Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ১৬ আনা ভয় – সম্পাদনা : সৈকত মুখোপাধ্যায়

    সৈকত মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প442 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ডমরুদহের মন্দির – কৌশিক সামন্ত

    ডমরুদহের মন্দির – কৌশিক সামন্ত

    ১। প্রতাপনারায়ণের দ্বিধা

    বহুদূর থেকে ভেসে আসা রাতচরা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। ওই ডাক কানে ব আসলেই মনে হয় যেন, অচেনা কোনও ভয়, অজানা কোনও বিপদ, হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে।

    এখন রাত ঠিক কত প্রহর, রাজা প্রতাপনারায়ণ সেই বিষয়ে অজ্ঞাত। তবে বিপদের ঘনঘোর যে ক্রমশ তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছে, সেটা তিনি ঠিকই টের পাচ্ছেন। কক্ষের মধ্যে মৃতপ্রায় প্রদীপ শিখায়, নিজের ছায়াকেও যেন অপরাধী মনে হয়। নিজের মখমলে বিছানাটাও যেন একটা কণ্টকশয্যা! পাশে অসাড়ে ঘুমিয়ে থাকা রানি সংঘমিত্রার আদুল শরীরে চাদরের প্রলেপ টেনে দিয়ে অতি সন্তর্পণে বিছানা ত্যাগ করেন তিনি। কী নিদারুণ সরলতা রানির মুখে, ঠিক যেন সদ্যোজাত কোনও শিশু ঘুমিয়ে রয়েছে।

    শিশু… নিজের মনের মধ্যে উচ্চারিত হওয়া এই শব্দে নিজেই হোঁচট খান প্রতাপনারায়ণ।

    এই একটা শব্দেই তাঁর সমগ্র জীবনটা আটকে রয়েছে, মল্ল বংশের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে এই একটা ক্ষুদ্র শব্দের অনুপ্রাসে৷ ‘রাজামশাইয়ের অভয় পেলে, সভাসদেরা একটি প্রস্তাব রাখতে পারে!’ ‘বলুন মহামন্ত্রী।’

    ‘মহারাজ, নিকটবর্তী সুবর্ণ রাজ্যের শত্রুতার কথা তো আপনার অজানা নয়। তাদের সীমানা থেকে মুহুর্মুহু আক্রমণ প্রতিহত করতে, প্রতিবছর আমাদের রাজকোষ থেকে প্রচুর পরিমাণ ধনবল আর লোকবল খরচ হয়ে যায়…’

    ‘অযথা ভণিতা না করে কাজের কথায় আসুন মন্ত্রীবর।’

    ‘মহারাজ, আপনার হয়তো এটা জানা নেই, যে গত পরশু সুবর্ণ রাজ্যের ঘরে নতুন রাজকুমার এসেছে।’

    ‘তো? তাতে মল্লরাজ্যের কী এসে যায়?’

    ‘আসলে… প্রজাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। আমাদের রানিমা পরপর চারটি মৃত সন্তান প্রসব করায়…’

    ‘খবরদার মন্ত্রীমশাই। এর পরে আর একটাও শব্দ যেন আপনার মুখে উচ্চারিত না হয় !’

    ‘দোহাই মহারাজ, এ আমার মনের কথা না, গোটা সভার…’

    হা ঈশ্বর, সকালের সেই কথাগুলো এখনও কানে রক্তপাত করছে মল্লরাজ প্রতাপনারায়ণের। এতদিন কানাঘুষো শোনা গেলেও, তাঁর মুখের ওপর যে কেউ এভাবে রাজ্যের উত্তরাধিকারের প্রশ্ন তুলতে পারে, তা তিনি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি।

    ধীর পায়ে পুবের জানলার দিকে এগিয়ে যান প্রতাপনারায়ণ। এখান থেকে গোটা মল্লরাজ্য সুন্দরভাবে ধরা দেয়। এখন যেহেতু মধ্যরাত, ঘুমে ঢাকা গোটা নগরকে নিজের অনুভূতির মতোই মৃতপ্রায় লাগছে তাঁর। চারিদিকে অন্ধকার… শুধু ওই সূদুরে পশ্চিমের মহলে টিমটিম করে আলো জ্বলছে৷ গোটা মল্লরাজ্য ঘুমিয়ে থাকলেও, পশ্চিমের ওই ভীষণ জঙ্গলের সীমানা ঘেঁষা পশ্চিম মহল আর তার অধিবাসীরা বিনিদ্র রজনী যাপন করেন।

    সেই কোনকাল থেকে কাকা রণেন্দ্রনারায়ণ আর তাঁর অতন্দ্র সেনাদল, দায়িত্ব নিয়ে পশ্চিমের ওই কুখ্যাত জংলা সীমাকে রক্ষা করে চলেছেন। না হলে যে এই রাতের থেকেও কত ভয়ঙ্কর অন্ধকার নিমেষে ওই জঙ্গল ছেড়ে মল্লরাজ্যে প্রবেশ করে ফেলত তা ঈশ্বরই জানেন। পিতাসম রণেন্দ্রনারায়ণ এভাবে পাশে না থাকলে কীভাবে তিনি একা এই গোটা রাজ্যকে সামলাতেন, সেটা ভেবেই শিহরিত হন প্রতাপনারায়ণ। এবারেও বোধহয় সব শঙ্কা, শরম দূরে সরিয়ে রণেন্দ্রনারায়ণেরই শরণাপন্ন হতে হবে তাঁকে।

    ‘জানলায় একা-একা দাঁড়িয়ে কী করছেন রাজন? আমার যে বড় শীত করছে এই বিছানায়।’ সংঘমিত্রার মায়াবী স্বরে হুঁশ ফেরে প্রতাপনারায়ণের।

    “কিছুই না রানি, মল্লরাজ্যের সুখ-দুঃখ-ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিইবা ভাবব !” ‘চিন্তা করবেন না প্রভু, দেখবেন এবারে সব ঠিক হয়ে যাবে। আসুন আমার কাছে! প্রাচীনেরা বলে গেছেন, ভোরের মিলন খুব শক্তিশালী, আসুন রাজন এবারে আমরা ঠিক সফল হবই।’

    ধীরে ধীরে বিছানার কাছে ফিরে আসেন প্রতাপনারায়ণ। শত দুর্ভাবনার কালো মেঘ থাকলেও, এই মোহময়ী নারীর আহ্বান উপেক্ষা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কৈশোর থেকে যে নারী, তাঁর অস্তিত্বের সঙ্গে ছায়ার মতো মিশে আছে, তাঁকে কীভাবে দূরে সরিয়ে রেখে অন্য নারীর বাহুডোরে প্রবেশ করবেন তিনি। দরকার হলে সভা কেন, গোটা রাজ্যের সঙ্গে লড়ে যাবেন প্রতাপনারায়ণ।

    সংঘমিত্রার গালে চুম্বন করেন মল্লরাজ। কপালে চুম্বন করেন। নীচের ঠোঁটে আলতো কামড় দিয়ে মোহগ্রস্তের মতো এক ঝটকায় পরনের রাত্রিবস্ত্র খুলে ফেলেন তিনি। তার পরে প্রদীপের অন্তিম শিখায় অবলোকন করতে থাকেন, হরিণচোখে বিছানায় অপেক্ষারত রানি সংঘমিত্রার নিরাবরণ শরীরটাকে। দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া ঘামে ভেজা অস্থির একটা শরীর।

    প্রদীপের আলো আঁধারিতে খেলা করা, সংঘমিত্রার প্রতিটা গোপন বিভাজিকা যেন অনাবিল আকর্ষণের অনন্ত গুহ্যদ্বার। পশুর মতো নয়, শুধুই সন্তান লাভের বাসনায়

    নয়—এক আদিম যৌন ইচ্ছা আর অসীম ভালোবাসায়, বিছানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন মল্লরাজ। স্বেদে আর কামরসে মাখামাখি দুই শরীরে পাপড়ির মতো লেগে থাকে রমণে পিষ্ট ভোরের আলো-আঁধারি।

    ২ । আবাহনের শেষ প্রহর

    তপ্ত গ্রীষ্মের প্রহর শেষে ধরণী যখন উত্তপ্ত, এক ফোঁটা বৃষ্টির জলের জন্য হাহাকার করছে প্রতিটা ধূলিকণা! তখন কালো মেঘের বুক চিরে আচমকা নেমে আসে শান্তির বারিধারা। আর সেই বৃষ্টির জলরাশি বেয়ে নাকে আসে সোঁদা মাটির গন্ধ। সেই সিক্ত পরশে তৃপ্ত হয় মন-শরীর। শুধু মানুষই নয়, সে তৃপ্তির ভাগ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি জীবন্ত অস্তিত্বে।

    কিন্তু রাজা প্রতাপনারায়ণ শান্ত হতে পারছেন কই! রাজজ্যোতিষীর বিধান মেনে, রাজমহল শোধন-বন্ধন, যজ্ঞ-পুজা পাঠ, গরীবকে অন্ন-বস্ত্রদান, মন্দির নির্মাণ, দুজনে মিলে তীর্থ ভ্রমণ কিছুই বাদ রাখেননি। গত নয়টা মাস কীভাবে কেটে গেছে তা তাঁর মনে পড়ে না। প্রতিটা পদক্ষেপ মেপে মেপে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা শুনে, তাঁদের সতর্কবাণী মেনে, অতি সাবধানে থেকেছেন তিনি আর রানি সংঘমিত্রা।

    আজ ফলাফলের পালা। তাই এত সুন্দর আবহাওয়াতেও রাজা স্থির থাকতে পারছেন না। প্রসূতি কক্ষে, কিছু মুহূর্ত আগেই গিয়েছেন রানি। সঙ্গে গিয়েছে রাজ্যের সব থেকে দক্ষ দাইমা আর তার স্যাঙাতেরা। কক্ষের বাইরে অতন্দ্র প্রহরাতে রয়েছেন রাজবৈদ্য আর তাঁর দল। রাজমহলের বাইরে পূজার উপাচার সাজিয়ে ব্রাহ্মণেরা অপেক্ষারত। সব আয়োজন সম্পূর্ণ, সব আবাহন প্রস্তুত। এবার শুধু অপেক্ষার পালা সেই ক্ষণের, যখন মল্লরাজ্যের উত্তরাধিকারীর উষ্ণ কোমল শরীরখানা তাঁর দু’হাতের মধ্যে থাকবে। দু’কানে বেজে উঠবে তার মঙ্গলময় ক্রন্দন ধ্বনি। চারপাশ মুখরিত হবে তার আগমন বার্তায়।

    ‘কী এত ভাবছ কুমার?’

    চিন্তার জাল ছিন্ন হয় রাজা প্রতাপনারায়ণের। তিনি ঘুরে দেখলেন কাকা রণেন্দ্রনারায়ণ প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে। হ্যাঁ, শৈশবের মতোই রণেন্দ্রনারায়ণ এখনও মল্লরাজকে কুমার বলেই ডাকেন। সদাহাস্যময় এই মধ্যবয়স্ক মানুষটাকে দেখলে বড় ভরসা জাগে প্রতাপনারায়ণের মনে। সর্বদা পরিপাটি পোশাকে সুসজ্জিত, সুগন্ধী আতরে পরিবেষ্টিত অকৃতদার এই মানুষটা মল্লরাজ্যের জন্য কীভাবে নিজের গোটা জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছেন, তা নিজের চোখে না দেখলে কেউ ধারণা করতে পারবে না। এই সময় রণেন্দ্রনারায়ণকে দেখে বড় প্রীত হয়ে উঠলেন মল্লরাজ।

    ‘কাকাবাবু আপনি! আসুন আসুন। আমি একদম খেয়াল করিনি। ছিঃ ছিঃ আমাকে ক্ষমা করবেন।’

    ‘ব্যস্ত হয়ো না কুমার। শুধু বাইরের এই ঝড় নয়, তোমার অন্তরেও যে ভীষণ

    ঝড় উঠেছে, সে খবর আমার অজ্ঞাত নয়। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি নিজেকে সামলাও। এই মুহূর্তে শুধু সংঘমিত্রাই নয়, গোটা রাজ্যের মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে। তোমাকে শক্ত থাকতে হবে। আর তো কিছু মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপরেই দুর্যোগের সমস্ত কালো মেঘ কেটে গিয়ে আলোর বন্যায় ভাসবে আমাদের মল্লরাজ্য। এই আমি বলে দিলুম। মিলিয়ে নিও।’

    ‘তাই যেন হয় কাকাবাবু, তাই যেন হয়।

    আবেগের আতিশয্যে আর নিজেকে ধরে

    রাখতে পারেন না প্রতাপনারায়ণ। শিশুর মতোই রণেন্দ্রকে মজবুত বাহুডোরে জড়িয়ে ফেলেন তিনি।

    ‘মঙ্গলময় ঈশ্বর সর্বদা রক্ষা করবেন মল্লরাজ্যকে। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ সস্নেহে প্রতাপনারায়ণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন রণেন্দ্র।

    এমন সময়ে হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা আলোড়নের শব্দ ভেসে আসে। অনেকগুলো গলা একসঙ্গে, বোধহয় একটা শিশুকান্নারও… অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে চোখ বুজে আসে প্রতাপনারায়ণের।

    ৩। রণেন্দ্র সহায়

    সবে শয্যা ছেড়ে প্রাতঃকালীন যোগ্যাভাসের আসনে বসার চেষ্টায় ছিলেন রণেন্দ্রনারায়ণ। তখনও রাতের পোশাক বদল হয়নি তাঁর। হঠাৎ দ্বাররক্ষীরা এসে সংবাদ দিল, স্বয়ং মল্লরাজ প্রতাপনারায়ণ তাঁর দর্শনপ্রার্থী। কালবিলম্ব না করে বাহিরকক্ষে এলেন রণেন্দ্রনারায়ণ । ‘এই প্রভাতে পশ্চিমের দরবারে কেন কুমার? সব কুশল মঙ্গল তো? পশ্চিম সীমায় কি আমার অগোচরে কোনও বিঘ্ন হল?’

    ‘সুপ্রভাত কাকাবাবু। প্রথমেই আমার অপরাধ মার্জনা করবেন। এভাবে বিনা সংবাদে আপনার সময় অপব্যয় করার জন্য।’

    ‘এভাবে বোলো না কুমার। বহির্জগতে তুমি যতই মহারাজ প্রতাপনারায়ণ হও না কেন, আমার কাছে তো তুমি সেই ছোট্ট কুমারই আছ। বলো, আবার কী নতুন সমস্যা এসে উপস্থিত হল মল্লরাজ্যের সামনে? ‘

    দুজনেই মুখোমুখি আসন নিলেন। রণেন্দ্রর ইশারায় দ্বাররক্ষীরা বাইরে চলে গেল। ‘আর নতুন করে কী বিপদ আসবে কাকাবাবু! পঞ্চম সন্তান হারিয়ে সংঘমিত্রা পাগলের মতো আচরণ করছে। সভাসদরা-প্রজারা উত্তরাধিকারীর অভাবে আমার মুণ্ডপাত করছে। আর শত্রুরা ভাবছে মল্লরাজ দুর্বল হয়ে গেছে, কবে হই-হই করে আক্রমণ করা যায়।’ গভীর দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলে উঠলেন প্রতাপনারায়ণ।

    ‘সবই আমার জ্ঞাত আছে কুমার। কিন্তু এই মুহূর্তে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই আমাদের হাতে। আর সংঘমিত্রাকে নিয়ে কে কী বলল, তা নিয়ে তুমি ভেবো না। সেটা সভাসদই হোক কিংবা কোনও প্রজা, রাজপরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটা জিভ ছিঁড়ে ফেলতে আমি বদ্ধপরিকর। আমার বয়স হয়েছে ঠিকই, কিন্তু

    আমার তরবারি এখনও আগের মতোই শাণিত রয়েছে।’

    ‘প্রজারা তো কিছু ভুল বলছে না কাকাবাবু। চারপাশের শত্রুরাজ্যরা যেভাবে উত্তরাধিকারীর আগমন উপলক্ষে বিশাল মহোৎসবের আয়োজন করছে, সেখানে এই রাজ্যের রাজপ্রাসাদ নিস্তব্ধ অন্ধকার!’

    ‘তাহলে তুমি কী বলতে চাইছ কুমার? বাকিদের কথা মেনে নিয়ে সংঘমিত্রাকে দূরে সরিয়ে নতুন করে সংসার পাতবে? এই তোমার ইচ্ছা?’

    ‘আপনি আজও আমাকে চিনলেন না কাকাবাবু?’ মৃদু হাসেন প্রতাপনারায়ণ । আমি মরে গেলেও সংঘমিত্রা ছাড়া আর কারও সঙ্গে ইহজীবনে একাত্ম হতে পারব না । তবে আপনি তো জানেন, আশেপাশের শত্রুরাজ্য ব্যতীত সব থানেই আমি আর সংঘমিত্রা মাথা ঠুকে এসেছি। মন্দির মসজিদ কিছুই বাদ দিইনি। কিন্তু পশ্চিমের জঙ্গলের…’

    ‘নাহ কুমার! তুমি কি পাগল হলে? এ অনুরোধ তুমি আমাকে করতে পারো না। বরং তুমি বলো কাকাবাবু আপনার কাটামুন্ডু চাই আমি হাসতে হাসতে তা তোমার হাতে তুলে দেব। কিন্তু আমি…’ ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন রণেন্দ্রনারায়ণ।

    ‘কিন্তু আমি কিছুতেই ওই খুনে জায়গার নরখাদক রাক্ষসগুলোর মধ্যে তোমাদের যেতে দেব না। অন্তত আমি বেঁচে থাকতে তো নয়ই!’

    উঠে পড়েন প্রতাপনারায়ণও। দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেন উত্তেজিত পিতৃব্যকে। ‘আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন কাকাবাবু। আমি কোনও ভাবেই সংঘমিত্রাকে ছাড়তে পারব না। আর তাই সব দৈবিক জৈবিক ক্রিয়া যখন ব্যর্থ হয়ে গেছে, তখন আমাদের এই সম্পর্ক তথা মল্লবংশকে টিকিয়ে রাখতে এটা ছাড়া আর উপায় কী বলুন? আলোর পথে যখন আমি বারে বারে ব্যর্থ হলাম, তখন আমাদের অন্ধকারের রাস্তাই শেষ আশ্রয়।’

    ‘তুমি কী উপায়ের কথা বলছ কুমার?’

    মন্দির!’ ‘পশ্চিমের ওই ভীষণ জঙ্গলের নরখেকোদের ওই দেবতার মন্দির! ডমরুদহের

    ‘ডমরুদহের মন্দির?’ সভয়ে চিৎকার করে উঠলেন রণেন্দ্রনারায়ণ।

    ‘এবার আমি নিশ্চিত, তুমি সত্যই পাগল হয়ে গেছ কুমার। এই নাম তুমি জানলে কী করে? এ নাম তো তোমার জানার কথা নয়! তোমার কেন, কারোরই জানার কথা নয়।”

    ‘জেনেছি কাকাবাবু। আর জেনেছি বলেই এর সত্যতা জানতে এসেছি আপনার কাছে। সেই কাঁচাখেগো দেবতাকে নাকি ভক্তিভরে ডাকলে ভক্তের সর মনোস্কামনা পূর্ণ হয়…?’

    ‘আমি তোমার সঙ্গে এ বিষয়ে আর কোনও কথা বলতে চাই না কুমার। আমাকে ক্ষমা করো।’

    ‘এভাবে বলবেন না কাকাবাবু, আপনি ছাড়া পশ্চিমের ওই ভীষণ জঙ্গলকে কেউ চেনে না। আপনার সাহায্য ছাড়া আমি ডমরুদহের মন্দিরে কোনওভাবেই যেতে পারব

    না। আমাকে করুণা করুন কাকাবাবু।”

    হঠাৎ করেই বাচ্চাদের মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রতাপনারায়ণ। লুটিয়ে পড়েন কাকা রণেন্দ্রনারায়ণের পায়ে।

    ৪। পশ্চিমের জঙ্গলে

    চারিদিকে চাপ চাপ অন্ধকার। মধ্যগগনে সূর্যের প্রখর উপস্থিতি সত্ত্বেও, এমন অন্ধকার কল্পনাতীত।

    বাইরের কেউ একথা বিশ্বাসই করবে না যে, এই খাঁ-খাঁ দুপুরেও পশ্চিমের জঙ্গল পেরোতে মশালের প্রয়োজন হচ্ছে। আর শুধু মশালই নয়, চাই দুর্জয় সাহস আর নিজের প্রাণশক্তির প্রতি অগাধ আত্মবিশ্বাস, তবেই এই ভয়ংকর গহীন জঙ্গল পার করা যাবে।

    খুব বিপদে না পড়লে কেউ এ জঙ্গলে আসে না। জঙ্গলের মাটি ঢেকে গেছে লম্বা লম্বা ঘাস আর নাম না জানা বুনো ঝোপের সমারোহে। ওপরে সুউচ্চ সব মহীরুহের দুর্ভেদ্য আচ্ছাদন। তাই সূর্যের আলোও এই জমাটবাঁধা অন্ধকারকে ভেদ করতে পারে না।

    কুয়াশার ঘন আস্তরণের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমের জংলি পথে কিছু মানুষকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। একটা পালকি, চারজন পালকিবাহক, ছয়জন তাগড়াই চেহারার লেঠেল, আর তাদের সঙ্গে সম্ভ্রান্ত পোশাকের এক মধ্যবয়স্ক মানুষ৷

    ‘আর কতটা পথ কাকাবাবু?’ পালকির ভেতর থেকে চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করলেন প্রতাপনারায়ণ।

    ‘সময় হলে সেই মন্দির নিজেই ধরা দেবে বাবা। তুমি অযথা উতলা হয়ো না। আমরা তো মানচিত্রের দেখানো পথেই চলছি। ভুল হবে না। শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো, আমরা যেন দ্রুত আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি।’ মৃদু কণ্ঠে উত্তর দিলেন রণেন্দ্রনারায়ণ।

    ‘কিন্তু কাকাবাবু, এই বুনো জায়গার আদিম অধিবাসী আর তাদের কালোজাদুর যে কাহিনি শুনলাম, তাতে বড় চিন্তা হচ্ছে। ওদের এই মুহূর্তে আটকানোর মতো লোকবল যে আমাদের নেই! আর তাছাড়া আমি পালকিতে আরাম করে যাচ্ছি আর আপনারা বাইরে একা এই বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিচ্ছেন। আমার যে বড় কুণ্ঠা জাগছে কাকাবাবু।’

    ‘দেখো প্রতাপ, পালকিতে তুমি একা নও, আমাদের রানিমাও রয়েছেন। তাঁর যেন কোনওরকম অসুবিধে না হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব এখন তোমার। আমরা তো বাইরে থেকে সবটা বুঝতে পারব না। তাই তুমি ওদিকে মন দাও। ওটাই তোমার প্রধান কাজ। আর তাছাড়া আমি রাজজ্যোতিষীকে দিয়ে ভালো করে গণনা করিয়েছি। আমাদের

    হিসাব ঠিক থাকলে, আজকের দিনটায় ওদের বেরোনোর কথা নয়। আশা করছি নিরুপদ্রবেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাব।

    আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন প্রতাপনারায়ণ, কিন্তু রণেন্দ্রর নির্দেশে চুপ করে যান। পালকির গতিরুদ্ধ হয়। সবাই রণেন্দ্রর অঙ্গুলি নির্দেশের দিকে তাকায়। গাছগাছালির সবুজ আস্তরণ ভেদ করে দূরে একটা পোড়ামাটির অট্টালিকা দেখা যাচ্ছে।

    ওঠেন।

    ‘ডমরুদহের মন্দির!’ রণেন্দ্রনারায়ণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই দুটো শব্দ উচ্চারণ করে

    কিন্তু পরক্ষণেই জঙ্গলের মধ্যে একটা আলোড়ন খেলে যায়। গাছের ডালপালা মটমট শব্দ করে আর্তনাদ করে ওঠে। কারা যেন সব কিছু পায়ে দলে-পিষে ছুটে আসছে তাদেরই দিকে। লেঠেলরা তাদের পেশি ফুলিয়ে লাঠি বাগিয়ে ধরে। পালকিবাহকেরা কাঁধ শক্ত করে। রণেন্দ্রনারায়ণ কোমরবন্ধ থেকে ধারালো তরবারিখানা তুলে ধরেন।

    কোত্থেকে যেন জনা দশেক কালি ঝুলি মাখা, বিচিত্র গাছের ডালপালা জড়ানো,

    অর্ধনগ্ন মানুষ তাদের ঘিরে ধরে। তাদের হাতে উদ্যত বর্শা আর তির ধনুক। এরাই এই পশ্চিমের জঙ্গলের আদিম আতঙ্ক, অসভ্য নরখেকো মানুষের দল। পালকি থেকে উদ্যত তলোয়ার হাতে লাফিয়ে নেমে আসেন প্রতাপনারায়ণ। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে খপ করে তাঁর হাতখানা ধরে ফেলেন রণেন্দ্র। কড়া দৃষ্টিতে সংযত হতে নির্দেশ দেন। তারপর শান্তস্বরে অদ্ভুত কটা শব্দ উচ্চারণ করেন।

    ‘লম ইটা না ভিন, ডমরুদ বাড়ি চ, মুই না মারি ইন্ডুবা, কীত্তা ইরিবে মানা…’ অর্থাৎ আমরা কোনও রক্তপাত চাইছি না। আমাদের মধ্যে থেকে কেবল দুজনকে ডমরুদহের মন্দিরে যেতে দাও। বড় বিপদে পড়ে আমরা এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি৷

    ৫। ডমরুদহের মন্দিরে

    ঝোপ জঙ্গলে ভর্তি পুরো জায়গাটা। তার মধ্যেই হঠাৎ করে খাপছাড়া ভাবে পোড়া মাটির উঁচু উঁচু গম্বুজ গড়ে উঠেছে। বিচিত্র সব কারুকার্য তার দেওয়াল জুড়ে। বীভৎস সব জংলি মূর্তি। এই জায়গার হাওয়াতেও যেন এক গোপনীয়তা ছেয়ে আছে। জঙ্গল জুড়ে হু-হু করে বইতে থাকা হাওয়া, এখানে এসে দম হারিয়েছে। অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ্য গোটা চত্বর জুড়ে।

    প্রাণের নিদর্শন বলতে, রাজা প্রতাপনারায়ণ আর সংঘমিত্রা বাদে গোটা কয়েক বিশালবপু দাঁড়কাক। গম্বুজের ওপরে তারা বসে আছে। কিন্তু ডাকছে না। বরং অদ্ভুতভাবে চেয়ে আছে তাঁদের দিকে। তাদের নিস্তব্ধ, ধারালো দৃষ্টি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে তাঁরা এখানে অবাঞ্ছিত।

    এটাই সেই ডমরুদহের মন্দির, নরখাদকেরা ছাড়া সেখানে কেউ অ গম্বুজের মুখে কিন্তু কোনও দরজা নেই। বুনো না। রানির হাতটা শক্ত করে ধরে গম্বুজের দিকে

    এগিয়ে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রতাপনারায়ণ। বহুকালের শুকিয়ে যাওয়া কালো জমাটবাঁধা রক্ত আর নাড়িভুঁড়ির অংশবিশেষ সেই গম্বুজের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে৷ বিশ্রী একটা উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সেগুলো থেকে। সাবধানে পাশ কাটিয়ে, সন্ত্রস্ত পায়ে দুজনে এগিয়ে চললেন গম্বুজের দিকে।

    সবে প্রবেশ করতে যাবেন, হঠাৎ… গম্বুজের প্রবেশদ্বারে অদ্ভুত চেহারার এক মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন তাঁরা। একটিমাত্র লাল কাপড়ে লজ্জা নিবারণ করা এক অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি। সারা গা ভর্তি বিচিত্র উল্কি! জরা যেন তার শরীরের প্রতিটা কোনা গ্রাস করে ফেলেছে। অথচ কোটরাগত দুটো চোখে কী অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য! ঠিক যেন আঁধারকুণ্ডের মাঝে ধিকধিকে দুটো রক্তাভ আগুনের গোলা দাউদাউ করে জ্বলছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ঠোঁটে আর কানে দুটো তামাটে বালা ছিদ্র করে বসানো।

    ‘কে তোরা? এখানে এসেছিস কেন? কে ঢুকতে দিয়েছে তোদের?’ মনে হল কানের সামনে যেন মেঘ ডাকল। প্রতাপনারায়ণ নিজেকে সামলে নিলেন। বুঝলেন, ইনিই এই মন্দিরের পুরোহিত।

    ‘আমরা পাশের মল্লরাজ্য থেকে এসেছি ঠাকুর। বড় কষ্টে আছি আমরা৷ ডমরু ঠাকুরের পুজো দিতে চাই।’

    ‘তাই? এত পুজো দেওয়ায় মন তোদের? কই দেখি তো!’

    বলে ধপ করে লোকটা প্রতাপনারায়ণের সামনে কী যেন একটা ছুড়ে দিল। কচুপাতায় মোড়া লালচে বস্তুটা হাতে নিয়ে দমকে বমি এল তাঁর। একটা সদ্যকাটা মানুষের হাত। কালো চামড়ার ওপর হলদেটে নখ। টপটপ করে গরম রক্ত পড়ছে সেটা থেকে।

    ধারা:’ ‘লে এটা খা বটে! ডমরু ঠাকুরের চড়ানো পেসাদ। দেখি তোদের ভক্তি কেমন

    প্রতাপনারায়ণ ভাবছিলেন, তিনি হয়তো এই ঘৃণ্য কাজ সম্পন্ন করতে পারলেও, সংঘমিত্রার পক্ষে এ কাজ কোনওভাবেই সম্ভবপর নয়। তাঁদের যাবতীয় পরিকল্পনা বোধহয় এখানেই শেষ।

    কিন্তু প্রকৃতির কী অদ্ভুত সৃষ্টি এই নারী! প্রতাপনারায়ণের আগেই ছুটে গিয়ে মাটি থেকে তুলে নিয়ে সেই প্রসাদে কড়মড়িয়ে কামড় বসালেন সংঘমিত্রা। পরপর পাঁচটি সদ্যোজাত সন্তান হারানো মা, প্রয়োজনে নিজেকে কী ইস্পাত কঠিন বানিয়ে ফেলতে পারে! তাঁর ফুলের মতো সংঘমিত্রাকে এই মুহূর্তে আদিম কোনও পিশাচিনীর মতো মনে হচ্ছিল তাঁর।

    ‘সাব্বাশ বেটা। পারবি, তোরাই পারবি।’ অট্টহাসি দিয়ে উঠল সেই বৃদ্ধ মানুষটা। ‘কিন্তু ডমরু ঠাকুরের পুজোর নিয়ম জানিস তো, একমন একপ্রাণ হয়ে ডাকতে হবে, তবেই ফুটবে ফুল, তা না হলে…’

    লোকটা কথা শেষ করে উঠতে পারল না, তার আগেই জঙ্গলের ভেতর থেকে

    একটা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এল। রণেন্দ্রনারায়ণের আনা বারুদের খোলায় অগ্নিসংযোগ হয়েছে। কিন্তু সেদিকে কান দেওয়ার সময় ছিল না প্রতাপনারায়ণের। তাঁর চোখ তখন চলে গেছে মন্দিরের ভিতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে।

    ৬। অভিলিপ্সার আগমন

    প্রতাপনারায়ণের চোখে ঘুম নেই। অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। ডমরুদেবতার আশীর্বাদেই হোক কিংবা পড়শি রাজ্য মোহনপুরের নামকরা বৈদ্যরাজের হাতের পাঁচন-

    বছর ঘুরতেই রানির কোল আলো করে এসেছিল তাঁদের একমাত্র কন্যা, অভিলিপ্সা৷ রাজকুমারী অভিলিপ্সা, প্রতাপনারায়ণের দু-চোখের মণি, তাঁর বুকে এত বছরের জমে থাকা অন্ধকারের মধ্যে জ্বলতে থাকা এক চিলতে আলো। ছোট ছোট অথচ বলিষ্ঠ দুটো হাত দিয়ে যখন রাজকুমারী তাঁর গলা জড়িয়ে ধরত, তখন আবেগে প্রতাপনারায়ণের দু’চোখ বুজে আসত। মনে হতো এই তো সেই সুযোগ্য হাতগুলো, যার উপর মল্লরাজ্যের দায়ভার দিয়ে তিনি নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পারবেন। অনেক দিনের পর বড় আনন্দে সময় কাটছিল তাঁদের। মুষড়ে থাকা মল্লরাজ আর বিষণ্ণ মল্লরাজ্য, উভয়েই তখন ভরে গিয়েছিল সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধিতে।

    কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হল না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিলিপ্সার অসামান্য রূপ সবার নজরে পড়তে লাগল। পিতা হিসাবে প্রতাপনারায়ণের শঙ্কাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। অভিলিপ্সার কামরার চারপাশে সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা করলেন তিনি। কিন্তু তবু তাঁর মনে হতে লাগল, কে যেন সর্বদা তাঁর একরত্তি মেয়েটার ওপর নজর রেখে চলেছে। সুযোগ পেলেই সে কেড়ে নেবে তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় রাজকুমারীকে।

    রানিকে বললে, সবটা হেসে উড়িয়ে দিতেন সংঘমিত্রা৷ বলতেন, এ সবই নাকি এক অতি সাবধানী পিতার মনের ভুল। থেমে যেতেন প্রতাপনারায়ণ, কারণ সবটা বললে, সংঘমিত্রার মুখে এত বছর পরে যে হাসি ফুটেছে, সেটা নিমেষে হারিয়ে যেত। তাই তিনি কাউকেই বলতে পারতেন না, যে কীভাবে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা তাঁর সুযোগ্য অতন্দ্র প্রহরীদল কালঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত আর রাজকুমারী একা একা ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেত।

    কখনও রাজবাগানে, কখনও পশ্চিমমহলের ছাদের ওপর ফুলের মতো অভিলিপ্সাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছেন প্রতাপনারায়ণ। যাতে অযথা লোক জানাজানি না হয়, তাই তিনি নিজের হাতে অভিলিপ্সাকে কোলে করে ফিরিয়ে আনতেন তার ঘরে। এভাবে রাতের পর রাত নজর রাখতে গিয়ে, নিজের রাতের ঘুমই হারাতে বসেছেন প্রতাপনারায়ণ । কিন্তু তিনি নিরুপায়। নজর তাঁকে রাখতেই হবে।

    বিশেষত, রাজবৈদ্যের কথাগুলো এখনও স্পষ্ট তাঁর কানে বাজে। শিশুবয়সে রাজকুমারীর ঘন ঘন জ্বর আসত। আবার নিজের থেকে সেরেও যেত। ভারি অদ্ভুত জ্বর! অভিলিপ্সার নাড়ি দেখতে গিয়ে আঁতকে উঠেছিলেন রাজবৈদ্য। তাঁর মুখের ফ্যাকাসে

    ভাব দেখে অবাক হয়েছিলেন প্রতাপনারায়ণ। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে রাজবৈদ্য বলেছিলেন, এমন নাড়ির স্পন্দন তিনি জীবনে অনুভব করেননি। তাঁর এত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, এই স্পন্দন কোনও মানুষের হতেই পারে না। তীব্র ভর্ৎসনা করে রাজবৈদ্যকে রাজ্যছাড়া করিয়েছিলেন মল্লরাজ। কিন্তু চিন্তা তাঁকে ছাড়ল কই। কারণ, জ্বরের দিনগুলোতেই আরও বেশি করে অভিলিপ্সাকে নৈশাভিসারে বেরোতে দেখেছেন তিনি।

    ৭ । অভিলিপ্সার অভিসার

    পুষ্করিণীর টলটলে স্বচ্ছ জলের মধ্যে রাজকুমারী অভিলিপ্সার সর্বাঙ্গ দেখতে পাচ্ছিল বিহান। উত্তেজনা আর অপরাধবোধের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে কাঁপুনি খেলে যাচ্ছিল তার সারা শরীরে। এটা পাপ, চরম পাপ জেনেও, সে আত্মরমণের এই মোহময় সুযোগ থেকে নিজেকে সরাতে পারছিল না।

    মল্ল রাজকুমারীর ভিজে কাপড়ের নীচে ফুটে ওঠা যৌবন দেখে বিহানের সারা শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইচ্ছে করছে, কাস্তে ধরা এই কঠোর হাতদুটো দিয়ে অভিলিপ্সার নরম স্তনদ্বয় সজোরে চেপে ধরে, দুমড়ে মুচড়ে আপন করে নিতে। রাজকুমারীর সঙ্গোপনে লালিত যোনির লালিমাতে চিরতরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে বিহানের। কিন্তু হায়, মল্ল রাজপুরীর এ মহার্ঘ প্রসাদে তার কোনও অধিকার নেই। সে যে সামান্য এক বাগান পরিচার্যকের সন্তান মাত্র!

    যদিও রাজপুরীর এই অন্তঃপুষ্করিণীতে পুরুষদের প্রবেশ একেবারেই নিষিদ্ধ। সুউচ্চ প্রাচীর আর চারধারে রক্ষী পরিবেষ্টিত এইস্থানে শুধুমাত্র রাজপরিবারের মহিলা আর পরিচারিকারাই যেতে পারে। কিন্তু মালির ছেলে হিসাবে পুষ্করিণী সংলগ্ন বাগান পরিষ্কার করার সময় ’এই গোপন অমৃতকুম্ভের সন্ধান পায় বিহান।

    সমস্ত উত্তেজনায় বেড় পরিয়ে, নিজের শরীর মনকে শান্ত রেখেছে সে, যাতে ঝোপের মধ্যে একটা পাতা নড়ারও শব্দ না হয়। কারণ একবার ধরা পড়লে তার এই ছোট্ট শরীরটা, তরবারির কত টুকরোতে যে বিভক্ত হতে পারে, তা সে নিজেও জানে না।

    ‘আমাকে স্নানরত দেখেই তোমার সব সাধ মিটে যাবে আগন্তুক?’ বিহানের কানের কাছে যেন বাজ পড়ল। কোনও বিষাক্ত নাগিনীর উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে যেন নিমেষে থমকে গেল, তার গোটা শরীর, সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

    ‘ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসো। না হলে আমি নিজেই প্রহরীদের ডেকে আনব। অভিলিপ্সার সিক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল পুষ্করিণী থেকে।

    আর উপায় নেই, বুঝতে পারল বিহান। ঝোপের আড়াল থেকে নিজেকে মুক্ত করে, পুষ্করিণীর সামনে এসে দাঁড়াল সে।

    ‘এবার তোমার পরনের কাপড়গুলো খুলে ফেলো আগন্তুক। তুমি আমাকে নিবস্ত্র দেখেছ, এখন তোমাকে উলঙ্গ না দেখলে শোধ বোধ হবে কী করে তাই না?” খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রাজকুমারী অভিলিপ্সা। হাসলে তাকে যেন আরো মোহময়ী

    দেখায়। নিমেষে নিজের শিকড়ের কথা, নিজের পরিণতির কথা… সবটাই বেমালুম ভুলে যায় বিহান। সে দ্যাখে জল থেকে ক্রমশ ওপরে উঠে আসছে রাজকুমারী, এগিয়ে আসছে তার দিকেই, নারী শরীরের গোপন বিভাজিকাগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিহানের সামনে।

    ‘কই, দেরি করছ কেন? পোশাক খুলতে এত সময় লাগে নাকি? দেখি তোমার সেই দুঃসাহসী শিশ্নের পরাক্রম, যার বলে বলীয়ান হয়ে তুমি এত স্পর্ধা লাভ করেছ? তবেই না তোমাকে আমার অন্তঃপুরে প্রবেশের অধিকার দেব।”

    ৮। বিপদের দুন্দুভি

    সারা রাজ্য জুড়ে আজ আলোর রোশনাই। ফটকে ফটকে রঙিন বস্ত্রের কারসাজি। রাস্তা ঢেকেছে সুগন্ধী পুষ্পে। ভিয়েন বসেছে মাঠ জুড়ে। কত রকমের মন্ডা মিঠাই, তাদের কী লোভনীয় গন্ধ, ম-ম করছে চারধার। শয়ে শয়ে মানুষ পাত পেড়ে খেয়ে যাচ্ছে। কত নতুন ধরনের ব্যঞ্জন। যেমন তাদের রূপ তেমনি তাদের স্বাদ। অমন খাবার সচরাচর কেউ খায়নি এ রাজ্যে। প্রজারা সেই ব্যঞ্জন খেয়ে মল্লরাজকে দু’হাত তুলে তাদের ভালোবাসা আর আশীর্বাদ জানিয়ে যাচ্ছে।

    এমন আনন্দের দিন খুব কমই এসেছে এ রাজ্যে। পুবের জানলায় দাঁড়িয়ে, আলো ঝলমলে গোটা রাজ্যকে নিরীক্ষণ করতে করতে ভাবছিলেন মল্লরাজ প্রতাপনারায়ণ। এর আগে মাত্র একবারই এত আনন্দের অবকাশ হয়েছিল। যখন বহু বাধা বিপদ পেরিয়ে সংঘমিত্রার কোল আলো করে এসেছিল মল্লরাজ্যের উত্তরাধিকারিণী, রাজকুমারী অভিলিপ্সা৷ তার সুমিষ্ট কান্নায় ভরে গিয়েছিল রাজমহলের প্রতিটা কোনা! পূরণ হয়েছিল প্রতাপনারায়ণের এত দিনের প্রার্থনা।

    তাঁর সেই প্রাণের প্রিয় রাজকুমারীর আজ ষোড়শতম জন্মদিন। সেই উপলক্ষ্যে আজ এই আনন্দ উৎসবের আয়োজন করেছেন মল্লরাজ।

    ‘যেখানে গোটা মল্লরাজ্য আনন্দে মাতোয়ারা, সেখানে মল্লরাজ স্বয়ং কেন নিজেকে এই অন্ধকার পুরীতে আবদ্ধ করে রেখেছেন।’ কক্ষে প্রবেশ করলেন রানি সংঘমিত্রা৷ ‘এমন আনন্দঘন দিনে, এসব স্থূল রসিকতা নাইবা করলে রানি!’ ম্লান হাসেন মল্লরাজ।

    ‘রসিকতা? রসিকতা তো সেই মন্দিরের দেবতা আমাদের সঙ্গে করেছিলেন মহারাজ। আমরা তো তাঁর হাতের ক্রীড়নক মাত্র।’ উত্তেজনার বশে চিৎকার করে উঠলেন রানি সংঘমিত্রা।

    ‘তুমি কি বলতে কী চাইছ রানি? স্পষ্ট করে বলো।’ প্রতাপনারায়ণের কণ্ঠে ঈষৎ ক্রোধ প্রকাশ পেল।

    ‘আপনি কী কিছুই অনুভব করেন না, কিছুই দেখেন না?”

    ‘আমাকে একটা গোটা রাজ্য চালাতে হয় রানি। শুধু তোমাকে আর তোমার মেয়েকে নিয়ে আমার জগৎ সীমাবদ্ধ নয়।”

    ‘জানি তো৷ আর জানি বলেই আপনাকে আগাম সতর্ক করতে এসেছি রাজন, আমাদের মেয়ের সম্পর্কে।’

    ‘সতর্ক? ওই একরত্তি মেয়ের ব্যাপারে? হাসালে তুমি রানি।’ হা হা করে হেসে ওঠেন প্রতাপনারায়ণ।

    ‘রাজধর্ম আপনি অবশ্যই পালন করুন মহারাজ। সে বিষয়ে আমি আপনাকে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু সেই সঙ্গে পিতৃধর্মটাও করুন, এটা আমার অনুরোধ!’ ‘পিতার কোন ধর্ম আমি পালন করিনি রানি?’

    ‘আপনি জানেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আপনার মেয়ে তার নিজের কক্ষে থাকে না? ’

    ‘কোথায় যায় সে?’ সব জেনেও না জানার ভান করেন প্রতাপনারায়ণ।

    ‘কেউ জানে না মহারাজ। আজকাল তাকে প্রশ্ন করলে ঠিক করে উত্তরও দেয়

    না। জোর করলে, কীরকম একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার বড় ভয় করছে মহারাজ।”

    ‘নিজের কোলের সন্তানকে তোমার ভয় লাগে রানি! তুমি কি সত্যিই পাগল হলে? বয়সের ভার গ্রাস করল তোমার বোধ বুদ্ধিকে ? ’

    ‘ভয় পাব না মহারাজ? মালির ছেলে, গাড়োয়ানের ছেলে, এমনকী মিনা আম্মার ছোট্ট মেয়েটাও, সবার মৃত্যু, নিশ্চয়ই নিছক দুর্ঘটনা হতে পারে না।’

    ‘ওরা সাপের কামড়ে মারা গেছে রানি। ওদের নীল শরীর সেটারই জানান দিয়েছিল।’ দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন প্রতাপনারায়ণ।

    ‘সেভাবেই তো আপনি ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা দিয়েছেন মহারাজ। কিন্তু ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলুন তো, একবারের জন্যও আপনার মনে দ্বিধা কাজ করেনি? এতগুলো মানুষ পরপর কী করে সাপের কামড়ে মারা গেল? অন্তিম অবস্থায় তারা উলঙ্গই বা ছিল কেন?”

    ‘তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ সংঘমিত্রা?’

    কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর রানি সংঘমিত্রা বললেন, ‘আপনি যখন আমার মুখ থেকেই কথাগুলো শুনতে চাইছেন, তাহলে শুনুন মহারাজ। ওই কিশোর-কিশোরীগুলো আপনার কন্যা অভিলিপ্সার খুনে লালসার শিকার, সে আসলে একটা ডাইনি, একটা ক্ষুধার্ত শরীর পিশাচিনী…’

    ‘রানি!’

    ক্রোধে ফেটে পড়লেন প্রতাপনারায়ণ, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। এত বছরের মর্যাদা ভুলে, আঘাত হানলেন রানি সংঘমিত্রার গায়ে।

    ৯। অন্তিমের অপরাহ্নে

    হা ঈশ্বর, ক্ষণিকের উত্তেজনার বশে তিনি এ কী সর্বনাশ করে ফেললেন। দেবীসম যে নারীকে তিনি চোখের মণি করে রেখেছেন এতগুলো বছর ধরে, শরীরে আঘাত তো

    দূরের কথা, যার সঙ্গে কোনওদিন উচ্চৈঃস্বরে কথা পর্যন্ত বলেননি প্রতাপনারায়ণ, আজ সেই সংঘমিত্রার গায়ে হাত তুললেন তিনি? নাহ, তিনি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন না।

    সম্বিত ফিরে পেতেই, অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে লাগলেন মল্লরাজ। ক্ষমা চাইতে হবে। চরম ক্ষমা চাইতে হবে প্রিয়তমার কাছে। কিন্তু রানি কোথায়? সারা মহল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সংঘমিত্রার হদিশ পাননি প্রতাপনারায়ণ। সেই যে পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে তিনি দৌড়ে চলে গেছেন কক্ষ ত্যাগ করে, আর তাঁকে দেখতে পাননি তিনি

    আসলে অত্যন্ত অভিমানী নারী সে। স্বপ্নেও বোধহয় ভাবেননি, তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় মানুষ, তাকে এমন অযাচিত আঘাত হানতে পারে কোনওদিন। তাই এই আঘাত তাঁর মরমে গিয়ে বিঁধেছে। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে তাঁর সংযমের বেড়া। লোক জানাজানি হওয়ার ভয়ে বড় সৈন্যদল পাঠাতে না পারলেও, প্রতাপনারায়ণ বিশ্বস্ত কয়েকজন রক্ষীকে মহলের চারপাশে পাঠালেন রানিকে খুঁজে আনতে।

    আর নিজে চললেন রাজকুমারী অভিলিপ্সার কক্ষের দিকে। এতদিন সব কিছু জেনেও চুপ করে ছিলেন তিনি। হ্যাঁ, রাজকুমারীকে ঘিরে এই ঘটে চলা মৃত্যুমিছিলকে নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন বটে! তবে অপত্য স্নেহ, আর নিজেরই সন্তানের প্রতি অগাধ অন্ধবিশ্বাস তাঁর দক্ষ রাজচক্ষুর সামনে স্নেহশীল পিতার পর্দা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এতদিন৷ কিন্তু আজ সংঘমিত্রার কথায় প্রতাপনারায়ণের সেই চিন্তার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।

    ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে তিনি চললেন প্রাসাদের একদম শেষ প্রান্তে থাকা, কুমারী মহলের দিকে। সেখানেই রয়েছে রাজকুমারী অভিলিপ্সা। রাজকুমারীর ইচ্ছাতেই মহলের এই নির্জন বিচ্ছিন্ন প্রান্তে তার থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন প্রতাপনারায়ণ। এদিকটা আলোবাতাস বেশ কম ঢোকে বলে, কোনওকালেই প্রাসাদের এইপাশখানা পছন্দ ছিল না তাঁর। কিন্তু মেয়ের আবদারের সামনে তিনি চিরকালই এক অসহায় পিতা৷

    রাজকুমারীর কক্ষে প্রবেশ করতে গিয়েই অদ্ভুত একটা গন্ধ পেলেন প্রতাপনারায়ণ। এ গন্ধ দামি আতরের নয়, কোনও সুগন্ধী ফুলের নয়। এ গন্ধ, ঘামে ভেজা প্রেয়সীকে রমণের পরমুহূর্তে আলিঙ্গন করার গন্ধ। এ গন্ধ পৃথিবীর সব থেকে প্রিয় কোনও বস্তুকে, হাতের নাগালের মধ্যে পেয়ে যাওয়ার গন্ধ। মৃদু অথচ মাদকতাময় গন্ধটা ভেসে আসছে রাজকুমারীর কক্ষ থেকেই।

    অদ্ভুত এক বিহ্বলতা ঘিরে ধরল প্রতাপনারায়ণের শরীর ও মনে। অন্যদিনের মতো, সহবতপূর্ণ আওয়াজ না তুলেই, সবেগে অভিলিপ্সার কক্ষে প্রবেশ করলেন তিনি। কিন্তু পরমুহূর্তেই থমকে গেলেন। রাজকুমারীর বিছানায় আদুল এক নারী শরীর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ করতে গিয়েও পারলেন না তিনি। সেই বিছানা জোড়া শরীরী টান তাঁর দুটো চোখকে মুদিত হতে দিল না। দীর্ঘাঙ্গী সেই শরীরে একফালি কাপড়ের লেশমাত্র নেই। কেবল, ঘন ঢেউ খেলানো চুল ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁধের আব্রুটুকু রক্ষা করছে।স্থান কাল পাত্র ভুলে প্রকৃতির এই আদিম আর সুন্দরতম দৃশপটের সাক্ষী হতে থাকেন তিনি। কে এই মোহময় না এ তো তার স্নেহের কন্যা নয়।

    ‘দরজার আড়ালে কেন পিতা? আমার সামনে আসুন। লজ্জা কী? আপনি তো আমাকে জন্মমুহূর্তেও আদুল দেখেছেন।’

    ‘নাহ।’ চিৎকার করে ওঠেন প্রতাপনারায়ণ। নিমেষে নিজের মোহাচ্ছন্ন অবস্থা ছিন্ন হয় তাঁর। লজ্জা ঘৃণা ভয়ে কেঁপে ওঠে তাঁর সারা শরীর। হা ঈশ্বর! এ কী পাপ করে ফেললেন তিনি। এ কোন নিম্নস্তরের রুচি গ্রাস করল তাঁর অস্তিত্বকে।

    ছুটে বেরিয়ে এলেন প্রতাপনারায়ণ, বিহ্বল হয়ে তিনি চললেন ভাঙ্গা গড়ের দিকে। রাজমহলের এই ভেঙে পড়া বিপজ্জনক অংশে কেউ আসে না৷ কিন্তু এই মুহূর্তে এই জনহীন প্রান্তরই ঢেকে দিতে পারে প্রতাপনারায়ণের যাবতীয় লজ্জাকে। তবে একটা কথা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে এল প্রতাপনারায়ণের।

    ডমরুদহের মন্দিরের সেই পুরোহিত, সেদিন বলেছিল, ‘এক মন এক প্রাণ হয়ে ডাকতে হবে, তবেই ফুটবে ফুল, না হলেই হবে মস্ত ভুল।’ সংঘমিত্রা বোধহয় সেই মুহূর্তে ডমরুঠাকুরের কাছে শুধু সন্তানই চেয়েছিল। কিন্তু প্রতাপনারায়ণ তো জানেন, তিনি সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে চেয়েছিলেন অর্থ ও প্রাচুর্য্য আর মল্লরাজ্যের দিগন্তভরা বিস্তৃতি। সেই লোভের অন্ধকারই আজ গ্রাস করেছে তাঁকে কারণ, বিবেকের বিষে জ্বলতে থাকা মল্লরাজ, আজ অভিলিপ্সার চোখে চোখ রেখে সেই ঘূর্ণায়মান অন্ধকারটাই দেখতে পেয়েছিলেন, যেমনটা পেয়েছিলেন, ডমরুদহের মন্দিরের সেই বেদীটার ওপরে। হঠাৎ বিশাল এক চাঁই খসে পড়ল মহলের ভাঙা ছাদ থেকে। অন্তিম লগ্নে

    দু’চোখ ভরে একবার নিজের রাজ্যকে দেখে নিলেন মল্লরাজ প্রতাপনারায়ণ।

    ১০। ডমরুদেবতার আশীর্বাদ না অভিশাপ?

    রাজপুরীর পুবের জানলায় আজ একা দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ রণেন্দ্রনারায়ণ। কক্ষে আর কেউ নেই। না প্রতাপনারায়ণ, না সংঘমিত্রা আর না অভিলিপ্সা। তারা সবাই আজ বহুদূরে অনন্তপুরের যাত্রী হয়ে গেছে। প্রতাপনারায়ণ কেন সব জেনেও মহলের ওই বিপজ্জনক অংশে গিয়েছিলেন তা কেউ জানে না।

    রানি সংঘমিত্রা উধাও হয়ে গেছেন চিরদিনের মতো। রাজকুমারী অভিলিপ্সাকেও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই খানিকটা বাধ্য হয়েই, মল্লরাজ্যের এই ঘোর দুর্যোগের দিনে, এই রাজ্যের তথা মল্লপরিবারের সবথেকে যোগ্যতম প্রতিনিধি হিসাবে, রণেন্দ্রনারায়ণকেই এগিয়ে আসতে হয়েছে।

    তবে তিনি যে শুধু নিজের ইচ্ছেয় এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তা নয়। সমস্ত সভাসদ, প্রজাবর্গ, দুহাত তুলে তাঁর কাছে আর্জি জানিয়েছে, মল্লরাজ্যের এই ঘোর বিপদের দিনে খড়কুটো হয়ে তাদের আশ্রয় দান করতে। শত্রু রাজ্যের সেনাবাহিনী যখন অভিভাবকহীন মল্লরাজ্যের সীমানায় বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে, এমন সময় পশ্চিম মহলের রণেন্দ্রনারায়ণ ছাড়া আর কেই বা ছিল এই রাজ্যের দায়িত্ব নেবার জন্য !

    তাই সর্বসম্মতিক্রমে মল্লরাজের আসনে রণেন্দ্রনারায়ণের আরোহণ ছিল শুধুই

    সময়ের অপেক্ষা। আজ ঊষালগ্নে সেই মহাক্ষণ এসে উপস্থিত। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মল্লরাজ্যের সিংহাসনে রণেন্দ্রনারায়ণের অভিষেক হবে। তবে তিনি কি খুব একটা খুশি হতে পারছেন? পুবের লালচে ঊষাকিরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠা তাঁর কপালের কুঞ্চিত বলিরেখাগুলো কি শুধুই বয়সের ভাঁজ ?

    রাজ অন্তঃপুরী থেকে ভেসে আসা রাজ্যাভিষেকের প্রস্তুতির হট্টগোলের দিকে রণেন্দ্রনারায়ণের কোনও খেয়াল ছিল না। খেয়াল ছিল না নগরীর প্রধান মন্দির থেকে ভেসে আসা মঙ্গলধ্বনির দিকেও। তাঁর চোখে তখন ভেসে উঠছিল বছর কুড়ি আগে ঘটে যাওয়া এক ধূসর দৃশ্যের।

    যেখানে পশ্চিমের ভয়ানক জঙ্গল পেরিয়ে একা এক ব্যক্তি চলেছে ডমরুদহের মন্দিরের দিকে। মন্দিরের সামনে পৌঁছে সে যেন কাউকে খুঁজছে৷ কিছু সময় পরে মন্দিরের ভেতর থেকে একটা কালো ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। তার পরনে একফালি লাল বস্ত্র। সে জলদগম্ভীর স্বরে সেই ব্যক্তিকে প্রশ্ন করল, ‘কে তুই? এখানে কী চাস?’ ‘বাবাঠাকুর আমি মল্লরাজ্যের রণেন্দ্রনারায়ণ, আমি ডমরু দেবতার পুজো দিতে চাই।’

    ‘কী তোর মনোস্কাম ? ”

    ‘বাবাঠাকুর, আমি মল্লরাজ্যের… রাজা হতে চাই!’ অদ্ভুত এক ক্রূর হাসি দেখা গেছিল সেদিনের সেই ব্যক্তির মুখে। ঠিক যেমনটা আজ দেখা যাচ্ছে মল্লরাজ্যের ভাবী মহারাজ রণেন্দ্রনারায়ণের মুখে। তফাত বলতে শুধু, তাঁর মুখের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠা মাঝের কুড়ি বছরের বলিরেখাগুলো।

    হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসা গোলমালের শব্দে বর্তমানে ফিরে আসেন তিনি। একদল লোক কাউকে যেন একটা ধরে বেঁধে নিয়ে আসছে৷ একটা তীব্র জান্তব কোলাহল ভেসে আসছে সেই ভিড় থেকে।

    ‘কে ওখানে’? হুংকার দিয়ে ওঠেন রণেন্দ্রনারায়ণ।

    ‘আজ্ঞে আমি, মহামন্ত্রী।’

    ‘কী সংবাদ? ‘

    ‘অভিলিপ্সাকে পাওয়া গেছে রাজন। এবার কী করণীয়?’

    ‘তুমি এতকালের মন্ত্রী। তোমাকে এখনও সবটা বলে দিতে হবে? ডমরুদেবতার অভিশাপকে হাপিশ না করলে, তাঁর আশীর্বাদ আমার উপর ফলবে কী করে? ওই ঘৃণ্য পিশাচিনীর কাজ শেষ হয়েছে এবার, ওকে মুক্ত করো!

    এই বলে দু’হাত শূন্যে তুলে হাসতে থাকেন মল্লরাজ্যের ভাবী রাজা, মহারাজ রণেন্দ্রনারায়ণ।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরহস্যে ঘেরা হিমালয় – অনিরুদ্ধ সরকার
    Next Article দাঁড়াও সময় (কাব্যগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার

    Related Articles

    সৈকত মুখোপাধ্যায়

    খেলার নাম খুন – সৈকত মুখোপাধ্যায়

    January 5, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }