অজ্ঞাত অপরাধী – ঐষিক মজুমদার
বলিউডের নায়ক এবং প্রযোজক সোহরাব খান তাঁর সিনেমার মুক্তির দিনক্ষণ ভেবেচিন্তেই ঠিক করেন। দু’হাজার চব্বিশে তাঁর প্রযোজিত ও অভিনীত, প্রত্যাশা জাগানো ছবি ‘শুটার’ মুক্তি পায় ইদের দিনে। এগারোই এপ্রিল, বৃহস্পতিবার। তারপরেই শুক্র-শনি-রবি, অর্থাৎ লম্বা সপ্তাহান্ত বলা চলে। এই চারদিনের মধ্যে শুধুমাত্র দেশের ভেতরে এই সিনেমার টিকিট বিক্রির অঙ্ক একশো কোটি ছাড়িয়ে যায়। আর তার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ সোমবার, নির্মাতারা কোনও কারণ না দেখিয়েই ভারত এবং ভারতের বাইরের সমস্ত প্রেক্ষাগৃহ থেকে ছবিটা তুলে নেন৷
তাঁরা উল্লেখ না করলেও, কারণটা শেষ পর্যন্ত অজানা থাকেনি। প্রথম দু’দিনে তেমন অস্বাভাবিক কিছুর খবর ছিল না। তবে শনি আর রবি, অর্থাৎ শেষ দু’দিন যে দর্শকরা এই সিনেমাটা দেখেছিলেন, তাঁদের অনেকের চোখেই বিরতির ঠিক আগের দৃশ্যে একটা অদ্ভুত ঘটনা ধরা পড়ে। ঘটনাটা অশ্লীল এবং অপরাধমূলক, এই ধরনের পারিবারিক ছবিতে যা একেবারেই বেমানান। আরও একটা ব্যাপার হল, ঘটনায় জড়িত অভিনেতা বা অভিনেত্রী সম্পূর্ণ অচেনা।
সেইসব দর্শকের মুখে-মুখে কথাটা ছড়িয়ে পড়ে। সমাজের সর্বস্তরে না হলেও, অন্তত তাঁদের পরিচিত মহলে। সম্ভবত তারপরেই ‘শুটার’-এর প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয় ।
কিছুদিন পরে বিখ্যাত প্রযোজক সঞ্জীব বনশালির মেগা-বাজেটের ছবি, ঐতিহাসিক কাহিনি অবলম্বনে তৈরি ‘শিব্বারাও’-এর প্রিমিয়ার শো হয়। হলে মুক্তি পাওয়ার আগের দিন এই বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন সমাজের বিভিন্ন মহলের গণ্যমান্য মানুষজন। সেই শো-তে তাঁরা ঠিক কী দেখেছিলেন, তা অবশ্য জানা যায়নি। সঞ্জীব অত্যন্ত প্রভাবশালী; সম্ভবত তাঁর অনুরোধেই অতিথিরা প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। তবে প্রিমিয়ার শো শেষ হওয়ার পর সেই রাতেই বনশালি প্রোডাকসন্স-এর তরফে একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। তাতে বলা হয়—‘অনিবার্য কারণবশত’ এই সিনেমার মুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
‘শিব্বারাও’-এর মাসখানেক পরে ‘টার্গেট’-এর পালা। অলিম্পিকে সোনাজয়ী ভারতীয় জ্যাভেলিন থ্রোয়ার নীরজ চোপড়ার জীবন অবলম্বনে এই বায়োপিক তৈরি করেছিল কর্মা স্টুডিও। মুখ্য চরিত্রে ছিলেন অ্যাকশন হিরো অরুণ ধাওয়ান। কর্মা স্টুডিও-র পক্ষ থেকে বলা হয়, ছবির শুটিং-এর পরে এডিটিং চলাকালীন কিছু ‘টেকনিক্যাল প্রবলেম’ বা প্রযুক্তিগত সমস্যা ধরা পড়েছে। সমাধানের চেষ্টা চলছে। শেষ পর্যন্ত সেই সমাধান আর হয়নি, দর্শকরাও ছবিটা দেখতে পাননি।
তবে এবারে আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায়নি। যে প্রযুক্তিবিদরা সমাধানের চেষ্টা করছিলেন, সম্ভবত তাঁদেরই কেউ অসতর্ক মুহূর্তে বাইরের কাউকে বলে ফেলেন,
সমস্যাটা ঠিক কী। তারপরেই দাবানলের মতো গুজবটা ছড়িয়ে পড়ে।
আঘাত হেনেছে ‘দ্য আননোন ক্রিমিনাল’ বা ‘অজ্ঞাত অপরাধী’। তার হাতে আক্রান্ত হচ্ছে একের পর এক বলিউড মুভি!
সামনের ল্যাপটপে খোলা ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে অঙ্কুশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফাইলটা তৈরি করে তাকে মেল-এ পাঠিয়েছে তার সহকর্মী দিশা। ‘দ্য আননোন ক্রিমিনাল’ নিয়ে এই ফাইল বানাতে গিয়ে একেবারে শুরুর দিনগুলোর কথা মেয়েটা নিজের ভাষায় লিখেছে। তবে বেশি বিস্তারিত বর্ণনা। সংবাদমাধ্যম আর নেটের কল্যাণে আজ সারা বিশ্বের লোক জানে, এখন থেকে প্রায় এক বছর আগে কীভাবে বলিউডের ওই তিনটে মুভির মাধ্যমে ‘অজ্ঞাত অপরাধী’-র জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। তদন্তের ফাইলে সেই ইতিহাস না লিখলেও চলত।
তাদের ছোট্ট ঘরে টেবিলের উলটোদিকে বসে দিশা উৎসুক চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের হেড অফিস লালবাজার। সেখানকার সমস্ত সাইবার ক্রাইম স্পেশালিস্টদের মধ্যে তার আর দিশার টিমের নামডাকই সবচেয়ে বেশি। তারা ডিসি সাইবার ক্রাইম মিস্টার অভিষেক মুখার্জির বিশেষ স্নেহভাজন। ‘প্রথমের এই কথাগুলো তো সবারই জানা, কাজেই না লিখলেও চলত।’—অঙ্কুশ দিশার উদ্দেশে একটু সমালোচনার সুরে বলল, ‘আমরা তো আর বই কিংবা নিউজপেপারের রগরগে রিপোর্ট লিখছি না। সরাসরি কাজের কথায় এলে ক্ষতি কী ছিল? আননোন ক্রিমিনাল নিয়ে আগের যতগুলো ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট আর রিলেটেড ইনফর্মেশন আছে, সেগুলো সব এক জায়গায় নিয়ে এলেই মিটে যেত।’ দিশা একটু হাসল।
‘তোর এই একটা দোষ!’ সে বলল, “তুই খালি ভাবিস, গাদা-গাদা ইনফর্মেশন এক জায়গায় জড়ো করলেই বোধহয় কেসটা সলভ হয়ে যাবে। অথচ, সমস্ত ঘটনা— সে যতই সবার জানা বা তুচ্ছ হোক না কেন, পরপর সাজিয়ে নিয়ে দেখতে বসলে অনেক সময়েই একটা প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায়। তখন ঠিক করা যায়—এবারে কোন পথে ভাবব।’
কথাটা পুরোপুরি অস্বীকার করতে না পেরে অঙ্কুশ চুপ করে গেল।
দিশা আবার বলল, ‘আর একটু এগোলেই দেখবি, একটা ভিডিও অ্যাটাচ করা আছে। তোর ওই রিলেটেড ইনফর্মেশন আর কী! মুম্বাইয়ে সান্টা টিভি-র স্টুডিওতে জার্নালিস্ট প্রিয়া দেশপান্ডে ‘শুটার’-এর দুই দর্শক হেমন্ত কানিতকার আর সালমা আফরোজ-এর ইন্টারভিউ নিয়েছে। তারিখ দু’হাজার চব্বিশের চৌঠা জুন।’
একটু থেমে সে আবার যোগ করল, ‘ভিডিওটা দেখলেই অনেক ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইন্টারভিউয়ের ডেটটা লক্ষ্য কর। তখন পরপর ‘শিব্বারাও’ আর ‘টার্গেট’এর রিলিজ আটকে গেছে, আননোন ক্রিমিনাল-এর গুজবটাও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। তখনই সান্টা টিভি তাদের সোর্স লাগিয়ে হেমন্ত আর সালমাকে খুঁজে বার করে। এরা
দু’জনেই ‘শুটার’ ছবিটা তৃতীয় দিন দেখেছিল, যদিও আলাদা-আলাদা হলে।… এবার ইন্টারভিউটা দ্যাখ।’
অঙ্কুশ আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখল। ভিডিও ফাইলটা আঙুলের ছোঁয়ায় চালু করল।
‘প্রিয় দর্শকবন্ধুরা, শুভ সন্ধ্যা। প্রতি শনিবারের মতো আজকেও ফিল্মি দুনিয়ার নানান অজানা খবর নিয়ে হাজির আপনাদের প্রিয় অনুষ্ঠান—গুমনাম হ্যায় কোই। সান্টা টিভির স্টুডিওতে আছি আমি, প্রিয়া দেশপান্ডে। সঙ্গে আছেন আমাদের আজকের দুই অতিথি—হেমন্ত কানিতকার আর সালমা আফরোজ। এঁরা দু’জনে হলে বসে শুটার মুভিটা দেখেছিলেন এ বছরের তেরোই এপ্রিল, শনিবার
‘সান্টা টিভির প্রতিবেদনের দৌলতে এখন আপনারা জানেন, তেরো এবং চোদ্দ তারিখে শুটার-এর প্রদর্শনীতে দর্শকরা একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান। ফলে ছবির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। এর বেশ কিছুদিন পরে টার্গেট ছবির রিলিজ আটকে যায়। বিশ্বস্ত সূত্রে আমরা জানতে পারি এর পিছনে রয়েছে পর্দায় সেই একই দৃশ্যের উপস্থিতি। আমাদের ধারণা, এই দুইয়ের মাঝখানে সঞ্জীব বনশালির শিব্বারাও-ও হয়তো একই ঘটনার শিকার হয়েছিল। তো দর্শকবন্ধুরা, আপনাদের নিশ্চয়ই কৌতূহল জাগছে, কী সেই দৃশ্য? এই সন্ধ্যায় আমাদের দুই তরুণ অতিথির কাছে আমরা সেটাই জানতে চাইব।’ প্রিয়ার ছোট্ট ভূমিকার পর প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হল।
প্রিয়া : প্রথমে আমি আসছি সালমার কাছে।… সালমা, মুভিটা আপনি কোন হলে দেখেছিলেন?
সালমা : আন্ধেরি-র কার্নিভ্যাল সিনেমা হলে।
প্রিয়া : আপনি কি সব সিনেমাই রিলিজ হওয়ামাত্র দেখেন?
সালমা : মোটেই না। বাট হোয়েন ইট কামস টু সোহরাব খান’স মুভি, ইট’স ডিফারেন্ট!
প্রিয়া : আচ্ছা, সেই বিতর্কিত দৃশ্যটা আপনি ঠিক কখন দেখলেন? আর এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
সালমা : ইন্টারভ্যালের ঠিক আগেই দেখলাম। একটা ক্রাউড সিন-এর মধ্যে, কিছুটা দূর থেকেই দেখানো হয়েছে। তবুও, জাস্ট ডিসগাস্টিং! ফোর্সড সেক্স, ফুল ফ্রন্টাল ন্যুডিটি—একটা ফ্যামিলি মুভিতে এইসব কী করে থাকে?
প্ৰিয়া : দর্শকবন্ধুরা, আমরা এবার আসছি হেমন্তের কাছে।… হেমন্ত, আপনি ছবিটা কোথায় দেখেছিলেন?
হেমন্ত : আমি গেছিলাম কোলাবা-র রিগাল সিনেমায়।
প্রিয়া : ওকে। ওই সিনটা সম্পর্কে আপনারও কি একই মত। ফোর্সড সেক্স, ফুল ফ্রন্টাল নুডিটি…
হেমন্ত : অ্যাঁ? অ্যাক্টররা কি ন্যুড ছিল?
হেমন্ত : হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। আরে, হাফ টাইমের আগে একটা সিন ছিল না? সেই যে, সুন্দর মানে শুটার আর কি…একটা বদমাশ মন্ত্রীকে গুলি করে মেরে জেলে গেছে, আর লোকজন জেলের পাঁচিলের বাইরে জড়ো হয়ে তাকে ছাড়ার দাবি জানাচ্ছে। সেখানে হঠাৎ দেখি, ভিড়ের পেছনে মাঠের ফাঁকা জায়গায় একটা মেয়ে এলিয়ে পড়ে আছে। ঘুমোচ্ছে না কিন্তু, চোখ খোলা। পুরোপুরি ইয়ে… মানে, গায়ে কাপড়চোপড় কিছু নেই। তারপর একটা লোক, তারও একই অবস্থা, গিয়ে মেয়েটাকে রেপ করতে লাগল! তাকে অবশ্য পেছন থেকে দেখিয়েছে, মুখটা দেখায়নি।
প্রিয়া : মানে, ওটা কি রেপ সিন ছিল?
প্রিয়া: তারপর কী হল ?
হেমন্ত: তারপর ক্যামেরা ঘুরে গেল, তাই আর দেখা গেল না। তবে আমার মোবাইল ফোনে তোলা আছে। আমি পুরো সিনেমাটা মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং করছিলাম কি না!
প্রিয়া: সে কী! আপনি হলে বসে স্ক্রিন থেকে মুভি রেকর্ড করছিলেন? কেন? হেমন্ত: ইয়ে, মানে…. অন্য কিছু নয়… আসলে… আসলে আমি সোহরাব-স্যারের
ফ্যান কিনা, তাই ওঁর সব সিনেমা নিজের কাছে রাখতে চাই, মানে… প্রিয়া: ঠিক আছে। আমাদের চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পরে এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।… প্রিয় দর্শকবন্ধুরা, ফিরে আসছি আপনাদের কাছে। আপনাদের সামনে প্রশ্ন রাখছি, একটা পারিবারিক সিনেমায় এরকম দৃশ্য থাকাটা কি সঙ্গত? এটা কি ইচ্ছাকৃত, না কি ভুলক্রমে হয়েছে? না কি এটা সোহরাবের কোনও শত্রুর কীর্তি? তাঁর ভাবমূর্তিকে ম্লান করার চক্রান্ত? আর অন্য দু’টো সিনেমার ক্ষেত্রেও কি…
‘সান্টা টিভি হেমন্ত কানিতকারের কাছ থেকে ভিডিওটা হাতায়, সম্ভবত কিছু পয়সার বিনিময়ে। সেখান থেকে ওই রেপ সিনটার একটা স্টিল ফটোও বানায়। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল, একটু রেখেঢেকে ছবিটা দেখিয়ে নিজেদের চ্যানেলের টিআরপি বাড়ানো। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। মুম্বাই পুলিশ ব্যাপারটা জানতে পেরে একটা অশ্লীল প্রদর্শনের মামলা দায়ের করে। তারাই সান্টা টিভিকে নোটিশ দেয়, এ নিয়ে যেন আর কোনও টেলিকাস্ট না হয়। তারপর তারা ওই তিনটে সিনেমার প্রোডাকশন হাউসের কাছ থেকে সিনেমাগুলোর মূল প্রিন্টও চেয়ে পাঠায়।
‘পরের ঘটনা তো জানিসই। বলিউডের আর দক্ষিণের আরও বেশ কয়েকটা সিনেমায় সিনটা ঢুকে পড়ে। হুবহু এক ঘটনা, যদিও এক-একটা সিনেমার এক-এক জায়গায় সিনটা রয়েছে। তাদের ডাইরেক্টররা একবাক্যে বলেছে, কোনও হ্যাকার তাদের মুভির ফাইনাল এডিটেড কপিতে ওই ভিডিওর এমপিজি ফাইল ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা নিজেরাই মুম্বাই সাইবার ক্রাইমে কমপ্লেন লজ করে। তারপর তো হলিউডের একটা সিনেমাতেও ব্যাপারটা হল। আর সবার শেষে এখন বাংলা ছবির পালা, যার জন্য আমরা এই কেসে জড়িয়ে পড়লাম।’
এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা বলে দিশা একটু দম নিল। তারপর আবার শুরু করল।
‘আমি মুম্বাইয়ের ওই প্রোডাকশন হাউসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। ওরা বলল, সিনেমার প্রিন্ট মুম্বাই পুলিশের হেফাজতে, তাই আমাদের দিতে পারবে না। সান্টা টিভির অথরিটিকেও রিকোয়েস্ট করেছিলাম। ওরা বলল, হেমন্ত কানিতকারের তোলা ভিডিওটাও না কি পুলিশকে জমা দিতে হয়েছে। তবে প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে ভিডিও থেকে ওদের বানানো সেই স্টিল ফটোটা জোগাড় করেছি। দ্যাখ, ফাইলে আছে।’
অঙ্কুশ মনে-মনে দিশার তারিফ না করে পারল না। তথ্য জোগাড়ের কাজে এ মেয়ের জুড়ি মেলা ভার। এবার অঙ্কুশ নিজে তদন্তের টেকনিক্যাল দিকটা সামলাতে পারলেই…
ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা স্টিল ফটোটা দেখে কিন্তু তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সত্যিই ছবিটা আপত্তিকর। তার ভিডিওর একটা দৃশ্যকে স্থির করার ফলে দেখা যাচ্ছে, ঘাসের মাঠের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা এক তরুণী। শ্যামলা রং, সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশের বাসিন্দা। মুখ দেখলে মনে হয়, মেয়েটা কোনওরকম নেশায় আচ্ছন্ন। তবে পুরোপুরি অজ্ঞান নয়, কারণ তার দু’চোখ খোলা। আর তার দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে গুড়ি মেরে রয়েছে এক নগ্ন পুরুষ। সে-ও সম্ভবত ভারতীয়, তবে ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে থাকায় তার মুখ বা দেহের সামনের অংশ দেখা যাচ্ছে না।
ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই অঙ্কুশ বলল, ‘আমাদের শ্রীনিবাস মোহতা-র ‘ত্রিলন’ সিনেমাটাতেও তো লোকটাকে পেছন থেকেই দেখা গেছে, তাই না? তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হল, মোহতা-র ফিল্মে যে অশ্লীল জায়গাটুকু আছে, তার সঙ্গে এই স্টিল ফটোর মিল আছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখা। তাই তো?’ ,
‘হ্যাঁ।’ দিশা অঙ্কুশের কথায় সায় দিল, ‘সেটাই আগে কনফার্ম করতে হবে। ভিলেন সিনেমার ওই পার্টটা ফাইলে অ্যাটাচ করা আছে, একটু পরেই দেখতে পাবি। তবে তার আগে…’
একটু ইতস্তত করে সে যোগ করল, ‘তার আগে অন্য কয়েকটা ঘটনা মেনশন করেছি। যারা আমাদের আগে আননোন ক্রিমিনাল-কে নিয়ে ইনভেস্টিগেট করছিল, তাদের মধ্যে কেউ-কেউ না কি তদন্ত চলাকালীন নিজেরাই… আসলে ব্যাপারটা নিয়ে নাড়াঘাঁটা করতে গিয়েই নেট থেকে জানতে পারলাম… একটু দেখিস তো !’
‘ভেবে দ্যাখ, পুলিশে কাজ করলেই যে কেউ অপরাধপ্রবণ হবে না, এমন তো নয়! আবার অনেকের পাগলামিও থাকে, আগে ধরা পড়ে না।’ পরদিন অঙ্কুশ দিশাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, ‘আর তা ছাড়া, গেল কয়েক মাসে আননোন ক্রিমিনাল-কে নিয়ে ইন্টারনেট জগতে প্রচুর মাতামাতি হচ্ছে। পেছন থেকে দেখা লোকটা আসলে কে
হতে পারে, সেটা পুলিশ ছাড়াও অনেক শৌখিন সাইবার এক্সপার্ট নিজের চেষ্টায় খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে আশ্চর্যের কী আছে?’
অঙ্কুশ আর দিশা দু’জনে গঙ্গার পাড়ে হাঁটছিল। দু’বছর একসঙ্গে কাজ করার ফলে তাদের মধ্যে একটা ভালোলাগার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। যদিও, সহকর্মীদের সামনে তারা সচেতনভাবেই এই ঘনিষ্ঠতার কথা গোপন রাখে। অঙ্কুশ অবিবাহিত, বাবা-মা তার বিয়ের কথা ভাবছেন৷ দিশা নিঃসন্তান, ডিভোর্সি। বাবা-মা বেঁচে নেই। মধ্য কলকাতার ঘিঞ্জি অঞ্চলে একটা এক কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটে সে একা থাকে।
অঙ্কুশ কয়েকবার তাকে সেই ফ্ল্যাটের কাছাকাছি ছেড়ে দিয়ে এলেও কখনও বিল্ডিং-এ ঢোকেনি। দিশাও তাকে আমন্ত্রণ জানায়নি। দু’জনেরই বয়েস ত্রিশের কাছাকাছি, বিয়েটা হতেই পারে। তবে অঙ্কুশের ধারণা, দিশার এখনও সামান্য দ্বিধা আছে, হয়তো নিজের অতীতের কথা ভেবেই। তাই অঙ্কুশ নিজে থেকে কিছু বলছে না, চাইছে প্রস্তাবটা দিশার পক্ষ থেকে আসুক। আপাতত দু’জনে অফিস থেকে আলাদা-আলাদা সময়ে বেরোয়, তারপর বাইরে কোথাও গিয়ে দেখা করে। আজ যেমন এসেছে মিলেনিয়াম পার্কে।
‘তাই বলে তিন-তিনজন লোক একই কাণ্ড ঘটাবে? বিশেষ করে আগে যখন কারোরই কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই।
অঙ্কুশের কথার উত্তরে অবিশ্বাসের সুরে দিশা বলল, ‘এটা কি স্বাভাবিক?” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুদিকে মাথা নাড়ে অঙ্কুশ।
আসলে দু’হাজার চব্বিশের শেষের দিক থেকেই পর-পর সিনেমায় অজ্ঞাত অপরাধীর ওই ধর্ষণ-দৃশ্য ঢুকে পড়তে থাকে। বলিউড, সাউথ-ইন্ডিয়ান ছবির পরে এবার হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা জন ক্রুজ-এর ‘দ্য নেইবারস’ মুক্তি পাওয়ার কয়েকদিনের ভেতরেই যখন একই ঘটনা ঘটে, তখন সারা পৃথিবীতে সাড়া পড়ে যায়। মুম্বাই-সহ ভারতের বিভিন্ন শহরের পুলিশের সঙ্গে তদন্তে সামিল হয় নিউ ইয়র্কের পুলিশও। সেই সময়েই মোটামুটি দশ সেকেন্ড-ব্যাপী বিতর্কিত ভিডিও ক্লিপটা ওইসব সিনেমা থেকে কোনওভাবে ভাইরাল হয়ে যায়।
ফলে বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ, পেজ এবং ব্লগে এই অজ্ঞাত অপরাধীকে নিয়ে চর্চা শুরু হয়। অসংখ্য সাইবার বিশেষজ্ঞ এবং হ্যাকার খুঁজে বার করার চেষ্টা করতে থাকে, তার প্রকৃত পরিচয় কী। কিন্তু সরকারি অথবা বেসরকারি–কোনও তদন্তই ফলপ্রসূ হয়নি। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্যও অপরাধীর মুখ দেখা যায়নি, দেখা যায়নি ট্যাটু বা অন্য কোনও শনাক্তকরণের চিহ্ন। এমনকী, কোথা থেকে বা কী উপায়ে ওই ভিডিও ক্লিপ এত নিখুঁতভাবে সিনেমাগুলোর নিজস্ব দৃশ্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, সেই রহস্যেরও সমাধান সম্ভব হয়নি।
কিন্তু যারা এই অনুসন্ধান চালাচ্ছিল, তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন নিজেরাই এই জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়। আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাই এগুলো তেমন প্রচার পায়নি। কিন্তু দিশা খোঁজখবর করে ঘটনাগুলোকে তুলে এনে পরপর সাজানোর পর
খটকা লাগতে শুরু করে। কারণ একদিকে যেমন জড়িত ব্যক্তিরা সকলেই অজ্ঞাত অপরাধীর পরিচয় নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিল, তেমনই ঘটনাগুলোর মধ্যেও আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে।
প্রথমজন মুম্বাইয়ের সাইবার ক্রাইম ইন্সপেক্টর অজয় রানাডে। সান্টাক্রুজ থানায় কর্মরত কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ এই তরুণ অফিসার অজ্ঞাত অপরাধী বিষয়ক তদন্তের দলে ছিল। কিন্তু দু’হাজার চব্বিশের পনেরোই সেপ্টেম্বর স্ত্রী বাপের বাড়িতে থাকার সময় সে ঘরের তরুণী পরিচারিকাকে ধর্ষণ করে। তার আগে মেয়েটাকে ঘুমের ওষুধ মেশানো সরবৎ খাইয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, পরে নিজের অপরাধ অস্বীকারের কোনও চেষ্টাই রানাডে করেনি। তার থেকেও আশ্চর্যের বিষয়—গ্রেফতারের পর সে জোরগলায় দাবি করতে থাকে, সে নিজেই না কি সেই অজ্ঞাত অপরাধী! বিভ্রান্ত পুলিশ প্রথমে তাকে কিছুটা বিশ্বাসও করেছিল। কিন্তু তদন্তে স্পষ্ট হয়ে যায়, তার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ভিডিও ক্লিপের অজ্ঞাত অপরাধীর সঙ্গে তার কোনওরকম দৈহিক সাদৃশ্য নেই। এর ফলে তার মানসিক সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। আপাতত সে মুম্বাই পুলিশের তত্ত্বাবধানে অ্যাসাইলামে বন্দি।
দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে এ বছর, অর্থাৎ দু’হাজার পঁচিশের জানুয়ারিতে। তার কিছুদিন আগেই হলিউডের ‘দ্য নেইবারস’ সিনেমায় একটা ফার্ম হাউসের ভেতর অজ্ঞাত অপরাধীকে দুষ্কর্ম সম্পাদন করতে দেখা যায়। আটলান্টার ধনকুবের তরুণ ব্যবসায়ী এবং শৌখিন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হিউ ওয়ালেস নিজের উদ্যোগে অজ্ঞাত অপরাধীর আসল পরিচয় জানার চেষ্টা করছিল। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সে তার দীর্ঘদিনের বান্ধবী লিন্ডা-কে একইভাবে নিজের ফার্ম হাউসে মাদক খাইয়ে ধর্ষণ করে। তারপর সেও পুলিশকে জানায় যে সে অজ্ঞাত অপরাধী। বলা বাহুল্য, এবারেও তদন্তে প্রমাণ হয় তার দাবি মিথ্যা।
তৃতীয় ঘটনার কেন্দ্রে বেঙ্গালুরু পুলিশের নিয়োজিত একজন এথিকাল হ্যাকার, পি রঙ্গরাজ রেড্ডি। সে একটা কন্নড় ছবিতে অজ্ঞাত অপরাধীর অনুপ্রবেশ নিয়ে তদন্তে অংশ নিয়েছিল। তার লালসার শিকার হয় তার নিজের মাসতুতো বোন। এবং পরবর্তী ঘটনা আগের ঘটনা দুটোর পুনরাবৃত্তি মাত্ৰ ৷
আর এই তিনজনের মস্তিষ্কবিকৃতির ধরন একেবারে একরকম হবে কেন, সেটাই দিশা বা অঙ্কুশ কেউই বুঝতে পারছে না ৷ দিশা পরবর্তী প্রশ্নে গেল।
‘ঠিক আছে, ওই লোকগুলোর ব্যাপার নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন বল, সান্টা টিভির ছবিটার সঙ্গে ভিলেন মুভির ওই পার্টটা মিলিয়েছিলি? মিলছে?’
‘পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।’—অঙ্কুশ ধীরে-ধীরে বলল, ‘ছবিটা হলের স্ক্রিন থেকে তোলা। কোয়ালিটি খারাপ, বড় করতে গেলে পিক্সেল ভেঙে যাচ্ছে। আমি তাই ছবিটাকে কয়েকটা পার্টে ভাগ করলাম। তারপর ভিলেন-এর ভিডিও ক্লিপটার ওপর সেটাকে সুপার-ইমপোজ করে দেখতে লাগলাম, কোথাও ছেলেটা আর মেয়েটার সমস্ত বডি পার্ট খাপে-খাপে মিলে যায় কি না।’
‘মিলল ? ’
‘হ্যাঁ ভিডিও-র পঞ্চম সেকেন্ডে এসে ছবিটা হুবহু মিলে গেল।’ ‘হুম!’
‘আর হ্যাঁ। শুধু তা-ই নয়। এরপর তোর ফাইলে তুই আরও তিনটে দশ সেকেন্ডের ভিডিও অ্যাটাচ করেছিস। একটা ওই হলিউডের মুভিটা থেকে ভাইরাল হয়েছিল। অন্য দু’টোর একটা তামিল আর একটা কন্নড় মুভি থেকে। সান্টা টিভির স্টিল ফটো ওই তিনটে ভিডিও ক্লিপেরও পঞ্চম সেকেন্ডের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে। আর খটকাটা সেখানেই ! ‘
‘কীরকম?’ দিশার ভ্রু কুঁচকে গেল।
‘দ্যাখ দিশা, এই সবগুলো ভিডিও ক্লিপ একদম একরকম, স্টিল ফটোটার সঙ্গেও মিলছে।’—অঙ্কুশের গলায় দ্বিধার সুর, ‘কিন্তু এক-একটা সিনেমায় ভিডিওটা এক-একরকম ব্যাকগ্রাউন্ডে প্লে করছে। দ্য নেইবার-এ একটা ফার্ম হাউসে। কন্নড় মুভিটায় একটা জঙ্গলের দৃশ্যে। আবার তামিল মুভি কোরিপালায়াম-এ একটা হাইরাইজের ছাদ থেকে ক্যামেরা প্যান করে চারদিক দেখাচ্ছে। আননোন ক্রিমিনাল-কে তার শিকার-সহ একটু নিচু একটা বাড়ির ছাদের ওপর দেখা যাচ্ছে।’
একটু থেমে সে যোগ করল, ‘আর এদের কোনওটাতেই মনে হচ্ছে না, ভিডিও ক্লিপটা বাইরে থেকে ঢোকানো কোনও এমপিজি ফাইল! ব্যাকগ্রাউন্ড বা ক্যারেকটার, কোথাও কোনও ডিসটরশন নেই। প্রত্যেকটা সিনেমাতে মনে হচ্ছে, ওই রেপ সিনটা আসল শুটিং-এরই পাৰ্ট!”
‘বলিস কী!’ দিশার চোখ কপালে উঠল।
“হ্যাঁ রে! আমি ব্যাপারটা অভিষেক স্যারকে জানিয়েছি। উনি মুম্বাইয়ের পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওদের সাইবার এক্সপার্ট-দেরও একই মত। কোনও সিনেমায় ভিডিও ক্লিপটা নকল বলে ধরা যাচ্ছে না।’
‘তাহলে এখন কী করবি?” দিশা জানতে চাইল।
“আমরা ভিলেন মুভির একটা কপি মুম্বাইয়ে পাঠাচ্ছি। ওরাও ওদের বাজেয়াপ্ত করা প্রথম তিনটে বলিউড মুভির কপি আমাদের পাঠাবে। একবার ওগুলোও খতিয়ে দেখি, জালিয়াতির কোনও প্রমাণ পাই কি না। পাওয়া কঠিন অবশ্য, কারণ ওরাও পায়নি।’
‘তারপর? তারপর কী করবি??
‘তারপর… তারপর একটু ভাবতে হবে, কোন পথে এগোনো যায়।”
‘বলো অঙ্কুশ, প্রগ্রেস এগোলে?’ ডিসি অভিষেক মুখার্জি জানতে চাইলেন, ‘আননোন ক্রিমিনাল-এর পরিচয় জানা গেল ? ”
উত্তর দেওয়ার আগে অঙ্কুশ নিজের দু’পাশে একবার তাকাল। ভিলেন সিনেমা নিয়ে তদন্তের আজ চোদ্দ দিন। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার জন্য ডিসি তাদের
নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠিয়েছেন। অঙ্কুশের বাঁ পাশে রয়েছে দিশা। ডানপাশে ইন্সপেক্টর অমিত রায়, ইনভেস্টিগেটিং অফিসার।
‘না স্যার, লোকটার পরিচয় জানতে পারিনি।’ অঙ্কুশ জানাল, ‘আগের সমস্ত সাইবার এক্সপার্ট-এর কথা ঠিক। দশ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপে একবারের জন্যও আননোন ক্রিমিনাল-এর মুখ দেখা যায়নি। তার শরীরের পেছন দিকে কোনও আইডেন্টিফিকেশন মার্কও নেই। মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে বটে, তবে তারও পরিচয় জানা যাচ্ছে না। কোনও নোন রেপ ভিকটিম অথবা মিসিং পার্সন-এর মুখের সঙ্গেও ম্যাচ করা যায়নি।’ ‘হুম! আর ভিডিও ক্লিপটা কীভাবে সবগুলো সিনেমায় ঢোকানো হচ্ছে, সেটা ধরতে পারলে? ‘
‘না৷ প্রত্যেকটা সিনেমাতেই ভিডিও ক্লিপটা এত নিখুঁতভাবে ঢোকানো হয়েছে যে, মনে হচ্ছে ওটা সিনেমারই পার্ট। আমার জানা কোনও অ্যাপ বা বাগ দিয়ে এমনটা করা সম্ভব নয়। মুম্বাইয়ের লোকেদেরও একই মত।’
‘যাব্বাবা! তাহলে?’ হতাশ ডিসি ইন্সপেক্টর অমিত-এর দিকে ফিরলেন, ‘অমিত, তুমি কি কাউকে সন্দেহ করছ? ভিলেন সিনেমার ক্রু-দের মধ্যে কেউ কি এই কাজে জড়িত থাকতে পারে?’
‘না, স্যার। সবাইকে খুঁটিয়ে জেরা করা হয়েছে। প্রত্যেকেরই নিখুঁত অ্যালিবাই আছে।’
‘বেশ। তাহলে তোমরা চেষ্টা চালিয়ে যাও। আবার দিন সাতেক পরে মিটিং ডাকা যাবে।’ বলে ডিসি সভা ভেঙে দিতে যাচ্ছিলেন।
‘কিন্তু স্যার, আমার কথা এখনও শেষ হয়নি!
অঙ্কুশের কণ্ঠস্বরে সবার চোখ তার দিকে ঘুরে গেল।
‘ইয়েস, মাই বয়! বলো, কী বলতে চাও।’ অভিষেক বললেন৷ ‘দু’টো কথা, স্যার। প্রথমটা হল, যে সিনেমাগুলো আক্রান্ত হয়েছে, তাদের কোনওটার ক্ষেত্রেই কোনও ফাউল প্লে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে হল, এগুলোর মধ্যে কোনও কমন ফ্যাক্টর নেই তো? ‘কমন ফ্যাক্টর বলতে?’
‘এই ধরুন, ছবিগুলোর প্রোডাকশন বা রিলিজের ক্ষেত্রে কোনও মিল ছিল কি? একই স্টুডিওতে এডিটিং, একই অ্যাপ-এর ব্যবহার, একই হলে রিলিজ—এরকম কিছু?’ বলতে-বলতে অঙ্কুশ আড়চোখে বাঁ দিকে তাকাল, ‘তৎক্ষণাৎ দিশাকে বললাম ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে। আর ওর রিসার্চে একটা তথ্য উঠে এল। এটা আগে জানা ছিল না, বা জানলেও এ নিয়ে কেউ ভাবেনি।’
‘কী তথ্য?’ অভিষেক নড়েচড়ে বসলেন।
‘স্যার, এই সবগুলো মুভির ভিএফএক্স-এর কাজ হয়েছিল একটাই স্টুডিওতে।’ ‘ভিএফএক্স? মানে ভিসুয়াল এফেক্টস?’
‘ঠিক বলেছেন, স্যার।’ অঙ্কুশ জানাল, ‘সবগুলো সিনেমারই ভিএফএক্স হয়েছিল মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ভিএফএক্স স্টুডিও স্টারবার্স্ট-এ।’
‘সবগুলো সিনেমার ? ‘
‘হ্যাঁ, স্যার। আসলে স্টারবার্স্ট এতটাই বিখ্যাত যে, বলিউড ছাড়াও দক্ষিণের বড় বাজেটের মুভিগুলোও ভিএফএক্স-এর জন্য ওদের দ্বারস্থ হয়। আমাদের শ্রীনিবাস মোহতা-ও হয়েছিলেন। এমনকি, হলিউডের ওই সিনেমাটারও কিছু কাজ ওখানে হয়েছিল। সম্ভবত কস্ট কাটিং-এর জন্য, কারণ ভারতের স্টুডিওতে কাজের খরচ কম। আর স্যার, এই স্টারবার্স্ট স্টুডিও-র মালিক হলেন রাজন বিন্দ্ৰা ৷
‘রাজন বিন্দ্রা, মানে…’
‘মুম্বাইয়ের বিখ্যাত পরিচালক ও প্রযোজক।’ দিশা বলে দিল।
‘মাই গড!’ অভিষেকের চোখ বড়-বড় হয়ে উঠল, ‘তিনি কি এতে জড়িত থাকতে পারেন? ‘
‘জানি না, স্যার।’ অঙ্কুশ বলল, ‘তবে এবার আমার দ্বিতীয় কথাটায় আসি। আমার ওই ভিডিও ক্লিপটা দেখে প্রথম থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল, ওটা হয়তো কোনও ট্রিপল এক্স ফিল্ম-এর অংশ। তাই আমি খুঁজতে থাকি, পাবলিক ডোমেন-এ থাকা কোনও পর্নো মুভির কোনও অংশের সঙ্গে ওই ক্লিপটা মেলে কি না।’
‘পর্নো মুভি?’ অভিষেক কিছুক্ষণ হাঁ করে চেয়ে থেকে বললেন, “তা সেরকম কিছু পেলে?
‘পেলাম স্যার। মুভির নাম…’ অঙ্কুশ বয়োজ্যেষ্ঠ অফিসারের সামনে বলতে গিয়ে ঢোঁক গিলল, ‘মুভির নাম—কুমারীয়োঁ কি বলাৎকার!’ ‘এঃ, জঘন্য!’
‘হ্যাঁ, স্যার। কিন্তু সেখানেও ওই দশ সেকেন্ডের ক্লিপটাই ছিল। যদিও এবার রেপটা হচ্ছিল একটা সাদামাটা ঘরের বিছানায়। আসলে মুভিটা ঠিক ট্র্যাডিশনাল পর্নো মুভি নয়, এরকম অনেকগুলো অশ্লীল ভিডিও ক্লিপ-এর একটা কোলাজ।’
‘সেখানকার ভিডিও ক্লিপ বলিউড-হলিউডের মুভিতে ঢুকল কী করে?’ ‘সেটা এখনও ধরতে পারিনি স্যার।’
‘তারপর? তারপর কী করলে?’
‘তারপর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ফলো করে খুঁজে বার করার চেষ্টা করলাম, ওই পর্নো মুভিটা প্রথম কোথা থেকে নেটে আপলোড করা হয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বান্দ্রার একটা টুইটার হ্যান্ডল-এর হদিশ মিলল। ইউজার নেম দেওয়া আছে হার্ডগাই। আসল নামটা এখনও বার করতে পারিনি।’
অঙ্কুশ একটু থেমে দম নিল।
তারপর ফের বলল, ‘স্যার, এবার যদি এই হার্ডগাই-কে খুঁজে বার করে জানা যায়, পর্নো মুভিটা ও ঠিক কোথা থেকে পেয়েছিল তাহলেই…’
‘সাব্বাশ!’ সে থামতেই অভিষেক তারিফের সুরে বললেন, ‘আমি মুম্বাইয়ের লোকদের এক্ষুনি ব্যাপারটা জানাচ্ছি। ওরা বাকিটা বুঝে নেবে।… আর কিছু?’
‘আর স্যার, এই পর্নো মুভির আলাদা-আলাদা ভিডিও ক্লিপগুলোর শুটিং বেশ কাঁচা হাতের। কিন্তু ভিশন মিক্সিং আর এডিটিং দেখে আমি রীতিমতো অবাক হয়েছি।
মনে হয় এটাও বড় কোনও স্টুডিওর প্রোডাক্ট।’
‘বড় কোনও স্টুডিও? যেমন…’ অভিষেক চোখ সরু করে তাকালেন, ‘যেমন স্টারবার্স্টং’
অঙ্কুশ কিছু না বলে ওপর থেকে নীচে মাথা নাড়ল।
ভাঁজ।
নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে অঙ্কুশ। কপালে চিন্তার
কিছুক্ষণ আগেই ডিসি অভিষেক মুখার্জি তাকে আর দিশাকে নিজের ঘরে ডেকে সহকর্মীদের সামনে বিশেষ সম্বর্ধনা দিয়েছেন। অজ্ঞাত অপরাধীর তদন্তে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্যই এই পুরস্কার। কিন্তু অঙ্কুশ তবুও ঠিক সন্তুষ্ট নয়, কারণ রহস্যের সমাধান পুরোপুরি হয়নি।
গত তিনটে মাস যেন একটা ঘোরের মধ্যে কেটেছে। তাদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে বান্দ্রা থেকে হার্ডগাই ওরফে সিদ্ধার্থ সাংভি-কে গ্রেফতার করতে মুম্বাই পুলিশের সময় লাগে ঠিক সাতদিন। দেখা যায়, এই সফটওয়্যার প্রফেশনাল আসলে অশ্লীল ছবির চক্রের সঙ্গে জড়িত।
সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই সব তথ্য বেরিয়ে আসে। জানা যায়, এই বিশেষ পর্নো মুভিটা তৈরি হয়েছে স্টারবার্স্ট স্টুডিওতেই। শুধু তাই নয়, এরকম আরও অনেক পর্নো মুভি তৈরি ও বিপণন এই স্টুডিও-র মাধ্যমে হয়। বাইরের সম্ভ্রান্ত কাজকর্মের আড়ালে রাজন বিন্দ্রার সংস্থা এই ক্লেদাক্ত ব্যবসা এতদিন নির্বিঘ্নে চালিয়ে এসেছে। রাজন বিন্দ্রা অবশ্য ঘটনার দায়িত্ব সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন— নিজের ব্যস্ততার দরুন সংস্থার খুঁটিনাটি তাঁর পক্ষে খেয়াল রাখা সম্ভব নয়। সেই সুযোগে তাঁর কোনও অধস্তন কর্মচারী সংস্থার পরিকাঠামো কাজে লাগিয়ে এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।
মালিকের এই উক্তির ঠিক পরেই স্টারবার্ট স্টুডিও-র ম্যানেজার ধবল কুলকার্নি স্বীকার করেন—পর্নো মুভি তৈরির দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁর একার। মুম্বাই পুলিশ তাঁর স্বীকারোক্তি মেনে নিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করে। তারা কোনওভাবে প্রভাবিত হয়েছিল কি না জানা নেই, তবে অভিষেক-সহ কলকাতা পুলিশের বড়কর্তারা সকলেই বলেছিলেনব্যাপারটা পুরোপুরি আইওয়াশ। ধবলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাঁকে এরকম স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
ঘটনা যা-ই হোক, পুলিশ স্টারবার্ট স্টুডিও সিল করে দেয়। গত দু’মাসে কোনও পরিচালক সেখানে ভিএফএক্স-এর জন্য যাননি। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বা নির্মীয়মান কোনও সিনেমায় অজ্ঞাত অপরাধীর হানার আর কোনও খবরও পাওয়া যায়নি। মনে করা হচ্ছে, ওই অধ্যায় শেষ।
তবে ধবলও কিন্তু অজ্ঞাত অপরাধীর পরিচয় জানাতে পারেননি। তিনি বলেন,
সংস্থার গোপন অ্যাড্রেসে অচেনা কারও কাছ থেকে ওই ভিডিও ক্লিপের এমপিজি ফাইল এসেছিল। মুম্বাই পুলিশ খোঁজ নিয়ে দেখেছে, সেই প্রেরকের ঠিকানা ভুয়ো। তার থেকেও বড় কথা, ওই এমপিজি ফাইল কীভাবে স্টারবার্স্ট স্টুডিও-তে স্পেশাল এফেক্টের জন্য আসা মূল ধারার সিনেমাগুলোর ভেতরে ঢুকল, সেই রহস্যেরও সমাধান হয়নি। এ বিষয়েও ধবলের কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই।
ধবল কুলকার্নি-র উকিলের উপস্থিতিতে মুম্বাই পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অর্চনা শিভালকার এবং কমিশনার বিনয় গোয়েল নিজেরাই এই ব্যাপারে ধবলকে জেরা করেন। অভিষেক মুখার্জির অনুরোধে মুম্বাই পুলিশ সেই জেরার ট্রান্সস্ক্রিপ্ট বা লিখিত রূপ এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। নিজের ল্যাপটপে অঙ্কুশ এখন সেটাই দেখছিল।
তৈরি? অৰ্চনা মিস্টার কুলকার্নি, ‘কুমারীয়োঁ কি বলাৎকার’ আপনাদের স্টুডিও-তে :
ধবল : হ্যাঁ, ম্যাডাম ।
অৰ্চনা : ছিঃ! এত বড় হাউসের সুনামের আড়ালে পর্নো মুভি তৈরি করতে লজ্জা করল না?
উকিল মিস্টার ভাটনগর : অবজেকশন, ম্যাডাম ! পর্নো ছবি তৈরির মামলা আদালতের বিচারাধীন। আমার মক্কেলকে জানানো হয়েছিল, এই জিজ্ঞাসাবাদ শুধুমাত্র আননোন ক্রিমিনাল-এর বিষয়ে।
বিনয় : শান্ত হোন, অর্চনা।… মিস্টার কুলকার্নি, আননোন ক্রিমিনাল নামে পরিচিত ভিডিও ক্লিপটা আপনাদের হাতে এল কী করে?
ধবল : সংস্থার গোপন ই-মেলে। ওরকম ক্লিপ অনেক অ্যামেচারই নিজস্ব মোবাইলে শুট করে পাঠাত, বড় কাজ পাওয়ার আশায়। এই ক্লিপটার কোয়ালিটি দেখেও মনে হয়েছিল, মোবাইল ক্যামেরায় তোলা৷
ভাটনগর : সেন্ডারের অ্যাড্রেস আমার মক্কেল লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তদন্তে সবরকমের সহযোগিতা করছেন।
বিনয় : হুম, সেই অ্যাড্রেস নিয়ে খোঁজখবর চলছে। কিন্তু মিস্টার কুলকার্নি, ‘কুমারীয়োঁ কি বলাৎকার’ বানাতে গিয়ে আপনারা ওই ক্লিপ ব্যবহার করলেন কেন? ধবল : মাঝেমধ্যে অমন করা হতো। অ্যামেচার ক্লিপগুলোকে স্প্রাইস করে, অর্থাৎ কেটে-জুড়ে ওরকম এক-একটা মুভি বানানো হতো। এই দশ সেকেন্ডের ক্লিপটা পুরোটাই ঢোকানো হয়। কারণ… ইয়ে, আমাদের মনে হয়েছিল—ড্রাগ খাইয়ে রেপ করার ব্যাপারটা কোনও-কোনও দর্শক পছন্দ করবে।
বিনয় : বুঝলাম, কিন্তু ওই একই ক্লিপ আপনাদের কাছে স্পেশাল এফেক্ট-এর জন্য আসা মুভিগুলোতে ঢুকল কী করে? ব্যাপারটা কি ইচ্ছাকৃত ?
ধবল : মোটেই না! আমার ধারণা, কেউ কারসাজি করে আমাদের কম্পিউটারগুলোয় কোনও বিশেষ অ্যাপ বা ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দিয়েছিল! তার ফলেই অমনটা ঘটেছে। অৰ্চনা উঁহু। আমাদের বিশেষজ্ঞরা পরখ করে দেখেছে, আপনাদের কোনও :
কম্পিউটারে ওরকম কোনও অ্যাপ বা বাগ নেই।
ধবল : তাহলে আমি বলতে পারছি না।…
‘কী রে অঙ্কুশ, স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েও মুখ গোমড়া করে বসে আছিস কেন ? ”
দিশা দু’কাপ কফি নিয়ে ঘরে এসে ঢুকেছে।
‘ধবল কুলকার্নি-র জেরার ট্রান্সস্ক্রিপ্ট-টা দেখছিলাম।’ ল্যাপটপের দিকে দেখিয়ে অঙ্কুশ অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘আননোন ক্রিমিনাল কে, বা সব মুভিতে সে কীভাবে ঢুকল—সেটা কিন্তু অজানাই থেকে গেল !
‘ছাড় তো ওসব!’ দিশা টেবিলের ওপার থেকে এদিকে একটু ঝুঁকে পড়ল, ‘কাল সানডে। কাল সন্ধ্যায় আমরা তো এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য একটু সেলিব্রেট করতে পারি, না কি?”
‘অবশ্যই!’ সচকিত অঙ্কুশ বলল, ‘কোনও মলে গিয়ে মুভি, তারপর ডিনার…’ না! কাল সন্ধ্যার সেলিব্রেশন আমার ফ্ল্যাটে!’
‘অ্যাঁ!” অঙ্কুশ নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।
‘দ্যাখ, আমার মনে হয় এবার আমাদের এই সম্পর্কটাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে। অবশ্যই যদি তোর আপত্তি না থাকে!
দিশার মুখে মৃদু হাসি। বড়-বড় চোখে জানালা গলে আসা শেষ বিকেলের
রোদের ঝলকের দিকে তাকিয়ে অঙ্কুশও একটু রোমান্টিক হয়ে পড়ল৷ ‘প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস,’ সে আপনা থেকেই আবৃত্তি করল, তোমার চোখে দেখেছিলাম…’
কিন্তু ঠিক এই জায়গাটায় এসে অঙ্কুশ হঠাৎ থমকে গেল।
তারপর আত্মবিস্মৃতের মতো বেশ কয়েকবার বিড়বিড় করে বলল, ‘তোমার চোখে দেখেছিলাম…’, ‘তোমার চোখে দেখেছিলাম …’
তোমার চোখে! আশ্চর্য, এই কথাটা তার আগে মনে হয়নি কেন ?
‘তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ। এটুকুও ভুলে গেলি না কি?’ ওদিকে অধৈর্য দিশা তাড়া দিচ্ছে, ‘কাল কী করবি, বললি না?’
‘কালকে অবশ্যই তোর ফ্ল্যাটে সেলিব্রেশন হবে।’ অঙ্কুশ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল, ‘এখন দাঁড়া, একটা জিনিস ট্রাই করে দেখতে হবে !
বলেই সে ল্যাপটপের ওপর ঝুঁকে পড়ল।
আবাসনটা একদমই সাদামাটা। সিঁড়ি অপ্রশস্ত, আলোও স্নান। দু’জনে পরপর উঠছে। আগে দিশা, পেছনে অঙ্কুশ। দিশার হাতে খাবারের প্যাকেট, অঙ্কুশের হাতে একটা ওয়াইন-এর বোতল।
দাঁড়াল। দু’জনের মনেই উত্তেজনার বুদবুদ, তবুও ল্যান্ডিং-এ পৌঁছে দিশা একটু থমকে
‘আননোন ক্রিমিনাল নিয়ে লেটেস্ট আপডেট-টা শুনেছিস?’
‘না তো৷ কী?’
‘অজয় রানাডে, হিউ ওয়ালেস আর রঙ্গরাজ রেড্ডি সেই যে, যে তিনজন আননোন ক্রিমিনাল-কে নিয়ে গবেষণা করতে-করতে নিজেরাই রেপ করে বসেছিল।’দিশা ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছেছে, ‘সাইকিয়াট্রিস্ট-রা জানিয়েছেন, তিনজনেই সম্পূর্ণ সুস্থ। প্রত্যেকের শুধু একটাই জেদ—সে-ই আননোন ক্রিমিনাল! সাইকিয়াট্রিস্টদের রিপোর্টগুলো তোকে পাঠাব কি?
অঙ্কুশ কোনও আগ্রহ দেখাল না।
‘দরকার নেই।’—সে নিচু গলায় বলল, ‘আননোন ক্রিমিনাল-এর ফাইলটাই ডিলিট করে দিয়েছি। ওটারও আর দরকার নেই।
দিশা ঝটিতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ‘ফাইলটাই ডিলিট করে দিয়েছিস মানে ? কিন্তু কেন ? ”
‘কারণ আননোন ক্রিমিনাল আসলে কে, সেটা এখন আমি জানি।”
‘তুই জানিস?” দিশার দৃষ্টিতে একইসঙ্গে বিস্ময় আর অবিশ্বাস, ‘কে সে?’
রাখবি? ‘বলছি।’ অঙ্কুশ সামান্য হাসল, ‘কিন্তু তুই কি সারা রাত বাইরেই দাঁড় করিয়ে
‘ও, হ্যাঁ!’
করছে। লজ্জিত দিশা ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার দিকে ফিরেছে। ব্যাগ থেকে ল্যাচ কি বার
পেছন থেকে লোলুপ দৃষ্টিতে তার শরীরটা দেখতে-দেখতে অঙ্কুশ নিজের ট্রাউজার্সের পকেটে হাত ঢোকাল। হ্যাঁ, ট্যাবলেট-এর পাতাটা ঠিকঠাক আছে। দিশার নজর এড়িয়ে ওর ওয়াইন গ্লাসে কয়েকটা মেশাতে পারলেই…
আসলে গতকাল লাইনটা বলতে গিয়েই অঙ্কুশ বুঝতে পারে, রহস্যের সমাধান সূত্র কোথায়। ওই ভিডিও ক্লিপের মেয়েটার ছবি অনেকটা বড় করতে পারলে তবেই অজ্ঞাত অপরাধীর মুখ দেখা যাবে। দেখা যাবে মেয়েটার চোখের তারায় তার প্রতিবিম্ব থেকে!
কাল অক্লান্ত পরিশ্রম আর পেশাদারি দক্ষতায় ওই ভিডিও ক্লিপের প্রতিটি সেকেন্ডের ভগ্নাংশের ফ্রেম স্থির করার পর সে বড় করে দেখেছে। চেষ্টার ফসল ফলেছে রাত বারোটায়। একটা ফ্রেমে মেয়েটার চোখে অপরাধীর মুখের প্রতিফলন ধরা পড়েছে। এবং সেই মুখ অঙ্কুশের নিজের !
এখন অঙ্কুশ নিশ্চিত জানে, রানাড়ে, হিউ আর রঙ্গরাজ-ও একই উপায়ে সফল হয়েছিল। মেয়েটার চোখের তারায় তারা প্রত্যেকেই দেখেছিল নিজের-নিজের মুখ। জেনেছিল, সে নিজেই অজ্ঞাত অপরাধী। এবং তৎক্ষণাৎ বুঝতে পেরেছিল, সেই মুহূর্তে তার কী করণীয়। এখন যেমন অঙ্কুশও বুঝতে পেরেছে। করতে হবে ওই কাজটাই। ওই অপরাধটাই।
অপরাধ? না, অপরাধ নয়। ‘ওটা অধিকার! পুরুষের স্বাভাবিক অধিকার!
অঙ্কুশ এখন এ-ও জানে, ভিডিও ক্লিপের প্রেরক কেন ধরা পড়েনি। আসলে এ ভিডিও কোনও মানুষের তোলা বা পাঠানো নয়। এ ভিডিও পাঠিয়েছেন মানুষের থেকে অনেক বড় একজন। সেই ইঙ্গিতে পুরুষকে বার্তা দিয়েছেন—সে যেন নিজের অধিকার অবিলম্বে বুঝে নেয়৷
হ্যাঁ, নারী-শরীর সম্ভোগ পুরুষের স্বাভাবিক অধিকার! আর মাদক প্রয়োগে যদি চূর্ণ করে দেওয়া যায় নারীর প্রতিরোধ, তাহলে উপভোগের মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণ! দরজা খুলে গেছে। দিশা পা রেখেছে ফ্ল্যাটের ভেতর। ‘চলে আয়।’ দিশা ডাকে।
অঙ্কুশের মুখে একটা ধূর্ত হাসি ফুটে ওঠে। তারপর ধীর পায়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয় সে।
