বৃহন্নলার বাঁশি – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী
সকালে কলেজে যাওয়ার পথে কুকুরটাকে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখে একটু সকালে কুলে আনিযাণের, মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু থায়ে থাকার ভঙ্গিটি কেমন একটু অস্বাভাবিক !
বিকেলে ফেরার পথে তখনও কুকুরটাকে একই ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে সে বুঝল যে সকালের খটকাটা ঠিকই ছিল। কুকুরটা মৃত।
এক মাস হল অনির্বাণ এই কলেজে নতুন জয়েন করেছে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে। গত দু’মাস ধরে সে নতুন চাকরির সন্ধান করছিল। যদিও আগের কলেজটা কলকাতায় তার বাড়ির কাছেই ছিল। কিন্তু তবুও গত কয়েক মাস যাবৎ ওখানে আর পোষাচ্ছিল না। কারণ ম্যানেজমেন্টকে তেল দিতে না পারলে তুমি সেখানে টিকতে পারবে না। তাই নতুন চাকরি খুঁজতে হল। অনেকগুলো কলেজ থেকে ডাকও এল।
কিন্তু পশ্চিম ভারতের এই ইউনিভার্সিটি যে টাকাটা অফার করল সেটা অন্যগুলোর চেয়ে অনেকটাই বেশি। এই বাজারে হঠাৎ এতটা সহৃদয়তার কারণ কী হতে পারে, সেই সময়ে না বুঝলেও, স্টেশন থেকে ইউনিভার্সিটি আসার পথেই সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল অনির্বাণ৷
আসলে ইউনিভার্সিটিটা শহর থেকে অনেকটাই দূরে। জায়গাটাকে প্রায় গ্রামই বলা চলে। কলেজের আশেপাশের যে কয়েকটা দোকান বা ফ্ল্যাট রয়েছে, সবগুলো শুধু এই ইউনিভার্সিটির ছাত্র, কর্মচারী, আর শিক্ষকদের জন্যেই চলছে। রাজ্য সরকারও এই অঞ্চলে খুব একটা নজর দেয় না। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা আবর্জনা, বড় খালে আটকে থাকা নালার জল, কোনওটাই ঠিকসময়ে পরিষ্কার করা হয় না৷
অনির্বাণ এসেই লক্ষ্য করেছিল যে এদিকের লোকজনও একটু কেমন যেন! কোনও কিছুতেই কোনও মাথাব্যথা নেই। এই তো আগের সপ্তাহে এক রাতে তার সোসাইটির ট্রান্সফরমারে আগুন লেগে গিয়েছিল। লোকজন বেরিয়ে এসে কাজের কাজ না করে দিব্যি তামাশা দেখতে লাগল। গুজগুজ ফুসফুস আলোচনা চলল। একদল লোক তো বালতি করে জল ঢালতে যাচ্ছিল। অনির্বাণ সহ আরো কয়েকজন বাধা দেওয়ায় সে যাত্রায় রক্ষা হল, নয়তো যাচ্ছেতাই একটা কাণ্ড ঘটে যেত সেদিন।
প্রায় দেড় ঘণ্টা বাদে দুজন ইউনিফর্মধারী লোক এল, একজনের হাতে আগুন নেভানোর যন্ত্র। আগুন তো নেভানো হল, কিন্তু কারেন্ট এল না। সামান্য কয়েক মিনিটের কাজ, তাও বিদ্যুৎ বিভাগের লোক আসবে না। আশ্চর্য হয়ে অনির্বাণ দেখল যে কারও কোনও হেলদোলও নেই তাতে। যে যার মতো নিজেদের অ্যাপাচমেন্টের বাইরে, দালানে,
ফোল্ডিং কট পেতে শুয়ে পড়ল। বিরক্ত হয়ে সে নিজের ঘরে ফিরে এল আর গরমে ছটফট করে বিনিদ্র রাত কাটাতে বাধ্য হল।
এহেন অবস্থায় যে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা মরা কুকুর নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র কোনও ভ্রুক্ষেপ থাকবে না, তা বলাই বাহুল্য।
সকালে তৈরি হয়ে, গলায় আই-কার্ড ঝুলিয়ে অনির্বাণ বেরোল কলেজের উদ্দেশে। যে সোসাইটিতে সে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছে, সেটা ইউনিভার্সিটি থেকে সাতশো মিটারের মধ্যে৷ সকালে নটা দশের দিকে বেরোলেও অনায়াসে সাড়ে নটার আগে ইউনিভার্সিটি পৌঁছে যাওয়া যায়৷
ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা দিতেই শান্তামা হাসি মুখে এসে দাঁড়াল, দুই হাতের তালু বাজিয়ে তালি দিল দুইবার। অনির্বাণ হিন্দিতে জিগ্যেস করল, —কী হল আম্মা? আজকে সকাল সকাল
এলে যে?
—আমায় একটু দুধ এনে দিবি বাবু? বেড়ালটার নতুন বাচ্চা হয়েছে। ছানাগুলোকে একটু খাওয়াব।
—আচ্ছা। বিকালে এনে দেব।
শান্তামা একজন বৃহন্নলা। এই এলাকাতেই থাকে। কিন্তু কোথায় থাকে তা ঠিক অনির্বাণ জানে না। কেউই জানে না বোধহয়। ভিখারি গোছের মানুষ। যদিও তাকে কোনওদিন ভিক্ষা করতে দেখেনি সে। এই রাজ্যে হিজড়াদের নাকি খুবই সমীহের চোখে দেখা হয়। তাই শান্তাবেনকে অনেক দোকানদার বা গৃহস্থ খাবার, টাকা দিতে তৈরি থাকে সবসময়ই। কিন্তু শান্তামা বিশেষ কিছু মানুষ ছাড়া কারও থেকেই কিছু চায় না৷ পথে-ঘাটে, গেটের ধারে, বা গাছের নীচে মাঝে মাঝেই এই বৃহন্নলাটিকে বসে থাকতে দ্যাখে অনির্বাণ। পরনে সেই একটাই ছেঁড়া শাড়ি, আর কোমরে সবসময় একটা বাঁশি গোঁজা থাকে।
শান্তাবেনের সঙ্গে অনির্বাণের প্রথম আলাপটাও হয়েছিল বেশ অদ্ভুতভাবে। একদিন অনির্বাণ কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল। ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই দেখল তার দরজার সামনে পড়ে আছে একটা বাঁশি। চেনা চেনা লাগছে, কোথায় যেন দেখেছে বাঁশিটা! ঝুঁকে সেটা তুলে নিতেই পেছন থেকে পুরুষালি ভাঙা গলায় আওয়াজ এল, —নাম কী রে তোর?
অনির্বাণ ঘুরে দেখল শান্তামা দাঁড়িয়ে আছে। যেন বাঁশিটা তোলার অপেক্ষাতেই আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে ছিল সে।
অনির্বাণ কিছুটা বিরক্ত হল। কলকাতার মানুষ মাত্রেই রাস্তা ঘাটে বৃহন্নলাদের উৎপাত কম বেশি সহ্য করতে হয়েছে কখনও না কখনও। তাই এই অযাচিত তুই-
–আমার নাম অনির্বাণ।
তোকারিতে বিরক্ত হয়েই সে উত্তর দিল,
শান্তামা তার হাতের বাঁশিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—দে। আমার বাঁশি দে৷
অনির্বাণ বাঁশি এগিয়ে দিল এবং মনে মনে প্রমাদ গুনল। কারণ সে জানে এরপরেই হিজড়াটা তার থেকে টাকা চাইবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে শান্তামা কিছু না বলেই বাঁশি নিয়ে চলে গেল।
তার পাশের অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় তখন বসে ছিলেন মিস্টার প্যাটেল। তিনি অনির্বাণকে বললেন,
—ওই বাঁশি আপনি ধরলেন যে! কিছু মনে হল না?
অনির্বাণ এই প্রশ্নের অর্থ বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে বলল, —কী মনে হবে?
প্যাটেল চারপাশ দেখে নিয়ে চাপা গলায় উত্তর দিলেন,
—ওই বাঁশি ও আমার বাড়ির সামনেও ফেলে রেখেছিল কয়েক বছর আগে । এখানে নতুন কেউ থাকতে এলেই ও এটা করে। ও আসলে পাগলা… মানে ইয়ে পাগলি গোছের। তবে এই এরা… ইয়ে…. মানে ওদের মতো ওরা, অনেক জাদুটোনা জানে। এখনও অনেক বাচ্চার অসুখ যদি ডাক্তার দেখিয়েও না সারে তখন বাপ মা ওর কাছে নিয়ে আসে। শান্তা ঠিক করে দেয়।
এইসব আজগুবি গল্প শুনতে একটুও ভালো লাগছিল না অনির্বাণের। বিশেষ করে এই প্যাটেল লোকটাকেও তার পছন্দ নয়। তাই আর কথা না বাড়িয়ে ঘরে ঢুকে যাচ্ছিল অনির্বাণ।
কিন্তু প্যাটেল আবার বললেন,
—আমি তো ওই বাঁশি ছুঁতেই কেঁপে গিয়েছিলাম! ওই বাঁশি কারেন্ট মারে। লোকটার মুখের দিকে আর একবার ভালো ভাবে দেখে নিল অনির্বাণ৷ শান্তামা যদি উন্মাদ হয় তবে এই বুড়োও সেই পথেরই পথিক, মনে মনে ভাবল সে।
এরপরের দিন অনির্বাণের সঙ্গে আবারও দেখা হল শান্তাবেনের। বেচারা কলেজ থেকে ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফিরছিল। তার জামাটাও চুপচুপে ভিজে গিয়েছিল। এদিককার গরমের প্রকৃতি বাংলার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে শুষ্ক গরম, কিছুক্ষণ বাদে বাদেই গলা শুকিয়ে যায়। গরমের ঠ্যালায় গত কয়েক রাত ঘুমই হয়নি তার। এদিকে বৃষ্টি আসতে নাকি এখনও প্রায় দেড় মাস বাকি। সেই জুলাই মাসের আগে বৃষ্টি নামে না এদিকে।
গাছের তলায় বসে থাকা শান্তামা তাকে দেখে হঠাৎ বলে উঠল,
—গরমে খুব কষ্ট পাচ্ছিস বাবু? আচ্ছা যা, আজ রাতে ভালো ঘুম হবে তোর। কথাটার কী উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে গিয়েছিল অনির্বাণ ।
সেই রাতে প্রথমবার শান্তাবেনকে বাঁশি বাজাতে শুনেছিল সে। রাত্রি দশটার দিকে হঠাৎ একটা বাঁশির সুর ভেসে এসেছিল তার কানে। অদ্ভুত একটা সুর… অদ্ভুত কিন্তু মধুর। এই সুর ভাষায় বোঝানো কঠিন। সারা শরীর ও মন আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল ওই সুর।
সেই রাতে বৃষ্টি নামল… মুষলধারায় বৃষ্টি। বহু দিনের তপ্ত শুষ্ক মাটি তৃপ্তি করে শুষে নিল সেই জল। বৃষ্টির মাঝেই হালকা হয়ে আসা বাঁশির সুর শুনতে শুনতে কখন যেন গভীর আরামের ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল অনির্বাণ।
বৃষ্টির ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবেই কাকতালীয়। কিন্তু সেই বাঁশির সুর…. বড় ভালো লেগেছিল তার।
সেই থেকে মাঝে মাঝেই পথচলতি একটা-দুটো কথা হয় অনির্বাণের সঙ্গে শান্তামার। একবার অনির্বাণ জিগ্যেস করেছিল,
–আচ্ছা শান্তামা, তুমি রোজ তোমার বাঁশি বাজাও না কেন ?
গম্ভীর মুখে শান্তামা উত্তর দিয়েছিল,
—নেহি রে, উসসে কেয়ামত আ জায়গা
কথাটার মানে অনির্বাণ স্পষ্ট বোঝেনি। কিন্তু আর বাড়তি প্রশ্নও করেনি। আধপাগলা মানুষ, বেশি না ঘাঁটানোই ভালো।
তবে মাঝে মাঝেই ছোটখাটো জিনিস শান্তামা চেয়ে নেয় তার থেকে। এই একটা দেশলাই, কখনও একটা সস্তার ইউজ অ্যান্ড থ্রো পেন, এইসব। আজকে প্রথমবার কোনও খাদ্য বস্তু চাইতে এসেছে শান্তামা।
ফেরার পথে এক প্যাকেট দুধ নিয়ে আসবে ঠিক করে কলেজের উদ্দেশে পা বাড়াল অনির্বাণ।
সকাল সকাল স্টাফ রুমে একদল অধ্যাপক জড়ো হয়ে কিছু একটা বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা করছে। অনির্বাণ তাঁদের মধ্যে না থেকে নিজের টেবিলে এসে বসল। হাজার হোক, সে এখনও নতুন। পুরোনোদের আলোচনায় সে কতটা স্বাগত তা সে এখনও বুঝে উঠতে পারেনি।
কিছুক্ষণ বাদেই একজন অনির্বাণের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
—আরে স্যার, আপ দয়াগোড়িয়া কে উহা রহতে হো না
অনির্বাণ হিন্দিতে উত্তর দিল, হ্যাঁ।
–কাল রাতের ঘটনা শুনেছেন কিছু?
কী ঘটনা?
-আরে স্যার খুব খারাপ ব্যাপার। একটা লোকাল মেয়েকে গ্যাংরেপ করা হয়েছে
গতকাল রাত্রে। মেয়েটা যাতে কথা না বলতে পারে, সেই জন্যে মেয়েটাকে খুন করে নালায় ফেলে দিয়ে গিয়েছে। হরিবল কাণ্ড! — সে কী ৷
—হ্যাঁ স্যার, এইদিকে এইসব ঘটে না। তাই মাহৌল গরম হয়ে আছে। বড়ি বেরহমি কে সাথ মারা গয়া হে লড়কি কো৷
অনির্বাণ জিগ্যেস করল,
—কেউ ধরা পড়েছে?
উত্তরটা দেওয়ার আগে একবার নাটকীয় ভঙ্গিতে দু’দিকে দেখে নিয়ে, গলার স্বর একদম খাদে নামিয়ে লোকটা উত্তর দিল,
—শোনা যাচ্ছে ইউনিভার্সিটির তিনটে ছেলে এই কাজটা করেছে। বড়লোকের বিগড়া হুয়া লন্ডা সব!
পেছন থেকে আর এক বিহারী কলিগ বলল,
—একজনের বাবা শুনছি স্টেটের রুলিং পার্টির বড় পোস্টে আছে। ছেলেগুলোকে হোস্টেলেই রাখা হয়েছে। তবে তারা যে কারা সেই কথা এখনও জানা যায়নি। ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আর ওই তিনজন ছাত্রের অভিভাবকদের চাপে প্রশাসন কারোর নাম প্রকাশ করছে না।
এতক্ষণে অনির্বাণের কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। ঠিক এই কারণেই কলেজের সবাই এত চিন্তিত। ইউনিভার্সিটির নাম ব্যাপারটায় জড়িত না থাকলে এদের কোনও মাথাব্যথা থাকত বলে মনে হয় না। এটা এই রাজ্যের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সিটি। বিদেশি ছাত্রও আছে প্রচুর। ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের বড় কর্তা, মুখ্যমন্ত্রীসহ বেশ কিছু বড় বড় মানুষদের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহান্তে মদের আসর বসান বলে শুনেছে অনির্বাণ। এত বড় একটা ইউনিভার্সিটি চালাতে গেলে এগুলো করতেই হয়। পলিটিক্যাল ব্যাকআপ ছাড়া কীভাবে চলবে এই বিরাট সাম্রাজ্য !
অনির্বাণ উত্তেজিত স্বরে জানতে চাইল,
–তো এবার কী হবে? ছেলেগুলো কোনও শাস্তি পাবে না? এরকম জঘন্য একটা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাবে ? সেই কলিগ কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেল। বিহারী লোকটা অনির্বাণের আরো একটু কাছে এসে চেয়ার টেনে এনে বলল,
—চেপে দেবে স্যার, ডিরেক্টর সাহেবের প্রচুর ক্ষমতা। আপনি জয়েন করার কয়েকদিন আগেই তো একটা ছেলে হস্টেলে সুইসাইড করল। ওটা যদিও ওই ছেলেটার প্রেমঘটিত সমস্যা ছিল। কিন্তু অ্যাডমিশনের বাজারে এইসব খবর যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেই জন্যে রাতারাতি গোটা এলাকার নেট অফ করে, ছেলেটার গার্জেনদের টাকা পয়সা দিয়ে ব্যাপারটা চেপে দিল।
—কিন্তু ওটা আর এটা তো এক ঘটনা নয়। এটা একটা ভয়ানক ক্রাইম ! বিহারী লোকটা উত্তর না দিয়ে অনির্বাণের দিকে খানিকটা অর্থপূর্ণ হাসি ছুড়ে
দিয়ে নিজের ল্যাপটপে মন দিল।
বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে ইচ্ছে না থাকলেও কুকুরটার দিকে চোখ চলে গেল অনির্বাণের৷ গত দু’দিনে ফুলে ঢোল হয়েছিল, আজকে পচন ধরে গন্ধ ছড়ানো শুরু হয়েছে।
দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে জিনিসটার পাশ কাটিয়ে হাঁটা দিল
অনির্বাণ। নিজের সোসাইটির বড় গেটটার সামনে এসে হাঁটার গতি কমাতে বাধ্য হল। নাক থেকে রুমাল সরিয়ে, গেট পার করে ভেতরে ঢুকতেই গাছতলার নীচে লোকজনের জটলা দেখতে পেল অনির্বাণ। তবে ইউনিভার্সিটির মতো শান্ত নয়, এখানে লোকজন খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিজেদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে। তবে সে অবাক হল খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ভ্যানটাকে দেখে
আরো একটু এগিয়ে আসতেই বুঝতে পারল গোটা ভিড়টা জুটেছে গাছের নীচে পা ভাঁজ করে বসে থাকা শান্তামাকে ঘিরে। শান্তাবেনের কোলে একটা বেড়ালছানা, চোখ ফোটেনি তখনও। গুটিসুটি মেরে বসে কুঁই কুঁই করে চলেছে। আর একজন দেহাতি মহিলা বিলাপ করে কেঁদে কেঁদে শান্তামাকে উদ্দেশ্য করে কিছু একটা বলছে। ভাষাটা এখনও আয়ত্তে না আসায় কথাগুলো বুঝতে পারল না অনির্বাণ৷
তবে ওই মহিলা আর শান্তাবেনের মধ্যিখানে, মাটিতে পড়ে থাকা বস্তুটার দিকে চোখ পড়তেই শিউরে উঠল সে! প্লাস্টিক মুড়ে যে জিনিসটা রাখা আছে, সেটা একটা মেয়ের লাশ! মেয়ে না বলে কিশোরী বলাই ভালো। বয়স পনেরো-ষোলোর বেশি নয়। কিন্তু ক্ষত বিক্ষত শরীরটা দেখেই অনুমান করা যায় যে তার ওপর কী অকথ্য অত্যাচার করা হয়েছে! এই দেহাতি মহিলা তার মানে এই মেয়েটির মা! কিন্তু সে এখানে কী করছে? শান্তামায়ের কাছে কী চায় ওরা?
শান্তাবেনের বেড়াল ছানার জন্যে দুধ এনেছে অনির্বাণ, কিন্তু সেটা এই পরিস্থিতিতে দেওয়া যায় না। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে কিশোরীটার লাশ ও তার মায়ের বিলাপ দেখতে দেখতে মনের মধ্যে একটা চরম বিতৃষ্ণার ভাব জমে উঠছে তার মধ্যে। বিতৃষ্ণা সেই তিনটে ছেলের প্রতি, ইউনিভার্সিটির প্রতি, এবং সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসাবে নিজের অক্ষমতার প্রতি।
হঠাৎই অনির্বাণ লক্ষ্য করল যে খানিকটা তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অফিসার পদের একজন ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে। কথা শোনা না গেলেও শরীরী ভাষা ও বাচন ভঙ্গি থেকে অনুমান করা যায় যে ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি উচ্চপদস্থ কেউ। ফোনে অফিসারের জন্যে নির্দেশ আসছে অপর প্রান্ত থেকে।
পুলিশ অফিসার ফোন রেখে কনস্টেবলদের নির্দেশ দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে তারা তৎপরতার সঙ্গে এগিয়ে গেল ভিড়টার দিকে। শুরু হল দুই পক্ষের তর্কাতর্কি। পুলিশ লাশ তুলে নিয়ে যেতে চাইছে, এদিকে লোকজন বাধা দিচ্ছে। ক্রমে তর্ক-বিতর্ক প্রায় মারামারির পর্যায় পৌঁছাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ভাঙা পুরুষালি গলায় হুঙ্কার দিয়ে উঠল
শান্তামা। মুহূর্তের মধ্যে চুপ করে গেল সকলে। চাপা ফিসফিসানির আওয়াজ কানে এল।
পুলিশদের উদ্দেশে আঙুল তুলে ধমকের ভঙ্গিতে শান্তামা কিছু একটা বলল, পুলিশ অফিসারটি চুপ করে তা হজম করল।
এবার একটা অদ্ভুত কাজ করল শান্তাবেন। কিশোরীর লাশটার পাশে বসে পড়ে, মেয়েটার মুখ খুলে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিল। কিছু একটা বের করে আনল মুখের ভেতর থেকে৷
অনির্বাণ অবাক হয়ে দেখল মেয়েটার একটা দাঁত উপড়ে নিয়েছে শান্তামা। এরপর লাশটার মায়ের মাথায় হাত রেখে কিছু একটা বিড়বিড় করে বলল সে।
শান্তামার ইশারায় পুলিশ এবার এগিয়ে এসে মেয়েটার লাশ তুলে নিয়ে গেল। লোকজন আর বাধা দিল না। একটু পরেই ধীরে ধীরে ভিড় ফাঁকা হয়ে গেল৷
এতক্ষণ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল অনির্বাণ। ভিড় ফাঁকা হতেই শান্তামা তাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। সে কাছে যেতে শান্তামা বলল, —দুধটা দিয়ে যা!
অনির্বাণ দ্বিরুক্তি না করে দুধের প্যাকেটটা দিয়ে দিল তার হাতে।
প্যাকেটটা দাঁত দিয়ে ফুটো করে সেটা কোলের বেড়াল ছানার মুখে ধরল শান্তাবেন। অনির্বাণ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে তারপর চুপচাপ হাঁটা দিল নিজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশে। কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছিল, হঠাৎই একটা ডাক শুনে আবার পেছন ফিরল অনির্বাণ।
-এ বাঙালি বাবু! শুন !
-বলো আম্মা?
—রাস্তায় কুকুরটা এখনও পড়ে আছে?
এই পরিস্থিতিতে এই রকম অদ্ভুত একটা প্রশ্নের জন্যে একদমই তৈরি ছিল না সে। কিছুক্ষণ হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে থেকে, উপর নীচে ঘাড় নেড়ে জানাল যে—আছে৷ শুনে শান্তামা আবার বেড়ালকে দুধ খাওয়ানোয় মন দিল।
অনির্বাণ কলেজ থেকে ফেরার সময়েই রাতের জন্য রুটি কিনে এনেছিল। ফ্রিজে গতকালের একটা পনিরের তরকারি আছে। ভেবেছিল সেটা দিয়েই কাজ চালিয়ে নেবে। কিন্তু তরকারিটা বের করতেই সে বুঝল, সেটাতে টক গন্ধ ছাড়তে শুরু করেছে। আসলে সকালে যখন সে কলেজ যাবার জন্যে বেরোচ্ছিল তখন সেই সময় কারেন্ট চলে গিয়েছিল। কারেন্ট এসেছে এই বিকেলে তার ফেরার খানিক আগে। এতক্ষণ ফ্রিজ বন্ধ থাকায় খাবারটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
অনির্বাণ একবার ভাবল যে এখন এই রাতে আর বেরোবে না। গুঁড়ো দুধ জলে গুলে রুটি দিয়ে খেয়ে নেবে। কিন্তু তারপর আবার কী মনে হতে গায়ে টি-শার্টটা চড়িয়ে, ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাত এখনও খুব একটা বেশি হয়নি। সবে ন’টা বেজেছে। মোড়ের দোকানটা এখনও খোলা থাকবে। একটু তড়কা বা কাবলি চানার ঝোল কিনে আনাই যায়।
দোকান খোলাই ছিল, কিন্তু সব্জি প্যাক করিয়ে ফিরতে ফিরতে আরো আধ ঘণ্টা সময় লেগে গেল তার। রাস্তার দুই ধারে আবার স্ট্রিট লাইট নেই। মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে ফিরছে অনির্বাণ। পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে মাঝে মাঝে হুস করে দুই চাকা, চার চাকা বেরিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ নাকে পচা দুর্গন্ধটা আসতেই সে বুঝল মরা কুকুরের জায়গাটার কাছাকাছি এসে গিয়েছে। জায়গাটা দ্রুত পেরিয়ে যাওয়ার জন্য চলার গতি বাড়াতে গিয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
কেউ একজন বসে আছে রাস্তার ধারে, মরা কুকুরটার সামনে। মোবাইলের আলো সেদিকে পড়তেই সেই মানুষটা অনির্বাণের দিকে মুখ ফেরাল। শান্তামা! কিন্তু এখন সে কী করছে এখানে?
অনির্বাণ এবার দেখতে পেল শান্তামা কী করছে! আর সেটা দেখেই গা ঘিনঘিন করে উঠল তার। গত কয়েকদিনে পোকায় ধরে যাওয়া মরা কুকুরটার মুখ এক হাতে ফাঁক করে শান্তামা অন্য হাত মুখের ভেতর ঢুকিয়ে কিছু একটা রাখছে। হঠাৎ করেই তার মনে হল, কুকুরের মুখে যে জিনিসটা শান্তামা ভরে দিচ্ছে সেটা কী তা অনির্বাণ জানে। আজ বিকেলেই শান্তামা ওই বস্তুটা আরো একটা মৃতদেহের মুখ থেকে বের করে নিয়েছিল।
দৃশ্যটা এতটাই অস্বাভাবিক ও নোংরা যে পাথরের মতো থমকে দাঁড়িয়ে রইল
সে। শান্তামা তাকে ঘাড় নাড়িয়ে চলে যেতে বলল। বলল বলা ভুল, যেন কথা না বলেই তাকে নির্দেশ দিল স্থান ত্যাগ করতে। অনির্বাণও দ্রুত পা চালাল। শান্তাবেনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অনির্বাণের উদ্দেশে কঠিন স্বরে নির্দেশ ভেসে এল,
—সাবধান, পিছে মুড়কে মাত দেখ না ৷
আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই বাঁশি বেজে উঠল
। শান্তামা বাঁশি বাজাচ্ছে।
কিন্তু এ কেমন সুর? এর আগে বৃষ্টির রাত্রে শোনা সুরের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। এ এক অদ্ভুত, অপার্থিব সুর। তার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যাতে শরীর অবশ হয়ে আসে ভয়ে!
এবার পেছন থেকে একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড় শব্দ শোনা যাচ্ছে।
মাথা নিচু করে হেঁটে চলেছে অনির্বাণ। তার প্রচণ্ড ভয় করছে। শান্তাবেনের সাবধানবাণী না থাকলেও সে পেছনে ফিরে দেখত না… কখনো না। সেই সাহস তার নেই। কারণ তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলে দিচ্ছে যে তার পেছনে কী ঘটছে!
অনির্বাণ জানে সে এখন পিছনে ঘুরলে যে দৃশ্য দেখবে সেটা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই৷
সেই রাতে আর খাবার খেতে পারল না অনির্বাণ। বারবার ওই পচা গন্ধটা যেন নাকে এসে গা গুলিয়ে দিচ্ছিল তার। একটু ঠান্ডা জল খেয়ে শুয়ে পড়ল সে। ঘুমের মধ্যে তখনও সে শুনতে পাচ্ছিল সেই অপার্থিব বাঁশির সুর।
রাতের ঘটনাটাকে হয়তো মনের ভুল বলেই উড়িয়ে দিত অনির্বাণ। কিন্তু পরেরদিন সকালে ইউনিভার্সিটি যাওয়ার সময় যখন সে লক্ষ্য করল যে মরা কুকুরটা আর ওখানে নেই, তখন গত রাতের ঘটনাটা আবার মনে পড়ে গেল তার। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল। না না, সে একজন শিক্ষিত অধ্যাপক। এসব কী ভাবছে সে? নিশ্চয়ই মিউনিসিপ্যালিটি থেকে এতদিন পর ওটাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক আসলে প্যাটার্ন খুঁজতে ভালোবাসে। তাই তার মস্তিষ্কও অকারণে তাকে এমন একটা প্যাটার্ন দেখাচ্ছে।
ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে আজকেও অনির্বাণ দেখল স্টাফ রুমে প্রফেসররা জড়ো হয়ে চাপা গলায় কীসব আলোচনা করছে। আজকে সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে তাদের জিগ্যেস করল,
—কী হয়েছে? একজন উত্তরে বলল,
—গতকাল রাতে হোস্টেল নম্বর পাঁচের বাইরে একটা ছেলেকে কুকুরে কামড়েছে। বিশ্রী ভাবে জখম হয়ে ছেলেটা হাসপাতালে ভর্তি, বাবা-মাও এসেছে। শুনছি অবস্থা ভালো নয়। বোধহয় বাঁচবে না।
অনির্বাণ প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে নিজের জায়গায় এসে ধপ করে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ বসেই রইল ওই ভাবে। তারপর ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বের করতে গিয়ে খেয়াল করল তার হাত কাঁপছে৷
এই ঘটনার পরে অনির্বাণসহ তার ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য অধ্যাপকদের খুব ব্যস্ততার মধ্যেই কাটল দুটো দিন। আন্তর্জাতিক কনফারেন্স ছিল ইউনিভার্সিটিতে। সেটার দায়িত্ব ছিল তারই ডিপার্টমেন্টের উপরে। বহু বড় মাপের বিজ্ঞানী ও প্রফেসররা এসেছিল সেখানে আমন্ত্রিত বক্তা হিসাবে। সবকিছু সামলাতে গিয়ে ডিপার্টমেন্টের নাভিঃশ্বাস উঠে গিয়েছিল। এর মধ্যে শান্তামা বা কুকুরটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল অনির্বাণ৷
দ্বিতীয় দিনে কনফারেন্স শেষ করে সব গোটাতে গোটাতে রাত আটটা বেজে গিয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের মধ্যে দিয়ে একা একা গেটের দিকে যাচ্ছিল অনির্বাণ। এমন সময়ে নয় নম্বর বয়েস হস্টেলের পাশে সিতে শব্দটা শুনতে পেল সে।
সেই বাঁশির সুর! হ্যাঁ কোনও ভুল নেই, সেই একই সুর ভেসে আসছে দূর থেকে। শান্তামা আবার বাঁশি বাজাচ্ছে।
অনির্বাণ দেখল, হোস্টেলের বাগানে বসে একটা ছেলে ফোনে কথা বলছে। হিন্দিতে নয় অন্য কোনও ভাষায়। সম্ভবত মারাঠি।
ছেলেটা কথা থামিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। ফোনটা তখনও তার কানে ধরা আছে। কিন্তু কিছু একটা দেখে সে কথা থামিয়ে দিয়েছে। খানিকটা দূরে ঝোপের দিকে ছেলেটার দৃষ্টি আটকে আছে৷ তার দৃষ্টি বরাবর তাকিয়ে অনির্বাণ কিছুই দেখতে পেল না। ঝোপের জায়গাটা নিকষ কালো অন্ধকার।
হঠাৎ অনির্বাণের ঘাড়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। খুব দ্রুতপায়ে কিছু একটা ঝোপের পেছন থেকে দৌড়ে এসে ছুটে গেল ছেলেটার দিকে। পাঁচিল দিয়ে আড়াল হয়ে যাওয়ায় সেটাকে দেখতে পেল না অনির্বাণ। তবে সে দেখতে না পেলেও ছেলেটা ঠিকই দেখতে পেয়েছে। তার চোখ দুটো অবিশ্বাস ও ভয়ে বিস্ফারিত!
ছেলেটার গলা থেকে এবার একটা অদ্ভুত আতঙ্কের আর্তনাদ বেরিয়ে এল। চিৎকার করে দ্রুত হোস্টেলের দিকে ছুটল সে। সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে ধাওয়া করে কিছু একটা ছুটে গেল! আর একটা অদ্ভুত ঘড় ঘড় আওয়াজ শোনা গেল।
জিনিসটা কী তা অনির্বাণ দেখতে পায়নি, কিন্তু এই জান্তব আওয়াজ তার চেনা। তীব্র ভয়ে অনির্বাণের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে পাথরের মতো স্থাণু হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। হাত-পা নড়ানোর ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে তার।
সে জানে যে জিনিসটা ছেলেটাকে তাড়া করেছে সেটা ঠিক কী! তীব্র মাংস পচা গন্ধটা আর দূর থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুরই তাকে জানিয়ে দিচ্ছে যে ওই জিনিসটা ইহজগতের কিছু নয়। বহু দূরের অগম্য অন্ধকার এক জগত থেকে ওটাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে!
এবার গন্ধটা ধীরে ধীরে কমে আসছে। ছেলেটার চিৎকার শোনা যাচ্ছে! বাঁচার তাগিদে পরিত্রাহী চিৎকার করছে ছেলেটা।
একটু বাদেই হোস্টেল থেকে ছেলে-পিলে বেরিয়ে আসবে। এই ছেলেটাকেও হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু অনির্বাণ জানে যে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
এরপর আর বেশিদিন অনির্বাণ ওখানে চাকরি করেনি। দুই মাসের মধ্যেই উত্তর ভারতের এক ইউনিভার্সিটিতে চাকরি পেয়ে চলে গিয়েছিল সে।
তবে সেই রাতের ঘটনার এক সপ্তাহ পরে আরো একটি ছেলে কুকুরের কামড়ে মারা গিয়েছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার সেই ছেলেটা তখন ওই চত্বরেই ছিল না। দুশো কিলোমিটার দূরে, অন্য একটা শহরে তার বাবা মায়ের সঙ্গে ছিল।
কিন্তু এক রাতে তাকেও কুকুরে কামড়েছিল। বন্ধ ঘরে কীভাবে কুকুরটা ভিতরে ঢুকেছিল কেউ জানে না। কয়েক দিন জলাতঙ্কে ভুগে মারা গিয়েছিল ছেলেটা। আর তার মৃত্যু ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। ছেলেটার বাবা মুখ্যমন্ত্রীর ডান হাত। তাই তার মৃত্যু নিয়ে দৈনিক সংবাদ পত্রগুলোয় এক কোণে একটা খবরও ছাপা হয়েছিল।
এরপর শান্তাবেনের সঙ্গে আর কথা হয়নি অনির্বাণের। সে এখান থেকে চলে আসার আগে আর মাত্র একবারই শান্তামাকে বাঁশি বাজাতে শুনেছিল। আর সে জানে যে সেই রাতেই দুশো কিলোমিটারেরও বেশি দূরে ওই তৃতীয় ছেলেটাকে কুকুরে কামড়েছিল।
তার এই বিশ্বাস সত্যি কিনা তা সহজেই অনির্বাণ যাচাই করতে পারত। কিন্তু ইচ্ছে করেই সে তা করেনি। কারণ কিছু সত্যি চিরকাল সন্দেহের আড়ালেই সুরক্ষিত থাকা দরকার। নয়তো এই দুনিয়ার চেনা হিসেবগুলো সব ওলট-পালট হয়ে যাবে।
