বরফ পড়ার আগে – দেবলীনা চট্টোপাধ্যায়
দার্জিলিং-গ্যাংটক-পেলিং। দার্জিলিং-গ্যাংটক-পেলিং। কাঁহা যায়েঙ্গে স্যার?” ছোটখাটো চেহারা, মাথায় পাতলা হয়ে আসা কাঁচাপাকা চুল আর মুখ ভর্তি বিজবিজে দাড়ি শোভিত মঙ্গোলিয় মুখটা অসীম আগ্রহে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটু বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক দেখল অরিজিৎ। যদিও পাহাড়ে আজকাল অফসিজন বলে কিছু হয় না, তবুও বহুবার এখানে আসার সুবাদে তার অভিজ্ঞ চোখ বলছে ডিসেম্বরের এই প্রথম সপ্তাহে এনজেপি স্টেশনের বাইরে ট্যুরিস্টদের ভিড় বেশ খানিকটা কম। নর্থ সিকিমের দিকটা তো বরফ পড়ে একেবারেই বন্ধ, দার্জিলিঙেও এবছর বরফ পড়েছে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে। এই সময়ে ট্যুর প্ল্যাপন করে বরফে আটকা পড়তে কেই বা চায়, তার মতো পাগল ছাড়া?
‘স্যার ক্যায়া ডুয়ার্সকে তরফ যায়েঙ্গে? লাটাগুড়ি, মালবাজার, মূর্তি? বুকিং কাঁহাপে হ্যায়?’ এবার খুব নরম গলায় সবিনয়ে জিগ্যেস করল লোকটা। অরিজিৎ একটু মাথা চুলকে বলল, ‘বুকিং তো নেই দাদা।’
“তো যানা কাঁহা হ্যায়?’
ঠোঁট কামড়ে ভাবতে শুরু করল অরিজিৎ। এবার তো একটা কিছু ফাইনাল করতেই হবে! কাল ট্রেনে শুয়ে শুয়ে ইউটিউবে বেশ কয়েকটা ভিডিও ঘেঁটে দেখেছে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথায় যাওয়া যায় সেটা ঠিক করার আগেই কখন যেন ঘুমে তলিয়ে গেছিল। সকালে যখন চোখ খুলল ততক্ষণে ট্রেন স্লো মোশনে ঢুকছে এনজেপিতে। ফলে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার আর সময়-সুযোগ কিছুই হয়নি ৷৷
অরিজিৎকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটা এবার প্রবল উৎসাহে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বিজ্ঞাপন দেবার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল, ‘উইকএন্ড কাটাতে এসেছেন স্যার? দুটো দিন একটু শান্তিতে রেস্ট নিতে চান? কোনও চিন্তা নেই! এই ডেভিড আছে, আপনাকে একদম বেস্ট জায়গায় নিয়ে যাবে! এই দেখুন স্যার, আগে দেখুন একবার…’ বলতে বলতে স্টিয়ারিং-এর পাশের গ্লোভ বক্স থেকে একটা ল্যামিনেট করা আঠারো বাই বারো ইঞ্চির ফটো তুলে ধরল অরিজিতের সামনে।
একটা কোলাজ করা ছবি। ওপরে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা ‘রোজভিউ হোমস্টে’। তিনটে ছবির একটা হোমস্টের একদম সামনে থেকে তোলা। পরেরটা বেশ কিছুটা উঁচু জায়গা থেকে, সম্ভবত অন্য কোনও পাহাড়ের ওপর থেকে তোলা লোকেশন দেখানোর জন্য, আর শেষেরটা রুমের ভেতরের দৃশ্য।
লোকেশনটা দেখে রীতিমতো ইমপ্রেসড হয়ে গেল অরিজিৎ। তিনদিকে পাহাড়ে ঘেরা, একদিকে গভীর খাদের ঠিক ধারে সামনে গোলাপি-লাল-কমলা গোলাপের পসরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদারঙের ছোট্ট একতলা বাড়ি। বাড়ির ঠিক পেছন থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে ঘন সবুজ জঙ্গল। ছবিতে আশপাশটা যতদূর দেখা যাচ্ছে, অন্য কোনও বাড়ি বা জনবসতি নেই।
আহা! টার্গেট-ডেডলাইন-রেটিং-পারফর্ম্যান্স রিভিউয়ের পচা পাঁক থেকে নিজেকে ডিটক্স করার জন্য প্রকৃতির কোলে এমনই একটা শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশই তো সে খুঁজছিল। লোকালয় থেকে দূরে যেখানে সারাদিন ফোনের চ্যাঁ ভ্যাঁ থাকবে না, শুধু কানে আসবে পাখির ডাক আর পাহাড়ি ঝরণার কলকলানি। কম্পিউটার স্ক্রিনের চোখ জ্বালানো ডিসপ্লের বদলে জানালা খুললেই দেখা যাবে পাহাড়, আকাশ আর জঙ্গল।
রুমের ভেতরের ছবিটা তো আরও লোভনীয়। সাদা চাদর পাতা বিছানার পাশে সুদৃশ্য কাঠের প্যানেলিং করা জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এই জানালার পাশে কফি আর পছন্দের বই নিয়ে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতেই হয়তো কাটিয়ে দেওয়া যাবে দুটো দিন। ছবির একদম নীচে ছোট করে লেখা রুংচাম, ইস্ট সিকিম। মুগ্ধ গলায় অরিজিৎ বলল, ‘জায়গাটা কোথায়? কতক্ষণ লাগবে পৌঁছতে ? ’ ডেভিড মুচকি হেসে গাড়ির দরজা খুলে দিল।
লাঞ্চে একটা দুর্দান্ত নেপালি থালি খাওয়ার পর চোখ লেগে এসেছিল অরিজিতের। গত দুটো সপ্তাহ টানা প্রায় দশ-বারো ঘণ্টা করে অফিস করেছে সে, শনি-রোববারের ছুটিটুকুও জোটেনি। ব্যাঙ্কের ইন্টারনাল অডিট একবার শুরু হলে ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের দম ফেলার ফুরসত কি আর থাকে! ছুটি তো দুরস্থ! প্রতি মুহূর্তে অডিটরের মন জুগিয়ে চলা, উঠতে বসতে ঝাড় খাওয়া এবং দেওয়া, সেই সঙ্গে রেটিং কেমন হবে সেই চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে যাওয়া ইত্যাদির চাপে আরেকটু হলেই প্রায় ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিল অরিজিৎ।
তাই যেদিনই সে জানতে পারল যে পরেরদিন অডিট শেষ হচ্ছে, সকাল সকাল একটা তৎকাল টিকিট কাটার জন্য হত্যে দিয়েছিল রেলের অনলাইন অ্যাপে৷ কপাল ভালো, টিকিট জুটেও গেল একটা। পাহাড়ই তার একমাত্র মুক্তির পথ, তার সমস্ত মনখারাপের ওষুধ। তাই শুক্রবার অফিস সেরে একখানা ব্যাকপ্যাকে টুকিটাকি কিছু জিনিস ভরে নিয়েই চড়ে বসেছিল রাতের ট্রেনে।
এক ঝলক কনকনে বাতাস এসে হাড়ের ভেতর অবধি কাঁপিয়ে দেওয়াতে ঘুমটা ভেঙে গেল। ডেভিড ড্রাইভার সিটের পাশের জানালাটা খুলেছে, তাতেই মালুম হচ্ছে বাইরে বেশ ঠান্ডা। মোটা হুডিটা বের করে গায়ে চাপাতে চাপাতে বলল, ‘আর কতক্ষণ দাদা?’
‘এই তো স্যার, এসে গেছি। আর মিনিট কুড়ি।’
এনজেপি থেকে বেরোনোর সময় ড্রাইভার বলেছিল ঘণ্টা ছয়েক লাগবে। মাঝে লাঞ্চ আর গাড়ির তেল ভরার জন্য সব মিলিয়ে আরো এক ঘণ্টা লেগেছে৷ এখানে আকাশ এখনও বেশ পরিষ্কার। জানালার বাইরে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, সেই আনন্দে মেঘেরা যেন লাল-কমলা-সোনালি রঙে হোলি খেলেছে! এমন জিনিস কাচের ওপার থেকে দেখে ঠিক পোষায় না। অরিজিৎ জানালার কাচ নামিয়ে দিয়ে বাইরের দিকে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘এখানে বরফ টরফ পড়ে?’
ডেভিড সাবধানে সরু বাঁকগুলো কাটাতে কাটাতে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, ভালোই
পড়ে। তখন হোমস্টে বন্ধ করে নীচের গ্রামে নেমে যেতে হয়। আসলে এখানে তো তেমন জিনিসপত্র পাওয়া যায় না, সবই আনতে হয় সেই নীচের বাজার থেকে। তাছাড়া বরফের মধ্যে ট্যুরিস্টও আসে না। শুধু শুধু হোমস্টে খুলে রেখেই বা কী লাভ? আবার দু-তিন মাস পর বরফ গললে নতুন সিজন শুরু হয়। এই সিজনে আপনিই বোধহয় লাস্ট গেস্ট।’
দূরে বাঁকের পাশে একটা জংলা ছাপওলা জিপ দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিকে দেখিয়ে ডেভিড বলল, ‘ওই যে, মিসেস গুরুং এসে গেছেন। এবার আপনি ওঁর গাড়িতে যাবেন।”
পুরোনো লঝঝরে জিপ। ডেভিড আগেই অবশ্য বলেছিল ব্যাপারটা। হোমস্টেতে পৌঁছানোর রাস্তা গেছে একটা ঘন পাইন বনের ভেতর দিয়ে। সে রাস্তা বেশ ভালোই দুর্গম, ঠিকঠাক চেনা না থাকলে সোজা খাদে গিয়ে পড়তে পারে গাড়ি। তাই গেস্টদের রিসিভ করতে স্বয়ং মালকিন মিসেস গুরুংই আসেন।
তাকে নামিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে চলে গেল ডেভিড। যাওয়ার আগে বলল, ‘সাইট সিয়িং করতে চাইলে ফোন করবেন স্যার! এনজয় ইয়োর হলিডে।’
দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন মিসেস গুরুং। রোগা শরীরটা যেন সামনের দিকে খানিক ঝুঁকে রয়েছে, মাথায় চওড়া সিঁথির দুপাশে পাতলা পাতলা কয়েক গাছি সাদা চুল পেছনে টেনে বাঁধা। খুদে খুদে চোখ জোড়াতে যতদূর সম্ভব আন্তরিকতা ফুটিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, ‘আপনার লাগেজ স্যার? দিন, আমাকে দিন।’
‘না না, এই তো একটা মাত্র ব্যাগ, আমি নিয়ে নিচ্ছি।’ বলে গাড়িতে উঠে পড়ল অরিজিৎ।
কিছুটা এগোনোর পর বোঝা গেল এ রাস্তাকে শুধু দুর্গম বলা উচিত নয়। কারণ তার জন্য একটা রাস্তা অন্তত থাকতে হয়। এ হল পাহাড়ের গায়ে ছোট নুড়ি-পাথরের ফাঁক দিয়ে পায়ে চলা একটা খাড়াই পথ গোছের জিনিস। যার ওপর দিয়ে গাড়ি তুলে দিলেন মিসেস গুরুং। গোঁ-গোঁ করতে করতে জিপ এগোচ্ছে বীরবিক্রমে। ড্রাইভারের দক্ষ হাত বুঝিয়ে দিচ্ছে এ রাস্তায় তাঁর নিয়মিত যাতায়াত আছে, তবুও কথাবার্তা চালাতে ঠিক সাহস পেল না অরিজিৎ।
পাইনবনের ভেতর একটা কুয়াশামাখা চটচটে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। মাথার ওপর গাছপালার চাঁদোয়ার ভেতর দিয়ে আকাশ প্রায় দেখাই যায় না। যতটুকুনি চোখে পড়ে, সেখানে উজ্জ্বল লাল কমলা মেঘেদের ওপরে চড়াও হয়েছে গাঢ় কালচে বেগুনি রঙের মেঘের দল। এই বিপজ্জনক পরিবেশে ড্রাইভারের মনোযোগ নড়ে যাওয়ার মতো কোনও কাজই করা ঠিক নয়।
ভেজা ভেজা পথের দুপাশে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা গাছেদের মাঝখান দিয়ে বিকট আওয়াজ তুলে লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছে গাড়ি, এছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। বনের মধ্যে ঢোকা মাত্র টেম্পারেচর যেন কয়েক ডিগ্রি কমে গেছিল৷ এতক্ষণ
গলা অবধি চেন টেনে হুডিতে মাথা ঢেকেও রীতিমতো কাঁপছিল অরিজিৎ, এবার সেই সঙ্গে গাড়ির ভেতর প্রবল ঝাঁকুনি খেতে খেতে ভাবতে থাকল এই হোমস্টেতে থাকার ডিসিশনটা কি ঠিক হল ? যাকগে, ভেবে লাভ নেই। একবার পৌঁছে গেলে এই দুটো দিন তো ল্যাদ খেয়েই কেটে যাবে, এই রাস্তায় আসা আবার সেই ফেরার দিন। ডেভিড যতই বলুক, ওসব সাইট সিয়িং-টিয়িং-এর কোনও মতলব তার নেই।
ঝাঁকুনি খেতে খেতে সেই তিন কিলোমিটার খাড়াই রাস্তা একসময় শেষ হল। ধীরে ধীরে একটা অপেক্ষাকৃত সমতল জায়গায় উঠে এল গাড়ি। উৎসুক চোখে সামনের সিটের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করল অরিজিৎ।
একটা সামান্য জংধরা লোহার গেট, তার পেছনে একটা সরু চাতালের একপাশে টিমটিম করে জ্বলছে একটা চল্লিশ ওয়াটের বাল্ব। সেই ফ্যাকাশে সাদা আলোয় অন্ধকার যেন আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। ভাতের ফ্যানের মতো সেই হড়হড়ে সাদাটে আলোয় গোলাপ বাগান-টাগান তো দেখা যায়ই না, শুধু বোঝা যায়, একটা একতলা বাড়ির অবয়ব আর তার সামনের দিকের রঙ-চটা দেওয়াল।
শশব্যস্ত হয়ে নেমে অরিজিতের সামনে দরজা খুলে দিলেন মিসেস গুরুং। তার গলায় একটা সরু লম্বাটে কাপড় পরিয়ে দিয়ে বাড়িয়ে ধরলেন রিবন বাঁধা ছোট্ট চৌকো মতো একটা জিনিস। তারপর বাও করার ভঙ্গিতে অদ্ভুত ভাবে বলে উঠলেন, ‘ওয়েলকাম টু দ্য রোজভিউ হোমস্টে!”
শব্দটা গোলাপ গাছের মরা ডাল থেকে আসছিল। একটা ছোট্ট গোল মতো পোকা সমানে শুকনো পাতা চিবিয়ে যাচ্ছে আর কিট কিট করে শব্দ করছে। একদৃষ্টে পোকাটাকে লক্ষ্য করছিল অরিজিৎ। কালো পুঁতির মতো গোল, ঠিক মাঝ বরাবর অংশটা শনির বলয়ের মতো রিং তৈরি করেছে। সেই রিং আবার মাঝে মাঝে ঢাকনার মতো খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। খোঁচা খোঁচা কী যেন আছে ঢাকনার ভেতরে। খোলার সময় ভেতর থেকে সরু মতো কিছু একটা বেরিয়ে খাদ্যবস্তুকে ছোবল মেরেই ঢুকে যাচ্ছে। কী পোকা কে জানে!
চাপা গলায় ‘গুডমর্নিং’ ভেসে এল। প্লাস্টিকের টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা ম্যাগির বাটি আর কফির কাপ বসিয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেলেন মিসেস গুরুং। মহিলা বড্ড কম কথা বলেন। যেটুকুনিও বলেন, তাতে যেন পরম ক্লান্তি জড়িয়ে থাকে। যেন একেবারে কথা না বলতে পারলেই খুশি হতেন। তাছাড়া মুখের ভাবও সবসময়ই কেমন বিষণ্ণ
ম্যাগির বাটিটা টেনে নিয়ে সামনের বাগানের দিকে তাকাল অরিজিৎ। হায়রে রোজভিউ! যে ফুল দেখানোর লোভে এই হোমস্টেতে পাবলিক টানার চেষ্টা করা হয়, সেই ফুল আর তার গাছেদের যে কী করুণ দশা সেটা আজ সকালে জানালা খুলেই সে বুঝেছে।
ডেভিড বলে লোকটা যে ঝলমলে ছবি দেখিয়েছিল সেটা স্রেফ ভাঁওতাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনও একসময় হয়তো বাগান-টাগান ছিল, কিন্তু এখন সামনের
নিচু বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গাটায় কিছু শুকনো ডাল আর দু-এক কুচি শুকনো পাতা লেগে থাকা গাছের কঙ্কাল ছাড়া আর কিছুই নেই। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন আগুন লেগে অথবা কোনও রোগের প্রভাবে পুড়ে ঝলসে গেছে গাছগুলো। ওই পোকাগুলোর জন্যই কি?
শুধু বাগানই নয়, পুরো হোমস্টের পরিবেশটাই তার মালকিনের মতোই কেমন যেন মলিন আর ক্ষয়াটে। একতলা বাড়িটার এখানে ওখানে রঙ চটে পলেস্তারা খসে পড়ছে৷ কিছু কিছু জায়গায় দেওয়ালে নোনা ধরা। চারিদিকে আগাছার জঙ্গল গজিয়েছে। দেখভালের অভাব স্পষ্ট বোঝা যায়। সেটা সম্ভবত লোকবল না থাকার কারণে। গতকাল সন্ধে থেকে এখনও পর্যন্ত মিসেস গুরুং ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও মানুষকে অরিজিৎ দেখতে পায়নি। রান্না করা থেকে পরিবেশন কিংবা ঘর-দোর সাফ সবকিছুই একা হাতে করছেন মহিলা।
তবে হোমস্টে আর তার বাগান যেমনই হোক না কেন, প্রকৃতি যেন তার সৌন্দর্যের ঝাঁপি উপুড় করে ঢেলে দিয়েছে এখানে। তুঁতে রঙা আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ আলখাল্লা পরা পাহাড়, আর সবার ওপরে রুপোর মুকুট পড়ে মোহময়ী ভঙ্গিতে তাদের দিকে নজর বোলাচ্ছে পাহাড়ের রানি। ছবির বাগানের মতো বাইরের দৃশ্যটা অন্তত ফেক নয়। সত্যিই জানালা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। এই একটা মাত্র গেস্টরুম হওয়ার কারণে রুমের ভেতরটা মোটামুটি পরিষ্কারপরিচ্ছন্নই রেখেছেন মিসেস গুরুং। গতকাল ওঁর দেওয়া ফিতে বাঁধা মোড়কটা খুলল অরিজিৎ। একটা বাদাম তক্তি। এক কামড় খেয়ে দেখল, মন্দ নয়। এবার উপুড় হয়ে একটা জমজমাট থ্রিলার পড়তে পড়তে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফেললেই হয়। তারপর না হয় একবার জঙ্গলের দিকটায় একটু হাঁটাহাঁটি করে আসবে।
খাটে বসে এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ শরীরে একটা কারেন্ট শক খেল অরিজিৎ! একটা অস্ফুট চিৎকার করে সে তাকাল ডান পায়ের গোড়ালির দিকে। কী যেন কামড়াল! গোড়ালির ওপর দিকটায় পাশাপাশি দুটো আঁচড়ের দাগ। বেশ গভীর, সরু রক্তের ধারা ফুটে উঠেছে। যন্ত্রণায় বিকৃত মুখে এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখতে পেল চারটে উপাঙ্গয় ভর করে প্রবল গতিতে খাটের নীচে ঢুকে পড়ছে সেই কালো পোকা !
খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাথরুমে ঢুকে ট্যাপ চালাল। মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে যাচ্ছে। এইমাত্র ভাবছিল গেস্টরুম অন্তত সাফ রেখেছেন মহিলা, কিন্তু এখানেও পোকা-মাকড় ! নাহ, এবারে মুখ খুলতেই হবে। দু-দিনই হোক বা দু-ঘণ্টা, মানুষের থাকার জন্যে অন্তত বেসিক পরিচ্ছন্নতাটুকু তো দরকার! এখানে লোকে বেড়াতে আসে, রিল্যাক্স করতে আসে, সেখানে ঘরে এরকম হিংস্র পোকা থাকলে আর যাই হোক নিশ্চিন্তে ঘুমানোও যাবে না।
ঠান্ডা জলে ভালো করে পা ধুয়ে টাওয়েলের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও থমকে গেল অরিজিৎ। ধবধবে সাদা টাওয়েলের ওপর একটা ছোট্ট কালো টিপের মতো বসে আছে সেই পোকা। কিট কিট শব্দ তুলে সমানে খেয়ে যাচ্ছে টাওয়েলের একটা কোণ এবার যেন তার মাথার ভেতর একটা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ হল। টাওয়েলটা তুলে ঝাড়তেই মেঝেতে পড়ল পোকাটা, সঙ্গে সঙ্গে চপ্পল সমেত একটা পা দিয়ে
সেটাকে থেঁতলে দিল অরিজিৎ। কিন্তু তার চোখের সামনে দিয়ে চপ্পলের ফাঁক গলে বেরিয়ে এল পোকাটা, তারপর সরসর করে দেওয়াল বেয়ে বাথরুমের জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
‘স্যার! স্যার।’
একটা মৃদু ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল। কে যেন প্রায় ফিসফিস করে একটানা ডেকে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে টোকা পড়ছে দরজায়। ধড়মড় করে উঠে বসল অরিজিৎ। কটা বাজে? কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? চোখ রগড়ে মোবাইলের ডিসপ্লেতে দেখল দুপুর দেড়টা। মানে প্রায় ঘণ্টা তিনেক
গা থেকে কম্বল সরিয়ে পা নামাতে গিয়ে বুঝল ব্যথা তো কমেইনি, বরং পায়ের পাতাটা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। তখন পা ধোয়ার পর ব্যাগে থাকা একটা অ্যান্টিসেপ্টিক মলম লাগিয়েছিল, কিন্তু তাতে তেমন কাজ হয়নি বোঝাই যাচ্ছে। পোকাটা বিষাক্ত কিনা কে জানে! কামড়ানোর কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ চোখের পাতা ভারী হয়ে ঘুম পেয়ে গেছিল। বইটা মুড়ে রেখে বালিশে মাথা রাখতেই সে তলিয়ে গেছিল ঘুমের অতল সমুদ্রে।
দরজা খুলে মিসেস গুরুং-এর মুখ দেখেই আবার দপ করে জ্বলে উঠল মাথার আগুনটা৷ মহিলা কখনওই সরাসরি মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেননি, এখনও মাথা নিচু করে কোনওমতে ‘লাঞ্চ রেডি হয়ে গেছে, খেয়ে নিন’ বলে ধাঁ করে বেরিয়ে গেলেন।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে স্নান সেরে হোমস্টের ডাইনিং রুমে এল অরিজিৎ। গতরাত্রে খুব টায়ার্ড ছিল বলে রুমেই ডিনার করেছিল। আজ ডাইনিং-এ এসে দেখল পাশেই ওপেন কিচেন, সেখানে দাঁড়িয়ে পেছন ঘুরে কী যেন করছেন মিসেস গুরুং। আর সেদিকে দেখা মাত্র রাগ-ঘৃণা-বিতৃষ্ণায় চোখমুখ কুঁচকে গেল তার।
এল শেপের স্ল্যাবের ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অজস্র জিনিস। তাকালেই গা ঘিন ঘিন করে। খোলা ময়দার প্যাকেটের চারপাশে গুঁড়ো, সবজির খোসা, ডিমের খোলা, দুধ উপচানো পোড়া সসপ্যান, তার গতরাতের উচ্ছিষ্ট সমেত এঁটো থালা… কী নেই! একটা ভ্যাপসা গুমোট গন্ধ পাক খাচ্ছে পুরো জায়গাটা জুড়ে। একদিকে ঝুড়ির ওপর ডাঁই করা আছে ফুলকপি, স্কোয়াশ, টমেটো ইত্যাদি সবজি, সবই প্রায় আধপচা। কয়েকটা মাছি তার ওপর ভনভন করছে, কিন্তু তাছাড়াও আরেকটা প্রাণীর উপস্থিতি নজরে পড়ল অরিজিতের।
সেই কালো পোকা !
মাথা নিচু করে ছুরি দিয়ে কিছু একটা কাটছেন মিসেস গুরুং, আর তার ঠিক পাশে একটা ঝুড়িতে রাখা পচে কালচে হয়ে ওঠা ফুলকপির ওপর বসে কিট কিট করে খাচ্ছে কয়েকটা কালো পোকা।
আর নিজেকে সামলাতে পারল না অরিজিৎ। চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এই আপনার রান্নাঘর। এখানে আপনি রান্না করে গেস্টদের খাবার দেন? ছিঃ। একটা নর্দমাও তো এর চেয়ে পরিষ্কার হয়।’
চমকে উঠে পেছনে ঘুরলেন মিসেস গুরুং। কী অস্বাভাবিক থমথমে তার মুখ! ‘চারদিকে শুধু পোকা আর পোকা! দেখুন ওই পোকা কামড়ে আমার পা’টার কী অবস্থা করেছে! এবার যদি ইনফেকশন হয়ে যায় তার দায়িত্ব কে নেবে, অ্যাঁ? রুমের ভেতরেও নিশ্চিন্তে থাকা যাবে না? আজ পোকা বেরিয়েছে, কাল সাপ বেরোবে না তার কী গ্যারান্টি? এই ভাবে রাখেন আপনি গেস্টদেরকে? ওই জন্যেই বোধহয় মানুষ আসে না এখানে। একটা ফটোশপ করা ছবি বানিয়ে রেখেছেন আর ড্রাইভাররা তাই দেখিয়ে ভুজুং ভাজুং দিয়ে ট্যুরিস্ট ডেকে আনছে! এরকম দুনম্বরি করতে লজ্জা করে না?’ গর্জন করে উঠল অরিজিৎ।
মিসেস গুরুং এবার একটা অদ্ভুত জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে সোজাসুজি তার দিকে তাকালেন। এই প্রথম। চোখের কোণে কি একটু কৌতুকের ঝলক ছিল? ঠোঁটের গোড়ায় আলতো ব্যঙ্গের হাসি? নাকি ভুল দেখল অরিজিৎ? কারণ পরমুহূর্তেই পাথুরে মুখ নিয়ে’ উলটোদিকে ঘুরে গেলেন মিসেস গুরুং। একটা থালার ওপর কী যেন সাজাচ্ছেন ! অরিজিতের গা চিড়বিড় করতে লাগল। কোনও তাপ-উত্তাপ নেই মহিলার! নাকি ভেবেছেন তিনি গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে না আসলে তো সে এখান থেকে বেরোতেও পারবে না, অতএব যা খুশি তাই করবেন!
এবার একটা স্টিলের থালা আর কয়েকটা বাটি নিয়ে এসে ঠক করে টেবিলের ওপর রাখলেন মিসেস গুরুং। ভাত, কীসের যেন একটা ঘ্যাঁট আর একটা ট্যালটেলে ডাল। সেদিকে তাকিয়েই বমি পেয়ে গেল অরিজিতের। কে জানে ওই পচা সবজি দিয়ে তৈরি কিনা!
মহিলা কিছু না বলে এখনও কেমন একটা অদ্ভুত ভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। সেই দৃষ্টি যেন তার সমস্ত রক্ত-মাংস-চামড়া-হাড় ভেদ করে সার্চলাইটের মতো পৌঁছে যাচ্ছে তার ভেতরের গভীরতম সত্তায়। অরিজিতের গা’টা কেমন শিরশির করে উঠল। মহিলা কি পাগল?
নিজের রুমে ফিরে এসে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল অরিজিৎ। ব্যাগে কিছু বিস্কুটের প্যাকেট আছে, তাই দিয়ে চালিয়ে দেবে। দরকার হলে জল খেয়ে থাকবে তাও ভালো, কিন্তু এখানকার খাবার আর নয়। একটা দিনের ব্যাপার, কালকেই তো ট্রেন। একবার এই পাহাড়ের মাথা থেকে নামুক, ফোনে টাওয়ার আসলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস করে দেবে রোজভিউ হোমস্টে’র ধান্দাবাজি। ব্যবসার নামে এরা কীভাবে মানুষকে হ্যারাস করছে সেটা সবার জানা দরকার। ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে আবার কম্বল টেনে শুয়ে পড়ল অরিজিৎ।
বাইরেটা মেঘ জমে কেমন ঘষা কাচের মতো লাগছে, কিছুই দেখা যায় না ৷ ঠান্ডাটা হঠাৎ চারগুণ বেড়ে গেছে। কম্বলে মাথাটা ঢাকা দিতে গিয়ে হঠাৎ কানে এল একটা চেনা শব্দ। কিট কিট কিট!
তড়াক করে খাটে উঠে বসে এদিক ওদিক দেখতে থাকল সে। আওয়াজটা ওপরের দিক থেকে আসছে। ছাদের দিকে তাকাতেই নজরে পড়ল সিলিংয়ের একদিকের কোণে। বেশ কিছুটা প্লাস্টার ফেটে সিমেন্টের অংশ বেরিয়ে এসেছে। সেখানে বসে আছে একটা ছোট্ট কালো পোকা।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা কনকনে স্রোত তার শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল। সিমেন্টের জায়গাটা কেমন উঁচু-নিচু, খোবলানো। পোকাটা কি ওটাও খাচ্ছে? গাছের পাতা, টাওয়েল, মানুষের চামড়া, সিমেন্ট… আর কী কী খায় এই রাক্ষুসে পোকা?
একটা গন্ধ আসছে। ভীষণ সুন্দর গন্ধ। মা যখন তেলের মধ্যে রাঁধুনি ফোড়ন দিয়ে মুসুর ডাল রান্না করে, ঠিক তেমন গন্ধ। আহ্! বুক ভরে শ্বাস টেনে অরিজিৎ চোখ খুলল ধীরে ধীরে। কটা বাজল? মা কি রান্না বসিয়ে দিয়েছে? তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নিতে হবে, অফিসে লেট হয়ে যাবে না হলে। কিন্তু কোথায় আছে সে? আস্তে আস্তে উঠে বসল খাটের ওপর। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ বেভুল ভাবে বসে থাকার পর মনে পড়ল সবকিছু। এটা সিকিমের সেই হোমস্টে।
দুপুরে লাঞ্চ না করেই ফিরে এসেছিল রুমে, তারপর সিলিংয়ের কাছে পোকাটাকে দেখতে পেয়ে সেটার দিকেই নজর দিয়ে বসেছিল। তারপর কখন যেন চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
সিলিংয়ের দিকে তাকাল অরিজিৎ। পোকাটা আর নেই। কিন্তু গন্ধটা? সেটা তো স্বপ্ন নয়! এই তো, এখনও দিব্যি রাঁধুনি দেওয়া ডালের গন্ধ পাচ্ছে। মিসেস গুরুং কি রান্না বসিয়েছেন? কিন্তু গন্ধটা আসছে ডানদিক দিয়ে, ওদিকে তো জঙ্গল। হোমস্টের কিচেন উলটোদিকে।
পা টেনে টেনে গিয়ে ডানদিকের জানালাটা খুলে দিল অরিজিৎ। আহ্, কী সুবাস! গন্ধে পেটের খিদেটা যেন চনমন করে উঠছে! ওই তো, জঙ্গলের মোটা মোটা গুঁড়িওলা আকাশছোঁয়া গাছ আর কোমর সমান উঁচু ঘন ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে গন্ধটা। নাহ, এ গন্ধটা এই হোমস্টের নয়। তাহলে কি ওই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অন্য কোনও রাস্তা আছে? অন্য কোনও হোটেল বা হোমস্টে ?
জ্বর বাড়ছে। পায়ের ঘা-টা ইনফেকশন হয়ে গেছে বোধহয়। দু-খানা কম্বল জড়িয়ে কোনওমতে রুমের বাইরে বেরোল অরিজিৎ। যতই চিৎকার চেঁচামেচি করুক, ওষুধের জন্য এখন মিসেস গুরুং-এর কাছে গিয়েই দাঁড়াতে হবে। খিদের চোটে পেটের ভেতর নাড়িভুঁড়ি পাক দিয়ে উঠছে। কিন্তু কী আশ্চর্য। মহিলা গেলেন কোথায়? পা-টার ওজন যেন কয়েক মণ হয়ে গেছে। তবুও সে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পা ঘষটে ঘষটে ঘুরতে থাকল গোটা হোমস্টেতে, চিৎকার করে ডাকতে লাগল মিসেস গুরুংয়ের নাম ধরে। কেউ কোত্থাও নেই !
প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেছে। চিৎকার করে করে গলাটা শিরীষ কাগজের মতো খরখরে হয়ে গেছে৷ তাকে এখানে একা ফেলে রেখে কি চলে গেলেন মহিলা? এখন সে কী খাবে? ফিরবে কী করে? হঠাৎ প্রচণ্ড শীত করছে তার। এই জনমানবহীন পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকায় সে একা, একেবারে একা। কেউ জানে না তার এখানে আসার কথা, কাউকে জানানোর আর উপায়ও নেই।
ওই পাইন বনের রাস্তাটা কোনদিকে ছিল? মাথার ভেতরটা কেমন যেন ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে, কিচ্ছু মনে পড়ছে না। শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জমাট বেঁধে যাচ্ছে। তাহলে কি জঙ্গলের মাঝে এই নির্জন পুরীতে ধীরে ধীরে না খেতে পেয়েই মরে যাবে সে? নাকি তার আগেই পায়ের ওই দগদগে ঘা-টা সারা শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে পচিয়ে ফেলবে সবকিছু? ওই যন্ত্রণাতেই দন্ধে দগ্ধে মরতে হবে তাকে? কিন্তু কেন? মিসেস গুরুং-এর কোনও ক্ষতি তো সে করেনি! তাহলে উনি এরকম কেন করলেন?
কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়ল অরিজিৎ। বাইরে পাহাড় আর জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে ফেনার মতো গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে কালো কুয়াশা, ধীরে ধীরে গিলে ফেলছে চারদিকের দৃশ্যপট। মানুষের হই-হট্টগোল, গাড়ির হর্ন, বাজারের ভিড়—যে সমস্ত জিনিসের হাত থেকে বাঁচতে সে পাহাড়ে মুক্তি খুঁজতে এসেছিল, এই মুহূর্তে সেই সব কোলাহলের জন্য বড্ড লোভ হচ্ছে তার। বড় সাধ জাগছে একটা রক্ত-মাংসে গড়া মানুষের মুখ দেখতে!
বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। যদি চিৎকার করে চারদিকের এই সমস্ত পাহাড়-পর্বত ফাটিয়ে ফেলে সে একবার জানান দিতে পারত যে সে আছে, এখনও বেঁচে আছে! কিন্তু এই পাহাড়, এই জঙ্গল, এই হোমস্টে… এ যেন পৃথিবী থেকে শত শত আলোকবর্ষ দূরের কোনও মৃত জগৎ, যেখানে সে ছাড়া আর অন্য কোনও জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব নেই।
না, আছে। ওরা আছে। শুধু ওরাই আছে৷
কানফাটানো কিট কিট আওয়াজ করে জানিয়ে দিচ্ছে তাদের প্রবল উপস্থিতি। একটু আগেই সে দেখেছে রান্না ঘরের স্টিলের থালাবাসনগুলো অবধি রেহাই পায়নি তাদের দানবিক খিদের কবল থেকে। এরপরে কি ওকেও ওইভাবে খুবলে খুবলে খেয়ে ফেলবে ওরা? এবার এক দলা অন্ধকার নেমে এল তার চেতনায়।
পাগলের মতো কিচেনের শেলফগুলো হাতড়াচ্ছিল অরিজিৎ। পোকা, পোকা, সর্বত্র সেই কালো পোকা! একে তো খাওয়ার যোগ্য কোনও জিনিস নেই এখানে, সবই নষ্ট নয়তো পচা… তার ওপর আবার সেই সব দুর্গন্ধযুক্ত পচা-গলা জিনিসের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্ষুধার্ত পোকার দল। চাল-ডাল, বাসন-কোসন থেকে শুরু করে ইট-কাঠ-পাথর অবধি সমস্ত জায়গাতেই তাদের হিংস্র আক্রমণ চালাচ্ছে।
বীভৎস ভাবে ফুলে ওঠা পা’টার দিকে তাকিয়ে যতটা সম্ভব দূর থেকেই তল্লাশি চালাচ্ছে সে। বেশি কাছাকাছি গেলেই যেন আরও হিংস্র হয়ে উঠছে পোকাগুলো, রণযোদ্ধার ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করছে। বাগানের পাশের বেড়া থেকে একটা
শক্তপোক্ত কঞ্চি তুলে এনেছে অরিজিৎ, আপাতত তাতে ভর করেই হাঁটছে কোনও রকমে। তার ব্যাগ, ব্যাগে থাকা বিস্কুট-ওষুধ- জামাকাপড় সব কিছুই এখন পোকাদের দখলে। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যে এই আস্ত বাড়িটাই খেয়ে ফেলবে ওরা।
কিন্তু খিদে তো ওদের একার নয়। খিদের একটা লকলকে শিখা তো সেই কখন থেকে জ্বলছে অরিজিতের পেটের ভেতরেও। গতকাল সকালে শেষ বারের মতো খাবার খেয়েছিল সে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় সারাটা রাত অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল সামনের উঠোনে, শেষমেশ একসময় সেই পেটের আগুনই বাড়তে বাড়তে জাগিয়ে তুলেছে তাকে৷
সরু চোখে চারদিকে তাকাল অরিজিৎ। কীভাবে এই পোকাদের নজর এড়িয়ে একটু খাবার জোগাড় করা যায়? একটা গলে যাওয়া আধপচা টমেটোর দিকে তাকিয়ে সবে ভাবছিল এটাকে কোনওভাবে হস্তগত করা যায় কিনা, তখনই একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ এসে ঝংকার দিল তার ভেতরের স্নায়ুতন্ত্রে। বিরিয়ানি! এ তো একদম তাদের পাড়ার মোড়ের বিরিয়ানির গন্ধ! খিদের চোটে সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? এখানে বিরিয়ানি আসবে কোত্থেকে? দু-হাতে মাথাটা টিপে ধরল অরিজিৎ। আবার সেই জঙ্গলের দিক থেকেই আসছে গন্ধটা৷
একটা আবছা স্মৃতির মতো মনে পড়ল, গতকাল রাতেও অচেতনতার পর্দার ওপার থেকে সে পেয়েছিল নানা রকম খাবারের সুগন্ধ। এমনকী গতকাল দুপুরেও তো পেয়েছিল! হঠাৎ একটা কথা মনে হওয়ায় লাঠিতে ভর করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। এই কথাটা এতক্ষণ মনে হয়নি কেন? ওই জঙ্গলের ওপারেও তো মানুষের বসতি থাকতে পারে!
লাঠি ঠুকে ঠুকে হোমস্টে থেকে বেরিয়ে এল অরিজিৎ। পেছনে কিছুটা ফাঁকা জায়গার পর তারের জালি দিয়ে ঘেরা বেড়া, তার ওপার থেকে শুরু হয়েছে গহীন জঙ্গল। কিন্তু অস্পষ্ট হলেও একটা পায়ে চলা পথ দেখা যাচ্ছে তার মাঝখান দিয়ে৷ তার মানে ঠিকই ভেবেছিল সে! এই রাস্তায় মানুষের চলাচল আছে! ধুত্তোর, এতটা নার্ভাস হওয়ার কী দরকার ছিল! গতকাল বিকেলেই এদিকটায় খোঁজ করলে এতটা ভোগান্তি হতো না।
বুক ভরে শ্বাস টেনে নিয়ে নতুন উদ্যমে হাঁটতে শুরু করল অরিজিৎ। এই মুহূর্তে বাতাসে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে, অনেকটা নলেন গুড়ের পায়েসের মতো। তার ঠাকুমা বানাত। ঝোপঝাড় পেরিয়ে এগোতে গিয়ে হাত-পা কেটে যাচ্ছে, কাঁটাও ফুটছে এখানে সেখানে… তবুও সব কিছু বড় সুন্দর লাগছে তার। ভোরের আলো গাছপালার ফাঁক গলে স্পটলাইটের মতো এসে পড়ছে, প্রজাপতিরা ওড়াউড়ি করছে ফুলে ফুলে। এবার ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু। নিশ্চয়ই একটা মানুষের দেখা মিলবে। মিনিট দশেক পর হঠাৎ মনে হল কিছুদূরের একটা গাছের গুঁড়ির পেছনে যেন একটা মানুষের অবয়ব দেখা যাচ্ছে! শরীরের সব শক্তি দিয়ে প্রবল বেগে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এগিয়ে চলল সে। হ্যাঁ, ওই তো, ফ্রক পরে দাঁড়িয়ে আছে একটা বছর দশেকের মেয়ে! তার পায়ের শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাল। চোখে জল চলে এল অরিজিতের। উফ, মুক্তি!
মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে দেখছে অরিজিতের দিকে। এই ঠান্ডায়ও গায়ে একটা ছেঁড়াখোঁড়া পাতলা সোয়েটার, ফ্রকের বিভিন্ন জায়গাও ছিঁড়ে গেছে। আরেকটু কাছে এগোতে বুঝতে পারল মেয়েটার সারা গায়ে অজস্র আঘাতের চিহ্ন। পায়ের খোলা অংশ, কনুই, ঠোঁটের কোণ, কপাল বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত ঝরছে। আহারে, কোথাও পড়ে গেছিল নাকি। তার চোখমুখের মঙ্গোলীয় ধাঁচ বুঝিয়ে দিচ্ছে সে এই অঞ্চলেরই মেয়ে৷
অরিজিৎ একদম সামনে গিয়ে কাতরস্বরে মেয়েটাকে বলল, ‘তুমি কোথায় থাকো খুকি? আমি খুব বিপদে পড়েছি, তোমার বাড়ি নিয়ে যাবে আমায় ? কোথায় তোমার বাড়ি?’
মেয়েটা শান্ত ভাবে একদিকে ঘাড় নাড়ল, তারপর নিষ্পাপ ভঙ্গিতে আঙুল তুলে দেখাল কিছু একটা। অরিজিৎ দেখল বেশ কিছুটা দূরে গাছপালার ফাঁকে একটা কাঠের বাড়ির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মেয়েটা হাঁটতে শুরু করেছে। সেও পেছন পেছন এগোল। জিনিসটাকে ঠিক ঘর বা বাড়ি বলা যায় না। একটা ছোট্ট দশ ফুট বাই দশ ফুটের ছোট্ট কাঠের কেবিন, যার তক্তাগুলো জলে ভিজে বিশ্রী ভাবে ফুলে উঠেছে। বেশ কিছু জায়গায় ফুটো, এছাড়া সারা গায়ে সবজেটে শ্যাওলা তো আছেই। খুবই অভাবী পরিবার, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মেয়েটা কাঠের দরজাটা খুলে ঢুকল, পিছু পিছু অরিজিৎও।
ভেতরে অজস্র ভাঙ্গাচোরা জিনিস ডাঁই করে রাখা, সেই সঙ্গে দমবন্ধ করা একটা উৎকট গন্ধ। অরিজিতের মাথার ভেতর কেমন একটা পাগলাঘণ্টি বেজে উঠল! এটা কোন জায়গা? এ তো কারও বাড়ি হতে পারে না! হঠাৎ কানের দুপাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘পালাও! পালাও এখান থেকে!’ সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াতে গেল সে, কিন্তু এক চুলও নাড়াতে পারল না শরীরটা।
অরিজিতের শরীরের সব রক্ত হঠাৎ যেন জমাট বেঁধে গেছে। বুঝতে পারছে মাংসপেশীগুলো আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। কারণ এই মুহূর্তে কোনও এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ধীরে ধীরে মাটির দিকে নেমে যাচ্ছে তার শরীর। নীচের দিকে তাকাতেই একটা আতঙ্কের আর্তনাদ ছিটকে এল তার গলা দিয়ে।
এক ঝাঁক কালো পোকা সুশৃঙ্খল সৈনিকের মতো সার দিয়ে তৈরি করেছে একটা কালো পুঁতির মালা, আর তেমনই বেশ কয়েক ছড়া মালা তার জামা-কাপড়ের বিভিন্ন জায়গায় আটকে অপার্থিব দানবীয় শক্তিতে তাকে টেনে শুইয়ে দিচ্ছে মাটিতে!
বীভৎস আতঙ্কে বলির পাঁঠার মতো ছটফট করতে করতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল অরিজিৎ, কিন্তু সেই শয়তানি সৈন্যদলের মিলিত শক্তির কাছে সে বড় অসহায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার শরীরটা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল মাটিতে।
ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল সেই বছর দশেকের বালিকা। তার বুভুক্ষু চোখ দুখানা তখন আগুনের ফুলকির মতো জ্বলছে। ধীরে ধীরে অরিজিতের বুকের ওপর চড়ে বসল সে। আর ঠিক তারপরেই খুলে গেল তার মুখের প্রায় দ্বিগুণ আকৃতির বিশাল বড় এক হাঁ। আর তার মধ্যে দুই পাটি ছুরির মতো ধারালো দাঁতের সারির
মধ্যে সাপের মতো দুলতে থাকা টকটকে লাল জিভ। বোবা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া অরিজিতের ঠিকরে আসা চোখ দুটো শেষবারের মতো দেখল নরকের খোলা দরজার মতো তার দিকে নেমে আসছে সেই মৃত্যু-গহ্বর।
ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সাকশন পাম্পের মতো অরিজিতের শরীরের সমস্ত রক্ত-মেদমজ্জা শুষে নিল অস্বাভাবিক বড় হাঁ-ওলা সেই বাচ্চা মেয়েটা।
অজয় তামাং-এর বেকারি শপের কাউন্টারে সেদিন বসেছিল দিনু বলে নতুন ছেলেটা। মিসেস গুরুং প্রতিমাসের মতো একবাক্স বাদাম তক্তি কিনে পয়সা মিটিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। দিনু বৃদ্ধ অজয়ের দিকে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এই আন্টি প্রতিমাসে শুধু ওই এক বাদাম তক্তি কেন কিনে নিয়ে যায় গো? অন্য কোনও কেক-বিস্কুট তো নিতে দেখি না?’
অজয় খবরের কাগজ পড়ছিলেন। চশমার ওপর দিয়ে একবার দেখে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কে? ন্যান্সি? বেচারী মেয়েটা খুব দুঃখী রে।’ ‘দুঃখী কেন?”
‘এই বাদাম তক্তি ওর মেয়ের খুব পছন্দের ছিল। ওর মেয়ে প্রায় রোজই আমার দোকান থেকে এইটা কিনে নিয়ে যেত।”
‘তা সেই মেয়ে এখন কোথায়? কই আসে না তো?’
এবার পেপার মুড়ে সোজা হয়ে বসলেন অজয় তামাং। ‘সে অনেক লম্বা গল্প। বেশ ক বছর আগে, হ্যাঁ তা বছর দশেক তো হবেই… ন্যান্সি আর ওর বর ডেভিড মিলে একটা হোমস্টে খুলেছিল। এখানে না, আমাদের এই রুংচাম থেকে আরও প্রায় পনেরো-কুড়ি কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের একদম ডগায়। আসলে ডেভিডের বাপের থেকে পাওয়া জায়গাটা। সবাই ভেবেছিল ওইরকম দুর্গম জায়গায় হোমস্টে মোটেই চলবে না৷ কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার উলটো! নির্জন বলে অনেকেই সেখানে আসতে শুরু করল।
‘বর-বউ মিলে অনেক খাটাখাটনি করে দাঁড় করিয়েছিল ব্যবসাটা। পয়সার অভাবে একটা মাত্র রুম করতে পেরেছিল, কিন্তু সব কিছু খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিল। ডেভিডের খুব গোলাপের শখ ছিল, সেজন্য মেয়ের নামও রেখেছিল রোজ। হোমস্টের সামনে গোলাপের বাগান করা আর রোজভিউ নাম রাখাটাও ওরই আইডিয়া।
‘সব ভালোই চলছিল কিন্তু গন্ডগোলটা হল বছর খানেক পর। সেবার বরফ পড়া শুরু হতে হোমস্টে বন্ধ করে নীচে নেমে এল ওরা, কিন্তু নামার আগের দিন থেকে রোজকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। থানা-পুলিশ হল, সার্চপার্টি বেরোল কিন্তু ততদিনে বরফ পড়ে সব দিকের রাস্তাই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক মাস পর নতুন সিজন শুরু হলে আবার হোমস্টে খোলার পর জানা গেল সেই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদটা।
‘ওদের হোমস্টের পেছন দিকে জঙ্গলে একটা ছোট গুদাম ঘর টাইপের লগকেবিন বানিয়েছিল ডেভিড। সেটা খুলতেই সেখান থেকে বেরোল রোজের পচাগলা বডি। পুলিশ পোস্টমর্টেম করে বলেছিল ওকে রেপ করা হয়েছিল, কিন্তু মারা গেছে স্টার্ভেশনে
সম্ভবত নামার আগে ওদের লাস্ট গেস্ট ছিল যে ছেলেটা, সে ওদের চোখের আড়ালে রোজকে রেপ করে। তারপর মরে গেছে ভেবে ওই লগকেবিনে আটকে রেখে চলে যায়। কিন্তু তার পরেও বেঁচে ছিল মেয়েটা, আর ওই কয়েক মাস ধরে খিদের জ্বালায় ধুঁকে ধুঁকে একটু একটু করে মরেছে কিন্তু কেউ জানতেও পারেনি। উফ, কী ভয়ানক ! একটু থামলেন বৃদ্ধ। সারাক্ষণ ফটরফটর করতে থাকা দিনুও এমন ঘটনা শুনে
চুপ মেরে গেছে৷ মিসেস গুরুং-এর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ধরা গলায় অজয় বললেন, ‘সেই শয়তান ছেলেটার খোঁজ পুলিশ আর পায়নি।
‘কিন্তু জীবন ওলটপালট হয়ে গেল ন্যান্সি আর ডেভিডের। প্রায় পাগল হয়ে গেল দুজনে৷ হোমস্টে চালানোর মতো মানসিক অবস্থা আর ছিল না ওদের, এমন ঘটনার পর কেউ হোমস্টেটা কিনতেও চাইল না। এখনও বোধহয় ওরকমই পড়ে আছে বাড়িটা, ন্যান্সি হয়তো মাঝেমধ্যে যায়। শুনেছি ডেভিড এখন এনজেপিতে ভাড়ার গাড়ি চালায়। কেমন বুড়িয়ে গেছে তরতাজা মানুষ দুটো, ওই কোনওমতে মরে বেঁচে আছে আর কী! ন্যান্সি এখনও মেয়ের পছন্দের খাবার কিনে নিয়ে যায়। সন্তানশোক কি আর সহজে ভুলতে পারে কেউ?’ চোখের কোনার জলটুকু মুছলেন অজয় তামাং।
বরফ গলে গেছে, নতুন সিজন শুরু হয়েছে আবার। ওই তো, ওই দেখা যাচ্ছে মিসেস গুরুং-এর জংলাছাপ জিপ। একটা বড় পাথরের চাঁইকে খুবলে খেতে খেতে সচকিত হয়ে উঠল অরিজিৎ। তার নাম অবশ্য এখন আর অরিজিৎ নয়। আর কোনও পরিচয় নেই তার। শুধু আছে একটা ছোট কালো পুঁতির মতো শরীর। আর আছে একটা হাঁ, যার চারপাশে শনির উপগ্রহের মতো ঘিরে থাকা ঠোঁট আর তার ভেতরে সাজানো ক্ষুদে ক্ষুদে দাঁত-জিভ। দৌড়ে পালানোর জন্য হাত-পাও আছে বটে, এই হাঁএর নীচে সরু কাঠির মতো ঝোলে তারা। আর আছে খিদে। সব খায় সে। শাকসবজি, জামাকাপড়, সিমেন্ট-পাথর, মানুষ… সব।
গাড়ি থেকে নামছে একটা কমবয়সি ছেলে। মিসেস গুরুং ছেলেটাকে বাদাম তক্তি দেওয়া মাত্র কাজ শুরু হয়ে যাবে তাদের। কারণ বাদাম তক্তি তাদের মালকিনের সবচেয়ে প্রিয়। তারা সবাই অপেক্ষা করে আছে নতুন গেস্টের জন্য। আপাতত আবার পাথরটার দিকে মন দিল সে। ক্রমাগত খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে তার রিং এর মতো ঠোঁট, আর আওয়াজ আসছে কিট কিট কিট।
কিন্তু এখন সে জানে, ওটা কোনও কিট কিট শব্দ নয়। ওটা আসলে… খিদে। মহাশূন্যের মতো অসীম অনন্ত খিদে৷
