হারবার্ট – ৪
চার
“অই শুন! অই শুন। ভেরীর আওয়াজ হে,
ভেরীর আওয়াজ”
-রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
বিনু কলকাতায়, আশুতোষ কলেজে জিওলজি অনার্স নিয়ে পড়তে এসেছিল। বিনু আরও, অনেক আগে ছোটবেলায় একটা ছড়া শিখিয়েছিল হারবার্টকে পুলিশের লাঠি, ঝাঁটার কাঠি/ভয় করে না, কমিনিস্ট পার্টি। বিনু এসে রাস্তার ধারের ঘরটায় উঠল। কৃষ্ণলাল নিজে এসেছিলেন। বিনুর জন্যে ছোট একটা তক্তপোষ এল। তোষক এল। জ্যাঠাইমা দোতলার বারান্দার ছাদ থেকে ঝোলা বিছানার বাণ্ডিল খুলে বিনুকে বালিশ দিলেন। দেওয়ালে খোদল করা বাঁধানো তাকে উইনচেল হোমস ইত্যাদি সাহেবদের বই শোভা পেতে লাগল। বিনু সিরিয়াস। দোহারা গড়ন। মিষ্টি করে কথা বলে। বিনু একদিন সকাল নটা নাগাদ খাটে উপুড় হয়ে বুকের তলায় বালিশ দিয়ে মন দিয়ে কী লিখছিল। দরজাটা একটু ফাঁক করে হারবার্ট ভেতরে তাকিয়েছিল। একগাল হেসে বিনু বলেছিল, ও কী হারবার্টকাকা। ভেতরে এসো। কী দেখছ দাঁড়িয়ে?
হারবার্টের সঙ্গে বিনুর বেশ অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। বিনুর বন্ধুদেরও বেশ লাগত হারবার্টের। হারবার্টকে ওরা সিগারেট খাওয়াত। গল্প করত। আবার এক এক সময় ঐ বিনুই বলত, হারবার্টকাকা, এবার তোমাকে একটু … হারবার্ট বুঝত যে বিনু ওকে এখনকার মতো চলে যেতে বলছে। কিন্তু সেটা খারাপভাবে নয়। বিনু তাকে একটা ফুলপ্যান্ট কিনে দিয়েছিল। সঙ্গে একটা বেস্ট।
–ওফ্, হারবার্টকাকা, তোমায় না ঠিক অ্যামেরিকান ফিল্মস্টারদের মত লাগছে।
ধন্না হারবার্টের প্যান্ট দেখে চমকে গিয়েছিল। পরে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল শুনে যে টিউশনির টাকা থেকে বিনু এটা হারবার্টকে কিনে দিয়েছে।
জ্যাঠাইমা বলেছিলেন, দেখেচিস তো! দেখে শেখ। আকুটেপনা করে তো জীবন কাটালি।
ধন্না বলেছিল, ফ্যাচফ্যাচ করোনা তো। ওপরপড়া আদিখ্যেতা থেকে শিখবটা কী শুনি? তবে হ্যাঁ, আমারগুলো যদি বিনুটাকে দেখে বোজে–না করল লেখাপড়া, না হল ভব্যসভ্য।
জ্যাঠামশাই বলেছিলেন, পিউ কাঁহা! পিউ কাঁহা।
বিনু পরলোকে আগ্রহী হারবার্টকে মৃত্যুর একটা অন্য মানে বুঝিয়েছিল।
–ও কি সব আগডুম বাগডুম পড় বলল তো। ওসব ধাপ্পা। রিডিকিউলাস। এ মরল, ভূত হয়ে এল, ও মরল ভূত হয়ে গেল–এই যে পাতায় পাতায় ভূত কিলবিল করছে, বলো, নিজে কখনও দেখেছ? লোক তো আর মরেনি এমন নয়? এ বাড়িতেই ক’জন মরেছে কে জানে?
-আমি দেকিনি বলেই সবটা মিথ্যে হয়ে যাবে?
-শুধু তুমি দেখনি না, কেউ দেখেনি।
-তাহলে প্ল্যানচেটে যেটা হয়?
-কী হয়? বহরমপুরে নিজে আমি দেখেছি।
-দেখেচিস? এল?
-আসবে না কেন? নিজেরাই তো হয় অক্ষরের কাছে গেলাশ টেনে আনছে নয় তো পেন্সিল কাঁপাচ্ছে। অবশ্য তোমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যতদিন হাতে গোনা কয়েকটা লোক লাখ লাখ মানুষকে বোকা বানিয়ে খাঁটিয়ে মারবে, তাদের ঠকাবে, ততদিন ভূত, তারপর তোমার গিয়ে ঠাকুর-দেবতা-ধর্ম–এই সবই চলবে। শোনো, একটা লেখা শোনো, (বিনু একটা ছোট বই খোলে, পাতা ওল্টায়)
-আমাদের সামনে হাজার হাজার শহীদ মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের কথা মনে পড়লেই আমাদের প্রতিটি জীবিত লোকের হৃদয় বেদনায় ভরে ওঠে, এমন কী স্বার্থ আছে যা আমরা ত্যাগ করতে পারব না অথবা এমন কী ভুল আছে যা আমরা শুধরে নিতে পারব না?–কথাটা কার লেখা বলতে পারবে?
হারবার্ট মাথা নাড়ে। এসবের কিছুই সে জানে না।
-মাও-সে-তুং।
১৯৭০-এর ১৯ নভেম্বর বারাসতের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ড ঘটে। যতীন দাস, কানাই। ভট্টাচার্য, শংকর চট্টোপাধ্যায়, সমীর মিত্র, স্বপন পাল, সমীরেন্দ্রনাথ দত্ত, তরুণ দাসও গণেশ ঘটককে গভীর রাতে পুলিশ নৃশংসভাবে হত্যা করে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক চারু মজুমদারতার ২২ নভেম্বর, ১৯৭০-এর ইস্তেহারে আহ্বান জানালেন,
-আজ প্রত্যেকটি ভারতবাসীর পবিত্রতম কর্তব্য এইসব কাপুরুষ বিদেশীদের আজ্ঞাবহ খুনেদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করা। এটা আজ দেশবাসীর দাবী, দেশপ্রেমিকের দাবী। প্রত্যেক বিপ্লবী কর্মীকে এই বীর শহীদদের হত্যার বদলা নেবার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতে হবে। এই জল্লাদরা ভারতবাসীর শত্রু, প্রগতির শত্রু এবং বিদেশীর অনুচর। এদের শেষ না করলে ভারতবর্ষের মুক্তি নেই।
বিনু এই ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কোনো কোনো রাতে ফিরত না। ধনাদাদার পাড়াটা কিন্তু পাঁড় কংগ্রেসী। বামপন্থার ছিটেফোঁটা থাকলেও বোঝ যেত না। বড়িলাল ছিল ইনফর্মার। হারবার্টকে একদিন বেশ কিছু টাকা আর মাও সে-তুং-লিন পিয়াও-এর ছবি ছাপা রসিদ বই দিয়ে বিনু পাঠাল লেক মার্কেট এলাকায় কোনো এক বিজয়-কে পৌঁছে দেবার জন্যে। বিজয় তাকে নিয়ে গেল কালীঘাটের গ্রীক চার্চের পেছনে। সেখানে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গাল ভাঙা চশমা পরা একজন লোক আবছা অন্ধকারে হারবার্টকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল—”অভিনন্দন কমরেড। বিনয় আপনার কথা অনেক বলেছে। আপনার মতো বিশ্বস্ত বন্ধুর আমাদের দরকার। চা খান।”
ফেরার রাস্তায় মনোহরপুকুর মোড়টা ওকে পার করে দিয়েছিল দুটি ছেলে। কোথাও বোমা পড়েছিল। হারবার্ট আর খবর পায়নি যে ঐ বিজয় পরে বরানগরে আত্মগোপনে থাকাকালীন ১৯৭১ সালের ৯ মে সকালে বাজারের খাবারের দোকানের সামনে পুলিশের গুলিতে মারা যায়।
বিনু একটানা অনেকদিন বাড়িতে ছিল না। ধাদাদা কৃষ্ণলালকে চিঠি দিল। কৃষ্ণলাল জবাবে লিখলেন।
-বিনু এখন যুবক। সে বোঝে কী করছে। আর, এটা তো আর সে নিজে বোঝে নি, অনেকের সঙ্গেই সে একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অতএব, আমার তরফ থেকে তাকে নিবৃত্ত করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। উপরন্তু বিনুর মাও এ বিষয়ে আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। তবে, তোমাদের অসুবিধা হচ্ছে জানলাম। অন্য ব্যবস্থা করছি। কিন্তু তার জন্য তোমাকে আমার কলকাতা যাওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হবে। বাবা ও মা আশা করি ভাল আছেন। হারবার্ট ও তোমার পুত্রদের আমার ….
অবশ্য কৃষ্ণলালের কলকাতায় এসে অন্য ব্যবস্থা করার দরকার হয়নি। রাত্তিরে, এলগিন রোডের জাহাজবাড়ির কাছে একটা দেওয়ালে স্টেনসিল থেকে মাও-সে তুং-এর মুখ আঁকছিল তিনটি ছেলে। উল্টোদিকের ফুটে মুখ ঢেকে যারা শুয়েছিল তাদের মধ্যে একজন চাদর সরিয়ে গুলি চালায়। একটি ছেলে দুজনের কাঁধের ওপর পা রেখে স্টেনসিলের ওপরে কালি বোলাচ্ছিল। সে পড়ে যায়। অন্যরা তাকে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। তখন অনেক পায়ের শব্দ ছুটে আসছে। হুইসল বাজছে। আহত ছেলেটির কথাতেই তাকে রেখে তখন দুজনে পালায়। আহত ছেলেটি উল্টে বুকের উপর ভর করে কনুই দিয়ে হেঁচড়ে চেড়ে হাত পাঁচ বা ছয়েক যেতে পেরেছিল। ফুটপাথে রক্তের ঘষটানো দাগ হয়েছিল। তারপর সে জ্ঞান হারায়।
এস. আই. সন্তোষ দেখল প্রাইজক্যাচ। বিনয়কে পায়ের ওপর দাঁড় করালে অনেক কিছু জানা যাবে। পিজির কেবিন। ডাক্তার।
-লাংফিল্ড পাঙচার হয়ে গেছে। কিছু করার নেই। এনি টাইম। জানলে বাড়িতে খবর দিন। বাড়িতে খবর এসেছিল। ধন্না কৃষ্ণলালকে তার করে। হারবার্ট দুবেলা হাসপাতালে পড়ে থাকত। শরীরের বেশির ভাগ রক্ত রাস্তায় ও ভ্যানের মেঝেতে ঢেলে দেওয়ার পরেও অদম্য এক প্রাণশক্তি বিনুকে দুদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। কৃষ্ণলাল এসেছিলেন। ওদিকে বাড়িতে, বিশেষত বিনুর ঘরে সব ওলটপালট করে, তোষকের তলায় বা কোথাও পুলিশ কিছু পায়নি। এর অনেক আগেই বিনুর কথামতো চিলছাদে হারবার্ট অনেক কিছু পুড়িয়েছে। দেশব্রতী, দক্ষিণ দেশ, চট্টগ্রামে ছাপানো একটি গেরিলা যুদ্ধের বাংলা ম্যানুয়াল, কিউবার ট্রাইকন্টিনেন্টাল পত্রিকা থেকে সংগৃহীত মলোটভ ককটেলের নকশা, রেডবুক, কিছু চিঠি। একটু একটু করে পুড়িয়েছে যাতে ধোঁয়া কম হয়। কেউ বুঝতেও পারেনি।
কৃষ্ণলালকে তার বন্ধু অধ্যাপক প্রফুল্লকান্তি বাইরে চা খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। হারবার্টকে বন্দুকধারী দুই গার্ড দয়াপরবশ হয়ে বলেছিল–ভেতরে যান, ভুল বকচে। বাপটা আবার কোথায় গেল?
হারবার্ট বিনুর কাছে গিয়েছিল। বুক অবধি কম্বলে ঢাকা। উল্টোনো বোতলের থেকে রবারের নল হাতে। একটা জিনিস হারবার্ট দেখতে পায়নি। পায়ের দিক থেকে কম্বলের তলা দিয়ে একটা শেকল বেরিয়েছে। সেটা লোহার খাটের সঙ্গে দুপাক জড়িয়ে তালা আটকানো। গলায় ট্রাকশন লাগানো একটা ছেলে পালাবার পরে এই ফুলফ ব্যবস্থা করা হয়।
বিনুর চোখদুটো বন্ধ কিন্তু ঠোঁটদুটো নড়ছিল আর যেটাকে দুজন পুলিশ প্রলাপ বলে ভুল করেছিল সেটা ছিল বারাসাতের শহীদ সমীর মিত্র-র লেখা কবিতা, অনেক চেষ্টা করে, মনে করে শব্দগুলো বলা, ঠিক কবিতা বলার মতো নয়,
-আমি দেখতে পাচ্ছি,
আমার চোখের সামনে, আমার এতকালের দেখা
পুরনো দুনিয়াটা পাল্টে যাচ্ছে,
(বিনু পরপর কয়েকবার ‘পাল্টে যাচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে’ বলে চলে, পরের কথাগুলো মনে আসে পরে, কাশির মতো হয়, ঠোঁটের কোনা দিয়ে রক্ত মেশা ফেনা ফেনা থুথু চলে আসে, হারবার্ট মাথার কাছে রাখা রক্ত মাখানো তোয়ালেতে মুছিয়ে দিতে যাবে, নার্স এসে যায়। নার্স মুছিয়ে দেয়, দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায়।)
ভেঙেচুরে, তছনছ হয়ে, গুঁড়ো গুঁড়ো
হয়ে ঝরে পড়ছে
পুরনো দিনগুলো।
ঝড় আসছে একটা
(কয়েকবার ‘আসছে, আসছে’ বলে। চোখদুটো বড় করে তাকায়। মুখের ওপরে। হারবার্ট ঝুঁকে। তার চোখে জল। বিনুর চোখ এদিক ওদিক তাকায়। সে আসলে কাউকে খোঁজেনি। দেখছিল পুলিশরা তার শেষ কথা শোনার চেষ্টা করছে কি না।)
-কিছু বলবি, বিনু?
-হারবার্টকাকা, পুজোর ঘরে, ডায়রি…হারবার্ট…কাকা….ডায়রি..কালীর ফটোর পেছনে…ডায়রি… বিনু তাকিয়ে থাকে। একটু ওপর দিকে। এভাবে মানুষ সবসময় তাকায় না। কিছু দেখার জন্যে না হলেও তাকিয়ে থাকা।
ডাক্তার এসে ঢোকে। হারবার্টকে বলে সরে যেতে। পুলিশরা ঢোকে। নার্স। এক্সপায়ার।
এরপর পুলিশ-ফৈজৎ কাঁটাপুকুর ঘুরে ক্যাওড়াতলা। বিনুর দেহ বিদ্যুৎ-চুল্লিতে ঢুকে যায়। শ্মশান ঘিরে অত রাতেও পুলিশের কড়া পাহারা। কৃষ্ণদাদা কি বিড়বিড় করছিলেন এক দৃষ্টিতে চুল্লির দিকে তাকিয়ে। চুল্লির দরজার ওপরে লেখা ‘পুলিশের কুত্তা দেবী রায় হুঁশিয়ার সি.পি. আই. (এম. এল.)’। জনৈক বুদ্ধিজীবী পুলিশ অফিসার অধস্তন একটিকে বলেন—’ঐ দেখুন, নকশালের বাবা, ছেলে পুড়ছে বলে মন্তর পড়ছে। কথাটা শুনে হারবার্ট কৃষ্ণদাদার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কৃষ্ণদাদা আবৃত্তি করছেন,
ওরা বীর ওরা আকাশে জাগাতো ঝড়
ওদের কাহিনী বিদেশীর খুনে,
গুলি, বন্দুক, বোমার আগুনে
আজও রোমাঞ্চকর।
বিনু পুড়ছিল তখন।
এই ঘটনার পরে পচা, বদ্ধ, অকিঞ্চিৎকর যে কালপর্ব চলেছে তা এতই ক্লান্তিকর যে এর তুলনা অন্তত ইতিহাসে মেলা ভার। এবং হারবার্ট কলকাতা শহরের যে খণ্ডের বাসিন্দা সেখানে যুগযুগান্তেও কিছু পাল্টায় কিনা সন্দেহ। বনেদী বাড়িগুলোর মধ্যে চিলচিৎকারের মধ্যে দিয়ে যে ভাগাভাগি হয়েছে তার ফলে অভাবনীয় সব জায়গাতে দেওয়াল ও দরজা এসেছে। অবশ্য কিছুটা মুখ পান্টানোর স্বাদ এনেছে পুরনো বাড়ির জায়গায় তৈরি প্রোমোটারদের মালটিস্টোরিড। ভিডিও-র দোকান হয়েছে। জ্ঞানবান ও বুদ্ধিমান দুই ভাই প্রথম বিপ্লবী পদক্ষেপ নিয়ে দোকানটি খোলে। মোড়ে রোলের দোকানও হয়েছে। বড় রাস্তায় আগে বড় বড় গাছের ছায়া ছিল। তার তলা দিয়ে ছায়াস্নিগ্ধ দোতলা বাস যেত। এখন গাছ নেই। উন্মত্ত যানবাহন। পাড়ায় ঠেলাওলাদের আড্ডাটা উঠে গেছে। হারবার্টের মনে পড়ে একবার মাঝরাত্তিরে ভূমিকম্প হয়েছিল। দোতলার বারান্দার ঝোলানো বিছানার বান্ডিল পেন্ডুলামের মতো দুলছিল। রাস্তায় ভীত এক বৃদ্ধ ঠেলাওলা তার ঘুমন্ত স্বদেশীদের—”ভূঁইডোলারে ভূঁইড়োলা!” বলে সতর্ক করছিল। অথচ, পরদিন সকালে ডেকাডেন্ট রাস্তায় সেই গত রাতের মাতাল ও গতকালের রেসুড়েদের ফোলা ফোলা চোখ নিয়ে বাজার করতে যাওয়া, সেলুনের মেঝেতে গুচ্ছ গুচ্ছ চুল, রিক্সার শব্দ-সব দেখলে শুনলে কার বাপের সাধ্যি বলে যে এই শহরে গতরাতে একটা ছোট মাপের হলেও ভূমিকম্প হয়ে গেছে। অবশ্য কয়েকবার ভোটহয়েছিল। হারবার্টের তাতে কিছু যায় আসে না। সে কখনও ভোট দেয়নি। প্রত্যেকবার ভোটের দিন ও যখন কোথাও না যেয়ে চিলছাদে বসে থেকেছে। সেটা ওর কাছে বিনুর প্রতি ট্রিবিউট বলে মনে হয়েছে। কিন্তু বিনুর বেশি কথা তার মনে পড়ত না।
অলেস্টারের ঘটনায় ভাইপোদের হাতে কর্দর্যভাবে মার খাওয়ার পরে একদিন দুপুরবেলা চিলছাদে আরাম করে ঘুমোচ্ছিল হারবার্ট। কৃষ্ণদাদা এসেছিলেন সে সময়। বিনুর মৃত্যুর পর ধন্নাকে তার নিজের অংশ লিখে দেওয়ার পরে সেই যে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি, তারপর এই প্রথম আসা। বিনর মৃত্যুর বছর পাঁচেক পরে বিনুর মা মারা যান। প্রায় তেরো চোদ্দ বছর পরে আসা। আগের মতো এবারেও হারবার্টকে নিয়ে হকার্স কর্নার থেকে দুটো ধুতি আর দুটো ফুলশার্ট কিনে দিয়েছিলেন।
নতুন ধুতি আর শার্ট পরে ঘুমোচ্ছিল হারবার্ট। আকাশে সাদা পালক মেঘের ফঁক দিয়ে সূর্যের ছটা বেরিয়েছিল। আধভিজে নিশ্বাসের মতো হাওয়া দিচ্ছিল। হারবার্ট স্বপ্নটা দেখেছিল।
“কেন গো নরের বেশে এ খেলা তোমার?
তারা কি তোমার ওগো বড় আপনার!”
–নগেন্দ্রবালা মুস্তোফি
বিরাট, কতদুর ছড়ানো একটা কাচের পর্দা। তার এপারে একটা এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তা যেটা কাচের পর্দার পাশ দিয়ে সমান্তরাল ভাবে চলেছে। ওপারে একটা সোনালী পাহাড়ের তলার দিকে বিরাট গুহা দেখা যাচ্ছে যার মধ্যে সরু পাথর ওপর থেকে ঝুলছে, বরফের ঝালরের মতো, আবার নিচের থেকেও ওরকম উঠে গেছে–বিনুর আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পায় হারবার্ট–ওপর থেকে যেগুলো ঝুলছে সেগুলো স্ট্যালাকটাইট, তলা থেকে যেগুলো উঠেছে সেটা স্ট্যালাগমাইট–ঠিকই তো, বই থেকে বিনু তো দেখিয়েছিল। তারপর পাহাড় ফুরিয়ে গেল। আবার চলছে, আবার চলছে। কখনো কাচের ওপারে জল। কখনো আকাশ। আলো কমছে। ফিরতে হবে অতটা পথ। কোথায় ফিরতে হবে। এই ভয়টা আসার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার কাকের একটা মেঘ ওপারে কাচের কাছে ছুটে আসে। কাচে ঠোকরায়। ডানা ঝাঁপটায়। অথচ কোনো শব্দ নেই। কাকের রক্ত, কাকের গু ছেবড়ে ছেবড়ে কাচটাকে নোংরা করে দিচ্ছে। সেই অসংখ্য কাকের ফাঁকে বিনুকে দেখতে পায় হারবার্ট। ৮০ দশকের মধ্যভাগ। বিনুর মৃত্যুর পর এই প্রথম বিনু। বিনু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। বিনু কিছু বলছে। কাকের ঢেউ এসে বার বার বিনুকে আড়াল করে। কাচের তলায়, ওপারে, মরা কাক জমছে। বিনু একটু এগিয়ে আসে। বিনু হাসছে। হারবার্টও হাসে। হাত নাড়ে। কথাগুলো, বিনুর কথাগুলো কাচের এপারে ইকো হচ্ছে অনেক দূরের ভেসে আসা মাইকের গানের সঙ্গে–
–হারবার্টকাকা, পুজোর ঘরে, ডায়রি …হারবার্ট … কাকা ডায়রি কালীর ফটোর পেছনে… ডায়রি …।
কাচের কাছে এসেছে বিনু। বিনু তাকিয়ে আছে। একটু ওপর দিকে। এভাবে মানুষ সবসময় তাকায় না। কিছু দেখার জন্যে না হলেও তাকিয়ে থাকা।
হারবার্ট ধড়মড় করে উঠে বসেছিল। মুখের গড়ানো লালা শার্টের আস্তিনে মুছেছিল। ঘুমচোখে দেখেছিল আকাশে রামধনু। রামধনুর ওপরে কারা যেন হাঁটছে। বুকের মধ্যে রেলগাড়ি চলার মতো শব্দ। শহরের অপ্রয়োজনীয় শব্দ। হারবার্ট নেমে এসেছিল। ঠাকুরঘরে ঢোকেনি। সোজা দোতলার বারান্দায়। জ্যাঠাইমা মাদুরে বসে। কৃষ্ণদাদা, ধাদাদা, ধনাবৌদি চা খাচ্ছিল। ধন্না কী একটা বলতে যাচ্ছিল, হারবার্ট চিৎকার করে উঠল।
-জ্যাঠাইমা। স্বপ্ন পেয়েছি। স্বপ্নে বিনু এসেছিল। বলল…
(আবার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। মনে পড়ছে, আবছা আবছা, ধন্দ…)
কৃষ্ণন্দাদা স্মিত হাসেন, বিনুকে স্বপ্ন দেখলি?
এবার পর পর মনে পড়ে।
-দেখব কী। এত কাক যে দেখাই দুষ্কর। বিনু, বিনু, বলল–চলো-দেখবে চলো জ্যাঠাইমা …
ধন্নাদাদা বলে,–যা বলল মাথা ঠাণ্ডা করে বল। গুলিয়ে না যায়। স্বপ্ন তো!
-বলল; জ্যাঠাইমার-ঠাকুর ঘরে, কালী ঠাকুরের যে ফটোটা আছে (হারবার্ট মাথায় হাত ঠেকায়) তার পেছনে বিনুর ডায়রি অছে।
জ্যাঠাইমা উঠতে চেষ্টা করেন–ধর, আমায় ধরে ওঠা। মা, মাগো!
হারবার্টের স্পষ্ট মনে ছিল আগে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জ্যাঠাইমা, তার পরে হারবার্ট, ধন্নাদাদা-বৌদি, শেষে কৃষ্ণলাল প্রায়ান্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। শেকল খুলে ঠাকুরঘর খোলা হল। ঠাকুরঘরের টিমটিমে আলো জ্বালানো হল। মা কালীর ফটোটি দেওয়ালের মাঝামাঝি ঝোলানো। জ্যাঠাইমা ঠাকুর প্রণাম করে ফটোর তলার দিকটা সামনে টানতে একটা টিকটিকি দৌড়ে দেওয়ালের ওপর দিকে গেল। ভারি ফটো। জ্যাঠাইমা বললেন—ধন্না, টান তা অত ভারি ঠাকুর, আমি কি পারি?
ফ্রেম বাঁধানো বড় ছবি কালীর। তলাটা সামনে টানতে কিছু হল না।
-কিছু থাকলে তো বেরোত।
জ্যাঠাইমা বললেন—ধরাধরি করে ঠাকুরটা নামা না, নামিয়ে উল্টো দিকে দ্যাখ।
ফ্রেমটা উল্টে দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করাবার সময়েই সকলে দেখতে পেয়েছিল। ফ্রেমের কাঠের ওপরে রেখে কাটাপেরেক ঘুরিয়ে আটকানো মাকড়সার জাল ও ধুলো মাখা ছোট একটা ডায়রি। নীচ থেকে ফোকলা চিৎকার শোনা গেল,–“পিউ কাঁহা! পিউ কাঁহা!”
-ওঃ সে কত কাগরে বাবা। কাচের এমুড়ো ওমুড়ো টুকরোচ্চে আর ডানা ঝটকাচ্চে। তার মধ্যে আবার গান হচ্চে। বিনু ঠায় হাসছে। কিছু শুনতে পাচ্চি না। তারপর কানে এল, ফাঁকায় কতা বলার মতো। পষ্ট শুনলাম … বলেই সেবারের মতো মরে গেল …
হারবার্ট হদিশ পাচ্ছে। এবার তাকে দাপাতে হবে। বিনুর সময় এসছিল। এবার তার সময়। সব লণ্ডভণ্ড করে দিতে হবে। নকড়াছকড়া করে ফারাফাই করে বিশ্ব সংসারে একটা তাণ্ডব লাগিয়ে দিতে হবে।
“পুরাকালে এ দেশে অনেক ভূতবিদ্যাবিৎ ঋষি ছিলেন। শুনিতে পাই, বিদ্যমানকালেও, অন্য ভূখণ্ডেও অনেক ভূতবিদ্যাবিশারদ জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু তাহাদের সহিত ঋষিদিগের মতবৈষম্য দেখা যায়। ঋষিদিগের মতে যাবৎ প্রেত অবস্থা, তাবৎ তাহাদিগকে আহ্বান বা আকর্ষণ করা যায় এবং দেব গন্ধৰ্বাদি দেবযোনি-প্রাপ্তদিগকেও আকর্ষণ বা আহ্বান করা যায়। …শুনিতে পাই, বর্তমান কালের ভূতবিদ্যাবিশারদেরা মৃতমাত্রকেই আহ্বান করিতে পারেন বা করেন; এমন কি, বুদ্ধদেবের আত্মাকেও নাকি কোনো পণ্ডিত আহ্বান করিয়াছিলেন।”
(পরলোক রহস্য)
‘কম্পিত হৃদয়ে স্পন্দিত বক্ষে গবাক্ষের দিকে অগ্রসর হইলাম, সবে মাত্র শয্যাত্যাগ করিয়াছি–এমন সময় কক্ষতলে আমার দৃষ্টি পতিত হইল, আমি সবিস্ময়ে দেখিলাম-পাঁচ সাতটা সদ্যচ্ছিন্ন নরমুণ্ড কক্ষতলে গড়াইয়া বেড়াইতেছে! সে মুণ্ডের বিকট দশন পাটি ভীষণ ভুকুটি-ভ্ৰভঙ্গ লক লক রসনা আমার হৃদয়ে মহা আতঙ্কের সঞ্চার করিল–আমি পুত্তলিকাবৎ স্থির হইয়া দাঁড়াইলাম-পদমাত্র অগ্রসর হইতে সাহস করিলাম না। পরক্ষণে আবার গগনভেদী চিৎকার!”
(সার্কাসে ভূতের উপদ্রব)
পিউ কাঁহা! পিউ কাঁহা।
কৃষ্ণলাল ফিরে যাওয়ার পরে হারবার্ট জ্যাঠাইমাকে জানিয়ে দিল যে, নীচের ঘরে সে ব্যবসা শুরু করবে।
