হেরুক – ১
১
ঘরটার দরজা-জানলা বন্ধ। যদিও বন্ধ রাখার দরকার ছিল না, এত রাতে জঙ্গলে কেউ ঢুকবে না। ফরেস্ট গার্ডরাও এই সময় এদিকে আসে না। চারপাশ নিস্তব্ধ, নিঃঝুম। শুধু কুলকুল করে নদীর শব্দ। ঘরটা যেখানে, সেখান থেকে আরও অনেকটা জায়গা নিয়ে জঙ্গল বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। তার ওপারে গ্রাম। বাড়িটাকে বাইরে থেকে দেখলে কোনও মঠ বলে মনে হবে। কিন্তু ভিতরে কী আছে, কেউ জানে না। এমনিতে স্থানীয় লোকজন ছাড়া এই জায়গাটার কথা খুব বেশি লোক জানেও না। মাঝে-মধ্যে এক-আধজন টুরিস্ট আসে, ভিতরে ঢুকে ছবি-টবি তুলে চলে যায়। স্থানীয় লোকজন মঠটা এড়িয়ে চলে। দিনের বেলায় যারা কাঠ কুড়োতে আসে, তারাও এদিকটায় বড় একটা ঘেঁষে না আর এত রাতে তো কথাই নেই। তবুও ওরা কোনও ঝুঁকি নিতে চায়নি।
মেঝেতে একটা অদ্ভুত ছবি আঁকা। লাল রঙের একটা বৃত্ত, তাকে ঘিরে ছোট-ছোট ১০৮টা অর্ধবৃত্ত। মাঝখানে একটা তারার মতো কিছু আঁকা। তার মধ্যে আবার একটা বৃত্ত। এই অদ্ভুত ছবিটার উপরে একটা প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের শিখার দিকে, সেদিকে একজন বয়স্ক লোক বসে আছেন। তাঁর থেকে কিছুটা তফাত রেখে আটজোড়া নারী-পুরুষ পরস্পরকে ছুঁয়ে বসে আছে। তাদের হাত কোলের উপরে রাখা এবং আঙুলগুলো একটা বিশেষ মুদ্রায় মোড়া রয়েছে। প্রত্যেকের পাশে একটা অদ্ভুত আকারের পাত্র, তাতে কিছু পানীয় রয়েছে। মাঝে মাঝে এক-একজন পাত্রটা মুখে তুলে নিচ্ছে। কারও মুখে কোনও কথা নেই। সকলে নিবিষ্ট হয়ে প্রদীপের দিকে তাকিয়ে আছে।
নদীর ধারে ছড়ানো পাথরের উপর দিয়ে হঠাৎ একটা হেঁটে যাওয়ার শব্দ হতেই ওরা প্রত্যেকে টানটান হয়ে বসল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর বয়স্ক মানুষটি বললেন, “ওঁ আঃ হুং।”
বাকিরা ওঁর দিকে তাকিয়ে রইল। এই ব্যক্তি তাদের মুক্তির ঠিকানা দিতে এসেছেন। উনি স্বয়ং বজ্রধর। ওই শব্দঝংকারটা মিলিয়ে যেতেই বাকি স্ত্রী-পুরুষরা একসঙ্গে বলল, “ওঁ আঃ হুং।” ঘরটা গমগম করে উঠল।
আবার সব চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর বজ্রধর বললেন, “আমি তোমাদের নির্বাণ দিতে এসেছি। এই নির্বাণ গৌতম বুদ্ধের চেয়েও বড়। এর নাম মহাসুখ। কিন্তু সেই মহাসুখ পেতে হলে জিনিসটা আদায় করতে হবে। এতদিন যা আড়ালে লুকিয়ে ছিল, এখন তার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। যে করেই হোক, তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসো। কোনও কিছুতেই পিছপা হয়ো না। জেনে রাখো, এর জন্যে কোনও পাপ তোমাদের হবে না। তোমাদের উদ্ধারের দায়িত্ব আমার। ওঁ রক্ষ রক্ষ হুং হুং ফট স্বাহা।”
ওরা সকলে সমস্বরে বলল, “ওঁ রক্ষ রক্ষ হুং হুং ফট স্বাহা,” তারপর উঠে বয়স্ক মানুষটিকে প্রণাম করে একে-একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
উনি একলা চুপ করে বসে রইলেন। সামনে প্রদীপ জ্বলছে। বাইরে অবিশ্রান্ত ঝিঁঝির ডাক। তিনি একদৃষ্টে প্রদীপের দিকে তাকিয়ে আছেন। প্রাণপণে দেখার চেষ্টা করছেন কোথায় আছে জিনিসটা, কিন্তু দেখতে পাচ্ছেন না। মনটা চঞ্চল হয়ে রয়েছে। যতক্ষণ না ওটা পাচ্ছেন, ওঁর চঞ্চলতা থামবে না। ততদিন খুব সাবধানে থাকতে হবে। একটু আগে কে হেঁটে গিয়েছে এখান দিয়ে?
কতক্ষণ বসে ছিলেন ঠিক নেই। আচমকা সারা জঙ্গল কাঁপিয়ে একটা গুলির শব্দ ভেসে এল। গাছের মাথা থেকে পাখিরা তারস্বরে ডাকাডাকি শুরু করল। শব্দটা হতেই উনি চমকে উঠেছিলেন। তারপরই প্রবল বিরক্তিতে মাথা নাড়লেন। এভাবে হয় না। বহুবার ওদের সাবধানে যাতায়াত করতে বলেছেন যাতে এই আস্তানাটার কথা কেউ টের না পায়। এই রাতদুপুরে ওভাবে গুলি চালানোর কী দরকারটা ছিল?
বেশ কিছুক্ষণ পাখিগুলো ডাকাডাকি করে চুপ করে গেল। মধ্যরাতের জঙ্গল আবার থমথম করছে। বজ্রধর একদৃষ্টে প্রদীপের দিকে তাকিয়ে আবার মনঃসংযোগের চেষ্টা করলেন। এখন নিকষ অন্ধকারে বসে তিনি ভাবলেন, জিনিসটা তাঁর চাই। ওটা বহু বছর অপাত্রে পড়ে আছে। অথচ তিনি যে ইতিহাস শুনেছেন, তাতে তাঁদের মালিকানাই প্রমাণিত হয়। উড্ডীয়ান থেকে কী করে ওটা হাত বদল হল, কেউ জানে না। তাঁর পূর্বসূরিরা বহু চেষ্টা করেছেন ওর হদিশ পাওয়ার। উনি নিজেও বহুদিনের চেষ্টায় সামান্য খোঁজ পেয়েছেন। তাঁর গুরু বলেছিলেন যে, শরীর-মন-প্রাণ একাত্ম করে ওর উপরে মনঃসংযোগ করতে। তা হলে একসময় প্ৰকৃতি নিজের হাতেই জিনিসটা তুলে দেবে। তাঁর পূর্বসূরিরা ওটার খোঁজ না পেলেও মনে হচ্ছে, অজস্র লোকের সম্মিলিত মনঃসংযোগের ফলে, তিনি হয়তো জিনিসটার সন্ধান পেয়েছেন। যখন প্রকৃতি এতটাই এগিয়ে দিয়েছে, বজ্রধর ভরসা রাখেন, বাকিটুকুও হয়ে যাবে। বজ্রধক খবর পাঠিয়েছে যে, তারা রওনা হয়েছে এবং সে নিজেও ওদের সঙ্গে আসছে। এই খবর শোনার পর থেকেই বজ্রধরের একটা ছটফটানি শুরু হয়েছে। ওরা এলে, যে করেই হোক, জিনিসটার সন্ধান পেতে হবে। সামনের চতুর্দশীতে চক্রে বসতে হবে।
বজ্রধর পরবর্তী কাজগুলো ভেবে নিলেন। এই রাতটা বৃথা যাবে? তার চেয়ে চণ্ডালীকে ডেকে নিলেও হয়। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর তিনি বাইরে এসে দাঁড়ালেন। অপরিসীম শান্তি চারদিকে। একটু আগেই যে গুলির শব্দ হয়েছিল, তার কোনও চিহ্নই আর নেই। অন্ধকার জঙ্গলের পথ ধরে তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। তিনি নিশ্চিত আর কেউ তাঁর পিছু নেবে না।
