চাঁদ ডুবে গেলে – মোহনা দেবরায়
পকেট কেট থেকে ফোনটা বের করে মেসেজগুলো আরেকবার পড়ে সুজাত। ভ্রু’দুটো কুঁচকে যায় তার। ভীষণ ইন্টারেস্টিং কেস! অন্যমনস্কভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সে।
সুজাত চক্রবর্তী এখনকার একজন সেলিব্রিটি মনোবিদ। লোকে বলে, ওর কাছে দুটো-তিনটে সেশন করার পর নাকি আর সমস্যার কথা মনেই থাকে না সাহায্যপ্রার্থীর। ওর একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার জন্য প্রায় একমাসের ওপর অপেক্ষা করতে হয়। তবু লোকজন সুজাতর কাছেই আসে।
সারাদিন বিভিন্ন মানুষের সমস্যা আর অসুস্থতার কথা শুনে শুনে দিনের শেষে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে সুজাত। তার ওপর ফোনে রোজ আসা মেসেজের সংখ্যাও কম নয়। সেখানে ফ্রি’তে পরামর্শ চাওয়ার ভিড়টাই সবচেয়ে বেশি। অনেকে আবার ‘ঘরোয়া সমাধান’-এর জন্য কাউন্সেলিং শিখতেও চায়। ওর পেশায় এগুলো রোজকার ব্যাপার। এদেরকে সাধারণত উত্তরের প্রশ্রয়টুকুও দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না সে।
কিন্তু সেদিনের অনুরোধটা মোটেই সেরকম কিছু ছিল না। সাধারণ অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েই কথাটা উঠেছিল। তাই উত্তর দিয়েছিল সুজাত। কিন্তু তারপরেই এক অদ্ভুত আবদার করে বসে প্রেরক। সে বলে, তার আর্জেন্ট সেশন চাই। প্রয়োজনে সে বেশি টাকাও দিতে প্রস্তুত৷
এই ব্যাপারটা সুজাতর পেশাদারি নৈতিকতার বিরোধী—বেশি টাকা নিয়ে কাউকে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা দেওয়া, বা টাকার লোভে নিজের ব্যক্তিগত সময়ের সঙ্গে আপোশ করা! তাই সে নাকচ করেই দিচ্ছিল, কিন্তু তারপর যে মেসেজটা আসে, সেটা দেখে বিষয়টা আর অগ্রাহ্য করার উপায় থাকে না। প্রেরক সংক্ষেপে—এক লাইনের মধ্যে নিজের সমস্যাটা বলেছিল। আর সেটা দেখে সুজাতর ভিতরের মনোবিদটাকে যেন চ্যালেঞ্জ করেছিল কেউ !
অফ ডে থাকা সত্ত্বেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয় সে। অ্যাটেনডেন্টকে না ডেকে একাই চেম্বারে এসে বসে।
কিছুক্ষণ পরে কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসেন একজন মহিলা। বয়স আন্দাজ চল্লিশ। পরনে সুতির শাড়ি। কাঁধে ঝোলানো টোটব্যাগ। লম্বা চুলের গোছা খানিক আলগাভাবে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। বৈশিষ্ট্যহীন মুখশ্রী। কানে দুটো ছোট ছোট দুল ছাড়া গায়ে আর কোনও গয়না নেই। কবজিও শূন্য। সিঁথিতে লালের আভা আছে কিনা বোঝা যায় না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা চোখে পড়ে, সেটা হল মহিলার চোখ। কিছু একটা আছে সেই চোখে! এক নজরে দেখলে নিষ্প্রাণ বলে মনে হলেও আদতে তা নিষ্প্রাণ নয়।
টেবিলের উলটোদিকে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘নমস্কার, আমি রুক্মিণী সিনহা। আমিই মেসেজ করেছিলাম আপনাকে।
সুজাত প্রতি-নমস্কার জানিয়ে বসতে বলে ভদ্রমহিলাকে।
কিছুক্ষণ দুজনেই কোনও কথা বলে না। তারপর একসময় একটু হেসে রুক্মিণী জিগ্যেস করে, ‘আপনি কোনও প্রশ্ন করবেন না আমায় ?
সুজাতও একটু হেসে বলে, ‘অবশ্যই করব। কিন্তু আগে আপনার সমস্যাটার কথা শুনি। তারপর আমি আমার কাজ শুরু করব।’
ভদ্রমহিলা স্মিত মুখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন। তারপর বলেন, ‘সত্যি বলতে কী, আমার ব্যাপারটাকে আদৌ সমস্যার পর্যায়ে ফেলা যায় কিনা, আমি জানি না। যেটা লিখেছিলাম, ওটাই… ওটাই আমার একমাত্র সমস্যা। আমার ভয় করে না। ভয়ের অনুভূতি শূন্য হয়ে গেছে আমার।’
সুজাত মাথা নাড়ে। তারপর বলে, ‘এরকমটা হওয়ার পর কী কী পরিবর্তন হয়েছে আপনার জীবনে, যাতে মনে হল আপনার প্রফেশনাল হেল্প দরকার?’ ‘সত্যি বলতে, আমার জীবনে কোনও পরিবর্তনই হয়নি। বরং ব্যাপারটা বেশ এনজয় করছি। মনে হচ্ছে কেউ যেন মুক্ত করে দিয়েছে আমায়। তবে আমার হাজব্যান্ড
আর মেয়ে… এদের কনসার্ন একটু বেশি। সবসময় আমায় আগলে আগলে রাখছে। যদিও, আমি ওদের অবস্থাটা বুঝতে পারছি। ভয় করছে না বলে আমি নিজের অজান্তেই অনেক সময় এমন রিস্ক নিয়ে ফেলছি যে ওরা চিন্তিত হয়ে যাচ্ছে। আমি পরে রিয়ালাইজ করছি সেটা! বলতে পারেন খানিকটা ওদের কথা ভেবেই আপনার কাছে…’
‘আপনার মেয়ের বয়স কত?’
‘এই তো… তেরো।’
‘মেয়ে বা হাজব্যান্ড কেউ সঙ্গে এলেন না কেন?’
‘আমিই আনতে চাইনি। প্রথম সেশনটা আমি একাই করতে চেয়েছিলাম।…’ বলতে বলতে আচমকা মুখ টিপে হেসে ফেলে মহিলা৷
‘হাসছেন কেন?’
মাথা নেড়ে রুক্মিণী বলে, ‘আপনি তো বেশ পুলিশি জেরা শুরু করেছেন!” সুজাতও আলতো হেসে বলে, ‘আপনার কোনও প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন।”
‘আচ্ছা। এরকম কেন হচ্ছে আমার ? ’
‘এক্সাক্টলি সেটা জানার জন্য আমাকে কতগুলো প্রশ্ন করতে হবে।’
‘করুন না… আমার কোনও আপত্তি নেই।’
‘আচ্ছা এই যে আপনার… ভয় না পাওয়ার ব্যাপারটা, এর সঙ্গে আর কিছু
হচ্ছে? মানে অন্য কোনও চেঞ্জ? রাগ, বিরক্তি এগুলো কমেছে বা বেড়েছে? বা অন্য কোনও ফিলিংস্?’
‘না। সবই নর্মাল। বিরক্তি আমার বরাবরই একটু বেশি। বাকি আর যা যেরকম ছিল তাইই আছে।’
‘আচ্ছা এই ব্যাপারটা প্রথম রিয়ালাইজ করলেন কবে?’ একের পর এক রুটিন প্রশ্ন করে ব্যাপারটা বুঝে নিতে চাইল সুজাত।
‘গত সপ্তাহে। আমি এমনিতে হোম মেকার। একটা এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত। বাড়ি থেকে প্রায়শই বেরোতে হয়। ফিরতেও দেরি হয় মাঝেমধ্যে। সেদিনও হয়েছিল। বাড়ি
পৌঁছোনোর শেষ পাঁচ কিলোমিটার মতো রাস্তা অটো ধরতে হয়। বেশি রাত হলে ওই রাস্তায় আর অটো চলে না। সেদিনও চলছিল না। আমি ক্যাব বুক করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পরপর রাইড ক্যান্সেল করছিল সবাই।
‘একসময় বিরক্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করি। প্রায় এক ঘণ্টা ওই শুনশান রাস্তা ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরি। রূপম আর বিন্নি ততক্ষণে শুয়ে পড়েছিল। আমার ফিরতে দেরি হলে ওরা সাধারণত জেগে থাকে না। পরদিন সকালে ঘটনাটা ওদেরকে জানাই। খুব টেনশনে পড়ে যায় ওরা। আসলে ওই রাস্তাটার একটু বদনাম আছে।
‘তো যাই হোক, তারপরেই আমি আবিষ্কার করি, ওই রাস্তায় আসতে আসতে আমার একটুও ভয় করছিল না। সেই শুরু। তারপর অনেক রকম ঘটনা হয়েছে। একবার… এই পরশু, ঘরে একটা সাপ ঢুকেছিল বুঝলেন! কেউটে। আমরা একটু মফস্সলের দিকে থাকি তো, বর্ষাকালে সাপখোপ বেরোয় এখনও দু’একটা। আমি জাস্ট ল্যাজের কাছটা ধরে একটা ডান্ডা দিয়ে মাথাটাকে দূরে দূরে রেখে জিনিসটাকে ধরে এক টান মেরে বাড়ির পাশের জঙ্গলে ফেলে দিই।
‘এই পুরো কাজটা করতে আমার কিন্তু একবারও হাত কাঁপেনি, নার্ভ ফেল করেনি। রূপমের হয়তো ইচ্ছে ছিল ওটাকে মেরে ফেলার। কিন্তু সেসব আমার মাথাতেও আসেনি তখন। ওরা দুজনেই খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল আমার কাণ্ডকারখানা দেখে৷’ ‘আচ্ছা এই ব্যাপারটা শুরু হওয়ার আগে আপনি কেমন ভয় পেতেন? খুব কি ভিতু ছিলেন? না সাধারণ? ‘
রুক্মিণী একটু ভেবে নেয়, ‘উমমম… হ্যাঁ একটু ভিতু তো ছিলাম বলতেই হয়৷ বিশেষ করে শেষ কয়েক বছরে সব ভয়গুলো প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়েছিল। মানুষ, জন্তু জানোয়ার, পোকামাকড় সবাইকে ভয় পেতাম। আর…’ ‘আর?’
, রুক্মিণীর মুখটা একটু লালচে হয়, ‘আমার আরো একটা ভয় ছিল। অযৌক্তিক ভয় বলতে পারেন। যেটাকে পাতি বাংলায় বলে ভূতের ভয়। অন্ধকার ঘরে আমি একা থাকতে পারতাম না।’
‘এই ভয়টাও এখন আর নেই?’
‘না। সাধে কি বলছি মুক্ত লাগছে? এখন কোনও মালুমই পড়ে না। সব মিলিয়ে ভালো আছি মশাই! খালি হুটপাট অকারণ রিস্ক নেওয়ার ব্যাপারগুলো ছাড়া! ভালো লাগার সঙ্গে সঙ্গে ওইটাই একটা উৎপাত। রিস্ক ফ্যাক্টর অ্যাসেস করতে পারছি না।’
‘হুঁ! আচ্ছা আপনি জীবনে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন চান এই মুহূর্তে? ‘
‘আমি… জাস্ট পরিস্থিতির জাজমেন্টটা ফেরত চাই। যদিও এখন আমার এটা ভেবে ভয় করছে না যে যেকোনও দিন রিস্ক ফ্যাক্টর বুঝতে না পেরে পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে গেলে আমার কী হবে—কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে এই নিয়ে আমার ভয় হওয়া উচিত।’
‘আচ্ছা আর একটা প্রশ্ন করছি। আপনি এর মধ্যে কখনও অ্যাক্টিভলি নিজেকে
ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন? যেমন ধরুন… কোনও হরর মুভি দেখে? ‘
ওপর-নীচে মাথা নাড়ে রুক্মিণী, ‘অনেক। বীভৎস দৃশ্য দেখে ঘেন্না করছে, কিন্তু
ভয় লাগছে না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুজাত আবার প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা এই ভয় না লাগার ব্যাপারটার জন্য আপনাকে এর মধ্যে কোনও সিরিয়াস সমস্যায় পড়তে হয়েছে?’
‘না,’ একটু ভেবে বলে রুক্মিণী, ‘এখনও পর্যন্ত না। তবে মনে হয় পড়তে হবে। অদূর ভবিষ্যতে।’
‘কী ধরনের সমস্যা?’
‘আমি মারা যাব।’
খুব একটা অবাক হয় না সুজাত। তার পেশায় অপরপক্ষ থেকে এ জাতীয় কথা শোনা খুবই নর্মাল ব্যাপার। সে শান্ত গলায় বলে, ‘একথা কেন মনে হচ্ছে?’ ‘কারণ মাঝেমাঝে অদ্ভুত অদ্ভুত ইচ্ছে করে আমার।’ ‘কেমন ইচ্ছে?’
‘পরীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছে। এই ভয় না পাওয়ার ব্যাপারটা কতদূর যেতে পারে— তার পরীক্ষা!’
—যেমন?’
‘যেমন… আমার প্রায়শই খুব ইচ্ছে হয়… রাতে সদর দরজাটা বেশ বন্ধ না করি! খোলা থাক। দেখি কী হয়! এরকম।’
‘তাও তো রোজ দরজা আটকান। কেন? খুলে রাখেন না কেন?’
দু’পাশে মাথা নাড়ে মহিলা, ‘এই সব শুরু হওয়ার পর থেকে রূপম আর আমার হাতে বাড়ির সিকিউরিটির কিছু ছাড়ে না। নিজেই সবটা দেখে। ইচ্ছেটা এক্সিকিউট করার মতো স্ট্রং হওয়ার আগেই আমার হাত থেকে সব কন্ট্রোল চলে গেছে৷ যা কিছু
ঠিকঠাক করি তা স্রেফ অভ্যাসে। মাসল মেমোরি। খেয়ালও করি না যে করছি।’ সময় শেষ হয়ে যায়। সুজাত তার লেটারহেডে পেন ঘষতে ঘষতে বলে, ‘আপনাকে আপাতত একটা কাজ দিচ্ছি। আপনি একটা ‘রেকলেস জার্নাল’ শুরু করুন। যখনই এরকম কোনও সেল্ফ হার্মিং ইচ্ছে মনের মধ্যে জাগবে, আপনি সেটা নোট ডাউন করবেন। কেমন ?
বাধ্য ছাত্রীর মতো মাথা নাড়ে রুক্মিণী।
‘আসব, স্যার?’
‘আরে… আসুন সপ্তাহখানেক পরের দৃশ্য। ছোট ঘরটায় ঢুকে রুক্মিণী একটু কুণ্ঠিতভাবে টেবিলের উলটো দিকে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়ে। ওকে লক্ষ্য করতে করতে সুজাত বলে, ‘তারপর বলুন, কী খবর?’ ‘খবর বলতে… আপনি যে জার্নালটা মেনটেইন করতে বলেছিলেন ওটা করছি।’ ‘বাহ্! তা… বিশেষ কিছু বুঝতে পারলেন? ‘ ‘হ্যাঁ মানে… একটা প্যাটার্ন এমার্জ করছে দেখতে পাচ্ছি।’ ‘কীরকম প্যাটার্ন?’
আসুন মিসেস সিনহা
‘ওই অদ্ভুত ইচ্ছেগুলো রাতের দিকে বেশি হয়। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর। মানে ধরুন সকালেও যখন অভ্যেসের বশে সব কাজ করি, কখনও মনে হয় না যে একটু পরীক্ষা করে দেখি। কিন্তু সন্ধে হলেই যেন কী একটা হয়ে যায়।’ ‘আচ্ছা৷ এই নোট ডাউন করায় কোনো হেল্প হচ্ছে কি?’ হতাশভাবে দু’পাশে মাথা নাড়ে মহিলা, ‘নাহ্! আজ আসার পথেও …’
‘কী হয়েছে?’
‘আমাকে তো খানিকটা রাস্তা ট্রেনে করে আসতে হয়, তো ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্ম ধরে নিয়েছে, কিন্তু ভালো স্পিড আছে, আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, আর তখনই…’ কথা শেষ করে না মহিলা। মুখ নামিয়ে নেয়। ‘দেখুন… ইচ্ছে হলেও তো আপনি সেটা করেননি। তার মানে আপনার মধ্যে
তো কোথাও একটা বেটার জাজমেন্ট রয়ে গেছে নিশ্চয়ই!’
‘না… আমি করিনি ঠিকই… কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম নয়। আমি করতেই যাচ্ছিলাম। পিছন থেকে একজন মহিলা আমার নড়া ধরে টেনে নিয়ে খানিকটা গালাগালি করল।’ ‘হুঁ! এর আগে এরকম কোনও ইনসিডেন্ট হয়েছে?’
‘গত পরশু আমি এক ডেচকি ফুটন্ত জলে হাত ডুবিয়ে দিতে গিয়েছিলাম। মেয়ে এসে আটকায়।’
‘আচ্ছা… আপনি যে এরকম ভালনারেবল অবস্থায় আছেন… আপনার মেয়ে, হাজব্যান্ড এরা আপনাকে এখনও রাস্তায় একা বেরোতে দিচ্ছেন কী করে? ‘ওদের দোষ নেই। আমি আজকে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়েছি।”
‘দেখুন ম্যাডাম… আপনার এই মুহূর্তে যা অবস্থা, তাতে আপনার বাড়ির লোকজনের
সঙ্গে কথা বলাটা খুবই আর্জেন্ট। আপনি প্লিজ ওদের সঙ্গে আমার কথা বলান । ‘আচ্ছা আচ্ছা… পরেরবার আমি রূপমকে নিয়ে আসব না হয়! আসলে ওরা…’ বলে চুপ করে যায় রুক্মিণী।
‘ওরা কী? ’
‘আসলে ওরা নানারকম কাজে ব্যস্ত থাকে, তাই আমি ওদেরকে ডিস্টার্ব করতে চাই না৷’
‘কিন্তু এটা খুবই সিরিয়াস ব্যাপার, মিসেস সিনহা। আই হোপ ওরাও সেটা বোঝেন। যাই হোক, আমার একটা অনুরোধ আছে আপনার কাছে। ‘হ্যাঁ বলুন।’
‘আপনি এখন কটা দিন আর বাড়ির বাইরে বেরোবেন না প্লিজ! আমরা বরং অনলাইনে মিট করব। আর পারলে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান। থেরাপি যেমন চলছে চলুক, কিন্তু আপনার এই মুহূর্তে মেডিসিন শুরু করা প্রয়োজন।’
রুক্মিণী দু’পাশে মাথা নাড়ে, ‘ওষুধে আমার কিছু হবে না। বিশ্বাস করুন! আমি এর আগে অনেক রকম সাইকিয়াট্রিক ড্রাগের ওপর থেকেছি। দে আর অ্যাবসলিউটলি নো ইউজ।’
‘এটা আপনার মনে হচ্ছে। তবে এই মনে হওয়াটা মোটেও অ্যাবনর্মাল নয়৷ কিন্তু যেটা আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে সেটা হল, এটা আপনি নন, আপনার অসুখ
আপনাকে দিয়ে ভাবাচ্ছে—যে অসুখটা ওষুধের মাধ্যমে সারানো যায়।’
মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায় রুক্মিণীর, ‘মিস্টার চক্রবর্তী, আমি একটা কথা আপনাকে এর আগে বলিনি।’
‘তাই? কী বলেননি?
‘ভয়গুলো আমার ওপর কাজ করা বন্ধ করে দিলেও, তাড়া আমাকে ছেড়ে কোনওদিন যায়নি।’
‘মানে?’
‘মানে আমার শরীর থেকে বেরিয়ে ওরা আমার আশপাশেই ঘুরছে। আর খুঁজছে।’ ‘কী? কী খুঁজছে? ,
‘মানুষ। যাদের মধ্যে ওরা আবার ছড়িয়ে বসতে পারবে।’
সুজাত চুপ করে যায়। হঠাৎ তার অস্বস্তি হয়। মহিলার কথা বলার ভঙ্গি বুঝিয়ে দিচ্ছে, সে এই ব্যাপারে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। স্থির প্রত্যয়ের গলায় সে কথাগুলো বলছে৷ একটু ভেবে নিয়ে সুজাত বলে, ‘আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে রেফার করে দিচ্ছি। হি ইজ আ স্পেশালিস্ট এইসব ব্যাপারে। আপনি প্লিজ ওঁকে একবার কনসাল্ট করুন।’
“বিশ্বাস করুন সুজাতবাবু, আমার সাইকিয়াট্রিস্ট লাগবে না। আমার সাইকিয়াট্রিস্ট একদমই লাগবে না৷ আমার শুধু… একজন মানুষ লাগবে। যে এই ভয়গুলোকে আমার কাছ থেকে টেনে নেবে। ওদেরকে দূরে সরিয়ে দেবে আমার থেকে। বলতে বলতেই হঠাৎ উঠে দরজা ঠেলে বেরিয়ে যায় মহিলা।
মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে যায় সুজাতর।
ঘরটা এত ঠান্ডা লাগছে কেন? এসিটা কি বেড়ে গেছে কোনওভাবে? ঘুমজড়ানো চোখে হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশে ফোনটা খোঁজে সে। আলো দরকার।
কিন্তু কিছুই হাতে এসে লাগে না। ফোনটা খুঁজে না পেয়ে ঘুমটা সম্পূর্ণ ছুটে যায়। আলো জ্বালানোর জন্য খাট থেকে নামতে যায় সে। কিন্তু উঠতে গিয়ে সুজাত বুঝতে পারে, এখন খাট থেকে নামা সম্ভব নয়। কারণ, পায়ের ওপর ভারী কিছু রয়েছে।
একটা মানুষ! হ্যাঁ, পায়ের ওপর একটা মানুষ বসে আছে তার। নাইটল্যাম্প থেকে যতটুকু আলো আসছে, তাতে সে দেখতে পায়, উবু হয়ে হাত-পা জড়ো করে একদম গুড়ি মেরে বসে আছে সেই মানুষটা।
সুজাত চিৎকার করতে চায়। কিন্তু তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না। শুধু পা নয়, গোটা শরীরটাই নাড়াতে পারছে না সে। মাঝেমাঝে ঘুমের মধ্যে এরকম হয়। মানসিক স্বাস্থ্যের পেশাদার সুজাতর কাছে এটা অজানা কিছু নয়। সারা শরীর অসাড় হয়ে যায় এতে। কিন্তু সুজাত জানে, এখন সে ঘুমোচ্ছে না। এখন সে ভয় পাচ্ছে। প্রচণ্ড, অসহ্য ভয় পাচ্ছে।
এতক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিল শরীরটা। এবার তার মধ্যে একটু নড়াচড়ার আভাস
দেখা যায়। আরো যেন জড়সড় হয়ে যায় সেটা। আরো জুত করে চেপে বসে সুজাতর পায়ের ওপর।
এবার আর পারে না সুজাত। ভয়ে, অসহায়তায় মরিয়া হয়ে যত জোরে সম্ভব পা দুটোকে শূন্যে ছুড়ে দেয়। পায়ের ওপর বসে থাকা শরীরটা আর সামলাতে পারে না তার অভিঘাত। ছিটকে গিয়ে পড়ে মেঝেতে! বোবা আতঙ্কে সুজাত দেখে, মেঝেতে পড়েই চার হাতে-পায়ে অবিকল একটা কাঁকড়ার মতো খড়মড় করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সেটা। সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ঠান্ডাটা অদ্ভুতভাবে কমে যেতে থাকে।
এবার নিজের ফোনটাও খুঁজে পায় সে। কীভাবে যেন বালিশের খাঁজে ঢুকে গিয়েছিল। আলোটা জ্বেলে দিয়ে ঘর থেকে সুজাত বেরিয়ে আসে। ঘরে যে ঢুকেছিল তার এখন বাইরেই থাকার কথা।
কিন্তু বাইরে তো দূরের কথা, গোটা তল্লাটে কেউ নেই। আজ বাড়িতেও সুজাত একা। সৈরিন্ধ্রী ওর দিদির বাড়ি গেছে পুটুসকে নিয়ে।
করিডরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সুজাত বুঝতে পারে, এই বাড়িতে এখন ও ছাড়া আর কেউ নেই। থাকা সম্ভব নয়। তবু ও সবকটা জানলা-দরকা চেক করে নেয় ভালো করে।
সব দেখে শুনে ওপরে যাওয়ার আগে হঠাৎ খিদে খিদে পেয়ে যায় তার। ঘড়িতে পৌনে চারটে। আনমনে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে সে। সাধারণত এই ধরনের ইচ্ছেকে প্রশ্রয় দেয় না সুজাত, তবে আজ নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করতে মন সায় দিচ্ছে না।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে নুডলস্ বানাতে বানাতে সুজাত জানলার দিকে তাকায়। আর সঙ্গে সঙ্গে তার বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। কারণ সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে, জানলার বাইরে জঙ্গল মতো জায়গাটায় দাঁড়িয়ে কেউ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
পরদিন সকালে উঠতে যথারীতি একটু দেরি হয়ে যায়। উঠে রোজকার অভ্যেসমত হোয়াটসঅ্যাপে না পড়া মেসেজগুলো এক এক করে দেখতে থাকে সুজাত।
একটা আননোন নম্বরের মেসেজ দেখে হাতটা থেমে যায় ওর। কোনও ফ্রি অ্যাডভাইসের অনুরোধ নয়, ফ্রি’তে কাউন্সেলিং শেখানোর অনুরোধ নয়, একটা ছোট্ট এক লাইনের মেসেজ
‘নমস্কার। আমি সঞ্জিতা সিনহা। রুক্মিণী সিনহার মেয়ে। গতকাল মা কি আপনার কাছে গিয়েছিল?’
সুজাত একটু চুপ করে কী যেন ভাবে। তারপর লেখে, ‘হ্যাঁ। এসেছিলেন।’ মেসেজটা দ্রুত সিন হয়। সঙ্গে সঙ্গে টাইপ হতে থাকে ওপাশ থেকে, “আচ্ছা ক’টা নাগাদ বেরিয়ে যায় মা?’
সুজাত লেখে, ‘সেই ইনফর্মেশন তো দেওয়া যাবে না।’
‘প্লিজ! আমার খুব জরুরি দরকার। মা কাল সারারাত বাড়ি ফেরেনি। আমি আর বাবা আজ সকাল থেকে পাগলের মতো ফোন করছি সব জায়গায়।’
সুজাতর অস্বস্তিটা আরো বেড়ে যায়। এরকম কিছুই যেন প্রত্যাশা করছিল সে। একটু সময় নিয়ে সে বেরিয়ে যাওয়ার আন্দাজ সময়টা লেখে, তারপর যোগ করে, “ওঁর
পক্ষে যেসব জায়গায় যাওয়া সম্ভব, সেগুলো খুঁজেছেন কি? কাজের জায়গা বা বন্ধুবান্ধবের বাড়ি…’
‘খুঁজেছি। সব খুঁজেছি। কেউ কিছু বলতে পারছে না।’
‘পুলিশে খবর দিচ্ছেন না?’
‘দেব। আমি আর বাবা বেরোব একটু পরে।’
সুজাত। ‘আচ্ছা। যদি খোঁজ পাওয়া যায়, জানাবেন।’ এইটুকু লিখে অফলাইন হয়ে যায়
এরপর সারাদিন নানান কাজের মাঝে বারবার মাথায় ঘুরে ফিরে আসতে থাকে রুক্মিণীর ঘটনাটা। কালকে যা যা বলেছে ভদ্রমহিলা, সেগুলো মাথার মধ্যে নেড়েচেড়ে দেখে। একটাই সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রুক্মিণীর হয়তো কালকে বাড়ি ফেরার পথে আবার ভয়ংকর কিছু করতে ইচ্ছে হয়েছিল, আর সেই ইচ্ছেটাই তার শেষ ইচ্ছেতে পরিণত হয়েছে।
কাল রাতের ঘটনাটাও মনে পড়ছে থেকে থেকে। সুজাতর মনোবিশেষজ্ঞ মন বারবার বলছে, কোনও কারণে নার্ভের স্ট্রেস থেকেই আধোঘুমে ওরকম একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর। কিন্তু ওর মনেরই একটা ছোট্ট অংশ যেন সেটা মানতে চাইছে না৷ সেদিন চেম্বার একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। আজও বাড়ি ফাঁকা। তবে সৈরিন্ধ্রী আর পুটুস ফিরে আসবে একটু পরেই।
সন্ধে থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হালকা রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে এক কাপ চা আর একটা পেপারব্যাক হাতে নিয়ে দোতলার বারান্দায় এসে বসে সুজাত। কী মনে করে নিজের ড্রয়ার থেকে পকেট নাইফটা বের করে হাতে নেয়। এমন সময়ে হঠাৎ ফোনটা বাজতে শুরু করে।
সাধারণত রাত্রি ন’টার পর আর কোনও পেশেন্টের কল রিসিভ করে না ও৷ কিন্তু এই মুহূর্তে স্ক্রিনে যে নামটা ফুটে উঠেছে, সেটা দেখে কল অগ্রাহ্য করার কথা মাথাতেও আসছে না।
রুক্মিণী সিনহা!
“হ্যাঁ বলুন মিসেস সিনহা৷’
“মিস্টার চক্রবর্তী, সরি! অসময়ে আপনাকে ডিস্টার্ব করছি। আমাকে কয়েকটা ইনফর্মেশন দিতে পারবেন?’
‘কীরকম ইনফর্মেশন?’
‘আচ্ছা… এই ভয় জিনিসটা আসলে কী বলুন তো?’
‘সে সব পরে বলছি, কিন্তু তার আগে আপনি বলুন আপনি কোথায় আছেন? আপনার মেয়ে মেসেজ করেছিল আজ। বলল, আপনি নাকি সারারাত বাড়ি ফেরেননি….?’ ওপাশ থেকে একটা ঠান্ডা হাসির শব্দ ভেসে আসে, ‘মেয়েটা এত বদমাশ হয়েছে না! ওর কথায় কান দেবেন না সুজাতবাবু, বলুন না… আপনাদের মেডিক্যাল টার্মে ভয় জিনিসটা কী? ‘
একটু ভেবে নিয়ে সুজাত বলে, ‘ভয় হল… একটা জৈবিক তাড়না। বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে এর জন্ম। যে কোনও বিপজ্জনক বা থ্রেটেনিং পরিস্থিতির উদ্ভব হলে
মস্তিষ্ক একটা বিশেষ রকমভাবে রিয়্যাক্ট করে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য সে হয় মানুষকে পালাতে বলে, নইলে উলটে লড়াই করতে বলে। অনেক সময় এই দুইয়ের মাঝখানে একটা অদ্ভুত অসাড় অবস্থাও হয়। তো এই মেকানিজমটাই হচ্ছে ভয়। এটা মানুষের প্রাচীনতম ইমোশন… ‘
‘ভুল ভুল ভুল! কিছু জানেন না আপনারা। ভয় হল একটা সম্পত্তি। ভয় আছে বলেই মানুষ বেঁচে থাকে। নিজের জীবনের ভয়, প্রিয়জনের জীবনের ভয়, হারিয়ে ফেলার ভয়—এগুলোই মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বকে বজায় রাখে। এই ভয় যদি মানুষের জীবন থেকে চলে যায়, তবে সেটাই তার মৃত্যু।’
কথা শুনতে শুনতে সুজাত সঞ্জিতাকে মেসেজ করছিল যে তার মা ফোন করেছে—এই বলে। হঠাৎ কলের মধ্যে আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে রুক্মিণী, ‘আপনি বিন্নিকে মেসেজ করছেন স্যার! আপনার সত্যিই মনে হয়, মেসেজটা ও আপনাকে পাঠিয়েছিল? ও তো আমার কথা ছাড়া কোনও কাজই করে না।…’ “মানে? আপনারা দুজনে মিলে…’
‘আরে না না…। আসলে… ওর উপায়ও নেই বুঝলেন তো! সেই যে সেদিনের কথা বলেছিলাম না… পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা একা একা হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলাম। কয়েকটা কথা আপনাকে বলিনি, জানেন! সবটা সত্যিও বলিনি। ভয় আমি সেদিন পেয়েছিলাম। তবে সেদিনের পর থেকে আর পাইনি।
‘আমাদের বাড়ি ফেরার রাস্তার একটা অংশ কুমোরপাড়া দিয়ে হয়ে আসে। সেদিন গলিঘুঁজি পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল, কেউ যেন আসছে আমার পিছন পিছন। প্রচণ্ড ভয় করতে লাগল। ছুটতে শুরু করলাম। ছুটতে ছুটতে যেখানে অর্ধেক শেষ হওয়া অনেকগুলো মূর্তি বসানো আছে এমন একটা চত্বরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। পায়ের আওয়াজটাও পিছু পিছু এল। আমি একটা মূর্তির পিছনে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম তার চলে যাওয়ার।
‘হঠাৎ একটা হালকা আলো চোখে পড়ল। সেই আলোয়, আমি সামনে রাখা একটা সদ্য তৈরি হওয়া অসুরের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। রংটং কিছু দেওয়া নেই। শুধু উলঙ্গ মাটি। মণিহীন চোখে সে যেন আমার দিকেই তাকিয়ে হাসছে। হঠাৎ আমার মধ্যে কী একটা হয়ে গেল, জানেন! মনে হল অসুরটা আমায় ঠাট্টা করছে। করুণা করছে। যেন ওর শক্তি খানিকটা দান করে দিতে চাইছে আমাকে।
‘ব্যাগে সবসময় একটা পোর্টেবল মাল্টিপারপাস নাইফ থাকে, সেটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। অবয়বটা দাঁড়িয়েছিল চাতালের মাঝখানে। মুহূর্তের মধ্যে পিছন থেকে মুখটা চেপে ধরে ছুরিটা তার গলায় টেনে দিলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম।
‘বাকি রাস্তাটা কেমন ঘোরের মধ্যে এলাম, জানেন। যেন মনে হচ্ছিল, আমাকে চালনা করছে অন্য কেউ। হয়তো ওই অসুরটা! বা অন্য কেউ! আর খুব ইচ্ছে করছিল রূপম আর বিন্নিকে দেখতে। কিন্তু কেবলই একটা অস্থির উদ্বেগ হতে লাগল ! মনে হল, বাড়ি গিয়ে ওদেরকে আর দেখতে পাব না। ওদের ওপরে কেউ অ্যাটাক করবে। পাগল পাগল লাগতে শুরু করল। কোনওরকমে ছুটতে ছুটতে বাড়ি পৌঁছোলাম আমি। “ওমা! পৌঁছে দেখি কোথায় কী। দুজনেই নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। একটু ডাকার
চেষ্টা করলাম। ঘুমই ভাঙাতে পারলাম না। বেশি ডাকাডাকি করতে সাহস পেলাম না । শুতে চলে গেলাম। কিন্তু মনের ভয়টা ক্রমশই বাড়তে লাগল। মনে হল, ওদেরকে এক্ষুনি তুলে সাবধান করে না দিলে ঘুমের মধ্যেই কেউ ওদেরকে খুন করে দেবে। মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হল। উঠে পড়লাম। তারপর আর সাসপেন্স ধরে রাখতে না পেরে, ওই একইভাবে ছুরিটা দুজনের গলাতেই টেনে দিলাম।’
সুজাতর গলার কাছে কী যেন একটা আটকে যায়। রুক্মিণী ওদিকে বলে চলেছে, ‘কিন্তু তারপরেও ওরা আমার সঙ্গে সঙ্গেই আছে, জানেন। আমার ভয়টা আমার শরীর থেকে বেরিয়ে ওদের দুজনের আকার নিয়ে আমার আশেপাশে ঘোরে। আমাকে রেকলেস কাজগুলো করা থেকে আটকায়। মনে করে বাড়ির সবকটা দরজা লক করে !
‘আসলে সেই রাতের পর থেকে ওরা সারাদিন আমার জন্য টেনশন করে। বেঁচে যখন ছিল, তখন অবশ্য ওদের কারোরই এত কনসার্ন ছিল না আমার ব্যাপারে। তবে এখন মুক্তি চাই আমার। ওদেরকে কারোর সঙ্গে একটা জুড়ে দিতে হবে। নইলে ওরা কখনোই আমাকে নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা করতে দেবে না। তবে একটা সুখবর আছে। অনেক খুঁজে অবশেষে উপযুক্ত লোক পেয়ে গেছি আমি। ধন্যবাদ সুজাতবাবু, আমার এত প্ল্যান মিথ্যে হয়নি…’
সুজাতর হাতটা কাঁপতে থাকে। ওপাশ থেকে ঠান্ডা গলায় মহিলা তখনও বলে চলেছে, “সরি স্যার, আর কাউকে পেলাম না, বিশ্বাস করুন! বিন্নি কাল রাত থেকেই অলরেডি আপনার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। ওকে তো রেখে এসেছিলাম আপনার কাছেই। আর রূপম গেছে… আপনার স্ত্রী আর ছেলের কাছে।
“প্লিজ কিছু মনে করবেন না! একটা কথা খেয়াল রাখবেন কেবল, শুধু আপনাকে ভয় দেখানো ছাড়া ওদের কিন্তু আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। তাও যদি আপনি চান, নিজের সব ভয়কে সমূলে উপড়ে ফেলতে পারেন। জানেন তো তার জন্য কী করতে হবে? শুনলেন তো আমার কাছে…! আচ্ছা, রাখি হ্যাঁ! বিন্নি এতক্ষণে আপনার দোতলায় পৌঁছে গিয়ে থাকবে। আর আটকাব না আপনাকে।’
কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রেখে দিয়ে এদিক ওদিক তাকায় সুজাত। না, কেউ কোথাও নেই। শুধু বৃষ্টির তোড়টা একটু বেড়েছে। তারই আওয়াজ! একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ও। মহিলাকে ইমিডিয়েটলি রিহ্যাবে দেওয়া দরকার। কিন্তু তবু সৈরিকে একটা ফোন করতে ইচ্ছে করছে। নাম্বারটা ডায়াল করে কানে চেপে ধরে সুজাত। সত্যিই… ভালোবাসা কী অদ্ভুত একটা জিনিস! কত অযৌক্তিক ভয় তৈরি করে !
‘আপনার ডায়াল করা নম্বরটি, বর্তমানে স্যুইচড অফ আছে!’
সুজাতর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা সরীসৃপ ধীরেসুস্থে নীচে নেমে যায়। এখন তো ওরা গাড়িতে। এখন তো স্যুইচ অফ থাকার কথা নয়। সৈরি তো কখনও বেরোনোর আগে ফোন চার্জ দিতে ভোলে না। তাহলে কী…
হঠাৎ গোটা বাড়ির সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে যায়। পাওয়ার কাট। ইনভার্টারটা মনে হয় খারাপ হয়ে গেছে বহুদিনের অব্যবহারে।
ফোনের আলোটা জ্বালে সুজাত। আপাতত একটা মোমবাতির ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু পিছন ফেরার আগেই সে বুঝতে পারে, ঘর থেকে বারান্দায় আসার দরজাটা খুলে
গেছে। হাওয়া দিচ্ছে না। তাও খুলে গেছে।
গলার কাছে আবারও কিছু একটা দলা পাকায় তার। কাঁপা কাঁপা হাতে আলোটা তুলে ধরে পিছন ফেরে সে।
আলোটা যার ওপর গিয়ে পড়েছে, সেটা কী, সুজাত জানে না। যেন নরকের খুব ঠান্ডা আর স্যাঁতস্যাঁতে একটা কোনায় বসে কেউ এই মূর্তিটা গড়েছে। সাদা, রক্তহীন, বাসি দইয়ের মতো স্বাস্থ্যহীন, ফ্যাকাসে। দেহটা একটু কুঁজো। কালো চুলের গোছা ঢেকে রেখেছে সমস্ত মুখটা। শুধু মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে ফ্যাটফ্যাটে সাদা দাঁতের সারি আর কাঁচা রক্তের মতো লাল চোখ দুটোয়। সুজাতর কণ্ঠনালী ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা উলঙ্গ চিৎকারটা আশপাশে কারো কানে
পৌঁছল কিনা, জানা নেই।
ছেলেকে একহাতে আঁকড়ে অনেকক্ষণ ধরে বেলটা বাজাচ্ছিল সৈরিন্ধ্রী। কোথায় যে থাকে এই লোকটা! একসময় বিরক্ত হয়ে ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে সে। কিন্তু কয়েকবার টেপাটিপি করার পরেও ফোনের আলো জ্বলে না। আজকাল মাঝেমধ্যেই ফোনটা নিজে থেকে স্যুইচ অফ হয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
অসহায় বোধ করতে থাকে সৈরিন্ধ্রী। পুটুস যে কখন শরীরের একেবারে কাছে ঘেঁষে এসেছে, খেয়াল করে না সে। গুনগুন করে নিচু গলায় পুটুস কী একটা বলে৷ শুনতে পায় না সৈরিন্ধ্রী। এবার পুটুস গলাটা আরেকটু চড়িয়ে, স্পষ্ট গলায় জিগ্যেস করে, “মা, বাগানে অন্ধকারের মধ্যে ওটা কে দাঁড়িয়ে আছে?’
সৈরিন্ধ্রী স্থির হয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে চোখ ফেরায় ছেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে। মাঝে মাঝে চমকে ওঠা বিদ্যুতের আলোয় যে অবয়বটা দেখা যায়, সেটা ওর বহুদিনের চেনা। বিদ্যুতের ঝলকে এবার সুজাতর মুখে একটা অমানুষিক রকমের করুণ হাসি দেখা যায়। আর দেখা যায় তার ডান হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা পকেট নাইফটা। ওদের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে আসতে ক্লান্ত গলায় সে বলে চলে, ‘আমাকে ক্ষমা করো, সৈরি! এত ভয় নিয়ে আমি আর বাঁচতে পারছি না…।’
