতার (ইমাম) আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়েছেন। রাজনৈতিক মিশন শুরুর আগে তাকে অবশ্যই মানুষ থেকে আল্লাহর উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে, নিজেকে আল্লাহর পরিবর্তনকারী দর্শনের কাছে উন্মুক্ত করতে হবে, এবং নিজেকে আত্মউপলব্ধির পথে বাধা অহমকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। কেবল এই দীর্ঘ ও শৃঙ্খলিত যাত্রার শেষেই তিনি, যেমন বলা হয়েছে, জাগতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে এসে আল্লাহ’র বাণী প্রচার করতে এবং সমাজে স্বর্গীয় বাণীর বাস্তবায়ন ঘটাতে পারবেন। আমেরিকান পণ্ডিত হামিদ আলগার বলছেন, ১৯৬৩ সালে শাহর বিরুদ্ধ বক্তব্য রাখতে শুরু করার সময় প্রাথমিক ও আবশ্যক ‘আল্লাহর অভিমুখে যাত্রা’ শেষ করেছিলেন খোমেনি।৪৪

    কয়েকদিন কারাগারে আটক রাখার পর খোমেনিকে মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু সাথে সাথে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি। ফায়যিয়াহ মাদ্রাসায় সাভাকের আক্রমণের চল্লিশ দিন পরে ছাত্ররা নিহতদের স্মরণে ঐতিহ্যবাহী শোক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এখানে দেওয়া ভাষণে খোমেনি এই আক্রমণকে ১৯৩৫ সালে মাশাদের উপাসনালয়ে রেযা শাহর পরিচালিত আক্রমণের সাথে তুলনা করেন, তখন শত শত বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছিল। গোটা গ্রীষ্মকাল জুড়ে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে থাকেন তিনি। শেষে কারবালায় ইমাম হুসেইনের শাহাদৎ বার্ষিকী আশুরার উৎসবে (৩রা জুন, ১৯৬৩) একটি শোকগাথা পাঠ করেন খোমেনি, রওদাহয় এই সময় প্রথা অনুযায়ী জনগণ কান্নাকাটি করছিল। খোমেনি দাবি করেন, শাহ হচ্ছেন কারবালার খলনায়ক ইয়াযিদের মতো। গত মার্চে ফায়যিয়াহ মাদ্রাসায় আক্রমণ চালানোর সময় পুলিস কেন কোরান ছিঁড়ে ফেলল? তারা কেবল উলেমাকে গ্রেপ্তার করতে চেয়ে থাকলে কেন তবে মাত্র আঠার বছরের এক ছাত্রকে হত্যা করতে গেল, যে কিনা কোনওদিন শাসকদের বিরুদ্ধে কিছু করেনি? উত্তর হচ্ছে শাহ খোদ ধর্মকেই ধ্বংস করতে চান। তাঁর প্রতি সংস্কারের আবেদন জানান তিনি:

    আমাদের দেশ, আমাদের ইসলাম বিপদাপন্ন। যেসব ঘটনা ঘটছে, ঘটতে যাচ্ছে, আমাদের তা উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ণ করে তুলছে। আমরা আমাদের এই বিধ্বস্ত দেশের অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ন। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যাতে একে সংস্কার করা যায়।৪৫

    পরদিন সকালে আবার গ্রেপ্তার হন খোমেনি। এবার ঘটে বিস্ফোরণ। খবর শোনামাত্র হাজার হাজার ইরানি তেহরান, মাশাদ, শিরাজ, কাশান ও ভারামিনে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় সাভাক বাহিনীকে; তেহরানের জনগণকে শুক্রবারের জুম্মার নামাজ পড়া থেকে বিরত রাখতে ট্যাংক দিয়ে মসজিদ ঘেরাও করে ফেলা হয়। তেহরান, কুম আর শিরাজে নেতৃস্থানীয় উলেমাগণ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। অন্যরা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জিহাদের আহবান জানান। কেউ কেউ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকার প্রমাণ দিতে কাফনের শাদা কাপড় পরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্র, আর মোল্লাহ ও সাধারণ জনগণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে। তলে তলে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা বিশাল টানাপোড়েন ও অসন্তোষ তুলে ধরা এই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েকদিন সময় লাগে সাভাকের। ১১ই জুন অবশেষে যখন শৃঙ্খলা ফিরে আসে, শত শত ইরানি প্রাণ হারিয়েছিল।৪৬

    স্বয়ং খোমেনি অল্পের জন্যে বেঁচে গিয়েছিলেন। অন্যতম প্রবীন মুজতাহিদ আয়াতোল্লাহ মুহাম্মদ কাযিম শরিয়তমাদারি (১৯০৪-৮৫) গ্র্যান্ড আয়াতোল্লাহ পদে উন্নীত করে খোমেনিকে রক্ষা করেছিলেন, ফলে তাঁকে হত্যা করা শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।৪৭ মুক্তির পর খোমেনি জনগণের কাছে নায়কে পরিণত হন। বিরোধিতার প্রতীক হিসাবে সর্বত্র তাঁর ছবি আবির্ভূত হয়। নিজেকে সঠিক স্থানে স্থাপন করে শাহর প্রতি আরও বহু ইরানির মনের অপ্রকাশিত বিতৃষ্ণাকে ভাষা দিয়েছিলেন তিনি। খোমেনির দর্শন সাধারণ মৌলবাদী বিকৃতিতে ভ্রান্তিময়। তিনি তাঁর ভাষণে অবিরাম ইহুদি, ক্রিশ্চান ও সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে গেছেন, সাভাকের সাথে সিআইএ ও মোসাদের সংশ্লিষ্টতার কারণে বহু ইরানি একে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছে। এটা ছিল ক্ষোভের ধর্মতত্ত্ব।৪৮ তবে খোমেনি ইরানিদের বোধগম্য ভাষায় বৈধ অসন্তোষ প্রকাশে সক্ষম করে তুলেছিলেন। মার্ক্সবাদী বা উদারনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত সমালোচকরা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অনাধুনিকায়িত ইরানিদের বাদ দিতেন, সেখানে প্রত্যেকে কারাবালার প্রতীকীবাদ বুঝতে পেরেছিল। অন্য আয়াতোল্লাহদের বিপরীতে খোমেনি দূরবর্তী, কেতাবি ঢঙে কথা বলেননি; তাঁর ভাষণ ছিল প্রত্যক্ষ, মাটি ঘেঁষা, সাধারণ মানুষের উদ্দেশে দেওয়া। পশ্চিমা জনগণ খোমেনিকে মধ্যযুগে প্রত্যাবর্তনকারী মনে করে, কিন্তু আসলে তাঁর অধিকাংশ বার্তা ও বিকাশমান ধর্মতত্ত্বই ছিল আধুনিক। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও প্যালেস্তাইনিদের প্রতি সমর্থন এই সময় অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের আন্দোলনের অনুরূপ; জনগণের কাছে তাঁর সরাসরি আবেদনও তাই।

    শেষ পর্যন্ত অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিলেন খোমেনি। ২৭শে অক্টোবর, ১৯৬৪ আমেরিকান সামরিক সদস্য ও অন্যান্য উপদেষ্টাকে দেওয়া সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ইম্যুনিটি ও অস্ত্র ক্রয়ের জন্যে শাহর ২০০ মিলিয়ন ডলার গ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোর আক্রমণ সূচিত করেন। তিনি দাবি করেন, ইরান কার্যত আমেরিকার উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। অন্য কোনও দেশ কি এমনি অসম্মান মেনে নিত? ইরানে সংঘটিত মারাত্মক অপরাধের জন্যে একজন আমেরিকান পরিচারিকা বিনা শাস্তিতে পার পেয়ে যাবে, অথচ একজন আমেরিকানের কুকুরকে মাড়িয়ে যাওয়ার দোষে ইরানিকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তিনি উপসংহার টানেন:

    ইরানি জনগণের পক্ষে আর কোনও নিরাময় নেই। আগামী শীতে দরিদ্র জনসাধারণের কী হবে ভেবে আমি উদ্বিগ্ন, আমার ধারণা, আল্লাহ না করুন, অনেকেই শীত ও অনাহারে প্রাণ হারাবে। মানুষের উচিত গরীবের কথা ভাবা, গত শীতের নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর পদক্ষেপ নেওয়া। উলেমাদের এই লক্ষ্যে চাঁদা চাইতে হবে।৪৯

    এই ভাষণের পর খোমেনিকে দেশান্তরী করা হয়, শেষ পর্যন্ত পবিত্র শিয়া নগরী নাজাফে অবস্থান নেন তিনি।

    কাসকগোষ্ঠী এবার যাজকদের বাকরুদ্ধ করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। খোমেনির বিদায়ের পর সরকার ধর্মীয়ভাবে দান করা সম্পত্তি (ওয়াকফ) বাজেয়াপ্ত করা শুরু করে ও মাদ্রাসাসমূহকে কঠোর আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এর ফলে ১৯৬০-র দশকের শেষের দিকে ধর্মতাত্ত্বিক ছাত্রের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল।° ১৯৭০ সালে আয়াতোল্লাহ রিযা সায়দিকে ইরানে আমেরিকান বিনিয়োগ বৃদ্ধির পক্ষে আয়োজিত এক সম্মেলনের বিরোধিতা ও শাসকগোষ্ঠীকে ‘সাম্রাজ্যবাদের স্বৈরাচারী চর’ হিসাবে নিন্দা করার দায়ে নিপীড়ন করে হত্যা করা হয়। কুমে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসে, এদিকে তেহরানে আয়াতোল্লাহ সায়দির মসজিদের সামনে আয়াতোল্লাহ তালেকানির ভাষণ শোনার জন্যে এক বিরাট জনতা সমবেত হয়।৫১ একই সময়ে সরকার রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত এক ধরনের ‘সরকারী ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায়: গ্রামাঞ্চলে ডিপার্টমেন্ট অভ রিলিজিয়াস প্রপাগান্ডা ডিপার্টমেন্টের সাথে নিবিড় সহযোগিতায় কাজ করার জন্যে সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতাত্ত্বিক অনুষদ থেকে পাস করা সাধারণ স্নাতকদের নিয়ে একটি ধর্মীয় বাহিনী গঠন করা হয়। ‘আধুনিকায়নের এই মোল্লাহদের সাধারণ কৃষকদের কাছে শ্বেত বিপ্লবের ব্যাখ্যা করতে হত, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, সেতু ও জলাধার নির্মাণ, গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধক টিকা দানের কাজ করতে হত। ঐতিহ্যবাহী উলেমাদের খাট করার পরিষ্কার প্রয়াস ছিল এটা।৫২ কিন্তু ইরান ও শিয়াহ মতবাদের সম্পর্কচ্ছেদের জন্যে শাহ যাপরনাই উদগ্রীব ছিলেন। ১৯৭০ সালে ইসলামি ক্যালেন্ডার বাতিল করে দেন তিনি, পরের বছর প্রাচীন ইরানি রাজন্ত্রের ২৫০০ তম বার্ষিকী স্মরণে পারসেপোলিসে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটা কেবল ইরানে ধনী ও দরিদ্রদের ভেতর বিশাল ফারাকের অশ্লীল প্রদর্শনীই ছিল না, বরং ইসলামের প্রাক ইসলামি ঐতিহ্যের মাঝে শাসকগোষ্ঠীর ইরানের আত্মপরিচয় খোঁজার ইচ্ছা সম্পর্কে জনগণের মনে প্রবল ধারণা জেগেছিল।

    ইরানিরা ইসলামকে হারিয়ে ফেললে, নিজেদেরই হারাবে তারা। এটাই ছিল ক্যারিশম্যাটিক তরুণ দার্শনিক ডক্টর আলি শরিয়তির (১৯৩৩-৭৭) বার্তা, ১৯৬০- র দশকের শেষের দিকে যাঁর লেকচার হলে পাশ্চাত্য শিক্ষিত তরুণরা ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ভীড় জমাতো।৫৩ শরিয়তির প্রচলিত মাদ্রাসার শিক্ষা ছিল না, বরং ইউনিভার্সিটি অভ মাশাদ ও সরবোর্নে পড়াশোনা করেছেন তিনি, সেখানে পারসিয় দর্শনের উপর অভিসন্দর্ভ লিখেছেন ও ফরাসি অরিয়েন্টালিস্ট লুই মাসির্গ, অস্তি ত্ববাদী দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র ও তৃতীয় বিশ্ব আদর্শবাদী ফ্রান্য ফানোর রচনা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, আধুনিক ইরানিদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না করেই তাদের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটানোর মতো একটি ভিন্ন শিয়া আদর্শ গড়ে তোলা সম্ভব। ইরানে ফিরে শেষ পর্যন্ত উত্তর তেহরানের ১৯৬৫ সালে দানবীর মুহাম্মদ হুমায়ুন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষালয় হুসাইনিয়াহতে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নেন শরিয়তি। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে সংস্কারবাদী উলেমাদের ভাষণে আলোড়িত হয়ে ইরানি তরুণ সমাজের কাছাকাছি পৌঁছতে হুসাইনিয়াহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হুমায়ুন। ইরানে হুসাইনিয়াহ ছিল ইমাম হুসেইনের প্রতি নিবেদনের একটি কেন্দ্র; সাধারণত মসজিদের পাশে নির্মাণ করা হত এগুলো। কারবালার কাহিনী হুসাইনিয়াহতে পড়তে আসা ছাত্রদের উন্নত সমাজের জন্যে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে, এমন আশা করা হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের অব্যবহিত পরে মধ্যপ্রাচ্যে আবির্ভূত ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল ইরান। ১৯৬৮ সাল নাগাদ এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সহায়তাকারী অন্যতম সংস্কারক আয়াতোল্লাহ মোতাহারি লিখতে পেরেছিলেন যে, হুসাইনিয়াহকে ধন্যবাদ, ‘আমাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজ বিস্ময়ের একটি পর্ব অতিক্রম করার পর, এমনকি [ধর্মের] দ্বারা বিতৃষ্ণ হয়েও এখন মনোযোগ দিচ্ছে এবং একে অগ্রাহ্যকারীর বেলায় উদ্বেগ দেখাচ্ছে।’৫৪ আর কোনও বাগ্মী শরিয়তির মতো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেননি। ছাত্ররা দুপুরের খাবার সময় বা কাজের পর তাঁর ভাষণ শোনার জন্যে ছুটে যেত, তাঁর বাগ্মীতার আবেগ ও প্রাবল্যে অনুপ্রাণিত ছিল তারা। তাঁর সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারত তারা, অনেকে তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো মনে করেছে।৫৫

    শরিয়তি ছিলেন সৃজনশীল বুদ্ধিজীবী, আবার আধ্যাত্মিক মানুষও। তাঁর জীবনে পয়গম্বর ও ইমামগণ ছিলেন বাস্তব সত্তা। তাঁদের প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল পরিষ্কার। শিয়া ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ স্রেফ সপ্তম শতাব্দীর ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা ছিল না, বরং এক সময়হীন বাস্তবতা যা বর্তমানের মানুষকে অনুপ্রাণিত ও পথ দেখাতে পারে। গোপন ইমাম, তিনি ব্যাখ্যা করতেন, জেসাসের মতো উধাও হয়ে যাননি। এখনও এই জগতেই আছেন তিনি, কিন্তু অদৃশ্যে; শিয়ারা কোনও বণিক বা ভিখিরির মাঝে তাঁর দেখা পেয়ে যেতে পারে। আত্মপ্রকাশের জন্যে অপেক্ষা করে আছেন তিনি, শিয়াদের অবশ্যই তাঁর কাড়ানাকাড়ার আওয়াজ শুনতে সব সময় প্রস্তুত অবস্থায় জীবন যাপন করতে হবে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান শোনার জন্যে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। গোপন সত্তা (যাত)-এর আভাস পাওয়ার জন্যে শিয়াদের অবশ্যই প্রাত্যহিক জীবনে তাদের ঘিরে রাখা বাস্তবতার নিরেট হতবৃদ্ধিকর বাস্তবতা ভেদ করে দেখতে হবে।৫৬ আধ্যাত্মিকতা যেহেতু ভিন্ন কোনও বলয় নয়, সুতরাং শাসকগোষ্ঠী যেভাবে প্রয়াস পাচ্ছে সেভাবে ধর্ম থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। মানুষ দুই মাত্রার প্রাণী; তাদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক অস্তিত্ব উভয়ই রয়েছে। তাদের লেগোসের মতোই মিথোসের প্রয়োজন, এবং সব রাজনীতিরই একটি দুর্ভেয় মাত্রা থাকা উচিত। এটাই ইমামতের মতবাদের আসল অর্থ: জনগণকে একাধারে তাদের আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়তা যোগাতে সমাজ একজন ইমাম, স্বর্গীয় নির্দেশক ছাড়া টিকে থাকতে পারে না, এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে একটা প্রতীকী স্মারক ছিল। ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করার মানে মুসলিমকে স্বর্গীয় একত্বে প্রতিপলিত অখণ্ডতা অর্জনে সাহায্যকারী ইসলামের মৌল বিশ্বাস তাওহিদের (‘ঐকবদ্ধকরণ’) নীতির সাথে বেঈমানি।৫৭

    তাওহিদ পাশ্চাত্য-আসক্ত ইরানিদের বিচ্ছিন্নতারও উপশম ঘটাবে। শরিয়তি বাজগাশত বেহ খিশতান—‘নিজের কাছে প্রত্যাবর্তন’-এর উপর জোর দিয়েছেন। গ্রিক চেতনা যেখানে দর্শন দিয়ে বৈশিষ্ট্যায়িত হয়েছে, রোমানি চেতনা শিল্প ও সামরবিদ্যায়, ইরানের আদিআদর্শ সত্তা ধর্মীয় ও ইসলামি। পশ্চিমের যৌক্তিক প্রায়োগিক বিজ্ঞান যেখানে অস্তিত্ববানের উপর দৃষ্টি দেয়, অরিয়েন্ট সেখানে আসন্ন সত্যিও সন্ধান করে। ইরানিরা বেশি নিবিড়ভাবে পশ্চিমা আদর্শ অনুসরণ করলে পরিচয় হারিয়ে ফেলবে এবং নিজেদের জাতিগত নিশ্চিহ্নতাতেই সহযোগিতা করবে।৫৮ শাহর মতো প্রাচীন পারসিয় সংস্কৃতিতে মাহাত্ম্য খোঁজার বদলে তাদের শিয়া ঐতিহ্যকে উদযাপন করা উচিত। কিন্তু এটা লোক দেখানো বা একেবারেই ধারণাগত প্রক্রিয়া হতে পারবে না। অসাধারণ সুন্দর মনোগ্রাফ হাজ্জ-এ শরিয়তি নিখুঁতভাবে রক্ষণশীল চেতনা মূর্ত করে তোলা কাবাহ ও মক্কায় তীর্থযাত্রার সাথে প্রাচীন কাল্টের পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে সেগুলো আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে মুসলিমদের কাছে পৌঁছতে পারে। শরিয়তির গ্রন্থে তীর্থযাত্রা আল্লাহ’র পথে অভিযাত্রায় পরিণত হয়েছে, মোল্লা সদ্রার বর্ণিত চার ধাপের অন্তস্থঃ যাত্রার সাথে এর খুব পার্থক্য নেই। সবার অতীন্দ্রিয়ার ক্ষমতা নেই, এর জন্যে বিশেষ মেধা ও মেজাজ প্রয়োজন, কিন্তু হজ্জের আচারগুলো সকল মুসলিম নারী-পুরুষের বোধগম্য। তীর্থযাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ-অধিকাংশ মুসলিমের পক্ষে জীবনের একমাত্র অভিজ্ঞতা—এক নতুন পরিচয় তুলে ধরে। তীর্থযাত্রীকে অবশ্যই বিভ্রান্ত ও বিচ্ছিন্ন সত্তাকে পেছনে ফেলে যেতে হবে। কাবাহকে ঘিরে সাতবার প্রদক্ষিণ করার সময় বিশাল ভীড়ের প্রচণ্ড চাপ, ব্যাখ্যা করেছেন শরিয়তি, তীর্থযাত্রীর মনে ‘ছোট জলধারার বিরাট কোনও নদীর সাথে মিলিত হওয়ার’ কথা মনে করিয়ে দেয়:

    মানুষের ভিড় আপনার উপর এমন চাপ সৃষ্টি করে যে আপনি নতুন জীবন লাভ করেন। এখন আপনি জনতার একটা অংশ; একজন মানুষ, জীবিত ও চিরন্তন…আল্লাহকে ঘিরে প্রদক্ষিণের সময় আপনি অচিরেই নিজেকে ভুলে যাবেন।৫৯

    উম্মাহর সাথে এই ঐক্যে অহমবাদ অতিক্রম করা হয়েছে এবং এক নতুন ‘কেন্দ্র’ অর্জিত হয়েছে। আরাফাতের ময়দানে রাত্রি জাগরণের সময় তীর্থযাত্রীরা স্বর্গীয় জ্ঞানের আলোর কাছে নিজেদের উন্মুক্ত করেছে এবং এবার তাদের অবশ্যই আল্লাহর শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে জগতে প্রবেশ করতে হবে (মিনার তিনটি স্তম্ভ লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ার আচারের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা এক জিহাদ)। এরপর হাজ্জি প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে পবিত্র দায়িত্ব ন্যায় ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্যে সংগ্রামের সাথে অবিচ্ছেদ্য এই আধ্যাত্মিক সচেতনতা নিয়ে জাগতে ফিরে আসতে প্রস্তুত হয়। এতে অন্তর্ভুক্ত যৌক্তিক প্রয়াস কাল্ট ও মিথে অনুপ্রাণিত আধ্যাত্মিকতার প্রদত্ত অর্থের উপর নির্ভর করে।

    শরিয়তির চোখে ইসলামকে অবশ্যই কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। সত্তার মূলে শিয়ারা যে সময়হীন বাস্তবতা দেখতে শিখেছে সেটাকে বর্তমানে সক্রিয় করে তুলতে হবে। কারবালায় ইমাম হুসেইনের উদাহরণ, শরিয়তি বিশ্বাস করতেন, সারা বিশ্বের সকল নির্যাতিত ও বিচ্ছিন্ন মানুষের পক্ষে অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত। শরিয়তি নিজেদের মাদ্রসায় বন্দি করে রাখা ও তাঁর দৃষ্টিতে ইসলামকে স্রেফ ব্যক্তিগত ক্রিডে পরিণত করে বিকৃতকারী শান্তিবাদী উলেমাদের প্রতি বিরক্ত ছিলেন। অকাল্টেশনের কাল নিষ্ক্রিয়তার কাল হতে পারে না। শিয়ারা হুসেইনের নজীর অনুসরণ করে তৃতীয় বিশ্বের জনগণকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারলে গোপন ইমামকে আত্মপ্রকাশে বাধ্য করতে পারত। কিন্তু উলেমাগণ তরুণ ইরানিদের জন্যে ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন, তাদের বিচ্যুতিতে একঘেয়েমিতে ফেলেছেন আর পশ্চিমের হাতে তুলে দিয়েছেন তাদের। ইসলামকে তারা একেবারেই আক্ষরিক অর্থে দেখে, অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মতো কিছু স্পষ্ট নির্দেশের বিন্যাস। অথচ আসলে প্রতীকীবাদই শিয়ামতবাদের বিশেষত্ব। মুসলিমদের তা পার্থিব বাস্তবতায় অদৃশ্যের ‘নিদর্শন’ দেখতে শিখিয়েছে।৬১ শিয়াদের প্রয়োজন সংস্কার। আলি ও হুসেইনের মূল শিয়াবাদ ইরানে শরিয়তির ভাষায় ‘সাফাভিয় শিয়াবাদের’ কারণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একটি সক্রিয় গতিশীল ধর্মকে ব্যক্তিগত, নিষ্ক্রিয় বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। অথচ গোপন ইমামের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পয়গম্বর ও ইমামদের ব্রত আসলে সাধারণ মানুষদের কাঁধে বর্তানোর কথা বুঝিয়েছিল। সুতরাং, অকাল্টেশনের কাল আসলে গণতন্ত্রের যুগ। সাধারণ মানুষকে আর মুজতাহিদদের কাছে বন্দি করে রাখা যাবে না, তাদের সাভাভীয় শিয়াবাদে আবশ্যক ধর্মীয় আচরণের অনুকরণে (তাকলিদ) বাধ্য করা যাবে না। প্রত্যেক মুসলিমকে অবশ্যই একাকী আল্লাহ’র কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং তার নিজস্ব জীবনের দায়িত্ব নিতে হবে। বাকি সবকিছু বহুঈশ্বরবাদীতা এবং ইসলামের বিকৃতি, একে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের প্রাণহীন অনুসরণে পরিণত করা। জনগণকেই তাদের নেতা নির্বাচিত করতে হবে; শুরার নীতিমালার দাবি অনুযায়ী অবশ্যই তাদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। ঐকমত্যের (ইজমাহ) ভেতর দিয়ে নেতাদের সিদ্ধান্তের বৈধতা দেবে তারা। যাজকীয় নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটাতে হবে। উলেমাদের বদলে ‘আলোকিত বুদ্ধিজীবীগণ’ (রওশানফেকরুন) দের হতে হবে উম্মাহর নতুন নেতা।৬২

    শরিয়তি সম্পূর্ণভাবে সাফাভিয় শিয়াবাদের উসুলি মতবাদের প্রতি পুরোপুরি ন্যায় আচরণ করেননি। বিশেষ প্রয়োজনের প্রতি সাড়া হিসাবে এগুলোর আবির্ভাব ঘটেছিল, সব সময়ই বিতর্কিত থাকলেও প্রাক আধুনিক যুগের আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরেছে সেগুলো, ব্যক্তিকে যেখানে বেশি স্বাধীনতা দান সম্ভব ছিল না। কিন্তু জগৎ বদলে গেছে। স্বায়ত্তশাসন ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার মতো পাশ্চাত্য আদর্শে প্রভাবিত ইরানিরা আর পূর্বপুরুষদের মতো মুজতাহিদদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিল না। সাধারণ মানুষকে তাদের সমাজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে ও স্থিতাবস্থার কাছে আত্মসমর্পণে সাহায্য করতে রক্ষণশীল আধ্যাত্মিকতা প্রণয়ন করা হয়েছিল। হুসেইনের মিথ শিয়াদের মাঝে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে আবেগকে জীবন্ত রেখেছে, কিন্তু তাঁর কাহিনী ও ইমামদের কাহিনী এও দেখায় যে রেডিক্যাল পরিবর্তনকে স্থান দিতে অক্ষম এক বিশ্বে স্বর্গীয় আইন বাস্তবায়ন কত কঠিন। ৬৪ কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এটা আর প্রয়োগযোগ্য ছিল না। ইরানিরা ভয়াবহ গতির পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করছিল; একইভাবে প্রাচীন আচার ও প্রতীকের প্রতি সাড়া দিতে পারছিল না তারা। শরিয়তি শিয়াবাদকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন যাতে তা গভীরভাবে পরিবর্তিত বিশ্বে শিয়াদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

    শরিয়তি জোরের সাথে বলেছেন, অন্য ধর্মবিশ্বাস থেকে ইসলাম ঢের বেশি গতিশীল। খোদ এর পরিভাষাই প্রগতিশীল ধাক্কা তুলে ধরে। পশ্চিমে ‘রাজনীতি’ শব্দটি নেওয়া হয়েছে স্থির প্রশাসনিক একক গ্রিক পোলিস (‘নগর’) থেকে, কিন্তু ইসলামি সমার্থক শব্দ সিয়াসাত, আক্ষরিকভাবে যার অর্থ ‘বুনো ঘোড়াকে বশ মানানো,’ অন্তস্থঃ সহজাত সম্পূর্ণতাকে বের করে আনার জোরাল সংগ্রামের কথা বোঝানো প্রক্রিয়া।৬৫ আরবী শব্দ উম্মাহ ও ইমাম, দুটিই এসেছে মূল শব্দ আমম (‘যাওয়ার সিদ্ধান্ত’) থেকে: সুতরাং ইমাম হচ্ছেন একজন আদর্শ যিনি মানুষকে নতুন দিকে নিয়ে যাবেন। সম্প্রদায় (উম্মাহ) কেবল কয়জন ব্যক্তির সমাবেশ নয়, বরং লক্ষ্যমুখী, চিরন্তন বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত।৬৬ ইজতিহাদের ধারণা (“স্বাধীন বিবেচনা’) নবায়ন ও পুননির্মাণের এক অবিরাম বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস বোঝায়; এটা, জোরের সাথে বলেছেন শরিয়তি, মুষ্টিমেয় উলেমার অধিকার নয়, বরং সকল মুসলিমের দায়িত্ব।৬৭ মুসলিম অভিজ্ঞতায় হিজরার (‘অভিবাসন’) কেন্দ্রিকতা পরিবর্তনের পক্ষে প্রস্তুতির কথা এবং মুসলিমকে অস্তিত্বের নতুনত্বের সাথে সম্পর্কিত রাখা উনুলতার কথা বোঝায়।৬৮ এমনকি ইন্তিযার (‘গোপন ইমামের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা’) পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতি চিরন্তন সচেতনতা ও স্থিতাবস্থার প্রত্যাখ্যান বোঝায়: ‘এটা মানুষের দায়িত্বকে তার নিজস্ব করে তোলে, সত্যির ধারা, মানুষের ধারা, ভারি, অবিলম্ব, যৌক্তিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। আলির শিয়াবাদ ছিল এমন এক বিশ্বাস যা মুসলিমদের রুখে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলতে বাধ্য করেছিল।৬৯

    শাসকগোষ্ঠী এই ধরনের কথাবার্তা চলতে দিতে পারেনি। ১৯৭৩ সালে হুসাইনিয়াহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শরিয়তিকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও কারাবন্দি করা হয়। এরপর ইরানে অভ্যন্তরীণ নির্বাসন দণ্ড ভোগ করে শেষে দেশ ত্যাগের অনুমতি পান। তাঁর বাবা স্মৃতিচারণ করেছেন, মারা যাবার আগে এক রাতে কেঁদে কেঁদে পয়গম্বর ও ইমাম আলিকে বিদায় জানাতে শুনেছেন তিনি। ১৯৭৭ সালে লন্ডনে প্রায় নিশ্চিতভাবেই সাভাকের এজেন্টদের হাতে মারা যান শরিয়তি। শিক্ষিত পাশ্চাত্যকৃত ইরানিদের একটি ইসলামি বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন শরিয়তি। ষাটের দশকের আল-ই আহমাদের মতো ১৯৭০-র দশকের বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালের বিপ্লবের দিকে অগ্রসরমান দিনগুলোতে খোমেনির পাশাপাশি তাঁর ছবিও মিছিলে বহন করা হত।

    অবশ্য ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পথ নির্দেশের জন্যে খোমেনির মুখের দিকে তাকিয়েছিল। বিপরীত দিক থেকে কুমের চেয়ে ইরাকে নির্বাসনে থাকার সময়ই তিনি বিরোধিতাকে ভাষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢের বেশি স্বাধীন ছিলেন। তাঁর বই ও টেপ চোরাপথে পাচার হয়ে দেশে আসত; এবং তাঁর ফতওয়া, যেমন ক্যালেন্ডার বাতিল করার পর শাহর শাসনকে ইসলামের সাথে বেমানান ঘোষণা করে দেওয়া সিদ্ধান্তটি, বেশ গুরুত্বের সাথে গৃহীত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে তিনি তাঁর ল্যান্ডমার্ক গ্রন্থ হুকুমাত-ই ইসলামি (‘ইসলামি সরকার’) প্রকাশ করেন, এখানে যাজকীয় শাসনের শিয়া আদর্শ রূপায়িত হয়েছিল। তাঁর থিসিস ছিল হতবুদ্ধিকর ও বিপ্লবী। শত শত বছর ধরে শিয়ারা গোপন ইমামের অনুপস্থিতিতে সকল সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে এসেছে, উলেমাদের পক্ষে রাষ্ট্র শাসন করা সঠিক বলে কখনওই ভাবেনি। কিন্তু ইসলামিক গভর্নমেন্ট-এ খোমেনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব নিরাপদ করার স্বার্থে উলেমাদের অবশ্যই ক্ষমতা দখল করতে হবে। একজন ফাকিহ-ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্সে বিশেষজ্ঞ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান সমূহের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিলে, শরীয়াহর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারবেন তিনি। ফাকিহ পয়গম্বর ও ইমামদের মতো সমপর্যায়ের না হলেও স্বর্গীয় বিধি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান বোঝায় যে তিনি তাঁদের মতোই সমান কর্তৃত্ব ধারণ করতে পারেন। কেবল আল্লাহই প্রকৃত বিধান প্রদানকারী, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে শরীয়া আইন প্রয়োগ করার জন্যে নিজস্ব মানব রচিত আইন সৃষ্টিকারী পার্লামেন্টের পরিবর্তে একটা সংসদ থাকা প্রয়োজন।

    খোমেনি জানতেন তাঁর যুক্তিগুলো দারুণভাবে বিতর্কিত ও মৌল শিয়া বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু কুতবের মতোই এই উদ্ভাবন বর্তমান জরুরি অবস্থায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। শরিয়তির মতো ধর্মকে আর ব্যক্তি পর্যায়ে সীমিত রাখা যাবে বলে বিশ্বাস করতেন না। পয়গম্বর, ইমাম আলি এবং ইমাম হুসেইন-এঁরা সবাই একাধারে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন, সক্রিয়ভাবে তাঁদের সময়ের নির্যাতন ও বহুঈশ্বরবাদীতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কোনও ব্যাপার ছিল না বরং ‘মানুষকে কর্মে চালিতকারী’ এক প্রবণতা ছিল:

    ইসলাম হচ্ছে বিশ্বাস ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ জঙ্গী ব্যক্তি বিশেষের ধর্ম। এটা তাদের ধর্ম যারা মুক্তি ও স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষা করে। এটা তাদের স্কুল যারা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।৭১

    খুবই আধুনিক বার্তা ছিল এটা। শরিয়তির মতো খোমেনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে ইসলাম মধ্যযুগিয় কোনও ধর্ম নয়, বরং সব সময় পশ্চিম যেসব মূল্যবোধ আবিষ্কার করেছে বলে মনে করে সেগুলোকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। কিন্তু ইসলাম সাম্রাজ্যবাদীদের কারণে আক্রান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। জনগণ পশ্চিমা আদর্শের ভিত্তিতে ধর্ম ও রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছে, এবং এটা বিশ্বাসকে বিকৃত করেছে: ‘ইসলাম এমনভাবে মানুষের মাঝে বাস করে যেন অচেনা কেউ,’ বিলাপ করেছেন খোমেনি। ‘কেউ ইসলামকে তার প্রকৃত রূপে উপস্থাপন করতে চাইলে জনগণকে তা বিশ্বাস করাতে কষ্ট হবে।‍ ইরানিরা আধ্যাত্মিক অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়েছে। ‘আমরা নিজেদের পরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে গেছি। একে পশ্চিমা পরিচয় দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছি,’ বলতেন খোমেনি। ইরানিরা ‘নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে, নিজেদের তারা চেনে না, বিদেশী আদর্শের দাসত্বে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সম্পূর্ণ ইসলামের আইন ভিত্তিক একটি সমাজ নির্মাণ করাই এই বিচ্ছিন্নতার নিরাময়ের উপায়; এসব আইন ইরানিদের কাছে আমদানি করা পশ্চিমের আইনি বিধানের চেয়ে অনেক কাছেরই নয়, বরং সেগুলোর স্বর্গীয় উৎস রয়েছে। তারা স্বর্গীয়ভাবে নির্ধারিত পরিবেশে বাস করে, দেশের আইন অনুযায়ী ঠিক যেভাবে আল্লাহ চেয়েছেন সেভাবে বাস করতে বাধ্য হলে তারা নিজেরা এবং তাদের জীবনের অর্থ বদলে যাবে। ইসলামের শৃঙ্খলা, অনুশীলন ও আচার তাদের মাঝে মানবজাতির পক্ষে আদর্শ মুহাম্মদীয় চেতনা সৃষ্টি করবে। খোমেনির চোখে ধর্মবিশ্বাস স্রেফ ক্রিডের ধারণাগত স্বীকারোক্তিমাত্র ছিল না, বরং আল্লাহ মানবজাতির পক্ষে যে সুখ ও অখণ্ডতা চেয়েছেন তার জন্যে বিপ্লবী সংগ্রামকে ধারণ করা এক প্রবণতা ও জীবনযাত্রার ধরণ। ‘একবার বিশ্বাস সৃষ্টি হলে, বাকি সব কিছু এমনি এসে যাবে। ৭৪

    পাশ্চাত্য চেতনার আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ধারণ করে বলে এই ধরনের বিশ্বাস বিপ্লবী ছিল। পশ্চিমা কারও চোখে খোমেনির তত্ত্ব বেলায়েত-ই ফাকিহ (‘দ্য গভর্নমেন্ট অভ জুরিস্ট’) ভয়ানক, নিপীড়নমূলক মনে হবে, কিন্তু ইরানিদের ‘আধুনিক’ সরকারের অভিজ্ঞতা তাদের জন্যে ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণের নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া মুক্তি এনে দেয়নি। খোমেনি পাহলভী শাসকের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিজস্ব একটি বিকল্প শিয়া আদর্শ ধারণ করতে যাচ্ছিলেন। অতীন্দ্রিয়বাদী হিসাবে পরিচিত ছিলেন তিনি এবং হুবহু ইমামদের মতো না হলেও কাছকাছি স্বর্গীয় জ্ঞানের ধারক ছিলেন বলে মনে করা হত তাঁকে। হুসেইনের মতো তিনি স্বৈরাচারের দুর্নীতিপরায়ণ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন; ইমামদের মতো তাঁকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে, তাঁকে তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন নাজাফে ইমাম আলির সমাধির পাশে বাসরত খোমেনিকে অনেকটা বরং গোপন ইমাম বলেই মনে হচ্ছিল: জাতির পক্ষে দৈহিকভাবে এখনও প্রবেশাধিকার রুদ্ধ, দূর থেকে তিনি তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন, একদিন ফিরে আসবেন। গুজব ছিল যে বর্তমান নির্বাসন সত্ত্বেও কুমে ইন্তেকাল করার স্বপ্ন দেখেছেন খোমেনি। পশ্চিমের লোকেরা একজন রাজনৈতিক নেতার মাঝে যেমন আকর্ষণ বা ক্যারিশমা আশা করে তার কোনওটাই না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে খোমেনি ইরানি জনগণের এমন ভক্তি লাভ করতে পেরেছেন সেটা কিছুতেই বুঝতে পারে না। শিয়াবাদ সম্পর্কে ধারণা থাকলে হয়তো একে তেমন রহস্যজনক ভাবত না।

    ইসলামিক গভর্নমেন্ট রচনা করার সময় সম্ভবত খোমেনির ধারণাই ছিল না যে বিপ্লব অত্যাসন্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বেলায়েত-ই ফাকিহ’র জন্যে প্রস্তুত হতে ইরানের আরও দুইশো বছর লাগবে।৭৫ এই সময় পর্যন্ত তাঁর তত্ত্বে রাজনৈতিক দিকের চেয়ে ধর্মীয় আদর্শ নিয়েই বেশি ভাবিত ছিলেন খোমেনি। ১৯৭২ সালে, ইসলামিক গভর্নমেন্ট প্রকাশিত হওয়ার এক বছর পর বিতর্কিত বেলায়ত-ই ফাকিহর পক্ষে অতীন্দ্রিয়বাদী যৌক্তিকতার সন্ধান লাভকারী একটি প্রবন্ধ লিখেন খোমেনি, যার নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য গ্রেটার জিহাদ’। শিরোনাম তাঁর একটি প্রিয় হাদিসের উল্লেখ করে, এক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে পয়গম্বর বলেছিলন: ‘আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’ এটা নিখুঁতভাবে খোমেনির বিশ্বাস তুলে ধরে যে রাজনীতির যুদ্ধ ও প্রচারণা ‘নিম্নপর্যায়ের’ সংগ্রাম, সমাজের আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আনা ও কারও হৃদয় আর মনকে সংহত করার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বহীন। শরিয়তির মতো তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ইরানের গভীরতর ধর্মীয় পুনর্জাগরণ ছাড়া রাজনৈতিক সমাধান সফল হতে পারে না।

    ১৯৭২ সালের নিবন্ধে খোমেনি প্রস্তাব করেন যে, মোল্লা সদ্রার বর্ণিত অধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে নিয়োজিত একজন ফাকিহ ইমামদের মতো একই ‘ভ্রান্তি হীনতা’ (ইসমাহ) অর্জন করতে পারেন। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে জুরিস্ট ইমামদের সমপর্যায়ের হয়ে গেছেন, বরং অতীন্দ্রিয়বাদী আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তাঁকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা অহমবাদ থেকে মুক্ত করেছেন। তাকে ‘অন্ধকারের পর্দা’, ‘জাগতিকতার সাথে সংশ্লিষ্টতা’ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতা থেকে মুক্ত করতে হয়েছে। আল্লাহ’র অভিমুখে যাত্রার চূড়ান্ত পর্যায়ে এভাবে তিনি পাপ প্রবণতা থেকে পরিশুদ্ধ হয়েছেন: ‘কেউ সর্বশক্তিমান আল্লাহয় বিশ্বাস করলে হৃদয়ের চোখ দিয়ে যেভাবে সে সূর্যকে দেখতে পায় সেভাবে তাঁকে দেখলে তার পক্ষে পাপ করা অসম্ভব।’ ইমামদের অনন্য উপহার, বিশেষ স্বর্গীয় জ্ঞান ছিল, তবে খোমেনি বিশ্বাস করতেন আধ্যাত্মিকতার সাধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই নিম্নতর ভ্রান্তিহীনতা অর্জন করেছেন তাঁরা। এভাবে ইসলামি আইনের বিশেষজ্ঞ ও অতীন্দ্রিয়বাদীভাবে নব জন্মলাভকারী একজন ফাকিহর পক্ষে জনগণকে আল্লাহ’র পথে পরিচালিত করা অসম্ভব হবে না। এখানে সম্ভাব্য বহুঈশ্বরবাদীতার ব্যাপার রয়েছে, কিন্তু আবারও জোরের সাথে বলা প্রয়োজন যে ১৯৭২ সালে কেউই, এমনকি খোমেনিও না, ইসলামি প্রবণতাসম্পন্ন বিপ্লবের মাধ্যমে শাহকে উৎখাত করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করতেন না। খোমেনি সত্তর বছর বয়সী ছিলেন তখন। নিশ্চয়ই তিনিই যে শাসক ফাকিহতে পরিণত হবেন এমনটা ভাবতে যাননি। ইসলামিক গভর্নমেন্ট ও দ্য গ্রেটার জিহাদে’ খোমেনি শিয়াহ পুরাণ ও অতীন্দ্রিয়বাদ কীভাবে অভিযোজিত করে শত শত বছরের পবিত্র ঐতিহ্যকে ভেঙে ইরানে যাজকীয় শাসনের অনুমতি দেওয়া যায় সেটাই দেখার চেষ্টা করেছেন। বাস্তব ক্ষেত্রে এই মিথোস কীভাবে কাজ করে সেটা দেখা তখনও বাকি ছিল তাঁর।

    *

    ইসরায়েলে এক নতুন ধরনের ইহুদি মৌলবাদ ইতিমধ্যে মিথকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুবাদ করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল। ধর্মীয় যায়নবাদে ছিল এর শেকড়, প্যালেস্তাইনে রাষ্ট্র-পূর্ববর্তী সময়ে সেক্যুলার যায়নবাদের ছায়ায় পরিপুষ্ট হয়েছে। এইসব ধর্মীয় যায়নবাদীরা ছিল আধুনিক অর্থডক্স, বেশ আগে থেকেই তারা সমাজতান্ত্রিক কিব্বুতযিমের পাশাপাশি নিজস্ব নিবেদিত বসতি স্থাপন করে আসছিল। হেরাদিমের বিপরীতে ধার্মিক ইহুদিদের এই ক্ষুদ্র দলটি যায়নবাদকে অর্থডক্সির সাথে বেমানান মনে করেনি। বাইবেলকে আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে তারা: তোরাহয় ঈশ্বর আব্রাহামের বংশধরদের ভুমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবং এভাবে ইহুদিদের প্যালেস্তাইনের উপর বৈধ অধিকার দান করেছেন। তাছাড়া, এরেত্য ইসরায়েলে ইহুদিরা ডায়াসপোরার চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে আইন অনুসরণ করতে পারবে। ঘেটোতে কৃষি ও ভূমিতে বসতি স্থাপনের অনেক বিধান কিংবা রাজনীতি ও সরকারের আইন বাস্তব কারণেই পালন করা সম্ভব ছিল না। ফলে প্রয়োজনের তাগিদেই ডায়াসপোরার ইহুদিবাদ বিভাজিত ও গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এখন নিজেদের দেশে আসার পর অবশেষে ইহুদিরা ফের সম্পূর্ণ তোরাহ আবার পালন করতে পারবে। যায়নবাদী অর্থডক্সির অন্যতম অগ্রদূত পিনচাস রোজেনব্লাথ ব্যাখ্যা করেছেন :

    আমরা নিজেদের উপর সম্পূর্ণ তোরাহ গ্রহণ করেছি, এর নির্দেশনা ও ধারণাসমূহ। [প্রাচীন] অর্থডক্সি আসলে তোরাহর ছোট একটা অংশ তুলে ধরেছে…সিনাগগ বা পরিবারে পালন করা হয়…কিংবা জীবনের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে। আমরা সব সময় সব জায়গায় তোরাহ অনুসরণ করতে চাই, [তোরাহ] ও এর বিধিবিধানকে ব্যক্তি ও সর্বসাধারণের জীবনে সার্বভৌমত্ব দিতে চাই।

    আধুনিকতার সাথে বেমানান হওয়া দূরের কথা, আইন একে সম্পূর্ণতা দান করবে। জগৎ দেখবে যে, ইহুদিরা ঈশ্বর পরিকল্পিত বলে সম্পূর্ণ প্রগতিশীল একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থার পত্তন ঘটাতে পারে।৭৮

    সামগ্রিকতার প্রতি সবসময়ই এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা ছিল ধর্মীয় যায়নবাদকে সব সময়ই যা বৈশিষ্ট্যায়িত করবে। নির্বাসনের আঘাত ও বিধিনিষেধের পর এটা ছিল উপশম ও অধিকতর হলিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি খোঁজার উপায়। তবে এটা সেক্যুলার যায়নবাদীদের যৌক্তিক দর্শনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও ছিল, যারা ধার্মিক বসতিস্থাপনকারীদের গুরুত্বের সাথে নেয়নি এবং এরেতয ইসরায়েলে তাদের তোরাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে কেবল পশ্চাদপদই নয় বরং বিতৃষ্ণা জাগানো মনে করেছে। ধার্মিক যায়নবাদীরা বিদ্রোহী হওয়ার বেলায় দারুণ সজাগ ছিল। ১৯২৯ সালে তারা নিজস্ব তরুণ আন্দোলন নেই আকিভা (‘সান্স অভ আকিভা’) সূচিত করার সময় এই তরুণ দল রোমে ইহুদি আন্দোলনের সমর্থনকারী দ্বিতীয় সিই শতাব্দীর মহান অতীন্দ্রিয়বাদী ও পণ্ডিত র‍্যাবাই আকিভাকে আদর্শ হিসাবে নিয়েছিল। সেক্যুলার যায়নবাদীরাও বিদ্রোহী ছিল, কিন্তু সেটা ধার্মিক ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে। এবার বনেই আকিভার ধারণা জেগেছিল যে তাদের অবশ্যই ‘বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাতে হবে, ইহুদিবাদ ও ইহুদি ঐতিহ্যের বিরোধিতাকারী [সেক্যুলার] তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে।’৭৯ ঈশ্বরের নামে যুদ্ধ করছিল তারা। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকে ধর্মকে বাদ বা প্রান্তিকায়িত করার বদলে তারা চাইছিল ‘সর্বক্ষণ ও সকল ক্ষেত্রে’ তাদের অস্তিত্বকে ধর্ম দিয়ে পরিপূর্ণ করে তুলতে। সেক্যুলারিস্টদের সম্পূর্ণভাবে যায়নবাদ ‘দখল’ করে নিতে দিতে চায়নি তারা। সংখ্যালঘু হলেও সেক্যুলারিস্টদের সম্পূর্ণ যৌক্তিক আদর্শের বিরুদ্ধে একটা ক্ষুদে অভ্যুত্থান ঘটাচ্ছিল তারা।

    নিজস্ব স্কুল ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছিল তাদের। ১৯৪০-র দশকে রাভ মোশে যুভি নেরিয়া ধার্মিক যায়নবাদী ছেলেমেয়েদের জন্যে বেশ কয়েকটি অভিজাত বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ইয়েশিভা হাই স্কুলগুলোতে পাঠ্যক্রম ছিল খুবই উচ্চমানের; ছাত্ররা তোরাহর পাশাপাশি সেক্যুলার বিষয় পড়াশোনা করত। হেরেদিমদের বিপরীতে এই নিও-অর্থডক্স ধার্মিক যায়নবাদীরা তাদের আধুনিক জীবনের প্রধান ধারা থেকে দূরে সারিয়ে রাখতে হবে বলে মনে করেনি। এটা তাদের হলিস্টিক দর্শনের বিরোধিতা করবে; তাদের বিশ্বাস ছিল যে ইহুদিবাদ এইসব জেন্টাইল বিজ্ঞানকে স্থান করে দেওয়ার মতো যথেষ্ট বিশাল, কিন্তু তোরাহ পাঠকেও খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছিল তারা, তোরাহ ও তালমুদ শিক্ষা দেওয়ার জন্যে হেরেদি ইয়েশিভোতের স্নাতকদের নিয়োগ দিয়েছিল। ইয়েশিভা হাইস্কুলে মিথোস ও লোগোসকে তখনও সম্পূরক মনে করা হত। তোরাহ ঈশ্বরের সাথে এক অতীন্দ্রিয়বাদী সাক্ষাতের ব্যবস্থা যোগাত ও সামগ্রের অর্থ প্রদান করত, যদিও এর কোনও বাস্তব উপযোগিতা ছিল না। মিদ্রশিয়াত নোয়ামের প্রিন্সিপাল র‍্যাবাই ইয়েহোশুয়া যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ছাত্ররা জীবীকা নির্বাহের জন্যে বা ‘অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের উপায় হিসাবে’ তোরা পাঠ করত না। বরং তোরাহকে অবশ্যই ‘এর খাতিরেই পাঠ করতে হবে’; সেক্যুলার বিষয়ের লোগোসের বিপরীতে এর বাস্তব কোনও ব্যবহার ছিল না, বরং তা ছিল স্রেফ ‘মানুষের সমগ্র লক্ষ্য’।° অবশ্য ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পড়াশোনাই ধার্মিক তরুণ যায়নিস্টদের জন্যে যথেষ্ট ছিল না। ১৯৫০-র দশকে বয়স্ক ছাত্রদের জন্যে ইয়েশিভোত প্রতিষ্ঠা করা হয় যেগুলোর ধার্মিক তরুণদের তোরাহ পাঠের সাথে আইডিএফ-এ জাতীয় চাকরিকে সমন্বিত করার উপায় দিয়ে নতুন ইসরায়েলি সরকারের সাথে বিশেষ ‘ব্যবস্থা’ (হেসদার) ছিল।

    ধার্মিক যায়নবাদীরা এভাবে নিজেদের জন্যে ভিন্ন জীবনধারা সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু রাষ্ট্রের গোড়ার দিকের বছরগুলোয় কেউ কেউ পরিচয় সংকটে ভুগছে। তারা যেন দুই জগতের মাঝখানে পড়ে গিয়েছিল: সেক্যুলারিস্টদের চোখে তারা যথেষ্ট যায়নবাদী ছিল না, এবং তাদের সাফল্যসমূহ রাষ্ট্রকে অস্তিত্ব দানকারী সেক্যুলার অগ্রদূতদের সাফল্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারছিল না। একই ভাবে হেরেদিমের পক্ষে যথেষ্ট অর্থডক্স ছিল না তারা, জানত তোরাহয় তাদের দক্ষতার সাথে পাল্লা দিতে পারবে না। এই সংকট ১৯৫০-র দশকের গোড়ার দিকে আরও একটি তরুণ অভ্যুত্থানের দিকে চালিত করেছিল। এক ইয়েশিভা হাই স্কুল ফার হারো’এহ-র চৌদ্দ বছরের দশবারজন ছেলের একটা ক্ষুদে দল হেরেদিমদের মতোই আরও কঠোর ধর্মীয় জীবন যাপন করতে শুরু করে। তারা শোভন পোশাক ও লিঙ্গের বিচ্ছিন্নতার উপর জোর দেয়, চটুল কথাবার্তা ও তুচ্ছ বিনোদনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ও দুষ্কৃতকারীদের বিচারের মাধমে একে অন্যের জীবনের উপর নজরদারী করতে থাকে। তীব্র জাতীয়তাবাদের সাথে হেরেদি উৎসাহকে সম্পর্কিত করে এরা নিজেদের নাম দিয়েছিল গাহেলেত (‘জ্বলন্ত অঙ্গার’)। কেন্দ্রে একটি ইয়েশিভাসহ কিব্বুত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখত ওরা, যেখানে পুরুষরা হেরেদিমের মতো দিন রাত সারাক্ষণ তালমুদ পাঠ করবে ও আল্ট্রা অর্থডক্স কায়দায় নিম্নতর তবে লোগোসের সম্পূরক বলয়ে অবনমিত নারীরা তাদের ভরণপোষণ করবে, জমিতে চাষ করবে। ধার্মিক যায়নবাদী বলয়ে অভিজাত গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল গাহেলেতরা, কিন্তু তাদের মনে হয়েছিল যে হাসিদিম ও মিসনাগদিমের মতো নির্দেশনা দানের জন্যে একজন র‍্যাবাই না মেলা পর্যন্ত তাদের অর্থডক্সি পূর্ণতা পাবে না। ১৯৫০-র দশকের শেষের দিকে র‍্যাবাই আব্রাহাম ইত্যহাত কুকের ছেলে প্রবীন র‍্যাবাই ভি ইয়েহুদা কুকের আকর্ষণে বন্দি হয়ে পড়ে এরা, ষষ্ঠ অধ্যায়ে তাঁর রচনাবলী আলোচিত হয়েছে।৮১

    গাহেলেত র‍্যাবাই ভি ইয়েহুদার দর্শন যখন পায় ততদিনে তিনি সত্তর বছর বয়স্ক হয়ে গেছেন, বাবার তুলনায় অর্ধেকও নন বলে সাধারণভাবে মনে করা হত তাঁকে। উত্তর জেরুজালেমেরে মারকায ইয়েশিভার প্রিন্সিপাল ছিলেন তিনি। বাবা প্রতিষ্ঠা করলেও মাত্র বিশ জন ছাত্র নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছিল সেটা। কিন্তু ছেলে কুকের ধারণাগুলো নিমেষে গাহেলেতের কাছে আবেদন সৃষ্টি করল, কারণ তিনি বাবা আব্রাহাম ইত্যহাকের চেয়ে ঢের অগ্রসর ছিলেন এবং বাবা কুকের জটিল দ্বান্দ্বিক দর্শনকে এতটাই সরলীকরণ করেছিলেন যে তা আধুনিক আদর্শের সংহত রূপ নিয়েছিল। প্রবীন কুক সেক্যুলার যায়নবাদে স্বর্গীয় উদ্দেশ্য দেখেছিলেন, কিন্তু র‍্যাবাই ভি ইয়েহুদা বিশ্বাস করতেন যে, সেক্যুলার ইসরায়েল রাষ্ট্রই ঈশ্বরের রাজ্য তাউত কোর্স; এর জমিনের প্রতিটি কণা পবিত্ৰ:

    এরেত্য ইসরায়েলে আগত প্রতিটি ইহুদি, ইসরায়েলের জমিনে রোপন করা প্রতিটি গাছ, ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া প্রতিটি সৈনিক অক্ষরিকভাবে আরেকটি আধ্যাত্মিক পর্যায় গঠন করে; নিষ্কৃতির প্রক্রিয়ায় আরেকটি স্তর।৮২

    হেরেদিম যেখানে স্বাধীনতা দিবসে ছাত্রদের আর্মি প্যারেড দেখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, সেখানে ছেলে কুক জোরের সাথে বলেছেন, সেনাবাহিনী যেহেতু পবিত্র তাই সেটা দেখা ধর্মীয় দায়িত্ব। সৈনিকরা তোরাহ পণ্ডিতদের মতোই ন্যায়নিষ্ঠ, তাদের অস্ত্র প্রার্থনার চাদর বা ফিলাক্ট্রিজের মতোই পবিত্র। ‘যায়নবাদ স্বর্গীয় বিষয়,’ জোরের সাথে বলেছেন র‍্যাবাই ভি ইয়েহুদা। ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র স্বর্গীয় সত্তা, আমাদের পবিত্র ও মহান রাজ্য।৮৩

    নিষ্কৃতিহীন বিশ্বে সকল রাজনীতিই দূষিত হওয়ায় পিতা কুক যেখানে ইহুদিদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়া ঠিক হবে না বলে বিশ্বাস করতেন সেখানে ছেলে কুকের বিশ্বাস ছিল যে মেসিয়ানিক যুগের সূচনা হয়েছে এবং রাজনৈতিক সংশ্রব কাব্বালিস্টের অতীন্দ্রিয় যাত্রার মতো পবিত্রতার চরম শিখরে আরোহণ। ৪ তাঁর দর্শন আক্ষরিক মতবাদগতভাবে দিক থেকে হলিস্টিক ছিল। ভূমি, জনগণ, ও তোরাহ এক অদৃশ্য ত্রয়ী সৃষ্টি করেছে। কোনও একটিকে ত্যাগ করা মানে সবকটিকেই ত্যাগ করা। ইহুদিরা বাইবেলে নির্ধারিত সীমানা মোতাবেক ইসরায়েলের সমগ্র ভূমিতে বাস না করা পর্যন্ত নিষ্কৃতি আসতে পারে না: এই সময় আরবদের অধিকারে থাকা এলাকাসহ সম্পূর্ণ দেশের অধিকার এক মহান ধর্মীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছিল।৮৫ কিন্তু ১৯৫০-র দশকের শেষ দিকে গাহেলেত কুকের দেখা পাওয়ার মুহূর্তে এমন কিছু অর্জনের সামান্যই সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সীমানায় গালিলি, নেজেভ ও উপকূলীয় সমতল অন্তর্ভুক্ত ছিল। জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের বাইবেলিয় ভূমি জর্দানের হাশেমিয় রাজ্যের অধিকারে ছিল। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী ছিলেন কুক। সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। এমনকি ইহুদিদের ডায়াসপোরা ছেড়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য করায় হলোকাস্ট নিষ্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে। ইহুদিরা ‘বিদেশী ভূমির অপবিত্রতাকে এমন শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল যে শেষ সময় উপস্থিত হওয়ায় বিপুল রক্তপাতের ভেতর দিয়ে সেখান থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করতে হয়েছে,’ ১৯৭৩ সালে এক হলোকাস্ট ডে সারমনে ব্যাখ্যা করেছেন কুক। ঐতিহাসিক এইসব ঘটনা ঈশ্বরের স্বর্গীয় হাতের প্রকাশ ঘটিয়েছে, এবং ‘তোরাহ এবং যা কিছু পবিত্র তার পুনর্জন্ম ঘটিয়েছে।’ এভাবে ইতিহাস ‘বিশ্ব জগতের প্রভুর সাথে’ এক মিলনের ব্যবস্থা করেছে

    মিথকে বাস্তবে পরিণত করার ব্যাপারটি অবশেষে সম্পন্ন হয়েছিল। প্রাক আধুনিক বিশ্বে পুরাণ ও রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। রাষ্ট্র নির্মাণ, সামরিক অভিযান, কৃষি ও অর্থনীতি এসবই ছিল লোগোসের যৌক্তিক অনুশীলনের এখতিয়ার। মিথ এইসব বাস্তব কর্মকাণ্ডকে ধারণ করে অর্থ যোগাত। মিথ আবার শুদ্ধিকরণের উপায় হিসাবেও কাজ করতে পারত এবং নারী-পুরুষকে যুক্তির বাস্তব বিবেচনাকে অতিক্রম করে যাওয়া সহানুভূতির মতো মূল্যবোধ মনে করিয়ে দিত। পার্থিব কোনও বাস্তবতা ঐশী প্রতীকে পরিণত হতে পারে, কিন্তু সেটা নিজে কখনও পবিত্র হতে পারে না, যুক্তির অগম্য নিজের অতীত সেই দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু এইসব পাথক্যকে অগ্রাহ্য করে কুক এমন কিছু নির্মাণ করেছেন কেউ যাকে বহু ঈশ্বরবাদীতা বলতে পারে। সেনাবাহিনী কি ‘পবিত্র’ হতে পারে যেখানে দোষী ব্যক্তিদের সাথে নিরীহ লোকজনকে হত্যা করার মতো ভয়ঙ্কর কাজ করতে বাধ্য হয় তারা? ঐতিহ্যগতভাবে মেসিয়ানিজম মানুষকে স্থিতাবস্থার সমালোচনায় আনুপ্রাণিত করেছে, কিন্তু কুক একে ইসরায়েলের নীতির প্রতি চরম অনুমোদন দিতে ব্যবহার করবেন। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধকে অস্বীকারকারী বিনাশী মতবাদের জন্ম দিতে পারে। ইসরায়েল রাষ্ট্রকে পবিত্র পরিণত করে এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে পরম মূল্য দিয়ে কুক বিংশ শতাব্দীর কিছু ভয়ঙ্করতম জাতীয় নিষ্ঠুরতার জন্যে দায়ী প্রলোভনের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। প্রবীন র‍্যাবাই কুকের অন্য ধর্মবিশ্বাস ও সেক্যুলার বিশ্বের দিকে হাত বাড়ানো অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন হারিয়ে গিয়েছিল। ছেলে কুক ইসরায়েলের আশার পথে বাধা দানকারী গোয়িম ক্রিশ্চান ও আরবদের প্রতি ঘৃণায় পরিপূর্ণ ছিলেন।’ অতীতের দর্শনে যুক্তি ও মিথকে ভিন্ন হলেও সম্পূরক হিসাবে বিবেচনাকারী প্রজ্ঞা ছিল। ছেলে কুকের দুটোকে একসাথে জোয়ালবদ্ধ করায় বিপদের ঝুঁকি ছিল।

    গাহেলেত অবশ্যই এই দর্শন গ্রহণ করেনি। র‍্যাবাই কুকের হলিস্টিক আদর্শ যায়নবাদকে ধর্মে পরিণত করেছিল। ঠিক এরই খোঁজ করছিল তারা। মারকায হারাভের পূর্ণসময়ের ছাত্রে পরিণত হয়ে এই আবছা ইয়েশিভাকে ইসরায়েলের মানচিত্রে স্থাপন করে। কুককেও তারা অনেকটা ইহুদি পোপে পরিণত করে, যাঁর সিদ্ধান্তসমূহ অবশ্য পালনীয় ও ভ্রান্তিহীন ছিল। এই তরুণরা কুকের ক্যাডারে পরিণত হয়; অচিরেই নতুন মৌলবাদী যায়নবাদের নেতায় পরিণত হবে তারা: মোশে লেভিংগার, ইয়াকভ আরিয়েল, শ্লোমো আভিনার, হাইম দ্রুকমান, দোভ লিয়র, যালমান মেলামেদ, আভ্রাহাম শাপিরা ও এলিয়েযার ওয়াল্ডমান। জাতিকে ঈশ্বরের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে ১৯৬০-র দশকে মারকায হারাভে একটি আক্রমণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তারা। সেক্যুলার রাষ্ট্র ইসরায়েলের ধর্মীয় সম্ভাবনা অর্জনের জন্যে প্রবীন কুকের পরিকল্পিত সেক্যুলার ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষের বদলে র‍্যাবাই ভি ইয়েহুদা ঈশ্বর কর্তৃক সেক্যুলারের অত্যাসন্ন অধিকারের স্বপ্ন দেখেছেন।

    অবশ্য শত উৎসাহ সত্ত্বেও গাহেলেত পরিকল্পনার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারেনি। সমগ্র দেশে বসতি স্থাপন বা জাতির মন বদলানোর মতো কার্যকর কিছু করার ছিল না তাদের, কিন্তু ১৯৬৭ সালে ইতিহাস হাত মিলিয়েছিল।

    ১৯৬৭ সালের স্বাধীনতা দিবসে, ছয় দিনের যুদ্ধের শুরু হওয়ার মোটামুটি তিন সপ্তাহ আগে, র‍্যাবাই কুক যথারীতি মারকায হারাভ ইয়েশিভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। সহসা ফুঁপিয়ে ওঠার মতো আওয়াজ করে উঠলেন তিনি, এমন কিছু শব্দ উচ্চারণ করলেন যা বক্তৃতার ধারাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিল: ‘কোথায় ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র থেকে ছিঁড়ে নেওয়া আমাদের হেব্রন, শেচেম, জেরিকো এবং আনাতোহ; কর্তিত অবস্থায় আমাদের রক্তক্ষরণ হচ্ছে?’৮৮ তিন সপ্তাহ পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এর আগে আরবদের হাতে থাকা এইসব বাইবেলিয় স্থান দখল করে নেয়। র‍্যাবাই কুকের শিষ্যরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, ঈশ্বর কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়েই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তিনি। স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের শেষে ইসরায়েল মিশর থেকে গাযা মালভূমি, জর্দানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও সিরিয়া থেকে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েল ও জর্দানের ভেতর বিভক্ত পবিত্র জেরুজালেম নগরী এবার ইসরায়েল কর্তৃক অধিকৃত হয় ও ইহুদি রাষ্ট্রের চিরন্তন রাজধানী বলে ঘোষিত হয়। আরও একবার ইহুদিরা পশ্চিম দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করার সুযোগ লাভ করে। উল্লাসের মেজাজ ও প্রায় অতীন্দ্রিয়বাদী উল্লাস গোটা দেশকে অধিকার করে নিয়েছিল। যুদ্ধের আগে ইসরায়েলিরা রেডিও-তে ওদের সবাইকে সাগরে নিক্ষেপ করার নাসেরের শপথের কথা শুনত; এখন অপ্রত্যাশিতভাবে ইহুদি স্মৃতিতে পবিত্র সব স্থানের অধিকার লাভ করেছে তারা। চরম সেক্যুলারিস্টদের অনেকেই যুদ্ধকে লোহিত সাগর অতিক্রম করার স্মৃতিবাহী একটি ধর্মীয় ঘটনা হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছিল।৮৯

    কিন্তু কুকবাদীদের জন্যে যুদ্ধ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একে নিষ্কৃতি একেবারে হাতের নাগালে এবং ঈশ্বর ইতিহাসকে চূড়ান্ত পূর্ণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তারই পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ মনে হয়েছে। প্রকৃত কোনও মেসায়াহর আগমন না ঘটার ব্যাপারটি গাহেলেতকে উদ্বিগ্ন করেনি; আধুনিক ছিল ওরা, নিখুঁতভাবে ব্যক্তি নয় বরং প্রক্রিয়াকেই ‘মেসায়াহ’ হিসাবে দেখতে প্রস্তুত ছিল।” যুদ্ধের ‘অলৌকিক’ ঘটনার একটি স্বাভাবিক ব্যাখ্যা থাকায়ও তারা অস্বস্তি বোধ করেনি: ইসরায়েলি বিজয় ছিল সম্পূর্ণ আইডিএফ-এর দক্ষতা ও আরব বাহিনীর অযোগ্যতার ফল। দ্বাদশ শতাব্দীর দার্শনিক মায়মোনাইদস ভবিষ্যদ্ববাণী করেছিলেন যে, নিষ্কৃতিতে অতিপ্রাকৃত কিছু থাকবে না: মহাজাগতিক বিস্ময় ও সর্বজনীন শান্তির কথা বলা ভবিষ্যদ্বাণীসূলভ অনুচ্ছেদগুলো মেসিয়ানিক রাজ্যের নয় বরং আসন্ন পৃথিবীর কথা বুঝিয়েছে। বিজয় কুকবাদীদের বিশ্বাস করিয়েছিল যে আন্তরিকতার সাথে সংগঠিত হওয়ার সময় হয়েছে।

    বিজয়ের কয়েক মাস পরে র‍্যাবাই ও ছাত্ররা আরব প্রতিবেশীদের সাথে শান্তি স্থাপনের জন্যে শ্রমিক দলীয় সরকারের সদ্য অধিকৃত কিছু এলাকা ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নাকচ করার উপায়ের খোঁজে মারকায হারাভে এক অনির্ধারিত সভার আয়োজন করেন। কুকবাদীদের চোখে এমনকি এক ইঞ্চি পবিত্র ভূমি ফিরিয়ে দেওয়ার মানে হবে অশুভ শক্তির বিজয়। বিস্ময়ের সাথে সেক্যুলারদের মিত্র হিসাবে পেয়ে যায় তারা। যুদ্ধের অব্যবহিত পর ইসরায়েলি কবি, প্রফেসর, অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিক ও সেনা কর্মকর্তাদের বিশিষ্ট একটি দল সরকারকে অঞ্চলগত ছাড় থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে ল্যান্ড অভ ইসরায়েল আন্দোলন গঠন করেন। বছর পরিক্রমায় এই আন্দোলন কুকবাদীদের এমনভাবে তাদের আদর্শ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে যা সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টি করবে এবং তাদের আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন যোগাবে। আস্তে আস্তে কুকবাদীরা মূল ধারায় যোগ দিচ্ছিল।

    ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে মোশে লেভিংগার হেব্রনে পাসওভারের অনুষ্ঠানে কুকবাদীদের একটি ছোট দল ও সেগুলোর পরিবারের নেতৃত্ব দেন, যেখানে আব্রাহাম, ইসাক ও জ্যাকবের সমাধি আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। মুসলিমরা যেহেতু ইহুদি গোত্রপিতাদের মহান পয়গম্বর হিসাবে শ্রদ্ধা করে, হেব্রন তাদের চোখেও পবিত্র নগরী। শত শত বছর ধরে প্যালেস্তাইনিরা হেব্রনকে ঈশ্বরের ‘বন্ধু’ আব্রাহামের সাথে সম্পর্কের কারণে আল-খালিল ডেকে এসেছে। কিন্তু হেব্রন অন্ধ স্মৃতিও জাগিয়ে তোলে। ২৪শে আগস্ট, ১৯২৯ প্যালেস্তাইনে আরব ও যায়নবাদীদের এক মহা টানাপোড়েনের সময় উনপঞ্চাশজন ইহুদি নারী-পুরুষ ও শিশু ব্রেনে গণহত্যার শিকার হয়। লেভিংগার ও তার দল সুইস পর্যটকের পরিচয়ে পার্ক হোটেলে অবস্থান করছিলেন, কিন্তু পাসওভার শেষ হয়ে গেলেও বিদায় নিতে অস্বীকার করে স্কোয়ার্টার হিসাবে থেকে যান। ইসরায়েলি সরকারের পক্ষে ব্রিতকর ব্যাপার ছিল এটা, কেননা জেনিভা কনভেনশন বৈরিতার সময় অধিকৃত যেকোনও এলাকায় বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে, এবং জাতি সংঘ অধিকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলকে প্রত্যাহারের চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু কুকবাদীদের চুতপা স্বর্ণযুগে তাদের শ্রমিক দলীয়দের তাদের অগ্রদূতদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল, সুতরাং সরকার তাদেরকে উৎখাত করতে অনীহ ছিল। ৯২

    লেভিংগারের দলটি কেভ অভ দ্য প্যাট্রিয়ার্কে সাথে সাথে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সামরিক সরকার বৈরিতার সময় বন্ধ থাকা উপসনালয়টি আবার উপাসনার জন্যে খুলে দিয়েছিল, আরবদের বিরক্ত না করে প্রার্থনার জন্যে ইহুদিদের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করেছিল। ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের পক্ষে এটা যথেষ্ট ছিল না, গুহায় আরও সময় ও স্থান বাড়ানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিল তারা। শুক্রবার মুসলিমদের সমবেত প্রার্থনার সময় তারা উপসনালয় ছেড়ে যেতে অস্বীকার করছিল, অনেক সময় দরবার ঘর ছেড়ে গেলেও মুল প্রবেশপথ অবরোধ করে রাখত, যাতে মুসলিম উপাসকরা ভেতরে ঢুকতে না পারে। গুহায় কিদ্দুশ ধরে মদ পান করত, জানত মুসলিমরা একে আক্রমণাত্মক মনে করবে। ১৯৬৮ সালের স্বাধীনতা দিবসে, সরকারী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে উপসনালয়ে ইসরায়েলি পতাকা ওঠায় তারা। উত্তেজনা বেড়ে ওঠে এবং সম্ভবত অনিবার্যভাবে-মসজিদের বাইরের কোনও প্যালেস্তাইনি তরুণ ইসরায়েলি পর্যটকদের প্রতি গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে। ৩ ইসরায়েলি সরকার অনীহার সাথে হেব্রনের বাইরে বসতি স্থাপনকারীদের জন্যে একটি ছিটমহল প্রতিষ্ঠা করে; নতুন বসতি আইডিএফ-এর হেফাযতে ছিল। লেভিংগার এর নাম দিয়েছিলেন কিরিয়াত আরবা (হেব্রনের বাইবেলিয় নাম), এবং তা সবচেয়ে চরম, সহিংস ও উস্কানিদাতা যায়নবাদী মৌলবাদীদের ঘাঁটি হয়েছিল। ১৯৭২ সাল নাগাদ কিরিয়াত আরবা আনুমানিক পাঁচ হাজার অধিবাসীর একটা ছোট শহরে পরিণত হয়। কুকবাদীদের কাছে পবিত্র যুদ্ধে ‘অন্যপক্ষে’র সীমানা ঠেলে ঈশ্বরের জন্যে পবিত্র ভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুক্ত করা বিজয়ের প্রতীক ছিল এটা।

    অবশ্য আর কোনও ক্ষেত্রে কুকবাদীরা তেমন এটা সাফল্য পায়নি। মহা হতাশার সাথে তারা লক্ষ করেছে যে নিষ্কৃতি থমকে গেছে। শ্রমিক দলীয় সরকার দখলিকৃত ভুমি অধিগ্রহণ করেনি, সামরিক বসতি স্থাপন করলেও শান্তির বিনিময়ে ভূমি ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা অব্যাহত ছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ইসরায়েলি আত্মতুষ্টিবোধের দিকে পরিচালিত করেছিল, কিন্তু ১৯৭৩ সালে অক্টোবর মাসে ইহুদি ক্যালেন্ডারে সবচেয়ে গম্ভীর দিন ইয়োম কিপ্পুর দিবসে (প্রায়শ্চিত্ত দিবস) তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, মিশর ও সিরিয়া ইসরায়েলিদের সম্পূর্ণ স্তম্ভিত করে সিনাই ও গোলান উপত্যকায় হামলা করে বসে। এবার অবশ্য আরবরা আগের চেয়ে ভালো ফল দেখায়। কেবল কষ্টেসৃষ্টেই আইডিএফ তাদের ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল। হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল ইসরায়েলিরা। গোটা দেশ জুড়ে হতাশা ও সন্দেহের একটা বোধ চেপে বসেছিল। অসতর্ক অবস্থায় আক্রান্ত হয়েছে ইসরায়েল। প্রায় পরাস্ত অবস্থাকে আদর্শগত অবক্ষয়েরই পরিণতি মনে হয়েছে। কুকবাদীরা এতে একমত হয়। ১৯৬৭ সালে ঈশ্বর তাঁর ইচ্ছা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই বিজয়কে পুঁজি না করে এবং দখলিকৃত এলাকা অধিগ্রহণ না করে ইসরায়েলি সরকার গড়িমসি করেছে ও গোয়িম, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করে তোলার ভয় করেছে। ইয়োম কিপ্পুরের যুদ্ধ ঈশ্বরের শাস্তি ও স্মারক। এবার ধার্মিক ইহুদিদের অবশ্যই জাতিকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসতে হবে। এক কুকবাদী র‍্যাবাই সেক্যুলার ইসরায়েলকে বীরের মতো যুদ্ধ করে রণক্ষেত্রে লুটিয়ে পড়া সৈনিকের সাথে তুলনা করেছিলেন। বিশ্বাসী ইহুদিরা, যারা কোনওদিনই ধর্মকে ত্যাগ করেনি, দায়িত্ব গ্রহণ করবে ও তাঁর সেই ব্রতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।”

    ছয়দিনের যুদ্ধ কুকবাদীদের তাদের দর্শনের ব্যাপারে নিশ্চিত করে তাদের বেশ কয়েকটি বসতি স্থাপনের পথে পরিচালিত করেছিল, কিন্তু ইয়োম কিপ্পুরের যুদ্ধের আগে তাদের আন্দোলন আসলে তেমন গতি পায়নি। কুকবাদী র‍্যাবাই ইয়েহুদা আমিতাল রচিত একটি নিবন্ধ এই নতুন জঙ্গী মনোভাব তুলে ধরেছে। ‘দ্য মিনিং অভ দ্য ইয়োম কিপ্পুর ওয়ার’-এ আমিতাল বহু মৌলবাদী আন্দোলনের অন্তরে বিরাজ করা নিশ্চিহ্নতার ভীতি তুলে ধরেছে। অক্টোবরের হামলা সকল ইসরায়েলিকে ম্যপ্রাচ্যে তাদের বিচ্ছিন্নতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা তাদের রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্যে বদ্ধ পরিকর মনে হওয়া শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে হলোকাস্টের অপচ্ছায়া জেগে উঠেছিল। এবার আমিতাল ঘোষণা করলেন, পুরোনো যায়নবাদ ব্যর্থ। সেক্যুলার রাষ্ট্র ইহুদি সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। অ্যান্টি-সেমিটিজম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট। ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র পৃথিবীতে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়ানো একমাত্র দেশ,’ যুক্তি দেখান তিনি। ইহুদিদের ‘স্বাভাবিকীকরণের’ কোনও উপায় নেই, সেক্যুলার যায়নবাদীদের প্রত্যাশা মোতাবেক অন্যান্য জাতির মতো হতে পারবে না তারা। কিন্তু র‍্যাবাই ভি কুক প্রবর্তিত আরেক ধরনের যায়নবাদ ছিল, যেখানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, নিষ্কৃতির প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যুদ্ধকে আরও একটি ইহুদি বিপর্যয় হিসাবে দেখার বদলে একে বরং পরিশুদ্ধিকরণের একটা প্রক্রিয়া হিসাবে দেখা উচিত। যাদের যায়নবাদ শোচনীয়ভাবে অপর্যাপ্ত থাকায় জাতিকে প্ৰায় বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সেই সেক্যুলার ইহুদিরা ইহুদিবাদকে আধুনিক পশ্চিমের অভিজ্ঞতালব্ধ যুক্তিবাদ ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত করার প্রয়াস পেয়েছিল। এই বিদেশী প্রভাবকে অবশ্যই নিশ্চিহ্ন করতে হবে।৯৫

    সেই সময়ের মিশর ও ইরানে বিকাশমান মৌলবাদের সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ এক তত্ত্বের কথা বলছিলেন আমিতাল। ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধকে ঈশ্বর ইহুদিদের ফের নিজেদের দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্যে সতর্ক করে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। ‘পাশ্চাত্য-আসক্ত’ ইসরায়েলের প্রতি প্রকৃত মূল্যবোধে ফিরে আসার স্মারক ছিল এটা। সুতরাং, তা মেসিয়ানিক প্রক্রিয়ার একটা অংশ, পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধ। কিন্তু স্রোত ফিরে গেছে। যুদ্ধ এটাও দেখিয়েছে যে, কেবল ইহুদিরাই বেঁচে থাকার জন্যে সংগ্রাম করছে না। এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে, আমিতালের বিশ্বাস ছিল, জেন্টাইলরাও চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ইহুদি রাষ্ট্রের পুনরুজ্জীবন ও সম্প্রসারণ তাদের দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ঈশ্বর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন, স্যাটানের কোনও অবকাশ নেই, এবং ইসরায়েল অসাম্যের শক্তিকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ইসরায়েল ভুমি জয় করেছে; এখন নিষ্কৃতির আগে কেবল ইহুদিদের আত্মা থেকে পশ্চিমা সেক্যুলার চেতনায় অবশেষটুকুও নিশ্চিহ্ন করা বাকি। তাদের অবশ্যই আবার ধর্মে ফিরে আসতে হবে। যুদ্ধ সেক্যুলারিজমের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। কুকবাদীরা এখন সংগঠিত হয়ে সংগ্রামে আরও বেশি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে প্রস্তুত-এই সংগ্রাম ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদে বাধা দিতে ইচ্ছুক পশ্চিমের বিরুদ্ধে, আরবদের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েলের উপর পশ্চিমের আরোপ করা সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে।

    *

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের মাঝেও একই রকম প্রস্তুতি ছিল। ১৯৬০-র দশকের খোলামেলা তরুণ সংস্কৃতি, যৌন বিপ্লব এবং সমকামী, কৃষ্ণাঙ্গ ও নারীদের সমান অধিকারের প্রচারণা নিয়ে শোরগোল যেন সমাজের ভিত্তি ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল বলে মনে হয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেছিল যে, এই ব্যাপক পরিবর্তন আর তার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের উন্মাতাল পরিবেশের কেবল একটা মানেই হতে পারে, পরমান্দ অত্যাসন্ন। বিপ্লবের পর থেকেই আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টবাদ দুটি বিবদমান শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, এবং প্রায় চল্লিশ বছর ধরে মৌলবাদীরা সেক্যুলারিস্ট ও উদারপন্থী ক্রিশ্চানদের রীতিনীতি সমানভাবে প্রত্যাখ্যানকারী নিজস্ব পৃথক জগৎ তৈরি করছিল। নিজেদের বহিরাগত হিসাবে দেখলেও আসলে পুবের সাংস্কৃতিক সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশকারী এবং মৌলবাদীদের রক্ষণশীল ধর্মে স্বস্তি বোধকারী আমেরিকান জনগণের এক বিরাট অংশের প্রতিনিধিত্ব করেছে তারা। আমেরিকার সমাজকে উদ্ধার করার লক্ষ্যে তখনও তারা রাজনৈতিক দল গঠনের জন্যে সংগঠিত হয়নি, কিন্তু ১৯৭০-র দশকের শেষ নাগাদ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, এবং মৌলবাদীরা তাদের শক্তি সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠছিল। ১৯৭৯ সালে, মৌলবাদীরা যে বছর তাদের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিল, জর্জ গালাপ-এর জাতীয় নির্বাচন দেখায় যে প্রতি তিনজন প্রাপ্ত বয়স্ক আমেরিকানের মধ্যে একজন ধর্মীয় (‘নবজন্ম’) অভিজ্ঞতা লাভ করেছে; প্রায় ৫০ শতাংশ বিশ্বাস করে যে, বাইবেল নির্ভুল, এবং ৮০ ভাগেরও বেশির বিশ্বাস জেসাস স্বর্গীয় ছিলেন। জরিপ এও প্রকাশ করে যে, মোট ১৩০০ ইভাঞ্জেলিকাল রেডিও টেলিভিশন স্টেশন রয়েছে যেগুলোর দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা প্রায় ১৩০ মিলিয়ন, এবং এদের আনুমানিক মুনাফার পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন ডলার থেকে কয়েক ‘বিলিয়ন’ ডলার পর্যন্ত। একজন নেতৃস্থানীয় মৌলবাদী প্যাট রবার্টসন ১৯৮০-র নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছিলেন: ‘এই দেশ চালানোর মতো যথেষ্ট ভোট আছে আমাদের হাতে!৯৬

    ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে এই নতুন বৃদ্ধি ও আত্মবিশ্বাসের পেছনে তিনটি উপাদান কাজ করেছে। প্রথমত দক্ষিণের ঘটনাপ্রবাহ। এযাবত মৌলবাদ ছিল বড় বড় উত্তরাঞ্চলীয় শহরের অবদান। দক্ষিণ তখনও প্রধানত কৃষিভিত্তিক ছিল। উদারপন্থী ক্রিশ্চানিটি চার্চে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি, সুতরাং সেখানে ‘মৌলবাদীদের সোশ্যাল গস্পেলের ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু ১৯৬০-র দশকে আধুনিকায়িত হয়ে উঠতে শুরু করে দক্ষিণ। উত্তর থেকে বর্ধিত হারে লোকজন আসতে শুরু করেছিল। এই এলাকায় স্থাপিত তেল শিল্প ও প্রযুক্তি এবং মহাশূন্য প্রকল্পে কাজের সন্ধান করছিল তারা। দক্ষিণ এক ধরনের দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের অভিজ্ঞতা লাভ করতে শুরু করেছিল একশো বছর আগেই উত্তর যার অভিজ্ঞতা লাভ করে। ১৯৩০-র দশকে দুই তৃতীয়াংশ দক্ষিণী সেখানে বাস করত, ১৯৬০ সাল নাগাদ অর্ধেকের চেয়েও কম বাস করছিল। দক্ষিণ উচ্চতর জাতীয় গুরুত্ব লাভ করতে শুরু করেছিল। ১৯৭৬ সালে জিমি কার্টার গৃহযুদ্ধের পর প্রথম দক্ষিণী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন; ১৯৮০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর রোনাল্ড রেগান তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু দক্ষিণীরা তাদের নতুন প্রাধান্যকে স্বাগত জানালেও নিজেদের বিশ্বকে তারা সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে দেখে। উত্তরের অভিবাসীরা সাথে করে আধুনিক ও উদার ধারণা নিয়ে এসেছিল। আবার সবাই প্রটেস্ট্যান্ট বা ক্রিশ্চান ছিল না। এতদিন পর্যন্ত নিশ্চিত মানা মূল্যবোধ ও বিশ্বাস নিয়ে যুদ্ধ করতে হচ্ছিল। বিশেষ করে ব্যাপ্টিস্ট ও প্রেসবিটারিয়ান গোষ্ঠীতে রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্টরা শতাব্দীর শুরুতে তাদের সধর্মীদের মতো সেই একই কারণে মৌলবাদী আন্দোলনের পক্ষে প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল।৯৭

    নিজেদের বসবাসের সমাজ থেকে উন্মুল ও বিচ্ছিন্ন মনে করা নতুন দক্ষিণের মানুষ এখন প্রায়শঃই দ্রুত বর্ধিষ্ণু শহরে গ্রামাঞ্চল থেকে আগত আগন্তুকে পরিণত হয়েছিল। গ্রামের বহু মানুষ তাদের ছেলেমেয়েদের কলেজে পাঠাচ্ছিল, ক্যাম্পাসে তারা তখন নব্য ষাটের উদারবাদের সাথে পরিচিত হচ্ছিল। সতীর্থ বহু ছাত্রের ধর্মবিশ্বাস হারানো প্রত্যক্ষ করেছে তারা।৮ ছেলেমেয়েদের আপাত ঈশ্বরহীন ধারণা গ্রহণ করতে দেখে বাবা-মারা ভীত হয়ে উঠছিলেন। চার্চে নবাগতদের উত্তর থেকে নিয়ে আসা আরও হতবুদ্ধিকর ধারণার দেখা পাচ্ছিলেন তারা। লোকে ক্রমবর্ধমান হারে মৌলবাদী চার্চের, বিশেষ করে বায়ুতরঙ্গের ‘ইলেক্ট্রিক’ চার্চের শরণাপন্ন হচ্ছিল। শক্তিশালী নতুন টেলিভেঞ্জালিস্টগণ এই সময়ে সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। মৌলবাদে সম্ভাব্য দীক্ষালাভকারীরা ভার্জিনিয়া সৈকতে শুরু করে দক্ষিণ প্রান্ত বরাবর বাস করত, প্যাট রাবার্টসন এখানে তাঁর ক্রিশ্চান ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্ক ও দারুণ জনপ্রিয় ‘৭০০ ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর এসেছে লিঞ্চবার্গ, ভার্জিনিয়া, এখানে ১৯৫৬ সালে জেরি ফলওয়েল তাঁর টেলিভিশন মিনিস্ট্রি শুরু করেছিলেন; উত্তর ক্যারোলিনার শার্লটে ছিল বর্ধিষ্ণু জিম ও ট্যামি ফেই বাক্কার এবং ‘বাইবেল বেল্ট’ শেষ হয়েছিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষনশীলতার দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী এলাকা দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ৯৯

    দ্বিতীয় যে উপাদানটি বহু ঐতিহ্যবাদীকে মৌলবাদীতে পরিণত করার পথে চালিত করেছিল সেটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্রুত প্রসার। বিপ্লবের পর থেকেই আমেরিকানরা কেন্দ্রিভূত সরকারের বেলায় অবিশ্বাসী ছিল, প্রায়শঃই সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিতৃষ্ণা বোঝাতে ধর্মকে ব্যবহার করেছে তারা। মৌলবাদীরা জেফারসনের জারি করা রাজনীতি ও ধর্মকে বিচ্ছিন্ন রাখার ‘বিচ্ছিন্নতার দেয়াল’ বিধান লঙ্ঘিত হওয়ার যুক্তিতে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সরকারী স্কুলে বাধ্যতামূলক প্রার্থনা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে ক্ষিপ্ত ছিল। সেক্যুলারিস্ট বিচারপতিগণ উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে, কর থেকে আহরিত অর্থ সংশ্লিষ্ট না থাকলেও, এবং এমনকি প্রার্থনা স্বেচ্ছামূলক ও গোষ্ঠীবাদের উর্দ্ধে হলেও স্কুলে প্রার্থনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সরকারের পক্ষে অসাংবিধানিক। ১৯৪৮, ১৯৫২ ও ১৯৬২ সালে এই ধরনের সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট সরকারী স্কুলে প্রথম সংশোধনীর ধর্মীয় ধারা উদ্ধৃত করে বাইবেল পাঠও নিষিদ্ধ করেন। ১৯৭০-র দশকে আদালত যেকোনও আইন (১) ধর্মকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে, (২) এর পরিণতিতে ইচ্ছা যাই হোক না কেন, ধর্মের প্রসার ঘটাতে চায় এবং সবশেষে (৩) সরকারকে তা ধর্মীয় বিষয়ে জড়াতে চাইলে তা বাতিল হয়ে যাবে ঘোষণা দিয়ে বেশ কয়েকটি রায় প্রদান করেন।১০ আদালত আমেরিকান সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান বহুত্ববাদের প্রতি সাড়া দিচ্ছিলেন; ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ধর্মের বিরুদ্ধে এর কোনও বিরাগ নেই, কিন্তু জোরের সাথে একে ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলেছেন।

    এইসব সিদ্ধান্ত সেক্যুলারকরণ ছিল, কিন্তু এদের ধর্মকে প্রান্তিকায়িত করার নাসের বা শাহর প্রয়াসের সাথে তুলনা করা যাবে না। তাসত্ত্বেও মৌলবাদী ও ইভাঞ্জেলিকাল ক্রিশ্চানরা সমানভাবে তাদের চোখে ঈশ্বরহীন ক্রুসেডে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এভাবে ধর্মকে আইন সঙ্গতভাবে সীমানা দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যাবে বলে বিশ্বাস করেনি তারা, কারণ ক্রিশ্চানিটির দাবি ছিল সামগ্রিক ও সার্বভৌম হতে হবে। আদালত (প্রথম সংশোধনীতে দাবিকৃত) ধর্মবিশ্বাসের ‘স্বাধীন প্রকাশের নীতি এমনকি ক্রিশ্চান নয় এমন ধর্মের উপরও বিস্তৃত করতে চাইছেন দেখে আক্রান্ত বোধ করেছে, সকল ধর্মকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার বিচারপতিদের নীতিগত প্রয়াসে ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ যেন ধর্মকে মিথ্যা বলারই শামিল মনে হয়েছে। ব্যক্তি জীবনে আদালতের মাত্রাতিরিক্ত ও নজীরবিহীন হস্তক্ষেপ মনে হওয়া ঘটনার সাথে মেলানো হলে ধর্মকে ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে মৌলবাদীদের কাছে আরও বেশি ভয়ানক ঠেকেছে। ইন্টারনাল রেভেনিউ সার্ভিস বিশেষ কতগুলো মৌলবাদী কলেজের নিয়মকানুন সরকারী নীতির বিরোধী যুক্তি দেখিয়ে দাতব্য কর অবকাশ সুবিধা প্রত্যাহারের হুমকি দিলে তাকে উদার নৈতিক সমাজের তরফ থেকে যুদ্ধ ঘোষণার মতো মনে হয়েছে। কেবল মৌলবাদীদেরই বিশ্বাসের নীতিমালার ‘স্বাধীন চর্চা’য় বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয়েছে। ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে সুপ্রিম কোর্ট আফ্রো-আমেরিকানদের ভর্তি না করায় উত্তর ক্যারোলিনার গোল্ডবরো ক্রিশ্চান স্কুল এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী না হলেও বাইবেলে নিষিদ্ধ দাবি করে ক্যাম্পাসে আন্তবর্ণ ডেটিং বাতিল করার কারণে বব জোন্স ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে দেওয়া আইআরএস রুলিংয়ের প্রত্যয়ন করে।

    এটা ছিল ১৯২৫ সালের স্কোপস ট্রায়ালের অনুরূপ দুটি ভিন্ন মূল্যবোধ ব্যবস্থার সংঘাত। দুই পক্ষই বিশ্বাস করছিল, তারাই চূড়ান্তভাবে সঠিক। গোটা জাতি সম্পূৰ্ণ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ক্রমবর্ধমানহারে ১৯৬০-ও দশকের শেষে ও ১৯৭০-র দশকে রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার সংক্রান্ত ধারণা প্রসারিত করার সাথে সাথে আধুনিক সমাজের একেবারে প্রান্তে অবস্থানরত রক্ষণশীল ক্রিশ্চানরা এইসব হস্তক্ষেপকে সেক্যুলার আক্রমণ হিসাবে অনুভব করেছে। নিজেদের ম্যানহাটান, ওয়াশিংটন ও হার্ভার্ডের ‘উপনিবেশ’ ভাবতে শুরু করেছিল তারা। তাদের এই অভিজ্ঞতা বিদেশী শক্তির অধিকারে যাওয়ার ব্যাপারে তিক্তভাবে অসন্তোষ প্রকাশকারী মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশগুলোর চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন ছিল না। মনে হচ্ছিল সরকার যেন পরিবারের অন্দর মহলে হানা দিয়েছে: নারীদের সমান চাকরির অধিকার দিয়ে আনা সাংবিধানিক সংশোধনীকে ‘নারীদের অবস্থান বাড়িতে’ বাইবেলের এই আদেশের মুখে চপেটাঘাত বলে মনে হয়েছে। আইন করে শিশুদের উপর শারীরিক আঘাত সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যদিও বাইবেলে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, এভাবে সন্তানদের শৃঙ্খলা শেখানো বাবার দায়িত্বের ভেতর পড়ে। সমকামীদের সিভিল রাইটস ও বাক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল এবং অ্যাবর্শন বৈধ করা হয়েছিল। সান ফ্রান্সিস্কো, বস্টন, বা ইয়েলে উদারপন্থীদের চোখে যেসব সংস্কার ন্যায়সঙ্গত ও নৈতিক মনে হয়েছে সেগুলোই আরকান-স ও আলাবামার রক্ষণশীলদের কাছে পাপাচারপূর্ণ ঠেকেছে, যারা বিশ্বাস করত যে, ঈশ্বর অনুপ্রাণিত বাণীকে অবশ্যই অক্ষরে অক্ষরে ব্যাখ্যা ও অনুসরণ করতে হবে। উদার সমাজে নিজেদের মুক্ত ভাবতে পারেনি তারা। তারা যখনই ভাবতে গেছে যে ১৯২০-র দশকে এই রাজ্যগুলোর দুই তৃতীয়াংশই মদপানের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল কিন্তু এখন গোটা উত্তর আমেরিকা জুড়ে মানুষ মারিয়াহুনাকে বৈধতা দিতে প্রচারণা চালাচ্ছে, তখন কেবল এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে পেরেছে যে স্যাটানের প্রভাবে আক্রান্ত হচ্ছে আমেরিকা। ১০১

    এক নতুন ধরনের তাগিদ দেখা দিয়েছিল। লোকজন মনে করেছে যে সত্যিকারের ধর্ম ধ্বংসের পথে। ক্রিশ্চানরা পাল্টা যুদ্ধ না করলে হয়তো বিশ্বাসীদের আরেকটি প্রজন্ম নাও থাকতে পারে। ১৯৭০-র দশকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক বাবা-মা পাবলিক স্কুল থেকে তাদের ছেলেমেয়েদের ক্রিশ্চান প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নিয়েছেন, যেখানে তাদের ক্রিশ্চান মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া যাবে, তাদের সামনে ক্রিশ্চান রোল মডেল খাড়া করা যাবে ও যেখানে সকল শিক্ষাই বাইবেলিয় প্রেক্ষিতেই সম্পন্ন হয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৩ সালের ভেতর এইসব ইভাঞ্জেলিকাল স্কুলে ভর্তির সংখ্যা ছয়গুণ বেড়ে উঠেছিল আর প্রায় ১০০,০০০ মৌলবাদী শিশুকে বাড়িতেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।১০২ স্বাধীন ক্রিশ্চান স্কুল আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। এর আগে পর্যন্ত মৌলবাদী স্কুলগুলো বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন থাকলেও ১৯৭০-র দশকে এরা শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিবিধান পর্যালোচনা, ইনস্যুরেন্স প্যাকেজ সৃষ্টি, শিক্ষকদের নিয়োগ সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ও ফেডারেল পযায়ে লবিং গ্রুপ হিসাবে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্থা গঠন শুরু করে। এগুলোর বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ১৯৯০-র দশক নাগাদ আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অভ ক্রিশ্চান স্কুলস-এর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৩৬০, অন্যদিকে অ্যাসোসিয়েশন অভ ক্রিশ্চান স্কুল ইন্টারন্যাশনালের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৯৩৯।১০৩ আমাদের বিবেচিত আরও অন্যান্য স্কুল, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো ‘হলিস্টিক’ শিক্ষার জন্যে একটা আকাঙক্ষা কাজ করছিল যেখানে সমস্ত কিছু-দেশপ্রেম, ইতিহাস, নৈতিকতা, রাজনীতি ও অর্থনীতি-ক্রিশ্চান প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা যাবে। আধ্যাত্মিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগত সাফল্য মনে করা হয়েছে (যদিও সাধারণভাবে এটা সরকারী পর্যায়ে শিক্ষার তুলনায় ভালোই ছিল)। এটা ছিল অঙ্গীকারাবদ্ধ ও প্রয়োজনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্যুলারাইজেশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত উগ্র ক্রিশ্চানদের তৈরি করার ‘হটহাউস’ পরিবেশ। উদাহরণ স্বরূপ, আমেরিকার ক্রিশ্চান ইতিহাস পাঠ করেছে তারা, আব্রাহাম লিংকন ও জর্জ ওয়াশিংটনের মতো ব্যক্তিত্বদের ধর্মীয় পরিচয় পরখ করেছে, এবং কেবল সেইসব সাহিত্য ও দর্শনই পাঠ করেছে যেগুলো বাইবেলের সাথে ‘যথেষ্ট’ খাপ খায় ও বাইবেলিয় পারিবারিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়। ১০৪

    আমরা যেমন দেখেছি, কার্যকরভাবে সংগঠিত হওয়ার লক্ষ্যে কোনও একটি গ্রুপের স্পষ্টভাবে শত্রুকে সংজ্ঞায়িত করে এমন একটি আদর্শের প্রয়োজন। ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদী আদর্শবাদীরা শত্রুকে ‘সেক্যুলার মানবতাবাদ’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। ‘পাশ্চাত্যের’ সেক্যুলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ইসলামপন্থী ও কুকবাদীদের বিপরীতে আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টরা ভয়ঙ্কর রকম দেশপ্রেমিক ছিল, তাদের সামনে এমন সহজ কোনও লক্ষ্যবস্তু ছিল না। ‘ঘরের শত্রুর’ বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে। বছর পরিক্রমায় ‘সেক্যুলার মানবতাবাদ’ এক পিণ্ডারি শব্দে পরিণত হয়েছিল, মৌলবাদীরা তাদের অপছন্দের যেকোনও মূল্যবোধ বা বিশ্বাসকে এই তকমা এঁটে দিতে পারত। যেমন এখানে উদাহরণ হিসাবে ‘প্রো-ফ্যামিলি ফোরামের’ (এন.ডি.) দেওয়া মানবতাবাদের সংজ্ঞা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা:

    ঈশ্বরের প্রভুত্ব, বাইবেলের অনুপ্রেরণা ও জেসাস ক্রাইস্টের ঐশ্বরিকতা অস্বীকার করে।

    আত্মার অস্তিত্ব, মৃত্যু পরবর্তী জীবন, নিষ্কৃতি এবং স্বর্গ ও নরকের শাস্তি অস্বীকার করে।

    সৃষ্টির বাইবেলিয় বিবরণ অস্বীকার করে।

    বিশ্বাস করে যে পরম, সঠিক, ভ্রান্তি বলে কিছু নেই নৈতিক মূল্যবোধ স্বনির্ধারিত এবং পরিস্থিতি নির্ভর। নিজের কাজ নিজে করো, “যতক্ষণ না অন্যের ক্ষতি করছে।’

    নারী-পুরুষের পৃথক ভুমিকার অপসারণে বিশ্বাস করে।

    বয়স নির্বিশেষে সম্মত ব্যক্তিদের ভেতর প্রাক-বিবাহ যৌনতাসহ যৌন স্বাধীনতা, সমকামীতা, লেসবিয়ানিয়াজম ও অবৈধ সম্পর্কে বিশ্বাস করে। গর্ভপাত, ইউথানাশিয়া ও আত্মহত্যায় বিশ্বাস করে।

    দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সাম্যতা প্রতিষ্ঠা করতে আমেরিকার সম্পদের সম বণ্টনে বিশ্বাস করে।

    পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ, শক্তি নিয়ন্ত্রণ ও এর সীমাবদ্ধতায় বিশ্বাস করে।

    আমেরিকান দেশপ্রেম বিনাশ, স্বাধীন উদ্যোগ ব্যবস্থা, নিরস্ত্রীকরণ ও একক বিশ্ব ব্যবস্থার সমাজতান্ত্রিক সরকার সৃষ্টিতে বিশ্বাস করে।১০৫

    সম্ভবত সামান্য প্রভাব বিশিষ্ট সংগঠন আমেরিকান হিউম্যানিস্ট সোসায়েটি নামে এক সংগঠনের প্রথম ও দ্বিতীয় ইশতেহার থেকে নেওয়া হলেও এই তালিকাকে ষাটের দশকে বিকাশ ঘটা উদারবাদী মানসিকতার মোটামুটি যুক্তিসঙ্গত বর্ণনা হিসাবে ধরা যেতে পারে।

    তবে অধিকাংশ মতাদর্শের ধারা অনুযায়ী অব্যশ্যই এটা ক্যারিকেচার ও উদারবাদের অতিরঞ্জিত সরলীকরণও ছিল। যৌন সাম্য বা সম্পদের সুষম বণ্টন- আকাঙ্ক্ষী সকল উদারপন্থীই নাস্তিক ছিল না। সমকামীদের অধিকারে বিশ্বাসী উদারপন্থীরা কোনওদিনই অবৈধ সম্পর্কের অনুমোদন দেয়নি। কোনও উদারপন্থী ‘সঠিক বা ভ্রান্তি বলে কিছু নেই’ এমন কথা মানবে না; বরং অতীতের নৈতিক মানদণ্ডের কিছু পরিমার্জনার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশ্বাস করত তারা। অতীতের বৈরী জাতিগুলোর ইউরোপিয় ইউনিয়ন বা জাতি সংঘের মতো সংস্থার মাধ্যমে কাছাকাছি আসার আকঙ্ক্ষা কোনওভাবেই ‘একক সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের’ আকাঙ্ক্ষার কথা বোঝায়নি। তবে এই তালিকাটি অনেক উদার ক্রিশ্চান ও সেক্যুলারিস্ট সমানভাবে যেসব মূল্যবোধকে স্বপ্রকাশিতভাবে ভালো মনে করবে (যেমন দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি বা পরিবেশের জন্যে উদ্বেগ) সেগুলোকে মৌলবাদীদের চোখে দারুণভাবে অশুভ মনে হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরার ক্ষেত্রে উপকারী। এমন মনে হতে পারে যে এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেকটা ইরান ও ইসরায়েলের মতোই ‘দুই জাতি’ ছিল। আধুনিক সমাজ এমনভাবে মেরুকৃত হয়ে গিয়েছিল যে বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানরত মানুষের পক্ষে পরস্পরকে বোঝাই কষ্টকর হয়ে পড়ছিল। উপসংস্কৃতি বড্ড বেশি বিচ্ছিন্ন ও পৃথক হওয়ায় অনেকেই এমনকি সমস্যাটা কোথায় সেটাই হয়তো বুঝতে পারেনি।

    কিন্তু প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা সেক্যুলার মানবতাবাদীদের এই সংজ্ঞাকে মোটেই ক্যারিকেচার ভাবেনি। সেক্যুলার মানবতাবাদকে নিজস্ব ক্রিড, নিজস্ব লক্ষ্য ও একটি সুনির্দিষ্ট সংগঠন বিশিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্ম মনে করেছে তারা। এই বিশ্বাসের পক্ষে সমর্থন হিসাবে সুপ্রিম কোর্টের তোরকাসো বনাম ওয়াটকিন্স মামলার রায়ের পাদটীকার শরণ নিয়েছে তারা, যেখানে স্পষ্টভাবে ‘সাধারণভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস বিবেচিত বিষয়ের শিক্ষা দেয় না’ যেমন বুদ্ধধর্মমত, তাওবাদ, ও নৈতিক সংস্কৃতির মতো সেইসব বিশ্ব ধর্মের ভেতর ‘সেক্যুলার মানবতাবাদকে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।১৬ মৌলবাদীরা পরে রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদের মতো সরকার ও আইন প্রণেতাদের অনুসৃত ‘সেক্যুলার মানবতাবাদ’-এর মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে কঠোরভাবে জনগণের জীবন থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলার সময় একে কাজে লাগাবে।

    অবশ্য সেক্যুলার মানবতাবাদ সম্পর্কে মৌলবাদী এই পূর্বধারণাকে ষড়যন্ত্র বা উদারনৈতিক প্রবণতাকে খাট করার লক্ষ্যে গৃহীত মেধাবী বিকৃতি মনে করা ভুল হবে। ‘সেক্যুলার উদারবাদ’ পরিভাষাটি এবং এর পক্ষের সমস্ত কিছুই মৌলবাদীদের ভয়াবহ ভীতিতে পূর্ণ করে তোলে। একে অশুভ শক্তির ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখে তারা, অন্যতম দ্রুতপ্রজ মৌলবাদী আদর্শবাদী টিম লাহাইয়ের ভাষায় যা ‘ঈশ্বর বিরোধী, নৈতিকতা বিরোধী, আত্মসংযম বিরোধী ও আমেরিকা বিরোধী।’ সেক্যুলার মানবতাবাদ একটি ক্ষুদে ক্যাডারে পরিচালিত হয়, ‘ক্রিশ্চানিটি ও আমেরিকান পরিবারকে ধ্বংস করার জন্যে’১০৭ এরা সরকার, সরকারী স্কুল ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে। ৬০০ মানবতাবাদী সিনেটর, কংগ্রেসম্যান এবং কেবিনেট মন্ত্রী রয়েছেন, আছে প্রায় ২৭৫,০০০ আমেরিকান সিভিল রাইটস ইউনিয়ন। ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর উওম্যান, ট্রেড ইউনিয়নসমূহ, দ্য কার্নেগি, ফোর্ড এবং রকেফেলার ফাউন্ডেশনসমূহ ও সকল ইউনিভার্সিটি ও কলেজও ‘মানবতাবাদী’। আইন প্রণেতাদের পঞ্চাশ ভাগ সেক্যুলার মানবতাবাদের ধর্মের প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ।১০৮ বাইবেল ভিত্তিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকা এখন সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, এই বিপর্যয়ের জন্যে জন হোয়াইটহেড (রক্ষণশীল রাদারফোর্ড ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট) প্রথম সংশোধনীর ব্যাপক ভ্রান্ত পাঠকে দায়ী করেছেন। হোয়াইটহেড বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে রক্ষা করার জন্যে জেফারসনের ‘বিচ্ছিন্নতার প্রাচীর’ প্রণীত হয়েছিল, উল্টোটি নয়।১০৯ কিন্তু এখন মানবতাবাদী বিচারকগণ রাষ্ট্রকেই উপাসনার বস্তুতে পরিণত করেছেন। “রাষ্ট্রকে সেক্যুলার হিসাবে দেখা হচ্ছে,’ যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, কিন্তু ‘রাষ্ট্র ধার্মিক, কারণ এর “পরম লক্ষ্য” খোদ রাষ্ট্রের স্থায়ীকরণ।’ সুতরাং সেক্যুলার মানবতাবাদ ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল, এবং এর রাষ্ট্রের উপাসনা বহুঈশ্বরবাদীতা।১১০

    ষড়যন্ত্র কেবল আমেরিকার সমাজে সম্পূর্ণভাবে অনুপ্রবেশ করেনি, বরং বিশ্বকেই দখল করে নিয়েছে। মৌলবাদী লেখক প্যাট ব্রুকসের চোখে সেক্যুলার মানবতাবাদীরা “এক নতুন বিশ্বব্যবস্থায়” এক বিশাল বিশ্ব সরকার গঠনের নিজ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলা “বিশাল ষড়যন্ত্রমূলক নেটওয়ার্ক” গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বকে দাসত্বে পর্যবসিত করবে’১১১ অন্য মৌলবাদীদের মতো সর্বত্রই দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়া শত্রুকে দেখতে পেয়েছেন ব্রুক্স। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ওয়াল স্ট্রিট, যায়নবাদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকাণ্ডে তিনি এর কাজ দেখেছেন। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এই চক্রে রথশচাইল্ডস, রকেফেলার, কিসিঙ্গার, ব্রেযনিস্কি, শাহ এবং সাবেক পানামিয় স্বৈরাচার ওমর তোরিজো অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।১১২ সেক্যুলার মানবতাবাদের ত্রাস ছিল আমাদের আলোচিত অন্য বিকৃত ফ্যান্টাসির মতোই অযৌক্তিক ও সামাল দেওয়ার অতীত, এবং বিনাশের ভীতি থেকে এর উদ্ভব। আধুনিক সমাজ সম্পর্কে প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণভাবে ও বিশেষ করে আমেরিকায় ইসলামিস্টদের মতোই দানবীয়। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রাঙ্কি শেফারের চোখে পাশ্চাত্য পা বাড়াতে প্রস্তুত হয়েছে এক ইলেক্ট্রনিক অন্ধকার যুগে, যেখানে নতুন পৌত্তলিক বাহিনী তাদের হাতের সমস্ত প্রযুক্তিগত শক্তি নিয়ে সভ্য মানবতার শেষ শক্ত ঘাঁটিটি ধ্বংস করার দ্বারপ্রান্তে হাজির হয়েছে। আমাদের সামনে পড়ে আছে অন্ধকারের এক দৃশ্যপট। আমরা ক্রিশ্চান পাশ্চাত্য লোকদের পেছনে ফেলে যাবার সময় সামনে কেবল এক অন্ধকার উত্তাল হতাশার সাগরই বিছিয়ে আছে…যদি আমরা যুদ্ধ না করি। ১১৩

    ইহুদি ও মুসলিম মৌলবাদীদের মতো আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টরাও তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে বলে ভেবেছে, বাঁচতে হলে যুদ্ধ ছাড়া গতি নেই।

    উদারপন্থী মুসলিমদের পক্ষে যেমন সায়ীদ কুতবের আধুনিক জাহিলি নগরী শনাক্ত করা কঠিন ছিল ঠিক তেমনি আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের ফুটিয়ে তোলা আমেরিকার ছবি মূলধারার উদারপন্থীদের চেয়ে ব্যাপকভাবে ভিন্ন ছিল। মৌলবাদীরা নিশ্চিত ছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঈশ্বরের আপন রাষ্ট্র, কিন্তু তারা অন্য আমেরিকানদের অত্যন্ত প্রিয় ও প্রশংসিত মূল্যবোধসমূহকে ধারণ করে বলে মনে হয়নি। আমেরিকান ইতিহাস সম্পর্কে লেখার সময় তারা প্রায় সকলেই নস্টালজিকভাবে পিউরিটান প্রিলগ্রিম ফাদারদের শরণাপন্ন হয়েছে, কিন্তু কেবল সেইসব গুণেরই তারিফ করেছে যেগুলো উদারপন্থীদের কাছে মোটেই পছন্দনীয় নয়। পিউরিটানরা নিউ ইংল্যান্ডে কী ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস পেয়েছিল? প্রশ্ন তুলেছেন প্লাইমাউথ রক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রাস ওয়াল্টন। ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র? জীবন গেলেও না! আদি আমেরিকানরা নতুন বিশ্বে এমন কোনও ধারণাই সাথে করে আনেনি,’ অনুমোদনের ভঙ্গিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।১১৪ মুক্তির কথা ভাববার সময়ও ছিল না পিউরিটানদের, ‘গির্জা ও রাষ্ট্রে’ ‘অন্যদের সঠিক পথে কাজ করতে বাধ্যকারী’১১৫ ‘সঠিক সরকার প্রতিষ্ঠা’র ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিল তারা। একইভাবে বিপ্লবকে ‘গণতান্ত্রিক’ মনে করা হয়নি। আমেরিকান ইহুদি ও মুসলিম প্রতিপক্ষের মতো একই কারণে প্রটেস্টট্যান্ট মৌলবাদীরা গণতন্ত্রকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। প্যাট রবার্টসনের মতে, আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের ফাউন্ডিং ফাদারগণ ছিলেন কালভিনিস্ট, বাইবেলিয় আদর্শে অনুপ্রাণিত। তার ফলেই আমেরিকান বিপ্লব ফরাসী বা রাশিয়ান বিপ্লবের পথ ধরা থেকে রক্ষা পেয়েছে। আমেরিকান বিপ্লবীরা গণমানুষের শাসনের কথা ভাবতেই যাননি, তাঁরা এমন এক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসন করবে ও সাম্যের প্রবণতা বাইবেলিয় আইনে নিয়ন্ত্রিত হবে।১১৬ ফাউন্ডিং ফাদারগণ নিশ্চিতভাবেই একটি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ যা ইচ্ছে করতে পারবে, এমন খাঁটি, প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাননি।’১১৭ সরকার তার নিজস্ব আইন বাস্তবায়ন করছে, এমন ধারণায় মুসলিম মৌলবাদীদের মতোই সমান আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল তারা: সংবিধান [ঈশ্বরের] আইনের চেয়ে উন্নতর আইন প্রণয়ন করার অধিকার রাখে না, কেবল মানুষের উপলব্ধি ও অনুসরণের যোগ্য মৌল বিধিবিধানই পরিচালনা করতে পারে।’১১৮

    আমেরিকার অতীতের এই ভাবমূর্তি উদার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৌলবাদী ইতিহাস ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রতি-সংস্কৃতির ফল। সকলেই পতন ও আমেরিকান ধার্মিক সূচনা থেকে অবনতি প্রত্যক্ষ করেছিল: সুপ্রিম কোর্টের রুলিংস, সামাজিক উদ্ভাবন ও অ্যাবরশনের আইন ‘মুক্তির’ নামে সেক্যুলারাইজেশনকে প্রশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭০-র দশকের শেষ নাগাদ মৌলবাদীরা বুঝতে শুরু করেছিল যে তাদেরও একই দোষ স্বীকার করে নিতে হবে।১১৯ স্কোপস ট্রয়ালের পর পিছু হটে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখে সেক্যুলার মানবতাবাদীদের ফাঁকা মাঠে দাবড়ে বেড়াতে দিয়েছে তারা। এখন নৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি অঙ্গীকারের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তারা। ১৯৭০ দশকের গোড়ার দিকে টিম লাহাই কখনওই মৌলবাদীদের রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কথা বলেননি, কিন্তু দশকের শেষ নাগাদ তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, মানবতাবাদীরা কয়েক বছরের মধ্যেই ‘আমেরিকাকে ধ্বংস’ করে দেবে ‘যদি না ক্রিশ্চানরা গত তিনটি দশক যেমন ছিল তারা তারচেয়ে নৈতিকতা ও শোভনতার পক্ষে লড়াই করার জন্যে আরও নিশ্চিত হয়ে ওঠার ইচ্ছা করে। ১২০

    মৌলবাদীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা অন্যতম উপাদান ছিল তাদের প্রিমিলেনিয়লিজমঃ পৃথিবী যেহেতু অভিশপ্ত, একে সংস্কার করার কোনও অর্থ নেই। কিন্তু এখানেও একটা পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। ১৯৭০ সালে হাল লিন্ডসে দারুণ সফল একটি বই বের করেন, যার নাম ছিল দ্য লেট গ্রেট প্ল্যানেট আর্থ, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এটি ২৮ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। গতিশীল হাল নাগাদ ভাষায় পুরোনো প্রিমিলেনিয়াল ধারণাকে নতুন করে তুলে ধরেছে বইটি। অন্তিমকালে আমেরিকার কোনও বিশেষ ভূমিকা দেখতে পাননি লিন্ডসে, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, চলমান ঘটনাপ্রবাহে আসন্ন সমাপ্তির ‘লক্ষণ’ শনাক্ত করেই ক্রিশ্চানদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু ১৯৭০-র দশকের শেষের দিকে তিনি টিম লাহাইয়ের মতো মত পাল্টে ফেলেন। দ্য নাইন্টিন এইটিজ, কাউন্টডাউন টু আর্মাগেদন-এ তিনি যুক্তি দেখান, আমেরিকার কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এলে গোটা সহস্রাব্দ জুড়েই সে বিশ্বশক্তি হিসাবে টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু তার মানে আমাদের অবশ্যই সক্রিয়ভাবে নাগরিক ও ঈশ্বরের পরিবারের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের সক্রিয় হতে হবে, এমন সব কর্মকর্তাদের নির্বাচিত করতে হবে যারা কেবল বাইবেলের নৈতিকতারই প্রতিফলন ঘটাবেন না, বরং আমাদের দেশ ও আমাদের জীবনধারাকে রক্ষা করার জন্যে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ নীতি নির্ধারণ করবেন।১২১

    মৌলবাদীরা প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ করার মতো প্রতিপক্ষ ছিল তাদের। আমেরিকার কেমন হওয়া উচিত তার উদারপন্থী ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ছবি এবং শত ভয় সত্ত্বেও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, ক্রুসেডে সফল হওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি তারা রাখে।

    ১৯৭০-র দশকের শেষের দিকে আমেরিকার প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা অনেক উঁচু প্রোফাইল ও বৃহত্তর আত্মবিশ্বাসের অধিকার লাভ করে। এটা ছিল ১৯৮০-র দশকে তাদের সংগঠিত হওয়ার তৃতীয় কারণ। তারা আর স্কোপস ট্রায়াল থেকে পালিয়ে বনে আশ্রয় নেওয়া দুর্বল বনবাসী ছিল না। সমাজকে সম্ভাব্য খোলামেলা করে তোলা প্রাচুর্য তাদেরও প্রভাবিত করেছিল। দক্ষিণের নব জাগরণ ও সেখানে মৌলবাদের উত্থান অনেকের মনেই এই ধারণা সৃষ্টি করেছিল যে এখন তাদের পক্ষে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। ১৯৬০-র দশকের দিক থেকেই উদারপন্থী মুলধারার গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংখ্যা কমে আসার কথা জানা ছিল তাদের, যেখানে ইভাঞ্জেলিকাল চার্চের সংখ্যা পাঁচ বছরে ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। ১২২ ক্রিশ্চান ধর্মকে মোড়কবদ্ধ করে বিপননের বেলায় টেলিভেঞ্জালিজমও অনেক দক্ষ হয়ে উঠেছিল। জনগণের জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন ঈশ্বরকে যেন আবার নাটকীয় ও স্পষ্ট উপস্থিতি দিয়েছে বলে মনে হয়েছে। পর্দায় পেন্টাকোস্টালিস্ট যাজক ওরাল রবার্টসকে আপাতদৃষ্টিতে অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের সারিয়ে তুলতে দেখে ঐশী শক্তিকে সক্রিয় হতে দেখেছে তারা। সপ্তাহে ১০০,০০০ আত্মাকে রক্ষা করার দাবিকারী দারুণ শক্তিমান টেলিভেঞ্জালিস্ট জিমি সোয়াগার্টকে রোমান ক্যাথলিক, সমকামী ও সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর ভাষায় মুখখিস্তি করতে দেখে কেউ একজন তাদের ভাবনাকেই প্রকাশ্যে ভাষা দিচ্ছে বলে মনে হয়েছে। প্যাট রবার্টসন বা বাক্কাররা প্রতি সপ্তাহের অনুষ্ঠানে চাঁদা হিসাবে অনেক টাকা সংগ্রহ করতে পারছেন জানতে পেরে মৌলবাদীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, ঈশ্বরই অর্থনীতির সমস্যার সমাধান। তারা জোরের সাথে বলেছেন যে, পেতে হলে ক্রিশ্চানদের অবশ্যই দান করতে হবে। ঈশ্বরের রাজ্যে, রবার্টসনের মতে, ‘কোনও অর্থনৈতিক মন্দা নেই, নেই কোনও ঘাটতি। ১২৩ এটা এমন এক সত্যি দশটি ক্রিশ্চান টেলিভিশন সাম্রাজ্যের সাফল্য যার সাক্ষ্য দিয়েছে বলে মনে হয়েছে, প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার আয় করত এগুলো, হাজারের বেশি লোককে চাকরি দিয়েছে ও দারুণ পেশাদারি পণ্য হাজির করেছে। ১২৪

    তবে সময়ের মানুষটি ছিলেন জেরি ফলওয়েল। ধারণা করা হয়, ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দশটি বাড়ির চারটিতেই তাঁর ভার্জিনিয়ার লিঞ্চবার্গের স্টেশনের অনুষ্ঠান শোনা হত। ১৯৫৬ সালে এক অব্যবহৃত সোডা কারখানায় অল্প কয়েকজন লোক নিয়ে নিজস্ব মিনিস্ট্রি শুরু করেন তিনি। তিন বছর পরে সমাবেশটি আদি আকারের তিনগুণ হয়ে ওঠে, এবং ১৯৮৮ সাল নাগাদ টমাস রোড ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সদস্য ও অ্যাসোসিয়েট প্যাস্টরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৮,০০০ ও ষাটে। চার্চের বার্ষিক মোট আয় ষাট মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে, ৩৯২টি টেলিভিশন ও ৬০০টি রেডিও স্টেশনে সার্ভিস প্রচারিত হত।১২৫ টিপিক্যাল মৌলবাদী জেরি ফলওয়েল একটি বিচ্ছিন্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ জগৎ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। লিঞ্চবার্গে বাইবেলিয় ধারায় পরিচালিত একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি; ১৯৭৬ সাল নাগাদ লিবার্টি ব্যাপ্টিস্ট কলেজের ছাত্র ছিল ১৫০০। দাতব্য প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেছিলেন ফলওয়েল: মদ্যপদের জন্যে নিবাস, নার্সিং হোম ও গর্ভপাতের বিকল্প ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে দত্তক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৬ সাল নাগাদ স্বয়ং ফলওয়েল নিজেকে নেতৃস্থানীয় নবজন্মপ্রাপ্ত ব্রডকাস্টার ভাবতে শুরু করেছিলেন।

    সেক্যুলার মানবতাবাদকে পরাস্ত করার জন্যে বিকল্প সমাজ গড়ে তুলছিলেন ফলওয়েল। শুরু থেকেই লিবার্টি কলেজকে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে চেয়েছিলেন; এটা রোমান ক্যাথলিকদের নতর দাম বা মরমনদের ব্রিগহাম ইয়াং নয়। ১৯২০ সালে বব জোন্স নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার পর থেকেই মৌলবাদ বদলে গিয়েছিল। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা যথেষ্ট ছিল না। অন্য মৌলবাদী শিক্ষকের মতো ফলওয়েল ভবিষ্যতের জন্যে একটি ক্যাডার সৃষ্টি করছিলেন, ‘জীবনমুখী, নীতিবান ও আমেরিকরাপন্থী তরুণদের এক আধ্যাত্মিক সেনাদল বব জোন্স যেখানে ক্রিশ্চান স্কুলের জন্যে শিক্ষক সৃষ্টি করতে সেক্যুলার বিশ্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন, ফলওয়েল সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠান হাত করতে চেয়েছেন। লিবার্টি ছাত্রদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও পেশার জন্যে প্রশিক্ষিত করবে। তারা সমাজকে ‘রক্ষা’ করবে। কিন্তু তার মানে ছিল তাদের অবশ্যই মৌলবাদী রীতির কাছে সমর্পণ করতে হবে: ফ্যাকাল্টিকে অবশ্যই বিশ্বাসের বিধান মেনে নিতে হবে; সকল ছাত্রকে প্রতি সেমিস্টারে প্যারিশে ‘ক্রিশ্চান সার্ভিস অ্যাসাইনমেন্টে’ সম্পন্ন করতে হত; মদ বা ধূমপান করা যেত না; ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে রোববারে সারাক্ষণ সেরা পোশাক পরে থাকতে হত আর সপ্তাহে তিনদিন টমাস রোডে সার্ভিসে যোগ দিতে হত। বব জোন্সের বিপরীতে ফলওয়েল একাডেমিক স্বীকৃতি চেয়েছিলেন এবং এভাবে ক্যাম্পাসের শালীনতা ও চমৎকার শিক্ষার পরিবেশের অনুমোদনদাতা অভিভাবকদের অমৌলবাদী ছাত্রদের আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। মধ্যপন্থা বেছে নিয়েছিলেন ফলওয়েল। লিবার্টি একদিকে ষাট ও সত্তর দশকের উদারপন্থী আর্ট কলেজের খোলামেলা পরিবেশের একটি বিকল্প যুগিয়েছে, অন্যদিকে অন্যান্য কিছু প্রাচীন মাঝারি মানের বাইবেলিয় কলেজের বিকল্প সৃষ্টি করেছে। মতবাদগত জোর সত্ত্বেও ক্যাম্পাস বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে গুরুতর বিষয়ে বিতর্কের জন্যে উন্মুক্ত ছিল। এটা ছাত্রদের সেক্যুলার জগতের সাথে এর শর্তেই মিলিত হতে সক্ষম করে তুলবে, এবং এর রিকনকুয়েস্তা সূচিত করবে ১২৭

    আক্রমণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করছিলেন ফলওয়ল। এবং আধুনিক কায়দায়। কলেজ, চার্চ ও রেডিও স্টেশনে তাঁর পরিশ্রমী দলটির দিশাহারা ও মৃতপ্রায় বিশ্বের কাছে পৌঁছানোর প্রয়াস ছিল। তাঁর স্টেশনে কোনও চমক বা বুনো অ্যান্টিক ছিল না; ওল্ড টাইম গস্পেল আওয়ার রবার্টস, সোয়াগার্ট ও বাক্কারদের বাড়াবাড়ি এড়িয়ে যেত। ধর্মতত্ত্বের মতো প্রচারণায়ও অক্ষরবাদী ফলওয়েল তাঁর সার্ভিসগুলোকে পরখ করতেন ও ঠিক যেভাবে প্রচারিত হচ্ছে সেভাবেই রেকর্ড করতেন, ক্যামেরা ও তাঁর জারিজুরির প্রতি দৃকপাত করতেন না। লিঞ্চবার্গ ছিল সংযম, পুঁজিবাদ ও কালভিনিয় নীতিকর্মের পক্ষে। গোটা সাম্রাজ্যকে নতুন শপিং মলের আদলে গড়ে তুলেছিলেন ফলওয়েল, যেখানে সমন্বিত সেবা পাওয়া যেত। তাঁর প্রধান ধর্মতাত্ত্বিক পরামর্শদাতা এলমার টাউন্স যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ফলওয়েল বিশ্বাস করতেন, একই রকম উদ্যোক্তাসুলভ দক্ষতা দিয়ে আত্মার অধিকার লাভ করতে পারবেন তিনি। ব্যবসা, ফলওয়েল মনে করেছেন, উদ্ভাবনের আসল দিক এবং ‘টমাস রোড ব্যাপ্টিস্ট চার্চ বিশ্বাস করত যে একটি চার্চে বিভিন্ন এজেন্সির সমন্বিত মিনিস্ট্রি কেবল বিপুল জনগণকে গস্পেলের দিকে আকৃষ্ট করবে না, বরং আগত প্রতিটি ব্যক্তিকে আরও ভালোভাবে সেবা দিতে পারবে। ১২৮ ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে টমাস রোড যেন পুঁজিবাদের ধার্মিক সম্ভাবনা প্রমাণ করেছে বলে মনে হয়েছে, একটি মিনিস্ট্রির সাথে আরেকটিকে সম্পর্কিত করেছে ও সম্প্রসারিত হয়েছে। সেক্যুলার ক্ষমতার কারবারীরা যখন ১৯৮০-র দশকের ডানপন্থী নবজাগরণে নেতৃত্ব দানের উপযুক্ত একজন ব্যক্তির খোঁজ করছিল, ফলওয়েলই যোগ্যতম লোক ছিলেন। তিনি পরিষ্কারভাবে আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের গতিময়তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং এর সাথে সমান তালে পাল্লা দেওয়ার উপযুক্ত ছিলেন।

    কিন্তু তারপরেও ফলওয়েলের আপাত কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর প্রতি সাড়া দানকারী মৌলাবাদীদের আশঙ্কায় ভরিয়ে তুলেছিল। সেক্যুলার মানবতাবাদী ষড়যন্ত্র বলে কিছুর অস্তিত্ব বোঝানোর আশায় ফলওয়েল, লাহাই বা রবার্টসনের সাথে তর্কে যাওয়া বৃথা। মুসলিম ও ইহুদি মৌলাবাদীদের মতো বিনাশ ও ধ্বংসের এই বৈকল্যময় ভীতি তাদের প্রচারণায় তাগিদ ও দৃঢ় বিশ্বাস যোগ করবে। আধুনিক সমাজ বস্তুগত ও নৈতিক দিক থেকে বিরাট অর্জনের অধিকারী হয়েছে। নিজের ন্যায়নিষ্ঠতায় বিশ্বাস রাখার কারণ ছিল এর। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অন্ততপক্ষে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা মুক্তিদায়ী ছিল। কিন্তু মৌলবাদীরা এটা বুঝতে পারেনি, সেটা তারা বিকৃত বলে নয়, বরং তার কারণ তারা আধুনিকতাকে তাদের পবিত্রতম মূল্যবোধকে হুমকীদানকারী ও তাদের খোদ অস্তিত্বকেই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে মনে হওয়া আক্রমণ হিসাবে দেখেছে। ১৯৭০ দশক নাগাদ ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিম ঐতিহ্যবাদীরা পাল্টা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হবে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleজেরুসালেম : ওয়ান সিটি থ্রি ফেইস – ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    Next Article বুদ্ধ – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    Related Articles

    ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    আ হিস্ট্রি অফ গড – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    August 4, 2025
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    ইসলাম : সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    August 4, 2025
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    পুরাণ : সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    August 4, 2025
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    বুদ্ধ – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    August 4, 2025
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    জেরুসালেম : ওয়ান সিটি থ্রি ফেইস – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    August 4, 2025
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    দ্য গ্রেট ট্রান্সফর্মেশন : আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সূচনা – ক্যারেন আর্মস্ট্রং

    August 4, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অসম্পূর্ণ বই
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Our Picks

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }