নিহিত পাতালছায়া – রোহন রায়
১৯৯৪
নর্দমা?’ আকাশ থেকে পড়লেন বঙ্কিম দত্ত, ‘মানে? আপনার কি মাথা খারাপ না কি? সাতসকালেই নেশা করেছেন?’
‘নেশা করেছি?” গণেশ মিত্তির রেগেমেগে খপ করে বঙ্কিমবাবুর হাত চেপে ধরলেন। তারপর তাঁকে টেনে দত্তভিলার পশ্চিমদিকের পাঁচিলের সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘আপনি তো নেশা করেননি। তাহলে বলুন, কোথায় গেল আমার নর্দমা?”
বঙ্কিমবাবু ভয়াক ঘাবড়ে গেলেন। দুই বাড়ির সীমানায় একটা সরু নর্দমা ছিল, সেটা ঠিক। আজ নর্দমাটা দেখা যাচ্ছে না, তাতেও কোনও ভুল নেই। কী আশ্চর্য! নর্দমা কি পক্ষীরাজ হয়ে উড়ে গেল? আমতা আমতা করে বঙ্কিমবাবু বললেন, “আমি কী করে জানব নর্দমা কোথায় গেল? আমি কি আপনার নর্দমা তুলে নিয়ে গিয়ে আলমারিতে রেখে দিয়েছি?’
‘কমেডি করবেন না! নর্দমা অবধি আমার জমি। দলিলে সীমানা স্পষ্ট করে মার্ক করা আছে। আপনার দেওয়াল এই পর্যন্ত এল কী করে? অ্যাঁ !”
‘কী মুশকিল! আমি বাড়ির দেওয়াল চওড়া করলে আপনি টের পেতেন না? ভাঙাভাঙি হতো না?’
‘আপনার স্ত্রী-র কাণ্ডকারখানা আমি জানি না ভেবেছেন?’ গণেশ মিত্তিরের ব্যাঁকা মুখটা জিঘাংসায় আরও বেঁকে গেল, ‘আমার মুখ খোলাবেন না। দেওয়াল পিছোনোর ব্যবস্থা করুন। আপনি এলাকার গণ্যমান্য মানুষ বলে ভদ্রভাবে বলছি। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আদালতে যাব, এই বলে দিলাম।’
গজগজ করতে করতে গণেশ মিত্তির’ চলে গেলেন। বঙ্কিমবাবু বেকুবের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর স্খলিত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পূর্বদিকের সীমানা-পাঁচিলের কাছে এলেন। এসেই বুকে আরেকবার ভূমিকম্প অনুভব করলেন।
কোনও সন্দেহ নেই, বাড়ির দেওয়াল এদিকেও বেড়েছে। এই ল্যাম্পপোস্টটা থেকে অন্তত চার-পাঁচ ইঞ্চি দূরত্বে শুরু হয়েছিল দত্তভিলার পাঁচিল। এখন একেবারে ঘাড়ে উঠে পড়েছে।
পচা ভাদ্রমাস। তবু একটা শীতল বাতাস বয়ে এল কোত্থেকে। বঙ্কিমবাবুর হাতপা কাঁপতে শুরু করল।
এই পূর্বদিকের দোতলায় মৃণালিনীর ঘর। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছিল। না-তাকিয়েও
তিনি জানেন মৃণালিনী এখন জানলায় এসে দাঁড়িয়েছে, চেয়ে আছে তাঁরই দিকে। আর তার ঠোঁটে ঝুলে আছে একটা গা-শিরশিরে হাসি।
2024
1
দরজা খুলে তন্ময়কে দেখে একটু বিরক্তই হয়েছিল সুমন্ত। বিরক্তিটা চার-ডবল হয়ে গেল, যখন সোফায় বসে তন্ময় বলল, ‘আমাদের বাড়িটা ভালো না, জানিস তো?” তন্ময়দের বাড়িতে যে কিছু-একটা গন্ডগোল আছে, সে কথা কাটোয়ার পাবনা কলোনি অঞ্চলের সকলেই জানে। শোনা যায়, ও-বাড়িতে কয়েকটা রহস্যময় মৃত্যু ঘটেছে। তন্ময়ের ঠাকুমা নাকি সুইসাইড করেছিলেন। তন্ময়ের দাদু বঙ্কিম দত্ত কাটোয়ার নামী সমাজসেবী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুটাও নাকি খুব একটা স্বাভাবিক নয়। সুমন্ত অবশ্য এ-তল্লাটের পুরোনো বাসিন্দা না। বাবার বদলির সূত্রে উচ্চ মাধ্যমিকের সময় থেকে এখানে। ফলে সব গল্প সে জানে না।
তন্ময়ের সঙ্গে তার আলাপ ইলেভেনের বাংলা কোচিংয়ে। তারপর অনেকদিন সেভাবে যোগাযোগ ছিল না। বছরখানেক হল তন্ময় খানিকটা গায়ে পড়েই যোগাযোগ রাখছে। সুমন্ত ভিতর থেকে সেরকম সাড়া পায় না, আবার ঠিক কাটাতেও পারে না৷ আসলে ঘাঁটা মাল হলেও তন্ময় এমনিতে ছেলে ভালো। নিরীহ, ভদ্র, বিনয়ী। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, গত কয়েক মাসে সামনাসামনি এবং ফোন মিলিয়ে অন্তত তিরিশবার তন্ময় এই একই কথা বলেছে। একই শব্দযোজনা। একই অন্বয়। আজও সেই একই হ্যাজ শুনতে হবে নাকি? বিরক্তি গোপন করে সুমন্ত বলল, ‘আবার কী হয়েছে? তন্ময় ফোঁস করে .একটা শ্বাস ছাড়ল, ‘বাড়িটা জ্যান্ত, বুঝলি? কনশাস। বাড়িটা
চায় না আমি ওকে ছেড়ে চলে যাই।’
‘এতটা কনশাস?’
বক্রোক্তিটা ধরতে পারল না তন্ময়, ‘হ্যাঁ রে। আমি যে জীবনে কিছু করতে পারলাম না, তার জন্য এই বাড়িই দায়ী। তোকে তো বলেছি সব। অনেক চেষ্টা করেও
অন্য কোথাও উঠে যেতে পারছি না। বাড়ি বিক্রি করার চেষ্টা করলেও ভেস্তে যায়। তন্ময়ের জীবন এইরকম হবার কথা ছিল না সেটা ঠিক। শ্যাওড়াফুলি স্টেশনের কাছে একটা কোচিং সেন্টারে ইতিহাস পড়ায়। সঙ্গে কলেজ স্ট্রিটের কোনও এক সেজোমাপের পাবলিকেশনে ডিটিপি, লে-আউটের কাজ করে। অথচ প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাসও ছিল। কেরিয়ারের এহেন শনির দশা কাম্য ছিল না ঠিকই, কিন্তু তার জন্য তন্ময় বাড়িটাকে কেন দায়ী করে কে জানে। আসলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না-মেলায়, ছেলেটার ভিতরের ম্যাগনেটিক ফিল্ডটা বোধহয় চটকে একেবারে চাটনি হয়ে গেছে।
তাছাড়া তন্ময় একেবারেই একা। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে। বড় হয়েছে পিসির কাছে। সেই পিসিও গত বছর মারা গেলেন। দু-বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। মাসকয়েক আগে মেয়েটা হুট করে ডিভোর্স ফাইল করে বসল। আপাতত ছ-মাসের সেপারেশন চলছে। যতই লাভ ম্যারেজ হোক, একটা এস্টাবলিশড মেয়ে এই
প্রোফাইলের একটা ছেলের সঙ্গে পড়ে থাকবে কেন? তন্ময় আগেই তারকাটা ছিল। বিয়ে ভাঙার পর থেকে ফিউজ একেবারেই উড়ে গেছে। কিন্তু এখন এই বাড়ি নিয়ে বারমাস্যা শোনার কোনও ইচ্ছে সুমন্তর নেই। হাই তুলে সে বলল, ‘এখন ঠিক কী সমস্যা হচ্ছে সেটা বল।’
তন্ময় ঢোঁক গিলল। যেন খুব কঠিন কিছুর প্রস্তুতি নিল মনে মনে। তারপর চাপা গলায় বলল, ‘আমাদের বাড়িটা বড় হচ্ছে, বুঝলি!’
মানে?” সুমন্তর আরও একটা হাই আসছিল। মাঝপথে আটকে গেল সেটা, ‘বড় হচ্ছে?
‘লম্বায়-চওড়ায় তিন-চার ইঞ্চি করে বেড়ে যাচ্ছে।”
সুমন্ত খর চোখে আপাদমস্তক মাপল তন্ময়কে, ‘কী নেশা করছিস বল তো আজকাল ? ’
‘বিশ্বাস কর, পার্থবাবুর ছেলের ঘর আর আমার ঘর একই লেভেলে ছিল। জানলার কাছে এগিয়ে গেলে তবে ওদের সানশেড চোখে পড়ত। আজ দেখি উলটোদিকের দেওয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে ওদের সানশেড দেখতে পাচ্ছি। আমাদের জানলাটা কিছুটা এগিয়েও গেছে ওদের জানলার দিকে।
‘ফালতু বকা বন্ধ করবি?’
‘সত্যি রে!’ উত্তেজিত গলায় তন্ময় বলল, ‘প্রতি দশ বছর অন্তর এটা ঘটে, আর সেই বছরই বাড়িতে একটা করে মৃত্যু হয়। একই প্যাটার্ন। মৃত্যুর ঠিক তিন-চার মাস আগে থেকে কালো কালো তিলের মতো গুটি বেরোতে শুরু করে। কিছুদিন পর থেকে শুরু হয় মারাত্মক জ্বালাপোড়া। প্রচণ্ড যন্ত্রণা সহ্য করে করে অবশেষে মৃত্যু চুরানব্বই সালে আমার দাদু, দুহাজার চারে ছোটদাদু, দু’হাজার চোদ্দয় জ্যাঠা। তারপর এই দু’হাজার চব্বিশ। এ-বছরও বাড়ি বাড়ছে। এ-বছরও একটা মৃত্যু হবে। তা আমি ছাড়া মরবার মতো আর আছেটাই বা কে?’
সুমন্ত কী বলবে বুঝতে পারছিল না। একইসঙ্গে বিরক্তও লাগছে, আবার ছেলেটার এই হাল দেখে খারাপও লাগছে। তন্ময়ের নিঃসন্দেহে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দরকার। আপাতত কোনওভাবে ঠেকনা দেওয়া যাক। সুমন্ত উঠে দাঁড়াল, ‘চল, তোদের বাড়িটা দেখে আসি।’
শিউরে উঠল তন্ময়, ‘না না, একদম না। তোরও অভিশাপ লেগে যাবে।’ ‘না গেলে বুঝব কী করে তুই ঠিক দেখেছিস কিনা? ‘
—ভুল দেখব কেন? বলছি না, বাড়িটা প্রতি দশ বছর অন্তর বাড়ে। শেষবার যখন বেড়েছিল, জ্যাঠা, জেঠিমা, পিসি সবাই বেঁচে। সবাই দেখেছে। জ্যাঠা পুরুত ডেকে শান্তি-স্বস্ত্যয়ন করিয়েছিলেন। লাভ হয়নি। দিনকয়েক পরেই জ্যাঠা মারা যান। ওই একইভাবে।’ বলে একটু থামল তন্ময়। চোয়াল আরও একটু ঝুলে পড়ল তার, ‘আসলে এই সবকিছুর জন্য দায়ী আমার ঠাকুমা।’
‘কেন ? ’
‘ঠাকুমা সুইসাইড করেছিলেন, বলেছিলাম তো তোকে। আলমারির গায়ে বেরিয়ে থাকা একটা পেরেকে কপাল ঠুকে।’ আঙুল দিয়ে কপাল ছুঁল তন্ময়, ‘বুঝলি তো? অনেকবার কপাল ঠুকেছিলেন। তারপর সারারাত ধরে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যান। ওইটা
ব্ল্যাক ম্যাজিকের একটা পার্ট ছিল।’
‘ব্ল্যাক ম্যাজিকের ব্যাপারটা এত শিওর হচ্ছিস কী করে?’ ‘মরার পর ঠাকুমার আলমারি খুলে কী কী পাওয়া গেছিল জানিস? এক কৌটো সিঁদুর মাখানো চাল, মানুষের পায়ের একটা ফিবুলা হাড়, একটা কাকের পালক, সঙ্গে ওই ঘরের দেওয়াল থেকে খুলে নেওয়া একটা ইট। আর মরার সময় ঠাকুমার বড়ির চারপাশে ছড়ানো ছিল কালো তিল।’
‘অ্যাঁ।’
ঠান্ডা গলায় তন্ময় ধীরে ধীরে বলল, ‘এগুলো কীসের কাজে লাগে জানিস সুমন্ত ? ’
2
সুমন্তর ফ্ল্যাট থেকে তন্ময়ের বাড়ি বাইকে লাগে মিনিট পনেরো। বাইক থেকে নেমে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটাকে ভালো করে দেখল সুমন্ত। একটু একটু করে ধ্বংসের পথে এগোনো এক বনেদি বাড়ি। আর দশ বছর পর এ-বাড়িকে ‘বিপজ্জনক’ ঘোষণা করে দিলে অবাক হবার কিছু নেই।
বাড়িটাকে সুমন্ত এতদিন বাইরে থেকেই দেখেছে। ভিতরে যাবার মতো ঘনিষ্ঠতা ছিল না কোনওকালেই। আজ ভিতরে ঢুকল, আর ঢুকতেই অদ্ভুত একটা দমচাপা ভাব টের পেল। মনে হল, একটা অস্বস্তির জোনে ঢুকে পড়েছে। সেটা অবশ্য তন্ময়ের আষাঢ়ে গল্প শোনার ফল হতে পারে। সুমন্ত যদিও গল্পগুলো সিরিয়াসলি নেয়নি। তবু এই করিডরে ঢুকে হালকা বুক-ঢিপঢিপ টের পেল সে৷
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে প্রথমে বাঁদিকের দ্বিতীয় ঘরটায় ঢুকল তন্ময়। বলল, ‘এই যে এইটা ঠাকুমার ঘর।
খুব বেশি হলে দশ বাই দশ একটা ঘর। দেওয়ালের প্লাস্টার খসে খসে পড়ে বিভিন্ন মহাদেশের ম্যাপের আকার নিয়েছে। ঝুল জমেছে এখানে-সেখানে। আসবাব বলতে ঘরের কোণে একটা মাঝারি মাপের কাঠের আলমারি। সুমন্ত অবাক হল, ‘এটাই সেই আলমারি নাকি?
‘হ্যাঁ।’
‘সে কী! এখনও রেখে দিয়েছিস?’
‘অনেক চেষ্টা করেও নড়ানো যায়নি। আলমারিটা শিকড় গেড়ে দিয়েছে এ-ঘরে। ‘ভিতরের জিনিসগুলো?’
‘সেগুলো ফেলা গেছে৷’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্ষীণ হয়ে আসা টিউবলাইটটার দিকে তাকাল সুমন্ত, ‘আলোটা পাল্টাসনি কেন?’
‘অনেকবার পাল্টেছি ভাই। নতুন দামি আলো কিনে এনে লাগানো মাত্র এরকম হয়ে যায়। লাইনে কোনও গোলমাল নেই। কোনও ইলেক্ট্রিসিয়ান এর রহস্য উদ্ধার করতে পারে না।’
‘বাড়িটাও তো সারানো হয়নি বহুকাল। থাকিস কী করে ?
‘কী করব! সারাতে গেলে কিছু-না-কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। বলছি না, বাড়িটা নিজের
মর্জিমাফিক চলে।’
‘ঝুলগুলো তো একটু ঝাড়তে পারিস। নাকি ঝুল ঝাড়তে গেলেও দুর্ঘটনা ঘটে?’ বলতে বলতে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল সুমন্ত। পেরেকটা তার চোখে পড়েছে। মৃণালিনী এই পেরেকেই কপাল ঠুকে মরেছিলেন। কথাটা মনে পড়তেই সুমন্তর একটু গা-ছমছম করে উঠল। মাথা-বাঁকানো পেরেকটা অন্তত ইঞ্চিখানেক লম্বা এবং খয়েরি। মরচে? নাকি তিরিশ বছর আগের রক্ত শুকিয়ে আছে? সুমন্ত উবু হয়ে বসল। মাঝারি মাপের একজন মানুষ হাঁটু গেড়ে বসলে পেরেকটা তার কপাল বরাবরই আসছে বটে। কী ভয়ানক মৃত্যু। বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না সে !
এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে হঠাৎ আলমারির পিছনের পায়ার দিকে চোখ যেতেই আঁতকে উঠল সুমন্ত। ব্যাঙের মতো লাফিয়ে সরে এল কিছুটা, ‘ওটা কী?’ তন্ময়ও চমকেছে, “কোনটা ? ’
‘আলমারির নীচে কী একটা বেরিয়ে আছে ওটা?’ সুমন্ত কাঁপা কাঁপা হাত তুলে আঙুল দেখাল।
তন্ময় থমথমে গলায় বলল, ‘ওটা আলমারিটার শিকড়।’
‘শিকড়?’ সুমন্ত হাঁ।
‘হ্যাঁ। তোকে তো বললাম, আলমারিটা এই ঘরে শিকড় গেড়ে দিয়েছে।’ ওটা তাহলে নেহাত কথার কথা নয়? তার মানে কি তন্ময়ের প্রত্যেকটা কথা সত্যি? এ-বাড়িতে সত্যিই এইসব অশৈলী কাণ্ড ঘটছে?
সুমন্ত পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল। ধরা গলায় বলল, ‘শোন, একজন আছেন যিনি তোকে সাহায্য করতে পারেন।’
3
‘এক্স মেন সিরিজের সিনেমাগুলো দেখেছিস তো?’ সুমন্তর কলেজের বন্ধু এবং
ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির বটানির অধ্যাপক-গবেষক অভিজিৎ বলেছিল, ‘মেয়েটা পুরো প্রোফেসর চার্লস জেভিয়ার্স লাইট ভার্সন। ‘
সুমন্ত অবাক হয়েছিল, ‘হ্যাট! টেলিপ্যাথি বলে কিছু হয় নাকি ?
অভিজিৎ তখন সবিস্তারে বলেছিল মন্ত্রপূত কাওন-বীজের প্রভাবে কোমায় চলে যাওয়া বিজ্ঞানীদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার গল্প। মেডিকেল সায়েন্স যেখানে হাত তুলে নিয়েছিল, সেখানে বিস্ময়তরুণীটি কীভাবে রোগীর মস্তিষ্কে হানা দিয়ে খুলে দিয়েছিল অনির্দেশ্য তালা—শুনে পুরো ব্যোমকে গেছিল সুমন্ত।
পারলে এই মেয়েটাই পারবে। বাড়ি ফিরেই অভিজিতের থেকে অন্বেষা রয়ের নম্বর নিয়ে ফোন করল সুমন্ত। অভিজিতের রেফারেন্স আর নিজের পরিচয় দিয়ে পুরো বিষয়টা খুলে বলল।
সব শুনে অন্বেষা ক্যাজুয়াল গলায় বলল, ‘দেখুন, আমার মনে হয় আপনাদের একজন ওঝা দরকার।’
‘কিন্তু আপনি তো ব্রেন ডিকোড করতে পারেন।’
‘মানুষের পারি। বাড়ির ব্রেন ডিকোড করতে পারব না। কারণ বাড়ির ব্রেন হয়
না।’
‘কিন্তু যদি কোনও কালোজাদু এই বাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার পিছনেও তো কোনও চিন্তার তরঙ্গই কাজ করছে।’ সুমন্ত মরিয়া হয়ে বলল, ‘সেটাও তো কোনও মানুষেরই ব্রেনওয়েভ। তাই না? আপনি সেটাকে ডিকোড করতে পারবেন নিশ্চয়ই।” ‘সুমন্তবাবু, আপনি যার কথা বলছেন সেই মানুষটা এখন মৃত। পাস্ট টেন্স।” ‘কিন্তু তাঁর জাদুশক্তি তো এখনও প্রবলরকম প্রেজেন্ট টেন্স, ম্যাডাম। হতেও তো
পারে, আপনি সেটা হ্যাক করতে পারলেন। সমাধান না-ই বা পেলাম, অন্তত এটুকু তো জানা দরকার যে বিষয়টা ঠিক কী এবং কেন হচ্ছে।’
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে অন্বেষা বলল, “ঠিক আছে, আপনাকে বিকেলের মধ্যে জানাচ্ছি।’
কণ্ঠস্বরে যতটা গলবস্ত্র হওয়া সম্ভব ততটা হল সুমন্ত, ‘একটু দেখুন প্লিজ। একটা নিরীহ ছেলে বেঁচে যায় তাহলে।’
8
পরদিন সকালে অন্বেষা রয়ের ট্যাক্সি যখন দত্তভিলার সামনে এসে দাঁড়াল, ঘড়িতে তখন পৌনে এগারোটা। সুমন্ত আর তন্ময় বাড়ির গেটের সামনে অপেক্ষা করছিল। সুমন্ত ভাবেনি মেয়েটা এতটা ছোট। বয়স মেরেকেটে পঁচিশ-ছাব্বিশ। পরনে একটা হলুদ লং কুর্তা আর সাদা প্লাজো। রোগা, শ্যামবর্ণ, গড়পড়তা চেহারার মেয়েটার চোখদুটো অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল।
নমস্কার-প্রতিনমস্কারের পালা সেরে তন্ময়কে ভালো করে লক্ষ্য করল অন্বেষা। ক্ষয়াটে চেহারা। কোটরাগত নিস্তেজ চোখ। নোনা-ধরা ভাবভঙ্গি। সম্ভবত গভীর হতাশাগ্রস্ত। বাড়িটাও তন্ময়ের মতোই। অভিজাত স্ট্রাকচার, কিন্তু ছাতা-পড়া। একসময় গাঢ় লাল রং ছিল বোধহয়। এখন সিমেন্ট খসে এখানে-ওখানে দাঁত খিঁচিয়ে আছে কানিভাঙা ইট। বাড়ির মানুষজন ভালো না-থাকলে সেটা বাড়ির সর্বাঙ্গে ধরা পড়ে। এটা একটা অসুখী বাড়ি। প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটরদের ভাষায়, নেগেটিভ এনার্জিতে ভরপুর।
সুমন্ত অন্বেষাকে গাইড করে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই অন্বেষার মনে হল, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ যেন এক লাফে আচমকা বেড়ে গেছে। করিডর থেকে সিঁড়ি সর্বত্রই একটা ভিজে ভিজে ভাব। মৃণালিনীর ঘরে ভিজে ভাবটা সবচেয়ে বেশি। ঘরের কোণে সেই আলমারি, যার গায়ের পেরেকে মাথা ঠুকে মহিলা আত্মহত্যা করেছিলেন। সুমন্তর কথা অনুযায়ী এই আলমারির শিকড় আছে। অন্বেষা আলমারিটার দিকে এগিয়ে গেল। হাঁটু মুড়ে বসে পেরেকটাকে দেখল অনেকক্ষণ ধরে। তারপর নিচু হয়ে আলমারির পায়াগুলো পরীক্ষা করল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘শিকড় দেখতে পেলাম না তো।’
যাবে।’ ‘সবসময় দেখা যায় না,’ ঘাড় নাড়ল তন্ময়, ‘যখন ওর মর্জি হবে তখন দেখা
‘বেশ,’ উঠে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে প্লাজো ঝাড়ল অন্বেষা, ‘আপনার ঠাকুমার ব্যাপারে কিছু কথা সুমন্তবাবুর থেকে শুনেছি। বাকিটা আপনার থেকে শুনব।’
তন্ময় একটু থেমে বলল, ‘ঠাকুমার স্মৃতি আমার নেই বললেই চলে। আমার তিন বছর বয়েসে ঠাকুমা মারা যান। তার ওপর বেশিরভাগ সময়েই তাঁকে ঘরে আটকে
রাখতে হতো৷ আমি তাঁকে দেখেছি খুবই কম। শুনেছি আমার বাবা ছাড়া বাড়ির কাউকেই তিনি সহ্য করতে পারতেন না।’
মিনিট দশেক তন্ময়কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানারকম প্রশ্ন করে অন্বেষা আসল কাজের জন্য তৈরি হল।
এই ঘরে বসার ব্যবস্থা নেই। তন্ময় চাইছিল অন্বেষা অন্য কোনও ঘরে বসুক। কিন্তু এই ঘরটা মৃণালিনীর ঘর ছিল বলে অন্বেষা এ-ঘরেই বসতে চাইল। তন্ময় একটা চেয়ার এনে দিল। চেয়ারে বসে চোখ বুজে রগে তর্জনী ছোঁয়াল অন্বেষা। মনোযোগকে নিয়ে এল দুই ভুরুর সানুদেশে। তার মন বলছে গোটা বাড়ি নয়, দোতলার পূর্বমুখী এই ঘরটাই পাখির চোখ। কালো জাদু বা তন্ত্রমন্ত্রের প্রয়োগ যা-কিছুই থাকুক না কেন, এখান থেকেই হয়েছে।
অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠল কালচে খয়েরি শিকড়ের ঝাড়। এরা কি মৃণালিনীর মৃত মস্তিষ্কের নিষ্ক্রিয় নিউরাল পাথওয়ে? কে জানে। অন্বেষার কাছে এ-একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। একজন মৃত মানুষের চিন্তার জগতে অনুপ্রবেশ করছে সে। জীবিত মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ম এখানে খাটবে কি? শিকড়ের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মনোযোগ ছুটল আলোর বেগে।
তিন-চার সেকেন্ড পরেই অন্বেষা নিজেকে আবিষ্কার করল দত্তভিলার সামনে। অতীত নয়, এ এখনকারই দত্তভিলা। চারপাশ ছোটবেলার সাদা-কালো টিভির মতো ঝাপসা আর ঘষে-যাওয়া। আকাশসহ সবটাই কেমন লালচে দেখাচ্ছে। গোটা চরাচর যেন তরল ফরমালিনের মধ্যে ভাসছে। অনিয়মিত ছন্দে ঈষৎ কাঁপছে মাঝে মাঝে। অদ্ভুত কিছু শব্দ কানে আসছে। স্কুবা ডাইভ করার সময় জলের তলায় এই ধরনের শব্দ পাওয়া যায়।
মাঝে মাঝে এদিকে-সেদিকে ফুটে উঠছে লাল দগদগে ক্ষতমুখ। যেন অ্যাসিডে পুড়ে যাচ্ছে একেকটা জায়গা, পরক্ষণেই কেউ রবার দিয়ে মুছে দিচ্ছে তার চিহ্ন। অন্বেষা চমকাল না। এরকম নানারকম পিলে-চমকানো দৃশ্যকল্প তৈরি হবে। কারণ ভদ্রমহিলা এখন অতীত, তদুপরি ডাকিনীবিদ্যা-বিশারদ। গেট ঠেলে অন্বেষা পা বাড়াল দত্তভিলার ভিতরে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁ-দিকের দ্বিতীয় ঘর। সেই আলমারি এখন চৌখুপি মেঝের ওপর এলোমেলো শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেন একটা পূর্ণবয়স্ক গাছ। আর তার সামনেই এক মহিলা দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছেন। অন্বেষার দিকে তার পিঠ। পরনে ফিরোজা রঙের শাড়ি। লম্বা খোলা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠের ওপর। তাকে ঘিরে ত্রিভুজ-প্যাটার্নে শায়িত সাদা কাপড়ে ঢাকা তিনটি দেহ। প্রতিটা দেহের বুক বরাবর ছড়ানো রয়েছে মুঠোপরিমাণ কালো তিল। অন্বেষা একটু থমকে গেল। এঁরাই কি দত্তভিলার অভিশপ্ত তিন পুরুষ ?
কোথাও থেকে একটা হিসহিসে শব্দ হল। ঠিক তখনই মাথা তুললেন মৃণালিনী। ঘাড় ঘোরালেন ধীরে ধীরে। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। ঘোলাটে চোখের সীমানা বরাবর ধেবড়ে-যাওয়া কাজল। নীরক্ত ঠোঁটে পাতলা হাসি ঝুলছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সম্পূৰ্ণ অপ্রকৃতিস্থ।
অন্বেষা দু-পা পিছিয়ে এল। চিন্তার তরঙ্গ দিয়ে কি যোগাযোগ করা যাবে এঁর
সঙ্গে ? মনঃসংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করল অন্বেষা। মৃণালিনী কিছু টের পেলেন কিনা কে জানে, ডান হাতের তর্জনী তুলে ধরে বিড়বিড় করে কীসব বলতে বলতে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর এগিয়ে এলেন তার দিকে। অন্বেষার মনে হল তার হৃদপিণ্ডও যেন খুব ধীরে ধীরে গলার কাছে উঠে আসছে।
মৃণালিনী তার হাতখানেক দূরত্বে এসে দাঁড়ালেন। অন্বেষা খেয়াল করল, তার কপালের মধ্যিখান বরাবর পাশাপাশি ছোট ছোট কয়েকটা ফুটো। তাদের গা ঘেঁষে রক্ত শুকিয়ে আছে। পেরেকে বেশ কয়েকবার কপাল ঠুকে মরেছিলেন। সেইসব ফুটো। মহিলার চোখে সদ্য খোলস ছাড়া সাপের মতো মসৃণ, অথচ অস্বস্তিকর দৃষ্টি। তার মধ্যেই উঁকি দিচ্ছে একটু কৌতুকমেশানো কৌতূহল। তবে উনি কি যোগাযোগে সাড়া দিতে চাইছেন? একবার পরখ করে দেখা যাক।
অন্বেষা মনে মনে বলল, ‘বাড়িটা বড় হচ্ছে কেন?’
মৃণালিনী দত্তের চোখের পাতা নড়ে উঠল। পরক্ষণেই সাপের মতো হিসহিসে এক কণ্ঠ বেজে উঠল অন্বেষার মাথার ভিতর, ‘বিষ। অনেক বিষ জমে আছে।’ ‘কীসের বিষ? আপনি কী চান? কেন এসব করছেন ? জবাব এল না। মৃণালিনীর চোখে একটা যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছে৷ অন্বেষা
দেখল, তার সাদা ব্লাউজের হাতায় চাপ চাপ রক্ত ফুটে উঠছে।
কী হচ্ছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রহস্যময় শক্তির অধিকারী এই মহিলা তাকে নিজের চেতনার গর্ভে কতক্ষণ থাকতে দেবেন সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। অন্বেষা আবার বলল, ‘তন্ময়কে কি আপনি মেরে ফেলবেন? ও তো আপনার নাতি। আপনার মনে কি একটুও মায়ামমতা নেই?’
এবারেও মৃণালিনী জবাব দিলেন না। মোচড়ানো ফুলের ভাঙা ডাঁটির মতো একদিকে হেলে পড়ল তার ঘাড়। অন্বেষাকে দেখছেন তিনি। পড়ার চেষ্টা করছেন। একেকটা মুহূর্ত পেরোচ্ছে একেকটা জন্মের মতো। চারপাশের লালচে ভাব বেড়ে উঠছে ক্রমশ। চেয়ে থাকতে থাকতে অন্বেষার মনোযোগ বোধহয় সামান্য টলে গিয়েছিল। কৌতুকমাখা চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা খলখল করে হেসে উঠলেন মৃণালিনী। তারপর এক লাফে একেবারে সামনে এসে পড়ে তর্জনী দিয়ে অন্বেষার কপালের ঠিক মাঝখানটা মৃদু একটা ঠেলা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাগলাঘণ্টি বেজে উঠল তারস্বরে। দুলে উঠল চারপাশ। অন্বেষাকে কে যেন ঠেলে ফেলে দিল একটা ব্ল্যাকহোলের মধ্যে।
ওপর। চোখ খুলে অন্বেষা দেখল, সুমন্ত আর তন্ময় উদ্বিগ্ন মুখে ঝুঁকে আছে তার
কয়েক মুহূর্ত পেশিগুলোকে আলগা দিয়ে বসে রইল অন্বেষা। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাইরে চলুন তো।’
উল্টোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে অন্বেষা বেশ খানিকক্ষণ ধরে বাড়িটাকে দেখল। ডানপাশের গলি ধরে বাড়ির পিছনদিকেও গেল একবার। ফিরে এসে সুমন্তকে বলল, ‘সুমন্তবাবু, আপনি ফিজিক্স পড়ান বললেন না? বেলুন ফোলানোর নিয়মটা কি বয়েলের সূত্রের আন্ডারে আসছে?’
‘বেলুন?” একটু ভড়কে গেল সুমন্ত, ‘হ্যাঁ। কিন্তু কেন বলুন তো?
“অনেক বিষ জমে আছে,’ আপনমনে বিড়বিড় করল অন্বেষা, কথাটার মানে কী? কীসের বিষ ! ‘
সুমন্ত আর তন্ময় পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপর। ছায়ারা গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে পড়ছে যার যার
নিজস্ব অবলম্বনের পায়ে। কয়েক পা এগিয়ে একটা গাছের তলায় গিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল অন্বেষা৷ কপালে ভাঁজ। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট পুড়ে পুড়ে বেঁটে হচ্ছে । গল্পটায় কোথাও একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। মৃণালিনী দত্ত আত্মহত্যা করেছিলেন একুশে জুন রাতে। দক্ষিণ গোলার্ধের দীর্ঘতম রাত। নিজের প্রাণের মূল্যে এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ তিনি বুনে গেছেন, যে-অভিশাপ ফরমালিনের মতো লালচে এক দুনিয়ার গর্ভ থেকে সিংহিকা রাক্ষসীর মতো দত্তবংশের ছায়া টেনে ধরে বসে আছে। গোটা বাড়িকে ছারখার না করে সে থামতে চায় না। কিন্তু আগুন জ্বলার আগে কেরোসিন মজুত করার কোনও ইতিহাস নেই, তা তো হতে পারে না। আরও বড় কোনও রহস্য কি তবে ঝাঁপিবন্ধ হয়ে পড়ে আছে এই দত্তভিলায় ?
মিনিট দুয়েক পর সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে অন্বেষা তন্ময়কে বলল, ‘এ-বাড়ির বয়স্ক কেউ বেঁচে আছেন যিনি আপনার দাদু-ঠাকুমার সময় ছিলেন?’ ‘আমার পিসিদিদা। দাদুদের একমাত্র বোন। দমদমে থাকেন।’
“ঠিকানাটা দিন তো।’
5
তন্ময়ের পিসিদিদা নব্বই ছাড়িয়েছেন। পুঁটলির মতো পড়ে আছেন বিছানার এককোণে। মোটা মোটা কাচের ওপারে চোখদুটো গয়টার-রোগীর মতো বিস্ফারিত দেখাচ্ছে। জুলজুল করে বেশ খানিকক্ষণ অন্বেষাকে মাপলেন। তাঁর সঙ্গেও যে কেউ দেখা করতে চাইতে পারে, তা-ও সম্পূর্ণ অনাত্মীয় কেউ, এ বোধহয় তাঁর ভাবনার অতীত। ঠোঁট কামড়াল অন্বেষা। ইনি কি আদৌ সেভাবে সাহায্য করতে পারবেন? এত বয়েসে স্মৃতি সাধারণত ঠিকঠাক কাজ করে না। নিজের পরিচয় দিয়ে অন্বেষা বলল,
‘আপনার বড়দাদার মৃত্যুটা কি সত্যিই অস্বাভাবিক ছিল?’
বৃদ্ধাকে বিশেষ ভাবতে হল না। খ্যানখ্যানে গলায় বললেন, ‘ডাইনিটাই তো মেরে ফেলেছিল দাদাকে।
‘আপনি নিশ্চিত? আপনি তো তখন সেখানে ছিলেন না৷’
“ছিলাম না তো কী? ডাইনির কীর্তি সবাই জানে। গোটা বাড়িটাকে জাদুটোনা করে দিয়েছে। মরেও ঘাড় থেকে নামল না। দাদাকে খেল, ছোড়দাকে খেল, সুকুকে খেল। তা-ও আবাগীর বেটির খিদে মেটেনি। আমাদের গোটা বংশ নির্বংশ না করে ছাড়বে না।’
‘আপনারা কি শুরু থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন উনি এরকম ভয়ঙ্কর মানুষ?’ ‘না না, শুরুতে অমন ছিল না। ভিতু ভিতু নজর। মিষ্টি হাসি। সুন্দর কথাবাত্রা। কী ভালো ব্যাভার। দেখে মনে হতো ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। আস্তে আস্তে নিজের চেহারায় এল।’
‘শুনেছি নাকি ওঁর চামড়া ফেটে রক্ত পড়ত?’
‘হ্যাঁ,’ উত্তেজনায় বৃদ্ধার গলা ঘষঘষে হয়ে এল, ‘ওরে বাবা, ওই দেখেই তো একদিন আমাদের খুড়িমা ভির্মি গেলেন। সেই থেকে কথাটা ছড়িয়ে পড়ল যে, বঙ্কিমের বউ ডাইনি।’
অন্বেষা চোখ সরু করে একটু ভাবল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, আপনার দাদা কি খুব রাগী মানুষ ছিলেন?’
‘একটুও না। অমন মাটির মানুষ হয় না। গোটা কালনার মানুষ একডাকে চিনত দাদাকে৷ এত বিদ্বান, এত পরোপকারী মানুষ, কাউকে উঁচু গলায় একটা কথা বলতেন না৷ সেইজন্যই তো ডাইনিটা মাথায় চড়ে বসল। ও-বউ এমন অলক্ষুণে যে বিয়ের সাতদিনের মাথায় দাদা ব্যবসায় বড় ধাক্কা খেয়েছিল। দাদা কিছু বলেনি। শুধু গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। আরেকবার তো ডাইনিটা দাদাকে আঁচড়ে-কামড়ে একশেষ করেছিল। দাদা তা-ও একটা রা কাড়েনি। শুধু তারপর থেকে ডাইনিটাকে একটা ঘরে আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
অন্বেষা হতভম্ব, ‘তারপর থেকে মানে? বাকি প্রায় পঁচিশ-তিরিশ বছর ওঁকে ঘরেই আটকে রাখা হয়েছিল?’
“হ্যাঁ।”
‘একটা কথা বলুন, এই আঁচড়ে-কামড়ে দেবার যে-গল্পটা বললেন সেটা কেন হয়েছিল? মানে, আপনার বউদি ওরকম আচরণ করলেন কেন?’
‘ডাইনির পেটে একটা মেয়ে এয়েছিল। সুকুরও আগে। দাদা ডাক্তার ডাকিয়ে সেটাকে ফেলা করিয়েছিল।’
‘কী বলছেন? আপনারা বঙ্কিমবাবুর এই কাজটাকে সমর্থন করেছিলেন?”
‘ওমা! ডাইনির পেটে আরেকটা ডাইনিই তো আসবে।’ অন্বেষা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। দেখার দোষে কোনও কোনও গল্পের ন্যারেটিভ পুরো উল্টো হয়ে যায়। এবার অনুমতি না-নিয়েই একটা কাজ করতে হবে। বৃদ্ধার দিকে খানিকক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইল অন্বেষা। তারপর চোখ বুজে রগে আঙুল ঠেকাল।
6
বেল বাজানোর প্রায় পঁচিশ সেকেন্ড পর দরজা খুলল এক তরুণী। কোঁকড়া চুল। আয়ত চোখ। বয়েস তিরিশের সীমান্তে হবে। কাজের ফাঁকে উঠতে হওয়ায় সম্ভবত একটু বিরক্ত, ‘কাকে চাই?’
অন্বেষা বলল, ‘আপনি শ্রেয়া দত্ত?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে আপনাকেই চাই। তন্ময় দত্ত আপনার এক্স হাজব্যান্ড তো? ‘
তরুণী অবাক হল, ‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো? ‘
অন্বেষা নিজের পরিচয় জানিয়ে বলল, ‘আপনার এক্স হাজব্যান্ডের বিষয়ে একটু কথা ছিল। অবশ্যই যদি আপনার আপত্তি না থাকে।’
শ্রেয়া কিছুক্ষণ ভেবে তারপর কোলাপসিবল গেট খুলে দরজা ছেড়ে দাঁড়াল, ‘আসুন।’
সোফায় বসে চায়ের অফার প্রত্যাখ্যান করে অন্বেষা সোজা প্রসঙ্গে চলে এল, ‘তন্ময়বাবু এলাকায় ভদ্র, নিরীহ ছেলে হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু মানুষ হিসেবে উনি ঠিক কেমন, সেটা সবচেয়ে ভালো বোধহয় আপনিই বলতে পারবেন।’ ম্লান চোখ তুলে তাকাল শ্রেয়া, ‘ওর সঙ্গে থাকা যায় না। ও একটা জানোয়ার।’
7
পরদিন দত্তভিলার বৈঠকখানায় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে অন্বেষা বলল, “আমরা আসলে ছয়কে নয় দেখছিলাম।’
সুমন্ত বলল, ‘ মানে?’
‘মানে পুরো বিষয়টা উল্টো করে দেখছিলাম। মৃণালিনী স্বাভাবিক ছিলেন না। ব্ল্যাক ম্যাজিক করতেন। ওঁর কারণেই এই বাড়ি অভিশপ্ত। ফলে ওঁকে ডাইনি বললে আপত্তি করা যায় না৷ কিন্তু এ-দুনিয়ায় কেউই ডাইনি হয়ে জন্মায় না সুমন্তবাবু। তাদের ডাইনি করে তোলা হয়।’
তন্ময়ের ভুরু কুঁচকে গেছে, ‘আপনি বলতে চাইছেন ঠাকুমাকে ডাইনি করে তোলা হয়েছিল?’
“আজ্ঞে।’
‘কে করেছিল?’
‘বাবু শ্রীযুক্ত বঙ্কিম দত্ত মহাশয়।’
তন্ময় প্রথমে অবাক হল। তারপরেই তেরিয়া ভঙ্গিতে বলল, “কী উল্টোপাল্টা বলছেন এসব? আপনি জানেন আমার দাদু এখানকার অত্যন্ত সম্মাননীয় মানুষ ছিলেন?’ “কিছু মানুষ চার দেওয়ালের ভিতর অন্যরকম হন, তন্ময়বাবু। তাছাড়া সব ভায়োলেন্স চোখে দেখা যায় না। আর যে-ভায়োলেন্সগুলো চোখে দেখা যায় না, সেগুলোই ভয়ঙ্করতম।’
‘আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন বলুন তো?’
‘ইটস আ কেস অব আইপিডি। ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক। মৃণালিনী যা-কিছু করেছেন, তার সম্পূর্ণ দায় ওঁর স্বামীর। পৃথিবীর সমস্ত শুভ জাদুর উৎস ভালোবাসা বা শুভকামনা, আর সমস্ত অশুভ জাদুর উৎস ঘৃণা, জুগুপ্সা, মাৎসর্য। আপনাদের এই বাড়ি অভিশপ্ত হয়েছে মৃণালিনীর তীব্র ঘৃণার কারণে, যার পিছনে রয়েছে অন্তত তিন দশকের দীর্ঘ গৃহহিংসার ইতিহাস।’ তন্ময় চটে গেল, ‘আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে?’
‘আমি কি চার্জশিট দিচ্ছি যে আপনি প্রমাণ চাইছেন?’ অন্বেষা কড়া গলায় বলল, ‘আপনি আমাকে ডেকে এনেছেন সত্যিটা খুঁজে বের করার জন্য। আমি সত্যিটা জানাচ্ছি মাত্র। বিয়ের সাতদিনের মাথায় স্বামীর ব্যবসার ক্ষতির জন্য মৃণালিনীকে দায়ী করা হল। বলা হল তিনি অলক্ষুণে। অ্যাকিউট হিমোফিলিয়া নামে একটা রোগে গায়ের রোমকূপ থেকে রক্ত বেরোয়। মৃণালিনীর সেই রোগ ছিল। মানসিক দোলাচল বাড়লে রোগটা বেশি করে ট্রিগার করে।
‘কিন্তু আপনার বাড়ির লোক সেসব জানার চেষ্টা করলেন না। উল্টে এগুলোকে ডাইনির লক্ষণ বলে প্রচার করে বেচারিকে আরও কোণঠাসা করলেন। পেটে কন্যাসন্তান
এসেছে জেনে জোর করে অ্যাবর্ট করালেন। বলা হল, ডাইনির পেটে আরেকটা ডাইনি জন্মাবে। মাত্র তিনটে উদাহরণ দিলাম। এরকম আরও হয়তো তিন হাজার ঘটনা ঘটেছে। একটা মানুষ আর কত সহ্য করবে বলতে পারেন?’
তন্ময় দৃশ্যতই ভয়ানক অপ্রস্তুত, ‘এত কিছু তো জানতাম না।
‘জানার চেষ্টা করেছেন? আমি তো সম্পূর্ণ অনাত্মীয় হয়ে আধঘণ্টা আপনার পিসিদিদার কাছে বসে সব জেনে গেলাম। যা-ই হোক, চরম মানসিক নির্যাতন আর গ্যাসলাইটিং মৃণালিনী দত্তের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছিল। গ্যাসলাইটিং কাকে বলে জানেন তো? অত্যাচারের জন্য যখন অত্যাচারিতকেই দায়ী করা হয়।
‘কিন্তু আপনিই তো ‘বললেন ঠাকুমা ব্ল্যাক ম্যাজিক চর্চা করতেন। তাহলে ? ’
‘করতেন, কারণ অত্যাচার সইতে সইতে উনি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্কিমবাবুর গ্যাসলাইটিং ওঁকে কনফার্মেশন বায়াসে ফেলে দিয়েছিল। উনি নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন উনি ডাইনি। ঘরের ভিতরে বঙ্কিমবাবুর ভয়ঙ্কর রূপটা কেউ জানত না৷ নির্যাতকরা অনেক ক্ষেত্রেই এমন দুমুখো এবং ম্যানিপুলেটিভ হয়ে থাকেন। বাইরের কেউ সহজে বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে মানুষটা আসলে কীরকম।
‘গ্যাসলাইটিংয়ের আসল কৌশল এখানেই। মৃণালিনী নিজেও বুঝতে পারতেন না, যে-মানুষ সবার কাছে এত ভালো, শুধুমাত্র স্ত্রীর সঙ্গেই তিনি কেন এরকম ব্যবহার করেন। তিনি ভাবতেন, তাহলে সমস্যা নিশ্চয়ই তাঁর নিজেরই মধ্যে। এটাই কনফার্মেশন বায়াস। যার ফলে নির্যাতিতা নিজেকেই দোষী ভাবতে থাকেন। মৃণালিনীও তাই নিজেকে ডাইনি ভাবতে শুরু করেছিলেন।
‘সে বিশ্বাস এতই দৃঢ় হয়ে যায় যে তিনি গোপনে তন্ত্রমন্ত্র চর্চা শুরু করে দেন। আমার ধারণা, দীর্ঘ চর্চার ফলে কিছু শক্তিও তিনি আয়ত্ব করেন। তখন যদি মনোবিদ দেখানো হতো, তাহলে হয়তো তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারতেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা দেখার মতো কেউ ছিল না। লোকজন তো তাঁকেই সমস্যা বলে চিহ্নিত করে ফেলেছিল।’
সুমন্তকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল, ‘তাহলে বলছেন, মৃণালিনীর ঘৃণারই প্রকাশ ঘটেছে এই বাড়িকে অবলম্বন করে?’
‘হ্যাঁ। ওঁর ঘৃণাই এই বাড়িকে প্রেতবস্তুতে পরিণত করেছে। যে-কোনও জিনিসের একটা আধার তো চাই। এই বাড়িই মৃণালিনীর ঘৃণার আধার। বাড়িটা আসলে ওঁর কাছে একটা জেলখানা ছিল। বঙ্কিমবাবু ওঁকে ঘরে আটকে রাখতেন। কোথাও যেতে দিতেন না। বাড়ির কেউ এলে দেখাও করতে দিতেন না। শেষদিকে তো ঘরের জানলাটাও বাটাম মেরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেইজন্যই বাড়িটা ফুলছে৷ বড় হচ্ছে না৷ আসলে ফুলছে। বয়েলের সূত্রের কথা হচ্ছিল না সেদিন? ‘
সুমন্ত ঢোঁক গিলে জিগ্যেস করল, ‘তাহলে বাড়িটার কী হবে? ‘ফোঁড়ার যা হয়। ফেটে যাবে।’ বলে পাজামার পকেট থেকে সিগারেটের বাক্স বের করল অন্বেষা।
তন্ময় যে বেশ ক্রুদ্ধ, সেটা তার মুখে স্পষ্ট ধরা পড়ছিল। রুক্ষ গলায় সে বলল, ‘কিন্তু দাদুর মৃত্যুর সঙ্গে এই অভিশাপ শেষ হল না কেন?’
‘ডাকিনীবিদ্যা চর্চার ফলে মৃণালিনীর ঘৃণা এতদূর শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে,
সেটা এক পুরুষে শেষ হবার ছিল না। উত্তরপ্রজন্মও অভিশাপের ফল ভুগেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সবার তো এরকম পরিণতি হয়নি। যেমন ধরুন আপনার জেঠতুতো দিদি তনুশ্রী।’
তন্ময় একটু চমকাল, ‘ও তো কলেজ লাইফ থেকেই বাইরে। ওর কথা আলাদা।’ ‘সেখানেই তো প্রশ্ন,’ সিগারেট ধরিয়ে নিল অন্বেষা, ওঁর কথা আলাদা হল কেন? জন্ম ইস্তক অনেকগুলো বছর উনি এখানেই তো ছিলেন।’ সুমন্ত একটু ভেবে বলল, ‘তাহলে কি এই অভিশাপ শুধু বাড়ির ছেলেদের
ওপর কাজ করছে?’
‘তা-ও নয়। তন্ময়বাবুর দাদু, ছোটদাদু, জেঠু অভিশাপের শিকার হয়েছেন। তারপরে তন্ময়বাবু। কিন্তু মাঝখানে আরও একজন ছিলেন যার ওপরে এই অভিশাপ কাজ করেনি।’ তন্ময় অস্ফুট স্বরে বলল, ‘বাবা!’
‘কারেক্ট!” মাথা নাড়ল অন্বেষা, ‘আপনার বাবা। তাঁর মৃত্যু আপনার একেবারেই কমবয়েসে। সেটা একটা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এবং অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু অভিশাপ আপনার বাবার ক্ষেত্রে কাজ করল না কেন? আপনার জেঠু অভিশাপের শিকার হলেন, কিন্তু আপনার বাবা ছাড় পেলেন কেন? ‘
‘ঠাকুমা বাবাকে ভালোবাসতেন। জেঠুকে বাসতেন না। সিম্পল।’
‘কার্যকারণ ভুল হয়ে যাচ্ছে আপনার। যেটা ফলাফল সেটাকে কারণ ভাবছেন।’ ধোঁয়ার রিং ছেড়ে অন্বেষা বলল, ‘দুই ছেলের বিবাহিত জীবনই দেখে গেছিলেন আপনার ঠাকুমা। সেইজন্যই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর স্বামীর টক্সিক পৌরুষের উত্তরাধিকার বহন করছে তাঁর বড় ছেলে। কিন্তু আপনার বাবা ছিলেন অন্যরকম। আপনার পিসিদিদার কাছে শুনেছি, তাঁর মধ্যে বাপ-দাদার তেজ ছিল না। বোধহয় সেই কারণেই আপনার ঠাকুমা তাঁকে অত ভালোবাসতেন।
‘আপনার জ্যাঠা ঠাকুমার ভালোবাসা পাননি, কারণ তাঁর মধ্যে ভদ্রমহিলা নিজের স্বামীর ছায়া দেখতে পেতেন। আপনার জেঠতুতো দিদি তনুশ্রীর সঙ্গে স্কাইপে দীর্ঘ কথাবার্তা হয়েছে আমার। জ্যাঠা তাঁর পিতৃদেবের মতোই একজন ঠান্ডা মাথার নির্যাতক ছিলেন। তনুশ্রী সেইসব দিনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ওঁর নিজের জীবনও তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যথেষ্ট।’
তন্ময়ের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সে কথাগুলো মেনে নিতে পারছে না। সুমন্তও বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।
খানিকক্ষণ নীরবতার পর সুমন্ত বলল, ‘বেশ। সব মেনে নিলাম। কিন্তু তন্ময় কী দোষ করল? ও কেন বলির পাঁঠা হচ্ছে?’
অন্বেষা বলল, ‘কারণ তন্ময় ওঁর বাবার মতো হননি। উনি ওঁর দাদু-জেঠুর কার্বন
কপি। বরং আরও এক কাঠি ওপরে।’
দো-নলা বন্দুকের মতো তাকাল তন্ময়, ‘এসব কী যা-তা বলছেন? ‘ অন্বেষা তন্ময়ের চোখে চোখ রাখল, ‘আপনি বলেছিলেন আপনার ডিভোর্সের কারণ আপনার অসাফল্য এবং এই বাড়ি। সেটা সত্যি নয়। আপনার ডিভোর্সের কারণ আপনার বিকৃত মানসিকতা। আমি শ্রেয়ার সঙ্গে কথা বলেছি। ওর সাইকিয়াট্রিস্টের রিপোর্টও দেখেছি। ওর অ্যাকিউট অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার ধরে গেছে। সঙ্গে ডিমেনশিয়া৷
এটা কোনওদিন পুরোপুরি সারবে না।’
‘আপনি কিন্তু এবার পার্সোনাল অ্যাটাক করছেন। তন্ময়ের গলা অস্বাভাবিক শীতল, ‘শুধুমাত্র এক পক্ষের কথা শুনে জাজমেন্ট দিচ্ছেন।’
, মুচকি হাসল অন্বেষা, ‘আপনি আমার বিশেষ ক্ষমতার কথা ভুলে যাচ্ছেন তন্ময়বাবু।’
জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো চুপ করে গেল তন্ময়।
অন্বেষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এখনকার সময় হলে মৃণালিনী হয়তো সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। যেমন শ্রেয়া বেরিয়ে গেছে। বেরিয়ে আসতে পারলে এত কিছু ঘটত না। কিন্তু তিনি তা পারেননি। এবার হয়তো আপনাকে দিয়েই এই বৃত্ত শেষ হবে। ঘৃণার এই মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়, আপনিই।
সুমন্তর চোখেমুখে বিভ্রান্তি। মানুষ চেনা এত কঠিন, এ-বোধহয় তার ধারণার বাইরে ছিল।
আমায়? তন্ময় হঠাৎ ডুকরে উঠে বলল, ‘কিন্তু ঠাকুমা কি ক্ষমা করতে পারেন না
‘উনি তো নেই। ওঁর ঘৃণাটুকু রয়ে গেছে শুধু। মানুষের মায়ামমতা থাকতে পারে। রিপুর তো ওসব থাকে না৷’
ফ্রিজে রাখা শীতার্ত সবজির মতো পাংশু দেখায় তন্ময়কে। অন্বেষা তার দিকে তাকিয়ে তৃপ্ত স্বরে বলল, ‘এবার সবচেয়ে জরুরি খবরটা দিই। শ্রেয়া চাইছিল না আপনি জানুন। আমিই জোরজার করে অনুমতি আদায় করে এনেছি। শ্রেয়া কনসিভ করেছে। তন্ময় আক্ষরিক অর্থেই হাঁ হয়ে গেল। মুখে আট আনা বিস্ময়ের সঙ্গে মিশল আট আনা সন্দেহ
‘বায়োলজিক্যাল বাবা আপনিই,’ সিগারেটে টান দিয়ে অন্বেষা বলল, ‘আপনারা সেপারেশনে আছেন মাসচারেক। আর শ্রেয়ার বিষয়টা সবে ধরা পড়েছে। একেবারে আর্লি স্টেজ। টেস্ট রিপোর্ট হাতে পেয়ে শ্রেয়া প্রথমে অ্যাবর্ট করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ ওর বক্তব্য, আপনি শেষ কয়েক মাসে ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একাধিকবার ইন্টারকোর্স করেছিলেন। ফলে টেকনিক্যালি ওগুলোকে বলতে হয় ম্যারিটাল রেপ। থ্যাঙ্ক গড়, পরের দিন ক্লিনিকে যাবার পথেই ও মত পাল্টে বাড়ি ফিরে আসে।’
‘এক মিনিট!’ তন্ময় আঙুল তুলল, ‘তখনও আমাদের সেপারেশন হয়নি। আর বউকে আবার রেপ কী?’
‘বিবাহিত বউকেও জোর করে সঙ্গমে বাধ্য করানো যায় না, তন্ময়বাবু। আপনি বোধহয় জানেন না। জানলেও বোঝেন না। যেমন বুঝতেন না আপনার দাদু, ছোড়দাদু আর জ্যাঠা। যাক গে, আসল কথাটা শুনুন। মৃণালিনী মারা গেছিলেন একুশে জুন। ডাক্তার শ্রেয়াকে ওই একই ডেট দিয়েছেন।
‘আরও আশ্চর্যের কথা কী জানেন? মৃণালিনীর হিমোফিলিয়া ছিল, আগেই বলেছি। রোগটা মূলত জেনেটিক। রোগী এটা নিয়েই জন্মায়। ডাক্তার বলেছেন, বাচ্চাটা হিমোফিলিয়া নিয়েই জন্মাবে। অদ্ভুত না? আপনি জানেন লিঙ্গ-নির্ধারণ নিষিদ্ধ। তবে দীর্ঘ আলোচনার পর আমি আর শ্রেয়া নিশ্চিত যে বাচ্চাটা…।’ কথাটা শেষ না-করে কাঁধ ঝাঁকাল অন্বেষা। তারপর মুখ টিপে হেসে বলল, ‘শ্রেয়া বলেছে মেয়ের নাম রাখবে মৃণালিনী। একটু
পুরোনো ধরনের নাম। কিন্তু ওর তাতে অসুবিধা নেই।’ তন্ময় টালুমালু চোখে প্রথমে সুমন্তর দিকে তাকাল, তারপর অন্বেষার দিকে। আকুল স্বরে বলল, ‘আমি যদি শ্রেয়ার কাছে ক্ষমা চাই? ওকে সসম্মানে ফিরিয়ে আনি?’
‘এটা কম্পিউটার নয় যে ব্যাকস্পেস টিপে আপনি ভুলটাকে ঠিক করতে পারবেন। জীবন সবসময় ব্যাকস্পেস মারার সুযোগ দেয় না। আপনি ভুল শোধরাতে চাইলেই শ্রেয়া রাজি হয়ে যাবে?’
‘মেয়েকে কাছে পাবার অধিকার নেই আমার?’
‘মেয়ে দুনিয়ায় ল্যান্ড করা অবধি আপনি থাকবেন কিনা সেটা ভাবুন! কাউন্টডাউন তো শুরু হয়ে গেছে দেখছি৷’
সুমন্ত বলল, ‘কীসের কাউন্টডাউন?’
‘তন্ময়বাবুর ডান হাতটা একবার দেখুন।’
সুমন্ত দেখল, আর দেখেই শিউরে উঠল। তন্ময়ের ডান হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত তিলের মতো কালো গুটিতে ভরে গেছে।
সুমন্তর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের কবজির দিকে তাকাল তন্ময়। বিপন্ন বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে তার। হাতটা চোখের সামনে তুলে ধরে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল দত্তভিলার শেষতম পুরুষ।
তীব্র অবিশ্বাস আর চরম অসহায়তা মেশানো জান্তব একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল তন্ময়ের বুক চিরে। গোটা বাড়ি কেঁপে উঠল সেই চিৎকারে।
ট্যাক্সি বাঁ-দিকে বাঁক নেবার আগে একবার দত্তভিলার দিকে তাকাল অন্বেষা পড়ন্ত বিকেলের অল্পায়ু কমলা রোদ এসে পড়েছে বিষণ্ণ বাড়িটার গায়ে। একটা বড় শ্বাস ফেলে অন্বেষা মাথাটা এলিয়ে দিল সিটের পিছনদিকে। দুদিনের অসম্ভব মানসিক পরিশ্রমের পর চোখ এবার বুজে আসতে চাইছে ঘুমে। মাথায় যেন একশো কেজির লোহার ট্রাঙ্ক চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। মৃত্যুপথযাত্রী একটা মানুষের প্রতি একটু বেশিই রূঢ় আচরণ হয়ে গেল কি?
ধুর! হলে হয়েছে। হ্যাঁ, পক্ষ নিয়েছে সে। আর এক্ষেত্রে নিয়েছে ঘৃণার পক্ষ কিন্তু যে-ঘৃণা জায়েজ, তা কি ভালোবাসার চেয়ে কিছু কম পবিত্র? ঘৃণাও যে এত সাদা হতে পারে—অন্বেষা ভাবতে পারেনি কোনওদিন। আর সেইজন্যই বোধহয় গল্পটা ঘৃণায় শেষ হচ্ছে না। বরং শুরু হচ্ছে এক নতুন আলো দিয়ে।
* গল্পের শিরোনাম শ্রী শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম থেকে ধার করা।
