সেই সব হরিণীরা – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
প্রাথমিক পরিচয়পর্ব মেটার পর পোর্ট ব্লেয়ারের বন দপ্তরের অধিকর্তা অনন্ত মুখার্জি বললেন, ‘আপনার নাম আমি প্রথম শুনি মধ্যপ্রদেশের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর প্রেম সিং-এর মুখে। আপনি বাঙালি জেনে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এত অল্পবয়সি ভাবিনি। আপনি তো এই বয়সেই পশু চিকিৎসক হিসাবে বেশ নাম করে ফেলেছেন।’ এ কথা শুনে রৌনক একটু লজ্জিত ভাবে বলল, ‘না স্যার, তেমন কোনও ব্যাপার নয়। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি মাত্র। মধ্যপ্রদেশের ওই জঙ্গলে যে ঘটনা ঘটেছিল সেটা হল—হরিণদের জল পান করার জন্য যে কৃত্রিম জলাধারগুলো থাকে তার একটার জল দূষিত হয়ে গেছিল, আর তা পান করার ফলেই ওদের খুরে ফাংগাস ইনফেকশন হয়েছিল। ব্যাপারটা তেমন বড় কিছু নয়।’
মুখার্জি সাহেব ফের বললেন, ‘যাই হোক, ব্যাপারটা আপনিই ডিটেক্ট করে প্রাণীগুলোকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। অন্যরা তো পারেননি। জানেন তো, অবাঙালিদের মুখে কোনও বাঙালির প্রশংসা শুনলে আমার বেশ গর্ব বোধ হয়। হয়তো বা আমি প্রবাসী বাঙালি বলেই। জানেন নিশ্চয়ই, এখানে প্রচুর বাঙালি আছেন যাঁরা কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানেই বসবাস করেন।
‘তবে একটা দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, আন্দামানের বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বাংলার বদলে হিন্দিকেই নিজেদের ভাষা করে নিচ্ছে। বলতে গেলে পোর্ট ব্লেয়ারে এখন যোগাযোগের ভাষাই হল হিন্দি। তা আপনি কি এর আগে কখনও আন্দামানে এসেছেন? রৌনক জবাব দিল, ‘না, এই প্রথমবার আসা।”
তিনি বললেন, ‘এক সময় এই কালাপানির দেশ ভারতীয়দের কাছে কতটা ভয়ঙ্কর জায়গা ছিল তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। সেলুলার জেল দেখলেই তা বোঝা যায়। তবে এখন এই দেশটা বেশ সুন্দর। চারপাশের সমুদ্র, সবুজ গাছে ভরা দ্বীপ, নির্মল আকাশ— সব মিলিয়ে মিশিয়ে বড় ভালো লাগে। এ জায়গার প্রেমে পড়েই তো গত তিরিশ বছর এখানে রয়ে গেলাম।’
এ কথা বলার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখার্জি সাহেব সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন, ‘সমস্যাটা এবার আপনাকে খুলে বলি। আমাদের এখানে বেশ অনেক ক’টা দ্বীপেই হরিণ আছে। চিতল হরিণ। এক সময় কিন্তু আন্দামানে হরিণ ছিল না। ব্রিটিশরা যখন এখানে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে, আন্দামানের দ্বীপগুলোকে বন্দিশিবির হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন তারা ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে হরিণ এনে এখানে ছেড়ে দেয়।
‘হরিণগুলোও এখানে বংশ বিস্তার শুরু করে। যখন প্রথম হরিণগুলোকে এখানে আনা হয়েছিল, তখনও কিন্তু সেলুলার জেল তৈরি হয়নি। রস আইল্যান্ড ছিল এই দ্বীপরাজ্যের শাসন কেন্দ্র। দ্বীপের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, আর প্রয়োজনে শিকারের আনন্দ নেবার জন্যই হরিণগুলোকে ছাড়া হয়েছিল রস আইল্যান্ডে।
‘এবার বলি আর একটি ছোট দ্বীপের কথা। রস আইল্যান্ড থেকে তার দূরত্ব দশ মাইলের মতো। তার পোশাকি নাম একটা থাকলেও স্থানীয় লোকেরা তাকে নাচনী দ্বীপ বলে ডাকে। ওখানে দ্বীপের মধ্যে ব্রিটিশ আমলের তৈরি একটা নাচঘর আছে। এখন যদিও সেই নাচঘরে খণ্ডহর অবস্থা। আমার ধারণা এই নাচঘরের জন্যই ওই দ্বীপের নাম হয়েছিল নাচনী দ্বীপ। ওটা ছিল ব্রিটিশ অফিসারদের ফুর্তি করবার জায়গা। যে জন্য ওই দ্বীপে কিছু হরিণ ছাড়া হয়েছিল।
‘আর ওই হরিণগুলোকে নিয়েই সমস্যা। এই কয়েক মাস ধরে ওখানকার হরিণগুলোর গায়ে লম্বা লম্বা ক্ষত চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। লাল দগদগে দাগ। এই দাগ থেকে ইনফেকশন হচ্ছে ওদের গায়ে। কিছু হরিণকে মরে পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। ওই রোগের কারণ আমরা ঠিক উদ্ধার করতে পারছি না। আর সে জন্যই আপনাকে ডেকে আনা…।’ একটানা কথাগুলো বলে দম নেবার জন্য থামলেন তিনি।
রৌনক বলল, ‘এই অক্টোবর-নভেম্বর মাস তো ওদের মিলন ঋতু। নারীর অধিকার নিয়ে অনেক সময় পুরুষ হরিণরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে। এছাড়া অনেক সময় মিলনে অনিচ্ছুক হরিণীকেও আঘাত করে। এই দাগ সেই দাগ নয়তো?”
মুখার্জি সাহেব বললেন, ‘সম্ভবত তা নয়। কারণ দাগগুলো খুব একটা গভীর নয়। কয়েকটা হরিণীর দেহ উদ্ধার করে এনে আমরা পোস্ট মর্টেম করেছিলাম৷ তাতে বোঝা গেছে ওগুলো হরিণের সিং-এর আঘাত নয়। এ ব্যাপারে আর একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি। ওই দ্বীপে একটাই পুরুষ হরিণ আছে। বাকি সব কিন্তু হরিণী।’ রৌনক একটু ভেবে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, ওই দ্বীপে কি মানুষ থাকে? মানুষেরা আঘাত করেনি তো?”
তিনি বললেন, ‘এই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ছ’শোর কাছাকাছি দ্বীপ আছে। আর তার মধ্যে মাত্র আটটি দ্বীপে সভ্য মানুষেরা বাস করে। কয়েকটি দ্বীপে সেন্টিনেলদের মতো প্রাচীন অধিবাসীরা বাস করে। বাকি দ্বীপগুলোকে পরিত্যক্তই বলা যেতে পারে, মাঝে মাঝে সে সব দ্বীপে বনদপ্তর বা পুলিশ বিভাগ থেকে টহল দিয়ে আসা হয় যাতে সেখানে কোনও অসামাজিক কাজের ঘাঁটি গড়ে উঠতে না পারে। এই দ্বীপটাও ঠিক তেমনই। কোনও জনবসতি নেই। ট্যুরিস্ট স্পটও নয়।’
এ কথা বলার পর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘তবে ওই দ্বীপে একজন লোক স্থায়ী ভাবে বসবাস করে। একটু পাগল গোছের লোক। ঘটনাচক্রে সেও বাঙালি। নিজের নাম ভুলে গেছে। তবে স্পষ্ট বাংলাতে কথা বলে। নিজেকে সে বলে ‘বাতিঅলা’। জানি না সে এমন পরিচয় দেয় কেন। অবশ্য পাগলদের ভাবনার পিছনে তো তেমন কোনও কার্যকারণ থাকে না৷’
রৌনক বলল, “ওটা ওই লোকটার কীর্তি নয়তো? সে আঘাত করছে না তো হরিণীগুলোকে?’
তিনি বললেন, ‘ব্যাপারটা বরং উলটো। লোকটা ডাক দিলেই হরিণীগুলো ওর কাছে চলে আসে। আপনি তো জানেন, চিতল হরিণ খুব ভিতু আর সেনসিটিভ প্রাণী। একবার তাকে কেউ আঘাত করলে সে তার কাছে ঘেঁষে না। আর লোকটাও হরিণীগুলোকে খুব ভালোবাসে।
‘একটা ঘটনা বলি আপনাকে। একবার দুজন চোরা শিকারি ঢুকেছিল ওই দ্বীপে হরিণের লোভে। ওই লোকটা শিকারি দুটোকে ধরে বেঁধে নৌকায় চাপিয়ে রাত্রিবেলায় রস আইল্যান্ডে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তবে আইন অনুসারে এই সব দ্বীপে কাউকে থাকতে দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতার কারণে আমরা অনেক সময়ই আইনকে পাশ কাটিয়ে চলি। ওর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা ওরকমই।’
‘ওখানে কী করে লোকটা? কী খায়?’ জানতে চাইল রৌনক ৷
‘ওই হরিণগুলোর সঙ্গেই থাকে৷ ফলমূল খায়, সমুদ্রের মাছ ধরে খায়। হরিণদের জন্য যখন বনদপ্তরের লোকেরা নুনের বস্তা দিতে যায়, তখন কিছু খাবারদাবারও কখনও কখনও দিয়ে আসা হয় ওর জন্য।’
‘আচ্ছা, লোকটা কি কিছু বলেছে হরিণদের গায়ের দাগগুলোর সম্পর্কে?’ ‘আমি ওই দ্বীপে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তেমন কিছু বলতে পারেনি সে এ ব্যাপারে। শুধু বলেছে ওই দাগগুলো দেখলে আর প্রাণীগুলো মারা গেলে সে কষ্ট পায়। লোকটার মাথার তো ঠিক নেই! মাঝে মাঝেই সে নানারকম অসংলগ্ন কথা বলে।
‘এই যেমন একবার তাকে পোর্ট ব্লেয়ারে নিয়ে আসার কথা বলতেই সে বলেছিল যে, সাহেব না বললে সে ওই দ্বীপ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারবে না। তাতে নাকি তার সাজার মেয়াদ বেড়ে যেতে পারে। আমি জানতে চেয়েছিলাম কোন সাহেব? সে বলেছিল সাদা চামড়ার সাহেব। একদিন সে আমার কাছে জানতে চেয়েছিল তার সাজার মেয়াদ আর কতদিন, তা আমি কাগজপত্র দেখে তাকে জানাতে পারব কিনা৷ যেন সে ব্রিটিশ আমলের কোনও কয়েদি!
এ কথা বলে আবার হরিণের প্রসঙ্গে ফিরে এলেন বন বিভাগের অধিকর্তা তিনি বললেন, ‘আমাদের আশঙ্কা শুধু ওই নাচনী দ্বীপের হরিণীদের নিয়েই নয়। রস আইল্যান্ড ও আশেপাশে যে সব দ্বীপে হরিণ আছে তাদের নিয়েও। এমনও তো হতে পারে যে এই ঘা-এর ব্যাপারটা আসলে কোনও চর্ম রোগ আর তা সংক্রামক, বাতাস বা জল বাহিত হয়ে আশে-পাশের দ্বীপের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে! ‘এখানকার যিনি পশু চিকিৎসক আছেন, তিনি কোনও প্রাণীগুলোকে?’ ওষুধ দিয়েছিলেন
‘হ্যাঁ দিয়েছিলেন, তাতে কোনও কাজ হচ্ছে না।’
রৌনক বলল, “আমার মনে হয় প্রাণীগুলোকে একটু কাছ থেকে অবজারভ করা প্রয়োজন। ওরা কী খাচ্ছে, কী করছে তা কাছ থেকে দেখা দরকার। ওখানে কোনও থাকার জায়গা আছে কি?’
মুখার্জি সাহেব একটু চুপ করে থেকে কী যেন ভাবার পর বললেন, ‘ওখানে কিছু ভাঙাচোরা ব্রিটিশ আমলের ঘর-বাড়ি আছে। তারই একটাকে মেরামত করে কিছুটা বাসযোগ্য করে তোলা হয়েছিল। আগে যান, দেখুন সেখানে থাকতে পারেন কিনা? আব্দুল নামে আমাদের এক ফরেস্ট গার্ড আছে। বোটও চালায় সে। ও আপনার সঙ্গে সবসময় থাকবে। কাল সকালে ও-ই আপনাকে নাচনী দ্বীপে নিয়ে যাবে।’
রৌনক বেলা দশটার ফ্লাইটে নেমেছে পোট ব্লেয়ারে। বন দপ্তরের গাড়ি তাকে
এয়ারপোর্টে আনতে গেছিল। তারপর ওই অফিসের লাগোয়া গেস্ট রুমে সে তার লাগেজ রেখেই বন বিভাগের অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে চলে এসেছে। এখন বেলা প্রায় বারোটা বাজে। তার একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। মুখার্জি সাহেব ব্যাপারটা সম্ভবত উপলব্ধি করে বললেন, ‘যান, এবার গিয়ে বিশ্রাম নিন। আপনি কি আজ সেলুলার জেল দেখতে যাবেন? কাছেই, দেখে আসতে পারেন। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।’ রৌনক পরদিন থেকে কাজ শুরু করবে। একটু ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘তা দেখে আসা যেতে পারে।’
তিনি বললেন, ‘তবে আব্দুলই আপনাকে নিয়ে যাবে অফিসের গাড়িতে। সেলুলার জেল দেখে, সন্ধ্যাবেলায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখে তারপর ফিরবেন। দারুণ লাগবে।’ কথা হয়ে গেল। মুখার্জি সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের থাকার জায়গায় ফিরে গেল রৌনক।
.
2
ঠিক সাড়ে তিনটেতে তার ঘরের দরজাতে কড়া নাড়ার শব্দ হল। দরজা খুলতেই সে দেখল, বন বিভাগের খাকি পোশাক পরা একজন প্রৌঢ় লোক দাঁড়িয়ে আছে। রৌনককে দেখে সে সেলাম ঠুকে বলল, ‘স্যার আমাকে বড়সাহেব পাঠিয়েছেন আপনাকে সেলুলার জেল দেখাতে নিয়ে যাবার জন্য। আমি আব্দুল।’
রৌনক তার সঙ্গে গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাইরেই চালক সমেত ডিপার্টমেন্টের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, আব্দুলের সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসল সে। চলতে শুরু করল গাড়ি। আব্দুলের সঙ্গে পরিচয় জমাবার জন্য সে জানতে চাইল, ‘আপনি আন্দামানে কত দিন আছেন? কোথায় থাকেন ?
লোকটা জবাব দিল, “এখানেই আমার জন্ম স্যার। আমার বাড়ি হ্যাডলক দ্বীপে৷ ফ্যামিলিও ওখানেই থাকে। তবে আমি এখানে থাকি৷ সপ্তাহে একবার বাড়ি যাই।’ ‘কত বছর চাকরি করছেন এই ডিপার্টমেন্টে? ‘ ‘তা প্রায় চল্লিশ বছর। আমার আর ছয় মাস চাকরি আছে মাত্র।’ ‘তবে তো আপনি এখানকার সব কিছুই ভালো মতো চেনেন। নাচনী দ্বীপেও
গেছেন নিশ্চয়ই?’
“হ্যাঁ স্যার, বোট নিয়ে গেছি।’
‘বড়সাহেব আপনাকে বলেছেন নিশ্চয়ই যে কাল আমি আপনার সঙ্গে নাচনী দ্বীপে যাব?’
আব্দুল একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, জানি।’
‘আচ্ছা, নাচনী দ্বীপে কী কী আছে?’
‘কিছু পুরোনো আমলের ভাঙা ঘর-বাড়ি, একটা কবরখানা আর ওই কিছু হরিণ।’ জবাব দিল আব্দুল।
কথা বলতে-বলতেই রাস্তার পাশে সমুদ্র এসে গেল। পাহাড় ঘেরা নীল সমুদ্র।
তারপর দেখতে দেখতেই কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পৌঁছে গেল সেলুলার জেলের গেটের সামনের চত্বরে৷ বহু ট্যুরিস্টের ভিড় সেখানে। টিকিটেরও লম্বা লাইন। মুখার্জি সাহেব বোধহয় আগেই বলে রেখেছিলেন সেলুলার জেলের কোনও কর্তাব্যক্তিকে। রৌনককে লাইনে দাঁড়াতে হল না৷
রৌনক ভিতরে প্রবেশ করার আগে আব্দুল তাকে বলল সে অফিসে ফিরে যাচ্ছে। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো শেষ হলে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ সে আবার তাকে নিতে আসবে।
গেটের সিকিউরিটি জানিয়ে দিল, বিকাল পাঁচটার পর দর্শনার্থীদের বাইরে বের করে দেওয়া হয়। তারপর যারা শো দেখবে তারা টিকিট কেটে আবার ভিতরে ঢোকে। কিন্তু রৌনক গেস্ট। তাই তার বাইরে বেরোবার দরকার নেই।
সেলুলার জেল এখন দর্শনীয় স্থান। দেশের জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন তাদের স্মৃতি স্মারক। রৌনক বইতে দেখেছে এই জেলের ছবি। বিপ্লবী বন্দিদের ওপর কালাপানির এই কুখ্যাত জেলে কী অমানুষিক অত্যাচার করা হতো সেই কাহিনিও শুনেছে। জেলের ভিতর প্রবেশ করতেই সে কথা ভেবে কেমন যেন একটা বিষাদময় রোমাঞ্চের অনুভূতি হল তার।
বহু ট্যুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে জেল প্রাঙ্গণে আর জেলের লোহার শলাকা বসানো অলিন্দতে। রৌনকও ঘুরতে শুরু করল। প্রাঙ্গণের মাঝখানে একটা বেদি রয়েছে। সেখানে কাঠের কাঠামোর গায়ে বন্দিদের বেঁধে পিঠে চাবুক মারা হতো। একটা ছোট মিউজিয়ামের মধ্যে রাখা আছে একটা ঘানি। যেখানে বলদের বদলে জুড়ে দেওয়া হতো বন্দিদের। প্রতিদিন ঘানি পিষে আশি লিটার তেল বার করতে হতো তাদের। কী অমানুষিক সব নির্যাতন !
এরপর জেলের বারান্দাগুলোতে ঘুরতে শুরু করল সে। অপরিসর বারান্দাসংলগ্ন ছোট ছোট আধো-অন্ধকার পায়রার খোপের মতো ঘর। কোনও জানলা নেই। মোটা গরাদের ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো ঢোকে ঘরে। দেশের জন্য কী অমানুষিক কষ্ট ভোগ করেছিলেন সেদিনের বিপ্লবীরা! এক জায়গায় দেওয়ালের গায়ে সার সার ফলকে বন্দিদের নাম লেখা। তার মধ্যে আশি শতাংশই চেনা-অচেনা বিপ্লবীদের নাম।
ভারতের বীর সন্তানদের রক্ত-ঘাম আর পদধূলিতে ধন্য সেলুলার জেলের কক্ষগুলো দেখতে দেখতে রৌনকের মনে পড়ে গেল কবি সুকান্তর লেখা কবিতা—
‘ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়,
ওদের কাহিনী বিদেশীর খুনে
গুলি, বন্দুক, বোমার আগুনে
আজো রোমাঞ্চকর;
রোমাঞ্চ হচ্ছিল রৌনকের মনেও। এক সময়ে সে কয়েদখানার বাইরে বেরিয়ে এল। একজনকে জিগ্যেস করে উপস্থিত হল ফাঁসি ঘরে। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটা কাঠের ঘর। ফাঁসির দড়ি ঝুলছে কড়িকাঠ থেকে। এক সঙ্গে তিনজনকে ফাঁসি দেওয়া হতো সেখানে। জায়গাটাতে এক অসীম নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আশেপাশের লোকজন যারা আছে, তারা সকলেই মৌন ভাবে স্মরণ করছে শহীদদের।
রৌনক কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর, ফাঁসি ঘরের চৌকাঠকে প্রণাম জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। ইতিমধ্যে পাঁচটা বেজে গেছে। লোকজনকে বাইরে বের করে দেওয়া হল, রৌনককে অবশ্য বাইরে বেরোতে হল না। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য প্রাঙ্গণের ভিতর একটা চেয়ারে বসল সে। সেলুলার জেলের প্রাচীরের আড়ালে তখন সূর্য ঢলতে শুরু করেছে।
আধঘণ্টা পর আবার লোক ঢুকতে শুরু করল। পূর্ণ হয়ে গেল আশেপাশের চেয়ারগুলো। সেলুলার জেলের অলিন্দ আর কুঠুরিগুলোকে যখন অন্ধকার সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিল তখন শুরু হল শো। ভরাট কণ্ঠস্বর আর আলোর খেলার মাধ্যমে বিবৃত করা হল সেলুলার জেল কবে, কেন, কীভাবে তৈরি হয়েছিল—সে কাহিনি। তারপর জেলের বন্দিদের কাহিনি।
কখনও কোনও অলিন্দ থেকে ভেসে আসতে লাগল চাবুকের শব্দ, বন্দিদের বন্দেমাতরম ধ্বনি, প্রহরীদের ভারী বুটের ঠকঠক আওয়াজ। আলোর মাধ্যমে অলিন্দর গায়ে, কুঠুরির গায়ে ফুটে উঠতে লাগল নানা নির্মম ছবি, ফাঁসিতে ঝোলাবার দৃশ্য। এক সময় জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শো শেষ হল।
শো দেখতে দেখতে কীভাবে যে এক ঘণ্টা সময় কেটে গেছে তা বুঝতেই পারেনি রৌনক। ভিড়ের সঙ্গে সেলুলার জেলের বাইরে এসে দাঁড়াল সে। সাতটা বাজে৷ আব্দুলের তাকে নিতে আসার কথা।
প্রবেশ তোরণের কিছুটা তফাতে রেলিং-এর ধারে দাঁড়িয়ে আব্দুলের আসার জন্য অপেক্ষা করছিল রৌনক। তখনও তার মনে কিছুক্ষণ আগে দেখা শো-এর রেশ কাটেনি অতীতের সেই সব দিনের কথাই ভাবছিল সে। হঠাৎ একটা প্রশ্ন কানে যেতে চিন্তাজাল ছিন্ন হল তার, ‘আপনি কি পশু চিকিৎসক রৌনক মিশ্র ?
রৌনক দেখল তার সামনে আনুমানিক বছর পঞ্চাশের একজন ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়েছেন। পরনে কোটপ্যান্ট, মাথায় হ্যাট।
রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনার পরিচয়টা? ‘
ভদ্রলোক একবার রৌনককে আপাদমস্তক জরিপ করে নিয়ে বললেন, “আমার নাম অর্ধেন্দু পালিত। আমি এখানকার বন বিভাগের পশু চিকিৎসক।’
রৌনক তাকে নমস্কার জানিয়ে বলল, ‘আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল। তা আপনি আমাকে চিনলেন কীভাবে ?
ভদ্রলোক আলগোছে প্রতি নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘দেখলাম, বিকালে আব্দুল আপনাকে গেটের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। তারপর তার সঙ্গে কথা বলতেই আপনার পরিচয় জানতে পারলাম।’
রৌনক বলল, ‘মুখার্জি সাহেব হয়তো আপনাকে জানিয়েছেন যে আমি ওই নাচনী দ্বীপের হরিণদের চিকিৎসার জন্য এসেছি। আপনি তো ওদের চিকিৎসা করছিলেন।
প্রাণীগুলোর কী হয়েছে বলে আপনার ধারণা? ‘
ডাক্তার পালিত একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘না, মুখার্জি আমাকে কিছু জানাননি। আমি ব্যাপারটা শুনলাম আব্দুলের কাছে। আর এও শুনলাম আপনি নাকি কাল ওই দ্বীপে যাচ্ছেন। আমি যতটুকু যা বুঝেছি রোগটা মেঞ্জ পরজীবী ঘটিত, ডেমোডেক্স বা ওই ধরনের কোনও রোগ নয়, যার কারণে চামড়া ফেটে ক্ষতর সৃষ্টি হতে পারে। সে ওষুধ আমি দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না।’
রৌনক বলল, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে৷ ব্যাপারটা জেনে আমার সুবিধা হল। এক কাজ করুন, কাল আপনিও চলুন না। দুজনে এক সঙ্গে প্রাণীগুলোকে পরীক্ষা করা যাবে।’
ভদ্রলোক এবার ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘না, আমি যাব না। আমি গত তিরিশ বছর ধরে এখানকার ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে পশু চিকিৎসকের কাজ করছি। সম্ভবত আমার এই চিকিৎসক জীবন আপনার বয়সের সমান অথবা বেশিই হবে। আমার ওষুধে হরিণগুলো সুস্থ হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম নানান ভাবে। হয়তো আমিই শেষ পর্যন্ত ওদের সারিয়ে তুলতে পারতাম আর কিছুটা সময় পেলে৷
‘কিন্তু মুখার্জি সাহেব আমাকে সে সময় দিলেন না। আমার ওপর ভরসা রাখতেও পারলেন না, এমনকী আপনার কথা আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না। মাফ করবেন, আমি আপনাকে সঙ্গ দিতে পারব না৷
এর জবাবে রৌনক কী বলবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না৷ ঠিক এই সময় তাদের খানিকটা তফাতে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে এল আব্দুল। তার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ডাক্তার অর্ধেন্দু পালিত বললেন, ‘ও দ্বীপে যাচ্ছেন যান। তবে ও জায়গা কিন্তু ভালো নয়। ‘
‘ভালো নয় মানে?’ অবাক হয়ে বলল রৌনক।
ডাক্তার অর্ধেন্দু পালিত এ প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না। মাথার টুপিটা হাত
দিয়ে একটু ঠিক করে নিয়ে হন হন করে হাঁটতে শুরু করলেন। রৌনক সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর গাড়িতে উঠে পড়ল। সবে সাতটা বাজে। অথচ রাস্তা-ঘাট কেমন যেন নিঝুম-অন্ধকার। সমুদ্র তীরে অস্পষ্ট ঢেউ ভাঙার শব্দ হচ্ছে। রৌনক জানতে চাইল, ‘রাস্তা হঠাৎ এমন ফাঁকা হয়ে গেল কেন? কিছু হয়েছে নাকি?’
আব্দুল বলল, ‘না স্যার, সব ঠিকই আছে। এখানকার এটাই নিয়ম। সাতটা, সাড়ে সাতটা বাজলেই পোর্ট ব্লেয়ারের দোকান-পাট সব বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় লোক চলাচলও কমে আসে।’
রৌনকের মাথায় এবার ঘুরতে লাগল ডাক্তার পালিতের বলা কথাগুলো। সে আব্দুলের কাছে জানতে চাইল, ‘কাল আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে কি চোর-ডাকাত হানার ভয় আছে বা সাপখোপ জাতীয় কিছু আছে?’
আব্দুল জবাব দিল, ‘না স্যার, চোর ডাকাতের ভয় নেই। আর সাপ তো কম বেশি সব জায়গাতেই থাকে। তবে ওই দ্বীপে কেড সাপের কামড়ে মারা গেছে বলে
কখনও শুনিনি।’
তবে কি ডাক্তার পালিত রৌনককে মিথ্যা ভয় দেখিয়ে গেলেন যাতে সে ওই দ্বীপে না যায় সে জন্য। রৌনকের এখানে আসা যে তিনি ভালো ভাবে নেননি তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।—এ সব কথা ভাবতে ভাবতেই রৌনক তার বাসস্থানে পৌঁছে গেল। আব্দুল তাকে বলে গেল, পরদিন সকালে সাতটায় তৈরি হয়ে থাকতে।
.
3
আলো ঝলমলে সুন্দর সকাল। রৌনকের ঘরের জানলা দিয়ে ছোট ছোট সবুজ পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল। ভোরবেলা উঠেই স্নান আর প্রাতরাশ সেরে তৈরি হয়ে নিল রৌনক৷ একটা সুটকেসের মধ্যে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল সে। কারণ হয়তো তাকে নাচনী দ্বীপে থেকে যেতে হতে পারে। এছাড়া চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস, ওষুধপত্রও বড় সুটকেসটাতে ভরে নিল।
ড্রাইভার সমেত গাড়ি নিয়ে ঠিক সকাল সাতটাতেই হাজির হল আব্দুল। রৌনক গাড়িতে ওঠার পর দেখল আব্দুল একটা দোনলা বন্দুকও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। পোর্ট ব্লেয়ার শহরের রাস্তাঘাট বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। টিলার ওপরে ব্রিটিশ আমলের কিছু কাঠের তৈরি ঘর-বাড়ির রয়েছে। এই পোর্ট ব্লেয়ারকে কেন্দ্র করেই আশেপাশের দ্বীপগুলির জীবনযাত্রা পরিচালিত হয়।
বেশ কয়েকটা জেটিও রয়েছে অন্য দ্বীপগুলোতে যাওয়া-আসার জন্য। মিনিট দশেকের মধ্যে তেমনই একটা জেটিতে গিয়ে পৌঁছল রৌনক আর আব্দুল। কী ঘন নীল সমুদ্রের জল সেখানে! নানা ধরনের ছোট বড় নৌকা বা যন্ত্রচালিত বোট ভাসছে এদিক-ওদিক। ইতিমধ্যে ট্যুরিস্টদের বেশ ভিড় জেটিতে।
আব্দুল জানাল, ‘এই জেটি থেকে রস আইল্যান্ডেও যাওয়া যায়। সব ট্যুরিস্টরা সেখানেই যাচ্ছে। কাঁধে বন্দুক আর হাতে রৌনকের সুটকেসটা নিয়ে জেটির রাস্তা ধরে এগোল আব্দুল। তার পিছু পিছু রৌনক। একটা ছোট অফিসের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। কোস্ট গার্ডের অফিস। তাদের দেখে বেরিয়ে এলেন এক অফিসার। সাদা পোশাক, কাঁধে বেশ কয়েকটা রঙিন পট্টি তাঁর পদমর্যাদার চিহ্ন বহন করছে।
তিনি রৌনকের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি কিরণ লাল। এখানকার কোস্টের দায়িত্বে আছি। আপনি তো মিস্টার মিশ্র? মুখার্জি স্যার আমাকে আপনার কথা জানিয়েছেন। নাচনী দ্বীপে যাচ্ছেন তো আপনারা? ‘ ব্যাপারে।’ রৌনক করমর্দন করে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, ওখানেই যাচ্ছি হরিণদের চিকিৎসার ব্যাপারে
অফিসার লাল বললেন, ‘মুখার্জি স্যার বলেছিলেন, আপনি নাকি ওই দ্বীপে গিয়ে থাকতেও পারেন?’
রৌনক জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, প্রয়োজন হলে থাকব। এর আগে কখনও দ্বীপে না থাকলেও কাজের জন্য বন-জঙ্গলে অনেকবার থেকেছি।’
তার কথা শুনে কোস্ট অফিসার একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘থাকতে পারেন। সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। যদিও স্থানীয় কেউ কেউ অনেক কথা বলে ওই দ্বীপ সম্পর্কে।
‘কী বলে?’ জানতে চাইল রৌনক।
কোস্টগার্ড অফিসার হেসে বললেন, ‘থাক ওসব কথা আর শুনে দরকার নেই। বোগাস কথাবার্তা। কাজে যাচ্ছেন, ও সব শুনলে আপনার মনঃসংযোগ নষ্ট হতে পারে।’ এ কথা বলে তিনি পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে রৌনকের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা রেখে দিন। এতে আমার আর অফিসের ফোন নম্বর আছে৷ অবশ্য আব্দুল যখন সঙ্গে আছে তখন আপনার কোনও ‘ চিন্তা নেই। ও এখানকার সব কিছু জানে। তবুও যদি কোনও সমস্যা হয় তবে আমাকে ফোন করবেন। কোস্ট গার্ডের বেশ কয়েকটা স্পিড বোট এখানে সারা দিনরাত টহল দেয়। ফোন করলেই দশ মিনিটের মধ্যে নাচনী দ্বীপে পৌঁছে যাবে।’
কোস্ট অফিসারের সঙ্গে আরও কিছু কথা-বার্তার পর রৌনক আব্দুলের সঙ্গে রওনা হল বোটে ওঠার জন্য। তাড়া বোটে উঠে লাইফ জ্যাকেট পরে আসনে বসার পর যন্ত্রচালিত বোট চালু হল। ধীরে ধীরে বোটের গতি বাড়াল আব্দুল। সে এক অপরূপ দৃশ্য। সমুদ্রের ঘন নীল জল। তার গায়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে টিলা সমৃদ্ধ দ্বীপ পোর্ট ব্লেয়ার। জল থেকে তার গায়ের সবুজ অংশটাই দেখা যাচ্ছে। ক্রমশ পিছনে সরে যেতে লাগল পোর্ট ব্লেয়ারের জেটি। কাছে দূরে আরও কিছু ছোট-বড় নানা আকৃতির দ্বীপ চোখে পড়ছে।
মাঝে মাঝে সমুদ্রের জল ছিটকে এসে লাগছে রৌনকের গায়ে। তার সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস। এক মনোমুগ্ধকর যাত্রা। খানিকক্ষণ চলার পর বেশ বড় একটা দ্বীপের তটরেখা দেখা গেল। কয়েকটা ঘর বাড়ি আর একটা জেটিও দেখা যাচ্ছে সেখানে। আশেপাশে ট্যুরিস্টদের নিয়ে যে বোটগুলো ভেসে চলেছে, তাদের গন্তব্য ওই দ্বীপের দিকেই। আব্দুল সেই দ্বীপটা দেখিয়ে বলল, “ওটা হল রস আইল্যান্ড। ওখানেও প্রচুর হরিণ আছে।’
রস আইল্যান্ডের দিকে খানিকটা এগোবার পর বোটের মুখ এক পাশে ঘুরে গেল। আইল্যান্ডের তটরেখাকে একপাশে রেখে চলতে চলতে এক সময় তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল বোট। এদিকে আর কোনও বোটের আনাগোনা দেখতে পেল না রৌনক। তবে দূরে ছোট ছোট কিছু দ্বীপ আছে। রৌনক জানতে চাইল, ‘এ সব দ্বীপে মানুষ থাকে?’
আব্দুল জবাব দিল, ‘না, স্যার। থাকলে মারা পড়ত। যে বার সুনামি হয়েছিল সে বার এই দ্বীপগুলো একদম জলের নীচে চলে গেছিল। রস আইল্যান্ড আর নাচনী দ্বীপেরও ক্ষতি হয়েছিল। পাড় ভেঙে গেছিল। ব্রিটিশ আমলের যে সব বাড়ি-ঘর ছিল সে সবও অনেক নষ্ট হয়ে গেছিল। যে দ্বীপগুলো দেখছেন ওই দ্বীপগুলোতেও ছোটখাটো দু-চারটে পুরোনো বাড়ি-ঘর আছে। ব্রিটিশ আমলে বন্দিদের এই সব ছোট দ্বীপগুলোতে আনা হতো কাঠ কাটার জন্য। তা দিয়েই রস আইল্যান্ড আর পোর্ট ব্লেয়ারের বাড়িগুলো তৈরি করা হতো।
‘সে সময় বন্দিদের সঙ্গে আসা ব্রিটিশ সৈনিকদের বিশ্রাম নেবার জন্য কিছু ঘর তৈরি করা হয়েছিল কোথাও কোথাও। জাপানিরাও এই দ্বীপপুঞ্জ দখল করার পর কোথাও কোথাও বাঙ্কার বানিয়েছিল। রস আইল্যান্ডে জেটি থেকে নামতেই এমন একটা জাপানি বাঙ্কার আছে। তবে এই সব দ্বীপে হরিণ নেই। ছোটখাটো সামান্য কিছু প্রাণী আছে। আমরা মাঝে মাঝে এ সব দ্বীপে টহল দিতে যাই। জেলেরাও কখনও সখনও এই সব দ্বীপে নৌকা ভিড়িয়ে জাল ফেলে।’
কিছুক্ষণ পরে আবার সে বলল, ‘আপনি তো কাল সেলুলার জেলে গেছিলেন। বিপ্লবীদের কীভাবে সেখানে হাতে-পায়ে বেড়ি দিয়ে আটকে রাখা হতো তা দেখেছেন। দ্বীপে তাদের কাঠ কাটতে নিয়ে আসার পর সেই বেড়ি খুলে দেওয়া হতো। অনেক বন্দি সেই সুযোগে পালাবার চেষ্টা করত, কিন্তু পারত না। কেউ সাঁতরানোর সময় পুলিশের গুলি খেয়ে মরত বা হাঙরের পেটে যেত। কেউ বা অসভ্য মানুষদের দ্বীপে গিয়ে তাদের হাতে মারা পড়ত।’
আব্দুল বোট এগিয়ে নিয়ে চলল, এক সময় বোটের গতি খানিক কমিয়ে দিয়ে বলল, ‘একবার জলের ভিতর তাকান স্যার।’
তার কথা শুনে রৌনক জলের দিকে তাকাল। জল এখানে কাচের মতো স্বচ্ছ। জলের গভীরে বেশ অনেকটা পর্যন্ত সূর্যালোক প্রবেশ করছে। কোরালরিফ দেখা যাচ্ছে। আর সেই সব কোরালের গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা ধরনের ছোট বড় রঙিন সামুদ্রিক মাছ। এসব দেখতে দেখতে রৌনক খেয়ালই করল না কখন যেন তার চোখের সামনে থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে রস আইল্যান্ড। আরও বেশ খানিকক্ষণ চলার পর আব্দুল বলল, ‘আমরা কাছাকাছি পৌঁছে গেছি স্যার। ওই হল নাচনী দ্বীপ।”
আব্দুলের দৃষ্টি অনুসরণ করে রৌনক দ্বীপটাকে দেখতে পেল। সবুজ গাছে ছাওয়া একটা মাঝারি আকৃতির একটা দ্বীপ। সে দিকেই বোট এগিয়ে চলল ক্রমশ। কাছে এগিয়ে আসতে লাগল দ্বীপটা। এ দ্বীপে কোনও বালুতট নেই। দ্বীপটা যেন সমুদ্রের বুক থেকে সোজা ওপর দিকে উঠেছে। দ্বীপের একদম কাছে পৌঁছে গেল তারা। সমুদ্রের জল নীচের প্রবাল প্রাচীর আর সমুদ্রতল থেকে উঠে আসা দ্বীপের খাড়া দেয়ালের গায়ে ধাক্কা খেয়ে সাপের ফণার মতো নাচছে। দুলে উঠছে বোটটা।
দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে যাবার পর আব্দুল কিছুটা উত্তেজিত ভাবে বলল, “ওই দেখুন স্যার, হরিণ!’
রৌনক এবার দেখতে পেল প্রাণীগুলোকে, যাদের জন্য তার এখানে আসা। দ্বীপের গায়ে যে নারকেল গাছগুলো আছে, সেগুলোর গুঁড়ির গা ঘেঁসে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একপাল হরিণী! সেখান থেকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তারা দেখছে বোটটাকে। বোট যেখানে এসে ভিড়ল সেখানে একটা ভাঙা সিঁড়ি আছে। মানুষেরই হাতে বানানো পাথরের তৈরি সিঁড়ির ধাপ। রৌনক অনুমান করল, সেটা সম্ভবত ব্রিটিশ আমলেরই হবে। বোটটা সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই হরিণীর পালটা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল দ্বীপের ভিতর।
সিঁড়ির গায়ে একটা স্তম্ভে কাছি দিয়ে বোটটাকে বাঁধল আব্দুল। তারপর বাক্স আর বন্দুক ঘাড়ে করে বোট থেকে সিঁড়িতে নামল। রৌনকও পা রাখল সেখানে। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল তারা। দ্বীপের ওপরের অংশটা সমতলই বলা
যায়। নারকেল আর নানা ধরনের গাছ আছে চারপাশে। ছায়াময় পরিবেশ। তারই ফাঁক দিয়ে খানিকটা দূরে একটা অনুচ্চ প্রাচীর ঘেরা জায়গা দেখতে পেয়ে রৌনক জানতে চাইল, ‘ওই জায়গাটা কী? ‘
আব্দুল বলল, ‘ওটা ছিল ব্রিটিশদের একটা কবরখানা। এখনও কিছুটা অবশিষ্ট আছে৷ বাকি অংশটা সুনামির সময় ধসে পড়ে জলের নীচে তলিয়ে গেছে।’
দ্বীপের ভিতর দিকে এগোল তারা। চারপাশে গাছের মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যর ভগ্ন চিহ্ন। রৌনকরা যে পথে হাঁটছে, সে পথ এক সময় ইট বাঁধানো ছিল। ইটগুলো ভেঙে গিয়ে বর্তমানে সুরকি হয়ে গেছে। মিনিট পাঁচেক এগোবার পর গাছের আড়াল থেকে একটা বেশ বড় স্থাপত্যর ধ্বংসাবশেষ দেখা গেল। রৌনক জানতে চাইল, ‘ওটা কী? ‘
আব্দুল বলল, “ওটাই তো স্যার নাচঘর। ওখানেই যাচ্ছি আমরা।’
.
8
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই জায়গাটায় পৌঁছে গেল রৌনকরা। চারপাশে গাছপালা ঘেরা একটা ফাঁকা জমি। আর তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যটা। তার একটা অংশ ধ্বসে পড়েছে। বাকি অংশটা দাঁড়িয়ে আছে অজগর সাপের মতো বিশাল বিশাল লতা গুল্মর বেষ্টনীর জন্য।
বেশ খানিকটা উঁচু ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। আর্চের মতো একটা দরজা আছে ভিতরে প্রবেশ করার জন্য। এখন অবশ্য তাকে গহ্বর বলাই ভালো৷ দুপাশের স্তম্ভর গায়ে পলেস্তারা খসে ইট দাঁত বের করে আছে। তবে ভিতের ওপরে ওঠার সিঁড়িটা মোটামুটি অক্ষতই আছে।
আর এ জায়গাতে পৌঁছেই রৌনকরা আবার দেখতে পেল হরিণীগুলোকে৷ নাচঘরে ওঠার সিঁড়ির মুখে তারা দাঁড়িয়ে আছে। ফাঁকা জমিটাতে প্রবেশ করেই থেমে গেল আব্দুল। তারপর আঙুল তুলে তাদের দিকে দেখিয়ে বলল, ‘স্যার, ওই দেখুন, ডান পাশে ওই যে হরিণীটা দাঁড়িয়ে, ওর গায়ে একটা ঘা-এর দাগ! দেখতে পাচ্ছেন ? আব্দুলের দৃষ্টি অনুসরণ করে রৌনক দেখতে পেল হরিণীটাকে। হ্যাঁ, তার গায়ে
পিঠ থেকে নেমে এসেছে লম্বা, একটা ক্ষতচিহ্নের মতো দাগ !
এরপর আরও একটা হরিণীর গায়ে একই দাগ দেখতে পেল রৌনক। তবে সব হরিণীগুলোর পিঠ দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, তারা গা ঘেঁসাঘেঁসি করে দাঁড়িয়ে। রৌনক সবে এগোতে যাচ্ছিল আরও কাছ থেকে তাদের দেখার জন্য, কিন্তু দু-কদম এগোতেই তারা লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে নাচঘরের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল৷ রৌনক বলল, ‘এখানে একটা বড় শিংঅলা পুরুষ হরিণ আছে বলে শুনেছি। সেটাকে ওই দলের মধ্যে দেখলাম না তো!’
আব্দুল বলল, ‘ও ওই নাচঘরের মধ্যে থাকতে পারে। হরিণীগুলোও রাতে বা ঝড় বাদলের সময় ওই নাচঘরের মধ্যেই ঢুকে থাকে৷’
‘আর তোমাদের সেই বাতিঅলা কই?’ প্রশ্ন করল রৌনক।
‘নিশ্চয়ই আশেপাশেই কোথাও আছে।’
আব্দুল এর পর নাচঘরের কিছুটা তফাতে কয়েকটা জীর্ণ ঘর দেখিয়ে বলল, ‘চলুন স্যার। আগে ওখানে আপনার মালপত্র রাখি। এখন একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন। তারপর আপনি যেমন বলবেন তেমন হবে।’
ঘরগুলোর সামনে রৌনককে নিয়ে উপস্থিত হল আব্দুল। সার সার কয়েকটা ঘর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তারমধ্যে কয়েকটা ঘর পরবর্তীকালে বোধহয় মেরামত করা হয়েছে। দরজা জানালা বসানো হয়েছে। তেমনই একটা ঘরের তালা খুলতে খুলতে আব্দুল বলল, ‘আগে এই ঘরগুলো সাহেবদের গার্ড বা সেনাদের মেস বাড়ি ছিল। এখন আমরা এই কয়েকটা ঘর সারিয়ে নিয়ে রেস্ট রুম হিসাবে ব্যবহার করি—যখন এ দ্বীপে আসি।’
তালা খুলে রৌনককে নিয়ে ভিতরে ঢুকল আব্দুল। সে ঘরটার পিছনের দেওয়ালের একটা জানালা খুলে দিতেই আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। ঘরের ভিতর প্লাস্টার আর চুনকাম করা। খাট বিছানা, জলের কুঁজো, টেবিল চেয়ারও আছে। বন্দোবস্ত খারাপ নয়। জানালার সামনে এসে দাঁড়াল রৌনক৷ পিছন দিকটা ফাঁকা ফাঁকা। সমুদ্র দেখা যাচ্ছে, আর দেখা যাচ্ছে ভাঙা প্রাচীর ঘেরা একটা জায়গা। আব্দুল বলল, “ওটা হল কবরখানার অন্য একটা দিক।”
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রৌনক বলল, ‘চলো আব্দুল, এবার হরিণগুলোকে দেখে আসা যাক।’
ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথমে নাচঘরের দিকে এগোল তারা। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে আব্দুল বলল, ‘যে অংশটা ভাঙা দেখছেন, ওটা ভেঙেছিল জাপানি বোমার আঘাতে। এটাকে ওরা সৈন্যদের বাসস্থান ভেবে বোমা ফেলেছিল। দ্বীপের আরও কয়েক জায়গাতেও ফেলেছিল। তারপর এ দ্বীপ পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
ওপরে উঠে সেই জীর্ণ তোরণ অতিক্রম করে তার ভিতরে প্রবেশ করল তারা। নির্জন প্রাসাদের মতো দাঁড়িয়ে নাচঘরটা। তার প্রবেশ পথটাও কপাট বিহীন। ঘরের সামনে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সম্ভবত এ জায়গার মাথার ওপরেও এক সময় ছাদ ছিল, যা হয়তো সেই জাপানি বোমার আঘাতে খসে পড়েছে। চারপাশে ইট সুরকি পাথর ছড়িয়ে আছে। রৌনক হরিণীগুলোকে দেখতে পেল সেখানেই। রৌনকদের দেখেই তারা ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ল আধো অন্ধকার ঘরের ভিতর। আব্দুল বলল, ‘ওরা এই ঘরটার ভিতরেই থাকে। আপনি যাবেন ভিতরে?’
রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ।’
কোমর থেকে টর্চ বার করে আব্দুল, রৌনককে নিয়ে এগোল নাচঘরের দিকে। সেখানে কোনও জানালা নেই। ভিতরটা বেশ ঠান্ডা আর কিছুটা স্যাঁতস্যাঁতেও বটে। বেশ বড় হলঘরের মতো ঘর। ছাদটাও বেশ উঁচুতে।
ঘরের এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হরিণীরা। আব্দুল আলো ফেলল তাদের ওপর। বেশ ভীত সন্ত্রস্ত ভাবে তারা তাকিয়ে আছে রৌনকদের দিকে। একদম স্থির। নড়ছে না। হয়তো বা টর্চের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে তাদের। আব্দুল হরিণীদের পিঠে আলো ফেলতে ফেলতে একটা হরিণীর পিঠে আলোটাকে স্থির করল। তার পিঠ থেকে গায়ে নেমে এসেছে লম্বা চেরা দগদগে একটা দাগ। বেশ কাছ থেকেই রৌনক এবার দাগটা দেখল। তারপর আরও একটা হরিণীর পিঠে একই রকম দাগ দেখতে পেল সে।
দাগগুলো যে কী কারণে হতে পারে বুঝতে পারল না রৌনক। একদম কাছ থেকে হাত দিয়ে পরীক্ষা না করলে বোঝা সম্ভব নয়। সে এরপর আব্দুলকে বলল, ‘যাক, ওদের গায়ে আর আলো ফেলার দরকার নেই। ভয় পাচ্ছে ওরা। এরপর হয়তো আমাদের দূর থেকে দেখতে পেলেই পালাবে।’
আলো সরিয়ে নিল আব্দুল। তারপর বলল, ‘আপনাকে একটা জিনিস দেখাই স্যার। এই বলে সে ছাদের দিকে আলো ফেলল। রৌনক বিস্মিত ভাবে দেখল, কাচের তৈরি বিরাট একটা ঝাড়বাতি সেখানে ঝুলছে! যদিও তার অনেক ডাল-পালাই খসে গেছে, তবু সে আজও তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। এ ধরনের ঝাড়বাতি রৌনক আগে কয়েকটা পুরোনো দিনের বাড়িতে দেখেছে।’
আব্দুল আবার বলল, ‘আরও একটা জিনিস আপনাকে দেখাই স্যার।’ এই বলে সে পা দিয়ে মেঝের ধুলোর ওপর ঘসল। ধুলো সরে যেতেই নীচ থেকে বেরিয়ে এল সাদা পাথরের আস্তরণ। শ্বেতপাথরের মেঝে। অর্থাৎ আমোদ-প্রমোদের জন্য নাচঘরটাকে বেশ ভালো করেই সাজিয়েছিল সাহেবরা।
হরিণীগুলো ভয় পাচ্ছে তাদের উপস্থিতির কারণে। রৌনক তাই বলল, ‘চলো, এবার ঘরের বাইরে যাওয়া যাক।’
নাচঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। উঁচু জায়গা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আব্দুল বলল, ‘এই নাচঘরটাই হল দ্বীপের সব থেকে উঁচু জায়গা৷ সুনামির সময় তো গোটা দ্বীপটা জলে ভেসে গেছিল। নাচঘরের ভিতর ছিল বলেই সম্ভবত হরিণগুলো বেঁচে গেছিল।’
এবার দ্বীপের ভিতর রৌনককে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল আব্দুল। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে ছোটখাটো ঘরের ধ্বংসাবশেষ।
আব্দুল বলল, ‘এই সব ঘরগুলো সাহেবদের চাকর-বাকর খানসামাদের ঘর ছিল। নাচনেওয়ালীদের জন্যও ঘর ছিল। তবে সে এখন নেই। ‘
চলতে চলতে একটা ছোট বাঁধানো জলাশয়ের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। আব্দুল বলল, ‘স্যার হরিণগুলো এখানেই জল খেতে আসে। এর জল সমুদ্রের নোনা জল নয়, মিষ্টি জল। বর্ষার জল ধরা থাকে এখানে। মাঝে মাঝে আমরা এর পাড়ে হরিণদের জন্য নুন ছিটিয়ে দিয়ে যাই।’
জানো?’ রৌনক জিগ্যেস করল, ‘এই জলাশয়ের জল পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা তুমি
আব্দুল বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, হয়েছে, আমাদের ডাক্তারবাবু এখান থেকে জল নিয়ে গিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করিয়েছেন। শুনেছি জলে বিষাক্ত কিছু পাওয়া যায়নি।’
এ কথা বলার পর সে বলল “ এ দ্বীপে বিশেষ কিছু দেখার নেই নাচঘর আর
কবরখানা ছাড়া। চলুন, এবার কবরখানাটা দেখিয়ে আনি।’
রৌনকরা এগোল সেদিকে। কিছুটা এগিয়েই তারা পৌঁছে গেল জায়গাটাতে। প্রাচীরের ভাঙা অংশ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল দু’জনে। চারপাশে পাথর বাঁধানো বেশ কয়েকটা ভগ্নপ্রায় কবর রয়েছে। ব্রিটিশদের কবর সব। যারা সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে আসার পর এই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে এসেছিল উপনিবেশ গড়ার জন্য, কালো চামড়ার কয়েদিদের পাহারা দেবার জন্য। কিন্তু বিভিন্ন কারণে যাদের আর দেশে ফেরা হয়নি, তারা ঘুমিয়ে আছে এই সব প্রাচীন কবরের তলাতে।
কবরস্থানটা ঘুরতে ঘুরতে যে দিকে প্রাচীর একদম মুছে গেছে, সেখানে এসে দাঁড়াল তারা। একদম নীচেই সমুদ্রের জল এসে ধাক্কা মারছে। জায়গাটার ঠিক কিনারে কালো পাথরের চাদর মোড়ানো একটা কবর দেখতে পেল রৌনক। তার মাঝ বরাবর ভেঙে প্রায় দু-খণ্ড হয়ে গেছে কবরটা।
সেই কবরটা রৌনকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে পেরে আব্দুল বলল, ‘সুনামির সময় এদিক থেকেই জল ঢুকেছিল দ্বীপে। তখনই ওই কবরটা ভেঙে দু-ফালি হয়ে গেছে। ওর আশেপাশে আরও কয়েকটা কবর ছিল। সেগুলো আর প্রাচীরটাকে সমুদ্র ভাসিয়ে নিয়ে গেছে৷
‘ওটা কার কবর তুমি জানো?’ প্রশ্ন করল রৌনক।
সে জবাব দিল, ‘না স্যার, জানি না।’
রৌনক কবরটা দেখার জন্য এগোতে যাচ্ছিল। কিন্তু আব্দুল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ওদিকে যাবেন না স্যার। অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে। জায়গাটা সমুদ্রের দিকে হেলে আছে। বলা যায় না কবে কখন ধ্বসে পড়বে!’
আব্দুলের কথাটা অযৌক্তিক নয়। জায়গাটা দেখে বিপজ্জনকই মনে হচ্ছে। কাজেই সে দিকে রৌনক আর এগোল না। তারপর প্রাচীরের ভাঙা অংশ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। আব্দুল তাকে নিয়ে ঠিক দু-পা এগিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে এক দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘স্যার ওই দেখুন, ও আমাদের দেখছে!’
রৌনক দেখতে পেল কিছু দূরে একটা ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা বিরাট পুরুষ হরিণ। তার মাথার শিং দুটো এত বড় আর ছড়ানো যে তা দিয়ে যেন সে গোটা আকাশকে ধরে রাখতে পারে। প্রাণীটা স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তাদের দিকে আব্দুল বলল, ‘ওর থেকে আমাদের একটু সাবধানে থাকতে হবে স্যার। ও মাঝে মাঝে আক্রমণ করে। ওর শিংগুলো খুব ধারালো। একবার আমাদের এক বনকর্মীকে আক্রমণ করেছিল। কোনওরকমে প্রাণে বেঁচেছিল সে।’
হরিণটা খানিকক্ষণ চেয়ে রইল তাদের দিকে। তারপর ইট-পাথরের স্তূপ থেকে লাফ দিয়ে নেমে একটা গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। রৌনকরা আবার হাঁটতে শুরু করল।
তারা যখন নাচঘরের কাছে ফিরে এল তখন হরিণীর দল আবার বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তবে তারা ভিতের ওপর থেকে নীচে আসেনি। কয়েকটা হরিণী রৌনকদের দেখামাত্রই নাচঘরের প্রবেশপথের ভিতরে ঢুকে গেল, আর বাকিগুলো ওপর থেকে তাদের দুজনকে দেখতে লাগল।
রৌনকরা নিজেদের ঘরে গিয়ে ঢুকল। আব্দুল বলল, ‘স্যার, বোট থেকে খাবার আর জলের জারটা নিয়ে আসি।’
আব্দুল জিনিসগুলো আনতে চলে গেল। আর রৌনক দরজার সামনে বসে বসে দেখতে লাগল হরিণীগুলোকে। তারাও তাকিয়ে আছে রৌনকের দিকেই। কিছুক্ষণ পর সম্ভবত তাদের ভয় কিছুটা কাটল। নাচঘর থেকে একজন একজন করে নীচে নামল তারা। তারপর দল বেঁধে রৌনকের চোখের আড়ালে অন্য দিকে চলে গেল। রৌনক ভাবছিল কীভাবে কাজ শুরু করা যায়। তার মধ্যেই আব্দুল ফিরে এল।
পরপর কয়েকদিন আসতে হতে পারে বলে বেশ অনেকটাই শুকনো খাবার আব্দুল সঙ্গে এনেছে দ্বীপে রেখে দেবার জন্য। অবশ্য দুপুরে খাবার জন্য রুটি-মাংস এনেছিল সে। দুপুর হয়ে গেছে বলে খাওয়া সেরে নিল তারা। তারপরই রৌনক দেখল একজন লোককে, তাদের ঘরটার দিকেই আসছে। তাকে দেখতে পেয়ে আব্দুল বলল, “ওই হল ক্ষ্যাপা বাতি-অলা৷’
রৌনক আর আব্দুল ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। লোকটাও এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। তার পরনের পোশাক বড় অদ্ভুত। গায়ের জামা আর কোমরের কাছে দড়ি দিয়ে বাঁধা প্যান্টটা চটের বস্তা কেটে তৈরি। এক মুখ দাড়ি গোঁফ। তবে বয়স বেশি বলে মনে হয় না৷ চল্লিশের কাছাকাছি হবে। আব্দুল তাকে প্রশ্ন করল, “কী গো কেমন আছ?’
লোকটা বেশ খানিকক্ষণ সন্ধিগ্ধ ভাবে রৌনকের দিকে তাকিয়ে থাকার পর আব্দুলকে প্রশ্ন করল, ‘এ কে? নতুন কয়েদি নাকি?”
আব্দুল বলল, ‘না, কয়েদি নয়, উনি ডাক্তারবাবু। হরিণগুলোর চিকিৎসা করবেন বলে এসেছেন এখানে।’
লোকটা বিড়বিড় করে বলল, ‘সাহেব জানে?’
আব্দুল জবাব দিল, “হ্যাঁ, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বড়সাহেবই তো এখানে ওনাকে পাঠিয়েছেন।
লোকটা বলল, ‘সেই সাহেব নয়।’
‘তাহলে কোন সাহেব?’ প্রশ্ন করল রৌনক।
এবার কোনও জবাব দিল না লোকটা।
রৌনক আবার প্রশ্ন করল, ‘তুমি তো এখানেই
ঘায়ের মতো দাগগুলো কেন হচ্ছে তা তুমি জানো? ‘
থাকো, হরিণীগুলোর গায়ে এই
‘ওই ঘা তুমি সারাতে পারবে না।’ কথাটা বলেই রৌনককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লোকটা পিছু ফিরে হাঁটতে শুরু করল।
সে গাছের আড়ালে মিলিয়ে যাবার পর আব্দুল বলল, ‘বুঝতে পারছেন তো লোকটা কেমন পাগলাটে!’ অদ্ভুত ধরনের কথা বলে।’
রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ, লোকটার কথাবার্তা কিছুটা অসংলগ্ন বলেই মনে হল।’ ঠিক এই সময় রৌনকের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মুখার্জি সাহেব বললেন, ‘দ্বীপে পৌঁছে গেছেন নিশ্চয়ই? আপনার কোনও সমস্যা হচ্ছে না তো?’
সুন্দর।’ রৌনক বলল, ‘না না, কোনও সমস্যা নেই। আব্দুল দ্বীপটা ঘুরিয়ে দেখাল। বেশ
‘হরিণগুলোকে দেখলেন? কিছু বুঝতে পারলেন? ‘
‘হ্যাঁ, দেখলাম। তবে এখনও কিছু বুঝতে পারিনি। আজই প্রথম দেখলাম তো! এখন ওদের আচার-আচরণ, ওরা কী খাচ্ছে এসব অবজারভ করতে হবে। ভাবছি এখানে দু-দিন থাকব। থাকার জায়গা তো আছেই।’
মুখার্জি সাহেব বললেন, ‘আপনার যা ভালো মনে হয় করতে পারেন। আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে কোনও সমস্যা হলে বা কোনও কিছুর প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন।’ এই বলে ফোন ছেড়ে দিলেন তিনি। রৌনক ফোন পকেটে রেখে আব্দুলের দিকে তাকাতেই খেয়াল করল তার চোখে-মুখে কেমন যেন একটা বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠেছে। সে প্রশ্ন করল, ‘বড়সাহেব ফোন করেছিলেন?’ রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ, খোঁজ নিলেন।’
আব্দুল খানিক ইতস্তত করে বলল, ‘আপনি কি সত্যিই এই দ্বীপে থাকার কথা ভাবছেন স্যার?
রৌনক জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, হরিণীগুলোকে কাছ থেকে দেখার প্রয়োজন। সারাক্ষণ ওদের অবজারভ করতে পারলে ভালো হয়। তাই ভাবছি অন্তত দু-তিন দিন এখানে থাকব।’
তার কথা শুনে আব্দুলের মুখটা কেমন যেন হাঁ হয়ে গেল। সে বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলি স্যার। রাতে এখানে থাকার দরকার নেই। আমরা না হয় রোজ ভোর বেলা এখানে চলে আসব।’
রৌনক বলল, ‘রাত্রিবাসের জন্য এ ঘরটা তো ভালোই। তাছাড়া আমি জঙ্গলে বেশ কয়েকবার খোলা আকাশের নীচে রাত কাটিয়েছি। আমার কোনও অসুবিধা হবে না। বেকার সময় নষ্ট করে রোজ যাওয়া আসা করতে যাব কেন ? ”
স্যার।’ আব্দুল চারিদিক দেখে নিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘রাতে এ জায়গা ভালো নয়
‘ভালো নয় কেন? এ দ্বীপে তো কোনও হিংস্র জন্তু নেই, শুনলাম চোর ডাকাতের ভয়ও নেই। তাহলে না থাকার কী আছে?’
আব্দুল বলল, ‘এ দ্বীপের ব্যাপারে বদনাম আছে স্যার। যে কারণে রাতে এখানে কেউ থাকতে চায় না। এমনকী দিনের বেলাতেও অনেকে এখানে আসে না। একবার এক খুনের আসামী পুলিশের হাত থেকে পালিয়েছিল। যে জন্য দ্বীপগুলোতে একজন করে ফরেস্ট গার্ডকে রাতে থাকতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এই নাচনী দ্বীপে কেউ থাকতে রাজি হয়নি রাতে। চাকরি হারাবার ভয় দেখিয়েও কাউকে রাজি করানো যায়নি।’ আব্দুলের •কথা শুনে রৌনক মৃদু বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘ভয়টা কীসের?
খুলে বলো তো? ‘
আব্দুল বলল, ‘ওই কবরখানা, আর নাচঘরের জন্য। রাত হলে সাহেবদের আত্মারা জেগে ওঠে স্যার। নাচঘরে গানবাজনা হয়। নানা রকম শব্দ শোনা যায় দ্বীপের ভিতর থেকে। অনেক জেলেই মাছ ধরতে এসে সেই শব্দ শুনেছে৷’ ‘তুমি এসব কথা বিশ্বাস করো?’ জানতে চাইল রৌনক।
আব্দুল বলল, ‘হ্যাঁ, করি স্যার। ছোটবেলা থেকে এ কথা শুনে এসেছি।’ এরপর সে একটু থেমে বলল, ‘একটা সত্যি কথা বলি স্যার। এ দ্বীপে যখন ফরেস্টগার্ডরা আসে তখন দল বেঁধে আসা হয়। আমাকে বাধ্য হয়েই একলা আসতে হল।’
‘বাধ্য হয়ে কেন? ‘
‘বড় সাহেবের ভয়ে। আমার চাকরি তো আর মাত্র কিছুদিন। বড়সাহেব যদি রেগে গিয়ে আমরা পাওনা-গন্ডা আটকে দেন, তবে খাব কী? ‘
রৌনক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তার কথা শুনে। সে নিজে ভূত-প্রেত-অপদেবতা এসব বিশ্বাস করে না। কিন্তু এ লোকটা যখন বিশ্বাস করে তখন তার মনে ভয় বাড়িয়ে লাভ নেই। সে নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছে যে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনও লোককে সঙ্গী করলে কাজের সময় অনেকক্ষেত্রে সমস্যা হয়৷ এ সব কথা ভেবে নিয়ে রৌনক বলল, ‘তাহলে আমি নয় রাতে একলাই থাকব এখানে। তুমি চলে যেও।’
কথাটা শুনে আব্দুল বলল, ‘কিন্তু বড়সাহেব ব্যাপারটা জানলে আমার চাকরি চলে যাবে।’
রৌনক বলল, ‘আমি তাকে জানাব না। শুধু রাতটুকুরই তো ব্যাপার। ভোর হলে তুমি চলে আসবে রোজ। আর তিনি যদি অন্য কোনওভাবে ব্যাপারটা জানতে পারেন তখন আমি তাঁকে বলব, আমি তোমাকে জিনিসপত্র কিনে আনার জন্য পাঠিয়েছিলাম।’
রৌনকের কথা শুনে আব্দুল কিছুটা স্বস্তি পেল। সে বলল, ‘আপনি ভালো লোক স্যার। তবু আর একবার বলি, আপনি রাতে ফিরে চলুন।’
রৌনক হেসে বলল, ‘আচ্ছা একটা রাত অন্তত থেকে দেখি। আপাতত চলো, দেখি হরিণগুলো কোথায় ? ”
ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল তারা। তারপর হরিণগুলো দ্বীপের যেদিকে গেছে সেদিকে এগোল। খানিক বাদেই তারা দলটাকে দেখতে পেল, দ্বীপের এক জায়গাতে সার বেঁধে বেশ কয়েকটা নারকেল গাছ আছে। তাদের ছায়ায় রয়েছে প্রাণীগুলো৷
কেউ বসে আছে, আবার কেউ ইতস্তত ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কিছু দূরে একটা বড় গাছের গুঁড়ির আড়ালে বসে তাদের লক্ষ্য করতে লাগল রৌনক আর আব্দুল৷ রৌনক খেয়াল করল সেই দুটো হরিণীকে, যাদের গায়ে ঘা বেরিয়েছে। দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও মাঝে মাঝে প্রাণী দুটো গা ঝাড়া দিচ্ছে আর মুখ দিয়ে ঘা চাটার চেষ্টা করছে। রৌনক বুঝল সম্ভবত তাদের ঘা এর ওপর পোকা-মাছি বসছে। সে আব্দুলকে বলল, ‘প্রয়োজন হলে একটা ঘা-অলা হরিণীকে জাল দিয়ে অথবা অন্য কোনওভাবে ধরে ঘা-টা পরীক্ষা করতে হবে।’
আব্দুল বলল, ‘জাল এখানেই আছে। তবে এতগুলো প্রাণীর মধ্যে একটা নির্দিষ্ট প্রাণীকে জাল দিয়ে ধরা শক্ত। তবুও আপনি বললে আমি চেষ্টা করব। ঘুম পাড়ানি বন্দুকও অবশ্য আনতে পারি।’
রৌনক বলল, ‘হরিণদের ক্ষেত্রে ট্রাঙ্কুলিন গান ব্যবহার করার পক্ষপাতী আমি নই। কারণ হরিণরা শক্ত ধাতের প্রাণী নয়। ঘুমের ওষুধের সামান্য ডোজও ওরা অনেক সময় সহ্য করতে না পেরে মারা যায়। তাই ওদের ধরতে হলে জাল বা অন্য কিছুর কথাই ভাবতে হবে৷’
সময় এগিয়ে চলল, বিকাল হল। তার কিছুক্ষণ পর নারকেল গাছগুলোর তলা ছেড়ে হরিণীগুলো দল বেঁধে হাঁটতে শুরু করল। রৌনকরা আড়াল থেকে তাদের অনুসরণ করল। হরিণীগুলো একসময় গিয়ে উপস্থিত হল তাদের জলপানের জায়গাতে। জল খেতে লাগল তারা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হল বিশাল শিংঅলা সেই পুরুষ হরিণটা। সে মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করল হরিণীগুলোর উদ্দেশে। সেই শব্দ শুনে হরিণীগুলো উঠে পড়ল জলাশয় ছেড়ে। তারপর আবার চলতে শুরু করল। তাদের সবার পিছনে চলল পুরুষ হরিণটা। সে যেন তাদের কোথাও তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। রৌনকরা আবারও অনুসরণ করল প্রাণীগুলোকে। তারা পৌঁছে গেল নাচঘরের সামনে। সিঁড়ি বেয়ে ভিতের ওপর উঠে পড়ল তারা। তারপর ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। হরিণটা কিন্তু ওপরে উঠল না। শেষ হরিণীটা নাচঘরের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যাবার পর সে ধীরে ধীরে সেই জায়গা ছেড়ে জঙ্গলের অন্যদিকে চলে গেল। রৌনকরা ফিরে এল।
গাছ-পালার ফাঁক গলে সমুদ্রের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে। সূর্য ঢলতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে টুকটাক কথা-বার্তা বলার পর রৌনক খেয়াল করল, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আব্দুল যেন একটু চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটার কারণ অনুমান করে রৌনক আব্দুলকে বলল, ‘তুমি এবার যেতে পারো।’ আব্দুল বলল, ‘আপনি সত্যিই এখানে থেকে যাবেন স্যার?’ রৌনক হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যি। তুমি এবার বেরিয়ে পড়ো।’
আব্দুল বলল, “তাহলে আসছি স্যার। কাল ভোরের আলো ফুটলেই আমি আবার চলে আসব। বন্দুকটা আপনার ঘরে রেখে গেলাম।”
ঘরের ভিতর বন্দুকটা রেখে আব্দুল এগোল সমুদ্রের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোটের ইঞ্জিনের শব্দ কানে এল তার। আব্দুল চলে গেল।
অন্ধকার নামতে আরও কিছু সময় দেরি আছে। রৌনক তার দরজার পাশে পড়ে থাকা একটা শুকনো গাছের গুঁড়ির ওপর বসল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নাচঘরের দিকে। একসময় উদাস হয়ে সে ভাবতে লাগল, এক কালে নিশ্চয়ই সন্ধ্যা নামার পর এই
সময়ে নাচঘরের আলো জ্বলে উঠত। সাহেবরা আসত খানা-পিনা-ফুর্তি করতে। আর ঠিক সেই সময় কালাপানির অন্ধকার কয়েদ ঘরে, খালি পেটে ধুঁকত আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা।
এই নাচঘর ওই কয়েদিরাই নিশ্চয়ই বানিয়েছিল তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের মাধ্যমে। সাহেবদের সব আমোদ-ফুর্তির জোগান তো দিত তারাই। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। অন্যায়কে সে ক্ষমা করে না। তারই ফলে আজকের ওই খণ্ডহর নাচঘর নিঝুম প্রেতপুরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
যারা একদিন এই দেশে, এই দ্বীপে বন্দিদের ওপর অত্যাচার চালাত, তারা আজ নিজেদের দেশ থেকে অনেক দূরে ওই কবরখানায় শুয়ে আছে। তাদের কবরে একটা মোমবাতি জ্বালাবার মতোও কেউ নেই।
এই সব কথাই বসে ভাবতে ভাবতে রৌনক হঠাৎ দেখতে পেল ‘বাতিঅলা’ নামের লোকটাকে। সে তার দিকেই আসছে। লোকটা এসে দাঁড়াতেই রৌনক তার উদ্দেশে হেসে বলল, “এসো, বসো, তোমার সঙ্গে একটু কথা বলি।’
গাছের গুঁড়িটা বেশ খানিকটা লম্বা। রৌনকের কথা শুনে সে একটু ইতস্তত করে গুঁড়িটার অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। রৌনক তাকে বলল, ‘তুমি এমন পোশাক পরে থাকো কেন? গরম লাগে না?’
সে জবাব দিল, ‘কয়েদিরা তো এমন পোশাকই পরে। জাহাজে যে চাল গমের বস্তা আসে তা দিয়ে সেলাই করা পোশাক।”
লোকটা সত্যিই নিজেকে কয়েদি ভাবে তা বুঝতে পারল রৌনক। তবুও যদি সে তার পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলতে পারে, সে জন্য তাকে জিগ্যেস করল, ‘তোমার
নাম কী? কোথা থেকে এখানে এসেছ তুমি? তুমি তো বাঙালি, তাই না?” ‘ লোকটা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি বাঙালি। তবে বাড়ি কোথায় মনে
নেই। আমার নাম ‘বাতিঅলা’! সাহেবরা আমাকে ওই নামেই ডাকে৷”
‘এমন অদ্ভুত নাম কেন? তোমার একটা আসল নাম তো নিশ্চয়ই আছে?’ লোকটা বলল, “ওই নাচঘরে বাতি জ্বালাবার কাজ আমার। তাই আমার নাম ‘বাতিঅলা’! অন্য নাম ভুলে গেছি। তবে বাতি জ্বালাবার কাজ ছাড়া সাহেবের অন্য কাজও করে দিতে হয় আমাকে।’
‘কোন সাহেব?’ জিগ্যেস করল রৌনক৷
বাতিঅলা চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে
বলল, ‘মরিস সাহেব। ক্যাপ্টেন মরিস। লম্বা-চওড়া চেহারা। লাল দাড়ি। তুমি দেখোনি তাকে? ‘
রৌনক হেসে বলল, ‘না, আমি তাঁকে দেখিনি। তোমার মুখ থেকেই প্রথম তাঁর নাম শুনলাম।’
রৌনক মরিস সাহেবের নাম শোনেনি শুনে বিস্ময় ফুটে উঠল বাতিঅলার চোখেমুখে। সে বলল, “তুমি তাঁর কথা শুনে হাসছ। তার নাম শুনলে সবাই কেঁপে ওঠে। এমনকী ওই গোরা সৈন্যরাও।’
‘তুমি এই দ্বীপে কেন এলে? কবে থেকে আছ?’ কথা ঘোরাতে অন্য প্রশ্ন করল রৌনক।
, বাতিঅলা বলল, ‘অনেকদিন আছি। কবে থেকে মনে নেই। মরিস সাহেবই আমাকে এ দ্বীপে কাজ করতে নিয়ে এসেছেন। যেমন অন্যান্য কয়েদিদের আনা হয়।’ লোকটার কথা-বার্তা অসংলগ্ন। সে নিজেকে কয়েদি ভাবে। হয়তো সে সুস্থ অবস্থায় ব্রিটিশ আমলের সাহেবদের কথা, কয়েদিদের কথা শুনেছিল। আর সেটাই তার মাথার মধ্যে গেঁথে গেছে কোনও কারণে।
গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে সূর্য দ্রুত ডুবতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। বাতাসও ভেসে আসছে সেদিক থেকে। হঠাৎ একটা বুনো গন্ধ নাকে এল। রৌনক বুঝতে পারল, সেটা আসছে লোকটার গা থেকেই। হরিণের গায়েও ঠিক এমনই বুনো গন্ধ থাকে৷ হঠাৎ একটা ব্যাপার মনে পড়ে গেল রৌনকের। সে বলল, ‘শুনেছি হরিণগুলো তোমাকে ভয় পায় না। তুমি ডাকলে তোমার কাছে আসে। এ ব্যাপারটা কি সত্যি?’ বাতিঅলা সংক্ষেপে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’
রৌনক আবার বলল, ‘যে হরিণীগুলোর পিঠে ঘা হয়েছে তেমন একটা হরিণী তুমি আমাকে ধরে দেবে? আমি ঘা-টা পরীক্ষা করব। তারপর দরকার হলে ওষুধ লাগিয়ে আবার ছেড়ে দেব।’
কথাটা শুনে বাতিঅলা বলল, ‘ও ঘা তুমি সারাতে পারবে না। তাছাড়া সাহেব জানলে বিপদ হবে। ওরা সব সাহেবের হরিণী।’
অবান্তর কথা বলে যাচ্ছে লোকটা। এ মুহূর্তে আর কী কথা বলবে তা বুঝতে পারল না রৌনক। সে চুপ করে গেল। লোকটাও চুপ করে বসে কী যেন ভাবতে লাগল। আর এর পরই সূর্য ডুবে গিয়ে চারপাশ অন্ধকার হতে শুরু করল। লোকটা এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এবার আমি যাই। নাচঘরের বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিতে হবে। সাহেব নাচ দেখতে আসবেন।’ তারপর ধীরে ধীরে নাচঘরের দিকে
চলে গেল লোকটা। রৌনক মনে মনে বলল, ‘লোকটার মাথাটা সত্যিই খারাপ।’ সে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। গাঢ় অন্ধকারে মুড়ে যেতে শুরু করল নাচনী দ্বীপ। সমুদ্রের পাড় থেকে ভেসে আসতে লাগল ঢেউয়ের নাচনের শব্দ। ঘরে ঢুকে মোমবাতি জ্বালিয়ে একটা মেডিকাল জার্নাল পড়তে শুরু করল সে। তারপর এক সময় খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘুম নেমে এল তার চোখে।
এখন কত রাত খেয়াল নেই। বাইরে থেকে ঢেউয়ের শব্দ ভেসে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করে মনে হল এর সঙ্গে আরও কিছু একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। রৌনক পাশ ফিরে আবার ঘুমাবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু সমুদ্র গর্জনের সঙ্গে ভেসে আসা শব্দটা ঘুমাতে দিল না তাকে। যদিও শব্দটা কীসের তা ঠিক বুঝতে পারল না সে। তবে তার মনে হল সেটা খুব বেশি দূর থেকে আসছে না।
এক সময় বিছানায় উঠে বসল রৌনক। বাইরে চাঁদের আলো। খোলা জানালা দিয়ে কবরস্থানের প্রাচীরটা দেখা যাচ্ছে। শব্দটা কি ওদিক থেকে আসছে? শুনতে পাচ্ছে সে। কৌতূহলী হয়ে খাট ছেড়ে নেমে, দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল সে। শব্দটা এবার স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। লোকজনের কথাবার্তা আর তার সঙ্গে গানবাজনার মৃদু আওয়াজ।
শব্দগুলো আসছে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে থাকা ওই নাচঘর থেকেই। বেশ
অবাক হয়ে গেল রৌনক। তবে কি রাত নামলে কেউ বা কারা এই দ্বীপে এসে, ওই নাচঘরে ফুর্তি করে? কিন্তু তারা কারা? রৌনক কৌতূহল দমন করতে পারল না ৷ সন্তর্পণে এগোল নাচঘরের দিকে।
নাচঘরের কাছে পৌঁছতেই রৌনক একদম নিশ্চিত হয়ে গেল যে তার ভিতর থেকেই মানুষের কথাবার্তার শব্দ আসছে। আর তার সঙ্গে ভেসে আসছে নূপুরের ছমছম ধ্বনি। রৌনক প্রবেশ করল তোরণের ভিতর। নাচঘরের দরজাটা খোলা। তার মধ্যে থেকে বাইরে আলো আসছে৷
রৌনক নিঃশব্দে নাচঘরের দরজার সামনে গিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি দিল। আর যে দৃশ্য তার চোখে পড়ল, তাতে অবাক হয়ে গেল সে। ঝলমল করে জ্বলছে নাচঘরের ছাদের ঝাড়বাতিটা। ঘরটাও কেউ বা কারা যেন সাফসুতরো করে ফেলেছে! উন্মোচিত হয়েছে ঝকঝকে শ্বেতপাথরের মেঝে। আর ঘরের ঠিক মাঝখানে শ্বেতপাথরের মেঝের ওপর নেচে চলেছে এক যুবতী নর্তকী। ঘরের একপাশে কয়েকজন মেয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাজনা বাজাচ্ছে।
এরপর সেই ঘরে আরও দুজনকে দেখতে পেল রৌনক। একজন বাতিঅলা বলে লোকটা, ঘরের এক কোণে একটা লম্বা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে। লাঠির মাথায় কাপড় জড়ানো। অর্থাৎ সেটা একটা মশাল। যাতে আগুন দিয়ে মাথার ওপরের ঝাড়বাতি জ্বালানো হয়। আর বাতিঅলার দৃষ্টি অনুসরণ করে রৌনক দেখতে পেল আরেকজনকে। একজন সাহেব আধশোয়া অবস্থায় একটা ইজিচেয়ারে বসে নাচ দেখছে। তার পরনে ইউরোপিয়ানদের মতো পোশাক। হাতে মদের গ্লাস। মাথায় টুপি আর কিছু জিনিস পাশের টেবিলে রাখা। লোকটার চেহারা প্রকাণ্ড, তবে তার যে জিনিসটা রৌনকের সব থেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল তা হল সাহেবের এক মুখ লাল দাড়ি !
রৌনকের মনে পড়ে গেল বাতিঅলার বলা কথা। তবে এ লোকটাই কি মরিস সাহেব? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? এখানে এইসময়ে সাহেব আসবে কীভাবে? সাহেবদের দিন তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
রৌনক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল ব্যাপারটা। নর্তকী নেচে চলেছে। এই নাচঘরের মেয়েগুলোকে দেখে রৌনকের ভারতীয় বলেই মনে হল। মদ্যপান করতে করতে বেশ আয়েশ করে নাচ দেখছে সাহেব। হাতের গ্লাসটা এক সময় এক চুমুকে শেষ করে সাহেব বলল, ‘এই বাতিঅলা হুইস্কি দো৷’
বাতিঅলা কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হাতের লাঠিটা দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে সাহেবের কাছে ছুটে গেল। তারপর আজ্ঞাবহ দাসের মতো টেবিলে রাখা হুইস্কির বোতলের ছিপি খুলে তার থেকে মদ ঢেলে দিল সাহেবের গ্লাসে। তারপর আবার সে নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে দাঁড়াল।
সাহেবের মদ চাওয়া আর বাতিঅলার গ্লাসে মদ ঢেলে দেওয়া—এই সময়টুকুর জন্য নাচ থামিয়ে দিয়েছিল। বাতিঅলা যথাস্থানে ফিরে যাবার পর আবার নাচ শুরু করতে যাচ্ছিল নর্তকী। ঠিক সেই সময় সাহেব মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে নর্তকীর উদ্দেশে বলল, ‘এ নাচনেওয়ালি, কাপড়া উতারো।’
রৌনক হকচকিয়ে গেল কথাটা শুনে।
মেয়েটার বয়স সম্ভবত কুড়ি পঁচিশ হবে। সাহেবের কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে রইল সে। সাহেব আবার কর্কশ গলায় বলল, ‘কাপড় খোল।’
মেয়েটার চোখে-মুখে ভয় ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সে হাত জোর করে সাহেবের উদ্দেশে বলল, ‘আমাকে দয়া করো সাহেব। তুমি যদি সারা রাত নাচ দেখতে চাও, আমি দেখাব। কিন্তু আমাকে কাপড় খুলতে বোলো না৷’
তার কথা শুনে হেসে উঠল সাহেব। তারপর মেয়েটাকে বলল, ‘কালা আদমির ওউরত! তোর আবার কাপড় খুলতে লজ্জা কী? খোল কাপড়।’ তবুও নিজের লজ্জা বাঁচাবার জন্য দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা।
সাহেবের কথা মেয়েটা অমান্য করছে দেখে কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠল সাহেবের মুখ। সে মেয়েটাকে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “তুই কাপড় খুলবি না? তাহলে তোরও একই ব্যবস্থা করছি।’
সাহেব এ কথা বলে বাতিঅলার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বাতিঅলা ভয়ার্ত কণ্ঠে মেয়েটার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি কাপড় খুলে ফ্যালো। নইলে সাহেব কী করবে তা তো তুমি দেখেইছ নিজের চোখে।
মেয়েটা কেঁপে উঠল বাতিঅলার কথা শুনে। সে তাকাল ঘরের অন্য মেয়েদের মুখের দিকে। কোনও কিছুর আশঙ্কাতে তাদের সকলের মুখমণ্ডলেও আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠেছে। তাদের দিকে তাকিয়ে রৌনকের মনে হল, তারাও চাইছে যে কোনও কিছু ভয়ঙ্কর ঘটার আগে মেয়েটা কাপড় খুলে ফেলুক। তাদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটাও সম্ভবত বুঝতে পারল এই অসম্মানই তার নিয়তি। ধীরে ধীরে শাড়ি খুলে ফেলল সে। রয়ে গেল তার অন্তর্বাসটুকু। এরপর আবার নাচ শুরু করতে যাচ্ছিল সেই যুবতী। কিন্তু সাহেব তাকে নির্দেশ দিল, ‘পুরা কাপড়া খোল।’
আবারও মুহূর্তর জন্য থমকে গেল মেয়েটা। সাহেব বলে উঠল, ‘খোল জলদি।’ একটা হিংস্রভাব ফুটে উঠেছে সাহেবের মুখে। তা দেখে নর্তকী আর দেরি করল না। সব লজ্জাকে দূরে সরিয়ে রেখে সে তার শরীরের অন্তর্বাস খুলে একদম নগ্ন হয়ে গেল। তারপর আবার নাচতে শুরু করল। ঝাড়বাতির আলোতে যুবতীর নগ্ন শরীরের প্রতিটা অংশ দেখা যাচ্ছে। সাহেব মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে লোলুপ দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করছে সেই দৃশ্য। মাঝে মাঝে তার চোখ ঘুরছে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য লোকদের ওপর।
রৌনক দেখল, বাতিঅলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রৌনক বুঝতে পারছিল না যে এসব কী হচ্ছে! তার মাথার ভিতর সব কিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সাহেব চিৎকার করে উঠল, ‘উও আদমি কউন হ্যায়? ইধার ক্যায়সে ঘুসা?’
সাহেবের কথার সঙ্গে সঙ্গেই নাচ আর বাজনা থেমে গেল। রৌনক দেখল, সাহেব তাকিয়ে আছে তার দিকেই। রৌনক দরজার আড়াল থেকে কখন যেন নিজের অজান্তেই খোলা দরজার একদম সামনে চলে এসেছে!
সাহেব আবার বলল, ‘ইয়ে তো কালা আদমি হ্যায়। কোই কয়দি হোগা!’ এ কথা বলতে বলতে সাহেবের চোখ দুটো হিংস্র ভাবে জ্বলে উঠল। সাহেব
এরপর লাফ দিয়ে কেদারা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাতিঅলা, মেরা বন্দুক কিধার ? পাকড়ো উসকো। উসে গোলি মারনা হ্যায়।’
এবার সাহেবের কথা শুনে আর কোনও কিছু না ভেবে রৌনক সঙ্গে সঙ্গে সে স্থান ত্যাগ করে বাইরে বেরোবার জন্য ছুটল। পিছনে ঘরের ভিতর থেকে সাহেবের চিৎকার শোনা গেল, ‘পাকড়ো, পাকড়ো, উসে পাকড়ো।’
রৌনক সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে সোজা নীচে নেমে ছুটল তার ঘরের দিকে। পিছন থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসছে। হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খাটে বসে পড়ল সে। তার চোখে পড়ল, ঘরের কোনায় আব্দুলের রেখে যাওয়া বন্দুকটা। সে স্থির করল, কেউ যদি দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করে তবে সে নিজেই গুলি চালিয়ে দেবে। তাতে যা হবার হবে। এই ভেবে বন্দুকটা দুহাত দিয়ে চেপে ধরে প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল সে।
হঠাৎ দরজা ধাক্কাবার শব্দ হল। খাটের ওপরই বসে ছিল রৌনক৷ কখন যেন চোখ বন্ধ হয়ে গেছিল তার। শব্দ শুনেই চোখ খুলল সে। সঙ্গে সঙ্গে সব মনে পড়ে গেল। খাট থেকে নেমে সে বন্দুক তাক করে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই দরজা ধাক্কাবার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে আব্দুলের গলার স্বর ভেসে এল, ‘আমি এসে গেছি। স্যার কি এখনও ঘুমোচ্ছেন ? ত
রৌনক এবার খেয়াল করল বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেছে। আলো ঢুকছে ঘরে। সে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। আব্দুল তার উদ্দেশে হাসি মুখে বলল, ‘বলেছিলাম না স্যার, ভোরের আলো ফুটলেই আমি চলে আসব! সব ঠিক আছে তো স্যার?’
গত রাতে রৌনক যে ঘটনার সাক্ষী হয়েছে তা কি স্বপ্ন না বাস্তব? এমনও তো হতে পারে বাতিঅলার মুখে, মরিস সাহেবের গল্প শুনে, আব্দুলের মুখে সাহেবের আত্মার কথা শুনে রৌনক দুঃস্বপ্ন দেখেছে! কারণ সে যা দেখেছে বাস্তবে তা কীভাবে সম্ভব? এখন সে যদি আব্দুলকে তার দুঃস্বপ্নের কথা বলে তবে নির্ঘাত ভয় পেয়ে যাবে আব্দুল। তাই সে বলল, ‘সব ঠিক আছে। তবে নতুন জায়গা বলে হয়তো রাতে ভালো ঘুম হয়নি।’
ফ্লাস্কে চা আর আরও কিছু জিনিস ব্যাগে করে এনেছে আব্দুল। চা-পানের পর কিছু সময়ের মধ্যে তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল তারা। নাচঘরের দিকে তাকাতেই রৌনকের মনে পড়ে গেল গত রাতের ঘটনাটার কথা। চারপাশে রোদ্দুর ঝলমল করছে। আলো অনেকসময় মানুষের মনের শঙ্কা কাটিয়ে দেয়। তাছাড়া আব্দুলের কাঁধে বন্দুক আছে। তাও রৌনক নিজের মনের সন্দেহ নিরসনের জন্য বলল, ‘চলো, একবার নাচঘরটা দেখে আসি।’
আব্দুল রৌনকের মনের ভাব ধরতে না পেরে বলল, ‘হরিণগুলো ওখানে নেই স্যার। ভোরের আলো ফুটতেই ওরা বাইরে বেরিয়ে সমুদ্রের পাড়ের দিকে গেছে। আমি আসার সময় ওদের ওখানে দেখেছি।’
রৌনক বলল, ‘তবুও একবার দেখে আসি জায়গাটা।’
সিঁড়ি বেয়ে ভিতের ওপর উঠে তোরণ অতিক্রম করে নাচঘরের ভিতর প্রবেশ করল দুজনে। আব্দুল আলো ফেলল ঘরের ভিতর। সেই একই রকম ঘর, ধুলোময় মেঝেতে জেগে আছে হরিণীদের পায়ের ছাপ। মাথার ওপর ঝুলছে ডাল ভাঙা ঝাড়বাতি। রৌনক, আব্দুলের হাত থেকে টর্চটা নিয়ে ঘরটাতে ঘুরতে ঘুরতে আলো ফেলতে লাগল চারপাশে। না, রৌনক কোথাও তেমন কিছু খুঁজে পেল না যা গত রাতের ঘটনার স্বপক্ষে সাক্ষী দেয়। তবে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা স্বপ্নই হবে। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে তারা বাইরে বেরিয়ে এল।
নীচে নেমে তারা হরিণগুলোর সন্ধানে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই তাদের কানে এল মোটর বোটের ইঞ্জিনের শব্দ। মনে হয় জেটিতে কোনও বোট এসে থামল। আব্দুল বলল, ‘বড়সাহেব হয়তো খোঁজ নিতে এসেছেন, আবার কোস্ট গার্ডের বোটও হতে পারে।’
কিন্তু জেটির দিকে কিছুটা এগোতেই তারা দেখল আব্দুলের অনুমান সত্যি নয়। মাথায় হ্যাট আর কোটপ্যান্ট পরা একজন লোক এগিয়ে আসছে। রৌনক চিনতে পারল লোকটাকে। পরশু সন্ধ্যায় সেলুলার জেলের বাইরে রৌনকের কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। এখানকার পশু চিকিৎসক অর্ধেন্দু পালিত।
তিনি এসে তাদের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। পরস্পরের মধ্যে গুডমর্নিং বিনিময়ের পর রৌনক তাকে বলল, ‘আপনাকে কি মুখার্জি সাহেব পাঠালেন? ’
এ কথার জবাবে পালিত বললেন, ‘না, তিনি পাঠাননি। কাছাকাছি অন্য একটা দ্বীপে ব্যক্তিগত কাজে যাচ্ছি। দূর থেকে আব্দুলের বোটটা দেখতে পেয়ে বুঝলাম আপনারা এখানে আছেন। ভাবলাম দেখি, আপনার কাজ কতদূর এগোল? ‘ শেষ কথাগুলো ব্যঙ্গের স্বরেই বললেন ডাক্তার পালিত।
রৌনক অবশ্য সেসব গায়ে না মেখে হেসে বলল, ‘কাজ তেমন কিছু এগোয়নি। সবে তো একদিন এসেছি এখানে। হরিণগুলোকে স্টাডি করার চেষ্টা করছি। দেখা যাক কী করতে পারি।’
ডাক্তার পালিত বক্রোক্তি করে বললেন, ‘আপনি কিছুই করতে পারবেন না ৷ আমি পঁয়ত্রিশ বছর এখানে চিকিৎসকের কাজ করছি। আমিই পারলাম না। আর আপনি ক’দিনের ডাক্তার হয়ে পারবেন।’
ডাক্তার পালিতের কথাগুলো যথেষ্ট অপমানজনক হলেও রৌনক ভদ্রতার খাতিরে বলল, ‘একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?’
কথাটা শুনে ডাক্তার পালিত ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘চেষ্টা করে আপনি ঘোড়ার ডিম করবেন। বরং ফিরে যান। অযথা সরকারি পয়সা অপচয় করবেন না!’
এবার আর রৌনকের পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব হল না। প্রতিটা বাক্যে তাকে অপমান করে চলেছেন পালিত।
রৌনক তাই বাধ্য হয়েই বলল, ‘পয়সার অপচয় করলাম কিনা সে ভাবনা সরকারের ওপরই ছেড়ে দিন। আমাকে তাঁরা কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি কাজ করব। আপনার উপদেশের প্রয়োজন নেই।’
বেশ কঠিন স্বরেই কথাগুলো বলল রৌনক। ডাক্তার পালিত কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন তার দিকে। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, আমিও দেখব কত বড় পশু চিকিৎসক আপনি। মুখার্জিকে ক’দিনের মধ্যেই তার কাজের জন্য ভুল স্বীকার করতে হবে আমাদের কাছে৷’ এই বলে তিনি গটগট করে এগিয়ে গেলেন জেটির দিকে। সেদিকে। রৌনকরাও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর এগোল, যেদিকে হরিণগুলো গেছে
হরিণীদের পালটাকে তারা খুঁজে পেল সমুদ্রের কিনারে বড় একটা গাছের নীচে। তবে তাদের দঙ্গলে সেই পুরুষ হরিণটা নেই। একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে হরিণীগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে রৌনক দেখল, ঘা-অলা একটা হরিণী যেন ধুঁকতে শুরু করেছে। তার পিঠে মাছি ভন ভন করছে। অর্থাৎ তার ঘা-টা ছড়াচ্ছে। হরিণীটা অসহায় ভাবে মাঝেমাঝে মাছিগুলোকে তাড়াবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। কী করা যায় ভাবতে লাগল রৌনক। তার কানে বাজতে লাগল ডাক্তার পালিতের
সদ্য বলে যাওয়া কথাগুলো, ‘চেষ্টা করে আপনি ঘোড়ার ডিম করবেন!’
তবে রৌনক এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে বলল, “ওই ঘা-অলা হরিণীটাকে যদি ধরা যেত তবে ভালো হতো৷’
আব্দুল বলল, ‘ঘর থেকে জালটা এনে একবার চেষ্টা করতে পারি। তবে জানি না পারব কিনা!’
রৌনকের এবার মনে পড়ে গেল বাতিঅলার কথা। সে বলল, ‘ওই বাতিঅলাকে তো হরিণগুলো ভয় করে না তাই না?
আব্দুল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ স্যার। একমাত্র ও কাছে গেলেই এরা পালায় না৷’ রৌনক বলল, “তুমি একবার লোকটাকে খুঁজে দ্যাখো তো। দেখি ওকে বুঝিয়ে হরিণ ধরতে পারা যায় কিনা!
আব্দুল কথাটা শুনে একবার চারপাশে তাকিয়ে তার মুখের কাছে হাত দুটো এনে চিৎকার করে উঠল, ‘বাতিঅলা তুমি কোথায়? এখানে এসো।’
আব্দুলের গলার শব্দে কান খাড়া করল হরিণীরা। তবে তারা সে জায়গা ছেড়ে নড়ল না। আব্দুল থেমে থেমে চারপাশে মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাঁক দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ঝোপের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করল বাতিঅলা।
রৌনক তাকে হাসি মুখে বলল, ‘এসো বাতিঅলা। তোমার সঙ্গে একটু দরকার আছে। তুমি এই হরিণীদের খুব ভালোবাসো, তাই না? ওরা তো তোমাকে ভয় পায় না শুনলাম!’
‘হ্যাঁ,’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল লোকটা।
রৌনক তাকে বলল, ‘তুমি পিঠে ঘা-অলা হরিণী দুটোকে ধরতে পারবে। আমি
ওদের চিকিৎসা করব।’
বাতিঅলা বলল, ‘আপনাকে তো বলেইছি এগুলো সাহেবের হরিণ। সাহেব জানলে রাগ করতে পারেন। আমাকে মেরেও ফেলতে পারেন।’
রৌনক বলল, ‘শোনো, আমি থাকতে সাহেব তোমার কিছু করতে পারবে না। এ দেশটা এখন আর সাহেবদের নয়। এটা এখন স্বাধীন দেশ। ফাঁসি দেওয়া তো অনেক দূরের কথা, সাহেব তোমাকে চাবুক মারতে এলেও তাকে পুলিশ ডেকে জেলে পুরে দেব৷’
রৌনকের কথা শুনে বাতিঅলা মৃদু বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, “তোমার ভয় করছে না মরিস সাহেবের নামে এ কথা বলতে? সাহেব যদি জানতে পারেন…।’ তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রৌনক বেশ দৃঢ় ভাবে বলল, ‘বলছি তো সে কিছু করতে পারবে না। তার কোনও ক্ষমতা নেই। তাছাড়া দেখছ তো আমাদের সঙ্গে বন্দুক আছে।’
রৌনকের কথা শুনে ইতস্তত করতে লাগল লোকটা। রৌনক এরপর তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘দেখছ তো হরিণীগুলোর কেমন অবস্থা! ওদের চিকিৎসা না করলে ওরা মারা পড়বে। যেমন আগে কয়েকটা হরিণী মারা গেছে। ওই ঘাগুলো ছড়িয়ে পড়ছে। তুমি কি চাও নিরীহ প্রাণীগুলো বিনা চিকিৎসায় মারা যাক? তুমি তো ওদের ভালোবাসো! ওদের কষ্ট বোঝ না?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল বাতিঅলা। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে চলুন৷’ বাতিঅলাকে অনুসরণ করে তারা এগোল হরিণীগুলোর দিকে।
তারা এগোতেই হরিণীগুলো অন্য দিকে পালিয়ে যাবার উপক্রম করছিল। কিন্তু বাতিঅলা অদ্ভুত একটা শব্দ করল তাদের উদ্দেশে। পুরুষ হরিণরা যেমন ডাকে ঠিক তেমন শব্দ। আর সেই শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল হরিণীরা। প্রাণীগুলোর চোখের দৃষ্টিতে রৌনকদের দেখে ভয়ের ভাব ফুটে উঠলেও তারা কেউ পালাল না। বাতিঅলার সঙ্গে হরিণীদের দলের একদম কাছে পৌঁছে গেল রৌনকরা।
বাতিঅলা আবারও মুখ দিয়ে হরিণের ডাকের মতো শব্দ করল, তারপর রৌনকদের একটু তফাতে দাঁড়াতে বলে হরিণীর পালের মধ্যে ঢুকে ধুঁকতে থাকা হরিণীটার মাথায় হাত বোলাতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্ত কাটার পর বাতিঅলা ইশারাতে রৌনকদের কাছে ডাকল। তারা এগোতেই কিছু হরিণী কয়েক পা তফাতে সরে গেলেও রৌনকরা পৌঁছে গেল সেই ঘা-অলা হরিণীটার সামনে।
বাতিঅলা শব্দ করে কিছু যেন বলল হরিণীটাকে। সে নড়ল না। রৌনক হাত রাখল হরিণীটার গায়ে। তারপর ঝুঁকে পড়ে তার পিঠের ঘা-টা পরীক্ষা করতে শুরু করল। লম্বা একটা পটির মতো চামড়াটা সাত-আট ইঞ্চি ফেটে গেছে। ঘা-টা দেখে রৌনকের মনে হল সেটা কোনও চর্মরোগ বা পোকার আক্রমণে হয়নি। কেউ আঘাত
করে প্রাণীটাকে। ঘা-টা পচতে শুরু করে চারপাশে ছড়াতে শুরু করেছে। তবে কাটা দাগটা বেশি গভীর বলা যাবে না।
কিন্তু কীসের আঘাতে এমন দাগ হতে পারে? সেটা ধরতে না পারলেও রৌনক বুঝতে পারল যে প্রথমে এই পচনটা রোধ করা প্রয়োজন। কাজ শুরু করে দিল রৌনক। তার পিঠের কিট ব্যাগে কিছু চিকিৎসার সরঞ্জাম ছিল। সে সব ব্যবহার করে সে প্রথমে হরিণীটার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করল, তারপর একটা অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিল তার ক্ষতস্থানে। তারপর ক্ষতচিহ্নযুক্ত আর একটি হরিণীকে সে ধরতে বলল বাতিঅলাকে।
সেই হরিণীটা কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে ছিল। বাতিঅলা মুখ দিয়ে আবার সেইরকম শব্দ করে সেই হরিণীটার কাছে গিয়ে তাকে ধরল। তার পিঠের ক্ষতচিহ্নটাও একই রকম। তবে প্রথম হরিণীটার ঘা-এর মতো তা ততটা ছড়ায়নি এখনও। সেই হরিণীটাকেও একই ভাবে চিকিৎসা করল রৌনক। তারপর বাতিঅলার পিছন পিছন হরিণের পালের কাছ থেকে এসে তারা একটা বড় গাছের তলায় দাঁড়াল।
রৌনক বাতিঅলাকে বলল, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। ওই হরিণীদুটোর চিকিৎসার সুযোগ করে দিলে তুমি। এখন দেখা যাক মলম লাগিয়ে ওদের আরাম হয় কি না!’ বাতিঅলা রৌনকের কথার কোনও জবাব না দিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল৷ রৌনক তাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি কী ভাবছ বাতিঅলা?’
বাতিঅলা ভয়ে ভয়ে জবাব দিল, ‘ভাবছি মরিস সাহেব যখন জানতে পারবেন তখন কী হবে?’
রৌনক বুঝতে পারল, আবার ক্যাপ্টেন মরিসের ভূত খেলা করতে শুরু করেছে বাতিঅলার মাথায়। বাতিঅলাকে সাহস জোগানোর জন্য বলল, ‘আমি বলছি তো, ওই মরিস সাহেব তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’
বাতিঅলা এরপর আর কোনও কথা না বলে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে সে অদৃশ্য হয়ে গেল অন্য দ্বীপের দিকে।
এর পরই রৌনকের ফোন বেজে উঠল। বন অধিকর্তা মুখার্জি সাহেব ফোন করেছেন। তিনি প্রথমে জানতে চাইলেন রাত কেমন কেটেছে। রৌনক জানাল তার কোনও সমস্যা হয়নি। এরপর তিনি তার কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সে কথা বলার আগে রৌনক জানাল ডাক্তার পালিতের উপস্থিত হবার ব্যাপারটা আর তাঁর সঙ্গে রৌনকের কথোপকথন।’
মুখার্জি সাহেব সব শুনে বললেন, ‘ওই লোকটা ওই রকমই। ভয়ঙ্কর ধরনের ঈর্ষাপরায়ণ। নেহাত ডিপার্টমেন্টের সিনিয়ার ডাক্তার তাই আমি ওঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিই না। তবে আমি ওনাকে জানিয়ে দিচ্ছি উনি যেন আপনাকে আর বিরক্ত না করে।’
রৌনক এরপর তাঁকে জানাল যে বাতিঅলার সাহায্যে সে ঘা-অলা হরিণী দুটোর গায়ে ওষুধ লাগিয়েছে। তবে ওই ক্ষতর সৃষ্টি কী কারণে হচ্ছে তা সে এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। হয়তো আরও কয়েকটা দিন এখানে থেকে হরিণগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলে সে রোগের কারণটা উদ্ধার করতে পারবে।
এ কথা বলার পর রৌনক তাঁকে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, ব্রিটিশ আমলে এখানে ক্যাপ্টেন মরিস নামের কোনও সাহেব ছিলেন কিনা আপনি জানেন? ‘ ‘কেন বলুন তো? পাল্টা প্রশ্ন করলেন মুখার্জি সাহেব।
রৌনক বলল, ‘নিছক একটা কৌতূহল বলতে পারেন। আসলে বাতিঅলার মনে ওই মরিস সাহেব সম্পর্কে একটা প্রবল ভয় কাজ করে। হয়তো বা সে কোথাও শুনে থাকবে অত্যাচারী মরিস সাহেবের কাহিনি। আর সেটাই তার মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। ‘যদি বাতিঅলার মন থেকে মরিস সাহেবের ব্যাপারটা সরিয়ে ফেলা যায় তবে অনেক কাজ করানো যাবে ওকে দিয়ে। আমার কাজের সুবিধা হবে। কারণ হরিণগুলো ওর কথা শোনে। হরিণদের সঙ্গে থাকতে থাকতে হরিণের ডাকও রপ্ত করে ফেলেছে লোকটা!’
মুখার্জি সাহেব বললেন, ‘না, ওই ক্যাপ্টেন মরিসের সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা নেই। সে সময় ওখানকার ব্রিটিশ সাহেবরা সকলেই তো অত্যাচারী ছিলেন। তবে আমার সঙ্গে এখানকার একজন ইতিহাস গবেষকের পরিচয় আছে। আমি তাঁর থেকে ব্যাপারটা সম্পর্কে খোঁজ নেব।”
এরপর আরও কিছু সাধারণ কথা বলে তিনি ফোন ছেড়ে দিলেন।
হরিণগুলো নিজেদের জায়গাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। গাছের তলায় বসে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে লাগল রৌনক৷ সময় এগিয়ে চলল। দেখতে দেখতে এক সময় সূর্য ঠিক মাথার ওপরে উঠল। রৌনক, আব্দুলকে বলল, ‘তুমি বরং এখানেই খাবারগুলো নিয়ে এসো। আমি হরিণীগুলোর ওপর নজর রাখি।’
রৌনকের কথা মতো খাবার নিয়ে এল আব্দুল। সেই গাছের তলায় বসেই খেল তারা দুজন। যে হরিণী দুটোর গায়ে ওষুধ লাগানো হয়েছে তাদের দেখে রৌনকের মনে হল ইতিমধ্যে তারা কিছুটা সুস্থ বোধ করছে ওষুধের গুণে। ধুঁকতে থাকা হরিণীটা মাঝে মাঝে ঘাস ছিড়ে খাচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটিয়ে হরিণীদের ওপর একই ভাবে নজর রাখতে লাগল তারা। রৌনক বলল, ‘ওই পুরুষ হরিণটাকে কিন্তু আজ একবারও চোখে পড়ল না!’
আব্দুল বলল, “ও সাধারণত একলাই ঘুরে বেড়ায়। করবখানার ওদিকে যেখানে
একটা ভাঙা ইট পাথরের স্তূপ আছে সেখানে হরিণটা অনেক সময় থাকে। কথা বলতে বলতে সময় এগিয়ে চলল। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল এক সময়। তার কিছুক্ষণ পর হরিণীর দল যাত্রা শুরু করল জলপানের উদ্দেশে। রৌনকরাও আগের দিনের মতো তাদের অনুসরণ করল। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে জলপান শুরু করল হরিণীগুলো। যদিও তারা পিছন ফিরে রৌনকদের দিকে তাকাচ্ছিল, তবু তাদের দেখে রৌনকের মনে হল হরিণীগুলোর ভয় যেন অনেকটাই কেটে গেছে। সেই অসুস্থ হরিণী দুটোও জলপান করল।
এরপর সারা দিনের শেষে দেখা মিলল বিশাল শিংঅলা হরিণটার। আগের দিনের মতোই পুরুষ হরিণটা হরিণীগুলোকে নাচঘর অবধি পৌঁছে দিয়ে চলে গেল জঙ্গলের ভিতরে।
এ দিনের মতো কাজ শেষ । রোনকদের। সূর্য ডুবতে শুরু করেছে সমুদ্রের
বুকে। সেদিকে তাকিয়ে আব্দুল বলল, ‘আমি তবে আজ যাই স্যার? কালকে ভোরের আলো ফুটলেই চলে আসব।’ রৌনক একবার গতরাতের স্বপ্নটার কথা ভাবল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ আব্দুল, তুমি যাও।’
ঘরে বন্দুকটা রেখে আব্দুল ফেরার জন্য রওনা হয়ে গেল।
আগের দিনের মতোই ঘরের দরজার পাশে রাখা কাঠের গুঁড়িটার ওপর বসল রৌনক। সে ভাবতে লাগল হরিণীগুলোর গায়ে ওই ঘাগুলো কী কারণে হতে পারে? —এ সব কথা ভাবতে ভাবতে রৌনক এক সময় খেয়াল করল, সূর্য ডুবে গিয়ে চারপাশে আঁধার ঘনাতে শুরু করেছে।
রৌনক বাড়ির ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় যে দেখতে পেল বাতিঅলা এসে দাঁড়াল নাচঘর আর রৌনকের ঘরের মাঝের ফাঁকা জমিতে। তারপর মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল। রৌনক এগোল তার দিকে। সে কাছাকাছি যেতেই লোকটা পায়ের শব্দ পেয়ে তাকাল রৌনকের দিকে। তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। রৌনক তাকে বলল, ‘কী এত ভাবছ তুমি?’
, বাতিঅলা একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘সাহেব কিন্তু জেনে গেছেন যে তুমি গতরাতে এই দ্বীপে ছিলে৷’
, রৌনক বলল, “তাহলে তো সেটা তোমার পক্ষে আরও ভালো হল। তুমি সাহেবকে বলবে যে আমার সঙ্গে বন্দুক আছে। সে তোমার ক্ষতি করতে চাইলে আমি তাকে ছাড়ব না৷’
লোকটা এর জবাবে কোনও কথা বলল না। সে ঠিক আশ্বস্ত হতে পারছে না রৌনকের কথা শুনে। চারপাশে দ্রুত অন্ধকার নামছে। এক সময় বাতিঅলা বলল, “যাই, নাচঘরের বাতিগুলো জ্বালাতে হবে।
ওই ভাঙা ঝাড়বাতিতে আলো জ্বালাবে কী করে তা দেখার জন্য রৌনক বলল, ‘চলো আমিও তোমার সঙ্গে যাই।’
বাতিঅলা বলে উঠল, ‘না, তোমাকে আমি সঙ্গে নিতে পারব না। সন্ধ্যার পর কারও নাচঘরে ঢোকার অনুমতি নেই। এমনকী গোরা সৈন্যদেরও নয়।’ রৌনককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বাতিঅলা চলে গেল নাচঘরের দিকে। রৌনকের মনে হল লোকটাকে অনুসরণ করা তার উচিত হবে না। কারণ লোকটা রৌনকের ওপর ক্ষেপে গেলে তার কাজের সমস্যা হতে পারে। রৌনক তাই চুপচাপ নিজের ঘরে ফিরে এল।
রাত ন’টা নাগাদ খাওয়া সেরে বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল রৌনক৷ সমুদ্রের একটানা গর্জন শুনতে শুনতে একসময় ঘুম নেমে এল চোখে৷ হঠাৎই মাঝ রাতে একটা চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে গেল তার। মনে হল কোথা থেকে যেন একজন মানুষের আর্তনাদের শব্দ তার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিল। ঘুম ভাঙার পর দ্বিতীয়বার আবার একটা শব্দ শুনতে পেল সে। তবে তা মানুষের নয়, একটা হরিণ চিৎকার করে উঠল। রৌনকের একবার মনে হল বন্দুকটা নিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে দেখে আসে যে
কিছু ঘটেছে কিনা? কিন্তু এর পর বাইরেটা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল৷
হাত ঘড়ি দেখল রৌনক। রাত দুটো বাজে। তার মনে হল বন্দুক থাকলেও এত রাতে একলা বাইরে বেরোনো ঠিক হবে না। তাছাড়া বাইরে থেকেও আর কোনও শব্দ আসছে না। হরিণ তো কোনও কারণে ডাকতেই পারে। হয়তো মানুষের চিৎকারটা তার মনের ভুল! এসব ভাবতে ভাবতে রৌনক এরপর ঘুমিয়ে পড়ল।
রৌনকের ঘুম ভাঙল খোলা জানালা দিয়ে ভেসে আসা পাখির ডাকে। চোখ মেলে সে দেখল ভোরের প্রথম আলো প্রবেশ করছে তার ঘরের ভিতর। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মোটর বোটের ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পেল। আর তার পরই আব্দুল এসে দরজার কড়া নাড়ল।
চা-পান ইত্যাদি কাজ সেরে আব্দুলকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল রৌনক। নাচঘরটার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘চলো, আগে ওর ভিতরটা দেখে আসি।’ আব্দুল বলল, ‘আজকেও ওখানে যাবেন?’
রৌনক বলল, ‘কাল রাতে একবার হরিণের চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেছিল। ওরা তো রাতে ওখানেই থাকে। তাই নাচঘরটা একবার দেখা দরকার।” আব্দুল রৌনককে নিয়ে এগোল নাচঘরের দিকে।
নাচঘরের ভিতর ঢুকে আলো ফেলে তারা দেখতে লাগল চারপাশে। প্রথমে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল না। তারা এরপর ঘর থেকে বেরিয়েই আসছিল, ঠিক সেই সময় কিছুটা কাকতালীয় ভাবেই মেঝের ওপর টর্চের আলো পড়তে তারা দেখল, ফোঁটা ফোঁটা কী যেন পড়ে আছে সেখানে! কালচে মতো ফোঁটা। কাছে গিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করতেই রৌনকরা বুঝতে পারল সেগুলো আসলে রক্তের ফোঁটা! জমাট বেঁধে কালচে রং ধারণ করতে শুরু করেছে।
আব্দুল অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘এ কার রক্ত?’
রৌনক বলল, ‘জানি না, হরিণীগুলোর ক্ষতস্থান থেকে কি রক্ত বেরোচ্ছে নাকি ওরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করেছে! সে জন্যই কি কোনও আহত হরিণী বা হরিণ চিৎকার করে উঠেছিল কাল রাতে! তাড়াতাড়ি চলো তো, হরিণগুলোকে দেখা দরকার। নাচঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে সমুদ্রের ধারে একটা ধ্বংসস্তুপের ওপর হরিণীগুলোকে দেখতে পেল তারা। রৌনক দেখল, কাল যে হরিণী দুটোর গায়ে মলম লাগানো হয়েছিল, তাদের গত দিনের থেকে বেশ খানিকটা সুস্থ স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ ওষুধ সম্ভবত কাজ করতে শুরু করেছে।
অন্য কোনও হরিণীর গায়েও নতুন করে কোনও ক্ষতচিহ্ন চোখে পড়ল না তাদের। কিন্তু হরিণীগুলোকে আজ যেন কেমন চঞ্চল মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝেই চমকে উঠে চারপাশে তাকাচ্ছে তারা। কান খাড়া করে কোনও শব্দ শোনার চেষ্টা করছে। * রৌনক অনেকটা স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘ব্যাপারটা কী হয়েছে কে জানে! গত রাতে কি সত্যিই ওদের সঙ্গে কিছু ঘটেছে? বা ওরা কিছু দেখেছে?’
আব্দুল বলল, ‘আমারও মনে হচ্ছে হরিণীগুলো কোনও কারণে ভীষণ ভয় পেয়েছে৷’
রৌনক একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘একটা কাজ করা যাক। তুমি বাতিঅলাকে ডাকো। গতকাল সন্ধ্যায় তাকে আমি নাচঘরে ঢুকতে দেখেছিলাম। হয়তো সে হরিণদের সম্পর্কে কিছু বলতে পারবে। তাছাড়া হরিণী দুটোর গায়ে আবার মলম লাগাতে হবে। ওকে দিয়ে হরিণী দুটোকে ধরা দরকার।’
রৌনকের কথা শুনে, আব্দুল ডাকতে শুরু করল। সেই শব্দ দ্বীপের ভগ্নস্তূপগুলোর মধ্যে প্রতিধবনিত হয়ে ফিরে আসতে লাগল। কিন্তু বাতিঅলা এল না। আব্দুল বলল, ‘ও আসছে না কেন? চলুন ওকে খুঁজে দেখি।’
দ্বীপের মধ্যে চলতে শুরু করল দুজনে। আব্দুল চলতে চলতে ডাকতে লাগল বাতিঅলাকে। রৌনকও বেশ কয়েকবার ডাকল তার নাম ধরে। কিন্তু লোকটার কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। মাঝে মাঝে বেশ কয়েকবার হরিণীর দলের সঙ্গে দেখা হল তাদের। আর রৌনকদের দেখতে পেয়েই তারা ভয় পেয়ে অন্য দিকে চলে যেতে লাগল।
বাতিঅলার খোঁজ করতে করতে এক সময় তারা কবরখানার কাছাকাছি পৌঁছে গেল। তার অনতিদূরেই একটা ইট পাথরের ধ্বংসস্তূপ আছে। যার ওপর সেই বিশাল শিংঅলা মদ্দা হরিণটাকে রৌনক প্রথম দেখেছিল। সে বলল, ‘চলো তো একবার ওই জায়গাটা গিয়ে দেখি।’
আব্দুল ইতস্তত করে বলল, ‘চলুন দেখি। কিন্তু ওই মদ্দা হরিণটার শিং-এর মাথাগুলো বল্লমের ফলার মতো ধারালো। একটু সাবধানে যেতে হবে।’
রৌনকরা সাবধানে সেই ইট-পাথরের স্তূপের পিছনে গিয়ে উপস্থিত হল। না, হরিণটা সেখানে নেই। তবে স্তূপের পিছনে কিছুটা এগোতেই তারা দেখতে পেল সেখানেও ফোঁটা ফোঁটা শুকনো রক্ত পড়ে আছে! ব্যাপারটা দেখার পর রৌনক চিন্তিত গলায় বলল, ‘আমার ধারণা ওই মদ্দা হরিণটাই আহত হয়েছে। এ ওরই রক্ত৷ কাল রাতে ওর চিৎকারই শুনেছিলাম আমি।’
আব্দুল বলল, “কিন্তু ওর সমকক্ষ শক্তিধর হরিণ তো আর এখানে নেই যে ওর সঙ্গে লড়াই করবে !
রৌনক বলল, ‘এমন কি হতে পারে যে চোরা শিকারি বা অন্য লোকেরা রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে এ দ্বীপে আসে?’
আব্দুল মাথা নেড়ে বলল, ‘সে সম্ভাবনা কম। কারণ এ দ্বীপকে সবাই রাতের বেলায় এড়িয়ে চলে। একবার অবশ্য দুজন এ দ্বীপে ঢুকেছিল। বাতিঅলাই তাকে ধরে জল পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল।’
রৌনক এ কথা আগেও শুনেছে। সে এগিয়ে গিয়ে কবরখানার ভাঙা প্রাচীরের ভিতর দিয়ে একবার কবরখানাটায় উঁকি দিয়ে দেখে নিয়ে, তারপর আবার দ্বীপের অন্য দিকে বাতিঅলার অনুসন্ধান করতে লাগল।
বাতিঅলাকে খুঁজতে খুঁজতে দুপুর হয়ে গেল, কিন্তু তার দেখা মিলল না। আব্দুল হঠাৎ বলল, ‘আপনি কি আজ রাতেও এখানেই থাকবেন স্যার?’
রৌনক বলল, ‘যতক্ষণ না হরিণগুলোর ঘা-এর কারণ খুঁজে পাচ্ছি ততক্ষণ আমার এখানেই থাকা দরকার। চব্বিশ ঘণ্টা অবজারভ করতে হবে।’ আব্দুল বলল, ‘আজকের রাতটা না হয় আপনি পোর্ট ব্লেয়ারেই ফিরে চলুন।’ রৌনক জানতে চাইল, ‘কেন বলো তো?’
আব্দুল বলল, ‘আজকের ওয়েদার রিপোর্ট বলছে, আজ সন্ধ্যার পর থেকে সমুদ্রে নিম্নচাপের ফলে ঝড় বৃষ্টি হতে পারে। তার মধ্যে কি আপনার এ দ্বীপে একা থাকা উচিত হবে?’
রৌনক বলল, ‘সুনামির মতো বড় কিছু হবে না নিশ্চয়ই? আমি তো ঘরের মধ্যেই থাকব। অসুবিধা হবে না। আর তাছাড়া তুমি চলে যাবার পর সন্ধে নামার আগে বাতিঅলা রোজ একবার নাচঘরের সামনে আসে। তখন আমার সঙ্গে কথা হয়
ওর। হয়তো সে আজকেও আসবে। তখন তার থেকে অনেক কিছু জানতে হবে।” এ কথা শুনে আব্দুল আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল। আজ যেন একটু তাড়াতাড়ি জলপান করার উদ্দেশে যাত্রা করল হরিণীরা।
আব্দুল আকাশের দিকে আঙুল তুলে ছোট্ট একখণ্ড কালো মেঘ দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখুন স্যার, আকাশের কোণে মেঘ জমতে শুরু করেছে। জানেনই তো বন্য প্রাণীরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম আভাস পায়। সে জন্যই হরিণীরা আজ আগে জল খেতে যাচ্ছে।’
১০
হরিণীগুলো তাদের জলপানের জায়গায় পৌঁছাতেই গাছপালার আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল সেই বিশাল হরিণটা। তার দিকে ভালো করে তাকিয়েই চমকে উঠল রৌনক। হরিণটার গায়ে একটা লম্বা দগদগে ক্ষতচিহ্ন। অর্থাৎ রৌনকের অনুমানই ঠিক। যে রক্তের ফোঁটা তারা দেখেছিল তা ওই হরিণটার দেহ থেকেই পড়েছে।
একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল যে ওই হরিণীদের দেহের ক্ষতচিহ্নগুলো আসলে কোনও রোগ নয়, আঘাতের কারণে হয়েছে। কারণ, কোনও চর্মঘটিত রোগ হলে এক রাতের মধ্যে অমন দগদগে ক্ষতর সৃষ্টি হতে পারে না। তবে কে আঘাত করছে ওদের! তবে কি কেউ বা কারা রাতে এ দ্বীপে আসে কোনও কারণে? আর তারাই আঘাত করছে হরিণদের? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবছিল রৌনক।
হরিণটা অন্যদিনের মতোই হরিণীগুলোকে নাচঘরে পৌঁছে দিয়ে অন্য দিকে চলে
গেল।
আব্দুল তাকাল আকাশের দিকে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে রৌনক দেখল, কালো মেঘের টুকরোটা ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে।
রৌনক আব্দুলকে বলল, ‘তুমি আর দেরি কোরো না। বেরিয়ে পড়ো। হঠাৎ সমুদ্রে ঝড় বৃষ্টি নামলে বিপদে পড়বে।’
আব্দুল আর দেরি না করে ফিরে গেল।
ততক্ষণে গোটা আকাশ মেঘে ছেয়ে গেছে। হঠাৎই রৌনক দেখতে পেল বাতিঅলাকে। রৌনককে তার দিকে এগোতে হল না। সে নিজেই এসে দাঁড়াল তার সামনে। রৌনক বলল, ‘তুমি সারা দিন কোথায় ছিলে? কতবার তোমার নাম ধরে ডাকলাম। সারা দ্বীপে তোমাকে খুঁজে বেড়ালাম।’ সে একটু চুপ করে থেকে জবাব দিল, ‘একটা ভাঙা ঘরের মধ্যে ঘুমোচ্ছিলাম।’
রৌনক বলল, ‘বোসো, তোমার সঙ্গে কথা আছে।’
বাতিঅলা বলল, ‘হ্যাঁ, আমারও কথা আছে তোমার সঙ্গে।’
কাঠের গুঁড়িটার দু-পাশে দুজনে বসল। রৌনক কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘আগে তোমার কথাটা শুনি।’
বাতিঅলা বলল, ‘তোমার কাছে ঘা-তে লাগাবার ওই মলমটা আর আছে? আমাকে দেবে? ‘
রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ আছে তো। নিশ্চয়ই দেব। হরিণের গায়ে লাগাবে? ওই জন্যই তো তোমাকে আমরা সারাদিন খুঁজছিলাম।’
উপর নীচে মাথা নাড়ল লোকটা।
রৌনক এবার আসল কথাটা উত্থাপন করল। সে বলল, ‘তোমার থেকে আমার একটা কথা জানার ছিল। কাল রাতে আমি হরিণের চিৎকার শুনেছিলাম। আজ দেখলাম পুরুষ হরিণটার পিঠে কাটা দাগ। আমার ধারণা ওদের পিঠের দাগগুলো আসলে আঘাতের চিহ্ন। তুমি জানো কে আঘাত করছে ওদের?’
রৌনকের প্রশ্ন শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বাতিঅলা তাকে জিগ্যেস করল, “তুমি কাল বলেছিলে যে সাহেবদের আর কোনও ক্ষমতা নেই, সেটা কি সত্যি কথা?’
রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যি কথা৷’
বাতিঅলা বলল, ‘কিন্তু মরিস সাহেব যে বলেন তাঁর কথাই এ দ্বীপের শেষ কথা! তাঁর কথা না শুনলে উনি যা খুশি করতে পারেন। ফাঁসিও দিতে পারেন।’ রৌনক বলল, ‘মিথ্যে কথা৷ দেশটা এখন সাহেবদের নয়। তোমার আমার। প্রায় আশি বছর হতে চলল আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।
‘তুমি মরিস সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে পারবে?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারব।’ দৃঢ় গলায় বলে উঠল রৌনক৷
লোকটার মন থেকে সংশয় তখনও কাটল না। সে বলল, “আমি কী করে জানব দেশ স্বাধীন হয়েছে? তুমি সত্যি কথা বলছ? এর আগে অবশ্য আরও অনেকে আমাকে এ কথা বলেছে।’
রৌনক বলল, ‘সমুদ্রে যে বোটগুলো চলে তাদের মাথায় যে আমাদের স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ে তা তুমি দেখতে পাও না? পোর্ট ব্লেয়ার, রস আইল্যান্ড এসব দ্বীপের মাথাতেও তো ওড়ে।’
বাতিঅলা বলল, ‘আমি পোর্ট ব্লেয়ার যাইনি। প্রথমে রস আইল্যান্ডে গেছিলাম, তারপর সেখান থেকে আমাদের এখানে আনা হয়েছিল। দেশ যদি স্বাধীনই হয়ে থাকে তবে মরিস সাহেবের এত দাপট থাকে কীভাবে?’
বাতিঅলার মাথা থেকে কিছুতেই মরিস সাহেবের ব্যাপারটা যাচ্ছে না। হঠাৎই রৌনকের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। পকেট থেকে সে তার মোবাইল বার করে নেট ঘেঁটে একটা ভিডিও ক্লিপ চালু করল। প্রথম স্বাধীনতার দিবসের ভিডিও ক্লিপ সেটা৷ বাতিঅলাকে কাছে ডেকে সে বলল, ‘যে পতাকা তুলছে তাকে তুমি চেনো?’ বেশ কয়েকবার ভিডিওটা দেখার পর সে বিস্মিত ভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, চিনি তো। ওনার ছবি দেখেছি। উনি নেহেরুজি।’
রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ, উনি। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। এরপর রৌনক তাকে আরও এমন কিছু ভিডিও ক্লিপ আর ছবি দেখাল যাতে প্রমাণ করা যায় যে এ দেশটা স্বাধীন৷
বাতিঅলা খানিক দ্বিধাভরেই বলল, ‘মরিস সাহেব কি তবে আমাদের মিথ্যে ভয় দেখান?’
রৌনক জানতে চাইল ‘তুমি কি সত্যি দেখতে পাও মরিস সাহেবকে ?” লোকটা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, প্রতি রাতে উনি নাচঘরে নাচ দেখতে আসেন। আমি নাচঘরে তাঁর জন্য বাতি জ্বালাই, তাঁর খিদমত খাটি।’
বাতিঅলার কথা শুনে রৌনক চুপ করে ভাবতে লাগল, এ কীভাবে সম্ভব ! ভাবতে ভাবতে দুটো সম্ভাবনার কথা মাথায় এল তার। প্রথমটা হল বাতিঅলার হ্যালুসিনেশান হয়, কল্পনাতে সে মরিস সাহেবকে দেখতে পায়। আর দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা হল মরিস সাহেব সেজে কেউ এই দ্বীপে রাতে আসে। সে-ই কোনও ভাবে বাতিঅলার মাথায় ব্যাপারটা ঢুকিয়েছে, তার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদি দ্বিতীয় কারণটা হয়ে থাকে তবে ধরতে হবে সেই বদ লোকটাকে। তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। রৌনক কথাটা ভেবে নেবার পর বাতিঅলাকে বলল, ‘আজ রাতে আমি নাচঘরে
যাব। দেখি তোমার মরিস সাহেব আমায় কী করতে পারে! আমি তাকে বুঝিয়ে দেব আমরা সত্যিই স্বাধীন৷
বাতিঅলা বলল, ‘তুমি যদি সত্যিই তা করতে পারো তবে তোমার কথা আমি বিশ্বাস করব। আর মরিস সাহেবের সব পাওনাও চুকিয়ে দেব। মাঝ রাতে যখন নাচঘর থেকে শব্দ শুনতে পাবে তখন চলে যেও ওখানে।
আছে।’ রৌনক দৃঢ় গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, আমি যাব। আর বন্দুকটা সঙ্গে নিয়েই যাব।” বাতিঅলা বলল, ‘মলমটা এবার দাও। আমি নাচঘরে যাই। হরিণীগুলো ওখানেই
রৌনক ব্যাগ থেকে মলমের কৌটো বার করে তুলে দিল তার হাতে। সেটা নিয়ে চলে যেতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল বাতিঅলা। রৌনককে অবাক করে দিয়ে সে বলল, ‘জানো, আমার নাম, ধাম, আমি কীভাবে এখানে এলাম, আমি কে—এসব কিছু আমার মনে পড়ে গেছে৷’
রৌনক জানতে চাইল, ‘কে তুমি?’
সে বলল, ‘তুমি যদি আজ সত্যি সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারো, তোমার কথা প্রমাণ করতে পারো, তখন বলব।’—এই বলে আধো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে নাচঘরের দিকে মিলিয়ে গেল।
জোর বাতাস বইতে শুরু করেছে। রৌনকও ঘরের ভিতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে ঝড় শুরু হল, তার সঙ্গে সমুদ্রের গর্জনও বাড়তে লাগল। তারপর শুরু হল বিদ্যুতের চমক। সেই আলোতে খোলা জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে চোখে পড়তে লাগল সমুদ্রর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা কবরখানার প্রাচীরটা। এক সময় বৃষ্টিও শুরু হল। কখনও বৃষ্টি কমছে তারপরই আবার বাড়ছে। ঝড়
বৃষ্টির বিরাম নেই। সময় এগিয়ে চলল। এক সময় খাওয়া সেরে রৌনক শুয়ে পড়ল৷ প্রতীক্ষা করতে লাগল বাইরে থেকে অন্য কোনও শব্দ তার কানে আসে কি না৷
হ্যাঁ, এক সময় শব্দ শোনা গেল, বৃষ্টি তখন সাময়িক কিছুটা কমেছে। রৌনকের মনে হল একটা অন্যরকম শব্দ অস্পষ্ট ভাবে ভেসে আসছে বাইরে থেকে। বিছানা ছেড়ে উঠে বন্দুক নিয়ে রৌনক বেরিয়ে পড়ল ঘরের বাইরে। হ্যাঁ, শব্দটা আসছে নাচঘর থেকেই। মানুষের কথাবার্তা, নূপুরের ছমছম আওয়াজ ইত্যাদি নানা মিলিত শব্দ।
রৌনক ভেবে নিল কেউ যদি মরিস সাহেব সেজে এখানে অপকর্ম করার জন্য আসে তবে তাকে উচিত শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করবে সে। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে, তবে হাওয়ার তেজ কমেনি। রৌনক এগোল নাচঘরের দিকে। ভিতের ওপর থেকে তোরণ অতিক্রম করতেই সে দেখল, নাচঘরের ভিতর থেকে আলো আসছে। সে ঠিক করে নিল আগে সে পরিস্থিতিটা দেখে নেবে, তারপর ভিতরে প্রবেশ করবে।
রৌনক এগিয়ে গিয়ে দরজার আড়াল থেকে ভিতরে উঁকি দিয়ে অবাক হয়ে গেল। নাচঘরটা যেন হুবহু তার দেখা স্বপ্নের মতো। সেদিনের মতোই ঝাড়বাতি জ্বলছে, তার নীচে একটা মেয়ে নেচে চলেছে, ঘরের মধ্যে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আরও বেশ কিছু যুবতী। এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে বাতিঅলা, আর আরাম কেদারাতে মদের গ্লাস হাতে বসে আছে লাল দাড়িঅলা সাহেব।
তবে কি দু’দিন আগের রাতে রৌনক যা দেখেছিল তা সত্যি ছিল? আর একটা জিনিস সে বুঝতে পারল না, সকালের ধুলোময় নোংরা ঘরটা এটুকু সময়ের মধ্যে কীভাবে ঝলমলে হয়ে উঠল! ডাল ভাঙা ঝাড়বাতিটাও কীভাবে নতুন হয়ে গেল ?
রৌনক এক সময় খেয়াল করল বাতিঅলা মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো সে রৌনক এসেছে কি না তা দেখার চেষ্টা করছে। রৌনক তার মাথাটা আর বন্দুক সমেত হাতটা বার করল দরজার আড়াল থেকে। সে বুঝল বাতিঅলা দেখতে পেয়েছে তাকে৷
নাচ হয়ে চলেছে। তবে মেয়েটি আগের দিনের মেয়েটা নয়, কৃষ্ণাঙ্গী খুব সুন্দরী এক যুবতী সে। মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে এক সময় সাহেব মেয়েটার উদ্দেশে বলল, ‘এবার কাপড় খোল।’
কথাটা শুনে নাচ থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মেয়েটা।
সাহেব আবারও বলল, ‘কাপড় উতার।’
১১
মেয়েটা তবুও দাঁড়িয়ে রইল। এরপর মেয়েটা তাকাল বাতিঅলার দিকে। বাতিঅলা মাথা নেড়ে তাকে কাপড় খুলতে নিষেধ করল।
সাহেব এরপর চিৎকার করে বলল, ‘দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোকে কাপড় খুলতে বলছি শুনতে পাচ্ছিস না?’
মেয়েটা জবাব দিল, ‘না, আমি কাপড় খুলব না। আর আমার ইজ্জত নষ্ট হতে দেব না।’
সাহেব যেন কল্পনাও করতে পারেনি মেয়েটা এভাবে উত্তর দেবে। তার মুখ লাল হয়ে উঠল। চোখ দুটো মশালের মতো জ্বলে উঠল।
হিংস্র ভাবে সাহেব বলল, ‘দেখি তুই কেমন করে কাপড় না খুলিস! চাবুকের এক ঘা পিঠে পড়লে ঠিকই খুলবি। যেমন অন্যরা খুলেছে। তারপর চাবুকের ঘা নিয়ে ল্যাংটো হয়ে নাচবি তুই, আর ক’দিন পর ঘা বিষিয়ে মারা যাবি। আমার চাবুকের ডগায় বাঁধা সীসের টুকরোটা দেখেছিস তো? এটা কেটে বসবে তোর শরীরে।” এই বলে সে মদের গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে পাশের টেবিলে রাখা চাবুকটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কালো সাপের মতো হিলহিলে একটা চাবুক। তার ডগায় ধাতুর টুকরো বাঁধা।
চাবুকটা মাথার ওপর একবার ঘুরিয়ে নিয়ে সাহেব বলল, ‘তোকে শেষ বারের মতো বলছি, কাপড় খুলবি কি না?’
বাইরে বেশ জোরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। সেই বাতাস ঘরের ভিতরও প্রবেশ করেছে। দুলতে শুরু করেছে ঝাড়বাতিটা। আতঙ্ক ফুটে উঠেছে ঘরের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা অন্য মেয়েগুলোর মুখে
যে মেয়েটাকে কাপড় খুলতে বলছে সে মেয়েটা আর একবার তাকিয়ে নিল বাতিঅলার দিকে। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে সাহেবের উদ্দেশে বলল, ‘না, আমি কাপড় খুলব না।’
সাহেব চাবুকটা তুলে মেয়েটার দিকে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু রৌনক আর দেরি না করে হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। থমকে গেল সাহেব। বিস্ময় ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। সাহেব জিগ্যেস করল, ‘তুই কে? এখানে কী করে ঢুকেছিস?’
রৌনক দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘মেয়েটা কাপড় খুলবে না। আর আমি কে সেটা তুমি বুঝতে পারবে। তবে তুমি যে একজন ঠগবাজ লম্পট, সেটা আমি বুঝে গেছি।” কথাটা শুনে সাহেব চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ব্লাড়ি, নিগার! তুই এ কথা বলার সাহস পেলি কীভাবে?”
রৌনকও পালটা চিৎকার করে বলল, ‘মুখ সামলে কথা বলো৷ তুমি এই বাতিঅলাকে মিথ্যে বুঝিয়ে ভয় দেখিয়ে এখানে কুকীর্তি করছ! তোমাকে আমি গারদে ঢোকাবার ব্যবস্থা করছি। তুমি যদি সত্যিকারের সাহেবও হয়ে থাকো তবুও তোমার এখন কিছু করার নেই। দেশটা এখন আর তোমার বাপের সম্পত্তি নয়। এটা একটা স্বাধীন দেশ।’
রৌনককে বন্দুক তাক করতে দেখে সাহেব এবার একটু থমকে গেল। তারপর বলল, ‘বন্দুক কিধার মিলা? মালুম হোতা হ্যায় ইয়ে কোই ক্রান্তিকারী হ্যায়! বাতিঅলা
আভি গার্ড লোককো বুলাও। পাকড়ো উসকো।’
বাতিঅলা সাহেবের কথা শুনে এগিয়ে এল ঠিকই, তবে রৌনকের দিকে নয়, সাহেবের দিকে। তারপর সাহেবের চাবুক ধরা হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘তুমি অনেক অত্যাচার করেছ সাহেব, মেয়েদের ইজ্জত নিয়ে খেলেছ। আজ আর তোমাকে আমি ছাড়ব না।’
সাহেবের কাছে ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত ছিল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাতিঅলাকে সে বলল, ‘কাল চাবুক খেয়েও তোর শিক্ষা হয়নি? তোকে আমি ফাঁসিতে লটকাব।’ চাবুক নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু হল দুজনের মধ্যে। ঘরের মেয়েরা ভয় পেয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। রৌনক, বাতিঅলার উদ্দেশে বলল, ‘বাতিঅলা তুমি ভয় পেও না। শয়তানটা তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না।’
রৌনকের কথা শুনে বাতিঅলা এবার সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সাহেবের ওপর। ঠিক সেই সময় খুব জোরে একটা হাওয়ার দমক এল ঘরের ভিতর। আর সেই বাতাসে দুলে উঠল ঝাড়বাতিটা। তারপর প্রচণ্ড শব্দ করে খসে পড়ল ঘরের ভিতর। মোমবাতিগুলো এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ে নিভে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল গোটা ঘরটা। মেয়েরা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করতে করতে ঘরের মধ্যে ছোটাছুটি করতে লাগল ।
অন্ধকারের মধ্যে কারও একজনের ধাক্কাতে রৌনক পড়ে গেল মাটিতে। বন্দুকটাও খসে পড়ল তার হাত থেকে। ঠিক সেই সময় সে দেখল, বাতিঅলার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে বাইরে ছুটে পালাচ্ছে সাহেব। রৌনক চিৎকার করে বলে উঠল, ‘বাতিঅলা, ওকে পালাতে দিও না, ধরো ওকে।’
বাতিঅলাও ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটল শয়তানটাকে ধরার জন্য। অন্ধকার হাতড়ে বন্দুকটা কুড়িয়ে নিয়ে বাইরে বেরোতে কয়েক মিনিট সময় লাগল রৌনকের। সে যখন তোরণের বাইরে বেরিয়ে এল, তখন সে শুনল পায়ের শব্দ ছুটে চলেছে কবরখানার দিকে।
রৌনকও নীচে নেমে ছুটল সেদিকেই। বৃষ্টি আবার জোরে পড়তে শুরু করেছে। আর তার সঙ্গে বিদ্যুতের চমক। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে দ্বীপের গায়ে। কানফাটানো বাজের শব্দে কেঁপে উঠেছে ছোট্ট দ্বীপটা। তার মধ্যেই পদশব্দ অনুসরণ করে ছুটল রৌনক।
ছুটতে ছুটতে এক সময় সে পৌঁছে গেল কবরখানার কাছে। সে দেখতে পেল ভাঙা প্রাচীরের ফাঁক গলে পর পর দুটো ছায়া মূর্তি প্রবেশ করল কবরখানার ভিতর। সেও দেরি না করে ঢুকে পড়ল সেখানে। তারপর দেখল, সাহেব ছুটছে কবরখানার যে অংশের প্রাচীর সমুদ্রের দিকে তলিয়ে গেছে সে দিকে। তবে বাতিঅলাকে সে দেখতে পেল না। তার পরিবর্তে দেখল বিশাল শিংঅলা মদ্দা হরিণটা পিছু ধাওয়া করে চলেছে শয়তান লোকটাকে।
একসময় তারা পৌঁছে গেল সেই কালো দ্বিখন্ডিত কবরটার কাছাকাছি। ঠিক সেই সময় পর পর আকাশ চিরে বিদ্যুতের ঝিলিক হল। আলোয় ভরে উঠল চারিদিক। রৌনকের মনে হল লোকটা কবরের ফাটলের ভিতর আত্মগোপন করতে যাচ্ছিল। কিন্তু
সেটা আর সম্ভব হল না। হরিণটা তার আগেই লোকটার কাছে পৌঁছে গেল। তারপর তার তীক্ষ্ণ শিং দিয়ে আঘাত করল লোকটাকে।
শয়তানটা ছিটকে পড়ল কিছুটা তফাতে। বাঁচার জন্য সে শেষ একবার পালাবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। বিদ্যুতের আলোয় রৌনক দেখল হরিণটা ছুটে এসে তার শিংগুলো আমূল বিধিয়ে দিল লোকটার পেটে। পরমুহূর্তেই বাজের শব্দে সারা দ্বীপ কেঁপে উঠল। রৌনকের চোখের সামনে লোকটা আর সেই কবরের অংশটা ধ্বসে পড়ল সমুদ্রের জলে।
হরিণটা ফিরে তাকাল রৌনকের দিকে৷ প্রাণীটা দেখতে পেয়েছে তাকে। রৌনক ভয় পেয়ে গেল। হরিণটা কি এবার তার দিকে ছুটে আসবে? তবে তো গুলি চালাতে হবে তাকে। কিন্তু প্রাণীটা তা করল না। সে ছুটল কবরখানার অন্য অংশটার দিকে। তারপর এক লাফে প্রাচীর টপকে কবরখানার বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল৷
রৌনকের চোখের সামনে এক মিনিটের মধ্যে যে ঘটনাগুলো ঘটল তা দেখে রৌনক এতটাই বিস্মিত, আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে ঘোর কাটতে আরও কয়েক মিনিট সময় লাগল তার। আর তার পরই রৌনকের মনে হল এখনই এ স্থান ত্যাগ করে ঘরে ফিরে যাওয়া উচিত। কারণ হয়তো মদ্দা হরিণটা আবার ফিরে এসে তাকে আক্রমণ করতে পারে।
এই ভেবে সে প্রাচীরের ভাঙা অংশটার দিকে এগোতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় সে শুনতে পেল কারা যেন দ্রুতপায়ে ধেয়ে আসছে কবরখানার দিকে৷ সঙ্গে সঙ্গে সে একপাশে সরে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই হরিণীগুলো প্রাচীরের ভাঙা ফাটল গলে ভিতরে ঢুকতে শুরু করল। পুরো দলটা কবরখানার ভিতর প্রবেশ করে তার মাঝখানে জড়ো হল।
কয়েক মুহূর্ত তারা তাকিয়ে দেখল সেই প্রাচীর কবর সমেত যে অংশটা জলের তলাতে তলিয়ে গেছে সেদিকে। তারপর এক অদ্ভুত কাণ্ড করল তারা। চারপাশের কবরগুলোর ওপর উঠে পড়ে নাচতে শুরু করল। বৃষ্টি পড়ছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আর তার মধ্যেই আনন্দে মেতে উঠেছে হরিণীর দল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই দুলছে তারা। এক অদ্ভুত অপার্থিব দৃশ্য! বাইরে বেরোবার কথা ভুলে গিয়ে রৌনক তাকিয়ে রইল সেইদিকে।
১২
‘চাবুকের ভয় আর নেই, তাই ওরা আজ সত্যিই আনন্দে নাচছে!’ এ কথাটা কানে যেতেই রৌনক যেন সম্বিত ফিরে পেল। সে পিছন ফিরে দেখল বাতিঅলা দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে রৌনক উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘তুমি কোথায় গেছিলে? ওই শয়তান লোকটাকে মদ্দা হরিণটা আক্রমণ করল। তারপর লোকটাকে নিয়ে ওই জায়গাটা ধ্বসে গেল সমুদ্রের জলে!’
রৌনক এরপর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাতিঅলা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি জানি। আগে তোমার ঘরে চলো, তারপর সব কথা বলছি তোমাকে।’ রৌনক বাতিঅলাকে নিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই সে
গাছের গুড়ির ওপর বসে পড়ল। অগত্যা রৌনককেও বসতে হল সেখানে।
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধ ভাবে কেটে যাবার পর লোকটা উদাসদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জানো, আমার জীবনের সব ঘটনা এখন মনে পড়ে গেছে। নাম, ধাম, সব কিছু৷’
রৌনক বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি তো আমাকে সব বলবে বলেছিলে! আর এখানে যা ঘটল, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!
একটু চুপ করে থেকে বাতিঅলা বলতে শুরু করল, ‘আমার নাম বাতিঅলা নয়। আমি পরেশ চন্দ্র দত্ত। আত্মীয় স্বজন আমার তেমন কেউ ছিল না। বর্ধমান থেকে চাকরি করতে গেছিলাম কলকাতাতে। কেরানির চাকরি করতাম। থাকতাম গোল দীঘির কাছে এক মেস বাড়িতে। একদিন আমার বাড়িতে এসে হাজির হল এক বাল্যবন্ধু। তার নাম আমি কাউকে কোনও দিন বলিনি। আজও বলব না৷ সে ছিল বিপ্লবী। আমার কাছে সে কয়েকদিন থাকবে বলল।
‘এক দিন দুপুরবেলায় সে হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এসে কাপড় মোড়ানো একটা পিস্তল আমাকে রাখতে দিয়ে বলল, সেটা রেখে দিতে। কয়েকদিন পর সে এসে সেটা ফেরত নিয়ে যাবে। এখন নাকি তার কলকাতায় থাকা নিরাপদ নয়। আমি পিস্তলটা রেখে দিলাম, সে চলে গেল।
‘কিন্তু সেদিন রাতেই একজন সার্জেন্ট একদল গোরা পুলিশ নিয়ে হাজির হল আমার মেসে। জানলাম, এক পুলিশ সাহেবকে একজন বিপ্লবী খুন করেছে, আর পুলিশের কাছে খবর আছে, সে নাকি আমার বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছে। খানা তল্লাশি শুরু হল। তাকে ধরতে না পারলেও আমার ঘরের চালের ড্রামের মধ্যে থেকে উদ্ধার হল সেই পিস্তল। ব্যস আমাকে গ্রেপ্তার করে লালবাজার নিয়ে যাওয়া হল।
‘আমার বন্ধুর নাম-ঠিকানা জানার জন্য শুরু হল প্রচণ্ড অত্যাচার। কিন্তু আমি মুখ খুলিনি। এরপর আদালতে আমার বিচার শুরু হল। আদালতে প্রমাণ হয়ে গেল আমার ঘরে পাওয়া পিস্তল দিয়েই সাহেবকে খুন করা হয়েছিল। আর আমি আমার বন্ধুর পরিচয় প্রকাশ না করাতে আমার ‘কালা পানি’ সাজা হল। আমাকে আনা হল রস আইল্যান্ডে। সার্জেন্ট মরিসের নেতৃত্বে এখানেও আমার ওপর অমানুষিক অত্যাচার শুরু হল আমার বন্ধুর নাম জানার জন্য। রোজ শুধু চাবুক আর চাবুক।
‘একদিন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমার সব স্মৃতি বিলুপ্ত হয়ে গেল। তারপর আমাকে মরিস সাহেব নিয়ে এল এই দ্বীপে। আমি তখন শুধু চিনতাম সাহেব আর তার চাবুককে।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল সে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাতিঅলা তাকিয়ে রইল বিদ্যুতের আলোতে মাঝে মাঝে স্পষ্ট হয়ে ওঠা নাচঘরের দিকে। তারপর আবার বলতে শুরু করল—
‘তুমি যে সব মেয়েদের এখানে দেখেছ তাদের এখানে ক্যাপ্টেন মরিসই এনেছিল।
ওদের বাধ্য করা হতো সাহেবের বিকৃত যৌন আকাঙ্ক্ষা মেটাবার জন্য। কথা না শুনলে পিঠে চাবুক চলত, কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। আমি অসহায় ভাবে শুধু দেখতাম। এমন ভাবেই চলছিল বছরের পর বছর।
‘তারপর একদিন আকাশে জাপানি উড়োজাহাজের আনাগোনা শুরু হল। একদিন রাতে সাহেব নাচ দেখছে, তখন জাপানিদের বোমা পড়া শুরু হল। সাহেব আমাদের নাচঘরে বন্ধ করে চলে গেল। তারপর একদিন নাচঘরেও বোমা পড়ল, আমরা সবাই বাইরে বেরিয়ে এলাম…।’
এ পর্যন্ত শোনার পর রৌনক প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু তুমি যা বলছ সে তো প্রায় একশো বছরের পুরোনো গল্প। তা কী করে সম্ভব? তোমার আর ওই মেয়েদের বয়স কি এখনও একশো বছরের বেশি হতে পারে? মরিসের ব্যাপারটা হয়তো সত্যি। সে গল্প হয়তো তুমি কোথাও শুনে থাকবে। আর সেটাই তোমার মাথায় গেঁথে আছে। আর যে লোকটা হরিণের শিং-এর গুঁতো খেয়ে জলে পড়ে গেল সে ওই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে মরিস সাহেব সেজে তোমাদের ভয় দেখাত।’
রৌনকের কথা শুনে মৃদুভাবে হাসল লোকটা। তারপর বলল, ‘না, ও নকল নয়, ও সত্যি মরিস সাহেব। জাপানিদের গোলা থেকে সেও সেদিন বাঁচতে পারেনি। ওকেও এই দ্বীপের কবর খানাতেই কবর দেওয়া হয়েছিল। ওই কালো কবরটা, যেটা জলের তলায় তলিয়ে গেল। দীর্ঘদিন ও ওই কবরের নীচেই আটকা ছিল। তারপর সুনামি হল। কবরটা দু-খণ্ডে ভেঙে গেল আর ও বাইরে বেরিয়ে আবার অত্যাচার শুরু করল।’
রৌনক এবার বলল, ‘তোমার এই সব কথাবার্তা আমি কীভাবে বিশ্বাস করব বলো? তুমি তো এখনও মরিস সাহেবকে নিয়ে অলীক কল্পনার জগতে আছ। তুমি যে কাহিনি শোনালে তা শুনে আমার মনে হচ্ছে তোমার স্মৃতি এখনও ফেরেনি।’
বাতিঅলা বলে উঠল, ‘না, আমার স্মৃতি ফিরেছে। চাবুকের আঘাত যেমন একদিন আমার স্মৃতি নষ্ট করেছিল তেমনই বহু যুগ পরে সে আঘাতই আমার স্মৃতি ফিরিয়ে আনল। মেয়েগুলোর পিঠের ঘায়ে মলম দেখতে পেয়ে কাল রাতে সাহেব আমাকে চাবুক মেরেছিল। বহু যুগ পরে সেই যন্ত্রণাই আমার স্মৃতি ফিরিয়ে দিল। এই দ্যাখো…’ এ কথা বলে পিছু ফিরে সে তার চটের জামাটা পিঠের ওপর তুলল।
আর সেই মুহূর্তে বিদ্যুত চমকাল। রৌনক দেখল, লোকটার পিঠে একটা দগদগে লাল ক্ষতচিহ্ন, ঠিক যেমন ক্ষতচিহ্ন হরিণীদের পিঠে হয়েছিল! হঠাৎ আকাশের বিদ্যুৎ যেন আগুনের গোলা হয়ে নেমে এল নাচঘরের ওপর। চারপাশ কাঁপিয়ে বাজ পড়ল নাচঘরের মাথায়। আর বিকট শব্দ করে সেই প্রাচীন অভিশপ্ত স্থাপত্যটা বাজের আঘাতে হুড়মুড় করে ধসে পড়ল রৌনকের চোখের সামনে।
এ ঘটনার চমকে রৌনক খানিকক্ষণ চেয়ে রইল ধসে যাওয়া প্রাচীন নাচঘরের ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া পাথরগুলোর দিকে।
বাতিঅলা বলল, ‘যাক, আর কোনও চিন্তা নেই। নাচঘরে আর কেউ কোনও দিন কোনও মেয়েকে চাবুকের ভয় দেখিয়ে উলঙ্গ করে নাচাতে পারবে না। তাদের
ওপর অত্যাচার করতে পারবে না। মেয়েগুলো এবার সত্যি মুক্তি পেল। তবে আমি এখানেই থাকব। এ জায়গার ওপর আমার মায়া পড়ে গেছে। তাছাড়া আজ আর আমি কোথায়ই বা যাব?’ লোকটার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল কথাগুলো বলার পর।
রৌনক বলল, ‘আমি তোমাকে সকাল হলেই পোর্ট ব্লেয়ারে নিয়ে যাব। তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব, সুস্থ করে তুলব তোমাকে।’
লোকটা এ কথার কোনও জবাব না দিয়ে বলল, ‘ওই যে ওরা এসে গেছে!’ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে রৌনক দেখল কবরখানার দিক থেকে হরিণীর দল এসে উপস্থিত হয়েছে ভেঙে পড়া নাচঘরের কিছুটা তফাতে। রৌনক দেখতে লাগল তাদের। বাতিঅলা এরপর বলল, ‘আমি এবার ওদের কাছে যাই। তোমাকে ধন্যবাদ। আর কোনও দিন ওদের পিঠে চাবুকের ঘা দেখা যাবে না৷
হরিণীদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বাতিঅলার দিকে তাকিয়ে রৌনক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল! কিন্তু পাশ ফিরে সেদিকে তাকাতেই কথা আটকে গেল রৌনকের। কোথায় বাতিঅলা? তার পরিবর্তে রৌনকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল শিংঅলা সেই পুরুষ হরিণটা। তার পিঠে চাবুকের দাগটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রৌনকের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর সে এগোল হরিণীগুলোর দিকে। তারপর তাদেরকে নিয়ে রৌনকের চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রৌনকের মাথার ভিতর সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে! দু-হাতে মাথা চেপে ধরে একই জায়গায় বসে রইল সে।
ভোরের আলো ফুটল এক সময়। গত রাতে হরিণীগুলো চলে যাবার পরই ঝড় বৃষ্টি থেমে গেছিল। কিন্তু তখন থেকে সেই একই জায়গায় বসে ছিল রৌনক। নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো যখন ছড়িয়ে পড়ল গোটা দ্বীপটায় তখন উঠে দাঁড়াল সে। ততক্ষণে অবশ্য সত্যিটা সে বুঝে গেছে। তার দেখা সেই দৃশ্য তো আর মিথ্যা নয়। অবিশ্বাস্য হলেও সে যা দেখেছে তা সবটাই সত্যি।
এরপরই বোটের শব্দ শোনা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে হাজির হল আব্দুল। সে বলল, ‘কাল রাতে যা ঝড়বৃষ্টি হল স্যার। আপনি ঠিক আছেন তো? আপনাকে অনেকবার ফোন করেছি, কিন্তু টাওয়ার প্রবলেমের জন্য যোগাযোগ হয়নি।’ রৌনক সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, ‘ঠিক আছি।’
আব্দুল এরপর ধসে যাওয়া নাচঘরটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হরিণগুলোকে দেখা যাচ্ছে না। ওর নীচে চাপা পড়ে গেছে নাকি? আসার সময় দেখলাম, কবরখানার আরও কিছুটা অংশও তো সমুদ্রে ধ্বসে পড়েছে!’
১৩
রৌনক বলল, ‘হরিণীগুলো নাচঘরটা ভেঙে পড়ার আগেই বাইরে বেরিয়ে গেছিল।’ তারপর কী একটা ভেবে নিয়ে বলল, ‘আব্দুল, আমি এখনই পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরে যাব। তুমি সব গুছিয়ে নাও।’
দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে তারা দুজনে রওনা হল জেটির
বোট চালু করল আব্দুল। দ্বীপটাকে খানিকটা বেড় দিয়ে বোট যখন এগোতে যাচ্ছে ঠিক তখনই দ্বীপের কিনারে একটা গাছের নীচে রৌনক দেখতে পেল তাকে। পরেশ চন্দ্র দত্ত। হ্যাঁ, বাতিঅলার সমস্ত কথাই বিশ্বাস করেছে রৌনক।
রৌনকের মনে হল যেন সে বিষণ্ণ ভাবে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল বোটটার দিকে। তারপর রৌনকের উদ্দেশে হাত নেড়ে মিলিয়ে গেল দ্বীপের ভিতরে। আব্দুল অবশ্য ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। নিজের মনেই বোট চালাচ্ছে সে। ধীরে ধীরে পিছনে সরে যেতে লাগল নাচনী দ্বীপ।
দ্বীপটাকে তারা এখন অনেকটাই পিছনে ফেলে এসেছে। এমন সময় বন দপ্তরের অধিকর্তা মুখার্জি সাহেবের উৎকণ্ঠিত ফোন এল রৌনক কেমন আছে তা জানার জন্য। রৌনক তাকে আশ্বস্ত করে বলল, সে ঠিক আছে। আর পোর্ট ব্লেয়ারের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। তার আর এ দ্বীপে থাকার দরকার নেই, কারণ হরিণীদের পিঠে আর কোনও ঘা হবে না।
খবরটা জেনে খুশি হলেন মুখার্জি সাহেব। তিনি ধারণা করলেন, রৌনক রোগটা ধরতে এবং হরিণীদের সুস্থ করে তুলতে সমর্থ হয়েছে। আসল সত্যিটা অবশ্য রৌনক তাকে কোনও দিনই বলতে পারবে না। বললে তিনি নিশ্চয়ই রৌনককে পাগল ভাববেন। ঠিক যেমন পরেশ চন্দ্র দত্তকে পাগল ভেবেছিল রৌনক।
ফোন রাখার আগে মুখার্জি সাহেব বললেন, ‘আপনাকে একটা কথা জানাই। ওই মরিস সাহেবের ব্যাপারে আমি খোঁজ নিয়েছিলাম ইতিহাস গবেষকের কাছে। তিনি জানিয়েছেন ক্যাপ্টেন মরিস নামে এক অত্যাচারী সাহেব নাকি সত্যি ছিলেন। তিনি ওই নাচঘরে বহু মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের সর্বনাশ করেছিলেন। যুদ্ধের সময় নাচঘরের ওপর বোমা পড়ে। তাতে ওই সব মেয়েরা মারা যায়।
‘তবে শেষ পর্যন্ত অত্যাচারী ক্যাপ্টেন মরিসও বাঁচতে পারেননি। জাপানিদের বোমার আঘাতে তিনিও মারা যান। তাঁকে ওই দ্বীপের কবরখানাতেই কবর দেওয়া হয়, কবরখানাতে ভেঙে যাওয়া যে কালো পাথরের কবরটা আছে সেটা নাকি ওই অত্যাচারী মরিস সাহবেরই।’ এ কথা শুনে রৌনক তাকে জানিয়ে দিল, গত রাতে কবরটা সমুদ্রে তলিয়ে গেছে, আর বাজ পড়ে নাচঘরটাও ধ্বংস হয়ে গেছে।
বাকি কথা পোর্ট ব্লেয়ারে ফেরার পর হবে বলে ফোন রেখে দিলেন মুখার্জি সাহেব। সমুদ্রের জল কেটে এগিয়ে চলল বোট।
আর এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আব্দুল বলল, “আরে স্যার, ওই দেখুন!’ রৌনকও দেখতে পেল সেই অদ্ভুত দৃশ্য। হরিণীরা দল বেঁধে সাঁতরে সাঁতরে এগিয়ে চলেছে নতুন কোনও দ্বীপের দিকে। অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্য! নীল জলে মুক্তির
আনন্দে যেন সাঁতার কাটছে তারা।
আব্দুল বলল, ‘নাচঘরটা তো আর নেই। ওখানেই ওরা থাকত। সে জন্য মনে হয় ওরা এবার অন্য দ্বীপে চলে যাচ্ছে! তবে শিংঅলা মদ্দা হরিণটা দেখছি ওদের মধ্যে নেই!’
রৌনকের মনে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠল গত রাতে কবরখানায় বিদ্যুৎ চমকের আলোয় দেখা সেই দৃশ্যটা—বিশাল হরিণটা মরিস সাহেবের পেটে শিং বিধিয়ে তাকে মাথার ওপর তুলে ছুড়ে দিল উন্মত্ত সমুদ্রের জলে। আর তার পরেই সমুদ্রর জলে ধসে পড়ল কবরটা!
রৌনক এখন জানে, বড় শিংঅলা হরিণটা নাচনী দ্বীপেই থাকবে। সে কোথাও যাবে না। কারণ তার বড় মায়া পড়ে গেছে দ্বীপটার ওপর।
