Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ১৬ আনা ভয় – সম্পাদনা : সৈকত মুখোপাধ্যায়

    সৈকত মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প442 Mins Read0
    ⤶

    ড্রাগন আর মায়া বাজপাখি – সৈকত মুখোপাধ্যায়

    ড্রাগন আর মায়া বাজপাখি – সৈকত মুখোপাধ্যায়

    রুহিনের দিনলিপি, ১৪ই মে, ১৮৪৭

    কীভাবে যেন হঠাৎই সব তছনছ হয়ে গেল।

    এখন যেখানে বসে আছি, এটাই আমার গত এক বছরের কর্মস্থল। আমার আশ্রয়ও বটে। এই কালাহাম অ্যানিমাল রেসকিউ সেন্টার। শহরের লোকেরা চিড়িয়াখানা বলে, তাই আমরাও চিড়িয়াখানাই বলি। ওটা জিভে বেশি সহজে আসে। এর আগে কোথাও কি কোনো কাজ করতাম? মনে নেই। আমি একজন স্মৃতিভ্রষ্ট

    মানুষ। এখানে আসার আগের কোনো স্মৃতি আমার মগজে ধরা নেই।

    কালাহাম অ্যানিমাল রেসকিউ সেন্টার খুবই ছোট একটা কর্মকাণ্ড। নতুনও বটে। আমার স্মৃতির বয়স আর এই রেসকিউ সেন্টারের বয়স একই। ওই এক বছর। শালখুঁটির বেড়া দিয়ে ঘেরা পাঁচ-ছ একর জমি নিয়ে এই প্রোজেক্ট। বেড়ার বাইরে আর ভেতরে একই রকম শাল, সেগুন আর মহুয়াবৃক্ষ। বন থেকে সহজে তাই চিড়িয়াখানাকে আলাদা করা যায় না৷

    জমিটার একপাশে কয়েকটা ঘর। পাতলা ইটের দেয়াল, স্লেটপাথরের ছাদ। ওই ঘরগুলোতেই রয়েছে আমাদের দপ্তর, পশু-চিকিৎসালয় আর থাকার কোয়ার্টার। বাকি জমিটায় উদ্ধার করে আনা পশুরা থাকে। বেশিরভাগই থাকে রেলিং দিয়ে ঘেরা খোলা জমিতে। খাঁচাও আছে কয়েকটা, পাখি আর সরীসৃপদের জন্য।

    আগে সন্ধের পর রাস্তার ধারে আর ঘরগুলোর মধ্যে কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বেলে দিতাম। আজকাল আর জ্বালাতে পারি না। জঙ্গল থেকে কাঠকুটো কুড়িয়ে এনে আগুন জ্বালিয়ে বসে থাকি। কারণ, কেরোসিন ফুরিয়ে গেছে।

    নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, আমরা যেন জাহাজডুবির পরে একটা দ্বীপে আটকে পড়েছি। কোথাও থেকে যে সাহায্য আসবে সেরকম কোনও আশা দেখছি না। তিলতিল করে আমরা মারা পড়ব।

    চিড়িয়াখানা থেকে তিন মাইল উত্তরে কালাহাম শহরটাই আমাদের লাইফ-লাইন ছোট্ট একটা শহর কালাহাম। আমাদের এই সেন্টার আর শহরের মাঝখানে সমতল রুক্ষ জমি ছাড়া আর কিছু নেই। তাই এখানে বসেই শহরটাকে দিব্যি দেখা যায়। খুদে খুদে ঘরবাড়িগুলো… মনে হয় দূরবিনের উল্টোপিঠ দিয়ে দেখছি।

    ছোট শহর কালাহাম, তবু ওখানেই আমাদের রেলস্টেশন ছিল। টিলা আর অরণ্য পার হয়ে দৈনিক একখানি ট্রেন প্রায় ছ’ঘণ্টা জার্নি করে দেশের রাজধানী থেকে যাতায়াত করত। এখন সবই অতীত।

    ‘আমাদের’ লাইফ-লাইন বলছি। তার মানে আমি ছাড়াও রেসকিউ-সেন্টারে আরো কেউ আছে?

    আছে তো নিশ্চয়ই। মিনিস্কা রয়েছে। আটাশ বছরের এক তরুণী।

    আমাদের উত্তরদিকে তিন-মাইল দূরে যেমন কালাহাম শহর, তেমনি দক্ষিণদিকে তিন-মাইল দূরে তুহির গ্রাম। আরণ্যক গ্রাম। যুগ যুগান্ত ধরে ওই গ্রামে আদিবাসীদের বাস। তুহির গ্রামেরই মেয়ে মিনিস্কা। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে পাতা কুড়োতে যেত। সেখানেই বিষাক্ত সাপের ছোবলে ও মাকে হারায়। তার পরেও মিনিস্কার জঙ্গলে যাওয়া বন্ধ হয়নি অবশ্য। বন্ধ করলে খাবে কী? বনই তো ওই গ্রামের মানুষদের অন্নদাতা।

    মিনিস্কার মধ্যে এমন একটা কিছু রয়েছে, যার প্রভাবে সবচেয়ে ভীতু মা-হারা চিতার ছানাটি, সবচেয়ে অসহায় বৃদ্ধ হাতিটি কিংবা বেজির কামড়ে আহত সাপটি ওকে কাছে পেলেই শান্ত হয়ে যায়। মিস্টার ইয়াদগার জামিল, যাকে আমরা জামিল স্যার বলে ডাকি, যিনি এই সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি মিনিস্কার ক্ষমতা দেখে তাকে সেই তুহির গ্রাম থেকে তুলে এনে এখানে চাকরি দিয়েছিলেন। আমাদের এই সংস্থাটি তো ওরকম আহত কিংবা একাকী পশুদের মঙ্গলের জন্যেই নিবেদিত।

    ইয়াদগার জামিল। উজ্জ্বল এক বৃদ্ধ। গতবছর তিনিই আমাকে কালাহাম স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন। শোনা কথা। মনে নেই সেই ঘটনা। জামিল স্যার, মিনিস্কা আর আমি—এখনও অবধি মাত্র এই তিনজনই রেসকিউ সেন্টারের কর্মচারী এবং দুপেয়ে বাসিন্দা৷

    আমি রুহিন। শুধুই রুহিন। নামটা মিনিস্কা দিয়েছে। ওদের ভাষায় রুহিন মানে অপার্থিব, পৃথিবীর বাইরের লোক। আমি নিজের নাম-পদবি জানি না। বাড়ি কোথায় ছিল জানি না। পরিবারে কারা ছিল তাও জানি না। আমার যা কিছু স্মৃতি তা বিগত এক বছরে এই চিড়িয়াখানায় কাটানো দিনগুলোই। তার আগের কথা আর কিছুই মনে নেই।

    কিছুই মনে নেই বললে মিথ্যে বলা হবে। মনের ভেতরে অনেক ছবিই ভাসে। কিন্তু সেগুলো চারপাশের দুনিয়ার থেকে এতটাই আলাদা যে, বলতে গেলে লোকে হাসবে। যদি বলি অজামিল নামে এক ড্রাগন আমার বন্ধু ছিল, তাহলে কি লোকে বিশ্বাস করবে? তাই কাউকে কিছু বলি না। শুধু মিনিস্কা কিছু কিছু জানে।

    মিনিস্কাকে আমি ভালোবাসি। মিনিস্কাও আমাকে ভালোবাসে। আমার গলায় শিলমাছের দাঁত দিয়ে তৈরি একটা হার আছে। ওগুলোকে শিলমাছের দাঁত বলে শনাক্ত করেছেন মিস্টার প্রোভস্ট। তার কথা পরে কখনও আবার বলব। তো, সেই হারের সঙ্গে লকেট হিসেবে যেটা গাঁথা আছে সেটা একটা সোনালি আঁশ। প্রায় আমার হাতের চেটোর মতো বড়।

    মিস্টার প্রোভস্ট বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো মাছ বা প্রাণীর কথা জানেন না, যার গায়ে এত বড় আর এমন সুন্দর আঁশ থাকে। ওটা পৃথিবীর কোনো প্রাণীর আঁশ নয়। আর বলেছিলেন, কালাহামের হাজার মাইলের মধ্যে কোথাও শিলমাছ নেই। কিন্তু আমার স্মৃতির ভেতরে শিল শিকারের দৃশ্য ধরা আছে। বরফের গর্তের মধ্যে দিয়ে শিলমাছ যেই না শ্বাস নেওয়ার জন্যে মুখ তুলছে, অমনি একদল লোক,

    তাদের গায়ে মোটা চামড়ার পোশাক, তিমিমাছের হাড়ের বল্লম দিয়ে সেই শিলকে গেঁথে ফেলছে। আমি অনেক উঁচু থেকে যেন সেই শিকারের দৃশ্য দেখছি।

    মিস্টার প্রোভস্টের সঙ্গে তর্ক করিনি। তবে মিনিস্কাকে পরে একান্তে বলেছিলাম, ‘এটা তো অজামিলের বুকের আঁশ। অজামিল। আমার জ্ঞানী বন্ধু। আমার প্রিয় ড্রাগন’ মিনিস্কা ওই আঁশটা সরিয়ে, আমার বুকে মুখ রেখে বলেছিল, ‘ড্রাগন বুঝি তোমার বন্ধু? এইজন্যেই তোমাকে রুহিন বলি। তুমিও এই পৃথিবীর কেউ নও’। কিন্তু এগুলো জরুরি কথা নয়। যে-কথা লিখবার জন্যে আজ ডায়েরি খুলে বসেছি, সেটাই এইবেলা লিখে রাখি।

    আজ থেকে মোটামুটি এক বছর আগে, ওই যে সময়টায় আমার কিংবা জামিল স্যারের এখানে আগমন, তখনই খুব আকস্মিক ভাবে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কালাহাম উপত্যকার সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ঠিক যেভাবে একটামাত্র মেন-সুইচ টিপে একটা বিরাট বাড়ির সমস্ত বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গোটা বাড়িটাকে অন্ধকার করে দেওয়া যায়। সেইভাবেই কোনো অদৃশ্য হাত যেন একটা সুইচ টিপে বাইরের পৃথিবী থেকে আমাদের এই টিলা-পাহাড় দিয়ে ঘেরা কালাহাম উপত্যকাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

    যে ট্রেনে অচৈতন্য অবস্থায় আমি এখানে এসে পৌঁছেছিলাম, সেটাই ছিল এখনও অবধি লাস্ট ট্রেন। পরদিন আর আপ-ট্রেন এল না। তাই রাজধানীর দিকে যাওয়ার ডাউন-ট্রেনও প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল না৷ অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী, চিকিৎসাধীন রুগি আর ডাকবিভাগের কর্মী যারা দুপুরে ট্রেন ধরবে বলে স্টেশনে গিয়েছিল, তারা স্টেশন মাস্টারের ঘরে উঁকি দিয়ে বিনীতভাবে জিগ্যেস করেছিল, ‘কী ব্যাপার ম্যাম? আজ ট্রেন এল না কেন?’ ।

    পদটির নাম স্টেশন-মাস্টার হলেও, তখন ওই পদে যিনি কর্মরতা ছিলেন, তিনি একজন মহিলা। নাম মিসেস জানোকি। ঊনত্রিশ বছর বয়স। শরীরে সামান্য বিবাহ-পরবর্তী মেদ জমলেও, মহিলার মুখটা ছিল ভারি মিষ্টি। একঢাল সোনালি চুল খোঁপা করে বেঁধে, রেল-কোম্পানির কালো ব্লেজার আর সাদা ট্রাউজার পরে, কালাহাম স্টেশনের সমস্ত কাজ একা হাতেই সামলাতেন।

    তো, যে-যাত্রীরা সেদিন স্টেশন-মাস্টারের অফিসে উঁকি মেরে ট্রেনের খবর শুধিয়েছিল, তারা দেখেছিল মিসেস জানোকি দরজার দিকে পিছন ফিরে মেহগনি কাঠের বিশাল টেবিলটার ওপরে ঝুঁকে বসে আছেন। দু-হাতের আঙুলগুলো টেলিগ্রাম মেশিনটার ওপরে রাখা ছিল। হয়তো তিনি রাজধানীতে রেলওয়ের হেড-অফিসে তার করে জানতে

    চাইছেন গোলমালটা কোথায় হল। তাই তারা তক্ষুনি ‘সরি’ বলে বেরিয়ে এসেছিল।

    তারপর তারা আরো অনেকক্ষণ স্টেশনমাস্টারের অফিসঘরের দরজার বাইরে অপেক্ষা করেছিল। সেটা ছিল অসহ্য গ্রীষ্মের এক দুপুর। বেলা বাড়তেই রোদ্দুর তেরছা হয়ে ঢুকে এসেছিল প্ল্যাটফর্মের শেডের নীচে। আর জ্বালিয়ে দিচ্ছিল যাত্রীদের শরীর। তাছাড়া জানোকি-ম্যাম কী এমন টেলিগ্রাম করছেন যে টরেটক্কা আওয়াজটুকুও পাওয়া যাচ্ছে না? যাত্রীরা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছিল।

    শেষ অবধি ওদের মধ্যে সবচেয়ে ডাকাবুকো দুজন লোক—কালাহামের একমাত্র কামার বুরিকো আর ওষুধের দোকানের কেমিস্ট আর্গো—কিঞ্চিৎ দোনামোনা করে ঢুকেই পড়ল সেই সরকারি অফিসের ভেতরে। তারপর মিসেস জানোকির ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে একযোগে বলল, ‘কিছু খবর পেলেন নাকি, ম্যাম? ট্রেন কি আজ আর আসবে?’। কোনো উত্তর মিলল না।

    দ্বিতীয়বার ডাকবার আগেই ওদের চোখে পড়ল, মিসেস জানোকির কালো ব্লেজারের ওপরে অসংখ্য সাদা-সাদা মড়াখেকো মাছির লার্ভা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    ভালো করে ব্যাপারটা বুঝবার জন্যে বুরিকো আর আর্গো টেবিলটাকে পাক দিয়ে

    মিসেস জানোকির সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তাঁর মুখটা দেখেই তীব্র আর্তনাদ করে উঠল। সেই চিৎকার শুনে বাকি লোকেরাও বাইরে থেকে হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। সবাই দেখেছিল, স্টেশন-মিস্ট্রেসের মুখ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। পেছনদিক থেকে দেখলে তখনও মিসেস জানোকির পিঠ, গলা, ঘাড়, সোনালিচুলের খোঁপা সবই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু মুখের সামনের দিকে তখন খামচা খামচা মাংস খসে হাড় বেরিয়ে পড়েছে। চোখের পাতা, ঠোঁট আর কানের লতির মতো নরম জায়গাগুলো স্রেফ গলে নেমে এসেছে বুকের ওপরে। ফলে মনে হচ্ছিল, মিসেস জানোকি যেন বিস্ফারিত দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে প্রাণভরে হাসছেন। নিঃশব্দ এবং অনিঃশেষ এক হাসি।

    ওনার শরীরে প্রাণ ছিল না, ফলে ঠিক কী হয়েছিল সেটা ওনার মুখ থেকে শোনা সম্ভব হয়নি। তবে দিন তিনেক বাদে লোকাল কোর্টে জুরিদের সামনে কালাহাম কাউন্টির সরকারি করোনার মিস্টার প্রোভস্ট বলেছিলেন, তীব্র কোনো তরল ছুড়ে মারা হয়েছিল মিসেস জানোকির মুখে।

    ‘তরলটা কী? অ্যাসিড? নাকি ক্ষার?’। প্রশ্ন করেছিলেন জুরিদের মধ্যে কয়েকজন। ‘না স্যার’।

    করোনার মিস্টার প্রোভস্ট ছিলেন বিশ্ববিশ্রুত কেমিস্ট অ্যাডলফ ফন বেয়ারের এক সময়ের সহকারী। তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেছিলেন, ‘তরলটা হল মূলত পাচক-রসের মতো কোনো উৎসেচক অর্থাৎ ডাইজেস্টিভ-এনজাইম—যেরকম তীব্র এনজাইম মাকড়শা তার শিকারের শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে…’

    ‘কী বলতে চাইছেন? ওনাকে মাকড়শায় কামড়েছিল?’। একসঙ্গে কয়েকজন জুরি প্রশ্ন করেছিলেন।

    ‘অবশ্যই না। কারণ এনজাইমটা ওনার রক্তে মেশেনি। বাইরে থেকে ওনার মুখের ওপরে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল’ উত্তর দিয়েছিলেন মিস্টার প্রোভস্ট। ‘থুতুর মতন। তবে কাজ হয়েছিল একই। ওই পাচক এনজাইম মিসেস জানোকির মুখের মাংস চামড়া চর্বি এমনকী নরম কার্টিলেজগুলোকে অবধি বাইরে থেকে গলিয়ে দিয়েছিল’। ‘কী ভয়ঙ্কর!’। জুরিরা একযোগে কপালের ঘাম মুছেছিলেন৷

    কাঠগড়া থেকে নেমে যাওয়ার আগে মিস্টার প্রোভস্ট বলেছিলেন, ‘আর একটা কথা মি লর্ডস! স্টেশন মাস্টারের ঘরের মেঝের ধুলোর ওপরে খুব অদ্ভুত কিছু ছাপ

    দেখা গেছে। এই রইল তার ফটোগ্রাফ। দেখলে আপনাদেরও মনে হবে এমন একজন মানুষ ওখান দিয়ে হেঁটে গেছে যার এদিকে তিনটে আর ওদিকে তিনটে পা৷ কিংবা এমন এক বিশাল ষটপদী পতঙ্গ হেঁটে গেছে যার পায়ের পাতাগুলো মানুষের মতো’।

    যাই হোক, মিসেস জানোকির মৃত্যুর সঙ্গেই কালাহাম রেল-স্টেশনেরও মৃত্যুঘণ্টা বেজে গিয়েছিল। তারপর থেকে ওখানে না এসেছে কোনো ট্রেন, না এসেছে কোনো রেলের কর্মচারী।

    শুধু ট্রেনই নয়, তারপর থেকে গাড়িঘোড়া মানুষজন… বাইরে থেকে কেউ আসেনি কালাহাম উপত্যকায়।

    হপ্তাখানেক দেখার পর, কালাহামের শেরিফ ক্যাপ্টেন ব্রিকস, তাঁর চারজন

    সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজধানীর দিকে রওনা হলেন। বললেন, “দেখে আসি, কালাহামের রাস্তা কেউ মাড়াচ্ছে না কেন’। সবাই বলল, ‘সাধু প্রস্তাব’। চোদ্দদিন বাদে তাঁরা ফিরেও এলেন। পাঁচজন অশ্বারোহীর চোখেই তখন হতভম্ব চাউনি। ঘোড়ার পিঠ থেকে কোনোরকমে নেমে প্রথমেই তারা চোঁ চোঁ করে কয়েক বোতল বিয়ার শেষ করলেন (শুঁড়িখানায় তখনও বিয়ারের স্টক শেষ হয়নি)। এদিকে শহরবাসীরা তো তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, কী দেখলেন তারা, কী শুনলেন, সেসব জানার জন্যে৷

    শেরিফ মহোদয় নিজেকে একটু সামলে নিয়ে শুঁড়িখানার কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু কিন্তু-কিন্তু ভাব করে যা বললেন, তার মর্মার্থ এই—তাঁরা সাতদিন ধরে ক্রমাগত পূর্ব দিকে চলেছিলেন, যেহেতু রাজধানী ওইদিকেই। এই সময়টুকুর মধ্যে তাঁরা উল্টোদিক থেকে আগত কোনো যানবাহন, বা কোনো মানুষের দেখা পাননি। অথচ অনেককেই দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। চার-ঘোড়ায় টানা গাড়িতে কাঠের ব্যারেল ভর্তি করে যে কেরোসিন তেলের সাপ্লাই আসে, সেই গাড়িটিকে দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। দেখতে পাওয়ার কথা ছিল শহরের মদের সাপ্লাই নিয়ে প্রতি সপ্তাহে পাহাড় পার হয়ে যে গাড়িটি আসে, সেটাকেও।

    কিন্তু কাউকেই তাঁরা দেখতে পাননি।

    অষ্টম দিন থেকে এক অদ্ভুত অনুভূতি তাঁদের গ্রাস করে। তাঁদের সকলেরই মনে হতে থাকে, তাঁরা যেন আবার কালাহাম শহরের দিকেই ফিরে চলেছেন। এবং সত্যিই আরো সাত-দিন হাঁটার পরে তারা কালাহাম শহরের পশ্চিম সীমানার গির্জার চুড়োটিকে চোখের সামনে দেখতে পেলেন। অর্থাৎ এককথায়, চোদ্দদিন ধরে হাঁটার পরে তারা রাজধানীর দিকে এক-কদমও অগ্রসর না হয়ে আবার কালাহাম শহরেই ফিরে এসেছিলেন।

    শেরিফদের দলটার পরে আরো অনেক অ্যাডভেঞ্চারার একা কিংবা দল বেঁধে চারটি দিকের যে-কোনো একটি দিকে যাত্রা শুরু করে দিন পনেরো বাদে আবার যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, সেখানেই ফিরে এসেছে। এ এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

    আগেই তো লিখেছি, শহরের একমাত্র ডিপোটায় কেরোসিন তেল ফুরিয়ে গিয়েছে। তাই সারা শহরের মতো আমাদের চিড়িয়াখানাও নিষ্প্রদীপ।

    ফুরিয়ে গিয়েছে আরো অনেক কিছুই। ময়দা, ভোজ্য তেল, মার্জারিন, কাপড়কাচার

    সাবান, মোমবাতি আর দেশলাইয়ের মতো যে-জিনিসগুলো উপত্যকার বাইরে থেকে সাপ্লাই আসত, সেই জিনিসগুলোকে মাথাপিছু রেশন করে বিক্রি করতে বলে দিয়েছেন শেরিফ মহোদয়। অর্থাৎ চারজনের পরিবার সপ্তাহে চারটে দেশলাই-ই পাবে। পয়সা দিলেও তার থেকে বেশি পাবে না। তাতেও বড়জোর আর দিন পনেরো চলবে। ড্রাগশপ বন্ধ। দর্জির দোকান… তাও বন্ধ। কাপড়ই নেই তো দর্জি তার দোকান খুলে রেখে কী করবে?

    ইতিমধ্যেই খবর পেয়েছি, সাতজন অভাগা মানুষ শুঁড়িখানায় মদ না পেয়ে, নিশাদল দিয়ে আঁখের রসকে গাঁজিয়ে মদ তৈরি করে সেই মদ পান করেছিল। সাতজনই সেই বিষমদ খেয়ে মারা গেছে। ওদিকে ওষুধের অভাবে প্রসব-পরবর্তী-সংক্রমণে মারা গেছে তিনজন প্রসূতি।

    মিনিস্কা বুকাননের দিনলিপি, ১৭ই মে, ১৮৪৭

    এতদিনে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, খুবই অভাবনীয় একটা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছে এই পুরো কালাহাম উপত্যকা। চারিদিকে যা ঘটে চলেছে, তার কোনোটাই যেন স্বাভাবিক পথে ঘটছে না। একটা আস্ত কাউন্টিকে কি ভূতে ধরতে পারে? একটা আস্ত অঞ্চল কি বিকারের ঘোরে মুখে গাঁজলা তুলে, খিস্তি দিয়ে, চুল ছিড়ে মরে যেতে পারে? যদি পারে, তা হলে আমাদের কালাহাম উপত্যকার হাল এখন ঠিক সেইরকম। মিসেস জানোকিকে দিয়ে যে আক্রমণের শুরু, তার শেষ এখনও দেখা যাচ্ছে না। তবে পরপর এগারো জন আক্রান্ত হবার পরে এখন একটা জিনিস পরিষ্কার। যেই আক্রমণ করুক, সে শুধু নারীদের ওপরেই আক্রমণ চালাচ্ছে। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, কিশোরী থেকে মধ্যবয়স্কা নারীদের ওপরে। তাদের মধ্যে স্কুলশিক্ষিকা একুশ বছরের মিস আদ্রিয়া যেমন আছেন তেমনি গোয়ালিনী ভেরুকাও রয়েছেন, যার বয়স বিয়াল্লিশ।

    তবে মিসেস জানোকির পরে গত ছ’মাসে আরও দশটি মেয়ে আক্রান্ত হলেও, আর কারও মৃত্যু হয়নি।

    প্রতিটি আক্রান্ত মেয়ের ক্ষতবিক্ষত মুখ থেকে পাচক-রসের স্যাম্পেল নিয়ে করোনার মিস্টার প্রোভস্ট পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য, যে আক্রমণ করছে, মেয়েদের হত্যা করা নাকি তার উদ্দেশ্য নয়। কারণ, আক্রমণকারী ক্রমশ এনজাইমের মারণ-মাত্রা, যাকে ইংরিজিতে বলে lethal dose, সেটা কমিয়ে এনে এখন এমন একটা জায়গায় নিয়ে এসেছে, যাতে বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকলেও আক্রান্ত মহিলাটির মৃত্যু হবে না। কিন্তু তার মুখটা আর মুখ থাকবে না। নারকোলের মালা হয়ে যাবে, এবং

    তাই হচ্ছে।

    আর এর কোনো চিকিৎসা নেই। ভালো করে প্রচুর সাবান আর জল দিয়ে মুখটা বারবার ধুইয়ে দেওয়া আর শক-এর হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে এক ছিপি ব্র্যান্ডি গেলানো। এর বেশি কিছু বার করতে পারেনি কেউ। ক্ষতবিক্ষত প্রেতপ্রতিম মুখ নিয়ে মেয়েগুলি ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে বসে আছে। হয়তো আর কোনোদিনই লোকসমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। একদিক থেকে মিসেস জানোকি মরে বেঁচে গিয়েছেন।

    আরো একটা অদ্ভুত এবং হাড় হিম করে-দেওয়া ঘটনা ঘটে চলেছে। একেকটি ঘটনাস্থলে আক্রমণকারী জন্তুটির একেক রকমের পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে। আমি জানি, কারণ, মিস্টার প্রোভস্ট আমার সাহায্য চেয়েছিলেন। ওই শহরের আরো অনেকের মতো উনিও জানেন যে, আমি বনের মেয়ে। অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগেই আমার জীবজন্তুর পায়ের ছাপ চেনা হয়ে গেছে। সেইজন্যেই ডেকেছিলেন।

    প্রতিটি আক্রমণস্থলে আমি ওঁর সঙ্গে গিয়েছি। এবং অবাক হয়ে দেখেছি, ঘটনাস্থলে ধুলোমাটির ওপরে যে পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে, তা দেখে কখনও মনে হচ্ছে বিশাল এক সাপের মতো সরীসৃপ, তবে এই সরীসৃপটির বুকের কাছে দুটি হাতও রয়েছে। ভারী শরীরটা মাটির ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে চলার সময় দুই হাতে ভর দিয়ে দেহের সামনের দিকটাকে উঁচু করে রাখে। কখনও মনে হয়েছে একটি রাক্ষুসে মোরগের পায়ের ছাপ। তবে পায়ের সংখ্যা দুই নয়, চার।

    এমনিতে সেই অজানা প্রাণী বা পতঙ্গগুলি আক্রমণের সময় হিসেবে ভোরবেলাকেই বেছে নেয়। এর একটা কারণ আছে। রাতে তো সকলেই ঘুমোয় আর সকাল থেকে সন্ধে অবধি রাস্তাঘাটে যথেষ্ট ভিড় থাকে। ওই সময়ে কোনো মেয়েকে একলা পাওয়া মুশকিল।

    কিন্তু ভোরবেলায় অনেক মেয়েই একা রাস্তায় বেরোয় … তাদের বেরোতেই হয়। যেমন মিসেস জানোকি। তিনি ভোরবেলায় স্টেশনে গিয়েছিলেন রাজধানী থেকে যে ট্রেন আসছে তাকে রিসিভ করতে। স্কুলশিক্ষিকা মিস আদ্রিয়া… তিনি যাচ্ছিলেন সকালে নার্সারির ক্লাস নিতে। আর গোয়ালিনী ভেরুকাকে প্রতিদিনই ভালো করে আলো ফোটবার আগেই গোশালার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে হতো, নাহলে তার গ্রাহকেরা সকালে দুধই বা পাবে কী করে আর গোয়ালের গরু ছাগলগুলো চরতেই বা যাবে কখন?

    এই প্রসঙ্গটা তোলার কারণ এই যে, পরবর্তী আক্রমণে যে-মহিলারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, তাদের কাছে গিয়েও জন্তুটার বা জন্তুগুলোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায়নি। প্রত্যেকেই বলেছেন, ‘কেমন করে দেখব? তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি যে’।

    তাছাড়াও তারা বলেছেন, ‘হঠাৎই যেন হাওয়া থেকেই জন্তুটা গজিয়ে উঠেছিল আর পরমুহূর্তেই মুখে তীব্র জ্বালা’।

    মিস্টার প্রোভস্ট প্রত্যেককে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘জন্তুটা কি থুতুর মতো নিজের লালা আপনার দিকে ছিটিয়ে দিয়েছিল?’। অর্ধেক মেয়ে এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছে, ‘হ্যাঁ’। অর্ধেক মেয়ে বলেছে, ‘মনে নেই’।

    দশজন জীবিত মেয়ের মধ্যে সাতজন আরো একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল। মিস্টার প্রোভস্টকে নয়, আমাকেই একান্তে ডেকে ওরা বলেছিল, ‘মিনিস্কা! তুমি তো একজন মেয়ে, তাই তোমাকেই বলি। এক পলক যেটুকু দেখেছিলাম তাতে মনে হয়েছিল…’

    একটি মেয়ে বলেছিল, জন্তুটার মুখের সঙ্গে শহরের এক কুখ্যাত লুচ্চার, আরেকজন বলেছিল তার প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের এবং তৃতীয়জন বলেছিল তার কাকার মুখের মিল রয়েছে—যে-কাকা ছোটবেলায় অনেকবার অশ্লীলভাবে তার শরীরের গোপন স্থানে হাত দিয়েছিল। সাতজন মেয়েই কোনো কামুক পুরুষের কথা বলেছিল, যে কিছুদিন আগেই মারা গেছে। যেন কামুক পুরুষগুলোর প্রেতাত্মাই জন্তুর বেশে এসে ওদের মুখ পুড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে।

    হয়তো কেবলমাত্র ওই সাতটি মেয়েই আক্রমণকারীর মুখের দিকে তাকাবার সময় পেয়েছিল। তাদের চোখে বিষ ছিটোতে হয়তো এক-মুহূর্ত দেরি হয়ে গিয়েছিল প্রাণীটির। যদি দশজনেই তাকাবার সময় পেত তাহলে কি দশজনেই আক্রমণকারীর মুখে নিজের পরিচিত কোনো পুরুষের আদল দেখতে পেত? হয়তো তাই।

    শেরিফ ক্যাপ্টেন ব্রিকসের নোটবুক, ২৬শে মে, ১৮৪৭

    পুলিশ-অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং-এর সময় অনেক কিছুই শিখেছিলাম। তার মধ্যে টেলিগ্রামে মেসেজ পাঠানো আর মেসেজ রিসিভ করা ছিল একটা। মাঝখানে এতগুলো বছরের অনভ্যাস। তবু গতকাল দেখলাম বিদ্যেটা ভুলিনি। দেখে নিজেই অবাক হলাম।

    হয়েছিল কী, কাল রাতে একবার কালাহাম স্টেশনে গিয়েছিলাম। একাই গিয়েছিলাম। এমনিই, কোনো কারণ ছিল না। কিংবা ছিল হয়তো৷ হয়তো আশা করেছিলাম কালাহামের অজানা আক্রমণকারী তার প্রথম অপরাধের জায়গায় ফিরে আসবে আর আমি তাকে ধরতে পারব।

    শূন্য এবং অন্ধকার প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটতে-হাঁটতে স্টেশন-মাস্টারের ঘরটার দিকে নজর পড়ল। কী মনে হতে, দরজার তালাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। দেখলাম টেবিলের ওপরে তখনও একটা বড় মোমবাতি আধপোড়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। পকেট থেকে ম্যাচবক্স বার করে সেটা জ্বালিয়ে নিলাম।

    স্টেশন-মাস্টারের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলাম। টেবিলের ওপর দুটো কনুই রেখে একদৃষ্টিতে মোমের শিখার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মিসেস জানোকির কথাই ভাবছিলাম। বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমাদের। দেখা হলেই মুচকি হেসে বলতেন, ‘চলুন মিস্টার ব্রিকস, আমরা দুজনেই ভোরবেলায় জগিং শুরু করি। দুজনেরই মধ্যপ্রদেশ যেভাবে বেড়ে চলেছে’।

    আমার এইসব ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ টেবিলের ওপরে রাখা টেলিগ্রাফ মেশিনের গায়ের লাল আলোটা জ্বলে উঠল। আর চাবিগুলো টরেটক্কা টরেটক্কা করে এক-রাউন্ড বেজে উঠল, যার অর্থ হচ্ছে রেডি হও, মেসেজ আসছে। মধ্যরাতে নিস্তব্ধ পরিবেশে

    সেই আওয়াজ যেন রিভলবারের গুলির আওয়াজকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। এত জোরে চমকে উঠেছিলাম যে, হৃদপিণ্ডটা মনে হচ্ছিল লাফিয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

    একটু শান্ত হওয়ার পরে প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এল সেটা হচ্ছে, অন্য সব দিক থেকে কালাহাম বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও, টেলিগ্রাফের লাইন দিয়ে এখনও যুক্ত রয়েছে। তাহলে এটাকে তো আমরা সাহায্য চাইবার জন্যে কাজে লাগাতে পারি৷ (পরে টেস্ট করে দেখেছি, আমার ধারণা ভুল ছিল। অন্যান্য সব কিছুর মতো টেলিগ্রাফ লাইনও ছিল মরা। ডেড। তবুও যে কেমন করে তখন ওটা কাজ করেছিল, তা এক রহস্য।)

    যাই হোক, আমি একটু দম নিয়ে টেবিলের ওপর থেকে রাইটিং-প্যাড আর পেন্সিল তুলে নিলাম৷ পেন্সিলটা খুঁজতে গিয়ে একটা কালো ইবোনাইটের বোতাম খুঁজে পেলাম। বুঝলাম এটা মিসেস জানোকির ব্লেজারের গলার বোতাম। অর্ধেকটা গলে গিয়েছে।

    আবার টরেটক্কা শুরু হল। বেশ ধীর ছন্দে। যেন ওদিক থেকে যে মেসেজ পাঠাচ্ছে, সে জানে, এই প্রান্তে একজন নভিস বসে আছে। আমিও মেসেজটা ধীরে ধীরে ডিকোড করে লিখতে শুরু করলাম। সে যা লিখল আর উত্তরে আমি যা লিখলাম, তা নীচে সাজিয়ে দিলাম—

    ‘বড় কষ্ট’।

    ‘কে বলছেন?’।

    ‘আমাকে চিনতে পারছেন না, মিস্টার শেরিফ? মৃত্যুর পর সবাইকেই কি মানুষ এত দ্রুত ভুলে যায়? আমি জানোকি’

    ‘মিসেস জানোকি! আপনি কোথা থেকে কথা বলছেন? কীসের কষ্ট?’। ‘মুখ, গলা, চোখ, সমস্ত জ্বলে যাচ্ছে মিস্টার শেরিফ। আমার এই জ্বালা কি আর সারবে না?’ ।

    ‘মিসেস জানোকি, উই অ্যারেঞ্জড ফর আ প্রপার বেরিয়াল অ্যান্ড প্রেয়ার ইন আওয়ার ক্যাথিড্রাল। আপনার আত্মার মুক্তির জন্যে আর কী করতে পারি বলুন’। “কিছু নয়, কিছু নয় মিস্টার ব্রিকস। নরকের জীবের হাতে মৃত্যু হয়েছে আমার। কষ্ট তো পেতেই হবে’।

    নরকে আমার আত্মা বন্দি। কাজেই

    ‘মিসেস জানোকি! একটা কথা প্লিজ বলুন। যে আপনাকে মারল তার পরিচয় কী? সে কোন জাতের জীব? কোথা থেকে এল?’।

    ‘কোথা থেকে আবার আসবে? এখানেই থাকে তো। এটাই তো নরক… এই কালাহাম ভ্যালি’।

    অস্বীকার করব না, এই শেষ মন্তব্যটা ডিকোড করে বেশ আহত হলাম৷ আজ আটবছর হল আমি এই কালাহাম-কাউন্টির শেরিফ। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি এখানে শান্তি বজায় রাখতে। শেষ এক বছর ধরে যেটা চলছে সেগুলো যদি কোনো মানুষের অত্যাচার হতো, তাহলে এই অবস্থাকেও ঠান্ডা করে দিতাম। কিন্তু অলৌকিকের বিরুদ্ধে কী করব তাই তো বুঝে উঠতে পারছি না। তার জন্যে মিসেস জানোকির অসুখী আত্মা এই

    কাউন্টিকে একেবারে নরক আখ্যা দিয়ে দেবেন।

    লিখলাম, ‘মিসেস জানোকি, এই জন্তুগুলোকে কোথায় গেলে ধরতে পারব, বলবেন প্লিজ?’।

    ‘দক্ষিণে যান। মিট দা ড্রাগন’।

    টেলিগ্রাফ মেশিনের গায়ের লাল আলোটা যেমন হঠাৎই দপ করে জ্বলে উঠেছিল, তেমন হঠাৎ করেই নিভে গেল। মিসেস জানোকির কথার কী অর্থ তাই ভাবতে-ভাবতে স্টেশন চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।

    সন্ধে থেকেই ভিজে হাওয়া বইছিল। বেরিয়ে এসে দেখলাম আকাশে মেঘ জমেছে। পূর্ণিমার চাঁদের সামনে দিয়ে অনর্গল ঝোড়ো হাওয়ায় বাদলমেঘ উড়ে যাচ্ছিল। ফলে একবার করে কয়েক মুহূর্তের জন্যে জ্যোৎস্না ফুটেই আবার আঁধারে ঢেকে যাচ্ছিল চরাচর।

    গত একমাস কোনো আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। মন বলছিল আজ আবার সে আসবে। আবার সে কালাহামের কোনো নারীর ওপরে আঘাত হানবে।

    কোমরের হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বার করে হাতের মুঠোয় নিলাম। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে তিনটে বাজে। হিসেব মতো আর একঘণ্টা বাদেই ভোরের আলো ফোটার কথা। এটা এখনকার হিসেব। আগে আমাদের এখানে অনেক দেরিতে ভোর হতো, কিন্তু গত এক বছর ধরে অনেক তাড়াতাড়ি ভোর হচ্ছে। দিন আর রাত্রির দৈর্ঘ্যও কমে গেছে অনেক৷

    এই শহরের পরিসীমা বরাবর একটা বৃত্তাকার রাস্তা আছে, যেটাকে আমরা মেয়েদের হাতের চুড়ির কথা ভেবে কঙ্কন-পথ নাম দিয়েছি। সেই পথটা ধরেই এগিয়ে চলেছিলাম। একবার চাঁদের সামনে দিয়ে মেঘের চাদর সরে যেতেই দেখলাম, দূরে মিস্টার জামিলের রেসকিউ সেন্টারের দিক থেকে একজন লোক খুব দ্রুতপায়ে মাঠ ভেঙে শহরের দিকে আসছে।

    অবাক হলাম। এত রাতে কে এদিকে আসছে?

    কিন্তু তাকে ভালো করে দেখার আগেই আবার চাঁদটা মেঘে ঢেকে গেল। আমিও আবার নিজের রাস্তা ধরলাম, কিন্তু মন পড়েছিল ওই রেসকিউ সেন্টারের দিকেই। ওখানে তো সাকুল্যে তিনজন বাসিন্দা—রুহিন, মিনিস্কা আর মিস্টার জামিল। তিনজনকেই আমি খুব ভালো করে চিনি। মিনিস্কা মেয়েমানুষ। রুহিন আর মিস্টার জামিল দুজনেই বিশাল লম্বা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস থাকার ফলে ওদের হাঁটাও খুব স্বচ্ছন্দ।৷ কিন্তু মাঠ পেরিয়ে যাকে আসতে দেখলাম, মনে হল তিনি বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। সামনের দিকে অনেকটা ঝুঁকে, একটু খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছিলেন।

    কে হতে পারেন ওই ভদ্রলোক?

    একজনের কথা খুব মনে পড়ছিল।

    আরেকবার মেঘ সরে গিয়ে জ্যোৎস্না ফুটল। আরেকবার তাকে দেখতে পেলাম এবং আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে এল। এখন তিনি অনেক কাছে এগিয়ে এসেছেন। প্রায় ঢুকেই পড়েছেন শহরে। তাই আরো স্পষ্টভাবে তাঁকে দেখতে

    পেলাম। হ্যাঁ, যাঁর কথা ভাবছিলাম, তিনিই। মিস্টার জ্যাকারেল – আমাদের এই শহরের মাংসবিক্রেতা।

    মধ্যবয়সে পৌঁছেছিলেন কিন্তু স্বভাবের লুচ্চামি যায়নি। কালাহাম উপত্যকার বাইরে একটা বড় গণিকাপল্লী ছিল, নাম সেইলর্স ক্যাম্প। ছিলই বলছি। উপত্যকার বাইরের যে-কোনো জায়গা সম্বন্ধে কিছু বলতে গেলেই আজকাল আমাদের মুখ দিয়ে অতীতকালের ক্রিয়াপদ বেরিয়ে আসে। যাই হোক, মিস্টার জ্যাকারেল ছিলেন সেইলর্স ক্যাম্পের নিয়মিত খরিদ্দার। বিক্রি করতেন গরু-শুয়োরের মাংস আর কিনতেন নারীমাংস। তবে তা কিনতে গিয়ে সঙ্গে ফাউ পেয়েছিলেন যৌনরোগ। মারাত্মক সিফিলিস।

    সেই রোগে তাঁর হাত-পা বেঁকে গিয়েছিল। শেষদিকে বাড়ি থেকে কমই বেরোতেন। তবে যখন বেরোতেন তখন ঠিক ওইভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে, একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই হাটতেন, যেভাবে এখন হাঁটছেন।

    সমস্যা হচ্ছে, ভোর হব হব এই সময়টায় মাঠ ভেঙে মিস্টার জ্যাকারেলের এদিকে আসার কথাই নয়। তার এখন মাটির নীচে শুয়ে থাকবার কথা। কারণ, পরশু সকালে তিনি মারা গেছেন। গতকাল আমি নিজে তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলাম।

    আরো একবার চাঁদের মুখ থেকে মেঘের ওড়না সরে গেল। দেখলাম, চার

    হাতপায়ে ভর দিয়ে, মাঠ ভেঙে ছুটে চলেছে এক মানুষের মতো জীব। যার শরীরটা নেকড়ের মতো কিন্তু দূর থেকে মনে হল মুখটা মানুষের। মুখটা মিস্টার জ্যাকারেলের। ঘোড়ার পিঠে চেপে বেরোইনি বলে আফসোস হল। তবু প্রায় ঘোড়ার বেগেই প্রেত-শরীরটাকে অনুসরণ করে দৌড় শুরু করলাম। একটা সময় মনে হল, একটু একটু করে ওর সঙ্গে আমার দূরত্ব কমছে। আর একটু কাছে যেতে পারলেই ওটাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে পারতাম, কিন্তু তার আগেই প্রেতটা বাজার-এলাকার মধ্যে ঢুকে পড়ল আর আমিও ওকে হারিয়ে ফেললাম।

    মনে পড়ল এই মার্কেট-বিটে আমাদের অন্তত তিনজন সিটি-গার্ড নাইট-ডিউটি করছে। টিউনিক থেকে হুইসলটা বার করে পরপর কয়েকবার জোরালো ফুঁ দিলাম । প্রত্যুত্তরে তিনদিক থেকে তিনটে হুইসলের শব্দ ভেসে এল এবং মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে আমাদের তিনজন সিটি-গার্ড এসে আমার সামনে স্যালুট দিয়ে দাঁড়াল।

    সবেমাত্র ওদের বুঝিয়ে বলতে যাচ্ছিলাম, কাকে খুঁজতে হবে। কিন্তু তার আর দরকার পড়ল না। তীব্র তীক্ষ্ণ এক নারীকণ্ঠের আর্তনাদে বাতাস ফালাফালা হয়ে গেল৷ আর সেই মুহূর্তে বৃষ্টিটাও নামল একেবারে আকাশ ভেঙে। আমরা চারজনেই দেখলাম, বৃষ্টির ঘন চাদরের মধ্যে দিয়ে প্রান্তর ভেঙে তিরগতিতে দক্ষিণদিকে ফিরে যাচ্ছে সেই নেকড়ে-মানুষ।

    নারীকণ্ঠের আর্তনাদটাকে অনুসরণ করে আমরা পৌঁছে গেলাম বাজারের একপ্রান্তে জ্যাকারেলের কসাইখানায়। মালিকের মৃত্যুর পরে সেইদিনই আন্না নামের মেয়েটি দোকান খুলতে এসেছিল। আন্না একটা বাচ্চা মেয়ে—বছর পনেরো বয়স। মিস্টার জ্যাকারেলের কাছে কাজ করত। দোকানের সামনের রাস্তাতেই মেয়েটা লুটিয়ে পড়ে ছটফট করছিল। মুখে মাংস বলতে আর কিছু ছিল না। চোখের পাতা, কানের লতি, নাকের পাটা কিছু ছিল না।

    আমি আর আন্নাকে জিগ্যেস করিনি, তার এই হাল কে করল। জিগ্যেস করার দরকার ছিল না। মিস্টার জ্যাকারেলের মতো লোক কি আর জীবিত অবস্থায় আন্নাকে বিছানায় টানার চেষ্টা করেননি? পারেননি টানতে আর সেই ক্ষোভটাই আজ ওর ওপরে মিটিয়ে গেলেন।

    ইয়াদগার জামিলের দিনলিপি, ৩১ মে, ১৮৪৭

    দুদিন ধরে দেখছি, কালাহাম শহর ছেড়ে মানুষজন কীভাবে পালিয়ে যাচ্ছে। ব্যথায় আমার মন অবশ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, আমি জানি ওরা কোথাও পালাতে পারবে না। ওরা শহর ছাড়বে, মাঠ পেরোবে, ঘাট পেরোবে, এমনকী অরণ্যকেও অতিক্রম করে যাবে। তারপর আবার ঘুরে আসবে এই কালাহাম উপত্যকায়। কারণ, কালাহামের বাইরে আর কিছু নেই।

    ওরা কেন এই সামান্য ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না, জানি না। রাতের আকাশের দিকে তাকালেই তো বোঝা যায়। যেভাবে কেকের মাথা থেকে খসে পড়ে যায় চেরিফল, সেইভাবেই পৃথিবীর বুক থেকে খসে পড়েছে কালাহাম ভ্যালি। সেইজন্যেই এক বছর আগেও আকাশে যে নক্ষত্রমণ্ডলী দেখা যেত, এখন সেগুলিকে আর দেখা যায় না৷ পালটে গিয়েছে গতবছরের ঋতুচক্র ও দিনরাতের দৈর্ঘ্য।

    আমাদের এই রেসকিউ সেন্টারের সীমানার ঠিক বাইরে একটা ছোট টিলা আছে৷ বড়জোর তিনশো ফুট উঁচু হবে। টিলাটার মাথাটা সমতল। সেখানে একটা চ্যাটালো পাথর রয়েছে। পাথরটাকে দেখলে মনে হয় যেন ঈশ্বর তাঁর সন্তানদের জন্য আসন পেতে রেখেছেন।

    সেই শিলাসনের সামান্য দূর দিয়ে বয়ে চলেছে একটা স্বচ্ছ জলের ধারা। টিলার বুক ফুঁড়েই ঝোরাটির জন্ম। ওই ঝোরাই নীচে নেমে আমাদের রেসকিউ সেন্টারের ঠিক পিছনদিক দিয়ে বয়ে গেছে। আমি ওটার নাম দিয়েছি আনন্দধারা। আনন্দধারার জলই আমরা পান করি।

    আমরা মানে আমরা তিনজন মানুষ আর বনের অগণিত হরিণ, খরগোশ, বেজি, গোসাপ, বনবিড়াল, হায়েনা, হাতি আর লেপার্ড। পাখিরা স্রোতে ঠোঁট ডুবিয়ে জল পান করতে পারে না। তাদের জন্যে ভগবান একধারে একটা শান্ত জলের কুণ্ড বানিয়ে দিয়েছেন। সেখানে বিকেলের দিকে রাশি-রাশি টিয়া, ময়না, মুনিয়া, বক, সারস আর ময়ূরের মেলা বসে যায়।

    যেদিন থেকে এখানে এসেছি, সেদিন থেকেই আমি খুব ভোরে একবার ওই টিলার মাথার শিলাসনে গিয়ে বসি, পাখি আর জীবজন্তু দেখবার জন্যে। আর একবার অনেক রাতে যাই আকাশের তারা দেখবার জন্যে। ভোরবেলায় কখনও কখনও আমার গলায় ঝোলানো থাকে দূরবিন, আর রাতে আমার নিজের হাতে বানানো একনলা একটা টেলিস্কোপ। 1

    এক বছর আগে যেদিন এই অচেনা শহরে এসে পড়েছিলাম, সেদিন শুধু আকাশটাকেই আমার চেনা লেগেছিল। শহরবাসীদের কাছে হয়তো অচেনা হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এখানকার এই নক্ষত্রসজ্জা খুব চেনা। তাই আমি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্তি পাই।

    গতকাল সকালেও টিলার মাথায় গিয়ে বসেছিলাম। আনন্দধারায় জল পান করতে এসেছিল আমার অতি পরিচিত এক হস্তি পরিবার। প্রথম-প্রথম আমাকে ওখানে দেখলে ওরা বিরক্ত হতো; দূর থেকেই বৃংহনের শব্দে বলত, ‘তফাত যাও’। কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। এখন হাতির ছানাগুলো ছপছপ করে ঝোরার জল ভেঙে আমার কাছে চলে আসে। আমার সারা গায়ে কচি-কচি শুঁড় বুলিয়ে বুঝবার চেষ্টা করে আমি কী ধরনের জন্তু। ওদের বাবা-মা, পিসি-পিসে, কাকা-কাকি আড়চোখে সেই দৃশ্য দেখে; কিন্তু উতলা হয় না। ওরা বুঝে গেছে আমি নিরাপদ প্রাণী।

    তারপর একটু বেলা বাড়তে হাতির পাল আরো গভীর জঙ্গলের দিকে চলে গেল। আমিও ভাবছিলাম এবার সেন্টারে ফিরব। কিন্তু হঠাৎই কানে এল শিশুর কান্না এবং বয়স্ক নারী-পুরুষের গলার স্বর। যেদিক দিয়ে আওয়াজটা ভেসে এল, সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম ওই হৃদয় বিদারক দৃশ্য। কালাহাম শহর থেকে উদ্বাস্তু নর-নারীর স্রোত এগিয়ে আসছে।

    এটাই অবশ্যম্ভাবী ছিল। জানতাম এটাই পরিণতি। যে-শহরে খাদ্য নেই, পানীয় নেই, ওষুধ নেই, যানবাহন নেই, উপরন্তু রয়েছে বীভৎস নরকের প্রাণীদের আনাগোনা এবং আক্রমণ, সেই শহরে কেন বাস করবে মানুষ?

    তবু, কোনোকিছুকে ভবিতব্য বলে জানা এক জিনিস, আর তাকে চোখের সামনে সত্যি হতে দেখা আর এক।

    ওখানে বসে-বসেই দেখছিলাম, আমাদের সেন্টারের সামনের মোরাম-ফেলা সরু রাস্তা ধরে শয়ে শয়ে নারী-পুরুষ কোন অজানার দিকে চলে যাচ্ছে কে জানে। শহুরে সুখী মানুষ ওরা। এই তিন কিলোমিটার পথ পেরোতেই গলদঘর্ম হয়ে গেছে৷ মাথা ঝুঁকে পড়ছে বুকের ওপরে। শিশুগুলিও আর হাঁটতে চাইছে না। তারা তারস্বরে চিৎকার করছে কোলে উঠবে বলে আর মায়ের হাতে মার খাচ্ছে।

    শহরের বিভিন্ন দোকানে অবশিষ্ট যেটুকু মাছ-মাংস, শস্য, ভোজ্যতেল, চিনি বা নুন ছিল, শেরিফ মহোদয় সেই সমস্তকিছু এক জায়গায় নিয়ে এসে, গত কয়েকদিন ধরে অল্প অল্প করে তা প্রতিটি পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছিলেন। বিনা পয়সাতেই। পয়সার উপযোগিতা এই কালাহাম উপত্যকায় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। দু-দিন আগে আমাদের তিনজনের জন্যে সেই রেশন তুলতে শহরে গিয়েছিল

    রুহিন। ম্লানমুখে ফিরে এসেছিল… কিছুই পায়নি। সব শেষ।

    সেইজন্যেই জানি, ওই যে রাস্তা দিয়ে যারা হেঁটে চলেছে, তারা শুধু রোদের তাপেই ক্লান্ত নয়, উপবাসেও কাহিল।

    দ্বিতীয়দিন, অর্থাৎ আজ, আর ওই দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুদিকে দু-হাত ছড়িয়ে চিৎকার করে বললাম, ‘দাঁড়াও ভাই। মা বোনেরা, একটু দাঁড়িয়ে যাও’।

    তারপর দৌড়োতে দৌড়োতে সেন্টারের ভেতরে গিয়ে রুহিন আর মিনিস্কাকে ডেকে আনলাম। খুলে দিলাম আমাদের ভাঁড়ার ঘরের তালা। পশুদের খাওয়ানোর জন্যে দু-বস্তা চিনেবাদাম জমিয়ে রেখেছিলাম। আর ছিল গুড়, সেও পশুদের জন্যে। তিনজনে মিলে বস্তাগুলোকে টানতে টানতে নিয়ে গেলাম আমাদের গেটের কাছে, বটগাছের ছায়ায়। সেখানে দাঁড়িয়েই ওদের হাতে হাতে ভাগ করে দিলাম একমুঠো করে বাদাম আর এক ডেলা করে গুড়। রুহিন জালা ভরে ঠান্ডা জল এনে রেখেছিল। সবাই একটু করে গুড় আর বাদাম খেল। পেট ভরে ঠান্ডা জল পান করে বটের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিল। তারপর আবার চলতে শুরু করল।

    আমাদেরও আজ খাওয়া বলতে ওইটুকুই… ওদের সঙ্গেই সেই সকালে একমুঠো বাদাম খেয়েছিলাম ।

    তারপরেও ভাবছিলাম, এই সেন্টারের অসহায় জন্তুগুলোর কী হবে?

    একটা পা-ভাঙা হরিণশিশু, নাম ডিব্বা। এক অন্ধ হাতি, নাম লোহারু। ডানা ভাঙা বাজপাখি। বৃদ্ধ চিতাবাঘ। মা-মরা বনবেড়ালের পাঁচটা ছানা। আরো অজস্র অনাথ পশুশাবক। এদের কী খাওয়াব আমরা? ওই যে চিনেবাদামের বস্তাগুলো আজ খালি হয়ে গেল, ওগুলোই ছিল আমাদের বাঁদর, খরগোশ আর কাকাতুয়ার খাবার।

    এদের কাউকে আমি বলতে পারব না, ‘যা, বনে গিয়ে চরে খা’। তা যদি পারত, তাহলে তো রেসকিউ সেন্টারে ওদের রাখতেই হতো না। পারে না ওরা। বনের ভেতর প্রকৃতিদেবীর নির্মম শাসন চলে। সেখানে যে-প্রাণীটি বিন্দুমাত্র অযোগ্য, তাকে মৃত্যু এসে মুছে দেয়। কতবার দেখেছি, প্রবল প্রতাপান্বিত চিতাবাঘ, তার থাবায় শজারুর কাঁটা ফুটল। বিষিয়ে উঠল পায়ের ঘা। শিকার ধরতে না পেরে সে ক্রমশ শুকিয়ে যেতে লাগল। তারপর? না, তারপর আর তাকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয় না৷ কোথা থেকে যেন ঠিক খবর পেয়ে যায় শেয়াল আর হায়নার দল। একদিন যারা চিতার গন্ধ পেলে সসম্ভ্রমে সরে দাঁড়াত, তারাই এবার ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেচারার ভবলীলা ঘুচিয়ে দেবে।

    সেইজন্যেই এই আহত, অনাথ, অসুস্থ পশুগুলোকে জঙ্গলে ছেড়ে দিতে পারব না, এদের এনক্লোজারের মধ্যেই রাখতে হবে। আবার সেখানে যদি রাখি, তাহলে ওদের খাদ্যের জোগাড় করতে হবে। কোথায় খাদ্য?

    রুহিনের দিনলিপি, ৩রা জুন ১৮৪৭

    চিড়িয়াখানার গেটের কাছে বসে উদ্বাস্তুর স্রোত দেখছিলাম। পাঁচদিন ধরে এই স্রোত চলেছে। একটানা নয়… ভাঙা ভাঙা দলে। এক এক দলে হয়তো দু-তিনটি বাড়ির দশ

    বারোজন নারী-পুরুষ আর শিশু। হয়তো তাদের সঙ্গে দুটো ঘোড়া, একটা কুকুর, খাঁচায় একটা টিয়াপাখি।

    একটা সাত-আট বছরের বাচ্চা দেখলাম বুকের কাছে একটা ফুলের টব আঁকড়ে ধরে হাঁটছে৷ আহা রে। হয়তো অনেকদিনের সাধের ফুলগাছের বীজটি সবে মাটির মধ্যে থেকে পাতা ছেড়েছিল; তাকে ফেলে রেখে ও যায় কেমন করে? এদিকে হাঁটতে হাঁটতে তার নিজেরই ছোট্ট পা-দুটো কনকন করছে। তাই রাস্তার মধ্যেই উবু হয়ে বসে পড়ছে। তখনও কিন্তু বুকের মধ্যে আঁকড়ে রেখেছে সেই ফুলের টব।

    পৃথিবীতে প্রাণের কী বিপুল বিস্ফোরণ, অবাক হয়ে তাই দেখি। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পিঁপড়ে থেকে শুরু করে ওই বিশাল বটগাছটা অবধি। সবাই কেমন নিজের মনে বেঁচে আছে, বংশবিস্তার করছে। মনে হয় যেন প্রাণের সমুদ্রে ডুবে আছি আমরা।

    কিন্তু জামিল স্যারের কথা যদি সত্যি হয় তাহলে আর কিছুদিনের মধ্যে ওই বালক আর তার বুকের ফুলগাছ একইসঙ্গে মারা যাবে। আমরা কেউই বাঁচব না। কারণ আমাদের এই ভূখণ্ডটুকু নাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

    ওই যে আজ দলে দলে মানুষ কালাহাম শহর ছেড়ে পালাচ্ছে, ওরা আসলে

    এই উপত্যকা ছেড়ে কোথাও পালাতে পারবে না। যদি বেঁচে থাকে তাহলে আবার এখানেই ঘুরে আসবে আর না হলে রাস্তায় মারা যাবে। মারা যাবে অনাহারে, অসুখে। এইসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ এমন একটা দৃশ্য চোখে পড়ল যে মনে মনে জিভ কাটলাম। বড্ড তাড়াতাড়ি ওদের মৃত্যুর কথা ভেবে ফেলেছিলাম। আরে, মানুষের বাঁচার ইচ্ছে কি অত সহজ জিনিস? দেখলাম, টিলা থেকে বেখেয়ালে নেমে-আসা একটা ময়ূর উদ্বাস্তুদের সামনে পড়ে গেল আর মুহূর্তের মধ্যে লোকগুলো সেই ময়ূরটাকে চারিদিক থেকে ঘিরে, মেরে, তার পালক ছাড়িয়ে মাংসের ব্যবস্থা করে ফেলল। বটগাছের শুকনো পাতা জ্বালিয়ে ওখানেই ওটাকে ঝলসে খেয়ে ফেলল তারা। তারপর আবার রওনা দিল অজানা গন্তব্যের দিকে৷

    আমি ভয়ের চোটে তাড়াতাড়ি চিড়িয়াখানার বড় লোহার গেট-টা ভেতর থেকে হুড়কো দিয়ে লাগিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লাম। কী দরকার বাবা ঝুঁকি নিয়ে। আমাদের রেসকিউ সেন্টারেও হরিণ কিংবা খরগোশের মতো অনেক পশু আছে যাদের মাংস দিব্যি খাওয়া চলে।

    এ তো গেল নরকের একটা দিক। নরকের আরেকদিকের ছবি দেখলাম আজ‍ই সন্ধেবেলায়, এই বড়জোর ঘণ্টাখানেক আগে। আমাদের রেসকিউ সেন্টারে বাকুম নামে একটা অজগর সাপ আছে। মানে যাকে ইংরিজিতে বলে ‘রক-পাইথন’।

    প্রায় চার-বছর আগে, গুমানি বনে যখন দাবানল লেগেছিল, তখন মিনিস্কা ওকে ওখান থেকে উদ্ধার করে এনেছিল। তখন বাকুম ছিল তিন মাসের বাচ্চা। খুব বিশ্রীভাবে আগুনে পুড়ে গিয়েছিল।

    যাই হোক, আমাদের পরিচর্যায় বাকুম তো পুরোপুরি সেরে উঠেছে। গত চারবছরে চেহারাটাও হয়েছে দশাসই। কিন্তু ও আর জঙ্গলে ফিরতে চায় না। এখানেই থাকে।

    আমরা জানতাম, সেন্টারের অন্য সমস্ত মাংসাশী প্রাণীদের মতো বাকুমও পেটে ভীষণ খিদে নিয়ে শুয়ে আছে। যারা ঘাস কিংবা গাছের পাতা-টাতা খায়, তাদের খাবার জুটে যাচ্ছিল। কিন্তু চিতা, বনবেড়াল, গোসাপ, সাপ আর কুমিরের মতো মাংসাশী প্রাণীগুলোকে আমরা খেতে দিতে পারছিলাম না।

    কোথা থেকে দেব? ওদের খাবার তো আসত জ্যাকারেলের কসাইখানা থেকে। জ্যাকারেল মারা গেছে। তার কর্মচারী আন্না অজানা আতঙ্কের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে শয্যাশায়ী। ফলে কসাইখানা বন্ধ। আর খোলা থাকলেই বা কী হতো? কসাইখানার মুরগি, ছাগল, ভেড়া এসবের বেশিরভাগটাই তো আসত উপত্যকার বাইরের বিভিন্ন পোল্ট্রি আর ডেয়ারি-ফার্ম থেকে। এখন তো উপত্যকার বাইরে বলে কিছুই নেই। সবটাই মহাশূন্যে মিলিয়ে গেছে৷

    জ্যাকরেলের কসাইখানায় যে-কটি ছাগল-ভেড়া বেঁচে ছিল, মেয়র সাহেবের মধ্যস্থতায়, ওর স্ত্রীয়ের হাতে যথাযোগ্য দাম দিয়ে, সেগুলোকে এনে তুলেছিলাম আমাদের রেসকিউ সেন্টারে। তাই দিয়েই এতদিন চলছিল। সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে তিনদিন আগে। সেই থেকে বেচারা প্রাণীগুলো প্রায় উপবাসে দিন কাটাচ্ছে।

    একবার জামিল স্যারকে বলতে গিয়েছিলাম, আশেপাশের জঙ্গল থেকে বনমোরগ কিংবা খরগোশের মতো কিছু প্রাণী শিকার করে আনতে পারলে… কিন্তু কথাটা শুরু করতেই উনি এমন ভীষণ রেগে গেলেন যে, সেই প্রসঙ্গের ওখানেই ইতি টানতে হল৷ তিনদিন নয়, বাকুম উপোস করছিল আরো আগে থেকে। কারণ, ও খোলস ছাড়ছিল। খোলস ছাড়ার সময় ওরা কিছু খায় না। খোলস ছাড়া শেষ হল গতকাল বিকেলে। তারপর থেকেই বেচারা ক্রমাগত কুণ্ডলী পাকাচ্ছিল আর খুলছিল। বুঝতে পারছিলাম, খিদে পেয়েছে। কিন্তু কী করব?

    দিনের আলো থাকতে থাকতে প্রতিদিনই আমি শেষবার চিড়িয়াখানার পুরো চত্বরটায় একটা রাউন্ড মেরে আসি—এটাই আমাদের নিয়ম। একবার দেখে নেওয়া সব খাঁচার দরজা, এনক্লোজারের সব গেট ঠিকঠাক বন্ধ আছে কিনা৷

    আজ বিকেল পাঁচটা নাগাদ ওরকমই ইন্সপেকসনে বেরিয়েছিলাম। যতই অবোলা প্রাণীগুলিকে দেখছিলাম, ততই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কথা বলতে না পারলেও ওদের চোখের দৃষ্টি আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওরা আমার কাছে খাবার ভিক্ষা করছে। তিনদিন ধরে উপোস করে আছে, আর বেশিদিন টানতে পারবে না ওরা। একে একে এবার মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে।

    এইভাবেই একসময় বাকুমের তারজালি দিয়ে তৈরি খাঁচাটার সামনে পৌঁছোলাম এবং দেখলাম বাকুম নেই, খাঁচা খালি। এও দেখলাম যে, খাঁচাটার পেছনদিকের কিছুটা তারজালিকে ও চাড় দিয়ে তুলে ফেলেছে৷ ওখান দিয়েই পালিয়েছে বাকুম।

    খুব একটা উদ্বিগ্ন হইনি, কারণ এটা জানতাম ও খুব দূরে যেতে পারবে না৷ এমনিতেই অজগর মন্থর প্রাণী, তার ওপরে বেটা না খেয়ে কাহিল। তবে ওকে খুঁজে বার করে খাঁচায় ফেরাতে তো হবেই। তাই মিনিস্কাকে ঘর থেকে ডেকে নিলাম৷ কারণ, মিনিস্কা অভ্রান্তভাবে ধুলোর ওপরে বাকুমের চলার চিহ্ন খুঁজে নিয়ে ওর কাছে পৌঁছে

    যেতে পারবে, যে-কাজটা আমি পারব না৷

    একটা ইংরিজি ওয়াই আকৃতির তেডালা গাছের ডাল আর একটা খালি বস্তা নিয়ে আমরা দুজন বাকুমকে খুঁজতে বেরোলাম।

    মিনিস্কা মাটির দিকে চোখ রেখে হাঁটছিল আর নিজের মনে গজগজ করছিল। ও বনের মেয়ে, পশুপাখিদের ও নিজের ভাইবোনের মতোই ভালোবাসে। ওদের এই অনাহারে থাকাটা তাই আমার চেয়েও ওর কাছে বেশি বেদনাদায়ক। সেইসবই বলছিল 31

    বলছিল ও নাকি জামিল স্যারের কাছ থেকে কথা আদায় করেছে, আর একদুদিনের মধ্যে যদি পশুদের খাবারের জোগাড় না হয় তাহলে সবকটাকে ধরে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসা হবে। সেখানে অন্তত শিকার করে খাওয়ার একটা সুযোগ থাকবে ওদের কাছে। যারা সেটা পারবে তারা বেঁচে যাবে আর যারা পারবে না…।

    আমি বললাম, ‘আর এই সেন্টারটা যে উঠে যাবে। তখন আমরা কোথায় যাব?’। মিনিস্কা তেতো একটা হাসি হেসে বলল, ‘মরব এবং মরার পরেও এখানেই থাকব। সেটাই তো এখন সুবিধে আমাদের। জ্যান্ত অবস্থাতেও নরকেই বাস করছি, মরার পরেও তাই করব’।

    মিনিস্কার এই কথাগুলোকে তখন হতাশার অভিব্যক্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু কথাগুলো যে কতটা সত্যি, সেটা কদিন পরেই বুঝতে পেরেছিলাম। যাই হোক, কিছুক্ষণ বাকুমের চলার দাগ ধরে হেঁটে যাওয়ার পরেই মিনিস্কা বলে উঠল, ‘সর্বনাশ!’

    ‘কী হল?’। আমি বললাম৷

    ‘এ যে গেট পেরিয়ে রাস্তার দিকে চলেছে’।

    আমরাও জোরে পা চালিয়ে রাস্তায় বেরোলাম। তখন সন্ধে নেমে এসেছে। আকাশে শুধু অস্ত যাওয়া সূর্যের লাল আভা রয়েছে একটুখানি। সেই আভাতেই আবছা দেখা যাচ্ছে আমাদের চিড়িয়াখানার সামনের লাল মাটির রাস্তাটা। সারাদিনের মধ্যে বেশ কিছু উদ্বাস্তুর দল ওই রাস্তা ধরে দূরের পর্বতশ্রেণীর দিকে চলে গেছে। এখন একটা মাত্র ছোট দল উদ্ভ্রান্তের মতো ঠিক আমাদের গেটটার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুজন পুরুষ, দুজন মহিলা আর তাদের চারটি বাচ্চা। কিশোর থেকে বালক৷ আমাদের দুজনকে দেখেই তারা আকুল হয়ে প্রশ্ন করল, ‘একটা ছোট মেয়েকে

    দেখেছেন? চার-বছর বয়স। সাদা ফ্রক পরেছিল’।

    একটা আশঙ্কায় আমাদের বুক কেঁপে উঠল। শুকনো মুখে ঘাড় নাড়লাম। জিগ্যেস করলাম, ‘কেন, কী হয়েছে?’।

    ওঁরা উত্তরে যা বললেন তাতে বুঝলাম, হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে ওই বটগাছের নীচে ওঁরা একটু বিশ্রাম নিতে বসেছিলেন। ওঁদের দুটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যে সর্বকনিষ্ঠ, সেই মেয়েটি তখন রাস্তার পাশে পরিখার মধ্যে ফুটে থাকা কলমিফুল তুলছিল। একটু জিরিয়ে নিয়ে ওঁরা যখন আবার যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছেন, তখন থেকেই ছোট্ট মেয়েটিকে অনেকবার ডাকছেন। কিন্তু মেয়েটি সাড়াও দিচ্ছে না, আসছেও না। ওঁরা

    আধঘণ্টার ওপর চারিদিক তন্নতন্ন করে খুঁজেছেন, কিন্তু মেয়েটিকে পাননি।

    শেষ অবধি ওরা আবার শহরের দিকেই ফিরে চললেন এই ভেবে যে, বাচ্চা মেয়েটি হয়তো নিজের বাড়ির টানে ওদিকেই আবার ফিরে গিয়েছে।

    ওঁরা চলে যাওয়ার পরে আমি আর মিনিস্কা রাস্তার ধারের পরিখার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওখানে বাকুমের ভারী শরীরের ছাপ ছিল। ওকে খুঁজে পেলাম কাছেই একটা পুটুশফুলের ঘন ঝোপের মধ্যে। পুঁটুশপাতার ফাঁক দিয়ে নেমে আসা গোধূলি-আলো মাটির ওপরে অদ্ভুত এক আলোছায়ার আলপনা এঁকেছিল। সেই আলপনার সঙ্গে বাকুমের গায়ের চকরা বকরা ছাপ এমন আশ্চর্যভাবে মিশে গিয়েছিল যে, মিনিস্কার মতো অরণ্যচারী মেয়ে ছাড়া আর কারও পক্ষে এক হাত দূর থেকেও ওকে খুঁজে পাওয়া ছিল অসম্ভব। অন্তত উদ্বাস্তুদের দলটা যে দেখতে পায়নি তা তো বুঝতেই পারছি। ভরপেট খাবার খেয়ে বাকুম ওই ঝোপের নীচে শুয়েই আরামে ঘুমোচ্ছিল। ওর

    মুখের কাছে পড়েছিল বাচ্চা মেয়েদের একপাটি লাল জুতো আর বুনো লতা দিয়ে বাঁধা একটা নীল কলমির থোকা।

    শেরিফ ক্যাপ্টেন ব্রিকসের নোটবুক, ৪ঠা জুন, ১৮৪৭

    আপাতত খাবারের ব্যাপারটা গ্রামবাসীদের সহায়তায় কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে৷ তারা নিজেদের ফসলের গোলা হাট করে খুলে দিয়েছে শহরের লোকেদের জন্যে। কিন্তু এক হাজার লোকের এক বছরের খাদ্য যদি কুড়িহাজার লোকে খায় তাহলে সেই খাবারে কদিন চলবে সেটা হিসেব করার জন্যে তো ক্লাস থ্রিয়ের বেশি বিদ্যে লাগে না৷ মোটামুটি কুড়িদিন। আজ থেকে কুড়িদিন বাদে এই কালাহাম উপত্যকায় আর এক কণাও শস্য থাকবে না। চাষিরা জানিয়েছে নতুন ফসল কবে উঠবে, তারও কোনো ভরসা নেই। প্রকৃতির খ্যাপামিকে তারা সামাল দিতে পারছে না৷

    তাও তো বহু মানুষ, সঠিক ভাবে বলতে গেলে শহরের অর্ধেক মানুষই, শহর ছেড়ে চলে গেছে। আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে যে, তারা কোথাও যেতে পারবে না। আমাদের অবশিষ্ট এই পৃথিবীকে এখন দু-সপ্তাহেই পরিক্রমণ করে আসা যায় এবং এখন যারা শহর ছাড়ছে তারা ওইভাবেই গ্রহাণু-পরিক্রমণ করে ফিরবে। কিন্তু তারা ফিরে এসে খাবে কী?

    সবাই ফিরবে না অবশ্য। আজ সকালেই দুটি পরিবারের সঙ্গে দেখা হল যারা শহর ছাড়বে বলে সবেমাত্র চিড়িয়াখানা অবধি গিয়েছিল। তার মধ্যেই একটি শিশুকন্যাকে যে কোথায় খুইয়ে এসেছে নিজেরাও বুঝতে পারছে না। এখন বাড়ি ফিরে এসে কান্নাকাটি করছে।

    সবাই যে পালিয়ে যায়নি তারও কারণ আছে। প্রথমত, তারা যায়নি যাদের বাড়িতে যুবতী বা মধ্যবয়স্কা নারী নেই। দ্বিতীয়ত, তারাও যায়নি যাদের বাড়ির নারী ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হয়ে গেছে। তৃতীয়ত, এরাই সংখ্যায় বেশি, যারা সুরক্ষাবলয় তৈরি

    করে তার মধ্যে বাস করছে।

    এখন বহু লোক একসঙ্গে স্কুলবাড়ি বা ক্লাবের মতো বড় বিল্ডিংগুলোর মধ্যে একসঙ্গে রাত কাটাচ্ছে। রাত নামলেই প্রথমে তারা বাড়ির প্রবেশমুখে অগ্নিকুণ্ড তৈরি করছে। তারপর প্রথমে পুরুষেরা একটা বলয় তৈরি করে অস্ত্র হাতে আসন নিচ্ছে। সেই বলয়ের ভেতরে শয্যা পাতছে নারীরা।

    কিন্তু এভাবে কি বাঁচা যায়? এই কি মানুষের জীবন? আমাদের কালাহাম উপত্যকার মেয়েরা চিরকালই স্বাধীন এবং নির্ভয়। তারা চিরকাল ঘরে এবং বাইরে পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। আজ এইভাবে গৃহবন্দি হয়ে থাকতে তাদের ভালো লাগবে কেন?

    মেয়েরা ক্রমশ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

    আমি আর আমাদের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মহিলা-চিকিৎসক ডক্টর কোকো ওদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। ওদের বিশ্বাস, যে-পুরুষগুলি যৌন ঈর্ষা বুকে নিয়ে মারা গিয়েছিল, তারাই এখন প্রেত হয়ে ফিরে আসছে এবং মুখের ওপরে তীব্র পাচকরস ছিটিয়ে নষ্ট করছে তাদের চেনা কোনো নারীর রূপ। প্রাণে মারছে না, কারণ মৃত্যু তো শুধু কয়েক মুহূর্তের কষ্ট মাত্র। বরং এমন অবস্থাই করে দিচ্ছে যাতে সারাজীবন ধরে মেয়েটি যন্ত্রণা পায় ।

    ওদের এই ধারণাকে নস্যাৎ করতে পারিনি। আমারও মনে হয়েছে ওরা যা বলছে সেটাই ঠিক।

    ডক্টর কোকো পরে আমাকে একান্তে ডেকে বলেছিলেন, ‘মেয়েদের আসল আতঙ্ক কিংবা অসহায়তাটা কোথায়, সেটা কি বুঝতে পারলেন মিস্টার ব্রিকস?’।

    উত্তর দিয়েছিলাম, ‘মুখটা চিরকালের মতো বিকৃত হয়ে যাবে, অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করবে, এর চেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ আর কী হতে পারে?’। ব্যঙ্গের হাসি হেসে উনি বলেছিলেন, ‘জানতাম, সঠিক উত্তরটা দিতে পারবেন না। কারণ আপনি ভালোমানুষ হলেও পুরুষমানুষ। সুবিধাভোগী শ্রেণী।

    ‘শুনুন মিস্টার ব্রিকস, কালাহামের প্রতিটি মেয়ে এখন বুঝতে পারছে যে, পুরুষদের কাছে তারা আসলে একধরনের মনুষ্যেতর জীব ছাড়া কিছু নয়। জীবিতাবস্থায় ভদ্দরলোকেরা সেই মনোভাবটা সযত্নে লুকিয়ে রাখে, কারণ সমাজে ভাবমূর্তির কথা ভাবতে হয় তাদের। কিন্তু মৃত্যুর পরে তো আর ভাবমূর্তির চিন্তা থাকে না। তাই তখন মেয়েদের মুখে জ্বলন্ত থুতু ছিটিয়ে দেওয়ার আর বাধা থাকছে না। কোন মেয়েদের মুখে? যাদের তারা বেঁচে থাকতে বিছানায় চেয়েছিল, কিন্তু পায়নি, বা যাদের কাছে তারা পেশার জগতে হেরে গিয়েছিল, কিংবা যে-মেয়েরা তাদের চেয়ে বেশি গুণী ছিল, তাদের মুখে।

    ‘সংগত-ভাবেই এখন কালাহামের মেয়েরা ভাবছে আমার স্বামীটিও এরকম? যে ছেলেটা আমার প্রত্যাখ্যান পেয়ে মাথা নিচু করে একদিন চলে গিয়েছিল, সেও এরকম ? কাজের জায়গায় যে সহকর্মী হাসতে হাসতে জিগ্যেস করেছিল, তোমার সাফল্যের পেছনে ম্যাজিকটা কী, সেও? এরাও তাহলে মনে-মনে আমার মুখে অ্যাসিড ছুড়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে?’।

    ডক্টর কোকোর তিক্ততায় ভরা কথাগুলো শুনে বলেছিলাম, ‘আপনি এমনভাবেই বলছেন, যেন ওরা কেউ কখনও পুরুষের ভালোবাসা পায়নি? এই যে এখন যারা ওদের ঘিরে সারারাত পাহারা দিচ্ছে, তারা পুরুষ নয়?’।

    ডক্টর কোকো আলতো করে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আহা, সে তো চাষারাও বুনো শুয়োরের হামলা থেকে ফসল বাঁচানোর জন্যে রাত জেগে মাঠ পাহারা দেয়। সম্পত্তি পাহারা দেবে না?’ ।

    রেগেমেগে বলেছিলাম, ‘আপনি অত্যন্ত নিরাশাবাদী, ডক্টর’।

    উনি সপাটে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কী করব বলুন! ডাক্তার হলেও আমিও একজন নারী। নারীদের আশাবাদী হওয়ার কোনো উপায় রেখেছেন কি আপনারা?”।

    এর মধ্যে গতকাল রাতে আবার একটা নরকের জীব হানা দিয়েছিল এবং যথারীতি একটি মেয়ের মুখ ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে পালিয়েছে। এবারের ব্যাপারটা এই কারণে আরো ভয়ঙ্কর যে, এই প্রথম জন্তুটা বসতবাড়ির মধ্যে ঢুকে কাউকে আঘাত করে গেল।

    পনেরো বছরের নিলীকা স্টেমার আমাদের কাউন্টির একজন নামকরা অ্যাথলিট। আগে সে প্রতিদিন ভোরবেলায় পার্কে গিয়ে শরীর-চর্চা করত। অজানা জন্তুর আক্রমণের ঘটনা ঘটার পর থেকে বাড়ির ছাদেই কিছু ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ সেরে নিচ্ছিল। গতকাল ভোরেও সেরকমই ব্যায়াম করছিল। হঠাৎই দেখে, দোতলার ছাদের পাঁচিলের ওপর মাকড়সার পায়ের মতো রোমশ দুটো পা। মাকড়শার সঙ্গে তফাত হচ্ছে, এই পা দুটো একেকটা প্রায় ছ-ফুট করে লম্বা।

    পরক্ষণেই পাঁচিলের ওপরে জন্তুটার মুন্ডুটাও জেগে উঠল এবং মাকড়শার মতোই সেটা আট পায়ে লাফ মেরে এসে নিলীকার মুখে বিষাক্ত রস ছিটিয়ে দিয়ে চলে গেল। বলাই বাহুল্য, নিলীকারও মুখে এখন মূলত হাড় ছাড়া আর কিছু নেই। মিস্টার প্রোভস্ট একটা ভারি ইন্টারেস্টিং কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, বিষাক্ত থুতুর মধ্যে ইদানিং এমন একটা উপাদান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে আক্রান্তদের ব্যথা যন্ত্রণা কম হচ্ছে।

    নিলীকা আক্রমণকারী মাকড়শাটিকে চিনতে পেরেছিল। ওর জিমন্যাস্টিকের কোচ ইসানুর। ডক্টর কোকো আমাদের ঘর থেকে বার করে দিয়ে নিলীকাকে জিগ্যেস করেছিলেন, ইসানুর কখনও ওকে কোনো নোংরা প্রস্তাব দিয়েছিল কিনা। নিলীকা জানিয়েছে, হ্যাঁ৷

    শুনে আমি তখনই ইসানুরের বাড়িতে হানা দিই। কিন্তু গিয়ে দেখি দরজায় তালা। প্রতিবেশী এক ভদ্রলোক বললেন, ইসানুর তার স্ত্রীকে নিয়ে দিন পাঁচেক আগেই প্রেতপ্রাণীদের ভয়ে শহর ছেড়ে পালিয়েছে।

    ও যে পালাবার পথেই কোথাও মারা পড়েছে এটা নিশ্চিত। ভাগ্যের কী পরিহাস ! যে প্রেত-প্রাণীদের ভয়ে ও পালিয়েছিল, এখন সেই প্রেত-প্রাণীতেই পরিবর্তিত হয়েছে ইসানুর। মৃত্যুর পরে নিলীকার ওপরে প্রতিশোধও নিয়ে গেছে।

    এই ঘটনা থেকেই আরেকটা দুশ্চিন্তা আমার মাথায় ঢুকল। এই যে প্রায় কুড়িহাজার মানুষ শহর ছেড়ে চলে গেছে—যারা এখন দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরছে—তাদের

    মধ্যে থেকেও তো ইসানুরের মতো অনেকে মারা যাবে। মৃত্যুর পরে তারা কেউই তো পরলোকে যাবে না। সবাই ফিরে আসবে এখানেই, এই কালাহাম উপত্যকায়। এবং তাদের মধ্যে যারা পাপিষ্ঠ তারা হিংস্র জন্তু হয়ে ঘুরে বেড়াবে এখানেই, এই শহরে। আর মেয়েদের আক্রমণ করবে।

    এই অবস্থাকে প্রতিহত করার জন্যে আমাদের তো কিছু করা দরকার। কী করব? মনে পড়ল, আট দিন আগে মিসেস জানোকি আমাকে বলেছিলেন, দক্ষিণে যেতে। ড্রাগনের সঙ্গে দেখা করতে। তখন কথাগুলোকে অতটা গুরুত্ব দিইনি। কেন দেব? কী আছে দক্ষিণে? কিন্তু এখন বারবার মনে পড়ছে, মৃত মিস্টার জ্যাকারেলকে আমি ওই দক্ষিণদিক থেকেই এদিকে আসতে দেখেছিলাম।

    সেইজন্যেই আজ রাত্রে মাঠ ভেঙে দক্ষিণদিকে গিয়েছিলাম। অবশ্যই ঘোড়ায় চেপে। শহর আর পাহাড়ের সারি, এই দুইয়ের মধ্যে একটিই মাত্র মানুষের আবাসন রয়েছে ওইদিকে—সেটি হল কালাহাম অ্যানিমাল রেসকিউ সেন্টার।

    খুব খেয়াল করে না দেখলে মনুষ্যসৃষ্ট ওই আবাসনটিকে প্রকৃতির থেকে আলাদা করে বোঝাই যায় না। একটা ছোট টিলার পায়ের কাছে বড় বড় গাছপালার আড়ালে কয়েকটি মাত্র বাড়ি আর তিনজন মাত্র মানুষ। এই তো ওদের সেন্টার। আলাদা করে আর কীই বা বোঝা যাবে?

    ওই সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা মিস্টার জামিলের সঙ্গে আমার ভালোই আলাপ রয়েছে। খুব অন্য ধরনের একজন মানুষ উনি। অতি সাধারণ জীবনযাপন করেন কিন্তু দুটো কথা বললেই বোঝা যায় জ্ঞানী ব্যক্তি। আর হৃদয়টা তো বিশাল বটেই, না হলে কেউ দুঃস্থ পশুপাখিদের জন্যে এত কিছু করেন?

    আজ আমি যখন চিড়িয়াখানার কাছাকাছি পৌঁছেছি তখন হঠাৎ রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা ডাক ভেসে এল, ‘মিস্টার ব্রিকস ! ‘

    চমকে উঠে এদিক-ওদিক চাইছি। তখনই আবার ডাক, ‘মিস্টার ব্রিকস, এদিকে। এই টিলার মাথায়’।

    তাকিয়ে দেখি অন্ধকারের মধ্যে গাঢ়তর সিল্যুয়েট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মিস্টার জামিল স্বয়ং।

    আমি চটপট ঘোড়াটাকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে, টিলার মাথায় উঠে পড়লাম৷ উনি আমার জন্যে রাস্তার শেষে অপেক্ষা করছিলেন। আমি ওপরে পৌঁছতেই হাতে টান দিয়ে বললেন, ‘চলুন। ওইখানে গিয়ে বসি’। এই বলে একটা বেশ চ্যাটালো পাথরের স্ল্যাবের ওপরে আমাকে নিয়ে বসলেন।

    বললাম, ‘এত রাত্তিরে এখানে কী করছেন, মিস্টার জামিল ?’।

    উনি বললেন, ‘আমি তো প্রায় প্রতি রাত্রেই এখানে এসে বসে থাকি’। একটা একনলা টেলিস্কোপ দেখিয়ে বললেন, ‘এইটা দিয়ে তারা দেখি। আর…’ কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলেন৷

    আমি বললাম, ‘আর কী করেন?’।

    উনি একটু লজ্জিতমুখে বললেন, ‘ধ্যান করি। দূরবিন, অণুবীক্ষণ এসব দিয়ে আর বিশ্বজগতের কতটুকু দেখা যায়? যেটা দেখা যায় না, চেষ্টা করি সেটা ধ্যানের মধ্যে দিয়ে দেখতে’।

    বললাম, ‘কী দেখলেন ধ্যানে?’।

    আমি হালকা চালেই কথাটা বলেছিলাম। উনি কিন্তু খুব সিরিয়াস মুখ করে বললেন, ‘আজ নয়। কিছুদিন ধরেই দেখছি। যা দেখছি সেটা বলব বলে আপনার কাছে যাব ভাবছিলাম। ভালোই হল আপনি নিজেই আজ এখানে চলে এলেন’। ‘বলুন’।

    ‘এই কালাহাম উপত্যকা…’।

    ‘হ্যাঁ৷ কী হয়েছে এই উপত্যকার?’।

    ‘এই উপত্যকাই এখন নরক। না, এটাকে নিতান্ত উপমা বলে ভাববেন না। মৃত এবং দুষ্ট আত্মাদের পুনর্বাসন দেবে বলে এই উপত্যকাকে পৃথিবী থেকে কেউ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। যেভাবে আপনারা শহরের ময়লা ফেলার জন্যে কোনো জমিকে নির্দিষ্ট করে সেই জায়গাটাকে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেন, ঠিক সেইভাবে’।

    কথাগুলো বলে মিস্টার জামিল যেভাবে আমার মুখের দিকে তাকালেন, তাতে বুঝতে পারলাম, উনি আশা করছেন আমি অবিশ্বাসের হাসি হেসে উঠব। কিন্তু কেন হাসব? প্রায় একই কথা তো আগেও একজন আমাকে বলেছিলেন। এবং যিনি বলেছিলেন তাকে সন্দেহ করা অসম্ভব। কারণ, তিনি কালাহামের নরকে নিজেই একজন বন্দিনীমিসেস জানোকি৷

    তাই আমি মিস্টার জামিলের কথার উত্তরে শান্তভাবে বললাম, ‘আপনার কথায় আমি বিশ্বাস করি’।

    উনি তাই শুনে বললেন, ‘শুধু ধ্যানে নয়। খুব সম্প্রতি আমি চর্মচক্ষে এমন কিছু জিনিস দেখেছি যা দেখলে আপনার সমস্ত শরীর শিউরে উঠবে’।

    কোনো কথা না বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকালাম। উনি বললেন, “আমার ওই সাধের রেসকিউ সেন্টার, ওটাই এখন নরকের জীবদের বাসস্থান। আসুন, এখানে চোখ লাগান’।

    এই বলে উনি ওঁর গলায় ঝোলানো বাইনোকুলারটা খুলে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘যে দুটো ঘরের দাওয়ায় আলো জ্বলছে ওই ঘরদুটো রুহিন আর মিনিস্কার ঘর। ওরা ঘুমোচ্ছে। আপনি ওই ঘরদুটোর বাঁদিকের জমিটা ধরে আপনার বাইনোকুলার প্যান করে এগিয়ে আনুন। দেখবেন ওখানেই পরপর আমাদের আশ্রিত প্রাণীগুলোর থাকার জায়গা… বেড়া দিয়ে ঘেরা জমি। আকাশে চাঁদ আছে, তাই আপনার দেখার অসুবিধে হবে না। যা দেখছেন আমাকে বলে যান’।

    প্রথমটায় অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়েনি। দেখলাম, একটা এনক্লোজারে এক বৃদ্ধ অস্থিসর্বস্ব নীলগাই হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে আর তার গায়ের কাছে দাঁড়িয়ে রাতের বাতাস শুঁকছে এক অন্ধ চিতল হরিণ। পরের এনক্লোজারটায় সাত-আটটা নানা

    বয়সের বাঁদরছানা খড়ের তৈরি নকল বাঁদর-মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে। তার পরেরটায় বাঘের মুখ থেকে ফিরে আসা বাইসন, পেছনের পায়ে ব্যান্ডেজ জড়ানো, শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছে।

    এইসবই দেখছিলাম আর বলে যাচ্ছিলাম মিস্টার জামিলকে। উনি বললেন, ‘আরেকটু নজর করে দেখুন’।

    তখন দেখলাম, ওই স্বাভাবিক পশুগুলোর আশেপাশেই ছায়ার মতো মিশে আছে সেই অলৌকিক আতঙ্কজনক প্রাণীগুলি, যাদের কারও কারও বর্ণনা আমরা কালাহাম শহরের আক্রান্ত মেয়েদের মুখে শুনেছি। পায়ের ছাপ দেখে করোনার মিস্টার প্রোভস্ট যাদের কথা অনুমান করেছিলেন। দেখলাম সেই ছয় পা ওয়ালা মানুষকে, একটা গাছের গুড়ির গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে। দেখলাম বিরাট সাপের মতো এক প্রাণী, বুকের কাছে দুই বলিষ্ঠ হাত, সেই হাতে আঁকড়ে ধরে একটা বেড়ালের মতো কোনো জন্তুকে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে।

    আর দেখতে পারছিলাম না। গা’টা কেমন গুলোচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এক্ষুনি বমি হয়ে যাবে। অনভ্যাসবশত বাইনোকুলারটা চোখে দিয়েই মিস্টার জামিলের দিকে ঘুরে গেলাম, ওঁর হাতে জিনিসটা ফেরত দেব বলে। তখনই আই-পিসের মধ্যে দিয়ে দেখলাম, আমার পাশে পাথরের চাতালের ওপরে বসে রয়েছে একটি ড্রাগন। তার পিঠের সবুজ আঁশের ওপর চাঁদের আলো পিছলে যাচ্ছে। কুমিরের মতো লম্বাটে মুখে হরিণের মতো দুই টানা-টানা চোখ। মাথায় ডালপালা মেলা শিং। বুকের আঁশগুলো সোনালি।

    অসম্ভব চমকে উঠে চোখ থেকে বাইনোকুলারটা নামাতেই দেখলাম, কোথায় ড্রাগন। মিস্টার জামিল যেমন বসেছিলেন তেমনই বসে রয়েছেন আমার পাশে। আমাকে চমকাতে দেখে বললেন, ‘কী হল?’।

    উত্তর না দিয়ে আবার দূরবিনটা চোখে লাগালাম। আবার দেখলাম, রাজকীয় ভঙ্গিতে এক বিশাল ড্রাগন বসে রয়েছে। তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে আগুনের হলকা বেরিয়ে আসছে।

    একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দূরবিনটা মিস্টার জামিলের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আপনি নিজে কি বুঝতে পারেন, আপনার খুব গভীরে এক অন্য অস্তিত্ব বাস করে? জ্ঞানী, মায়াবী, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এক অস্তিত্ব?’।

    উনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘কত গভীরে? দূরবিন দিয়ে দেখতে হয় এমন গভীরে?’।

    বললাম, “হ্যাঁ”।

    উনি কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন, “মিথ্যে কথা বলব না। বুঝতে পারি। গতবছর যে এখানে এসে এই রেসকিউ সেন্টার বানিয়েছিলাম, সেটা ভেতর থেকে নির্দেশ এসেছিল বলেই। তার কিছুদিন পরেই কালাহাম স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে যে ওই স্মৃতিভ্রষ্ট তরুণটিকে উদ্ধার করে এখানে নিয়ে এসেছিলাম, তাও স্বেচ্ছায় নয়। কে যেন আমাকে বলেছিল, ‘ওখানে যান। একজন এসেছে যাকে আপনি চেনেন ৷ বুঝতে পারছিলাম, এই আলোচনাটাকে মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়া আমার

    পক্ষে কঠিন। মিসেস জানোকি এমনি এমনি আমাকে ড্রাগনের সঙ্গে দেখা করতে বলেননি। তাই গোঁয়ারের মতো আবার প্রশ্ন করলাম, “কিন্তু আপনারা কোথা থেকে এসেছেন তা তো বললেন না’ ।

    উনি বললেন, ‘আমরা তো কোথাও থেকে আসিনি, মিস্টার ব্রিকস। আমি আর রুহিন এখানেই ছিলাম। এক পাখি আর তার ড্রাগনবন্ধু। কিংবা এক ড্রাগন আর তার পাখিবন্ধু। আমাদের সেই পৃথিবীর অনেকটা অংশই তুষারে ঢেকে থাকত। অল্প কিছু মানুষ সেই তুষার-প্রান্তর ভেঙে মাইলের পর মাইল চলে যেত শিকারের খোঁজে। পাথরের অস্ত্র দিয়ে তারা ম্যামথ শিকার করত।

    ‘হঠাৎই একদিন দেখলাম চারিদিকে এত মানুষ, এত ঘরবাড়ি। ট্রেন, মোটর, স্টিমার। স্কুল, ডিসপেনসারি, পানশালা। কোথায় হারিয়ে গেল জগৎজোড়া সেই শুভ্রতা, সেই শৈত্য আর সেই নৈঃশব্দ্য।

    ‘শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেটা একই রয়ে গেছে। সেই আমাদের গ্রহের চেনা আকাশ।

    ‘এই যে রেসকিউ সেন্টার… ত্রাণকেন্দ্র… এটাকে আসলে আমাদের দুজনের ত্রাণের জন্যেই বানিয়েছিলাম। এখনও এই সেন্টারের গণ্ডির বাইরে গেলে আমরা ভিতরে ভিতরে ভয়ে কাঁপি, জানেন? আপনাদের কাউকে চিনতে পারি না যে। যতই আপনাদের ভাষা, আপনাদের আচার-ব্যবহার আর পোশাক-আশাক নকল করি, তবুও ভয় করে। যদি আমাদের বহিরাগত বলে চিনে ফেলেন। যদি মেরে ফেলেন আমাদের। আপনাদের নিষ্ঠুরতার বহু পরিচয় যে প্রতিদিন দেখি।

    ‘কিন্তু আমরা কেন বহিরাগত হব বলুন তো। আমি আর রুহিন তো বহুদিন ধরে এখানেই, এই পুরোনো-আকাশের নীচেই ছিলাম’।

    কথা শেষ করে মিস্টার জামিল চুপ করে বসে রইলেন। আমি ওঁর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনের দিকে তাকালাম। চোখে পড়ল, চিড়িয়াখানার পাঁচিল টপকে অতিকায় বেড়ালের মতো একটা জন্তু সামনের রাস্তায় নেমে এল। তারপর লাফের পর লাফে মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলল শহরের দিকে। ওর ঘাড়ের কাছে একটা বড় গর্ত, যেটার ভেতর দিয়ে একটা শামুকের মুখের মতো মুখ পেছনদিকে তাকিয়েছিল। সমস্ত বিকৃতি সত্ত্বেও ওই মুখটা চিনতে আমার ভুল হল না৷ উনি ছিলেন পিয়ানোর শিক্ষক। গত বছরে মারা গিয়েছেন। অনেক মেয়েই ওঁর কাছে পিয়ানো শিখতে যেত। কিন্তু উনি আজ কার কাছে চললেন ?

    শহরের চারিদিকে যতটা সম্ভব প্রহরার ব্যবস্থা করেই এসেছি। তবে তাতেও এই প্রেতগুলোকে আটকানো যাবে কিনা কে জানে! কারণ, এরা তো ইচ্ছেমতো অদৃশ্য হতে পারে। শরীর ধারণ করতে পারে একেবারে শিকারের সামনে গিয়ে। আমাকেও এবার উঠতে হবে। আমার সঙ্গে সঙ্গে মিস্টার জামিলও উঠে দাঁড়ালেন। দুজনে পাশাপাশিই টিলা বেয়ে নামতে শুরু করলাম। উনি পায়ের তলার মাটির দিকে

    চোখ রেখেই বললেন, ‘ক্যাপ্টেন ব্রিকস, আমরা একই জায়গায় দুটো আলাদা সময়ে জন্ম নিয়েছি। এই ১৮৪৭ সাল, এ আমাদের জীবনকাল নয়। আমি আর রুহিন অনেক অনেক আদিম৷ কিন্তু এই পাহাড়, বন, এই টিলা আর নদী সব আমার চেনা’ ।

    বললাম, ‘জানি। আপনি ড্রাগন। কোন সুদূর অতীত থেকে আমাদের রক্তের মধ্যে আপনার স্মৃতি ধরা আছে। যেমন ধরা আছে পেগেসাস আর ইউনিকর্ন। আমরা অপেক্ষা করব কতদিনে আপনার ভেতর থেকে সেই ড্রাগন বেরিয়ে এসে আমাদের উদ্ধার করে’।

    চিড়িয়াখানার গেটের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলাম। উনি আমার হাতটা হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, ‘আমি নিজেও নিজেকে নিরন্তর খুঁড়ে চলেছি। আমারও খুব তাড়াতাড়ি বুকের ভিতরের সেই ড্রাগনের কাছে পৌঁছোনো দরকার। নাহলে দেখছেন না, আমার এই ভালোবাসার রেসকিউ-সেন্টারটাকে ওরা কেমন অধিকার করে নিচ্ছে’।

    ওঁর কাছে বিদায় নিয়ে যে গাছটার সঙ্গে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখেছিলাম, সেই গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম ঘোড়াটার কঙ্কালমাত্র মাটির ওপরে পড়ে রয়েছে। এটা কেন করল ওরা? সাবধান করে দিল আমাকে ?

    রুহিনের দিনলিপি, ১০ই জুন ১৮৪৭

    দুদিন আগে আমাদের করোনার মিস্টার প্রোভস্ট মারা গেছেন। স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। উনি প্রতিদিনই ভোরবেলায় অনেকক্ষণ হর্স-রাইডিং করতেন—শরীরচর্চাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য৷ পরশু নাকি ওঁর ঘোড়াটা হঠাৎই কিছু একটা দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে একটা কুয়োর মধ্যে ঝাঁপ দেয়। ওখানেই ঘাড় মটকে মারা যান মিস্টার প্রোভস্ট।

    মিস্টার প্রোভস্ট মারা যাওয়ায় কালাহামের প্রেতেদের বিরুদ্ধে লড়াইটা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ল। মিস্টার প্রোভস্ট আর ডক্টর কোকো, এঁরা দুজনে ছিলেন শেরিফ

    ক্যাপ্টেন ব্রিকসের ডানহাত আর বাঁহাত। উনিও খুব একা হয়ে যাবেন নিশ্চয়ই। মিনিস্কা খুব আপসেট হয়ে পড়েছে। মিস্টার প্রোভস্ট ওকে বহুবার বহু তদন্তের কাজে নিজের সহকারিণী হিসেবে ডেকে নিয়ে গিয়েছেন। আমারও চোখের সামনে বারবার ওঁর চেহারাটা ভেসে উঠছে। গালে চাপদাড়ি, লম্বা চুলগুলো একটা রুমাল দিয়ে মাথার পেছনদিকে ঝুঁটি করে বাঁধা। বেঁটেখাটো বলিষ্ঠ চেহারা আর সর্বদাই ঠোঁটে একটা বুদ্ধিদীপ্ত হাসি লেগে আছে। এই ছিলেন করোনার মিস্টার প্রোভস্ট। আমি আর মিনিস্কা ওঁর সৎকার-অনুষ্ঠানেও গিয়েছিলাম।

    মিনিস্কাকে একবার জিগ্যেস করেছিলাম, ‘তোমার ভয় করছে না? এই যে যারা কালাহাম শহরের মেয়েদের ওপরে আক্রমণ করছে, তাদের মুখ পুড়িয়ে দিচ্ছে, তারা

    তো বলতে গেলে তোমার ঘরের উঠোনেই বসবাস

    করে।

    কথা শেষ হওয়ার আগেই ও বলল, ‘হ্যাঁ। কতবার রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছি জানলার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে ওরকম একটা মাকড়সা মানুষ আমাকে দেখছে। তার সারি দিয়ে সাজানো আটখানা চোখ অন্ধকারে হিরেকুচির মতো জ্বলজ্বল করছে। ‘তাহলে? ভয় করে না?’।

    ‘নাঃ’, ও নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলত।

    আমি জিগ্যেস করতাম, ‘কেন?’।

    ও বলত, ‘কারণ, আমি যেখানে মানুষ, সেই গ্রামে অবদমিত যৌনতা বলে কিছু নেই। নারী পুরুষ দুজনেরই যদি ইচ্ছে থাকে তাহলে যৌন মিলন হয়। সম্পর্ক সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আর যদি কোনো মেয়ে কোনো পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করে, সে জাস্ট একটা শ্রাগ করে ব্যাপারটা ভুলে যায়। তার জন্যে তাদের বন্ধুত্বে চিড় ধরে না৷ সেইজন্যেই কোনো পুরুষের মনে আমাকে না পাওয়ার ক্ষোভ নেই আর তুমি তো জানোই…’

    ‘জানি৷ অবদমিত যৌনতা আর ক্ষোভ থেকে প্রেতের জন্ম

    মিনিস্কা আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘তোমার মনের মধ্যে অবদমন নেই ,

    তো?’।

    আমি ওর স্কার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলেছিলাম, ‘সে সুযোগ দিলে কই?’।

    কিন্তু শেষ অবধি মিনিস্কাও রক্ষা পেল না৷

    গতকাল মিনিস্কার মুখে এক প্রেত পশু বিষাক্ত থুতু ছিটিয়ে দিয়ে গেছে৷ কাল সারারাত ও যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। মাথার কাছে জেগে বসেছিলাম আমি আর জামিল স্যার। ওর ঘর থেকে আয়না সরিয়ে দিয়েছি। সরিয়ে দিয়েছি সবরকমের ধাতুর পাত্রও। কিন্তু তাতে কী? একজন মানুষ নিজেকে তো সবথেকে ভালো দেখতে পায় অন্যদের চোখে।

    আমার আর জামিল স্যারের চোখ দেখেই মিনিস্কা বুঝতে পেরেছিল ওর মুখের দশা কেমন হয়েছে। ও তো এর আগে অজস্র এমন মেয়েদের দেখেছে, তাই আরো ভালো করে নিজের মুখের একটা ছবি মনের মধ্যে তৈরি করে নিতে পারছিল।

    সেই-মুখে নাক, কানের পাতা, চোখের পল্লব, কিছু নেই। নারকোলের মালার

    মতো মসৃণ একটা মুখ। কপালের দিক থেকে অনেকখানি চুলও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে৷ আজ সকালে যখন ওর পুরোপুরি চৈতন্য ফিরে এল তখন জামিল স্যার ওর মুখে মলম লাগাতে লাগাতে প্রশ্ন করলেন, ‘কে ছিল জানোয়ারটা? চিনতে পেরেছিলিস?’। মিনিস্কা উত্তর দিল, ‘মিস্টার প্রোভস্ট’।

    আমি চিৎকার করে উঠলাম—’মিস্টার বলছ কেন, মিনিস্কা? শয়তান বলো। বলো শয়তান প্রোভস্ট’।

    মিনিস্কা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে-পড়তে জড়ানো গলায় বলল, ‘ভদ্রসমাজের সমস্ত পুরুষকেই তো তাহলে শয়তান বলে ডাকতে হয়’।

    রুহিনের দিনলিপি, ১১ই জুন ১৮৪৭

    মিনিস্কা কষ্ট পাচ্ছিল। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমিও কষ্ট পাচ্ছিলাম। তবে সেই কষ্টকেও ছাপিয়ে উঠছিল অন্য এক কর্কশ প্রশ্ন। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, ‘আর কোনো দিন তুমি মিনিস্কাকে চুম্বন করতে পারবে, রুহিন? ওই ঠোঁট-গলে-যাওয়া সাদাটে মাড়ির ওপরে চেপে ধরতে পারবে তোমার দুই ঠোঁট, যেভাবে মাত্র ছত্রিশ ঘণ্টা আগেও ধরেছ? তুমি ওর বুকের ওপরে শুয়ে, ওর নিষ্পলক লাল দুই চোখের তারার দিকে তাকিয়ে, ওর সঙ্গে উপগত হতে পারবে? নাসিকাহীন বিশাল দুই নাসাছিদ্রের মধ্যে দিয়ে ও যখন অবারিত শীৎকার করে উঠবে, তখন শিথিল হয়ে যাবে না তো তোমার শিশ্ন, রুহিন আর যে-নারীর শরীরে তুমি উপগত হতে পারবে না, তাকে আর কতদিন তুমি

    ভালোবাসতে পারবে, সত্যি করে বলো তো’।

    বুঝতে পারছিলাম, মিনিস্কার মনের মধ্যেও ঠিক এই-কথাগুলোই ঘুরছে। না হলে হঠাৎ কেনই বা জামিল স্যারকে ও বলবে, ‘এবার আমি তাহলে গ্রামেই ফিরে যাই স্যার’? ।

    আমি যা পারিনি, জামিল স্যার সেটাই পারলেন। ওকে প্রবল শক্তিতে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন। বললেন, ‘বলিস না, বলিস না এমন কথা। তুই চলে গেলে আমি যে কতটা একা হয়ে যাব, সে-কথা ভাবিস না?’।

    তাই শুনে মিনিস্কার পল্লবহীন দুই চোখ থেকে অবিরল অশ্রু গড়িয়ে নামল ওর ত্বক-হীন মাংস-সর্বস্ব দুই গালের ওপরে আর এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম জামিল স্যারের ওই কথাগুলো আমারও কথা। আমিও পারব না মিনিস্কাকে ছেড়ে থাকতে। ও যদি মানুষ থেকে একটা অ্যামিবা হয়ে যায়, তাহলেও না। ওর প্রাণটুকুই আমার কাছে ভীষণ দামি। কারণ, ওই প্রাণ দিয়ে ও আমাকে এতটা ভালোবাসে… যেরকম ভালো আর কেউ আমাকে বাসে না।

    জামিল স্যারের মধ্যে আজ সারাদিনই একটা প্রবল অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছিলাম। সেটা শুধুই মানসিক অস্থিরতা নয়। গুটি কেটে প্রজাপতি বেরিয়ে আসার সময় হলে তার মধ্যে যেমন একটা বিপুল অস্থিরতা দেখা যায়, গুটিটা ফুলে ফুলে ওঠে, পাতার সঙ্গে সংলগ্ন অবস্থাতেই মোচড় খেতে শুরু করে, ঠিক সেইরকম এক শারীরিক অস্থিরতা। প্রবল শোক এবং ক্রোধে ওঁর শরীরটাই যেন ফেটে যাবে মনে হচ্ছিল।

    আজ সন্ধ্যাবেলাতেও উনি অন্যান্যদিনের মতোই টিলার মাথায় উঠে বসেছিলেন। পাথরের আসনের ওপরে বসে ধ্যান করছিলেন। আমি আমার ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ওঁকে দেখতে পাচ্ছিলাম। এতদূর থেকেও পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, ওঁর বুকটা হাপরের

    মতো উঠছে আর পড়ছে।

    অন্ধকার আরো একটু গভীর হল। কী আশ্চর্য, আমি তখনও জামিল স্যারকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। কেন? কারণটা কী? ভাবতে ভাবতে বুঝতে পারলাম, দুটো কারণ। এক, ওঁর শরীরটা অনেক বড় হয়ে গেছে আর দুই, শরীর থেকে ফসফরাসের মতো এক সবুজ আলোর আভা বেরিয়ে আসছে। সেইজন্যেই তখনও উনি দৃশ্যমান।

    আমার আর কোনো কাজ হল না, ওইদিকে তাকিয়েই বসে রইলাম।

    রাত পৌনে বারোটা নাগাদ পরিষ্কার দেখতে পেলাম ওঁর নাকের ফুটো দিয়ে নিঃশ্বাসের সঙ্গে আগুনের দুটো হলকা বেরিয়ে এল। আমি আর দেরি না করে টিলার চুড়ো লক্ষ্য করে রওনা দিলাম। বড় বড় গাছের আড়াল আবডাল দিয়ে যখন চুড়োয় গিয়ে পৌঁছলাম তখন সেখানে ওই পাথরের চাতালের ওপরেই পা ভাঁজ করে বসে ছিল বিশাল এক ড্রাগন।

    জামিল স্যার রূপান্তরিত হয়েছেন অজামিলে। আমার প্রিয় ড্রাগন, আশৈশব আমার খেলার সঙ্গী। তার সবুজ আঁশে ঢাকা গন্ডারের মতো শরীর। কুমিরের মতো মাথা আর পা। তবে সেই পা চারটে কুমিরের চেয়ে অনেক বেশি লম্বা। মাথায় ডালপালাওলা শিং। শিংগুলো বোধহয় রুপোর তৈরি, কারণ, চাঁদের আলোয় ঠিক রুপোর মতোই ঝকমক করছিল। এই চেহারা আমার ভীষণ চেনা। আমার মনে পড়ছিল, আমাদের তুষারযুগের পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করত অজামিলের মতো জ্ঞানী ও হৃদয়বান ড্রাগনেরা।

    আমাকে দেখতে পেয়ে অজামিল পাথরের আসন থেকে নেমে এল। আমি তাকে বললাম, ‘তাহলে এই যে নিজেদের কাল থেকে বিচ্যুত হয়ে শুধু তুমি আর আমি ১৮৪৭ সালে এসে পৌঁছালাম, এর পেছনে কি কোনো কারণ রয়েছে?”।

    যে-কোনো ড্রাগনের মতো, অজামিল কথা বললেও মনে হয় মেঘ ডাকছে৷ সেই মেঘমন্দ্রিত স্বরেই ও বলল, ‘হ্যাঁ উশীনর। তুমি ছাড়া ওই ক্ষতবিক্ষত মেয়েগুলিকে কে আরোগ্য দেবে?’।

    ‘উশীনর! আমার নাম উশীনর? আমি ওদের আরোগ্য দেব?’।

    ‘অবশ্যই। তোমার কি এখনও কিছু মনে পড়ছে না? এখানে এসো। জলের ধারে দাঁড়াও। দ্যাখো নিজের ছায়ার দিকে’।

    তাই করলাম। আনন্দধারার শান্ত স্রোতের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অজামিলের শরীর থেকে নির্গত সবুজ আলো জ্যোৎস্নার মতো আমার শরীরেও আলো ফেলেছিল। জলের মধ্যে সেই আলোকিত প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখি, আমিও আর মানুষ নেই; পাখি হয়ে গেছি। বিরাট এক বাজ পাখি। উশীনর পাখি।

    আছে?’। অজামিল বলল, ‘তোমার যে এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল সে-কথা কি মনে

    বললাম, ‘মনে ছিল না। এখন সবই মনে পড়ছে আস্তে আস্তে’। সত্যিই আমার মনে পড়ছিল, আমিই সেই পৌরাণিক শ্যেনপক্ষী, রাজা উশীনরের

    ক্ষতস্থান যে সারিয়ে তুলেছিল। আমি ক্ষতভোজী শ্যেন। ক্ষতস্থান ভক্ষণ করে সেই জায়গায় নতুন মাংস চামড়া গজিয়ে তুলি। অজামিল বলল, ‘যাও। তাহলে কাজে লেগে পড়ো। আর দেরি কেন? ‘ ।

    উশীনর পাখির মুখের কথা, যখন লিপি আবিষ্কার হয়নি

    আমি ডানা মেলে টিলা থেকে তীব্রবেগে ঝাঁপ দিলাম। আমার সঙ্গেই ডানা মেলল ড্রাগন। আমাদের প্রথম গন্তব্য মিনিস্কার ঘর। তারপর বাকি শহরের যত ক্ষতবিক্ষত মেয়েদের লুকোনো আবাস। সবার মুখে আবার আগের রূপ ফিরিয়ে দেব, এটাই আমাদের ব্রত।

    ঘুমন্ত মিনিস্কার মুখের সমস্ত ক্ষত আমার শাণিত চঞ্চু দিয়ে যত্ন করে তুলে নিলাম। আমার ঔষধি নিঃশ্বাসে ওর মুখে নতুন মাংস, নতুন ত্বক এমনকী মাথায় নতুন কেশও গজিয়ে উঠল।

    পুরো সময়টা জুড়েই ওর ঠোঁটে একটা হালকা হাসি লেগেছিল। আসলে ও ভাবছিল, ড্রাগন আর বাজপাখির স্বপ্ন দেখছে। ও যখন সম্পূর্ণ আরোগ্য হয়ে গেল, তখন আমি আর অজামিল জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে রোদের সঙ্গে রোদ হয়ে মিশে গেলাম আর সেই রোদ্দুরেরই একটা ফলা জানলা দিয়ে মিনিস্কার চোখের ওপরে পড়ে ওকে জাগিয়ে দিল।

    ছোট্ট হাত-আয়নাটা নিয়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়াল মিনিস্কা৷ ওর শ্যামলী মুখ তখন আবার আগের মতোই সুস্থ, ঝলমলে, নিদাগ। এইটুকু দেখে আমি আর ড্রাগন আনন্দিত চিত্তে কালাহাম শহরের দিকে উড়াল দিলাম।

    কিন্তু সেখানে গিয়ে আর কোনো প্রেত-আক্রান্ত মেয়েকে খুঁজে পেলাম না। যারা সুস্থ তারা বলল, “কই, এরকম কেউ নেই তো। কখনও তো ঘটেনি এরকম কিছু দ্যাখো, এই সুন্দর সকালে সব মেয়েই কেমন হাসতে হাসতে স্কুল-কলেজে যাচ্ছে, চাকরি করছে, সংসারের জন্যে বাজার করে আনছে, সখীদের সঙ্গে গল্প করছে। কোন বিষাক্ত উৎসেচকের কথা বলছ তুমি পাখি! মাথা খারাপ নাকি তোমার?’।

    আমি আর অজামিল কেমন যেন হতভম্ব হয়ে পড়লাম। তাহলে কি সবটাই আমাদের স্বপ্ন? কিন্তু তাহলে মিনিস্কা? ওকে যে একটু আগে সুস্থ করে এলাম !

    ড্রাগন বলল, ‘নরক নরক। এরা স্বীকারই করবে না মেয়েদের কোনো কষ্ট আছে। ওদের লুকিয়ে রাখবে। দরকার হলে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দেবে। হতে পারে, এমন কিছু বিকৃতকাম পুরুষ জুটে গেল, ওই ক্ষতবিক্ষত মুখ দেখেই যাদের কাম জাগ্রত হয়। তখন এই মুখপোড়া মেয়েগুলোকে দিয়েই বিশেষ ধরনের বেশ্যাপাড়া চালু করবে। চলো হে উশীনর, আমরা নিজেদের সময়ে ফিরি। ওই দ্যাখো, পায়ের নীচের দুনিয়াটা কেমন বদলে যাচ্ছে’।

    ততক্ষণে আমরা উড়তে উড়তে অনেক উঁচুতে উঠে এসেছি। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি, কোথায় কালাহাম ? কোথায় তার রেলস্টেশন আর অ্যানিমাল রেসকিউ সেন্টার ? মিনিস্কাই বা কোথায় ? পায়ের নীচে শুধুই বরফে ঢাকা পৃথিবী। বরফের স্তূপ ভেঙে সারিবদ্ধভাবে হেঁটে চলেছে জনা কুড়ি নারী-পুরুষ। এত উঁচু থেকে ওদের ঠিক পুতুলের মতো দেখাচ্ছে।

    এই পৃথিবী থেকেই আমরা সময়ের আরেক গ্রন্থিতে বিচ্যুত হয়েছিলাম। এটাই আমাদের চেনা পৃথিবী। ওই পশুচর্মে আবৃত মানুষগুলিও আমাদের খুব চেনা। ওই যে ওরা আকাশের দিকে মুখ তুলে আমাদের দেখছে। বরফের ওপরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ছে। মাথা ঝুঁকিয়ে আমাদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

    আজ ওরা নিজেদের গুহায় ফিরে গিয়ে পাথরের দেয়ালে অঙ্গার দিয়ে ড্রাগন আর মায়া বাজপাখির ছবি আঁকবে। সেই ছবি ভবিষ্যতের জন্যে থেকে যাবে, কিন্তু আমরা থাকব না৷

    ⤶
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরহস্যে ঘেরা হিমালয় – অনিরুদ্ধ সরকার
    Next Article দাঁড়াও সময় (কাব্যগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার

    Related Articles

    সৈকত মুখোপাধ্যায়

    খেলার নাম খুন – সৈকত মুখোপাধ্যায়

    January 5, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }