Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    হাঁসুলী বাঁকের উপকথা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প529 Mins Read0

    ৫.৭ বনওয়ারীর ঘরে ঢুকেছে কালসাপিনী

    বাবাঠাকুর কর্তাবাবা! তুমি কি বিরূপ হলে বাবা? বিরূপ হবার কথা বটে, তোমার বাহনকে যে মেরেছে তাকে সে ক্ষমা করেছে। কিন্তু তোমার বাহনকে যে মারলে, তার চেয়েও কি তার বেশি অপরাধ?

    বনওয়ারীর মনে কথাটা প্রায়ই উঁকি মারছে। কাহারপাড়ার ছোঁড়ারা তাকে অমান্য করার লক্ষণ দেখাচ্ছে। তাকে অগ্রাহ্য করে করালী জেদ করে নিত্য সন্ধ্যায় এসে নিজের বাড়িতে আড্ডা জমাচ্ছে। সেখানে গিয়ে জমছে তারা।

    আর বনওয়ারীর ঘরে ঢুকেছে কালসাপিনী। সুবাসী কালসাপিনী। তার মতিগতি দেখে বনওয়ারীর সন্দেহ হয়–ও-ই হয়ত কোন্ দিন তার বুকে মারবে ছোবল!

    সুচাঁদ পিসি রূপকথা বলত—এক আজার কন্যেকে যে বিয়ে করত সে-ই মরত। কন্যের নাক দিয়ে আত্তিরে সুতোর মত সরু হয়ে বের হত এক সাপ, বের হয়ে সে ফুলত, কেমে কেমে ফুলে সে হত রজগর। তারপর সে ডংসাত আজকন্যের স্বামীকে।

    বনওয়ারী ভাবে, মেয়েটাকে দূর করে দেবে। কিন্তু ভয়ে পারে না। ভয় কালোশশীর প্ৰেতাত্মার ভয়, ভয় গোপালীবালার প্রেতাত্মার ভয়। তাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে—সুবাসী। মেয়ের প্রেতাত্মার হাত থেকে বাঁচাতে পারে মেয়ের ভাগ্যি—মেয়ের এয়োত। সুবাসীকে বিদায় করলে আবার তাকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু এ বয়সে আবার বিয়ে! সে লজ্জা করে তার। তা ছাড়া কাহারদের মেয়ের রীত চরিত সবই প্রায় এক রকম। গোপালীবালার মত আর কজনে হয়? তার উপর তার বয়স হয়েছে; আড়াই কুড়ি হল বোধহয়। তাকে বিয়ে করে যুবতী কাহারমেয়ের উড়ুক্ষু স্বভাব আরও খানিকটা উড় হবেই। তাই সে সুবাসীকে বিদায় করে না। তা ছাড়া সুবাসীকে ছাড়ব মনে করলেও মনটা কেমন করে। সুবাসী তাকে বোধহয় গুণ কি বশীকরণ করেছে। সুবাসীর ছলাকলা অদ্ভুত। তাই সুবাসীই বুকে তার ছোবল মারবে-সন্দেহ করেও সুবাসীকে কড়া নজরে রেখেছে, ছাড়ে নাই। করালী যখন সন্ধ্যাবেলায় আড্ডা জমায়, তখন বনওয়ারী সুবাসীকে সামনে নিয়ে ঘরে বসে থাকে। প্রহ্লাদ রতন গুপী প্রভৃতি প্রবীণরা আসে, পানাও আসে মজলিস হয়। কিন্তু পাগলের অভাবে মজলিস জমে না। কে গান গাইবে, ছড়া কাটবে। পাগল আবার চলে গিয়েছে ‘গেরাম ছেড়ে গিয়েছে গোপালীবালার শ্রাদ্ধের পরের দিনই। পাগলের জন্য দুঃখ হয় বনওয়ারীর। পাগলের অভাবে মজলিসে হয় শুধু কাজের কথা। সুবাসীর রমণকাকা তামাক সাজে। কেরোসিন নাই, বিনা আলোতে মজলিস, শুধু জ্বলে একটা ধুনি। আঙারের শিখায় লালচে ছাপ পড়ে সকলের মুখের উপর। নানা কথার মধ্যে চাষবাসের কথা এসে পড়ে।

    চাষের কথা এলে বনওয়ারীর সংশয়, মনের ছমছমানি খানিকটা ঘুচে যায়। এবার দেবতা ‘পিথিমী’র উপর সদয়। হাঁসুলী বাঁকের বাবাঠাকুরও নিশ্চয় সদয়, নইলে পিথিমীতে এত ধান কেন? পিথিমীর মধ্যে হাঁসুলী বাঁকে আবার সবচেয়ে বেশি ধান। বাবাঠাকুর সদয় না হলে এমন হয় কখনও? মাঠভরা সবুজ ধানে কালো মেঘের ঘোর লেগেছে। এক-একটি ধানের ঝাড় দু হাতের মুঠোতে ধরা যায় না।

    সকলেই বলো, এবারে বছরের মতন একটা বছর বটে।

    পানা বলে—ব্যানোকাকার ভাগ্যের কথা বল একবার। সায়েবডাঙার জমিতে এবারেই কোদাল ঠেকালে, এবারেই দেখ কি ধানটা পায়।

    বনওয়ারী মনে মনে কথাটা স্বীকার করে, কিন্তু মুখে বলে—ভাগ্যি আমার লয়, ভাগ্যি বাবু মশায়দের, যুদ্ধের বাজারে লাখো লাখো টাকা ঘরে ঢুকছে আমি শুনেছি। তাদের জমির পাশে আমার জমি, তাতেই–লইলে দেখতিস অন্য রকম হত।

    রতন বলে—উটি বললে শুনব না ভাই। সায়েবডাঙায় তোমার ধানই সবচেয়ে জোর। তারপর স্মিতমুখে ঘাড় নেড়ে বলো, জবর ধান হয়েছে, গোছা কি!

    পানা হেসে বললে—কাকি, এবার কিন্তু নবানে আমাদিগে খাওয়াতে হবে। কথাটা বলে সুবাসীকে। হারামজাদা পানা কম নয়; ছোকরা হয়েও মাতব্বর সাজলে কি হবে, বয়সের বদমায়েশি যাবে কোথায়? কোনোমতে সুবাসীর সঙ্গে দুটো বাক্য বলবার ফাঁক পেলে হয়! সুবাসীকে উত্তর দেবার সুযোগ দেয় না বনওয়ারী, তাড়াতাড়ি বলে ওঠেআচ্ছা আচ্ছা, পিঠে এবার খাওয়াব।

    সুবাসী হাসে, সে বুঝতে পারে বনওয়ারীর মনের কথা। হাসতে হাসতে উঠে যায়, মৃদুস্বরে বলে যায়—মরণ! কাকে যে বলে, সে কথা ঠিক বুঝতে পারে না কেউ।

    রাত্রিবেলা জিজ্ঞাসা করে বনওয়ারীকাকে বললি সে কথাটা?

    –কোন্ কথা?

    —সেই যি বললি ‘মরণ’?

    —নিজেকে, আবার কাকে?

    –না।

    —তবে তোমাকে।

    –কেনে?

    —কেনে? সুবাসী তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে—তা তুমি বুঝতে পার না? এমনি বোকা তুমি লও। ওই মৰ্কট পানার সঙ্গে কথা বললে আমি ক্ষয়ে যেতাম নাকি?

    বনওয়ারী একটু চুপ করে থাকে, তারপর বলেপানা যদি মৰ্কট না হত, করালীর মত অমনি লম্বা চওড়া ফেশানদুরস্ত হত তবে?

    সুবাসী বনওয়ারীর মুখের দিকে সাপের মত নিম্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। ঠিক সাপের মত। চোখ দুটোই শুধু চকচক করে, মুখের মধ্যে কোনো ভাব ফোটে না।

    বনওয়ারী প্রশ্ন করে রা কাড়িস না যে?

    সুবাসী কথা না বলে উঠে চলে যায় বিছানা থেকে। দাওয়ায় গিয়ে বসে থাকে। বনওয়ারীও কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থেকে উঠে গিয়ে সুবাসীকে তোষামোেদ করে ফিরিয়ে আনে।

    একলা ঘরের মধ্যে ভয় অনুভব করে সে। গোপালীবালা, কালোশশী। বেশি ভয় গোপালীকে। প্রথম পক্ষের পরিবার মরলে বিয়ের ‘কুম কলসি’ অর্থাৎ জলভরা ঘট কাখে নিয়ে ফেরে। স্বামীর মৃত্যু না হলে সে কলসি ফেলতে পায় না। ঠিক মৃত্যুর কিছুকাল আগে সেই কলসি সে ফেলে দেয়। শব্দ ওঠে। কোথাও কিছু পড়ে না, অথচ একটা শব্দ শোনা যায়। পাড়ায় এখন কারও বাড়িতে বাসন পড়ার কোনো শব্দ উঠলেই বনওয়ারী চমকে ওঠে, কৌশল করে খোঁজ নিয়ে আশ্বস্ত হয়। সুবাসীকে ছুঁয়ে শুয়ে থাকে। সুবাসী বড় চতুর। বনওয়ারীর মনের কথাটি ঠিক বুঝতে পারে। বলে-ভয় নাই, বড়কী কোণে দাঁড়িয়ে নাই, ঘুমোও। টুটি টিপে মারবে না তোমাকে।

    বনওয়ারী চুপ করে পড়ে থাকে, ঘুম আসে না তার। অকালে সে মরবে কেন? তাকে বাচতে হবে। ভরাভর্তি সুখের সময় তার এখন। সে এখন পাঁচ পাঁচ বিঘা জমির মালিক। সে জমিতে প্রথম বছরেই প্রচুর ফসল হয়েছে। নতুন বিয়ে করেছে।

    সে উঠে বসে। সুবাসীর নাকের কাছে হাতের তালু রেখে নিশ্বাস অনুভব করে। সুততার মত কিছু বের হচ্ছে কি না পরীক্ষা করে।

    অন্ধকার কাটলে সকালে আলো ফুটলে বনওয়ারী হয় বীর বনওয়ারী। ছুটে চলে সে মাঠের দিকে।

    ***

    কত কাজ, কত কাজ!

    বর্ষা কেটেছে, আকাশ হয়েছে নীলবরন। মা-দুর্গার চালচিত্তিরের ছবির ফাঁকে নীল রঙের মত ঘোরালো নীল হয়ে উঠেছে। কার্তিকের বাহন ময়ূরের গলার মত ঝকমক করছে। হাঁসুলী বাঁকের মাঠে হাতিঠেলা ধান বাতাসে লুটোপুটি খাচ্ছে, সূর্যঠাকুরের রোদ যেন দুধে ধোওয়া। কাহারপাড়ার মরদেরা ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষেতে ক্ষেতে। দেড় হাত দু হাত উঁচু ধানের জমির মধ্যে ড়ুব দিয়েছে, হাঁটু গেড়ে বসে বুনো পাতালের মত চলে বেড়াচ্ছে, আগাছা তুলে ভেঙে মুচড়ে পুঁতে দিচ্ছে মাটিতে, পচে সার হবে।

    কিন্তু মধ্যে মধ্যে আজকাল ব্যাঘাত ঘটছে কাজে; মাথার উপর দিয়ে বড় বড় ভীমরুলের ঝাঁকের মত গো-গো শব্দ করে উড়োজাহাজের দল চলে যায়; তখন হাতের কাজ ফেলে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে দেখে। বনওয়ারী পর্যন্ত দেখে।

    ওঃ, কাল যুদ্ধ রে বাবা! ওদিকে চন্ননপুরে আর সব বাবু মহাশয়দের ‘গেরামে’ শহরে। লেগেছে গান্ধীরাজার কাণ্ডকারখানা। লাইন তুলছে, সরকারি ঘরদোর জ্বালাচ্ছে; পুলিশ মিলিটারিতে গুলি করছে, গুলি খেয়ে মরছে, তবু ভয়-ডর নাই।

    চাল-ধানের দর হু-হু করে বাড়ছে। বলছে—আরও বাড়বে। ধানের দর বাড়লে ভাবনা নাই। এবার ধান প্রচুর হবে। শুধু আশ্বিন মাসটা পার করতে পারলেই হয়। এক ‘আচাল’ অর্থাৎ এক পসলা বেশ জোরালো জল হলেই বাস, আর চাই কি! আধ হাতের চেয়েও লম্বা শিষ বেরিয়ে দিনে দিনে পরিপুষ্ট হয়ে পেকে মাটিতে আপনার ভারে শুয়ে পড়বে। এবার মনিবদের দেনাপত্ৰ মিটিয়ে ধান ঘরে আনবে কাহারেরা। বনওয়ারীর ইচ্ছে আছে, করালীকে ডেকে দেখাবে, বলবেদেখু! কাহারপাড়ার আদি মা-লক্ষ্মীকে দেখে যা। আশা আছে, ছোঁড়ারা যতই চুলবুল করুক এবার হাঁসুলী বাঁকের মা-লক্ষ্মী মাটিকে সেবা করার রস বুঝিয়ে দেবেন তাদের। তবু খটকা লাগছে।

    যুদ্ধ তো শুধু ধানের বাজারে আগুন ধরায় নাই। সবকিছুর বাজারে আগুন ধরিয়েছে। কাপড় মিলছে না, কাপড়ের কথা মনে করতে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বনওয়ারী। গোপালীবালার শেষ কাজে সে কাপড় দিতে পারে নাই। কাহারপাড়ার মেয়েগুলি চিরদিনের বিলাসিনী, তারা ফুলপাড় কাপড় পরতে ভালবাসে। কিন্তু তারা ময়লা কাপড় পরে বেড়াচ্ছে।

    কেরোসিন নাই। চিনি তারা খায় না, তবু অসুখবিসুখে পুজো-পার্বণে দরকার হয়। ‘নিউনাইন-বোডে’র কার্ডেও আর পাওয়া যাচ্ছে না। শোনা যায়, দেশেই নাই। এদিকে ‘মালোয়ারী’ আরম্ভ হয়েছে বেশ জোরের সঙ্গে, কিন্তু ‘কুনিয়ান পাওয়া যাচ্ছে না। শিউলিপাতার রস সম্বল। আশ্বিনের এই কটা দিন যেতে না যেতে পাড়ার শিউলিগাছের পাতা অর্ধেক শেষ হয়ে এল। এখন থেকে জ্বরের আরম্ভ;—পড়বে উঠবে, আবার পড়বে, দু-একজন মরবে বিকার হয়ে। বেশি মরবে শীতকালে, বুড়োঠারাই মরবে বেশি। চিরকালই এই হয়ে আসছে। এবার ভয়—‘কুনিয়ান নাই। এরই মধ্যে পড়েছে পুজোর কাজ-পুজোর ভাবনা। মাদশভুজা আসবেন বেটা-বেটী-বাহন নিয়ে, সিংহীর উপর চড়া মা-জননী, তার সমারোহ কত! দেশ করবে কলকল কলকল, ঢাক বাজবে, ঢোল বাজবে, সানাই বাজবে, কাঁসি বাজবে; নাচবে গাইবে, খাবে পরবে। সে মায়ের ঘরের ওই দূরে দাঁড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বলবে—অক্ষে কর মা, বিপদে আপদে, অণে বনে, জলে মাটিতে অক্ষে কর। ধৰ্ম্মে মতি দাও, লোভের হাত থেকে বাঁচাও; আমরা ক্ষুদু মানুষ, আমরা দুই হাতে পূজা করছি, দূর থেকে তুমি পেসন্ন দৃষ্টিতে দেখ, তোমার দশ হাতে আমাদিগে দিয়ে যাও। আমাদের পাপ তাপ সব খণ্ডন কর মা।

    দশ হাতওয়ালা মেয়ে, সে কি কম! তার পুজো! ঘরদোর নিকুতে হবে। নতুন কাপড় চাই। টাকা-পয়সার টানাটানি। গোরস্ত বাড়িতে পুরনো ধান ফুরিয়ে এল, নতুন ধানের দেরি আছে; এই সময়ে খরচের পালা। এবার ওই যুদ্ধের জন্যে বিপদ হয়েছে বেশি। মনিব মহাশয়েরা বেশি ধান দিতে চাচ্ছেন না। ধান বেঁধে রাখছেন। খোরাকির উপর বেশি ধান চিরকাল মনিবেরা এ সময়ে দিয়ে থাকেন। এবার বলছেন না।

    করালীর কথা এক এক সময় সত্যি বলে মনে হয়। নিজের গরজ ছাড়া ওরা কিছু বুঝবে না। ধান চালের দর দিন দিন বাড়ছে, সুতরাং কৃষাণদের ধান দেবে না। একেবারে বন্ধ করলে তারাও চাষ বন্ধ করবে—কাজেই পেটে খাবার মত দাও। কাপড় কিনতে হবে, পুজো আসছে— সে বিবেচনা করবে না। রতন কালই বলেছে বনওয়ারী, আর বুঝি জাত রাখতে পারলাম না। মনিব তো ধানের কথায় তেড়ে মারতে এল। বলে, কাপড়? কাপড় হল কি না হল দেখবার ভার আমার নয়। তারপর গালাগালের চরম। শ্যাষে গদগদ মার!

    রতনের মনিব হেদো মণ্ডল এমনিই গোয়ার। পানার মনিব পাকু মণ্ডল হাতে মারে না, কথায় মারে। ফুর-ফুরু করে এঁকো টানে আর বলে-হ; হু; হু। ‘হু’ই পুরে যায়, শেষকালে বার করে হিসেবের খাতা। বলে বাকিতে তো পাহাড় হয়েছে। এর ওপর বেশি ধান? তা খাবার মত দিতে হবেই, দোব। বেশি দিতে বোলো না বাবা, পারব না।

    পানা মাথায় হাত দিয়ে বসেছে। ছেলে-ছোকরারা বনওয়ারীকে বলছে- তোমার কথায় আমরা চাষে লেগেলি। এর উপায় কর তুমি।

    আড়ালে গজগজ করছে—এর চেয়ে কারখানায় কাজ করলে বেঁচে যেতাম আমরা।

    বনওয়ারী চাষের কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাঙল আর চন্ননপুর যাচ্ছে। জাঙলে যাচ্ছে চাষী মহাশয়দের কাছে, বেশি ধান কিছু দিতেই হবে, আর দিতে হবে সারের দাদন। জমির জন্য সার দেবে কাহারেরা। টাকার দরের চেয়ে এক গাড়ি হিসেবে বেশিই দেবে। নিমরাজি হয়েছেন। তারা। আর চন্ননপুরে যাচ্ছে দোকানদারদের কাছে, পুজোর সময় কাপড়ের দাম কিছু কিছু বাকি রাখতে হবে। ধান উঠলেই পাই-পয়সা মিটিয়ে দেবে কাহারেরা, আমি দায়ী থাকছি।

    দত্ত মহাশয় রাজি হয়েছেন। ধানের কারবারের সঙ্গে তার কাপড়ের কারবারও আছে। বাকিটা টাকায় নেবেন না, নেবেন ধানে, পৌষ মাসে। তবে বলেছেন—এই বাজারদরে ধান দিতে হবে।

    বনওয়ারী প্রথমটা আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। দত্ত মহাশয় কি ক্ষেপে গেলেন। আশ্বিন মাসে ধানের দর বছরের মধ্যে চড়া থাকে, নতুন ধান উঠলেই ধানের দর নেমে যায়। সুতরাং হঠাৎ চড়াৎ করে কথাটা মাথার মধ্যে খেলে গিয়েছে তার; ধানের দর চড়ে চলেছে—চড়েই চলেছে, তা হলে নতুন ধান উঠলেও ধানের দর নামবে না!

    চার টাকা সাড়ে চার টাকারও উপরে উঠবে ধানের দর? এ তো ভূ-ভারতে কেউ কখনও শোনে নাই! ন টাকা চালের মন! হে বাবাঠাকুর, কালে কালে এ কি খেলা খেলছ বাবা! ওঃ! তার পাঁচ বিঘে জমির ধানে এবার খামার ভরে যাবে। বিঘেতে তিন বিশ করে ফলন হলে পনের বিশ ধান। ভাগের জমিতে ধান হবে তার চেয়ে বেশি, অবশ্য ভাগ হবে মনিবের সঙ্গে; আঠার বাইশ ভাগ। চল্লিশ ভাগ করে, মনিব পাবেন বাইশ ভাগ, বনওয়ারী পাবে আঠার ভাগ। তাতেও মনিবের দেন শোধ দিয়েও ফিরে পাবে সে পাঁচ সাত বিশ। এক এক বিশে দু মন দশ সের ধান। হিসেব করতে গিয়ে মাথা ঘুরে যায় বনওয়ারীর। বুড়ো রমণকে ডেকে বলে—অমনখুড়ো, হেসেবটা কর দি-নি!

    বুড়ো দিনরাত বসে তামাকই খাচ্ছে-ফুড়ৎ ফুড়ুৎ। কাজের মধ্যে গরুগুলিকে নিয়ে মাঠে যাওয়া। বাস্, তারপর কুটোটি ভেঙে উপকার করবে না। ভাত খায় এক কড়ি।

    বুড়ো বলে—হেসাব? তবেই তো মুশকিলে ফেলালে। আটপৌরে-পাড়ার লোকে ধানচালের কারবার কখনও করেছে? বস্তায় ভরে ধান চুরি করে এনেছি, সামালদারের ঘরে ফেলেছি, ঠাউকো দাম দিয়েছে। সুবাসীকে বল বরং, উ পারবে, চাষী মাশায়দের বাড়িতে তিন-চার বছর ধান-নানী ছিল।

    সুবাসী হিসাব মন্দ করে না। পনের বিশ, বিশে দু মন—তা হলে দু পনের মন আর পনের দশ সের। আঙুল গুনে হিসেব করে। হিসেব শেষ করে হঠাৎ পা ছড়িয়ে বসে হাসতে হাসতে বলে—এইবার আমি কদব। হা!

    ভারি ভাল লাগে বনওয়ারীর। হেসে বলে—কেনে খুকুমণি, কাঁদবা কেনে? কি চাই?

    –এবার পুজোতে আমি ভাল কাপড় লোব-খুব ভাল।

    বনওয়ারীও রসিকতা করে—না খুকু, কেঁদো না। আমি নিশ্চয় কিনে দোব, নিচ্চয় দোব। সুবাসী হিসাব করে আঙুল গুনে—আর পুজোতে আছে রাম-দুই-তিন-চার—

    ***

    সে দিনগুলিও ফুরিয়ে এল।

    নয়ানের মা আর সুচাঁদের কান্না শুনে বুঝতে পারা যায়। হাঁসুলী বাঁকের উপকথায় এই হল নিয়ম। পিতিপুরুষেরা বলে গিয়েছেন পুজোতে পরবে, বিয়েতে-শাদিতে সুখের দিনে সুখের কথা মনে করতে হয়; যারা ছিল নাকি তোমার আপনজন, যারা তোমাকে ভালবাসত, তুমি যাদের ভালবাসতে, যারা আজ নাই, তাদের মনে করে দু ফোঁটা চোখের জল ফেলো। টাটকা যারা যায় তাদের কথা আপনিই মনে পড়ে, সে শুধু হাঁসুলী বাঁকে নয়—চন্ননপুর পর্যন্ত পৃথিবীসুদ্ধ লোকেরই মনে পড়ে—বুক-ফাটানো কত কথা কান্নার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে, চোখ ফেটে আপনি জল ঝরে বুক ভাসিয়ে দেয়। নয়ানের জন্য তার মায়ের কান্না সেই কান্না, গোটা কাহারপাড়াটির পুজোর আনন্দ তাতে লজ্জা পাচ্ছে। নয়ানকে মনে করে চোখের জলে তার জিভের বিষ আজ ধুয়ে গিয়েছে। কাঁদছে এই পুজো উপলক্ষ করে, যে দিন থেকে সে নয়ানকে ডাকছে, সেই দিন থেকে আর কাউকে শাপ-শাপান্ত করে নাই সে।

    সুচাঁদ কাঁদে সেই নিয়মের কান্না। উপকথার হাঁসুলী বাঁকের সে-ই যে আদ্যিকালের বুড়ি। সে তার বাপের জন্যে কাদে, ভাইয়ের জন্যে কাদে, স্বামীর জন্যে কাদে, জামাইয়ের জন্যে কাদে, তারপর একে একে কাহারপাড়ার যত মরা লোকের নাম ধরে কাদে আর পায়ের হাড়ে হাত বুলোয়, পায়ে তার বাতের বেথা’ ‘কনকন’ করছে। মধ্যে মধ্যে আক্ষেপ করে, আঃ, আমি মরলে আর কাহারপাড়ার এ নিয়ম কেউ মানবে না। কালে কালে ‘দ্যাশঘাট’ বদলে গেল, তার সঙ্গে গেল মানুষও অনাচারী অধৰ্মপরায়ণ হয়ে। কথার শেষে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলে-আঃ! আঃ! হায় হায় রে!

    আরও বলে—বনওয়ারী আমার পাখীকে করালীকে তাড়ালে—ধরমনাশা কুলনাশা বলে। তা চোখ তো আছে, তাকিয়ে দেখুক-ধরমকে কে একেছে, কুলকে কে একেছে। তবে হ্যাঁ, করালীর একটি ঘাট হয়েছে। একশো বার বলব, হাজার বার বলব—ঘাট হয়েছে বাবার বাহনটিকে পুড়িয়ে মারা। বারবার সে হাত জোড় করে প্রণাম করে সেই মৃত সাপটিকে। প্ৰণাম করতে করতে হঠাৎ কাঁদতে আরম্ভ করে স্মরণ করে—‘চিত্তবিচিত্ত’ অর্থাৎ চিত্রবিচিত্র রূপ নিয়ে বাবা পুজোর দিনে ফিরে এস রে! বাঁশবনে শিস দিয়ে ঘুরে বেড়াও মনের সাধে, ব্যাঙ খাও ইদুর খাও বাবা রে! গায়ের মঙ্গল কর রে!

    বনওয়ারী বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। জ্বালালে রে বাবা! বুড়ি মরেও না!

    রতন বললে—উ অমুনি বটে।

    অমুনি বটে—অমুনি বটে! বলতে বলতে রতনের হাত থেকে কোটা কেড়ে নিয়ে টানতে আরম্ভ করে।

    প্ৰহ্লাদ বলে—তা হলে চল একদিন উ-পারের মোষডহরী মউটোয়।

    হঠাৎ মাঠের জলের অভাব ঘটে। আশ্বিনের প্রথম থেকেই বৃষ্টি ধরেছে, ক্ষেতের জল প্ৰায় শুকিয়ে এসেছে। অথচ আশ্বিন মাসে ধানের পেটে ‘থোড় হয়েছে, এখন কানায় কানায় ভরা জল চাই। পিতিপুরুষে বলে গিয়েছেন একটি ধানের ঝাড় দিনে পঁচ ঘড়া জল টানে; মাঠে এবার হাতিঠেলা ধান। এ ধান নষ্ট হলে কাহারেরা বুক ফেটে মরে যাবে। ষোল বছরের পুত্রসন্তান মরলেও এত দুঃখ হয় না। তাই কথা হচ্ছে কোপাইয়ের বাঁধ বাঁধবার। কোপাইয়ের বুকে বাঁধ দিয়ে, কোপাইয়ের জলে মাঠ ভাসিয়ে দিতে হবে। জাঙলের মনিবেরা হুকুম দিয়েছেন। সেই বাঁধের কথা হচ্ছে।

    বনওয়ারী অনেক কথা ভাবছে। বাঁধ বাঁধতে গেলেই দু-চার জন যাবে। বাঁধ বাঁধতে জলের ধাক্কায় যাবে, তার উপর আছে দাঙ্গা। বাঁধ বাঁধতে গেলেই নদীর নিচে লোকেরা ফৌজদারি করতে আসবে। আসবে শেখেদের দল। এ সব ছাড়া, করালী নাকি বলেছে—মিলিটারিতে বাঁধ বাঁধতে দেবে না। তারা উড়োজাহাজের আস্তানা করেছে, চন্ননপুরের ঘাটের খানিকটা তফাতে সেখানে ‘পাম্প বসিয়ে জল তুলছে। চান করে, উড়োজাহাজ ধোওয়া-মোছা হয়, রান্নাবান্নার বেবাক জল ওই কোপাই থেকে ওঠে। তারা নাকি বাঁধ বাঁধতে দেবে না।

    বনওয়ারীর ধারণা-করালীই লাগান-ভজান করে এইটি করিয়েছে। মনিবেরা বলেছেন–নাঃ। ও-বেটার সাধ্যি কি! তারা গালাগালি দিচ্ছেন যুদ্ধকে আর সাহেব মহাশয়দিগে। তাঁরা বলছেন, তারা সায়েবদের কাছে যাবেন, কাহারদের উষ্যগ করতে বলেছেন। আর বলেছেন পুজোটাও দেখ, মা এবার গজে আসছেন।

    বনওয়ারী বললে—আমি বলি অতন, পুজোটা যাক। গজে আসবেন মা। দু-এক আচাল ছিটোবে না গজে? তা’পরে ধরমোষ পাঁঠা খাবেন মা, মুখ ধুতেও তো হবে।

     

    ষষ্ঠীর দিন উৎফুল্ল হয়ে উঠল কাহারেরা। এসেছে—এসেছে। মেঘ এসেছে।

    আকাশে মেঘ দেখা দিয়েছে। ‘আউলি-বাউলি’ অর্থাৎ এলোমেলো বাতাস বইছে। মধ্যে মধ্যে ফিফি করে বৃষ্টি যেন খুঁড়ো পুঁড়ো হয়ে ভেসে আসছে।

    বনওয়ারী উৎসাহভরে কাহারদের বললে চল, কাপড় আনিগা চল। আকাশে মেঘ উঠেছে, দত্ত মশায় নির্ভাবনায় কাপড় দেবে।

    নসুবালা নতুন শাড়ি পরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হা-হা করে আসছে। বলছে—আমাদের কি মাঠের পয়সা? আমাদের পয়সা কলির কারখানার। ঝম্‌-ঝম্‌-ঝম্ লগদ লগদ! আমাদের কাপড় সম সম কালে নয়, আগে-ভাগে।

    যাবার আগে সুবাসী বললে আমি কিন্তু পাখীর মত কাপড় লোব।

    বনওয়ারীর মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল।–কার মতন?

    –পাখীর মতন।

    —কেনে, কেনে, কেনে? পাখীর মতন কেনে?

    অবাক হয়ে গেল সুবাসী। কয়েক মুহূর্ত সে স্তম্ভিত হয়ে রইল, তারপর ছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলে। বনওয়ারী পাঁতে দাঁত ঘষে বললে—গোসা-ঘরে খিল দিলেন মানিনী। তিন লাথিতে দেব গতর ভেঙে। ঘরের দরজায় শিকলটা তুলে দিয়ে সে চলে গেল। থাক, বন্ধ হয়েই থাক।

    দোকানে গিয়ে কিন্তু সবচেয়ে ভাল শাড়িখানি কিনলে। তাতে কিছু বেশি ধার হয়ে গেল দোকানে। দত্ত মশায় পর্যন্ত রসিকতা করলেন। রতন প্ৰহাদ হাসতে লাগল। ছেলে-ছোকরারা। গোপনে পরস্পরের গা টিপে হাসলে। তা হাসুক। মনে মনে একটু লজ্জা হল। দোকান থেকে বেরিয়ে আবার ফিরতে হল। কত্তাবাবার পুজো আছে দশমীর দিন। বিজয়া দশমীর দিন বলি। হবে, পুজো হবে। তার কাপড় কিনতে হবে। মনে মনে আফসোস হল-বাবার কাপড় কিনতে ভুল হয়েছিল তার। ছি! ছিঃ! ছি!

    এমন কাপড়ও কিন্তু সুবাসী হাসিমুখে নিলে না। অনেক সাধ্যসাধনা করে তার মান ভাঙিয়ে বনওয়ারীকে শেষ স্বীকার করতে হল—কাল সকালে উঠেই সে চন্ননপুরে গিয়ে উড়োজাহাজপেড়ে ‘অঙিন কাপড় এনে দেবে পাখীর মতন।

    হায় রে কপাল, কাপড়ের পাড়েও এল উড়োজাহাজ!

    এবার সুবাসী আড়চোখে চেয়ে হেসে বললে! কাপড়খানা পরে ফুড়ৎ করে উড়ে যাব।

    বনওয়ারী হাসলে। দুঃখও হয়, হাসিও পায়। সুবাসী এসে তার গলা জড়িয়ে ধরলে এবার। খিলখিল করে হেসে বললে—একা যাব না, তোমাকে সমেত নিয়ে যাব পরীর মতন পিঠে করে।

    ভোরবেলায় সুবাসীই তাকে ঠেলে তুলে দিলে। পুজোর ঘট ভরতে যাবার আগেই তার কাপড় চাই। কিন্তু—এ কি?

    আকাশে ঘোর ঘনঘটা। বাতাস বইছে মাতালের মত। শব্দ করছে বুনো দাতালের মত। এঃ, দুর্যোগ হবে-বাদলা নামবে! আশ্বিনের শেষ, ধানের মুখে মুখে শিষ। যদি ঝড় হয়! মাথাভারী ধানগাছগুলিকে যদি ঝাপটায় মাঝখানে ভেঙে শুইয়ে জলে ড়ুবিয়ে দেয়, তবে সর্বনাশ হয়ে যাবে। হে বাবাঠাকুর! যদি আশ্বিনের সেই সর্বনাশা ঝড়ই হয়, তবে বাবাঠাকুর একবার তুমি আকাশে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়াও, বাঁশবাঁদির বাঁশের বেড়ে পিঠ দাও, বড় বড় বট পাকুড় শিমুল শিরীষের গাছগুলিকে ঠেলে ধর হাত দিয়ে। মিষ্টি হাসি হেসে অভয় দিয়ে কাহারদের বলভয় নাই, আমি ধরেছি শক্ত করে গাছপালার আড়াল, ঝড় উড়ে যাক মাথার উপর দিয়ে, রক্ষা হোক কাহারপাড়ার মনিষ্যিকুল, রক্ষা পাক গরু বাছুর ছাগল ভেড়া হাঁস মুরগি কীটপতঙ্গ, সোজা দাঁড়িয়ে থাক মাঠের গলগালে-হোড়ভরা ধানকাহারদের লক্ষ্মী। হে বাবাঠাকুর। শুধু বনওয়ারী নয়, গোটা কাহারপাড়া দুর্যোগের দিকে তাকিয়ে ডাকতে লাগল—‘দয়’ বাবাঠাকুর। অর্থাৎ দোহাই বাবাঠাকুর।

    ঝড় বাড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি। গাছের মাথা যেন আছাড় খাচ্ছে, বাঁশের ঝাড়ে ব্রাশ উপড়ে পড়ছে, কোপাইয়ের জলে তুফান উঠছে, মধ্যে মধ্যে দুটো একটা পাখি ঝাপটায় আছাড় খেয়ে এসে পড়ছে উঠানে দাওয়ায়। যে পিথিমীর বুকে সদাই বাজে পঞ্চ শব্দের বাদ্য, সে পৃথিবীতে ঝড়ের গোঙানি ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যায় না। দশভুজার পূজা, চারিদিকে উঠবার আগে ঢাক ঢোল সানাই, কাসি কাসর ঘণ্টা শখের শব্দ, তার জায়গায় শুধু শব্দ হচ্ছে—গো-গোঁ- গো-গোঁ, ঝড় গোঙাচ্ছে। মধ্যে মধ্যে শব্দ উঠছে মড়মড়মড়মড়, তারপরই উঠছে প্রকাণ্ড একটা শব্দ। গাছ ভেঙে পড়ছে। হে বাবাঠাকুর।

    এর মধ্যে কে যেন চিৎকার করে বলছে! কে কি বলছে? কার কি হল? সুবাসী ঝপ করে। দাওয়া থেকে নেমে পড়ল। বনওয়ারী এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে ভাবছিল, সে ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল নামিস না, নামিস না।

    সুবাসী বললে—সেই ডাকাবুকো। লইলে আর এত সাহস কার হবে?

    —কে?

    –ওই যে, নাম করলে তুমি আগ করবা। এই ঝড়ের মধ্যেও সুবাসী মুখে কাপড় দিয়ে হাসতে লাগল। বনওয়ারী কঠিন বিরক্তিতে নেমে এল দাওয়া থেকে।

    —ঝড় এসেছে। পেল—য় ঝড় আসছে, ‘সাইকোলন’ ‘সাইকোলন’কলকাতা থেকে চন্ননপুরের ইস্টিশানে তার এসেছে। ঘর থেকে কেউ বেরিয়ো না। খবরদার! গায়ে একটা তেরপলের লম্বা জামা আর মাথায় টুপি পরে হেঁকে বেড়াচ্ছে করালী।

    সুচাঁদ চিৎকার করে উঠল—হে বাবা, কত্তাবাবা!

    করালী দাঁত-মুখ খিচিয়ে বললে বাবাঠাকুরের ডিঙে উল্টার্ছে। বেলগাছ উপড়ে মুখ খুঁজে পড়ে আছে—দেখ গা। চেঁচাস না বেশি। ঘরে যা।

    বনওয়ারী আতঙ্কে চমকে উঠল।

    সুবাসী খিলখিল করে হেসে উঠল। সুচাঁদ ঝড়ের বেগে পা পিছলে আছাড় খেয়ে পড়ে গিয়েছে।

    বনওয়ারী তার গালে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল। সুবাসী তখন আরও হাসতে লাগল। বনওয়ারী ছুটল সেই ঝড়ের মধ্যেই বাবাঠাকুরের থানের দিকে।

    বেলগাছটা সত্যই আবার উপড়ে পড়ে রয়েছে। গাঁথুনিটা দু ভাগ হয়ে ফেটে গিয়েছে। বনওয়ারীর সর্বশরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। শেষ পর্যন্ত বাবাঠাকুরের গাছ উপড়ে পড়ল। নিশ্চয় আর বাবাঠাকুর নাই; হাঁসুলী বাঁকের দেবতা, উপকথার বিধাতাপুরুষ চলে গিয়েছেন। তবে আর কি রইল তাদের? দুর্দান্ত ঝড়ের মধ্যে আর দাঁড়াতে পারলে না বওয়ারী, বসে পড়ল; কোনো রকমে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে আরম্ভ করলে বাড়ির দিকে।

    নয়ানের মা এই ঝড়ের মধ্যে ছেলের জন্যে কান্না ভুলে গিয়েছে, গায়ে কাপড় জড়িয়ে ঝড়-বাদলের আরামে-অলসভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে পরমানন্দে বলছে—আরও জোরে বাবা, আরও জোরে। ভেঙেচুরে উপড়ে সব সমান করে দাও। হে বাবা!

    ঝড়-ঝড়-ঝড়! গো-গো-গোঁ! দেওয়াল পড়ছে, গাছ পড়ছে, বাঁশ পড়ছে। জলের ঝাপটায় সব ঝাপসা হুড়-হুড় শব্দে জলের স্রোত বয়ে চলেছে, কোপাই ফুলে ফুলে উঠছে; নীলবাঁধের মোহনা ভেঙেছে, গোটা হাঁসুলী বাঁকের মাঠ ঘোলা জলে থইথই করছে, এবারে সেই হাতি ঠেলা সবুজবরন মন-ভোলানো চোখ-জুড়ানো প্রাণ-মানো মাঠ-ভরা ধান জলে ড়ুবে যাচ্ছে, মধ্যে মধ্যে জলের উপরে সবুজ পাতা ভেসে উঠছে, যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে ড়ুববার আগে বাঁচাবার জন্যে। কিন্তু মা-লক্ষ্মীকে কে তুলবে হাত ধরে? বাবাঠাকুর নাই, কে তুলবে দেবকন্যেকে?

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরাইকমল – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article গল্পসমগ্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গল্পসমগ্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    রাইকমল – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    চৈতালী-ঘূর্ণি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    ধাত্রী দেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গণদেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    নাগিনী কন্যার কাহিনী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.