হেঁটমুন্ডু – নির্বাণ রায়
বাপি… বারোভাতারি কাকে বলে? ‘
মিঠে গলার প্রশ্নটা খচ করে এসে বুকে বিঁধল কার্তিকের। উঠোনধারে টালির চালাটার নীচে উবু হয়ে বসে আছে কার্তিক। মরচে পড়া লোহার শিকখানা দিয়ে থেকে থেকে খুঁচিয়ে দিচ্ছে মাটির উনুনের ঝিমিয়ে পড়া আঁচ। কথাটা কানে আসতেই পেছনদিকে হালকা ঘুরে বসল সে।
সুকু কার্তিকের ব্যাটা। পঞ্চায়েত প্রাথমিক ইস্কুলে কেলাস ফোরে পড়ে। সুকুর পরনে হাফপ্যান্ট, হাওয়াই চটি৷ খালি গা—পাঁজরা গোনা যায়। সুকুর এক হাতে একটা লাল ঘুড়ি, অন্য হাতে লাটাই। কথাটা সুকুই বলেছে।
কার্তিক শুকনো গলায় শুধোয়, ‘কী বললি ? ”
সুকু বলে, ‘বারোভাতারি… কাকে বলে বাপি?”
কার্তিক আড়ষ্ট। আর্দ্র বাতাসে কথাখানা ঝুলে থাকে ঝাঁঝালো আঁশটে গন্ধের মতো। ভাতের হাঁড়ির আশেপাশে মাছি ভ্যানভ্যান করে। সুকুর চোখজোড়া উজ্জ্বল, ছলছলে। দেখলেই বুকটা আঁকপাঁক করে ওঠে কার্তিকের।
‘কোত্থেকে শুনে এলি এ কতা?’
সুকু কচি গলায় উত্তর দেয়, ‘ঘোষেদের বাড়ির সুপুরি ঠাগমা বলল। আমি ওদের পাঁচিলের ধার থেকে আম কুইড়েছিলুম। মাক্কালী বলচি বাপি, আমি গাছ থেকে পাড়িনি— কুইড়েছিলুম। সুপুরি ঠাগমা ছাদ থেকে চেললে বলল, ‘মা যেমন বারোভাতারি, ছেলে তেমনি চোর…’
কার্তিকের মনে হয় তার বুকের ভেতরটা কেউ নারকেল কুডুনি দিয়ে কুড়ছে। তাও কাঠ হেসে সে বলে, ‘বারোভাতারি মানে… বারোভাতারি মানে যে ঠিক দুকুর বারোটার সময় ভাত খায় … বুজলি?’
‘কিন্তু মা তো দুকুর বারোটার সময় ভাত খায় না! সেবার খেইছিল অনেক রাত্তিরে… বারোটা কি না তা আমি জানি নে…
কার্তিক ভালো করে ঘুরে বসে। সুকুর চোখে চোখ রেখে শুধোয়, ‘কবে? ’ ‘সেই সেবার পুজোর সময় তুমি যখন হোলনাইট ডিউটি দিচ্ছিলে… মা আমাকে দুধ-রুটি খাইয়ে তাড়াতাড়ি ঘুম পায়ড়ে দিত। আমি ঘুমুতাম না। চাদরের ফাঁক দিয়ে চেয়ে থাকতাম… বিল্টুকাকু আসত… মা আর বিটুকাকু ভাত খেত… খাসির মাংস দিয়ে…’
মাটির হাঁড়িতে ভাতের ফ্যান উথলে ওঠে। কার্তিকের সেদিকে হুঁশ নেই৷ ‘সত্যি?’
‘তিন সত্যি বাপি…
সুকুকে দু’হাতে ধরে কাছে টেনে নেয় কার্তিক। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘এসব কতা কাউকে বলিসনি বাবু, হ্যাঁ? আর ওসব বারোভাতারি টাতারি খারাপ কতা। ও কতা খবদ্দার মুখে আনিসনি…’ “কিন্তু সুপুরি ঠাগমা যে বলল…’
দেবে…’ ‘বলুক গে যাক। তুই বলবিনি… ঠিকাচে? বাপি তবে কাঠি আসকিরিম কিনে
খুশি হয়ে ঘাড় নাড়ে সুকু। কমলা রঙের কাঠি আসকিরিম তার খুব ভাল্লাগে। জিভটা কিরম রঙিন হয়ে যায়।
দিন বড় গুমোট। ছাইরঙা আকাশ দেখে বোঝার জো নেই যে বেলা কদ্দূর গড়াল। উঠোনে জমা জলের ওপর মাথা তুলে জেগে থাকা ইটে ইটে পা ফেলে বাইরের দিকে এগিয়ে যায় সুকু। ‘কোথায় চললি? খেয়ে যা…’
‘মা এলে খাব’খন… খিদে পায়নি অ্যাখন…’
কার্তিক হাঁকে, ‘ঘুড়ি লুটতে গাছে টাছে উঠবিনি খবদ্দার। একটা ঘুড়ি গেলে দশটা কিনে দোব, কিন্তু আমি যেন না শুনি তুই ঘুড়ি লুটতে গাছ বেইচিস… পড়ে মরবি…
ভাতের ফ্যান গেলে ঘরে আসে কার্তিক। এক কামরার টালির ঘর। দেওয়ালের নোনা আর গরম ভাতের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে ডাঁই করে রাখা বাসি জামাকাপড়ের গন্ধ। দু’মুঠো খেয়েই টোটো নিয়ে বেরোবে সে। আজ রবিবার—দশটার ট্রেনে কলকাতা থেকে ঘর ফিরতি প্যাসেঞ্জার পাবে বেশ কিছু৷ মনসাতলা বাজারে গেঁড়ি আর হাঁসের ডিম বিক্কিরি করে ঘরে ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে দুপুর হবে পিঙ্কির। সুকু তখনই খাবে।
খেতে বসেও ‘বারোভাতারি’ কথাটা চারা মাছের কাঁটার মতো বিধতে থাকে তাকে। খচখচ করে টাগরায়—গরম ভাতের দলা দিয়ে ঘিটে নেওয়ার চেষ্টা করে কার্তিক৷ গত রাত্তিরেই চটচটে গরমে ঘুম ভেঙে কার্তিক দেখেছিল পিঙ্কি ঘরে নেই। বিছানা ঘাঁটা। দরজায় ফাঁক বইছে। দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গিয়ে সেই ফাঁকে চোখ রেখেছিল কার্তিক। জবাঝাড়ের আবডালে পিঙ্কির ছায়াশরীর। দুটো বলিষ্ঠ পুরুষ-হাত পেষাই করছিল তার নরম বুকজোড়া। পিঙ্কির শীৎকারে কান গরম করে ফের বিছানায় ফিরে এসেছিল কার্তিক। ঘুমন্ত সুকুকে আঁকড়ে ধরেছিল।
‘বারোভাতারি…’ কানে বাজতে থাকে কার্তিকের।
ভাত শেষ করে জামাটা গলিয়ে বেরিয়ে আসে সে। দেড় হাত চওড়া গলিময় স্রেফ শ্যাওলা আর পচা এঁটোকাঁটার গন্ধ। দু’ধারে টিনের চাল, টালির চালের বাড়ি, কাঁচা নর্দমা। কলতলায় বসে বাসন মাজে একটা বুড়ি। কার্তিককে ঘোলাটে চোখে মাপে আগাপাশতলা। গলির বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা টোটোয় উঠে বসে কার্তিক। ঠাকুর পেন্নাম করে চাবি ঘোরায়।
এঁদো গলিখানা পেরিয়ে টোটো আলপথে ওঠে। খানাখন্দ বাঁচিয়ে এগিয়ে চলে সে। ভেজা বাতাস। দু’ধারে ছড়ানো ধানক্ষেত। উল্টোদিক থেকে হাঁইহাঁই করে একটা বাইক আসছে।
ক্যাট-ক্যাট-ক্যাড়-ক্যাড়-ক্যাড়-ক্যাড়…
দুটো চ্যাঙড়া ছেলে। চুলে সোনালি রঙ। গচ্ছা ফচ্ছা মানে না। গুলতিছুট ঢেলার মতো ধেয়ে আসে টোটোর দিকে। পাকা হাতে কাটিয়ে নেয় কার্তিক। ছেলেগুলো চলে যেতে যেতে দুটো কাঁচা খিস্তি ছুড়ে দেয়। হাওয়া কেটে গেলেও কার্তিকের স্পষ্ট কানে আসে—‘বারোভাতারি…’
মাথা দপদপ করতে থাকে তার।
পুকুরপাড়ে এক ল্যাংটো পাগল ঢিল ছোড়ে জলে।
ছপাং ছপ!
পাগলটা নিজের মনে গজগজায়। গতি বাড়ায় কার্তিক। যদি ঢিল মেরে দেয়— পাগল ছাগলের কাণ্ড।
হুশ্ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কার্তিক আবার শোনে—‘বারোভাতারি…’ বুক কেঁপে ওঠে তার।
কার্তিকের বড় ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে কোথাও কেটে পড়তে।
টোটো, সংসার, গ্রাম, বউ—কিচ্ছুটি চাই না তার। কিন্তু পারে না। সুকু আছে যে! তাকে ছাড়া ছেলেটা বাঁচবে কী করে? ওর মা হয়তো সুকুকে না খাইয়ে রেখে দেবে, মারবে-ধরবে। বিল্টুর সঙ্গে ছক করে এক্কেবারে হয়তো মার্ডারই করে দিল। ভাবলেই বুক ঢিপঢিপ করে কার্তিকের
ছেলেটার জন্য বড্ড মায়া লাগে। বুদ্ধিটা এক্কেবারে খাঁটি সোনা। গতবার কেলাস থিরি থেকে ফোরে উঠতে ফার্স্ট হয়েছিল। ইস্কুলের দিদিমণি কার্তিকের হাতে রেজাল্টখানা ধরিয়ে হেসে বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলেকে ঠিকমতো গাইড করলে কিন্তু অনেক দূর যাবে…’
কদ্দূর যাবে তা কার্তিক জানে না। তবে শুনে বড্ড ভাল্লেগেছিল। আরও ভাল্লেগেছিল দিদিমণিকে। বেণী দুলিয়ে অফিসঘরের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন দিদিমণি।
সুকুটাও ভারী বাপন্যাওটা হয়েছে। রাত্তিরে ঘুমোনোর আগে নানারকম গল্প শোনার আবদার করে। কার্তিক পড়ালেখা জানে না বটে, কিন্তু ছেলেবেলায় ঠাগমার মুখে মেলা গল্প শুনেছে সে। সুকুকেও সেগুলোই শোনায়—জলার প্রেত, আদার বাদাড়ের রাক্ষস, লাইনধারের কন্দকাটা, একানড়ে, হেঁটমুন্ডু…
এসব শুনে টুনে ইদানীং আবার ছেলেটা নিজেই বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে শুরু করেছে। ক’দিন আগেই শুয়ে শুয়ে বলছিল, ‘বাপি জানো তো? আমার বন্ধু পানু কন্দকাটা দেকেচে…’
কার্তিক হাসে, “ধুর… গুল দিসনি…’
‘মাক্কালী বলচি বাপি। সন্ধেবেলা পানুর বাপি ঘরে ফিরলেই পানুর মা ওকে
তিরিশ টাকার তেল তুলতে পাঠায়। পানু কেরোসিন নিয়ে ফেরার সময় ওকে কন্দকাটায় তাড়া করে।’
‘তাই ? ’
‘হ্যাঁ গো বাপি… লাইনধারে ওই পুরোনো পুলিশ ফাঁড়ির কাছে এলেই ওকে
কন্দকাটায় তাড়া করে। মুন্ডু নেই। গলার কাছে স্রেফ গ্যাজগ্যাজে মাংস। খুব পচা গন্ধ ছাড়ে। হাতগুলো হাওয়ায় হাইহাই করে টানে।’
‘তাহলে পানুকে তো অ্যাদ্দিনে কন্দকাটায় মেরে দেওয়ার কতা রে… ‘উঁ বাপি! অত সহজ যেন… পানু বহুত জোর ছোটে… ইস্কুলের এস্পোর্টসে গেল বারে পেরাইজ পেল না?’
“তাই? ’
‘ধুর, তুমিও তো দেখতে এয়েচিলে। আমাকে আর পানুকে বাদামভাজা কিনে দিলে… মনে নেই? ‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে বই কি…’
‘বাপি?’
‘P’
‘মা আসে না কেন বাপি? ইস্কুলে আমার রেজাল্ট দিলে, এস্পোর্টস হলে তুমি আসো… মা কখনো আসে না…’
সুকুর গায়ে সুড়সুড়ি দিতে দিতে কার্তিক বলেছিল, ‘মায়ের অনেক কাজ থাকে মানিক। আসবে, মা’কে বলে দোব। এবার থেকে আসবে…’
ঘুম জড়ানো গলায় সুকু ফের ডেকে উঠেছিল, ‘বাপি?’
‘S?’
‘আমি যে পানুর মতো অত জোরে ছুটতে পারি না…’
‘তাতে কী হয়েচে? সবাই কি সব পারে? তুই যে কত ভালো পড়ালেখা করিস…’
হবে? ‘ ‘কন্দকাটা আমাকে তাড়া করলে আমি যে পালাতে পারব না বাপি… তখন কী
সুকুকে নিজের খোঁদলে বসে যাওয়া বুকে আগলে নিয়ে কার্তিক বলেছিল, ‘তোর বাপি আছে না? তোর বাপি হুশ করে টোটো নিয়ে চলে আসবে। এক লাফে তুই টোটোয় উঠে পড়বি। বাপ-ব্যাটা হাঁ-হাঁ করে টোটো চায়লে কেটে পড়ব। কন্দকাটা আমাদের কিচ্ছুটি করতে পারবে নাকো দেকিস।’ ‘সত্যি বাপি?’
‘তিন সত্যি।’
এইসব ভাবতে ভাবতে ঘোর লেগে যায় কার্তিকের। বাজারে পৌঁছতে টোটোর গতি খানিকটা শ্লথ হয়। পোস্টাপিসের সামনে অনেকগুলো বুড়োহাবড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে— প্যাসেঞ্জার। কার্তিক ভাবে, বউনিটা হল তবে।
তখনই তার চোখে পড়ে দৃশ্যটা। চটপটিওয়ালার দোকানে দাঁড়িয়ে রয়েছে পিঙ্কি।
পাশে বিল্টু। হেসে হেসে বিল্টুর গায়ে ঢলে পড়ছে সে। আঁচল খসে যাচ্ছে বুক থেকে। মোটা গোঁফের নীচে বিল্টুর ফিচেল হাসি। ভামবেড়ালের মতো চোখ। তার হাত পিঙ্কির খোলা পেটে…
চোখ সরিয়ে নেয় কার্তিক। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। টোটোর হাতলে আঙুল চেপে বসে। গতি বাড়িয়ে, প্যাসেঞ্জার ফেলে রেখেই স্টেশনের দিকে এগিয়ে যায় সে।
.
কোলাব্যাঙের সবজে গুটিতে পিছলে যাচ্ছে বর্ষা বিকেলের নিস্তেজ রোদ্দুর। উলুঘাসের গোড়ায় ঘাই মারে কালচে কালচে মৃগেল চারা, লায়লান্টিকা। পুকুরধারের ঢালু পাড়ের কাদা-শরীর ফুঁড়ে মাথা তুলেছে ঠাকুরের কাঠামোর ফাটামাথা বাঁশেরা। তাদেরই একটা নখে আঁকড়ে ধরে আলসেমিতে গলা খাঁকড়ানি দেয় বুড়ো মাছরাঙা।
ক’দিন ধরেই আকাশটা পোড়া হাঁড়ির পোঁদের মতো কালো হয়ে আছে। থেকে থেকে মেঘ গুড়গুড় আর ছিরিক ছিরিক। গতবছর ডেঙ্গু থেকে সেরে উঠে কার্তিককে কড়া আমাশায় ধরেছিল। দিন নেই রাত নেই কেবলই পেট গুড়গুড় আর ওই ছিরিক ছিরিক। এক হপ্তা ভুগিয়ে নাকাল করে ছেড়েছিল তাকে। দিনেমানে শান্তি নেই, রাত্তিরে ঘুম নেই। এপাশ-ওপাশ করার মোটে জো ছিল না। রাত্তিরে দু’চোখের পাতা এক হয়েছে কী হয়নি অমনি পেট কনকন, ভিজেভিজে ভাব।
ননী ডাক্তার দাঁতে কাঠি করতে করতে ব্যাটারি বসে যাওয়া টোটোগাড়ির হর্নের মতো গলায় বলেছিল, ‘ডেঙ্গু ভুগে উঠলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। এখন চলবে। ধরে রাখ বছরখানেক পাঁচরকম রোগজ্বালায় ভুগবি। হোয়াটস্যাপে দেখে নে। নাম লিখে পাটে দিইচি। একটা করে বড়ি তিনবেলা খালি পেটে। কেটে পচ্চিস কোতায় ? ক্যাশ নেই? অসুবিধে কী? ওই দেওয়ালের ছপিটা এস্ক্যান কর। ডেরশো টাকা৷ খালি পয়সা মেরে দেওয়ার তাল। শুয়োরের বাচ্চা…’
এবারের বর্ষাতেও খুব ডেঙ্গু হচ্ছে। ঘরে ঘরে লোকজন ডেঙ্গুজ্বরে কোঁকোঁ করছে। এই সময়ে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘোরা একদম ঠিক নয়। এসব ঝোপঝাড়, বনজঙ্গল, ডোবার ধার মশার আড়ত। তাতে অবশ্য কার্তিকের কিছু আসে যায় না। তার মন মেজাজ ক’দিন যাবৎ মোটে ভালো নেই। ভালো থাকার কথাও না। দু’দিন হল বউটা তিনমাথা মোড়ের ওষুধ দোকানের বিল্টুর সঙ্গে পালিয়েছে। কার্তিক অবশ্য অনেক আগেই আঁচ করেছিল ওদের ব্যাপারটা।
টোটোটা রেখে ঘরে ঢুকলেই অন্যরকম একটা গন্ধ পেত সে। বউটার কাপড় আলুথালু, সিঁদুর-টিদুর ঘাঁটা। কার্তিককে দেখে চোখ নামিয়ে স্যাট করে সরে যেত পিঙ্কি। চায়ের কাপ দূর থেকেই মেঝেতে নামিয়ে রেখে ফের রান্নাঘরে। কার্তিক তাকে জাপটে ধরে গলায় ঘাড়ে দাড়ি ঘষলে আগে শরীর মোচড়াত পিঙ্কি। ইদানীং বিরক্ত হয়ে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিচ্ছিল তাকে।
মাস তিনেক আগে একবার হুট করে ঘরে ঢুকে পড়েছিল কার্তিক। পিঙ্কির কালো
ঘাম চকচকে বুকে ঘিয়ে রঙের ব্রেসিয়ার। লাল শায়ার ফিতের গিঁট দিতে দিতে বউ বলেছিল, ‘এই নেয়ে এলুম। দাঁড়াও চা দিই…’
পিঙ্কি রান্নাঘরে ঢুকে যেতে বাড়ির পেছনের কলাগাছের গোড়ায় হিসি করতে গিয়েছিল কার্তিক। সন্ধে নামার মুখে নীলচে আলোয় কালো কালো ঝোপঝাড়। জোনাকী জ্বলছিল। একটা, দু’টো।
কানে পৈতে জড়িয়ে প্যান্টের চেন আঁটতে আঁটতে কার্তিক বিল্টুকে দেখেছিল। জাঙিয়া পরা বিল্টু পাশের পাটক্ষেতের বেড়া টপকাচ্ছে। বগলে বোধহয় জামা প্যান্টের গোছ।
সেদিন রাত্তিরে কিছু খায়নি কার্তিক। গোঁজ হয়ে শুয়ে পড়েছিল সন্ধে থাকতে থাকতেই। পিঙ্কিও সাধেনি৷
শুয়ে পড়লেও ঘুম আসেনি কার্তিকের। দরমার ঘরের ফাঁক গলে ব্যাঙের ডাক ছুঁচের মতো বুকে বিঁধেছিল তার। পিঙ্কি নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিল। অ্যাত ছোট তক্তাপোশেও তাদের দু’জনের মাঝে যেন ছোটগড় এক্সপ্রেসওয়ের মতো ফাঁক।
দুদিন আগে রাতের বেলা জেগে বসেছিল কার্তিক। তারপর ভোররাতের দিকটায় শীত শীত করতে পায়ের কাছে রাখা ক্যাঁথাটা টেনে নিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়েছিল। সুকুকে টেনে নিয়েছিল কোলের কাছে।
পিঙ্কির নাকের ঘুড়ুৎ ঘুড়ুৎ শব্দে চোখ লেগে গিয়েছিল তার। জানলার ট্যারাব্যাঁকা ফ্রেমের ফাঁক দিয়ে রোদ্দুরের খোঁচায় ঘুম ভাঙতে মোবাইল ফোনের ফাটা স্ক্রিনে কার্তিক দেখেছিল আটটা সাঁইত্রিশ। পিঙ্কি ঘরে নেই। হয়তো মাজু বাগদীর পুকুরে ডুব গালতে গেছে। কার্তিক পইপই করে বারণ করত, ‘ওই পুকুরে যেউনি। মেসবাড়ির ছেলেগুলো দ্যাখে…’
পিঙ্কি কথা শুনত না৷ লাল শায়া বুকে বেঁধে ডুব গালত। ভিজে গামছা গায়ে জড়িয়ে শায়া ছাড়ত
পাড়ার পাঁচটা লোক পাঁচকথা বলত তার নামে। ওসব অবিশ্যি কার্তিক গায়ে মাখত না। পিঙ্কিকেও মুখ ফুটে সে কখনও বলেনি, ‘চরণির বিলের ধারের পুরোনো চালাঘরের জানলায় তোমার শাড়ি ঝুলতে দেকিচি… বাইরে বিল্টুর বাইক দাঁইড়েছিল… আসলে চোখে চোখ রেখে মোকাবিলা করা জিনিসটাই কার্তিকের ধাতে নেই৷ কারও ধান্দাবাজি ধরে ফেলার পর তাকে জোর গলায় সে কথা জানানোর কথা ভাবলেই কার্তিকের পেট গুড়গুড় করে।
আগে কার্তিক ভাবত পিঙ্কি ভাগলে তার ছেঁড়া যায়। ছেলেকে নিয়ে সে রাজার হালে থাকবে। কিন্তু পিঙ্কি সত্যি সত্যিই ভাগতে, ব্যাপারটা কিছুতেই হজম করতে পারছে না সে। পাড়াপড়শি আঁচ করতে শুরু করে দিয়েছে। পাঁচকান হতে আর দেরি নেই। কলতলায় নাইটি পরা বউদিদের ফুসুরফুসুর, টোটোস্ট্যান্ডের তাসের আড্ডায় কার্তিককে নিয়ে খ্যাঁক্সা, হারামজাদা গুলে বাগদির রগড় করে দেখানো পিঙ্কি কীভাবে বিল্টুর সঙ্গে মাদুর নোংরা করছে—নাহ্। এসব কার্তিক মেনে নিতে পারবে না। গলায় দড়ি দেবে সে। কিন্তু সুকু? তার কী হবে?
আজ সারাদিন ডিউটি দেয়নি কার্তিক। চষে বেড়িয়েছে শিমুলগাছা। ঢুঁ মেরেছে
স্টেশন ধারের সস্তা হোটেলে, চরণির বিলের চালাঘরে। পিঙ্কি আর বিল্টু কোখাও নেই। শিমুলগাছা থেকে বেরোনোর সরাসরি বাস রুট নেই। মনসাতলা স্টেশন থেকে ট্রেন ধরাই একমাত্র রাস্তা। স্টেশনের ডাবওয়ালা প্রহ্লাদ তার এক বোতলের ইয়ার। স্টেশনের গেটের মুখেই সে পসরা সাজিয়ে বসে।
সমস্ত ট্রেনের টাইমটেবল প্রহ্লাদের মুখস্থ। প্যাসেঞ্জারদের যাতায়াত তার নখদর্পণে। সেও পিঙ্কি বা বিল্টুকে দেখেনি। তারমানে, তারা দু’জন এখনও শিমুলগাছাতেই আছে। ‘বারোভাতারি…’ কার্তিকের শিরায় শিরায় বিষের জ্বালা।
মাথার ওপর একটা লাল ঘুড়ি পতপতাচ্ছে। নিম গাছের পাতায় হাওয়ার শিরশিরানি। দূরে দক্ষিণের জঙ্গল। অন্ধকার পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও জঙ্গলে দুপুরের পর থেকেই কেউ ঢোকে না। জঙ্গলময় মেলা ভাঙাচোরা বাড়ি রয়েছে— আগে নাকি পয়সাওয়ালা লোকেদের বাস ছিল।
এ জঙ্গল নিয়ে অনেক কানাঘুষোই বাতাসে ওড়ে। মাটি ফুঁড়ে কারা যেন বেরিয়ে আসে, বুড়ো গাছের ডাল থেকে দোল খায় হেঁটমুন্ডু…
গেরস্ত ঘরের লোক পারতপক্ষে ও জঙ্গলে পা রাখে না। তবে কলজেতে দম থাকলে লুকিয়ে ফুর্তি করার জন্য এটাই ফার্স্ট কেলাস জায়গা উঠে দাঁড়ায় কার্তিক।
হাওয়াই চটিতে পা গলায়৷
দক্ষিণের জঙ্গলেই তার ঢুঁ মারা বাকি রয়েছে। অন্ধকার হওয়ার আগেই পিঙ্কিকে খুঁজে বের করতে হবে।
লাল ঘুড়িটা সুকুর বড় প্রিয়। ল্যাজটা কালো৷
ইস্কুল থেকে ফিরে ব্যাগখানা কোনওমতে ঘরে রেখেই সুকু তুলে নেয় ঘুড়িখানা। লাটাইটা গতবছর বাপি কিনে দিয়েছিল মনসাতলার রথের মেলায়।
মা’কে ক’দিন হল দেখেনি সুকু। এমনিতেও মা যে তাকে খুব একটা পাত্তা দেয় তা নয়। বাপি বলেছে মা নাকি বিল্টকাকুর সঙ্গে কোথায় ঘুরতে গ্যাছে। যাকগে… আজ ভোরে বৃষ্টি থেমেছে। মেঘ কেটেছে। ঘাসের ডগায় জলের ফোঁটা রোদ্দুর পড়ে চকচক করে।
এখানে ওখানে সাদার খাঁজে খোঁজে দু-চারটে কালো মেঘের ছোপ রয়েছে বটে, কিন্তু আকাশ ঝলমলে নীল।
দক্ষিণের মাঠের দিকে চলেছে সুকু। তার মনে জোর ফুর্তি। অনেকদিন বাদে ঘুড়ি ওড়ানোর মতো জুতসই দিন পাওয়া গেছে।
দক্ষিণের মাঠে পৌঁছে লাল ঘুড়িতে তোল্লাই দেয় সুকু। দু-চার বার তোল্লাই মারতেই ঘুড়ি চেগে ওঠে বাতাসে।
সুতো ছাড়ে সুকু। নীল আকাশে সুকুর লাল ঘুড়ি পতপতায়। কী ভালোই না
দেখাচ্ছে! আহা !
একটু দূরেই গাব গাছখানার তলায় সদলবলে বসেছিল দুলে পাড়ার সনাতন। শিমুলগাছা নেতাজি বিদ্যাপীঠে কেলাস সেভেনে পড়ে সে। হলে কী হবে? বার দুয়েক গাড্ডুও মেরেছে।
খানিক বাদে প্যান্টুল ঝাড়তে ঝাড়তে সুকুর দিকে এগিয়ে আসে সনাতন। চোখে মুখে শয়তানি হাসি খেলা করছে। পেছনে দুই শাগরেদ—মনা আর বাবুলাল। তাদের হাতে ঘুড়ি আর লাটাই।
তোবড়ানো গালে গ্যালগ্যালে হাসি ছড়িয়ে সনাতন বলে, ‘প্যাঁচ খেলবি?’ সুকু দু’দিকে ঘাড় নেড়ে বলে, ‘না, খেলবুনি।’
বাঁকা হেসে সনাতন বলে, ‘কেন রে বারোভাতারির ব্যাটা? ভয় হচ্চে?’
সুকুর মনে হয় কচুগাছের ডাঁটি দিয়ে তার গালে সপাটে কেউ ঝাপটা মেরেছে। কান গরম৷ বুকে ধড়ফড়ানি।
কচি গলায় সে সনাতনকে বলে, ‘আয় তবে দম থাকে তো…’ ঘুড়ি বাড়ে সনাতন। লাটাই ধরে বাবুলাল ।
প্যাঁচের খেলা বোধহয় তিন মিনিটও গড়ায় না। সনাতন পোড় খাওয়া প্যাঁচ খেলিয়ে।
কাচগুঁড়ো সবুজ মাঞ্জা আর সাদা-কালো মুখপোড়া ঘুড়ি দিয়ে সে অনেক তাবড় তাবড় খেলুড়েকে হারিয়েছে।
সুকুর লাল ঘুড়ির পেটের কাছে বাতাস কেটে চিলের মতো পৌঁছয় সনাতনের মুখপোড়া। পাকা হাত টান দেয় মাঞ্জা সুতোয়।
‘ভোঁওওওও-কাট্টা-কাট্টা-কাট্টা-কাট্টা…’
সনাতন, বাবুলাল আর মনা সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে।
লাল ঘুড়িখানা গোঁৎ খেতে খেতে উড়ে চলে যায় দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে। সুকু
লাটাইটাকে মাঠে ফেলে রেখেই প্রাণপণে ধাওয়া করে সে ঘুড়ির পিছনে। দক্ষিণের জঙ্গল জায়গা ভালো না, সুকু জানে। দিনেমানেই কেউ খুব একটা পা দেয় না। বিশাল বিশাল বুড়ো গাছ আড়াল করে আকাশকে। এক্কেবারে আঁধারের রাজ্য এই দক্ষিণের জঙ্গল। ঝিঁঝিঁর ডাকে ঘোর লাগে।
গাছে গাছে ঘোরে সুকুর সন্ধানী চোখ। বাপির মুখে শুনেছে এ জঙ্গলে নাকি অনেক বড় বড় গাছ রয়েছে। ঘুড়িখানা লম্বা সুতো নিয়ে কেটেছে। বড় গাছে ফাঁসলেও ফাঁসতে পারে।
কপাল ভালো। মিনিট দশেক লতাপাতা, ঝোপঝাড় সরিয়ে এগোতেই সুকুর চোখে পড়ে তার ঘুড়িটা। বিশাল এক আমগাছ। গাছটা ঝুঁকে আছে একটা ঝিলের ওপর। সেই
গাছের প্রায় মগডালের কাছে ফাঁদে পড়া পাখির মতো ঝটপটাচ্ছে সুকুর ঘুড়ি।
ঠিক পাশেই বিশাল এক ভাঙাচোরা বাড়ি। চিলেকোঠা ফুঁড়ে এক লম্বা অশ্বত্থ গজিয়েছে। এমন বাড়ি শিমুলগাছায় ঢের ঢের রয়েছে। বাপি বলেছিল দক্ষিণের জঙ্গলেও নাকি এমন বাড়ি মেলা দেখতে পাওয়া যায়। এখানে নাকি একসময় অনেক বড় বড় লোকের বাস ছিল।
সুকুর মনে পড়ে রাত্তিরে শুয়ে শুয়ে একবার বাপি বলেছিল, “খবদ্দার সুকু, দক্ষিণের জঙ্গলে কোনওদিন যেন ভুলেও পা দিসনি। ও জঙ্গল যত রাজ্যের ভূত প্রেতের আড়ত। আর দক্ষিণের জঙ্গলের কোনও ভাঙাচোরা ঘরবাড়িতে যদি কেউ ভুলেও ঢুকে পড়ে, তবে আর তার রক্ষে নেই…’
‘কেন বাপি? ’ ’
‘হেঁটমুন্ডু…
‘সে আবার কী? ‘
‘তার ঠ্যাঙ ওপরে, মুন্ডু নীচে৷ গাছ থেকে ঝুলে থাকে। কড়িকাঠ থেকেও দোল খায়। চামড়া ফেটে রক্ত গড়ায়। ঠোঁট ফেটে পুঁজ।’
ঢোক গিলেছিল সুকু, ‘সে কী করে বাপি? ‘
ধরা গলায় কার্তিক বলেছিল, ‘মুখের ভেতর হাত পুরে দেয়—একদম পেট অবধি। টেনে বের করে আনে নাড়িভুঁড়ি। নিজেও খায়, যার নাড়িভুঁড়ি তাকেও খাওয়ায়… তিলে তিলে মারে…’
বাড়িটার দিকে চেয়ে বুকটা ধড়াস করে ওঠে সুকুর। কিন্তু ঘুড়িটা ফেলে সে যায় কী করে? যাকগে, সে তো আর ওই বাড়ির ভেতর ঢুকছে না। আম গাছটায় চড়ে ঘুড়িটা পেড়েই সে পালাবে।
গাছ বাইতে শুরু করে সুকু। গাছের বাকল ভিজে, ডালে ডালে শ্যাওলা। তবে সুকু গাছ বাইতে ভারি ওস্তাদ। বাপ-মা’র চোখের আড়ালে কম ঘুড়ি লুটেছে সে? এক পা এই ডালে, এক পা ওই ডালে—তরতরিয়ে উঠে পড়ে সুকু। ঘুড়ি তার
হাতের নাগালে। একবার টান মারলেই লাল ঘুড়ি ফের তার কব্জায়। তখনই সুকুর চোখ পড়ে বাড়ির জানলাটায়। আম গাছের ঠিক পাঁচ হাতের মধ্যেই জানলাটা। একটা পাল্লা আছে, একটা নেই৷
ভেতরে আলোছায়ার খেলা। কী যেন একটা হিলহিলিয়ে নড়ছে। চোখ সরু করে ঠাহর করে সুকু। চোখ সয়ে আসতেই সুকু তাকে দেখতে পায়। হেঁটমুন্ডু।
কড়িকাঠ থেকে ঝুলে রয়েছে বাদুড়ের মতন। সুকুর দিকে তার পিঠ। পিঠময় রক্ত, খোলা পাছা। চুলের গোছা মেঝের আগে অবধি ঝুলে রয়েছে। চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা… ও কি রক্ত?
ভয়ে কাঠ হয়ে যায় সুকু। বাবা পইপই করে বলেছিল। সুকু শোনেনি।
ঘরের ঠিক উল্টোদিকের দেওয়ালে রোদ্দুর পড়েছে। আমগাছের ডালে সেঁটে থাকা
সুকুর ছায়া স্পষ্ট। ওই তো সুকুর মাথা, হাত। হেঁটমুন্ডু সেদিকেই ঘুরে আছে। এবার সেটা নড়ে ওঠে আস্তে আস্তে।
প্রমাদ গোনে সুকু। হেঁটমুন্ডু সুকুকে দেখতে পেয়েছে। সুকুর ছায়া দেখতে পেয়েছে।
এবার নেমে আসবে কড়িকাঠ থেকে। হিলহিলিয়ে কেউটের মতো বেয়ে উঠবে আমগাছ। তারপর সুকুর গলায় হাত পুরে দিয়ে বের করে আনবে তার নাড়িভুঁড়ি… উফ্, আর ভাবতে পারে না সে!
হঠাৎ সুকুর চোখে পড়ে ডালের নীচেই ঝিলের জল। ঝাঁপ মারে সে।
ঝপাং! গুব্বুস! ভুস্!
ভেসে উঠেই প্রাণপণে সাঁতার টানে। শেকড় বাকড় ধরে খচমচিয়ে পাড়ে উঠে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করে সুকু। কাঁটায় গা ছড়ে, ঝোপেঝাড়ে হোঁচট খায়। তাও তার কোনওদিকে হুঁশ নেই। গাছের ডালে ডালে খচমচ শব্দ। নির্ঘাত হেঁটমুন্ডু ধাওয়া করেছে তাকে। দক্ষিণের জঙ্গল ফেলে ফাঁকা মাঠে এসে ওঠে সুকু। তাও সে থামে না। দূর থেকে কে যেন চেল্লায়, ‘কীরে সুকু? ছুটছিস কেন অমন করে?’ সুকু থামে না। সে থামতে পারে না। আজকে বাবাকে বলতে হবে। সুকু দেখেছে৷ সে হেঁটমুন্ডু দেখেছে। আকাশে ফের জট পাকাতে থাকে কালো মেঘের দল। ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস দেয়।
.
‘বাপি, আজ ফের একটা ভুত দেকিচি…’
কার্তিক বিরক্ত হয়। দুপুর থেকেই তার মাথা টিপটিপ করছে। প্রতিবেশী মাগিগুলো কানাকানি শুরু করে দিয়েছে। সবারই চোখে পড়েছে আজ চারদিন হল পিঙ্কির পাত্তা নেই। গুজগুজ, ফিসফাস, চাপা হাসি…
তার ওপর প্যান্টুলটা আজ বাজেভাবে ফেঁসেছে। বাল্বের ঝিমধরা আলোয় ঘাড় গুঁজে সেলাই করে কার্তিক। এই একটাই ফুলপ্যান্ট তার।
সুকু ফের বলে, “ছবি এঁকিচি, দেকবে ?
‘ঝাঁট জ্বালাসনি সুকু, ঝাঁঝিয়ে ওঠে কার্তিক।
সুকুর কাঁধ ঝুলে যায়। অনেক আশা নিয়ে বাপিকে বলতে এসেছিল ভূত দেখার গল্প। দাবড়ানি খেয়ে বইখাতা নিয়ে ঘরের এক কোণে বসে পড়ে সে। আজ মন নেই তার পড়ায়।
টালির চালের ফাঁকে খটাশে বাচ্চা পেড়েছে। খড়মড় শব্দ হয়। জলায় ব্যাঙেদের কোরাস। কানে ছুঁচের মতন এসে বিধতে থাকে ঝিঁঝিঁর ডাক
রুটি বেলতে বেলতে আড় চোখে কার্তিক তাকায় সুকুর দিকে। ঘাড় গুঁজে এক মনে খাতায় কী যেন লিখছে সুকু। খারাপ লাগে কার্তিকের। ছেলেকে বকলে বড্ড মন খারাপ হয় তার।
খানিক বাদে কার্তিক সস্নেহে ছেলেকে ডাকে, ‘সুকু? খাবি আয়…’
খেতে বসেও কোনও কথা বলে না রুকু। তার চোখ থালাতেই আটকে আছে। কার্তিকের হাতের রুটি খুব নরম হয়—কিড়কিড়ে আখের গুড় দিয়ে অমৃত। ‘সুকু? রাগ করিচিস বাপির ওপর।’
সুকু ওপর-নীচে ঘাড় নাড়ে৷
‘আচ্ছা বাবা বল, কী দেকিচিস বল। বাপির মন মেজাজ ভালো নেই রে, নইলে বাপি তোকে বকে? বল…’
দু’টো বড়বড় ছলছলে চোখ মেলে কার্তিকের দিকে তাকায়। বলে, ‘কষ্ট পেউনি
বাপি। মা ঠিক চলে আসবে…’ এইটুকু ছেলে হলে কী হবে। বড় বুঝদার। কার্তিকের মন ভরে ওঠে। কপাল করে ছেলে পেয়েছে সে। দেকিচিস? ফের কন্দকাটা?’
‘ওসব কথা ছাড়। বল, কী
পরম উৎসাহে সুকু বলে ওঠে, ‘না বাপি, সে তো পানু দেকেচে। আমি আজ হেঁটমুন্ড দেকিচি বাপি ‘তাই নাকি? তা কোথায় দেখলি?’ এঁটো বাসন গোছাতে গোছাতে কার্তিক
জিগ্যেস করে।
‘তুমি রাগ করবে না বলো… তিন সত্যি? ‘
‘তিন সত্যি…’
‘তুমি তো জানো বাপি লাল ঘুড়িটা আমার বড্ড প্রিয়। আজ দুকুরে দক্ষিণের মাঠে প্যাঁচ খেলছিলুম। দুলে পাড়ার সনাতন, কেলাস সেভেনে পড়ে গো, আমার লাল ঘুড়িটা কেটে দিল। ঘুড়িটা লাট খেতে খেতে চলল দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে। আমি ছুটলুম ঘুড়ির পোঁদে পোঁদে। আমি জানি বাপি তুমি দক্ষিণের জঙ্গলে ঢুকতে মানা করেচ, কিন্তু কী করি বাপি? ঘুড়িটা…’
ঠান্ডা চোখে সুকুর দিকে চেয়ে কার্তিক বলে, “তারপর?”
‘অনেক খুঁজে শেষে ঘুড়িটা পেলুম। যেখানে সেই ঝিলের ধারে পুরোনো বাড়িটা আছে না? ওইখেনে। একটা আমগাছের ডালে লটকেছিল ঘুড়িটা…’
এই অবধি বলে দম নেয় সুকু। কাঁচুমাচু হয়ে ফের শুরু করে, ‘জানি বাপি গাছ বাইতে বারণ করেচ… কিন্তু ঘুড়িটা…’ ‘বল…’
‘গাছ বাইতেই ঘুড়িটা পেলুম বাপি। ঠিক তখনই আমার চোখ গেল ভাঙা বাড়িটার দোতলার জানলায়। একটা পাল্লা নেই। ভেতরটা ছায়াছায়া। কী যেন একটা দোল খাচ্ছে…’
সুকুর চোখ বড় বড়। কপালে ঘামের ফোঁটা। নিঃশ্বাস দ্রুত হয় তার।
‘ভালো করে চাইতে দেখি এ-একটা হেঁটমুন্ডু। সেই তুমি যেমনটা গল্প বলেছিলে। ঝুলে রয়েচে। খালি পিঠ। চটচটে কীসব লেগে রয়েছে। রক্ত নয় তো বাপি? আ-আর মাথার চুল মেঝে অবধি ঝুলছে। আ-আমি আর সইতে পারিনি বাপি। আমগাছ থেকে ঝিলের জলে ঝাঁপ কেটিচি সোজা। সাঁতরে পাড়ে উঠে ছুটতে ছুটতে সিধে জঙ্গলের বাইরে…’
স্টিলের গেলাসটা সজোরে দেওয়ালে ছুড়ে মারে কার্তিক। ছিটকে পড়ে সস্তার ফুলদানি আর প্লাস্টিকের ফুল। তার হাত কাঁপছে। মাথার দু’পাশের রগ দপদপাচ্ছে। চোখ লাল করে সুকুর দিকে চায় কার্তিক, ‘তোকে না গাছ বাইতে হাজারবার বারণ করিচি, করিনি? ‘
বাবার এমন রুদ্রমূর্তি আগে কখনও দেখেনি সুকু। সে থরথর করে কেঁপে ওঠে। সুকুর মুখের কাছে মুখ নামিয়ে এনে আঙুল উঁচিয়ে কার্তিক বলে, ‘বল… বারণ করিনি তোকে গাছ বাইতে? ‘
‘আ-আর হবে না বাপি।’ কাঁদোকাঁদো সুকু।
‘আজগে শেষ বারের মতন বলচি সুকু—দক্ষিণের জঙ্গলে খবদ্দার আর ঢুকিসনি। যদি ঢুকিস আমি কিন্তু তোকে ঘরে পুরে তালাচাবি মেরে রাখব। ইস্কুল যেতে দোব না। মাঠেও যেতে দোব না…’ ‘না না বাপি। আমি সত্যি বলছি আর কক্ষনও জঙ্গলে ঢুকব না। গাছেও চড়ব
‘মনে থাকে যেন… যা গেলাসটা কুইড়ে নিয়ে আয় আর ফুলগুনো গুচ্চে রাখ…’ সুকুর হাত-পা কাঁপছে। বাবার কথা মতো কাজ করে সে।
দরজার সামনে খাটানো তেরপলে চড়বড়িয়ে বৃষ্টি শুরু হয়।
অনেক রাত্তিরে যখন বৃষ্টির তোড় কমে আসে, কচুবনে ফের শুরু হয় ব্যাঙেদের মিথুন ডাক, রাগ পড়ে আসে কার্তিকের। বাংলার গোটা একটা বোতল নামিয়েছে সে। দুঃখটা এখন একটু কম কমই বোধ হচ্ছে।
ঘুমন্ত সুকুর চুলে বিলি কাটে সে। আধো ঘুমে সুকু বলে, ‘বাপি? ঘরে এয়েচ?’ ‘রাগ করিচিস মানিক আমার?’
‘না বাপি…’
‘বাপি খুব রেগে গেসল তখন, না রে?’
‘হ্যাঁ বাপি… তুমি অমন রেগে গেলে বড্ড ভয় হয় আমার…’
‘তোকে নিয়ে আমার বড় চিন্তা রে সুকু। তুই ছাড়া আমার যে কেউ নেই। তুই গাছ বাইলে, পুকুরে ঝাঁপ কাটলে, আমার বুকটা যে ছ্যাঁৎ করে ওঠে। তুই বুঝিস না? ‘ ‘বুঝি বাপি। আর করব না।’
সুকুর কপালে একটা আলতো চুমু দেয় কার্তিক৷
বাপের গলা জড়িয়ে ধরে সুকু বলে, ‘বাপি, তুমি কষ্ট পেউনি। মা যেখানে গেছে যাক। আমি-তুমি ভালো থাকব। তুমি আমার কাছে থাকলেই হল…’ ছ্যাঁকা খাওয়া বুকখানা জুড়িয়ে যায় কার্তিকের।
মনসাতলার রথের মেলা। রথ টানছে কার্তিক।
কার্তিক ল্যাংটো। মোটা দড়ি কেটে বসেছে তার শরীরে। কব্জি আর পায়ের গোছে লোহার শেকল। কাদায় বসে যায় রথের চাকা। তাও কার্তিক টেনে চলে প্রাণপণে। পাকানো শরীরের শিরাগুলো ফুলে ওঠে কেঁচোর মতন। মাথার ওপর আকাশটা গাঢ় কমলা। তার ওপর সিঁদুররঙা মেঘেরা ঘোট পাকাচ্ছে না৷’
.
মেলার মাঠ খাঁখাঁ করছে৷ কেউ কোত্থাও নেই। গুমটিগুলো ফাঁকা। পুতুলের গায়ে শ্যাওলা। জিলিপি, গজার গাদায় বিজবিজ করছে লাল পিঁপড়ের দঙ্গল। রথ টেনে চলে কার্তিক। মেলার ঠিক মধ্যিখানে ডালপালা মেলেছে একটা বুড়ো আমগাছ। কালো বাকল, দানবিক চেহারা।
আমের ডাল থেকে উলটো ঝোলে সে। লম্বা চুলের গোছা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ে রক্ত। মুখ তার কদাকার।
হেঁটমুন্ডু থ্যাপাক!
গাছ থেকে খসে পড়ে সে।
চার হাতে পায় হামা দিয়ে এগিয়ে আসে কার্তিকের দিকে। হাড় ভাঙার শব্দ হয়—মট্… মট্…
ছটফটিয়ে বাঁধন ছেঁড়ার চেষ্টা করে কার্তিক। কাদায় বসে যায় তার পা। গেঁথে যায় কোমর অবধি।
নরম কাদা গ্রাস করতে থাকে তাকে। এগিয়ে আসে হেঁটমুন্ডু। মুখটা নোড়া দিয়ে থেঁতো করা আমের মতন।
কোনওমতে ঠোঁটজোড়া নড়ে ওঠে। রক্ত জমে কালো হওয়া দাঁত। কার্তিকের কানের কাছে মুখ এনে বালি কাগজের মতন খসখসে গলায় সে এক নাগাড়ে বলতে থাকে,
‘বারোভাতারি!’ ‘বারোভাতারি!’
‘বারোভাতারি!’
চোরা পাঁকের অতলে ডুবে যেতে যেতে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে কার্তিক। সকাল হয়ে গেছে। জানলা দিয়ে রোদ্দুর এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। ঘেমে নেয়ে গেছে সে।
খোলা দরজা দিয়ে ঘরে এসে ঢোকে সুকু। পরনে ইস্কুলের জামা প্যান্ট। ‘উঠেচ বাপি? সেই কখন থেকে ডাকচি। তুমি কেবল হাঁ করে ঘুমিয়েই যাচ্ছ। তাড়াতাড়ি ওঠো। বেরুবে তো। ইস্কুল ছাড়বে তো আমায়।
হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নেয় কার্তিক। সাড়ে ন’টা এই মেরেচে! গত রাতের মালের ডোজটা একটু বেশিই হয়ে গেসল, মনে মনে জিভ কাটে কার্তিক।
হুড়োতাড়া করে জামা-প্যান্টুল গলায় সে। সুকু তার ইস্কুলের ব্যাগ নিয়ে রেডি। আলপথ দিয়ে ঢ্যারঢেরিয়ে এগিয়ে চলে টোটো।
সুকু জিগ্যেস করে, ‘বাপি? এখনও আমার ওপর রেগে আচ? ‘
‘না রে মানিক, আর রেগে নেই,’ কার্তিক বলে, ‘তবে আমাকে কতা দে—আর গাছ বাইবিনি, আর কখনও ঢুকবিনি দক্ষিণের জঙ্গলে।’
‘অমন কাজ আর করবুনি বাপি। সত্যি।’
‘আর এসব ভূতপ্রেতের গপ্পোগুলো আমাকে ছাড়া আর কাউকে বলিসনি বুজলি?’ ‘কেন বাপি? ’
‘মনে আছে তোকে যেবার একানড়ের গপ্পোখানা বলেছিলুম, তুই শুনে এসে বন্ধুদের বললি। তাদের মধ্যে কোন শুয়ারের বাচ্চা দিদিমণিকে লাগিয়ে দিল। দিদিমণি আমাকে ডেকে পাঁচকথা শুনিয়ে দিল। বলে বাচ্ছাদের নাকি এসব গপ্পো বলতে নেই। যত্তসব! ছেলেবেলা থেকে এসব গপ্পো শুনে আসছি আমরা। যাকগে, তুই কাউকে বলিসনি… হেঁটমুন্ডু ফেটমুন্ডু কিচ্ছু না…’
‘বলব না বাপি।’ কী যেন ভাবে সুকু
‘পানুকেও বলব না? ও যে আমাকে কন্দকাটার গল্প বলে !”
‘না, পানুকেও না। কাউকে বিশ্বাস করবিনি। দুনিয়াটাই বেইমানে ভর্তি। নিজের বাপিকে ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করবিনি। তুই কি চাস ফের তোর বাপি কথা শুনুক ? ” ‘না বাপি। আমি পানুকেও বলব না।’
স্কুলের সামনে ছেলেপুলেদের ভিড়। তাদের কিচিমিচিতে কান পাতা দায়। সুকুকে নামায় কার্তিক। চুমু খায় দু’গালে। কার্তিকের হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ দিয়ে সুকু বলে, ‘পরে খুলো বাপি। আগেরদিন এঁকেছিলুম। দেখে বোলো কেমন হয়েচে। রাগ করুনি যেন।’
‘করব না।’
‘তিন সত্যি?’
‘তিন সত্যি।’
সাদা জামা, নীল প্যন্টের ভিড়ে মিশে যায় সুকু। কাগজটার ভাঁজ খোলে কার্তিক। মোমরঙ ঘষে ঘষে আঁকা ছবি। আঁকশি মতো কী একটা যেন; তা থেকে উলটো হয়ে ঝুলে আছে এক কদাকার মূর্তি। মুখটা কালো রঙ দিয়ে হিজিবিজি কাটা। লম্বা চুলের গোছা থেকে টপটপাচ্ছে লাল রঙের ফোঁটা। গোটা গোটা অক্ষরে তলায় লেখা ‘হেঁটমুন্ডু।’ টোটোর চাবি ঘোরায় কার্তিক। টোটো চলে দক্ষিণের মাঠের দিকে৷ কালভার্ট পেরিয়ে নয়নতারার ঝোপের পেছনে টোটোটাকে দাঁড় করায়। পায়ে হেঁটে মাঠ পেরিয়ে দক্ষিণের জঙ্গলে ঢোকে কার্তিক।
পুরোনো বাড়িটার গা থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। হলে কী হবে? সদর দরজাখানা এখনও মজবুত। জাঁদরেল একখানা তালা ঝুলছে তাতে। তালাটা নতুন—হাল আমলের স্টেনলেস স্টিল, ঝকঝক করছে। পকেট থেকে চাবি বের করে সে।
একতলার সিঁড়ির নীচে ভাঙাচোরা জিনিসপত্রের ডাই সরিয়ে কার্তিক বের করে চটে মোড়া একটা শাবল আর একটা খাসি কাটার চপার
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে গুনগুনিয়ে গান ধরে, ‘ইয়ে লাল রঙ কব মুঝে ছোড়েগা?”
দোতলার ঘরের দরজাখানা লাথ মেরে খোলে কার্তিক। পচা গন্ধের দমকে নাক সিঁটকোয় সে।
সিলিং থেকে ঝুলছে পিঙ্কি—উলটো। চুলের গোছায় শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে যাওয়া
রক্ত। মুখখানা দেখে কার্তিক নিজের মনেই বলে, একেই বলে মেরে বদন বিগড়ে দেওয়া।
পিঙ্কি নিঃসাড়। তার শরীরে আর প্রাণ নেই। দু’দিনের নরকযন্ত্রণার ছাপ তার রক্তাক্ত থেঁতো অস্তিত্বে স্পষ্ট।
কার্তিকের চোয়াল শক্ত হয়। হাতে মোটে চারটে ঘণ্টা। সুকু ফের আসবে। তার কৌতূহল মেটেনি। এবার সে পানুকে নিয়ে আসবে। ইস্কুল ছুটি হলেই আসবে। চপারের হাতলে কার্তিকের মুঠো শক্ত হয়। চার ঘণ্টার মধ্যেই হাপিশ করতে হবে। যেভাবে বিল্টুকে হাপিশ করেছে সে।
হাপিশ করতে হবে পিঙ্কিকে।
হাপিশ করতে হবে বারোভাতারিকে।
হাপিশ করতে হবে হেঁটমুন্ডুকে।
