সাত বছর পরে – শোভন কাপুড়িয়া
সূচনা
পূর্ণিমার রাত। চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে রয়েছে গুহাগড় গ্রামের শেষ সীমানায় “অবস্থিত মাঠটা। মাঠের বুক চিরে শেষ প্রান্তে অবস্থিত কালো পাহাড়ের দিকে বিশালাকার সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে একটা কাঁচা রাস্তা। দূরদূরান্তে কোথাও কোনও জনমানবের চিহ্ন নেই।
এমন নির্জন রাতে হনহনিয়ে হেঁটে চলেছে লোকটা।
তার সর্বাঙ্গ কালো কাপড়ে ঢাকা। মুখমণ্ডল ভালোভাবে দেখা যায় না। ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা নিবারণের জন্য এই কাপড়টা যথেষ্ট নয়। কিন্তু এখন সেসব ভাববার সময় নেই। লোকটার সতর্ক-ভয়ার্ত দৃষ্টি বারবার ঘোরাফেরা করছে মাঠের চারিদিকে। হঠাৎ দূর থেকে কয়েক জোড়া শেয়াল ডেকে উঠল। প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তাদের সেই অপার্থিব ডাক। অজান্তেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে লোকটার।
মাঠের যেখান থেকে উঁচু ঘাসের জমি শুরু হয়েছে, সেখানে বিশালাকার প্রাচীন একটা বটগাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। চাঁদের আলোয় সেই গাছের ছায়াটা বড় বিকট দেখতে লাগছে। গাছটার নীচে এসে দাঁড়ায় লোকটা। আরো একবার দেখে নেয় চারপাশ; তারপরে তার হাতে ধরা টর্চটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পরপর তিনবার জ্বালায়। ‘এখানেই তো দাঁড়াতে বলেছিল।’ নিজের মনেই বিড়বিড় করে সে।
মিনিট দুয়েক পর হঠাৎ তার সামনে আবির্ভূত হয় দ্বিতীয় এক ব্যক্তি। তার লাল আলখাল্লা গোছের পোশাক আর কপালে রক্তাভ তিলক দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সে একজন তান্ত্রিক। তাকে দেখে লোকটা খানিকটা চমকে উঠলেও পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয়।
লোকটার নজর যায় তান্ত্রিকের ডান হাতের দিকে; কালো কাপড়ে মোড়া একটা বস্তু ধরা রয়েছে তার হাতে। তান্ত্রিকটা এবার ক্রূর ভাবে হাসে। ঠোঁটের একপাশ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে ময়লা ক্ষয়িষ্ণু দাঁতের সারি। লোকটা জিনিসটার দিকে হাত বাড়াতে গেলেই গম্ভীর ও রূঢ় কণ্ঠে তান্ত্রিক বলে ওঠে, ‘আগে টাকাটা দে! তারপরে এটা পাবি।’ মনের ভেতরকার বিরক্তিটাকে চেপে পরনের পোশাকের ভেতর থেকে লোকটা একতাড়া টাকা বের করে আনে। তারপর খানিক সংকোচের সঙ্গে টাকাগুলো তুলে দেয় তান্ত্রিকের হাতে।
এবারে তান্ত্রিক কালো কাপড়ে মোড়া সেই জিনিসটা দুইহাতে চেপে ধরে। সেটার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কীসব যেন বলতে থাকে বিড়বিড় করে। কথাগুলো ঠিক পরিষ্কার নয়। হঠাৎ করে শুনলে মনে হয় দুর্বোধ্য ভাষায় কোনও মন্ত্রোচ্চারণ চলছে। এরপর লোকটার হাতে জিনিসটা তুলে দেয় সেই তান্ত্রিক। চাপা কণ্ঠে ফিসফিস
করে বলে, ‘যেটা বলেছি সেটা মনে রাখিস। এ জিনিস অব্যর্থ। কিন্তু যদি কোনও ভুল হয় তাহলে…’ বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়ে লোকটা। তারপর ধীরে ধীরে ফেরার পথ ধরে। তার ঠোঁটে লেগে থাকে একটা চাপা ধূর্ত হাসি।
ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৬৬ ধরে দ্রুত গতিতে চলেছে কালো রঙের গাড়িটা। মোবাইলের ন্যাভিগেশনের দিকে নজর ঘুরিয়ে সন্তোষ বলল, ‘আর পনেরো কিলোমিটার পরেই রত্নগিরি ঢুকব আমরা; উফফ, এতক্ষণ ধরে ড্রাইভ করে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। জবরদস্ত খিদে পেয়েছে৷’ এতটা রাস্তা একটানা গাড়ি চালানো সত্যিই বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সেই পুনে থেকে একনাগাড়ে ড্রাইভ করে চলেছে সন্তোষ।
স্বামীর কষ্ট খানিকটা লাঘব করতে একটা জলের বোতল আর রাস্তা থেকে কেনা দুটো শুকনো বড়াপাও সন্তোষের দিকে এগিয়ে দেয় বৈশালী। হাইওয়ে থেকে রত্নগিরির এক্সিটে পৌঁছানোর দশ মিনিট আগে একপাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে পেটের আগুন নিবারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সন্তোষ। বৈশালী সন্তোষের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবে জলের বোতলটা পাশে রাখতে যাবে সন্তোষ, তখনই বৈশালী জিগ্যেস করে ওঠে, ‘তোমার কি সত্যিই খারাপ লাগছে না? মানে, এতটুকুও না?’
সন্তোষ থেমে যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার, ‘তোমায় তো আগেই বলেছি বৈশালী, শুধু বর্ষা বউদি ডেকেছে বলেই আমি যাচ্ছি। সম্পর্কের পাট তো আমি চোকাইনি! শুরুটা তো ওই লোকটাই করেছিল। কোনও সম্পর্কই একতরফা হয়ে বেঁচে থাকতে পারে না৷’
‘আমি জানি সন্তোষ, আমি জানি কী হয়েছিল। আমি জানি তোমার দাদা অন্যায় করেছিল তোমার সঙ্গে। তোমাকে তোমার বাবার ব্যবসার একটুও অংশ না দিয়ে পুরোটাই নিজে আত্মসাৎ করেছিল। খুবই অন্যায়। কিন্তু যে মানুষটা মারা গিয়েছে; যতই যাই হয়ে যাক না কেন, সে তোমার দাদা ছিল। তাই আমি চাই না যে তুমি কোনও কষ্ট মনে চেপে রাখো, কারণ সেটা তোমার শরীরের ক্ষতি করবে।’ কথাটা শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৈশালী।
গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ম্লান হাসে সন্তোষ। বৈশালীর পেটে হাত রেখে বলে, ‘তোমাদের দুজনকে ভালো রাখা ছাড়া আমার জীবনে আর কোনও প্রায়োরিটি নেই বৈশালী। দাদা আমায় প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করলেও ব্যবসাটা তো রক্তে রয়েছে আমার, সেটা তো আর কেড়ে নিতে পারেনি ও। সাত বছর আগে রত্নগিরির বাড়ি ছেড়ে পুনেতে গিয়ে আমরা দুজনে মিলে সাকসেসফুল একটা রেস্টুরেন্ট চেইন তৈরি করেছি, এটাই বা কম কী?
‘সে যাই হোক, ঘটনা যখন একটা ঘটেছে এবং আমি যেহেতু মানুষটার ভাই,
সেহেতু একবার বউদির সঙ্গে দেখা করে আসাটা আমার কর্তব্য বলে মনে করি। শুধুই কর্তব্য৷ মনে কোনও দুঃখ-টুঃখ চেপে রাখিনি আমি। দাদা-ভাইয়ের সম্পর্কটাই, যখন মরে গিয়েছে তখন আর এত ভেবে লাভ কী! ‘
বৈশালী এবার অল্প হাসে, সন্তোষের হাতে হাত রাখে সে। গাড়িটা আবারও পাড়ি দেয় গন্তব্যের দিকে।
সন্তোষ ও বৈশালী রত্নগিরির পৈতৃক বাড়িতে এসেছে, বেশিক্ষণ হয়নি। বাড়ির সামনে এসে একপ্রকার অবাকই হয়েছিল সন্তোষ। তাদের সেই ছোট্ট দোতলা বাড়িটা আজ পরিণত হয়েছে সুউচ্চ অট্টালিকায়। অট্টালিকাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট বড় আরো বেশ কিছু বাড়ি, আউট হাউজ, বিশাল একটা বাগান। বাগানের একপাশে রয়েছে সোনায় মোড়ানো ফাউন্টেন, যদিও সেই ফাউন্টেনে এখন জল পড়ে না…শুকনো।
বাগানের মাঝের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সন্তোষ লক্ষ্য করছিল যে বাগানে লাগানো গাছগুলো কেমন নেতিয়ে পড়েছে; যেন প্রাণবায়ু শুষে নেওয়া হয়েছে তাদের। গাছগুলোর যে কোনওরকম যত্ন নেওয়া হয় না তাতে কোনও সন্দেহ নেই৷
মূল বাড়িতে প্রবেশের পরে তাদের যে প্রভূত অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল এমন নয়। অবশ্য যে বাড়িতে দিন তিনেক আগেই একটা মৃত্যু ঘটে গিয়েছে সেখানে এমন কিছু হওয়ার আশাও রাখে না সন্তোষ। তাছাড়া সাত বছর আগের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও ভুলে যায়নি সে।
বাড়ির একতলার ডাইনিংয়ের সোফায় ওরা বসে আছে আপাতত। ডাইনিংয়ে বাবার সংগ্রহ করা বেশ কিছু অ্যান্টিক জিনিস ছিল। পুরোনো দুষ্প্রাপ্য জিনিস সংগ্রহ করার নেশা ছিল বাবার। আজ আর সেগুলোর বেশিরভাগেরই অস্তিত্ব নেই। কেন নেই সে সম্পর্কে ঠিক ধারণা করে উঠতে পারে না সন্তোষ ৷ ৷
একটা ট্রে’তে দু’কাপ চা আর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ফরসান ও পোহা সাজিয়ে নিয়ে এসে সামনের টি টেবিলের ওপর রাখে বর্ষা। ওর চোখ-মুখ অস্বাভাবিক শুকনো, চোখের তলায় গাঢ় কালির ছাপ। সাত বছর আগে শেষবার যখন বর্ষা বউদিকে দেখেছিল সন্তোষ, তখন সে রীতিমতো হৃষ্টপুষ্ট। ঝলমলে মুখে সবসময় একটা হাসি লেগে থাকত। মাত্র সাত বছরের মধ্যে বর্ষা বউদির শরীরের এমন পরিবর্তন হয়েছে! সত্যি বলতে বড্ড চোখে লাগছে তার এই কঙ্কালসার চেহারা। পরনে শাড়ি, ফুলহাতা সোয়েটার ব্লাউজ। হাত ও পায়ে কালো গ্লাভস। বাইরের আবহাওয়া ঠান্ডা হলেও এতটাও ঠান্ডা নয় যে হাত-পা সবকিছু ঢেকে রাখার প্রয়োজন রয়েছে; খানিকটা অদ্ভুতই লাগল সন্তোষের।
‘সন্তোষ, এতদিন পরে তোমরা এসেছ, খুব ভালো লাগছে ভাই। তোমার দাদা চলে যাওয়ার পর থেকে এই বাড়িতে একা থাকতে বড্ড দমবদ্ধ লাগে! চাকর-বাকর
ছিল আগে, সবাই সব দেখে রাখত। কিন্তু এখন আর…’ কাঁপা কাঁপা গলায় কথাগুলো বলল বর্ষা। বউদির শারীরিক দুর্বলতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আর মানসিক বিষাদটুকু যেন শারীরিক দুর্বলতার মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
সন্তোষ কিছু বলে না, নিশ্চুপ হয়ে চায়ের কাপ থেকে প্লেটে চা ঢেলে চুমুক দেয়। মনে মনে ভাবে, তার মানে দাদার ব্যবসা শেষ দিকে ভালো চলত না। ‘কটাদিন থাকবে তো তোমরা?’ জিগ্যেস করে বর্ষা।
‘এই তো তিনদিনের দিন সকালে বেরিয়ে যাব। বেশিদিন ব্যবসা ছেড়ে থাকতে পারব না। তোমাকে দেখতেই এখানে আসা বউদি…’ বউদির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে সন্তোষ।
বৈশালী একটু ইতস্তত করে বলে, “দিদি, সংগ্রামদা হঠাৎ করে মারা গেল কীভাবে? মানে যদি কিছু মনে না করো…’ বৈশালীর কথা শেষ হওয়ার আগেই বর্ষার চোখের কোণে জল জমে, মুখে একটা কালো মেঘের ছায়া ঘনিয়ে আসে।
‘সে সব পরে হবে’খন। তোমরা এতদূর জার্নি করে এসেছ; খাওয়া দাওয়া করো… একটু বিশ্রাম নাও।’ এটুকু বলে বৈশালীর স্ফীত পেটের দিকে তাকায় বর্ষা, ‘তাছাড়া, এখন তোমরা দুজন নও… তিনজন। শরীরের একটু বেশিই খেয়াল রাখতে হবে তাই না!’ দুঃখের ভাব কিছু সময়ের জন্য ভুলে আগের মতো মিষ্টি করে হাসে বর্ষা। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয় বৈশালী, ওর গাল দুটো লাল হয়ে গিয়েছে…বড্ড মিষ্টি লাগছে।
দুপুরে অল্প কিছু খেয়ে বাইরে হাঁটতে বেরোয় সন্তোষ আর বৈশালী। বাড়িটার চারিপাশ খুব নির্জন, শুনশান। সামনের রাস্তায় না আছে কোনও দোকানপাট, না আছে কোনও গাড়ি ঘোড়ার চিহ্ন! দুয়েকটা বাইক বা অটো কখনও সখনও দূরের মেইন রোড ধরে ছুটে যাচ্ছে। আশেপাশে কিছু ছোটখাটো একতলা দোতলা বাড়ি রয়েছে বটে, লোকজন হয়তো থাকেও সেখানে। তবে সবক’টা বাড়ির অবস্থা বড় সঙ্গিন, দারিদ্রতার চিহ্ন সেখানে প্রকট হয়ে উঠেছে।
আশপাশটা নিজের মতো করে ঘুরে ফিরে দেখছিল বৈশালী। হঠাৎ তার নজর পড়ে খানিক দূরের ঝোপঝাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটা প্রকাণ্ড বাড়ির দিকে। বাড়িটার চেহারা দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সেটা একেবারেই পরিত্যক্ত। বড় বড় চিড় ধরেছে দেওয়ালে, লতাপাতা ভরাট করেছে সেই সমস্ত চিড়। ‘ওই বড় বাড়িটা কাদের গো?”
বৈশালীর কথা শুনে বাড়িটার দিকে দেখে সন্তোষ। বলে, ‘সুরেশ আঙ্কেলের, এখানেই থাকতেন আগে। বাবার বন্ধু ছিলেন, তবে বাবা একটু হলেও হিংসে করতেন আঙ্কেলকে।’
‘কেন ? ’
‘আঙ্কেল খুব সাকসেসফুল ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রচুর পয়সা আর সম্পত্তি ছিল ওঁদের। বাবার ব্যবসা তখন ছোট ছিল, তাই ওই প্রফেসশাল জেলাসি আর কী! আঙ্কেল দুই ছেলে, বউ আর মা’কে নিয়ে থাকতেন। ওঁর ছোটছেলে আনন্দর সঙ্গে আমার টুকটাক চেনাজানা ছিল। তবে ও একটু ধার্মিক টাইপের, অকাল্টে বিশ্বাস করত। অদ্ভুত সব জিনিস নিয়ে কথাটথা বলত; তাই আমার সঙ্গে খুব বেশি পটত না। আমি যখন বাড়ি ছেড়েছিলাম, তখনও আঙ্কেল এখানেই থাকতেন। কিন্তু সাত বছরে এই বাড়ি কী করে এমন পরিত্যক্ত হল, সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না। ওদের পুরো পরিবার কোথাও চলে গিয়েছে কিনা কে জানে!’ শেষ কথাটা বলার সময় সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে সন্তোষ।
বাড়ি ফিরে আসার সময় সন্তোষ বলে, ‘আমি একবার মার্কেট থেকে ঘুরে আসি বুঝলে, আগে কত ঘুরেছি ওখানে…পুরোনো স্মৃতি ঝালিয়ে নিই একবার।’ ‘যাও না! ঘুরে এসো…’ বলে সন্তোষকে বিদায় জানায় বৈশালী।
.
সন্তোষ চলে যাওয়ার পরে বৈশালী ভাঙা পরিত্যক্ত বাড়িটার চারপাশটা ঘুরে দেখতে থাকে। রাস্তাটা একেবারেই মসৃণ নয়, গাছপালা ঝোপঝাড় থেকে খসে পড়া পাতায় রাস্তার দুপাশ ভর্তি। আশেপাশে কোনও পশুপাখি বা নিদেনপক্ষে কাকের ডাকও শোনা যাচ্ছে না। এখানকার বাতাস যেন একটু বেশিই ভারী…অল্প অস্বস্তি হতে থাকে তার। তবুও বাড়ির পেছনের দালানের দিকে হেঁটে যায় সে।
সেখানে রাস্তার একপাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা প্রাচীন বটগাছ। আর তার ডাল থেকে ঝুলছে বহু পুরোনো খয়ে যাওয়া একটা দড়ি। মনে কু ডাকে বৈশালীর। সে অনুমান করে যে কোনওকালে হয়তো এই গাছের ডাল থেকেই গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল কেউ। সে গাছটার পিছন দিকে যায়। তারপরই হঠাৎ একটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ কানে আসে তার, দড়ি থেকে ভারী কিছু ঝুললে যেরকম শব্দ হয় সেরকম। তার পিঠ বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে আসে।
এখান থেকে বাড়িটার পেছনের দিকের অনেকগুলো জানালা দেখতে পাওয়া যায়; তাদেরই মধ্যে একটা জানালার দিকে বৈশালীর দৃষ্টি আটকে যায়। জানালার কাচের ওপরে পুরু ধুলোর আস্তরণ জমেছে। কাচের ওপারে কী আছে তা পরিষ্কার ভাবে বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু বৈশালীর মনে হয় যে কাচের ওপারে কে যেন একটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। নারীমূর্তি না পুরুষ, তা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু সেই মূর্তিটা তার দিকে তাকিয়েই হাসছে…হাসিটা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়।
মূর্তিটা হাত নেড়ে ডাকছে বৈশালীকে। এবার মূর্তিটার হাতের ওপরে দৃষ্টি পড়তেই গা গুলিয়ে ওঠে বৈশালীর, সেখানে রয়েছে অসংখ্য কালো কালো ঘা। ঘাগুলো থকথকে
আর মাঝেমধ্যে ধুকপুক করছে। মুখটা পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে না। তবুও চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। আর ওই চোখে এমন কিছু একটা রয়েছে যেটা দেখে বৈশালীর মনে হয় যে চোখ দুটো কোনও জীবিত মানুষের হতে পারে না ৷ সে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায় নিজেদের বাড়ির দিকে।
বাজারে গিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে বেশ ভালোই লাগছিল সন্তোষের। পুরোনো দিনের সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। দাদার সঙ্গে তখন খারাপ সম্পর্ক ছিল না, দুই ভাই মিলে একসঙ্গে এই বাজারে ঘুরে বেড়ানো, খাওয়া দাওয়া সবই হয়েছে এককালে। কিন্তু দাদার স্বভাবের এতটা পরিবর্তন কখনও আশা করেনি সন্তোষ। কিন্তু মানুষ ঠিক ঋতুর মতোই, বদলে বদলে যায়। কোনও সম্পর্কই হয়তো চিরকালের জন্য হয় না। এসব ভাবতে ভাবতেই সে ঢুকল একটা ওষুধের দোকানে। ‘দাদা, একটা স্যানিটাইজার দিন তো ! ‘কত দামের?” লোকটা জিগ্যেস করে।
‘দিন না একটা কিছু। আর হ্যাঁ, দুটো মাস্ক দেবেন।’
দাম মিটিয়ে ফেরার পথে বাজারের শেষ মুদির দোকানটার দিকে চোখ আটকে যায় সন্তোষের। সেখানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছে আনন্দ! কৌতূহল দমন করতে না পেরে সে হেঁটে যায় সেদিকে৷ আনন্দ প্রথমটায় চিনতে না পারলেও সন্তোষ নিজের পরিচয় দিতেই সে বুঝতে পারে। কথা বলার জন্য দোকানের পেছনের দিকটায় চলে যায় ওরা।
“তোমার দাদার ব্যাপারটা শুনেছি, ভয়াবহ মৃত্যু। তবে আমি কিন্তু একটুও অবাক হইনি। এটাই ওর প্রাপ্য ছিল।’
“মানে? কী বলতে চাইছ?’
একটা বিড়ি ধরিয়ে এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে চোয়াল শক্ত করে আনন্দ বলে, ‘তুমি হয়তো জানো না, ওর যে এত প্রতিপত্তি ছিল, এত ব্যবসা, এত কাস্টমার, এত পার্টনার—এইসবই কিন্তু আমার বাবার ব্যবসা ভেঙেই করা। বাবার সমস্ত কর্মচারী, পার্টনারদের হঠাৎ করেই কীভাবে যেন হাত করে নিয়েছিল ও। বাবার ব্যবসা বন্ধ করিয়ে নিজের মনোপলি করেছিল তোমার দাদা। কিন্তু অন্যের থেকে চুরি করা জিনিস কি আর বেশিদিন নিজের কাছে রাখা যায়??
নিজেকে অল্প সামলে নেয় সন্তোষ। কথা ঘোরানোর জন্য বলে, ‘তোমরা আর ওখানে থাকো না? ‘
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনন্দ, ‘না, বাবার হার্ট অ্যাটাক, মায়ের আর দিদার পরপর মৃত্যুর পরে ওই বাড়ি আমরা ছেড়ে দিই। ছোটখাটো কাজ করে দিন চলে এখন।’ একটু থেমে আবারও সে বলে, ‘শুধু আমার বাবাই নয়, আরো বেশ কয়েকজন ঠিক এমন ভাবে হঠাৎ করেই সর্বস্ব হারিয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন আত্মহত্যাও করেছিল।’
‘সে কী।’
‘আমাদের বাড়ির পেছনের বটগাছে গলায় দড়ি দিয়েছিল লোকটা। বীভৎস ব্যাপার।’ মাথা নিচু করে নেয় সন্তোষ। যদিও কথাগুলো শুনে খুব বেশি অবাক হয়নি সে; সংগ্রাম টিংরে অন্যের প্রাপ্য জিনিস ছিনিয়ে নেওয়ায় সিদ্ধহস্ত ছিল। আনন্দর মুখ দেখে মনে হল সে আরো কিছু বলতে চায়।
‘আর কিছু বলবে?” গলা নিচু করে জিগ্যেস করে সন্তোষ।
‘সন্তোষ ভাই, তোমার দাদার মৃত্যুর পর থেকে আমার একটা জিনিস মনে হচ্ছে। বলতে পারো একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছে। জানি না তুমি কতটা কী মানবে, কিন্তু তাও একবার শুনবে ? ‘
‘কী ব্যাপার বলো তো?”
‘তোমাদের বাড়িতে কি এমন কোনও জায়গা আছে যেখানে কেউ যেতে পারে না বা সহজে দেখা যায় না? ‘
সন্তোষ বেশ কিছুক্ষণ ভেবে হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে, “একটা বেসমেন্ট রয়েছে, কিন্তু সেটা তো বন্ধ থাকে৷ মানে আমিও কোনওদিন সে ঘরে যাইনি। কেন বলো তো?”
‘যদি থেকে থাকে, তাহলে… একবার দেখবে তো ওখানে কোনও নারকেল পাও কিনা! আর যদি পাও, তাহলে অবশ্যই পালিয়ে যেও ও বাড়ি ছেড়ে।’
আনন্দ আর কিছু বলতে পারল না, কেননা দোকানের ভেতর থেকে ডাক পড়ল তার; সে চলে গেল দোকানের ভেতরে। সন্তোষ কী করবে বুঝতে না পেরে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
‘কাকে দেখেছ তুমি?’ বৈশালীর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে জিগ্যেস করল বর্ষা৷ বৈশালী অল্প তোতলাতে তোতলাতে বলল, “ওই যে ওই বাড়িটার পেছনের জানালায় কে যেন একটা…’ কথা শেষ করতে না পেরে গ্লাস থেকে আরো একটু জল সে গলায় ঢালল। সামনের কাউচে বসেছিল সন্তোষ। তার চোখ মুখের অবস্থা বদলে গিয়েছে স্ত্রীর এমন দশা দেখে।
‘মুখটা ঠিকঠাক দেখতে পাইনি…কিন্তু ওই হাসি…আর ওই চোখ…আমি জীবনে ভুলব না!’ রীতিমতো কাঁপতে থাকে বৈশালী।
সন্তোষ উঠে গিয়ে বৈশালীর গা ঘেঁষে বসে। তারপরে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলে, “আচ্ছা বউদি, দাদার তো শুনেছি বিশাল বিজনেস ছিল। তা হঠাৎ করে কী এমন হল যে তোমরা চাকর-বাকর পর্যন্ত ছাড়িয়ে দিতে বাধ্য হলে? ‘
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বর্ষা। মাথায় চিন্তার ভাঁজ আরো একটু গভীর হল, ‘তাহলে পুরোটা গুছিয়েই বলি তোমাদের। টানা সাত বছর ধরে ব্যবসাটা ভালোই চালাচ্ছিল সংগ্রাম। তোমাদের বাবার থেকে অনেক বেশি সফল হয়েছিল ও; ব্যাপারটা
এমন হয়ে গিয়েছিল যে ও যাতেই হাত দিচ্ছে তাতেই সফল হচ্ছে। আগে গোটা রত্নগিরিতে তোমাদের বাবার একটাই দোকান ছিল। সংগ্রাম সেই একটা দোকান থেকে পনেরোটা দোকান করল এই সাত বছরে।
‘রত্নগিরি শহরে ‘টিংরে বড়েওয়ালে’র নাম সকলের মুখে মুখে ঘুরত। প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা ঢুকতে থাকল ঘরে। কিন্তু সাফল্য দেখতে দেখতে তোমার দাদা হয়তো ভুলেই গিয়েছিল যে ব্যর্থতাও কোনও সময়ে আসতে পারে। আর সেটাই হল।
‘গত বছর ঠিক এই সময় তিন তিনটে দোকান শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন লেগে ভস্মীভূত হয়ে গেল। দোকানের ভেতরে থাকা কর্মীদের মৃত্যু হল। তারপরে কোর্ট কাছারি, উকিলের ফিস, পুলিশকে ঘুষ, সেটেলমেন্ট, ইন্সুরেন্সের টাকা না পাওয়া…সব মিলিয়ে জলের মতো টাকা খরচ হতে থাকল।
‘সেই বোধহয় শুরু হল সর্বনাশের। সাত বছরের সাফল্যের পরে এমন ভয়ানক ব্যর্থতা আসতেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ল তোমার দাদা। আসক্ত হয়ে পড়ল জুয়া খেলায়। সেখানেও কিছু কম টাকা খোয়ায়নি ও। বাজারে দেনা বাড়তে থাকল, অন্যদিকে একটার পর একটা দোকান বন্ধ হতে থাকল। এরপর বাবার অ্যান্টিক জিনিসগুলো বেচতে শুরু করল সংগ্রাম আর সেই টাকা দিয়েই কিছু কিছু ধারদেনা মেটাল। জুয়ার সঙ্গে সঙ্গে মদের নেশাও ধরল।’
কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভেবে আবার বলতে শুরু করল বর্ষা, ‘সেই মদের নেশা ছাড়তে বলায় একদিন প্রচণ্ড মারধোর পর্যন্ত করেছিল আমায়। আমার পেটে সন্তান ছিল তখন, কিন্তু সংগ্রামের অত্যাচারে অনেক রক্ত বেরিয়ে…বাচ্চাটা মারা যায়।’ এই বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বর্ষা৷
‘কিন্তু এখানেই বিপদের শেষ হল না, এ ছিল সর্বনাশের শুরু। পাঁচ মাস আগে হঠাৎ করেই অদ্ভুত এক রোগ হল তোমার দাদার। ওর সারা শরীর অস্বাভাবিক রকমের খসখসে হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবলাম অতিরিক্ত মদ খাওয়ার ফলে কি এমন কিছু হল? কিন্তু যতদিন যেতে লাগল, ততই যেন সেই খসখসে ভাব বাড়তে থাকল। অনেক ডাক্তার বদ্যি হাসপাতাল করেও সেই রোগের কারণ বা উপশম বোঝা গেল না৷ ওর চিকিৎসার জন্য আমায় গয়না বেচে দিতে হল। এরপরে একদিন ডাক্তার জানাল যে সংগ্রামের শুধু বাইরেটা নয়, ভেতরটাও শুকিয়ে যাচ্ছে এই অদ্ভুত রোগের প্রভাবে। তারাও হাত তুলে দিল।
‘রোগের প্রকোপে ওর শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক ক্লান্তি এতটাই বেড়েছিল যে ও মনে হয় পাগল হয়ে গিয়েছিল। কোনওভাবে সেই রহস্যময় রোগ হয়তো ওর মস্তিষ্কেও বাসা বেঁধেছিল। রাতের বেলায় উঠে পায়চারি করত, আপনমনেই কীসব যেন বিড়বিড় করত। আমি একদিন জিগ্যেস করেছিলাম, ‘তোমার কী হয়েছে বলো তো!’ সংগ্রামের চোখে মুখে আমি যে ভাব দেখেছিলাম, সেটা আতঙ্ক ছাড়া আর কিছুই নয়। ও বলেছিল, ‘ও আমায় ছাড়বে না… ও আমায় ছাড়বে না।’ কার কথা বলেছিল আমি জানি না, কিন্তু কোনও কারণে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল ও… মৃত্যুভয় !
‘খাওয়া দাওয়া করত না, চান করত না, সারাটাদিন শুয়ে থাকতে থাকতে কেমন
যেন কুঁজো হয়ে যাচ্ছিল। গায়ের চামড়া আর চামড়া ছিল না, মাছের আঁশের মতো হয়ে গিয়েছিল। বোটকা গন্ধ ছাড়ত। মাঝে মাঝে দেখতাম ওই আঁশের মতন চামড়াগুলো ও টেনে টেনে তুলছে…রক্ত বেরোত কিন্তু সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ থাকত না সংগ্রামের; পাগলের মতো হাসত আর চামড়া টেনে তুলত।’
কিছু একটা মনে পড়তে যেন ভয়ে শিউরে উঠল বর্ষা। তারপর আবার বলল, ‘তবে তিনদিন আগের সেই রাতটা আমি কখনোই ভুলতে পারব না। সেই রাতে সংগ্রামের পাগলামো চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। জানি না তোমরা কতটা বিশ্বাস করবে আমায়, তবুও বলছি। শেষের দিকে আমি আর সংগ্রাম আলাদা ঘরে শুতাম। এমনিতেই আমার ঘুম পাতলা, তার ওপরে সংগ্রামের অদ্ভুত আচরণের কারণে আমি নিজেও রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারি না। চোখ বুজে এলেই মনে হয় এই বোধহয় কোনওকিছু ঘটবে, হাঁসফাঁস করে উঠি।
‘সে রাতেও আধো ঘুমের মধ্যেই ছিলাম; রাত তখন কটা বাজে ঠিক বুঝতে পারিনি। ঘুমটা ভেঙে যায় আলগা একটা ধাতব শব্দে। শব্দটা আসছিল দোতলার কিচেনের দিক থেকে। আমি উঠে পা টিপে টিপে হেঁটে গেলাম কিচেনের দিকে; কিন্তু কিচেনে কেউ ছিল না! ভাবলাম ভুল শুনেছি, কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে আবারও নিজের ঘরের দিকে ঢুকতে যাব ঠিক তখন আবার শব্দটা শুনতে পেলাম। শুকিয়ে যাওয়া চামড়ার ওপর দিয়ে ধারালো ছুরি চালালে ঠিক যেমন শব্দ হয়… গা’টা শিরশির করে উঠল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সংগ্রামের ঘরের দিকে।
‘গিয়ে দেখি ও ডানহাতে ধরা ছুরি দিয়ে নিজের গলার চামড়া কাটছে একটু একটু করে। অথচ ওর মুখে কোনও বিকার নেই, হাসছে। হাসতে হাসতেই গলার শুকিয়ে যাওয়া চামড়া কাটতে থাকে ও। সারা ঘর কাঁচা রক্তের গন্ধে ভরে ওঠে। ওকে আমি আটকাতে পারিনি। ওর ওপরে যেন কিছু একটা ভর করেছিল। ওরকম ভাবে কাটতে কাটতেই ওর শরীরটা একসময় নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল।’
বর্ষার কথা শেষ হলে গোটা ঘরটা একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে সন্তোষ অল্প ইতস্তত করে বলে, ‘দাদার ঘরটা এখন খোলা না বন্ধ? বর্ষা জানায় ঘরটা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সন্তোষ৷ ৷ এমন ভয়াবহ কাণ্ড যে ঘরে ঘটে গিয়েছে, সেটা খোলা না রাখাই ভালো! তাছাড়া, বৈশালীও প্রচণ্ড পরিমাণে ভয় পেয়ে গেছে। না চাইতেও মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা অস্বস্তির একটা ভাব জেগে উঠছে, কিছুতেই সেটা কাটাতে পারছে না সন্তোষ।
অমাবস্যার রাত। রাত দুটোর ঘণ্টা বাজছে। শারীরিক ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও কিছুতেই ঘুম আসছে না সন্তোষের। ঘুমোনোর চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। চোখ বুজলেই কী একটা ভয় যেন ঘিরে ধরছে ওকে; ওর শুধুই মনে হচ্ছে খুব চাপা স্বরে কে যেন দুর্বোধ্য কোনও ভাষায় কিছু একটা বলছে…খুব সম্ভবত তাকে ডাকছে। ডাকটা খুব চাপা…অথচ
বেশ তীক্ষ্ণ। সোজা সন্তোষের কানে এসে বিঁধছে। সে ডাক ভেসে আসছে অন্ধকার নরকের কোনও অজানা অতল থেকে।
ধড়মড়িয়ে সে উঠে বসে বিছানায়, বৈশালী অঘোরে ঘুমোচ্ছে। দুপুর থেকেই বৈশালীর শরীরটা ভালো নেই…বেশ কয়েকবার বমি করেছে। বৈশালী কিছুটা চিন্তিত ছিল যে আজ বাচ্চাটা একবারের জন্যও নড়েনি। তার ওপর আবার সন্ধে থেকে বৈশালীর ধুম জ্বর। স্ত্রীর কপালে হাত দেয় সন্তোষ। তাপমাত্রা আগের চেয়ে কম হলেও জ্বর এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। মাঝেমধ্যে জ্বরের ঘোরে সে কিছু একটা বিড়বিড় করছিল, যদিও কথাগুলো পরিষ্কারভাবে শুনতে পায়নি সন্তোষ। বর্ষা বউদির বলা কথাগুলোও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব নিয়ে এমনিতেই চিন্তায় আছে সন্তোষ; তার ওপরে রাতবিরেতে এমন শব্দ !
অজানা ভয়ে সন্তোষের গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে জল খাওয়ার জন্য সে নেমে আসে একতলায়। তামার ঘটি থেকে বেশ কিছুটা জল খেয়ে নিয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে যাবে, এমন সময় একতলার একেবারে শেষ প্রান্তের দিকে তার নজর চলে যায় তার। একটা বন্ধ দরজা রয়েছে সেখানে। বাড়ির নীচের পুরোনো বেসমেন্টে যাওয়ার এটা। আনন্দ তো এমন কিছুর কথাই বলছিল ওকে। কিন্তু কেন? উত্তরের আশায় মনের মধ্যে জমাট বাঁধা প্রশ্নগুলো ঘূর্ণিঝড়ের মতো উথালপাথাল করতে থাকে। পা টিপে টিপে সেদিকে হেঁটে যায় সন্তোষ।
. দরজাটার গায়ে বড় একটা তালা ঝুলছে। তালার ওপরে হয়তো কোনওকালে লাল সিঁদুর লেপা হয়েছিল। এখন সেই সিঁদুর শুকিয়ে গিয়েছে৷ বাবা বলত যে এই দরজার ওপারে নাকি একটা সিঁড়ি রয়েছে, যেটা চলে যায় বাড়ির বেসমেন্টের দিকে। আজ অবধি সেই বেসমেন্ট দেখার সুযোগ হয়নি সন্তোষের। আবারও সেই অস্বস্তিকর ভয়ের ভাবটা ফিরে আসছে। দরজার ধার থেকে সে সরে আসতে যাবে, ঠিক তখনই আবার দুর্বোধ্য ভাষার সেই ডাক ভেসে এল তার কানে।
দরজার গা থেকে সন্তোষ ভয়ে ছিটকে এল। এখন সে নিশ্চিত, ওই ডাক ভেসে আসছে বন্ধ দরজার ওপার থেকে। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সে ছুটে যায় সিঁড়ির দিকে। একদৌড়ে ওপরে এসে দোতলায় তাকে থামতে হয়। বলা ভালো, একটা দৃশ্য তাকে থামতে বাধ্য করে।
বর্ষা বউদির ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা। সেখান থেকে ভেসে আসছে চাপা হাসির শব্দ। রাত বিরেতে একা একা বউদি এমন করে হাসছে কেন! পা টিপে টিপে সন্তোষ হেঁটে যায় সেদিকে, উঁকি মারে ঘরের ভেতরে। আর তারপর ঘরের ভিতরের দৃশ্য দেখে নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসে তার। বর্ষা সম্পূর্ণ উলঙ্গ, শরীরে একটা সুতোও নেই। আর ওর শরীরের এখানে ওখানে তৈরি হয়েছে কালো কালো পুঁজের মতন দেখতে কিছু একটা, থক থক করছে সেগুলো। সন্তোষের কাছে পরিষ্কার হয় কেন বর্ষার সর্বাঙ্গ আবৃত ছিল।
বর্ষা হাসছে পাগলের মতো। নখ দিয়ে খুঁটছে পুঁজগুলো, রক্ত মিশ্রিত কষ বেরিয়ে আসছে সেগুলো থেকে। গা গুলিয়ে ওঠে সন্তোষের। এ বাড়ির সবকিছুই কেমন
যেন অস্বাভাবিক। দাদার পরে কি বউদিও পাগল হয়ে গেল? বউদির ওপরেও কি কিছু ভর করল। সকালে তো স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছিল…অথচ রাতে এমন করছে কেন? আর সারা গায়ে এগুলো কী। কোনও কঠিন রোগ, নাকি অন্য কিছু? না, পরশু অবধি অপেক্ষা করা যাবে না। আগামীকালই সে বেরিয়ে পড়বে বৈশালীকে নিয়ে। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়।
সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত ওপরে এসে শোয়ার ঘরে ঢুকতেই সন্তোষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দেয় যে এখানে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস পড়তে থাকে তার, কারণ সে স্পষ্ট বুঝতে পারে যে বৈশালী বিছানায় নেই…এমনকী ঘরেও কোথাও নেই। আলোটাও বন্ধ; তাহলে এই অন্ধকারে গায়ে এত জ্বর নিয়ে বৈশালী গেল কোথায়? ‘বৈশালী! বৈশালী!’ পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকে সন্তোষ। হলরুম সহ অন্যান্য ঘরের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না বৈশালীকে। এই ঘর থেকে ও ঘর, বাথরুম, রান্নাঘর, বারান্দা সব জায়গায় খোঁজা হয় বৈশালীকে… কোথায় গেল সে!
এত চিৎকার চেঁচামেচির মাঝেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বর্ষা। তাকে দেখে অবাক হয়ে যায় সন্তোষ… কিছুক্ষণ আগেই যেভাবে সে বর্ষাকে দেখেছে, এখন সেই রূপের কোনও অস্তিত্বই নেই। কোথায় গেল শরীরের সেই থকথকে ঘাগুলো! নাকি পুরোটাই ভুল দেখেছে সে! সে কী বলবে, কী করবে বুঝতে পারে না। হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকে সন্তোষ।
ঠিক সেইসময় ছাদের দিকের দরজা খোলার শব্দ শোনা যায়। তবে কি বৈশালী ছাদে উঠে গেল! কিন্তু এতরাতে সে ছাদে একা একা কী করছে!
‘বৈশালী!” সিঁড়ি ধরে ছাদের দিকে দৌড় দেয় সন্তোষ। পিছু নেয় বর্ষা বউদিও। ছাদের দরজা হাট করে খোলা, আলকাতরার মতো ঘন অন্ধকারের রাজত্ব সেখানে। ছাদে উঠতেই দক্ষিণের কার্নিশে চোখ চলে যায় সন্তোষের। থমকে যায় সে। কার্নিশের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বৈশালী; খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে…চোখের দৃষ্টি মরা মাছের মতো স্থির… কিন্তু সেই দৃষ্টির সঙ্গে ঠোঁটের হাসিটা বড় অদ্ভুত।
‘বৈশালী! নেমে এসো, আর পেছনে যেও না…নেমে এসো…’ সন্তোষের হাজার মানা সত্ত্বেও বৈশালী অদ্ভুত ভাবে হাসতে হাসতে পিছোতে থাকে। তার পরমুহূর্তেই ভারী শরীরটা পড়ে যায় নীচে। বীভৎস একটা শব্দে কেঁপে ওঠে সন্তোষের অন্তরাত্মা। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে যায়।
সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখন সকাল প্রায় সাতটা। ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে সন্তোষ। বৈশালীকে দেখে চমকে ওঠে সে। একঝটকায় তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে গতকাল রাতের সেই বীভৎস দৃশ্য। দৌড়ে গিয়ে বৈশালীকে আঁকড়ে ধরে সন্তোষ বলে ওঠে, ‘তুমি ঠিক আছ বৈশালী…তুমি…তুমি… তোমার কিছু হয়নি তো? ‘ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জামাকাপড় গোছাতে গোছাতে বৈশালী নির্বিকার ভাবে
বলে, ‘আমার আবার কী হবে। আমি একদম ঠিক আছি। কিন্তু তোমার কী হয়েছিল?’ ‘আমার? আমার কী হয়েছিল? ‘
হাতের কাজ ছেড়ে বৈশালী সন্তোষের সামনে এসে বসল, ‘কাল রাতে একবার ঘুম ভেঙেছিল, দেখলাম তুমি বিছানায় নেই। কিছুক্ষণ পরে কেমন যেন ভয়ে ভয়ে তুমি ঘরে এলে আর শুয়ে পড়লে…আর তারপরে বোধহয় স্বপ্ন দেখে কীসব আবোল-তাবোল বকছিলে, সে তুমিই জানো!’
সন্তোষ হতবাক হয়ে গেল। যে ব্যাপারটা তার কাছে চরম সত্যি বলে মনে হয়েছিল…সেটা তাহলে স্রেফ স্বপ্ন ছিল? স্বপ্ন নয়…ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। সে সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে বৈশালীকে পুরোটা খুলে বলল। সবটা শুনে বৈশালী বলল, ‘আমি তো তোমার সামনেই বসে আছি দ্যাখো! কিন্তু তোমার যদি মনে হয় আমাদের এখনই বেরিয়ে পড়া উচিত, তাহলে তাই হোক! সত্যিই তো, কাকে যে আমি দেখেছিলাম বাড়ির পেছনে কে জানে!’
গো?” কিছুক্ষণ মাথা ধরে বসে থাকে সন্তোষ। তারপর আবার বলে, ‘বউদি কোথায়
‘জানি না তো…সকাল থেকে দেখিনি দিদিকে।
“বেশ, তুমি তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে নাও। একদম রেডি হয়ে থেকো। আমি শুধু একটা জিনিস দেখেই এক্ষুনি আসছি।’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে একেবারে নীচের তলায় সেই বেসমেন্টের দরজার সামনে চলে আসে সন্তোষ। কিন্তু এখন সেটায় তালা দেওয়া নেই। দরজাটা ভেজিয়ে রাখা। সন্তোষ ভাবে, আশ্চর্য! কাল রাতেও তো তালাটা ছিল। এত সকালে কে খুলল !
একবার আশেপাশে দেখে নিয়ে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে সে৷ একটা হালকা লাল আলো জ্বলছে বটে, তবে তাতে এখানকার অন্ধকার যেন আরো গভীর হয়ে গেছে। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি নেমে গিয়েছে লালচে আঁধারের গহীনে। এক পা এক পা করে সেদিকে নামতে থাকে সন্তোষ। যত নামছে, একটা তীব্র পচা গন্ধ নাকে এসে লাগছে তার। সন্তোষের গা গুলিয়ে ওঠে।
একসময় একেবারে নীচে এসে দাঁড়ায় সন্তোষ আর সেখানে একটা জিনিসের দিকে চোখ পড়তেই থমকে যায় সে। অন্ধকার জমা কোণে লাল কাপড়ে মোড়া কিছু একটা রাখা রয়েছে। সন্তোষ এগিয়ে যায় সেদিকে। লাল কাপড়টা সরাতেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে সিঁদুর মাখা পুরোনো একটা নারকেল; সেই নারকেল আজকের নয়, যথেষ্ট পুরোনো…শুকিয়ে গিয়েছে অনেকদিন আগে। আনন্দ তো এটার কথাই বলেছিল ওকে। কিন্তু এটা কী?
ভয় ও সংশয় নিয়েই নারকেলটা হাতে তুলে নেয় সন্তোষ…ঠিক তখনই পেছন থেকে শুনতে পায় বৈশালীর হাড়হিম করা কণ্ঠস্বর, ‘কী গো, ভয় পেলে নাকি? ভাবছ ওটা কী!’
সন্তোষের ঘাড়ের কাছের লোম খাড়া হয়ে ওঠে, ‘তু…তুমি ক…কী…ক….করছ এখানে? ‘
আগের মতোই থমথমে • বৈশালী বলে, ‘বায়াঙ্গী; এই বাড়িতে বাসা বেঁধেছে
বায়াঙ্গী। সাত বছর আগে তোমার দাদা গুহাগড়ের কোনও এক তান্ত্রিকের কাছ থেকে মোটা টাকার বিনিময়ে কিনে এনেছিল এটা। বায়াঙ্গী না থাকলে কী আর এত কম সময়ের মধ্যে এত প্রতিপত্তি পাওয়া ওর মতো মানুষের পক্ষে সম্ভব? শত্রুকে শেষ করে তার সম্পত্তি আর অর্থকে করায়ত্ত করতেই ব্যবহৃত হয় এই বায়াঙ্গী।
‘কিন্তু এখানে একটা সাবধানবাণীও আছে। যদি সাত বছর পরেও যদি আরো সম্পত্তির লোভে ওই অভিশপ্ত নারকেলকে বাড়িতে রাখা হয়, তখনই বায়াঙ্গী তার আসল রূপ ধারণ করে। শেষ করে দেয় সবকিছু৷ আসলে, মানুষের লোভের তো শেষ নেই। তোমার দাদা লোভে অন্ধ হয়ে বায়াঙ্গীকে ছাড়েনি, আর সেখান থেকেই সর্বনাশের শুরু। তাই প্রথমে তোমার দাদা…আর তারপর…’
সন্তোষের শরীর যেন অসাড় হয়ে যায়। সে বলে, ‘তুমি এত কিছু কী করে জানলে বৈশালী? তুমি তো…।’ বৈশালী হা হা করে হেসে ওঠে। সন্তোষের বুক শুকিয়ে যায় ওই হাসি শুনে। এবার সে চমকে ওঠে। সে এতক্ষণে খেয়াল করে, তার পায়ের কাছে কী যেন একটা পড়ে আছে৷ সেদিকে দেখতেই প্রচণ্ড ভয়ে ও অবিশ্বাসে কেঁপে ওঠে তার গোটা শরীর।
কারণ সেখানে পড়ে রয়েছে বৈশালীর নিথর দেহ…থেঁতলে গিয়েছে তার মাথা মাথার পাশে জমাট বাঁধা কালচে রক্ত। আর ঠিক তার পাশেই পচে গলে যাওয়া বিকৃত একটা মৃতদেহ। যার অবয়ব দেখে সন্তোষের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এটা বর্ষা বউদির লাশ।
সন্তোষের ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায় বৈশালীরূপী বায়াঙ্গী। তার অপার্থিব হাসি সহ্যসীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে।
সন্তোষের মাথার দুইপাশ চেপে ধরে বায়াঙ্গী। সঙ্গে সঙ্গে সন্তোষের চোখের সামনে ফুটে উঠতে থাকে অতীতের কিছু দৃশ্য। উদ্ঘাটিত হতে থাকে গোপন রহস্য। সুদূর গুহাগড় থেকে আনা সিঁদুর মাখানো একটা নারকেল সাত বছর আগে সকলের নজর এড়িয়ে পূর্ণিমার রাতে বেসমেন্টে রেখে আসে সংগ্রাম। সাত বছর পরেও যখন সে নারকেলটা ত্যাগ করে না, তখন এমনই এক পূর্ণিমার রাতে নারকেলের ভেতরে বন্দি নরকের কোনও এক পৈশাচিক জীব দখল করে সংগ্রামের শরীর। সংগ্রাম যে রাতে ভয়ঙ্কর ভাবে মারা যায়, সেই রাতেই জীবটি তার শরীর ছেড়ে দখল করে বর্ষার শরীর। আর এখন বৈশালীর…।
মাথার চাপ হালকা হতেই চোখ খোলে সন্তোষ৷ সে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বৈশালীরূপী বায়াঙ্গী। মুখে হিংস্র হাসি, তার সারা শরীরে কালো কালো থকথকে পুঁজ। ডান হাতে ধরা ছুরি ধীরে ধীরে উঠে আসে গলার ওপরের দিকে। বিনা কোনও বিকৃতিতে সে কাটতে থাকে নিজের গলার চামড়া। সন্তোষ অসহায়ের মতো চুপচাপ সেই ভয়ানক দৃশ্য দেখতে থাকে। রক্ত সমেত কষ বেরিয়ে আসতে থাকে পুঁজ থেকে। বৈশালী কাটতেই থাকে… কাটতেই থাকে…।
