সলিলসমাধি – সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়
মনে মনে আমি আশা করেছিলাম, রেস্তোরাটার ভেতরে দু’চারটে মড়ার খুলির মতো দেখতে লাইট-বাল্ব থাকবে, বা হয়তো কয়েকটা আস্ত কঙ্কাল দাঁড়িয়ে থাকবে অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য। কিন্তু ভেতরে এসে দেখি, ওসব কিছুই নেই। আর পাঁচটা রেস্তোরাঁর মতো নিতান্ত সাধারণ কাঠের টেবিল, কুশন দেওয়া চেয়ার, মাথার উপর থেকে ঝুলে থাকা হলদে আলো, আর অদেখা স্পিকারে চলতে থাকা হালকা রোমান্টিক মিউজিক। ভেতরে ঢোকার সময় যে ঘোলাটে কাচের দরজা ঠেলে ঢুকেছিলাম, তার উপর খুব সুন্দর করে নাম লেখা ছিল ‘অস্তরাগ’, আর নামের উপর আঁকা ছিল একটা সমুদ্রে ডুবন্ত সূর্যের ছবি। আর যাই হোক, এটাকে ‘অদ্ভুত’ বলা যায় না।
কিন্তু এই রেস্তোরাঁ যে বিশেষ ব্যাপারটির জন্য বিখ্যাত, তার কিছু লক্ষণ তো
থাকবে!
গৌতম বলল, ‘কী বুঝছ, মায়া? আমরা যেমনটি ভেবে এসেছিলাম, তেমনটি আদৌ নয় দেখছি যে।”
আমি বললাম, ‘দশম অ্যানিভার্সারির অ্যাডভেঞ্চারটা নিতান্তই পানসে হয়ে গেল গো৷ দাঁড়াও, ওই যে ওয়েটার আসছে। ওকে একবার জিগ্যেস করো।’
যে ছেলেটা একটা খয়েরি রঙের লেদারে বাঁধাই করা মেনুবইটা নিয়ে এল, তাকে দেখেই আমার মনে পড়ে গেল সুতনুর কথা। তার পরিষ্কার করে দাড়ি-কামানো সুন্দর গাল আর চৌকো চোয়ালটার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়েই আমি অস্বস্তিভরে চোখ সরিয়ে নিলাম।
না, এই মুহূর্তে আমি কিছুতেই সুতনুর কথা ভাবব না, কিছুতেই না। আমার স্বামীর সঙ্গে অ্যানিভার্সারি ডিনার আর একটা সম্ভাব্য অ্যাডভেঞ্চার করতে এসেছি, তার বাইরে কিছুতেই অন্য কথা মনে আনব না। আমি জানি, আমরা নিজেরা শেষবারের মতো চেষ্টা না করলে এই সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাবে।
ওয়েটার আমাদের টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে খুব ভদ্রভাবে বলল, ‘ম্যাম, স্যার, আপনারা কি ডিনারের শেষে আমাদের স্পেশাল সুইট ডিশ ট্রাই করতে চান ? ‘ গৌতম আমার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্তের হাসি হাসল, তারপর ওয়েটারকে বলল, ‘সুইট ডিশের লোভেই তো এসেছি এখানে।”
ওয়েটার জানতে চাইল, ‘আপনাদের কি কোনও রেকমেন্ডেশন আছে?’
গৌতম একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আমাদের ম্যারেজ কাউন্সেলার ডক্টর এন সরকার সাজেস্ট করেছিলেন, একসঙ্গে আপনাদের এখানকার একটা অ্যাডভেঞ্চার করতে।’ ‘আচ্ছা, ডক্টর সরকার!’ ওয়েটার একটু হাসল। ‘হ্যাঁ, আমাদের অনেক কাস্টমারই তাঁর রেকমেন্ডেশন নিয়ে এসেছেন এখানে। আশা করি, শেষের স্পেশাল সুইট ডিশটা আপনাদেরও ভালো লাগবে।’
গৌতম আমাকে বলল, ‘তুমিই মেন কোর্সটা বলে দাও, মায়া। তারপর দু’জনে
মিলে ডেজার্টটা ঠিক করব।’
লোকটার দিকে তাকিয়ে আবার আমার সুতনুর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল—অফিসের বন্ধ দরজার পেছনে ওর নগ্ন, ঘামজড়ানো শরীরটা আমার শরীরের ওপর… দুচ্ছাই! আবার ওসব ভাবছি।
মাথা নিচু করে আমি মেনুবইটা তুলে নিয়ে ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান অর্ডার করে দিলাম। গৌতম তখন ওয়েটারকে বলছে, ‘আজ আমাদের টেনথ অ্যানিভার্সারি। আপনিই বলুন না, শেষপাতে আপনাদের কোন ‘ডেডলি ডিশ’ আমাদের জন্য ভালো হবে।’
ওয়েটার সঙ্গে সঙ্গে কেজো স্বরে বলতে শুরু করল, ‘নতুন বিয়ে করা কাপল বা আপনাদের মতো অ্যানিভার্সারি সেলিব্রেট করা কাপল-সবাই আমাদের মেনু-শেষের স্পেশাল ডেডলি ডিশগুলো টেস্ট করার জন্যই বেশি করে এখানে আসে। মাঝেমধ্যে ডক্টর সরকারের মতো অভিজ্ঞ কাউন্সেলাররাও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার বন্ড দৃঢ় করার জন্য একসঙ্গে এই অ্যাডভেঞ্চার করার উপদেশ দেন। আমাদের এখানে আপনি অনেক রকমের ‘সুইট ডেথ’ পাবেন, স্যার। ইলেকট্রিক চেয়ার, খুঁটিতে বেঁধে জ্যান্ত পোড়ানো, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছুরি-তরোয়াল-বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে মারা, মাথায় গুলি করা-যা চাইবেন। তার দিকে না তাকিয়েই আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি তাহলে কোনটা রেকমেন্ড জন্য?’
করছেন আমাদের
মেনুবইতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে বলল, ‘মেন কোর্সের শেষে একবার সলিলসমাধি ট্রাই করে দেখতে পারেন। ইলেকট্রিক চেয়ারের মতো খুব এক্সপেন্সিভ নয়, তাও কাস্টমাররা পুরোপুরি স্যাটিসফায়েড হয়েছেন এর আগে। আর একটা কথা ম্যাম, এই মুহূর্তে আমাদের সুইট ডেথ-এর মেনু আইটেম বাড়াচ্ছি আমরা। পরে কখনও এলে একবার আইফেল টাওয়ার থেকে নীচে পড়ে মরার এক্সপেরিয়েন্সটাও নিয়ে যাবেন।” গৌতম আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী বলো, ডার্লিং? সলিলসমাধি চলবে?”
‘চলুক।’
ওয়েটার বলল, “দারুণ চয়েস, ম্যাম। আপনাদের মেন কোর্স এসে পড়বে এখুনি। খাওয়া শেষ হলে পাশের ঘরে নিয়ে যাব আপনাদের। আর হ্যাঁ, কাইন্ডলি এই কাগজগুলোয় দু’জনেই সই করে দেবেন।
বেশ কয়েকটা লম্বাটে আকারের গোলাপি রঙের কাগজ আর একটা কলম বার
করে সে আমাদের সামনে টেবিলের উপর রাখল। গৌতম বলল, ‘এগুলো কী? ‘ ‘কিছু দরকারি পেপারওয়ার্ক রাখতে হয় আমাদের, স্যার। সব কাস্টমারই ডেথ ডিশ টেস্ট করার আগে এগুলোতে সই করেন। এতে সই করছেন মানে আপনি আমাদের লিগ্যাল পারমিশন দিচ্ছেন যে আমরা আপনাদের উপর ওই প্রসিডিওর চালাতে পারি।’
তার শেষ কথাটা আমাদের দু’জনের কানেই বড় বেসুরো শোনাল। কেমন যেন গা-ছমছম করে উঠল। আমরা এদের আইনি অনুমতি দিয়ে দিচ্ছি আমাদের উপর প্রায় যা খুশি তাই করার জন্য?
আমি দেখতে পাচ্ছি, গোলাপি কাগজে ‘সাইন হিয়ার’ লেখা বক্সটার উপর
গৌতমের কলমধরা হাত থমকে আছে। আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল সে। আমি তাকে আশ্বাস দিতে বললাম, ‘কেন টেনশন করছ? আমরা তো মৃত্যুর এক্সপেরিয়েন্স টেস্ট করতেই এসেছি এখানে। সই করে দাও; মরার চেয়ে খারাপ কী আর হবে?’ ওয়েটার একগাল হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দ্যাটস দ্য স্পিরিট, ম্যাম।’ অমনি আমার আবার সুতনুর কথা মনে পড়ে গেল। ওঃ, অসহ্য।
যত ভাবি ওর ওই সুঠাম শরীর আর দুষ্টুমি-মাখা আকর্ষণীয় হাসিটার কথা ভাবব না, ততই হতচ্ছাড়া ফিরে ফিরে আসে আমার মনে। আজ আর কারও কথা মনে করতে চাই না আমি। আজকের রাতটা শুধু আমার আর আমার স্বামীর কথা ভাবব। আমি নিজেও কি বেরোতে চাই না ওই চক্কর থেকে? একবার যে ভুল করে ফেলেছি, একবার যেটাকে ‘ভুল’ বলে বুঝতে পেরেছি, আবার কেন তার কথা ভেবে মরছি?
সই করা শেষ করে গৌতম বলল, ‘আচ্ছা, পুরো ব্যাপারটা সেফ তো?’ ওয়েটার বলল, ‘মৃত্যু কি কখনও সেফ হতে পারে, স্যার? বরং তার উলটোটাই তো স্বাভাবিক, তাই নয় কি? মৃত্যুর অভিজ্ঞতা মানুষকে বদলে দেয়।’ আমি বললাম, ‘কী বলতে চাইছেন আপনি ?
একটু হেসে লোকটা বলল, ‘মৃত্যু কাছে এলে আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি, জানেন তো? মরার আগে মানুষ এমন অনেক কিছু ভাবে, যেসব কথা সে জন্মেও ভাবেনি। তাই মরণের মুখ থেকে যারা ফিরে আসে, তারা অনেক ম্যাচিওর্ড হয়ে ফেরে।… আর একটা রিকোয়েস্ট, যখন আপনারা ফিরবেন, তখন যদি সম্ভব হয়, তাহলে এই রেটিং ফর্মটা ফিল-আপ করে দেবেন কাইন্ডলি। জানেন তো, আমরা ফাইভ-স্টারের কম রেটিং কখনও পাইনি।’
গৌতম ভ্রু তুলে বলল, ‘তা কী করে সম্ভব? কাস্টমারদের রেটিং ম্যানিপুলেট করেন নাকি আপনারা?”
‘না, স্যার। সকলেই স্বেচ্ছায় ফাইভ-স্টার দিয়ে যান আমাদের। আশা করি, আপনারাও দেবেন।
‘এই যে, আপনাদের মেন কোর্স এসে গেছে। খাওয়া হলে আমাদের সলিলসমাধি ডিপার্টমেন্টে নিয়ে যাব আপনাদের। হ্যাপি অ্যানিভার্সারি।
আরও দু’জন ওয়েটার তখন আমাদের খাবারগুলো এনে সাজিয়ে দিচ্ছে টেবিলে৷ হাতের কাগজগুলো গুছিয়ে নিয়ে ওই লোকটা ভেতরে চলে গেল।
আমাদের খাওয়া শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট পরে ফিরে এল সে; গৌতমের পাশে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘কীভাবে পেমেন্ট করবেন, স্যার?’
গৌতম আমার দিকে ফিরে এক চোখ টিপে বলল, ‘ক্রেডিট কার্ডেই করা যাক, কী বলো? সত্যি সত্যি যদি জলে ডুবে মরেই যাই, তাহলে ও-টাকা আর মেটাতে হবে না।’
বুঝতে পারছি, খুব নার্ভাস হয়ে গেছে ও। সহানুভূতির সঙ্গে একটু হেসে বললাম, ‘বেশ তো। ক্রেডিট কার্ডেই করে দাও।’
বিল মেটানোর পর ওয়েটার আমাদের আরেকটা ভারী, ঘোলাটে কাচের দরজা ঠেলে একটা বিরাট ঘরে নিয়ে গেল। ঢোকার আগে দেখলাম, ঘরের দরজায় লেখা মোটা মোটা নীল অক্ষরে লেখা আছে, ‘সলিলসমাধি কেন্দ্র’।
আগে আমিই ঢুকলাম, আমার পেছনে গৌতম। ঢুকে দেখি, ঘরের একদিকে বিরাট দানবাকার ধূসর রঙের কফিনের মতো বেশ কয়েকটা বাক্স রাখা আছে, আর তাদের ঢাকনার উপর হলদে রঙের ছোট ছোট আলো মিটমিট করছে। সাদাটে দেওয়াল থেকে কালো কালো পাইপ বেরিয়ে এসে জুড়ে গেছে বাক্সগুলোর গায়ে। সাদা ল্যাবকোট পরা রোগামতো এক ভদ্রলোক আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন।
লোকটির মুখে সরু গোঁফ, মাথায় টাক, আর মুখে হাসি। ওয়েটারের কাছ থেকে সই করা গোলাপি কাগজগুলো নিয়ে তিনি আমাদের দিকে ফিরে একগাল হাসলেন। ‘সলিলসমাধি কেন্দ্রে আপনাদের স্বাগত, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস সাঁতরা। আমাকে আপনারা ‘শেফ’ বলে ডাকতে পারেন, কারণ এখন জলে ডুবে মরার যে অপূর্ব সুইট এক্সপেরিয়েন্সটি আপনারা টেস্ট করতে চলেছেন, আমিই সেটির কারিগর।
তিনি আবার হাসলেন, কিন্তু আমরা হাসলাম না৷
ঘরটা ভীষণ ঠান্ডা। সব কিছু দেখে শুনে ভয় যে লাগছে, তা আর নিজের কাছে অস্বীকার করি কী করে?
শেফ ল্যাভেন্ডার পারফিউম মেখেছেন, তার গন্ধ আসছে নাকে। আর তার সঙ্গে পাচ্ছি গৌতমের গায়ের ঘামের গন্ধ। চারপাশটা ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। সাদা দেওয়ালের একদিকে বিরাট বড় একটা আয়না; তাতে দেখতে পাচ্ছি, গৌতম মুখে একটা বাহাদুরি হাসি রাখার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু ওর হাত কাঁপছে। শেফের পেছনে ঘরের এক কোণে একটা কন্ট্রোল প্যানেল আছে, তাতে একগাদা সুইচ, লিভার আর নানা রঙের আলো চিকমিক করছে। আমাদের মরণ-কফিনগুলো বোধহয় ওখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করবেন উনি।
আবার চোখ চলে গেল বিরাট বাক্সগুলোর দিকে। অমনি বুকের মধ্যে প্রবল ধড়ফড়ানি শুরু হল। এই ঘরে ঢোকার পর থেকেই আমার মন বলছে, আমরা বোধহয় খুব ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চলেছি। ধূসর কফিনগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে, ওরা যেন অন্য কোনও গ্রহ থেকে আসা হিংস্র প্রাণীর দল। ভুল করে কেউ কাছে গেলেই তাকে ‘খপ্’ করে গিলে নেবে। বাক্সগুলোর উপরে একটা কার্টুন চরিত্রের ছবি বাঁধানো আছে—বোধহয় ঘরের এই থমথমে পরিবেশটাকে একটু হালকা করার জন্য।
ছবির লোকটা জলে ডুবে যাচ্ছে, তার হাঁ করা মুখটা আধখানা জেগে আছে জলের উপরে, আর কমিক্সের ওয়ার্ড-বেলুনের মতো একটা ‘লেখা বেরিয়ে আসছে তার মুখ থেকে—‘গব-গব-গব।’ কার্টুনটা দেখে হাসি তো পেলই না, বরং ভয়ে আর বিরক্তিতে গা-টা গুলিয়ে উঠল।
যখনই সবাই চুপচাপ হয়ে যাচ্ছি, তখনই ঘরের নীরবতাটা আরও অসহ্য হয়ে উঠছে। বাইরের কোনও শব্দও আসছে না এ ঘরে।
গৌতমের মুখ দেখে বুঝতে পারছি, ঘরের এই চূড়ান্ত নিস্তব্ধতার মধ্যে যে অনুচ্চারিত আতঙ্ক লুকিয়ে আছে, ও সেটা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। ওর হাত ভীষণ কাঁপছে। দেখতে পেয়ে শেফ এগিয়ে এলেন। ‘ভয় করছে নাকি, মিস্টার সাঁতরা?” হিরো সাজতে চাইল ও, যদিও পারল না। বোকার মতো একটা হাসি হেসে বলল, ‘নাঃ, ভয় করবে কেন? ডেঞ্জার ইজ মাই মিডল নেম।’ শেফ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমার মুখেও বোধহয় ওই একই
রকমের একটা ক্যাবলামার্কা হাসি ফুটে উঠল। আমি বললাম, ‘আমার অবশ্য কোনও মিডল নেম নেই। কিন্তু কেমন যেন একটা মনে হচ্ছে।’
একটু কৌতূহল নিয়ে শেফ বললেন, ‘কেমন মনে হচ্ছে?’
‘জানি না৷ ঠিক বোঝাতে পারছি না। কেমন একটা…’
‘অস্বস্তি? ’
‘হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন।
শেফ হাত তুলে আমাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন। ‘কোনও চিন্তা নেই, মিসেস সাঁতরা। জলে ডোবার সময় আপনারা যা যা এক্সপেরিয়েন্স করবেন, সব কিছুর উপর আমি খুঁটিয়ে নজর রাখব। মৃত্যুর মতো চূড়ান্ত থ্রিলিং ব্যাপার আর কীই বা আছে বলুন তো? ভয় করছে, বুঝতে পারছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনারা আসলে অসম্ভব সাহসী বলেই এই ডিশের স্বাদ নিতে এসে হাজির হয়েছেন।’
বাক্সগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে গৌতম বলল, “পুরো ব্যাপারটা আলটিমেটলি নিরাপদ তো?”
কথাটা শুনে শেফের মুখটা হঠাৎ ভাবলেশহীন হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তিনি বললেন, ‘যারা স্কাই-ডাইভিং করার জন্য আকাশ থেকে ঝাঁপ দেয়, বা যারা সমুদ্রের গভীরে অভিযান করে, তারা সবাই জানে, তেমন বিপদ ঘটলে আর ফিরে না আসার সম্ভাবনা থেকেই যায়।…মৃত্যু একটা অ্যাডভেঞ্চার, মিস্টার সাঁতরা। তার নিজস্ব একটা সৌন্দর্য আছে। প্রশ্ন যত কম করবেন, সেই সৌন্দর্য তত বেশি উপভোগ করতে পারবেন। যদি সত্যি সত্যি তা করার সাহস থাকে, তাহলে যান, ওই সলিলসমাধির বাক্সের মধ্যে শুয়ে পড়ুন, নিজের মুখের উপর ঢাকনাটা বন্ধ হয়ে যেতে দেখুন। কী চান বলুন? যাবেন, না আমি টাকা রিফান্ড করে দেব?”
গৌতম আর ‘না’ বলতে পারল না। মিনমিন করে বলল, “যাব, শেফ।’ ‘আর আপনি, মিসেস সাঁতরা। তৈরি?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম আমি৷
‘অতি উত্তম। প্রসিডিওর শুরু করার আগে আপনাদের পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। মৃত্যুর আগে দু’জন দু’জনকে যা বলতে চান, বলে নিন।
ঘোলাটে কাচের দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে শেফ একটা শয়তানি হাসি হেসে আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন।
গৌতমের মুখের দিকে তাকালাম আমি। ভাবলাম, আচ্ছা, মরার আগে একটা মানুষের মাথায় শেষ কী চিন্তা আসে ?
এর উত্তর আমি জানি না। কিন্তু সম্ভাব্য এই শেষবার দু’জনের একান্তে কাটানোর
মুহূর্তে আমার মনে পড়তে লাগল আমাদের ঝগড়াগুলোর কথা। হাতের সামনে যা পেয়েছি, একসময় রাগের মাথায় সব ছুড়েছি পরস্পরের দিকে—হ্যান্ডব্যাগ, রিমোট, ওষুধের শিশি, এমনকী জুতোও। পরস্পরকে এমন জঘন্য ভাষায় গালাগাল দিয়েছি, যে ভাষায় কথা বলার কথা সুস্থ মস্তিষ্কে ভাবতেই পারি না। তারপর নিজেদের রাগারাগির উপর নিজেরাই বিরক্ত হয়ে একসময় রুটিন সেক্স করেছি বিছানায়, আর ঘুমিয়ে পড়েছি মড়ার মতো।
এর পাশাপাশি মনে পড়তে লাগল, কেমন সুন্দর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পরস্পরের কাঁধ জড়িয়ে ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুকে ছবি দিয়েছি দু’জনের। দুনিয়াসুদ্ধ লোককে দেখাতে চেয়েছি, ‘দেখো সবাই, আমরা কত ভালো আছি।’
চুপ করে তাকিয়ে আছি ওর দিকে, কিন্তু আরেকটা ভাবনা বারবার ফিরে আসছে মাথার মধ্যে। আমার অফিসের বস সুতনুর সঙ্গে সেই তীব্র আদরের মুহূর্তগুলো—অফিস টেবিলে যা কিছু ছিল, ন্যাতা দিয়ে মোছার মতো এক ধাক্কায় সব জিনিস মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দিয়ে সেই উদ্দাম সোহাগ। আর গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময়কার সেই সুনামির ঢেউয়ের মতো আকাশচুম্বী অপরাধবোধ। সব মনে পড়ে যাচ্ছে আমার এই শেষ বিদায়ের সময়, কিন্তু তবু এত যন্ত্রণা, এত আত্মধিক্কার, এত গোপন অশান্তির কথা এই লোকটাকে বলতে পারছি না—এই লোকটাকে, যে আমার গত দশ বছরের ‘জীবনসঙ্গী’ হয়ে আছে।
ওর হাতটা ধরলাম আমি, চোখের দিকে তাকালাম, তারপর এমন একটা কথা বললাম, যেটা সত্যি কিনা আমি নিজেই জানি না৷
“খুব ভালোবাসি তোমাকে, গৌতম।’
গৌতম ঢোঁক গিলল। মনে হল যেন একদলা আবেগকে জোর করে গিলে নিল ও। তারপর বলল, ‘আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি গো।’
আমি। ‘হ্যাপি অ্যানিভার্সারি।’ ‘হ্যাপি’ শব্দটার উপর একটু জোর দিয়েই উচ্চারণ করলাম
ও যেন শুনতেই পেল না আমার কথাটা। ওর চোখ তখন স্থিরভাবে নিবদ্ধ হয়ে আছে ধূসর কফিনের সারি আর তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা মোটা মোটা অজগরের মতো কালো পাইপগুলোর দিকে। পাইপগুলোর দিকে আঙুল তুলে ও বলল, ‘ওই পাইপ দিয়েই এরা বাক্সে জল ভরে মানুষগুলোকে ডুবিয়ে মারে।’
ব্যাপারটা নিতান্তই সহজবোধ্য, তবু ওর চোখে-মুখে প্রবল ভয়ের ছাপ চিনে নিতে আমার ভুল হল না। বললাম, ‘গৌতম, চলো ফিরে যাই। এসব ফালতু এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে দরকার নেই আমাদের। বাড়ি ফিরে চলো।’
নিজেকে সামলে নিয়ে গৌতম বলল, ‘বাড়ি? বাড়িতে আছেটা কী, মায়া? সেখানে তো শুধুই…! নাঃ, এই ভালো হবে। এই অ্যাডভেঞ্চারটা আমরা গত ক’দিন ধরেই প্ল্যান করছিলাম না? তাছাড়া…’ বলে হঠাৎ করে চুপ করে গেল ও। ‘তাছাড়া কী?’
কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে ও বলল, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ কিছুদিন ধরে জানতে চাইছিলাম, মৃত্যু ঠিক কেমন করে আসে।’
‘সে-কথা আমি তোমাকে বলতে পারব না; তাই প্লিজ জানতে চেয়ো না।’ সরাসরি তাকালাম ওর চোখের দিকে। ও চোখ সরিয়ে নিল।
শেফ এসে আবার ঢুকলেন ঘরে। ‘কী, সবাই রেডি তো? এবার তাহলে আপনাদের জন্য সলিলসমাধির ডিশ সার্ভ করি?’
গৌতম বলল, ‘কীভাবে করবেন? ঐ বাক্সে ভরে আমাদের ইঁদুরের মতো ডুবিয়ে মারবেন?’
শেফ তখন ঘরের ডানদিকের কোণে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে কীসব করছিলেন। আয়নার মধ্য দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ইঁদুরের মতো? না মিস্টার সাঁতরা, ইঁদুরদের ‘বিবেকবোধ’ বলে কিছু থাকে না; ওদের কাছে জীবনের কোনও অর্থ নেই। কিন্তু আমরা মানুষেরা তো এই জীবনটাতে অনেক কিছু করি—তার মধ্যে কিছু ভালো, কিছু খারাপ। মৃত্যু আপনার সেইসব কাজের বহু স্মৃতি কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ফিরিয়ে আনে৷
‘জলে ডুবে মরাটা আমার কাছে বেশ দার্শনিক গোছের একটা মৃত্যু মনে হয়। যখন ডুবতে থাকবেন, তখন দেখবেন, ভয় আসবে, ভীষণ অসহায় মনে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে একটা অদ্ভুত সুখও আসবে। যাই হোক, আমি আগে থেকেই সব জানিয়ে দিয়ে আপনাদের মজাটা মাটি করতে চাই না। যান, এইসব জামাকাপড় ছেড়ে এই সাদা ট্র্যাকসুট পরে নিন দু’জনেই। ভেতরে কোনও আন্ডারওয়্যার রাখবেন না। ওই কালো পর্দার পেছনে গিয়ে চেঞ্জ করে নিতে পারেন।’
এক এক করে পর্দার আড়ালে গিয়ে আমরা নতুন পোশাক পরে এলাম। কী জানি কেন, একসঙ্গে এ কাজ করতে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। অথচ আমার নগ্ন শরীরটা কি আমার স্বামী এই দশ বছরের বিবাহিত জীবনে অসংখ্যবার দেখেনি? এ কি শুধুই আমার মৃত্যুভয়ের কারণে? নাকি অন্য কিছু?
নিজেকেও যেন আর চিনে উঠতে পারছি না আমি।
চামড়ার সঙ্গে সেঁটে থাকা সাদা স্লিভলেস ড্রেসটায় আমাকে মন্দ লাগছে না অবশ্য। দেওয়ালে আটকানো ছ’ফুটেরও বেশি বড় আয়নাটায় নিজেকে দেখছিলাম আমি। হুম, পেটের মেদটা আরেকটু কম হলে ভালো হতো, কিন্তু আজ যদি মরেই যাই, তাহলে ওতে আর কী এসে যায়?
বিচিত্র ভাবনাটা মাথায় আসতেই একটা হাসি খেলে গেল আমার ঠোঁটে। গৌতম সেটা দেখল, কিন্তু কিছু জানতে চাইল না৷
কন্ট্রোল প্যানেলে শেফ একটা সুইচ টিপতেই আমাদের কফিন দুটোর ঢাকনা উপর দিকে খুলে গিয়ে হাঁ করল দুটো অজগরের মতো৷ আমাদের দিকে তাকিয়ে সেদিকে ইশারা করে তিনি বললেন, ‘যান, ঢুকে পড়ুন। আপনাদের সলিলসমাধি শুভ হোক।’
আমিই আগে গিয়ে বামদিকের বাক্সটা বাছলাম, তারপর গৌতম এসে ডানদিকেরটার সামনে দাঁড়াল। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম কফিনের হাঁ করা মুখটার সামনে দাঁড়িয়ে
‘কেন ?’
ওর মুখ শুকিয়ে গেছে। শেফ বললেন, ‘সাহস রাখুন, মিস্টার সাঁতরা। মৃত্যুকে উপভোগ করুন।’
আর কিছু না বলে বাক্সটার মধ্যে ঢুকে পড়ল ও। ভেতরে একটা ধূসর রঙের ধাতুর পাত দিয়ে তৈরি শোওয়ার জায়গা করা ছিল। ও গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ল— বুকের উপর দু’হাত জড়ো, চোখ বন্ধ। যখন ওর মুখের উপর ঢাকনাটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন দৃশ্যটা দেখে আমার একবার মনে হল, যেন কাউন্ট ড্রাকুলা তার কফিনের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে।
এবার আমার পালা। মুখে সেই অদ্ভুত হাসিটা নিয়ে আমাকে বুড়ো আঙুল দেখালেন শেফ। নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কফিনের ভেতরের অন্ধকার হাঁ-এর মধ্যে এসে ঢুকলাম আমি; শুয়ে পড়লাম টানটান হয়ে। ধাতুর পাতটা গায়ের খোলা চামড়ায় লাগতেই শিউরে উঠলাম। কী ঠান্ডা! শেফ এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। ‘কেমন লাগছে, মিসেস সাঁতরা?’
‘খুব ঠান্ডা লাগছে।’
‘আরও লাগবে।’
বলে তিনি কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে ফিরে গিয়ে একটা সুইচ টিপলেন। কফিনের ঢাকনাটা অমনি আস্তে আস্তে আমার মুখের উপর বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। ছোট হয়ে আসা চৌকো আলোটার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রইলাম। আমার বয়স যখন সাত, তখন মায়ের সঙ্গে একবার সূর্যগ্রহণ দেখেছিলাম—সেই স্মৃতি মনে পড়ে গেল। চারপাশটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার হয়ে গেল।
সেই ঘন কালোর মধ্যে শুয়ে থাকতে থাকতে আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমার মাথায় এখন গৌতম বা সুতনু—কারও কথাই আসছে না; শুধু মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। ফার্ম থেকে যখন মা ফিরে আসত, তখন আমি তার গায়ে বুনো জামের গন্ধ পেতাম। সকালের ঝকঝকে সবুজ জঙ্গলের মধ্যে কেমন উজ্জ্বল ঝরণার ধারা পাহাড়ের গা বেয়ে নীচে নেমে আসে, আমাকে সেই গল্প বলত মা৷ এসব ভাবতে ভাবতেই অন্য আরেকটা বীভৎস স্মৃতি মনে পড়ে গেল, আর অমনি গা কেঁপে উঠল। সেই ভয়ংকর অ্যাক্সিডেন্টের পর মায়ের মৃতদেহ শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়— দৃশ্যটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।
কিন্তু এখন আমি এসব ভাবব না। কিছুতেই ভাবব না।
জোর করে মন থেকে সেই ভয়াবহ ঘটনার দৃশ্য সরিয়ে দিয়ে ছোটবেলার খুশিমাখা স্মৃতিগুলোর কথা ভাবতে লাগলাম। তারপর মনে হল, কোথায় যেন জল পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
প্রথমে ভাবলাম, ও আমার কল্পনা হবে। এতক্ষণ তো ঝরণার কথাই ভাবছিলাম। কিন্তু তারপর পায়ে ঠান্ডা জলের স্পর্শ লাগল। কল্পনা নয়, সত্যি সত্যি ! সঙ্গে সঙ্গে ওই উজ্জ্বল
স্মৃতিগুলো কোথায় যেন এক ফুঁয়ে মিলিয়ে গেল, আর তীব্র আতঙ্কে হাত-পা যেন পাথর হয়ে গেল। মনে হল, আমার চারপাশে অন্ধকারটা এত ঘন হয়ে এসেছে যে হাত বাড়ালেই সেটাকে ছোঁয়া যাবে।
হঠাৎ শেফের কণ্ঠস্বর বেজে উঠল কফিনের মধ্যে। ‘আপনি কি শেষবারের মতো আপনার স্বামীর হাত ধরতে চান, মিসেস সাঁতরা? ‘
দ্রুতগতিতে জল ভরিয়ে তুলছে এই বাক্সের ভেতরের সামান্য জায়গাটুকু। যা হোক কিছু একটা জিনিসকে আঁকড়ে ধরার ইচ্ছা জেগে উঠছে প্রবল ভাবে। আমি কাতরস্বরে বললাম, ‘হ্যাঁ, শেফ। আপনি তার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন, প্লিজ?’
চান? ‘
‘পারব। মিস্টার সাঁতরা, আপনিও কি মৃত্যুর আগে আপনার স্ত্রীর হাত ধরতে
আমাদের কফিন দুটোর মধ্যে বোধহয় শব্দ আদানপ্রদানের কোনও ব্যবস্থা আছে। গৌতমের মরিয়া আর্তি কানে এল আমার। ‘চাই! চাই ! চাই!’
শেফের কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ‘আপনার ডানদিকে দেখুন, মিস্টার সাঁতরা। একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি খুলে যাচ্ছে, ওর মধ্যে দিয়ে ডানহাতটা আপনি বাইরে বার করে দিতে পারেন। মিসেস সাঁতরা, একই কাজ আপনি করতে পারেন আপনার বামদিকে।
আমি দেখলাম, আমার শয্যার বামদিকের অন্ধকার দেওয়ালে একটা গোল গর্ত জেগে উঠছে, অপরিমেয় অন্ধকারের মধ্যে একটা আলোময় চোখ খুলে যাচ্ছে। সেই গর্ত দিয়ে বাম হাতটা কনুই পর্যন্ত গলিয়ে দিলাম; পরক্ষণেই গৌতমের ঘামে ভেজা, ঠান্ডা হাতটা আমার হাত স্পর্শ করল। দুটো মিলনোন্মুখ মাকড়সার দাঁড়ার মতো আমাদের আঙুলগুলো পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল।
কফিনের গায়ের গোল গর্তটা এবার বন্ধ হয়ে আসছে; আমাদের দু’জনের কনুই পর্যন্ত হাতদুটো রয়ে যাচ্ছে বাইরে। গর্তের পরিধি বরাবর একটা রাবারের মতো বস্তু লাগানো আছে, সেটার দৃঢ়ভাবে চেপে বসছে আমার বাহুতে। বুঝতে পারলাম, কফিনের ভেতরটাকে আবার ওয়াটার-টাইট করার জন্য এই ব্যবস্থা। গর্তটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার চারপাশ আবার সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল।
এখন চোখ খোলা রাখার সঙ্গে বন্ধ রাখার কোনও পার্থক্য আর বুঝতে পারছি না। তবু এই যে কফিনের বাইরে বেরিয়ে থাকা আমার হাত দিয়ে ওর হাতটাকে ধরে রেখেছি, এতেই একটু শান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে, বাইরের জীবন্ত পৃথিবীর সঙ্গে এইটুকু যোগসূত্র অন্তত এখনও রয়ে গেছে।
কফিনের ভেতরের স্পিকারে আবার বেজে উঠল শেফের কণ্ঠস্বর। ‘এখনও পর্যন্ত জল কেবল আপনাদের শরীরের নীচের দিকটুকুকেই স্পর্শ করেছে। এবার জলের লেভেল বাড়বে, আর আপনারাও ডুবে যাবেন।
পাইপগুলো দিয়ে কফিনের ভেতরে আবার জল পড়ার শব্দ শুরু হল। এবার যেন তার তীব্রতা আরও বেড়ে গেছে। আর সেই হিংস্র শব্দকে জলপ্রপাতের মিঠে শব্দ বলে ভ্রম হচ্ছে না, বরং মনে হচ্ছে হাজার হাজার সাপ যেন এই অন্ধকারে আমার শরীরের চারপাশে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে।
যে হাতটা এখনও বাইরে রয়ে গেছে, তাতে গৌতমের আঙুলের চাপ বাড়ছে; প্রবল আতঙ্কে অমানুষিক জোরে ও চেপে ধরতে চাইছে আমার হাতটাকে। কিন্তু আমি কীই বা করব? ওর মতো আমিও তো অসহায়, আমিও তো বন্দি! কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না এই ঘন অন্ধকারে, শুধু স্পষ্ট বুঝতে পারা • বাড়ছে।
তীব্র ভয়ে আমি হাঁ করে শ্বাস টানতেই মনে হল যেন জমাট, দলাপাকানো অন্ধকারটা ঢুকে পড়ল আমার শ্বাসনালীর মধ্যে। চারপাশে জল, তবু আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে৷ আমার খোলা ঘাড়ে, কাঁধে আমি ঠান্ডা জলের স্পর্শ পাচ্ছি। জল নড়ছে আমার চারপাশে, আমার অসহায়, অনড় শরীরটাকে চাটছে বুনো জন্তুর মতো। আমি মাথা তুলে বসতে গেলাম, কিন্তু কফিনের ভারী, ধাতব ঢাকনাটা ভীষণ নীচু—‘ঠকাং’ করে মাথা ঠুকে গেল আমার। জলে ডুবে যাচ্ছে আমার সারা দেহ; যতটা সম্ভব মাথা উঁচু করে মুখটাকে রাখতে চাইছি জলতলের উপরে; কিন্তু আমি জানি, এই যুদ্ধে জলই জিতবে—এখন না হলেও একটু পরেই।
আতঙ্কে আমার বুক প্রচণ্ড জোরে ধকধক করছে; কানের মধ্যে রক্তের স্পন্দন যেন একটানা ড্রাম বাজিয়ে যাচ্ছে। চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু পারলাম না। জলটা আমার উঁচিয়ে রাখা চিবুকের ঠিক নীচেই খলবল করছে। মৃত্যু আসছে, আমি বুঝতে পারছি। অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস নিচ্ছি আমি।
ভয়ানক মাথা ঘুরছে। জল উঠে এসেছে আমার কান অবধি। আমার গালগুলো অর্ধেকেরও বেশি ডুবে গেছে। শেষ মুহূর্তেও বাঁচতে চাওয়ার প্রবল প্রবৃত্তি আমাকে বলছে, শ্বাসনালীটাকে যেভাবেই হোক মুক্ত রাখতে হবে, ভেতরে জল যেতে দেওয়া চলবে না—দিলেই সর্বনাশ! তাই জলটা যখন আমার ঠোঁট পর্যন্ত উঠে এল, তখন আমি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে মুখটা বন্ধ করে নিলাম।
আবার শেফের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ‘আপনারা দু’জনেই এখন শ্বাস আটকে রাখার পর্যায়ে আছেন। একটা মানুষ ডুবে যাওয়ার শেষ কয়েক সেকেন্ড আগে এটা হয়। যে মুহূর্তে আপনারা মুখ খুলবেন, সেই মুহূর্তেই বন্যার মতো জল ঢুকে যাবে আপনাদের শরীরের ভেতরে। এই সুন্দর, শীতল জল গিয়ে ঢুকবে আপনাদের ফুসফুসে, আর অমনি আপনারা বুকে অসহ্য জ্বালা অনুভব করতে শুরু করবেন। কিন্তু চিন্তা নেই, আপনারা যখন মরবেন, তখন দেখবেন, কী দারুণ একটা শান্তি আপনাদের ঘিরে ধরবে। হয়তো কিছু হ্যালুসিনেশনও দেখতে পারেন সেই শেষ মুহূর্তে।’
আমার পুরো শরীরটা এবার ডুবে গেল। গৌতমও যে তার কফিনের মধ্যে অসহনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করছে, বুঝতে পারছিলাম। এই অন্তিম অবস্থাতেও—ওর খোলা হাতটা আমার হাতের মধ্যে ছিটকে ছিটকে উঠছিল।
বুকে কী বীভৎস চাপ লাগছে! মনে হচ্ছে যেন অস্থিপঞ্জর গুঁড়িয়ে যাবে। সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি আমি। আমার শরীর কফিনের মধ্যে ওই ধাতুর পাতটার উপর থরথর করে কাঁপছে। মরিয়া হয়ে অসহায় ভাবে কফিনের ভেতরের দেওয়ালে আমার ডানহাতের আঙুল দিয়ে খামচে দিতে লাগলাম, আঁচড়াতে লাগলাম, লাথি মারতে লাগলাম বোবা দেওয়ালগুলোর গায়ে।
অবশেষে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। মুখ খোলামাত্র প্রলয়বেগে জল এসে ঢুকে পড়ল আমার ভেতরে। আর আমি শ্বাস নিতে পারছি না—তীব্র আতঙ্কে আমার সারা দেহ অবশ হয়ে গেছে। এক মুহূর্তের মধ্যে জল আমার শরীরের ভেতরটাকে প্লাবিত করে ফেলল। এই কালো কফিনের পেটের মধ্যে আমি ছটফট করতে লাগলাম। বুকের মধ্যে মনে হল আগুন লেগে গেছে৷ এ কী ভয়াবহ দাহ, এ কী নরক যন্ত্ৰণা ! সেই
অবর্ণনীয় কষ্টে, আতঙ্কে আমি নিজের ডানহাত দিয়ে নিজেরই গলা টিপে ধরলাম। অসহায় মৃত্যুযন্ত্রণায় আমার শরীর কাটা ছাগলের মতো ছটকাতে লাগল। কফিনভরা জলের মধ্যে এলোমেলো পা ছুড়ে ছপছপ শব্দ করতে লাগল। কিন্তু এতক্ষণে যেন
আমি সত্যিটা উপলব্ধি করতে পারছিলাম—সব শেষ, আমি এবার মারা যাচ্ছি।
তারপর যন্ত্রণাটা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। শ্বাস নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় অবশভাবে হাঁ করে থাকা মুখ আর নাক দিয়ে আরও জল ঢুকতে শুরু করল ভেতরে। কখন যে আমি গৌতমের হাত ছেড়ে দিয়েছি, নাকি ও-ই আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে, আর কিছু বুঝতে পারলাম না৷
সেই প্রগাঢ়, জলমগ্ন অন্ধকারে শুয়ে রইলাম আমি একটা জলজ প্রাণীর মৃতদেহের মতো। আর সেই বিপুল অন্ধকার আর শীতল জলরাশির মধ্যে শায়িত অবস্থায় একটা উপলব্ধি জেগে উঠল মরণের ঠিক আগের মুহূর্তে। আমি বুঝতে পারলাম, সারা বিশ্বে মৃত্যুর চেয়ে ‘ব্যক্তিগত’ আর কিছু নেই, আর কিছু হতে পারে না। আমরা বাঁচার চেষ্টা করি একসঙ্গে; কিন্তু আমরা প্রত্যেকে মরি একা, একদম একা। মৃত্যুর যন্ত্রণা, মৃত্যুর আতঙ্ক—সব আমাদের একা ভোগ করতে হয়; হাজার হাত ধরলেও তার অপার্থিব তীব্রতা কমানোর কোনও উপায় নেই।
আমি এবার অলীক সব দৃশ্য দেখতে শুরু করলাম। দেখলাম, মায়ের দুটো সুন্দর চোখ যেন নেমে এসেছে আমাকে মৃতদের দেশে ডেকে নিয়ে যেতে। তারপর দেখলাম, সুতনু নগ্ন হয়ে বসে আছে অফিসের ডেস্কে, একটা আঙুল বাঁকিয়ে আমাকে কাছে ডাকছে। আমি তাকে চিৎকার করে বললাম, ‘তুমি গোল্লায় যাও, সুতনু। তোমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক নেই আমার। তুমি শুধুই আমার ক্ষণিকের উত্তেজনার করা ভুল মাত্ৰ !’
তারপর মনে হল, একবার গৌতমের গলাটা যেন শুনতে পেলাম চতুর্দিক ছেয়ে আসা কালোর মধ্যে। হয়তো এটাও আমার ওইসব অলীক হ্যালুসিনেশন। কণ্ঠস্বর যেন বুজে আসছে ওর; বদ্ধ উন্মাদের মতো জড়িয়ে জড়িয়ে ও বলছে, ‘আয়্যাম সরি, মায়া। সেদিন তোমার মাকে লিফট দেওয়া আমার উচিত হয়নি। চার পেগ খেয়েই আমি গাড়ি চালাতে বসেছিলাম; ওই ট্রাকটা যে আসছে, আমি দেখতেই পাইনি।’
তারপর হঠাৎ ওর কথা থেমে গেল। অনুমানে বুঝলাম, ও মারা গেল। মৃত্যু বোধহয় আসলে এমন একটা গভীর স্বপ্ন, যার মধ্যে গেলে আর ফিরে আসার ইচ্ছেই হয় না। আর আমার ভয় করছে না। বাকি যতটা সময় ধরে আমি মরলাম, ততক্ষণ একটা অদ্ভুত সুন্দর আরামদায়ক অন্ধকার আমাকে ঘিরে রইল।
তারপর আবিষ্কার করলাম, আমরা সত্যি সত্যি মরিনি।
আমার ধাঁধা-লাগা চোখের সামনে আবার যেন সূর্য উঠতে দেখলাম। তারপর বুঝতে পারলাম, আসলে কফিনের ধাতব ঢাকনাটা সরে যাচ্ছে, আর আমি আবার ঘরের আলো দেখতে পাচ্ছি। এতক্ষণ ওই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে থেকে এই আলোটা বড্ড বেশি চড়া লাগছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
তারপর শরীরে-মনে একটু সাড় ফেরার পর অবাক হয়ে অনুভব করলাম, আমার সারা দেহে তো একটুও জল নেই।
আমার সাদা, স্কিন-টাইট পোশাকটাও সম্পূর্ণ শুকনো; আমার চুলও তাই। গোটা শরীরের কোথাও এক ফোঁটা জল লেগে নেই। ব্যাপারটা কী হল?
পাশ ফিরে দেখলাম, সময়ের আগে গুটি কেটে বেরোনো পোকার মতো গৌতম
কফিন থেকে আধখানা বেরিয়ে এসে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। শেফ দাঁড়িয়ে আছেন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে। তাঁর মুখে চওড়া হাসি। ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস সাঁতরা, অস্তরাগ রেস্তোরাঁর ‘সলিলসমাধি’র ডেডলি সুইট ডিশ আপনাদের ভালো লেগেছে তো?’
আমার মাথার মধ্যে যে দুটো প্রশ্ন ঘুরছিল, গৌতম ঠিক সেই দুটোই করে বসল। ‘আমরা একটুও ভিজিনি কেন, শেফ? আর আমরা বাঁচলামই বা কী করে?’ দাঁত বার করে ‘হে-হে’ করে হাসলেন তিনি। ‘মরেননি, কারণ ওই বাক্সগুলোতে ‘জল’ জিনিসটাই ছিল না। আসুন, দেখাচ্ছি।”
একটা কফিনের সামনে এনে তিনি আমাদের দেখালেন, ধাতুর যে পাতটার উপর আমরা শুয়েছিলাম, তার মাথার দিক থেকে চুলের মতো অজস্র সরু সরু ইলেকট্রোড জাতীয় জিনিস বেরিয়ে এসেছে। তিনি বললেন, ‘এই শয্যায় আপনারা শুয়ে পড়ার পর আমি দূর থেকে এগুলোকে আপনাদের মাথায় লাগিয়ে দিয়েছিলাম। এগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে আপনারা বুঝতেও পারেননি। তারপর আপনারা যা-কিছু শুনেছেন এবং বুঝেছেন, সবই আসলে আপনাদের মস্তিষ্কে ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল পাঠিয়ে আপনাদের স্নায়ুতন্ত্রকে অনুভব করতে বাধ্য করা হয়েছে।
আমরা দু’জন দু’জনের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম।
শেফ মাথা নুইয়ে বললেন, ‘আপনাদের সেবা করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস সাঁতরা।’
দরজা খুলে দিলেন তিনি। পোশাক পরিবর্তন করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমরা দেখলাম, সেই চেনা ওয়েটার মেনুবই বগলে নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমাদের বেরিয়ে আসতে দেখে সে হাসল।
‘ গৌতমকে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার, আমাদের সুইট ডিশ আপনাদের ভালো লেগেছে তো?’
একটু শুকনো হাসি হেসে গৌতম একবার মাথা নাড়ল। ওয়েটার দুটো আকাশি নীল রঙের ফর্ম বার করে আমাদের হাতে দিল। ‘স্যার, ম্যাডাম, যদি একবার আপনাদের
অভিজ্ঞতার একটা রেটিং দিয়ে যান, খুব ভালো হয়।’
গৌতম আমার দিকে ফিরে জানতে চাইল, ‘কী বলো তুমি?’
আমি বললাম, ‘রেটিং দিয়ে দিতে আর অসুবিধা কী?’
ওয়েটার আমাদের দু’জনকে দুটো কলম ধরিয়ে দিল। টেবিলের উপর ঝুঁকে যখন রেটিং দিচ্ছি, তখন সে পাশ থেকে খুব নম্রভাবে বলল, ‘আপনারা যখন সলিলসমাধির বক্সের মধ্যে ছিলেন, তখন দু’জনেই দু’জনের উদ্দেশে কিছু কথা বলেছিলেন। আমাদের কাছে অডিও রেকর্ডিংগুলো আছে। যদি চান, একটা মেমোরি কার্ডে সেগুলো লোড করে
আমরা আপনাদের দিতে পারি। আমাদের কোনও কোনও কাস্টমার তাঁদের ‘মৃত্যু’র ঠিক আগের মুহূর্তের এইরকম অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কথাগুলো স্মৃতি হিসাবে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান৷ কেউ যদি না চান, তাহলে আমরা ওগুলো আর রাখি না, স্টোরেজ থেকে মুছে দিই।’
রেটিং ফর্মগুলোয় লিখতে লিখতে আমরা দু’জনেই একসঙ্গে থমকে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল সেই ঘনকৃষ্ণ অন্ধকার, সেই অসহায় ছটফটানি, আর যেসব কথা আমি ‘মৃত্যু’র আগের মুহূর্তে বলেছিলাম, আর ও আমাকে ওই সময় যে-কথাগুলো বলেছিল, সেই সব সদ্য-অতীত স্মৃতি। কেউ আমরা পরস্পরের দিকে তাকালাম না, কিন্তু আমি খুব দৃঢ়ভাবে দু’জনের হয়েই বললাম, ‘থ্যাংকস, কিন্তু ওগুলো আমাদের লাগবে না৷ কাইন্ডলি যদি ফাইলগুলো আপনাদের ডেটাবেস থেকে ডিলিট করে দেন, তাহলে আমরা খুশি হব।’
ওয়েটার মাথা নাড়ল। ‘তাই হবে, ম্যাডাম। ডক্টর সরকারকে আমাদের তরফ থেকে ধন্যবাদ জানাবেন কাইন্ডলি।’
আমি আর গৌতম দু’জনেই আমাদের ‘মৃত্যু’কে ফাইভ-স্টার রেটিং দিয়ে পরস্পরের হাত ধরে ঘোলাটে কাচের দরজা ঠেলে বাইরের উষ্ণ আকাশভরা তারার নীচে খোলা রাস্তায় পা রাখলাম। আমি জানতে চাইলাম, ‘কোথায় যাবে এখন? ’ ও আমার হাতে একটু চাপ দিয়ে বলল, “চলো বাড়ি যাই।’
