ময়মনবিল – পিয়া সরকার
ইয়াসিন মণ্ডলের বাড়ির অবস্থানটি বেশ চমৎকার। পূর্বে চৌধুরীদের বাগান, পশ্চিমে বাঁশঝাড়, আর দক্ষিণে আড়েবহরে বিরাট চাষের জমি। কিন্তু এমন চোখজুড়ানো দৃশ্যটা সম্পূর্ণ আদল নেওয়ার আগেই, উত্তরের বিলটার দিকে সকলের নজর পড়ে।
ভরন্ত জলাধার। আষাঢ় মাসের প্রথম ভাগই হোক, বা কার্তিকের জাড়, ময়মনবিলের
সামনে গিয়ে দাঁড়ালে সকলেরই গা ছমছম করে ওঠে। কালচে সবুজ বিপুল জলরাশি, তার পুব-পশ্চিম পাড় বোঝা গেলেও, বিলের ও মাথাটা এ মাথা থেকে দেখা যায় না৷ ইয়াসিনের বাড়ির পিছন দিকের উঠোন যেখানে শেষ হয়, সেখানে বিলের এক সীমানা ধরলে, রাসমণি চকে যে আটাকল আছে, বিলের অপর ধারটা সেখানে তাকে আধখানা চাঁদের আকারে বেড় দিয়ে রেখেছে।
দুপুরবেলা সূর্য সোনালি হয়ে উঠলেও ময়মনবিলের জলের রঙ বদলায় না। মাঝে মাঝে শুধু ঢেউয়ের বুকে, খোলা অস্ত্রের মতো আলো চকচক করে ওঠে। পাড়ের কাছে এসে খরগতি জল খলবল করে। দুই পাড়ে ভর্তি ঝোপঝাড়। তার পাতা থেকে পাতায় মাকড়সার জাল নেমে এসে কখনও জলকে ছোঁয়, কখনও বা হাওয়ায় ভেসে থাকে। বিলটা স্বচ্ছ, পাঁক থাকলেও তা অনেক গভীরে।
তবু, ইয়াসিন মণ্ডল, তার পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনে কাউকে ময়মনবিলে নামতে দেখেনি। স্নান করা তো দূরের কথা, একটা পুঁটি মাছও বিল থেকে কেউ ধরে না৷ বিলের আশপাশ এমনিতে পরিষ্কার। দু’হাত নাগালে বসতবাড়ি থাকলেও আবর্জনা, সকড়ি এসব কেউ ফেলে না এদিকটায়। বিলের পানিতে মানুষের গায়ের ছোঁয়াচ যত কম লাগে—ততই ভালো। নয়তো ঘোর বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে।
বর্ষা এলে, কই মাছের ঝাঁক ইয়াসিনের বাড়ির খিড়কির দরজায় এসে হুটোপাটি করে। ইয়াসিনের বউ রেখা ড্যাবডেবে চোখে সেদিকে তাকায়। তার ছুঁচলো মুখটা খুলে সে কার উদ্দেশে গালিগালাজ করে, কেউ জানে না। মাছের ঝাঁক জলের তোড়ের সঙ্গে যেমন ভেসে আসে, তেমনই ফেরত চলে যায়।
আজ রেখা অনেকক্ষণ ধরে হাঁড়ি পাতিল নিয়ে পড়েছিল। ইয়াসিনের ফুফাতো বোন আসমানি বর্ধমান থেকে এসে তার কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফুফু-ফুফা হজে যাওয়া ইস্তক ময়দার গোলা আসমানিকে বাড়িতে নিয়ে এনে রেখেছে ইয়াসিন। সেই কোন ছোটবেলায়, ইয়াসিনের আব্বা যখন বেঁচে ছিলেন, আসমানিকে ছেলের জন্য খুব পছন্দ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অসময়ে ওয়ালিদের ইন্তেকাল হয়ে গেলে, এতিম সন্তানের কথা কার আর মনে থাকে !
ততদিনে দুই পরিবারের ক্ষমতারও পার্থক্য হয়ে গেছে ঢের। ইয়াসিন চরম দারিদ্রে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল, সামান্য সামলে রেখাকে নিকাহ করেছে পাঁচ বছর হল।
আসমানির ওয়ালিদের মোটামুটি বড়মাপের চাষবাস বর্ধমানে। সামনের বর্ষাকালে আসমানির নিকাহ, বর্ধমানেরই কোনও এক ঘরে। পাত্রের ক্ষেত খামার আছে, ট্রাক্টর আছে নিজের। দাবি একটাই ছিল। পাত্রী হুরপরীর মতো সুন্দর হতে হবে। নিকাহর কথা পাকাপাকি হয়েছে এক মাস হল। আসমানির মিহিন চামড়ায় যাতে কোনও দাগ না বসে, পইপই করে ইয়াসিনকে বলে গেছে ফুফু। সোমত্ত মেয়ে যাতে ভালোমন্দ খেতে পড়তে পায়, তার জন্য ইয়াসিনের হাতে গরম নোট ধরিয়ে গেছে। ছ’টা পাঁচশো টাকার নোট। কিন্তু ইয়াসিনের লুঙ্গির খুট থেকে সে টাকা তারপর কোথায় উধাও হয়েছে, হাজারবার মুখ লাগিয়েও জানতে পারেনি সে।
আসমানিকে রেখা পছন্দ করে না। কেন করে না তার হাজার একটা কারণ দেখাতে পারে সে। কিন্তু একসময় আসমানি তার জায়গাটি নিতে পারত, এ কারণটাই রেখাকে পীড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ইয়াসিনের অন্তত তাই ধারণা।
ইয়াসিন উদাস মুখে বিড়িতে টান দিয়েছিল। তার আজ ছুটি। দুদিন হল ইদ-উল আজহার গেছে। আজ থেকে চৌধুরীদের পেয়ারা বাগানে ওষুধ স্প্রে করার লোক আসবে। পোকা লেগে দুটো গাছের ফল নষ্ট হয়ে গেছে। চৌধুরীর গুল-সাবানগুঁড়োর জলে বিশ্বাস নেই। সে আধুনিক মানুষ। ইয়াসিনের আবার ওষুধের গন্ধে হাঁপ ওঠে। তাই সে চৌধুরীকে বলে কয়ে রেহাই পেয়েছে।
বিড়িটা শেষ করে একবার রেখার দিকে তাকাল সে।
রেখা হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে কলতলায় বাসন মাজছে। সারা গায়ে ময়মনবিলের মতো শ্যাওলা সবুজ রঙ রেখার। শুধু দাবনায় আর পায়ের গোছে গমের মতো চামড়া। ইয়াসিনের নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। রেখা বিছানায় মরার মতো ঘুমায় আজকাল। ছুঁতে গেলে ফোঁস করে ওঠে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে ইয়াসিন মোল্লাও তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। ওদের কোলের কাছে ঘুমোয় তিন বছরের পরী।
গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে, ইয়াসিন রেখাকে টপকে সন্তানের শরীর ছুঁয়ে দেখে। মাথার চুলে বিলি কেটে দেয়। ঘুমন্ত সন্তানকে আদর করতে নেই, জিনে ধরে। রেখা জাগলে মুখ করে কুরুক্ষেত্র করবে। দু’একবার আদর করেই ইয়াসিন ক্ষান্ত দেয়। তার কিছু না থাকার জীবনে, একমাত্র পরীকে ছুঁলেই রাজকীয় আনন্দ হয়। ঝুড়ি ঝুড়ি পেয়ারা দেখে চৌধুরীর যা আনন্দ হয়, ফুফার মানিপার্সে টাকার যে গরম থাকে, তাচ্চেয়ে পরীকে চোখের সামনে দেখার ওম কি কম !
আসমানি অনেকক্ষণ ধরে ঘরে ছিল না। গ্রাম বেড়াতে বেরিয়েছিল। মাঠে এখন ফসল নেই। পাটের নুড়ো খোঁচা খোঁচা দাড়ির মতো মাঠে উজিয়ে আছে।
আসমানির এই গ্রাম ভালো লাগেনি। কিন্তু তার ময়মনবিল ভালো লেগেছে। গতরাতে আকাশ পরিষ্কার ছিল। তারাগুলো জ্বলছিল বিড়ালের চোখের মতো৷ অথচ বিলের জলে গাঢ় অন্ধকার। তাতে আকাশের এক বিন্দু আলো নেমে আসে না। এমনকী আশেপাশে জোনাকিও জ্বলে না।
খাবার বেড়ে রেখা ডাকাডাকি করেছিল ওকে। আসমানি শুনতে পায়নি। সদর
দরজা পেরিয়ে ঢালু জমিটা যেখানে বিলের পাড়ের কাছে নেমেছে, সেখানেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে ছিল সে। তাকে ডাকতে গিয়ে গা-টা কেমন ছ্যাঁত করে উঠেছিল ইয়াসিনের।
‘রাত কেমন আগুনে সাজছে আজ। বিলের জল থেকে শোঁ-শোঁ হাওয়া আসছে৷ পরাণ জুড়ায় যায় যেন। যাবে নাকি বউ?’ আসমানি ডালে লঙ্কা টিপে খেতে খেতে রেখাকে প্রস্তাব দিয়েছিল। আসমানির কথায় শহুরে টান প্রবল।
রেখা উত্তর দেয়নি। সারাদিন পরে তার গতরে আর আদিখ্যেতা পোষাচ্ছিল না৷ সে আড়চোখে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়েছিল। ইয়াসিন গলা খাঁকরিয়ে বলেছিল, ‘বিলের ধারে ঘুরবানি আসমানি। ও বাতাস ভালা না৷’
‘কেন ভালো না? আমারে খুলে না বললে বুঝব কেমনে?’
‘যাবা না মানে যাবা না। জিন আছে।’
‘তুমি দ্যাখছ?’
‘জিন দ্যাখলে কেউ জিন্দা থাকে? চোখ উপড়ি নিবেনি? কাটা ছাগলের মতো ছটফট কত্তে কত্তে পরাণডা বাইরাইবে।’ ইয়াসিন গম্ভীর হয়ে বলেছিল।
আসমানি ইয়াসিনের কথায় তেমন পাত্তা দিল বলে মনে হল না। শেষ পাতের ঝোলটুকু চেটে পুটে খেয়ে, আঙুল চাটতে চাটতে উঠে গিয়েছিল সে। তারপর এঁটো থালা কুড়াতে কুড়াতে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসেছিল। রেখা মুখ বেঁকিয়ে উঠে গিয়েছিল। অস্বস্তি এড়াতে ইয়াসিনও।
আসমানি ঠিক সয়ে বয়ে থাকার মেয়ে নয়, বোঝে ও। বড়বাড়ির মেয়ে, পয়সার মধ্যে মানুষ হয়েছে। কিন্তু ওর হাসি আর হাসতে হাসতে গায়ে ঢলে পড়া—কেমন যেন গা শিরশির করে ইয়াসিনের। যত দিন যাচ্ছে প্রথমদিকের জড়তা তত কাটিয়ে উঠছে আসমানি। নাহলে ‘আপনার সঙ্গে আমার নিকাহ হওয়ার কথা ছিল, শুনছিলাম কচিবেলায়’—বলতে বলতে কোন বিটিছেলে এমন হেসে ওঠে!
রাতের বেলা শুয়ে যখন ঘুম আসে না, তখন নানা আজগুবি চিন্তা ঘোরে ইয়াসিনের মাথায়। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। গতকালও তাই হয়েছিল। আম্মির কাছে বায়না করে একবার দুটো হাঁস পুষেছিল। আজমল চাচা বারেবারে নিষেধ করেছিল। হাঁসের গন্ধে জিন টানে। ইয়াসিন সেকথা শোনেনি। জোর করে বাজার থেকে খরিদ করে এনেছিল। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।
তেরো দিন যেতে না যেতেই, এক সন্ধেবেলা হাঁস দুটোর খোঁজ পড়ে। সকালবেলা দোরের সামনেই চরে বেড়াত। ঘরে ফেরেনি আর সেদিন। সারা গ্রাম চষে, চৌধুরীদের পেয়ারা বাগান পর্যন্ত তন্নতন্ন করে ছেনে ওদের খোঁজ পায়নি ইয়াসিন। আজমল চাচা শুনে মাথা নাড়িয়েছিল। যার একটাই মানে হয়—আশা নেই।
তবে একটাই রক্ষে, জিনের আছর বোধহয় হাঁস দুটোর উপর দিয়েই গেছে, নইলে ইয়াসিনের আম্মি ঠ্যালা বুঝত। আব্বা মারা যাওয়ার পর, ইয়াসিনের আম্মিকে নিকাহ করতে চেয়েছিল আজমল চাচা, আম্মি সরাসরি রাজি হয়নি। না বলেছিল কি? মনে পড়ে না ইয়াসিনের। তবে চাচা অভিভাবকের জায়গাটা পাকাপাকি নিয়ে ফেলেছিল।
মাঝে-মাঝেই এসে দাওয়ায় বসে বিড়ি ফুঁকত, পাটালি দিয়ে মুড়ি খেত। ময়মনবিলের গল্প আজমল চাচাই প্রথম বলেছিল ইয়াসিনকে।
ময় আর মন নামের দুই জিন থাকত বিলে। ময় ব্যাটাছেলে, মন বিটিছেলে। অনেক বছর আগে, আল্লাহতালার এক ফরিস্তা ওদের পোষ মানিয়ে রেখেছিল বিলে। তখন পানিতে নামা বারণ ছিল না। দিনেমানে লোকে বিলে নামত। গোসল করত। পানি তুলে আনত রান্নার। শুধু রাতের বেলা বিলের ধারে যাওয়া মানা ছিল।
‘কেউ ভুল করে বিলের পানিতে নামলি কী হয়?’ ইয়াসিন প্রশ্ন করেছিল।
আজমল চাচা এর উত্তরে আনতাবড়ি অনেক কথা বলত। ইয়াসিনের বন্ধুরাও নানা গল্প বলত। রাতের বেলা বিলের ধারে দাঁড়ালে নাকি তিনকোনা এক আলো নেচে নেচে পানির মধ্যে এপার ওপার হতে দেখা যায়। কেউ অনেকক্ষণ দাঁড়ালে আলোটা তাকে ঠাওর করে কাছে আসে। তাকে বশ করে। ‘তারপর কী হয়? ‘
‘পিছু পিছু বাড়ি যায়। মরণকামড় বসিয়ে মানষের গলার সব রস টেনে নেয়।” ইয়াসিনের বন্ধুরা বড় বড় চোখ করে বলেছিল। এসব তারা কোথা থেকে শুনেছিল, জানে না ইয়াসিন। তবে তার গা ছমছম করত শুনে।
‘ময় আর মন এক লহনেই ঠিক ছিল বুঝলানি ইয়াসিন। যেই ওদের আলাদা করার জন্য মানুষ হাত বাড়াল, বিলটা বদলে গেল। মানুষ মারার বিল হই গেল। রেতে বল, দিনে বল, মানুষ খাবার জন্যি অ্যাই এত্ত বড় হাঁ করি থাহে। ‘কে আলাদা কল্প? ‘
‘কোন এক আজরাইলের ব্যাটা, তা কী কইরে কই! রাতের বেলায় মন নামের সেই সুন্দরী জিন জামাকাপড় সব খুলে থুয়ে, নৌকার পৈঠায় বইসা, রাতের আকাশের তারা দ্যাহতো। সেই আজরাইলের ব্যাটা রাতের বেলা মনকে দেখে ফেলল একদিন। তার মাথা ঘুরে গেল। গুনিন ধরে জিন বশ করবে ঠিক কল্প।’ ‘তারপর?’
‘তারপর আর কীড়া! কেয়ামত ঘনাইলে নি লোকের এমনটা শখ হয়? মনরে বাগে পেইয়ে সেই মানষের ব্যাটা তাকে নিকাহ করল। কিন্তুক মনের সাথী ছিল ময়। একজন দেহ, আরেকজন পরাণ। ময় কি ছাড়ি দিবে?’ ‘সে কীড়া করল? ‘
—তুই যহন নিকাহ করবি, তর বিবিজানরে কেউ বশ কল্পে কী করবি সেইটা কওনি আগে?’ আজমল চাচা ইয়াসিনকে প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। মা তখন গোসল সেরে ফিরছে। ভিজা কাপড়ে মাকে দেখে জুলজুল চোখে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আজমলচাচা। দেখে গা-টা কেমন চিড়বিড় করে উঠেছিল ইয়াসিনের। মনকে বশ করেছিল যে গুণিন, সে কামকাজ কিসুই জানত না, মনে মনে সেসময় ভেবেছিল ও। আগে ব্যাটাছেলে জিনটারে শায়েস্তা করতে হতো।
হাঁস দুটো আর ফেরেনি। ‘কে কেইটে খেয়ে থুইচে ইয়াসিন,’ আম্মি ধমকে উঠে
বলেছিল। আম্মির খুব সাহস ছিল। বিলের জিনে ভয় করত বলে মনে হতো না। কিন্তু আম্মির কথায় ইয়াসিনের ভরসা হয়নি। ও ঘুমের মধ্যে হাঁসদুটোকে দেখেছিল। বিলের জলে সাঁতরে সাঁতরে এসে ডাঙায় উঠেছিল। ইয়াসিন তখন ডাঙায় ঠায় খাড়া। হাঁসদুটোকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছিল ও। ওরা ধরা দেয়নি। ইয়াসিনের পিছুও নেয়নি। কাছে এসে দাঁড়িয়ে কেমন মায়ালু চোখে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
তারপর ধারালো ঠোঁট বেঁকিয়ে নিজেদের বুকে এমনভাবে ঠেকিয়েছিল, যেন বুকের পশমে ওম খুঁজছে। মুগ্ধ হয়ে ইয়াসিন দেখছিল ওদের। সাদা সাদা পশম, বিরাট মাপের ডানা, কুসুমকমলা ঠোঁট—এ দুটো ওরই পোষা হাঁস, নাকি ময় আর মন ভেক ধরে এসেছে ওর কাছে! কোনটা মন, কোনটা ময়, সে-ও দিব্যি বোঝা যায়। যেটা ঘাড় সামান্য বেঁকিয়ে থাকে, সেটাই নিশ্চয়ই মন। কী রূপ তার। জলে তার ডানা ভিজে গেছে। ডানা ঝাপটিয়ে জল ঝেড়ে ফেলছিল সে। ময় পায়ে পায়ে এগোচ্ছিল ওর দিকে।
ঘুমের মধ্যেও নিজের শরীরের এক বিশেষ অংশ স্ফীত হয়ে উঠছিল বুঝেছিল ইয়াসিন। কিন্তু সুখ নয়—গা কেমন ঘিনঘিন করে উঠেছিল। আর ঠিক তখনই ব্যাটাছেলে হাঁসটা নিজের ঠোঁট গুঁজে দিয়েছিল মাদী হাঁসটার বুকে। সোহাগ নয়, মসৃণভাবে বুক চিরে দিয়েছিল মাদীটার। কাঁচা মাংস আর গরম রক্তের গন্ধে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ইয়াসিনের।
এর কতদিন পরে আর মনে পড়ে না, বিলের জলে হাঁসের পালক ভেসে আসতে দেখেছিল ইয়াসিন—গোলাপিরঙা জলের ঢেউ এসে পা ভিজিয়েছিল ইয়াসিনের, তাতে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা পালক, আর পালকের গায়ে ছিটছিট রক্ত… বহুদিন ভুলতে পারেনি ইয়াসিন।
ভোলাটা আরও অসম্ভব হয়ে উঠেছিল আরেকটা কারণে। জিনের আছরের কারণেই হবে হয়তো বা, ইয়াসিনের মা আর বেশিদিন টেকেনি এরপর। চোখ উলটে মরে পড়েছিল উঠোনে। আজমল চাচা আফসোসে মাথা নাড়িয়েছিল—বিটিছেলেটার বড় সাহস ছিল, জিনকেও ডরাত না। গাঁয়ের লোককে দুঃখ করে বলেছিল চাচা, এত সাহস ভালা না—দত্যিদানোর সঙ্গে কি গায়ের জোরে টিকা যায়?
সেদিনের পর থেকেই ইয়াসিন মোল্লা হঠাৎ বড় হয়ে গিয়েছিল।
দুপুরবেলা বাড়ি নিঝুম থাকে। রেখার রান্নাবান্না সারা হয়ে যায় অনেক আগেই। বারোটার সময় স্নান সেরে, পরীকে স্নান করিয়ে রেখা ওকে খাওয়াতে বসে। পরীর খেতে অনেক সময় লাগে। রান্নাঘরের দরজায় একখানা দরমার ঝাঁপ ফেলা। তার গায়ে, বাচ্চাদের ছবির বই থেকে ছিড়ে অনেক ছবি আটকে রেখেছে রেখা। ছবি দেখিয়ে গল্প বললে পরী খায়। কখনও খুব জেদ করলে, বিলের জিনের কথা বলে ভয় দেখায় রেখা। পরী ভয় পায় না। খিলখিল করে হাসে। ইয়াসিন একবার সেই হাসি দেখেছিল। জিনের কথা শুনলে পরীর হাসি থামতেই চায় না। বাচ্চা বলেই এত সাহস !
, ইয়াসিন রান্নাঘরের ঝাঁপ ঠেলে দেখল ভিতরে। আজ পেয়ারাবাগানের কাজ কম ছিল। দেড়টার মধ্যে খেতে আসতে পেরেছে। দরজার ওপার থেকে পেঁয়াজ, আদা, রসুনের ভুনা মশলার সুবাস এসে লাগল নাকে। আজ কী রান্না করেছে রেখা! ইয়াসিনের হঠাৎ ফুর্তি হল। রান্নাঘরটার ফুটিফাটা দশা। হাঁড়িপাতিল কাঠের তাকে অগোছালো ভাবে রাখা—পেছনপোড়া, দুমড়ে গিয়ে গায়ে টাল খাওয়া বাসন। সেগুলোকেই উলটে পালটে ইয়াসিন সুগন্ধের খোঁজ শুরু করল।
‘এইডা খুঁজতাছেন নি?’ আসমানির গলার ডাকে চমকে উঠল ইয়াসিন। ওর হাতে একটা স্টিলের বাটিতে গোস্ত। গরম, ধোঁয়া উঠছে।
‘পুবপাড়ার মেজনি খাতুনের বাড়ি থেকে নেমন্ত করতে এইয়েছিল। মেজনির বোনের নিকাহ বেস্পতিবার। গয়না শাড়ি দ্যাখতে গ্যাছে রেখাদি। পরী নে সঙ্গে নে গেছে।’
‘তুমি যাওনি?” ইয়াসিন গলা খাঁকরিয়ে প্রশ্ন করল।
‘নাহ। ওরা কুরবানির গোস্ত দে গেসল। আমি রান্না করেছি। খেয়েছি। আপনের জন্য এক বাটি রেখে দিতে বলেছেল রেখাদি।’ “ওহ৷’
আসমানি ঠোঁট টিপে হাসল। ইয়াসিনের হাতে বাটি দেওয়ার সময় আঙুলগুলো ইচ্ছে করে ওর হাতের তেলোতে ছুঁয়ে দিল। পরনে একটা ফিনফিনে কামিজ৷ পর্দা করেনি। আচ্ছা বেশরম মাইয়া। রেখা কি কিছু না বুঝেই ওকে বাড়িতে রেখে গেছে এসময়! ইয়াসিনের খেতে আসার সময় হয়ে গেছে জেনেও? নাকি রেখা যাচাই করে দেখছে, তার স্বামীর পিরিতে জং ধরছে কিনা!
আসমানির ঠোঁটদুটো হাসার সময় পেয়ারা পাতায় লাগা সাদা সাদা পেটমোটা পোকাগুলোর মতো লাগে—স্বচ্ছ চামড়ার নীচে নীলচে আভা, একটা আরেকটার গায়ে ঠেকে মোচড় দিচ্ছে সমানে। ইয়াসিন অনেকবার পাতার পোকা আঙুলে টিপে মেরেছে নিজে হাতে। এখনও সেরকম ইচ্ছে হল।
বাইরে চনচনে রোদ্দুর, রান্নাঘরের জানালায় সজনের ডাল দুলছে। সবজে কালো ছায়া ঘর জুড়ে।
আসমানির অদ্ভুত ফর্সা মুখ আর পাতলা ঠোঁটের ডগায় ঝুলন্ত হাসি—যেন ময়মনবিল থেকে মন নামের সেই সুন্দরী জিন উঠে এসেছে। নিজের ফুফাতো বোন, এর আগে তো কখনও এমন লাগেনি ওকে। ইয়াসিনের বুক ধড়াস করে উঠল। ভয়ে নয়, বরং তিতকুটে বিরক্তিতে মন ভরে উঠল। ফুফা ফুফিকে সে কথা দিয়েছে আসমানির খেয়াল রাখবে। গায়ে আঁচড় লাগতে দেবে না। আর এই বিটিছেলে নিজের সর্বনাশ করতে চায় নাকি !
‘কী হল খাবারটা ধরেন?’ নরম গলায় বলে উঠল আসমানি।
‘ওইহানে থোও আসমানি।’ রুক্ষ গলায় বলল ইয়াসিন। বাইরের গেট খোলার আওয়াজ হল। রেখা এসেছে। পরীর কান্নার আওয়াজ এল। ইয়াসিনের খিদের অনুভূতিটাও
ফেরত এল। কিন্তু মাথার মধ্যে এমন অস্বস্তি ভর করল, যে তখনই রসিয়ে খেতে মন হল না। লাল তেল চুপচুপে ঝোলে ডোবানো টুকরোগুলো রেখে দিলে রাতে পরী খাবে, সেও গোস্ত খেতে ভালোবাসে—বাপ বেটিতে জমিয়ে খাওয়া হবে, এই ভেবে ইয়াসিন ডাল ভাত আর বেগুনভাজায় দুপুরের খাবার সারল।
কিন্তু ওর কপালে সেদিন গোস্ত ছিল না। পেটে একটা ব্যথা হচ্ছিল। রেখারও পেট ভরা ছিল, সে নেমতন্ন বাড়িতে ভরপেট খেয়ে এসেছে। পরী একাই খেল। আর পরীকে খেতে দেখে ইয়াসিনের যা সুখ হল, তাতে সব জুড়িয়ে গেল। তিনখানি মাংসের টুকরো দিয়ে চেটেপুটে ভাত খেল পরী। ওইটুকুন মেইয়ে, খাবারের স্বাদ পছন্দ হলে আর ঝাল লাগে না, মনে মনে ভেবে হাসল ইয়াসিন। ডাল ভাতের পিণ্ডি খায় বলেই না রোজ খেতে বসে অত সময় নেয় !
‘কাল রাতে আসমানি ফের বিলের ধারে গেসল। মেজনির বাড়িতে সকলে বলাবলি করতেসিল।’ রেখা রাতে বিছানায় বলল। ‘সকলে?’
‘সাজেদা বিবি শুরু করল, তারপর মইদুল মিস্ত্রির আপা…তারপর সক্কলে গুজগুজ করতে সিল। আপনে অরে ডেকে মানা কইরেন না কেন ?
‘ ‘মানা তো করসি, ধিড়িঙ্গে মাইয়া না শোনলে আমি কি ঘাড় ধরে শোনাব ? ইয়াসিন চাপা গলায় বলল। আসমানির ফিনফিনে কামিজ, পাতলা ঠোঁটের হাসি মনে পড়ে দুপুরের অস্বস্তিটা আবার ফিরে এল।
‘বিলের ধারে গ্যালে কীড়া হয় জানেন তো? সাজেদা বিবি কইতেসিল আসমানিরে জিনে নেবে। জিন ক্যামনে ন্যায় আপনে জানেন না?’
বলল। ‘নাহ। আমি কি পির ফকির নাকি?” ইয়াসিন উলটো দিকে পাশ ফিরে শুয়ে
“বিটিছেলেদের বেশি ধরে। মদ্দা জিন তো৷ হাড়ের বাঁশিতে ফু দিয়ে বশ করে৷ আপনে বোঝতেও পারবেন না, জিন কখন কারে বাগে পায়, কখন কার গলায় কামড় বসায়।
‘তোমাকে এসব কে বলল?’
‘সক্কলে জানে তো৷ এই জিন যেমন তেমন জিন নয়, জোড়া খোঁজে জোড়া। জোড়ার একটারে খেইয়ে ফের বিলের জলে ঘাপুস…’ রেখা বলতে বলতে শিউরে উঠল যেন।
‘তাইলে আর আসমানিরে নিইয়ে ভয় খাও কেন? তার তো জোড়া নাই। ইয়াসিন হাই তুলতে তুলতে বলল।
‘জোড়া নাই, জোড়া হতি কতক্ষণ? ও মেয়ের হাল চাল শরিফ নয়।’ ইয়াসিনের তার মার কথা মনে পড়ে গেল। মারও কি চালচলন শরিফ ছিল শেষ দিকটায়? আব্বার গোরে মাটি পড়ল কি পড়ল না, মা আজমল চাচার দিকে ঢলে পড়েনি? হঠাৎ চলে আসলে মুচকি হেসে জালার জল গড়িয়ে দিত না? জিন
কি রক্তে বদ গন্ধ পায়। মা যেদিন মরল, তার আগে উঠোনে কাকে যেন দেখে চমকে বারবার পিছু তাকাচ্ছিল। আজমল চাচা বর্ধমান গেছিল তখন। ইয়াসিনকে তবু একবার জিগ্যেস করেছিল ওর মা, ‘হ্যাঁ রে ইয়াসিন, তর চাচায় ফিরছে নাকি?”
‘নাহ, সে তো কাল ফিরবে।’ ইয়াসিন ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দিচ্ছিল তখন। ‘আমিও তো তাই জানি। তবু তখন কেমন মনে হল, উঠোনে এসে খাড়াইছে। ছায়া দেখছি হবে কোনও!’
ইয়াসিন উত্তর দেয়নি। তার হাঁসদুটোর কথা মনে পড়েছিল—ব্লেডের মতো ধারালো ঠোট দিয়ে মাদীটার বুক চিরে দিচ্ছে মদ্দা। জলের মধ্যে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ছড়াচ্ছে—দুধে আলতা থেকে লালচে গোলাপি—মুহূর্তের মধ্যে বিলের জলের রঙ বদলাচ্ছে। ইয়াসিনের কান মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। উঠে ঢকঢক করে জল খেয়েছিল ও।
আজও জল পিপাসা পেয়েছে খুব। ঘরের ভিতর ঘটিতে জল রাখতে ভুলে গেছে রেখা। ইয়াসিন ঘুম চোখে রান্নাঘরের দিকে এগোল। রান্নাঘরের পাশে ছোট আরেকটা ঘরে আসমানি শোয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিকে চোখ চলে গেল ইয়াসিনের। বিছানায় এক চিলতে আলোর মতো ঘুমাচ্ছে আসমানি। ফর্সা পায়ের গোছ দেখা যায়, পরনের নাইটি গুটিয়ে হাঁটুর কাছে উঠেছে।
চোখ সরিয়ে নিল ইয়াসিন। রাগ হল, ক্ষোভও। এই আপদ কতদিনে বাড়ি থেকে যায় কে জানে। তখন ছ’-ছ’টা পাঁচশো টাকার বদলে অনেকটা হ্যাপা নিয়ে ফেলেছে ও। পায়ে পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল ইয়াসিন। জল খেল। ফেরার সময় আবার চোখ গেল আসমানির দিকে। বিসমিল্লা হীর রাহমা নীর রাহিম! আসমানিকে কি সত্যি জিনে পেয়েছে? শরীরের ওই জ্যোতি আসে কোত্থেকে?
বিলের ধারে শনশন হাওয়া দেয় রাতে। তিনকোনা আলো নাচতে নাচতে মানুষের ভেক ধরে। আসল মানুষের মধ্যে ঢুকে যায়, না মানুষটাই আর থাকে না—তা কে বলতে পারে? ইয়াসিন মনে মনে তিনবার আয়াতুল কুরসি পড়ে দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে মাছেহ করে নিল। মাথা একটু হলেও হালকা লাগছিল এবার। বিছানায় কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর ঘুম নেমে এল দুইচোখে।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙল রেখার ভয়ার্ত চিৎকারে। পরীর গায়ে এত জ্বর, যে সে বেহুঁশ হয়ে গেছে। ধড়ফড়িয়ে মেয়েকে কোলে নিল ইয়াসিন। গা তাপে পুড়ে যাচ্ছে। চামড়ার তলায় ছোট ছোট লালচে বুজকুড়ি, মুখে আর গলায় বেশি। ডান কানের ঠিক নীচে গলার লালচে দাগটা সবচে বড়, পাশাপাশি দুটো লাল ছোপ—যেন কেউ দাঁত বসানোর চেষ্টা করেছে।
অনেক চেষ্টা করেও পরীকে বাঁচানো গেল না। তার গলায় দংশনের মতো লাল ছোপ দ্রুত সারা শরীরে ছড়াল। শেষে রক্তবমি করতে করতে পরী মারা গেল। হাকিম বলল খাবার থেকে বিষক্রিয়া হতে পারে। গোস্ত গরমে পচে গিয়েছিল
হয়তো, পরীর কচি পেটে তা একেবারেই সয়নি। বড়রা খেলে হয়তো সেরকম কিছু হতো না। ওষুধে কাজ দিত। হাকিমের কথায় কজন বিশ্বাস করল তা বলা মুশকিল। গলার কাছে লাল দাগটা বড় তাগড়া। পাড়া প্রতিবেশী গুজগুজ করল, তাদেরও ভিড় পাতলা হয়ে এল সন্ধেয়।
কবরে মাটি দিয়ে ইয়াসিন আর অন্যেরা সবে ফিরেছে তখন। চৌধুরীদের বাড়ি থেকে এসে খোঁজ নিয়ে গেছে দু-তিনবার। টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করেছে। কদিন ইয়াসিন কাজে না গেলে রোজ কাটবে না, আশ্বাস দিয়েছেন চৌধুরী। ইয়াসিন চোখ মেলে চেয়ে থেকেছে। কিছু বুঝতে পারেনি। গোরের গেরুয়া মাটি কলতলায় হাত থেকে ঘষে ঘষে রগড়ে ধুয়ে ফেলেছে, কিন্তু সদ্য খুঁড়ে তোলা সোঁদা মাটির অদ্ভুত গন্ধ ওর সারা গায়ে লেগে থেকেছে৷ ক্লান্তি আর বিষাদে ইয়াসিনের চোখ বুজে এলেও, পরীর শরীরের উপর ঝুপ ঝুপ মাটি পড়ার শব্দ ওকে ঘুমাতে দেয়নি৷
রেখা কোলের উপর দু হাত ছড়িয়ে অন্ধকারের মূর্তির মতো বসে ছিল। পরীকে সকলে সাদা চাদরে মুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই হাত দুটোর উপরেই তার মাথা আর পাতলা শরীর ধরে রেখেছিল রেখা।
ইয়াসিন শোকে টলতে টলতে তার কাছে গেলে সেও মরা মাছের মতো ইয়াসিনের দিকে তাকাল। সেই তাকানোর ভাষা বুঝল না ইয়াসিন। বাইরের দরমা ঘেরা বারান্দায় আসমানি হেঁটে গেল। তার নূপুরের ছমছম শব্দ, রাতের নিঝুম বাতাসে মিশে গেল। জানালা দিয়ে বিলের হাওয়া এল ঘরে। রেখার চোখ হিংস্র হয়ে উঠল হঠাৎ। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল, ‘আপনে ঠিকই বুঝতাছিলেন, তবুও কিছু করেননি, তাই না?” ‘কী কও রেখা?” ইয়াসিন শোকে উদভ্রান্ত ছিল। রেখার কথার অর্থ বুঝল না৷ ‘আপনারে পই পই করে বলেছিলাম, ওই মেয়ের আচার আচরণ পাক নয়৷ রেতের বেলা বিলের ধারে দাঁড়ায়, তেমন বুকের পাটা বিটিছেলেকে কে দ্যায়? ইবলিশ ছাড়া?’
ইয়াসিন রেখার কথার উত্তর দিল না। শুধু একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিল, আসমানি সত্যি যেন কেমনধারা। প্রতিবেশীরা রাতের খাবার দিয়ে গিয়েছিল ওদের জন্য৷ ইয়াসিন আর রেখা মুখে তোলেনি খাবার। আসমানি খেয়েছিল। ইয়াসিনকে সাধতেও এসেছিল। সামনের দিকে ঝুঁকে, ওর পায়ের কাছে মুড়ির বাটি নামিয়ে রেখে গিয়েছিল। বুকের নরম মাংস উথলে বেরিয়ে আসে ওরকম ঝুঁকলে, মেয়েটা কি তা খেয়াল করে নাঃ ওর চোখের দিকে তাকিয়েছিল ইয়াসিন। সুমা লাগাতে আজও ভোলেনি আসমানি। কখন লাগিয়েছিল? পরীকে দফন করার আগে না পরে?
‘বিশ্বাস করতাছেন নি? চলেন আপনারে দেখাব।’ আলুথালু হয়ে রেখা উঠে দাঁড়াল। ইয়াসিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বিলের ধারে। পাড়ের মাটিতে ওদের দুজনের ছায়া পড়ল, ওদের শরীরের থেকে অনেক বড় মাপের। জোলো গন্ধ আসছিল একটা। ইয়াসিন নাক টানল। বহুদিন পর এত রাতে সে বিলের ধারে এসেছে। শেষবার মা বেঁচে থাকতে—সেসময় তার বয়স অল্প ছিল।
বিলের তিনকোনা আলো, নাকি তিনচোখো ময়ের শরীর, তলিয়ে দেখার সাহস ছিল না। এই মধ্যবয়সেও ধূ-ধূ কালো জলের সামনে দাঁড়িয়ে ইয়াসিন কেঁপে গেল। সদ্য গোর দিয়ে আসা মেয়ের কচি মুখটা মনে পড়ে গেল। রাত গভীর হলে বিলের পানি থেকে ময় উঠে আসে৷ সর্বনাশ করে। আগেই বিশ্বাস করত ইয়াসিন। এখন সে বিশ্বাস গভীরতর হচ্ছিল।
‘ওই দ্যাখেন!’ রেখা ফিসফিসিয়ে বলে উঠল।
রেখার বাড়ানো হাতের দিকে ইয়াসিন তাকাল। বিলের ধারে যে আগাছা, সেখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জিনিসগুলো। চোখ কুঁচকে দেখল ইয়াসিন। ক’টা মাংসের হাড়। জ্যোৎস্না ঘেরা ছায়ায় হলদেটে, ফ্যাটফ্যাট করছে। গায়ে এক টুকরো গোস্ত লেগে নেই। চেটেপুটে চুষে পরিষ্কার করে খাওয়া। কয়েকটা গুঁড়ো গুঁড়ো বাদামি হয়ে পড়ে আছে। এখানে হাড় এল কোত্থেকে? জবাই করার পর ফেলে দেওয়া হাড় মনে হচ্ছে! সেরম হাড় খাওয়া যে হারাম! সে যে জিন দানোয় খায়।
‘গোস্তের হাড়গোড় ফেলেছে আসমানি। ওকে বারণ করেছিলাম এধারে কিছু ফেলতে। কথা শুনতাছেন নি আপনি ?
‘হুঁ।’. ইয়াসিন দমচাপা ভাব সামলে বলল। হাড়গুলো যে চিবিয়ে খেয়েছে কেউ, তা খেয়াল করেনি রেখা।
‘সাজেদা বিবি সেদিন বলতেছিল, আসমানি চুল খুলে বেবাক সব ভুলে বিলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক রাতে যখন আপনি আমি ঘুমাই, সেসময় সে এখানে আসে। গুনগুন গান গায়। বিলের পানিতে পা ডোবায়।’ রেখা কেঁপে গেল কথাগুলো বলতে বলতে, ‘গোস্তের হাড়গোড় এধারে কেন দিয়ে গ্যাছে সে, বুঝতাছেন নি?”
‘কেন? ’
‘সে জিনরে ডাকছে, জিন তারে বশ করছে। জিনের তাজা রক্ত চাই, কচি গোস্ত চাই। আসমানি জিনরে সব দেছে। সব। ওর হাড় ফুটো করে জিন ওর শরীরে ঢুকেছে। এখন ওর চোখই জিনের চোখ, গোটা মাথাটাই জিনের বাসা। জিভে রক্তের স্বাদ পায়, নাকে সারাক্ষণ মানুষের গায়ের গন্ধ পায়। রূপের জাদুতে ব্যাটাছেলে ধরে আনে।’ রেখা কঁকিয়ে উঠল বলতে বলতে।
‘আসমানির জোড়া নাই এখানে। যার সঙ্গে নিকাহ দিবে ফুফা ফুফু, সে থাকে দুশো মাইল দূরে। বোকা কথা কওনি রেখা।’ ইয়াসিন সামান্য ঝাঁঝিয়ে বলল৷ কিন্তু নিজের কথাতে তার নিজেরই বিশ্বাস ছিল না। সারা শরীরে ঘাম দিচ্ছিল। ঘামের ফোঁটা পিঠ বেয়ে আরও নীচে নামছিল। দাবনা ঘামছিল। নাকের পাটাও। আসমানির হুরের মতো রূপ না কেয়ামতের জাদু? যখন এসেছিল তখন তো এমন লাগেনি। বুকের নরম মাংস, পায়ের চিকন গোছ, ইয়াসিনকে দেখে ঠোঁট টিপে হাসি, নরম সুরের কথা–সব মনে পড়ে গেল ইয়াসিনের। খোদ ইবলিশ ভর করেছে ওই মাইয়ার উপর?
‘জোড়া বর্ধমানে নয়, জোড়া নিজের ঘরেই আছে।’ রেখা হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
‘আপনার ওপর ওর লোভ। আমি ওর চোখের ভাষা দ্যাখছি। ও আপনারে খাবে। তার আগে আপনার পরিবার খাবে, আপনারে একা করবে। আপনে কখন ওর উপর নিজেরে পুরা ছাড়ি দিবেন, ও সেই তাকে তাকে আছে…’
রেখার কথা ওর ফোঁপানিতে মিশে গেল। ইয়াসিন নিজের গলায় হাত বুলাল। কানের নীচে রগটা দপদপ করে উঠল। রগের ভিতর রক্ত দৌড়াচ্ছে। সারা শরীরের মধ্যে সবচে জোরের, সবচে তাকদের রগ। পরীর এই রগটায় কে যেন দাঁত বসিয়ে শরীরে বিষ ঢেলে দিয়ে গেছে। হাতের তালুতে গোস্তর বাটির উষ্ণতা ফের অনুভব করল ইয়াসিন। আসমানির নরম তালুর ওম-ও। খিদমত নয়, কেয়ামতের ওম। বিড়বিড়িয়ে ও ডাকল, ‘পরী…পরী…’
বুকের মধ্যে বিলের কালো অন্ধকার জাঁক করে বসল। ও বুঝতে পারল, পানির মধ্যে ময় নামের জিনটা বসে বসে দুয়ো দিচ্ছে ওকে। ওর পাঁজর খুলে কে কবে মনকে নিয়ে গিয়েছিল, এখন গোস্ত খেয়ে ও পাঁজর ভরাট করে। হাড়ের বাঁশিতে ফুঁ দেয়।
ইয়াসিনের আসমানির ঠোঁট জোড়ার কথা মনে পড়ে গেল। মাংসল জিভের কথা। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে লিপস্টিক লাগা দাঁতের অংশ উঁকি দেয়, লাল লিপস্টিক লাগায় আসমানি। অন্য রঙ লাগাতে দেখেনি কোনওদিন ইয়াসিন। আজও লিপস্টিক লাগিয়েছিল কি! লাল লিপস্টিকের রঙে রক্তের রঙ ঢাকা যায় সহজে। ইয়াসিনের বুকের ভিতর ভারী ভারী লাগে। মাথাটা ব্যোমকে যায়। মা মারা যাওয়ার আগেও ঠিক এরকম লেগেছিল। স্মৃতিটা বুক পেট ফুঁড়ে উপরে উঠে আসে।
ইয়াসিন বা রেখা দুজনের কেউই বুক চাপড়ে, জামা কাপড় ছিঁড়ে, শোকে উন্মাদ হয়ে গেল না। পরীর মাগফিরাত কামনা করে দুজনেই দোয়া করল। ইস্তিগফার করল। ইয়াসিন কবরে জিয়ারত করে এল। .
মহান আল্লা বলেছেন, প্রিয়জন হারিয়ে ধৈর্য ধরলে, নেকির আশায় থাকলে তাকে জান্নাত মকুব করবেন। ইয়াসিন সে কথা ভুলল না। কিন্তু মেয়ের শোকে তার চোখ বেয়ে পানি আসে, আর তা থামানো তার সাধ্যের অতীত। রেখা সে রাতের তুমুল বিস্ফোরণের পর হঠাৎ ঝিমিয়ে গিয়েছিল। পরী চলে যাওয়াতে বাকি সংসার থাকল, কী ডুবল, এই বোধটাই তার ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হচ্ছিল। রাঁধতে বসে বেখেয়ালে সে তার আঁচলে প্রায় আগুন লাগিয়ে ফেলছিল। আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে ইয়াসিন রেখাকে তার আব্বার কাছে দিয়ে এসেছে, তিন দিন হল।
এখন ইয়াসিন আসমানির সঙ্গে একই ছাদের তলায় থাকবে। প্রতিবেশীরা অবাক হল, ভয়ও পেল, কিন্তু ইয়াসিন তার দেওয়া কথা রাখবে বলেই, আসমানিকে অন্য কোথাও দিয়ে এল না। ওরও যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিল। ফুফা ফুফু হজ থেকে ফিরছেন আগামী সোমবার। কিন্তু ইয়াসিন মোল্লা দায়িত্ব যেমন ছাড়ল না, তেমনই সে
তক্কে তক্কে রইল। আসমানি কি মানুষ না জিন— চরম শোকের মধ্যেও এই সংশয় মাথা থেকে মুছে গেল না ওর। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘেমে নেয়ে উঠে বসে ওর কোরানে পড়া আয়াতের কথা মনে পড়ল—’হে আদমের সন্তানেরা, শয়তান যেন তোমায় ভুলিয়ে নাপাক না করে।’
আসমানি এ কদিনে ইয়াসিনের সামনে বেশি আসেনি। পাথরের মতো বসে থাকতে দেখে সামনে দিয়ে চলে গেছে। রেখা নেই, ফলে সে রেঁধেছে। ইয়াসিন সে খাবার মুখে তোলেনি। বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও সে আসমানিকে চোখে চোখে রেখেছে। বেতরিবত কিছু দেখলে সে কীভাবে মোকাবিলা করবে জানে না, কিন্তু সতর্ক হয়ে থাকতে দোষ কী!
চৌধুরীর বাগানে নানা কথা হয়। কেউ বলে জিন মানুষকে ভুলানোর জন্য যার রূপ ধরে আসে, তাকেই আগে কতল করে। তার শরীরটা এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখে যে চট করে কারও চোখে পড়ে না। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ইবলিশ তার শরীর দখল করে থাকতে পারে। সাধারণের মধ্যে এমনভাবে মিশে থাকতে পারে যে তাকে চেনা সহজ হয় না।
রাতের বেলা অসহ্য গরম লাগছে আজ। ইয়াসিন এপাশ ওপাশ করেও ঘুমাতে পারেনি। যতবার ঘুম এসেছে, ঝটকা লেগে ভেঙে গেছে। এমন গুমোট যে গাছের পাতাও নড়ে না। শোওয়ার ঘরের একটাই জানালা, তাতে পর্দা করা ছিল রেখার পুরোনো নাইটি দিয়ে। মাঝে মাঝে ফেঁসে গিয়েছে পর্দা। ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো ঢোকে৷ ইয়াসিন উঠে ঘটি থেকে ঢকঢক করে জল খেল। জলের ধারা গলা বেয়ে বুক ভিজাল। কোথা থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে….কীসের শব্দ তা ধরতে পারল না ইয়াসিন। একটা গুনগুন আওয়াজ, গানের অথবা ফোঁপানির, খুব ধীর চাপা কণ্ঠস্বর ইয়াসিনের কানে এসে পৌঁছাল। মনে হল, কান পাতলে কথাগুলো স্পষ্ট বোঝা যাবে, কিন্তু মন পাতলেই, সেই শব্দ দূর থেকে আরও দূরে চলে যায়৷ , ইয়াসিন ঠিক করল, ও এই শব্দের পিছু করবে।
বারান্দার আলোটা কেটে গেছে কিছুদিন। কুপি জ্বালিয়ে ইয়াসিন বারান্দায় বেরোতেই রান্নাঘরের অর্ধেক খোলা দরজার দিকে ওর নজর পড়ল। আর তখনই গুমোট ভেঙে দমকা হাওয়া এসে কুপির আগুন নিভিয়ে দিয়ে গেল। যে অশরীরী শব্দের পিছু নিয়েছিল ও, তা থেমে গিয়ে ‘রান্নাঘরের ভিতর থেকে ঠুকঠাক আওয়াজ এল।
শোওয়ার আগে রান্নাঘরের দরজা সে বন্ধ করে শুয়েছিল। পরিষ্কার মনে আছে। দরজার দরমার বেড়ার ফাঁক থেকে কোনও আলো নজরে আসে না। তবু, ইয়াসিনের মনে হল, দরজার ওপার থেকে হাঁড়ি পাতিল সরানোর আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে কার যেন নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে। ইয়াসিন মনে মনে একবার পিছু হটল, কিন্তু তারপরেই ওর বুকের মধ্যে পরীর পাংশু মুখটা ভেসে উঠল। দমকা হাওয়ার ঝোঁক বাড়ছিল। ইয়াসিন স্পষ্ট বুঝল, কেউ যেন ওকে ঠেলে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
দরজাটার পাল্লার কাছে দমবন্ধ করে দাঁড়াল ইয়াসিন। ভিতর থেকে কচকচ করে
আওয়াজ আসছিল। দরজাটা এক হাতে জোরে ঠেলে দিল ও, আর যা দেখল, তাতে ওর বুকের রক্ত চলকে উঠল। মেজেতে একটা তেলের কুপি জ্বলছে, আর তার পাশে থেবড়ে বসে, একটা জামবাটি থেকে মাংস তুলে মুখে পুরছে আসমানি। ঝোল আর লালায় ঠোঁটের চারপাশ মাখামাখি। ছোট কুপিতে যত না আলো হয়, তাচ্চেয়ে অনেক বেশি ছায়া হয়। ঘরটা সেই আলোয় এমন ঝুল কালো লাগছিল, যেন জাহান্নামের অন্ধকূপ।
ইয়াসিন আসমানির চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। সেখানে গাঢ় অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নেই। ইয়াসিনের পায়ের শব্দ টের পায়নি ও। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঝোল জিভ দিয়ে চেটে নিল আসমানি। মুখের ভিতর মাংস চেবানোর শব্দ এল—কচ কচ কচ।
‘এত রাতে কী খাচ্ছ আসমানি? গোস্ত কই পেলে?’
ইয়াসিনের গলায় আসমানি এমন চমকে গেল যে খাবার হাত থেকে ফেলে দিল পাতে। কয়েক দণ্ড। তারপরেই ওর মুখে এমন একটা হাসি ফুটে উঠল, যে মনে হল স্বয়ং ইবলিশ তার ধারালো দাঁতে শান দিয়েছে।
‘পাশের বাড়ি থেকে দিয়ে গেছিল রাতে। আপনাকে সাধব ভাবলাম, আপনি তো খান না। মাঝরাতে খিদে লাগছিল, তাই উঠে…’ হাত দিয়ে নাল ঝোল মুছতে মুছতে বলল আসমানি।
‘সে রাতেও তবে তুমিই গোস্ত খেয়েছিলে?’ প্রশ্নটা ইয়াসিনের মুখ থেকে গরম হলকার মতো বেরিয়ে এল।
আসমানি বোকার মতো হাসার চেষ্টা করল। তারপর অদ্ভুত একটা খনখনে গলায় বলল, ‘কই, এক টুকরোও তো ছিল না…খালি হাড়গুলো বাটিতে ছিল। পরীকে রেখা ভাবী হাড় থেকে ছাড়িয়ে মাংস খাইয়েছিল…এ বাড়িতে আসার পর থেকে গোস্ত খাইনি, সেদিন দুপুরে শুধু এক টুকরা…খুব ইচ্ছা করছিল…তাই ঝোলটুকু আর হাড়গুলো…’
ইয়াসিনের মাথা লন্ডভন্ড হয়ে গেল। হাড় চিবানো হলদেটে বাদামি গুঁড়ো ঘাসের উপর ছড়িয়ে আছে, দিনের আলোর মতো মনে পড়ে গেল। মিছে কথা বলছে আসমানি৷ ওই গোস্ত খেলে ওর কিছু হল না কেন! ওই খেয়েই তো পরী মরল!
‘তোমার শরীরে তাইলে বিষ ঢুকেনি আসমানি! ঢুকার কথাও নয় অবিশ্যি। তোমার রগে রক্ত তো আর মানুষের নয়। আমার পরীরে কেমনে খেলে, গলায় দাঁত বিধিয়ে? ‘
ইয়াসিনের গলার আওয়াজ হিংস্র হয়ে উঠল। মাথার মধ্যে সেই শব্দ, কোন একটা অতল থেকে উঠে এল আবার। পেয়ারা বাগানের সাদা সাদা পোকা যেমন পাতার উপর কিলবিল করে, তেমনি সেই আওয়াজ ইয়াসিনের মাথার ভিতর সব স্নায়ু ঘেঁটে দিচ্ছিল।
আসমানি ইয়াসিনের কথায় একটু থমকে গেল প্রথমে, তারপরেই সে দম বন্ধ করা হাসি হাসতে লাগল।
‘কী বলছেন কী আপনি? কিছু বুঝছি না।’ হাসতে হাসতেই প্রশ্ন করল আসমানি। সেই হাসি শুনে ইয়াসিনের জিভ, চোখ, কান ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। ইয়াসিন আর সময় নিল না। দরজার পাশেই একটা রাম-দাঁ ছিল, বিদ্যুতের গতিতে সেটা তুলে নিয়ে আসমানির গলা লক্ষ্য করে ছুটে গেল ও। আসমানি হাসছিল, কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে সে নিশ্চয়ই ইয়াসিনকে দেখেছিল। মাথা নিচু করে কোপ বাঁচাল ও৷ আর এক লহমায় ছুটে দরজার বাইরে বেরিয়ে গেল।
ইয়াসিনের গায়ে অসীম শক্তি ভর করেছিল। আসমানির পিছন পিছন তাড়া করার সময় ও বুঝল, খিড়কির দরজা খোলা। পাল্লা হাট করে আসমানি বিলের ধারে চলে গেছে। মাথার ভিতর শব্দটা আরও স্পষ্ট হচ্ছিল।
এরম শব্দ আগেও হয়েছে, মনে করতে পারছিল ইয়াসিন। হুমহুম করে কারা যেন কীসব আয়াত পড়েছিল সেবার। ময়ের ডাকে জিনের দল আকাশ থেকে নেমে আসে, বলেছিল আম্মি। পৃথিবীর পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ আনাচ কানাচ ঘুরে বেড়ায়। ময়মনবিলের উপর ঘুরে বেড়ায় তাদের অদৃশ্য কায়া। আয়াত পড়ে আকাশ আর জলের মধ্যে অন্তরায় করছিলেন ইমাম। আম্মি তবু, খুশি হতে পারছিলেন না। ইয়াসিন দিন দিন বদতমিজ হচ্ছিল। আজমল চাচার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছিল। আম্মিকে দেখে থুতু ফেলছিল ঘেন্নায়। আম্মির বিশ্বাস ছিল, পাঁচ ওক্ত নামাজ ঠিক করে পড়লেই সব বিপদ কেটে যাবে।
কিন্তু এখন, এত বছর পরে ইয়াসিনের মাথার ভিতর সেই শব্দ থামছে কই? এ কি বিলের পানির নীচ থেকে ময় নামের জিনটার কান্না? এইভাবে মাথা গুলিয়ে দিচ্ছে সে? সে এত শক্তিশালী! ইয়াসিনের মনে পড়ল, ও অনেকদিন ফজরের নামাজ পড়েনি। পরীর যাওয়ার পর থেকে একবারও না!
দূরে ও কে? ইয়াসিন ভুরু কুঁচকে তাকাল। দুধসাদা ওড়না জ্যোৎস্নায় উড়ছে৷ আসমানি কি এখনও হাসছে? বদতমিজ অওরত, হায়া নেই কোনও। ঢলানি মাগি ! ইয়াসিন মনে মনে বিশ্রী খিস্তি করল ওকে। ও কি ইয়াসিনকে দেখে জলে নামছে? ইয়াসিন চোখ বন্ধ করল। আসমানির দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা হাড়ের গুঁড়ো, নাল ঝোল, অন্ধকার চোখ মুখ—এহ! চিনতে বড় দেরি করে ফেলেছে ও৷
পায়ের গোছে যেন হাতির বল এল। রামদা-টা হাতে শক্ত করে ধরে আসমানির দিকে ছুটে গেল ইয়াসিন। ও ওকে টেনে নামানোর আগে, গলাটা ওখানেই কেটে ফেলতে হবে। যখন যখন যার যার উপর জিনের আছর হয়, তখন তাকে এভাবেই… আম্মিকেও গলা টিপে মেরে ফেলতে পারতেই হয়েছিল ওকে৷
আম্মি কি ঠিক বুঝেছিল? জিন আসলে ইয়াসিনকে নয়, আম্মিকে কবজা করতে চেয়েছিল। তাই না অমন রসের নাগর জুটে গেছিল? আব্বা চলে যাওয়ার পর চার মাস দশ দিনের শোকটাও কাটায়নি ঠিক করে, নতুন করে ঢলে পড়েছিল অন্য মরদের দিকে !
আসমানি জলের মধ্যে এক পা ডুবিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। এমন জায়গায়
সে এসে দাঁড়িয়েছে, চারিদিকে ধূ-ধূ পানি। ইয়াসিন নিষ্ঠুর হাসল। এবার একটু দেরি হয়ে গেছে। নিজের চরম ক্ষতি হয়েছে। তার অমন দুধের শিশুটা…না আর দেরি করলে চলবে না৷
হাতের দাঁ-টা তুলে অব্যর্থ কোপ চালাল ইয়াসিন। কিন্তু আশ্চর্য! কোপটা জায়গায় গিয়ে পড়ল না। বদলে ইয়াসিনের পা পিছলে গেল, আর ময়মনবিলের স্থির জল তোলপাড় হয়ে ইয়াসিনকে গিলে নিল পেটে।
ডুবতে ডুবতে ইয়াসিন টের পেল, ওর মাথার ভিতরটা বেবাক ফাঁকা হয়ে গেছে। কোনও শব্দ নেই। শুধু একটা তিনকোনা আগুন ওর আগে আগে জলের তলায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেই আগুনে চোখ মেলে ও চমকে দেখল, অনেক নীচে বিলের গর্ভে এক কিশোর শুয়ে আছে। রোগা পাতলা চিকন চেহারা। পশমের মতো চুল। গলায় মাদুলি, তার গায়ে আম্মি শখ করে খোদাই করে দিয়েছিল নামটা। ইয়াসিন মণ্ডল৷ জিন যার শরীর নেয়, তার দেহ সকলের চোখের আড়ালে রেখে দেয়, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ !
