পিশাচিনী – রণদীপ নন্দী
গুলি করে মারব শালা। চুন চুনকে মারুঙ্গা।’ চটাস পটাস শব্দে খান তিনেক মশাকে ঘায়েল করে মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠল বঙ্কা৷ সন্তু চোখ বড় করে নিঃশব্দে ধমকে উঠল তাকে৷ এইজন্য বঙ্কাকে নিয়ে কোনও অপারেশনে আসতে চায় না সে। ভাইটাল মুহূর্তে ছোকরা কিছু না কিছু একটা গড়বড় বাধাবেই। গতবার ঠিক যন্তর চালানোর মুহূর্তেই হতভাগাটা বিকট শব্দে হেঁচে দিল। গুলি টার্গেটের দু-হাত দূর দিয়ে বেরিয়ে পেছনের একটা ল্যাম্পপোস্ট কানা করে দিল। আরেকটু হলেই শিকার পালিয়ে যাচ্ছিল, ভাগ্যিস সন্তু রেডি ছিল। তার একটা অব্যর্থ গুলি মালটার খুলি ফাটিয়ে দেয়। ,
সেদিনই সে ভেবে নিয়েছিল রায়বাবুকে মুখের ওপর বলে দেবে, আর কোনও অপারেশনে বঙ্কাকে তার সঙ্গে জুড়ে দিলে সে আর নেই। কিন্তু বসের সামনে গিয়েও সেটা বলতে ঠিক সাহসে কুলায়নি তার। তাই অগত্যা আজ আবার এই আপদ এসে জুটেছে ঘাড়ে। না জানি আজ কী বিপত্তি বাধাবে !
‘টেরেন তো আসছে না রে সন্তু। সাড়ে এগারোটা হয়ে গেল। উফ্!’ পিস্তলের নল দিয়ে অস্থিরভাবে পিঠ চুলকাতে চুলকাতে বলে বঙ্কা। তারা দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণবঙ্গের এক অখ্যাত মফঃস্বল হরিপুর স্টেশনের ওভারব্রিজের উপর। ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা পেরিয়ে গেছে। পুরো এলাকা তন্দ্রাচ্ছন্ন। স্টেশনটা মূল শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। চারিদিক শুনশান। রাতের ট্রেনে মেরে কেটে খান দশেকের বেশি লোক নামে না৷
তাদের টার্গেট, মানে সুখেন পোদ্দারও আসবে এই ট্রেনেই। লোকটা বেজায় বড়লোক। কলকাতায় দুটো সোনার দোকান আছে। এইবার নাকি ভোটেও দাঁড়াবে বলে শোনা যাচ্ছে। সেইজন্যই সম্ভবত নমিনেশন ফাইল টাইল করার আগেই মালটাকে সাফ করে দিতে চাইছেন রায়বাবু। অবশ্য সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই সন্তুর। সে আদার ব্যাপারি। মানে টার্গেটকে আদার মতোই ছেঁচে দেওয়া তার কাজ। এসব রাজনৈতিক কোন্দলে তার কোনও ইন্টারেস্ট নেই।
‘কই রে! টেরেন আসছে না তো।’ আবার অভিযোগ করে বঙ্কা৷
‘দেখ গে টেরেনের টায়ার পাংচার হয়ে গেছে বোধহয়।’ বেজার মুখে জবাব দেয় সন্তু। বঙ্কা সারকাজম বোঝে না। চোখ গোল গোল করে ভেবলে যাওয়া মুখে তাকিয়ে থাকে সন্তুর দিকে। সন্তু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দূর থেকে ট্রেনের হুইসেলের আওয়াজ শোনা যায়।
ট্রেন এসে থামতেই পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে নীচের দিকে তাক করল
সন্তু।
ট্রেন থেকে একে একে গুটিকয় লোক নেমে এগিয়ে আসছে প্ল্যাটফর্ম ধরে৷ কদিন আগেই ওভারব্রিজের ওপরের আলোগুলো খারাপ হয়ে গেছে। ফলে পারতপক্ষে রাত নামলে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যেতে ওভারব্রিজ ব্যবহার করছে না কেউ। নীচের লাইন পেরিয়েই যাতায়াত করছে। তাই অনেক ভেবে চিন্তেই এই লোকেশনটা
বেছেছে সন্তু। প্ল্যাটফর্ম থেকে কারও পক্ষে ওপরে অন্ধকার পরিত্যক্ত ওভারব্রিজে লুকিয়ে থাকা হত্যাকারীদের দেখতে পাওয়া অসম্ভব। গুলি চালিয়ে লোকজনের হতভম্ব ভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই চম্পট দেবে ওরা।
নীচে ঝোপের আড়ালে সন্তুর রয়াল এনফিল্ডটা দাঁড় করানো আছে। আজকের অপারেশন মনে হচ্ছে বেশ স্মুদলি মিটে যাবে। নিজের মনেই একটা আত্মপ্রসাদ অনুভব করে সন্তু। ওই তো পোদ্দার। ছ’নম্বরী ফুটবলের সাইজের ভুঁড়ি বাগিয়ে হেলে দুলে এগিয়ে আসছে এদিকেই। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। গলায় ঝুলন্ত মোটা সোনার চেন এই আধো অন্ধকারে দূর থেকে ঝিলিক দিচ্ছে।
আজ আরও একটা লাশ পড়বে সন্তুর হাতে। এই নিয়ে কতগুলো হল? তা খান পনেরো-কুড়ি তো হবেই। এছাড়া তোলাবাজি, ছিনতাই, রেপ, সব মিলিয়ে বেশ চকচকে রেকর্ড তার নামে। সন্তু ছেলেবেলা থেকে পড়াশোনায় যে খুব একটা খারাপ ছিল, তা নয়। এমনকী এই বঙ্কার মতো অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে সে এই লাইনে এসেছে, এমনটাও নয়। সে রীতিমতো ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে কলেজে পড়েছে।
তবে ছোটবেলা থেকেই যা কিছু নিষিদ্ধ, যা কিছু সমাজের চোখে অপরাধ, তার প্রতি একটা তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে সে। যখন সে কাউকে খুন করে, তখন টার্গেটের পেটের মধ্যে হাতের তীক্ষ্ণ ছুরিটা আমূল গেঁথে কব্জির মোচড়ে এক হ্যাঁচকা টানে সেটা বের করে আনে। তারপর দ্বিতীয়বার সেটাকে সজোরে বসিয়ে দেয় চামড়া মাংস ভেদ করে।
সন্তু জানে যে দ্বিতীয়বারের আঘাতটা অপ্রয়োজনীয়। প্রথমবারের নিখুঁত মোচড়েই লোকটার ক্ষুদ্রান্ত্র ছিন্ন হয়ে গেছে। তবু দ্বিতীয়বারের আঘাতটা সে করে শুধুমাত্র শিকারের মুখের অভিব্যক্তি দেখতে। মানুষটা তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারে না যে এই পৃথিবীতে তার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে অকস্মাৎ। তার দু-চোখে কষ্ট বা ভয়ের থেকেও বেশি ফুটে ওঠে বিস্ময়। আর সেই বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখের চাউনিতেই চরম তৃপ্তি খুঁজে পায় সন্তু।
বহু বছর ধরে এই অপরাধ দুনিয়ার অলিতে গলিতে বিচরণ করা সন্তু আজ অবধি এমন কোনও নেশা নেই যা করেনি। শেষে সে বুঝেছে তার প্রকৃত নেশা শুধু চটচটে রক্তের নোনা স্বাদে। কাউকে হত্যা করার সময় যখন তার চোখে মুখে রক্তের ছিটে এসে লাগে, সেই উষ্ণ স্পর্শ, হালকা আঁশটে গন্ধ সন্তুকে পাগল করে দেয়। সেই গন্ধের থেকে বেশি নেশাতুর আমেজ বোধহয় আর কিছুতে সৃষ্টি হয় না৷
ওহ না! হঠাৎ মনে পড়ে সন্তুর। আরেকটা গন্ধ বড় প্রিয় তার। কোনও কিশোরী মেয়েকে রয়ে সয়ে ধর্ষণ করার পর তার ঘর্মাক্ত শরীর আর ঘন হয়ে আসা নিঃশ্বাসের আঘ্রাণ… আহ্! শরীরে একটা সুখানুভূতির শিহরন অনুভব করে সন্তু। তার হৃদপিণ্ড গতি বাড়ায়।
নেহাত আজকের অপারেশনটায় কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি রায়বাবু। কড়া অর্ডার আছে খুনটা করতে হবে পিস্তল ব্যবহার করে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। তাই আজ নিজের হাতে ঘন গাঢ় লাল তরলটা স্পর্শ না করতে পারার দুঃখটা আপাতত তাকে গিলে নিতে হচ্ছে। রায়বাবু মাইবাপ, তাঁর কথা অমান্য করার জো নেই।
ততক্ষণে পোদ্দার প্রায় ওভারব্রিজের নীচে চলে এসেছে। বঙ্কা চাপা গলায় বলে, ‘গুরু, জলদি চালাও। মালটা ভেগে যাবে তো!’
কিন্তু বঙ্কার কথাগুলো সন্তুর কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না। সে হঠাৎ দূরে প্ল্যাটফর্মের একদম শেষ প্রান্তে জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। কণ্ঠমণিটা গলার কাছে একবার ওঠানামা করল। বঙ্কা অবাক হয়ে তাকায় সন্তুর দিকে। ওই নিরেট অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করে কিছু একটা যেন সন্তুকে সম্মোহিত করে ফেলেছে।
সে কনুই দিয়ে একবার সন্তুর পেটে খোঁচা দেয়। কিন্তু সন্তু নির্বিকার। প্রস্তরমূর্তির মতো অবিচল সে দাঁড়িয়ে থাকে দূরের ওই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। বঙ্কা দেখতে পায় সন্তুর হাত কাঁপছে৷ এবার সেদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে সে। একটা আবছা অবয়ব কি চোখে পড়ছে তার? মেয়ে মানুষের অবয়ব? নাহ! কই কিছুই তো নেই! সবই চোখের ধাঁধা।
‘ধুর বা…!’ বলে নিজেই সামনের দিকে পিস্তল তাক করে বঙ্কা। তবে তারপরের ঘটনাটুকুর জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না সে। সন্তু চকিতে সজোরে ধাক্কা দেয় তাকে। সে কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ে। হাত থেকে পিস্তল মাটিতে পড়ে ছিটকে যায়।
প্রথমে থতমত খেয়ে বিস্ময়মাখা চোখে সন্তুর দিকে তাকিয়ে থাকে বঙ্কা। তারপর পিস্তলটা কুড়িয়ে নিয়ে আবার উঠে আসে। পরক্ষণেই সন্তু আবার ধাক্কা দেয় তাকে। বঙ্কার রোগা দুর্বল শরীর। সে সন্তুর সঙ্গে পেরে উঠবে কেন! এক ধাক্কাতেই আবার ছিটকে যায় দূরে। উঠে বসে হাঁফাতে হাঁফাতে বঙ্কা বলে, ‘মাইরি এরম করিস না। অনেক পয়সা অ্যাডভান্স নিয়েছি। মায়ের শরীর খারাপ জানিস তো। ডাক্তার আর ওষুধে সব পয়সা বেরিয়ে গেছে। এই কাজটা আমায় সাল্টাতেই হবে ভাই।’
পিস্তলটা আবার কিছুটা দূরে পড়েছিল। বঙ্কা হাঁফাতে হাঁফাতেই সেদিকে হাত বাড়ায়। সন্তু ছুটে এসে বঙ্কার হাত চেপে ধরে। তারপর তার কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে বলে, “বাঁকা, গুলি করিস না। ও বারণ করছে। দেখছিস না?’ ‘কে বারণ করছে? কী বলছিস?’
“চুপ চুপ.. ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে নিশ্চুপ হতে ইশারা করে সন্তু। বঙ্কা একটা বিশ্রী অপশব্দ উচ্চারণ করে সন্তুকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। তারপর পিস্তল তুলে নিয়ে লক্ষ্য স্থির করে পোদ্দারের দিকে। এগিয়ে যায় ওভারব্রিজের একদম ধারে। এই শেষ সুযোগ। প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে টিকিট কাউন্টারের ওপাশে মিলিয়ে গেলেই টার্গেট হাতছাড়া হয়ে যাবে।
সন্তু আবার গভীর চোখে সেই দূরের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকায়। একজন নারীমূর্তি কি ছলনার হাসি হাসছে সেই জমাট বাঁধা নিকষ কালো থেকে? সন্তুর মুখে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত মৃদু হাসির রেখা। গালের মাংসপেশীতে জলতরঙ্গের মতো কম্পন খেলে যায়। সে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘খুব খিদে না রে তোর? রক্ত খাবি? গরম রক্ত? তাহলে পিশাচী একে খা। আমায় মুক্তি দে!’
সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় বঙ্কার পিছনে। তারপর অতর্কিতে ছেলেটার শীর্ণ শরীরটাকে ঠেলে দেয় নীচে সমান্তরাল রেললাইনের ওপর। বঙ্কা এই আচমকা আক্রমণের জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। তার তরফ থেকে কোনও প্রতিরোধ আসে
না। ছোট্ট মাথাটা লোহার রেললাইনের আঘাতে ঠিক একটা পাকা বেলের মতো শব্দ করে ফেটে যায়। খুলি তুবড়ে ছিটকে যাওয়ার সেই শব্দটা ওপর থেকেও অস্পষ্ট শুনতে পায় সন্তু৷
সে নীচে তাকিয়ে দেখে দৃশ্যটা। কালচে লাল থকথকে ঘিলু ছিটকে ছড়িয়ে আছে কালো কালো পাথরের খাঁজে খাঁজে। বাকি শরীরটা তখনও কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই কাঁপতে থাকা হাড়সর্বস্ব শরীরটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অকারণেই একটা আলগা উল্লাস অনুভূত হয় সন্তুর মনে। সে মুখ বাড়িয়ে দেখতে থাকে দৃশ্যটা।
কিন্তু তার সেই উপভোগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। চারপাশের মানুষ ছুটে আসে বঙ্কার ক্ষতবিক্ষত শরীরটার কাছে। আর তখনই তাদের নজর পড়ে বঙ্কার পাশে পড়ে থাকা পিস্তল আর ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সন্তুর দিকে।
পুরো প্ল্যাটফর্ম জুড়ে একটা হইহই রব ওঠে। তার পরের কয়েকটা মিনিট কেমন যেন ঘোরের মধ্যে কাটে সন্তুর। মারমুখী উগ্র জনতার হাত থেকে বেঁচে সে যে কীভাবে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাইক চালিয়ে সোজা পার্টি অফিসে এসে পৌঁছাল, তা সন্তু পরে আর নিজেও মনে করতে পারে না।
‘কচি মাগিরে একটু বেশি আদর করি ফালাইলে তার ফরসা পিঠে যহন রক্ত
জইমা কালশিটা পড়ে, তহন হে কেমুন দেখতে লাগে দ্যাকসেন?’ চায়ের কাপটা সবে মুখে তুলে চুমুক দিচ্ছিল সন্তু। বাদলের কথা শুনে বিষম খেল। খানিকটা চা চলকে পড়ল টেবিলে। মুখে জমে থাকা পানের পিকটা একটা ঘৃণ্য শব্দ করে টেনে গিলে নিয়ে খুকখুক করে হাসল বাদল। তারপর বলল, ‘আমি আইজকার আকাশটার কথা বলতেসিলাম। কেমুন কালো কইরে ম্যাঘ জমিসে দ্যাখেন। ঠিক য্যান্ ফরসা পিঠে সুহাগের দাগ।’
সন্তু উত্তর দেয় না। একটু অপ্রস্তুতভাবে চায়ে চুমুক দিতে থাকে। বাইরে সত্যিই অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। চৈত্রের শেষ, দিন দুয়েক বাদে নববর্ষ। এই বেনারসের রাস্তাঘাটে যদিও বাংলা নববর্ষ নিয়ে খুব একটা মাতামাতি নেই। তবে তার পরপরই রামনবমী আসছে। সেই উপলক্ষ্যে সেজে উঠছে শহর। শিরা-ধমনী বেয়ে ছুটে চলা উষ্ণ রক্তের স্রোতের মতো রাম নবমীর শোভাযাত্রা দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে শুরু হয়ে গধৌলিয়া চৌক ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শহরের অলিতে গলিতে।
বড় বড় ঘোড়ায় টানা গাড়িকে সাজানো হয়েছে ফুল, রাংতা, রঙিন কাগজে। সেই গাড়ির ওপর কিশোর-কিশোরীরা বসে রাম-সীতার সাজে। রাম সাজা ছেলেটা গভীর তন্দ্রার সঙ্গে লড়াই করছে প্রাণপণ। বার বার হাই তুলতে গিয়েও নিজেকে সংযত করে নিচ্ছে। বোধহয় লোকলজ্জায়। সীতার অবশ্য সেসব বালাই নেই। বছর বারো তেরোর সেই কিশোরী রামরূপী ছেলেটার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে অকাতরে। সামনে আরেকটা গাড়িতে হনুমান। হাতে ধরা পিচবোর্ডের গদা মাঝে মাঝেই প্রবল বিক্রমে ঘোরাচ্ছে
মাথার উপর। কখনও কখনও লাফিয়ে এগিয়ে আসছে সামনে। সঙ্গে সঙ্গে দু-দিকে অপেক্ষারত জনতার ঢেউ সমস্বরে গর্জন করে উঠছে ‘বোলো জয় বজরংবলী কী…’ সন্তু দুপুরে খাওয়ার পর বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। আজ প্রায় দিন তিনেক হল সে এসেছে এখানে৷ প্রতিদিনই বেরিয়েছে। যদিও রায়বাবু বারবার সাবধান করে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘সন্তু, আন্ডারগ্রাউন্ড হতে যাচ্ছিস, ঘুরতে নয়। বেনারসে যে বাড়িটায় উঠবি সেটা কিন্তু আমার বন্ধুর বাড়ি। ওখান থেকে ধরা পড়লে এই ভোটের আগে মহা ক্যাচাল হয়ে যাবে।’ তবু এই পুরোনো স্যাঁতস্যাঁতে শহরে এক অতিবৃদ্ধ বাড়ির এককোণে শ্যাওলার মতো পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না তার।
তিনদিন আগে শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে মুঘলসরাই তথা পণ্ডিত দিনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশনে এসে যখন নেমেছিল সন্তু, তখন ঘড়িতে সকাল পৌনে নটা। এসি কোচ থেকে নেমেই ভ্যাপসা গরমে কপালের রগে একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণ হল যেন। মাথা ধরাটা কমাতে একটু চা খাওয়া দরকার। এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে এক্সেলেটর ধরে নীচে নেমে স্টেশনের চৌহদ্দির মধ্যেই আপার ক্লাস ওয়েটিং রুম। সেই ওয়েটিং রুমসংলগ্ন চায়ের দোকানের বেঞ্চে নিজের লাগেজ রেখে এক চুমুকে চায়ের ভাঁড়টা শেষ করল সন্তু।
পকেট থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করে তাতে চোখ বোলাল। যোশীভিলা, ২৭২ শিভালা রোড, নিয়ার আনন্দমাই হসপিটাল, বারাণসী ২২১০০১। চিরকুটটা হাতে ধরেই চারিদিকে একবার তাকাল সে। কাউকে খুঁজল অন্যমনস্কভাবেই। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নম্বর ডায়াল করল। ‘হ্যালো, কে?’
‘স্যার আমি সন্তু।’
‘এই শালা হারামির বাচ্চা। বলেছি না আমায় ফোন করবি না?” ‘আরে স্যার এটা তো নতুন নম্বর। বেনামী সিম। ফোনটাও শিয়ালদা থেকে নতুন কিনলাম তো। চাপ নেবেন না।’
‘হোক। তবু খুব দরকার ছাড়া ফোন করবি না। দুজন মিলে একটা চারমণি লাশকে টপকাতে পারে না, আবার বড় বড় বুকনিবাজি। তাড়াতাড়ি বল কী দরকার। ‘বলছি আমি মুঘলসরাইতে নেমে গেছি। আমায় নিতে কার যেন আসার কথা ছিল, ওই যেখানে উঠব তার কেয়ারটেকার না কে যেন…’
‘সে বেনারসে আসবে শুয়ার, মুঘলসরাইয়ে না। তুই স্টেশনের বাইরে থেকে বেনারসের অটো ধর। নামবি লাঙ্কা চৌরায়ায়। ওখানেই বাদল থাকবে। সে তোকে নিয়ে যাবে।’
‘আচ্ছা স্যার। আর বলছি পেমেন্টটা…’
‘শুয়ারের বাচ্চা কাজটা কি ঠিকঠাক উতরেছ? মাঝখান থেকে ওই বঙ্কা হারামজাদা নিজেই পা পিছলে মাটিতে পড়ে টপকে গেল। শুধু শুধু মিডিয়াতে চব্ব চলল রাতদিন। যাকগে শোন, এখন দিন পনেরো ঘাপটি মেরে পড়ে থাক ওখানে। আর মনে থাকে যেন, বাড়ি থেকে খবরদার বাইরে পা রাখবি না। বাদলকে বলা আছে, ও বাজার হাট করে আনবে। ভোটের আগে যদি ধরা পড়ো না চাঁদু, ওই টাকা তোমার পেছনে…
‘এই স্যার অটো ছেড়ে দিল, রাখছি রাখছি…’
ফোনটা কেটে রায়বাবুর উদ্দেশে নিজের মনেই কিছু বাছা বাছা খিস্তি ছুড়ে মারল সন্তু। সব নেতাগুলো শালা কুত্তার বাচ্চা। এদের স্বার্থে ঘা লাগলে এরা নিজের বাপকেও চামড়া ছাড়িয়ে কুচিকুচি করে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়াবে।
অটো এসে দাঁড়াল বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির গেটের মুখে। রাস্তার দুদিকে অস্থায়ী কচুরি সব্জির দোকান। গরম কচুরি ভাজার সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। সন্তু সবে শালপাতার প্লেটে কচুরি জিলিপি নিয়ে দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চে বসেছে, লোকটা এসে তার সামনে দাঁড়াল। মাঝবয়সি ক্ষয়াটে চেহারা। চোখগুলো কোটরে বসা। মুখে আকর্ণবিস্তৃত হাসি৷ ‘মুলোর মতো দাঁত’—এই প্রবাদটার এর থেকে উৎকৃষ্ট উদাহরণ বোধহয় সন্তু এর আগে দেখেনি। লোকটা মাথা চুলকে বলল, ‘আইজ্ঞা, আপনে কি সম্ভবাবু ?’
‘বাবুটাবু আবার কী! তুমি বাদল বুঝি? ‘ ‘আইজ্ঞা।’
‘বাহ, বাঙালি! তা আমায় চিনতে পারলে কী করে?’
‘স্যার ছবি পাঠাইসিলেন।”
‘অ। কচুরি খাবে?’
‘না না৷ আমি খাবার খাইসি, আপনে খান। তাছাড়া বাইত্তে তো বেরেকফাস্ট রেডি আসে।’
‘থাক না। আবার খাব গিয়ে। এই চারটে কচুরিতে কিছু হয় নাকি?
উত্তর না দিয়ে হেঁ-হেঁ করে দেঁতো হাসি হাসে বাদল।
লাঙ্কা থেকে অশ্বী মোড় পেরিয়ে মদনপুরার ঠিক আগেই শিভালা। ঘিঞ্জি পরিবেশে পুরোনো আমলের বাড়িগুলো অনেকটা প্রৌঢ়ত্ব পেরোনো পুরুষের অসমান দাঁতের পাটির মতো একে ওপরের গায়ে হেলে পড়েছে। রাস্তাঘাটের অবস্থাও অথৈবচ। এদিকটায় বোধহয় ট্যুরিস্ট তেমন আসে না। মদনপুরা বা শিভালার বেশিরভাগ জীর্ণ বাড়িগুলোর ভিতরেই হাতে বোনা সিল্কের কারখানা। খুটখাট একটানা আওয়াজে মজে থাকে পরিবেশ। সন্তু জাত শিকারী। কোনও জায়গাকে একবার দেখলেই সে সেই জায়গার প্রতিটা অলিগলি, রং, গন্ধ, শব্দ চিনে রাখে হাতের তালুর মতো। মেনরোড থেকে একটা সরু গলি চলে গিয়েছে উত্তর-পূর্ব দিকে বেশ খানিকটা। তারপর রাস্তার ডানদিকে এই বিশাল দোতলা বাড়িটা। যদিও এখন এর যা অবস্থা তাতে একে আর বাড়ি বলা যায় কিনা সন্দেহ আছে।
নিচু ফটক দিয়ে ঢুকে ছোট্ট একফালি বারান্দা। তার তিনদিকে সারি সারি ঘর। সন্তু বুঝল বাড়িটাকে বাইরে থেকে যতটা মনে হয় আদপে তার থেকেও অনেকটাই বড়। অধিকাংশ ঘর তালা দেওয়া। কিছু ঘরের দরজা নেই। ভিতরে নিকষ অন্ধকার ছাড়া কিছুই দৃশ্যমান নয়। সেদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল সন্তু। বাদল বলল, ‘আইজ্ঞা এই বাড়ি তো বহু বসর খালি পইড়া আসিল। তারপর বাবু কেনলেন। যহন আমি আসি তার আগেই এসব ঘরের দরজা-জানলা সব খুইলা লইয়া চইলা গেসে চোরে। কে জানে খাট আলমারিও কিসু সিল-টিল কিনা। থাকলে হেও লইয়া গেসে।’
‘তুমি এই বাড়িতে কতদিন আছ?’ ‘তা বসর দুয়েক।’
‘তার আগে কোথায় ছিলে?’
‘আইজ্ঞা গ্রামে৷ ওই বনগাঁর কাছে।’
দ্যালেন।’
‘ও৷ তা এখানে চলে এলে যে ঘর-বাড়ি ছেড়ে?’
‘পালায় আইচি। রায়বাবুর অনেক দয়া। তিনিই তাঁর বন্ধুরে কইয়া এইহানে ঠাঁই
‘পালিয়ে এসেছিলে কেন?’
‘তিনজনেরে খুন করেসিলাম।’
‘সে কী!’
এত সহজ স্বাভাবিক গলায় বাদল কথাটা বলল যে সন্তু প্রথমে ভাবল সে বুঝি মজা করছে। ওরা একতলার শেষ প্রান্তে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সরু লোহার সিঁড়িটা দিয়ে ওপরে উঠছিল। এখানে অন্ধকার খানিক পাতলা। সেই আলো-আঁধারি পরিবেশে মানুষের অবয়ব ঠাওর হলেও কারও মুখের অভিব্যক্তি বোঝা সম্ভব নয়। তবু সন্তু চমকে মাথা তুলে বাদলের মুখের দিকে তাকাল। সন্তুর মতো পোড় খাওয়া খুনিও বোধহয় নরহত্যাকে এত সহজভাবে নিতে শেখেনি।
লোকটা সন্তুর মুখের বিস্ময়ের অভিব্যক্তি খেয়াল করল না। সে নির্বিকার ভাবেই বলে চলল, “তিনজনরেই খুন কইরা মাথা কাইট্যা একটা বস্তায় ভইরা ইসামতীর জলে ভাসায় দিসিলাম। আর বডিগুলা কুসি কুসি করে কাইট্যা সাতদিন ধইরা গেরামের কুকুরগুলারে খাওয়াইসিলাম।’
‘কিন্তু তুমি খুনগুলো করলে কেন? তোমার পেশা যে খুন করা নয় সেটা তো বুঝতেই পারছি।’ ‘কী কইরা বোঝলেন ? ’
‘প্রফেশনালরা এভাবে অপারেট করে না। কোনও পার্সোনাল রাগ ছিল তোমার ওদের ওপর। পুরো ঘটনাটা বলো তো শুনি।’
“হেইসব তো মেলা কথা। ওসব পরে হইব’খন। এহন খাইবেন চলেন দেহি।’ বিশাল দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসে বাদল।
‘আচ্ছা বাদলদা, বাড়িতে একটা খুব বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে না? কুকুর বেড়াল কিছু পচেছে নাকি?
‘গন্ধ?’ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়েও থমকে পিছনে তাকাল বাদল। তারপর নাকটা কুঁচকে বার দুয়েক বাতাস শুঁকে নিয়ে বলল, ‘কুথায় ভাই? আমি তো কোনও গন্ধ পাইতাসি না।’
‘পাচ্ছ না, না? আচ্ছা বেশ, চলো ওপরে চলো।’
দিন কয়েক পরের কথা, আজ আবার সেই দুঃস্বপ্নটা দেখে উঠে বসেছে সন্তু। প্রায় রোজই একটা অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে তাকে। আজকাল এই
বাড়ির চৌহদ্দি থেকে সে আর সচরাচর বেরোয় না। এমনটা নয় যে সেটা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে। ঠিক কেন যে সে নিজেকে এই নরককুণ্ডের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি বানিয়ে ফেলেছে তা সে নিজেও জানে না। সারাদিন একটা ঘুম ঘুম ক্লান্তি গ্রাস করে রাখে তাকে।
আর সেই দুর্গন্ধ। উফ! অসম্ভব কড়া একটা পূতিগন্ধ কালো চাদরের মতো মুড়ে রাখে বাড়িটাকে। প্রথম প্রথম গন্ধটা হালকা ছিল। এখন যত দিন যাচ্ছে গন্ধের তীব্রতা আরও বাড়ছে। আর যত তীব্রতা বাড়ছে, ততই একটা গভীর নেশা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।
নেশা লাগছে সেই দুঃস্বপ্নেরও। হরিপুরের ঘটনাটার দিন তিনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল সেটা। নাহ, এই দুঃস্বপ্ন ঘুমিয়ে দেখা অবচেতন মনের কল্পনা নয়৷ সেটা এই নির্মম জগতের ইট-কাঠ-বালির মতো বাস্তব। পারুল এসে দাঁড়াচ্ছে তার সামনে। বারবার। গভীর রাতে কোনও অচেনা গলির মোড়ে সে এসে দাঁড়িয়ে থাকছে সন্তুর অপেক্ষায়। যেমন সেই যে হরিপুরে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল সে। নিঃশব্দে হাসছিল। হাতছানি দিয়ে ডাকছিল তাকে। সন্তু তাই বঙ্কাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল তার কাছে। মুচকি হেসে মিলিয়ে গিয়েছিল পারুল। সন্তু ভেবেছিল বোধহয় মুক্তি মিলল এই যন্ত্রণা থেকে। আর এই প্রেতিনী তাকে তাড়া করে বেড়াবে না। কিন্তু হা ঈশ্বর! এখন রোজ রাতেই সে আসে। সন্তু তার কৌতুকপূর্ণ খিলখিল হাসি শোনে, মাঝে মাঝে শোনে তার নূপুরের ঝমঝম আওয়াজ। মাথার ভিতর সব গোলমাল হয়ে যায়। নিজেকে বদ্ধ উন্মাদ মনে হয়। বাদলকে কিছু জানাতে পারে না। যদিও এই কদিনে লোকটার সঙ্গে বেশ সখ্য হয়ে গেছে সন্তুর। বাদলের রান্নার হাত অতি চমৎকার। খেলে হাত চাটতে হয়।
ওই তো! নূপুরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ঘরের বাইরে। ঝম ঝম ঝম… আবার এসেছে ওই শয়তানি। সন্তু বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনে। হ্যাঁ! কোনও ভুল নেই। সে কি ভয় পাচ্ছে? গোটা উত্তর চব্বিশ পরগনার ত্রাস নির্মল তপাদার ওরফে সন্তু ভয় পাচ্ছে! জানালার কাছে দাঁড়িয়ে একটা পাল্লা খুলে সিগারেট ধরায় সে। নাহ্! এর একটা হেস্তনেস্ত হওয়া প্রয়োজন। মিনিট কয়েক পর অ্যাশট্রেতে জ্বলন্ত সিগারেটটা গুঁজে হাত বাড়িয়ে দরজার একটা মোটা খিল তুলে নেয়।
এক-পা এক-পা করে এগোচ্ছে সন্তু। পিছনে খোলা জানালা দিয়ে শন শন শব্দে হাওয়া বইছে। খুব সন্তর্পণে ঘরের দরজার হাতল ঘুরিয়ে বাইরে বেরোল সে। একটা অজানা আশঙ্কা মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মনে হচ্ছে যেন ওর মনটা কোনও শক্তিশালী মাদকের আবেশে আচ্ছন্ন। শুধু যন্ত্রের মতো শরীরটা এগিয়ে চলেছে ওই শব্দের উৎস লক্ষ্য করে। মেঝেতে পা ঘষে ঘষে চলার শব্দ। সঙ্গে মৃদু ঝম ঝম আওয়াজ।
পায়ে পায়ে লম্বা বারান্দাটার ঠিক মাঝামাঝি এসে দাঁড়িয়েছে সে। এখন মনে হচ্ছে শব্দটা তাকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করছে। ঝিঁঝির ডাক ছাপিয়ে একটা মৃদু নূপুরের আওয়াজ তাকে ঘিরে ফেলেছে ক্রমশ। চারপাশে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। বারান্দার আলোটা
জ্বালায়নি সন্তু। অথচ সেটাই ছিল স্বাভাবিক নিয়মে তার প্রথম কর্তব্য। হঠাৎ কে যেন তার কানের কাছে এসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সন্তু কিন্তু বিন্দুমাত্র চমকাল না। তার শরীর মন সব গ্রাস করে নিয়েছে এক অদ্ভুত মায়া। সব বাহ্যিক জ্ঞান লোপ পেয়েছে বেমালুম। তার মনে হল কে যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
সন্তু একটা ঘোরের মধ্যে নেশাতুরের মতো স্খলিত পায়ে সেই শব্দকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে৷ তার সামনে সামনে হেঁটে চলেছে নূপুর পরা দুটো পা। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে নরম গলার খিলখিল হাসির আওয়াজ। হালকা পায়ের মৃদু পদশব্দ ভেসে আসছে৷ নাহ, ঠিক পদশব্দ নয়। কেউ তার পা দুটোকে অতি কষ্টে মেঝেতে ঘষে ঘষে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে বারান্দা পেরিয়ে সেই নারীমূর্তি বাথরুমে ঢুকে গেল। অনুসরণ করে ঢুকল সন্তুও।
কই, কেউ তো নেই। বাথরুমের ছোট্ট জানালার ওপারে সরু রাস্তা। স্ট্রিট লাইটের কুসুমরঙা আলো খড়ি-ওঠা দেওয়ালের গা চুঁইয়ে এসে ঢুকেছে বাথরুমে। সেই আলো ঘন হয়ে এসে পড়েছে আয়নার সামনের একফালি জায়গায়। বাকি সবটুকু গিলে খেয়েছে ঘন অন্ধকারের বলয়।
সন্তু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আয়নার সামনে। সেই তির্যক আলো এখন এসে পড়েছে তার মুখে, বুকে, কাঁধে। আয়নার কাচে ফাটলের ফাঁকে ফাঁকে ময়লা জমেছে। দীর্ঘদিনের অযত্নে জলের ছিটের দাগ জমে জমে অস্বচ্ছ হয়ে গিয়েছে প্রতিবিম্ব৷ একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে আছে সন্তু৷ মনে হচ্ছে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটাও ব্যঙ্গ করছে তাকে। তার ঠোঁটের কোণে লেগে রয়েছে একটা শয়তানি হাসি।
হঠাৎ সন্তুর গলাটা বুজে এল। যেন কেউ শক্ত, বলশালী দুই হাতে তার গলাটা টিপে ধরেছে। পরক্ষণেই মনে হল না, তা নয়। তার গলার কাছে কী একটা দলা পাকিয়ে আটকে গেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। সন্তু জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু তা সম্ভব নয় আর। তার মনে হচ্ছে তার শরীরের ভিতর থেকে সবকিছু লন্ডভন্ড করে কিছু একটা বেরিয়ে আসতে চাইছে গলা দিয়ে৷ সন্তু আয়নার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে৷ হঠাৎ সে দেখতে পায় তার পিছনে আরেকটা চেনা মুখের প্রতিবিম্ব। অ্যাসিডে বিকৃত হয়ে যাওয়া দুটো চোখ, একটা নাক, ঠোঁট। সেই আবছা আলোয় ক্ষতবিক্ষত ঠোঁটের কোণে একফালি নরম হাসি চকচক করে ওঠে। সেই মুখ আরো এগিয়ে আসে আয়নার দিকে। সন্তু তার নরম নিঃশ্বাস অনুভব করে নিজের কাঁধে। আয়নার প্রতিবিম্বের মধ্যে দিয়েই পারুলের চোখে চোখ রাখে সন্তু। সে চোখ নিস্পলক, মরা মাছের চোখের মতো স্থির।
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে সন্তুর। আতঙ্কে, উত্তেজনায় ছটপট করতে থাকে সে৷ তার গলা দিয়ে একটা অস্পষ্ট চাপা গোঙানির মতো আর্তনাদ ছিটকে আসে। সঙ্গে সঙ্গে পারুল বিশ্রী স্বরে হেসে ওঠে। সন্তুর মনে হয় তাকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করছে সেই অদ্ভুত অশরীরী হাসি। সে দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে বসে পড়ে মেঝেতে। সন্তু পরিষ্কার বুঝতে পারছে সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। হয়তো সবকিছুই হ্যালুসিনেশন। হ্যাঁ। স্রেফ চোখের আর মনের ভুল। তবু সবকিছুই যেন ভীষণ সত্যি, ভীষণ বাস্তব। হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়।
অনুভব করা যায়। তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে।
কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে বেসিনের কল খুলে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেয় সন্তু, এমন সময় পিছন থেকে ঘুম জড়ানো গলায় কেউ বলে ওঠে, ‘কী ব্যাপার ? শরীর খারাপ লাগতাসে নাকি?’ চমকে ওঠে সে। চকিতে পিছন ফিরে দেখে উদ্বিগ্ন মুখে বাদল দাঁড়িয়ে। প্রথমে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও বাদলের পিছনে দৃষ্টি পড়তেই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিরশিরে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায় তার।
পারুল দাঁড়িয়ে আছে ঠিক বাদলের পিছনে। ঘাড়টা ডানদিকে কাত হয়ে আছে। যেন শরীর থেকে আলাদা হয়ে ঝুলে আছে কোনওমতে। সে হাসছে। উচ্চৈঃস্বরে খিলখিলিয়ে হাসছে৷ বড় পৈশাচিক সে হাসি। শরীরটা হাসির দমকে দুলে দুলে উঠছে। এদিকে বাদলের সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। সে কি এই হাসি শুনতে পাচ্ছে না? ‘বাদলদা তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ না?’ প্রায় চিৎকার করে ওঠে সন্তু। ‘কী শুনুম ভাই?’ বাদলকে আরও হতভম্ব দেখায়৷
‘পারুল হাসছে বাদলদা৷ তুমি শুনতে পাচ্ছ না? ওই দ্যাখো তোমার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে পারুল হাসছে।’
পিছন ফিরে তাকায় বাদল। তারপর তার সেই প্রকাণ্ড দাঁতের পাটি বের করে হাসে। হাসতে হাসতেই বলে, ‘আপনি আসেন তো আমার লগে। টেনশনে কীসব ভুলভাল দেখতাসেন, কিচ্ছু হইব না দ্যাখবেন। পুলিশের কেস ধামাচাপা পইড়া যাইব। লোকেও ভুইলা যাইব। প্রায়ই তো রায়বাবু এইহানে লুক পাঠান আন্ডারগ্রাউন্ড হইবার জইন্য। তারা আসে, খায়-দায়, মজা করে, তারপর চইল্যা যায়। এসব লইয়া একদম ভাইবেন না। আসেন, ঘরে আসেন।’
বাদলের পিছন পিছন ঘরে এসে ঢোকে সন্তু। বাদল নুন চিনির সরবত করে এনে দেয়। তাতে আলতো চুমুক দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে সন্তু। সারা বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা দুর্গন্ধটা এখন অসহ্য হয়ে উঠেছে৷ গা গুলিয়ে ওঠে সন্তুর। সে জিগ্যেস করে, ‘তুমি সত্যিই এই বাড়িতে কোনও গন্ধ পাও না, তাই না বাদলদা?’
বাদল উত্তর দেয় না। শুধু হেসে সন্তুর কাঁধে একটা হাত রাখে। সন্তু দিন দিন মানুষটার ওপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কালবৈশাখীতে পথ হারানো পথিকের মাথা আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছের মতো আগলে রেখেছে সে সন্তুকে। সন্তু হঠাৎ দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। বাদল নরম গলায় বলে, ‘কাইন্দেন না ভাই। একখান কথা জিগাই যদি কিছু মনে না করেন?’ সন্তু মাথা তুলে
তাকায়।
‘পারুল ক্যাডা? আপনে বলসেন পারুল আপনারে মাইরা ফ্যালবে। পারুল আমার পিছনে দাঁড়ায় আসে।’
‘আমার অনেক শিকারের মধ্যে একজন।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্তু বলে, ‘একটা গ্রামে গেছিলাম রায়বাবুরই একটা অপারেশনে। ঠাকুরনগর থেকে অনেকটা ভিতরে। ওই তোমাদের ওদিকেই বলা যায়। সেখানে পারুলকে দেখেছিলাম স্কুল থেকে ফিরছে। লোভ লেগেছিল বাদলদা। ভীষণ লোভ।’
‘তারপর ?’
‘তারপর মেয়েটার সঙ্গে দিন সাতেক প্রেমের নাটক করলাম। বললাম বিয়ে করব, কলকাতায় নিয়ে আসব। এসব বলে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাতে দেখা করতে ডাকলাম গণ চৌধুরীর মাঠে। আসলে ওকে বলেছিলাম আমি শিক্ষিত ছেলে, সরকারি সার্ভের কাজে এসেছি। মেয়েটা আর কিছু সন্দেহ করেনি। সেইমতো সেই রাতে পারুল এসেছিল, একা। আর আমরা ছিলাম চারজন। সব মিটলে শেষ রাতে মেয়েটার মুখটা অ্যাসিড ঢেলে পুড়িয়ে, গলা কেটে লাশটা খালের জলে ফেলে এসেছিলাম।’
‘কাজটা খুব খারাপই করসিলেন ভাই…’ একটু উদাস দৃষ্টিতে খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল বাদল।
সন্তু উত্তর দেয় না। চোখ বুজে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে চুপচাপ। ফোনের স্ক্রিনটা আলোকিত হয়ে ওঠে। গত দিন তিন চারেক ধরে রায়বাবু ফোন করছেন। ধরতে ইচ্ছে করে না সন্তুর। ফোন পড়ে থাকে খাটের পাশের টেবিলে। বেজে বেজে একসময় নিজেই কেটে যায়। ধীরে ধীরে ঘুম নেমে আসে সন্তুর ক্লান্ত চোখে৷ একটা ছোট্ট কালো বিন্দু বড় হতে হতে গ্রাস করে ফেলে তার চৈতন্য। বিছানায় এলিয়ে পড়ে শরীরটা। সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় বাদল৷
‘কী ভাবতাসেন ভাই?’ বাদলের প্রশ্নে সম্বিৎ ফেরে সন্তুর। সে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল কী যেন একটা ভাবতে ভাবতে। বাদলের কথায় চমক ভাঙতে জবাব দেয়, ‘নাহ! কিছু না। কী যেন বলছিলে?
‘বলতাছিলাম, মাংসটা কেমুন হইসে’ সন্তু একটু নিষ্প্রাণ শুকনো হেসে বলে, ‘তুমি রোজ রোজ মাটন খাইয়ে আমায় মেরে ফেলবে দেখছি।”
‘কী যে কন! আপনারে আইজকাল এত শুকনা দেখায়…’
‘সে সমস্যা কি আর ভালোমন্দ খেয়ে মিটবে গো দাদা!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে সন্তু।
‘এত ভাইরবেন না ভাই। ভাবনাতেই যত সমস্যা৷’
‘তুমি বুঝছ না বাদলদা। আমার সঙ্গে যা যা ঘটছে কয়েকদিন ধরে…. আমার মনে হচ্ছে আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাব। শেষ তিনদিন আমি ভালো করে কিছু খেতে পারছি না। খেলেই মনে হচ্ছে বমি হয়ে যাবে।
‘বিশ্বাস করো আমি একবর্ণ মিথ্যে বলছি না। আমার মনে হচ্ছে আমার এই বডিটা পুরো ফাঁপা। এর মধ্যে অন্য কেউ একজন ঘাপটি মেরে আছে। সে খালি আমার পেট চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমার মনে হচ্ছে আমি পাল্টে গিয়ে সেই লোকটা হয়ে যাব। আমার এই চোখ, নাক, এই যে গায়ের চামড়া, সব সাপের খোলসের মতো ধীরে ধীরে খসে পড়বে। বুঝতে পারছি এসব কথা বলতে গেলে আমায় পাগল বলবে লোকে।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে ওঠে সন্তু, ‘আবার হয়তো তখন আমায় কেউ চিনতেই পারল না। আমার এই চামড়ার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসল অন্য কেউ৷
সে সন্তু না। সে কোনও খুন খারাপি করেনি, কোনও মেয়ের সর্বনাশ করেনি। কোনও মেয়ের প্রেতাত্মা তাকে দিনরাত তাড়া করে না। কেমন মজা হবে বলো তো!”
হঠাৎ তীব্র স্বরে হেসে ওঠে সন্তু। হাসতে হাসতে পেট চেপে চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে বসে পড়ে। বাদল কিন্তু অস্থির হল না। ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আমরা হক্কলেই খুব খারাপ মানুষ ভাই। অতীত তাই আমাগো সবাইরেই তাড়া কইরা বেড়ায়। এর থিক্যা কিছুতেই মুক্তি নাই।’
ততক্ষণে সন্তুর হাসি থেমেছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে তার। চেয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরেছে প্রাণপণে। চোখের কোল ঘেঁষে জলের বিন্দু নেমেছে গাল বেয়ে । বাদল উঠে এসে তার কাঁধে হাত রাখে। সন্তু উঠে দাঁড়ায়। তারপর টলোমলো পায়ে ফিরে আসে নিজের ঘরে।
বিছানায় শরীর এলিয়ে চোখ বুজেছে, আবার ফোনটা বেজে ওঠে। রায়বাবু! কী মনে হতে ফোনটা রিসিভ করে সন্তু। ওপ্রান্ত থেকে গলা ভেসে আসে, ‘হারামজাদা ফোনটা ধরতে কী হয়েছিল এতদিন ধরে। আমি ভাবছি ওখানে গিয়েও কেস খেলি কিনা কোনও। বাদলের ফোনটাও তো সুইচড অফ।’ ‘বলুন স্যার।’
‘ছুটি কাটানোর দিন শেষ সোনামণি। কাজে লাগতে হবে। আগের বছর সেই ঠাকুরনগরের ভিতরে গ্রামে গেছিলি তোরা মনে আছে? সেই আমার এগেনস্টে এফআইআর করেছিল যে মাস্টার, তার সুপারি নিয়ে গেছিলি তোরা চারজন। তো সেই মাস্টারকে তো সেবারই মারলি, কিন্তু শালা ওর ছেলেটা আরও বড় ঢ্যামনা। এলাকার লোকজনকে খেপাচ্ছে আমাদের এগেনস্টে। কেসটা রিওপেন করানোর জন্য চাপ দিচ্ছে।
—তুই তো তখন হরিপুরে সেই অপারেশনটায় বিজি ছিলি। তাই আমি তোদের পুরোনো টিমের সেই বাকি তিনজনকেই পাঠালাম। তা খবর পেলাম এর মধ্যে শালা কোন শুয়ারের বাচ্চা তিনজনেরই নাকি মাথা কেটে নদীর জলে ফেলে দিয়েছে৷ আমি শিওর, এ ওই শালা মাস্টারের ছেলের কাজ। ওই বোধহয় লোক লাগিয়ে এসব করিয়েছে…’ রায়বাবু অনেক কিছুই বলে যাচ্ছিলেন। যদিও শেষের দিকের প্রায় কোনও কথাই সন্তুর মাথায় ঢুকছিল না। সে কোনওরকমে কেটে কেটে শুধু জিগ্যেস করল, ‘স্যার, আপনি বাদলকে চেনেন?’
‘কে বাদল? ও তোর ওই বাড়ির কেয়ারটেকার? না না পার্সোনালি চিনি না৷ শুনেছি ভালো ছেলে। অল্পবয়সি ছোকরা। ইউপির ছেলে। বেনারসের কাছেই রামনগরে বাড়ি। কেন বল তো? কী রে? কথা বলছিস না কেন? কীসের শব্দ হল? সন্তু? চিৎকার করে উঠলি কেন? কীসের শব্দ হল? হ্যালো? ‘
‘হ্যালো রায়বাবু! আপনি আমায় সিনবেন না। আমি সনাতন। সনাতন দাস। আমার বাড়ি ওই ঠাকুরনগর থেকে বনগাঁ যাওয়ার পথে অনেকটা ভিতরে একটা ছোট্ট গেরামে। গেরামের নাম উনাই। চিনেননি?’
‘উনাই? মানে তুইই শালা সেই মাস্টারমশাইয়ের ছেলে নাকি? তুই মেরেছিস আমার ছেলেদের? তোকে আমি ছাড়ব না। তার আগে সন্তুকে ফোন দে। সন্তুকে ফোন দে শুয়ারের বাচ্চা
‘এত প্রশ্ন একলগে করলে কী কইরা জবাব দিব স্যার? একে একে দেই? না, আমি কোনও মাস্টারমশাইয়ের ছেলে-টেলে নই। আমি সামান্য চাষীর ব্যাটা, অনেক পুরুষ ধইরাই চাইষবাস কইরা খাই। তবে হ, পরের প্রশ্নটার জবাব এক্কেরে ঠিক। আমিই আপনার ছেলেগো মারসি। আর সম্ভবাবুর শরীরটা হঠাৎ একটু খারাপ করসে। তাই ওর লগে বোধহয় আর আপনার কথা হইব না। যাই হোইক, আপনার লগে কথা বইল্যা ভালা লাগল স্যার। টাটা।’
সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডানহাতে একটা হলঘর। দরজায় একটা মোটা তালা ঝুলছিল এতদিন। এখন দরজাটা খোলা। ঘরের ভিতর দুটো লম্বা টেবিল পাশাপাশি রাখা। ঘরের আনাচে কানাচে জমা চাপা অন্ধকারে ভিতরটা পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান নয়। তবে যেটুকু ঠাহর করা যায় দুটো টেবিলেই দুজন মানুষকে শোয়ানো আছে৷
প্রথমটায় শায়িত মানুষটার শরীরের বেশ কিছু অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই। পা দুটো হাঁটুর নীচ থেকে কাটা। ডান হাতের জায়গায় একটা গর্ত। সেখান থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে নেমেছে টেবিলের পায়া বেয়ে মেঝেতে। এখন অবশ্য সে রক্ত শুকিয়ে গেছে। মেঝেতে বেশ কিছুটা অংশ জুড়ে রক্ত জমে চ্যাটচ্যাটে হয়ে আছে। মাছি উড়ছে ভনভনিয়ে। বলা বাহুল্য, সেই দেহে প্রাণ নেই। কেটে নেওয়া অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জায়গায় দগদগে ক্ষত৷
দ্বিতীয় টেবিলে শায়িত মানুষটা অবশ্য এখনও জীবিত। খুব ধীর গতিতে তার বুকটা ওঠানামা করছে। নিঃশ্বাসের গতি দুর্বল হলেও রুদ্ধ হয়নি এখনও। তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। পরনে আকাশি রঙের সালোয়ার কামিজ। হাতে ধরে থাকা একটা প্লাস্টিকের বোতলের ঢাকনি আলগা করে টপ টপ করে জলের ফোঁটা ফেলতে লাগল সে, টেবিলে শায়িত মানুষটার কপালে।
কপালে টিপটিপ ঠান্ডা জলের ফোঁটায় সজাগ হয়ে ওঠে সন্তু৷ এক ঝটকায় উঠে বসতে চায় সে, কিন্তু পারে না। উপলব্ধি করে তার শরীর আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা রয়েছে একটা লম্বা টেবিলের সঙ্গে। হাত আর পায়ের আঙুল ছাড়া আর শরীরের কোনও অংশ নাড়াবার অবকাশ নেই। শরীরকে চিৎ করে শুইয়ে টেবিলের সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। কপালে জল কোথা থেকে পড়ছে সন্তু বুঝতে পারছে না। তার চেতনা এখনও পুরোপুরি সজাগ হয়নি। সে কি বাড়িটারই কোনও ঘরে বন্দি? অবশ্য এটাকে ঘর না বলে গুদাম বললেই বোধহয় যথার্থ হয়। ভ্যাপসা সেই পচা কটু গন্ধটা ছড়িয়ে আছে ঘরময়, প্রায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।
সন্তু বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই শুয়ে রইল। কপালের ওপর টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে, ব্যাপারটা বেশ বিরক্তিকর। সন্তু মনে করার চেষ্টা করল, সে এখানে কী করে এল! কিন্তু কিছুতেই স্পষ্টভাবে কিছু মনে পড়ল না। রায়বাবু ফোন করেছিলেন না? কী যেন বলছিলেন? বাদল কী যেন করেছে। উফ। আবার সেই বিরক্তিকর জলের ফোঁটা! সন্তু ঝটকা দিয়ে মাথা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হল। এইবারে বিরক্তি সীমা অতিক্রম করছে। সে নিজের সর্বশক্তি একত্রিত করে নিজেকে বন্ধনমুক্ত করার চেষ্টা করল।
কিন্তু বৃথা চেষ্টা। উন্মাদের মতো অস্থির লাগছে নিজের মনের ভিতরটা। নিজেকে
এতটা অসহায় বোধহয় আগে কখনও লাগেনি তার। পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে সে। অদ্ভুত এক অনুভূতি। না কোনও অত্যাচার, না কোনও যন্ত্রণা। অথচ একঘেয়ে নিরন্তর কপালে এই ফোঁটা ফোঁটা জলের আঘাত ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। চিৎকার করে সাহায্য চায় সন্তু। কিন্তু তার নিজের গলা অনুরণিত হয়ে তার কাছেই ফিরে আসে। হা ঈশ্বর। এ কেমন অমানবিক অত্যাচার।
হঠাৎ সেই অন্ধকারে একটা আলোর রেখা ফুটে ওঠে। সেই আলোর রেখা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। যেন গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের পেন্ডুলামের মতো দুলছে ডাইনে বাঁয়ে। ধীরে ধীরে সেই আলো কাছে এসে স্থির হয়। সন্তু যতটুকু সম্ভব মাথা তুলে দেখতে চেষ্টা করে। একজন পুরুষ। উচ্চতা মাঝারি, একহারা গড়ন। পরনে লম্বা হাঁটু পর্যন্ত কালো বর্ষাতি, মুখে অমায়িক হাসি।
লোকটার হাসির দিকে দৃষ্টি যেতেই অস্বাভাবিক লম্বা দাঁতগুলো নজরে পড়ে সন্তুর। বাদলদা! নামটা মাথায় ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চকিতে সবটা মনে পড়ে যায়। এ তো বাদল নয়। অন্য কেউ। কে এটা? লোকটার হাতে একটা ঝুলন্ত হ্যারিকেন। আলোটা পাশে নামিয়ে রেখে সে সন্তুর মাথার কাছে এসে চাপা অথচ বিনীত স্বরে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে, “খুব লাগে নাই ত ভাই?’
সন্তু নিরুত্তর থাকে। সে বুঝে গেছে এখানে তার কথা গুরুত্বহীন। লোকটা পাশে রাখা একটা টুল টেনে নিয়ে বসে। সন্তুর চোখের পাতা অসম্ভব ভারী লাগছে, হাত পায়ের আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছে। সে টের পায় তার হাত পায়ের বাঁধন খোলা হচ্ছে। সে প্রতিরোধের চেষ্টা করে না, জানে করে লাভও নেই।
এবার আরেকটা মুখ তার চোখের সামনে ঝুঁকে পড়ে। একটা অল্পবয়সি মেয়ের মুখ। সঙ্গে সঙ্গে সন্তু আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। লোকটা দাঁতে দাঁত চিপে সেই একই রকম ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ভয় পাইবেন না ভাই। ও পিশাচী বা ভূত-প্রেত কেউ না৷ অর নাম চুমকি। আমার ছোট মেয়ে। পারুলের যমজ বোইন। পারুল কে, সেটা মনে আসে তো? আপনি চুমকিরে দ্যাখেন নাই। কিন্তু ও আপনেগো দ্যাখছে। আমার পারুল মা হেই রাইতে কিন্তু একা যায় নাই। অন্ধকারে মাঠের রাস্তায় ভয় পাইব কইয়া লুকাইয়া বোনরে সঙ্গে কইরা লইয়া গেছিল। কইছিল খানিক দূরে অপেক্ষা করতে, কথা হয়ে গেলে আবার একলগে ফিরবে।
‘চুমকি মাঠের শ্যাষে বটতলায় দিদির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। অনেকক্ষণ কাইট্যা গেলেও দিদি না ফেরায় গণ চৌধুরীর মাঠে যায়, আর দিদির ওই অবস্থা দেইখ্যা অজ্ঞান হইয়া যায়। ও কিন্তু আপনেগো হেইদিন দূর থিক্যা দ্যাখছিল। কিন্তু বেচারি ছোট থিকাই কথা কইতে পারে না। তাই কোনওদিন মুখ ফুইটা বলতে পারে নাই ওর ফুলের মতো অসহায় দিদিটারে কারা…’ শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা বুজে আসে লোকটার।
সন্তুর কাছে এতক্ষণ যা ঘষা কাচের মতো ঝাপসা ছিল, তা এবার ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করে। টুকরো টুকরো তথ্যের কোলাজ। মনে পড়ে একটা সুন্দরী কিশোরীর মুখ। যে মুখ সে দেখেছে দিন দুয়েক আগের সেই অভিশপ্ত রাতে। অবশ্য দুদিন আগে রাতে দেখা মুখের ভয়ঙ্কর মেকআপটা এখন আর নেই। এখন আবার তার চোখের সামনে সেই এক বছর আগে দেখা ফুটফুটে নিষ্পাপ মুখ
নাহ। চোখদুটো নিষ্পাপ নয়। সেখানে ফুটে উঠেছে প্রতিশোধের আগুন। জ্বলন্ত কয়লার মতো উজ্জ্বল আঁচে জ্বলছে ধিকিধিকি।
লোকটা তখনও বলে চলেছে, ‘ভাগ্যিস ওই তিন হারামজাদা আবার ফিরা আইছিল গ্রামে৷ তবে অগো মৃত্যুটা খুব সহজ ছিল ভাই। তর ব্যাপারে সব খবর বাইর কইরা লওয়ার পর আর একটুও কষ্ট দিই নাই অগো, বিশ্বাস কর। নিজে হাতে এই কাস্তেটা দিয়াই প্যাঁচাইয়া প্যাঁচাইয়া শুধু গলাগুলি কাইটা নিছি। তারপর বডিটা কুচি কুচি কইরা কাইটা কুকুরগো খাওয়াইছি। কুকুরেরা মানুষের মাংস খাইতে খুব ভালোবাসে জানোস তো! যেমন তুই বাসছিলি। বার বার কইতিস না, বাদলদা তোমার হাতের মাংসটা ! উফ!’ বিশ্রী একটা স্বরে হেসে ওঠে লোকটা।
তারপর পাশের ছিন্নভিন্ন দেহটা দেখিয়ে বলে, ‘তুই শালা সত্যই বাদলের হাতের মাংস খাইতিস! এক্কেরে চাইটা পুইটা!’
লোকটার বিকৃত হাসিটা এবার কান্নায় বদলে যায়। সে কাঁদতে কাঁদতেই কাস্তেটা নিয়ে এগিয়ে আসে। কতকটা নিজেই মনেই বলতে থাকে, “হেই থিকাই চুমকিরে ম্যাকআপ করাইয়া রাত নামলেই তরে তাড়া কইরা লইয়া বেড়াইতাম। প্রথমে হরিপুরে, তারপর এই বেনারসে। আরও অনেক বেশি, অনেক বেশি কষ্ট দিয়া মারতে হইত রে তরে। তুই ফোনটা এমনিতেই ধরতাছিলি না, সরাইয়া ফেললে সন্দেহ করতে পারিস ভাইবা আমিও আর সরাইলাম না। ভুল হইয়া গেল গো বন্ধু, বড্ড ভুল হইয়া গেল…
সন্তুর অবচেতন স্মৃতিতে ভেসে ওঠে টুকরো টুকরো ফেলে আসা মুহূর্তের ভিড়। ছোটবেলার কথা, কলেজ রাজনীতি করে প্রথমবার জেলে যাওয়ার কথা, নিজে হাতে খুন করার সময় শিকারের চোখে চোখ রাখার অনুভূতি… সন্তুর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ঘুমে
ঢুলে পড়ছে দুচোখ। কেউ তার গালে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে তাকে জাগিয়ে রাখতে চাইছে৷ ঘরে ঠিক কজন আছে সন্তু বুঝতে পারে না৷ প্রথমে মনে হয় একজন, পরমুহূর্তেই মনে হয় দুজন, আবার হঠাৎ মনে হয় তাদের পিছনে অনেকগুলো ঝাপসা ছায়ামূর্তি। ওরা কারা? ওই তো উনাই গ্রামের সেই মাস্টারমশাই। সেই ইছাপুরের মহেন্দ্র সমাদ্দার, যাকে বছর দুয়েক আগে রাতের অন্ধকারে গলা কেটে নিজের হাতে মার্ডার করেছিল সন্তু। হঠাৎ সবাইকে ছাপিয়ে তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল একটা চেনা মুখ, বঙ্কা৷ উফ! মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। উন্মাদের মতো হেসে ওঠে সন্তু৷
একটা ধারালো অস্ত্র ততক্ষণে স্পর্শ করেছে তার হাতের চামড়া। খসখস করে একটা আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে। নিজের হাতের চামড়া ভেদ করে মাংসপেশী কাটার রুক্ষ শব্দ। সন্তু হাসতে হাসতেই চিৎকার করে কেঁদে ফেলে। চেপে রাখা সমস্ত যন্ত্রণা যেন বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো আছড়ে পড়ে। টেবিলের কোণ শক্ত করে খামচে ধরে হাসি আর কান্না মিশ্রিত এক অদ্ভুত অমানুষিক চিৎকার করতে থাকে সে৷
তারপর মনে হয় আস্তে আস্তে সে যেন তলিয়ে যাচ্ছে কোনও এক অতল গহ্বরে। হাতের বাহুতে শুধু একটা চিনচিনে ব্যথা। যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে একঘেয়ে মৃদু কোনও যান্ত্রিক আওয়াজ। তারপর হঠাৎই, এক লহমায় সবকিছু অন্ধকার।
