লেবু – অভীক মুখোপাধ্যায়
ভালোনাম যাই দেওয়া হয়ে থাকুক না কেন, পাড়ার লোকের কাছে সে ক্যাবলা । তিন ভাইয়ের মধ্যে সবথেকে ছোট। তার দুই দাদা লব-কুশ। তার জন্মের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে সে নাকি মায়ের প্রাণটা খেয়েছে। তাই ছোট থেকেই জন্মঅপয়া তকমাটা তার কপালে লেগে গেছে। আগে থেকেই রক্তাল্পতায় ভুগতে থাকা মা’টা নিজের বিবাহোত্তর পঞ্চম বর্ষের মধ্যেই তৃতীয় বাচ্চার জন্মের পরে টুপটাপ পলক মেলে ক্যাবলার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল নিশ্চয়ই—‘হায় রে, বাছা আমার! একবার মায়ের বুকের দুধটুকুও দিতে পারলুম না কো!”
জন্মের পরে ইহজগতে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিশুর ক্রন্দন অতি স্বাভাবিক একটা বিষয়। কিন্তু সে কান্না তো আর কান্না নয়। ক্যাবলার ক্ষেত্রে রোদনটা একেবারে আসল ছিল। খিদের তাড়না ছাড়াও, বিগত সাড়ে সাত মাসের নাতিদীর্ঘ গর্ভস্থ জীবনযাপনের ফলে মায়ের সঙ্গে প্রিম্যাচিওরড বেবি ক্যাবলার একটা বন্ধন তো গড়ে উঠেছিল বটেই, তাই না?
তো, ক্যাবলার জীবন শুরু হল এমন একটা বাড়িতে, যেখানে কোনও নারীর ছোঁয়া নেই। তার বাপ, শম্ভু, তাকে কোলে নেওয়ার চেষ্টা করত বটে, কিন্তু কোনও এক অজানা কারণে সে শম্ভুকে দেখলেই চিৎকার করে কেঁদে-কেটে পাড়া মাথায় তোলার জোগাড় করত।
লব-কুশ যমজ। দুটোই পাক্কা খচরা। ক্যাবলার থেকে তারা চার বছরের বড় হলেও তার প্রতি ঢ্যামনামোতে রাশ টানত না, সবসময় শোনাত যে তার জন্যই তাদের মা মরেছে।
মা-হারা শিশুকে বড় করতে গেলে যা যা ঝঞ্ঝাট হতে পারে সব পোহাতে হয়েছে শম্ভুকে। বয়ঃবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপুষ্ট, হাবাগোবা ক্যাবলার শরীরের কিছু জটিলতাও দেখা দিয়েছে। আঠারো মাসের মাথায় দেখা গেল ক্যাবলার পেটটা ডাবা হয়ে যাচ্ছে। এ ডাক্তার, সেই হাসপাতাল ঘুরে ক্যাবলার প্রেসক্রিপশনে লেখা উঠল…কোয়াশিয়রকর, আর পাড়ার লোকের মুখে ঘুরতে লাগল, ‘হাত-পাগুলো নুড়ি নুড়ি, পেটটা ওষুধের বড়ি।’
এরপর থেকে ক্যাবলাকে লেবু-লেবু করে খেপাতে লাগল তার দুই দাদা। ক্যাবলাকে দূর থেকে দেখলে চলমান লেবুর মতোই দেখাত আসলে। গন্ধরাজ লেবু। এমনিতেই ক্যাবলা শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল। কেউ খেলতে নিত না। নিলেও সে সব খেলাতেই দুধভাত। তাই একা একাই দিন কাটত তার।
পরিবেশ সুখকর হলে শৈশব সুন্দর হয়, নইলে শৈশবের থেকে বেশি যাতনাময় আর কিছুই নেই। সমাজের চোখে দুর্বল শিশু সবসময়ই সহজ শিকারে পরিণত হয়।
শিশুটি বাদে অন্য সবাই তখন শক্তিমান, ভয়াল।
স্বাভাবিকভাবেই, ক্যাবলা লব-কুশের সঙ্গে খেলা করা পছন্দও করত না। দুটো দাদাই বয়সের তুলনায় বেশ গাঁট্টাগোট্টা, মাথায় লম্বা। তাদের পাশে দাঁড়ালে হাসির খোরাক ছাড়া আর কিছুই হয় না সে। তাই এটুকু বোঝার জ্ঞান তার যবে থেকে হয়েছে, সে নিজেকে শামুকের মতো খোলসের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছে। বন্ধুবৃত্তও নেই। নিজের মনের কথা কারও সঙ্গে ভাগও করে নেয় না ক্যাবলা।
তবে ক্যাবলা শান্তি পায় শুধু এক জায়গাতেই, সে রাতে শম্ভুর সঙ্গে চলে যায় রতিকান্ত চাটুজ্জেদের গোডাউনে। তার বাপ সেখানে নাইট গার্ডের কাজ করে। শম্ভুর মতো আকাট নিরক্ষরের জন্য কাজটা যথেষ্ট ভালোই। হাতে টাকা যা আসে, তাতে ভালোভাবেই চারটে পেট চলে যায়। চাটুজ্জেরা এ গ্রামে থাকেও না। ফলে কোনও খবরদারি নেই। বিদেশ থেকে প্রতিমাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে টাকা পাঠিয়ে দেয় ব্যাঙ্কের খাতায়, বছর বছর সেটা একটু আধটু করে বাড়তেও থাকে। মালিকের সঙ্গে তার এটুকুই সম্পর্ক।
গোডাউনে অ্যাসবেস্টসের শেড, পেল্লায় দুটো কাঠের পাল্লাওয়ালা দরজায় একটা ইয়াব্বড় তালা ঝোলে সবসময়। শেডের সম্মুখে একটা বারান্দা। বারান্দার সামনের জমিটাতে নানান ঝোপ। রাতে ন্যাবাটে আলোয় জমিটাতে একটা জরাজীর্ণ চেয়ার নিয়ে বসে থাকে শম্ভু।
স্কুল থেকে ফেরার পর ক্যাবলা বাপের কাছে চলে যায় গোডাউনে। শম্ভু প্রথমদিন ছোটছেলেকে সেখানে দেখে রেগে মেগে বলেছিল, ‘দাদাদের সঙ্গে খেলবি না তুই? এখানে এসেছিস কেন?”
‘না, আমার এখানেই ভালো লাগে। তোমার সঙ্গে থাকব। বারান্দাতে খেলৰ তারপর আর একটাও কথা বলেনি ক্যাবলা। শম্ভুও আর কথা বাড়ায়নি, ধীরে ধীরে বাপ-ব্যাটাতে একটা বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে।
বকে। আজকাল দুজনের মধ্যে দিব্যি ভাব জমেছে। কথাও হয় অনেক৷ ক্যাবলাই বেশি
যেমন তৃতীয় দিনে ক্যাবলা বাপের সামনে প্রশ্ন রেখেছিল, ‘দরজার পেছনে কী আছে, বাবা?”
শম্ভু কিছুক্ষণ বোবার মতো দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ঈশ্বর জানেন। আমি তো কখনও দরজা খোলা দেখিইনি। মনে হয় খাদ্যশস্য আছে৷’
‘কেউ খোলে না? খারাপ হয়ে যাবে তো!’
‘খারাপ হলেও মালিকের কিছু যায় আসে না। ওরা অনেক বড়লোক৷’ ‘জায়গাটা বেশ গা-ছমছমে। ভেতরে গিয়ে একবার দেখতে পারলে মজা হতো।” শম্ভু হেসে ফেলল। ‘বুঝেছি। তোর ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে হচ্ছে খুব, তাই না? কিন্তু খোলা যে বারণ! তবে, খুব সাবধান, বাবা। লোকে বলে, এই জায়গাটা খুব একটা ভালো নয়।’
‘মানে? ’
কাশল শম্ভু। ‘পরে বলব।’ ‘না! এখনই বলো।’
‘এখন শুনলে ভয় করবে। তুই আর আসবি না তখন।’
‘না। আমি ভয় পাব না। আমি তোমার মতোই সাহসী।’ ‘আচ্ছা, বেশ। আয়, বোস এখানে।’
ক্যাবলা বাবু হয়ে বসে পড়ল বাবার চেয়ারের সামনেটাতে। ‘অনেক বছর আগের কথা, তখন ইংরেজদের শাসন ছিল। এই জায়গাটাতে নাকি ইংরেজরা ফাঁসি দিত।’ শম্ভুর কথা বলার ধরনটা আচমকাই ভারিক্কি হয়ে উঠেছে। তালাটার দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘এই দরজার পেছনে গোডাউনে অনেক বিপ্লবীকে কড়িকাঠ থেকে ঝুলিয়ে মারা হয়েছিল। ঘাড় ভেঙে গেছে নিশ্চিত হলে ইংরেজরা লাশগুলোকে নামিয়ে এখানেই এই মাটিতে কবর দিত।’ শম্ভুর হাতের আঙুলটা এখন সামনে অদূরে থাকা একটা বটগাছের আশপাশের মাটিটাকে নির্দেশ করছে। তড়াক করে লাফ দিয়ে বাপের কোলে উঠে পড়ল ক্যাবলা ।
শম্ভু হো হো করে হাসল। ‘বলেছিলাম না, শুনলে তুই ভয় পেয়ে যাবি।” ‘না না। একটুও ভয় পাইনি।’ তড়িঘড়ি বলে উঠল ক্যাবলা। ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে শম্ভু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। পুরোনো আসবাব—
ক্যাঁচ করে শব্দ হল। ‘এদিকে আয়, একটা জিনিস দেখাই,’ বলে শম্ভু গোডাউনের দরজাটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
ঠিক তখনই ক্যাবলা খেয়াল করল বিষয়টা—একটা সুতোয় লেবু আর লঙ্কা ঝুলছে দরজার ওপর থেকে।
‘ওটা কী?’ বোকা দৃষ্টি নিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল ক্যাবলা।
‘লেবু-লঙ্কা!’
‘কী হয় ওটা দিয়ে?
‘যত দূষিত হাওয়া-বাতাস, অপদেবতা, খারাপ নজরকে দূর করার মোক্ষম টোটকা ওটা। গুণে বল দেখি, ক’টা লেবু, ক’খানা লঙ্কা? ‘
‘এক… দুই…’ মন দিয়ে গুনে ক্যাবলা বলল, ‘একটা লেবু, আর সাতখানা
লঙ্কা৷’
‘প্রতি শনিবার এগুলো বদলাই রে, ব্যাটা। ভূত-প্রেতদের দূরে রাখে।’ টাটকা মালাটার দিকে একপানে তাকিয়ে রয়েছে ক্যাবলা। বিড়বিড় করছে। ‘লেবু…’ ‘অ্যাঁ!’ ছেলের কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে শম্ভু জানতে চায়, ‘কী বললি? ’ ‘লেবু!’ ,
প্রথমটায় শম্ভু ঠিক ধরতে পারেনি। কিন্তু শব্দটার পুনরাবৃত্তি হওয়াতে এবার বুঝতে পারল। ‘ও, হ্যাঁ, লেবু। তোকে তোর দাদারা লেবু লেবু করে খেপায় তো!’ হাসল শম্ভু।
‘লেবু!’
ছেলে আবার একই কথা বলাতে শম্ভু এবার একটু বিস্মিত হল।
‘লেবু! আমাকে ওরা লেবু বলে রাগায়।’
‘জানি জানি,’ বিরক্তিমাখা গলায় শম্ভু বলে উঠল, ‘ওদের কথা ছাড়। বোকার ডিম সবক’টা! তবে তুই যেন ওই মালাটার কাছে যাস না, বাপ! আশপাশের খারাপ সবকিছুকে নিজের মধ্যে শুষে নেয় লেবু-লঙ্কার মালা। চুম্বক যেভাবে লোহাকে টানে
ঠিক সেভাবে টেনে নেয় শোঁ-শোঁ করে। সাবধান।’
ক্যাবলা কিন্তু মালাটার দিকে তাকিয়েই রইল। শম্ভু ঘুণাক্ষরেও টের পেল না, তার আপাত বোকাহাবা ছেলেটার মাথার মধ্যে ঠিক কী চলছে।
সেদিনের কথোপকথনের পরে বেশ কয়েক রাত বিনিদ্র কাটিয়েছিল ক্যাবলা। এমনিতেই সে শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল চিন্তা করত। আর গোডাউনের লেবু-লঙ্কার মালা দেখে আসার পর থেকে সে সারা রাত না ঘুমিয়ে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে থাকা শুরু করল। তার বাপ, দাদারা নাক ডাকে, আর তার চোখের সামনে দোলে সেই লেবু-লঙ্কার মালা। আচমকাই মনে হয় লেবুটার জায়গাতে এসে গেছে তার পেটটা। দুলছে। দুলছে আর ফুলছে। ফুলতে ফুলতে লাল হচ্ছে ক্রমশ। দুনিয়ার যত বদনজর, দূষিত হাওয়া বাতাস টানতে টানতে রক্তাভ হয়ে একসময় ফটাস করে ফেটেও যাচ্ছে পেটখানা। ছড়িয়ে পড়ছে লাল রঙের তরল।
ক্যাবলা উঠে বসে পড়ে। দরদর করে ঘাম দেয় তার। গলাটা শুকিয়ে মরুভূমি। বুক ধড়ফড় করে পোলট্রির মুরগিগুলোর ডানা ঝাপটানোর মতো। সে তখন বুঝতে পারে যে, এতক্ষণ ধরে সে ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখছিল। আবার শুয়ে পড়ে তখন। দেখে- · তার দুই খচ্চর দাদা, আর বাপ কেমন নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে।
খুব মন দিয়ে লব-কুশের মুখের দিকে তাকায় ক্যাবলা। নিষ্পাপ মুখ৷ কিন্তু জেগে উঠলেই শয়তান দুটো তেড়ে তার পেছনে লাগে। বল মেরে জানলার কাচ ভাঙে ওরা, ক্যাবলার নামে দোষ হয়। ক্রিকেট খেলার সরঞ্জামগুলো সব ক্যাবলাকে দিয়ে বওয়ায়, কিন্তু খেলতে নেয় না। বন্ধুমহলে ‘তাকে নিয়ে খিল্লি করে দুজনে। যেন সে মানুষই নয় ৷ পারলে ঘুমের মধ্যেই ক্যাবলা ওদের ঘাড় মটকে দেয়। কিন্তু দুটো কারণে সেটা সম্ভব হয় না। এক, সে ওদের তুলনায় দুর্বল। এবং দুই, সে অতটা উচ্চদরের শয়তান নয়।
কিন্তু কাউকে আসল পরীক্ষার মুখে না ফেললে তো জানা সম্ভবই নয় যে, সে ঠিক কতখানি নিষ্ঠুর হতে পারে, তাই না?
চৌধুরী গিন্নির পোষ্য সারমেয়টির রঙ দুধে চকোলেট গোলার মতো। নাম ফ্রুটি। নিখুঁতভাবে লোম ছাঁটিয়ে রাখেন সবসময়। সঙ্গে নিয়ে যখন বেরোন, তখন ফ্রুটিকে দেখে চূড়ান্ত অনাগ্রহী ব্যক্তি পর্যন্ত তার দিকে এগিয়ে আসে, প্রশংসা করে। কুকুরটাকে নাকি জার্মানি থেকে আনা হয়েছিল।
রবিবারটা চৌধুরী গিন্নির কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে তিনি ঠিক করেন ফ্রুটিকে নিয়ে বিস্কুটের মাঠে ঘুরতে বেরোবেন কিনা। আসলে তাঁর মনে
অন্য একটা ব্যাপার কাজ করে। ভালো আবহাওয়া থাকলে তিনি বেরোনোর সুযোগটা হাতছাড়া করেন না। লোকে ফ্রুটির সম্পর্কে প্রশংসা করলে তাঁর মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যায়৷
তবে রোববার মাঠে ছেলেমেয়েরা খেলে। দৌড়াদৌড়ি করে। তাদের বিপজ্জনক খেলার সামনে পড়লে ফ্রুটির ক্ষতি হতে পারে বলেই অত সাতপাঁচ ভাবতে হয় তাঁকে। এই রোববার শেষ পর্যন্ত অনেক ভাবনা-চিন্তার পর তিনি বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা নিলেন।
ফ্রুটিকে নিয়ে মাঠের বাইরের পরিধিটাতে চক্কর মারছিলেন চৌধুরী গিন্নি। একটা বল মাঠের মাঝখান থেকে বুলেটের গতিতে ছুটে এল। প্রথমটায় চৌধুরী গিন্নি কিছু বুঝতেই পারেননি। কিন্তু ফ্রুটি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই তিনি টের পেলেন, খুব ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছে। লোমশ ফ্রুটির কম্পমান শরীরের ঠিক পাশটাতে একটা লাল ধারাও দেখা দিয়েছে ততক্ষণে৷
বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে একটা টোটো ডেকে, ফ্রুটিকে কোলে তুলে নিয়ে পশু-চিকিৎসকের ডিসপেন্সারির দিকে ছুট লাগাতে যাবেন, এমন সময় অপরাধীকে দেখতে পেলেন চৌধুরী গিন্নি। পেট-ডাবা ছেলেটা ব্যাট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কী একটা নামে যেন সবাই ডাকে ছেলেটাকে? ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
—লেবু!
মুহূর্তের মধ্যে কত কী যে ঘটে গেল তা ধরতেই পারেনি ক্যাবলা। আজ বাবার সঙ্গে গোডাউনে যায়নি সে। দুই দাদার সঙ্গে চলে এসেছে মাঠটাতে। যথারীতি তাকে খেলতে নিলেও দুধভাত বানিয়ে সবাই ব্যাট আর বল করে চলেছে।
ব্যাটিং চলছিল লবের। সপাটে একটা কভার ড্রাইভ হাঁকিয়ে দেওয়ার দু-তিন সেকেন্ডের মধ্যে জিভ কেটে লব বলে উঠল, ‘কেলো করেছে!’ দৌড়ে এসে সে ব্যাটখানা ক্যাবলার হাতে জোর করে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘ধর এটা…’ ‘কেন?’ ক্যাবলা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল। ‘ধরতে বলেছি, ধর।’
এরপর ক্যাবলা চৌধুরী গিন্নির রোষষায়িত নয়ন দেখেছিল।
চৌধুরী গিন্নি সেদিন কিছু বলেননি। এক সপ্তাহ পরে ফ্রুটিকে কোলে নিয়ে সোজা হাজির হলেন ক্যাবলাদের বাড়ি। শম্ভুকে ডেকে তার সন্তানের মুণ্ডপাত করে ক্ষতিপূরণ চাইলেন।
‘আপনার ছেলে আমার ফ্রুটিকে মেরেই ফেলেছিল আরেকটু হলে।’ চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করতে শুরু করলেন চৌধুরী গিন্নি। ‘হয় খরচটা দেবেন, নয়তো…’ শম্ভু গরিব হলেও পাড়ায় তার একটা সম্মান আছে। প্রথমে মানতেই চাইল না তার তিন ছেলের মধ্যে কেউ এই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। বলল, ‘আপনার কুকুরটাকে ভালো করে সামলানো উচিত ছিল।’ ফ্রুটিকে কুকুর বলায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন চৌধুরী গিন্নি। ‘আপনার উচিত ছিল নিজের বাচ্চাদের সামলানো।’
কথার পিঠে কথা বাড়ল। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হতেই ভিড় জমল। ক্যাবলাও ততক্ষণে ঘরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছে।
‘এই তো… এই তো রাস্কেলটা…’ চৌধুরী গিন্নি একেবারে ক্যাবলার মুখের ওপরে আঙুল তুলে ধরলেন।
ঘটনা পরম্পরা বলার চেষ্টা করলেও দুর্বল ক্যাবলাকে হার মানতে হল ভদ্রমহিলার প্রবল বাক্যবাণের সমক্ষে। তিনি কিছু শুনতেই নারাজ।
হলেন। তুমুল বাকবিতণ্ডার শেষে চৌধুরী গিন্নি চাহিদার অর্ধেক পরিমাণ অর্থ নিয়ে বিদায়
শম্ভু রেগে কাঁই। অর্থদণ্ডের ফলে যা ক্ষতি হয়েছে তো হয়েছে, কিন্তু এমন এক রোববারে ব্যাপারটা ঘটল, যেদিন শম্ভু মদ গিলে একটু খোঁয়াড়ি করবে ভেবে রেখেছিল। সে গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে এই ঘটনা। ক্যাবলার কপালে যে দুঃখ নাচানাচি
করছে তা বোঝাই গেল। এই প্রথম শম্ভুর হাতে মার খেল ক্যাবলা। বিষম মার
তবে মারার জন্য যতটা না লাগল, তার থেকেও বেশি লাগল দাদাদের নিশ্চুপ থাকাটা। পরে লব-কুশের নির্লজ্জ চোখ দুটো তার মনে ভেসে উঠছিল। শম্ভু যখন ক্যাবলাকে মারছিল, তখন তা দেখে দাঁত বের করে হাসছিল লব আর কুশ। বড় বেহায়া সেই হাসি।
.
একটা আট বছরের শিশুর মনে কল্পনার দাঙ্গা চলতে লাগল। কোনও বিষয় নিয়ে ক্রমাগত চিন্তা করা একেক সময় মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলে যে তা ব্যক্তির সহজাত প্রবৃত্তিতে পরিণত হয়। তা স্তরে স্তরে মানবমনকে কবলিত করে তোলে।
ক্যাবলারও তাই হল। তার যাবতীয় কল্পনা এখন একটা বস্তুকে ঘিরেই ঘনীভূত হচ্ছে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে শুনে আসা সকল কাহিনির সার-শিক্ষা থেকে পাওয়া সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করে সে প্রতিশোধ নিতে চায়। আর কোনও পথ তার সামনে খোলা নেই। যে পদ্ধতিটা সে ভেবে রেখেছে, সেটা সহজ হলেও মারাত্মক।
বাবার সঙ্গে গোডাউনে গিয়েছিল ক্যাবলা। শম্ভু একটু চোখের আড়াল হতেই একটা চেয়ারে উঠে গোডাউনের দরজার মাথায় লাগানো লেবু-লঙ্কার মালাটা সে খুলে পকেটে ভ’রে বাড়ি নিয়ে চলে এসেছে।
যখন প্যান্টের পকেটে সেটাকে ভ’রছিল, তখন মনে হয়েছিল লেবুটা জীবন্ত— তার কচি দাপনাতে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভয় পায়নি ক্যাবলা, বরং মুখে ফুটে উঠেছিল একটা আত্মপ্রসাদী হাসি।
এটাই তো চেয়েছিল সে। সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল লেবু নয়, পকেটে বিধ্বংসী একখানা বোমা নিয়ে ঘুরছে।
বংশীর ঘুগনি এই এলাকার বিখ্যাত খাবারগুলোর মধ্যে একটা৷ সন্ধে হলেই
মানিকজোড় লব-কুশ বংশীর ঠেলাগাড়িটার সামনে চলে যায়। দণ্ডপাণিতলা যাওয়ার মোড়ের মাথায় দাঁড় করানো ঠেলাগাড়িটার কাচের ওপারে হলুদ-সবুজ দুনিয়ার খাবারগুলো আরও রঙিন দেখায় ভেপার ল্যাম্প জ্বলে ওঠার পরে।
ঘুগনির ডেকচির ওপর সাজানো বাগানের মতো কুচো—কুচো সবুজ ধনেপাতা, পাশাপাশি জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকা টমেটোর স্লাইস—আহ, লব-কুশের জিভে জল চলে আসে। পাশেই কতগুলো মশলার কৌটো। মুখখোলা। সেই থেকে চামচে করে দরকারমতো মশলা তুলে নিয়ে ঝালমুড়ি বানাচ্ছে বংশী।
মুড়ি দিল, সেদ্ধ করে রাখা ছোলা মেশাল, আলুসেদ্ধ কাটল ছুরি দিয়ে, কাঁচা লঙ্কা কুঁচিয়ে দিয়ে, লেবু ছড়িয়ে, এক ফালা নারকেল ভ’রে দেয় ঠোঙায়। ভেলপুরিও বানায়। ঝালমুড়ির মিক্সচারে নানান টক-ঝাল সস আর পাপড়ি চালান করে দিলেই হয়ে গেল ভেল। পঞ্চাশ টাকার নোট নিয়ে গেলে এক প্লেট ঘুগনি আর ভেল হিসেবে যা মিলবে তা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের পেট ভরার জন্য যথেষ্ট। পথচলতি লোকেরাও সুগন্ধের টানে টানে বংশীর ঘুগনির ঠেলায় হানা দেয়৷
যেদিন লব-কুশের গিয়ে খেতে ইচ্ছে হয় না, সেদিন তারা ক্যাবলার হাতে টাকা
দিয়ে খাবার আনতে পাঠায়। ক্যাবলাকে একটা মুড়ি পর্যন্ত দেয় না অবশ্য। আজ কিন্তু তাদের ক্যাবলাই বলল, ‘টাকা দে, আমি এনে দিচ্ছি।’ ‘আজ ভেলপুরি আনিস!’ হোটেলের বেয়ারাকে হুকুম দেওয়ার মতো করে বলল লব। নোট হাতে নিয়ে মাথা নেড়ে ক্যাবলা ঘর থেকে বেরোতেই দুই ভাই হেসে লুটোপুটি খেতে লাগল ৷ ৷
হাসি অবশ্য আজ ক্যাবলার মুখেও খেলা করছে। হাসতে হাসতেই বংশীকে সে বলল, “কাকু, আজ লেবু দেবে না।’
দাম মিটিয়ে ঠোঙাটা বাঁ-হাতে নিয়ে মোড়ের আলোর বৃত্তের বাইরে এসে একটা জায়গাতে সে দাঁড়াল। ডান পকেটে হাত ভ’রে বের করে আনল একটা শুকনো গোছের লেবু। এটা গোডাউন থেকে লেবু-লঙ্কার মালা থেকে খুলে আনা। লেবুটাকে আধখানা করে কেটে রেখেছিল সে আগেই। গায়ে কেমন পচা পচা দাগ ধরেছে। শিরা-উপশিরাগুলো কালচে বাদামী। অশুভ অশুভ দেখাচ্ছে। আধখানা লেবুটাকে চোখের খুব কাছে এনে দেখল ক্যাবলা। মনে হল গোডাউনের আশপাশের জমিতে থাকা সমস্ত প্রেতাত্মা লেবুটার মধ্যে নেচে বেড়াচ্ছে।
“দাদা, এই যে ভেলপুরিটা…’
লব-কুশ তাকাল। ঠোঙা থেকে সুবাস ছড়াচ্ছে। কুশ হাত বাড়িয়ে ঠোঙাটা নিতে যাচ্ছে এমন সময় লব তাকে থামিয়ে দিল। ‘মালটা হাসছে কেন?”
‘হুম?’ প্রশ্নসূচকভাবে কুশ এবারে ‘ধুত্তু বেড়ালের মতো হাসি দেখলাম ক্যাবলার মুখে। কী লেবু-উ-উ…? হাসছিস কেন? কী মিশিয়েছিস ভেলপুরিটায়?’
লবের দিকে তাকাল। ‘কেসটা কী?’
ক্যাবলার দুই দাদা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে, এমন সময় ভেলপুরির মনমাতানো গন্ধে ঘরটা ভ’রে উঠল।
কুশ লবকে বলল, ‘ছাড়। ওর নাম এমনি এমনি কি আর ক্যাবলা ? বোকা ছেলে! হাসছে। চল, খাওয়া যাক।’
‘সন্দেহ হচ্ছে, মুতে টুতে আনেনি তো এটায়?’ ঠোঙাটাকে নাকের কাছে এনে টেনে টেনে গন্ধ শুঁকল লব।
‘কী যা তা বলছিস? এসব শুনে খাওয়া যাবে না আর।’
‘না না, আমি হিসি করিনি।’ ক্যাবলা রে-রে করে উঠল। ‘কোনও গন্ডগোল নেই৷ দাম দিয়ে কেনা। খেয়ে নাও। বাবা নইলে কুরুক্ষেত্তর বাঁধিয়ে দেবে।’ ঠিক কথাই। শম্ভু খাবার নষ্ট করলে সহ্য করতে পারে না। করবেই বা কী করে? এত কষ্ট করে আয় করা পয়সা।
কুশ এবার গন্ধ শুঁকল। সদ্য দেওয়া লেবুর গন্ধ ছাড়ছে। ‘আজ মনে হচ্ছে বেশি দিয়েছে একটু।’ লবের দিকে তাকিয়ে চোখ মারল।
লব এখনও গররাজি। যদিও খেতে ইচ্ছে করছে তারও।
‘ক্যাবলা, তুই খাবি না?’ লবই জানতে চাইল।
অন্যদিন তাকে এসব বলে না দাদারা। আজ বেকায়দায় পড়ল ক্যাবলা। ‘আ… আমি খাব না।’
‘বোকচন্দর!’ লব কুশকে দেখে চোখ টিপল। ক্যাবলাকে বলল, “খাবি! আলবাত খাবি। বোস। আয়… আয়…’
ক্যাবলা এক পা পিছোল। ‘আমি বরং একবার বাইরে থেকে ঘুরে আসি।’
‘না। তুই কোথথাও যাবি না। কোত্থেকে ঘুরে আসবি এখন? দেরি করলে মুড়িগুলো মিইয়ে যাবে। এমনিতেই ভেলপুরি তাড়াতাড়ি নেতিয়ে যায়। বোস বলছি!’ এবারে ভাইকে জোড় করে বসিয়ে দিল লব৷
কোণঠাসা বোধ করছে ক্যাবলা। ঠোঙাটার দিকে বার বার তাকাচ্ছে।
‘আমি খাব না। ভালো লাগছে না এখন খেতে…’ জোর করে খানিকটা লাল মুড়ি লব ক্যাবলার মুখে টিপে ধরল।
ক্যাবলার চোখ দিয়ে জলের ধারা নামছে৷
‘কাঁদছিস কেন?’ লবের মুখে শয়তানি হাসি।
‘ঝাল… খুব ঝাল…।’ দম নিতে পারছে না ক্যাবলা। “খুব ঝাল !’ ‘আরও গেল!’ বলে লব ঠুসে দিল আরও খানিকটা মুড়ি। ‘অভ্যেস হয়ে যাবে ঝাল খাওয়া।’
এরপরে প্রায় দশ মিনিট ধরে দুই দাদাতে মিলে ঠুসে ঠুসে ভেলপুরি খাওয়াল ক্যাবলাকে। ,
ভেলপুরিটা খাওয়ার পরে ক্যাবলার পেটের যন্ত্রণা হয়েছিল। লব-কুশও ভয় ভয়েই ছিল, এই বুঝি খারাপ কিছু হয়। এক তো বাইরের খাবার ক্যাবলা খায় না, তার ওপরে ঝাল ছিল বলেই পেটের যন্ত্রণাতে কষ্ট পেল সে৷
শম্ভুর কাছে একচোট বকুনিও খেয়েছিল ক্যাবলা। ‘বাইরের অখাদ্য কুখাদ্যগুলো না গিললেই কি নয়? বাড়িতে কি খাবার দেওয়া হয় না? ‘
শারীরিক কষ্ট একটা সময় উধাও হল। কিন্তু মনের জ্বালাটা কমল কই? লবকুশকে দেখলেই ক্যাবলার বুকের মধ্যেটা কেমন জ্বলে ওঠে তার। সে চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিতে চায়, কিন্তু পেরে উঠবে কি? হ্যাঁ, তাকে পারতেই হবে।
তারপর একদিন সুযোগ পেল সে। শম্ভুর সঙ্গে গোডাউনে গিয়ে আরও একটা লেবু-লঙ্কার মালা খুলে আনল ক্যাবলা। তবে এবার আর মালাটাকে খুলে সোজা নিয়ে চলে আসেনি। কিছুক্ষণ গোডাউনের সামনের জমিতে থাকা বটগাছটার একটা ডালে ঝুলিয়ে রেখেছিল। মালাটাকে গাছের ডাল থেকে খুলে আনার সময়ে তার মনে হচ্ছিল বহু বছর আগে কবর দেওয়া মরদেহগুলোর আত্মারা সেটার মধ্যে প্রবেশ করছে। কিছু একটা যেন তার কানের কাছে ফিসফিস করছে, ‘প্র-তি-শো-ধ! অমোঘ প্রতিশোধ’।
শম্ভু সেদিন রাতে খিচুড়ি রাঁধল। সহজে, আর কম খরচে বানানো যায় বলে শম্ভু প্রায়ই খিচুড়ি বানায়। যাতে দলা পাকিয়ে না যায় তার জন্য বেশি করে জল রাখে। স্বাদ যেমনই হোক সুড়ুত সুড়ুত করে ঠিক উঠে যাবে।
হাঁড়িভরা খিচুড়ি উনুন থেকে নামিয়ে নিজে খেয়ে সদর দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে শম্ভু চলে গেল গোডাউনের পাহারায়। লব-কুশকে বলে গেল খিদে পেলে যেন খেয়ে নেয়, ভাইকেও বেড়ে দেয়। ষাট ওয়াটের বাল্বের ম্যাড়ম্যাড়ে আলোয় খেতে বসল তিন ভাই।
‘এই অখাদ্যটা এখন গিলতে হবে?’ লবের খাওয়ার ইচ্ছে একেবারেই নেই। ‘একটু আচার হলে তবু মুখে তোলা যেত…’
কুশ তাকে তুলে রাখা আচারের বয়ামের দিকে তাকাল। শূন্যগর্ভ বয়াম জানান দিচ্ছে আচারের অ-আ কিছুই নেই তাতে।
‘ফাঁকা!’
ঠিক এই মোক্ষম সময়ে ক্যাবলা লেবুখানা বের করে আনল। ভালো করে ধুয়ে নিয়েছে আগেই। দেখলে বোঝার উপায় নেই কয়েক ঘণ্টা আগেই ফলটা গোডাউনের মালায় ঝুলছিল। ·
‘সাব্বাশ!’ লব আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল, ‘লেবু, ভাই আমার, কী সুন্দর লেবু জোগাড় করে রেখেছে দেখো !
‘যা, গিয়ে একটা ছুরি নিয়ে আয়। ক্যাবলার মতো বসে আছিস এখনও?’ কুশ ধমক দিতেই ক্যাবলা উঠে গেল। এর আগে কখনও দুই দাদার আদেশ পালনে মন থেকে এতটা তৎপরতা সে দেখায়নি। ছুরি দিয়ে লেবুটাকে দু’টুকরো করে এনে লবকুশের পাতে সুন্দরভাবে নিংড়ে দিল ক্যাবলা ।
‘তুই নিবি না?’ লব জানতে চাইল।
‘না,’ ক্যাবলার গলা সপাট। ‘আমার ভালো লাগে না৷’
‘মরগে যা! আপনি বাঁচলে বাপের নাম৷’ গপ গপ করে মুখে গ্রাস তুলতে লাগল লব। দেখাদেখি কুশও।
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ক্যাবলা দুই দাদার দিকে শিকারি বাজপাখির মতো নজর রাখল। দুজনে খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ গুলতানি করল, তারপর বিছানায় গা এলিয়ে দিল। দুই ভাইয়ের নড়াচড়া, নাকডাকার দিকে চোখ কান খোলা রেখে তাকিয়ে রইল ক্যাবলা ৷ কিন্তু কখন যে তারও চোখ জুড়ে এল সে টের পায়নি। স্বপ্নে দেখতে পেল ঘরের
মধ্যে কালো কালো ছায়া ঘুরছে, লব-কুশের বুকের কাছে নেমে এসে ছায়াগুলো নখদন্ত বের করে ভয় দেখাচ্ছে, শয়তান দুটোও ভয়ে কান্নাকাটি করছে।
কান্নার শব্দেই ক্যাবলার ঘুমটা ভাঙল। লবের গলা। ‘দাগটা কী-সে-র?’
চিতার মতো টানটান হয়ে উঠে বসল ক্যাবলা। পাশে বসে লব গেঞ্জিটা নিজের পেটের ওপরে তুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী যেন দেখছে।
পর মুহূর্তেই কুশ ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। ‘এই তো… আমার পেটেও …. এটা কী করে হল ? ”
মনে মনে হাসছে ক্যাবলা। তার দুই দাদা পরনের গেঞ্জিগুলো খুলে ফেলে পেট ধরে বসে আছে।
ঠিক তখনই শম্ভু এসে ঢুকল।
এটা!’ ‘বাবা-আ-আ…’ লব ডুকরে কেঁদে উঠল পেটের যন্ত্রণায়। ‘এই দেখো, কী হয়েছে
পরদিন…
শম্ভু দাওয়াটাতে বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। শোওয়ার ঘরটাতে দুই ছেলেকে তালা দিয়ে রেখেছে। কাল থেকে কাজে যায়নি শম্ভু। সারাটা দিন এভাবে কপাল চাপড়েই কাটাচ্ছে। যে যা বলছে সব করেছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না৷
সন্তানের কষ্ট নিজের চোখে দেখার থেকে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে একজন পিতার কাছে? বিশেষত সেই কষ্ট নিবারণের চেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়, তখন নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়৷
শম্ভু। ‘কী করব আমি এবার? এ কেমন রোগ?’ মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদছে
লব-কুশের এই অবস্থার কথা শুনে শম্ভুর দিদি দেখা করতে এসেছে৷ ‘রোগ নয়, ভাই। এ হল বালাই। মনে হচ্ছে অশুভ কিছু বাসা বেঁধেছে ওদের পেটে। কোনও ওঝাকে খবর দিতে হবে।’
ঠিক এই সময়েই পাড়ার একটা ছেলে দৌড়ে এসে খবর দিল, মণি ডাক্তার আসছেন। শম্ভুর মুখে অনেকক্ষণ পরে একটু আশার ঝিলিক ফুটে উঠল। তবে কেউ লক্ষ্য করল না, আর একজনের মুখেও তখন একটা তৃপ্তির হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। সে হল ক্যাবলা। এই হাসিটুকুর জন্যই সে এতদিন অপেক্ষা করেছিল।
মণি ডাক্তারের খুব নামযশ। ব্যস্ত মানুষ। এলাকার প্রতিটা বড় মেডিক্যাল শপ-এর সাইনবোর্ডে তাঁর নাম লেখা থাকে—মণিময় মুখোপাধ্যায়। রোগীর ভিড় হয় দেখার মতো৷
ছেলেটা যখন লব-কুশের খবরটা এসে তাঁকে বলে, তখনই রোগলক্ষণ শুনে তিনি নড়েচড়ে বসেন। কৌতূহল জাগে। ছেলেটা খুব বিশদে কেস হিস্ট্রি বলতে না পারলেও তাঁর ডাক্তারি অভিজ্ঞতা তাঁকে বলছে—এ মোটেই কোনও সাধারণ পেটের ব্যামো নয়।
মণি ডাক্তার যখন শম্ভুর বাড়ির সামনেটাতে গাড়ি থেকে নামলেন, তখন বাড়ির
সামনে ঠাসা ভিড়। ভিড় অবশ্য সারাদিন ধরেই ছেঁকে আছে বাড়িটাকে। একজন দৌড়ে এসে তাঁর হাতের ব্যাগটা ধরে নেওয়ার চেষ্টা করল। ওটাই শম্ভু। সে নিজের পরিচয় দিল। ব্যাগটা তার হাতে ধরিয়ে দিলেন মণি ডাক্তার। গম্ভীর মুখে বললেন, ‘পেশেন্টস ? ”
‘ছেলেদুটো ঘরের মধ্যে আছে, স্যার। আপনি ভেতরে চলুন।’
পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে তালাবন্ধ একটা দরজার সামনে নিয়ে ডাক্তারকে দাঁড়
করাল শম্ভু। দাওয়ার ডান দিকটাতে মাদুরে বসে থাকা ক্যাবলার দিকে মণি ডাক্তারের নজর পড়ল। যুদ্ধজয়ের প্রশান্ত হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বসে আছে ক্যাবলা শম্ভু দরজার তালা খুলে দিল।
অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর থেকে চাপা গোঙানির মতো কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। একটু নার্ভাসভাবেই ঘরের মধ্যে পা রাখলেন মণিময় ডাক্তার।
শম্ভু তড়িঘড়ি ঘরে ঢুকে লাইটের সুইচটা অন করতে আলোর বন্যা বয়ে গেল। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা কতিপয় মানুষ উঁকিঝুঁকি মারতে ব্যস্ত। কিন্তু যে দৃশ্য তারা দেখল, তাতে তাদের বুক কেঁপে উঠল। মণি ডাক্তারের চোখও বিস্ফারিত। লব আর কুশ দুজনেই বিছানায় শায়িত। খালি গা৷ পেটদুটো অসম্ভব ফুলে গেছে। চকচক করছে আলো প’ড়ে! পেটের চামড়াটা হালকা সবুজ। তার ওপরে জায়গায় জায়গায় টিপ টিপ হলদে ছোপ। শিরার মতো উঁচু ফোলা ভাব রয়েছে পেটের ওপর থেকে নীচে।
প্রথম দর্শনে যে কোনও ব্যক্তির মাথাতে একটাই কথা আসবে। দুটো জিয়ন্ত লেবু বিছানায় শুয়ে রয়েছে। যন্ত্রণায় ছটকাচ্ছে। এপাশ-ওপাশ করছে। সকলে চমকে উঠল সে’দিকে তাকিয়ে।
আর সবার বিহ্বল দৃষ্টির আড়ালে একজন তখনও সমানতালে মুচকি হাসি হাসছে। হাসবে না-ই বা কেন? সে যে এবার সঙ্গী পেল। লেবু নামটা এখন থেকে ভাগ করে নিতে পারবে সে।
